বৃক্ষজীবন

লেখক:

মা হ বু ব  তা লু ক দা র

আ    মি একটা গাছ, নিতান্তই  গাছ, কিন্তু নিজেকে বৃক্ষ নামে ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে। বৃক্ষ শব্দটা বেশ ভারি মনে হয়। গাছ ছাড়াও বৃক্ষের অনেক নাম। এসব নামের মধ্যে তরু নামটা আমার পছন্দ। তবে এটা যেন একটা মেয়েলি নাম। বৃক্ষের মতো পৌরুষের প্রতিচ্ছবি মনে ভেসে ওঠে না এই নামে। আরেকটা সুন্দর নাম আছে আমাদের – মহীরুহ। এটা কি একটা পোশাকি নাম? এ-নামের সঙ্গে একধরনের অহংবোধ বুঝি জড়িয়ে আছে! মহীরুহ মানে কোনো বিশালত্বের বিষয়-আশয়। মানুষও অনেক সময় মহীরুহ হয়ে ওঠে। কীর্তিমান কোনো ব্যক্তি মারা গেলে বলা হয়, তিনি ছিলেন এক মহীরুহ। ব্যাপারটা বড়ই চমকপ্রদ। বড়মাপের মানুষকে যদি মহীরুহ বলা হয়, তাহলে আমি যে নিজেকে মানুষ বলে ভাবছি, তাতে আপত্তি কোথায়?

বৃক্ষ ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য ও মিল কোথায় বা কতখানি? উত্তরে বলা যায়, উভয়েরই প্রাণ আছে। পৃথিবীতে মানুষ বোধহয় একমাত্র প্রাণী যে মাটি থেকে লম্বালম্বি হয়ে দাঁড়াতে পারে, অনেকটা আমাদের মতো। মানুষ কথা বলতে পারে এবং আমরাও তা পারি। আমাদের কথা অন্যরা কেউ শুনতে বা বুঝতে না পারলে সেটা আমাদের দোষ নয়। মানুষের মতো আমাদের আবেগ আছে , দুঃখ-বেদনা আছে, এমনকি আনন্দ-সুখও আছে। সবচেয়ে বড় যে-জিনিসটা  আছে, তা হলো মানুষের মতো ভাব-বিহবলতা আর কল্পনা-বিলাসিতা। মানুষ যেমন অতীত নিয়ে ভাবতে পারে, তা আমরাও পারি। বর্তমানের আত্মচর্চা ও ভবিষ্যতের সমূহ সম্ভাবনা বা উদ্বিগ্নতা আমাদেরও আবিষ্ট করে রাখে। কিন্তু মানুষের সবার ভাববিকাশ যেমন একরকম নয়, আমাদেরও তাই। অনেক গাছ আছে, যারা শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য চমৎকার সব স্বাভাবিকতার আয়োজন আছে, আমাদের ক্ষেত্রে তা নয়। অর্থাৎ আমরা সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত।

নিজের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কিংবা বলতে গিয়ে আমি একটা কৌশল অবলম্বন করেছি। ধরা যাক, কেউ একজন আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। আমাকে একের পর এক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে, আর আমি তার উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। এমন সাক্ষাৎকার পৃথিবীতে কখনো ঘটবে না জানি, কিন্তু কল্পনা করতে অসুবিধা কী? কল্পনাই তো আমাদের মানসিক পরিবেশের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করে, আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করে, আমাদের বেঁচে থাকার ইন্ধন জোগায়। কল্পনা হচ্ছে অন্ধের যষ্টির মতো, যাতে ভর করে আমরা অজানা পথে পা ফেলতে পারি।

আমি খুব তত্ত্বমূলক কথাবার্তা বলে ফেলছি। তত্ত্বমূলক কিছু বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য নিজের কাহিনি বিবৃত করা। সেটা কোত্থেকে শুরু করা যাবে? নিজের জন্মকাল থেকে কি? মানুষ যখন জন্মায়, তখন তার জীবন শুরু হয়। না, কথাটা ঠিক নয়। জন্মের আগেও তার অন্য একটা জীবন থাকে। সেটা মায়ের জঠরে, সে যখন একটু একটু করে গঠিত হতে থাকে। আমার ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, আবার কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। আমার জন্ম কারো পেটে নয়, ঠোঁটে। একটা কাক ঠোঁটে করে আমার জন্মের বীজ নিয়ে এসেছিল। ওর সঙ্গীকে কা-কা করে ডাকার সময় বীজটা নিচে পড়ে যায়। ব্যস! হয়ে গেল! আমি মাটিতে ধরাশায়ী হয়ে জন্মাতে শুরু করলাম। মাটির এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে। অসম্ভব তার প্রজনন শক্তি। আমার বীজ মাটিতে পড়ার পর থেকে আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি সে। আমাকে পরম আদরে তার জঠরে নিয়ে দেহ গঠন করতে আরম্ভ করল। একটা গান আছে – ‘তুমি গঠিত যেন স্বপনে’। দারুণ গান! এক পিকনিক পার্টি আমার কাছাকাছি মাইকে গানটা বাজিয়ে দিয়েছিল। আমি সবটা বুঝতে পারিনি, বোঝার    কথাও নয়। অবশ্য আমাকে কেউ স্বপ্ন দিয়ে গঠন করেনি। আমি নিতান্ত জৈবিক নিয়মে বড় হচ্ছিলাম। একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিল আমার শরীর, এমনকি মনও। মানুষের মন শরীরের মধ্যে লেপ্টে থাকে।  আমারও কি তাই? কী জানি!

বীজ থেকে চারা হয়ে ওঠার গল্পটা অসাধারণ। অনেকটা মায়ের জঠরে শিশুর অবয়ব পাওয়ার মতোই। যেদিন প্রথম বুঝতে পারলাম আমার শারীরিক গঠনের পরিবর্তন ঘটছে, আমার সারাশরীরে কী যে এক রোমাঞ্চ ও শিহরণ অনুভব করলাম! সম্ভবত এর চেয়েও বিশেষ আরেকটা অনুভূতি মনের মধ্যে জেগে উঠল। সেটা হচ্ছে, পৃথিবীর পরিবেশে আমার প্রথম আত্মপ্রকাশের অনুভব। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি শুধু জন্মাইনি, আমি সাত রাজার ধন কোনো মানিক পেয়ে গেছি। সূর্যের আলোর প্রথম রশ্মি গায়ে মেখে, বৃষ্টির প্রথম ফোঁটায় স্নান করে, ভোরের বাতাসে আন্দোলিত হওয়ার যে আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কে যেন কানে কানে বলে দিলো, ‘এটা হচ্ছে ধরিত্রী, এর পরিপার্শ্ব হচ্ছে নিসর্গ। তুমি এই নিসর্গের মধ্যে জীবনযাপন করবে।’ পৃথিবীর সঙ্গে সেটাই আমার পরিচয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে আত্ম-আবিষ্কারের উন্মাদনা আমাকে বিভোর করে তুলল।

আমি যেখানে বড় হচ্ছিলাম, সেটা এক বিশাল বনভূমি। বনভূমি মানে সেখানে তেমন কোনো বন নেই, আছে গাছগাছড়া, তরুলতা। মানুষজন এখানে খুব একটা আসে না। লোকে বলে, এখানে নাকি বাঘ দেখা যায়। বাঘকে মানুষ এতো ভয় পায় কেন? বাঘ কি মানুষের চেয়ে হিংস্র! যাকগে, এসব আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। প্রথম যেদিন আমি মানুষের দেখা পেলাম, সেটি আমার জীবনের স্মরণীয় দিন। কী আশ্চর্য! মানুষ দেখার আগেই আমি মানুষের কথা জানি। সেটা কীভাবে সম্ভব জানি না। কিন্তু মানুষ কী, দেখতে কেমন, তারা কী করে, আমাদের মতো কোনো প্রাণী কিনা, সে-রহস্যের উদ্ঘাটন তখন হয়নি। শুধু মনে কল্পনা করছিলাম, মানুষ নিজের ক্ষমতায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে।

কিন্তু আমার জীবনে প্রথম মানুষ দেখার অভিজ্ঞতা ভিন্ন প্রকৃতির। সেদিন চলমান যে দুটো প্রাণীকে দেখলাম, তারা অন্য প্রাণীদের মতো মোটেই নয়। সব প্রাণীর দেহই মাটির সঙ্গে সমান্তরাল, কিন্তু ওরা ছিল মাটি থেকে ওপরের দিকে লম্বালম্বি। বুঝতে অসুবিধা হলো না, এরাই মানুষ। আমি ওদের ভাষা আর কথাবার্তা বুঝতে চেষ্টা করলাম।

একজন বলল, দূর ছাই! এ-জঙ্গলে বাঘ তো দূরের কথা, একটা খরগোশ পর্যন্ত নেই। লোকে যে কেন এটাকে শিকারের গড় নাম দিয়েছে, কে জানে!

বাঘ না পাই, পাখি তো নিশ্চয়ই পাব। আরেকজন বলল।

ধুস্! পাখি মেরে কী হবে? শুধু শুধু পয়সা খরচ।

পয়সা খরচ মানে?

একটা গুলির দাম কত? আর একটা পাখি?

টাকার হিসাব করলে বন্দুক নিয়ে শিকার করতে আসা কেন? সময়েরও তো দাম আছে। সেসব হিসাবে পুরোটাই লস।

ভেবেছিলাম বাঘ মেরে বাঘের ওপরে পা রেখে ছবি তুলব। ছবি দেখে সবাই ধন্য ধন্য করবে। কিন্তু কিছুই হলো না।

এতো হতাশ হয়ো না। বাঘ যদি মারতেই হয়, তাহলে সুন্দরবনে যাও। রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারো। এসব বনবাদাড়ের গেছোবাঘ মেরে লাভ কী?

সেটাও তো ভাগ্যে জুটল না। ওই যে একটা ঘুঘু দেখা যাচ্ছে। চালাব নাকি বন্দুক?

মশা মারতে কামান দাগা!

কী আর করা? খালি হাতে বাড়ি ফিললে বউ-বেটি বলবে, এক পয়সার মুরোদ নেই!

এর সঙ্গে মুরোদের কী সম্পর্ক?

আর বলো না। এটা ওর মুখের লব্জ। কথায় কথায় বলে আমার মুরোদ নাই। মুরোদ আছে কি নেই, সে তো প্রতিরাতেই টের পাচ্ছে।

প্রতিরাতেই মুরোদের পরীক্ষা দিচ্ছ নাকি?

তুমি একটা আহাম্মক! মুরোদ কাকে বলে তা কি বোঝ?

আমি তো বিয়েই করিনি। কী করে বুঝব?

এরপর কিছুটা নীরবতা। হঠাৎ বন্দুকের শব্দে আমি চমকে উঠলাম। আমার সারাশরীর ওই শব্দে তিরতির করে কেঁপে উঠল। কী আশ্চর্য! শব্দটা দূরে হলেও আমি কেঁপে উঠলাম কেন? আসলে শব্দের একটা প্রচণ্ড শক্তি আছে। অনেকদিন আগে আকাশপথে একটা উড়োজাহাজ উড়ে যাচ্ছিল। ওর ওড়ার শব্দে মাটিও কেঁপে উঠছিল তখন। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, উড়োজাহাজের সঙ্গে তো তখন মাটির কোনো সম্পর্ক ছিল না। তারপরও মাটি কেঁপে উঠল কেন? আর যখন মাটিই কেঁপে উঠল, আমার কাঁপুনি কোন ছার! আমার মনে হয়েছিল, ওই শব্দের ধাক্কায় আমি মরে যাব। ধাক্কা কথাটা এখানে যথাযথ হলো কিনা জানি না। জুতসই আর কোনো শব্দই খুঁজে পাচ্ছি না।

আকাশের ওই শব্দই আমার মনে প্রথম মৃত্যুর অনুভূতি বয়ে আনে। যারা প্রাণীবাচক, তাদের প্রত্যেককে একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এর মানে হচ্ছে, মৃত্যুই জীবনের পূর্বশর্ত। আমি একদিন মরে যাব, এই অনুভূতি সেদিন থেকে আমার মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। মানুষের মধ্যেও কি এমন মৃত্যুভীতি থাকে? মৃত্যুকে কি আদৌ কেউ কখনো জয় করতে পারে?

বন্দুকের শব্দের কথা বলতে গিয়ে আমি মৃত্যুচিন্তার দিকে চলে গিয়েছিলাম। আমার ভাবনাগুলো এরকমই এলোমেলো। অনেক সময় ভাবনার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমি হয়তো কিছু নিয়ে ভাবছি, ভাবনা আমাকে আলগোছে অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এ মুহূর্তে আমি ভাবতে চেষ্টা করছি, মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে, তা নিয়ে। একটা অবোধ ঘুঘু পাখি গাছের ডালে একাকী বসে ছিল। সে তো কারো কোনো ক্ষতি করেনি। তাহলে মানুষের ইচ্ছার খেলায় তাকে প্রাণ দিতে হবে কেন? আমি নীরবে ওদের কথাবার্তা শুনতে থাকলাম।

শেষ পর্যন্ত তুমি একটা ঘুঘুই মারলে?

দুটো ঘুঘু ছিল। ভেবেছিলাম, এক গুলিতে দুটোকে সাবাড় করব; কিন্তু গুলি ছোড়ার আগেই আরেকটা ফুড়ুত করে উড়ে গেল। একটু খুঁজে দেখতে হবে ওটা কোথায় গেছে। পেলে ওটাকেও বধ করব।

বাঘ মারতে এসে ঘুঘু মারা?

বড় গুলি কাজে লাগাইনি। ছররা গুলি ব্যবহার করেছি।

দেখি, আরো যদি দু-একটা পাখি পাই, একবেলা রান্না তো হতে পারে। একেবারে খালি হাতে ফিরতে হবে না।

অদূরে পতিত রক্তাক্ত ঘুঘুটাকে তুলে নিয়ে ওরা অন্যদিকে চলে গেল। লোক দুজনকে আমি এরপর আরো কয়েকবার দেখেছি। ওরা একরকম আমার পরিচিতই হয়ে গেছে। একজনের সঙ্গে তো আমার জীবন-মরণের সম্পর্ক। তার নাম হাসান। দুজনের কথাবার্তার ভেতর থেকে ওদের উভয়ের নাম আমার জানা হয়ে গেছে। আমি যে বলেছি, হাসানের সঙ্গে আমার জীবন-মরণের সম্পর্ক, এতোটুকু বাড়িয়ে বলিনি। কয়েক বছর পর আমি যখন আগের তুলনায় আরেকটু বড় হয়েছি, তখন ঘটল সেই ঘটনা। তবে এটাকে ঘটনা না বলে দুর্ঘটনা বলাই অধিকতর যুক্তিসংগত।

সেদিন দুপুরে ওরা দুজন এখানে এসেছিল। তবে শিকারের উদ্দেশ্যে নয়। কী উদ্দেশ্য, সেটা প্রথমে আমিও বুঝতে পারিনি। ওরা সঙ্গে করে এনেছিল লম্বা একটা দড়ি কিংবা ফিতা। হাসান বলল, গড়ের মধ্যে এ-জায়গাটাই সবচেয়ে ভালো, গড়ের ভেতরের দিকে কেবল জঙ্গল। বসবাসের জন্য মোটেই উপযোগী নয়।

হাসানের সঙ্গী জাভেদ বলল, আমি ভাই জঙ্গলটাই দখল করতে চাই। ওখানে যেসব গাছ আছে, ওগুলো কেটে কেটে বিক্রি করতে পারলে অনেক লাভ।

ওগুলো সব সরকারি জঙ্গল। বনবিভাগের লোকেরা পাহারা দেয়।

তাতে আমার কী? বনবিভাগের লোকদের কীভাবে বশ করতে হয়, আমার জানা আছে। সরকারের পাহারাদাররাই পরে আমার হয়ে পাহারা দেবে।

আমার অত কিছু দরকার নেই। এই জায়গায় দুটো ঘর তুলে বসবাস করতে পারলেই হলো। নতুন বউ বলেছে, বিয়ের পর মেয়েরা বাপ-মায়ের সঙ্গে থাকতে চায় না। নিজের আলাদা সংসার পেতে চায়। কাছাকাছি তো বাড়িঘর হয়েছে। এই জায়গাতেই করব নিজের বাড়ি। জায়গাটা ভিটেবাড়ির মতোই মনে হয়। কী বলো?

ভালোই তো! জঙ্গলের কাঠ কাটতে এসে তোমার বাড়িতে  দুপুরবেলা খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

আগে তো ঘর তুলি! তারপর-

ঘর তুলতে আর কতক্ষণ?

কথা বাড়িও না। ফিতাটা ধরো। ঘরের মাপটা ঠিক করে দাও।

ওরা দুজন অনেকক্ষণ ধরে জায়গা-জমি মাপজোখ করল। আমার চারপাশে মাপামাপি করতে বুঝতে পারলাম, আমার ওপরেই ঘর তোলার ব্যবস্থা করছে ওরা। তাহলে আমার কী পরিণতি হবে? ঘরের প্রয়োজনে আমাকে হয়তো উপড়ে তুলে ফেলবে। তারপর আমি কোথায় যাব? বুঝতে পারলাম, আমার অস্তিত্ব বিপন্ন। শিকড় থেকে বিচ্যুত হলে আমার অবস্থা কী হবে? হয়তো শুকিয়ে মরে পড়ে থাকব মাটির ওপরে। তারপর আমার ক্ষুদ্র দেহ ধীরে ধীরে মিশে যাবে মাটির ভেতর। বাতাস ও রোদের প্রলেপ থেকে বঞ্চিত হয়ে আমি কি নির্বাণ লাভ করব? নাকি, মাটির ভেতর থেকে অঙ্কুরিত হয়ে আবার জীবনচক্রের মধ্যে ফিরে আসব? এসব ভেবে আমি অনুভব করলাম, দিনদুপুরে আমার চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।

অকস্মাৎ একটা অস্ফুট আর্তনাদ শুনতে পেলাম। হাসান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। জাভেদ ছুটে এলো তার কাছে। সেও হাসানের নিকটবর্তী হয়ে আর্তচিৎকার জুড়ে দিলো। হাতের ফিতাটা দিয়েই হাসানের একটা পা পেঁচিয়ে বেঁধে দিতে থাকল। তারপর হাঁটুর ওপরে আরেকটা গিঁট দিলো।

মুমূর্ষু হাসান বলল, কালসাপ। আমি দেখেছি। ছোবল মেরেই চলে গেল। আমাকে বাসায় নিয়ে চলো। আমি আর বাঁচব না।

ভয়ের কিছু নেই। নবা ওঝাকে ডেকে নিয়ে আসব। ওই সাপকে দিয়েই বিষ ঝেড়ে দেবে সে।

আমার খুব ভয় করছে। হাসান আর্তনাদ করল, বউ, তুমি কোথায়?

জাভেদ বলল, বাড়িতে গেলেই বউয়ের দেখা পাবে। চোখ বন্ধ করো না। মনে সাহস রাখো।

আমার খুব ঘুম পাচ্ছে ভাই।

কোনোভাবেই এখন ঘুমানো যাবে না। চোখ খোলা রাখো।

জাভেদ ওকে কাঁধে তুলে নিয়ে আমার সামনে থেকে সরে গেল। পুরো ঘটনার আকস্মিকতায় আমি বিমূঢ়। যেখানে ওরা আমার অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলেছিল, সেখানে এখন হাসানের অস্তিত্বই বিপন্ন। সাপটিকে আমি আগেও দেখেছি। আমার পাশ দিয়ে দু-চারবার সে বয়ে চলে গেছে। ওর চলার ভঙ্গিটা অসাধারণ। চলার সময় ওর ফণা তোলা থাকে না। কিন্তু বাধা পেলে বা কোনো শব্দ পেলে সে মুহূর্তে ফণা তুলে ফেলে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ওর প্রতিক্ষণের সতর্কতা। ওটা কেউটে জাতীয় সাপ। ওদের বিষের খ্যাতি সর্বজনবিদিত।

আমি ভাবছিলাম, মানুষের মতো বিষধর প্রাণী পৃথিবীতে আর কিছু নেই। মানুষের নিজেদের কোনো বিষ নেই, কিন্তু ওদের বিষাক্ত মন আছে। মনের বিষ দিয়ে ওরা প্রাণ-হন্তারক বিষ তৈরি করে থাকে। বিষ মানে – অস্ত্র, গোলাগুলি, আণবিক বোমা, যা জীবের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। এছাড়া রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাত বিষ তো আছেই। এসব কথা ভাবতে গিয়ে হাসান ও জাভেদের প্রথম দিনের পাখি শিকারের ঘটনাটা মনে পড়ল। ওরা দুজন গড়ে এসেছিল খেলাচ্ছলে হত্যা করার জন্য। ঘুঘুটি ওদের কোনো ক্ষতি করেনি। তবু ওরা নিরীহ পাখিটির প্রাণসংহার করেছে। যে-সাপটি হাসানকে দংশন করেছে, সে কিন্তু খেলাচ্ছলে তা করেনি। ভয় পেয়ে অনেকটা আত্মরক্ষার তাগিদে করেছে। সেদিক থেকে সাপটিকে আমি অধিকতর নিরীহ বললে অন্যায় হবে কি? পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণী মানুষের চেয়ে অনেক বেশি নিরীহ। আর আমরা যারা বৃক্ষ বা গাছ, তাদের তো কারো উপকার ছাড়া অপকার করার কোনো ক্ষমতাই নেই। সৃষ্টিকর্তাকে সেজন্য ধন্যবাদ।

পৃথিবীতে যা-কিছু ঘটে সবই বিস্ময়কর। প্রতিটি ঘটনার পেছনে অনুঘটক হিসেবে থাকে অদৃশ্য কারো অদ্ভুত আচরণ। এহেন রহস্যের কোনো কূলকিনারা নেই। আমার সামনেই স্থাপিত হলো এর উদাহরণ। আমার অদূরে হাসানের দাফনের জন্য কবর খোঁড়া হলো। তার আত্মীয়-স্বজন এসে তাকে শায়িত করল সেই কবরে। কবরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করা হলো। আমি সবিস্ময়ে লক্ষ করলাম, হাসান যেখানে তার বাড়ি বাঁধতে চেয়েছিল, সেখানেই সে চিরনিদ্রায় শায়িত। মাটির ওপরে বাসস্থানে তার থাকা হলো না, মাটির তলের ঘরে তার চিরস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা হলো।

আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। জাভেদ আচমকা এসে শিকড়সুদ্ধ আমাকে উপড়ে ফেলতে চাইল। কিন্তু কাজটা এতো সহজসাধ্য ছিল না। আমাকে তোলার জন্য গোরখোদকদের কাছ থেকে সে একটা কোদাল নিয়ে এলো।

এ কী করছেন জাভেদ ভাই? কে একজন জিজ্ঞাসা করল।

গাছটা তুলছি।

গাছ তুলে কী করবেন?

দেখো কী করি! জাভেদ বলল।

কী গাছ এটা?

তা জানি না। বলতে বলতে জাভেদ আমাকে সমূলে উপড়ে ফেলল। আসন্ন মৃত্যুর ভয়ে আমি আতংকিত হলাম। আরো একবার এমন মৃত্যুর আশঙ্কা করেছিলাম। এবার কি সত্য সত্যই মৃত্যু হবে? নাকি সারাজীবন এরকম মৃত্যুভয়ে ভীত থাকব?

জাভেদ অবশ্য অতি যত্নসহকারে আমাকে উৎপাটন করল। আমার শিকড়ের মাটিগুলো যাতে খসে না পড়ে সেদিকে সে যথেষ্ট যত্নবান মনে হলো। এরপর সে কবরের মাঝখানে গর্ত করে আমাকে তাতে পুঁতে দিলো। আমার শরীরে কিছু পানিও ছড়িয়ে দিলো সে। আমি আশ্বস্ত হলাম।

কবরের চারপাশ বাঁশের বেড়া আর মাঝখানে আমি। মনে মনে ভাবলাম, জাভেদ লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিলাম, ততটা খারাপ সে নয়। আমাকে যেভাবে রাজকীয় সুরক্ষা দিয়ে কবরের মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে, তাতে আমি মৃত হাসানের প্রতিও এক গভীর সংবেদনশীলতা অনুভব করলাম।

এরপর শুরু হলো আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায়। বাঁশের বেড়াটাকে পাকাপোক্ত করে আমাকে আরো অধিকতর সুরক্ষা দেওয়া হলো। হাসানের স্বজনরা মাঝে মাঝে এসে কবর জিয়ারত করে। তারা আমার প্রতিও যথেষ্ট যত্নবান। খরার সময় আমার চারপাশে পানি ছিটিয়ে দেয়। আমি যাতে শুকিয়ে না যাই, সেজন্য তারা সবসময়ই সচেতন।

কিন্তু সময় বড় সাংঘাতিক বিষয়। সময়ই পরিবেশ-প্রতিবেশের সবকিছু পালটে দেয়। সময় হরণ করে মানুষের জীবনের চলমান প্রক্রিয়া। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর ঘটায় সময়ের অভিনব কারসাজি। কয়েক বছরের মধ্যে লক্ষ করলাম, হাসানের কবরে স্বজনদের আনাগোনা কমে গেছে। কালেভদ্রে কেউ তার কবর জিয়ারত করতে আসে। কিন্তু কবরের বাঁশের বেড়াগুলো যে ভেঙে অন্তর্হিত হয়েছে, সে সম্পর্কে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। গত দুবছরের মধ্যে জাভেদকেও এখানে আসতে দেখিনি। আরো কিছুদিন পরে লক্ষ করলাম, কবরটি আর কবরের মতো নেই। তার সব নাম-নিশানা মুছে গেছে। কালক্রমে কবরের স্থানে একাকী দাঁড়িয়ে আছি আমি। এতোদিন নিজেকে আমি চিনতে পারিনি। জানতে পারিনি আমার পরিচয়। আমার নামই-বা কী? এক হিন্দু পুরোহিত এখান দিয়ে যাওয়ার সময় তার ছোট ছেলেটিকে বলল, একে প্রণাম করো। এ যে বটবৃক্ষ! সাক্ষাৎ দেবতা।

কথাটা আমার মনের মধ্যে তরঙ্গ তুলল। আমি তাহলে বটবৃক্ষ। আমি কোনো সাধারণ গাছ নই। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখার কোনো উপায় আমার নেই। অন্যরা যখন আমার কাছে এসে দাঁড়ায়, আমি বুঝতে পারি, আমি এক অসাধারণ কোনো বৃক্ষ, যাকে ঈশ্বরের প্রতিভূ মনে করা হচ্ছে। বছরের পর বছরে বেড়ে উঠেছি আমি। আমি এখন এক মহীরুহ। আমার নাম বটবৃক্ষ।

আমি যে কত অসাধারণ তা বুঝতে পারলাম আরো অনেক বছর পর, যখন আমার শরীর থেকে ঝুরি নামতে শুরু করেছে। বার্ধক্যের মধ্যেও যেন এক নতুন সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, যার দিকে সবাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ততদিনে আমি এতদঞ্চলের পূজনীয় বিষয়ে রূপান্তরিত হয়েছি। একজন পুরোহিত সার্বক্ষণিকভাবে আমার পরিচর্যায় ব্যস্ত। সে আমার পাদদেশে সিঁদুর মাখিয়ে দিয়েছে। দানবাক্স রাখা হয়েছে সেখানে। লোকজন দেখলে পূজারি মাটিতে লুটিয়ে প্রণাম করে আমাকে। শুধু হিন্দুরা নয়, মুসলমানরাও এখন দলবেঁধে আসে আমার চারপাশে। কোনো এক মুসলিম নারীর এতোদিন সন্তান হয়নি। আমার বেদিতে সহস্তে লোবান জ্বালিয়ে দেওয়ার পর তার সন্তান হয়েছে। এ-ঘটনায় সাড়া পড়ে গেছে এই অঞ্চলে। মুসলমানরা সপরিবারে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করে। হিন্দু সম্প্রদায় আমার কাছে এসে সত্যনারায়ণের পূজা দেয়, আর মুসলমানরা দেয় সত্যপীরের শিরনি। হিন্দু-মুসলিম দুটো সম্প্রদায়ই আমার কাছে এসে এক হয়ে গেছে দেখে আমার মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।

কিন্তু জীবন তো এক বহমান নদী নয় যে একভাবে বয়ে চলবে। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে কালান্তরে টিকে থাকাই হচ্ছে জীবন। অনেক বছর পরে একদিন আমি আবিষ্কার করলাম যে, আমি নিতান্ত নিঃসঙ্গ, একক। আমার চারপাশে আর আগের মতো মানুষের ভিড় নেই। নেই সেই পুরোহিত কিংবা মুসলমানদের রওজা। কী করে এমন হলো, কেন এমন হলো, বুঝতে পারলাম না। পরে অবশ্য কিছুটা বুঝেছি যে, দেশের মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা চলে গেছে এ-দেশ ছেড়ে। যেসব মুসলমান আমার কাছে আসত, তাদের কারা যেন শাসানি দিয়ে বলেছে, সত্যপীরের শিরনি মানে, সত্যনারায়ণের ভোগ। এদেশে এসব চলবে না। কিছু কিছু কথা বাতাসে ভেসে বেড়ায় বলে আমি বুঝতে পারি। আরো বুঝতে পারি, শতবর্ষী আমার কাছে যে-কোনো পরিবর্তনই স্বাভাবিক।

এখন সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এই গড়ে। সেখানে স্থানে স্থানে বন কেটে বসত গড়ে উঠেছে। বনদস্যুরা রাতের আঁধারে বড় বড় গাছ কেটে বন উজাড় করে দিয়েছে। তারা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কাছ থেকে বন উজাড় করার অদৃশ্য সনদ নিয়ে এসেছে। ওরা নৃশংস হত্যাকারী, ডাকাত। ওদের রোধ করার কেউ নেই। আমি বুঝতে পারি, এই গড়ে একদিন আর কোনো গাছ থাকবে না। শূন্যতা খাঁ-খাঁ করবে চারপাশে। এখানে যে কোনোকালে বন বা জঙ্গল ছিল, কোথাও তার নাম-নিশানা থাকবে না। সময় সবকিছু গিলে খেয়ে ফেলবে। কেউ বাধা দেবে না। নিজের অসহায়ত্বকে কেউ পরিমাপও করতে চাইবে না। কী ভয়ংকর হবে সেই দিন!

একদিন এক ব্যক্তি এসেছিল এখানে। খোঁজ করেছিল তার দাদার দাদার কবর। সে শুনেছে একটা বড় গাছ উঠেছিল তার বড় দাদার কবরের ওপর। আমার জরাজীর্ণ ঝুরি নামা শরীর দেখে সে আমাকে চিনতে পারেনি। আমি যে সেই বটবৃক্ষ, একবার তার মনে হয়নি। আমি বারবার তাকে কাছে ডাকছিলাম, ‘ওরে! আমার কাছে আয়। আমার শিকড়ের তলায় আমি আগলে রেখেছি তোর সেই দাদার দাদা হাসানকে। তোর পূর্বসূরি তো আমার আশ্রয়েই আছে শতবর্ষের অধিককাল ধরে। তুই কাছে আয়। আমাকে স্পর্শ কর। তোর স্পর্শে আমি যেন যৌবনের ঘ্রাণ পাই।’ কিন্তু সে কিছুই শুনতে পেল না। আমার নিষ্ফল হাহাকার তার কান পর্যন্ত পৌঁছাল না। আমি বুঝতে পারলাম, এই শহরবাসী বা প্রবাসী মানুষটা জীবনে বটগাছ দেখেনি। সে আমাকে চিনবে কী করে?

আমার দুঃসময় ঘনিয়ে এলো আর কিছুদিন পরে। কয়েকজন সাহেব-সুবো ধরনের লোক কিছু শ্রমিককে নিয়ে এই এলাকা মাপজোখ করতে এলো। ওদের কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম, এখানে এরা কোনো কারখানা বসাবে। বনের কোনো প্রয়োজন নেই, এখন প্রয়োজন কলের। প্রকৃতি বা নিসর্গকে হত্যা করে এখন যন্ত্রের আবাদ করা হচ্ছে, এমনকি কৃষির আবাদও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবার কি মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে আমাকে? আমার কি অস্তিম দিন ঘনিয়ে এসেছে? এ পৃথিবীকে অনেকদিন ধরে দেখলাম। এর আলো-বাতাস ও জলে পরিপুষ্ট হয়েছি দিনের পর দিন। এবার শেষ অধ্যায়। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। জীবনের পূর্বশর্তের নাম মৃত্যু!

একদিন সকালে কতগুলো লোক এলো পুলিশ নিয়ে। ওরা এই বনের দখল নিতে এসেছে। কিন্তু পুলিশ কেন? তা বোঝা গেল একটু পরে। পুলিশরা পজিশন নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কোত্থেকে এগিয়ে এলো অসংখ্য মানুষ। একজন-দুজন নয়, শত শত নয়, সম্ভবত হাজার ছাড়িয়ে। তাদের হাতে হাতে পস্ন্যাকার্ড, গলায় স্লোগান : ‘এই গড়ে কারখানা বানানো চলবে না,’ ‘প্রকৃতি ও পরিবেশের হত্যাকারীদের রুখে দাঁড়াও, ‘শতবর্ষী বটবৃক্ষকে বাঁচাতে হবে’। ওরা আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করল। পুলিশরা দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। কিন্তু এরা কারা? এরা প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা বলে! আমাকে বাঁচানোর জন্য ওরা পুলিশের উদ্যত রাইফেলের নলের মুখে নির্ভয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়? কারা এরা? এরা কেমন লোক, যারা নিজের প্রাণের বিনিময়ে গাছের প্রাণ বাঁচাতে চায়? এদের কথা কেন আমি জানতে পারিনি? আমি মানুষকে কেবল প্রতিপক্ষ ভেবে এসেছি, কেবল সন্দেহের চোখে দেখেছি ভেবে নিজেই লজ্জা পেলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার পাশের ছোট-বড় সবগুলো গাছ সবুজ পাতার হিল্লোলে এই নতুন প্রজন্মকে স্বাগত জানাচ্ছে। পৃথিবীটা সত্যি বড় সুন্দর। ‘প্রকৃতি, জেগে দেখ! কারা আমাদের জন্য আজ মানববন্ধন করছে! এদের বন্দনা গাও সবাই।’

দখল নিতে না পেরে দখলদাররা ফিরে গেল। ফিরে গেল মানববন্ধনের সব মানুষ। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এলো গড়ের জঙ্গলে। কিন্তু একি! কারা যেন লুকিয়ে আসছে আমার চারপাশে। নিশ্চয়ই কোনো গোপন অভিসন্ধি আছে ওদের। সেসব বোঝা গেল আরেকটু পরে। কয়েকজন বনদস্যু বৈদ্যুতিক করাত হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। ওইসব গুপ্তঘাতকের লক্ষ আমার সংহার। আমি যে শতবর্ষী বটগাছ! আমার জন্যই তো মানববন্ধন হয়েছে আজ সকালে।

লোকচক্ষুর অন্তরালে আমার কা- থেকে শরীর বিচ্ছিন্ন করতে অনেক ভোগাস্তি হয়েছে ওদের। আমার ঝুরিগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করেছে আত্মরক্ষার জন্য। কিন্তু যন্ত্রদানব আর মনুষ্যরূপী দানবদের কাছে কত অসহায় আমরা।

রাতের অন্ধকারে আমি টুকরো হয়ে পড়ে আছি আহত সৈনিকের মতো। বারবার মনে হচ্ছিল মানববন্ধনের মানুষগুলোকে ডেকে বলি, আমাদের হত্যা করে ওই দানবরা কোনো দিন জয়ী হতে পারবে না। কাল সকালে তোমরা যখন এখানে আসবে, দেখবে, আমাদের শরীর থেকে গড়িয়ে পড়ছে মানুষের মতোই লাল লাল রক্ত, ওদের পরাজয়ের রক্তলেখা।

সারা বনভূমিজুড়ে এখন শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিদের অবিশ্রান্ত আর্তনাদ। প্রথমে মনে হয়েছিল, তা বুঝি আমার জন্য উৎসর্গীকৃত ওদের শোকের সংগীত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ওদের কণ্ঠে বেজে উঠছে মানুষের জন্য ঘুম ভাঙানিয়া গান। এ-গান তারা পৌঁছে দিতে চায় সকালের সেই মানববন্ধনকারীদের কাছে, দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে প্রস্ত্তত হতেছে ঘরে ঘরে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply