বুড়ো  গাছ নিখিল অন্ধকারে

লেখক:

সুশান্ত মজুমদার

পালিশ ওঠা ক্ষয়াটে কাঠের সিঁড়ি; আর মরচেধরা সরু রডের খরখরে রেলিং উঠেছে নিচ থেকে দোতলায়। দোতলা মানে সেকেলে আমলের চুন-সুরকির বাড়ি। সিলিং থেকে হঠাৎ-হঠাৎ পলেস্তারার চাক খসে জমিয়ে রেখেছে রুমের অসুস্থতা। খ–খ- প্রলেপ না-থাকায় শক্তিক্ষুণ্ণ দেয়ালটা যেন ক্ষতে ভর্তি। ঢাকার ঝকঝকে চাকচিক্যময় পাইওনিয়ার রোডে সামনে-পাশে-আকাশে ঘাড় তোলা বিশাল সব সরকারি দপ্তর। মোড় ফিরলেই নতুন-নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, কংক্রিট-ইট-কাঠ-টাইলসের অফুরন্ত জৌলুসের পাশে পুরনো এই বাড়িটা বাস্তবিক বেমানান, দেখতেও বাজে। শ্রীহীন বাড়ির পেছনের দোতলার অংশের দুরুমে দাদার একাকী বহু বছরের দিনক্ষয় জীবন। জামরুল, আমগাছের পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বাইরের আলো কোনোক্রমে বারান্দার

কাছাকাছি এসে থমকে যায়; ভেতর অবধি পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অনুজ্জ্বল রুমে সার্বক্ষণিক তাই কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে। ফ্যাকাশে ওই আলোয় দাদার চেহারার ছায়া দূর হয়েছে কি-না বোঝা কঠিন। বিছানার ওপর গোটা চার বেড়াল সত্তর-ঊর্ধ্ব নিঃসঙ্গ দাদাকে এমন ঘেরাও করে শুয়ে থাকে, যেন বুড়োকে পাহারার দায়িত্ব নিয়েছে। পায়ে-পায়ে ঘোরা বেড়ালগুলো খাওয়ার সময় দাদার মুখের দিকে আত্মীয়নজর ধরে রাখে। দাদা পেস্নটের ভাত-মাছ খুঁটে-খুঁটে নিজে যা খান তার বেশি বেড়ালদের খেতে দেন। দুপুরে গুমোটভর্তি হেঁশেলে হাঁপাহাঁপি করে কাজের ছুটা বুয়ার রান্না করা খাদ্য হলুদ লবণজলের সেদ্ধ বলা ঠিক। দুই ফাও খাইয়ে নিজাম বা সিরাজ যখন যার সুযোগ হয় দাদার টাকায় এজিবির ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার থেকে মাছ-তরকারি কিনে আনে। কিছু দামে কম শাকসবজির বেশিরভাগ বাসি। মলা-ঢেলা-পুঁটি-টেংরা-তেলাপিয়া মাছও সবসময় টাটকা থাকে না। দাদা নির্বিকার। কেবল তাঁর পেটে কিছু গেলেই ব্যস, অল্পেই খুশি তিনি। নিত্য আয়ু যাপনে বাড়তি কোনো চাওয়া বা সাধ পূরণের ইচ্ছা তাঁর নেই। শুধু বংশে বনেদি বর্তমানে ফতুর মানুষটি সেই কবেকার নাছোড় অভ্যাসে কোনো-কোনো রাতে কয়েক পেগ বিভোর উপযোগী রস পেলে বেজায় খুশি। তাঁর বুড়ো হাড্ডির জোড়ে-জোড়ে বুঝি সমর্থ তখন চালু হয়। তার তেজে তিনকাল বয়সের টুকরো- টুকরো ঘুম জোড়া লেগে মাখোমাখো

দারুণ এক আরাম এনে দেয়। কদমে- কদমে এলোমেলো ভাব থাকে না। মনে হয় হাঁটাচলা বেশ উচিত রকমই। নিজেকে নিজে খুঁজে পেয়ে তখন আসল দাদাই ভাবেন। বাড়িঅলা যতদিন বেঁচেছে মান্যিগণ্যি করে তাঁকে দাদা ডেকেছে, তাঁর দু-ছেলেরও তিনি দাদা, নিচের অফিসের পিয়ন-দারোয়ান-কেরানি সবার এজমালি দাদা। দেয়ালের ওধারের কাচ্চাবাচ্চাদের দাদা, সামনে ফুটপাতের টং দোকানির দাদা – সর্বজনের আন্তরিক দাদা সম্বোধনে চাপা পড়েছে তাঁর আসল নাম। কখনো পুরনো দিনের সমবয়সী কোনো সখা দেখাসাক্ষাতে এলে কাঠের সিঁড়ির গোড়ায় থমকে উপরে চাহনি টেনে নিচের কাউকে জিজ্ঞেস  করেন – কেশববাবু কি আছেন? তখনই অনেকদিন পর দাদার প্রকৃত নাম শোনা যায়। নিজস্ব চৌখুপিতে নিঃশব্দ আউল মানুষটি অধিকাংশ সময় লোকচোখের বাইরে-বাইরে থাকেন। হঠাৎ ঘটনা কী, কাহিল শরীরে গড়িয়ে-খুঁড়িয়ে ইদানীং গ্রামের বাড়িতে তিনি যাতায়াত করছেন। ব্যাপার কী? অনুমানে কোনো উদ্দেশ্য পাওয়া না গেলেও কেউ বলে গাছ, কেউ ধান, কেউ বলে জমি বেচতে বাড়ি গেছেন দাদা। হতে পারে হাতের পাঁচ তাঁর ফুরিয়েছে। ঢাকায় চুপচাপ বসবাসেও তো বেশ খরচ।

সকাল-সকাল ঘাড়ে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে রিকশা নিয়ে দাদা চলে যান আমত্মঃজেলা বাসস্ট্যান্ডে। তাঁর হিসাবে অনিয়মিত হলেও প্রায় ষাট বছরেরও বেশি তিনি বাসে চড়ছেন। তখন ঢাকা, কি বাড়ির শহর ফেনী, কোথাও বাস টার্মিনাল ছিল না। আরে, দূরপালস্নার বাসই ছিল হাতেগোনা। এত ধোঁয়া, ধুলোবালির ওড়াউড়ি, যানজট, যাত্রীর গাদাগাদি ছিল কই। তাঁর এলাকার বাসে সবসময় বসার সিট পাওয়া গেছে। এই যে মাঝেমধ্যে গৃহযাত্রা, কদিন পর ফেরা, যাতায়াতের এমন সুবাদে হেলপার-ড্রাইভারের একই চেহারার দেখাদেখি, ছুটকো-ছাটকা আলাপের মধ্যে সখ্যভাবের সর জমে। কথা-চালাচালি করে তারা জেনে ফেলে, দাদা হচ্ছেন একসময়ের তাদের পাড়াগাঁর অবস্থাপন্ন বাড়ির লোক, তিনি চিরকুমার। অবশ্যই এমন মুরুবিব, সাধুপুরুষের বিশেষ কদর প্রাপ্য। বাসযাত্রায় কখনো-কখনো বাসের কর্মীরাই ভালোবেসে তাঁকে শসা-কলা খেতে দেয়।

মফস্বল থানা সদরের চলনসই রাস্তার তেমাথায় বাস থেকে নেমে দাদা এবার ভ্যানে চড়ে যান নিজ ঝাউ গ্রামের সীমানায়। ইট-বিছানো পুরনো সরু পথের দুপাশে রোদ-ছায়ার জড়াজড়ি। পামশু পরা কুলীন পায়ে হাঁটার পর টিনের দোচালা – এ-অঞ্চলের বহুদিন আগের বড় বংশের গুপ্তবাড়ি। বাড়িটা এখন নড়বড়ে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। ঘুণে-খাওয়া খুঁটির হাঁটু কখন জানি ভেঙে পড়ে। উত্তর-পশ্চিমে বাগান, তাঁর নিচে ধানের জমি, ওই জমি ও বাগান ভাগ করেছে একটা পগার। সীমানা ঘেঁষে নালায় কখনো বারো মাস জল থাকে না। প্যাঁচপেঁচে কালো কাদায় ভর্তি, এরই মাঝামাঝি উপরে ঢিবির পাশে পোক্ত বড় গাছটা চার মাস আগে বিক্রি করে নগদ একুশ হাজার টাকা দাদা পেয়েছেন। দূরের কাঁহা-কাঁহা মুলস্নুকে গুপ্তদের যে ধানি জমি ছিল আগেই বেচেছেন তিনি। কোনো ভাবাভাবি ছাড়াই বাড়ির সীমানার কাছাকাছি জায়গা বাজার চলতি দামের চেয়েও কমে তিনি ছেড়ে দেন। ঢাকা শহরে খরচ তাঁর অনেক। তাবাদে, গ্রামে গাছগাছালি, জমিজমা রেখে হবে কী, একমাত্র দূরসম্পর্কের ভাইপো ছাড়া বাড়ির শরিক বলে এদেশে কেউ নেই। ছয় যুগ আগে তাঁরমা-বাবা মরেছেন। একে-একে ভাইবোন দেশত্যাগ করে ভারতে গিয়ে নতুন সম্পত্তি করে ওখানে তাঁরা প্রতিষ্ঠিত। বারবার হাত ধরে কত অনুরোধ তাঁদের, কখনো ভাই-ভাইপোরা বেড়াতে এসে কেঁদে-কেটে উপর্যুপরি অনুনয় – কিসের কী, তাঁর সাফ কথা, ওই পারে গিয়ে স্থায়ী হতে তিনি অনিচ্ছুক, একা হলেও এখানেই থাকবেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেতর দাদাকে রেখে মহাবিরক্ত আত্মীয়-স্বজন শেষাবধি যার-যার ডেরায় ফিরে গেছে। বছর ছয় আগে বড় ভাই মরেছেন। খবর পেয়ে তাঁর শ্রাদ্ধ-শামিত্মতে যাওয়ার মনস্থহ করলেও ভগ্ন শরীরের অবনতির কারণে উদ্যোগ বরবাদ হয়ে যায়। ওপারের আত্মীয়রা তো তাঁর এমন শোচনীয় দুরবস্থা জানে না। তাঁরা রেগেমেগে তাঁর মু-ুপাত করে।

 

এজিবি অফিসের উলটোপাশে ফুটপাথ-লাগোয়া পুরনো দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে বড়-বড় পাতার ছালখোসা ওঠা কয়েকটা উঁচু মোটা গাছ। তার ওধারে বাঁশের বেড়ার টিনের ছাপরা। বাস-অনুপযোগী লম্বা জায়গাটা আদৌ রাজধানীর বুকের অংশ বলে ভ্রম হয়। বরাবর আড়ালে মুখ ফিরিয়ে রাখা এখানের ছেঁদো বাসিন্দারা একপাল গরু পোষে, বালতিভর্তি রোজ দুধ বেচে। দুপুরের চড়া রোদে গরুর গায়ের ও গোবরের মিলিত দুর্গন্ধে গোটা এলাকা নির্যাতিত হয়। তখন পথচারী, টং দোকানি, কি অফিসের মানুষজন নিয়মিত গালিগালাজ করে মুখ সমর্থ ও সচল রাখে। এখানে টুটাফাটা টিনের ছাওয়া খোলের কাছের গৃহবাসী দাদার টুঁ-শব্দটিও নেই, খারাপ গন্ধ নিয়ে তিনি পুরো চুপ। ওই চালা অংশের কতগুলো নোংরা জামাপ্যান্ট পরা মলিন চেহারার শিশুসন্তান বুকে বইখাতা জড়িয়ে লেখাপড়ার নামে দাদার কাছে আসে। তাদের ফ্লোরে বসিয়ে অকাতরে তিনি জ্ঞানদান করেন। অল্পক্ষণের মধ্যে বাচ্চাদের নজর বইয়ের চেয়ে রান্নাঘরের উদ্দেশে বেশি-বেশি যায়। বুড়ো দাদা কখন হাতে করে কিছু খাওয়া এনে তাদের বিলি করবেন। দাদাও এই দুস্থ বাচ্চাদের খাইয়ে দারুণ আনন্দ পান। তাঁর রান্নার মহিলা যেদিন কাজে আসে না, লোকের অভাবে শরীরের কাঁপুনি ঠোঁটে-মুখে চেপে দাদা বাচ্চাদের জন্য লজেন্স, বিস্কুট, নিজের খাওয়ার রুটি নিয়ে আসেন। এই শিশুদের সঙ্গে খাইয়ে আছে বিড়ালগুলো। বছর-বছর বিড়ালগুলো বাচ্চা দিচ্ছে আর তাদের হারিয়ে ফেলছে। কয়েকটা বয়েসি বিড়াল দাদাকে ছেড়ে কোথাও যায় না। দাদা কখনো নিচে এলে বিড়ালগুলোও নেমে তাঁর পায়ের পাশে ঘুরঘুর করে। বিড়ালদের জন্য আছে দুধের খরচ। সপ্তাহে দুই-তিন দিন মাছের বরাদ্দও থাকে। দাদার দোতলার সামান্য তফাতে সোজাসুজি অংশে ডেভেলপিং অফিসের পিয়ন সালামত থাকে। তাঁকে বারান্দায় এসে তিনি ডাকেন। বিষয় কী? দ্যাখো, বিড়ালের জন্য ভালো কিছু খাবার না আনলে নিরীহ প্রাণীগুলো অভুক্ত থেকে নাকি অভিমান করে আছে। শুনে সালামত তাঁর চেয়ালের হাসি সারা শরীরে ছড়িয়ে দিতে চায়। – দাদা একা মানুষ, টাকা তাঁর খাবে কে, এখন বিড়ালই খাচ্ছে।

কোনো-কোনো রাতে ফুর্তিবাজ দু-তিনজন পুরনো অধিকারে দাদার বাসায় এসে উপস্থিত হয়। দাদার আদরে তাঁদের প্রবেশ এখানে অবাধ। খরচ করার মতো সময় তো পড়েই থাকে। এই রসভোক্তারা জানে, বয়সের উদ্বেগে বহুদর্শী মানুষটা ঢুলুঢুলু হলেও এখনো শুয়ে যাননি। ঘণ্টা-তিন জোর আমোদ করা যাবে। ড্রিঙ্কসের বোতল, পরোটা-কাবাব, চানাচুর-চিপস সব নিয়ে আসে তাঁরা। বোতল কখনো না আনলেও ভোগ-সমেত্মাষে ঘাটতি নেই। নিয়মিত ঝাঁট না পড়া ভেতরের রুমে কাঠের যে জীর্ণ আলমারি তার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে রাখা বোতলে অবশিষ্ট কিছু-না-কিছু জিন-হুইস্কি-ভদকা আছে। এক সিটিংয়ে ওই মাল যথেষ্ট। আধা পেগ, কোনো বোতলের তলানি ঝেড়ে নিলে দিব্যি চুর নেশা জমে। অনিষ্ট পাত্তা না দিয়ে একাধিক পদের সুরা মেলানোর পদ্ধতি দাদাই শিখিয়েছেন, তাঁর মতে ম্যাড ককটেল। বেশি-বেশি বরফ দাও। দাদার ছোট্ট ফ্রিজটা অনেকদিন ধরে নষ্ট; আর মেরামত উপযুক্ত নেই। ঠান্ডা

জলের বোতলের জন্য নিজাম ছেলেটাকে বাড়িঅলার বাসায় পাঠাতে হয়। মরহুম বাড়িঅলার দুই ছেলে। ছোটটা কাবু-কাতরা ধোঁয়াখোর সাইফুল বাড়ি এখন দেখভাল করে। ঠান্ডাজলের বোতল দরকার শুনে পরিষ্কার সে বোঝে – দাদার বাসায় মউজ করা মেহমান এসেছে। দুটো কচি বয়সের ছেলে রেখে বাড়িঅলা আকস্মিক মারা গেলে পুরনো ভাড়াটে এই দাদা এদের আগলে রাখেন। ট্যাটন আত্মীয়দের ছোঁমারা ফন্দি থেকে অভিভাবকশূন্য দুই বালকের সম্পত্তি তিনিই রক্ষা করেছেন। দাদার জন্য এতদিন তাঁদের আলাদা মহববত ছিল। হালে বয়স বা সঙ্গদোষে সাইফুলের দাদার সামনে বেফাঁস কথা বলতে মুখে বাধে না। তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভঙ্গিও সে করে। মনে-মনে তিনি সিদ্ধান্ত নেয়, ঢাকায় আর নয়, অনেক হয়েছে, এবার গ্রামে ফিরবেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই।

 

বছর এগারো আগে, এই পাইওনিয়ার এলাকায় এত মানুষ, তাঁদের কোলাহল, যানচলাচল, উঁচু-উঁচু নতুন বিল্ডিং ছিল না। অনেকটা নিরিবিলি চারপাশ। সন্ধ্যার আগেই দুপাশের অনাবশ্যক গাছপালার ছায়া নেমে বুঝি ভাংচুর রাস্তার ওপর লেংটা শুয়ে গেছে। আগাম কালো করেছে পরিবেশ। শেওলাধরা ইটপাটকেল ফেলে রাখা, জঞ্জাল-ধুলাময় শহরের অসার এই প্রামেত্ম লোক যাতায়াতে ভাটা দেখা যেত। দাদার বাস তখন নোনাধরা বাতিটার নিচতলার সিঁড়ির মুখের এক রুমে। কোনোক্রমে এঁটে যাওয়া রুমে একে অন্যের নিশ্বাসের ছোঁয়ার মধ্যে আরো থাকতো সম্পর্কে দুই ভাইপো। বাসা থেকে হেঁটে, কখনো তাঁরা রিকশায় গিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করত। থাকা, খাওয়াসহ তাঁদের যাবতীয় খরচ অকাতরে দাদা দিয়েছেন। পাশের পরপরই চাকরি পেয়ে এক ভাইপো বউ নিয়ে থাকত ইন্দিরা রোডে; আরেক ভাইপো বিদেশের এক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টারি করছে। কবছর পরপর শিক্ষক ভাইপো দেশে এলে অবশ্যই কাকার কাছে সে দীর্ঘ সময় কাটায়। ইন্দিরা রোডের ভাইপো কাকমুখেও যদি খবর পায় কাকা অসুস্থ তো উড়াল দিয়ে সে চলে এসেছে। কাকাকে জোর করে উঠিয়ে কাছে নিয়ে রাখত। কিন্তু দিন দুই যেতে না যেতেই যথারীতি দাদা তাঁর আস্তানায় ফিরে আসার জন্য উদ্গ্রীব। বিড়ালগুলো না খেয়ে আছে। তাঁর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ভরসা করা নিঃসহায় মানুষগুলো পথের ওপর দৃষ্টি ফেলে আছে। দুটি বাড়তি মানুষ, যারা রক্ত সম্পর্ক তো দূর, ধর্ম সম্পর্কেও কেউ না, একজন মোসলেম দুপুরবেলায়, আরেকজন নিজাম রাতে দাদার বাসায় প্রায়ই ফ্রি খায়। বাসার সামনের ফুটপাথের ডানে দেয়াল ঘেঁষে টং দোকান পেতে মোসলেম রোজ পান-বিড়ি-সিগারেট বেচে। বাড্ডা না রামপুরার কোনো অফিস সকালে চালু হওয়ার আগেই তাঁর লাল রঙের বাক্স দোকানটা দাদার সিঁড়ির নিচ থেকে টেনে সে ফুটপাথে সেট করে। এই মানুষটার চোখে ছানি জমেছে – পরিষ্কার নাকি সে দেখতে পায় না। তাঁর দৃষ্টি স্বচ্ছ করার খরচ দাদার কাছে সে চেয়ে রেখেছে। দাবির মতো করে তাঁর কথা – বাবু টাকা দিলেই অপারেশনের জন্য সে হাসপাতালে চলে যাবে। নিজাম ছেলেটা টোটো করে রাতের বেলা এসে হাজির। তার নিজস্ব একটা টিনের থালা আছে। পেটের ওপর থালাটা চেপে ধরে সোজা চলে যাবে দাদার রান্নাঘরে। ঠোঁটেমুখে ব্যস্ত ভাত গুঁজে দাদার বাসার ফ্লোরে পড়ে তার টানা ঘুম। ছেলেটার বাপ সিরাজ ছিল বাইন্ডার। একসময় দাদা পুরানা পল্টনের যে অফসেট প্রেস অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন, ওখানে কাজ করতো সিরাজ। শরীরে অচল হয়ে সে নিজের গ্রামে ফিরে গেলে তার ছন্নছাড়া ছেলেকে দাদার হাতে সঁপে দিয়ে যায়। এখন মোসলেম ও নিজাম – এই আলগা দুজনের ঈদ-কোরবানিরও যাবতীয় খরচ দাদার জোগান দিতে হয়।

অকৃতদার দাদার কামরায় একাকী নিভৃত জীবন, মামুলি বাড়ির নিরিবিলি বাস, নিরুপদ্রব সীমানা তাঁর যুবা বন্ধুদের বেশ পছন্দ। কেউ-কেউ সাংবাদিক। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রতিদিন রিপোর্টার সালাম আসে তাঁর সংবাদ অফিসে। মধ্যরাতে জয়কালি মন্দির এলাকা থেকে শেষ বাসে সে বাসায় ফেরে। দাদার কর্মকালীন প্রতিষ্ঠানের কোলের পাশে তখন দৈনিক কাগজের অফিস। যাতায়াতে দেখাদেখি, আলাপ, পরে উভয়ের বয়স ভেঙে ঘনিষ্ঠতা। সালামের নিংড়ানো সুবাক্যে অন্য দৈনিকের রিপোর্টারদের সঙ্গে দাদার বন্ধুত্ব। দূর নিকট করে কোনো-কোনো রাতে একত্রে পানাহার, সঙ্গে চলে কালের বিবরণী, গল্পগুজব। মাখামাখি এখন জমাট। এদের মধ্যে হুমায়ুনের গুণপনা অনেক। সে শুধু সাংবাদিক নয়, ব্যবসায়ীও। বেতনে লোক রেখে রড-সিমেন্ট ছাড়াও বিবিধ ব্যবসার দোকান চালাচ্ছে। তদবিরে বুদ্ধি বলো, ফন্দি বলো – পরামর্শদানে হুমায়ুনের যশ-খ্যাতি আছে। এ-কাজেও তাঁর কমিশন থাকে। কালোপনা, লম্বা ছিপছিপে মোটা ফ্রেমের চশমাপরা এ-মানুষটার বহু সেক্টরে যোগাযোগ, নানা কিসিমের মানুষের সঙ্গে খাইখাতির। কন্ট্রোল দরে ওয়্যার হাউস থেকে হার্ড ড্রিঙ্কসের বোতল জোগাড় করে সে। নারকোটিকস ডিপার্টমেন্টও তাঁকে হাতে রাখতে চায়। তাদের আড়ালের কোনো কালো খবর ফাঁসের উপক্রম হলে হুমায়ুনকে দিয়ে তা চাপা দেওয়া হয়। সাংবাদিক বন্ধুদের কেউ-কেউ বাজার চলতি দামের চেয়ে কমে তাঁর থেকে বোতল নেয়। হুমায়ুনের খরচের হাত বেশ উদার – টাকা যেন তেজপাতা, উড়িয়ে দিতে তাঁর কার্পণ্য নেই। এমনি-এমনি কি হুমায়ুনকে নিয়ে দাদার বিশেষ স্নেহের নজর বহাল! তার আদব-কায়দাদুরস্ত মন দখল করে আছে। সুস্বাদু আহার্য বস্ত্তর সঙ্গে কণ্ঠতরলের সুযোগে হুমায়ুন উদ্যোগী না হলে বর্তমান অনটনের দিনে সহসা সম্ভব নয়। শরীর যতই বিরুদ্ধে যাক, বস্নাড সুগার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, হাত-পা কাঁপুক, বোতল দেখলে দাদার বুকবন্দি পুরনো পিপাসা শনৈঃশনৈঃ বেড়ে যায়।

 

গত পরশু থেকে দাদার মনের শামিত্ম-স্বসিত্মতে ক্ষতি হয়েছে। এ-বাড়ির যে-ছেলেকে তিনি হামাগুড়ি দিতে দেখেছেন, তাঁর কোলে পেশাব করে লুঙি ভিজিয়েছে, সর্বক্ষণ যার মুখে ছিল দুধের গন্ধ, এখন সেই ছেলের গোঁফ গজিয়েছে, ছ-ফুট ঢ্যাঙ্গা, সে তাঁকেই কি-না বাসা ছাড়ার কঠিন মনভাঙা কথা বলতে পারলো! শুনে নিজেকে সামলে নিতে বিস্ময়ে তিনি বুজে যান। এখানের সবচেয়ে প্রথম বাসিন্দা হলেও জমানা যতই বদলাক, তিনি যে ভাড়াটে সে-খেয়াল তাঁর পুরোপুরি আছে। মাগনা থাকেন না, অনিয়মিত হলেও সাবেক ভাড়াই তিনি দিয়ে আসছেন। গত দুমাসে কোনো ভাড়াই সাইফুলের হাতে দেওয়া যায়নি। হাতের পাঁচের মোটা অংশ গেছে শরীরের চিকিৎসায়। ডাক্তার পরিচিত, তাঁর ফি নয় বাদ, ওষুধ বিনামূল্যে দেবে কে?

দাদার অসুখ-বিসুখ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া আতাহার ডাক্তার বাসা বদলে এখন থাকে কামরাঙ্গীরচরে নিজের তৈরি নতুন বাড়িতে। চেম্বার তাঁর শামিত্মনগরের চৌরাস্তার বাঁপাশে এক ফার্মেসির পেছনের খোপে। ওখান থেকে পাইওনিয়ার রোডে দাদার বাসাটা দূর নয়। সম্ভবত দাদাকে দেখতে-আসতে ডাক্তারের আগ্রহ কমতির দিকে। অসচ্ছলতার কারণে গ্রাম মনুষ্যি এই আতাহারের ছাত্রজীবন যখন বন্ধ হওয়ার জোগাড়, তখন তিনজন দরদি মানুষ ধরে দাদা প্রতিমাসে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পাশ করার পর আতাহার দাদার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে এসেছে। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে এখন বুঝি ডাক্তারের মনোযোগ থেকে দাদা মুছে যাচ্ছেন। হতে পারে, বিকেল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত রোগী দেখে দূরের বাসায় ফিরতে-ফিরতে শরীর ও মনঃসংযোগ তাঁর ঠিক থাকে

না। ডাক্তারের কাছে সালামতকে পাঠিয়ে উপর্যুপরি অনুরোধের পর এক ফাঁকে সে নীরস মুখে বাসায় আসে। দাদার শরীর টিপেটুপে একগাদা টেস্ট দেয়। প্যাথলজির ওই টেস্টের খরচের কারণে হাত থেকে টাকা চলে যায়। শোনা যায়, সাইফুল বাসার চৌহদ্দির তুচ্ছ আদমদের প্রায়শই বলছে – পকেটে টাকা না থাকলে হাঁটতে-চলতেও তাঁর ভালো লাগে না, মেজাজ গরম থাকে। দ্যাখো, কত কম বয়সে ছেলেটা টাকা চিনেছে। সে যখন দুঃসময়ের হিতকারীর সঙ্গে বেয়াদবি ও বাসা ছাড়ার হুকুম জারি করতে পেরেছে, আখেরে ছেলেটা আরো ভয়ংকর হবে। আগামীতে মানসম্মান পয়মাল হতে পারে ভেবে তাঁর মনের মোটা চিকন বিভিন্ন তারে খেদ-আফসোসের টোকা পড়ে।

রুমে পাতলা অন্ধকারের ঘেরাও যখন শুরু, তার আগেই হালকা হলদে বিকেলে চাদর মুড়ি দিয়ে বিমর্ষ দাদা টানটান শুয়েছিলেন। বিড়ালগুলোও কার্যকলাপ, নড়াচড়া, এমনকি চেহারা দেখে নির্ভুল মনিবের হাল যেন বুঝতে পারে। তারা দাদার সঙ্গে উপবাসে, কী নিষ্ক্রিয় থাকতে একাট্টা। দুভাগে দাদার মাথা ও পায়ের পাশে চুপটি মেরে তারা শুয়ে আছে। তাঁকে দেখতে নিঃশব্দে মোসলেম উপরে এসে উঁকি মেরে তখুনি নিচে নেমে গেছে। রান্নার বুয়া বালিশের নিচ থেকে নিজেই টাকা খুঁজে ফুটপাতের পরিচিত হকার থেকে বাজার করে আনে। তাঁর ইচ্ছামতো তরকারি, কুঁচো মাছ পাক করে সে ঢেকে রেখে গেছে। পরে খেয়ে নিলেই হবে। কিন্তু দাদার উঠে বসার ইচ্ছা নেই। বিষাদ বুঝি অনুভূতির ওপর এমন দখল কায়েম করেছে যে, কোনো কিছু ভালো না লাগাই প্রধান হয়ে উঠেছে; কিন্তু সন্ধ্যা ঘুরে আঁধার ঘোরালো হয়ে এলে কাঠের সিঁড়িতে শোনা গেল একাধিক পায়ের ছড়ানো আওয়াজ। ক-মুহূর্ত পর দোতলার পাতলা গ্রিলে খুটখুট শব্দ হলে খাট ছেড়ে তিনি নেমে আসেন। বিড়ালগুলো মেহমানদের খোশ আমদেদ জানাতে আগেই দৌড়ে গেছে। শব্দ করা মার্জিত হাত দাদার মুখস্থ। দাদার বাসায় কোনো মান খোয়ানো টেবিলও নেই। কখনো হয়তো ছিল, এখন ব্যবহার-অযোগ্য কিংবা ভেঙে যাওয়ায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। হুমায়ুন তাঁর সঙ্গী দুজনকে পুরনো দাগে ধরা বেতের চেয়ার টেনে বসতে দেয়। এই বাসার ভারী ও ঠুনকো সব তৈজসপত্র ঠোলামালা ধরার অধিকার তাঁর তৈরি হয়ে আছে। চার দেয়ালের মধ্যে বহুকেলে ব্যবহৃত নেহাত যা আছে চোখ বুজে সে বলে দিতে পারে। পানের গস্নাস, পানির জগ টানাটানি করে, পেস্নটে চানাচুর। রেস্টুরেন্ট থেকে কেনা কাবাব-তন্দুরি সব সে-ই সাজায়। রাতের জন্য দাদার কোনো কাজের লোক নেই। নিজাম ছেলেটা ঘুমানোর জন্য আগেভাগে এলে তাঁকে কাজে লাগানো হয়। আসর না-ভাঙা অবধি নিজাম ডাকের অপেক্ষায় বাইরে সিঁড়ির ধাপে অন্ধকারে বসে থাকে। খাওয়ার টুকরো-টাকরা তার ভাগেও কখনো- কখনো পড়ে। ফাই-ফরমাশ খাটা বাবদ কেউ-কেউ যাওয়ার সময় পানে উদার হয়ে খুচরো টাকার ময়লা নোট তার হাতে গুঁজে দেয়।

পানি-মেশানো ড্রিংসের গস্নাস ফ্লোরে রাখা ছাড়া ব্যবস্থা নেই। নিচু হয়ে গস্নাস তুলে তবে সিপ টানা। দাদা পা মুড়ে তাঁর খাটেই, কখনো বালিশে হেলান দিয়ে বসেন। এখানেও তাঁর কুলীন মানুষের ভঙ্গি শিষ্ট থাকে। মানুষের সাড়া পেয়ে বিড়ালগুলো শরীর-ঘেঁষে যাতায়াত করে, কখনো লেজ ছুঁইয়ে আগতদের যেন আদর উপহার দেয়। বিড়ালের এমন বিরক্তিকর ঘোরাফেরা, পায়ের ফাঁকে অসহ্য চলাচলে হুমায়ুনের মুখে একজন ফোকাস দিলে চোখ টিপে সে ব্যাপারটা উপেক্ষা করার ইশারা দেয়। হুইস্কির গস্নাস চোখের সামনে ধরে দাদা পরখ করেন। রুমের মস্নান পীত আলোয় তাঁর কাছে হুইস্কির রং পরিষ্কার কি-না মুখ দেখে বোঝা গেল না। এবার নাকের কাছে গস্নাস ধরে ভাঙাভাঙা শ্বাস টেনে তিনি গন্ধ গ্রহণ করেন। এই হুইস্কি ডিলাক্স না। নরমাল হুইস্কির রুক্ষতা শরীরের ভাঁজে-ভাঁজে ছড়িয়ে চনমনে ভাব এনে দেয়। তবে পা-জোড়া আজকাল মাঝেমধ্যে শাসনে থাকছে না। এখন কড়া হুইস্কির কারণে কদম বেসামাল হলে মুসিবত। নিজে দাদা হুঁশিয়ার – গলা পর্যন্ত টেনেও নিচ থেকে কাঠের ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে-উঠতে একবারও তিনি পড়ে যাননি। পতন তাঁর পছন্দ নয়। কাহিল বুড়ো শরীর ভেতরে-ভেতরে এখনো হয়তো দৃঢ়। ঘাড় হেলে যাবে, কথা জড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু দারু টেনে তাঁর কুলমর্যাদা ধারণ করা শরীর পড়ে গুঁড়ো হবে, উঁহুঁ, কস্মিনকালেও এমন নজির তিনি হতে দেবেন না। দাদার একাধিক স্নেহাস্পদ – সালামত, মোসলেম, নিজাম, গণি কি এমনি-এমনি তাঁকে গুরু বিবেচনা করে। নিজেদের মধ্যে রসালাপে তাঁদের বলাবলি, বুড়ো বট হেলে যেতে নারাজ। তিনিও জানেন, তালে ঠিক থাকা, নিজেকে পানের পর পোক্ত রাখা দোষ বা দুর্বলতা নয়।

অধুনা মনের মধ্যগত অন্দরের বেশ গভীরে কোথাও ফাটল ধরেছে। ওই চিড় থেকে কষ্ট, নিঃশব্দ রোদন চুঁইয়ে-চুঁইয়ে ভেতরে তা চাপ দিচ্ছে। ঢাকা এখন বসবাসের উপযোগী নয়, একলা মানুষের জন্য দিনকাল বিরুদ্ধে। লোকজনের উলটাপালটা খল স্বভাব ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছে। বাড়িঅলার ছোট ছেলেটাও তাঁর এখানের নিরুপদ্রব আশ্রয় আর পছন্দ করছে না। বুড়ো-হাবড়াটা কেটে পড়লে বাসা বেশি টাকায় ভাড়া দিয়ে মোটা আয়ের আমদানি সে করতে পারবে। ইন্দিরা রোড থেকে নিকেতনের ওদিকে বাস তুলে নেওয়া ভাইপোও চাইছে সে ফেনীতে ফিরে যাক। কিন্তু ওই নিষ্ফলা গ্রামের পনেরো আনা খালি বাড়িতে গিয়ে কদিন আদৌ মন টেকে না। ঢাকায় এখানে বয়সে ছোট হলেও হরেক জীবিকার সাধারণজন আন্তরিক স্বরে কেউ বাবু, কেউ দাদা ডেকে সময় তাঁর ন্যাড়া হতে দিচ্ছে না। খোঁজ-খবরের নামে পুরনো বন্ধুদের কেউ-কেউ এসে একপ্রস্ত আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে। কারো-কারো পানাহারের সঙ্গী, কত মধুর এই বিনোদন। জীবনের বদলে যাওয়া অভ্যাসের বোঝাপড়া কী গ্রামে থেকে সম্ভব!

পাড়াগাঁর সম্বল-সম্পত্তি ফুরিয়েছে, এক আনা বলতে আছে পানাভর্তি ছোট পুকুর, একটা লম্বা দোচালা টিনের ঘর, দক্ষিণে বাঁশঝাড় বাগান – চালতে, আমড়া, কামরাঙা ও গোটা বিশেক সুপারিগাছ। এই বাগানের বহু বছরের একটা ছাইয়ের গাদার ভেতর ছিল লতানো মেটে-আলু গাছ। ছাইগাদা খোড়ল করে মেটে আলুর বড় খ-াংশ তুলে এনে ঢাকায় বিতরণ করে ঘনিষ্ঠদের তিনি মাত করে দিয়েছিলেন। এখন এসবের কোনো মূল্য নেই। শহর-গ্রাম সব একাকার। শহুরে নষ্ট ঝোঁক-আসক্তি দ্রুত পাড়াগাঁয় ঢুকে ক্ষয় বলো, পচন বলো, মাটি ছেনা-চটকানো মনুষ্যিদের ফোঁপরা করে দিচ্ছে। হিসাব-নিকাশেও তারা ঘাগু এখন। তলস্নাটের মানুষজন জানে, বাবু নিঃস্ব। কোনো এককালে তিনি ছিলেন বড় সম্পদশালী পরিবারের মানুষ। কোথায় ওই বড় পরিবার, এখন শূন্য। ধুর, এই লোকের এখন দাম আছে নাকি! ভক্তি-শ্রদ্ধা টানে-টানে তাই পাতলা হয়ে গেছে। পথেঘাটে দেখে পাড়া-প্রতিবেশী আগের মতো খাতির জমানো গলা, শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ, কিংবা বাবু বাড়িতে আছেন তো কদিন বলে কোনো আন্তরিকতা দেখায় না। এর চেয়ে ঢাকার পাইওনিয়ার রোডের ধর্তব্য নয়, চুনকাম খসা বাসার নুন-ঝাঁঝরা চৌখ– যথাসম্ভব নিঃসঙ্গ সময় ফুরিয়ে দেওয়া ঢের ভালো। কে বলে এখানে তাঁর সুহৃদ নেই? এই যে দিন-দুনিয়ার হাল-হকিকত জানার উদ্দেশ্যে খবরের কাগজও তাকে পড়তে দেওয়া হয়। কোনো-কোনো দিন পড়ার অনিচ্ছায় সংবাদের হেডিংয়েও নজর দেওয়া হয় না। নিচের অফিসের পিয়ন ছেলেটা গণি কাগজটা সকালে দিয়ে দশটার সময় এসে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। গণি পারলে হইচই করার স্বরে কথা বলে – দাদা হচ্ছে আমাদের মনের মানুষ। আমরা থাকতে এই

সামান্য কাগজটা তাঁকে কিনতে হবে কেন?

দাদার ধারণা, নিচে ও আশপাশের পিয়ন-দারোয়ান-দোকানি থেকে মেকানিক-মিস্ত্রি যারা আছে, মাসের পর মাস তাঁকে দেখছে, একজন প্রৌঢ়ের আটপৌরে বিবাগী সন্ত জীবন পালন করতে, এরা তার কাছে অনেক বেশি অকপট, উদার, দরদি ও নির্ভেজাল। এই যে বাসায় আনন্দময় সময় ব্যয়ে আসা সাংবাদিকরা পত্রিকার সৌজন্য সংখ্যা ব্যবস্থার প্রতিশ্রম্নতি দিলেও কখনো তা রক্ষা করেনি। মালের ঘোরে নিচে নামতে-নামতে তাদের দেয় কথা ওখানেই ফেলে গেছে। দাদার এমন সাজানো নিশ্চয়তার ওপর কোনো আস্থাও নেই। মহাসমারোহে স্বাদে বুঁদ সঙ্গীরা হচ্ছে মৌচাকের মাছি, উড়লো-বসলো, সুযোগ বুঝে অন্য চাকে চলে গেল – ব্যস! দেশের, কি দুনিয়ার খবর মানে দুঃসংবাদ। টিভি দেখতেও তাঁর ইচ্ছা হয় না। হ্যাঁ, পুরনো সাদাকালো ছোট টিভি একটা রুমে অনেকদিন ধরে পড়ে আছে। টিভিতে গোলমাল, ছবি লাফায়, সাউন্ড পরিষ্কার নয় – গ্যা-গ্যা করে। মেরামত করার সাড়া তাঁর মনের মধ্যে টের পান না। মগবাজারের টিভি কোম্পানির পরিচিত মেকানিক যুবক মাইকেল শেষবার যন্ত্রপাতি সারাতে এসে রায় দিয়ে গেছে – দাদা, এরপর নষ্ট মানে ফিনিশ, চলবে না আর, বাতিল। ডিশ লাইনের ব্যবসায়ী আবু দাদার বাসার লাইন টেনে দিয়ে মাসে-মাসে কখনো ভাড়া নেয়নি। বেশ মজার মানুষ দাদা, তাঁর থেকে পুরনো দিনের কাহিনি, কত রঙ্গরসের গল্প শুনে মন ফুরফুরে করেছে সে। এমন বিশেষজ্ঞ মানুষটাকে ফ্রি-সার্ভিস দিতে পেরে সে তৃপ্ত; কিন্তু আবু তো দাদাকে টিভি দিতে পারে না। এ নয় টেলিভিশনের ব্যাপার, টিঅ্যান্ডটির ল্যান্ডফোনের সংযোগ গত সাত মাসের বিল বাকি পড়ায় বিছিন্ন। কী আর করা – সময়ের সঙ্গে পারা মুশকিল!

বেশ কিছুদিন হলো গোছগাছ দিনযাপনে বিঘ্ন ঘটছে। এলোমেলো হয়ে গেছে ছিমছাম থাকার উপায়। টানাটানি থাকতে পারে; কিন্তু ঘাটতি-কমতির জন্য মন বলছে শুরু হয়ে গেছে হারানো সুর। বীতশ্রদ্ধ দাদা অবসাদে বারান্দায় চেয়ার পেতে দৃষ্টি ধরে রাখেন রাস্তার উদ্দেশে। কী দেখছেন তিনি? না, নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে স্মৃতি খনন করে খোয়ানো অতীত ধরতে চাইছেন? বোঝা সম্ভব নয়। থমথমে মুখে একামেত্ম দাদা নিজস্ব স্মরণ নিয়ে বিভোর। বিড়ালগুলো মিউমিউ করুণস্বরে পায়ের পাশে বসে ডাকাডাকি করলেও তিনি সাড়া দেন না। খুঁটিনাটি থেকে ঘটনা পরম্পরা, তাঁর কুলবৃত্তি, প্রথা, ব্যবহার জোড়া দিয়ে-দিয়ে চূড়ান্ত উপলব্ধি করলে একটাই মানে – বয়সের তিনকাল গেছে, শরীর ভাঙবেই; কিন্তু মন ভেতরে-ভেতরে জখম হয়েছে বেশি। মন সারাবেন কী দিয়ে? সাতাত্তর বছর হতে যাচ্ছে, মনের ওপর দিয়ে তো ধকল কম যায়নি। এই যে তেতালিস্নশ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জীবন বাঁচাতে সব কিছু ফেলে বর্ডার পার হয়েছিলেন। সে কী দুঃসহ সময়! ফিরে এসে শোনেন, তাঁদেরই মাঠেঘাটে কামলা খাটা দুমুঠ খুদকুঁড়োর দরকারে ক্ষেতের ঢেলায় মুগুরমারা, সামান্য একটা পরগাছা মোজাম্মেল দলে-বলে গুপ্তবাড়ি লুট করেছিল। মন তছনছ চুরমার হয়ে যায়। সেই থেকে মন আর জোড়া লাগেনি, মজবুত, স্ফীত, তাজাও হয়নি। তাঁর বিমর্ষ মুখ পড়ে শুভাকাঙক্ষীদের অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন – একলা জীবন উদ্যাপনে কত দুর্ভোগ, অন্তহীন সমস্যা। বলা তো যায় না কোন সময়ে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়। তাঁর উচিত ভিটেমাটির মায়া ছেড়ে রক্ত সম্পর্কদের কাছে জীবনের বাকি দিন কাটানো।

 

তিন নম্বর পেগের শেষ ফোঁটা জিভে নিয়ে হুমায়ুন শূন্য গস্নাস ফ্লোরে রেখে মুখ তুলতেই সে ওপরমুখো নজরসহ জমে যায় – ঘটনা কী, দাদার মুখ কেমন ভারিক্কি। সে কি ঠিক দেখছে? অন্যদিন মুখের আঠা মুছে দাদার কথার পিঠে কথা, নিংড়ানো কত স্মৃতি, তাঁদের আমলের স্বচক্ষে দেখা নেতাদের বাহাদুরি বয়ান করেন তিনি। হুইস্কি আজ কি তাঁর পেটে ক্রিয়াই করছে না? মাল কি ভেজাল? উঁহুঁ, এই তো তাঁর নিজের শরীরের অলিগলিতে মাথার খুলির নিচে চমৎকার কত তালের বাজনা। তাহলে? দাদার কেন চনমনে ভাব নেই? কোনো কারণে তিনি কি বিষণ্ণ? নাকি, তাঁর শুকনো শরীর বয়সের ভার ও পীড়ন ধারণে এখন অসমর্থ? তাই যদি হয়, ড্রিংকস নিয়ে দাদার এখানে আসর বসানো ঠিক হচ্ছে না। বাসায় দাদার একা বসবাসও উচিত নয়। দাদাকে নিয়ে অকথিত কষ্ট নিজের মধ্যে লতিয়ে উঠলে পরিবারশূন্য বুড়া মানুষটার জন্য বিসত্মৃত মমত্ব হুমায়ুন নিশ্ছিদ্র টের পায়। দরদ-মহববতে তৈরি ফিনফিনে এক বাষ্প তাঁর অন্তস্তলে দ্রুতই ঘনীভূত হচ্ছে। না, অকেজো দাদার সঙ্গে হুইস্কি খাওয়া ঠিক হচ্ছে না। অসমর্থ কাঠামোর মানুষ, হাড়-মাংসে শাঁসের অভাব, দিন-দিন ক্ষীণ হচ্ছেন তিনি, এই মানুষটা পানের প্রতাপে হঠাৎ অসুস্থ হলে দুর্নামের ভাগীদার হবে তারাও।

হুমায়ুন দাদার হাতের গস্নাসটি নিয়ে নিচে রাখতে-রাখতে বলে – ‘আজ থাক।’ তখুনি দাদার মুখ থেকে খসে আসে অস্ফুট আর্তনাদ। এর মানে একটাই – বলো কী, সবে শুরু, আরো পেগ দুই পেটে না পড়লে শরীর বলো, মেজাজ বলো কিছুই উত্তম থাকবে না। এমন ব্যাখ্যা দাদার থেকে হুমায়ুন আগেও শুনেছে। বুঝি এবার সে হালকা কণ্ঠে রেহাই খোঁজে – ‘আরেক দিন ঠান্ডা ওয়েদারে বসা যাবে।’ দাদা ঘাড় কাত করে ফ্লোরে রাখা বোতল জরিপ করেন। তাঁর ধারণা, প্রায় সিকিভাগ আছে। হাত তুলে গস্নাসে তিনি মাল ঢালার ইশারা রাখতেই তাঁর চিবুক ঝুলে পড়ে। হুমায়ুনের ইচ্ছা হয় না। বিপদ না জানি আজই ঘটে। দেখো, মানুষটার অনুমানের ক্ষমতা কী অসাধারণ! শুধু মুখে চাহনি টেনে মনের কথা ধরতে এখনো ওস্তাদ তিনি। – ‘হুমায়ুন, আমি পুরো ফিট, ভয় নেই, ঢালো।’ বলেই খাটে নড়েচড়ে তিনি সরে বসতে গেলে প্রায় ঢলে পড়ার উপক্রম হন। হুমায়ুন খপ্ করে তাঁকে ধরে ফেলে। সকাতর গাঢ় স্বরে সে মাথা নাড়ে – ‘না দাদা। বোতলের লেফ্ট ওভার তো আপনার কাছেই থাকছে। একটা কথা বলি। কিছু মনে করবেন না।’

এরপর চুপ। শব্দশূন্য রুমের নীরবতা ক্রমশ ঘন হতে থাকে। এই একটা কথা বলার ব্যাপারে হুমায়ুন কি দ্বিধায় আছে? তাঁর চেহারা বলছে, কথা নিয়ে সে ভাবনাচিন্তা করছে। সঙ্গী দুজনের গস্নাস খালি হয়নি এখনো, তাঁরা বিরতি দিয়ে সিপ্ টেনে চলেছে। বোঝা যায়, পানে এখনো ঘাগু হয়নি এরা। – ‘বলো।’ আর্দ্র স্বরে দাদা সায় দিলে হুমায়ুন নিজের হাতের আঙুল দাদার আঙুলের ফাঁকে নিয়ে সদাচার রক্ষার মতো উচ্চারণ রাখে। ‘আমার মনে হয়, শরীরের যে-অবস্থা আপনার এখানে আর একা থাকা ঠিক নয়। যদি অনুমতি দেন, আমরাই ওই পারে আপনাকে রেখে আসতে পারি।’ দাদার ব্যাকব্রাশ পাতলা সাদা চুলের ওপর দিয়ে রুমের আলো বুঝি পিছলে যাচ্ছে। সুঁচালো নাকের ডগায় পড়া ফোঁটা আলোয় মুখচ্ছবিও ধরা যাচ্ছে না। তাঁর দৃষ্টি সামনের লবণাক্ত দেয়ালের ম্যাড়ম্যাড়ে রঙের ওপর স্থির। চারটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ছাড়া রুমে নিস্তব্ধতাই প্রধান। ধীরে দাদার ধ্যানী মূর্তির মৌনভাব ভেঙে গেলে শোনা যায় অতিশয় শান্ত কণ্ঠ – ‘দেখো, চারাগাছ মাটি থেকে তুলে আরেক জায়গায় লাগালেও বাঁচানো যায়। বড় হয়। কিন্তু গাছ বুড়ো হলে অন্য জায়গায় পুঁতে গোড়ায় শত জল ঢাললেও বাঁচানো যায় না। আমি বুড়ো গাছ, ওই পারে গিয়ে কি বেশি টিকবো?’ মর্মে জমা এমন জবানির পর তাঁর নিজস্ব মাটিতে থাকার ব্যাপক স্পৃহা রুমের মধ্যে হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply