বিভ্রান্তি অথবা বাস্তবতা অথবা কাকতালীয়

লেখক:

brivanti-othoba-bastobota

নকিব ফিরোজ

ট্রেনটা রাত দশটায় স্টেশন ছাড়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আশ্বিনের ঠান্ডা হাওয়ায় যাত্রীরা ঝিমুতে শুরু করে। ঘুমোনোর পরিকল্পনা করেই যেন এসব যাত্রী রাতের ট্রেনে রওনা হয় দূর-দূরান্তের পথে। তাই কামরার একদিকে একটা হলুদ আলো ছাড়া আর সব আলো নিভিয়ে দেওয়া। লোকজনের কথাবার্তাও কমে এসেছে। শুধু কানে বাজছে একলয়ে ছুটে চলা ট্রেনের ধাতব শব্দটা।

শরীরে একরাশ ক্লান্তি থাকলেও চোখে ঘুম নেই মিশুকের। পাশের সিটে বন্ধু রফিকও ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ বিকট একটা শব্দ তুলে তিস্তা ব্রিজের ওপর উঠে পড়ল ট্রেনটা। ধাতব ব্রিজের ওপর ট্রেনটা ওঠায় সৃষ্ট উৎকট শব্দের ঢেউ আছড়ে পড়ল মরা তিস্তায় হঠাৎ বানডাকা জলের পাথারে। রাতের অন্ধকারে ধাক্কা মারতে-মারতে সে-শব্দের ঢেউ ছড়িয়ে যায় দিগন্তের দিকে।

ট্রেনটা ব্রিজে ওঠার শব্দে যাত্রীদের কারো-কারো চোখ খুলে যায়, নড়েচড়ে ওঠে। কিন্তু আধো ঘুমের ভেতর যখন তারা বুঝতে পারে ট্রেন ব্রিজ পার হচ্ছে, তখন আবার ঘাড় কাত করে ঘুমিয়ে পড়ে।

মিশুক ট্রেনের জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে অন্ধকারে গোমড়াতে থাকা তিস্তা নদীটাকে শেষবারের মতো, মানুষ যেমন দেখে তেমনি করে, দেখতে থাকে। তার নিথর চোখে-মুখে বিস্ময় আর ভালোলাগার এক মিশ্র অভিব্যক্তি। ট্রেনের দু-একটা খোলা জানালা দিয়ে ছিটকে পড়া আলোয় তিস্তার বুকভরা খোলা পানির স্রোত দেখা যায়। মরা তিস্তা হঠাৎ এখন জলে থইথই। উজানে ভারতীয় ভূখণ্ড গজালডোবা বাঁধের কারণে তিস্তা নদী মরে গেছে। সারা বছর পানি প্রায় আসে না। তবে কখনো-কখনো অসময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অতিরিক্ত পানি সরাতে ভারতীয়রা স্লুইসগেটের কপাট খুলে দিলে তিস্তায় বান ডাকে। চরপড়া মরা নদী হঠাৎ আসা অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে না পেরে প্লাবিত করে চরের জনপদ, স্রোতের তোড়ে বালুচর ভাঙে, ভাঙে ঘরবসতি।

ব্রিজ থেকে নেমে ট্রেনটা আবার তার নিজস্ব শব্দের তালে ছুটতে থাকে। মিশুকের সিটের পাশে খুলে রাখা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। ধূসর ছাইছাই অন্ধকারে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে মিশুকের ভালোই লাগছে।

দূরে একটা টিমটিমে নিভুনিভু লালচে আলোর দিকে মিশুকের চোখ পড়ে। আলোটা যেন ট্রেনের সমান্তরালে ছুটে চলেছে। একবার মনে হয় কাছে, আবার মনে হয় অনেক দূরে। একবার একটু হারিয়ে যায় আবার ফিরে আসে। ঢাকার ছেলে মিশুক ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারে না, এটা কীসের আলো। রূপকথার হিংস্র একচোখা ছুটেচলা কোনো প্রাণীর জ্বলন্ত দৃষ্টির মতো রহস্যময় মনে হয় আলোটাকে।

এবার কুড়িগ্রামে তার ভ্রমণের অনেককিছুই যে রহস্যময় হয়ে রইল তার কাছে!

মিশুকের জন্ম ঢাকায়; বড়ও হয়েছে ঢাকায়। ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকবার ঘুরতে যাওয়া হলেও কোনো পর্যটন এলাকা বা মফস্বল শহর ছাড়া প্রত্যন্ত কোনো দুর্গম অঞ্চলে এর আগে কোনোদিন তার যাওয়া হয়নি। এবার সহকর্মী রফিকের আমন্ত্রণে আর প্রত্যন্ত এলাকার জীবনযাত্রা দেখার নিজের আগ্রহে কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর পাড়ে রফিকদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল গত পরশু দিন।

মিশুকের অনেক দিনের ইচ্ছা, প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলের প্রান্তিক জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা নেওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাকরিতে ঢুকে ব্যস্ততার কারণে তার সে-ইচ্ছাটা হারিয়েই যাচ্ছিল। এমন সময় সহকর্মী রফিকের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। রফিকের কাছে তার ইচ্ছাটা প্রকাশ করতেই রফিক তার ইচ্ছা পূরণের প্রস্তাব দেয়। মিশুককে সে বলে, বাংলাদেশের সত্যিই এক দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকায় তাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে সে, যেখানে ঢাকার লোকজন তো দূরের কথা, নিকটবর্তী এলাকার লোকজনও কমই যায়। রফিকের প্রস্তাবে মিশুক রাজি হয়ে যায়। এবার শুক্র-শনির সঙ্গে রোববার একদিনের সরকারি ছুটি পেয়ে যাওয়ায় তিনটা দিন হাতে নিয়ে তারা বেরিয়ে পড়েছিল।

বৃহস্পতিবার রাতের ট্রেনে ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়ে সকালে গাইবান্ধা স্টেশনে এসে নামে তারা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সুন্দরগঞ্জ এসে খেয়ায় একটা নদী পার হয়ে দিগন্তবিসত্মৃত চরের ভেতর দিয়ে প্রায় বারো-তেরো মাইল পথ পায়ে হেঁটে, তিস্তারই ছোট-বড় পাঁচ-ছয়টা শাখানদী পার হয়ে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষে ধরলা নদীর পারে রফিকদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছিল। তারপর একটা দিন আর একটা রাত গেছে। এত অল্প সময়ে শহুরে যুবক মিশুকের প্রত্যন্ত প্রান্তিক জীবন দর্শনের গোপন ইচ্ছাটা এমন দারুণভাবে পূরণ হবে তা সে কোনোদিন ভাবেনি। কিছু গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে প্রান্তিক জীবনের কিছু চিত্রের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও এমন নিরেট কঠিন আর বিস্ময়কর বাস্তবতা ছিল তার কল্পনারও অতীত। গত আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই তার অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেকখানি ভরে উঠেছে।

ট্রেনটা একলয়ে চলছে। মিশুকের দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাইরে, সেই আলোটার দিকে। ওটা কীসের আলো! কাল রাতে ধরলা নদীর জনমানবহীন বালুচরে ওরকম একটা আলো দেখিয়ে রফিক বলেছিল, ওটা আলেয়া। মিশুক অবশ্য আলেয়ার আলো দেখার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানে। সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে ছুটে চলা এই আলোটার তো মিল নেই। এই আলোটাতে ট্রেনের সঙ্গে-সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে ছুটছে! মিশুকের এখন মনে হয় আসলে আমাদের ধারণা ও বাস্তবতার মাঝে যে দুস্তর ফারাক, গত দুদিনের অভিজ্ঞতাই যেন তার প্রমাণ।

ট্রেনটা একটানা লয়ে ছুটে চলছে। আশ্বিনের ঠান্ডা বাতাসে চোখ জুড়িয়ে আসে। একটু যেন শীতশীতও করছে। জানালার সার্শি নামিয়ে দিয়ে চেয়ারের পেছনে মাথাটা রেখে চোখ বোজে মিশুক। কিন্তু কী আশ্চর্য! চোখ বুজলেও সেই আলোটাকে সে দেখতে পায়;  হয়তো কল্পনায়, হয়তো তন্দ্রাচ্ছন্নের ভিতরে…। সেইসঙ্গে গত দুদিনের সব চিত্র-দৃশ্য-ছবি-ঘটনা-শব্দ আষাঢ়ের মেঘের মতো ছোটাছুটি শুরু করে তার মাথার ভিতর… দিগন্তবিসত্মৃত জনবিরল সবুজ চরের মাঝ দিয়ে মেঠোপথ ধরে তাদের সেই রোমাঞ্চকর যাত্রা… নতুন জমির আলপথ মাড়িয়ে, কাদামাটি পায়ে মেখে, ঘামে জবজবে হয়ে, মেঘ ভেসে চলা শরতের রোদ-ছায়ায় লম্বা বুনো ঘাস আর কাশবনের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাওয়া… নানারকম পাখির উড়ে চলা আর আকন্দের বনে ভ্রমর আর প্রজাপতির আনাগোনার অপূর্ব দৃশ্যের মাঝে দূরে-দূরে সবুজ স্তূপের মতো ছাড়া ছাড়া দু-একটা বাড়িঘর… আর অথই গায় নির্জনতা… কখনো-কখনো গা-ছমছম করা পরিবেশ। এত দুর্গম কোনো স্থানের মিশুকের কল্পনায় কোনোদিনই ছিল না। রফিকের কাছে সে শোনে, বছর কয়েক আগে থাইল্যান্ডের রাজকুমারী বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে বাংলাদেশের কোনো দুর্গম এলাকা দেখার এবং সেখানে কিছুটা সময় কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে এ-এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। সত্যিই অনেক দুর্গম এলাকা; পায়ে হেঁটে আসার পথও এখানে নেই। রফিক বলেছিল, ইদানীং এখানে নাকি জঙ্গিরা আস্তানা গেড়েছে; আর একাত্তরে এখানে ছিল মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের ক্যাম্প।

কিছুদূর পরপরই পথে পড়ে নদী। কোথাও কোমরসমান,  কোথাও হাঁটুজল; আর সেকি অসাধারণ স্বচ্ছ পানি মরা নদীগুলোতে! আর এই নদীগুলো নাকি স্থির নয়; এবার এখানে আছে তো বর্ষায় সরে যাবে অন্য কোথাও। কারণ এসব চর হলো খুবই ভঙ্গুর বালুর চর। তিস্তা থেকে উৎপত্তি হয়ে হাতের আঙুলের মতো ছড়িয়ে থাকা মরা নদীগুলো সাপের খোলসের মতো পড়ে আছে এখানে-সেখানে।

ইতোমধ্যে গোটা দুই মাঝারি নদী খেয়ায় পার হয়ে এসে তৃতীয় খেয়ায় উঠে অপেক্ষার বিরক্তি কাটাতে এক মহিলার সঙ্গে আলাপ শুরু করে রফিক। পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর বয়সী দুই মেয়েসন্তানের জননী, অনেকটা আলুবালু বেশ, চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, পাঁচ-ছয় বছরের মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বিষণ্ণমুখে বসে ছিল নৌকার ডালিতে। রফিকের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে সে জানায়, হঠাৎ স্রোতের তোড়ে তার ঘরখানা ভাঙনের মুখে পড়েছে। হয়তো আজ রাতের মধ্যেই তাদের ছোট্ট ভিটেবাড়িটুকু ভেঙে পড়ে যাবে নদীতে। তাই নদীর ওপারে ভাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিল সাময়িক আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতির আশায়। কিন্তু ভাই তার গরিব, ছোট্ট শনের ঘর তার; আশ্রয়ের প্রতিশ্রম্নতি মেলেনি – এই সংবাদ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সে। এসব কথা বলতে-বলতে চোখদুটো তার ভিজে ওঠে। বিয়ের পর এ নিয়ে
তৃতীয়বারের মতো তার ভিটেবাড়ি গ্রাস করছে রাক্ষুসে তিস্তা।

খেয়া পার হয়ে ভাঙনধরা নদীর খাড়া তীর ধরে সাবধানে সামনে এগিয়ে চলি আমরা। মহিলাও আমাদের সঙ্গে আসে। কিছুদূর যাওয়ার পথেই পড়ল মহিলার বাড়ি। অনেক উঁচু খাড়া বালুচরের ভাঙনধরা নদীর একদম কিনারে ছাউনি-বেড়া খুলে ফেলা তার ঘরের কাঠামোটা যেন হকচকিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা একটু দাঁড়ালাম সেখানে। সে তার স্বামীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলো। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি-গজানো ছোটখাটো মানুষটা লুঙ্গি কাছা মেরে ঘরের মালপত্তর সরানোতে ব্যস্ত। অদূরে একটা ক্ষেতের পাশে মালপত্রগুলো নিয়ে রাখছে। কাঁথা-বালিশ, হাঁড়িপাতিল, ঠিলা-কলসি ইত্যাদি গেরস্থালির জিনিসপত্র, ঘরের চালার জংধরা পুরনো টিনগুলো, চাটাইয়ের বেড়া ইত্যাদি সত্মূপ করে রাখা। গায়েগতরে কালিঝুলি-মাখা কিশোরী মেয়েটা বাবার সঙ্গে খাটছে।

আমাদের দাঁড়াতে দেখে মালপত্রের সত্মূপের ভেতর থেকে দুটি মোড়া বের করে এনে এগিয়ে দিয়ে বলে, বইসেন ভাই।

– না না না, আমরা এখন বসব না। বলে ওদের জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার পা বাড়ালাম সামনে।

আমি একটু অবাক হলাম, মাথার ওপর এমন বিপদের মধ্যেও দুজন অচেনা পথচারীকে সম্মান দেখাতে সে ভুলল না। আমার একবার ইচ্ছা হয়েছিল জিজ্ঞেস করি, এখন আপনারা কী করবেন? কোথায় যাবেন? বিষণ্ণ কণ্ঠে মহিলা হয়তো উত্তর দিত, জানি না বাই, কই যাইবাম…

এই অথই চরে কাছাকাছি কোনো বাড়িঘরও চোখে পড়ে না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কেমন যেন একটা ঘোরলাগা অনুভূতি নিয়ে এগিয়ে চললাম।

– এই ডিম… ডিম… ডিম…

একটা ফেরিঅলা ডেকে যায় কানের কাছে। সেই শব্দে মিশুকের চোখ খুলে যায়। পাশে তাকিয়ে দেখে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে রফিক। মধ্যরাতের নির্জনতা আর ঘন অন্ধকারে নিজস্ব ধাতব শব্দ তুলে একটানা লয়ে ছুটে চলেছে ট্রেনটা। মিশুক আবার চোখ বোজে। আধো ঘুমে, আধো জাগরণে স্মৃতি-বিস্ময় মাখামাখি হয়ে আবার জেগে ওঠে তার মাথার ভিতরে।… তখন সন্ধ্যার আবছা আলোয় তিস্তাচরের বুনো ঘাসের ঝোপে ইতস্তত জ্বলে উঠছে দু-চারটি জোনাকি পোকা।

এরপর মূল তিস্তা নদীর শেষ খেয়াটা পার হয়ে আসি আমরা। তারপর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চেপে রফিকদের বাড়ি পৌঁছে ওর মায়ের হাতে রান্না কয়েক পদের কুঁচো মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে বেহুশ ঘুম।

পরদিন সকালে উঠে ধরলা নদীতে গোসল করে এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরি… মরা দুধকুমার নদীর পারে ইংরেজ কুঠিয়ালের পরিত্যক্ত ভিটা… ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে আলপথ মাড়িয়ে হিন্দুপাড়ায় গিয়ে ডাবাহুঁকোয় তামাক খেয়ে চোখ লাল… নদীর তীরে নদীভাঙা মানুষের বস্তি; গায়ে-গায়ে ছোট-ছোট ঘর… পশুপাখি মানুষের এক মিলিত জীবন।

রোদপড়া বিকেলে রফিকের বাল্যবন্ধু, গ্রামের ছোট্ট বাজারে ফোনে টাকা দেওয়া-নেওয়ার ব্যবসা করে তাইজুল এসে জুটল আমাদের সঙ্গে। রফিকই তাকে ফোনে দিয়ে আসতে বলেছে। কারণ ওর কাছে খোঁজ আছে কোথায় চোরাই ইন্ডিয়ান মদ কিনতে পাওয়া যায়। ঢাকায় মাসে-দুমাসে একবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় এক-আধটু পানের অভ্যেস আছে দুজনেরই।

তাইজুল আমাদের পাশের গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে এক বাড়ি থেকে প্রায় প্রকাশ্যে বিক্রি হতে থাকা একটা মদের বোতল নেই আমরা। তারপর চলে যাই ধরলা নদীর পারে একটা খোলা জায়গায়। তখন বিকেল পড়ে এসেছে। সুনিবিড় গ্রাম-প্রান্তরে ছায়ার বিস্তার। আমরা সঙ্গে করে প্রত্যেকে একটা ছোট্ট পানির বোতল নিয়ে এসেছি। তাতে ভালোমতো মদ নিয়ে পান শুরু করি। মদটা তত ভালো নয়; তবে উগ্র একটা ঝাঁঝ আছে।

ধীরে এক সময় সন্ধ্যা নেমে আসে। নদীটা রহস্যময় হয়ে ওঠে। পশ্চিমের আকাশে ক্ষীণ একফালি চাঁদের জ্যোৎস্নায় অন্ধকারটা কিছু সহনীয় মনে হয়। তার মধ্যে ইতস্তত কিছু জোনাকি যেন পথ ভুলে ঘুরছে নদীর ধারে-ধারে। এর মধ্যে নদীতে পাড় ভেঙে পড়ার শব্দ পাচ্ছি। দূরে কে যেন কাকে ডাক দেয় – কোনঠে বাহে য়ে-য়ে… দু-চার পেগ পেটে পড়তেই রফিক এবং তাইজুল বেশ প্রগলভ হয়ে ওঠে। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে ওরা আর একটু পরপর উচ্চকিত হাসিতে ফেটে পড়ছে। আমি ওদের স্মৃতিচারণমূলক গল্পের  ভেতর ঢুকতে না পারলেও ওদের কাণ্ড দেখে আমারও হাসি পাচ্ছে।

একসময় তাইজুল রফিকের কানে-কানে ফিসফিস করে কী যেন বলে। রফিক ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়ে। তাইজুল তখন ফোনে কার সঙ্গে যেন আসেত্ম-আসেত্ম কী আলাপ করে। আলাপ শেষ করে রফিককে বলে, চলো, সব ঠিক আছে। রফিক আমাকে বলে, দোস্ত ওঠো, চলো।

– কোথায় যাবে?

– আরে চলো বন্ধু, তোমার জন্য এ-সন্ধ্যাটা একটু অন্যভাবে সেলিব্রেট করা যাক।

রফিক আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে। বেড়িবাঁধ ধরে আধো অন্ধকারে আমরা এগিয়ে চলি। বাঁধের দুপাশে নদীভাঙা মানুষের বস্তি। দু-একটা ঘরে কুপির আলো দেখা যায়। অন্ধকারে নারী-পুরুষের কথার শব্দ পাওয়া যায়।

রাস্তার দুপাশে গাছপালা থাকায় অন্ধকারটা একটু বেশিই মনে হয়। রফিক মোবাইলের আলো জ্বালে। এবড়োখেবড়ো রাস্তা। আমরা তিনজনই কিছুটা উত্তেজিত। অসংলগ্ন পা ফেলে এগিয়ে যেতে থাকি।

কিছুদূর যাওয়ার পর রফিক আমার হাতটা ধরে একটু দাঁড়ায়। নিঃশব্দে হেসে বলে, তোমাকে একটা চমৎকার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করতে নিয়ে যাচ্ছি বন্ধু।

– ব্যাপারটা কী বল তো?

– এক সুন্দরী নারী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে… তোমাকে পেয়ে সে ধন্য হবে। আমরা তোমাকে তার কাছে নিয়ে যাচ্ছি। চলো।

বলে হা-হা করে হাসতে-হাসতে আমার হাত ধরে সামনে নিয়ে চলে।

আমি ভেবে নিই হয়তো পরিচিত কারো বাড়িতে আমরা যাব, যেখানে হয়তো গৃহকর্তার রূপবতী কোনো কন্যার দেখা মিলতে পারে।

কিছুদূর গিয়ে একটা বড় গাছের ছায়ার নিচে জমাট অন্ধকারে দাঁড়াই আমরা। এখানটায় বাঁধের ভেতরদিকে কিছুটা ফাঁকা জায়গা, ধানক্ষেত; তারপর অন্ধকার জঙ্গল।

রফিক এবং তাইজুল দুজনই কিছুটা সতর্ক। বস্তিটা ফেলে এসেছি পেছনে। তাইজুল ফিসফিস করে বলে, ভাই শব্দ করবেন না, কথা কইবেন না। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না ব্যাপারটা।

– চুপচাপ আমার পিছে-পিছে আইসবার লাগেন…

তাইজুল ফোনের ডিসপেস্ন লাইট জ্বেলে নিচের দিকে ধরে বাঁধের সাত-আট ফুট নিচে ধানক্ষেতের দিকে নেমে যায়। রফিক আমার হাত ধরে বলে আসো।

– কোথায় যাচ্ছি আমরা?

– আসো না… ভেতরে একটা বাড়ি আছে… কথা অসমাপ্ত রেখেই হাত ধরে নিচের ধানক্ষেতে নামিয়ে আনে সে আমাকে।

ক্ষীণ চাঁদটা ততক্ষণে গাছপালার ওপর কিছুটা ঢলে পড়েছে। বেলে জ্যোৎস্না আরো কিছুটা ম্লান। ধানক্ষেতের ওপর ইতস্তত উড়ছে কিছু জোনাকি পোকা। হয়তো নেশার প্রভাবে, মাথার ভিতরে দুর্দমনীয় রোমাঞ্চকর একটা অনুভূতি জেগে উঠেছে। কৌতূহল নিয়ে প্রায় কোমরসমান ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে আলপথে চুপচাপ তাইজুলের  পেছন-পেছন এগিয়ে চলেছি আমরা দুজন। ছাই-ছাই অন্ধকারে নরম মাটিতে পা ফেলে এগিয়ে যেতে-যেতে মেরুদণ্ডের ভেতরে একটা শিরশির অনুভূতি জেগে ওঠে।

ধানক্ষেত পার হয়ে অন্ধকারের একটা সুরক্ষার মধ্যে ঢুকে পড়ি আমরা। দুপাশে নিবিড় ঘন গাছপালা। আকাশ দেখা যায় না। তাইজুল মোবাইলের আলো জ্বেলে ঈশারায় পথ দেখায়। হঠাৎ একটা কিছুতে পা লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই আমি। ওরা দুজন একটা চাপা আর্তনাদ করে আমাকে ধরে তোলে। মোবাইলের আলোয় দেখা যায় মাটির ভেতর থেকে গাছের একটা মোটা শেকড় বেরিয়ে আছে।

– লেগেছে নাকি? ফিসফিস করে রফিক।

– না না, তেমন না।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়ি। নিঃশব্দে হিসহিস চাপা হাসিতে ফেটে পড়ে দুজন। এখন টের পাচ্ছি, আমার মাথাটা একটু ঘুরছে। হয়তো নেশার প্রভাবে। মনে হচ্ছে, যেন একটা দারুণ রহস্যভরা জগতে প্রবেশ করেছি আমি।

কিছুদূর এগিয়ে ঘন ঝোপ-জঙ্গলের ভেতরে একটা ছোট টিন-কাঠের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াই আমরা। ঘরের সামনে এক চিলতে উঠোন। ঘরের ভিতরে মৃদু আলোর আভাস। তাইজুল এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজায় আঙুলের টোকা দেয় দুবার। ফিসফিস করে ডাকে – দিদি… দিদি।

তখন দরজার একটা পাল্লা আলগোছে খুলে যায়। একচিলতে ফিকে আলো এসে পড়ে উঠোনে। তাইজুল ঘরের ভেতর ঢুকে গেলে দরজাটা আবার চেপে যায়।

মাথাটা আমার ঘুরছে। মনে অদম্য কৌতূহল। সবকিছু নিস্তব্ধতা আর গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। হঠাৎ ডানা ঝাপটে দু-তিন মিনিট পরই তাইজুল ফিসফিস করে বলে, বাই… যায়েন… কাঁয়ে যাইবেন আগে…। রফিক আমার কানের কাছে ফিসফিস করে, যাও দোস্ত,  ভিতরে যাও। বলে আমাকে ঠেলতে থাকে। যদিও আমার মাথা ঘুরছে কিন্তু একটা তীব্র কৌতূহল আর রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে আমার চেতনা প্রখর জাগ্রত।

– রফিক আমাকে ঠেলে দরজার কাছে নিয়ে যায়। কাঁপা-কাঁপা বুকে দ্বিধান্বিত পায়ে কাঠের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে যাই আমি।

ঘরে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে আলো কমিয়ে রাখা হারিকেনটা একটা ছোট কাঠের টেবিলে রাখা। পাশেই ছোট্ট চৌকিতে লাল-সবুজ রঙের আধময়লা চাদরে ঢাকা বিছানা। বেড়ার সঙ্গে দড়িতে ঝুলছে কিছু বিবর্ণ পুরনো কাপড়-চোপড়। ছিটকিনি লাগানোর শব্দে তাকিয়ে দেখি অন্ধকারের ভিতর থেকে হঠাৎ যেন বেরিয়ে এলেন এক নারী। আমার আরো কাছে এগিয়ে আসতেই হারিকেনের আলোয় তার মুখটা স্পষ্টভাবে দেখে চমকে উঠি আমি। এ কী! এ-নারী এখানে এলো কীভাবে?

মহিলা আমার হাত ধরে বিছানার দিকে টেনে নেয় আমাকে। আসেত্ম করে বলে, বইসেন। আমি বসি। সে আমার পাশে বসে।

– আপনি এখানে?

মহিলা তাড়াতাড়ি মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় আমাকে কথা বলতে নিষেধ করল।

হারিকেনের আলোয় তার মুখটা এখন আরো স্পষ্ট দেখতে পাই। কালকের রোদে পোড়া ধূলিবালি-মুখটা এখন সিণগ্ধতায় ভরা।

হ্যাঁ, এই তো সেই নারী! গতকাল বিকেলে তিস্তা নদীর শেষ খেয়াটার আগের খেয়ায় শ্যামলামতো যে-নারীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যার সামান্য আশ্রয়টুকু রাক্ষুসী তিস্তার ভয়াল গ্রাসের মুখে, রাত পোহালেই যার আশ্রয় বলতে কিছু থাকবে না…

উত্তেজিত চাপা কণ্ঠে আমি বলি, আপনার সঙ্গে গতকাল বিকেলে তিস্তা নদীর খেয়ায় দেখা হয়েছিল না?

– কী কবার লাগছেন!

মহাবিস্মিত;

– কেন, আপনার মনে নেই? আমরা যে আপনার সঙ্গে আপনার ভাঙা ভিটায় গেলাম?

মহিলা উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে থাকে। নরম পুরনো শাড়িটা আঁটোসাঁটো করে পরছে সে। হারিকেনের স্বল্প আলোয় অসাধারণ লাগছে তাকে। তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম আমি – সেই যে কাল বিকেলে আমি আর আমার বন্ধু খেয়ায় কথা বললাম। আমার কণ্ঠস্বর চড়ে যাচ্ছিল দেখে আমার হাতে চাপ দিয়ে ফিসফিস করল, আসেত্ম-আসেত্ম। তারপর বলল – আপনে ভুল কবার লাগছেন। কার লগে আপনাগোর দ্যাহা অইছিলো কেম্বা কমু?

ভাবলেশহীন মহিলার শীতল দৃষ্টি আমার মুখে। গতকাল বিকেল কথা মাত্র। এত তাড়াতাড়ি আমা ভুল হবে? তাহলে আমি কি নেশার ঘোরে সবকিছু গুলিয়ে ফেলছি?

আমি অন্য কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম, আপনার দুই মেয়ে আছে না?

– হয় আছে।

– নদীতে আপনার ভিটাবাড়ি ভেঙে গেছে না?

– হয়, গ্যাছে।

– তাহলে?

আমার ঘোর আরো বেড়ে যায়। মহিলা বলে ওঠে – হেইডা তো কুন কালের কতা!

মহিলা একটু বিরক্ত হলো। তবে সঙ্গে-সঙ্গে তার চোখেমুখে একটা বিষণ্ণতার ছায়া পড়ে যেন।

হারিকেনের নরম আলোয় আরো মায়াবী সুন্দর বিষণ্ণ হয়ে-ওঠা শ্যামলা মুখখানার দিকে আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি।

মহিলা উসখুস করে। পরিশ্রমী একহারা সুগঠিত দেহটা নিয়ে নড়েচড়ে বসতে-বসতে অস্বস্তি প্রকাশ করে। বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলে, আপনের ভুল হবার নাগছে। কারে দেখছেন কেডা কবো!

মাথাটা আমার প্রবলভাবে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। চোখ বুজে আসতে চাচ্ছে। বুকের ভিতরটা যেন ধুকপুক করছে। তীব্র সন্দেহজনক দৃষ্টিতে মহিলার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিটকিনি খুলে দ্রম্নত বেরিয়ে আসি ঘরের বাইরে।

পেছনে মহিলার বিরক্তিভরা অনুচ্চকণ্ঠে শেষ সংলাপ শুনতে পাই –  কেম্বা ঢঙের মানুষ রে বাবা!

বাইরে এসে অন্ধকারে দাঁড়াতেই কানের কাছে শুনি, রফিকের ফিসফিসে কণ্ঠ – কী রে দোস্ত, ক্যামল লাগল।

– হ্যাঁ, ভালো-ভালো। উদ্ভ্রান্তের মতো উত্তর দিই আমি।

তাইজুল ফিসফিস করে – এবার তুমি যাবার লাগেন। রফিককে বলে সে।

রফিক দেরি না করে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা আলগোছে ফাঁক করে  ভেতরে চলে যায়।

মাথাটা আমার যথারীতি ঘুরছে। অন্ধকারে এক হাত সামনেও দৃষ্টি চলে না। আমার ব্যাপারটা ওরা কি আঁচ করতে পেরেছে? চারপাশের ঘন অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার চাপে আমার নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে।

কিছুক্ষণ পর রফিক বের হয়ে আসে। তাইজুল এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে ফিসফাস করে। রফিক তাইজুলের মোবাইলের আলোয় দেখে কিছু টাকা গুঁজে দেয় তা হাতে। তারপর তাইজুল ভেতরে ঢোকে। আমি কৌতূহল দমাতে না পেরে ফিসফিস করে রফিককে জিজ্ঞেস করি – দোস্ত, গতকাল যে-মহিলার সঙ্গে খেয়ায় আলাপ হয়েছিল সেই মহিলা না?

– চুপ। কথা বলা যাবে না। লোক আসছে।

একটু দূরে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কে একজন একটা টিমটিমে কুপি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অন্যদিকে। কুপির শিখাটা একটা ছোট্ট পাখির মতো ছটফট করছে বাতাসে।

…ট্রেনটা ছুটে চলেছে একটানা মন্থরগতিতে। আধো ঘুমে আধো জাগরণে মিশুকের মনে হয় গত রাতের সেই টিমটিমে আলোটাই এখন ছুটে চলেছে ট্রেনের সমান্তরালে। r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার