বুকের মধ্যে আশাবৃক্ষ

লেখক:

সৈয়দ শামসুল হক

লোকে বলে – সংসার ভবের হাট; এ বড় লাগসই কথা। মানুষ আসে আর যায়, যায় আর আসে; কিন্তু কি তাই? – আবার যে আসে পুরোনো কি মানুষটাই ঘুরে আসে, নাকি নতুন মানুষ আসে? মানব-জীবনধারার কথা যদি হয়, তবে নতুনই তো আসে, তার নতুন গল্প নিয়ে; সে গল্প একই সঙ্গে নতুন এবং পুরোনো।
হায়, এই জীবনের পরে, এই নদী মাঠ আকাশের ভুবনে আর ঘুরে আসা নাই। কিন্তু হাটের দিনে হাটের ভিড়ে মানুষ, পরের হাটে একই মানুষ, সেই চেনা মুখ সকল,
প্রতি হাটেই, ফিরে ফিরে; নতুন মানুষ তারা নয়।
হাট যেমন ভাঙে, বন্ধুজনের আড্ডাও একদিন ভাঙে, পরের দিন আবার বসে। হাটে যেমন চেনা মানুষ পরপর কদিন না এলে উদ্বেগ হয়, প্রশ্ন হয়, অবশেষে জানা যায় – নাই সে
মানুষটা বাহে, মারা গেইছে! তখন শোক হয়; কিন্তু কতক্ষণের জন্যে আর! বেচাকেনার ভিড়ে কলরবে শোক লয় পায়। তারপর আবার হয়তো দেখা যায়, নিত্য হাটে দু-একজন নতুন মানুষ এসেছে; পুরোনোর ভেতরে তারা স্থিতি পায়, মিশে যায়; নতুন মানুষও একদিন পুরোনো হয়ে যায়।
আড্ডারও সেই এক কাহিনি। হঠাৎ একদিন কেউ খসে যায়। কেন সে উধাও হয়ে যায়, প্রথমে নির্ণয় হয় না। কেন সে আসে না, জীবিত আছে কি নাই – এ প্রশ্নও মনে ওঠে। তারপর বিস্মরণ নেমে আসে আড্ডার নিয়মিত মানুষের ভেতরে। যদি হঠাৎ আবার একদিন দেখা দেয় মানুষটিকে, যদি একদিন আবার সে আড্ডায় এসে বসে, তখন শত প্রশ্ন বর্ষিত হয় – কী হইছিল রে তোর? কোন্ঠে গেইছিলু? হামার কথা কি তোর মনে পড়ে নাই?
তাহলে আমরা এখন একটি মানুষের হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যাওয়া আর হঠাৎই একদিন ফিরে আসা নিয়ে এই গল্প-প্রবন্ধটির পাত পাড়ি। যেদিন সে ফিরে আসে, যে-রাত্রি গভীর কালে, আমরা তখন আড্ডা ভেঙে বাড়ি ফিরে গেছি। তার সঙ্গে আমাদের দেখা হয় নাই; বিবরণটি আমরা হানিফভাইয়ের কাছে শুনি, আর খানিক শুনি সরকারি হাসপাতালের সেই নার্সটির কাছে, যার চিকন কালো যুবতী স্নিগ্ধ মুখখানা আমাদের কারো কারো মনে ঘুমহীন অঘোর রাতে হঠাৎ কখনো হানা দেয়।
হানিফভাই – জলেশ্বরীর ইস্টিশান রোডে, ইস্টিশানের পরেই পহেলা যে পড়ে সেই হানিফভাইয়ের মিষ্টির দোকানে আমাদের এক নিত্য আড্ডা বসে, এ-কথা বহুদিন বহু গল্পে আমরা বলেছি। সকালে দশটার ট্রেন আসবার আগে এসে আমরা হানিফভাইয়ের দোকানে বসি; সকালের ট্রেনে ঢাকা থেকে আগের দিনের খবরের কাগজ আসে, কাগজ নিয়ে কাড়াকাড়ি করে পড়ি; নৌকার দলের খবর, ধানের শীষ দলের খবর, তাদের আড়াআড়ি, এ সকল তো আছেই – এ নিয়ে আর কতক্ষণ কথা বলা যায়? আমাদের বিষণ্ণ স্তব্ধতার ভেতরে পাথরের মতো গড়িয়ে পড়া আরো কিছু যে-খবর, আমাদের ভেতরটাকে নিঃশব্দে খুন করে রাখে – কোথায় কোন যুবতী গলায় দড়ি দিয়েছে, যৌতুকের চাপে কোন স্ত্রী খুন হয়েছে, কিশোরী কোথায় ধর্ষিত কোন গ্রামে; তারপর চা, আবার চা, দুপুর হয়ে যায়, রোদে ঝিমঝিম করে ওঠে, চোখ পুড়ে যেতে থাকে, তখন আমরা যে-যার বাড়ির পথ ধরি; বাড়িতে আমাদের জননীরা ভাত ধরে বসে আছেন।
আবার আসি সন্ধ্যাকালে, আবার যখন দিনের দ্বিতীয় ট্রেন রাতের ট্রেন আসে, তার আগে মগরেব নামাজের আজানের কালে; সূর্যডোবা প্রথম ফিকে অন্ধকারে প্রথম তারা ফোটার পর হঠাৎ আতশবাজির মতো হাজার তারা ফুটতে থাকে জলেশ্বরীর গগনে; আমরা সেই গগনটিকে মাথায় নিয়ে হানিফভাইয়ের দোকানে এসে বসি। এশার আজান পড়ে; ট্রেন আসে। এখন দূরের যাত্রী যারা এবার বাস ধরে রাতের অন্ধকার ঠেলে নিজ ঠিকানায় যাবে, তারা অনেকেই জলপান করতে হানিফভাইয়ের দোকানে ঢোকে। তখন আর ঠাঁই ধরে রাখা সমীচীন হয় না আমাদের। আমরা পথে নেমে পড়ি। এ-পথ সে-পথ উদ্দেশ্যহীন হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা উদ্দেশ্যহীন নয় তা মোটেই – পথ বাড়ির দিকেই শেষ পর্যন্ত ঘুরে যায়, আমরা গভীর রাতে বাড়ি ফিরে আবার সেই জননীর অন্নে ক্ষুধা হত্যা করে ঘুমে ঢলে পড়ি। এ-জীবন ভবের হাট, সেই হাটও একসময় ভাঙে; আড্ডা শেষে আমাদের ভাঙা হাটের মতোই আমাদের জীবনের হাটখোলায় পচা-গলা আনাজ পড়ে থাকে, বিরান হাটখোলার ধূলিপথে কুকুর নামে, শোঁকে, যদিবা কিছু খাদ্য পাওয়া যায়।
হানিফভাইয়ের দোকানের মাথার ওপরে মিষ্টান্ন ভান্ডার লেখা সাইনবোর্ডে অাঁকা আছে পরী, গলায় তার মালা, হাতে মিষ্টির থালা, উড়ে চলেছে। আমাদের আকাশে কোনো পরী নাই। হানিফভাইয়ের মুখে আমরা বিবরণ শুনি – দিনের অবিক্রি সকল মিষ্টি পরীর ভোগে যায়, অচেনা মানুষ এসে পরীর জন্যে কিনে নিয়ে যায়। হানিফভাই কাহিনির অবতারণা করেন – হঠাতে চোখ তুলিয়া দ্যাঁখোঙ একটা মানুষ, ফির নজর করিয়া দ্যাঁখোঙ, চিনা বলিয়া ঠ্যাকে, তোমারে আড্ডায় বসিতো বলি মনে হয়, দোকানের সমুখে থির খাড়া হয়া আছে।
রাতের ট্রেন ফিরে গেছে কিছুক্ষণ আগে। সামান্য দূরের যাত্রীরা এখন চা খেয়ে খিদেটা মেরে নেয়। অচিরেই তারা অন্ধকার-ডোবা গ্রামের দিকে নেমে যাবে। আরো দূরের যাত্রীরা এখন এখানেই দুটি খেয়ে নিয়ে, কাছেই কোনো হোটেলের ঢালা বিছানায় রাত কাটিয়ে ভোরে রওনা দেবে। দোকানে এখন যাত্রীদের ভিড়। ব্যবসার সময়। যুবকটিকে দোকানের খোলামুখে এসে দাঁড়াতে দেখে হানিফভাই বড় অসন্তুষ্ট হন। বিরক্তই বলা যায়। যুবকের চোখে চোখ না পড়ে এমন একটা ছলে হানিফভাই তখন দোকানের কাজের লোকদের ওপর হম্বিতম্বি শুরু করে দেন, যদি তাঁর এই তপ্ত মূর্তি দেখে যুবকটি সরে পড়ে।
হানিফভাইয়ের এই মনোকথাটি যে যুবক টের না পায় তা নয়। সে থমকে যায়। ইতস্তত করে। ঢুকবে কি ঢুকবে না! তার মন মরে যায়। কিন্তু যুবকের উপস্থিতি হানিফভাইয়ের পক্ষে বেশিক্ষণ অগ্রাহ্য করে থাকা সম্ভব হয় না। যুবকটিকে তিনি এবার সরাসরিই বলেন, নাই! তারা চলি গেইছে মেলা সময় আগে।
নাই? নাই শুনেও যুবকটি নিরস্ত হয় না। দোকানের ভেতরে দ্রুত চোখ বোলায়। খোঁজে। প্রতিটি মুখ খোঁজে। তার বন্ধুদের কেউ এখন এখানে নাই, তবু সে দুয়ার থেকে নড়ে না। তাকে ছাড়াই যে বন্ধুদের আড্ডা এখনো এখানে হয়, তার অভাব যে কেউ বোধ করে না, তার জন্যে একবারও কেউ অপেক্ষা করে না, এ সকল কি সে ভাবে? আমরা জানি না; তবে নিশ্চয়ই সে এক লহমার জন্যে ভাবে। তার মনের একটি ভাগ তখন তিতো হয়ে যায়; কিন্তু তার মনের মধ্যে এটাও সে জানে, জগৎ এখনো আগের মতোই বিস্ময়কর রকমে চলমান।
হানিফভাই টের পান, যুবকটি তার ডাকের অপেক্ষা করছে – যদি ভেতরে এসে বসতে বলেন! কিন্তু আমাদের হানিফভাইটি জলেশ্বরীর এক নম্বর মঞ্চনায়ক একদা ছিলেন বটে, কত যুবতীর ঘুম তিনি একদা হারাম করেছেন – এ সকল অনেক আগের কথা, এখন তিনি পাকা ব্যবসায়ী। তিনি জানেন, ভেতরে ডাকলে কিছু না কিছু তো খাবেই। কিন্তু এ সন্দেহও তাঁর মনে আসে, পয়সা দিতে পারবে কি?
তবু হানিফভাই ধমক দিয়ে ওঠেন, যেন সে ভেতরেই তবে আসুক, তাই বলেন, কী হইলো? অলক্ষ্মীর মতন খাড়া হয়া আছো কেনে?
হোক ধমক, তবু একটা সাড়া তো বটে। যুবক দোকানের ভেতরে অবিলম্বে একটা পা রাখে।
হানিফভাই, একটু বসিলোম না হয়।
হানিফভাই ধমকের মাত্রা চড়িয়ে পালটা বলেন, কইলোম তো, দোস্তরা সউগ চলি গেইছে।
যুবক আরেক পা ভেতরে আসে।
দুয়ারের মুখেই মিষ্টির কাচপাল্লা আলমারি। আলমারির ভেতরে টিউবলাইট। পেতলের বারকোশে রাখা মিষ্টিগুলো সেই দুধশাদা আলোয় আরো বড় আরো রসালো দেখায়। যুবক এখন আলমারি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ে। আলমারির শেষ মাথায় চকচকে কাঁঠাল কাঠের চেয়ারে বসে ছিলেন হানিফভাই। কাছেই একটা ছোট টেবিলের ওপর ক্যাশবাকসো। হানিফভাই বাকসোটার ওপর দ্রুত একটা হাত রাখেন, যেন যুবকটি টাকা ছিনতাই করতেই এত কাছে চলে এসেছে। হানিফভাই লক্ষ করেন, মনে মনে বলেন, ভঙ্গিটা দ্যাখেন না কেনে, ঘাড় তেড়া করিয়া খাড়া! চোখেওবা অগ্নি জ্বলে।
বন্ধুরা চলে গেছে শুনেও যুবক বলে, যদি আসে!
চিৎকার করে ওঠেন হানিফভাই, যদি-ফদি বোঝো না মুই। তফাৎ হন!
এ চেঁচানিতে যুবকটি চলে যাওয়া দূরে থাক, মাটি বেশ মাড়িয়েই সে দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে তার ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে ওঠে। হয়তো সে মজাই পায়। এই সেদিনও হানিফভাইয়ের দোকানে সে অবাঞ্ছিত ছিল না। এই সেদিন পর্যন্ত সে এখানে বসে রাতদুপুর পর্যন্ত আড্ডা দিয়েছে। চা-ডালপুরি, মাঝেমধ্যে চমচম কি লাড্ডু, পয়সা গুনেছে বন্ধুরা।
তারপর একদিন হয়তো আমাদের চোখে পড়েছিল, সে গরিব; আড্ডা-খরচের পয়সা যে সে দিতে পারে না, সে নিয়ে একদিন কী একটা মর্মান্তিক ঠাট্টাও বহে যায় হয়তো আমাদের আড্ডার ওপর দিয়ে। নীরবে সে চলেই গিয়েছিল। বহুদিন সে আসে নাই। আজ আবার এসেছে। পয়সা! পয়সাই তবে সব! জলেশ্বরীর এত জাগ্রত যে মাজার, বাবা কাউকে নিরাশ করেন না, খালি হাতে ফেরান না, এ সকলই গুজবকথা – বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজারেও হাত তুলে কোনো লাভ নাই, যদি না ১০-২০ টাকা তাঁর দানের বাকসে না দেওয়া যায়।
যুবকের মুখে রহস্যময় হাসিটি নীরবে প্রশস্ত হতে থাকে। এর কোনো মানেমুন্ডু ধরতে না পেরে হানিফভাই অস্বস্তি বোধ করেন। তাঁর ঈষৎ ভয়ও হতে থাকে। এই বেকার অনাহারী আত্মীয়হীন বন্ধুহীন কপর্দকহীন স্বাস্থ্যহীন যুবকটিকে তিনি ভয় পাবেন কেন? – এর উত্তর তাঁর জানা নাই, আমাদেরও নাই। কিন্তু ওদিকে, ওই ভয়টা হানিফভাইকে এতটাই ক্ষেপিয়ে তোলে যে, তিনি কোলের কাছে পড়ে থাকা তাঁর হাতের মুঠি এখন খপ্ করে পাকিয়ে তোলেন, যুবকটির দিকে নিষ্পলক চোখ ফেলে রাখেন এরপর।
যুবকটির ঘাড়ে কোন ভূত চাপে কে জানে, এ সকলের দিশউদ্দিশ নাই; সে আরো দু-পা এগিয়ে যায় হানিফভাইয়ের দিকে। আর ঠিক তখনই চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ান হানিফভাই। যতটা বিক্রম নিয়ে তিনি লাফ দেন, তার তুলনায় অনেক হালকা একটা ঘুষি মারেন তিনি। ঘুষিটা যুবকের বুকে লাগে। হানিফভাই জানেন না, আমরাও কি জানি, গতকাল দুপুরে বুড়ির চরের মোড়ে একটি বাসি ডালপুরির পর যুবকটির পেটে কিছুই আর পড়ে নাই।
যুবক অস্ফুট আর্ত শব্দ করে মাটিতে পড়ে যায়। হানিফভাই কিন্তু তাকে আহত নয়, ক্যাশবাকসের কাছাকাছি চলে আসা থেকে নিরস্ত করতেই তাকে ঘুষিটি মেরেছিলেন। এখন যুবককে টাল খেয়ে পড়ে যেতে দেখে তিনি ঘটনার উপযুক্ততা প্রতিষ্ঠা করতে চিৎকার করে ওঠেন, ছিনতাই করিবার মতলব! ভদ্দরঘরের ব্যাটার হয় এই কাম!
যুবককে মাটি থেকে কেউ তোলে না। নিজেও সে উঠে দাঁড়াবার শক্তি বা প্রয়োজন অনেকক্ষণ খুঁজে পায় না। পতিত অবস্থাতেই সে বিস্মিত হয়ে ভাবে, সব দুর্ভোগেরই শেষে একটা পুরস্কার জোটে। এ ক্ষেত্রে তার মতো ব্যক্তিকেও বংশের একটা গৌরব তবে দিয়েছেন হানিফভাই – ভদ্দরলোকের ব্যাটা বলেছেন।
দোকানের খদ্দেরসকল কিছুক্ষণের জন্যে খাওয়া থামিয়ে হাত তুলে এসবই দেখে; নিরাসক্তরা আসন ছেড়ে ওঠে না বা কোনো মন্তব্য করে না; বিষয়ীরা দ্রুতহাতে কোমরের গেঁজে টাকা-পয়সা টিপে দেখে নিশ্চিন্ত হয়। আছে! অচিরে যুবক নিজেই ধীরে উঠে দাঁড়ায়। কারো সাহায্য সে প্রত্যাশা করে না।
হানিফভাইকে পাছে কেউ হৃদয়হীন মনে করে, তাই তিনি এবার নরোম গলা ধরেন। ভিজে গামছা দিয়ে নিজের হাত মুছতে মুছতে একবার খদ্দেরদের দিকে, আরেকবার যুবকের দিকে চোখ ফিরিয়ে ফিরিয়ে শান্ত গলায় বলতে থাকেন, কাম না পান জলেশ্বরীতে? তো, রংপুরে যান না কেনে? ঢাকা যান না কেনে? কিছু না পারেন, সরকারি ধানের শীষের দলে যোগ দিয়া, মিটিংয়ে চুঙ্গা ফুকিবার কাম ধরেন না কেনে? বড় বড় কথা তোমাক্ ভাত দিবে? প্যাটের ভাত বলিয়া কথা! জলেশ্বরীতে না জোটে, ঢাকা যায়া কপাল পরীক্ষা করেন না কেনে?
যুবকটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে খদ্দেরদের দিকে। খদ্দেরদের কারো কারো মাথা নড়ে। হানিফভাইয়ের কথায় তাদের সায় লক্ষ করা যায়। যুবক এরপর বিড়বিড় করে কী বলে, বোঝা যায় না। অচিরে সে দোকান থেকে নেমে পা টেনে টেনে পথের বাঁকে চোখের আড়াল হয়ে যায়।
তখন খদ্দেরদের একজন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে, জায়গার মায়া বড় মায়া, বাহে।
আরেকজন চায়ের পেয়ালায় সুড়ুৎ করে চুমুক দিয়ে জগৎ-অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে বলে, রাজধানীতে চাকরি পাওয়া কঠিন কথা, মামু। নৌকায় ওঠেন বা ধানের শীষ মুঠ করিয়া ধরেন, তবে চাকরি। নয়, জমি বেচিয়া দালাল ধরেন, নবীর দ্যাশে দুবাই-দোহায় কুলি কাম করিবার যান।
যুবকটির পা টলমল করে। এখানেই কোথাও বসে পড়তে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এখানে কিছুতেই নয়। জীবন বা মৃত্যু কোনো কিছুই আর ফল দেয় না বা ঝড়ে ভাঙে না। কেবল বুকের ভেতরে আশা এই যে, কালকের দিনটি অন্যরকম হবে হয়তো। সেই আগামীকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্যে তাকে মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। এখানে আর নয়; এই নির্দয় দোকানে নয়।
এই নির্জন রাস্তায় নয়।
ইস্টিশানের গা ছমছমে অন্ধকারে নয়।
পাট গুদামের বারান্দায় শুয়ে থাকা কুন্ডলী পাকানো কুকুরদের পাশে নয়।
আলোর ভেতরে। মানুষের ভেতরে। মানুষের কাছে।
রাতের ট্রেন চলে যাওয়ার পরে পরেই জলেশ্বরীতে ঝপ করে মধ্যরাত নামে। সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। বাড়িঘরের বাতি নিভে যায়। রাস্তা নির্জন হয়ে যায়। মাতালের মতো হাওয়া ঘোরে শহরের ওপর দিয়ে। যুবকটি ইস্টিশানের লোহার থামে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হাঁটতে থাকে।
ইস্টিশান রোড, স্কুল রোড, চানবিবির পুকুর, কুতুবুদ্দিনের মাজার, শহীদ গেদু মিয়া রোড, শহীদ মহিউদ্দিন সড়ক, একাত্তরের স্মৃতিমিনার, কাছারি বিল্ডিং, টাউন হলের মাঠ – পায়ে পায়ে টেনে নিয়ে চলে সে। সাইকেলে চড়ে এই এত রাতে মুক্তিযোদ্ধা হায়দারভাই ফিরছেন, এখন পাটের গুদামে কেরানির কাজ করেন – তার বাতিহীন সাইকেলের দ্রুতগামিতার মুখে যুবকটি ত্রস্তে একপাশে সরে যায়; ছায়ার সঙ্গে মিশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে; এই অনাহারী মুখ মুক্তিযোদ্ধাকে দেখাতে তার ইচ্ছে করে না। ওঁরা তো সোনার দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছিলেন, তাই না! যদিও একবার ডাকতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে তার করুণকথা হায়দারভাইকে শোনায় – সে হায়দারভাই বলে ডেকে ওঠে না।
যুবকটি নিজেকে এখন হাসপাতালের সমুখ সড়কে আবিষ্কার করে। এই শরীর ও মন নিয়ে কত দীর্ঘপথ সে হেঁটেছে ভেবে বিস্ময় হয় তার। এত শক্তি তার অনাহারী শরীরে! এখনো! হাসপাতালের সমুখভাগে চাঁদের মতো গোল ঘরটাতে আলো জ্বলছে। এতক্ষণ পরে এই একটি আলো দেখে যুবকটি উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
ঘরের ভেতরে হলদে একটা ন্যাংটো বাল্ব জ্বলছে মাথার ওপরে। নিচে টেবিলে মাথা রেখে ড্রেস করে শাদা শাড়ি পরা একটি নার্স ঘুমিয়ে আছে। এও তবে ঘুমিয়ে? পৃথিবীর কত অসুখ এখনো জেগে আছে! নার্সটিকে ঘুমোতে দেখে যুবকটির বড় শঙ্কা হয়। বুকের ভেতরে তাড়া অনুভব করে সে। নিজেরই ভেতর থেকে সে মিনতি শুনতে পায়, বুবু, আর না ঘুম যান, জাগি ওঠেন।
বুবু! শুনতে পাচ্ছেন না, যন্ত্রণায় কারা কোথায় অবিরাম কেঁদে কেঁদে এখন ভেঙে পড়েছে? বুবু, তাদের কান্নার স্বর ক্ষীণ হয়ে যেতে যেতে বাতাসের ফিসফিস হয়ে গেছে, মরা চাঁদের মতো ময়লা হয়ে গেছে, আপনি এখনো ঘুমিয়ে থাকবেন?
কতকাল আগে ফাঁসি নেয় যুবকের বোনটি; স্বামীর যৌতুকের চাপ; সহ্য করতে পারে নাই সে; সকল জুড়ান সে খুঁজে পায় কড়িকাঠের দড়িতে। বোনের ছবি-মুখখানা যুবকের মনে পড়ে; মিলিয়ে দেখে সে; আপনা থেকেই মিলিয়ে দেখে ওঠে সে। ঠিক সেই রকম! অবিকল সে-ই! নার্সের মাথাটি অবিকল সেইভাবে কাৎ হয়ে আছে, যেমন ছিল ফাঁসির দড়ি থেকে মেঝের ওপরে বোনটিকে নামাবার পর। কিন্তু বোনটির মুখচ্ছবি ঠিক মনে পড়ে না তার। অমাবস্যার রাতে আধকোশার কালো জলের ঢেউয়ে যেন ধুয়ে গেছে।
যুবকের ভেতরটা শিরশির করে ওঠে। সে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। ভয়ের পিঠ বেয়ে মমতা ঝরে পড়তে থাকে শিশিরের মতো।
নার্সটি ঘুমের ভেতরে চমকে ওঠে। চোখ খুলে দেখে, তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে ক্ষুধার্ত শীর্ণ অচেনা একটি মুখ। কোটরের ভেতর থেকে ধক ধক করছে একজোড়া বিশাল চোখ। হঠাৎ কোথায় একটা পাখি তীব্র কটাস্ স্বরে একবার ডেকে ওঠে। রাত ফালাফালা হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ নার্স টেবিলের ওপর থেকে পেপারওয়েট তুলে সেই চোখ দুটির মাঝখানে ছুড়ে মারে।
মুহূর্তের মধ্যে রক্ত ফিনিক দিয়ে চোখ দুটিকে ঢেকে দেয়। যুবক মেঝের ওপর পড়ে যায়।
কপালে পাথরের আঘাত আর মেঝেতে লুটিয়ে পড়বার মাঝখানে, রক্তের ভেতর দিয়ে জগতের রং ঘোর লাল হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে যুবকটি ভাবে। হানিফভাইয়ের দোকানে যেমন, আবার তার মুখে অদ্ভুত নীরব হাসিটি ফুটে ওঠে। সে ভাবে, এই যে বন্ধু কমে যায়, একদিন আর বন্ধু কেউ থাকে না, মানুষও আর থাকে না তারপর, চেনা বা অচেনা, শেষ পর্যন্ত পড়ে থাকে বিকট এক শূন্যতা, কিন্তু সেই শূন্যতা হ্রাস বা বিদায়ের মতো ঘন নয়, আর সেই শূন্যতা নিজেই নিজেকে ঘৃণা করে, শূন্যতা নিজেই নিজের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, এবং, হ্যাঁ, রুখে উঠে আঘাত করে।
না, শূন্যতা অন্তত সৌজন্য বা প্রতারণা করে না কাউকে।
আহ্, এই আঘাত কী মধুর। কী উষ্ণ। কী কোমল। যুবকটির মুখ দীর্ঘ অনাহারের পর খাদ্যগ্রহণের তৃপ্তি ও প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
নার্সটি কর্তব্যসচেতন হয়ে ওঠে মুহূর্তের মধ্যেই। ঝুঁকে পড়ে সে যুবকের কপালে হাত রাখে। পূর্ণ পাকস্থলী থেকে যেমন, যুবকের দীর্ঘ একটি উদ্গারধ্বনি তখন শোনা যায়। কালকের দিনটি হয়তো অন্যরকম হবে, আর, সে সেই আগামীকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে, এমন একটি আশাবৃক্ষ বুকের মধ্যে শেকড় চারিয়ে ওঠে। সে জ্ঞান হারায়।
লোকে বলে – এই সংসার ভবের হাট; এ বড় লাগসই কথা। মানুষ আসে আর যায়, যায় আর আসে; কিন্তু কি তাই? – আবার যে আসে সে কি পুরোনো মানুষটাই ঘুরে আসে, নাকি নতুন মানুষ আসে? মানব-জীবন ধারার কথা যদি হয়, তবে নতুনই তো আসে, তার নতুন গল্প নিয়ে; সে গল্প একই সঙ্গে নতুন এবং পুরোনো।

শেয়ার করুন

২ thoughts on “বুকের মধ্যে আশাবৃক্ষ

Leave a Reply