বিশুদ্ধ চাকরি

লেখক:

মধুময় পাল

বাসস্টপটা এখানে ছিল না। ছিল সত্তর-আশি মিটার আগে, নাম কামারশালা। লোচনদাস কামারের জন্মভূমি, কর্মভূমি। লোকে বলে, লোচনদাস বড় হয়ে অাঁতুড়ঘরে কামারশালা খোলে। আরো বড় হয়ে গ্রিল মেশিন বসিয়ে কারখানা করে। নিজে খাটত, লোক খাটাত। কদমগাছের নিচে বসে খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলত। টালিঘরে সারাদুপুর গ্রিলের ঘর্ঘর, চ্যাঁই…চুঁই…। কখনো কখনো মাঝরাত পর্যন্ত। লোকে বলে, অাঁতুড়ঘরেই লোচনদাসের দেহান্ত হয়। আমি এসব শুনেছি বাস ড্রাইভার-কন্ডাক্টরদের গল্পে।
কামারশালা নামটা এখনো আছে। যেমন আছে রজনীর মোড়। যদিও ‘রজনী’ সিনেমা হলটা কবেই ভেঙে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেছে। যেমন আছে হরতুকিবাগান, যদিও সাত
বর্গমাইলের মধ্যে এক পিসও হরতুকিগাছ মিলবে না। যেমন আছে রেমিংটন মোড়, যদিও
‘রেমিংটন প্রাইভেট লিমিটেডে’র সাইনবোর্ডটাও লোপাট হয়ে গেছে বিশ বছর আগে। বাস কন্ডাক্টরদের খুচরো কথাবার্তায় এসব শুনেছি।
এখানে বাসস্টপ ছিল না। হলো। কন্ডাক্টররা নাম দিলো ‘তরু ভিলা’। আমি যে-বাড়িতে যাই, তার নামে। আমি তরু ভিলায় যাবো শুনে ওরা প্রথমে অবাক হয়েছিল। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল। অবিশ্বাসও করেছিল দু-একজন। কেউ থাকে না, কেউ যায় না ওখানে। তবে কিছু বলেনি। পরপর কয়েকদিন আমাকে যেতে দেখে বাড়িটির সামনে ওরা বাস দাঁড় করায়। তার আগেই হাঁক দেয়, তরু ভিলা। আমি একা নামি। কেউ ওঠে না। তরু ভিলার উত্তরদিকে গা-ঘেঁষে দুটো ঝুপড়ি আছে। তাতে যারা থাকে, তাদের বাসে ওঠার হয়তো দরকার হয় না। তরু ভিলার উলটোদিকে বিশাল জলা। কচুরিপানা আর হোগলা জমে জমে রাক্ষসীর ক্ষুধার্ত হা-মুখের মতো হয়ে আছে। তরু ভিলার আগের স্টপ ও পরের স্টপে মানুষের ওঠানামা, জীবনের শব্দগন্ধ, রোদজোছনার উনুন-রুটি-ভাতের ধোঁয়া। মধ্যখানে বিরানভূমি।
এখানে আমি রোজ আসি। এখানে আমার কর্মস্থল। তরু ভিলায় আমি চাকরি করি।

দুই
বন্ধুরা যখন চাকরির খোঁজে অন্তরে-বাহিরে দৌড়াদৌড়ি করছে, কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখা-ফরম তোলা-পড়াশোনা করা এবং এ-দাদা ও-দাদার বাড়ি যাওয়া ইত্যাদি রিলিজিয়াসলি সম্পন্ন করছে, বিপ্লব ঘটিয়ে বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা ধ্বংস করে শোষণমুক্ত পৃথিবীর জন্মের লেবার পেইনের মতো উচ্চকিত স্লোগান ও বক্তৃতাবাজির মধ্যে এসব হচ্ছে, দু-চারজন একরোখা বন্ধুর লাশ হয়ে যাওয়ার খবরের মধ্যেই হচ্ছে, আমিও তখন লাশ হওয়ার দিকে হাঁটছি। আলটিমেটলি লাশ হইনি, বিপ্লবও হয়নি; এবং মোটামুটি একটা ভদ্রসভ্য চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্যতা খুইয়ে কেমন যেন বাতিলের দলে পড়ে গেলাম। কেউ কেউ আমাকে করুণা করতে লাগল। আর আমি, আশৈশব চেনা জায়গাগুলো থেকে ছিটকে-যাওয়া আমি, করুণাকারীদের কাছে যাতায়াত করতে থাকলাম। যদি কোনোভাবে একটা কাজ জুটে যায়, খাওয়া-পরার একটা ব্যবস্থা করা যায়। হয়নি। করুণাকারীরা আমাকে দু-এক কাপ চা খাইয়ে প্রচুর গল্প শুনিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা অনেক জানে।
তবে একেবারে কর্মহীন থাকতে হয়নি। কিছু কাজ জোটানো গেছে।
এক জায়গায় বলার মতো মাইনেতে কাজ পেয়েছিলাম। কাজটা এরকম, গণহত্যাকারীদের পক্ষে বয়ান তৈরি করতে হবে। গণহত্যা কাকে বলে প্রশ্ন তুলে ব্যাপারটা গুলিয়ে দিতে হবে। ‘প্রতিটি মৃত্যু দুঃখজনক’ বলে গলাভারী শোক প্রকাশ করে পরিস্থিতির অনিবার্যতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের আপসহীনতার কথা উদাহরণসহ বলতে হবে। উদাহরণের ঘাটতি যেন না হয়। মানবিক স্টোরি ফেব্রিকেট করে নিহতদের সম্পর্কে ঘৃণা তৈরি করতে হবে। প্রশিক্ষণ পর্বেই আমি পালিয়ে আসি।
আরেকটা কাজ এসেছিল, অলীক উন্নয়নের রিপোর্ট বানানো। যা ঘটেনি, তা কাগজে-কলমে ঘটিয়ে তোলা। এটারও মাইনে ভালো। ব্যাপারটা বুঝতে এক সপ্তাহ লাগে। চলে আসি। এক সহকর্মী বোধহয় আমার মনোভাব টের পেয়েছিল। বলল, কোথায় যাবে!
আরেকটি চাকরি পাই এক পরিচিতের সূত্রে। মানুষের যাতে ভালো হয়, সেই কাজের চাকরি। সংস্থার নাম ‘কল্যাণ’। বস্তি এলাকায় ঘুরে ঘুরে গরিবদের সমস্যার কথা জানতে হবে। কীভাবে সুরাহা হতে পারে, তা নিয়ে বাসিন্দাদের ভাবনা জানতে হবে। সামাজিক সমীক্ষা গোছের কাজ। মাস দুয়েকের মধ্যে বুঝতে পারি, মানুষের ভালো করাটা বাহানা, মলাট। আসলে কোন কোন এলাকায় কোন কোন দাদার হেক্কর বেশি, কার কতটা পোটেনশিয়ালিটি, প্রতিবাদী ছেলেপুলে একজিস্ট করে কিনা, মাসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক – এসব খবর জোগাড় করা। খবরকে তথ্যের ফরম্যাটে সাজিয়ে বিক্রি করা হয়। ভালো দাম মেলে। ঘেন্নায় ‘কল্যাণ’ ছেড়ে দিলাম।
এরপর জুটল পরিষ্কার লোক ঠকানোর চাকরি। স্কিম খাইয়ে পাবলিককে মুরগি করা। চেনাজানাকেও মুরগি করেছি। এক বছর ছিলাম। ছেড়ে দিলে মায়ের চিকিৎসা হতো না।
সরকারি টাকা খিঁচে নিতে প্রজেক্ট বানানোর চাকরিও করেছি। এক করুণাকর দাদা আমাকে বোঝায়, আত্মহত্যা অপরাধ। আত্মরক্ষা জীবধর্ম। জীবধর্ম পালনে অন্যায় নেই। তুমি নিজেকে অপরাধীদের পক্ষভুক্ত করো না। যেন কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণ কেস! ছেড়ে দিলাম।
আসলে আমার জন্য কোনো চাকরি নেই।
নীলমণিহাটে বাস ডিপোয় বসে এসব কাহিনি কন্ডাক্টর-ড্রাইভারদের বলেছি। ওরা যে শুনতে চেয়েছে, এমন নয়। একটা পোড়ো বাড়ির স্তব্ধতায় ঢোকার আগে হয়তো আমি যতটা সম্ভব কথা বলে নিতে চাই। ওরা শুনেছে। এক কাহিনি বারবার শুনেছে।

তিন
তরু ভিলার চাকরিটা দিয়েছে অরুণদা। অরুণ চট্টোপাধ্যায়। বিরাট বড়লোকের মেধাবী ছেলে। মেডিক্যালের কৃতী ছাত্র। আদাড়ে-বাদাড়ে গরিব-গুরবোদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে ক্যারিয়ারটা নষ্ট করল। অরুণদা বুঝতে পেরেছিল, আমার কোনো চাকরি থাকতে পারে না। একদিন পাঁচ শহীদের স্ট্যাচুর সামনে পাকড়াও করে বলল, চাকরি করবি? এমনিতে কোনো কাজ নেই। ফাঁকা বাড়ি। কথা বলার লোক পাবি না। সারাদিন একদম একা। ফটক খুলে ঢুকবি সকাল নটা-সাড়ে নটা নাগাদ। চারটেয় বেরিয়ে আসবি। দোতলা বাড়ি। গোটা কুড়ি বিশাল বিশাল ঘর আছে। চারদিকে বারান্দা। ছাদ। লন। বেশির ভাগই ভাঙাচোরা। এর মধ্যে বেছে নিবি। যেখানে তোর খুশি হয় থাকবি। বসে বসে বই পড়তে পারিস। লিখতে পারিস। গান গাইতে পারিস। নিজে ছাড়া শোনার কেউ নেই। সুতরাং লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই। ঘুমোতে পারিস। নাচতেও পারিস। একশ শতাংশ স্বাধীন, যা তোকে কোনো রাষ্ট্রও দিতে পারে না। যখন ইচ্ছে হবে, নিজে বানিয়ে চা খাবি। খাবার বানানোর জিনিসপত্র অবশ্য পাবি না। ইলেকট্রিক লাইনটা এখনো আছে। ফটকের মাথায় জোড়া সিংহ পড়ে গেছে। লম্বা লম্বা থামের গায়ে হেলান দিয়ে আকাশ দেখবি। আর ভাববি, একদিন এই রাজবাড়িটা ঝমঝম করে বাজত। বেতন মাসে চল্লিশ হাজার।
আমার মাথায় ‘চল্লিশ হাজার’টা ভেঙে পড়েছিল। জীবনে কখনো এত বেতনের কথা ভাবিনি। তার ওপর কিছু না করে চল্লিশ হাজার! এরকম বেতন কোথাও কোথাও হয় বটে, সেখানে গুপ্ত কারণ থাকে। টের পাই, ভয় জমছে। আমাকে কি অবৈধ কোনো কাজে…? অরুণদাকে বলি, কী বলছ? আমাকে চল্লিশ হাজার?
জেনেই বলছি। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে।
অত টাকা কেন দেবে?
দেবে। আছে। তাই দেবে। ওদের টাকাপয়সা ভূতে খায়। আমার বড়দিদার বাড়ি। তরুলতা মুখোপাধ্যায়। তাঁর চার ছেলের ঘরের নাতিপুতিরা মালিক। ওরা ওখানে থাকবে না। বেচবেও না। আবার মেরামতও করবে না। পোড়ো বাড়ি হিসেবে রেখে দেবে। নিজে থেকে ধসে পড়লে তখন দেখা যাবে। এই পাগলগুলো একজন কেয়ারটেকার খুঁজছে। অন্যরকম কেয়ারটেকার। বাড়ির দেখভাল করতে হবে না। কয়েক ঘণ্টা থাকতে হবে। লালদাদুকে জানিয়ে দিই? অরুণদা থামে।
মাথার ভেতর অনেক প্রশ্ন ব্যাঙাচির মতো কিলবিল করে। কেন থাকে না বাড়িতে? কেন বেচবে না? মেরামত করবে না কেন? কিসের বাড়ি? একা একা থাকা যাবে? বাজে কোনো ব্যাপার নেই তো? কোনো কাজ নেই, তবু কেন এত টাকা দেবে? এখন তো কত প্রাইভেট সিকিউরিটি এজেন্সি হয়েছে, তাদের বললেই অল্প পয়সায় গার্ড পাওয়া যায়। সেখানে কেন যোগাযোগ করছে না? আবার বলছে অন্যরকম কেয়ারটেকার। সেটা কী? আমাকে কেন? জিজ্ঞেস করি, অরুণদা, আপনি আমাকে বাছলেন কেন?
অরুণদা হেসেছিল। বলেছিল, ওরা তোর মতো লোক চায়। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। আমি তো তোকে জানি। তুই পারবি। ভাবছিস, কী করতে হবে? দারুণ কাজ। তোর মনের মতো কাজ। ওই বাড়িতে থাকবি। বাড়িটা নিয়ে বলবি। ভাববি। কল্পনা করবি। লেখার সুযোগ খুঁজছিলি। পেয়ে গেলি। তোর লেখায় বাড়িটা জীবিত হয়ে থাকবে। বড়দিদার পরিবারে কিছু গোলমাল ছিল। ফিউডাল পরিবারে ওরকম থাকেই। খুন-টুন হয়েছে বলে রটনা আছে। তোর লেখা প্রমাণ করে দেবে, সমাজে অনেক বড় ত্যাগ আছে এই বাড়ির।

চার
নীলমণিহাট ডিপোয় আমি সকাল আটটার মধ্যে পৌঁছে যাই। হাঁটাপথে বাড়ি থেকে দশ মিনিট। ডিপো থেকে চল্লিশ মিনিট লাগে ‘তরু ভিলা’। প্রথম দিন সাড়ে সাতটায় এসেছিলাম ডিপোয়। বাস কতক্ষণ পরপর ছাড়ে, জানা ছিল না। দ্বিতীয় দিন থেকে আটটায়। হাতের কাছের বাস ধরেছি। বসার জায়গা না পেলেও চলে গেছি। পরে একটা-দুটো বাস ছেড়েছি ভালো সিটে আরাম করে যাব বলে, কন্ডাক্টর-ড্রাইভারদের সঙ্গে গল্প করব বলে। ওরা আমাকে খুব ভালোবাসে। ঘন দুধের মশলা চা খাওয়ায়। সুজি বিস্কুট খাওয়ায় বা মোটা দানার চিনি জড়ানো বাসনা বিস্কুট। কোনো কোনো দিন শালপাতার ঠোঙায় জিলিপি আর পুরি-তরকারি নিয়ে আসে। এক ড্রাইভার তার বাড়ি থেকে আনা রুটি-হালুয়া খাইয়েছে। ততদিনে ওরা জেনে গেছে, সকালে আমি শুধু চা খেয়ে বেরিয়ে আসি। খাবার তৈরি করে সঙ্গে নিয়ে যাই। ওরা আমার সঙ্গে কথা বলে খুশি হয় যেন। হয়তো ‘তরু ভিলা’য় কাজ করি বলে। ওদের কাছে এটা বিস্ময়। একটা পোড়ো বাড়িতে লোকটা ঢুকে যায়। সারাদিন একা থেকে বেরিয়ে আসে। হয়তো ওরা ভাবে, লোকটা যে-কোনোদিন আর ফিরতে না-ও পারে। সেই অনিশ্চয়তা থেকেই হয়তো বেশি ভালোবাসা। ওরা কি আমাকে অতিপ্রাকৃত কিছু ভাবে? ভাবতে পারে। সন্দেহ করে? মনে হয়, না।
তবে প্রায়ই জানতে চায়, ওই বাড়িতে আপনাকে কী কাজ করতে হয়?
প্রথমদিকে কায়দা করে এড়িয়ে যেতাম। কীই-বা বলি। কিন্তু ডিপোয় আড্ডা মারাটা যখন আবশ্যিক হয়ে পড়ল, তখন গল্প বানাতে শুরু করি। তরু ভিলার লাইব্রেরি, আলমারিভর্তি পুরনো রেকর্ড, কলের গান, পাখি-ঘড়ি, পালঙ্ক, হুঁকো, নাচঘরে ঝুলন্ত পাঙ্খা ইত্যাদি হয়ে উঠতে থাকে। আমি বলি। ওরা শোনে। হয়তো তিনটে বাস ছেড়ে দিই। নটায় ঢোকার কথা। সাড়ে নটা-পৌনে দশটা হয়ে যায়। দেখার কেউ নেই বলে বেশি দেরি কিন্তু করি না কখনই। কামাইও করি না।
পাঁচ
লোচনদাসের কামারশালার এককালে খুব নাম ছিল। বাইরে থেকে লোক এসে দা-বঁটি-ছুরি-কাটারি-সাঁড়াশি-শাবল-কোদাল-খুন্তি পাইকারি নিয়ে যেত। হাটে-গঞ্জে তারা বেচত। ড্রাইভারের সিটের পেছন দিকে মাল রাখার জায়গা ছিল। ধারালো জিনিস চটের বস্তা দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হতো। এক মাঝবয়সী কন্ডাক্টর আমাকে বলেছে। সে তার কাকার কাছে শুনেছে।
এক বুড়ো ড্রাইভার বলেছে, লোচনদাস অস্ত্র বানাত। রামদা, তলোয়ার, বর্শা, টাঙ্গি, দোফলা-তিনফলা ছুরি, আরো কত ভয়ংকর। চাহিদা ছিল সেসবের। লরির নিচে, বাসের নিচে কায়দা করে বেঁধে পাচার হতো। উলুবেড়ে, বিহার, মুর্শিদাবাদ, মোল্লারচক, হাওড়া, বর্ডার, বাদাবনে যেত। পুলিশের গাড়িতেও অস্ত্র গেছে। আপনি যেখানে চাকরি করেন, সেই বাড়ির লোকেরাও লোচনদাসের কাছ থেকে কিনত। একদিন বড়কর্তা এলেন তো দুদিন পর ছোটকর্তা। আমার বাবা লোচনদাসকে ওই বাড়িতে বাইজির গা-ঘেঁষে বসতে দেখেছে।
বাস ডিপোর প্রবীণতম কর্মী হাতকাটা স্টার্টার আরো চমকপ্রদ খবর দিয়েছে। ও আগে মারহাববার দলে ছিল। তরু ভিলার এক কর্তার হয়ে কাজ করত মারহাববা। কর্তার অর্ডারমাফিক বেয়াড়াদের নামিয়ে দিত। লাশও লোপাট করে দিত। তরু ভিলার একটা মেয়েমানুষ ও একটা বাচ্চা ছেলেকে হাওয়া করে দেয় মারহাববা। হাতকাটা স্টার্টার তখনো মারহাববার দলে ঢোকেনি। শুনেছে, ব্যাপারটা নিয়ে গুলি চলে ভিলার লোকজনের মধ্যে। মারহাববার রং লালচে ফর্সা। পরত কালো লুঙ্গি, কালো পাঞ্জাবি। মাথায় লাল ফেট্টি। লোচনদাসের সঙ্গে তরু ভিলায় যেত মারহাববা। লোচনদাস তখন গ্রিল মেশিন বসিয়েছে।
বুঝতে অসুবিধে হয় না, লোচনদাস সাবেক অস্ত্র থেকে আধুনিক অস্ত্রের কারবারে বিবর্তিত হয়েছিল। তরু ভিলার কোনো কোনো কর্তাকে সে অস্ত্র দিত। হয়তো ভাড়াটে খুনিও জোগাড় করে দিত। আমি যেন আরো একটা জমিদারবাড়ির লোভ-লালসা, লাম্পট্য, হিংসা-প্রতিহিংসার কাহিনি ছায়া থেকে স্পষ্টতায় উঠে আসতে দেখি। আরো কিছু ঘাতকের নিঃশব্দ চলাফেরা, চাপা কান্না ও কপট শোকসভা এবং গ্রাম-গ্রামান্তরে গরিব অসহায় প্রজাদের হাহাকার ধরা দিতে থাকে।
বাসের ড্রাইভার-কন্ডাক্টররা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আপনাকে ওখানে কী করতে হয়?
আমি লাইব্রেরির কথা, রেকর্ডের কথা, বিদেশি চিত্রকলার কথা, তরুলতা মুখার্জির গোপন খাতার কথা বানিয়ে বানিয়ে বলি।
আমি অস্ত্র দেখেছি কিনা ওরা জিজ্ঞেস করে না।

ছয়
অরুণদাকে প্রশ্ন করি, এরকম চাকরি আমাকে দিলে কেন?
উত্তর এড়িয়ে অরুণদা বলে, কেমন আছিস?
আমি বলি, মাইনে পেতে ভালো লাগে। তবে টাকাটা বড় বেশি। তাতে একটু অসুবিধে হয়।
অরুণদা বলে, অন্য অসুবিধে হচ্ছে?
আমি বলি, আর কী অসুবিধে! কথা বলার কেউ নেই। মাঝেমধ্যে হলঘরে গিয়ে চেঁচিয়ে আসি। সিঁড়ির আয়নায় একটু নেচে নিই। হেঁড়ে গলা ছেড়ে গান গাই। লম্বা বারান্দায় জোরে হাঁটি। নিজের নিশ্বাসের শব্দ শুনি। চা বানাই। দুপুরের ভাত নিয়ে আসি। খাই। ঝিমোই। চামচ দিয়ে রেলিংয়ে বাজনা বাজাই। ভাঙা ফোয়ারার নিচে ফাটা পাইপ থেকে সরু হয়ে জল পড়ে। বোতলে ভরে চারদিকে জল ছিটিয়ে দিই। বিড়াল-কুকুরও নেই যে তাড়াব।
পড়িস না?
পড়তে পারি না।
কেন?
নাচঘরের ছাদ থেকে মেঝে অবধি মাকড়সার বাসা। একদিন দরজা খুলেছিলাম।
পড়তে পারিস না কেন?
দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় হাজার হাজার চামচিকে ঝোলে। ওদিকটায় একবার গিয়েছিলাম।
পুরনো বাড়িতে ওসব থাকেই। তুই তো লেখার সুযোগ চেয়েছিলি। সঙ্গে উপার্জন। আগের একটা চাকরিও তোর পছন্দের ছিল না। নিজেকে সৎ-শুদ্ধ রাখতে ছেড়ে দিয়েছিস। এবার একটা ব্যবস্থা হয়েছে। সুযোগ আছে। বই পড়। নিজের লেখা লেখ। বাড়িটা নিয়ে লেখ। এরকম একটা বাড়িতে কিছুদিন থাকলে মাথায় গল্প গিজগিজ করার কথা। আর তুই কিনা…।
এ-বাড়িতে অনেক কুকর্ম আছে।
ও একটু থাকেই। বাড়ির ইতিহাসে তা কয়েক পৃষ্ঠা মাত্র। সমাজকল্যাণ, প্রজাকল্যাণ, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা, উৎসব ইত্যাদি কয়েক হাজার পৃষ্ঠার। তুমি লেখো।
আমি লিখলে কী হবে। কে পড়বে? কেন বিশ্বাস করবে? এখানকার লোকে এটাকে খুনিবাড়ি বলে!
ওদের কথা কতদূর যায়? তোমার লেখা আমরা বিশ্বাস করাব। আমার বড়দিদা সত্যি কোনো অন্যায় করেননি। তাঁকে সুবিচার দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তুমি লেখো। চাকরি করো। বাড়িটা ধসে পড়লেও তোমার চাকরি থাকবে।
আমি অরুণদাকে যেন চিনতে পারি না।
অরুণদা বলে, আমার বড়দিদাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। তাঁর রক্তের টান অহরহ টের পাই।
আমি বলি, অরুণদা, বাড়িটার উত্তরদিকে একটা কাঠবাদামগাছ আছে। বিরাট গাছ। তার নিচে দুটো ঝুপড়ি আছে। খড়ের ছাউনি। দরমার দেয়াল। একটা দাওয়ায় টিয়ে পাখি। খাঁচার ভেতর। আরেকটা দাওয়ায়, কী বলব অরুণদা, অমন সাদা আমি জীবনে দেখিনি, একটা লোক, বয়স বোঝা যায় না, তিরিশ হতে পারে, নববইও হতে পারে, কুঁচকানো সাদা চামড়া ফাঁক করে সাদা চোখ ও সাদা দাঁত খুলে সারাদিন বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। সাদা খালি গা, সাদা চুল। মরণের সাদা সমনের মতো পলকহীন চোখে ওত পেতে আছে। কখনো বাড়িটাকে হাত তুলে ডাকে। ঝুপড়িতে আর কেউ থাকে কিনা জানি না। যতক্ষণ থাকি, কাউকে দেখিনি। তুমি জানো ওটা কে? বাড়ির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে?
জানি না বললে মিথ্যা বলা হবে। তোর না জানাই ভালো। বিকেলের পর থাকিস না।
আমি চারটের মধ্যে বেরিয়ে পড়ি।
তা-ই করিস। লেখাটা শুরু কর। ওরা অপেক্ষায় আছে। বলতে পারব যে লেখা হচ্ছে। তরুলতা কিন্তু সত্যি প্রজাদের কল্যাণে কিছু কাজ করেছিলেন।

সাত
ওরা বলল, আপনি সেদিন একটা খাতার কথা বলেছিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করি, কোন খাতা?
ওরা বলে, যেখানে বিদ্রোহী পাঁচ প্রজাকে মেরে ফেলার বিবরণ আছে। মেটালার জঙ্গলে বিদ্রোহীরা ঘুমোচ্ছিল। গুলি চালিয়ে ওদের হত্যা করে জমিদারের ভাড়াটে বাহিনী। জঙ্গলমহল গুলির শব্দ শুনেছিল। ঘরে ঘরে এ-ওকে জাপটে ধরে বসেছিল। প্রত্যেকের মধ্যে ভয় ছিল খুন হয়ে যাওয়ার, প্রিয়জনের খুন হওয়ার।
মনে পড়ে, আমি ওদের বলেছি। হয়তো এভাবে নয়। প্রজাদের বিশ্বাসমতো শব্দ বসিয়ে নিয়েছে ওরা। ঠিক কী বলেছি, আমার পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। খাতাটা যে কাল্পনিক। তবে হত্যাকান্ড একটা ঘটেছিল কোথাও এবং তা নিয়ে হইচই হতে দেওয়া হয়নি। আমার ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ইতিহাসটা বেরিয়ে পড়েছে।
শালপাতায় গরম জিলিপি আসে। পৌষের সকালের নরম রোদ তার শরীরে।
আমি কি আর কিছু বলেছি?
ওরা জানায়, হত্যাকান্ডের আগের দিন লোচনদাসের লোকজন তরু ভিলায় গিয়েছিল। তার মানে, লোচনদাস লোক সাপ্লাই দিত।
এটাও বলেছি আমি? ভেবে অবাক লাগে। যে-খাতার কোনো অস্তিত্ব নেই, তার ভেতর থেকে এসব কথা বের করে এনেছি! মনে হয়, আমি কিছুই বলিনি। আমার সময় আমাকে দিয়ে বলিয়েছে।
স্টার্টার বাঁশি বাজায়। একটা বাস হেঁকে হেঁকে চলে গেল। পরের বাসে আমি যাব। ওরা আমার ব্যাগটা রেখে দিয়েছে জানালার ধারের সিটে।
আর জিলিপি বলব?
না।
চা আসে।
এটা কি বলেছি যে, মেটালার জঙ্গলে হত্যাকান্ডের দুদিন পর লোচনদাসের এক কারিগর খুন হয়। সে নাকি বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়েছিল। ব্যাপারটা এই প্রথম জানা গেল। তার মানে, লোচনদাসের লোকজনের মধ্যে বিদ্রোহীদের লোক ছিল। আসলে ওরাও তো প্রজা।
একজন বলে, তরু ভিলার লেকে যার দেহ ভেসে উঠেছিল, সেই লোকটা? সে আমাদের পাড়ার গাজু।
বলি, হতে পারে। খাতাটা খুঁটিয়ে দেখতে হবে। কয়েকটা পাতা পোকায় কেটেছে। আজ একটা খাতা পাব। তরুমা নিজে দেবেন।
তরুমা! মানে বড়মা? তিনি তো কবে মারা গেছেন! ওরা সমস্বরে বলে ওঠে। আমাদের তখন জন্ম হয়নি। ওনার মৃত্যুটাও নাকি সন্দেহজনক!
ওভাবে বলতে নেই। ওনাদের মৃত্যু আর পাঁচজনের মতো নয়। মরেও অমর। সেদিন বললেন, বিরামপুরে ইশ্কুল বানিয়েছিলাম। প্রজাদের লেখাপড়া হলো। উন্নতি হলো। চাষের কাজ ছাড়াও কাজ শিখল। দেশ-বিদেশ গেল কত ছেলেপুলে। সেই ইশ্কুলবাড়ি নাকি এখন ফাঁকা। বাংলাতে পড়াশোনা হয় না বলে বাবা-মা ছেলেমেয়েদের পাঠায় না। পাশেই ইংরেজি ইশ্কুলে খুব ভিড়। আমাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে বুঝিয়ে দিতাম, বাংলায় পড়াশোনা ছোটদের কত দরকার।
আপনার সঙ্গে ওনাদের নিয়মিত দেখা হয় বুঝি? ওরা জানতে চায়। বলি, দেখা হয়। ওনারা দেশের জন্য কত কাজ করেছেন। শুনি, লিখে রাখি।
ভয় করে না? ওনারা কি মূর্তিতে আসেন? স্পষ্ট দেখতে পান?
ওরা সবাই ছায়া ছায়া। ধরা যায় না। বোঝা যায়। ঘরের পর্দা দুলে ওঠে। আয়নার পর্দা সরে যায়। জানালা খুলে যায়। বন্ধ দেয়ালঘড়ি চলতে শুরু করে। রেকাবে মিষ্টি আসে। ওনারা কারো ক্ষতি করেন না। আমি কেন ভয় পাব? আমি তো চাকরি করি। চাকরি করা আমার বেঁচে থাকা। ভয় পেলে বাঁচব কী করে? যা জানতে চাই, ওনারা বলেন। এখন তো জ্যান্তদের কাছে জানতে চাইলে গালমন্দ শুনতে হয়, হুমকির মুখে পড়তে হয়। কত জ্যান্ত চোখ লাল করে, আঙুল তুলে শাসায়। তেনারা এসব করেন না।
আমার চাকরি আমার মধ্যে কথা বলতে থাকে। আমার আমিও বলে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার