বিপ্লবের শ্বেতপত্র

লেখক:

আবুবকর সিদ্দিক
হ্যাঁ  দাদু! তোমাকে চিঠি লিখেছিল মাওদাদু, তাই না?
– আরে দূর! সব কাগজঅলাদের গুলপট্টি। খবর আর পায় না তো খুঁজে!
– এই দ্যাখো! তুমি কিন্তু স্লিAbubakar (Q)001প কেটে যাচ্ছো দাদু। আচ্ছা এবারে হলপ করে বলো তো, চারুদাদুর সঙ্গে তোমার কী কথা হয়েছিল? জোতদারদের গলা কাটতে অর্ডার দিয়েছিল তো?
– আরে দূরো! দ্যাখাই হয়নি তার আবার কথা হলো কবে?
– কী ঢপ মারছো মাইরি! পাড়ার বুড়োরা যে বলে?
– আরে ওটা কি আদপে সত্যি ছিল নাকি? স্বপ্নে একবারটি দ্যাখা হয়েছিল বটে।
– বা! বা! চালিয়ে যাও দাদু। থেমো না য়্যাঁ! তা কী কী বাতচিৎ হলো গুরুশিষ্যে? মাথায় একটা লম্বা ফুঁ দিয়ে দিলো বুঝি?
ফোকলা গালে সুড়–ক টেনে নিয়ে কথা বলে বুড়ো মহের আলী, তখন আমি জেলখানায় বুঝলে দাদু? বেশ একটু দেরিতে ঘুমিয়েছি তো! ছারপোকা আর মশা আর গরমে –
– আর বলতে হবে না দাদু, বাকিটা তো মুখস্থ আছে আমার। অন্তত পঞ্চাশবার তো শোনা আছে তোমার মুখে। না কী বলো য়্যাঁ?
– তা – তার মানে?
– তার মানে দুটো পাত্তি – মাত্তর দুটো পাত্তি ছাড়ো আমার সোনাদাদুভাই!
– কী জুলুম! আমি টাকা পাবো কোথায়? চাকরি করি, না ব্যবসা করি আমি? এই বুড়োবয়েসে এখন –
– হুঁহুঁ – মাই গ্রেট ফাদার তোমাকে যে প্রতি মাসে দুটো হাজার করে টাকা দিয়ে আসছে, সেটা দিয়ে কী এমন মহাকম্মোটা করো তুমি দাদু? বিড়িসিগারেট খাও? মাল টানো? ছাড়ো দাদু! মাত্র দুখানা একশ টাকার নোট! আজকে না পেলে উপায় নেই, এই বলে দিচ্ছি তোমায়।
– উঃ! জ্বালিয়ে খাবে আমায়! কাব্লিয়ালাকে হার মানিয়ে ছাড়বে দেখছি! কেন? চাকরি-টাকরি কিছু করতে পারিসনে? বাপের হোটেলে বসে বসে, – গজগজ করতে করতে টেবিলের ড্রয়ার খুলে দুখানা একশ টাকার নোট বের করে মহের আলী।
নোটদুটো ছোঁ মেরে নিয়ে মহেরের মুখে চুমু খেয়ে সুর করে বলে নাজিব, লং লিভ মাই সুইট সোনাদাদু! শিস দিতে দিতে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

(খ)
কথায় আছে না, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে! মরা হাতি লাখ টাকা! ভুয়ারাজিবের ফাটা কপালে সেই পয়াটা গেদে বসে গেছে। ব্যাংক লোন, সিন্ডিকেটগিরি, টেন্ডারবাজি, থানা-পুলিশ, সাংসদমেম্বারদোস্তি; – সব ঘাটে পার পেয়ে যায় ‘বিপ্লবী মহের আলীর পুত্র’ এই জন্মধনের বদৌলতে।
ব্যাংক থেকে সোয়াশ কোটি টাকার লোনটা ক্যাশ করে ঘরে তোলার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নেমে গেছে ভুয়ারাজিব। সাভার মৌজায় নদীতীরের ষাট একর বিলানজমি রাতারাতি বাউন্ডারিশান পুঁতে ঘেরাও করে নিয়েছে। ‘জনসেবা আবাসন’ নাম লিখে টিনের সাইনবোর্ড বসিয়ে দিয়েছে জমির মাঝামাঝি পজিশনে।
জীবন এখন রমরমা। সংসারে ষোলোকলা উপ্চে উঠছে। খেদ একটাই। ছেলেটা পথে এলো না। দামড়া এঁড়ের মতো অস্থানেকুস্থানে ঢুসিয়ে বেড়ায়, হেরোইন-ফেনসিডিল-মেয়েবাজি করে তার এত কষ্টে গড়া প্রেস্টিজ পাংচার করে বেড়ায়। কী মেহনতে খাড়া করে তোলা এই সাধের ইমেজ, মর্ম বুঝল না নেমকহারাম ইবলিশটা!
সকালের এই সময়টা কফি খেতে খেতে রাজাউজির মারে ভুয়ারাজিব। তারিয়ে তারিয়ে গরম কফিতে চুমুক দেয় আর পাদের চোটে আসমান ফাটায়।
আজ এবেলাটা উথালপাথাল মনের মধ্যে। ছেলে নাজিব রাতে বাড়ি ফেরেনি। মায়ের মোবাইলটা চুরি করে নিয়ে গেছে। টাউটকুদ্দুস খবর দিয়ে গেছে, থানাহাজতে আটক আছে। ডাঁহা ফ্যাঁচাঙ আর কী? কে যাবে এখন হেঁটমাথায় থানায় গিয়ে ওসিকে তেলমালিশ করতে? মানইজ্জত সব ধুলোয় লুটিয়ে দিলে ইবলিশটা!
কফিটা ঠান্ডা পানি হয়ে গেছে জুড়িয়ে। ঠোঁটে আলতো ছুঁইয়ে ঠকাস করে কাপটা নামিয়ে রেখে দেয় টেবিলে।
ঝিমুনি এসে গিয়েছিল অঘ্রাণের উঠতি বেলার আঁচে। খসখস শব্দে চোখ মেলে তাকায়। রেণু বেগম দাঁড়িয়ে আছে একেবারে সামনাসামনি। এক্ষুনি চিড়বিড় করে জ্বলেচেতে উঠবে এই গরিব বাপের খুনসুটে মহিলাটি।
শুরুতেই মুখ মেরে দেয় ভুয়ারাজিব, আমি পারবো না তোমার গুণধরকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় যেতে। ম্যানেজারকে পাঠিয়ে দাও। টাকা যা লাগে –
কথা আর শেষ করতে দেয় না রেণু। ফেটে পড়ে তিরিক্ষি গলায়, লজ্জা করে না বলতে? জন্ম দিয়েছেটা কে? তুমি ভুয়ারাজিব, না তোমার ওই ম্যানেজার ট্যারাহারুণ?
– হুঁ! আর পেটে ধরেছিল কে শুনি? আগের হাল যেদিক বায়, পাছের হালও সেদিক যায়! বেহায়া! বেলাজ! তার আবার – এ্যাও! – এই ফকিরনির বেটি! মুখ সামলা কিন্তু এখনো। নইলে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো কলাম! খাউজানি কেটি মাগি!
– ছেঁড়্ – ছেঁড়্ তয় কী রোমাডা ছিঁড়বি আমার ছেঁড়্! লাফ দিয়ে এগিয়ে ভুয়ারাজিবের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাঁটুর উপর শাড়ি তুলে কুঁদতে থাকে রেণু।
পাকঘরে বসে পাটায় মশলা বাটতে বাটতে কুনকুন করে হেসে গড়িয়ে পড়ে কাজের বুয়া আম্বিয়া।
অন্য ঘরে মহের আলী খাটে বসে একা একা আকচাকিয়ে মরে, এই রে, আজ আবার শুরু হয়ে গেল মহররম! চেঁচিয়ে খুন হবে তবু ক্ষান্তি দেবে না! তখন কত বললাম বিয়ের সময়! এখন বোঝ্ ঠ্যালা! ভাবিয়া করিয়ো কাজ করিয়া হুঁ-হুঁ -!

(গ)
মহের আলী বাঁ-কানটায় শুনতে পায় না। পুলিশের থাপ্পড় খেয়ে পর্দা ফেটে গেছে। একটা কনুই আধাঠুঁটো। থানায় ফেলে ডাণ্ডাবাজির খেসারত। ডান চোখে ছানি। হাই পাওয়ারের মাইনাস লেন্স বসানো চশমায়। ডান হাতের সঙ্গে সঙ্গে ঠুঁটো বাঁ-হাতের প্যালা দিয়ে মোটা মোটা বই নামিয়ে আনে শেল্ফ থেকে। বইয়ের ধুলোয় বুকের গেন্জি মেটেরঙা হয়ে যায়। বাঁ-চোখের ছুঁচাল চাহনি দিয়ে লাইনগুলো তন্নতন্ন করে পরখ করে। যেন চাপাপড়া হীরেমণি খুঁড়ে বের করবে। মাঝে মাঝে লাল ডটপেন দিয়ে আন্ডারলাইন করে। মার্জিনে নোটও করে। কখনো বা সোঁদা গন্ধজমা বড় বড় ফাইল পেড়ে আনে। হাতের লেখা সাইক্লোস্টাইল পেপার সব। সে আমলে তো ফটোস্ট্যাট মেশিন আসেনি দেশে! মহের আলী খাটের ওপর উবু হয়ে বসে বাদামি হয়ে আসা পেপারগুলোর ছায়া ছায়া হরফগুলোর পাঠোদ্ধারের চেষ্টা চালায় :
* আজ রাতে আরো একটি শ্রেণিশত্র“ খতম হলো। ফাজেলপুরের জুলুমকারী গণদুশমন ছায়েল জোতদারকে আমাদের কমরেড আলমগীর (ছদ্মনাম) গতকাল রাতে গলা কেটে খতম করেছে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ! বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!
* বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।
* আসুন আমরা আত্মসমালোচনা করি।
* গলাকাটা খতম অভিযান চলছে চলবে।
* সংশোধনবাদ থেকে সাবধান!
* চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান! চারু মজুমদার লাল
সেলাম!
ঝাটা হাতে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে আম্বিয়া। সারাঘরের মেঝেয় কাগজের টুকরো ছিটানো। কোন্টা রেখে কোন্টা ঝাটা  দিয়ে ফেলবে? বিছানার ওপর জোড়াহাঁটু ঠেসে উবু হয়ে বসে  টুকরো কাগজে হিজিবিজি কী সব লিখে চলেছে দাদু? ঘাড় দোলাচ্ছে। হুঁহুঁ করে হাসছে। মুঠো পাকাচ্ছে। কলম নাবিয়ে রেখে ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে ভোলাবাবাজি হয়ে বসে আছে। তার মানে আজ আবার বাই উঠেছে বুড়োর। লক্ষণ টের পেয়ে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল আম্বিয়া। দরজায় ঝাঁটার ঘষটানি লেগে আওয়াজ ওঠে।
আম্বিয়াকে দেখে ভালো মানুষের মতো কথা বলে মহের আলী, অ তুমি? খবরদার! একটা কাগজও যেন খোয়া না যায়।
হঠাৎ নাকটা উঁচিয়ে সরু করে টান দিয়ে ছেড়ে দেয়। আবার টানে। আবার ছেড়ে দেয়। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, অ! গন্ধোটা তাহলে তোমার কাপড় থেকে আসছে! না কি তোমার গা থেকে ছাড়ছে এই ওঁচা ওঁচা টক গন্ধো? এঃ! তোমাদের মতো সিঁটে গণ্ধোঅলা সব প্রোলেতারিয়েতদের গায়ের ধারে এলে কমরেড লেনিনের বিপ্লবটিপ্লব মাথায় উঠত! পার্টিফার্টি ফেলে নির্ঘাত সাইবেরিয়ায় পালাতেন। আচ্ছা বুয়া, তুমি এখন চলে যাও। আজ আর এ-ঘরে কোনো কাজের দরকার নেই তোমার।

(ঘ)
– হোনেন খালাম্মা! বুইড়াদাদুর ঘরে আমি আর কাম কারবার পারতাম না।
– কেন রে? আবার কী হলো?
– হইবোডা কী আর? সারাঘরে খালি ছেঁড়া কাগজ ছড়াইবোগা। ঝাড়– লাগাইতে মানা। শকুনের নাহাল হারাদিন বইয়ের মইধ্যে মাথা গুঁইজা বইয়া থাহে। হাবিজাবি ল্যাখতে আছে। এই হাসে এই চিক্কুর পাড়ে। মুখে প্যাচাল খালি খতম খতম। আমারে কয় গায়ে গোন্ধো। আমার ডর লাগে জানে!
– আচ্ছা, ঠিক আছে। তোর আর ও-ঘরে ঢুকে দরকার নেই। আমি নিজে দেখবো।

(ঙ)
প্রথম অঘ্রাণের বাতাসের আচরণ নওল তন্বী কন্যার মতো ফিচেল স্বভাবের। সকালে ঠান্ডা তো বিকেলে গরম। সন্ধেরাতে গায়ে লেপ জড়ালে ঘাড়ে গলায় ঘামের ফোঁটা জমে। গা দিয়ে গর্মী ছুটে বেরোচ্ছে রাজিবের। ভাপের চোটে গায়ের গেন্জি খুলে ছুড়ে মারে পায়ের দিকে। পিঠের তলা দিয়ে রেণুর হাত টেনে বের করে পাশে ঠেলে দেয়। বিশ-পঁচিশদিন পরে আজকের ফুলকোর্স সঙ্গমে একটু জেরবার হয়ে পড়েছে সন্দেহ নেই। গাল পুরোটা মেলে টেনে-টেনে শ্বাস নিতে থাকে।
মতলববাজ গিন্নিরা স্বামীর এই মস্তিমুহূর্তটির জন্যে ওত পেতে অপেক্ষা করে। রেণু বেগম ঝোপ বুঝে কোপ মারে এইবেলা। ভুয়ারাজিবের কপালের চুলে আঙুল চালিয়ে বিলি কাটতে-কাটতে ধরা গলায় বলে, ঘুম নাকি?
– উঁ! না। বলো শুনছি।
– ইয়ে! বলছিলাম কী! নাজুর তো খোঁজই হলো না এই ক’দিনে। আছে না মরেছে –
– আমি তো বসে নেই রেণু। থানায় নিজে ফোন করেছি তোমাকে না বলে। মুচলেকা লিখে নিয়ে সেইদিনই ছেড়ে দিয়েছে। কোথায় কোন্ ঠেকে গিয়ে ঘাপটি মেরে আছে বান্চোৎ কে জানে? ট্যাঁকে টান পড়লে ঠিক সুড়সুড় করে এসে সেঁধুবে তোমার আঁচলের তলায়, বলে দিলাম। পেস্টিজ আর রেখেছে নাকি শুয়ারের বাচ্চা?
রেণুবালা আরো ঘনঘন স্বামীর চুলের মধ্যে আঙুল চালাতে থাকে। আরেকটু ধরা গলায় বলে, বলছিলাম কী! মানে ইয়ে – মানে বাপজানকে ফুলবাগানের পাশের ওই ঘরটায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হতো না? খোলা বাতাস? বেশ কী সুন্দর ফুলের বাস!
– অ! এই কথা? তা তোমার আবার ওই বুড়োমানুষটার দিকে নজর পড়ল কেন? ক’দিন আর বাঁচবেন উনি? আছেন আছেন নিজের মতো। নিদেনকালে আর ঠাঁইনাড়া করে কী স্বার্থটা হাসিল হবে তোমার বলো তো? উনি তো আর রাস্তায় গিয়ে গু ছড়াচ্ছেন না তোমার সুপুত্তুরের মতো! আগে নিজের পেটেরটি সামলাও, তার পরে –
ফোঁ-ও-স করে নিশ্বাস ফেলে বাকি কথা চেপে যায় রেণুবালা।
(চ)
মহের আলীর খাটের তলায় ডাঁই হয়ে জমে আছে পুরনো দিনের খবরের কাগজের স্তূপ। বুকের যন্ত্রণার জন্য হাত পড়েনি গত কয়েকদিন। ধুলোর পরত পড়ে গেছে বাসি নিউজপ্রিন্টে। কাজের বুয়া আম্বিয়া এক-এক খ্যাপে পাঁচসাতদিনের কাগজ এনে খাটের ওপর রেখে দেয়। মহের পড়ে পড়ে খাট থেকে মেঝের উপর ছুড়ে ফেলে। খুব বেশিখানিক জমে গিয়ে মেঝেটা বদখত হয়ে উঠলে বুয়া বকবক করতে করতে ঝেঁটিয়ে খাটের তলার দিকে ঠেলে রাখে।
কাগজের পয়সার যিনি নিয়মিত জোগানদার, সেই খোদ মালিক ভুয়ারাজিব নিজে নিয়মিত পড়ে না। আসলে সময়ই পায় না পড়ার। কালেকস্মিনে হয়তো বা দুটো-একটা পেপারের হেডলাইনে চোখ বুলানোর খেয়াল হয়। এইমাত্র বড়জোর। নিউজপেপার রাখাটা একটা স্ট্যাটাস সিম্বল হালে। এই আপ্তবাক্যটি সে যথানিয়মে মান্য করে।
বাইরে প্যাঁচা ডাকছে জাম্বুরাডালে। ঘরে চড়া জেল্লা দিয়ে লাইট জ্বলছে। রাত কত এখন? মহের আলীর মতো কুনোবুড়োর কী যায়-আসে তাতে? বাতিল বারুদকাঠির কিবা দিন কিবা রাত? তবু ছানিপড়া চোখে মাইনাস পাওয়ারের চশমা বসিয়ে ধুনি জ্বেলে বাসি-বা’স্টে খবরের কাগজে নতুন খবর হাতড়ায় মহের আলী। আনকোরা বলতে আর কী আছে এই চল্লিশে বুড়ি বাংলাদেশটায়? কাগজ খুললেই যত রাজ্যির নেগেটিভ খবর : খুন জখম ধর্ষণ – ভূমি দখল নদী দখল শেয়ার দখল – পুলিশ পার্টি প্রশাসনের বাণিজ্য দুর্নীতি! পাঁশগাদা ঘেঁটে ঘেঁটে মোহর খুঁজে মরে মহের।
শেষকালে হঠাৎ করে এক ভয়াবহ হেডলাইন দেখে চোখ চড়কে উঠে যাওয়ার জোগাড় : ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কমরেড’। কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী হিসেবে কথিত জনৈক প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক সরকারি সম্পত্তি বেদখল। স্থানীয় সংবাদপ্রতিনিধির অনুসন্ধানে প্রকাশ, তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটি ভুয়া। বিস্তারিত তথ্যে ধরা পড়ে, উক্ত কমিউনিস্ট নেতার প্রকৃত জন্মসাল ১৯৭৫। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চার বছর পরে তাঁর জন্ম হয়।
প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মহের আলী। এই বর্ণচোরা মার্ক্সবাদী ওস্তাদটিকে মনে পড়েছে তার। বছরদশেক আগে তার কাছে লেনিনবাদের সবক নিতে এসেছিল। নিজের লেখা ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সহজপাঠ’ নামে বইয়ের একটা কপি উপহারও দিয়ে গিয়েছিল।
– বাস্টার্ড কাঁহাকা! অল লুম্পেন লুটেরা! গুলি করে মারো – খতম করে দাও সব শোধনবাদী প্যারাসাইটকে! এনিমি অব দ্য পিপ্ল!
বকতে বকতে মুখে গাঁজলা উঠে যায় মহের আলীর। চোখ ঠিকরে চশমা ছিটকে শ্লেষ্মা ফুঁসে উঠে সে এক ভয়াবহ কাণ্ড। তড়্পাতে তড়্পাতে ধড়াস করে বিছানায় পড়ে যায় কেঠো দেহটা। দুমড়েমুচড়ে খিঁচুনি উঠতে থাকে সারাশরীর জুড়ে। বিশ মিনিটের, – না হয় বড়জোর তিরিশ-বত্রিশ মিনিটের লড়াই। হঠাৎ হাত-পা সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে টানটান হয়ে যায় গোটা কাঠামো।
নিশুতি রাত।
জাম্বুরাডালে অডাক ডাকে অদৃশ্য কালপ্যাঁচা।

(ছ)
প্রথম শীতের হিম। কনকনে ঠান্ডা। থিকথিকে আঁধার। কে আর লেপের ওম ছেড়ে এই অনারাতে রাস্তায় নেমে আসে? কে আর? মাথার ঘায়ে কুকুর পাগলদশা যার! নেশার ধান্ধা কঠিন ধান্ধা! ঘরে তিষ্টোতে দেয় না।
পেছনে জাম্বুরাডালে অপয়া প্যাঁচাডাক। সামনে হাঁ-হাঁ করা খোলা গেট। বাঁ-পায়ে গোড়ালির পাঁচ ইঞ্চি উপরে কাঁচা জখম। খোঁড়াতে খোঁড়াতে গেট পেরিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকল এ-বাড়ির সুপুত্তুর নাজিব।
পুরনো আমলের এল-প্যাটার্নের বিল্ডিং। ঘরদোর অন্ধিসন্ধি সব চেনা। বারান্দায় পা দিয়ে বুঝতে পারল, পেছনের ঘরে আলো জ্বলছে। ওল্ডম্যান ঘুমায়নি তাহলে? রাতদুপুরে জেগে জেগে বিপ্লবের ছক কষছে? নাকি লাইট অফ্ করতে ভুলেই গেছে? মনের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছে?
পা টিপে টিপে ডাইনিং রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। একবার চকিতে দেখে নেয় ডাইনে-বাঁয়ে।  তারপর দরজা ঠেলে টুক করে ভিতরে ঢুকে খিল লাগিয়ে দেয়। ফ্রিজ খুলে হাত্ড়ে হাত্ড়ে খাবার যা পায়, ডাইনিং টেবিলে জড়ো করে রাখে। আলুভাজি-কাঁচকি  মাছ-চালতা দেওয়া ডাল। ঠান্ডা ভাত। সত্যিকার অমৃতের স্বাদ! চেটেপুটে খেয়ে বেসিনে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নেয়। কিন্তু আসল কাজই তো বাকি এখনো। নতুন করে খুনের দায় চেপেছে মাথায়। ফেরারি হয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এখন দাদুর ত’বিলই শেষ ভরসা। তাই চলো তবে!
কী করছে এত রাত জেগে বুড়োমানুষ? দরজা আলতো ভেজানো। একটুখানি উঁকি মেরে দেখে, দাদু টানটান চিত্তির দিয়ে ঘুমুচ্ছে বিছানায়। মহামওকা তাহলে য়্যাঁ? পরম নিশ্চিন্তে ঘরে ঢুকে পড়ে নাজিব। প্রথমেই টেবিলের ড্রয়ার। খুব সাবধানে টান দেয়। আওয়াজ না ক’রে। মাত্তর তিনখানা একশ টাকার পাত্তি, আর কিছু খুচরো নোট। বেশ হতাশ হয় নাজিব। এত রিস্ক নিয়ে শেষে এই তার নিটফল? একবার কটমট করে তাকায় বিছানায় শোয়া মহের আলীর দিকে।
কী সাংঘাতিক। কী হয়েছে ওল্ড দাদুমণির? বেঁচে নেই?
ঠোঁটে রক্ত। শেভ না করা চিবুকের দাড়িতে রক্ত। চোখ পাকানো। মাথার বালিশ ছিটকে সরে গেছে সাইডে। তার তলা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কতকগুলো পাঁচশো টাকার নোট।
নাকে হাত দিয়ে বুঝতে পারে নাজিব, নিশ্বাস পড়ছে না। মারা গেছে খানিক আগে সম্ভবত। বডি শক্ত কাঠ হয়ে পারেনি এখনো।
– মাই গ্রেট দাদু! সর্বহারা বিপ্লব – খেল খতম! চ্চুক! চ্চুক! চ্চুক!
এখন আর টাইম নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। আম্বিয়াটার মাঝরাতে উঠে পেচ্ছাবে যাওয়ার বাতিক। নাজিবকে দেখে ফেললে শেষে ওরই ঘাড়ে মহের আলীকে খুনের দায় চাপিয়ে দেবে মেয়েটা। হারি আপ! নো ডিলে!
প্রথমে বালিশ হাঁটকে পাঁচশো টাকার নোট যতগুলো পায়, সব পকেটে পোরে। ড্রয়ারের টাকাগুলোও। শেল্ফ থেকে বেছে বেছে কার্ল মার্কসের দাস ক্যাপিটাল, এঙ্গেলসের অ্যান্টিড্যুরিং, লেনিনের কালেক্টেড ওয়ার্কস্, মাও সে তুঙের সিলেক্টেড মিলিটারি রাইটিংস ইত্যাদি সব মোটা মোটা বই নামায়। ইঁদুর লাফিয়ে হাতের ওপর দিয়ে দৌড়ে যায়। তেলাপোকা ওড়ে র্র্র্ফ করে। ফাইলগুলোও নামিয়ে আনে ঝটপট। নেবে কিসে করে? ব্যাগট্যাগ কিচ্ছু নেই ঘরের ভিতর। হ্যাঁ, এই তো পাওয়া গেছে! রক্তের ছিটে লাগানো চাদরটা গুটিয়ে আছে লাশের বুক অব্দি।
ডোন্ট্ মাইন্ড প্লিজ! বিড়বিড় করে বলে চাদরটা তুলে আনে নাজিব। বই-ফাইল সবকিছু চাদরে বেঁধেছেঁদে মাঝারি সাইজের গাঁটরি বানিয়ে ফেলে। হাত দিয়ে তুলে শূন্যে ঝুলিয়ে ওজন আন্দাজ করে। মন্দ না! নীলক্ষেতের ফুটপাতে কেজি দরে বেচে দিলে বেশ কটা দিনের হেরোইন কেনার রেস্ত হয়ে যাবে।
এই মেরেছে! হেরোইনের নাম করতে না করতেই প্রচণ্ডরকম নেশা চ্যাগাল দিয়ে ওঠে ভিতরটায়।
কোনো উপায় নেই! এই এক্ষুনি শাদা ধোঁয়া গিলতে না পারলে শরীরে খিঁচ উঠে যাবে মাইরি! তখন আর এ-ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামার জো থাকবে না। ধরা পড়ে যেতে হবে বমাল! এখন উপায়?
উপায় ওইসব বিপ্লবফিপ্লবের থিসিসটিসিস লেখা শাদা কাগজগুলো। লিখে লিখে সময় কাটাত ওল্ডম্যান।
প্রথমে খুব সাবধানে ভেতর থেকে খিল এঁটে দেয় দরজায়। তারপর গ্যাঁট হয়ে বসে নেয় মেঝেয়। চারদিকে ছড়ানো ছেঁড়া কাগজের টুকরো। কাঁপা কাঁপা অক্ষরে হিজিবিজি লেখা সব। একটা টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে পছন্দমতো ভাঁজ করতে থাকে। মাপসই করে ভাঁজে-ভাঁজে ছিঁড়ে পথে আনে পাত্তিটা। এবারে পকেট থেকে সেই পুরিয়া বের করে আনে, যার মধ্যে পোরা আছে তার প্রাণধন। পুরিয়া খুললে বেরিয়ে পড়ে পাউডারের মতো শাদা রঙের গুঁড়ো। আহা! গুঁড়ো তো নয়, প্রিয় পবিত্র সব জীবনদায়িনী দানা! চাপা উত্তেজনায় ঝকঝক করে ওঠে নাজিবের চোখ। জিতা রহো হেরোইনসুন্দরী – ফেনসিডিলরঙ্গিণী! গুঁড়োগুলো খুব যতেœ কাগজের পাত্তিতে ঢেলে সরু করে পাকিয়ে নেয়। তারপর পকেট থেকে বের করে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট তুলে নেয় এবারে। জোরে জোরে ফুঁক দিয়ে টিপেটুপে ভিতরের তামাকটুকু বের করে আনে আর তার মধ্যে হেরোইনের সরু পুরিয়া ঢুকিয়ে দেয়। ব্যস! মাল কম্প্লিট! চোখের সামনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে নেয় একবার। তারপর ঠোঁটের ডগায় টিপে ধরে বস্তুটির মাথায় আগুন লাগায় পাকা হাতে। এবার? এবারে – দে টান দম ভ’রে! এক – দুই – তিন – এই তো – জাদুধোঁয়া শিস দিয়ে মাথার ব্রহ্মতালু বরাবর উঠে যাচ্ছে! আঃ আঃ! বেহেশতের কবাটখানি খুলে দিলে কোন্ সে হুরি-গেলমান?
পর্দার পর পর্দা পেরিয়ে অজানা আসমানে উড়ে যায় নাজিব।
নেশার মৌতাতে খেয়ালই করতে পারেনি সে, এদিকে আরো মারাত্মক জাদুকাণ্ড ঘটে বসে আছে কামরার মধ্যে।
সারা মেঝেয় ছড়িয়ে থাকা যত কাগজ – শ্রেণিশত্রু খতমের ডাক দেওয়া যত সর্বহারা বিপ্লবের ইস্তাহার, আঁকাবাঁকা হাতে লেখা সমস্ত কালো কালো হরফ কোন্ অদৃশ্য জাদুবলে উবে গেছে! এখন স্রেফ শাদা কাগজ – ধবধবে শাদা – সফেদ শ্বেতপত্র!

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার