বিদেশি সাহিত্য প্রসঙ্গ : কেনজাবুরো ওয়ে

লেখক:

সরকার মাসুদ

 

আধুনিক বিশ্বকথাসাহিত্যের একটি শ্রদ্ধেয় নাম কেনজাবুরো ওয়ে (Kenzaburo Oe)। লেখক হিসেবে যদিও তাঁর উত্থান বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে, কিন্তু জাপানি সাহিত্যে তিনিই প্রথম মানুষের অমত্মর্লীন চিন্তা-ভাবনাকে প্রাসঙ্গিকতা দিয়েছেন। মানবমনে যে-চিন্তাস্রোত অস্তিত্বশীল তা প্রায়ই স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। ভার্জিনিয়া উল্ফ, জেমস জয়েস, সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ্ প্রমুখ লেখক সেই মনোস্রোতধারাকে বাণীরূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তাঁদের সাহিত্যের থিমের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে। কেনজাবুরো ওয়ের ওপর, লেখা বাহুল্য, এঁদের প্রভাব কম-বেশি পড়েছে। তা সত্ত্বেও ওয়ে এ-পশ্চিমা ভাবকল্পটিকে সার্থকভাবে ব্যবহার করে জাপানের কথাসাহিত্যে নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করেছেন। তাঁর ফরাসি সাহিত্য পাঠের বিষয়টি এক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। জ্যঁ পল সার্ত্রে এবং আলবেয়ার কামুর অস্তিত্ববাদী রচনা ওয়ের নিজের পথ তৈরিতে প্রভূত সহায়ক হয়েছে বলেই মনে হয়।

জাপানে আধুনিক যুগ শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। ১৮৫০ সালের পর থেকে এখন পর্যমত্ম যে আধুনিক যুগ চলছে সেখানে, তাতে পশ্চিমের প্রবল প্রভাব লক্ষণীয়। গ্রেট ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো এবং বিশেষভাবে আমেরিকার বিশ্বসেরাদের অনেকেরই লেখাজোখা এ-সময়ের মধ্যে জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রতিভাবান লেখক এবং প্রাগ্রসর পাঠকদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন দিগমত্ম। কোনো সন্দেহ নেই পশ্চিমা শিক্ষা, ভাবধারা ও সংস্কৃতি আধুনিক জাপানের সমাজজীবনে মিশে গেছে। এশিয়ার উন্নততম এ-দেশটি বর্তমান বিশ্বের উপযুক্ত ভাবপ্রকল্পের অমত্মর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু জাপানিরা অত্যমত্ম ঐতিহ্যসচেতন। কাজেই তাদের আধুনিক সাহিত্যের ভিত্তিমূলে প্রাচীন জাপান সর্বদাই সক্রিয়। জাপানি লেখকগণ, অতএব, প্রাণচেতনার দিক থেকে জাপানি কিন্তু শিল্প-সাহিত্যের রূপকর্মের দিক থেকে পাশ্চাত্যের। পশ্চিমা শিল্পকলার আঙ্গিক ও গঠনরীতি জাপানিদের ভাবিয়ে আসছিল বহুকাল ধরেই। এ-ভাবনার পথেই কেনজাবুরো ওয়ে সৃষ্টিশীলতার নতুন দিগমত্ম উন্মোচিত করেছেন।

জাপানি সাহিত্যে আধুনিকতার লক্ষণ প্রথম দেখা দিয়েছিল সাড়ে চারশো বছর আগে। ১৫৫৫ সালের পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে জাপানের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। যোগাযোগ ঘটে প্রধানত চীনের মাধ্যমে। প্রাচ্যের অনেক দেশের চিন্তা-চেতনা প্রবেশ করে জাপানে। ফলে সেখানে নতুন ধরনের শিল্প সৃষ্টি হয়। বিশিষ্ট আঙ্গিকের কাব্য ‘হাইকু’ এবং ‘কিওকা’ এ-সময়েরই সৃষ্টি। পুতুল নাচেরও প্রবর্তন ঘটে এ সময়ের মধ্যেই। নাচ ও নাটকে সঞ্চারিত হয় নতুন ভাবনা – নতুন প্রাণ। জাপানের ভাবনা-চেতনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে পৃথিবীর নানা দেশে।

কেনজাবুরো ওয়ের জন্ম ১৯৩৫ সালে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ফরাসি সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প ‘অদ্ভুত বৃত্তি’ (A Strange job) পাঠক-সমালোচকের সুদৃষ্টি কেড়ে নিতে সমর্থ হয়েছিল। পরবর্তী গল্প ‘Lavish Are The Dead’ নিয়েও গুঞ্জন ওঠে। এর কিছুকাল পরে ওয়ে লেখেন ‘The Catch’ (নাগাল পাওয়া) নামে আরেকটি গল্প। শেষেরটি তাঁকে আকুতাগাওয়া পুরস্কার এনে দেয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ– না পেরোতেই ওয়ে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি এবং পরিচিতি পেয়েছেন। এটা ১৯৫৬-৫৭ সালের দিককার কথা। চীন-জাপান সাহিত্য প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ওয়ে ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি চীন ভ্রমণ করেন। ১৯৬১ সালে যান ইউরোপে। প্যারিসে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে জ্যঁ পল সার্ত্রের সঙ্গে।

কেনজাবুরোর গল্প-উপন্যাসে বিধৃত আখ্যান বা কাহিনি যদিও স্বদেশভিত্তিক, আঙ্গিকের বিচারে সেসব রচনার অধিকাংশই ইউরোপীয়। ফলে তাঁর যেসব লেখা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে সেগুলো মার্কিনি, ব্রিটিশ ও ফরাসি সমালোচকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করেছে। দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকাশরীতি উভয় কারণেই ওয়ের লেখাজোখা আজ বিশ্বসাহিত্যের অমত্মর্ভুক্ত হয়েছে; একীভূত হয়েছে বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে। অত্যমত্ম উর্বর কল্পনাশক্তি, বহুমুখী বিষয়বস্ত্ত, উদার-গভীর অমত্মদর্শন, সর্বোপরি চমৎকার নির্মাণশৈলী তাঁকে দেশ-বিদেশের অপরাপর আধুনিক কথাসাহিত্যিক থেকে স্পষ্টত আলাদা করেছে।

শুধু জাপানে নয়, বহির্বিশ্বেও কেনজাবুরোর সমতুল্য কোনো লেখককে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি না। অতিকল্পনা যদিও বিপজ্জনক কিন্তু ওয়ে মনে করেন, অতিনিরাসক্তি (যা শুদ্ধ কথাসাহিত্যের এক বৈশিষ্ট্য) কল্পনার লাগামকে বড় বেশি টেনে রাখতে চায়। ওয়ে এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন। উপন্যাসে ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ ও স্বীকারোক্তির ব্যবহার বিষয়েও তিনি খুব সতর্ক। প্রসঙ্গত এসে যাচ্ছে ‘আই নভেলে’র কথা। ‘আই নভেল’ হচ্ছে কেনজাবুরোর আবির্ভাবের আগেই সুপ্রতিষ্ঠিত এক সাহিত্যরীতি, যা বিশেষ কোনো প্রক্রিয়া কিংবা পূর্বনির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে না। কেনজাবুরোর বড় সার্থকতা এখানেই যে, তিনি ‘আই নভেলে’র সৃজনশীলতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এ বিশেষ সাহিত্যরীতির সফলতম কারিগরের নাম শিখা নাওইয়া। A Dark Night’s Passing তাঁর মাস্টারপিস। কিন্তু উপন্যাসটি বিশুদ্ধ সাহিত্যের উৎকৃষ্ট মডেল, এর সব ইতিবাচক দিক সত্ত্বেও। অমত্মর্দ্বন্দ্ব আধুনিক কথাসাহিত্যের একটি উলেস্নখযোগ্য দিক। কিন্তু নাওইয়ার এই উপন্যাসে দেখা যায়, প্রকৃতি ও নিজের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর জন্য নায়ক নিজেই প্রকৃতির মধ্যে মিশে গেছে। বইয়ের শেষে কোনো আত্মপ্রতীতি বা নতুন ভাবনার ইঙ্গিতও আমরা পাই না। উপরন্তু কল্পনা-ভাবনার বহুমুখিতারও অভাব লক্ষ করা যায় এখানে।

কেনজাবুরোর প্রধান গ্রন্থগুলো হচ্ছে : A Personal Matter  (১৯৬৪), The Football Game of the First year of Man’en (১৯৬৫), The Silent Cry (১৯৬৭), The Waters Have Come in Unto My Soul (দু-খ–র উপন্যাস, ১৯৭৩), The Pinch-runner Memorandum (১৯৭৬), The Game of Contemporareity (১৯৭৯), A collection of Modern Grotesque Stories (১৯৮১), Women Who Listen To ‘The Rain Tree’ (১৯৮৩), Rouse

Up O Young Men of the New Age (১৯৯০)।

শেষোক্ত উপন্যাসটি ‘আই নভেল’ ঘরানার। তবে সেই বৃত্তকেও লেখক এখানে অতিক্রম করেছেন। বইটি ওসারাগি জিরো পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে। The Waters Have Come in Unto My Soul লাভ করে নোমা সাহিত্য পুরস্কার। The Football Game of the First year of Man’en জয় করে নিয়েছিল তানিজাকি জুনিচিরো পুরস্কার। A Personal matter-এর স্থান সবার ওপরে। কেননা এটা ওয়ের জন্য এনে দিয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও সম্মান। এই উপন্যাস প্রথমে শিনচো সা পুরস্কার ও পরে নোবেল পুরস্কার (১৯৯৪) অর্জন করে। উলেস্নখ্য, কেনজাবুরো ওয়ে হচ্ছেন দ্বিতীয় জাপানি লেখক, যিনি নোবেল পুরস্কারের বিরল সম্মানে গৌরবান্বিত হয়েছেন। তাঁর আগে কাওয়াবাতা ইয়াসুনারি পেয়েছিলেন এই পুরস্কার, ১৯৬৮ সালে।

বহুকাল ধরে কেনজাবুরো জাপানের সাহিত্যমহলে এক বিতর্কিত ব্যক্তি। সাহিত্যে প্রযুক্ত ভিন্নমত এবং কলাকৌশলই এই বিতর্কের অন্যতম কারণ। ১৯৫৯ সালে তিনি আমাদের সময় নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন যার মুখ্য বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমানের সাফল্যের জন্য অতীতের সমর্থনকে অস্বীকার করা। জাপানি ঐতিহ্য অনুসারে বর্তমান অস্তিত্বের সাফল্যের জন্য অতীতের সমর্থন কামনা খুব প্রয়োজনীয় বিষয়। কেনজাবুরো এটাকে একেবারেই পাত্তা দেননি। পরন্তু শূন্যতা এবং নাস্তিবাদের জয় ঘোষণা করেছেন। এভাবে জাপানের শিক্ষেত সমাজের, যার এক বিরাট অংশ রক্ষণশীল, বিরাগভাজন হয়েছে।

কেনজাবুরো ২২-২৩ বছর বয়সেই অদ্ভুত ধরনের ভাবনা-কল্পনা এবং রূপকের আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁর গল্পে। বক্তব্যবস্ত্তকে অভিঘাতী করে তোলার লক্ষ্যে Grotesque reality-র আইডিয়াটি তিনি ব্যবহার করেছেন সার্থকভাবে। নৃতত্ত্ব, মনসত্মত্ত্ব এবং নানাবিধ লোকাচার ওয়ের সাহিত্যকর্মের ভিত মজবুত করার পেছনে সর্বদাই ক্রিয়াশীল। নিবিষ্টভাবে পাঠ করলে বোঝা যায় এগুলোর গঠনমূলক, এমনকি শিক্ষামূলক ভূমিকাও আছে কেনজাবুরোর সাহিত্যে। ‘অদ্ভুত বাসত্মবে’র বহুরূপী চেহারা তুলে ধরেছে যাঁর সাহিত্যকর্ম, তিনি কিন্তু অনেক লেখাতেই বেশ সহজ-সরল বর্ণনাভঙ্গি প্রয়োগ করেছেন, বিশেষ করে তাঁর গোড়ার দিককার কাজগুলোতে। ‘A Strange Job’ এবং ‘Lavish Are the Dead’ নামে গল্পদুটিতে এসব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এগুলো তাঁর উত্তরকালের রচনাগুলোতেও লক্ষণীয়। লেখকের গ্রামীণ শৈশব, জাপানের পরাজয়, সম্রাটের স্বর্গীয় প্রতিমূর্তি, লেখকের প্রতিবন্ধী প্রথম সন্তানের জন্ম, রূপামত্মরিত বাকপ্রতিমা, নতুন ও আজব উপমা, বিচিত্র বিষয়ে কৌতূহল, আবেগের বিশিষ্ট প্রকাশ এবং আরো অনেক কিছু কেনজাবুরোর কথাসাহিত্যিক ইমেজ তৈরির পেছনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। সবকিছু মিলে, শেষের দিকে, তাঁর সাহিত্য একটা জটিল রূপ নিয়েছে। ওয়ের স্বতন্ত্র এবং প্রভাবসম্পাতী ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। এসবের মধ্যে একাধিক উপাদান লেখক পরিণত বয়সের লেখাজোখাতেও বারবার কাজে লাগিয়েছেন। যেমন – ভাবাবেগের বিশেষ ধরনের প্রকাশ-কৌশল কেনজাবুরো-সাহিত্যে একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তাছাড়া তার প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম এবং এ নিয়ে লেখকের মানসচাঞ্চল্য ও অমত্মর্দ্বন্দ্ব, যা A Personal Matter উপন্যাসের প্রধানতম থিম, বারবার ফিরে এসেছে তাঁর লেখায়।

এখন A Personal Matter এবং The Silent Cry উপন্যাস দুটি নিয়ে দু-চার কথা বলব। নোবেলবিজয়ী A Personal Matter পড়ে আমি সত্মম্ভিত হয়েছি। বইটি অস্তিত্ববাদী ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছে। অতিসংক্ষেপে অস্তিত্ববাদ হচ্ছে – পৃথিবী নিষ্ঠুর, সমাজের পরিবেশ শত্রম্নভাবাপন্ন; ফলে মানুষের জন্য বিষণ্ণতা অনিবার্য। তারপরও মানুষ সুখ খোঁজে। প্রকৃত সুখের নাগাল সে পায় না, পায় ছদ্মসুখ! ফলে প্রহেলিকা ও বিপদের ভেতরেই তাকে জীবন কাটাতে হয়। এটা নতুন কোনো ধারণা নয়, সাহিত্যে অসংখ্যবার বিষয়টি প্রযুক্তও হয়েছে। আমাকে যা চমৎকৃত করেছে তা হলো, উপন্যাসটির অসাধারণ প্রকাশরীতি। এখানে কোনো কাহিনি নেই। আছে একজন বিক্ষুব্ধ হতাশ মানুষের বিহবল অনুভূতির ধারাবিবরণ। বার্ড নামে এ-লোকটি ভয়ংকর ও অত্যমত্ম বেদনাদায়ক এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। তার স্ত্রী জন্ম দিয়েছে একটি বিকলাঙ্গ পুত্র। মস্তিষ্কে হার্নিয়ার কারণে ছেলেটির মাথার খুলি অস্বাভাবিক রকম স্ফীত। এ ঘটনায় প্রচ- মানসিক আঘাত পায় বার্ড। সে অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন, সংবেদনশীল মানুষ। ফলে ব্যর্থতার বোধ এবং হতাশা তাকে ঘিরে ধরে। বার্ড আফ্রিকায় পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে। সে এক পর্যায়ে এমনকি শিশুটিকে মেরে ফেলার কথাও ভাবে, এ গর্হিত কাজে উদ্যোগীও হয়। কিন্তু শেষ পর্যমত্ম কা-জ্ঞানচেতনা এবং দায়িত্ববোধ তাকে বিরত রাখে অপকর্ম থেকে। এ যুগের মানুষকে সাংঘাতিক বিকার ও বীভৎসতার মধ্যে নিরুপায় জীবনযাপন করতে হচ্ছে, তারই প্রতীক উপন্যাসটি। আহত নায়কের মনোভাব এবং চিন্তাস্রোত অনুসরণ করা গড়পড়তা পাঠকের পক্ষে খুবই কঠিন হবে। কিন্তু যারা পশ্চিমের আধুনিক উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিত, তারা বার্ডের বিক্ষেপ্ত মনের ভাবনাস্রোতের মধ্য থেকেও অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে আলাদা করতে পারবেন, যদিও লেখক গ্রন্থে কালিক পারম্পর্য রক্ষা করেননি সচেতনভাবেই। বিকৃত মাথা নিয়ে জন্মানো পুত্রসন্তানটিকে দেখার পর বার্ডের (বার্ড তো আসলে কেনজাবুরো নিজেই) কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বর্ণিত হয়েছে অনন্য এবং অতুল গদ্যে – Bird gazed forbearingly at the incubator the nurse had indicated. He had been under her influence ever since he had entered the ward, gradually losing his resentment and his need to resist. He was now feeble and unprotesting himself; he might have been bound with strips of gauze even like the infants who had begun to cry in a baffling demonstration of accord. Bird exhaled a long, hot breath, wiped his damp hands on the seat of his pants, and then with his hand wiped the sweat from his brow and eyes and cheeks. He turned his fists in his eyes and blackish flames leaped; the sensation was of falling headlong into an abyss : Bird reeled… (A Personal Matter, page-71)

The Silent Cry (নিঃশব্দ আর্তনাদ) কেনজাবুরো ওয়ের আরেকটি প্রধান উপন্যাস। এই গ্রন্থটিরও ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে। ওয়ের নোবেলপ্রাপ্তির পেছনে যে-কটি রচনাকে অত্যমত্ম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল, এটাও তার ভেতরে পড়ে। এখানেও A Personal Matter-এর মতো মনোজগতের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে মুন্শিয়ানার সঙ্গে। উপন্যাসে মূলত কোনো কাহিনি নেই। বইয়ে এমন দুটি ভাইয়ের কথা বলা হয়েছে যাদের চিন্তা-ভাবনা, কামনা-বাসনা, স্বপ্ন-সামর্থ্য ও জীবনযাপন পদ্ধতির (Life style) মধ্যে কোনো মিল নেই। দুই ভাই একে অপরের কাছে আসতে চায়, হতে চায় অমত্মরঙ্গ। কিন্তু রুচি ও অনুভবগত বৈপরীত্য তাদের ঘনিষ্ঠ হতে দেয় না, দূরেই সরিয়ে রাখে। তারা কেউ কাউকে মেরে ফেলে না। বরং ভাবে যে, সহোদর হলেও মানুষ নানারকম, অস্তিত্বের প্রকাশ এমনই এবং জীবন বিচিত্র।

The Silent Cry (১৯৬৭) বিশিষ্ট হয়ে আছে মানুষের অমত্মর্জগতের অনবদ্য উন্মোচনের কারণে। এই উপন্যাসে দেখা যায় মানবমনে সংরক্ষেত থাকা বিক্ষুব্ধ ভাবনারাশির প্রকাশ। এখানে কেনজাবুরো মানব অস্তিত্বের যে-ব্যাখ্যা দিয়েছেন, জীবন সম্বন্ধে যেসব কথাবার্তা বলেছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি সার্ত্রে, মিলার বা কাম্যুর মতো উঁচু দরের ভাবুকদেরই সগোত্র। উপন্যাসটির নামের বিশেষ অর্থ আছে। মানুষের প্রতিটি আর্ত উচ্চারণের শেষে আসে নৈঃশব্দ্য। ওয়ে এই নৈঃশব্দ্যের কথাই বলেছেন। আর্তনাদটি অস্তিত্বের পুঞ্জীভূত কষ্টের আর্তনাদ। অন্যদিকে এই নৈঃশব্দ্য এমন এক মানসপরিস্থিতি, যা পুরোপুরি অনুভবও করা যায় না। মানুষ ভাবে, তা করতে পারলে সে বেঁচে যেত, ঠিক যেমন ভেবেছে দুই ভাই – তাকাশি ও মিৎসুসাবুরো। কিন্তু সে তা করতে পারে না। পরিস্থিতির বাসত্মবতাকে স্বীকার করে নিয়ে জটিল এক বিভ্রমের ভেতর তাকে জীবন কাটাতে হয়। আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব এবং বিভীষিকা-বিষাদের সহাবস্থান অত্যমত্ম কুশলী হাতে চিত্রিত হয়েছে এ-গ্রন্থে। সত্যিই মানব অস্তিত্বের আর্তনাদ সাকার হয়ে উঠেছে লেখকের নিজত্বপূর্ণ ভাষার মধ্য দিয়ে।

‘Writer’s job’ নামক নিবন্ধে কেনজাবুরো ওয়ে লিখেছিলেন, The writers job is the job of a clown, the clown who also talks about sorrow. একই রচনায় তিনি আরো বলেছেন, It is also to make a violent, urgent confession through language and imagination. And this imagination is not a state; it is the human existence itself. উদ্ধৃতিদুটিতে ব্যবহৃত sorrow, imagination এবং existence শব্দ তিনটি লক্ষ করুন। existence বা মানব-অস্তিত্বের সঙ্গে sorrow বা দুঃখ-কষ্টের সম্পর্ক ওতপ্রোত। আর এ অনিবার্য বিষয়টিকে অভিঘাতী করে তোলার গরজে সৃষ্টিশীল কল্পনার (imagination) শরণাপন্ন হয়েছেন লেখক। উর্বর কল্পনা কিংবা ফ্যান্টাসি যেসব কথাশিল্পীর প্রিয় অবলম্বন তাঁদের লেখা পড়ে কখনো কখনো মনে হয়, লেখক কল্পনার ফানুস উড়িয়ে বাসত্মব জগতের নির্মমতাকে অস্বীকার এবং পরাজিত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে একজন কথাসাহিত্যিক, বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া, সর্বদাই কঠিন বাসত্মবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ। সেই বাসত্মবতাকে রূপায়িত করার স্বার্থেই কেনজাবুরো কল্পকাহিনিসুলভ বাকচাতুর্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভাঁড়সুলভ ভাষা প্রয়োগ করেছেন। গদ্যভাষার এজাতীয় ব্যবহার বিশেষ করে তাঁর ১৯৭৬-পরবর্তী সাহিত্যকর্মগুলোতে বেশ চোখে পড়ে, যা রচনাগুলোর নান্দনিকতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনেকখানি সহায়ক হয়েছে।

ওয়ে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, একজন লেখক তাঁর সমকালের প্রতিনিধি, যিনি সাধারণ লোকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁর গদ্যভঙ্গি পাঠক-সমালোচকের কাছে সর্বদাই জটিল ঠেকেছে। এ জটিলতা স্বেচ্ছাকৃত। কেননা কলাকৌশল প্রয়োগের বিষয়টিকে তিনি গোড়া থেকেই অনেক গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। সুতরাং উপন্যাসের নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি যে বলেছিলেন, ‘The device made by language to activate man in his entirety’ – তাঁর এ-কথা অভিজ্ঞতাপ্রসূত এবং যথার্থ। কেনজাবুরো কখনোই কোনো এক মাত্রিক, সরল গল্প লেখেননি; তাঁর অভিপ্রায়ও তেমন ছিল না। খুঁটিয়ে পাঠ করলে তাঁর text-এর ভেতর লক্ষ করা যায় দুটি জিনিস – এক. গল্প, (story); দুই মতামত বা পরামর্শ (discourse)। আর এসবের ভেতর দিয়েই তিনি স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছেন।

রাজনৈতিক জীবনেও কেনজাবুরো ওয়ে অত্যমত্ম সচেতন ও সক্রিয়। জাপানি নব্য বাম আন্দোলনের অন্যতম নেতা এ-লেখক উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্ব এবং পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকির ওপর অনেক নিবন্ধ লিখেছেন; দিয়েছেন বহু বক্তৃতা ও বিবৃতি। গুন্টার গ্রাস, অ্যালান গিন্সবার্গ, মার্কিন ঔপন্যাসিক কুর্ট ভনে গার্ট, কোরীয় কবি কিম্ চি হা প্রমুখের মতো ওয়েও বিশেষত ‘ঠান্ডা লড়াই’ ও সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধের ধ্বংসকা- থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ। ‘Save our planet, trees, whales and humans’ বলে তিনি আওয়াজ তুলেছেন। কেনজাবুরো কমিউনিকেশনে বিশ্বাসী। তিনিও চান পাঠক তাঁর লেখালেখির মর্ম উপলব্ধি করুক। কিন্তু প্রাতিস্বিক হওয়ার আমত্মর তাগিদে তিনি যেভাবে ভাষার শৃঙ্খলা, ভাষিক অন্বয় ভেঙে ফেলেছেন, উপমা, রূপক প্রভৃতির ভিন্ন ধরনের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তাতে এক জটিল গদ্যশৈলীর জন্ম হয়েছে। কেবল আধুনিক কথাশিল্পের অগ্রসর পাঠকের পক্ষেই এর স্বাদ নেওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন

Leave a Reply