বৃষ্টির ছাট

লেখক:

মঈনুল আহসান সাবের

মৃণ্ময়ী খুব অবাক হয়ে গেল যখন সাহান বলল রতন আদনানকে সে চেনে। সাহান অবশ্য নিজেও অবাক, সে বলল – গড, আমার এতো সময় কেন লাগল! সে বলল – মৃ, তুমি এক কাজ করো, তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও।

রতন আদনান সাহানের সম্পর্কের মামা শহীদ রেজা টুকলুর বন্ধু। সাহান লোকটাকে দেখেছেও বারদুই। হয়তো কথাও হয়েছে। সে বেশ আগের কথা। তারপর আর কথা হয়নি। কারণ টুকলু মামার সঙ্গেই সম্পর্ক নেই। টুকলু সাহানের বাবার কাছ থেকে ব্যবসা করার জন্য বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে বেশ অনেকদিন হলো নিরাপদ দূরত্বে আছেন।

সাহান বলল – টুকলু মামাও ফ্রড, এ-লোকটাও দুনাম্বার, আর কী হবে!

মৃণ্ময়ী বলল – বুঝলাম। কিন্তু আমার চাকরি ছাড়ার ইচ্ছা নেই।

– তুমিই অনেকবার বলেছ লোকটা বিরক্তিকর। ঝামেলা করছে।

মৃণ্ময়ী বলল – হু, বলেছি…।

চাকরিতে ঢোকার পরই মৃণ্ময়ীর মনে হয়েছিল, এই রতন আদনান লোকটা ভাব নিতে পছন্দ করে। প্রথম বিশ-পঁচিশটা দিন লোকটা পুরোই উদাস, যেন আশেপাশে কেউ আছে কি নেই, এটাও জানা নেই। এ যে বানানো, বোঝা যাচ্ছিল, ভাব দেখে মৃণ্ময়ীর বলতে ইচ্ছা করছিল – বাহ্! এভাবে মাস দেড়েক গেল বোধহয়, লোকটা বলল – তুমি আমাকে রতন বলতে পারো।

হায় রতন! মৃণ্ময়ী মনে মনে বলল।

সাহানকে এই কথা ফোনে জানালে সাহান বলল – বাহ্, বস দেখছি ভালো। এক কাজ করো, উঠতে-বসতে রতন রতন করে ডেকে যাও।

লোকটার বয়স ৫০, হয়তো আরো কিছু বেশি, মৃণ্ময়ী অফিসেই শুনেছে, তবে সেটা বোঝা যায় না। বয়সের তুলনায় মজবুত শরীর। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, খাড়া কান, কখনো মুখে এলোমেলো দাড়ি – সব মিলিয়ে বেশ নজরকাড়া। সে যে নজরকাড়া, এটা লোকটার জানা আছে, কোন অবস্থায় তাকে বেশি ভালো দেখায়, এ-ব্যাপারেও সজাগ। তাই লোকটা কাজ করতে করতে হঠাৎ উদাস হয়ে কোনো একদিকে তাকিয়ে থাকে। এ-সময় লোকটাকে বেশ লাগে। একদিন, লোকটা যখন বেশ উদাস উদাস, মৃণ্ময়ী তাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করল। জিজ্ঞেস সে না করলেও পারত, তার জিজ্ঞেস করার কী দরকার, আসলে একটু মজা করার সুযোগ সে হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না, কিংবা তার হয়তো একটু টোকা মারার ইচ্ছা হয়েছিল। সে যাই হোক, সে জিজ্ঞেস করল – স্যার, আপনি কি কিছু ভাবছেন?

কে? লোকটা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল – কে? আমি?

মৃণ্ময়ী মনে মনে বলল – এসব ভান মেয়েদের সামনে করে কি তেমন লাভ হয় আপনার। এসব মেয়েরা খুব সহজেই বুঝে ফেলে! সে অবশ্য হাসল বাইরে – জি স্যার, আপনি। হঠাৎ হঠাৎ খুব আনমাইন্ডফুল হয়ে যান।

উদাস, না? আর বোলো না। রতন আদনান হাসল। জানি এটা। কশাসও থাকতে চাই। কিন্তু সবসময় খেয়াল থাকে না।

সাহান যখন চাকরি ছেড়ে দিতে বলল, মৃণ্ময়ী বোঝার চেষ্টা করল সাহান কতটা সিরিয়াসলি বলছে। এই চাকরি, কিংবা কোনো চাকরিই তার করার ইচ্ছা ছিল না। একটা হিসাব ছিল তার, পরীক্ষার পর মাস চারেক সময় হাতে থাকবে। রেজাল্ট বেরোতে বেরোতে সাহানেরও থিসিসের কাজ শেষ করে ফেরার সময় হবে। এই সময়টা, সে যেমন সাহানকে বলেছিল – তুমি না ফেরা পর্যন্ত এই কটা মাস ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াব – এভাবেই পার করার কথা। কিন্তু কিছুদিন পর সাহান জানাল, তার আরো মাস তিনেক লেগে যাবে, সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে তার তেমনই ধারণা হয়েছে। মৃণ্ময়ী তখন দেখল, তাহলে আরো তিন মাস, তারপর সাহানের ফেরা, তাদের বিয়ে, সাহানের আবার তাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে যাওয়া – সব মিলিয়ে সময়টা বেশ অনেকই হয়ে যাচ্ছে। তখন সে ভাবল – চাকরি করি না একটা।

তাদের পারিবারিক অবস্থা ভালো, সামাজিক পর্যায়ে তাদের ওঠাবসাও, ওদিকে সাহানরাও উঁচু মাত্রায় সচ্ছল, চাকরি সে বেছে করতে পারত, এমন চাকরিও জুটে যেত – সে অফিসে যাবে, টুকটাক কাজ করবে, ফিরে আসবে, অর্থাৎ দুধভাত টাইপ – কিন্তু মৃণ্ময়ী বলল – চাকরি যখন করব, ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরির মতো করেই করি। তা-ই সে করল। ইন্টারভিউ বোর্ডে সে শুধু এটুকু গোপন করল – মাস সাত-আটের জন্য তার চাকরি, কিছু কমবেশি, বেশি হলেও খুব একটা বেশি না, তারপর সে আর চাকরি করবে না। কারণ সে আর দেশেই থাকবে না। তখন সে যদি চাকরি করে, করবে নিশ্চয়, সেটা বিদেশে। ওখানে একটা জুতসই কোর্স বা ডিপ্লোমার পর ওখানে। এখানে চাকরির অভিজ্ঞতা ওখানে হয়ত কিছু কাজেও লাগবে।

চাকরি শুরু করার পর তার অফিসের কথা প্রায় রোজই জিজ্ঞেস করে, কারণ প্রায় রোজই তাদের কথা হয়। চাকরি তার ভালো লাগছে, মৃণ্ময়ী এটা জানায়। ছোট অফিস, নির্ঝঞ্ঝাট ও গোছানো। তাদের কাজ হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করা, প্রয়োজনীয় তথ্য বিন্যস্ত ও বিশ্লেষণ করা। এ-কাজটি ভালো লাগবে, মৃণ্ময়ীর ধারণা, এ-কথা সে সাহানকে বলে, তবে ইয়ার্কির ছলে হলেও রতন আদনানের কথা এসেই যায়। যেমন চাকরির দিন পনেরো-বিশের মধ্যেই সাহানের কী এক কথার পিঠে মৃণ্ময়ী বলল – লোকটা হ্যান্ডসাম। বুঝেছ?

– কতটা? সাহান জানতে চাইল। আমার চেয়েও?

– বেশ। হ্যাঁ, তোমার চেয়েও।… ঈর্ষা?

– খুব। একটা ছবি পাঠাবে তোমার বসের?

– আমার সঙ্গে?

– হ্যাঁ। তুলেছ?

– এখনো না। লোকটা বলেনি। কিন্তু বলবে।… বলবে না?

– বেস্ট অব লাক। দেখি কবে বলে।

রতন আদনান বলল – একটা ব্যাপারে আমি বেশ মজা পাচ্ছি। বলে সে মৃণ্ময়ীর দিকে তাকিয়ে থাকল। মৃণ্ময়ী প্রথমে ভাবল, রতন আদনানের এই তাকিয়ে থাকায় সে না বোঝার ভান করবে।  সেটা অবশ্য পারা গেল না, সে জিজ্ঞেস করল – কী, স্যার?

– আমি যেমন ভেবেছিলাম, তার অনেক আগেই তুমি কাজ সেরে ফেলতে পারছ।

মৃণ্ময়ী হাসল। সে জানে সে অনেক রকম হাসতে পারে। এই হাসিটা, যেটা সে হাসল, কিছুটা বোকার মতো।

অর্থাৎ, কী দাঁড়াচ্ছে তাহলে। রতন আদনান বলল, আমি যা ভেবেছিলাম তুমি তার চেয়ে বুদ্ধিমান। হায়! মৃণ্ময়ী বলল। হায় রতন! তুমি দেখি একদম ধরাবাঁধা পথে এগোচ্ছ! তা, এখন কী বলবে তাহলে? ওই পুরনো কথাই বলবে যে তোমার ধারণা ছিল না সুন্দরীরা একই সঙ্গে বুদ্ধিমানও হয়? বেশ, তা-ই বলো না হয়, শুনি।

রতন আদনান বলল – তুমি যে ইন্টেলিজেন্ট এটা আমার পছন্দ।

স্যার, আপনার অনেক বুদ্ধি। আমি মাঝেমাঝে অবাক হয়ে যাই।

সামান্য হাসল রতন আদনান। উদাস হয়ে একদিকে তাকিয়ে থাকল।

কোনো লাভ নেই স্যার। মৃণ্ময়ী মনে মনে বলল। কেউ উদাস হয়ে কোনো একদিকে তাকিয়ে থাকলেই আমি নড়ব না।

প্রথম প্রথম রতন আদনানের এই উৎসাহ মৃণ্ময়ীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। পুরুষ মানুষকে সে কমবেশি এরকমই দেখে আসছে। রতন আদনানের ওটুকু উৎসাহ তাই সে মানিয়ে নিতে পারে। সে জানে, এটা রতন আদনানের মতো লোকদের শখ। এরা প্রেমে পড়বে না, কিন্তু প্রেমে পড়ার ভান করবে। প্রেমে পড়ার ঘুঁটিগুলো ছেড়ে দিয়ে দেখতে চাইবে মেয়েটা সেগুলো কীভাবে গিলল। মেয়েটাও তার প্রেমে পড়লে কী হবে, সে পরের কথা। এমনিতে এটা শখ, স্কোর বাড়ানো, নিজেকে বিজয়ী ভেবে আনন্দ পাওয়া। একদম প্রথম দিকে মৃণ্ময়ী ভেবেছিল, এই লোকটার সঙ্গে সে একটু অন্যভাব নেবে। সে যেমন ভান করে, তেমন ভান মৃণ্ময়ীও একটু করবে। রতন আদনানকে একটু একটু করে মেসেজ দেবে সে। মেসেজটা এরকম সাদামাটা – সে একটু একটু করে রতন আদনানকে পছন্দ করছে। পছন্দ হয়ে গেছে, একবারে এই মেসেজটা দেবে না সে, সে বোঝাবে – সে পছন্দ করছে। অর্থাৎ ব্যাপারটা কখনোই শেষ হবে না, রতন আদনান শুধু অপেক্ষায় থাকবে – এই এটুকু। তারপর সময় হয়ে গেলে সাহান চলে আসবে, তারপর অনেকদিন আগে ঠিক করে রাখা তাদের বিয়েটা হয়ে যাবে, তারপর সাহানের সঙ্গে সে বিদেশ চলে যাবে। রতন আদনানের কথা তার মনেও থাকবে না। সে সাহানের সঙ্গে মজা করে তার এই ইচ্ছার কথা বলেছিল। সে বলেছিল – এই লোকগুলোর সঙ্গে এমনই করা উচিত। আর সাহানও তেমন করে নানা ভেবে খুব হ্যাঁ হ্যাঁ করেছিল। তারপর সাহান এ-কথা একসময় ভুলে গেছে, কারণ তার কাছে এটা ছিল কথার কথা, মৃণ্ময়ী ভোলেনি, তবে সে অমন কিছু করেনি, করেনি বলে সে বলে – ভাগ্যিস। সে বলে – ভাগ্যিস করিনি। এই রতন আদনান লোকটা একটু বেশি উদ্যোগী।

তা সে যখন কোনো মেসেজ দেবে না, সে যখন কোনো মজা করবে না, ঝুলিয়ে রাখবে না রতন আদনানকে, তখন তার বাড়াবাড়িগুলো সহ্য করা কষ্টের। তবে চাকরিটা সে ছাড়তেও চায় না। আর কয়েক মাসের ব্যাপার, তাই না? তাছাড়া সময় কাটানো ছাড়া চাকরি তার করার দরকার ছিল না – এটা যেমন ঠিক, এটাও ঠিক – হুট করে ছেড়ে দিলে ব্যাপারটা বোধহয় কেমন হয়ে যাবে। মৃণ্ময়ীর মনে হলো, একটু যেন হেরে যাওয়ার ব্যাপার থাকবে সেখানে। সে ঘরে বসে চাকরিটা তৈরি পায়নি, সে অনেকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাকরিটা পেয়েছে। এখন তার ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আছে বলে ছেড়ে দেবে, মৃণ্ময়ীর কাছে মনে হলো, এটা তার নিজের কাছেই ভালো দেখাবে না।

সে সাহানকে বলল – চাকরিটা ছাড়তে অবশ্যই চাই না। কিন্তু লোকটা বিরক্তি বাড়াচ্ছে। আর একটু বোধহয় ছেলেমানুষও আছে… গ্রাম্যও। মৃণ্ময়ী বলল – দেখো, সেদিন আমাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখল… অত দামি গাড়ি বোধহয় এক্সপেক্ট করেনি। পরে জিজ্ঞেস করল – তা, তোমাদের গাড়ি কয়টা?… মানে হয়! সাহান হাসতে আরম্ভ করলে মৃণ্ময়ী বিরক্ত হলো – হাসবে না।… সেদিন বলছে তার সঙ্গে সিনেমায় যাওয়ার কথা। দেখো, পরিচিত কারো সঙ্গে ভালো একটা সিনেমা আমি দেখতেই পারি। কিন্তু লোকটা বলার পর থেকেই ব্যাপারটা কেমন ঘিনঘিনে লাগতে আরম্ভ করল।

হুম্ম। সাহান বলল। এক কাজ করো। আমার কথা বলে দাও।

তোমার কথা? কী লাভ হবে তাতে?

গভীর প্রেমের কথা বলবে। বলবে তুমি কী ভীষণ ভালোবাসো আমাকে। লাভ হয়তো এটুকু হবে, লোকটা বুঝবে তোমাকে বিরক্ত করে লাভ নেই।… দাঁড়াও দাঁড়াও, আমার কথা বোলো না।

কী হলো! বললে সমস্যা কী?

টুকলু মামা। আমার কথা বললে টুকলু মামার কথা এসে যাবে। আমি চাই না টুকলু মামার কথা ওই লোক কোনোভাবে জানুক, বা টুকলু মামা নতুন করে জানুক আমার বা তোমার কথা। বাদ দাও। তবে তুমি অন্য কারো কথা বলতে পারো।

সেটা কীরকম? মৃণ্ময়ী জানতে চাইল।

আমার কথা বলার দরকার নেই। কিন্তু তোমার অ্যাফেয়ার আছে এটা জানিয়ে দাও।

ওহ! তা, আমার কোন প্রেমিকের কথা বলব?

বানিয়ে বলে দাও একটা। তোমার আবার বানানোর ক্ষমতা অপরিসীম।

তাই? বানিয়ে বলে দেবো? মৃণ্ময়ী হাসতে লাগল। তুমি জানো আমার বানাতে ভালো লাগে।

বানাতে তার সত্যিই ভালো লাগে, একরম কিছু বানাতে তার আরো ভালো লাগবে। আর বানিয়ে এরকম কিছু একটা বলে দেওয়াই যায়, মৃণ্ময়ীর মনে হলো। সাহানের কথা ঠিক, এতে হয়তো রতন আদনানের জ্বালাতন কমবে, আর এই যে সে বলে দেবে – এতে তার অসুবিধা নেই কোনো। চাকরির আর যে-কটা দিন বাকি আছে, স্বস্তিতে থাকা যাবে। তবে সে একটু সময় নিল, সাহান এমনভাবে বলল, যেন সে চাচ্ছে মৃণ্ময়ী কালই বলে দিক। মৃণ্ময়ী সাহানের সঙ্গে কথা হওয়ার পরদিনই বলল না। সে ভাবল – আচ্ছা, আর দুটো দিন দেখি না। বলতেই হবে সম্পর্কের কথা, এমন না, যদি না বলেই বাকি সময়টুকু পার করা যায় সে তা-ই করবে।

সেরকম পারা গেল না। কারণ রতন আদনান অধিকতর উদ্যোগী হয়ে উঠল। ব্যাপারটার নিষ্পত্তি দরকার, মৃণ্ময়ী ভাবল, এবং এক বিকেলে, অফিস ছুটি হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে, রতন আদনান যখন সিনেমা দেখার বাসনায় ব্যাকুল মৃণ্ময়ী বলল – স্যার, মুভিটা আমি দেখে ফেলেছি।

দেখে ফেলেছ? একটু ঝাঁকিই খেল রতন আদনান। কই, আগে বলোনি!

গত পরশু দেখলাম। আমি আর অঞ্জন। ভালো মুভি স্যার। আমরা আবার দেখব।

ওহ্।… ভালো মুভি না? আচ্ছা, কার কথা যেন বললে… কার সঙ্গে দেখেছ?

অঞ্জন। মৃণ্ময়ী মানানসই একটা হাসি তৈরি করল। সামান্য লাজুকও সে হলো। অঞ্জন।… আমার বন্ধু – বলে সে রতন আদনানকে খেয়াল করল। তার মনে হলো, একটা ধাক্কাই খেয়েছে রতন আদনান। হয়তো কথাটা এতোদিন পর শুনল বলে। তবে সে সামাল দেওয়ার অপ্রাণ চেষ্টা করল। কিছুটা অপ্রস্ত্তত যে হাসি তৈরি হয়েছিল, সেটা সে তখনই মুছে দিতে চাইল – আরে, কী বলো! এমন একটা ভালো কথা তুমি এতোদিন বলোনি!

মৃণ্ময়ী হাসল – একটু পর আসবে, স্যার। ছুটির পর। হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাসায় যাব।

গল্প করতে করতে? দারুণ।… রোজ?

মানে, অঞ্জন যদি ঢাকায় থাকে…।

তোমার বন্ধু ঢাকায় থাকে না? বাইরে?

ঢাকায়ই থাকে স্যার। তবে ওর কোনো ঠিক নেই। উড়নচন্ডী… কোথায় কোথায় চলে যায়…।

যে-হাসিটা মৃণ্ময়ী আটকে রাখল অফিসে, বাড়ি ফেরার পথে, সেটা বাড়িতে পৌঁছে ছিটকে বের হলো, এমন নয়, তবে মুখে মৃদু একটা হাসি থেকে গেল তার, সে টের পেল সে স্বস্তি বোধ করছে। আজ সে বলবে, ওভাবে বলবে – এসবের কিছুই ঠিক ছিল না। যদি বলে, কার কথা কী বলবে, তাও তার গোছানো ছিল না। এমনকি কী নাম হবে ওই ছেলের, তাও সে ভেবে রাখেনি। একদম হুট করে একজনের কথা বলে ফেলা, নামটাও তখন তখনই ঠিক করা – তবে সে এলোমেলো করেনি, গুছিয়ে বলেছে, রতন আদনান বিশ্বাস করেছে এবং কিছুটা গুটিয়েই গেছে।

বেশ বেশ – মৃণ্ময়ী নিজের মনে হাসল। এই এটুকুই দরকার ছিল – রতন আদনানের গুটিয়ে যাওয়া। এটা সে এখন সাহানকে জানাতে পারবে – শোনো, তোমার বুদ্ধি কাজে লেগেছে।

দুদিন পর সাহান যখন ফোন করল, মৃণ্ময়ী বলল – আজ বিকেলে কী করেছি জানো? অঞ্জনের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরেছি। অনেক গল্প…।

সাহান অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল – অঞ্জন মানে! অঞ্জন কে? তারপর সে যখন শুনল, হো-হো করে হাসতে আরম্ভ করল – তোমাকে বলেছিলাম না কাজে লাগবে? লাগেনি?

আমার বস বাইরে বাইরে খুব স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাকে দেখেই বোঝাই গেল এমন কিছু তিনি আশা করেননি।… সাহান, থ্যাঙ্কু সোনা।

শোনো মৃ. এমন হতে পারে লোকটার কৌতূহল কমবে না। কিংবা সে যে খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে এটা বোঝানোর জন্য এই অঞ্জনকে নিয়ে তোমাকে প্রায়ই কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করে যাবে।

অসুবিধা নেই। মৃণ্ময়ী বলল। আমিও প্রতিবার অঞ্জন সম্পর্কে তাকে অনেক কিছু বলে যাবো।

অনেক কিছু?… বাহবা, স্টক মনে হচ্ছে অফুরান!

তা তো অবশ্যই। অঞ্জন যেমন চরিত্র, ওকে নিয়ে অনেক কিছু বানিয়ে ফেলা যায়।

তাই?… সত্যি সত্যি তোমার পরিচিত কেউ না তো?

দেশে ফেরো। তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো। মৃণ্ময়ী বলল।

সাহানের কথা ঠিক হলো। রতন আদনান বেশ কৌতূহল দেখাতে আরম্ভ করল। মৃণ্ময়ীর নিজেরও এমনই ধারণা ছিল, রতন আদনান দেখাতে চাইবে সে স্বাভাবিক আছে, এই যে মৃণ্ময়ীর একটা সম্পর্ক আছে, এটাও সে সহজভাবে নিয়েছে, এটা তার ভালোও লেগেছে। ভালো লেগেছে বলেই মৃণ্ময়ীকে উৎসাহ দেওয়া তার কর্তব্যের মধ্যেও পড়ে যাবে। সুতরাং একদিন সে মৃণ্ময়ীকে বলবে – এক কাজ করো না। অঞ্জনকে আসতে বলো একদিন। আমরা লাঞ্চ করি একসঙ্গে।

মৃণ্ময়ী হাসল – আনব। বলেছি ওকে। কিন্তু আপনি শুনেছেন ও একটু অন্যরকম…।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা জানি। তাই বলে লাঞ্চে আসতে অসুবিধা কী!

একটু তো গোটানো স্বভাবের। সবার সামনে ফ্রি হতে পারে না।

একটু একটু ফিলোসফার টাইপ?

না না স্যার, তেমনও না। খেয়ালি…।

আহ-হা, একজন ফিলোসফারের সঙ্গেই না-হয় অফিসের সবার পরিচয় হোক।

ঠিক তা কিন্তু না স্যার। একটু চাপা, এটা ঠিক। মৃণ্ময়ী একটু হাসার চেষ্টা করল। স্যার, কথা হলো – ওর ব্যাপার-স্যাপার আগে থেকে অনেক সময় কিছুই বোঝা যায় না। একবার করল কী জানেন, এটা অবশ্য কয়েক বছর আগের কথা, এক শীতে ও গেছে ওদের নানাবাড়িতে, মফস্বল শহর, আর সেখানে এসেছে সার্কাসপার্টি, ও করল কী জানেন, সার্কাসপার্টি যেদিন শহর ছেড়ে চলে গেল, ও-ও সেদিন সার্কাসপার্টির সঙ্গে শহর ছাড়ল।

মানে!… তারপর?

তারপর কেউ ওর খোঁজ জানে না। ও বেশ কিছুদিন থেকে গেল ওই সার্কাসপার্টির সঙ্গে।

রতন আদনান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল মৃণ্ময়ীর দিকে। মৃণ্ময়ী বলল – ও এরকমই। আমাকে বলল – যদি থেকে যেতে পারতাম ওদের সঙ্গে!

তুমি আগেও এরকম দু-তিনটা কথা বলেছ। দেখছি অদ্ভুত, না?

অদ্ভুত। কী যে সব করে! কিছু ঠিক নেই।

একটু ইতস্তত করল রতন আদনান – একটা কথা তোমাকে বলব ভাবছিলাম, যদি তুমি কিছু মনে না করো…।

বলেন। মনে করব কেন!

মানে, এই যে – কিছু ঠিক নেই ওর… তো প্রেম বা জীবনযাপন হিসাবে এটা কি একটু বেশি অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে না?

তা হয়তো হচ্ছে। কিন্তু স্যার, অঞ্জনকে এভাবেই আমার ভালো লাগে।

সে বুঝলাম। ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু এই অনিশ্চয়তা…।

স্যার, হয়তো এটাই আমাকে টানে।

রতন আদনান মৃণ্ময়ীকে দেখল, সামান্য হাসল, সামান্য মাথা ঝাঁকাল – তুমিই বুঝবে। তোমার মতো কেউ বুঝবে না। আমার কিছু বলা এখানে খাটে না। তবে একটা কথা, বিয়ের কথা ভেবেছ তোমরা? মানে, কী ভেবেছ?

মৃণ্ময়ী সামান্য লজ্জা পাওয়ার চেষ্টা করল – ও-কথাটা ওঠেনি। ও তো তুলবে না। হয়তো ওর মাথায়ই নেই এটা। ও তো বলে, পথে পথে কাটিয়ে দেবে জীবন…।

তুমি ভাবোনি? ধরো, বিয়ে হলো তোমাদের। তোমরা দুজন একসঙ্গে পথে পথে কাটিয়ে দেবে জীবন? থিতু হয়ে বসবে না?   তাই কখনো হয়?

একটু ভাবল মৃণ্ময়ী, দুপাশে মাথা নাড়ল – না, তা হয় না।

তাহলে?

জানি না।

এক কাজ করো, বোঝাও ওকে। বিয়ে করে থিতু হয়ে বসো। বলো, ওসব তো হলো অনেক।

কোন সব?

ওই যে, ওসব খেয়ালিপনা।

সে-রাতে সাহান যখন ফোন করল। মৃণ্ময়ী জিজ্ঞেস করল – আচ্ছা, আমরা বিয়ে করে থিতু হয়ে বসব কবে?

তুমি জানো না, আমরা বিয়ে করছি কবে?

জানি। হয়েছে কী – রতন আদনান একথা জিজ্ঞেস করেছিল – আমরা বিয়ে করে থিতু হচ্ছি কবে। মনে হচ্ছে খুব জুতসই উত্তর দিতে পারিনি। তাই তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।

কী বলেছো তুমি, এই খুব তাড়াতাড়িই? সাহান জানতে চাইল।

না। হলো না। মৃণ্ময়ী মাথা নাড়ল। আমি বলেছি বিয়ের কথা আমরা ভাবিনি।

সাহান বুঝতে পারল না। সে অবাক হলো।

আহা, আমি আমার আর অঞ্জনের কথা বলছি। রতন আদনান নিশ্চয় তোমার আমার বিয়ের কথা জানতে চাইবেন না। উনি আমার আর অঞ্জনের বিয়ের কথা জানতে চাচ্ছিলেন।

ওহ্, আচ্ছা! তা, কবে হচ্ছে ওটা?

মৃণ্ময়ী নরম গলায় বলল – বিয়ের কথা আমরা ভাবিনি।

সাহান হাসতে আরম্ভ করল – শোনো, ভাবাভাবির কিছুই নেই। বসকে তোমার বলা উচিত ছিল – ওটা স্যার কখনোই হচ্ছে না।… কিন্তু মৃ. এই যে তুমি বললে তোমরা বিয়ের কথা ভাবছ না, রতন আদনান আবার লাই পেয়ে যাবে না তো?

এটা মাথায় আসেনি মৃণ্ময়ীর, এটা সে মাথায় রাখলও না, সে বলল – না সাহান, তেমন কিছু হবে না। বরং বিয়ের কথা সিরিয়াসলি ভাবা উচিত, এরকম উপদেশ দিচ্ছিলেন তিনি। এটুকু উনি বুঝেছেন আমি আর অঞ্জন গভীরভাবে জড়িয়ে।

তাই?

তাই।

মৃ…।

কী?

হিংসা হচ্ছে।

বেশ কয়েকটা দিন পার হয়ে গেল। সাহানের কথা শুনে একটু দ্বিধা, একটু শংকা মৃণ্ময়ীর তৈরি হয়েছিল – তারা বিয়ের কথা ভাবেনি – এরকম জেনে রতন আদনান না আবার উদ্যম ফিরে পায়। সেরকম কিছু ঘটল না। রতন আদনান চুপচাপ থাকল। এতে মৃণ্ময়ীর স্বস্তি পাওয়ার কথা, সে স্বস্তি পেলও, আবার দেখল কোথায় যেন একটা অস্বস্তিও কাজ করছে। সে এই অস্বস্তির কারণ বুঝলো না। অস্বস্তির কারণটা বোঝার চেষ্টা করতে করতে একসময় তার মনে হলো – আচ্ছা, অঞ্জনকে নিয়ে বেশ কিছু গল্প জমে আছে, রতন আদনানকে বলা হচ্ছে না, বললে ভালো লাগত – ব্যাপারটা কি একরম? সে বলতে পারছে না বলে অস্বস্তি লাগছে?

সে সাহানকে বলল – জানো, রতন আদনান অঞ্জন সম্পর্কে আর কিছুই জিজ্ঞেস করছে না।

সাহান বলল – গুড।

আহা…।

আবার তোমার পেছনে লেগেছে নাকি?

না না।

তাহলে!

আমি ভেবেছিলাম অঞ্জনকে নিয়ে তার উৎসাহ থাকবে। আরো কিছু গল্প তৈরি করে রেখেছিলাম।

তুমি!… যেটুকু দেখানোর সেটুকু দেখিয়েছেন। দেখাননি?

কিন্তু দেখো, এমন একটা ইন্টারেস্টিং চরিত্র বানালাম…।

বানিয়ে মুগ্ধ হয়ে আছো। মৃ, তোমার দেখি ভালোবাসায় ঢল নেমেছে।

নেমেছে। তবে ভালোবাসা ব্যাপারটা অঞ্জনের মধ্যে নেই।… আমি লুতুপুতু টাইপ ভালোবাসার কথা বলছি।

ঠিক। সাহান বলল। তারপর গলা একটু নামাল – ঠিক, কারণ আধা-পাগলা একজন ভালোবাসা কী বুঝবে! যে একটা ক্যারেক্টার বানিয়েছ তুমি!

অ্যাই, খবরদার। আধা-পাগলা বলবে না।… আচ্ছা, বলো। অঞ্জন অমনই।… হুঁ, পাগলাটে।

একটা পাগলের সঙ্গে প্রেম, তার কথা বসকে জানিয়েছ, এখন আরো জানানোর জন্য অস্থির!

আহা সাহান, পাগল কোথায়! খেয়ালি। তুমিই দেখো – এরকম থাকে না কেউ কেউ? খুব কম অবশ্য। কিন্তু ও ঠিক – কেউ কেউ এরকম।

খেয়ালি – অঞ্জন সম্পর্কে মৃণ্ময়ীর এমনই ধারণা। সে নির্মোহ আর তার কোথাও কোনো টান নেই। ওই যে কথা – কেউ কেউ থাকে এরকম। তাকে সংসার টানে না, জগৎ টানে। কেউ কেউ থাকে এরকম। যার পায়ের নিচে সুপারি। কেউ কেউ থাকে এরকম, কদিন পরপরই যাকে উতলা দেখায়।

রতন আদনানকে সে যখন অঞ্জনের কথা বলে, হুট করেই বলেছে, তখন গোছানো ছিল না ব্যাপারটা। বলে যখন ফেলেছে, তারপর সে ভেবেছে। ভেবে ভেবে রতন আদনানকে আরো কিছু বলেছে। আরো অনেক কিছু বলা হয়নি, তার কাছে থেকে গেছে। আর সাহানকে খুব একটা বলতে হয়নি, সে বুদ্ধিমান, তাকে কিছুটা বলতেই বাকিটা বুঝে নিয়েছে। সাহান বুঝে না নিলেও পারত। তাহলে সাহানকেই সে বলতে পারত – সবাই কি আর হিসাবে থাকে? কেউ কেউ কি হিসাবের বাইরে থাকবে না, বলো? সে যদি বলে এভাবে, মৃণ্ময়ী জানে, সাহান মজা করবে, উৎসাহ দেখাবে না।

সাহান বলল – শোনো মৃ। রতন আদনান যে উৎসাহ দেখাচ্ছে না, এটা ভালো কথা।

মৃণ্ময়ী বলল – হুঁ।

আর তোমারও গল্প জমা করার দরকার নেই। রতন আদনান চুপ মেরেছে। অর্থাৎ কাজ হয়েছে। তাহলে অঞ্জনও শেষ। …ঠিক বলিনি?

ঠিক। মৃণ্ময়ী এটা অস্বীকার করবে না সোহান যদিও হালকা গলায় বলছে, মৃণ্ময়ী বুঝতে পারছে, সাহানের একটা বিরক্তিও আছে। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সে মৃদু গলায় বলল – ঠিক বলেছ।

তাহলে মৃ, খামোখা আর এটা নিয়ে ভাবার দরকার কী?

না, দরকার নেই। মৃণ্ময়ী সাহানকে বলল। সে নিজেকেও বলল – হ্যাঁ, দরকার নেই। অঞ্জনকে যে-কারণে দরকার ছিল, সে-কারণ ফুরিয়েছে, সুতরাং তাকে আর হাজির রাখার প্রয়োজন নেই।

মৃণ্ময়ী এরকম ভাবল বটে, সে মনস্থিরও করল – হ্যাঁ, অঞ্জন আর কেন, কিন্তু কী আশ্চর্য, দুদিন পর, অফিস ছুটি হয়েছে, আজ গাড়ি আসবে না, মৃণ্ময়ী অফিস থেকে বেরিয়ে রিকশা বা ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছে, তার মনে হলো পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। মৃণ্ময়ী পেছন ফিরে দেখল অঞ্জন দাঁড়িয়ে – তুমি!

তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অবাক হওনি। যেন জানতে আমি হুট করে চলে আসব।

না। মৃণ্ময়ী মাথা নাড়ল। জানতাম না। কিন্তু এভাবে তুমি আসতেই পারো।

হুঁ, পারি।… এখন রিকশা বা ট্যাক্সি পাবে না। চলো হাঁটি। হাঁটবে?

হাঁটব।… তুমি ছিলে কোথায়?

আমি তো থাকিই।

আহা, হেঁয়ালি কোরো না।

আমি হেঁয়ালি করি না। আমি কি হেঁয়ালি করি?

তারা হাঁটতে আরম্ভ করল। হাঁটতে হাঁটতে মৃণ্ময়ী জিজ্ঞেস করল – একটা সত্যি কথা বলবে? এবার কোথায় গিয়েছিলে?… আচ্ছা, যেখানেই যাও, ফিরেছ যখন এবার থাকবে কদিন?

কদিন?… বলা মুশকিল। আমি তো থেকেই যেত চাই… যদি না আমার আবার যেতে ইচ্ছা করে।

তাও ঠিক। অঞ্জনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল মৃণ্ময়ী। তোমাকে এসব জিজ্ঞেস করার কোনো মানে হয় না। তুমি আছ… তুমি নেই।

ঠিক না। তুমি জানো আমি আছি। আছি না?

আছ। মৃণ্ময়ী হাসল। হাসতে হাসতেই, একটা বেবিট্যাক্সি এসে থেমেছে, সেদিকে সে প্রায় দৌড় দিলো। বনিবনা হলে ট্যাক্সিতে চড়ে মৃণ্ময়ী অপলক একদিকে তাকিয়ে থাকল।

এর মধ্যে অঞ্জনকে নিয়ে রতন আদনানের সঙ্গে মৃণ্ময়ীর কথা হয়ে গেল। মৃণ্ময়ী অঞ্জনের কথা বলতে চায়নি, সাহানের সঙ্গে সেদিন কথা হওয়ার পর সে ঠিকই করেছিল, রতন আদনানের সঙ্গে অঞ্জনের কথা আর না। কিন্তু কী নিয়ে যেন কথা হচ্ছিল, অঞ্জনের কথা তোলার মতো মানানসই কোনো প্রসঙ্গ না, তবু সে হঠাৎ অঞ্জনের কথা বলে ফেলল – এ তো অঞ্জনের মতো কথা হয়ে গেল!… অঞ্জন সেদিন কী বলেছে স্যার, শুনবেন?

রতন আদনান এমনভাবে তাকাল, মৃণ্ময়ী বলতে চাইলে বলতে পারে, না বললেও অসুবিধা নেই। মৃণ্ময়ী গুটিয়ে গেল। অঞ্জনের কথা বলার দরকার ছিল না। সে কথা ঘুরিয়ে নিল। তবে সেই অস্বস্তিটা আবার বড় হয়ে উঠল। সে যেচে পড়ে অঞ্জনের কথা বলতে গেছে, বলার আর দরকার নেই, রতন আদনান জানতে চাইলে অন্য কথা, এটা এক অস্বস্তি, তার চেয়ে বড় অস্বস্তিটা এরকম, পুরনো অস্বস্তি – অঞ্জনকে নিয়ে রতন আদনানের আর আগ্রহ নেই। থাকার কি কথা? এই প্রশ্ন নিজেকেও অবশ্য করল মৃণ্ময়ী, ঠিক ঠিক উত্তর পেল না, তার আবারো মনে হলো, প্রথমে যেভাবে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল রতন আদনান, সেটার কিছুটা এখনো বজায় থাকা উচিত।

আরেকদিন তাই নিজ থেকেই অঞ্জনের কথা তুলল মৃণ্ময়ী, কথায় কথায় – স্যার, ছোটবেলায় অঞ্জন হারিয়ে গিয়েছিল, এটা কি আপনাকে বলেছি?

হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছ। কোথায় যেন চলে গিয়েছিল।

তারপর আরো একদিন, রতন আদনান সেদিন তার এক বন্ধুর বিয়ের গল্প করছিল, যে বন্ধু বিয়ে করবে না বলেই পণ করেছিল। এই গল্প করতে করতে রতন আদনান মৃণ্ময়ীকে জিজ্ঞেস করল – আচ্ছা, তোমাদের বিয়ের কী খবর?

এটা কোনো প্রশ্ন ছিল না। এটা ছিল কথার কথা। এর উত্তরে ছোট একটা হাসিই যথেষ্ট। কিন্তু মৃণ্ময়ী বড় করে বলতে নিল। বড় করে সে অবশ্য বলতেই পারে, বড় করে তার আর সাহানের বিয়ের কথা বলতে পারে। কারণ দু-বাড়ি থেকে তাদের বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সাহানের আসার সময় হয়ে এসেছে, ও আসার পর খুব বেশি সময় হাতে থাকবে না, তাই যা যা পারা যায় তা তা এগিয়ে রাখা হচ্ছে, গুছিয়ে রাখা হচ্ছে। এখান থেকে যা যা কেন যাবে মৃণ্ময়ীর জন্য, সাহানের ছোট বোন সাজান এসেছে বারকয়েক, মৃণ্ময়ীকে সঙ্গে নিয়ে কিনে ফেলবে। এই গল্প ঘটা করে বলা যেত, মৃণ্ময়ী বলতে নিল অঞ্জনের কথা। তা, তার আর অঞ্জনের বিয়ের কথাই জানতে চেয়েছিল রতন আদনান, নাকি? কিন্তু সে মুখ খুললেই রতন আদনান বলল – ব্যাংকের ফাইলটা শেষ করতে তোমার আর কতদিন লাগবে? দুদিন?

দুদিন পর ফোন করল সাহান – তোমাকে বলেছিলাম একটা মেইল করতে, তোমার কী কী লাগবে, রোজ রোজ মেইল চেক করি…।

তুমি যা যা আনবে তার সবই আমার লাগবে।

আমার ইচ্ছা করে তোমার জন্য পুরো আমেরিকা নিয়ে যেতে…।

নিয়ে আসো।… না থাক, আমিই যাব। কষ্ট করে আনতে হবে না।

চাকরি ছাড়বে কবে?… অফিসে বলে দাও।

দেবো। এ মাসেই।

তোমার রতন আদনান খুব নিরাশ হবে।… আচ্ছা, ও-ব্যাটা আর জ্বালায়নি তো।

একটুও না। উলটো।… তোমাকে বলবো ভাবছিলাম। রতন আদনান অঞ্জন সম্পর্কে আর কিছুই জানতে চায় না। যে-উৎসাহ ছিল, নেই।

তো? এটা ভালো না? তোমাকে আর বানিয়ে বানিয়ে বলতে হচ্ছে না।

হু হু, তা ঠিক। এমন হয়েছে, আমি যদি আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যাই অঞ্জন সম্পর্কে, রতন আদনান উৎসাহ দেখায় না।

আশ্চর্য!

খুবই আশ্চর্য! আমরা ভেবেছিলাম রতন আদনানের উৎসাহ ফুরোবে না।

শোনো মৃণ্ময়ী, আমি সে কারণে আশ্চর্য বলছি না। আমি তোমার উৎসাহ দেখে আশ্চর্য হচ্ছি।

মৃণ্ময়ী বোকা বোকা হয়ে গেল – আমার উৎসাহ…!

তোমাকে আমি কী বলেছিলাম?

কী?

বলিনি আমি, রতন আদনান যদি তোমাকে আর বিরক্ত না করে, তবে তাকে তোমার আগ বাড়িয়ে অঞ্জনের কথা বলার দরকার নেই?

এটা যদি কোনো প্রশ্ন হয়ে থাকে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তাছাড়া এটা প্রশ্ন না, এটা সাহানের উষ্মা। কী বলা উচিত, কী বলা যেতে পারে, মৃণ্ময়ীর জানা নেই। সে চুপ করে থাকল।

বলো কী দরকার?

আরে, আমি সব সময় বলি নাকি!

কোনো সময়ই বলার দরকার নেই। আছে, বলো?

মৃণ্ময়ী বলল – আচ্ছা, বাদ দাও।

তোমাকে এর আগেও বলিনি? বলিনি, অঞ্জনের প্রয়োজন ফুরিয়েছে? বলিনি?

হুঁ।

তাহলে? খামাখা কেন আবার অঞ্জনের কথা?

মৃণ্ময়ীর খুব লজ্জা হলো। তার রাগ হতে পারতো। মাঝে মাঝে এমন হয় – হঠাৎ একটা রাগ তৈরি হয় যে ভুল বা দোষটা ধরিয়ে দেয়, তার প্রতি; সেরকম একটা রাগ তার হতে পারত। সেরকম রাগ তার হলো না। বরং বেশ লজ্জায়ই পড়ল সে। হ্যাঁ, সাহান বলেছিল, আর, সেও তখন বুঝেছিল। তাহলে আবার কেন রতন আদনানকে বলতে যাওয়া। ধাৎ ধাৎ – সে বলল। আর বলিহারি তার বুদ্ধিও, রতন আদনানকে বলেছিল বলেছিল, সেটা সে সাহানকেও জানাতে গেল! শেষদিকে সাহান যদিও ইয়ার্কি মেরে তাকে হালকা করতে চাইল – কে জানে, হয়ত আমার অনুমানই ঠিক, অঞ্জন সত্যিই কেউ আছে, বলে ফেলো বলে ফেলো – এরকম বলে, তাতে তার উষ্মাটা পুরো চাপা পড়ল না। ফোন রেখে মৃণ্ময়ী খুব মন খারাপ করে ছাদে গেল।

এর পরের কয়েকটা দিনও মৃণ্ময়ীর খুব মন খারাপ থাকলো। সাহান খেপেছে, এটা বোঝা যাচ্ছে, সে আর ফোন করছে না। ফোন মৃণ্ময়ী নিজেই করতে পারে। কিন্তু সেও করছে না, কারণ তারও একটু একটু রাগ হচ্ছে। তবে যত না রাগ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি লাগছে লজ্জা।  এই লজ্জাটা কেন, সে বুঝতে পারছে না। সে অবশ্য বারবার চাচ্ছে, সাহান ফোন করুক। সে বলবে – অ্যাই ছেলে, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি, জানো না?

সাহানের রাগ যদি কমে গিয়ে থাকে, কিংবা রেগেও যদি থাকে মৃণ্ময়ীর ধারণা সে বলবে – জানি। জানব না কেন?

তা হলে?

তা হলে কী?

ফোন না করে আছ কী ভাবে!

তুমি যা করো না মৃ!… তুমি দেখো, অঞ্জন…।

আহা, আবার অঞ্জন কেন!

আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে চাচ্ছিলাম…।

তোমার কি ধারণা আমি বুঝি না? বাদ দাও।

দেবো। তোমার বুঝতে হবে রতন আদনান আর বিরক্ত না করলে ওই তোমার বানানো পাগল…।

আহা, সাহান, বাদ। লাভ য়ু।

সমস্যা একটাই, এভাবে সাহানকে বলাই যায়, বলা উচিতও, সে জানে, কিন্তু সে যে সাহানের সঙ্গে এভাবে বলেছে, এটা অঞ্জন জেনেই যাবে। হয়ত সে-ই বলে দেবে কখনো। আর, অঞ্জন যদি জেনেই যায়, সে রাগ করবে না – তুমি একদম এভাবে বললে! সে কি তখন বোঝাতে পারবে অঞ্জনকে – আহা, ওসব কথার কথা। তুমি জানো।

যেভাবে পাল্লা দিয়ে দুজন আমাকে বিদায় করলে! পাগল বিদায়!

এভাবে বললেই তুমি নেই হয়ে যাচ্ছ না। তুমি জানো না?

আচ্ছা বাদ, এসব তোমাদের ব্যাপার। তোমার আর সাহানের।

মৃণ্ময়ীর ধারণা, অঞ্জন এভাবেই বলবে। এসব ছোটখাটো বিষয়ে মুখভার করে থাকার মতো ছেলেমানুষ সে না। তবে, মৃণ্ময়ীর মনে হলো, আরেকটা কাজও করা যায়। সে প্রথমে অঞ্জনকেই জিজ্ঞেস করতে পারে – একটা পরামর্শ দাও তো আমাকে। সাহান খুব খেপে আছে আমার ওপর। আমার মন খারাপ। তুমি জানো আমি ওকে কত ভালোবাসি!

রাগ ভাঙাও।

কীভাবে?… আচ্ছা দেখো, আমি ঠিক করেছি ওর সঙ্গে কথা হলে এভাবে বলব।… এভাবে বলব? মানে আমি যেভাবে ভাবছি, সেভাবে?

দেখো, এত ভাবাভাবির কী আছে! অঞ্জন হয়তো খুব সহজেই বলে দেবে। তোমার যেভাবে দরকার সেভাবে বলবে।

বলব?

আহা, কেন বলবে না!

মৃণ্ময়ী, নিশ্চিত, অঞ্জন এভাবেই বলবে। সে তখন স্বস্তিবোধ করবে। বলবে – আমি জানতাম তুমি বুঝবে।

এই কথার পিঠে অঞ্জন কিছু বলবে না। মৃণ্ময়ী জানে, সে-ই বলবে – গেল ওটা। এখন তাহলে থাকো কিছুক্ষণ, হুট করে বোলো না – চলে যাবে।

আমি তো যাই না। তুমিই রাখতে পারো না।

আচ্ছা আচ্ছা, যা-ই হোক। অঞ্জন একটা গল্প বলো তুমি।

কোন গল্প?

ওই যে, তুমি একবার সার্কাসদলের সঙ্গে চলে গিয়েছিলে। ওই গল্পটা বলো।

মৃণ্ময়ী, তুমি ওটা আগে শুনেছ। আমার কাছে আরো অনেক গল্প আছে।

আছে যে জানি। ওসব ধীরে ধীরে। ওসব অন্য সময়ে। এখন ওটা শুনতে ইচ্ছা করছে।

অঞ্জন হয়ত হাসবে – পরামর্শের জন্য ডেকে এনে গল্প শোনা…!

হুঁ, তাই।

বলি তাহলে।

মৃণ্ময়ী জানে অঞ্জন গল্প বলতে শুরু করলে সে মুগ্ধ হয়ে শুনবে। কারণ অঞ্জনের সব গল্পই মুগ্ধ হয়ে শোনার মতো।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার