বাঘের পিঠে বৈশাখি চিত্রমেলা

লেখক:

Bagher pitheরবিউল হুসাইন

সম্প্রতি ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে পটুয়া নাজির হোসেনের ২৫তম একক পটচিত্র-প্রদর্শনী হয়ে গেল। প্রদর্শনীটির শিরোনাম ‘বাঘের দেশে বৈশাখ’, বাংলা নববর্ষ ১৪২১ উপলক্ষে আয়োজিত এবং ৫৮টি পটচিত্র ও আটটি পটের গান শ্লোকমালা দিয়ে সাজানো, যা নতুন বছরের বাঙালির একান্ত নিজস্ব পরিচয়ের একটি সময়োচিত অনন্য উৎসবের জন্য যথার্থ উদাহরণ বলে বিবেচিত। পটুয়া নাজির পার্বতীপুরের একজন স্বাপ্নিক পটুয়া। ৩২ বছরের তরুণ ছবিতে রং দিয়ে দেশের প্রকৃতি, পাখি, ফুল, জীবজন্তু, গাছপালা, ঘরবাড়ি, মাঠঘাট, নৌকা-নদী, খালবিল, আউল-বাউল, একতারা-দোতারা সব নিয়ে বিভিন্ন আলেখ্য নিজের কল্পনার সঙ্গে মিশিয়ে একটি ব্যক্তিগত জগৎ সৃষ্টি করেন। তাঁর শৈলী স্বশিক্ষায় উপস্থাপিত, কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতার নিগড়ে বাঁধা নয়, বরং তা বাধাহীন স্বাধীন বাংলার লোকায়ত শিল্পের হাত ধরে একটি হারিয়ে যাওয়া ধারাবাহিকতার সূত্রকে খুঁজে তার সঙ্গে দৃঢ়বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আর্তি নিয়ে সৃষ্টির প্রয়াসে সমৃদ্ধ। এই নন্দিত শিল্প-সন্ধান সবাইকে মুগ্ধ করে। বিশ হাজার বছর আগে ফ্রান্সের গুহাচিত্র থেকে পাঁচ হাজার বছর আগের হায়ারোগ্লিফ যা মিশর সভ্যতার বর্ণলিপি ও চিত্রসম্ভার দেখা যায় এবং তা ভারতের অজন্তা-ইলোরা হয়ে আমাদের পাহাড়পুর-ময়নামতি-দিনাজপুরের পোড়ামাটি কান্তজী মন্দির হয়ে কালীঘাটের পট ছুঁয়ে এখনো বহমান। এর মধ্যে সরাসরি, প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, প্রতীকী ইত্যাদি আঙ্গিকে বিভিন্ন প্রাণী, জীবজন্তু, শিকারের পশুপাখি, পরে অক্ষরসহ বাণী, শ্লোক, ধর্মকথা, ধর্মকাহিনি, রূপকথা, লোকগাথা, জনশ্রুতি, প্রেমকাহিনি, বিয়োগ বা যুগলমিলন, দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাযুদ্ধ – এসবের নানান গল্প-কাহিনির রূপালেখ্য, রেখা, আকার ও অবয়বের মধ্য দিয়ে লোকজ রীতিতে উজ্জ্বল রঙে প্রতিভাসিত। এগুলোর মধ্যে গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে শহরের নানান অনুষঙ্গ যোগ দেয়, যা সময়ের প্রয়োজনে দেখা দিয়েছে। তবে পটুয়া নাজির সবচেয়ে প্রাধান্য দিয়েছেন পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর-সুন্দর প্রাণী আমাদের জাতীয় প্রাণী রাজকীয় ব্যাঘ্রকে, যারা সুন্দরতম এক বনাঞ্চল খুলনার সমুদ্রপাড়ে সুন্দরবনে বসবাস করে কুমির, হরিণ, অজগর, শিয়াল,  হায়েনা, শূকর, বন্যমহিষ সহবাসীর সঙ্গে শান্তি ও সাম্যে। শিল্পী এই উপাদানগুলোকে নিয়ে চলতি কাহিনিকে আরো গতিময় করে তুলেছেন নিজের স্বপ্ন ও কল্পনায়। গরুগাড়ির বদলে বাঘের গাড়ি, সেই গাড়িতে বর বাঁশি বাজিয়ে পাশে বধূকে নিয়ে চলছে। আবার গাড়ি তিন চাকার রিকশা হয়ে আকাশে উড়ছে, আকাশে ঘুড়ি আর পাখি উড়ছে, বাঘের লেজটি শেষে পাখির আকারে, নিচে দুটি ময়ূর, বরের হাতে একতারা, সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকাটি একতারার খোলে ও ঘুড়িতেও ধরা দিয়েছে, যা তার কপালেও দেখা যাচ্ছে। নাজিরকেও ওইভাবে জাতীয় পতাকা নিয়ে মাথার পট্টি ও জামা-গায়ে দেখা যায়। হাতি, মাছ, কুমির, পাখি তাদের রূপ বদলে একে অন্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে অবলীলায়।

নাজিরের অঙ্কনশৈলীর ক্ষমতা আর কল্পনাশক্তির ক্ষমতা – এই দুইয়ের মধ্যে কল্পনাই অগ্রগামী, তবে তা একটি অন্যটির পরিপূরক এবং তা খুব চমকপ্রদ ও উপভোগ্য।

কল্পনা তাঁর স্বপ্নের মধ্যে ডানা মেলে উড়ে যায়, যেমনটি মার্ক শাগাল তাঁর গ্রামভিত্তিক বহু ছবিতে দৃশ্যমান করেছেন। মৎস্যকন্যা, ব্যাঘ্রমৎস্য, হস্তীমৎস্য, নৌকোবাইচে হাল ধরে উৎসাহ দিচ্ছে বাঘ-মাঝি, এক নৌকোয় শুধুই মেয়ে আরেকটিতে শুধুই ছেলে, তাদের মধ্যে নদীর নীল জলের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। দুই পাশে দুই মনুষ্যাকারে নদীর পাড়ে গ্রামের মেলা বসেছে। চরকি ঘুরছে, সাপুড়ে সাপের খেলা দেখাচ্ছে হাতে ডুগডুগি বাজিয়ে। নৌকোতে গান হচ্ছে, নৌকোর পালে বাংলার জাতীয় পতাকা – এসব দেখা যায়। একটায় দেখা যায় আকাশে উড়োজাহাজ, তার ওপর ছেলেমেয়ে বসা, ট্রেন আসছে, শহীদ মিনার, কমলাপুর রেলস্টেশন, সাভার স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর। আরো একটায় দেখা যায় প্যারিসের আইফেল টাওয়ার। এসবের পাশাপাশি বাউল, খেজুরগাছ বেয়ে বাঘের রসের কলসি পাড়া, বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়া, কুমোর মাটির সরা, পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করছে – এসবও খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেখা যায়। নাজির আবার গায়ক, সুরস্রষ্টা এবং গীতিকার। লম্বা করে বেশ কয়েকটি প্লট তৈরি করেছেন উজ্জ্বল লাল, হলুদ, নীল, কমলা, সবুজ – এসব বর্ণে। গানের পঙ্ক্তিগুলো এমন – ‘দেশের তরে দশের তরে লড়াই করে যা রে, জলপরী জলে নাইচা গান শুনায় রে’ অথবা ‘সাপুড়িয়া বিন বাজাইয়া খেলা দেখায় রে।’ অথবা, ‘বৈশাখ এলো রে বাঘের দেশ বাংলাদেশে, বৈশাখ এলো রে’ কিংবা ‘চাষি জেলের সঙ্গে অঙ্কন কাজ, ফসল রোপণ করে অঙ্কন চলবে বারো মাস।’ বাংলার আদি লোক-সংস্কৃতির পরম্পরা নাজির তাঁর মতো করে ছবি, শ্লোক, রং, সুর ও রেখায় ধরে রাখতে চেয়েছেন। প্রতিটির মধ্যে একটি গল্প বা কাহিনি আছে। এমনি করে তাঁর একটি নিজস্ব পরিমন্ডল সৃষ্টি করে চলেছেন। স্বশিক্ষিত, যাঁকে বলা হয় নাইভ শিল্পী, এরকম বহু শিল্পী আমাদের দেশে দেখা যায়। তাঁদের সব সময় উৎসাহ ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা একান্তই কাম্য যা দেশ, সমাজ, শিল্পী ও শিল্প-পরিমন্ডল সর্বক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক শিল্পবান্ধব সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পল ক্লির শিশুসুলভ অাঁকিবুকি, রুশোর আদিম রহস্য, ফ্রান্সিস বেকনের রূঢ় বাস্তবধর্মী আদিমতা – সব অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার মাধ্যমে শিল্পে স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে। শিল্প তাই রহস্যঘেরা এক ব্যাখ্যাতীত সৌন্দর্যের মাধ্যম। মূলধারার বাইরে নাজিরের অপরিশীলিত অথচ বাংলাদেশের বহমান ঋদ্ধমান লোক-সংস্কৃতিজাত অঙ্কন ও শিল্পশৈলীর ঐতিহ্যিক ধারা অবশ্যই সামগ্রিকভাবে দেশের শিল্পজগৎকে পরিবর্ধন ও উন্নত করে তুলতে সাহায্য করবে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার