বিশাল প্রশান্তি : প্রশ্ন আর উত্তরেরা ইয়েহুদা আমিহাইয়ের কবিতা

লেখক:

কুমার চক্রবর্তী

ইয়েহুদা আমিহাই  হিব্র“ ভাষার কবি। ইহুদি সাহিত্যের দুটি ভাগ রয়েছে : হিব্র“ ভাষায় রচিত সাহিত্য, যা বিশাল ও প্রাচীন এবং হাল আমলেরও এক সাহিত্য। আর ইদ্দিশ ভাষায় রচিত সাহিত্য, যা মূলত একশ বছর আগে বিকশিত এবং হালে মৃতকল্প। কেননা, ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর  বিভিন্ন দেশের ইহুদিরা একে-একে এখানে চলে আসায় ইদ্দিশ ভাষার চলতি ব্যবহার হ্রাস পেতে থাকে। বর্তমানে এই ভাষা-ব্যবহারকারীর
সংখ্যা দুই মিলিয়নের মতো।
হিব্র“ ভাষার রয়েছে কমপক্ষে তিন হাজার বছরের ইতিহাস আর এই ভাষা প্রাচীন ভাষাগুলোর অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশীল ভাষা। ওল্ড টেস্টামেন্ট এ-ভাষায় রচিত। এই ভাষা দীর্ঘকালীন বিবর্তনের মাঝ দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। একে মনে করা হতো ঈশ্বরের ভাষা। ফলে এই ভাষায় মানুষের কথা বলা নিষেধ বলে মনে করা হতো, আর সমগ্র বিশ্বের ইহুদিদের কাছে এ-ভাষা আত্মপরিচয়ের অনন্য স্মারক। কিন্তু এই ভাষা প্রায় মৃত ও পতনশীল অবস্থায় ছিল, তবে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে কথ্যভাষা হিসেবে হিব্র“র পুনরুত্থান ঘটে। বলা হয়, এই ভাষাই এক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, যার নাম ইসরায়েল। এর  ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ভাষা হলো আরবি। মনে করা হয়, আরবি ও আরামেইক ভাষার জন্ম হিব্র“ থেকেই হয়েছে। এই ভাষা সেমেটিক পরিবারভুক্ত, যা একসময় ক্যানান গোষ্ঠীর ভাষা ছিল, যা প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে মৌখিক ভাষা হিসেবে অবলুপ্ত হয়ে যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে একে মৌখিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন ইলাইজার বেন ইয়েহুদা (১৮৫৮-১৯২২)।
ইদ্দিশ ভাষা ফ্র্যাংকিশ উপভাষা থেকে সৃষ্ট, যা মধ্যযুগের জার্মানির ইহুদিদের দ্বারা সৃষ্ট, আর এতে ঘটেছে ইংরেজি, রুশ, ফরাসি, পোলিশ এমনকি হিব্র“ ভাষার নানা উপাদানের  বিমিশ্রণ। হিব্র“ বর্ণমালার একটি পরিবর্তিত রূপ হলো রক্ষা-পাওয়া ইদ্দিশ ভাষার বর্ণমালা। ইহুদি জনগোষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত নিচু শ্রেণি কর্তৃক ইদ্দিশ সাহিত্যের প্রথম সূত্রপাত হয়, যদিও উচ্চ ও অভিজাত ইহুদিরা একে বর্জন করত। তবে গোঁড়া ধার্মিক ইহুদিরা, যারা মনে করত গঠিত ভাষা হিসেবে হিব্র“ বলা ঘৃণ্য কাজ, ইদ্দিশ ভাষা ব্যবহার করত এবং এই ভাষায় রচিত সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে প্রায় ৮০ লাখ লোক ইদ্দিশ ভাষায় কথা বলত; কিন্তু এখন এই সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। তবে এটা সত্য যে, ইদ্দিশ ভাষা ইহুদিদের ৫০০-৬০০ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হিব্র“ হয় রাষ্ট্রভাষা। ফলে হিব্র“ ভাষার ঘটে বিশাল পুনরুত্থান। সেখানে চালু হয় কথ্য হিব্র“রীতি। তা সত্ত্বেও ইহুদি সংস্কৃতিতে ইদ্দিশ ভাষার রয়েছে এক বিরাট প্রভাব। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইদ্দিশ সাহিত্য তার সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে, যখন ভাষাটি পশ্চিমা সংস্কৃতির মূলধারায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। ইদ্দিশ ভাষার উত্থান ঘটে প্যালেস্টাইন এবং যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড ও রাশিয়ায়। ইদ্দিশ সাহিত্যের তিন প্রধান স্থপতি হলেন মেন্ডেল মোকহার সেফোরিম, ওয়াই এল প্যারেজ এবং সোলেম অ্যালেইশেম।
মেন্ডেল মাকহার  সেফোরিম (১৮৩৬-১৯১৭) ইদ্দিশ ও হিব্র“ উভয় ভাষাতেই লিখতেন এবং নতুন ও স্বাভাবিক হিব্র“ ভাষা সৃষ্টিতে তাঁর অবদান বিস্ময়কর। তাঁকে হিব্র“ ও ইদ্দিশ উভয় ভাষার সাহিত্যের ‘পিতামহ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি রাশিয়ায় বাস করতেন। প্রথমে তিনি হিব্র“ ভাষায় লিখতেন; পরে ইদ্দিশ ভাষায় লেখা শুরু করেন। তাঁর লেখায় রাশিয়ার স্বাভাবিক দৃশ্যপট এবং ইহুদি-জীবনের ভয়াবহ বাস্তবতার দিক উন্মোচিত। তাঁর ছদ্মনাম সোলেম জেরুর আব্রামোভিজের অর্থ ‘বই বিক্রেতা’, যার দ্বারা তিনি বোঝাতেন ‘জ্ঞানের ধারক’। তিনি গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য উইশিং রিং (১৮৮৯)। তিনি তালমুদীয় লিখনকৌশলকে হিব্র“শৈলীতে নিয়ে আসেন। আধুনিক ইহুদিদের ‘আত্মঘৃণা’ তাঁর লেখায় প্রতিফলিত।
ওয়াই এল প্যারেজ (১৮৫২-১৯১৫) পোল্যান্ডে তাঁর জীবন কাটান। লেখা শুরু করেন হিব্র“ ভাষায়। কিন্তু ১৮৮৮ সালে তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হলে তিনি ইদ্দিশ সাহিত্যের কেন্দ্রে চলে আসেন। ইহুদি জাতীয়তার, সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার সহমিলনে তিনি ইদ্দিশ সাহিত্যের সুস্পষ্ট এক পথরেখা চিহ্নিত করেন। তাঁর লেখা বইগুলো হলো : গল্প ও ছবি (১৯০৬-এ ইংরেজিতে অনূদিত), গেটোর রাজকুমার (১৯৪৮-এ অনূদিত), আগুনের বই, (১৯৬০ অনূদিত), পেরেজের গল্প (১৯৬৪-এ অনূদিত), তিনটি চন্দ্রাতপ (১৯৬৮-এ অনূদিত)। তিনি একজন জনপ্রিয় গীতিকবিও ছিলেন। হাজিডিক ভাবধারার দিক থেকে তিনি হিব্র“ ও ইদ্দিশ সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি।
সোলেম অ্যালেইশেম (ছদ্মনাম : সোলেম রবিনোভিস, ১৮৫৯-১৯১৬) ইউক্রেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অক্লান্ত ভ্রমণকারী। শেষাবধি নিউইয়র্কে আবাস গড়েন এবং সেখানেই মারা যান। মেন্ডেলের মতো গভীরতাসম্পন্ন না হলেও তিনিও ছিলেন বিখ্যাত। সরকারি রাব্বি হিসেবে তিনি জীবন শুরু করেন। পরে মধ্যবিশে তিনি কিয়েভে চলে যান এবং লেখালেখি ও ইহুদি সংস্কৃতি প্রচারে মনস্ক হন। আশির দশক এবং তারপর থেকে তিনি বেশিরভাগ লেখা ইদ্দিশ ভাষাতেই লিখতে থাকেন। তাঁর সাহিত্যিক নামের অর্থ ‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ধিত হোক’। ইদ্দিশ ভাষায় প্রথম বার্ষিক সাময়িকী সম্পাদনা করে তিনি ইদ্দিশ ভাষাকে এক জীবন্ত সাহিত্য উপহার দিতে সচেষ্টতা দেখান। তাঁর লেখা গল্পগুলো স্পষ্ট এবং হাস্যরসময়। বলা হয়ে থাকে যে,  দুর্ভাগ্যতাড়িত ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক নির্যাতিত ইহুদিদের তিনি হাসাতে ভূমিকা রাখেন।
ইদ্দিশ ভাষার লেখকদের মধ্যে আছেন আরো অনেকে : সম্যুল নিগার (১৮৮৪-১৯৫৫), ডেভিড বার্গেলসন (১৮৮৪-১৯৫২), শোলেম অ্যাচ (১৮৮০-১৯৫৭), সাপিরো (১৮৭৫-১৯৪৮), অ্যারোন জেইটলিন, আ এম ফাচ্স প্রমুখ।  তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন ওয়াই জে সিঙ্গার (১৮৯৩-১৯৪৪) এবং তাঁর ছোটভাই আইজাক বোশেভিস সিঙ্গার (১৯০২-৯১), যিনি ১৯৭৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৩৫ সাল থেকে আইজাক বোশেভিস সিঙ্গার আমেরিকায় বসবাস করতে থাকেন। লেখক হিসেবে সিঙ্গারের মহত্ত্ব হলো, তিনি এক অস্তিত্বশীল অপসৃত অতীতকে তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। এজন্যই তাঁর লেখা হয়ে ওঠে গা-ছমছম-করা। তিনি লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, স্মৃতিকথা। ইহুদি-পোলিশ লোককথার ওপর তাঁর ছিল এক অতুলনীয় দখল। ষাটের দশকের লেখকদের ওপর তাঁর ছিল তুমুল প্রভাব। সল বেলো তাঁর লেখা অনুবাদ করেছিলেন। এর কারণ হয়তো এই ছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষ যুগের এক ধর্মভাবনার কথা তিনি বলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘উচ্চতর শক্তি’তে, কিন্তু তিনি ছিলেন না গোঁড়া। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো হলো Ñ দ্য ম্যাজিশিয়ান অব লুবলিন, দ্য স্লেভ, শোশা ইত্যাদি উপন্যাস, ছোটগল্প-সংকলন : গিমপেল দ্য ফুল, দ্য স্পিনোজা অব মার্কেট স্টিট, শর্ট ফ্রাইডে, স্মৃতিকথা : ইন মাই ফাদারস কোর্ট ইত্যাদি।
ইদ্দিশ ভাষার প্রথম কবিদের মধ্যে অন্যতম সিমন স্যামুয়েল ফ্রগ (১৮৬০-১৯১৬)। জন্ম  রাশিয়ায়। প্রথমদিকে রুশ ভাষায় কবিতা লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন; কিন্তু ১৮৮৮ সালে ইদ্দিশ ভাষায়  কবিতা লেখা শুরু করেন। তিনি ইদ্দিশ ভাষার কবিতার আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তবে রুশ ভাষায় লেখাগুলোই তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ। আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রদূত কবি হলেন মরিস রোজেনফেন্ড, যাঁর ছদ্মনাম মোজে জেকব অলটার (১৮৬২-১৯২৩)। ইদ্দিশ ভাষায় তাঁর লেখা কবিতা ইংরেজিতে অনূদিত হলে ইংরেজিভাষী জগতে ইদ্দিশ সাহিত্যের কদর ও মনোযোগ বাড়তে থাকে। এ সময়ের অন্য ইদ্দিশ কবিদের মধ্যে আছেন জোসেফ বদসোভার (১৮৭৩-১৯৫৫), মরিচ ভিনসেভ্স্কি (১৮৫৬-১৯৩৩), ইহোয়াস (ছদ্মনাম : সলোমন ব্লুমগার্ডেন,             ১৮৭০-১৯২৭), ডেভিড ইগনাটফ (১৮৫৫-১৯৫৩), মোসে লেভ হালপার্ন (১৮৮৬-১৯৩২), জিসে লানদাও (১৮৮৯-১৯৩৭)।
‘ইনট্রোস্পেকশানিস্ট’ আন্দোলনের মাধ্যমে ইদ্দিশ কবিতা চরম শিখরে পৌঁছে। ১৯১৯ সালে শুরু হওয়া এই স্কুলের তিন স্রষ্টা হলেন Ñ আরোন লেইলিস (১৮৮৯-১৯৬৬), জেকব গ্লাটস্টেন (১৮৯৬-১৯৭১), নাহুম মিনকফ (১৮৯৮-১৯৫৮)। ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ এবং জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত এই কবিরা কবিতার স্বায়ত্তশাসন এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর  গুরুত্ব আরোপ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেউই মৌলিক প্রতিভাধর ছিলেন না। এর পরবর্তি কবিরা হলেন আব্রাহাম রেইজেন (১৮৭৫-১৯৫৩), মেনাহেম বোরাইসা (১৮৮৮-১৯৪৯), হেলপার লেইডিক (১৮৮৮-১৯৬২), ইটজিক মেনজার (১৯০১-৬৯), আব্রাহাম সুজকেভার (১৯১৩)।

দুই
হিব্র“ ভাষার পুরনো প্রজন্মের লেখকদের শিকড় প্রোথিত ছিল ইহুদিদের অ-ইহুদিদের মধ্যে ছড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাসে, যাকে বলা হয় ডায়াস্পোরা। আর নতুন প্রজন্মের লেখকরা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অনুপ্রাণিত হন হিব্র“ ভাষায় লেখার। মূলত ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মানে হিব্র“ ভাষার আধুনিক উজ্জীবন। অর্থাৎ এর মাধ্যমে জন্ম হয় কথ্য হিব্র“রীতির। কিন্তু হিব্র“ ভাষার এই পুনরুত্থানের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল জার্মান দার্শনিক মোজেস মেন্ডেলসনের (১৭২৯-৮৬) মধ্যে, যিনি বলেছিলেন, ইহুদিরা তাদের মুক্তিসংগ্রামে যেভাষা ব্যবহার করবে তা হওয়া উচিত হিব্র“, যা সব ইহুদিকে মর্যাদায় মহৎভাবে উদ্বেলিত ও উদ্বোধিত করতে পারবে। ফলে, সময়ান্তরে হিব্র“ সাহিত্য হয়ে ওঠে বিশাল ইহুদি জাগরণের প্রধান অস্ত্র। ভাষাতাত্ত্বিক পুরোধা হিসেবে আবির্ভূত হন এলিজার বেন ইয়েহুদা (১৮৫৮-১৯২২), যার পরিকল্পনায় প্রাচীন ও আধুনিক হিব্র“ অভিধান (১৯০৮-৫৯) গড়ে ওঠে। একটি প্রাচীন মৃত ভাষার সাফল্যজনক পুনরুত্থানের প্রধান উদাহরণ হিব্র“ ভাষা।
আধুনিক হিব্র“ সাহিত্যের লেখকদের মধ্যে আছেন মোশি হাইয়াম ল্যাজাটো (১৭০৭-৪৭), মোশি স্মাইলানাস্কি (১৮৭৪-১৯৫০), জোসেফ চেইম ব্লেনার (১৮৮১-১৯২১), আব্রাহাম কাবাক (১৮৮৩-১৯৪৪), স্যামুয়েল জোসেফ আগনন (১৮৮৮-১৯৭০), আসের বারাস (১৮৮৯-১৯৫২), হাইয়াম হাজাজ (১৮৯৮-১৯২২), মোশে শামির (১৯২১), আহারন মেগ্ড (১৯২০), বিনামিন তামুজ (১৯১৯), নাখান সাহাম (১৯২৫), আব্রাহাম বি জিশাইয় (১৯৩৭), অ্যামোজ ওজ (১৯৩৯), আহারোন অ্যাপেলফেল্ড (১৯৩২) প্রমুখ।
প্রাচীন হিব্র“ কবিতা পৃথিবীর সব কবিতাপ্রেমীর কাছেই পরিচিত : ওল্ড টেস্টামেন্টের সম্ভবত গীতসংহিতা, যব, পরমগীত এবং উপদেশক পুস্তকে এর পরিচিত উদাহরণ মিলবে। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্ট অপেক্ষাও আগাদার কবিতা (যার অর্থ লোকগল্প, যা আনুশাসনিক আইন, যা হালাখা থেকে ভিন্ন) প্রাণবন্ত। মধ্যযুগে হিব্র“ ধর্মীয় কবিতা ও পার্থিববিষয়ক কবিতার সহাবস্থান ছিল। কিন্তু ১৩০০ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত উৎকৃষ্ট হিব্র“ কবিতার সংখ্যা একবারেই কমে যায়। প্রথম অভিঘাত আসে Ñ ইয়েহুদা লেব গর্ডনের (১৮৩০-৯২) মাধ্যমে। তাঁর কবিতা বাইবেলীয় হিব্র“কে ত্যাগ করে নতুন হিব্র“ কবিতার জন্ম দিতে থাকে, যা ‘হাসকালাহ’ (অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগের ‘আলোকপ্রাপ্তি’) থেকে উদ্ভূত এক শৈলী। এই সময়ের তিন গুরুত্বপূর্ণ কবি হলেন হাইয়িম নাহমন বিয়ালিক, সৌল জারিনকভস্কি, ভ্যালমান সেনিউর। এছাড়া এ-সময়ের অন্য কবিরা হলেন Ñ ল্যামডেন, নাথান অল্টারম্যান, গ্রিনবার্গ, জোনাথান রটোজ, আমির গিলবোয়া, দেবোরাহ ব্যারন, ডেভিড অ্যাভিডান প্রমুখ।
হিব্র“ হলো পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত ভাষা। বাইবেলীয় যুগের প্যালেস্টাইনে বসবাসরত অধিবাসীরা এই ভাষায় কথা বলত এবং লিখত। পুরনো বাইবেল হিব্র“ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ফসল। হিব্র“ হলো উত্তর-পশ্চিম সেমেটিক ভাষার একটি শাখা ক্যানানিয়রের উপভাষা, যা উচ্চারণের দিক থেকে আরবি এবং আরামীয় ভাষার বৈশিষ্ট্যধারী। এই ভাষায় ব্যবহৃত উচ্চারণপদ্ধতি দুইরকম : অ্যাসকেনাজিক (মধ্য ইউরোপীয়) আর সেফারডিক (মধ্যপ্রাচ্যীয়)। এই দুইয়ের প্রধান পার্থক্য হলো উচ্চারণে নির্দিষ্ট স্বরবর্ণ আর কিছু শব্দের ব্যবহার-সংক্রান্ত। হিব্র“ ভাষায় ২৬টি ব্যঞ্জনধ্বনি ও ধ্বনিনির্দেশক শব্দচিহ্ন  রয়েছে। এই ভাষায় দীর্ঘ স্বরবর্ণের ব্যবহার অনেক কম, আর ব্যাঞ্জনবর্ণের, সঙ্গে কিছু কিছু স্বরবর্ণের চিহ্ন যুক্ত হয়ে স্বরবর্ণের রূপ নির্ধারিত হয়। অধিকাংশ হিব্র“ শব্দই মূলে তিনটি বর্ণ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়। কথ্য হিব্র“র অস্তিত্ব ছিল প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে। জানামতে, প্রথম হিব্র“ সাহিত্য হলো বাইবেলের কবিতা ‘দ্য সং অব দেবোরাহ’, যা খ্রিষ্টপূর্ব ১১০০ অব্দের দিকে রচিত। বাইবেলের পাশাপাশি প্রাচীন হিব্র“ সাহিত্যের অন্যতম কীর্তি হলো তালমুদ Ñ যা মূলত ইহুদিদের বাচনিক আইন এবং পণ্ডিতদের ভাষ্যের সংকলন। এটি ৭০ থেকে ৫০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত।
মধ্যযুগের পর্যটক ইলদাদ দ্য ভেনিত এবং বেঞ্জামিন অব তেদুলা তাঁদের ভ্রমণবিষয়ক রচনা হিব্র“তে লেখেন। ১১০০ ও ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লেখা হয় ইবনে জাবালার বুক অব ডিলাইট এবং জুডা আলহাজিরির তাহকেমোনি। এসব লেখায় ইহুদিদের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হওয়ার কাহিনি বর্ণিত। বুক অব ডিলাইটে ছন্দোবদ্ধ গদ্যে ইশপের গল্প, আরবি, ভারতীয় ও পারস্যের গল্পের উপাদান নিহিত। মধ্যযুগে কিছু ইহুদি দর্শনের বইও রচিত হয়। যেমন, জুডা হালেভির কুজারি এবং মায়মোনাইদসের গাইড ফর দ্য পারপ্লেক্সেড। উভয়েই একাদশ শতকে সৃষ্ট, যা মূলত আরবি থেকে হিব্র“তে অনূদিত হয়। ৯০০-১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত স্পেনে রচিত সাহিত্য হিব্র“ সাহিত্যের, বিশেষত হিব্র“ কবিতার এক স্বর্গযুগ। এই সময়ে হিব্র“ কবিরা বন্ধুতা, হাস্যরস, প্রেম, যুদ্ধ আর ধর্মবিষয়ক কবিতা রচনা করতেন। স্যামুয়েল ইবনে নাগ্নেলার যুদ্ধবিষয়ক কবিতা এবং জুডা হালেভির সংস অব জাইয়োনও একাদশ শতকেই রচিত হয়। ১৪৯২ সালে ইহুদিরা স্পেন থেকে বহিষ্কৃত হলে তাদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে। এই সময়েই ইহুদি মরমি ধারা কাব্বালার উত্থান। জোহার (দীপ্তির পুস্তক) যা কাব্বালিস্টদের মূল বই, তা এই সময়েই কিছু হিব্র“ অংশসহ আরামীয় ভাষায় লেখা হয়। এটি কাব্বালা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। পণ্ডিতদের ধারণা, জোহারের অধিকাংশই দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে স্পেনের দ্য লিওনের দ্বারা রচিত।
কাব্বালা হলো ইহুদিদের এক মরমিয়া রহস্যবাদী আন্দোলন। হিব্র“ শব্দ ‘কাব্বালা’র অর্থ ‘গ্রহণ করা’। এই মতবাদে ঈশ্বর ও সৃষ্টি-প্রকৃতি বিষয়ে ব্যাখ্যা রয়েছে। বলা হয় যে, মানুষের ধর্মীয় জীবন ঈশ্বরের এক প্রকাশ। ঈশ্বরের আছে এক অপ্রকাশিত গোপন অন্তর্গত জীবন। ঈশ্বরের এই অন্তর্গত জীবনের সঙ্গে প্রত্যেক মানুষের এবং প্রকৃতির অন্তর্গত গোপন জীবনের সূত্রের ব্যাখ্যাকেই কাব্বালাপন্থীরা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
আধুনিক হিব্র“ সাহিত্যের উত্থানকাল হিসেবে, পণ্ডিতেরা, পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধকেই বিবেচনা করে থাকেন। প্রথম আধুনিক ইহুদি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলো ‘হাসকালাহ’ (আলোকপ্রাপ্তি), যা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে পশ্চিম ইউরোপের ইহুদিদের মধ্যে শুরু হয়। পরবর্তীকালে তা পূর্বে ছড়ায়। এই আন্দোলনের অনুসারীরা বিশ্বাস করতেন, ইহুদিদের, তাদের ঐতিহ্যগত কিছু বিষয়কে ত্যাগ করে আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতি গ্রহণ করা উচিত। হাসকালাহ সাহিত্য প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জ্ঞানের মহিমাকে এবং একই সঙ্গে অ-ইহুদি দেশে ইহুদিদের সমানাধিকারকে গুরুত্ব দিত।
প্রথম হিব্র“ উপন্যাস লাভ অব জাইয়োন (১৮৫৩) লেখেন লিথুয়ানিয়ায় জন্মগ্রহণকারী লেখক আব্রাহাম মাপু। ১৮৬০ থেকে ১৮৭০ Ñ এই সময়কালের প্রধান তিন লেখক হলেন, ইয়েহুদা লেভ গর্ডন, মোশে লেভ লিলিয়েন ব্লুম আর পেরেজ  স্মোলেনস্কিন। গর্ডন ঐতিহাসিক বিষয় ও নারীর সমানাধিকার নিয়ে লিখতেন। লিলিয়েন ব্লুম লেখেন আত্মজীবনী সিন্স অব ইয়ুথ (১৮৭৬), যা  খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। স্মোলেনস্কিন ছিলেন প্রথম হিব্র“ লেখক, যিনি Ñ ইহুদিরা শুধু কোনো ধর্মীয় দল নয়, তারা একটি জাতি Ñ এই ধারণার অগ্রদূত। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধের অন্যতম বড় লেখক হলেন স্যালোম জেকভ আব্রামোভিচ, যিনি মেন্ডেল দ্য বুকমেলার নামে লিখতেন। তিনি একটি আধুনিক হিব্র“ সাহিত্যশৈলী সৃষ্টিতে অবদান রাখেন, যা ছিল সময়ের নিরিখে স্বাভাবিক ও যথাযথ। এ-সময়ে কথ্য হিব্র“র পুনরুত্থানে অবদান রাখেন সাংবাদিক ও অভিধান-রচয়িতা এলিজার বিন ইয়েহুদা।
১৮৮০ সালে, একটি জাতীয় ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত আন্দোলন জিয়োনিজম হিব্র“ সাহিত্যে অন্যতম শক্তি হিসেবে দেখা দিতে থাকে। এই প্রস্তাবিত ইহুদিভূমি নিয়ে সাংবাদিক আসের গিন্সবার্গ, যিনি আহাদ হাম নামেও পরিচিত, বিভিন্ন দার্শনিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। চেইম নাচম্যান বিয়ালিকের অনেক কবিতাও এই জাতীয় ভাবনাকে অভিসঞ্চারিত করতে থাকে। স্যামুয়েল ইউসেফ অ্যাগননের বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে, ১৯০০-এর প্রথম দিকে প্যালেস্টাইনে ইহুদি বসতি-স্থাপনের বিষয়টি উঠে আসে। ১৯৬৬ সালে, অ্যাগনন, হিব্র“ লেখক হিসেবে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। এরই ধারাবাহিকতায় বিংশ শতাব্দীর হিব্র“ ভাষার গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা হলেন Ñ কবি ইয়েহুদা আমিহাই, ইউরি তেজভি গ্রিনবার্গ, সওল তারনিকোভ্স্কি; গদ্যলেখক  মিশা ইউসেফ বার্র্দিচেভস্কি, ইউসেফ হায়েম ব্রেনার, হায়েম হাজাজ, আহারোন মেগেদ, এস ইয়াজার প্রমুখ।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর নতুন প্রজন্মের হিব্র“ লেখকদের আবির্ভাব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ঔপন্যাসিক মোশে শামির ও কবি হায়েম গুরির লেখায় নতুন জাতিসত্তার অভিভাবনা সঞ্চারিত। সাম্প্রতিক হিব্র“ সাহিত্যে বিষয়ের বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে সন্তান ও মাতাপিতার দ্বন্দ্ব, ইহুদি ও জায়োনবাদ ধারণার প্রত্যাখ্যান লক্ষণীয়। এসব বিষয় নিয়ে অ্যামোস ওজের লেখা উপন্যাস মাই মাইকেল (১৯৬৮) এবং এ বি ইহোসোয়ারের উপন্যাস দ্য লাভার (১৯৭৬) উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। এছাড়া আরব-ইসরায়েল বৈরিতা, ১৯৩০-১৯৪০-এর ইহুদি নিধনযজ্ঞও আধুনিক হিব্র“ সাহিত্য রচনার অন্যতম বিষয়।
তিন
ইয়েহুদা আমিহাইয়ের জন্ম দক্ষিণ জার্মানিতে, হ্ব্যুৎসবুর্গে, এক ব্যবসায়িক গোঁড়া ইহুদি পরিবারে, ৩ মে ১৯২৪-এ। হিব্রু Ami-chai নামের  অর্থ ‘My people lives’। এ প্রসঙ্গে একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘ÔFor five shillings I changed the Jewish name of my ancestors/ to a proud Hebrew name that matched hers।’ প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৬ সালে তিনি তাঁর গার্লফ্রেন্ড রুথ হেরমানের অনুরোধে নাম পালটে আমিহাই রাখেন। মধ্যযুগ থেকেই তাঁর পূর্বপুরুষরা জার্মানিতে বসবাস করতেন, তারা ছিলেন মূলত হিব্র“ভাষী জার্মান। ১৯৩৬-এ ১১ বছর বয়সে আমিহাই তাঁর পিতামাতার সঙ্গে জার্মানি ছেড়ে প্যালেস্টাইনে চলে আসেন। এই দেশত্যাগ সম্ভবত কবি মেনে নিতে পারেননি যা তাঁর লেখা থেকে অনুমান করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ইহুদি রেজিমেন্টের হয়ে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বলা স্মর্তব্য, আমিহাই প্রথম ইসরায়েলি, যিনি প্রচলিত বা কলোকোইয়াল হিব্র“ ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেন।
ইতিহাস এক অনিবার্য বিষয় তাঁর লেখায়; কিন্তু তাঁর কবিতা আত্মজীবনীনির্ভর, ব্যাজস্তুতিময়, যা কাহিনি ও ফ্যান্টাসির বাতাবরণে ঋদ্ধ। তিনি নিজেও মনে করতেন যে, তাঁর কবিতা ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে এক সংক্ষুব্ধ রূপক। রাজনীতিকে তিনি পাশ কাটাননি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি রাজনৈতিকভাবে নিয়োজিত, কারণ ইসরায়েলে সবাই Ñ বাম অথবা ডান Ñ রাজনৈতিক চাপ এবং আস্তিত্বিক সংকটের মাঝেই সতত অস্তিত্বশীল। আমার ব্যক্তিগত ইতিহাস এক বিশাল ইতিহাসের সঙ্গে মিশে গেছে। আমার জন্য তা সবসময়ই এক ও অভিন্ন।’ আমিহাই আরো মনে করতেন, সব কবিতাই রাজনৈতিক, কারণ প্রকৃত কবিতা বাস্তবের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের প্রতিক্রিয়াকে প্রকাশ করে, আর রাজনীতি বাস্তবতারই অংশ। তাঁর ভাষায়, ‘এমনকি যদি একজন কবি কোনো কাচঘরে বসে চা খেতে খেতে কবিতা লেখেন, তা-ও রাজনীতিকে প্রতিফলিত করে।’
তাঁর লেখায় তিনি স্থূল বিশ্বাস নয়, বরং ধর্মকে ব্যবহার করেন এবং আশ্চর্য আর বিমূঢ়তার উৎস হিসেবে এসবের ভালোবাসায় আত্মনিবেদন করেন। তাঁর কবিতার আছে ব্যঙ্গার্থময়তা ও সোজাসুজি বলার কৌশল, যা অনেক সময় তাঁর কবিতার অন্যবিধ উৎকর্ষকে আড়াল করে রাখে। তিনি বলেন, ‘একজন আধুনিক অথবা উত্তরাধুনিক সুরকার অবশ্যই বাখের সংগীতকে গ্রহণ করবেন, আবার তা ভেঙে মুক্ত করে নেবেন, সম্প্রসারিত করবেন। আমি যা করি তা হলো, বিরুদ্ধতার যুগপৎ অবস্থানে জমকালো ভাষা আর পদ্ধতিকে ক্লাসিক্যাল ফর্মে অন্তর্ভুক্ত করি। কখনো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভাষা আর আঙ্গিককে ঋদ্ধ করি।’
২০০০ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, জেরুজালেমে বসবাসকারী এই কবির প্রকাশ পেয়েছে দুটি উপন্যাস : এই সময় নয়, এই জায়গা নয় (১৯৬৩), ভয়ংকর বাতাসে (১৯৭১); একটি ছোটগল্প সংকলন : পৃথিবী এক কক্ষ আর এগারোটি কাব্যগ্রন্থ : এখন এবং অন্য দিনে (১৯৫৫), দুটি আশা দূরে (১৯৫৮), কবিতাবলি ১৯৪৮-৬২, এখন ঝড়ে, কবিতা ১৯৬৩-৬৮, স্মরণের কথা ভেবে নয় (১৯৭১), এসবের আড়ালে এক বিশাল সুখ লুকানো (১৯৭৬), সময় (১৯৭৮), বিশাল প্রশান্তি : প্রশ্ন আর উত্তরেরা (১৯৮০), মহার্ঘ্য সময় (১৯৮৩), মানুষ তোমার শিল্প আর মানুষের অভিমুখে তোমার ফেরা (১৯৮৫), মুষ্টিও একদা ছিল মুক্ত হাতের করতল এবং আঙুল (১৯৮৯)। বিশ্বের ৪০টির মতো ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চীনা, জাপানি ও আলবেনীয় ভাষা।
১৯৪৮ সালে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন, ১৯৫৫ সালে প্রথম কাব্য প্রকাশিত হয়। ইসরায়েলে তিনি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাসম্পন্ন এক কবি। তাঁর কবিতা স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়, বিয়ের অনুষ্ঠান, এমনকি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়ও পাঠ করা হয়। আবার সংগীত হিসেবেও তা গীত হয়। কবি হিসেবে নিজের দেশে প্রোথিত শিকড় নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। পেয়েছেন অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। যে-দেশে শুধু ৩০ লাখ লোক হিব্র“ ভাষায় পড়ে, সেখানে তাঁর একেকটি কবিতার বই প্রকাশমাত্র প্রায় ১৫ হাজার কপি বিক্রি হতো।
তাঁর কবিতায় দেশ-ভাষা, বিশ্বাস, বিপন্নতা যেন সংস্থানিক; আর আত্মার সংস্থানসূত্রের সীমার উৎসার তাঁকে দেয় এক ভিন্ন অনন্যতা। সমগ্র জীবন ধরেই তিনি স্মৃতি আর স্মৃতির বোঝা নিয়ে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন তাঁর পিতামাতার সরল সুমধুর জীবন নিয়ে, লিখেছেন জীবন-যুদ্ধ-ভালোবাসা নিয়ে, লিখেছেন তাঁর শৈশব-হারানোর বিষয় নিয়ে। যে-শৈশব যুদ্ধে নিহত, যে-শৈশব তাঁর কাছে এক ‘আশীর্বাদিত স্মৃতি’ Ñ তার প্রস্থান তাঁকে বিমূঢ় করেছে। এজন্যই ‘১৯২৪’ কবিতায় তিনি বলেন :
আর যে-ই স্মরণ করবে তার শৈশব মহান
সে-ই জয়ী
বস্তুত যদি কোনো জয় থেকে থাকে।
নিজের সম্পর্কে তাঁর আছে দার্শনিকতা, আছে অন্তর্দৃষ্টি আর বীক্ষণ যা ‘আমার জন্মদিনের জন্য’ কবিতায় ধ্বনিত :
আর এখন বত্রিশবারের পরও
আমি এখনও এক নীতিগর্ভসূত্র
যার
অর্থময়তার কোনো সম্ভবনা নেই আর।
ভালোবাসা তাঁর লেখার জগতের এক ভরকেন্দ্র। এই ভালোবাসা পুরনো শহর, জেরুজালেম, ইহুদি, আরব, নারী-পুরুষ ইত্যাদি বহুবিধ ব্যাপ্তি এবং মাত্রিকতায় তাঁর লেখায় উদ্ভিন্ন :
আর এমন আমি যেন এক ট্রয়ের ঘোড়া
ভয়ংকর ভালোবাসায় পূর্ণ।
প্রতি রাতে তারা বেরিয়ে আসে, বন্যভাবে দৌড়ায়
আর প্রত্যুষে আমার অন্ধকার বিবরে
ফিরে আসে
(‘প্রেমসংগীত’)
তাঁর কবিতার রূপকপ্রবাহ নিঃসীম, প্রতীকী ব্যঞ্জনা তাঁকে দেয় এক আত্মোপম উচ্চাসন। প্রতীক-উপমার কিছু নমুনা :
১. আর ডুবন্ত মানুষের নিশ্বাসের বুদ্বুদের মতো আকাশে নক্ষত্ররা জেগে ওঠে।
২. শব্দরাও আমাকে ত্যাগ করে যেভাবে ডুবন্ত জাহাজকে ত্যাগ করে ইঁদুরেরা।
৩. আমার বিশাল শরীর নাড়ে তার হৃদয়কে, যেমন করে জুয়াড়ি ছক্কার ঘুঁটি নাড়ে টেবিলে ছুড়ে দেওয়ার আগে।
৪. আর জীবনের শেষে আমি আবিষ্কার করি এক প্রশান্ত আনন্দ যেভাবে এক মারাত্মক রোগ ধরা পড়ে শেষে।
৫. চোখ দুটো তীক্ষè যেন ক্যান ওপেনার, তার মাঝে বিশাল গোপনতা উঁকিঝুঁকি মারে।
৬. জাইয়োন পাহাড়ে আর্মেনীয়দের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া; কফিন বহন করা হচ্ছে, কম্পিত, যেন কালো পিঁপড়ার দঙ্গলে একটুকরো খড়কুটো।
৭. আকাশ আজ যন্ত্রণাময়, নারীর ঊরুর শিরার মতোই নীল।
তাঁর ব্যবহৃত চিত্রকল্প চিত্তসন্দীপক, রূপক প্রসারিত আর জাগরণবাহী। ভাষাপ্রয়োগের দার্শনিকতা, ব্যবহৃত কূটাভাস পাঠকের মনে সৃষ্টি করে প্রতিবর্ত ক্রিয়া। পুরাণ, ঐতিহ্য, ইতিহাস, সমকালীনতা, আত্মসৃষ্টি, আত্মআবিষ্কার ও আত্মকল্পনার রসায়ন তাঁর কবিতাকে দেয় এক তুমুল উৎকর্ষ আর তূর্য অবস্থান।
১. রাতে পদক্ষেপগুলো দূরে হেঁটে যায়
অথবা বুঝি কাছাকাছি আসে
কিন্তু তা প্রকৃতপক্ষে স্পর্শ করার মতো কাছে আসে না।
এই হলো ঈশ্বর বিষয়ে মানুষের আর মানুষ বিষয়ে ঈশ্বরের ভুল।
২. আমি পরিধান করলাম  রঙিন পোশাক আর হয়ে গেলাম এক রঙিন পুরুষপাখি।
৩. মাটি কর্ষিত, যেন স্বীকারোক্তিদানকারী মানুষের মতো
ভেতর বাইরের দিকে উন্মোচিত Ñ।
৪. এই ছিল আশ্চর্য সুন্দর, স্বপ্নগুলো টেবিলের পর।
৫. আমার স্মৃতিগুলো এমন এক মানুষের মতো যার চেকোশ্লোভাকিয়া যাওয়া নিষেধ বা যে চিলি ফিরে যেতে ভয় পায়।
৬. শহরে জলের সমতল সব সময়ই মৃতদের সমতল অপেক্ষা নিচে।
৭. জিহাদ এবং জিহোবার যুদ্ধ পাকা ডুমুরের মতো ফেটে চৌচির হয়ে যায়।
৮. আগস্টের মদ চলকে পড়ে মেয়েটার মুখে, কিন্তু তার ধ্বংস অপ্র্রমত্ত।
৯. যত জ্ঞান আমি জীবনে অর্জন করেছি, এখন সবকিছু ত্যাগ করি, যেভাবে মরুভূমি ত্যাগ করে তার জলরাশি।
১০. পৃথিবীর সব কূপগুলো আমরা খনন করেছি আর এখন আকাশের শূন্যতায় আমরা খনন চালাই। চমৎকার মোটের ওপর, যার শুরু নেই সমাপ্তিও নেই আর।
১১. যখন সে পায় ভুলে যায়, যখন ভুলে যায় তখন ভালোবাসে, যখন ভালোবাসে তখন আবার ভুলে যেতে শুরু করে।
১২. পৃথিবী শুধু ভুলে থাকার জন্য মদের মতো পান করে মানুষ ও  ভালোবাসা।
কবি এমন একজন, যিনি অর্জন করেন এক বিবিক্ত সংবেদনশীলতা আর এর মাধ্যমেই কবি তাঁর অন্তর্গত উন্নয়নকে প্রদর্শন করেন। কবিতা হলো এক ভালোবাসা, যা কবি আর পাঠকের এক সুন্দর সম্পর্কের ঝুলন্তসেতু। আমিহাইয়ের কবিতা যেন ইতিহাসের দেবদূতের সঙ্গে এক মল্লযুদ্ধ। তাঁর আহ্বানকারী ভাষা, ঘটনার উল্লিখন আর ইতিহাসবোধ আমাদের চিন্তার সীমানাকে প্রসারিত করে এক লুক্কায়িত সত্যের মুখোমুখি করে দেয়।
তিনি কবি হিসেবে বিখ্যাত কিন্তু উপন্যাস ও গল্পও তাঁর অন্যতম স্থায়ী কাজ। এই সময় নয়, এই স্থানও নয় উপন্যাস, যা ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬৯ সালে অনূদিত হয়, যা মূলত দুই ধারার উপন্যাস, যেখানে নায়ক দুই বিরুদ্ধ সত্তাকে নিয়ে থাকে এবং সে একই সঙ্গে থাকে জেরুজালেম ও  জার্মানির ডয়েনবার্গে Ñ নাৎসিদের ওপর প্রতিশোধ খোঁজে কারণ নাৎসিরা ইহুদিদের দেশছাড়া করেছিল। নায়ক জেরুজালেমে থাকতে পারে অথবা জার্মানিতে যেতে পারে, এ ধরনের পছন্দ আছে উপন্যাসে। সে দুটি একসঙ্গে করতে পারে না। কারণ দুই স্থানেরই সময় এক, একই সময়ে দুই স্থানে থাকা যায় না। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও তিনি লিখেছেন নাটক, প্রবন্ধ এবং সমালোচনা।
তাঁর ব্যবহৃত চিত্রকল্প, শ্লেষ ইত্যাদির কারণে কেউ কেউ তাঁকে অভিহিত করেছেন ‘আধিবিদ্যক’ কবি হিসেবে। বৌদ্ধিকতা তাঁর সরাসরি বলার প্রাপ্যতাকে ক্ষুণœ করেছে, যদিও তাঁর ভাষা স্বচ্ছ এবং প্রায়শই কথ্যবাচনিকতায় ঋদ্ধ। সেই বহুল প্রাচীন ভাব, কীভাবে এক দয়ালু ঈশ্বর সৃষ্টি করছেন এই অদয়ালু  জগৎ, তা তাঁর কবিতায় গভীরভাবে এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিবেচিত।
১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে কিছু ইসরায়েলি ছাত্রকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ডাকা হলে তারা তাদের রুমে গিয়ে বন্দুক ও জিনিসপত্রের সঙ্গে নিয়েছিল আমিহাইয়ের কবিতার বই, এরকম কাহিনিও শোনা যায়। আমিহাইয়ের কবিতা প্রচলিত অর্থে দেশাত্মবোধক নয়, তা শত্র“হননের কথা বলে না, করে না হত্যা বা  মৃত্যুর আবাহন, তবু কেন আমিহাইয়ের কবিতা যুদ্ধক্ষেত্রে যায়? কারণ হয়তো, তাঁর কবিতা পুনরুদ্ধারক। শক্তিতে অনিঃশেষ। ইসরায়েলের মতো দেশে কবিতা যেখানে এক অর্থে বিসর্জিত, সেখানেও আমিহাই অতিজনপ্রিয়। অনেকের কাছেই তিনি শান্তির বার্তাবাহক। ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে আইজাক রবিন এবং সিমন প্যারেজ যখন একসঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, তখন অসলোতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আমিহাই পড়ে শোনান তাঁর ‘বুনোশান্তি’ কবিতাটি, যা লেখা হয়েছিল বিশ বছর আগে, যখন শান্তির প্রচেষ্টা ছিল সুদূরের স্বপ্ন। তিনি বলেন :
বুনো ফুলের মতো
তাকে আসতে দাও
হঠাৎই, কারণ মাঠের তো রয়েছে :
বুনোশান্তি

লরিয়েটের ভাষণে, রবিন আবৃত্তি করেন আমিহাইয়ের বিখ্যাত কবিতা – ‘কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের ওপর ঈশ্বরের দয়া আছে’।
আধুনিক সময়ের এক মহৎ কবির মতোই তাঁর কবিতা বস্তুত অন্তর্জগতের ইতিহাস, তবে স্বদেশ, ঐতিহ্য এবং ইহুদি জাতির চিরবেদনার উপাদানের আহৃতকরণের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে সে-ইতিহাস। তাঁর বহু বাক্প্রতিমার উৎসই ইহুদি ঐতিহ্য থেকে নেওয়া। তিনি লেখাপড়াও করেছিলেন জেরুজালেমের হিব্র“ বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাইবেল ও হিব্র“সাহিত্য নিয়ে। হয়তো এ-কারণেই ইহুদি ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের বহু নায়ক ও চরিত্র তিনি পুনরুজ্জীবিত করেছেন তাঁর লেখায়। তাঁর কবিতায় আছে দার্শনিকতার পৌনঃপুনিকতা, আছে গোলকধাঁধা এবং কূটাভাস। অনেকে, গীতিকবিতার মাধুর্যের কারণে তাঁকে জন ডান, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ডাইলান টমাস বা অডেনের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। কবি অক্তাবিয়ো পাস তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি আমাদের এক মহৎ কবি, এক সহজগম্য কবি। একবার তাঁর কবিতা কেউ পড়েছে তো তা আর ভুলতে পারবে না। কারণ, সেখানে, ১৬ পঙ্ক্তিতে, রয়েছে অনেকান্ত জীবন। ইয়েহুদা আমিহাই আমাদের শিক্ষক।’
বর্ণনার তির্যকতা, প্রতিমা-নির্মাণের ঋদ্ধতায় আধুনিক ইহুদি জীবনের তিনি এক অসামান্য রূপকার। অতীত এবং ভবিষ্যৎ তাঁর কবিতায় একাধারে বর্তমানে উদ্ভাসিত। ভৌগোলিক (ঐতিহ্য ও জাতীয় ভূগোল) ও কালগত বিস্তার তাঁর কবিতাকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনের সৃষ্টি, যুদ্ধ আর আকস্মিক বিলয়ের উপাদান। এসবই যেন তাঁর অস্তিত্বের ইতিহাস, জীবনের অস্তিমান উপলব্ধির নির্যাস :

১. দেখো, আমরা মিলিত হলাম এক নিরাপদ স্থানে,কৌণিকভাবে
যেখানে শান্ত আর
নিরাপদভাবে যাবতীয় বাজে ঘটনা থেকে ইতিহাস জাগতে শুরু করেছিল
আর শিশুদের বিছানার পাশে, বিকেলে সেই স্বর
গল্প বলতে শুরু করেছিল।
২. জেরুজালেম এমন এক শহর যেখানে
এমনকি মৃতদেরও ভোটাধিকার রয়েছে।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্ত্রী চানা সকোলোভ আমিহাইয়ের সঙ্গে তিনি জেরুজালেমে বসবাস করেছেন। তাঁর দুই ছেলে রন ও ডেভিড, আর এক কন্যা ইম্মানোয়েল্লা। মৃত্যু তাঁর কাছে :
মৃত্যুই একমাত্র আমলা যে
বিষয় ও স্থান অনুযায়ী
নথি এবং আর্কাইভে আমাদের জীবনকে সাজিয়ে রাখে।
আমৃত্যু বসবাস করা জেরুজালেম শহর নিয়ে তাঁর আছে একাধিক কবিতা। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন :
জেরুজালেম-পাথরই একমাত্র পাথর যা
ব্যথা অনুভব করতে পারে। তার আছে
স্নায়ুর ইন্দ্রজাল। সময়ে সময়ে জেরুজালেম
টাওয়ার অব বাবেলের মতোই ব্যাপক
প্রতিবাদে মানুষ-ভরতি হয়ে ওঠে।

নিজেকে কীভাবে চিহ্নিত করেন আমিহাই, কীভাবেই বা তাঁর ভাষার আইকন আধুনিক হিব্র“ সাহিত্যকে সামূহিক চৈতন্যে স্বনিত করার প্রয়াস পায়, কীভাবে তিনি জীবনকে গর্বিত করেন কবিতায় নিজ ঐতিহ্য, ধর্ম এবং ইতিহাসবোধে! ‘ট্র্যাভেলস অব দ্য লাস্ট বেঞ্জামিন অব তুদেলা’ নামীয় তাঁর বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতায় তিনি বলেন :
আমি এক ধার্মিক ইহুদি, শ্মশ্র“রাশি ভেতরে ভেতরে বেড়ে গেছে
রক্তমাংসের পরিবর্তে দাড়ি-গোঁফে পূর্ণ আমি।
কপালে জমে থাকা ব্যথা-বেদনা, উপশম নেই,
তোরাহ-র পাতা ফেলি আর নাই-ই ফেলি,
মন্দির ধ্বংস বা পুনর্নির্মাণ যা-ই হোক না কেন
প্রতি সপ্তাহেই আমার হৃদয় থাকে উপোস।
হিব্র“ ভাষার এই আধুনিক কবি ২০০০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কর্কট রোগে মৃত্যুবরণ করেন।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার