বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব : কাজী আবদুল ওদুদের ভাবনা

লেখক:

সাইফুল আলম

বাঙালি মুসলিম ভাবুক ও চিন্তাবিদ হিসেবে ওদুদের ভূমিকা ছিল বুদ্ধিজীবীর। বুদ্ধিজীবীর ব্যক্তিত্ব সমাজমঙ্গলের উদ্দেশ্যে নিবেদিত না হলে তাঁকে প্রকৃত বুদ্ধিজীবী বলা যায় না। বুদ্ধিজীবী বা বিদ্বজ্জন এবং বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠী বা বিদ্বৎসমাজের ভূমিকা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানের সাহিত্যে ‘সিভিল সোসাইটি’ প্রত্যয়ের সূচনা। সমাজবিজ্ঞানী ড. রঙ্গলাল সেন সিভিল সোসাইটি (ঢাকা, তপন প্রকাশন, ২০০৬) গ্রন্থে ‘সিভিল সোসাইটি’র প্রত্যয়নের ইতিহাসের পর্যায়কে ছয়টি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রথমত. প্লেটো থেকে রুশোর ধারণা, দ্বিতীয়ত. অ্যাডাম ফার্গুসনের           প্রস্তাবনা, তৃতীয়ত. হেগেলের চিন্তাভাবনা, চতুর্থত. মার্কসের মতবাদ, পঞ্চমত. গ্রামসির ধ্যান-ধারণা, ষষ্ঠত. সাম্প্রতিককালে ‘সিভিল সোসাইটি’র বিবর্তিত ও বিতর্কিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ (রঙ্গলাল সেন, ২০০৬ : ২)। তবে সিভিল সোসাইটির সদস্য হিসেবে বুদ্ধিজীবীর কার্যপরিধি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ১৯৯৩ সালে বিবিসি থেকে প্রচারিত Edward W. Said-এর রিথ বক্তৃতার সংকলন Representation of the Intellectual (New York, Vintage Books, 1996) ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতে বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করা হয়। সাঈদের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ড চালাতে এ-কালের বুদ্ধিজীবীকে চারটি চাপ সহ্য করতে হয় – প্রথমত. কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া, যা একজন বুদ্ধিজীবীর উত্তেজনা ও আবিষ্কারের প্রত্যয়কে দমিয়ে রাখে; দ্বিতীয়ত. বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন অর্থাৎ অ্যাকাডেমিক ও নন-অ্যাকাডেমিক বিভাজন; তৃতীয়ত. ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল আকর্ষণ, ক্ষমতা কর্তৃক নিযুক্ত হয়ে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রয়োজন ও সুবিধার প্রতি তীব্র ঝোঁক এবং চতুর্থত. পেশাদারিত্ব (সাঈদ, ৯৬ : ৮০)। বিভিন্ন দেশে বুদ্ধিজীবীদের দলীয় আনুগত্য মূলত ক্ষমতা কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্তির প্রত্যাশা, গণমাধ্যমে প্রচারের প্রলোভন, গবেষণা ও প্রজেক্ট থেকে অর্থ ও পুরস্কারপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই সৃষ্ট। এ-কালে বুদ্ধিজীবীদের পেশাদারিত্বের চাপ প্রথাবিরোধী এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিদ্যমান রূঢ় বাস্তবতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওদুদের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তার পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে নব্য গোড়াপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং উদারপন্থী ইসলামি বুদ্ধিজীবীদের জীবনদৃষ্টি ও সমাজদর্শন সৃষ্টির ক্ষেত্রে রক্ষণশীল ও দ্বিধান্বিত অবস্থানকে ওদুদ সততা, সাহস ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনায় মোকাবেলা করেছেন। এক্ষেত্রে চিঠিপত্র, সংগঠন ও পত্রিকার ভূমিকা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমেই তিনি ঐতিহ্য ও উদারপন্থী মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের মতাদর্শের বিপরীতে নিজের চিন্তা প্রকাশ করেছেন। ওদুদের অবলম্বন ছিল যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ। জীবিকার প্রয়োজনে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকলেও তিনি ছদ্মনামে চিন্তা-উদ্রেককারী প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ ও ‘শিখাগোষ্ঠী’র প্রাণসঞ্চালক শক্তি হিসেবে নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন। ওদুদের এবং শিখাগোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজদর্শন সৃষ্টির জন্য মুক্তবুদ্ধির সাহায্যে মানববিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রসঙ্গ মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আত্মীয়স্বজন এবং অনুরাগীদের অনুরোধে তিনি জন্মভূমিতে ফিরে আসেননি মূলত আদর্শগত ও রাজনৈতিক কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ পদে যোগদানের প্রলোভন অর্থাৎ নতুন করে পেশাদারিত্বের চাপ প্রত্যাখ্যান করেছেন মূলত সাহিত্যিক-কৃত্য অনুকূল পরিবেশে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে। সাময়িক পত্রিকা এবং লিটন ম্যাগাজিনের লেখক ও সম্পাদক হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব পালনে কোনো ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আনুগত্য প্রকাশ করেননি।

কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি বুদ্ধিজীবী। তাঁর জীবনোপলব্ধি ও সাহিত্যকর্ম বিবেচনাসূত্রে প্রতীয়মান হয় যে, রেনেসাঁসের চেতনাই তাঁকে প্রেরণা দিয়েছে। ওদুদের চিন্তা, মনন ও সৃজনের ব্যাপকতা রেনেসাঁসের যুগান্তকারী অভিঘাতে সম্ভাবনাময়। তাঁর সাহিত্যকর্মে যে-সমগ্রতা বা পূর্ণতার পরিচয় মেলে, সেখানে রেনেসাঁসের চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল। তিনি যে-জীবনার্থ সন্ধান করেছেন তা রেনেসাঁসের নবচৈতন্যে এবং আধুনিকতার বোধে গতিশীল ও সম্মুখগামী। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের জীবনভাবনা, মানবিকতা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সংলগ্ন জীবনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা এবং আধুনিকায়নের প্রত্যাশাকে তিনি সমাজপ্রগতির অগ্রযাত্রার সম্পৃক্ত করেছেন। রেনেসাঁসের চারিত্র মাত্রাগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ হলেও তা বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত। রেনেসাঁস বৈজ্ঞানিক এবং ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কার, রাজনৈতিক দৃষ্টিতে জাতীয়তাবাদ এবং সাধারণ দৃষ্টিতে বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ বলতে মূলত প্রাচীন ও মধ্যযুগের রীতিনীতির প্রতি জিজ্ঞাসা এবং বস্ত্তজগৎ ও প্রকৃতিবিজ্ঞানের রূপান্তর বুঝিয়ে থাকে। রেনেসাঁস শুধু আবিষ্কার, নবজাগৃতি কিংবা বিদ্রোহ নয় বরং এই ত্রয়ী লক্ষণের সমন্বয়ে অর্জিত জীবনমুখী, চৈতন্যসর্বস্ব, মানবকল্যাণমূলক কর্মপ্রচেষ্টা। রেনেসাঁসের ফলে সমাজপ্রগতির ধারায় ব্যক্তিচৈতন্যও নতুনতর জীবনাদর্শে উজ্জীবিত হতে পারে। রেনেসাঁসের কারণেই ব্যক্তি-অস্তিত্ব বিশ্বজনীন অস্তিত্বের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।

কাজী আবদুল ওদুদের জন্ম ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোয়। অসহিষ্ণু, দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষে জর্জরিত সমাজে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন রক্ষণশীলতা, পশ্চাৎপদতা ও কুসংস্কার। ব্রিটিশ বাণিজ্যপুঁজি ও শিল্পপুঁজির প্রভাবে উনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির রেনেসাঁস বাঙালি হিন্দুর আত্ম-আবিষ্কারের পথকে সুগম করে। বাঙালি মুসলমান তখনো আত্মসংকট মীমাংসায় দ্বিধান্বিত, অপ্রস্ত্তত, পুনরুজ্জীবনবাদে মুগ্ধ। বিশ শতকের বিশের দশকে বাঙালি মুসলমান সমাজে রেনেসাঁসের আলো নতুন জীবনধর্মে উজ্জীবিত করে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১) স্থাপন ও ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ (১৯২৬) প্রতিষ্ঠা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের মাধ্যমে ওদুদের উদারমানবতাবাদী সংস্কার প্রচেষ্টা স্বসম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। অন্যদিকে প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেও তিনি বিরাগের সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমৃত্যু তিনি চেষ্টা করেছেন হিন্দু-মুসলমান বিরোধ মীমাংসার। দেশ বিভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল তাঁকে আপনজন বলে গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত ছিল। কলকাতার অনুকূল পরিবেশ এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে প্রলোভন সত্ত্বেও তিনি জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেননি। কলকাতায় নিঃসঙ্গ আত্মীয়-স্বজনহীন অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। ওদুদের জীবনের ট্র্যাজেডি জাতিসত্তার ট্র্যাজেডির সঙ্গে সন্নিহিত। এ কারণেই কাজী আবদুল ওদুদ বাঙালির জটিল সময়, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে সংলগ্ন। বাঙালি মুসলমানের আত্মাসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের সঙ্গে বিশ্বাত্মাসন্ধানের প্রশ্নে ওদুদ ছিলেন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের উজ্জীবিত ব্যক্তিত্ব। তিনি উপলব্ধি করেছেন রেনেসাঁসের আলো ছড়িয়ে দিলে সমাজের অন্ধকার দূরীভূত হতে পারে। জাতিসত্তার উৎকর্ষের জন্য তিনি নিজ সম্প্রদায় ও প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মহৎ চিন্তা আলোচনা করেছেন। একই কারণে বিশ্বজনীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর অনুরাগ ছিল।

বুদ্ধিকে শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে ওদুদ মানসে এমার্সন, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, রমাঁ রলাঁ, তলস্তয়, শেখ সাদি প্রমুখ মনীষার আলো প্রেরণা সঞ্চার করেছে। রমাঁ রলাঁর জাঁ ক্রিস্তফ উপন্যাস পাঠের মাধ্যমেই ওদুদের জীবনজিজ্ঞাসার সূত্রপাত ঘটে। তাঁর জীবনের গতিপথকে সঞ্জীবিত রেখেছেন হজরত মোহাম্মদ, কামাল আতাতুর্ক ও রামমোহন রায়। হজরত মোহাম্মদের মানবিক গুণাবলির প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল। ইসলামের ইতিহাসে মোতাজেলাবাদ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর অর্থাৎ ইবনে রুশ্দের মৃত্যুর (মৃত্যু ১১৯৮) পর পুনরায় মুক্তচিন্তা ও বিচার প্রতিষ্ঠায় সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন কামাল আতাতুর্ক। হজরত মোহাম্মদের একেশ্বরবাদ, সবল কান্ডজ্ঞান রামমোহনের ওপর প্রভাব সঞ্চার করেছে। মোতাজেলাবাদের প্রতিও রামমোহনের আকর্ষণ ছিল। রেনেসাঁসের মুক্তচেতনা ও ধর্মসমন্বয়ের চিন্তা থেকেই ওদুদ বাঙালি মুসলমান সমাজের সামনে রামমোহনের আদর্শকে উপস্থাপন করেছেন। ওদুদের গ্যেটে-চর্চার পরিধি দেখেই অনুভব করা যায় তিনি গ্যেটে অনুরাগী ছিলেন। তাঁর ধর্মসমন্বয় প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ গঠনে গ্যেটের প্রেরণা তাৎপর্যময়। তাঁর শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্যে বিশ্বাত্মাসন্ধানী প্রবণতায় গ্যেটের শিল্পদর্শন  প্রেরণাস্থল। রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সঙ্গে ওদুদের গ্রহণ-বর্জনের সম্পর্ক ছিল। তবে ওদুদের শিল্পরুচি গঠনে ও মানবতাবাদী                চিন্তনক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পথিকৃৎ প্রতিভার ব্যক্তিত্ব উন্মোচনে ওদুদের ভূমিকা ছিল বিবেকবান বুদ্ধিজীবীর। স্বকালের সংকট বিবেচনায় তিনি প্রতিভাবানদের ত্রুটি-বিচ্যুতিও উল্লেখ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রধান উপাদান মহৎ প্রতিভাবান ব্যক্তির জীবন ও কর্ম।

মুক্তবুদ্ধি ও বিচারবোধের সন্নিপাতে তাঁর সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠেছে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন ভাবুক ও গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তাঁর চারিত্রিক গাম্ভীর্য আত্মমর্যাদাবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তিনি চারিত্রিক মাধুর্য ও জ্ঞানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তিনি যুক্তিতর্ক বাদ-প্রতিবাদের মাধ্যমেই তাঁর মতাদর্শ প্রচার করতেন। এক্ষেত্রে কখনোই অপরের প্রতি অশ্রদ্ধার মনোভাব দেখাতেন না। তিনি যে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা ভাবতেন তা বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে সমাজে সঞ্চারিত করতেন। তাঁর  চিন্তার সততা এবং মতের নির্ভীকতাই তাঁকে স্বাধীনচেতা ও স্পষ্টভাষী মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পার্থিব প্রয়োজন কিংবা প্রলোভন তাঁর মনে সৃষ্টি করেনি সংকোচের দেয়াল। এ-কারণেই তিনি জীবনাদর্শে ও জীবিকায় অকপট মনোভঙ্গি পোষণ করতেন।

তিনি বুদ্ধির মুক্তিবাদী ও আস্তিক ছিলেন। মানবতাবাদ ছিল তাঁর কাছে আদর্শ। চিত্তের উদারতায় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের বিভক্তি বাঙালির সমাজপ্রগতির অন্তরায়। বুদ্ধির মুক্তি না ঘটলে বাঙালি মুসলমানসমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হবে। বাঙালি মুসলমানসমাজ যদি বাঙালি হিন্দুর সম্প্রসারণশীল বিকাশপ্রক্রিয়ার বিপরীতে প্রগতিবিমুখ থাকে, তবে সামগ্রিকভাবে বাঙালির সম্মুখগতি পিছিয়ে যাবে। এ-কারণেই তিনি শাশ্বত বঙ্গের উন্নতির জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তবে শাশ্বত বঙ্গ মানে অখন্ড বঙ্গ নয়, ওদুদের কাছে বাঙালি জাতীয়তা ছিল ভারতীয় জাতীয়তার পরিপূরক। তিনি দেশভাগের রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিলেও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগকে সমর্থন করেননি। কাজী আবদুল ওদুদের জীবন ও কর্ম অনুধ্যান সূত্রে জীবনীলেখক ও শিষ্য আবদুল কাদিরের মনে হয়েছিল ওদুদ ‘বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম ভাবুক ও চিন্তাবিদ’ – এ-অভিমত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়সহ সমকালের পন্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তবে ওদুদ-মানস সম্পর্কে আবদুল কাদির-রচিত জীবনীগ্রন্থ ‘কাজী আবদুল ওদুদে’র পরিশিষ্টে সংযোজিত অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘কাজী আবদুল ওদুদ প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে যে-মন্তব্য আছে, তাতে তাঁর জীবনদর্শনের সূত্রসমূহ চিহ্নিত হয়েছে।

কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন জাতিতে ভারতীয়, ভাষায় বাঙালি, ধর্মে মুসলমান, জীবনদর্শনে মানবিকবাদী, মতবাদে রামমোহনপন্থী, সাহিত্যে গ্যেটে ও রবীন্দ্রপন্থী, রাজনীতিতে গান্ধী ও নেহরুপন্থী, অর্থনৈতিক শ্রেণিবিচারে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক, সামাজিক ধ্যানধারণায় ভিক্টোরিয়ান লিবারল। কোনোরূপ চরমপন্থায় তাঁর বিশ্বাস ছিল না। … ইংরেজিতে থাকে বলে ওয়ার্ মথ্।

কাজী আবদুল ওদুদ উনিশ শতকের বাংলার জাগরণের ভাবাদর্শ বিশ্লেষণ করেছেন। গণজাগরণের প্রশ্নে তিনি রেনেসাঁসকে ‘অতিকথা’ বলে অস্বীকার না করে বরং রেনেসাঁসকে অঙ্গীকারকল্পে অবরোহী পদ্ধতিতে ঘটনাক্রম ও ভাবধারার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের ব্রত গ্রহণ করেছেন। নবজাগরণের ইতিবাচক লক্ষণসমূহ আলোচনা করলেও তিনি সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্র সন্ধান করেননি। এ-কারণেই আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বাস্তবভিত্তিক উপাদান আলোচিত হয়নি। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্রের সংস্কারধর্মী চিন্তার বর্ণনা দিলেও তাদের শিক্ষাচিন্তা, ভাষাচিন্তা ও সাহিত্যিক অবদানের প্রসঙ্গ ওদুদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে গেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে বনেদি জমিদার বিলুপ্ত হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের বাড়তি পুঁজি জমিতে বিনিয়োগের ফলে নতুন জমিদারের সৃষ্টি হয়। এরা প্রজাহিতৈষী নয় বরং প্রজাপীড়নকারী। তিনি প্রসঙ্গটির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় প্রণীত গণবিরোধী আইন-কানুন জনমানসে ভীতি ও অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। তিনি নীল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করলেও বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করেননি। তবে বাংলার জাগরণ কেবল বাঙালি হিন্দু সমাজের জাগরণ ছিল না, তা বাঙালি মুসলমান সমাজেও সঞ্চারিত হয়েছিল। তিনি রেনেসাঁসের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বাংলার জাগরণে ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালির সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন।

বাংলার জাগরণ মূল্যায়নে উদার জাতীয়তাবাদী আলোচনা, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী পর্যালোচনা এবং মার্কসবাদীদের সমালোচনা সৃষ্টি করেছে সংশয় ও বিভ্রান্তির। ওদুদের বাংলার জাগরণ গ্রন্থটি              যে-কারণে ইতিহাসদৃষ্টির সমগ্রতা অর্জন করেনি, একই কারণে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী কিংবা মার্কসবাদীদের ইতিহাসদৃষ্টিও খন্ডিত। মার্কসবাদী সমালোচকরা যখন রেনেসাঁসের অমিত সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে উনিশ শতকেই রেনেসাঁসের সীমা নির্দেশ করেন, তখন ওদুদ বিশ শতকে রাজনৈতিক কারণে এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বিধ্বস্ত রেনেসাঁসের বাস্তবতা উপলব্ধি করেন। তবে তিনি বিপর্যস্ত ও উদ্যমহীন না হয়ে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ (১৯২৬) গঠনের মাধ্যমে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূচনা করেন। শিখাগোষ্ঠীর উদারমানবিক চেতনা নিভৃতে ক্রিয়াশীল থেকে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় চেতনার উদ্বোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওদুদ বাংলাদেশের অভ্যুদয় দেখে যেতে পারেননি। তবে রেনেসাঁসের অনিঃশেষ সম্ভাবনার ক্ষেত্র প্রস্ত্ততে তাঁর অবদান উজ্জ্বল ও অনতিক্রম্য।

ঐতিহ্যপন্থী বাঙালি মুসলিম চিন্তাবিদরা ছিলেন শরীয়তপন্থী। ইসলামের মূল বিষয়ের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। আচারপরায়ণতা, অতীত ঐতিহ্য অনুধ্যানে পুনঃজাগরণ, ধর্মসংঘবাদ মূলত ঐতিহ্য অনুসারী ধর্মচিন্তার নানামুখী প্রকাশ। মওলানা আকরম খাঁ বাঙালি মুসলমান সমাজে এই চিন্তাস্রোতের কেন্দ্রীয় পুরুষ। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ লেখকের লেখনীর মাধ্যমে এ-ভাবধারা পরিপুষ্ট হয়। সাংগঠনিকভাবে ঐতিহ্যপন্থীদের চিন্তা প্রকাশ করেছে মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক আজাদ, দৈনিক ছোলতান প্রভৃতি পত্রিকা।

উদারনৈতিক মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে প্রচলিত কুসংস্কার এবং গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। এই উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বাঙালির আত্মশনাক্তি আগে, নাকি মুসলমান হিসেবে আত্মপরিচয় আগে – এ-প্রশ্নে দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত ছিলেন। বাঙালির উদার মানবতাবাদী চেতনার উৎস হিসেবে এঁরা রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়ন করেননি। বাঙালি মুসলমান হিসেবে তাঁরা ইসলামের সাম্য ও মৈত্রী চেতনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। শান্তির প্রচেষ্টা ও ত্যাগ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আত্মনিবেদন কিংবা আত্মসমর্পণ ইসলামের প্রধান তাৎপর্য বলে উল্লেখ করে, উদারপন্থীরা ধার্মিকতা বলতে সত্যের সাধনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। উদারপন্থী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের রচনায় পরোভাবে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের প্রসঙ্গ ছিল। তাঁরা পাশ্চাত্যের আধুনিকতার জন্য ইসলামের অবদান, সচেতনভাবেই উল্লেখ করেছেন। তবে ঐতিহ্যপন্থীদের মতো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য, উদারপন্থী মুসলিম বুদ্ধিজীবী বাঙালি মুসলমানের আত্মস্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ে মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহী ছিলেন না। উদারপন্থী বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, এস. ওয়াজেদ আলি, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, এয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ।

উদারপন্থী মুসলিম বুদ্ধিজীবীর ধর্মনিরপেক্ষ জীবনদৃষ্টির  ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত অবস্থানকে কাজী আবদুল ওদুদ সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। রামমোহনের যুক্তিবাদ, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা, তাঁকে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী হতে উৎসাহিত করেছে। ওদুদ ধর্মের অনুশাসন ও শাস্ত্রকে যুক্তির আলোতে বিবেচনা করে, বাঙালি মুসলমানের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। ওদুদের ব্যাখ্যাত ‘সৃষ্টিধর্ম’ ছিল মূলত বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানকে সমন্বয়ধর্মী সামঞ্জস্যসূত্রে আবদ্ধ করার পথনির্দেশ। ওদুদ চিঠিপত্র, প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমেই কেবল ঐতিহ্যপন্থী ও উদারপন্থী মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের মতাদর্শের জবাব দেননি। সাংগঠনিকভাবে শিখা পত্রিকার মাধ্যমে যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের চিন্তা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের সহযাত্রী ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল। বিবেকবান বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব পালনের কারণেই কাজী আবদুল ওদুদ বাঙালি মুসলমান সমাজে অনুসরণীয় চিন্তানায়ক হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply