ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন ও সংগীত

লেখক:

সুধীর চক্রবর্তী

ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন সম্পর্কে খুব বড়মাপের কাজ বাংলা ভাষায় এখনো হয়নি। তার প্রধান কারণ, ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের যাঁরা ঋত্বিক, যাঁদের গান এই আন্দোলনকে শাখায়িত করেছে, তাঁরা ভিন প্রদেশীয় বলে তাঁদের অনেকের ভাষা আমরা জানি না।
ভারতীয় ভক্তি আন্দোলন সূচিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে, দক্ষিণ ভারতে এবং যে-সম্প্রদায় এই আন্দোলনের সূচনা করেছিল, তাদের বলা হয় ‘আরওয়ার’। ‘আর’ মানে হচ্ছে নিমগ্ন, আর ‘ওয়ার’ মানে ব্যক্তি। নিমগ্ন ব্যক্তিরাই এই সাধনার ধারা তৈরি করেছিলেন। ভক্তি আন্দোলনের মূল কথা হচ্ছে দ্বৈতবাদ। ভক্ত-ভগবানের সম্পর্কটাই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। আগে ছিল অদ্বৈতবাদ। ইতিহাসের পথে চলতে চলতে দ্বৈতবাদ উদ্বর্তিত হয়েছে। দ্বৈতবাদের প্রধান কথাই হচ্ছে – কোনো পরম শরণ্য ব্যক্তির প্রতি, ঈশ্বরের প্রতি নিজেকে সমর্পণ করা। ভক্তি, ভক্ত, ভগবান : ভগবানই হচ্ছেন উপাস্য, উপাসক হচ্ছেন ভক্ত। তার পথ হলো ভক্তির পথ। এই ভক্তি শব্দটি ‘ভজ’ ধাতুনিষ্পন্ন, যার অর্থ বন্দনা বা অর্চনা। আমাদের বৈষ্ণবীয় শাস্ত্রে ভক্তির যে-কটি পথ চিহ্নিত হয়েছে, তাতে বলা হচ্ছে :
শ্রবণং কীর্ত্তনং বিষ্ণো
স্মরণং পাদসেবনম্।
অর্চ্চনং বন্দনং দাস্যং
সখ্যং আত্মনিবেদনম্ \

রবীন্দ্রনাথের গানে বলতে গেলে বলা যায়, ‘প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী দাঁড়াব তোমার সম্মুখে’, কিংবা বলা যায়, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।’ ‘ম্যায়নে চাকর রাখো জি’ বলে তাঁর পায়ের কাছে যেমন প্রণত হওয়া যায়, তেমনি সখাভাবেও তাঁকে পাওয়া যেতে পারে। ঈশ্বরের যেমন নানা মূর্তি, ভক্তেরও নানা মূর্তি। কিন্তু প্রাপ্তিটাই আসল কথা। শরণাগতিটাই আসল কথা। তাঁকে পাওয়ার মতো করে পেতে গেলে নিজেকে অনেকটাই ওপর দিকে তুলতে হয়, উত্তরণ করতে হয় – এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ঈশ্বরকে আমরা কখনো আমাদের সমস্তরে ভাবতে পারি না, তিনি আমাদের চেয়ে অনেক উঁচুতে আছেন। আমরা নিচু থেকে তাঁর দিকে প্রেরণ করছি আমাদের সমস্ত আবেগ, আমাদের সমস্ত অর্চনা, সমস্ত বন্দনা। আমাদের সমস্ত দাস্যভাব, সমস্ত নিবেদন। তিনি তো এমন ব্যক্তি নন যে আমাদের এই আবেদনে সাড়া দেবেন না। তিনিও একটু নেমে আসছেন, আমিও একটু ওপরের দিকে যাচ্ছি। ওঁর একটু অবতরণ ঘটল, আমার একটু উত্তরণ ঘটল – এরই কোনো মধ্যবিন্দুতে হয়তো তাঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হতে পারে।
এই অবস্থানটা আমাদের ফকিরদের মধ্যেও দেখা যায়। ফকিররাও বলেন, আমরা আস্তে আস্তে নিজেদের উন্নয়ন করে তাঁর সঙ্গে একীভূত হতে চাই। যখন আল্লাহ্র সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবেন ফকির, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় ‘ফানা’। ‘ফানাবিল্লাহ’ মানে যখন তাঁর সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছি। একীভূত হয়ে যাওয়ার পর সেই অবস্থাটাকে স্থায়ী করাকে বলা হয় ‘বাকাবিল্লাহ’। শুধু একীভূত হলে তো হবে না, সেই একীভূত অবস্থাকে চিরস্থায়ী করতে হবে। যিনি তা পারেন, তিনিই মগ্ন সাধক। ফকিরদের মধ্যে তাঁকেই আমরা বড় সাধক বলি, যিনি ‘ফানাবিল্লাহ’ থেকে শুরু করে ‘বাকাবিল্লাহ’ অবধি পৌঁছতে পারেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, ফানা অবস্থা থেকে বাকা অবস্থায় পৌঁছানো। আত্মবিলোপের সাধনা, অহংকারকে বিসর্জন দেওয়ার সাধনাই হচ্ছে প্রপত্তি বা শরণাগতি। অহং, ক্ষোভ, বস্ত্তগত চিন্তা – সবকিছু বিলীন করে দিয়ে একীভূত হওয়ার যে চিন্তা, তার জন্যে সত্তার অনেকটা উন্নয়ন প্রয়োজন।
লক্ষ করে দেখা যায় যে, এই জাগতিক জীবনে আমরা সেইসব মানুষের কথা যখন বলি – তুলসীদাস, মীরাবাঈ, তুকারাম, কবীর, নানক, লালন, রবীন্দ্রনাথ – যা-ই বলি না কেন, তাঁদের পদবির কথা বলি না। তাঁদের কোনো বস্ত্তগত যোগ্যতার কথাও বলি না। মানুষ যখন সবকিছুর ওপরে চলে যেতে পারে, তখন তার শুধু নামটাই থাকে। নামটাই আমাদের উদ্বোধিত করে। সেই ভক্তিভাজন মানুষগুলোর দিকে আমরা যদি তাকাই, দেখতে পাব যে, তাঁরা নিজেদের নামটাকেই কেবল জাগিয়ে রেখেছেন, আর তাঁদের কর্ম ও আদর্শ আমাদের দিয়ে গেছেন। তাঁরা কোন জাত, কী বৃত্তান্ত – সেটা অবান্তর। সেজন্য দেখা যায়, কবীর যখন মারা গেলেন, একদল বলল, ‘আমরা তাঁকে গোরস্তানে নিয়ে যাব, কবর দেব,’ আরেকদল বলল, ‘আমরা তাঁকে দাহ করব;’ কিন্তু কার্যকালে গিয়ে দেখা গেল যে তাঁর কোনো দেহই নেই, ফুল পড়ে আছে। এটা একটা প্রতীকী গল্প। ফুল পড়ে আছে মানে তাঁর সুরভিত সত্তাটাই শুধু রয়েছে, যা আমরা কখনো সমাধিস্থ করতে পারি না, ভস্মীভূত করতেও পারি না।
লালন ফকির আমাদের অনেকটা কাছের লোক। কবীর তো ছশো বছর আগেকার মানুষ, লালন মারা গিয়েছেন ১৮৯০ সালে। তাঁর নিজের কোনো আত্মপরিচয় তিনি দিয়ে যাননি। যখন কেউ জিজ্ঞেস করত, আপনার কোন জাত – তিনি বলতে পারতেন না। তাই নিজেই একটা গান লিখেছিলেন :
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে?
লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে।
আমার নিজের চোখে জাতের কোনো রূপ দেখতে পাই না। সেজন্য আমার কোনো জাত নেই, আমি মনুষ্য জাত। ‘মানুষতত্ত্ব যাঁর সত্য হয় মনে, সে কি অন্য তত্ত্ব মানে?’ জলধর সেন, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, কাঙাল হরিনাথের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল; জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্কেচ এঁকেছিলেন। এরকম একটা লোকের জাতিগত পরিচয় কেউ লিখতে পারেননি। তিনি নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে থাকতেন, বহু লোক তাঁর কাছে যাতায়াত করত। কিন্তু লোকটি কোন জাতের, কোনোদিন কেউ নির্ণয় করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর পর যে-বিবরণ পাওয়া যায় কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকায়, তাতে লেখা ছিল যে, তিনি মরবার সময় শিষ্যদের বলে গিয়েছিলেন – ‘আমার কথা তোমরা কাউকে বলবে না।’ মৃত্যুর পর তাঁকে যখন কবর দেওয়ার প্রশ্ন উঠল, তখন শিষ্যরা বলল, এ ব্যাপারে তাঁর নিষেধ আছে। হিন্দুরা বলল, আমরা তাঁকে দাহ করব। তখন শিষ্যরা বলল, সেটাতেও তাঁর নিষেধ আছে। কুষ্টিয়াতে গেলে দেখা যায়, তাঁর যে সমাধি রয়েছে, তার তলার দিকে তিনি শুয়ে আছেন। জীবনসায়াহ্নে তিনি তাঁর সাধনস্থলরূপে বেছে নিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার একদম প্রান্তে ছেউড়িয়া গ্রাম। তাঁতিদের মধ্যে কুটির বানিয়ে সেখানেই তিনি বসবাস করতেন, সাধনভজন করতেন। তিনি সবহারাদের মাঝে বাস করতেন। এলিটিস্টদের মধ্যে আসেননি।
এখান থেকে ভক্তি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যটা আমরা পাই। ভক্তি আন্দোলন যাঁরা করেছিলেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষ। তাদের নৈতিকভাবে উন্নত করা, সব রকমের সংস্কার থেকে মুক্ত করা, কবচ-তাবিজের হাত থেকে মুক্ত করা, তাদের মধ্যে মানবিকতার উজ্জীবন করা – এই ছিল ভক্তি আন্দোলনের দিশারীদের মূল কথা। এই কথা বলতে গিয়ে নিজেদের প্রাদেশিক ভাষাতেই নিজেদের বুলি বা বয়ান তাঁরা লিখেছেন। কবীর এক জায়গায় লিখেছেন – ‘সংস্কৃত কূপজল, ভাষা বহতা নীর’। অর্থাৎ সংস্কৃত হচ্ছে কূপজলের মতো বদ্ধ, সকলের কাজে লাগছে না। তার জন্য বিদ্বান হতে হয়, পঠন-পাঠন করতে হয়। আর যার যার প্রাদেশিক ভাষা হচ্ছে বহতা জলের মতো, সকলের পক্ষে ব্যবহার্য। সে-জন্য কবীর তাঁর রচনাগুলো লিখেছিলেন এক ধরনের ঠেট পাঞ্জাবিতে। দক্ষিণ ভারতীয় আরওয়ার কবিয়ালরা লিখেছিলেন তামিল-তেলেগু-মালয়ালম ভাষায়; তুকারাম-নামদেব-জ্ঞানেশ্বর লিখেছেন মারাঠি ভাষায়। মীরাবাঈ লিখেছিলেন ঠেট রাজস্থানি ভাষায়। শ্রীচৈতন্য যখন তাঁর সাধনার মূল কথাটা বললেন, আমরা শুনলাম – ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।’ সেটাও বিশুদ্ধ বাংলা ভাষাতেই বলা। শাস্ত্রের একেবারে সরলীকরণ করে বলে দিলেন যে ‘নামটাকে ধরো’। আসামের শঙ্করদেব যে কীর্তন-আঙ্গিক তৈরি করলেন, তার নাম নামঘোষা কীর্তন। সংস্কৃত ভাষার জন্য যে পান্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি লাগে, তাতে ব্যক্তিগত জ্ঞানের একটা অর্জনের দিক থাকে, সেটাকে বাদ দিয়ে ভাষার সরলীকরণ, শাস্ত্রের সরলীকরণ, মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব প্রয়াস, তার জন্যই এসব গান রচিত হয়েছিল; আমাদের জন্য নয়। আমরা সেগুলো পড়ি, তার থেকে জীবনের অনেক উপাদান পাই। সমাজবিজ্ঞানের অনেক সূত্র পাই। কিন্তু আমাদের জন্য সেগুলো উদ্দিষ্ট নয়, এটা মনে রাখলে ভালো হয়।
উদ্দিষ্ট যে নয় তার একটা প্রমাণ হলো এই যে, একদা সর্বাজিৎ নামে একজন পন্ডিত একটা ষাঁড়ের পিঠে অজস্র শাস্ত্র নিয়ে কবীরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। প্রতীক হিসেবে বলা হচ্ছে, ষাঁড়টা হচ্ছে ধর্মের প্রতীক, আর শাস্ত্র হচ্ছে অন্যের লিখিত একটা ব্যাপার। যেটা আমি অন্যের কাছ থেকে পেয়েছি, সেটা হচ্ছে শাস্ত্র। যখন তিনি বললেন – ‘কবীরের সঙ্গে দেখা করতে চাই’, তখন কবীরের ছেলে কামাল তাঁকে বললেন, ‘কবীর একটা উঁচু শিখরের কাছে থাকেন, সেখানে একটা পিঁপড়ে যেতে গেলেও তার পদস্খলন হয়। তুমি এত সব নিয়ে সেখানে যাবে কী করে?’ তার মানে কবীর রয়েছেন সাধনার সবচেয়ে উন্নত স্তরে। কবীর নিজের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, আমি এই হাতে কখনো কাগজ তুলোট ধরিনি, আর এই হাতে কলম ছুঁইনি। তার মানে, তাঁর সমস্ত বোধভাষ্য, তাঁর জীবনের সমস্ত অনুভূতি তিনি মুখে মুখে বলে গেছেন। শ্রুতিবাহিত হয়ে সেটা চলেছে। অনেকদিন পরে সেটা লিপিবদ্ধ হয়েছে। তখন সর্বাজিৎ বললেন – ‘আমি ত্যাগ করলাম আমার সব ধর্মশাস্ত্র, পান্ডিত্য। এইবার কি আমি ওপরের দিকে যেতে পারব?’ তখন তাঁকে কামাল বললেন, ‘তুমি চেষ্টা করো।’ তখন সর্বাজিৎ কবীরের শিষ্য হলেন।
এই গল্পটাও প্রতীকী। জ্ঞানকর্মের একটা মূল্য আছে, কিন্তু জ্ঞানকর্মের একটা সমস্যা হচ্ছে এই যে, জ্ঞানের কোনো সংজ্ঞা নেই। আমরা যদি নিজেদের জ্ঞানী বলে প্রচার করতে চাই, তাহলে দেখব, আমাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়ে গেছে। একজন বলছেন, ‘আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছি’ তো আর একজন বলছেন, ‘আমি বি.ই. কলেজে পড়েছি,’ আরেকজন বললেন, ‘আমি মৌলানা আজাদে পড়েছি।’ একজন যাদবপুরের ছাত্র, আরেকজন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কেউ বলবেন, ‘আমি অক্সফোর্ড থেকে লেখাপড়া করেছি।’ কোথাকার স্ট্যাম্প হলে জ্ঞানটা সঠিক হয়, সেটা ঠিক বোঝা যায় না। আসল যে জ্ঞান সেটা পরিজ্ঞান, সেটা নিজে অর্জন করতে হয় এবং সেই জ্ঞানটা যার অর্জিত হয়েছে, সে কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা দেখায় না।
জ্ঞানের মতো কর্মেরও তেমনি বিভাজন আছে। একজন হয়তো মনে করেন, ‘আমি রাষ্ট্র চালাচ্ছি, আমি সবচেয়ে বড় কর্মী।’ আরেকজন যদি মনে করেন, ‘আমি চাষির হাতের কাস্তেটা তৈরি করছি’, তিনিও খুব বড় কর্মী। আবার যে-মানুষটি আদিবাসীদের মধ্যে গিয়ে তাদের একটু লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, তাদের অক্ষর পরিচয় করাচ্ছেন, সভ্য পৃথিবীর কথা শোনাচ্ছেন, তিনিও মস্ত কর্মী। মস্ত জ্ঞানী।
বিভূতিভূষণের আরণ্যক বইটার শেষে কথক সত্যচরণ ভানুমতীকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘ভানুমতী, তুমি বড় কোনো শহরের নাম শুনেছ?’ ভানুমতী বলছে, ‘হ্যাঁ, শুনেছি। গয়া, পাটনা, মুঙ্গের।’ ‘কলকাতার নাম শুনেছ?’ ‘হ্যাঁ, শুনেছি।’ ‘তুমি কোন জেলায় থাকো, জানো?’ ‘গয়া জিলায়।’ ‘ভারতবর্ষের নাম শুনেছ?’ ‘না।’
বিভূতিভূষণ এই একটা দ্যোতক মন্তব্যের মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছেন, যাদের আমরা প্রান্তিক মানুষ বলছি, সেই মার্জিনাল ম্যান, যারা ‘আমরা’ নয় ‘ওরা’, ‘আমি’ নয় ‘সে’, এই যে বিভাজন এটা আমরা জ্ঞানের মধ্য দিয়ে করছি। এই যে ক্যাটিগরিক্যাল ভাগ, এটা আমাদের কাছে পতনের নিশানা দিচ্ছে।
ভক্তি একমাত্র লেভেলার। ভক্তি একটা জায়গা, ভজন একটা বিষয়, কীর্তন একটা বিষয় – সেটাতে অংশগ্রহণ করতে হলে আমাদের অহংকে ত্যাগ করে যেতে হবে। সেটা ত্যাগ করে আমরা শিখতে চাই, তাহলে শিখতে পারব, নিজেকে বিলীন করে দিতে পারব।
এইখানে এসে একটু ফকিরিতন্ত্রের কথা এনে ফেলতে চাই। ওখানে যারা শাস্ত্রকে মানে, তাদের বলা হয় ‘শরিয়তি’। তারা নামাজ পড়ে, কলেমা বিশ্বাস করে, জাকাত দেয়, রোজা রাখে, হজে যায়; তাদের প্রতিটি বিষয়ের পেছনে একটা আকিদা বা বিশ্বাস রয়েছে। শরিয়তের পথ যাঁরা ত্যাগ করেছেন, তারাই হচ্ছেন মারফতি ফকির। সেই ফকিররা বলেন, ‘এই যে নামাজ করছো, রোজা রাখছো, হজ-নামাজ করছো – এসব বাহ্য, আসল নয়। আসল হচ্ছে ভেতরে আল্লাহ্কে উপলব্ধি করা। এই কতগুলো নৈষ্ঠিক আচার-আচরণে তুমি তাঁকে পাবে না।’ সেই জন্যে তাঁরা নিজেদের বলেন ‘মারফতি’। তাঁদের মতে, ‘মারফত’ মানে হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞান। এই জ্ঞান শাস্ত্র থেকে পাওয়া যায় না। এই জ্ঞান মানুষের আত্মোপলব্ধির জ্ঞান। মারফতের পথে যে একবার যাবে, সে আর শরিয়তের পথে যাবে না। শরিয়ত হচ্ছে গাছ, আর মারফত হচ্ছে তার ফল। ফল আহরণই যদি আমার কাজ হয়, আমি গাছ বেয়ে উঠে যাব, কিন্তু ফলের দিকেই আমার লক্ষ থাকবে। সে-জন্যে তাঁরা বলছেন, মারফতি জ্ঞান যে অর্জন করেছে সে আর শরিয়তের দিকে ফেরে না। ফকিরিতন্ত্রে আমরা এই কথা পাই যে, প্রথমে স্বরবর্ণ শেখো। স্বরবর্ণ মানে হচ্ছে আত্মতত্ত্ব। তুমি কে? মানে, আমি নিজে কী? আমার সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির সম্পর্ক কী? আমার সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কী? এগুলো যখন পরিষ্কার হয়ে যাবে, তখন স্বরবর্ণটা পড়া যাবে। ব্যঞ্জনবর্ণ মানে হচ্ছে পরতত্ত্ব। আমার সঙ্গে এই বাহ্য পৃথিবীর কী সম্পর্ক? আমার সঙ্গে অসংখ্য জনমানবের এই প্রাকৃতিকতার কী সম্পর্ক? এরপরই উনি বলছেন যুক্তাক্ষর। ‘যুক্তাক্ষর’ মানে হচ্ছে গুরু। এই আত্মতত্ত্ব আর পরতত্ত্বর পর গুরুকে পাওয়া যায়। তিনে মিলে যা হলো তা হচ্ছে, জীবনের লক্ষ্য।
আমি একটা মেলায় মধ্যরাতে একজন ফকিরকে বোকার মতোই একটা কথা জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম। দুজন ফকির তর্ক করছিলেন। তাঁরা কেউ আমাদের মতো লেখাপড়া জানেন না, আমাদের ভাষায় যাকে বলে নিরক্ষর। কিন্তু নিজস্ব ধর্মচেতনায় তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তাঁদের কথা আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলাম – ‘যদি মারফতি হতে হয়, তাহলে কি শরিয়ত ত্যাগ করব?’ তার উত্তরে ফকির আমাকে বললেন, ‘বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ পড়েছেন?’ ‘হ্যাঁ, পড়েছি।’ ‘দ্বিতীয় ভাগ পড়েছেন?’ ‘হ্যাঁ, পড়েছি।’ ‘দ্বিতীয় ভাগ পড়ার পর আপনি কি প্রথম ভাগটা ভুলে গেছেন?’
এই কথাটা বলে সেই নিরক্ষর মানুষটি আমায় যে চপেটাঘাত করলেন, তার থেকে আমি বুঝলাম, আমার জ্ঞানের কী সীমাবদ্ধতা! স্বরবর্ণকে বাদ দিয়ে যেমন ব্যঞ্জনবর্ণ হয় না, শরিয়তকে বাদ দিয়ে তেমন মারফতি হয় না।
লালন বলেছেন, ‘ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই/ হিন্দু বা যবন বলে তার কোনো বিচার নাই।’ আমরা এখানেও লক্ষ করছি যে, ভক্তি আমাদের সবাইকে সমান করে দিচ্ছে। ইসলাম ধর্মে সবাই যে কাতার দিয়ে নামাজ পড়ছেন, তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে এই যে, ওখানে কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত কোনো সমাজ নেই। একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির পাশে হয়তো একজন কসাই একই সঙ্গে নামাজ পড়ছে। ভক্তি সবাইকে সমান করতে পারে। জ্ঞানকর্মের দিক থেকে আমরা কোনোদিন এক হতে পারব না। প্রতিটি স্তরে আমাদের তর্ক থাকবে। প্রতিটি বিষয়ে আমরা একটা থিসিসের পর অ্যান্টিথিসিস দেবো। ভক্তি এমন জায়গা, যেখানে অ্যান্টিথিসিস-টিসিস কিছুই দেওয়া যাবে না। সেখানে আত্মবিলোপের সাধনা করতে হবে। বৈষ্ণবীয়ভাবে আমরা লক্ষ করি যে, ‘রাধা’ ভাবে তো ভজনা করা যাবেই না, ‘সখী’ ভাবেও ভজনা করলে চলবে না। সখীরও সখী ‘মঞ্জরি’ হয়ে ভজনা করতে হবে। ভক্তিবাদের এটাই মূল লক্ষ্য।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার