বৃহস্পতির দশা

লেখক:

বাণী বসু

Brihospotir Dasha

১. আবির্ভাব

নাম কী তোমার? – বসবার ঘরে মোড়াটা দেখে সে পারমিশন নিয়ে সবে বসেছে, জিগগেস করি।  সরুমতো চঁাঁছা গলায় সে জবাব দেয় – দিদি জন্মেছিল সোমবার করে তার নাম হলো সোমরা, মেজ জন্মাল শনিবার তার নাম শানু, বোন জন্মাল বুধবার করে তার নাম বুধিয়া, আর আমি জন্মালুম বেস্পতিবার, তো আমার নাম বেস্পতি বাদে আর কী হবে বলেন?

 

পুরো বংশের ইতিহাসের টুকরো এবং লজিক সে এমনভাবে আমার কাছে পেশ করে যেন আমি তার হাফ অন্তত জানি বা আমার জানা উচিত, না জানলে সেটা আমার বোকামি বা অজ্ঞতা। একনজরে দেখলে মহিলা মোটেই ইমপ্রেসিভ নয়। বাঁটকুল, ঘোর কালো, সামনের  দাঁতগুলো বড় বড়, একটু উঁচুও বটে। কিন্তু তার ধরনধারণে সংকোচ বলে জিনিস নেই, বেশ স্মার্ট। আচ্ছা ও কি আধা হিন্দুস্থানি? সোমরা, বুধিয়া এসব তো বিহারি নাম? হিন্দুস্থানি শব্দটাই বা আমরা কীভাবে ব্যবহার করি? এক হিসেবে আমরা সবাই তো হিন্দুস্থানি? কিন্তু সে হলো বাইরের দেশের কথা, তারা আমাদের একসময়ে হিন্দুস্থানের বাসিন্দা বলে মনে করত। আমরা নিজেদের ভারতীয়, প্রদেশ পরিচয়ে বাঙালি বলে জানি। ভেবে দেখলে হিন্দুস্তানি বা হিন্দুস্থানি বলতে আমরা নর্থ ইন্ডিয়ানদের বোঝাই। নর্থ বলতে বাংলার উত্তরে যারা থাকে। এর মধ্যে বিহারও যেমন পড়ে, তেমনি পড়ে উত্তর ভারতীয়রাও। কিন্তু কোনো রহস্যময় কারণে দিল্লির লোকদের আমরা আর হিন্দুস্থানি বলি না, বলি দিল্লিওয়ালা এবং রাজস্থানের সব অধিবাসীকে একধার থেকে মাড়োয়ারি বানিয়ে দিই।

বেস্পতি তার অপূর্ব নাম নিয়ে কাজে লেগে গেল। কিন্তু তার বংশপরিচয় নিয়ে ধন্দটা আমার মনে লেগেই রইল। সে ঘোরাফেরা করে, মানে সামান্য দোদুল দোদুল হাঁটে, এই রোগীকে চান করাতে ঢুকে গেল তো ওই শাক বাছছে, এই দোকান যাচ্ছে, কি চাল ধুচ্ছে তো ওই হুঁশ একখানা পান খেয়ে আসতে চলে গেছে গলির মোড়ে। আর থেকে থেকেই আমার মনের মধ্যে রব উঠছে – বেস্পতি বৃহস্পতি, বেস্পতি বৃহস্পতি।

কোত্থেকে এমন নামটি বাগাল? কেমন ‘ঢোঁড়াই চরিত’ মার্কা নাম না? সোমরা, বুধিয়া এসবও যেন কেমন কেমন, মাঝখান থেকে শানুটা দলছাড়া। শনিচরি হলে মানানসই হতো, কিন্তু ওই নামকরণকারীরা বোধহয় শনিচরির হদিস জানত না। কেন জানত না? কারণ তারা বোধহয় হিন্দুস্থানি নয়। জাতিপরিচয়ের এসব অন্ধিসন্ধিতে ঢুকে গিয়েছিলাম এমন সময়ে শুনতে পেলাম বেস্পতি বলছে – নিয়েন না, নিয়েন না, ও ডাল কাল থিয়ে তসপাচ্চে, খোকাবাবুকে ফেশ ডাল দ্যান।

আমার কৌতূহল পা বাড়িয়ে আরো কয়েক ধাপ উঠে গেল।

 

২. ভদ্দল্লোক

এরা যাই হোক ভদ্দরলোক।

বজবজে যেখানে পেটিয়েছিল? বাব্বাঃ! ট্যাঙস ট্যাঙস করে ওটো তিনতলায়, তারপরে ঢুকতেই বল্লে – পারবে? তুমি পারবে? বলচে আর পা থিয়ে মাতা অবধি দেকচে। কী অত দেকার আছে জানিনে। রাগ উটে গেল, বলি – রেকে দেকতে হবে। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তো কার কী পারঙ্গম বুজতে পারবেন না।

বুড়িটা কেমন তেরিয়া গোচের, বলল – চারতলার চিলেকুঠিতে    থাকতে হবে কিন্তু, ওইখানেই শোয়াবসা, ওইখানেই বাতরুম- পায়খানা। নিজের খাবার রান্নাঘর ত্থে নিজের থালায় নিয়ে ওপরে গিয়ে খাবে।

রাগ কিন্তু উটচে, যার জন্যে আসা সেই তোদের রুগী কোতায়, কেমনধারা সে সব বিত্তান্ত বল, দেকা, তা নয় তো যত উটকো কতা। ততক্ষণে আবার বলতে লেগেচে, টিউকল ত্থে খাবার জল নিয়ে আসতে হবে দুকলসী দুবেলা, সে তুমি একবেলাতেই আনো আর দুবেলাতেই আনো। রাগ এবার মাতায় উটে দুম করে ভূমিকম্প ফেটে গেল। বল্লুম – মাপ করবেন আমার দ্বারায় হবে না।

ও মা! বুড়ি যেন অগ্নিমুত্তি ধল্লে – বেরোও, বাড়িত্থে বেরোও। বেরোও বলচি, দোরের বাইরে যাও।

চোকাট পেরিয়ে এতক্ষণ তো দাঁড়িয়েই ছিলুম, ভেতরে ডাকো নি বসতে বলো নি, এতটা দূর থিয়ে টেরেনে-বাসে করে এসেচি এক গেলাস জল পজ্জন্ত সাদো নি, একন বিনা দোষে এমনি করে কুকুর তাড়ান তাড়াচ্চো? বটে! আমি ফুঁসচি, সঙ্গে ছিল আমাদের মোল্লাপাড়ার তমিন, আমি তো পড়ালেকা জানিনে, এৎটা দূর, বাসের নম্বর অবধি বুজবো না, তাই তাকে আমার গার্ড দিয়েছিল রিংকু মালকিন। তা সে জোয়ান মেয়ে, সইবে কেন? কোমরে দুহাত দিয়ে ফোঁস করে উটল কী রে বুড়ি? উনি সেধে এয়েচে? লোক চেয়েছিলি তাই পেটিয়েচে, তবে এয়েচে। তিনতলায় থাকিস বলে বড্ড বাড় বেড়েচে, নয়? কী দোষ উনি করেচে যে একটা বয়স্ক মেয়েছেলে কোন দূর দূরত্ব ত্থে টেরেন-বাস ঠেঙিয়ে এসেচে তাকে নিষ্কারণ এমন করে কাক-তাড়ান তাড়াচ্চিস? অ্যাঁ? তোদের তিনতলায় শালা মুতে দিই, অমন ঢের ঢের তিনতলা দেকা আচে, চল তো দিদি, ভদ্দল্লোক এরা ভদ্দল্লোক! থুঃ!

বুড়িটার মুক যা হয়েছিল সে একখানা দেকবার মতন!

তখন তেতপ্পর বেলা, বজবজের পাইস হোটেলে আঁচলেত্থে বেশি পয়সা বার করে মাংস-ভাত খাই দুজনে। তাকে বাদ দিয়ে নিজে তো আর খেতে পারি না। ওসব করে ভদ্দল্লোকে। তোমার সঙে গলায় গলায় কতা কইবে, কত না জানি দোস্তি। তাপর ইদিক-উদিক চাইবে, ঘড়ি দেকবে, তুমি রওনা হয়ে গেলেই সিদে সড়কে একেবারে হোটেলখানা, এক পেট গিলবে, এটা নেবে সেটা নেবে, শালা বউ ছেলকে পজ্জন্ত নুকিয়ে খায় এসব ব্যাটাছেলে… এ আমার অনেক দেকা। তমিন, হতে পারে পর, কিন্তু এখন তো আমার গার্ড বটে, সে পড়ে দিয়েচে পর আমি ইস্টিশনে নেমেচি, বাসে উটেচি। হতে পারে সেন্টারের চশমখোর মালকিনটা গার্ডের জন্যে একশ টাকা হেঁকেচে, কাজটাও হলো না, আবার পরে যে চুলোয় পাটাবে তার জন্যে আবার গচ্চা যাবে একশ টাকা, কিন্তু এই বজবজের অলিগলি দিয়ে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে আমাকে এনেচে তো ঠিক, আমার মানে মান মেনেচে, ওর মতো অমন করে বুড়িটাকে মুক শোনাতে আমিও পাত্তুম না, তা কতকগুলো বেহুদো কতা সে তো আমার জন্যেই খরচ কল্লে, তাকে মাংস-ভাত খাওয়ানোটা আমার কত্তব্য কিনা আপনারাই বলেন!

রেট আমাকে যা-ই দিক রিংকু, দুটো ছুটি আমার মাস গেলে চাই-ই চাই। সব পার্টিকে এ-কতাটা আগেত্থেই বলে রাকি। আমার বাবা পরিষ্কার কতা। সারা মাস যা বলো করবো। রুগী যদি খুব খারাপ হয়, হামেহাল একপায় খাড়া থাকতে হবে, তা হলে তোমাদের সংসারের আর কিচু করতে টেইমে কুলোবে না, নইলে আমাকে বলতে হবে না। এই তো কাঁকুলি রোডের রুগীটাই ছিল অমনি। নব্বুইয়ের কাচে বয়স, সে বেচারির টেরামে পা কাটা গেচে। পেনশান তুলতে গিয়েছিল, তখন আশির ওপর বয়স, বাড়ির লোকের আক্কেলটা দেখুন! গেচে পা ফসকে টেরামের তলায়, দুটো পা-ই কাটা। তার ওপর চোকে দেকে না। কাটের পা আচে, আমাকে পরিয়ে দিতে বলতো, কিন্তু সে আমার দ্বারায় হতো না, আমি গুড়গুড়ি মেয়েমানুষ। তোর নিজের বাপ, নিজে পরিয়ে দে না বাপু, আমি ঠিকঠাক পারবো না, তারপর অত বড় মানুষটা যদি ধড়াস করে পড়ে যায়! এমনিতেই তো সে সব সময়ে ঠিরঠির করে কাঁপচে, দোষটা তখন কার হবে, দোষদুস পরের কতা, সে-রুগীমানুষটার কী হবে? হাত চলে না, চোক চলে না, পা তো নুলোন্যাংলা, সে যদি মরে যায় তো এই বেস্পতিই তো দায়িক হলো না কি? আর যদি পেরানটা থাকে, তবে সে-মানুষের যে কী যন্ত্রণা সে কি তুমি আমি হিসেব কত্তে পারবো?

এক মিনিট বসতে পেতুম না। বুড়োর আবার ডায়বিটি। তার দুধে আলাদা বড়ি দিতে হতো, দুধের মধ্যে দুটো করে বড়ি ফেলা, রুটি চটকে দেওয়া, তার ওপরে সব সময়ে আপসাচ্চে – মা, জল দাও, মা ছোট বাতরুম করবো, মা পেটটা কেমন কোঁতাচ্চে!

রুগীর সব করেও তাদের দশখানা রুটি, রাতের খাবার গরম করা, ভাত কম পড়লে ভাত করা সব করে দিয়েচি। এ-ও বলি, বুড়ো তোর জ্বলজ্বলে শ্বশুর, রেলের নাকি মস্ত চাকরি করত, মোটা পেনশন পায়। তাকে খেতে দেবে এইটু বাটা মাচ একটা। বুড়ো বলে – ও বেস্পতি আজকে শুনলুম পার্শে এসেচে, দেবে না? ও মা! সে কতা বলেচি তো ওই একটা ছোট্ট পার্শে ঠেকিয়ে দিয়েচে। এরকম তঞ্চকতা ছোট মন বেস্পতি সহ্যি কত্তে পারে না। সেই নিয়েই দুটো কতা বলেচি, বাস আমায় দশ কতা শুনিয়ে দিলো। সে দিনই চলে আসি। যাঃ, তোরা যা পারিস কর।

কিন্তু যেখানেই যাই, যতই যাই করি দুটো ছুটি আমার চাই-ই চাই। কেননা আমার গভ্ভধারিণী পঁচাশি পার হলেন, তাকে দেকাশোনার একটা কাজ, খাইখরচাটা আমায় মাস মাস দিতে হয়। বয়সকালে তিনিও আমার করেচে, বাপ তো বাসচাপা পড়ে মরে গেল, তা একন বুড়োকালে তাকে দেকা আমার কর্তব্য কিনা বলেন।

 

৩. নাতিমারা দেবতা

সেশনের ঠিক মধ্যিখানে হয়েছিল আমাদের মহামুশকিল। শাশুড়ি পায়ের অপারেশনে শয্যাগত। বেরোতে না হলে আমিই হয়তো কষ্ট করে সামলে দিতে পারতাম। কিন্তু বেরোতে তো হবেই। সরকার এখন ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার জন্য পর্যন্ত ছুটি দিচ্ছে; কিন্তু

শ্বশুর-শাশুড়ি, মা-বাবার অসুখে ছুটিটা এখনো দিচ্ছে না। অথচ সেটা খুব জরুরি। এ তো আর এখনো পুরোপুরি ওয়েস্টের আপনি আর কপনির সংসার হয়নি! উপরন্তু বাকি ছুটির ব্যাপারে অথরিটি বেশ কড়া। অগত্যা দুদিন সিএল নিয়ে বিভিন্ন সেন্টারের আয়াদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম। কাউকেই মায়ের পছন্দ হয় না, কেমন নোংরা নোংরা, ওরে বাবা চোখে-মুখে কথা কইছে, দেখলেই মনে হয় চোর, খালি ইতি-উতি চাইছে…। যতই সেন্টার থেকে আসুক, সেখানে শুনেছি এদের পরিচয়ের সমস্ত ডিটেলস ফাইল করা থাকে, কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। যতই পরিচয় থাক, একবার দামি কিছু নিয়ে পালালে বা আর কোনো ক্ষতি করে দিলে তো হাজার ঝামেলা, আজকের ব্যস্ত দিনকালে আমরা সেসব করে উঠতে পারলে তো! আর ক্ষতির তো কোনো পূরণ নেই! অন্যগুলো ঠিকে কাজের লোক, নির্দিষ্ট কাজটুকু করে দিয়েই কেটে পড়বে। ছেলেমেয়ে বড়রা সব যে-যার কাজে বেরিয়ে যাবে, মা একেবারে একা, এই আয়ার তত্ত্বাবধানে। ভয় লাগে বইকি!

মা প্রথম কথাই জিগগেস করলেন – দেখো বাবা, তোমার      মাথায় আবার উকুন-টুকুন নেই তো? থাকলে বলো, ওষুধ দেবো, মাথা ধুয়ে আসবে।

উত্তরে সে নিচু হয়ে স্বল্পকেশ-মাথাটা মায়ের চোখের তলায় পেতে দিলো। তারপর বলল – দেকে নিন মা, বেস্পতির মাথাত্থে পা সব পয়ঃপরিষ্কার। ও কতা তাকে বলতে হবে না। রুগীর কাজ! আমার নিজের মা-জননী আমাকে হাত ধরে শিকিয়েচে। আজ আট বচ্চর ধরে এই-ই করচি মা। শরীরে ময়লা পাবেন না। রংটা ভগমান ময়লা দিয়েচেন। তার ওপর তো আর হাত নেই, কিন্তু

পতিদিন সাবাং মেকে চান, পতিদিন নিজের কাপোড়চোপড় সাবাং দিয়ে কাচা। সাবাংটা আপনারা দিলে বালো, নইলে নিজে ত্থিয়েই খর্চা কর্তে হবে।

সত্যিই, মা পরে বলেছিলেন – মেয়েটার গায়ে দুর্গন্ধ তো দূরের কথা, কোনোরকম গন্ধই নেই। খুশিমনে মা তাকে গায়েমাখা সাবান, গুঁড়ো সাবান, মাথার সুবাসিত নারিকেল তেল, গায়ে মাখার সরিষার তেল সব মঞ্জুর করলেন। সে মহাউৎসাহে কাজে লেগে গেল, মাকে ‘বেয়াম’ করিয়ে সে বরফের ‘ছ্যাঁক’ দেয় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, পাঁচ মিনিটের বেশি এক জায়গায় রাখতে হয় না এ-বৃত্তান্ত সে অলরেডি জানে, যদিও আমাদের জানা ছিল না, তারপরে চান, গোড়ায় অলিভ অয়েল, মাঝে বেশ করে সাবাং তারপরে আগাপাশতলা ক্রিম ম্যাসাজ, যার চোটে মায়ের একঘুম হয়ে যায়, তারপরে সযতেœ খাবারের প্লেটটা একটা ট্রেতে রেখে সে মাকে খাওয়ায়। অ্যান্টিবায়োটিকের ঠ্যালায় তাঁর কিছুই এখন মুখে রুচছে না, বেস্পতি মাকে তেতো খাওয়ায়, বাজার থেকে গন্ধলেবু আনে, টিপে খাবারের স্বাদ বাড়ানোর চেষ্টা করে, দিনরাত মায়ের উহু উহুটা যেন একটু কমেছে মনে হয়, আমি নিশ্চিন্তে কাজে যোগ দিই। মাসখানেকের মধ্যেই নাক আসবে, কলেজে হুলস্থুল পড়ে গেছে,  আমিও সেই ঘূর্ণাবর্তের মাঝে পড়ে যাই, বেস্পতি আর বেস্পতির ‘রুগী’ মাথার অজস্র কম্পার্টমেন্টের মধ্যে পেছনের দিকে চলে যায়।

হঠাৎ একদিন খেয়াল হতে দেখি মা পিঠে তিনটে বালিশ ঠেসে বিছানায় বসে আছেন, মুখে একচিলতে হাসি, সামনে মোড়ায় বসা বেস্পতি, তার অতিসামান্য চুল মাথায় উবু ঝুঁটি, পরিষ্কার একটা নীল ছাপছাপ শাড়ি কালো ব্লাউজের ওপর পরা, পা-দুটো প্যান্তা খ্যাচাং করে দুদিকে ছড়ানো, ছোট ছোট হাতদুটো শূন্যে নেড়ে নেড়ে কী সব গল্প করে যাচ্ছে, মা নিবিষ্টমনে শুনছেন। আমিও একটা মোড়া টেনে বসে যাই – কেমন বোধ করছেন, মা? কী বেস্পতি তোমার রোগী কী রকম সারছে?

মা বললেন – আগের চেয়ে ভালো। শোন্ না বেস্পতির কথা। খুব ইন্ট্রেস্টিং। আগেই বলেছি বেস্পতি বেশ স্মার্ট, সে কোনো লজ্জা-সংকোচের ধার ধারে না, বলল – বউদি কতসব ভালোমন্দ কতা শুনে এলেন, আমার কতায় ইনটেস পাবে কেন?

মায়ের মুখ হাসিতে উজলে উঠল, বললেন – শোনই না। বলো বেস্পতি বলো।

বেস্পতি বলল – আমার গায়ে পা লাগতে আপনার শাশুড়ি নমো-নমো করচেন, দেকে তো আমি অবাক। তিনি একে ভদ্দল্লোক, তার ওপরে বয়সে বড়। তাই বলচিলুম – এ কী করচেন, এমন আমি কোথাও দেকি না। সে এক বাড়িতে কাজে লেগেচিলুম, তাদের চোদ্দো-পনেরো বচরের ছেলেটা যকনই পাশ দিয়ে যাবে এমন করে যাবে, তার পা-টা আমার গায়ে লাগবেই লাগবে। যতই সরে সরে বসি সে ঠিক এসে আমাকে লাতি মারবে, লাতিই তো, আর কী বলেন! কদিন দেকে রাগ উটে গেল, বলি – ঠিক করে চলতে পারেন না? আমার গায়ে যে আপনার পা লাগচে! কিচু না হলেও তো আমি আপনার চে বয়সে বড়। তা লাল লাল করে চেয়ে বললে – তুমি সরে বসতে পারো না? ইডিয়ট, আবার কতা! তার মা শুনতে পেয়ে ধেয়ে এলো, – বললে বয়সে তুমি বড় হতে পারো কিন্তু পোস্টে ও বড়। তা ছাড়া এ বয়সের বাচ্চা সে তো দেবতার মতো! তার পা আবার পা! মনে মনে বলি – চোদ্দো-পনেরোর ধাড়ি, আবার নীতি মারা পুত্তুর! সে দেবতাই বটে! কিন্তু মা আমরা হলুম ছোটলোক, এত রাগ করা কি আমাদের পোষায়! তার ওপরে তখন বড্ডই টাকার দরকার হয়ে পড়েছিল। সেই ত্থে জানি ভদ্দল্লোক এমনিই হয়!

আমি বল্লুম – ছি ছি! তুমি কি সব জায়গাতেই এমনি ব্যবহার পেয়েছ?

সে বলল – মিথ্যেয়তা বলবো না। সকলে এমন ছিল না। তবে আপনার শাউড়ির মতো নমস্কার মানতেও কারে দেকিনি।

মা বললেন – জানিস তো, ও আমাদের চা খায় না, গুঁড়ো চা কিনে আনে, দুধ দিয়ে খায়।

– সবাই কি আর আমাদের মতো লাল চা খাবে মা?

আমি জানি, বাঙালি মধ্য আর উচ্চবিত্ত ছাড়া কেউই প্রায় পাতা দার্জিলিং পছন্দ করে না, বিশেষ করে বেস্পতির শ্রেণি তো আরো না। সেটা আর বলি না। মা বললেন – নারে, ও মাড়োয়ারিদের থেকে চা খাওয়া শিখেছে। বলো না বেস্পতি…

– না মা, চা তো বেস্পতি জন্মেত্থেই খাচ্ছে, তা নয়। মাড়োয়ারিরা টুপিয়ায় দুধ বেশি জল কম, অনেক সময়ে দুধ গুঁড়ো চা আর চিনি সব দিয়ে একবারে উনানে বসিয়ে দেয়, তাতে তেজপাতা, ডালচিনি, ছোট এলাচ ফেলে দেবে, সেই চা খেতে ভারি সোয়াদ। সে আর পাচ্চি কোতায়। না না, তা বলে ভাববেন না আপনাদের দুষচি, তা নয়। একেক বাড়ির ধান পান একেক রকমারি। আমি বলি – মাড়োয়ারিদের বাড়ি কী করতে? এই রকম রোগীর সেবাই?

– আমার মা সে-বাড়ি করতো, সিজারের কাজ, তা মা-ই আমাকে ঢোকায়। বাবুজির বাঁদিকটা পড়ে গেচে, মাজিও কেমন জুবুথবু। মিথ্যেয়তা বলবো না, দুজনের জন্যে পাঁচ পাঁচ দশ হাজার টাকা আমায় মাস গেলে দিত। চার বচরেরও বেশি ওখানে ছিলুম মা, একটু খাটনি বেশি, কিন্তু সুকে ছিলুম। দুদ খেয়ে খেয়ে মোটা হয়ে গিয়েছিলুম। কত রকম শিকেচি। মশলা-চা তো কিচুই না। সে-বাড়ির দাদারা শুদু দুদে চা খেত, রাজমা জানেন? রাজমা রাঁদতে পারি, ছোলে, তারা তো রুটি-পরোটায় এক থাবা ভালো ঘি ছাড়া খায় না, কোলের ছেলের চুল ফেলতে গেল সেই রাজস্তান, তারপর কাশী বেন্দাবন হিল্লি দিল্লি, আমাকে নিয়ে গেল, কোনোখানে তাদের আপনার লোকের বাড়ি, কোতাও হোটেল, এই আপনাদের মতন নরম ফর্সা বিসনা, কত রকমের খাবার, নিরমিষ অবিশ্যি … বুঝতে পারি বেস্পতি সোজা কথার সিধে উত্তর দিতে পারে না, তাকে একটু না একটু ফ্যানাতে হয়, উপরন্তু তার অভিজ্ঞতা অনেক। কিন্তু এখন আমারও আবার রকমারি কাজ। বসে বসে বেস্পতির সত্যি কথা শোনবার সময় নেই। মা শুনে মজা পাচ্ছেন, শুনুন। ভালোই, অন্যমনস্ক থাকলে ব্যথা-বেদনা ভুলে থাকতে পারবেন।

 

৪. ঐতিহাসিক

এই যে তার রোগী-রোগিণী বা তাদের আপনজন, যাদের সঙ্গে কথাবার্তা, মেলামেশা তাদের সে-বয়স বুঝে বউদি, বাবা বা মা ডাকে ঠিকই, কিন্তু অবসরকালে যখন মাথার মধ্যে ভাবনাচিন্তারা ভিড় করে আসে, তখন যার কথা মনে পড়ে সে বেস্পতির নিজের মা। আসল মা সে-ই। কাগের পালক দিয়ে কান চুলকোতে চুলকোতে বেস্পতি জাবর  কাটে – আজ তিনি পঁচাশি-ছেয়াশি বচরের কোমরভাঙা বুড়ি, কিন্তু তাকে তো আমি তার কম বয়সেও দেকেচি মা, ইয়া লম্বা চওড়া মানুষ। চল্লিশ-বেয়াল্লিশের নিচে সায়া পরে না। বেলাউজের মাপে দুটো বেস্পতি ঢুকে যাবে। টালিগঞ্জের রেলের পাশে থাকা। আমি আর দিদি শানু। বাকি সব দিদি কোন ছোটতেই মরে হেজে গেচে। বড় সোমরা তাকে আমার মনেই পড়ে না, বুধিয়া টাইফাট রোগে গেল। বাপ বাসচাপা পড়ে মরল, তখন আমি এই টুকুনি, আমাদের দুজনকে নিজের ননদের কাচে রেকে সেই মা তো উদস্ত খাটতো। জোগাড়ের কাজ। সারাদিনের পরে সন্দে রাত্তিরের দিকে যাচ্ছে তখন এসে এলিয়ে পড়তো। কিচুদিন পরে মাড়োয়ারিদের বাড়ি সিজারের কাজ ধরল, ওরই মদ্যে একটু হালকা কাজ। বুধির জন্যে আমি তখন খুব আপসাতুম, বাবার জন্যে অতটা না, মাকে ভয় পেতুম, একে অত বড় মানুষটা, তায় যকনই বাড়ি আসুক আমাদের বুয়া তার কাচে ঘেঁষতে দিত না। বলতো মা খেটে এলো তাকে তং করিসনি।

রোগিণী মা বুঝতে পারেন না, বলেন বুয়া? বুয়া তো হিন্দুস্থানিরা বলে।

– বা, ওই যে বল্লুম আমার বাপ বেহারি রাজিন্দর সাউয়ের ঘরে মানুষ হয়েছিল! এ তার মেয়ে। তা শুয়ে শুয়ে মা খালি শরীল পাকলাতো, শরীল পাকলাতো উঃ, আঃ, উঃ, আঃ, গোঙাচ্চে, তখন আমি তার পা মাড়িয়ে দিতুম, দিদি মাতা টিপে দিত, কিন্তু ভয়ে

ভয়ে। মিথ্যেয়তা বলবো না সে বুয়া আমাদের দু বোনকে খুব আলগাতো। –

বাপ মরে গেচে খপর পেয়ে বাপের আসল বাড়ি ওপার থেকে দু-তিনজন ব্যাটাছেলে, তারা নাকি বাপের মেজো ভাই আর ছোট ভাই, তো তারা এসে বললে – চলেন, আমরা আপনাগ আপনজন, বউদি আপনি আমাগো বংশের বড় বউ, আপনাকে এভাবে ফাইলা যাইতে পারি না, চলেন মাইয়াদের লইয়া, কোনো ভয় নাই।

মা যাবে না, তার সেই এক গোঁ, আমি খেটে খাবো, মেয়েদের মানুষ করব, কারুর দয়ার পিত্যেশ করি না।

কাকারা বলে – মাইয়াগ বিয়া দিবেন কী কইরা? আমরা অগো ইস্কুলে পড়াইমু, বংশের মাইয়া সেই মতুন যোইগ্য বিয়া…

মা বললে – মেয়েদের জিগান, যদি যেতে চায় যাক, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই।

শানুদিদি নেচে উটলো, ও যাবে, ওপারে কোতায় বাপেদের নাকি এত বড় বাড়ি, ধানের গোলা, ক্ষেত, চাষবাস, অনেক মুনিষ খাটে। একানে এই কষ্ট করে দুবেলা দুমুটো, জাঁল্লা দিয়ে একটু রোদ বলে কিছু আসে না, বাপ গিয়ে অবধি একটা লজেন চকলেট পজ্জন্ত কোনদিন মুকে করিনি… কাকারা দোকান থে এত বড় বড় চকলেট এনেছেন, মিষ্টির বাকসো… সে বলল – আমি যাবো।

কাকারা বললে – আর ছুটটা?

আমি মায়ের আঁচলের মুঠ শক্ত করে ধরে রেকেচি। মা ছেড়ে কোত্থাও যাবো না।

– বলো কী? শানু মাকে ছেড়ে চলে গেল?

– ওরে কয় নিমকহারামি মা, মানুষের মদ্যে এ-প্রেবিত্তি আকচার দেকবেন। জন্মেত্থে নেমকহারামি। ভালো খাবে পরবে, বাস এই লোভে শানুদিদি চলে গেল।

– তোমার মাও ছাড়ল তো!

– সে তো আগেই বলেচে মেয়েরা যেতে চাইলে যাক…

– জানা নেই, শোনা নেই, মেয়েটার যদি কোনো ক্ষতি হতো!                  – নিজের কাকা সব, সে টুক তো জানা, ক্ষেতি যদি হয়, হবে। বেস্পতির কোনো হেলদোল নেই।

– তা তুমি যে এই বলছো ওপার থেকে তোমার কাকারা এলেন, বুঝতে পারছি অনেক দিন বাদে, ব্যাপারটা আমার কাছে কিন্তু ঠিক ক্লিয়ার মানে খোলসা হলো না বেস্পতি।

– আমার বাপে কিন্তু ছিল চৌধুরী, মা আপনাদের যে টাইটেল। বামুন ছিল বাপ। সে এক গপ্পো কতা।

– বলো কী? তবে যে বললে তুমি ম-ল!

সে তো আমি বে হয়ে হয়েচি মা, তার আগে ছিলুম ওই চৌধুরী বাম্ভনা। কিন্তু বাপ সে মানতো না। নিজেকে বলতো সাউ। তেনার ধম্মবাপ বেহারের সাউ ছিল কিনা! তাকে বাপ জেয়াদা ভক্তি করতো।

তেনার মেয়ে বাপের বোন, তেনার ছেলে বাপের ভাই… এমনি। আমরাও তাই জানতুম। মা মাজে মাজে পুব বাংলার ওই বামুনবেড়ের কতা গপ্পো করতো, বাপের কাচ থে যেমন শুনেচিল আর কি, আমরাও সেইটু জানতুম, কিন্তু ভালো বুজতে পারতুম না। এই একটা বাপের বাড়িতে বাপের বাপজি মাজি বাই বহেন আবার বামুনবেড়ে না কী সেকানে কী করে বাপের বাপ মা থাকে! আসল কতা বাপ নিজের বাড়িত্থে পেইলে এসেচিল।

– কী কা-! কেন?

– বাপের যে বাপ তিনি ছিল গোঁড়া বলে না! সেই, আর যা বলবে তাই, যা বলবে তাই, আমার বাপ পড়ালেকা করতে চাইতো না, তিনি বয়সের ছেলে পিলে নিয়ে দল করে শয়তানি করে বেড়াতো আর ধরা পড়ে মার খেতো। একদিন বদমাশি করে কার বাড়ি ত্থে মোরগা চুরি করে খেয়ে সেরেচে, জানতে পেরে তাঁর বাপ দিয়েচে রামপ্যাদান প্যাদানি – বামুনের ছেলে তুই মুরগি খেয়েচিস? তার ওপরে আবার মোসলমানের বাড়ি চুরি? তোর ওই জিব আমি ছিঁড়ে ফেলে দেব। অক্ত বয়ে যাচ্ছে মা, ঘরে দোরে যে ছিল এসে তামাতে যায় তিনি থামবে না। কঞ্চি ভেঙে যেতে সেটা ফেলে দে হুম দুম করে চলে গেল।

তার মা এসে খাওয়াতে যায়, তিনি খায় না, দিদি এসে মুকে চোকে জল, ওষুদপালা করতে চায়, তিনি উল্টে শোয় না, দিনমান সেই উবুড় হয়ে শোয়া। সাঁজ লাগতে চুপিসাড়ে উটে সে শটির জঙ্গল দে বারের রাস্তায় পড়ে আর পেচনে চায় না। তকন বোদহয় বর্টারের ত্যাত কড়াকড়ি ছিল না, এপারে তিনি এক রাজিন্দর সাউয়ের কাচ থে কাটের কাজ শিকচিল, সেই বাড়ি এসে পড়ল, আর কোনদিন খপর নেয়নি, ফিরে যায়নি। তিনিই বাপকে ছেলের মতো বড়টা করল, কাজ শেকালো, বে-থা দিল, বাস।

– এ তো এক আজব গল্প শোনালে বেস্পতি! বাংলাদেশের, নাকি তখনো বাংলাদেশ হয়নি?

– অত কতা বেস্পতি বলতে পারবে না মা। কবে সে বাংলা, কবে সে পাকিস্তান, জানিনেকো।

– তা সেই বাংলাদেশের গোঁড়া বামুন ঘরের ছেলে তিনি এ-বাংলায় বিহারি রাজিন্দর সাউয়ের কাছে কার্পেনট্রির শিক্ষানবিশ? মধ্যবিত্তের আপোয়ার্ড মবিলিটির কতা শুনেচি ঢের, এ যে তার উলটো? বউমাকে বলতে হবে তো? তারপরে? তোমার বাবা-মার বিয়েটা কীভাবে হলো? মা-ও বিহারি ছিলেন না কী?

– না মা, আমার মা বেহারি ছিল না, সে ম-লের ঘরের মেয়ে। তারও কেউ ছিল না, বাঙাল ঘরে মানুষ হয়েচিল, বাপের সেই বেহারি বাপেদের সঙ্গে তাদের জানাশোনা ছিল, তাইতেই বে-টা হয়ে গেল।

– তোমার বাবা কোনো আপত্তি করেননি, বামুনের ছেলে তো!

– মনে কিচু করবেন না মা, আমার বাপ বামুন বলতে ঘেন্না পেতো। বেহারিদের সঙ্গে ওটাবসা, ম-ল বউ, তো তার মতো করে ঘরকন্না, বাপের কোনো আপত্তি ছিল না।

 

৫. ফ্যামিলি স্ট্রাকচার

বাড়ি ফিরতে সেদিন আমার শাশুড়ি জানালেন প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকাটাই স্বাভাবিক হলেও আমাদের ক্ষেত্রে আলংকারিক অর্থে সেটা যেন না থাকে। আমরা নাকি ইতিহাসের টুকরো নিয়ে বাস করছি। সে-বিষয়ে আমাদের সচেতনতার নিতান্ত অভাব।

এত কথার কারণ আমি ইতিহাসের অধ্যাপিকা। সোশ্যাল হিসট্রির ওপর আমার ডিসার্টেশন আছে একটা। কৌতূহল দেখাতেই হয়, নয় তো মা ক্ষুণœ হবেন। কৌতূহল অবশ্য আমার এমনিতেই যথেষ্ট। কিন্তু কলেজে ধুন্ধুমার খেটে, তারও পরে ইতর ক্লিকের সামনে পড়ে তাকে বুদ্ধি করে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে আরো একটু এক্সট্রা অন্যের হয়ে থ্যাংকলেস খেটে দিয়ে হাঁ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছি। এখন আমার প্রয়োজন এমনকি এক কাপ চা বা কিছু গরম খাবারও নয়, স্রেফ নিজ বিছানায় লম্বা হয়ে বিশ্রাম।

টোটকা আর রুমি আমার ছেলেমেয়ে এতক্ষণ নিজেদের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, এখন বোধহয় মায়ের সঙ্গে কিছু ইয়ার্কি দেওয়ার তালে ছিল, আমার সঙ্গে হুট করে ঠাম্মার ঘরে ঢুকে পড়ল –

– মা জানো বেস্পতিমাসি না আমাদের তরকারি খায় না, নিজে আলাদা করে রান্না করে নেয়, রুমি উবাচ।

আমি একনজর দেখেই বুঝতে পারি বেস্পতি খুব লজ্জায় পড়ে গেছে, মুখ নিচু হয়ে গেছে একেবারে। – তেমন কিচু নয় বউদি বিশ্বেস করুন, ওই দুটো গাঁটি কচু ফেলে দিতে বলেছিলুম ভাতে, আর বাজার ত্থে দুটো চুনাচানা মাচ এনেছিলুম সেটা রেঁদে নিয়েচি।

উল্লেখ্য, বেস্পতি মায়ের সেবার কাজটা হালকা হওয়া ইস্তক আমাদের বাজারটাও করে দিচ্ছে। আমরা কেউই তাকে বাজার যেতে বলিনি, কিন্তু সে-ই বলল, চুপচাপ বসে থাকতে নাকি তার অসহ্যি লাগে, আর তার একটু হাঁটাও দরকার। সে হাঁটার মানুষ, বসে থাকার মনিষ্যি নয়।

– মা বললেন – কই বেস্পতি তুমি যে নিজেরটা নিজে রান্না করে খাও সে কথা তো আমায় বলোনি! কী ব্যাপার? বামুন, আমাদের ছোঁয়া খাবে না না কী?

– ছি ছি, বেস্পতি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে যায় আর কি! আসল কতা মা, মনে কিচু করবেন না, আপনাদের আঝালা আতেলা রান্না বেস্পতি খেতে পারে না। তার ওপর ও রান্নামাসি সবেতেই একগঙ্গা করে জল ঢালে। আমি কিছু বললে সে ভালো মনে নেবে না তাই বলতে পারি না মা। ও বউদি, আমার মাতা খাওসে আজ এট্টু আমার রাঁদা মাচ খেয়ে দেকতেই হবে।

তা দেখলুম। পেঁয়াজ রসুন বিশেষত রসুন বাটা বেশ খানিকটা পড়েছে বুঝতেই পারা যাচ্ছে, যদিও ভালো করেই কষা হয়েছে। তবে তার স্বাদ নেব কি, ঝালে মুখ জ্বলে গেল। বেশ তেলও আছে। বলি  – কতটা লংকা দিয়েচিলে বেস্পতি? আমাদের বাড়ি কাশ্মিরি লংকা আসে, রংটাই লাল, আসলে তো তত ঝাল নয়!

বেস্পতি বলল – আপনার ঝাল লাগল? আমি তো গুঁড়ো লংকা ব্যাভারই করি না বউদি, ওই গোটা চারেক কাঁচালংকা বেটে দিয়েচি।

চুনোচানা মাছ বলে যা রেঁধেছে বেস্পতি তার আলাদা অস্তিত্ব কিছু বোঝা যাচ্ছে না, পেঁয়াজ রসুন আর ধানি লংকার ঝাল মিশে সেটা একটি তাল, রীতিমতো তেলা তেলা। তবে হ্যাঁ, খেতে ভালো, আমাদের অভ্যাস নেই তাই। বারোমাস এই খেতে হলে দুদিন পরেই শুয়ে পড়তে হবে। বেস্পতির হিম্মৎ আছে।

– কেমন খেলেন বউদি!

– ভালো। ওর জ্বলজ্বলে মুখের দিকে তাকিয়ে বলতেই হয়। আর সত্যিই তো, ভালোই তো!

– মিথ্যেয়তা বলব না, সে উৎসাহিত হয়ে বলে, বাড়িতে সব আমার হাতে ভালো খায়। জামাইরা তো আমি থাকলে আর কাউকে রাঁদতেই দেবে না। খাসিটা মা রাঁদুক। তা বউদি, বাড়িতে থাকা আমার… সে যে-মাসে অমাবস্যে নেই। আপনাদের এ-দিদি রাঁদে এককড়া ঝোল। আমরা ও রকম খেতে পারি না মোটে। মা বড়টা হয়েচে বাঙালবাড়ি, বাঙালদের রান্না একবারে আলাদা, মনে কিচু করবেন না, সে আপনাদের হাতে আসবে না। আর ওই গোদা গোদা পোনা মাচও আমরা খেতে পারি না। ছোট মাচ যেমন পুঁটি চ্যালা আমুদি কাঁচকি নেহারি এইসব ভালো খাই।

– তা কীভাবে রাঁধলে তোমার ওই চুনো মাছ?

একটা বড় পেঁয়াজ, একটা গোটা রসুন, বেশ করে বেটে নিলুম একেবারে চার পাঁচটা কাঁচালংকা দে, এক পলা শর্ষের তেল গরম করে হলুদ আর ওই বাটাটা কষলুম, তারপরে মাছটা দিয়ে দিলুম।

– আলাদা করে ভাজলে না?

– না বউদি, আপনারা ভাবেন এত তেল কত তেল, তা কিন্তু নয়, ওই একবারের তেলেই মাচ মশলা সব ভেজে নিলুম। এবার ওই মাচ আর মশলা আপনি স্বতন্তর করতে পারবেন না। খন্তি করে একধার থিয়ে তুলে গরম ভাতে দোব, ওই দিয়েই আপনার এক থালা ভাত উটে যাবে। –

– তোমাদের সব্বাই এরকম ঝাল খায়?

– আমাদের লাগে না। সেজ জামাইটা এ দিকের, শহরে বাজারে বড়টা হয়েচে, সে একটু হুশহাশ করে। খেয়ে নেয় ঠিক।

– সেজ জামাই মানে? আশ্চর্য হয়ে জিগগেস করি – কজন জামাই তোমার?

– চারটে মাইয়া, চার জামাই আমার।

– বলো কী?

ঈষৎ লজ্জিত হয়ে বেস্পতি বলল -­ আপনাদের আশীব্বাদে চারটে মাইয়ারই বিয়েশাদি হয়ে গেচে। নাতি-নাতনি দশটা, দুটো গেচে তাই নিয়ে।

– সেজ জামাই এদিকের বললে, তা আর জামাইরা কোন দিকের?

– দকনো বলে না? সেই বউদি। তার মদ্যে দুটো আবার বাঙাল, ওদিকের চোঁদরবন ত্থে এদিকে সব এসে সেটলমেন বলে না সেই।

বুঝলুম।

বেস্পতির ফ্যামিলি স্ট্রাকচারের রূপরেখা যা পাচ্ছিলুম, তাতে কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। এই মহিলা, মধ্যপঞ্চাশ বয়সে যে নাকি সারা বচ্ছর ঘুরে ঘুরে আয়ার কাজ করে বেড়ায়, তার চার মেয়ে, চার জামাই, দশ নাতি-নাতনি দুটো মৃত নিয়ে এবং পঁচাশি-ঊর্ধ্ব মা। জামাইরা তার হাতের ঝাল ঝাল খাসির মাংস খেতে ভালোবাসে। এর পরে বেস্পতি আমাকে আরো চমকে দিলো ঘোষণা করে যে, তার মেজ নাতবউ এবং ছোট্ট আট বছুরে নাতনিটা পর্যন্ত তার হাতের মাংস ভালোবাসে। মনশ্চক্ষে দেখতে পেলুম বেস্পতি হাঁড়ি ডেকচি কোলে করে বসে আছে, আর তাকে ঘিরে হুশহাশ করে খাসির ঝাল ঝাল মাংস খাচ্ছে এক বিরাট ফ্যামিলি, চার মাইয়া, চার জামাই, আট নাতি-নাতনি এবং তাদের দিদিমা। কল্পদৃশ্যটি মধুর এবং জমজমাট সন্দেহ নেই, কিন্তু বেশ উদ্বেগজনক। নানান কারণে।

একনম্বর, বেস্পতি কি একাই আর্নিং মেম্বার এই সমূহ ফ্যামিলির? এদের রকমসকম আমার যদ্দূর জানা আছে, এদের পুরুষ মেম্বাররা একটু আরামে থাকতে ভালোবাসে, কাজকম্ম করা তাদের আসে না, এরা সকলেই কি বেস্পতির নড়বড়ে ঘাড়ে?

দুনম্বর, যে-কালে মেজো নাতবউ পর্যন্ত হয়ে গেছে, বলার ধরন শুনে মনে হয় তার আগে বড় নাতবউও আছে, তার মানে নয় নয় করেও কয়েক বছর হলো এডিশনটি হয়েছে, সে-কালে নাতি অন্তত পঁচিশ ছাব্বিশ তো হবেই? তার মা অন্ততপক্ষে আর সতেরো বছর, হলো তেতাল্লিশ, সে যদি বড় কন্যে হয় তো বেস্পতির বয়স মিনিমাম আর ষোলো যোগ করে সাতান্ন, মেজ কন্যে হলে আরো দুই যোগ করে ঊনষাট। তার এদিক-ওদিক যে হবার জো নেই তা বলছি না, কিন্তু এটাই বাস্তব হিসাব। বেস্পতি আগেই কবুল করেছিল যে তার বর মাথায় রক্ত উঠে যখন মারা যায় তখন সে বাড়ির বাইরে পজ্জন্ত বেরোতে শেখেনি। তবে কি তার চার চারটি অফস্প্রিং আঠারোর মধ্যেই হয়ে যায়? তা হলে তার বিয়ে হয় কত বয়সে?

তিন নম্বর, মেয়েরা তো বেস্পতির কাল থেকে এক প্রজন্ম অন্তত এগিয়ে এসেছে, তা হলে তাদের বিয়েটাই বা হলো কত বয়সে, তখনো আঠারোর নিচে বিয়ে বেআইনি হয়ে যায়নি এ-কথা ঠিক, তবু একটু তো অগ্রগতি! একেবারে তেরো-চোদ্দোয় বিয়ে নাকি? আর একটু-আধটু অন্তত করপোরেশন স্কুলে পড়াশোনা… ? নাকি…

তা বেস্পতি স্বয়ং এ-সমস্যার সমাধান করে দিলে। মুখে বেগুনি আভা খেলিয়ে বলল -­ মা তো আমার বে দিয়ে দিলো তখন আমার এগারো পোরেনি, সংসারের কিচুই বুজি না।

-­ বলো কী? কোন সাল সেটা?

দশ-এগারোয় বিয়ে তো আমাদের শাশুড়িদের কালেও ছিল না।

-­ সাল তারিক যদি অতই জানবো তো ব্যবস্তার এত দুর্বিপাক হবে কেন বউদি?

ব্যবস্তা মানে বোধহয় অবস্থা, আর দুর্বিপাক বেস্পতি পরিষ্কার উচ্চারণ করল, ওর বলার কথা দুব্বিপাক, তাই না? শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত হবার সময়ে যেমনটা ঘটেছিল তেমন কিছুই শুনতে পাচ্ছি বেস্পতির ভাষ্যে, কোনোটা শুদ্ধ, কোনোটা ভাঙা।

ও-ই বিশদ করে কার্যকারণ।

-­ শানু তো চলে গেল। মা রোজের রোজ কাজ করতে বেরিয়ে যায়। আর রোজ বাড়ি ফিরে দুজনে মাথায় হাত দিয়ে বসে।

-­ দুজনে?

-­ হ্যাঁ গো বউদি, মা আর ওই বুয়া। মেয়েকে ইস্কুলে পাটাতে অবধি ভয়, রেল বস্তি তো জায়গা ভালো না, দিনকালও খুব খারাপ। শেষে ওই কাচাকাচিই তিনি টিউকলের কাজ করতো, মা বাদে আর কেউ নেই, তাদের ধরে পড়ল, কি আমাদের বয়সের মেয়ে আচে, নিয়ে উদ্ধার দাও। তা সে তিনি তো পঁচিশ-ছাব্বিশের জোয়ান, ইয়া মোচ, করপোরেশনে জলের লাইনের কাজটাও ধরেচে সবে। শানাই-মানাই করে তিনি আর তার মা তো উদ্ধার দিলে, নাইন করে লোক খাচ্চে, মাংস মাচ দই বোঁদে কিচ্চুটি বাকি ছিল না। বেস্পতি তো কাপড় পরে ভয়ে জড়পুঁটুলি। তা মা ছেলে তারা লোক ভালো ছিল। একটি একটি করে হাতে ধরে কাজ শিকিয়েচে শাউড়ি।

-­ আর তোমার বর?

-­ সে-কাজ ফেরত পেরায় পেরায়ই লজেন টফি নিয়ে বাড়ি আসতো বউদি -­ খা বেস্পতি খা, বলতে বলতে কি একটু উদাস হয়ে গেল বেস্পতি? নাকি ওটা আমারই সংস্কারবদ্ধ ধারণা? প্রায় চল্লিশ বছর তো কেটে গেছেই। আর কেটেছে কীভাবে? চারটে ছোট শিশু, তাদের বড় করতে হলে যেমন তেমন হলেও উপকরণ তো কম লাগে না? চিন্তাও আছে একগঙ্গা, তখন থেকেই কি রোজগারে বেরিয়ে পড়েছিল ও? হঠাৎ স্বামী মারা যেতে ওই বয়সেই একেবারে মূর্খ-অনভিজ্ঞ একটা মেয়ের অবস্থা কী হয়েছিল আন্দাজও করতে পারি না। তখন কি ওর শোক করারই সময় ছিল? নাকি এখনই আছে?

-­ কী করে কী করলে? আলগা প্রশ্ন নয়, আমার প্রচ- কৌতূহল হচ্ছিল জানতে কী করে এই সিচুয়েশন সামাল দিলো ওইটুকু মেয়ে।

-­ কী না করেচি বউদি, বেস্পতি বলে, শ্যালদা থিয়ে খুঁতো ফল পাকড় কম দামে কিনে আর ওই টেরেনেই সোয়ার হয়ে বসতুম, এবার চলো বালিগঞ্জ, ঢাকুরে, যাদবপুর, বাগা যতীন, গড়িয়া, সোনারপুর, নরেন্দরপুর, কালিকাপুর, চম্পাটি… গৌরদ, তাপ্পর আমাদের ঘুঁটেশ্বরী, কোনো কোনোদিন তারো পরে বেতবেড়িয়া, তালদি হয়ে ক্যানিং, বিককিরি করতে করতে যাচ্চি,  ফিরতিতে ঘুঁটেশ্বরীতে নেবে যাচ্চি, যে টুক ফলফলার বাঁচচে বাড়ি এসে বাচ্চাদের মুকে ধচ্চি।

 

ও যে ক্যানিং লাইনে কোথাও থাকতো তা তো শুনিনি, বললাম -­ এই যে বললে টালিগঞ্জের রেলের জমিতে থাকতে!

-­ রেলের জমিত্থে তো তারা পুলিশ মুলিশ লাগিয়ে তুলে দিলো। বদলি সব জমি জায়গা দিলো নানান খানা জায়গায়, আমাদের পড়ল ওই ঘুঁটিয়ারিতে।

-­ ঘুঁটিয়ারি শরিফ?

-­ হ্যাঁ গো বউদি যে ঘুঁটেশ্বরী সে-ই ঘুঁটিয়ারি। মাজারের থানে পুকুর আচে, তাইতে ফুল ফেলো, সে যদি ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে তোমার বরাবর চলে আসে তো তুমি যা চাইবে তাই পাবে।

ঘুঁটিয়ারির পর বেতবেড়িয়া, তালদি গেলেই ক্যানিং।

-­ বেশ। কতটা জমি? সব চাষ হতো, না কী?

-­ আটারো কাটা জমি, তাতে এই বড় নারকোল গাছ সাতটা, চালতা খেয়েছেন?

-­ ছোটবেলায় খেয়ে থাকতে পারি, কেন?

-­ সেই চালতে ছিল একটা, আম দুটো, সবেদা গাছ দু-তিনটে, নিম, বেল, একটা এই বড় পুকুর।

-­ বলো কী? সে তো ভালোই!

-­ আমরাও তো তেনমই ভেবেছিলুম। ঝোপঝাপ কেটেকুটে ঘর কল্লুম, গবরমেন টিন দিয়েছিল। মাটি দিয়ে ঘর গড়ে, টিনের ছাউনি। ঘর, রান্নাঘর, কলঘর। ঘরের পেচন দিয়ে পুকুর, অতগুলো গাছ, মাটি কুপিয়ে লংকা উচ্ছে বেগুন, অত বড় পুকুর তাতে মাচের মীন ফেলতে হবে, মাচের খাবার দিতে কতগুলি পয়সা, তারপর বিষ্টিবাষ্টা হলে জল উপচিয়ে তৈরি মাচ ভেসে ভিন পুকুরে চলে যাবে মা। সেসব কর্তে হলে সেখানে থেকে রাত পাহারা দিয়ে খরচ খরচা করে তবে যদি দুটো লোকের ভাত কাপড় হয়। কাজ ধরতেই হবে। কিন্তু কাজ কোতায়? কাজ খুঁজতে তো সে-ই কলকাতা, সে-ই টালিগঞ্জ, রোজ কাকভোরে উটে কল সেরে, জল দোয়া ভাত তেল পেঁয়াজ দে কোনমতে গভভরে পুরে ছোটো। তিনি টালিগঞ্জে টিউকলের কাজে, আর মা নিয়ালিপুরে মাড়োয়ারিদের বাড়ি। ধু ধু কচ্ছে, কোতাও কোনো ইস্কুল-মিস্কুল ছিল না যে মেয়েদেরে দোব, সাপখোঁপ, পোকামাকড়, সাঁপের সঙ্গে কি কোনদিন গর করেচি মা? সে কী আতান্তর! কালবলিটে ওষুদ দিতে যদি কোনোদিন ভুলেচি তো তেনারা ফোঁস করে জাঁল্লা, চোকাট সব পেরোবেন। তাপ্পর তিনি যকন অ্যাই ঘুরে পড়ল, না আচে কোনো ডাক্তার বদ্যি, না কোনো হাসপাতাল। ছিল তো সেই ভাঙড়েই, অঙ্গ পড়ে গ্যাচে সেই রুগীকে ঘাড়ে করে ঘুঁটিয়ারি নিয়াসা সে কি মুকের কতা মা? তাপ্পর তিনির মা আমার মা মিলে তাকে মালিশ মুলিশ করে কোনমতে দাঁড় করায়। বচর ঘুরল না, মানুষ আবার ঘুরে পড়ল, আর তো কোনো হাঁসপাতাল নেই সে মুলুকে। আশপাশের লোকে, মিথ্যেয়তা বলব না মা অনেক করেছিল। কিন্তু তিনি আর উটল না। যত বলচি, মনের জোর করো উটে বসো, তিনি তত এলিয়ে পড়ে, এই করে পরানটা বার হয়ে গেল।

আমার শাশুড়ি রুদ্ধশ্বাসে বললেন -­ তারপর?

-­ সে কী যজ্ঞি মা। তিনশো চারশো লোক খেল। পুকুরে জাল ফ্যালোরে, লোক ডাকিয়ে মাচ ধরো রে, সেসব কাটাকুটি, পাঁটার মাংস, রান্নাবান্না, কী বলব মা ঋণ কর্তে হলো, নারকোল গাচ কাটিয়ে সে ঋণ শুদি… তা পর…

-­ মানে?

-­ কিসের মানে বউদি?

-­ ওই যে বল্লে যজ্ঞি… মাছ মাংস…

-­ বা, কাটুরিয়াদের খাওয়াতে হবে না?

-­ কাটুরিয়া? তারা কারা?

-­ ওই যে যারা সব শ্মশানে গেল…

-­ তিন-চারশো? এত লোক শ্মশানে?

-­ বউদি, মড়া পুড়িয়ে ফিরেই তো তারা ফিরিস্তি লিকে দিলো। নিয়ে যাচ্ছে, তখনি দেকি কি পিলপিল করে লোক, যেকানে যে আচে সব আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে তো চে! তাদের যেমন করে হোক খাওয়াতেই হবে মা, না কল্লে নরকে যেতে হবে না?

মা বললেন -­ ওরেব্বাবা!

আমি বলি -­ শ্রাদ্ধতে কেউ পাঁঠার মাংস খাওয়ায় বলে জীবনে শুনিনি।

বেস্পতি বলল -­ তা বললে হবে বউদি? যে-দেশের যে-রীত!

মা বললেন -­ বাঃ, তো তারপরেই তুমি আধপচা ফল ফেরি করতে লেগে গ্যালে?

-­ আর কী করা মা, মাইয়াগুলোকে মানুষমুনুষ করে তুলতে তো হবে! তিনি বড় দুজনের বে দিয়ে গিয়েচিল, একটা রক্ষে। বাকি দুটির দায় এই বেস্পতির।

-­ যাব্বাবা!

 

৬. প্রগতির পথে

তবু রক্ষা যে দুটি মেয়ে সে-সময়ে তার ঘাড় থেকে নেমেছে। কতই বা বয়স তখন তাদের? লেখাপড়া কিছু করেছিল? এসব প্রশ্ন আমাদের মনে উঠবেই। এভাবেই আমরা ভাবতে অভ্যস্ত। প্রাণপণে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি বেস্পতিদের রিয়্যালিটি আমাদের রিয়্যালিটি থেকে আলাদা। তবু ঠিক মেনে নিতে পারি না। আমাদের সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতা আর পড়াশোনায় আমরা ভাবতে ভালোবাসি যে ভালো থাকা বলতে আমরা যা বুঝি, শৈশবে আরক্ষা তারপর পরীক্ষা পাশ করা, তারপর অন্তত কুড়ি-একুশ বয়সে এই সিঁড়িভাঙা অংক কষেই সবাই ভালো থাকে। তা সে শিগগিরই তার রিয়্যালিটিতে নিয়ে গেল।

-­ মেয়েরা তাই বলে বেস্পতির মতো মুখখু নয় বউদি, বড় দুটো তো সাত আট কেলাস অবধি পড়েছিল। ছোট দুটো কিন্তু মাধ্যমিক পাশ। সবার ছোটটা তো মাধ্যমিকের পরের কেলাসেও পড়ছিল, সেই পড়তে পড়তেই তার বে হলো।

আমি বিরক্ত হয়ে বলি -­ তা বেশ তো পড়ছিল, তাকে আবার তক্ষুনি তক্ষুনি বিয়ে দিতে গেলে কেন?

-­ আমি কি আর সাদ করে দিয়েচি বউদি, নিজেরাই সব ভাব করে এসে দাঁড়াল, তারা পচন্দ করেচে, বেস্পতি সাজিয়ে-গুজিয়ে বে দিয়ে পুরো লৌকিতা করেচে। আমি না বললে তারা শুনবে? এ আর বেস্পতিদের কাল নেই যে, মা বলল আর এগারো বয়সে কাপড়ের পুঁটলিটা হয়ে দেগুনি বচরের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। সেজটা তবু অটো চালায়, ছোটটা তো কেষ্ট ঠাকুর, তাদের নাকি গোসাবাতে মাচের কারবার আচে, কিচু সেখান থিয়ে আমদানি হচ্চে বলে তো কখনো শুনিনি। তবে কিচু না কিচু সে করে, চুরি জোচ্চুরিও হতে পারে, মেয়েরা আমার সব্বাই রোজগার করে কিন্তু।

-­ বলো কী? কী করে?

-­ বড় মেজো ইদিকে পার্ক সার্কাসে ব্যাগের কারখানায় কাজ করে। সেজ ছোটদের ইস্কুলের মিড্ডে মিল রাঁদে।

-­ আর ছোট?

-­ তাকে বাড়ির থিয়ে বার হতে হয় না মা, বাড়িতেই সব আসে। ওই তোমাদের ভুরু তোলা, চুলকাটা এই সব। মন্দ পয়সা কামায় না।

আমি একেবারে হতবাক হয়ে গেছি -­ মা শুনছেন?

শাশুড়ি মিটিমিটি হাসেন -­ তোমরা একাই সাজবে-গুজবে মনে করেছো বউমা! যে সময়ের যা ওরাও ধরে নিচ্ছে ঠিক।

-­ ধরল তো ওই ভুরু তোলাটাই ধরল মা? আরো তো কত পালটাল দিনকাল…

-­ ওই তো মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পড়ছে, কেউ আর দলিলপত্তর না পড়ে সই করবে না, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে শিখবে, এই দ্যাখো না মা করছে বাড়ি বাড়ি কাজ, মেয়েরা কাজ করছে ব্যাগের কারখানায়। প্রগ্রেস হলো না?

বেস্পতি কী বুঝল জানি না, হুট করে বলে উঠল -­ প¹েসের ভুষ্টিনাশ। বে দোবো না তো কী করবো মা বলেন, চাদ্দিকে তো নানান কেষ্ট ঠাকুর তক্কে তক্কে ঘুরে বেড়াচ্চে, ওই যে কিচু কচ্চে ও-ই না কতো! চোপর দিন বিসনায় শুয়ে রইল কি রাস্তাত্থে তুলে নিয়ে গেল, বউ রোজগার করবে সে নেশা করবে নইলে ঠেঙিয়ে বাপের বে দেকিয়ে দেবে… এ যে হয়নি এই তো ভাগ্যি মানতে হয়।

মা হাসি চেপে বললেন -­ তা হলে তোমার জামাইরা সব ভালো, ভব্যিযুক্ত, স্বামী-স্ত্রী উভয়ে রোজগার করে বুঝে-শুনে সংসার করছে, বাঃ!

-­ ভুষ্টিনাশ! বেস্পতি আবার বলল -­ কিচু মনে করবেন না মা, ব্যাটাছেলেতে মাগের গায়ে হাত তুলবে না এ আবার হয় নাকি? বেস্পতি মার খেয়েচে সে তার সোয়ামি তার চে এক গাচ বড় ছিল, অন্যায্য মনে হলে সে গুরুজন, রোজগেরে, শাসন কত্তেই পারে, তেমনি যে হাটের ভালো ডুরেটা, সময়ের মাচটা, ফলটা এনে হাতে তুলে দিত! এদের বড় মেজ তো জমিজিরেতের ছেলে, যবে ত্থে ঘুঁটেশ্বরীতে এসে বসেচে তাদের নেশার ধুম বেড়ে যায়নি? বড়টা দেশি খেয়ে টলরমলর করে বাড়ি আসবে, আর মেজটার তো জুয়োর নেশা! তা ত্থিয়ের লাভ,  তাত্থিয়েই লোকসান। হাত আবার তোলে না। তা এখন চেলেরা বড় হয়েচে, জব্দ! বড় ছেলের হাতে এমন মার খেয়েচে যে ঠ্যাঙ ভেঙে দেড়টি মাস। নাতি অটো ধরে নিয়েচে, বলে দিশি খেয়ে বাড়িতে এসে হামলা কললে এবার অন্য পাটাও মটকে ভেঙে রেকে দোব।

যতই এগোচ্ছি বেস্পতির মুখের ভাষাও যেমন আগলবাগল ভেঙে বেরিয়ে যাচ্ছে তার ফ্যামিলির সিক্রেটগুলিও তেমন!

বললাম -­ এই যে বললে বড় জামাই ঘুঁটেশ্বরীতে এসে বসেচে, বাকিগুলি থাকে কোথাও?

-­ চারটে মেয়ে জামাই-ই ঘুঁটেশ্বরীতে, তবে আর বল্লুম কী! ছোটটা আমার সঙ্গেই থাকে। সেজটা পাশে।

-­ একরকম ভালো, মা বললেন, তুমি সারা বচ্ছর এমনি কাজ নিয়ে নিয়ে বাইরে, তোমার বুড়ো মা-ও তো তোমার কাছেই বললে!

তাতে বেস্পতি ঝাঁঝিয়ে উঠল -­ আমার মায়ের কতা আর বলেন না, তিনি কারুর হাতে খাবে না, নিজের যা মন করল তাই খাবে, টিনের একটা ঘর তুলে দিয়েচি, সেইখানে জাঁল্লায় মুক ঠেকিয়ে চোপর দিন গালাগাল করবে,

-­ কেন? কাকে গালাগাল?

-­ কে জানচে মা! যত বলি মা ও দিকে বাচ্ছাদের ইস্কুল, বাচ্ছারা আসচে যাচ্চে, তাদের দিদিমণিরা আসচে যাচ্চে, একবার যদি শুনতে পায়, শেষে তুমি মার খেয়ে মরবে! তা কার কতা কে শুনচে! দুটো নাতি-নাতনি তো বাড়িতেও রয়েচে, ঝুমার ছেলেমেয়ে, তারা যদি আহ্লাদ করে কাচে গেচে তো বুড়ি তুই তো খুশি হবি, রাম বলো মা, সে অমনি তাদের দূর দূর করবে। তিনিকে কেউ দেখাশোনা কর্তে পার্বে না। এক বিশু। যেই বাড়ি যাবো, অমনি হাত পাতবে, বিশু আমার মাসকাবারি টাকাটুকু? শিঙাড়া, তেলেভাজা আনিয়ে দে, কদ্দিন খাই না।

-­ বুড়ো বয়সে অমন একটু হয়, মা বললেন।

-­ আপনিও যেমন মা, ও বুড়ি রোজ শিঙাড়া খাচ্চে, শালপাতার ঘুগনি, ছোলার চাট, জাঁল্লা দিয়ে ডাকবে আর খাবে। আসলে ভয়, বিশু যদি ওর মাসের টাকাটা না দেয়! আর বিশুর আরো কিছু ট্যাকা খসিয়ে দিই।

কথা শুনে মা হেসে ফেললেন।

-­ না মা, হাসবেন না, যা বলচি নিয্যস সত্যি কতা বলচি। আসল কতা কী জানেন, বুড়ি তার চল্লিশ হাজার টাকা আমার খাতায় রেকেচিল, দিন রাত্তির তার জন্যে আপসাচ্চে। মনে নেই অটোর ধাক্কায় রাস্তায় পড়ে পাঁজর ভাঙল, হাঁটু ঘুরে গেল, হাসপাতাল গিয়ে চিত্তির, তাতে দশ হাজার ট্যাকা গলে গেল। আরো একবার কাকে দেবে বলে জোর করে পাঁচ হাজার বার করে নিল। তা’লে হাতে কত থাকে আপনিই বলো না! হতে পারি মুখখু মানুষ, ঠিক হিসেব কচ্চি কিনা আপনারাই বলো! তা সেসব তার মনে থাকলে তো? মন মন ভাবচে ওইয যাঃ বিশু মেরে দিল।

হঠাৎ মা জিগগেস করলেন -­ সেই যে তোমার বোন বাংলাদেশে চলে গেল! সেই কাকারা… তারা তোমাদের কখনো কিছু দেয় টেয় না!

বেস্পতির মুখ এক মুহূর্তে উজ্জ্বল। -­ বোনের তো সেকানে বদ্যিঘরে বে হয়েচে মা, পড়ালেকা শিকেচে মন্দ নয়, দিব্যি সুখে আচে। দুটো ছেলেসন্তান। সে ওখেনকার এই বড় ইলিশ নিয়ে এসেচিল একবার, আর বাকরকানি বলে কী একরকম। সে-ইলিশ আপনি একানে পাবেন না। তার সোয়াদ এখনো মুকে লেগে আচে। তখন মিস্ত্রি আর বেঁচে নেই। মা আমার মেয়েদের পেলচে, আর আমি টেরেনে টেরেনে ঘুরতে লেগেচি। তাও তাকে মোয়া মিষ্টি খাসির মাংস কিচু খাওয়াতে বাকি রাকিনি মা। পুকুরের মাচ যা পেরেচি ধরেচি। তা কী বলে জানেন? বলে -­ মা তো তোর জন্যে অনেক খরচ করেচে, সবটা না হলেও কিচু অন্তত আমাকেও দিক, আমিও তো তার মেয়ে!

-­ বলো কী? এই কথা বললে?

-­ তবেই বলুন। সে কি কিচু দেবার মনিষ্যি! আর কাকারা? ওই একবারই তাদের দেকেচি। মাও চেইতে যায়নি, আমিও না। কী জানেন? যার ভাগ্য তার তার।… তবে… যা ইলিশ এনেচিল না, সারা জীবনটা চলে গেল অমন আর খেলুম না।

 

৭. উপসংহার

তা আজ আমাদের বাড়িতেও ইলিশ এসেছে। অনেক খুঁজে বারোশো টাকা কিলো দরে দেড় কিলো। মায়ের মুখের স্বাদ ফিরেছে, খেতে চেয়েছেন, এ দুমাস তো স্রেফ শিঙি মাছের ঝোল খেয়ে কাটিয়ে দিলেন। তবে ওই আমরাই। আমরা তিনজনে মাত্র ইলিশের খদ্দের। ছেলেমেয়ে সে-মাছ ছোঁবে না। তারা গ্লোবাল যুগের গ্লোবাল খাদ্য ছাড়া মুখে তোলে না। পিৎজা কিংবা বার্গার। আমরা স্বামী-স্ত্রী আর মা, ও বেস্পতিও আছে, আমরা চারজনে কষে ইলিশ খাবো। ভাজা, কালো জিরে ফোড়ন দিয়ে পাতলা ঝোল, পাতুড়িটা মার কথা ভেবে আর করিনি। সরষে-টরষে এখনই খাওয়া ঠিক না। রোববার। ছেলেমেয়ের জন্যে পিৎজা অর্ডার গেল। আর কী করবো?

মহিলাটি এলো দুপুর তখন সাড়ে তিনটে। দুমাস কাজ করছে বেস্পতি, আগের মাসে সেবাকেন্দ্রের এই মহিলাটি টাকা নিয়ে গেল, বেস্পতি তখন তার সেই মাসান্তিক ছুটিটাতে বাড়ি গিয়েছিল। এলে শুনলাম মোটে সাড়ে চার হাজার দিয়েছে। মানে তিন হাজার টাকা ক্লিন গাপ। সেন্টারের কাজ শুধু এদের পার্টির বাড়িতে পাঠানো। আসার খরচটা সুদ্ধ নাকি ওদের নিজেদের পকেট থেকেই দিতে হয়। তার মানে দালালি তো দাঁড়াচ্ছে সিক্সটি পার্সেন্ট! বারে বা! খাটবে ওরা আর স্রেফ বসে বসে সিক্সটি পার্সেন্ট নিট লাভ খাবে এই মহিলা? ভালো ব্যবসা ফেদেছে তো! এক্সপ্লয়টেশনের তো দেখছি মা-বাপ নেই! গরিব মানুষ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই!

-­ কেমন কাজ করেচে বেস্পতিদি? মহিলা জিগগেস করল।

আমি খুব খুশিমুখে বলি -­ আপনি না জিগগেস করলেও আমরা বলতাম -­ বেস্পতি যা করেছে এমন আপনার লোকের মতো কাজ আমরা আর কাউকে করতে দেখিনি। ম্যাসাজ বলুন, ব্যায়াম বলুন, চান, হাঁটানো, কত কী টুকটাক রান্না করে খাইয়ে মায়ের মুখের টেস্ট ফিরিয়ে দিলো। আপনি আগেও লোক পাঠিয়েছিলেন তো, তুলনা করেই বলছি তার চেয়ে এ শতগুণে ভালো। একটা কথা বলি যদি কিছু মনে না করেন!

-­ বলেন বলেন!

-­ ওই লক্ষ্মীকে যদি ছয় দিয়ে থাকেন, তো একেও তাই-ই দেবেন অন্তত।

-­ কে আপনাকে বলল -­ লক্ষ্মীকে ছয় দিয়েছি?

-­ এতদিন বাড়িতে কাজ করল এটুকু জানা আর এমন কী শক্ত! কেন জানতে বারণ আছে নাকি?

আমার এ-জিজ্ঞাসার আড়ালে কিছু সংগত কারণ ছিল। লক্ষ্মী নামে মহিলা কথায় কথায় জানতে চায় সেন্টারের মালকিনকে আমরা কত দিই। শুনে সে আকাশ থেকে পড়ল -­ আপনার থেকে সাড়ে সাত নিচ্ছে আর আমাকে দিচ্ছে ছয়?

তারপরে বেস্পতির সাড়ে চারের কথা জানতে পারলাম। তার মানে একই কাজের জন্য একেক জনকে একেক রকম পে করে মহিলা। এ তো ভালো কথা নয়!

-­ কেন? তোমাকে এত কম দেয় কেন?

-­ কে জানে, আমি জোয়ান নই, তাই বোধয়।

কী অন্যায় কথা! কাজ এক, খাটুনি এক। অথচ বয়সের তারতম্যে পেমেন্টের এমন তফাত!

বলি -­ আমার বলার কথা বললাম, এবার আপনার বিবেক।

দিনসাতেক পরে অচেনা নম্বর থেকে ফোন। -­ বউদি!!

সরুমতো চাঁছা গলায় কাতর চিৎকার। -­ আমি বেস্পতি!

-­ আরে? কী খবর?

শুনলাম এখনো পর্যন্ত বেস্পতি এক পয়সাও পায়নি। রোজ একবার করে সোনারপুরে যাচ্ছে আর ব্যর্থমনোরথ হয়ে ঘুঁটিয়ারি ফেরত যাচ্ছে, ব্যাংকের আধুলি ভেঙে মাকে দিতে হয়েছে, রেলভাড়া বাবদ নগদ ষাট-সত্তর টাকা তো নাহক খরচ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে জেরা, মহাঝগড়া কেন সে পার্টিকে তার পাওনা টাকার কথা বলতে গেছে! এত বড় আস্পদ্দা! সেন্টার তাকে আর কাজ দেবে না। যা পারে করুক গিয়ে!

শেষ পর্যন্ত কি তা হলে আমিই বেস্পতির শনি হলাম!