বুনো বিলাস

লেখক:

হামিদ কায়সার

বাসর রাতেই হোঁচটটা খেয়েছিল শায়লা, জগলুলের মধ্যে অস্বাভাবিকত্বের একটা ক্ষীণ স্ফুরণ চোখে পড়েছিল ওর। কিন্তু এটা যে এতোটা প্রকট অথবা একসময় এতো সমস্যার কারণ হয়ে উঠবে, ধারণা ছিল না সামান্যও। ভেবেছিল এ বুঝি নিছক খেয়াল। বাসরঘরে ওদের দুজনকে রেখে সবাই যখন বেরিয়ে গেল, ও প্রথামতো পা ছুঁয়ে সালাম করে স্বামীর সামনে দাঁড়াতেই, জগলুল ওকে বিছানায় বসার আহবান করেছিল। বসার পর ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো অনেকক্ষণ, বড় নিস্পৃহ আর ভাষাহীন সে-দৃষ্টি। নেই মুগ্ধতা কিংবা মুখরতা কিছুই। বেশ কিছুক্ষণ পর, ওকে অবাক করে দিয়ে বললো, বেনারসি ছেড়ে নার্সের ড্রেস পরতে। প্রথমে বলেছিল বিনয় করেই, পরে বেশ জোর দিয়ে। ওর কথা শুনে শায়লা এতটাই হকচকিত হয়ে পড়েছিল যে, অনেকক্ষণ কী করবে না করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। জগলুল পাত্তা দিলো না ওর এই বিবমিষাটুকুকেও, আবারো আবদার, ‘আজ আমি এই বিশেষ রাতে তোমাকে ওই শুভ্রসাদা ড্রেসেই দেখতে চাই, প্লিজ শায়লা, রাখবে আমার কথা?’ তখন ওর অবাক হওয়ার পালা অনেকটাই ঘুচে গেছে। উলটো জানতে চাইলো, ‘কেন, বলো তো!’

অনেকক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত জগলুল, বলবে না বলবে না করেও শেষে মুখ খুলেছিল, ‘তোমাকে আমি ঠিক খুঁজে পাচ্ছি না।’ চমকে গিয়েছিল ওর কথা শুনে। আড়মোড়া ভেঙে তাকিয়েছিল ওর চোখের দিকে। শায়লার চোখের সে-ভাষা দেখেই কিনা জগলুলের মুখে ফুটে উঠেছিল প্রসন্নতা, ‘তুমি মনে হয় ভয় পেয়ে গেলে?’ শায়লার স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ার চেষ্টা, ‘না, না। ভয় পাবো কেন?’ তারপর ঢোক গিলে জানতে চাইলো, ‘তোমার ভালো লাগছে না?’

‘আমি কি সে-কথা বলেছি? আসলে তোমাকে আমি প্রথম দিন যেভাবে দেখেছিলাম, ঠিক সেভাবেই দেখতে ইচ্ছে করছে। ভীষণভাবে ইচ্ছে করছে। কী করবো, বলো?’ কথা শুনে হেসে উঠেছিল শায়লা, ‘কী পাগল! এখন আমি ও-ড্রেস কোথায় পাবো!’

‘ব্যবস্থা করা যায় না? কোনোভাবে?’

বড় বিপন্ন চোখে ওর দিকে তাকিয়েছিল শায়লা। কী উত্তর দেবে মাথায় আসছিল না। ওই ড্রেসটা আজকেই পরতে হবে! কী ক্রেজি রে বাবা! এখন এই রাত একটার সময় কীভাবে ব্যবস্থা করবে! এটা কি সম্ভব? বিয়েটা যদিও হয়েছে শান্তিনগরের আনন্দ সেন্টারে, কিন্তু ও থাকে গ্রিন রোডের আরোগ্য নিকেতন হসপিটালের নার্সিং হোস্টেলে। এতো রাতে এখন বাসর ফেলে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে সেখানে যাবে নার্সিং ড্রেস আনতে? পাগল বলবে সবাই! অসহায় গলায় শুধু বলেছিল, ‘এতো রাতে…!’

‘তোমাকে আমি ঠিক খুঁজে পাচ্ছি না।’ বিড়বিড় করতে করতে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়েছিল জগলুল। সারা ঘর পায়চারি করছিল অস্থিরভাবে। আর শায়লা বিছানায় নিজের ভেতর নিজে আরো গুটিয়ে যাচ্ছিল। অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকে কেবলই খাবি-খাচ্ছিল। যে-মানুষ বাসররাতে এমন কাঠখোট্টা হতে পারে, এতোটা নির্মম রসকষহীন হতে পারে, তার সঙ্গে সারাটা জীবন এক বিছানায় কাটাবে কীভাবে! অথচ এ-মানুষটিকে ঘিরে কতো স্বপ্ন আর কল্পনার মালা-ই না গেঁথেছিল রোজ। জগলুল ওর ড্রাগ বিজনেসটাকে বাড়াবে। ও একসময় আর নার্সিংগিরি করবে না। সংসারের হাল ধরবে। ছেলেপুলে মানুষ করবে। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবে! হায় রে স্বপ্ন! এখন বাসররাতের ভ্রমণটাই তো আটকে আছে নার্সিং ড্রেসের ভেতর। একবার ইচ্ছে করছিল উঠে দাঁড়িয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেসব ভালো ভালো কথা ওকে মনে করিয়ে দেয়। আশা ও প্রতিশ্রুতির কথা, যা ওকে শুনিয়েছিল বিয়ের আগে দিনের পর দিন – রাতের পর রাতে, মোবাইলে।  তাহলে কি ওসব শুধু কথার কথা! তখন কিন্তু এরকম  মনে হয়নি। মনে হওয়ার কথাও নয়। জগলুলের সঙ্গে ওর পরিচয়টা হয়েছিল হসপিটালে। একটা মাইল্ড স্ট্রোক নিয়ে আরোগ্য নিকেতনে এসেছিল। অল্পবয়স্ক মানুষ! কত আর বয়স হবে তখন! পঁয়ত্রিশ কি চল্লিশ। দেখতেও তেমন খারাপ নয়। হসপিটালের বেডে ঠিক মানাচ্ছিল না। শায়লার যেমন দায়িত্ব, সেভাবেই মানুষটার সেবা করেছে, আর সেবা দেওয়ার সময় ওর যা হয়, কোনো ভেদ থাকে না, গভীর নিমগ্নতায় মিশে যাওয়া, জগলুলের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল তাই। আর ওর সে-সেবাকেই কী যে মনে করেছিল জগলুল, সুস্থ হয়ে ফেরার সময়ও তার রেশ বয়ে নিয়ে গেল। কোনো এক আত্মীয়কে দিয়ে কিনিয়ে মোবাইল ফোনের সেট গিফট করলো শায়লাকে, ফোন নাম্বারটাও নিলো। নিলোই বটে ফোন নাম্বার, কিন্তু ফোন আর করে না। করে না তো করেই না, হঠাৎ একদিন ওকে চমকে দিয়ে এলো বার্থ ডে-র উইশ। এমন সুন্দর ছিল সে-উইশ, এতো গভীর তার কথাবার্তা। অদ্ভুত এক ভালো লাগার আনন্দে ও বেশ কদিন বুঁদ হয়েছিল। না, উইশ করার পেছনে লোকটার কোনো মতলববাজি ছিল না, এটা বুঝতে খুব বেশি দেরি হয়নি। উইশের উত্তর দিতে গিয়ে ও সাধারণ সৌজন্য দেখিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে মেসেজ দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার পিঠে আর নতুন কোনো মেসেজ পাঠায়নি জগলুল।

এর পরের জন্মদিনেও এলো মেসেজ, এর পরের জন্মদিনেও। লোকটা কী করে মনে রাখে জন্মদিনের তারিখটা? সারাবছরই কি ওর কথা ভেবে রাখে নাকি। এমনই একটা প্রশ্নের ইঙ্গিত জানিয়ে থ্যাংকস মেসেজ দিতেই ও উত্তর দিয়েছিল, ‘সারাবছর নয়, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তেই আপনাকে আমি মনে রাখি। আমি যদি নিজেকে আপনার যোগ্য মনে করতাম, আমার ঘরে আপনাকে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখতাম; কিন্তু সে-যোগ্যতা কি আমার আছে?’ ইঙ্গিত বুঝতে কষ্ট হয়নি শায়লার। ও এ-কথার কী উত্তর দেবে, ভাবতে ভাবতেই চলে গিয়েছিল বেশকটা দিন। কিন্তু উত্তর না দেওয়াতেও একটা অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করছিল মনের ভেতর। ওদিকে মানুষটার অধীরতা বেড়ে যাচ্ছিল। অনেকদিন পর ওর আরেকটা মেসেজ এলো, ‘আপনার হ্যাঁ কি না – কিছুই জানা হলো না।’ শায়লা সংকোচ তাড়িয়ে শেষে আমন্ত্রণটা দিয়েই ফেললো, ‘আমরা কি সামনাসামনি কথা বলতে পারি?’ শায়লা ততদিনে সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার নিয়ে ফেলেছে। ওর জীবনও হয়ে উঠেছিল একঘেয়ে এবং ক্লান্তিকর। স্ট্রাগল আর ভালো লাগছিল না। বিশেষ করে লোকটাকে যেহেতু মনে হচ্ছিল সৎ এবং ভালোবাসায় বিশ্বস্ত, তাছাড়া ব্যবসায়ও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত, আর দ্বিধা কেন?

শায়লার দিক থেকে সাড়া পেয়ে জগলুল মেসেজ দিয়ে জানিয়েছিল কোন চিনে রেস্তোরাঁয় কখন ও দেখা করতে চায়। শায়লা অবশ্য চিনে রেস্তোরাঁয় যেতে রাজি হলো না। বললো, আরোগ্য নিকেতনের ক্যান্টিনেই কথা বলা যাবে। আরোগ্য নিকেতনের ক্যান্টিনেই এসেছিল জগলুল এবং এটা সত্য যে, হসপিটালে প্রথম দেখা হওয়ার পর দুজনের আবার হসপিটালেই দেখা হয়েছিল এবং সেদিনও শায়লার গায়ে ছিল নার্সিং ড্রেস। খুব বেশি ভূমিকা নেয়নি জগলুল, শুধু বলেছিল, ছোটবেলায় আমার মায়ের মৃত্যুর পরই আমি ডিসিশন নিয়েছিলাম জীবনে কখনো বিয়ে করবো না। আজো আমার সে-লক্ষ্যেই আছি। সত্যি বলতে কী, হসপিটালে আপনাকে দেখার পর থেকেই আমার সেই প্রতিজ্ঞা নড়েচড়ে উঠেছে। কিন্তু আমার কোনো গার্জেন নেই বলে নিজেকেই বলতে হচ্ছে। আমি এখন ঘরসংসার করতে চাই।’ লজ্জা-সংকোচের মাথা খেয়ে শায়লা নিচের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে শুধু বলেছিল, ‘করেন। বাধা তো নেই।’ সেদিন সেই ক্যান্টিনে বসেই দুজন বিয়ের সিদ্ধান্তটা চূড়ান্তভাবে নিয়ে নিল। এক্ষেত্রে সুবিধাটা ছিল, শায়লার গার্জেনও যেমন ও নিজে, জগলুলেরও তেমন মাথার ওপর কেউ নেই। এরপর শুরু হলো জগলুলের স্বপ্ন-বুনুনি। এই যে আরোগ্য নিকেতনের ক্যান্টিনের মিটিংয়ের দিন থেকে বিয়ের দিন পর্যন্ত – কত ফোন আর কত যে মেসেজ ওর, তার কোনো শেষ নেই। স্বপ্ন-উচ্ছ্বাস-আনন্দ-আশা-ভবিষ্যৎ কত কিছু!

কোথায় গেল সে-সব আজ! বাসররাতেই ফুট্টুস! তাহলে কি অন্ধকার সুড়ঙ্গেই কাটাতে হবে বাকি জীবন? ভেতরের উদ্বেগ লুকিয়ে শায়লা উঠে দাঁড়াল। উদ্ভ্রান্তের মতো পায়চারিরত জগলুলের সামনে দাঁড়িয়ে ওর চোখের দিকে তাকাল গভীরভাবে, ‘কী খুঁজে পাচ্ছো না তুমি! দেখো তো ভালো করে?’ শায়লার চোখে চোখ রাখলো জগলুল। ওর চোখে এ-মুহূর্তে কিছুই চোখে পড়লো না, উপেক্ষাও করতে পারলো না দৃষ্টির সে-গভীরতাকে। জগলুলকে হাত ধরে টেনে নিয়ে আবারো বিছানায় বসালো শায়লা, ‘বলো কী খুঁজে পাচ্ছো না?’ ‘আমি বলতে পারবো না, শায়লা! সে-ভাষা আমার জানা নেই।’ কেমন অসহায়ের মতো লাগছিল ওর কণ্ঠ। ‘আমার সাজাটা তোমার পছন্দ হয়নি?’ জানতে চেয়েছিল শায়লা। ‘না না। ভালোই তো।’ বড় ভাসা-ভাসা একটা মন্তব্য জগলুলের। ‘উহু। ভালো করে দেখো। তুমি তো আমাকে দেখছোই না!’ ভালো করেই তাকায় জগলুল, ওর চোখে তেমন মুগ্ধতার কারুকার্য ফুটে ওঠে না। কেমন নিরাকার নির্মোহ দৃষ্টি। শায়লা পরনের বেনারসি দেখিয়ে বলল, ‘এটা পরতে কতক্ষণ লেগেছে, জানো?’

‘জানি। প্রায় তিন ঘণ্টার মতো ছিলে বিউটি পার্লারে।’

‘শাড়িটা পরতে কতক্ষণ লেগেছে, সেটা জানো?’

‘দশ মিনিট, পনেরো মিনিট? আধা ঘণ্টা?’

‘তার বেশিও হতে পারে।’

জগলুল মৃদু হেসে উঠেছিল শুধু। শায়লা সহজে ছাড়লো না, ‘এই কষ্টটা আমি কেন করেছি? কার জন্য?’

‘কার জন্য?’

‘জানো না কার জন্য?’

‘আমার জন্য না বিয়ের জন্য?’

রাগের কৃত্রিম ভঙ্গি শায়লার, ওর হাতটা গাঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরলো জগলুল, ‘আমি জানি আমার জন্যই শাড়িটা পরেছো তুমি। সবাই তাই পরে। এটাই নিয়ম। এ-রাতে মেয়েরা শ্রেষ্ঠ সাজটাই নিতে চায়। তুমিও নিয়েছো। আর আমিও তোমাকে দেখেছি, দেখে চোখ সার্থক হয়েছে। হ্যাঁ, সত্যি।’

‘এই তার নমুনা? তুমি আমাকে খুঁজে পাচ্ছো না! আমাকে নার্সের ড্রেস পরতে বলছো!’

চুপচাপ বসে রইল জগলুল। শায়লা ওকে খুঁটিয়ে দেখছিল, এ কেমন পাগল বর জুটলো ওর কপালে! পাগল নয়তো কী। ওর ভেতর থেকে উটকো হাসি বিপুলবেগে ঠেলে ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। কিছুতেই সে-হাসি সামলানো গেল না। হাসতে হাসতেই জানতে চাইলো, ‘আচ্ছা। তোমার এমন অদ্ভুত খেয়াল কেন হলো, বলো তো?

অসহায় আত্মসমর্পণ জগলুলের, ‘জানি না। আমি জানি না।’ সেই একই রকম নিস্পৃহ ভঙ্গি। আরো অনেকক্ষণ ওকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করলো শায়লা, এসো বলে ঠোঁটও বাড়িয়ে দিলো। সে-ঠোঁটে নিজের ঠোঁট স্পর্শও করলো জগলুল। কিন্তু বড় ঠান্ডা আর আবেগশূন্য সে-চুম্বন। শেষে হাল ছেড়ে শায়লা জগলুলের উলটো দিকে ফিরে সেই বেনারসি পরেই শুয়ে পড়েছিল। চোখে পানি চলে এসেছিল ওর। কত যত্ন করে বিউটি পার্লারের মেয়েটা সাজালো, কত সময় নিয়ে! কার জন্য এসব? কার জন্য? সাজটা যে খারাপ হয়েছিল, তাও নয়। নিজেকে ও মুগ্ধ চোখে বারবারই দেখছিল। অন্যরাও প্রশংসা করছিল সে-সাজের। বারবারই আয়নায় ও নিজেকে দেখেছে। কেমন স্বপ্নময় এক জগতের মানুষ মনে হয়েছে। কেন মানুষটা এভাবে সেই স্বপ্নটা ভেঙে দিতে চাইছে? অন্তত ভোর পর্যন্ত তো ধরে রাখা যেত এই ভালোবাসার ঘোর! কী যে অসহায় লেগেছিল তখন! জগলুলকে মনে হয়েছিল স্বার্থপর। যার কাছে ওর সাজসজ্জা অভিরুচির সামান্যও মূল্য নেই। স্বৈরাচারের মতো নিজের পছন্দের ব্যাপারটি চাপিয়ে দিয়ে খালাস! ক্লেশে ভুগে ভুগে কখন ওর ঘুম লেগে গিয়েছিল চোখে, বলতে পারবে না। খাটের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকতে থাকতে একসময় জগলুলের চোখেও নেমে এসেছিল ঘুমের ঘোর। শায়লাকে জড়িয়ে ধরে ও-ও ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর ডাকেনি।

বিয়ের পরের সারাটা দিন যেন ইচ্ছে করেই জগলুলের কাছ থেকে দূরে দূরে রইলো শায়লা। বাসায় চার পাঁচজন আত্মীয় ছিল, তাদের সঙ্গে কাটিয়েছে। আত্মীয়দেরই একজন রান্না সামলেছে। তাকেও সময় দিয়েছে। তারপর, এক ফাঁকে হসপিটালের কথা বলে হোস্টেল থেকেও ঘুরে এসেছে। জগলুলেরও সারাদিন কেটেছে ব্যস্ততায়। বাসার হাঙ্গামাতো সামলেছেই, অফিসেও কাটিয়ে এসেছে অনেকটা সময়। তারপর সন্ধ্যা থেকে বসেছিল ড্রয়িংরুমে টিভি দেখায়। রাত দশটার পরই বাসায় নেমে এসেছিল সীমাহীন নির্জনতা। আত্মীয়স্বজনও সবাই চলে গিয়েছিল যে যার মতো। রাত একটু ঘন হতেই শায়লা ধবধবে সাদা নার্সের সালোয়ার-কামিজ আর মাথার স্কার্ফ পরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল জগলুলের।

জগলুল ওকে এক মুহূর্তের জন্যই দেখে নিয়ে বিছানা ছাড়লো। ঘরের সবকটা লাইট জ্বালিয়ে দিলো। এমনকি ডিম লাইট পর্যন্ত – যেন দিনের একটা আবহ তৈরির চেষ্টা ওর। তারপর ফিরে এসে বিছানায় শায়লার দিকে তাকালো মনোযোগী চোখে। শায়লার মনে তখনও ধুকপুকি ভয়। পাগলটার মনে আবার কী ভাব আসে না আসে, কে জানে! হয়তো ভালোই লাগলো না, সোজা বলে দিলো, মানে মানে কেটে পড়ো! এ লোককে দিয়ে তো কিছুই অসম্ভব নয়।

না, ঠিক তা হলো না। সেই যে মুগ্ধ চোখে তাকাল জগলুল, একধ্যানে তাকিয়েই রইলো। হ্যাঁ, এই সেই মুখ, যা ওর হারানো জীবনের তৃষ্ণাকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছিল। হসপিটালে ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে আসার পর এ-মুখ দেখেই, ওর জীবনের সব দোলদোলানো আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন ফিরে এসেছিল। মনে হয়েছিল এ-মুখ দেখার জন্যই তো একটা জীবন পার করে দেওয়া যায়। এইতো সেই কমলার কোয়ার মতো টসটসে রসালো ঠোঁট, গভীর রহস্য-মোড়ানো সেই দুটি কাজল চোখ। কী তীক্ষ্ণ ধারালো ওর চেহারা! পাহাড়ের নীল আহবানের সঙ্গে যেখানে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিময় কামনার কুন্ড লুকিয়ে আছে, যা জেগে উঠতে পারে যে-কোনো সময়। চোখ ওর ফিরছিলই না। ততক্ষণে নিজের রাগ উষ্মা অনেকটাই মিলিয়ে গিয়েছিল শায়লার। এতক্ষণে মনে হচ্ছিল সত্যিই এটা জীবনের এক শ্রেষ্ঠ রাত, যা মদালসে ভরা আর স্বপ্নময় এবং মুহূর্তেই এ-রাতটিকে কীভাবে আরো বাঙ্ময়ী করে তোলা যায় – সেই ব্যাকুলতা যখন তীব্রতর হতে শুরু করলো, ঠিক তখনই গভীর আকুলতায় কাছে টেনে এনে ওর টসটসে ঠোঁটে, কমলার কোয়ার মতো টসটসে রসালো ঠোঁটে গাঢ় গভীর চুম্বন বুলিয়ে দিয়েছিল। বড় গভীর এক নিঃশ্বাস থেকে তাপ এসে দুজনকেই কী এক সুখের আবিষ্টে বুঁদ করে রেখেছিল অনেকক্ষণ।

এরপরই যা করেছিল জগলুল, তা অস্বাভাবিক তো বটেই হকচকিয়ে দেওয়ার মতো। চুম্বন থেকে বিযুক্ত হয়েই শায়লার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। হতভম্ব শায়লা খানিকটা বিহবল। পুরুষমানুষ কখনো এমন করে কাঁদে! কাঁদতে পারে! তাও আবার বাসররাতে? যখন আনন্দ-ভালোবাসায় উত্তাল হবার কথা, জড়িয়ে ধরবার কথা, সোহাগ করবার কথা। কান্না সামলাতে পারছিল না মানুষটা। বেদনার উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসতে ভাসতেই বলছিল, ‘সেদিন হাসপাতালে তোমার সেবা না পেলে আমি মরেই যেতাম। বাঁচতাম না আমি। কিছুতেই বাঁচতাম না।’ যেন এক অবোধ শিশুকে বুঝ দেওয়ার মতোই, ও বলছিল, ‘আমি আর কী  করেছি তোমার জন্যে।’ ‘সে তুমি বুঝবে না, বুঝবে না শায়লা। তোমার বোঝার কথাও না।’ তারপর নিজেকে সামলানোর চেষ্টা ওর, যেন এতক্ষণে বোধ ফিরেছে যে, এভাবে বাসররাতে বউকে হকচকিয়ে দেওয়াটা কোনো কাজের কথা নয়, চোখমুখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা। আর তা করতে গিয়ে উলটো খুলে দিয়েছিল মনের ঝাঁপি, ‘ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর প্রেম ভালোবাসা এসব কী জিনিস আমি বলতে পারবো না। কী যে নিষ্ঠুরতা গেছে আমার জীবনের ওপর দিয়ে, তুমি তা কল্পনাও করতে পারবা না। মায়ের মৃত্যুর ঘটনাটাই তো চরম এক নিষ্ঠুরতা। যদিও আমার বাপ-চাচা-ফুফুসহ আমার দাদা-দাদি সবাই আমার মায়ের মৃত্যুটাকে একটা নিছক অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু আসলে সেটা ছিল ঠান্ডামাথার খুন, আমি সেটা সেই শৈশবেই বুঝেছিলাম। ওরা টাকা-পয়সা দিয়ে থানাপুলিশ কিনেছে, পত্রিকার মুখও বন্ধ করতে পেরেছে, কিন্তু আমার শিশুমনে যে-ধিকিধিকি আগুন জ্বলতে শুরু করেছিল, যতই আমি বড় হতে লাগলাম সেই আগুনের শিখা ক্রমশ বেড়েই যেতে লাগলো। জানো শায়লা, আমার বাবার ফ্যামিলি যেমন এক সেকেন্ডের জন্যও আমার মাকে মেনে নিতে পারেনি, আমাকেও দুচোখে কেউ দেখতে পারতো না। সহ্য করতে পারতো না। এমনকি আমার বাবাও না। তুমি জানতে চাইছো না, কেন আমাকে আমার মাকে এতো হীন করে দেখতো ওরা?’

শায়লা ওর দুঠোঁটের মাঝখানে আঙুল ধরে রেখে বলছিল, ‘থাক। যা ভাবলে তোমার কষ্ট হয়, তেমন কথা বলার দরকার নেই।’ ‘আমার জীবনে তেমন কোনো ভালো স্মৃতি নেই যে বলবো। তোমার হয়তো শুনতে ভালো লাগছে না। কিন্তু তোমাকে না বললে যে আমার শান্তি নেই।’ আরো অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিল শায়লা, ‘বলো, আজ আমি তোমার সব কথা শুনবো।’ ‘আমার বাবা-মায়ের বিয়েটাকে বাবাসহ আমার বাবার ফ্যামিলির কেউই মেনে নিতে পারেনি। সবাই মনে করতো এটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। মায়ের আর তার ফ্যামিলির ষড়যন্ত্র। নাম বলো, বংশ বলো, অর্থ বলো কোনোদিক দিয়েই আমার মায়ের ফ্যামিলিটা বাবার ফ্যামিলির সমান ছিল না। সেজন্য এক পক্ষের যেমন দম্ভ ছিল, অন্যপক্ষের ছিল হীনম্মন্যতা। তবু দুই ফ্যামিলির মধ্যে সম্পর্কটা  কীভাবে হয়েছিল সেটার পেছনেও আছে কুৎসিত কিছু ঘটনা।

আমার বাবা বদরুল আলম প্রথম জীবনে ছিলেন দুর্দান্ত এক প্লেবয়। বাগানের সেই প্রজাপতি, যে পছন্দ করতো উড়ে-উড়ে ফুলে-ফুলে ঘুরে বেড়াতে। আমার মাও হয়েছিলেন তার শিকার, আর আমি তাদের সেই আবেগের ফসল, আমাকে আনস্পেক্টলি পেটে ধরার পর মা বাবাকে তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে চাইলেন, কিছুতেই পেটের সন্তান নষ্ট করতে রাজি হলেন না। হয়তো আমাকে বাঁচিয়ে রাখতেই মা বিয়ের জাল ফেলেছিলেন। আর বাবাও বন্দি হয়েছিলেন সে-জালে। নিরুপায় হয়েই বিয়ে করেছিলেন মাকে। কিন্তু মন থেকে কখনো স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেননি, দিতে পারেননি। মা ভেবেছিলেন আমার জন্মের পর সব ঠিক হয়ে যাবে, হলো তার উলটো। আমি আর আমার মা, বাবাসহ ওদের ফ্যামিলির সবার দুচোখের বিষ হয়ে উঠলাম। উঠতে-বসতে-শুতে ওরা সবাই আমাদেরকে জ্বালাতো। মাকে যেন সহ্যই করতে পারতো না দুচোখে। রান্নাঘরে মায়ের শরীরে আগুন লাগার ঘটনাটা আমার কাছে সবসময়ই রহস্য থেকে গেছে, যা আর কখনো উন্মোচন হবে না। আর হলেই বা কী, মাকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে। মা চলে যাওয়ার পর আমার জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। কী যে অসহনীয় অত্যাচারই না আমাকে সহ্য করতে হয়েছে, বেড়ে উঠতে হয়েছে কী দুর্বহ অবহেলা আর বঞ্চনা নিয়ে, সেসব বলে তোমাকে আর শেষ করতে পারবো না।

আববা আমাকে মারতো, শুধু শুধুই মারতো, চাচু মারতো ফুফু মারতো… মারতে মারতে মারতে মারতে… কথা শেষ করতে পারেনি জগলুল। ওর হু-হু সেই কান্না ঠাঁই খুঁজে নিয়েছিল শায়লার বুকে… ‘এতটুকু কারো অনুকম্পা পাইনি… সহানুভূতি, স্নেহ, আদর – সামান্য। কুকুর-বেড়ালের মতোই মানুষ হয়েছি। বাড়িতে একটা কুকুর-বেড়াল থাকলে যেভাবে বাঁচে, আমিও ঠিক তাই… আমার ঊনচল্লিশ বছরের জীবনটা এভাবেই কেটেছে… শেষ পর্যন্ত আমার হার্টটা আর নিতে পারেনি না। আরোগ্য নিকেতনে গেলাম। তোমার সঙ্গে দেখা হলো। তোমার সেবা… আর তুমি যে কী অকৃত্রিম… আমি সেই তোমাকেই আজ চেয়েছিলাম, বউ নয় বেনারসি নয়… সেই তোমাকে, যে আমার ঘুম ভাঙিয়েছে, আমাকে জাগিয়েছে, নতুন করে জন্ম দিয়েছে…।’

সেদিন, সেই তখনই শায়লা বুঝে নিয়েছে, স্বামীর সংসার করার সঙ্গে সঙ্গে ওকে এক শিশুকেও লালন করতে হবে। এক অবোধ শিশুর জন্য ভেতরে ভেতরে সহানুভূতির জায়গায় কী তীব্র এক মায়াবোধ সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। আর যতই তা গাঢ় হচ্ছিল, নিজের প্রতিও যেন জেগে উঠছিল একটু একটু করে ঘৃণা। শুভ্রসাদা এই নার্সের ড্রেসের ভেতরেই যে সূক্ষ্ম একটা কালো দাগ লেগে আছে, তা বড় প্রকট হয়ে উঠছিল। সেদিন সেই বাসররাতে শায়লা ভাবনাটাকে তেমন পাত্তা দিতে চায়নি, ভুলে থাকতে চেয়েছে আর ভেবেছে এই বোধ সাময়িক, সকাল হলেই কেটে যাবে। রাতের অন্ধকারের সঙ্গে মিলিয়ে যাবে সেই গ্লানি। না কাটেনি, হয়তো কেটে যেতো, হয়তো ভুলে থাকতে পারতো ও আর দশটা স্বাভাবিক ঘটনার মতোই। কিন্তু সেটা যেন খুঁড়ে খুঁড়ে জগলুলই জাগিয়ে তুলছিল। কী বলবে জগলুলের এ-ব্যাপারটাকে – পারভারশন, বিকৃতি? তা নয়তো কী! পরের রাতেও জগলুল একই কান্ড ঘটালো, যখন ঘুমিয়ে পড়বার সময় হলো, রাত পেঁছাল নিভৃতিতে, আবারো ওর সকাতরতা, ওই সাদাশুভ্র ড্রেসটা পরতে হবে। ও-ড্রেসটা না পরলে নাকি শায়লাকে সেক্সি লাগে না, ওর প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করে না, ওর ভেতরে জাগে না কাম-স্পৃহা। এটা কোনো কথা হলো! বড়ো আজব লাগছিল ওকে। শায়লা চেষ্টাও করেছিল নার্সের ড্রেস ছাড়াও কামনার সেই জগতে পরিভ্রমণ করা যায় কিনা। ওর সে-চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নাছোড়ের মতো জগলুল ওকে নার্সের ড্রেসটা পরিয়েই ছেড়েছে। আর মুহূর্তেই বিম্ববর্তী হয়ে উঠেছে শায়লা। ওর সাধারণ ঠোঁট দুটিই ফুলে ফুলে কমলার কোয়ার মতো রসালো টসটসে হয়ে উঠেছে, কামনায় অধর সিক্ত হয়ে উঠেছে, চোখে কোথা থেকে ছুটে এসেছে রহস্যের কাজলবিভা, শরীরে শুরু হয়েছে বসন্তের বুনো গান। আর সেই সুরে মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে জগলুল। পাগলের মতো আদরে আদরে ওকে করে তুলেছে বিবশ।

তার পরের দিনও চললো একই কান্ড, তারও পরের দিন। আর যতই বেপরোয়া হয়ে উঠতো জগলুল, ততই শায়লার কামনার আগুনও তুঙ্গে পৌঁছাতো, পাশেই এলায়িত সেই শুভ্রসাদা নার্সিং ড্রেসটার সূক্ষ্ম কালো দাগটা বেড়ে উঠতো, বিপুল বিস্ময় হয়ে উঠতো, অবয়ব পেত ডাক্তার রোহানের, অবয়ব পেত ডাক্তার সাদেকের। মৈথুনের চূড়ান্তে পৌঁছানোর পর্যায়ে শায়লা টের পেত জগলুল নয়, ও শুয়ে আছে ডাক্তার রোহানের বুকে আর মুখ রেখে আছে ডাক্তার সাদেকের শিশ্নে। হাজারো চেষ্টায় নিজেকে বিযুক্ত করতে পারতো না, কিছুতেই পারতো না ওই ডাক্তারদ্বয়ের শরীর থেকে নিজেকে আলাদা করতে। জগলুল যত বেশি ওকে শিৎকারের প্রলয়ে ভাসিয়ে দিতো, তত বেশিই ডাক্তারদ্বয় ওকে পিষ্ট করে চলতো, দুমড়ে দিতো ওর অস্তিত্ব। যতদিন ও বিয়ে উপলক্ষে ছুটি কাটাল, প্রতিদিনই ঘটে যেতে লাগলো এই এক-ই কান্ড। শুধু কি সন্ধ্যার পর, শুধু কি রাতে! কোনো কোনো দিন, দিনের বেলায়ও সময় নেই অসময় নেই, শরীরের ঝাঁপ খুলে দিতো জগলুল। নিজের মনের বিরুদ্ধেও শায়লা অসহায় আত্মসমর্পণ করতো ওর কাছে আর অমনিই ডাক্তারদ্বয় পাশে রাখা এলায়িত নার্সের সেই শুভ্রসাদা সালোয়ার-কামিজ থেকে নিজস্ব অবয়ব নিয়ে উঠে আসতো। জগলুলকে কিলিয়ে ঘুষিয়ে বিদেয় করে দুজন একসঙ্গে শায়লার শরীরটাকে নিয়ে মেতে উঠতো বুনো উন্মাদনায়। এমনকি বিয়ের এক সপ্তাহ পর ও যখন হসপিটালে জয়েন করলো, শিফটের ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরলেই হলো, ওর শরীর থেকে সেই শুভ্রসাদা ড্রেসটাকে নিজের হাতে খসিয়ে-খসিয়ে জগলুল, ওর শরীরে প্রেমের ঝড় বইয়ে দিতো, আর তা মুহূর্তেই ডাক্তারদ্বয়ের আবির্ভাবে রূপ নিতো কামনার প্রলয়ে।

শরীরের আগুন নিভে যাওয়ার পর শায়লার রতিক্লান্ত মনে জেগে উঠতো গ্লানি, এমন তীব্র সে গ্লানি যে, নিজের কাছে নিজেকে বড় অসহ্য লাগতো ওর। টের পেতো শরীরে কিলবিল করছে পোকা। শরীরে থকথক করছে কাদা। সঙ্গে সঙ্গেই নার্সের ড্রেসটাকে ও নিয়ে যেতো বাথরুমে। ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে রেখে আছড়াতো ঘষতো ডলতো মুচড়াতো। ভরা বালতিতে খলিয়ে নিতো একবার দুবার- তিনবার-চারবার-পাঁচবার-দশবার।

যত দিন যায়, যত পার হয় রাত, বালতিতে খলানোও ওর বেড়ে যেতে থাকে নার্সের সেই শুভ্রসাদা ড্রেস। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেড়ে যেতে থাকে ক্রমাগত। ধোয়া আর শেষ হতে চায় না। সেইসঙ্গে ওর গোসলের সময়ও বেড়ে যায়, বেড়ে যেতে থাকে এক ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা… গোসল আর শেষ হয় না শায়লার, শরীর থেকে মুছে না কিছুতেই ডাক্তার রোহান আর ডাক্তার সাদেকের লোল, মল এবং কামড়ের দাগ। কতবার শায়লার ইচ্ছে হয়েছে, জগলুলকে সব খুলে বলে – ডাক্তার রোহানের কথা ডাক্তার সাদেকের কথা। বলে যে, ওই নার্সের ড্রেস পরলেই ওরা চলে আসে, শুভ্রসাদা ড্রেস থেকে কিছুতেই ওদের দুজনকে ওর পক্ষে বিযুক্ত করা সম্ভব হয় না, তুমি আমাকে পরিত্রাণ দাও, আমাকে সুস্থতা দাও তুমি। কিন্তু বলা আর হয়ে ওঠে না। এটা সত্য যে, জগলুল আজ ওর বড় একটা ছায়া হয়ে উঠেছে, ভালোবাসার পরম আশ্রয়। আর যা-ই হোক ওর ভালোবাসার মধ্যে সামান্যও কৃত্রিমতা নেই। এটা ও পরিচয়ের সেই সময় থেকেই বুঝেছে।

বুঝেছে বলেই, একটু বেশি বয়স হলেও বিয়ের প্রস্তাবটা মেনে নিয়েছিল। তবু কী বিনয় ছিল জগলুলের। বিয়ের সম্মতিতে রাজি হওয়ার পর আবেগে ওর হাতটা ধরে বলেছিল, ‘আপনি যে               এ-বিয়েতে রাজি হবেন এটা আমি কল্পনাও করিনি। আমার সাহসই হয়নি কল্পনা করতে।’ ‘কী যে বলেন!’ একটা আলোর আভা এসে চিকচিক করছিল শায়লার চোখেমুখে। মনে হয়েছিল এই প্রথম ও এই পৃথিবীতে ছায়া পেল আশ্রয় পেল, বেঁচে থাকার শক্ত খুঁটি পেল। খুব লজ্জা লাগছিল নিজের হাতটা আটকে থাকায় জগলুলের উষ্ণ হাতে। কিছুতেই উদ্ধার করতে পারছিল না। যতক্ষণ বসেছিল জগলুল ওর হাত আর ছাড়লোই না। বিয়ের পরও জুগিয়ে চলেছে ওর সেই অকৃত্রিমতা। আর ও সেই ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গেই করেছে প্রতারণা? ওর  বিশ্বাসের পিঠে মেরেছে ছুরি? নিজেকে ও দেখতে পেল জগলুলের বাবা-চাচা-ফুফু-দাদা-দাদির সারিতে বীভৎস এক দাঁতওয়ালা শিংওয়ালা রাক্ষুসির অবয়বে। কামড়ে ধরে আছে জগলুলের গলা। দিনের পর দিন নিজের এই বীভৎস রূপ দেখতে দেখতে বিয়ের ঠিক এক বছরের মাথায় নার্সের চাকরিটা ছেড়ে দিলো শায়লা।

নার্সের চাকরিটা যেদিন ছাড়লো শায়লা, সে-রাতেই আরেকটি কান্ড ঘটালো। একেবারে নিজেরই অজান্তে। হয়তো এমন ঘটনা ও ঘটাতো না, হয়তো চাকরি ছাড়ার কথাটাও সে-রাতে জগলুলকে বলতো না, কিন্তু জগলুলই যখন দীর্ঘ মিলনবিরতির পর সেদিনই গভীর ব্যাকুলতা নিয়ে হাজির হলো, বাড়িয়ে দিলো নার্সের সেই শুভ্রসাদা ড্রেস, তখনই অকস্মাৎ কী হয় শায়লার, মাথায় রক্ত চড়ে ওঠে, কিচেন থেকে ঝড়ের বেগে ম্যাচ এনে নার্সের ড্রেসে আগুন ধরিয়ে দেয়। হতভম্ব জগলুলের চোখের সামনে দাউ-দাউ করে পুড়তে লাগলো ড্রেসটা। আগুনের ধিকিধিকি শিখায় শায়লা কাঁপতে-কাঁপতে জগলুলের বুকে ঠাঁই নিয়ে হু-হু কেঁদে উঠলো। ‘তুমি আর কোনোদিন ও ড্রেস আমাকে পরতে বলবে না, প্লিজ, প্লিজ! বলো পরতে বলবে না? ওটা আর আমি শরীরে বইতে পারছি না জগলু। আজ জবটা ছেড়ে দিয়েছি।’ এমন ঠান্ডাভাবে বললো ও, মুহূর্তেই রুমটা আমূল বরফখন্ডে পরিণত হলো, সহসাই।

আশ্চর্য যে, জগলুলের চেহারায় সামান্য কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই, যেন কৌতূহলী হওয়ার মতো অবশিষ্ট আর কিছু নেই এ-পৃথিবীতে। ওর অভিব্যক্তি দেখে উলটো শায়লাই অবাক হলো বেশি। জগলুলের চোখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো, ‘জানতে ইচ্ছে করছে না, কেন ছাড়লাম চাকরি?’

অদ্ভুত শীতল চোখে তাকিয়ে রইলো জগলুল। যার অর্থ হতে পারে হ্যাঁ কিংবা না দুটোই, যে, হ্যাঁ জানতে ইচ্ছে করছে অথবা না জানতে মন চাইছে না। ‘তোমাকে আমি আর ঠকাতে পারছিলাম না। হ্যাঁ। সত্যি।’ ঠান্ডা এবং স্বাভাবিক কণ্ঠ শায়লার। তারপর, বাসররাতের পর ওদের আর একটি রাত পুরোপুরিই কেটে গেল গল্পে গল্পে। মফস্বলের এক দরিদ্র মেয়ে কীভাবে একা একা সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় ঢাকা এলো, নার্সিং কোর্সে ভর্তি হলো, ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হলো ডাক্তার রোহানের সঙ্গে, কীভাবে কীভাবে ফেসবুকে জড়িয়ে পড়লো দুজন সেক্সচ্যাটিংয়ে, ‘জানো লোকটা জাদুকরের মতো আশ্চর্য এক সম্মোহনে জড়িয়ে ফেললো আমাকে। আমি যে কীভাবে ওর গভীর থেকে আরো গভীরতায় হারিয়ে যেতে লাগলাম, আমার সেই হুঁশই ছিল না। এমন ফ্যান্টাসির জগৎ সেটা, প্রতিদিনই এক-একটা নতুন স্বাদের জন্য মুখিয়ে থাকতাম। ফ্যান্টাসির মাত্রা ছাড়াতে ছাড়াতে আমি কবে যে ওর ক্লোজ ফ্রেন্ড ডাক্তার সাদেকের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছি, জানি না।  ডাক্তার রোহানের সঙ্গে আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা এতটাই গভীর ও বিশ্বস্ত হলো যে, নার্সের ট্রেনিংয়ের পর আমাকে আর একদিনও বেকার থাকতে হয়নি, রোহান ওদের হাসপাতালেই চাকরির ব্যবস্থা করেছে। এই নার্সের ড্রেস পরার পর আমিও কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে মিটিয়ে দিয়েছি ওদের শরীরের সব চাহিদা। রোহানও পারভারটেড, একা ভোগ করেনি আমাকে, ওর বন্ধু ডাক্তার সাদেককেও সঙ্গে নিয়েছে। একদিন নয়, দুদিন নয়, দিনের পর দিন। আমার এই শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে ওদের জিভ পড়েনি। আমার শরীরজুড়ে লালা। আমার শরীরজুড়ে কাদা। তুমি দেখতে পাচ্ছো না? তোমার ঘৃণা হচ্ছে না? কি, ঘৃণা হচ্ছে আমাকে? অবশ্য বিয়ের পর আমি ওদের কাছে যাইনি। তোমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি। চরমভাবেই থেকেছি বিশ্বস্ত। ওরা আমাকে কতো ডাকলো, কতো আকুতি! আমি ফিরেও তাকাইনি। তারপরও অসহ্য এক যন্ত্রণায় আমি ধুঁকছি। ধুঁকে চলেছি, আমাদের বিয়ের সেই রাত থেকে, সেই যখন তুমি নার্সিং ড্রেসটা আমাকে পরতে বললে, তখন থেকেই কেবল মনে হচ্ছে আমার, আমি তোমাকে ঠকাচ্ছি। আমি কেবলই ঠকাচ্ছি তোমাকে। তাই চাকরিটা আজ ছেড়ে দিলাম। ছেড়ে দিয়েও যদি স্বস্তি পেতাম। হা-হা। কষ্ট আরো বেড়ে গেল। তাই তোমাকে সব খুলে বললাম। খুলে বলার পর এখন নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছে। খুবই হালকা। তুমি এখন আমাকে যা খুশি ইচ্ছে শাস্তি দিতে পারো, যা তোমার মন চায়। তবু ওই নার্সের ড্রেসটা আর কিছুতেই আমাকে পরতে বলো না। প্লিজ। ওটা পরলে আমি আর তোমার থাকি না গো। আমি আর তোমার থাকি না।’

জগলুল স্থির, পাথর, জড়ো। মূর্তির মতো চুপ করে ঠায় বসে থাকে। ওকে বসিয়ে রেখেই একসময় বিছানায় অতল ঘুমে ঢলে পড়লো শায়লা। লাইটটা জ্বললো সারারাত।

এরপর অদ্ভুত এক শৈত্যপ্রবাহের মতোই কেটে গেল কটা দিন। যেন কুয়াশায় আবৃত চারদিক। ধূমল সাদায় জগলুল এবং শায়লা কেউ কাউকে ঠিক ভালো করে দেখতে পায় না। শায়লার সময়গুলো কাটে শুয়েবসে। জগলুল অফিসে যায় রুটিনমতো, রুটিনমতোই ফেরে। দুজন বিছানার দুদিকে মুখ রেখে ঘুমায়। মুখোমুখি বসে খায়। তেমন কথাবার্তা হয় না। শুধু দরকারি কথাটুকু ছাড়া। এভাবেই যেতে যেতে সেই আবৃত কুয়াশাতেই একদিন, মাঝরাতে প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল শায়লার। ও দেখলো, লাইটের আলোয় আলোকময় ঘরে ওর চোখের দিকে গভীর আকুতিভরা চোখে তাকিয়ে আছে জগলুল, ওর ডানহাতে নার্সিং ড্রেস।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার