ভালোলাগা, ভালোবাসা এবং কষ্টের শ্রদ্ধাঞ্জলি

লেখক:

কাজী নাসির

স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নাম প্রথম শুনেছি ১৯৭৭ সালের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগের আঙিনায় এসে। বরিশালের বিএম কলেজে পদার্থবিদ্যায় অনার্স পড়ার সময় হঠাৎ করে বাবার বন্ধুর মুখে শুনলাম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনন্য একটি বিষয় স্থাপত্য নিয়ে পড়ানো হয় এবং আমার পদার্থবিদ্যা না পড়ে স্থাপত্য বিষয়ে পড়াশোনা করাই শ্রেয়। বাবার বন্ধুর কথা অনুযায়ী ঢাকা এলাম, স্থাপত্য বিভাগের আঙিনায় এসে এখানকার পরিবেশ দেখে উজ্জীবিত হলাম, ভালোলাগায় মুগ্ধ হলাম। স্থাপত্যের শিক্ষক হাবিবুর রহমান স্যারের সঙ্গে দেখা করে ভর্তির জন্য উপদেশ নেওয়া শুরু হলো।
সেই প্রথম দিন স্যারের কাছে শুনলাম বাংলাদেশের খ্যাতিমান স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নাম এবং তাঁর সৃষ্টির কথা। আমি মাজহারুল ইসলাম স্যারকে চিনি না। মাজহারুল ইসলাম কেন, কোনো স্থপতিকেই আমি চিনি না, স্থাপত্য কী তা জানি না, শুধু চিনি বুয়েটের শিক্ষক হাবিবুর রহমান স্যারকে, যিনি বরিশালে মেজদা (আমাদের বন্ধুর বড়ভাই এবং বন্ধু তাকে মেজদা ডাকে) নামে পরিচিত। স্যারের কাছে কোচিং শুরু হলো। স্থপতির দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি আলো, বাতাস, জল আর সবুজের কথা বললেন, পরিবেশের কথা বললেন এবং পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে ইসলাম স্যারের কাজ নিয়ে অনেক কথা বললেন, বিশেষত চারুকলা ইনস্টিটিউটের কথা। আমাকে বললেন নিজ চোখে স্যারের কাজ দেখে আসতে। তার কথা অনুযায়ী অচেনা ঢাকা শহরে বরিশালের অখ্যাত গলির একটি ছেলে চারুকলা ইনস্টিটিউটকে খুঁজে বের করল।
চারুকলার চত্বরে ঢুকে আমি দ্বিতীয়বার মুগ্ধ হলাম। কোনো ভবনে দেয়ালবিহীন প্রকৃতিপ্রেমিক সিঁড়ি আমি জীবনে প্রথম দেখলাম। একজন স্থপতি এমন একটি ভবন তৈরি করেন, তৈরি করতে পারেন Ñ এরকম একটি পরিবেশ। এ-ভবন কি সত্যিই কোনো স্কুল, নাকি গুরু-শিষ্যের মিলনস্থল? চারুকলা প্রাঙ্গণের শুকনা পুকুরের ঢালে বসে অনুভব করলাম শূন্যতা কীভাবে শিল্পীদের শিল্পসৃষ্টির অনুভবকে উদ্দীপ্ত করতে পারে।  আমার বাবার বন্ধু স্থাপত্য নিয়ে যে আগ্রহের বীজটি আমার মনে বপন করেছিলেন, মনের গহিনের সেই ছোট্ট আকাক্সক্ষাটা বিস্তৃত হলো, নিশ্চিত হলাম যে আমাকে স্থাপত্য নিয়ে পড়তে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বাবার আরেক বরিশালবাসী বন্ধু সংস্কৃত ভাষা নিয়ে রিসার্চ করেন। বাবার আদেশ অনুযায়ী কোচিং চলাকালীন তাঁর সঙ্গে একদিন দেখা করতে গেলাম। লাইব্রেরির ঢালু সিঁড়ি (তখনো র‌্যাম্প শব্দটির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি) দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হলো, এরকম ঢালু সিঁড়িতে তো আমি স্কুলের শেষ প্রান্তে পড়ার সময় সাইকেল চালিয়েছি। বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নির্মাণাধীন ভবনের ঢালু সিঁড়ি দিয়ে বাবার সাইকেলটি ঠেলে ঠেলে ওপরে উঠতাম আর সাইকেলে বসে  প্যাডেলে পা রেখে ওই ঢালু পথে মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচে নামতাম। আস্তরবিহীন ইট, বিকেলের মিষ্টি রোদের লালচে আভা ইটের ওপর যে ভালোলাগার আবরণ তৈরি করত তা দেখে ভাবতাম, দেয়ালে লোকজন কেন আস্তর করে? ইটকে কেন ইটের মতো তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে থাকতে দেয় না? ওই দিনগুলিতে নির্মাণাধীন পলিটেকনিকের ক্যাম্পাস ছিল আমাদের কয়েক সাইকেলচালক বন্ধুর বিচরণের ক্ষেত্র। এ-ভবনের নকশা কে করেছেন তখন আমি তার কিছুই জানি না; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢালু পথে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হলো, সাইকেল চালানো ওই কিশোরবেলায় যে স্রষ্টার সৃষ্টি দেখে আমরা মুগ্ধ ছিলাম তিনিই স্থপতি মাজহারুল ইসলাম।
আমার বাবার বন্ধুর কাছে এরপর অনেকদিন গিয়েছি, বিশেষত প্রথম বর্ষ স্থাপত্যের ছাত্র থাকাকালীন ‘আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার’ নিয়ে পড়াশোনার জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে বেশকিছু বই ছিল। প্রতিবার নতুন করে অনুভব করেছি লাইব্রেরির ঢালু পথ, অনুভব করেছি লাইব্রেরি ভবনের নিচতলার পরিবেশ, অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টির সাহচর্যে স্থাপত্যের ছাত্র হিসেবে অনুপ্রাণিত হয়েছি বারংবার।
তারপর সময় কেটেছে এক দুই তিন করে অনেকদিন। স্থাপত্যের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক মোবাশ্বের আলী স্যার আমাদের ক্লাসের সবাইকে চট্টগ্রাম নিয়ে গেছেন, দেখিয়েছেন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের অনন্য স্থাপত্যকর্ম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, পাহাড়ের ঢালে সবুজের মাঝে ইটের বোনা ভালোলাগার বন্ধন। দেখতে গিয়েছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইটের দেয়ালে  রোদ-বৃষ্টির আলো-ছায়া আর বৃষ্টিসিক্ত ইটের অপরূপ রূপ। ইসলাম স্যারের দর্শন এবং সৃষ্টি নিয়ে স্থাপত্যের আরেক শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক অধ্যাপক সামসুল ওয়ারেসের অনুভূতি শুনেছি ছাত্র থাকাকালীন। স্যারকে নিয়ে আলোচনাকালে তাঁর কণ্ঠ শ্রদ্ধায় যেভাবে আপ্লুত হতো তাতে অনুভব করেছি গুরু-শিষ্যের আন্তরিকতা, এসেছে ইসলাম স্যারের প্রতি তাঁর ভালোলাগার শ্রদ্ধাঞ্জলি।
স্থাপত্য বিভাগে পড়ার সময় অনেক স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। যেসব স্থাপত্য উপদেষ্টা ফার্মের নকশাকৃত ভবনের মডেল করার জন্য নিয়মিত যেতাম তাদের অন্যতম ‘স্থাপত্যশিল্প লিমিটেড’। ‘স্থাপত্যশিল্পে’ প্রয়াত স্থপতি আলমগীর কবির এবং স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ডিজাইন করেন, আমি আর আমার সহপাঠী স্থপতি মুশতাক কাদরী এবং মাঝে মাঝে আরেক সহপাঠী স্থপতি ড. সাইদ মিলে মডেল তৈরি করি। আমাদের কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা মাজহারুল ইসলাম স্যারকে নিয়ে গল্প করেন, তাঁর কাজের কথা বলেন, তাঁকে বোঝার জন্য বাংলাদেশের স্থাপত্য অনুভবের জন্য প্রকল্পগুলি নিজ চোখে দেখার নির্দেশনা দেন। তাঁদের গল্পে, নির্দেশে, প্রেরণায় স্থাপত্যের ছাত্র হিসেবে মনের গহিনে ক্রমান্বয়ে স্যারের জন্য ভালোলাগা সঞ্চিত হয়, শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়।

দুই
স্থাপত্যের ছাত্র থাকাকালীন বাংলাদেশের স্থাপত্য পেশার আঙিনায় নতুন একটা জাগরণের সৃষ্টি হলো। ইসলাম স্যারের নেতৃত্বে কয়েকজন স্থপতি, আমাদের কয়েকজন সহপাঠী এবং সিনিয়রদের নিয়ে গঠিত হলো ‘চেতনা’। বাংলাদেশের স্থাপত্য, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে নতুন প্রজন্মকে ঋদ্ধ করার দায়িত্ব নিলেন তিনি। এখানে আমার একটু কষ্ট আছে, স্যারকে সামনাসামনি দেখার জন্য, তাঁর কথা শোনার জন্য ক্লাস করার অনুমতি চেয়েও আমি ওই সময়ে পাইনি, যদিও আমাদের ক্লাসের অনেক সহপাঠী তখন চেতনার সৈনিক।
পড়াশোনা শেষ হলো, স্থাপত্য পেশাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদে জড়িত হলাম বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের নানাবিধ কার্যক্রমে। যে-ইনস্টিটিউটে নির্বাচনের কোনো প্রচলন ছিল না, সে-ইনস্টিটিউটে জোরেশোরে নির্বাচন হলো, সভাপতি হিসেবে জয়ী হলেন স্থপতি মাহবুবুল হক। নতুন সভাপতির নেতৃত্বে সেবারই প্রথমবারের মতো ধানমণ্ডিতে নিজস্ব অফিস ভাড়া নিয়ে নতুন করে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু হলো এবং ওই অফিস উদ্বোধনের সময় বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম স্যারকে আমন্ত্রণ জানানো হলো এবং তিনি এলেন।
সামনে থেকে ওইদিন তাঁর বক্তব্য শুনলাম, বাচনভঙ্গিতে মুগ্ধ হলাম, ভালোলাগায় আপ্লুত হলাম। পরবর্তীকালে ইনস্টিটিউটের কার্যনির্বাহী পরিষদে সরাসরি জড়িয়েছি, তাঁর জন্মদিনে নাগরিক সংবর্ধনায় ইনস্টিটিউটের পক্ষে সম্পৃক্ত থেকেছি, ইনস্টিটিউটের কাজে অনেকবার পরীবাগের বাসায় গিয়েছি, ‘স্থপতি আইনে’র খসড়া নিয়ে সিনিয়র স্থপতিদের সহযোগী হয়ে কাজ করেছি সরাসরি স্যারের সঙ্গে। ‘স্থপতি আইন’ নিয়ে কাজ করার সময়, আইনের খসড়া প্রণয়নকালীন স্যারকে নতুন করে উপলব্ধি করেছি। দেশ নিয়ে তাঁর বক্তব্য, স্থাপত্য পেশা নিয়ে তাঁর ভাবনা, স্থপতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা Ñ সবকিছু নিয়ে তাঁর নিজস্ব বাচনভঙ্গিতে  তাঁর নিজস্ব ধারণার কথা শুনেছি। বয়স যখন তাঁকে শারীরিকভাবে কাবু করেছে কিন্তু মানসিকভাবে তখনো দৃঢ়চেতা তখন দেখেছি অসুস্থ শরীর নিয়ে আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে হরতালের মাঝেও অনেক মন্ত্রীর বাসায় তিনি হেঁটে গিয়েছেন, বাংলাদেশে স্থাপত্য পেশাচর্চার ক্ষেত্রে ‘স্থপতি আইনে’র প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি নীতিনির্ধারকদের বুঝিয়েছেন। যুক্তিতর্কের মাধ্যমে অনেক প্রতিকূলতা, বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে আইন প্রণয়নের বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি সফলভাবে হলেও কোনো এক অজানা কারণে জাতীয় সংসদে এ-আইন উত্থাপিত হলো না। দেশের স্থপতিরা বঞ্চিত হলেন ন্যায্য একটা অধিকার থেকে, দেশ বঞ্চিত হলো যোগ্য পেশাজীবীর প্রযোজ্য সেবা থেকে। ওইদিন দেশের নীতিনির্ধারকদের ভুল সিদ্ধান্তগ্রহণে স্যারকে ক্ষুব্ধ হতে দেখেছি, কষ্ট পেতে দেখেছি।

তিন
স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় অনেকের বক্তব্য শুনেছি। তাঁর প্রয়াণে এবং নাগরিক শোকসভার দিন তাঁদের অনেককে দেখিনি। যদিও পেশাগত জীবনে বৈরী অনেকে তাঁর প্রয়াণ এবং শোকসভায় এসে তাঁদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন, পেশাগত জীবনের বৈরিতা ভুলে গিয়ে স্যারের বিশালত্বকে নিজস্ব অনুভূতিতে ধারণ করেছেন। এ-দৃশ্য দেখে ভালোলাগা এবং কষ্ট, দুয়ের মিশ্রণে কষ্টকে বেশি অনুভব করেছি। কষ্ট অনুভব করেছি জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনের বিশাল হলের অনেক আসন শূন্য দেখে, যদিও ওইদিন আমার মনে হয়েছিল, জাদুঘরের আসনে লোকের অনুপস্থিতির যে-শূন্যতা তা আমার মনের গহিনে ইসলাম স্যারের অনুপস্থিতির অনুভূতি।
কষ্ট পেয়েছি, যখন শুনেছি ইসলাম স্যারের অগণিত অনুসারী আর ভক্তের আকাক্সক্ষা থাকা সত্ত্বেও তাঁর অমর সৃষ্টি চারুকলা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন চত্বরে তাঁর চিরনিদ্রার জন্য স্থান পাওয়া গেল না, দেশবরেণ্য স্থপতির জন্য দেশবাসী তাঁর অমর সৃষ্টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ও চারুকলার অন্তর্বর্তী স্থানে তাঁকে শায়িত দেখতে পেলেন না।
কষ্টে সিক্ত হই যখন দেখি যে-ভবনটি দেখে তাঁর মুগ্ধতায় আমার স্থাপত্য পড়ার অনুপ্রেরণা, সেই চারুকলার কাঠের জানালা সাদা এনামেল পেইন্ট দিয়ে আবৃত করা হয়, স্যারের ভাবনার বিশালত্বের প্রতিফলন ভবনের দোতলায় উন্মুক্ত পরিসর অ্যালুমিনিয়াম আর কাচ দিয়ে ঘিরে দৈনন্দিন ব্যবহারে পরিবর্তন করা হয়। কষ্ট হয় দেশব্যাপী স্যারের সৃষ্ট কালজয়ী স্থাপত্যশিল্প নষ্ট হতে দেখে, আমাদের স্বকীয় স্থাপত্যের প্রমাণগুলিকে অবহেলায় ধ্বংস হতে দেখে। যখন দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি ভবনের ছাদকে সেলফোনের টাওয়ার বসানোর জন্য ভাড়া দেওয়া হয়, স্যারের শিল্পকে অপমানিত করা হয় নির্লজ্জভাবে, ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করে এ-নির্মাণকাজ বন্ধ করা হলেও অর্ধসমাপ্ত কক্ষটি অপসারিত হয় না বহু বছর ধরে, তখন স্থপতি হিসেবে নিজেকে অত্যন্ত অসহায় মনে করি, অসহায়ত্বকে প্রকাশ করতে না পেরে কষ্টে কষ্টে নিজে দগ্ধ হই। অশ্র“জলে সিক্ত হই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুমতির জন্য বিধাতার কাছে প্রার্থনা করি।
আমরা আসলে নিজেদের সম্মান দিতে জানি না। স্থপতি লুই আই কানের কালজয়ী স্থাপত্য জাতীয় সংসদ ভবন নিয়ে আমরা অহংকারী হই, প্রতিবাদে সোচ্চার হই তার অবমাননা হলে; কিন্তু অবহেলায় ফেলে রাখি পঞ্চাশের দশকে আমাদের অহংকার ইসলাম স্যারের অনবদ্য সৃষ্টি চারুকলা ইনস্টিটিউটকে। ওই সময়কালের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্থপতিদের আধুনিক স্থাপত্য সৃষ্টি নিয়ে বিশ্লেষণ হলে চারুকলা ইনস্টিটিউটও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বসেরা আধুনিক স্থাপত্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

চার
এখানে বোধহয় ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির জন্য বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের একটি দায়িত্ব আছে আর তা হলো, স্যারের সৃষ্টিগুলিকে বিশ্বদরবারে স্থপতিদের মাঝে তুলে ধরা।
বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট ঝঅঅজঈঅ SAARCA (South Asian Association for Regional Cooperation of Architects), ARCASIA (Architects Regional Council of Asia), CAA (Commonwealth Association of Architects) Ges UIA (International Union of Architects)-এর অন্যতম সদস্য। প্রতিনিয়ত এ-সংগঠনগুলোর সভা ও সেমিনারে ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। ইনস্টিটিউট থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে এ সংগঠনগুলির সেমিনারে স্যারের স্থাপত্যকর্ম প্রদর্শনের, তাঁর স্থাপত্য নিয়ে আলোচনা এবং সমকালীন স্থপতিদের প্রতিক্রিয়া অনুধাবনের জন্য। আমি আশা করব বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট কর্তৃক এ-ধরনের একটি উদ্যোগ অবশ্যই গৃহীত হবে এবং ইনস্টিটিউট ইসলাম স্যারের নিজস্ব দর্শনকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য, চিত্রশিল্প, ভাস্কর্য ও সংগীত শিল্পের চর্চা ও বিকাশে নিজেদের দেশীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টি অনুসরণ এবং অনুধাবনে সচেষ্ট স্থপতি মাজহারুল ইসলামের জন্ম ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৩। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে বিজ্ঞানে স্নাতক, একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে পুরকৌশল বিদ্যায় স্নাতক এবং পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন ও পরবর্তীকালে ১৯৫৭ সালে লন্ডনের আর্কিটেকচারাল অ্যাসোসিয়েশন স্কুল অব আর্কিটেকচার থেকে স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পেশাগত জীবনের শুরুতে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কনস্ট্রাকশন, বিল্ডিং অ্যান্ড ইরিগেশন বিভাগে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে ১৯৫২ সালে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ শেষে ১৯৫৩তে দেশে ফিরে জুনিয়র সহ-স্থপতি হিসেবে পুনরায় সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং স্থপতি হিসেবে তিনি সৃষ্টি করেন তাঁর অমর দুটি স্থাপত্য – চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউট এবং পাবলিক লাইব্রেরি ভবন (যা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত)। সরকারি চাকরিতে তাঁর মনোনিবেশ যথাযথ হচ্ছে না, বাধা পাচ্ছে তাঁর সৃজনশীলতা – এমন ভাবনা থেকে তিনি ১৯৬৭ সালে সরকারি স্থপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। যদিও ১৯৫৮ সালে চাকরি ছাড়ার আবেদন জানালেও তৎকালীন সরকার কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
সরকারি চাকরি থেকে তাঁর পদত্যাগের পর শুরু হলো এদেশের স্থাপত্য পেশাচর্চার জগতে নতুন অধ্যায়, তিনি প্রখ্যাত প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন বাস্তুকলাবিদ। ওই সময় তদানীন্তন সমগ্র পাকিস্তানে এ-প্রতিষ্ঠান উন্নত স্থাপত্য-শিল্পকর্মচর্চার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এদেশের স্থাপত্য পেশাকে তাঁর ব্যক্তিত্ব, রুচি, দেশপ্রেম, সততা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও নান্দনিকতার বিন্যাসের মাধ্যমে জনগণের কাছে নিয়ে আসেন।

 

Art Institute Dhaka

 

পাঁচ
তার ফলে বেশকিছু কালজয়ী স্থাপত্যের সৃষ্টি হয় এবং আমরা দেখতে পাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ভবনসহ জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্প এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো। স্থাপত্যের আচার্য, এদেশের কালজয়ী স্থাপত্যের স্রষ্টা, সংগ্রামে, ব্যক্তিত্বে, অনমনীয়তায় এদেশের মাটিতে আলো, বাতাস আর সবুজের সঙ্গে ৮৯ বৎসর পথ চলে তিনি থমকে দাঁড়ান ২০১২ সালের ১৫ জুলাই।
দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ, শ্রদ্ধা, ভালোলাগা আর ভালোবাসা নিয়েই তো আমাদের জীবন, আমাদের পথচলা। আমরা পথ চলছি, আমরা পথ চলছি, আমরা পথ চলছি… চলার পথের কষ্টগুলি অপসারিত করে ভালোলাগা আর ভালোবাসায় সিক্ত হই। আমাদের পথ হোক কষ্টবিহীন, মঙ্গলময়, আনন্দময়। বৃষ্টিতে ভিজে সূর্যালোকে শুকিয়ে মন থেকে সকল কালিমা মুছে যাক, ইসলাম স্যারের দেশ গড়ার স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পেশাজীবীরা সংঘবদ্ধ হই, নতুন করে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে।
বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, আপনি অন্তিম শয়ানে শায়িত হলেও আপনার দর্শনের মাধ্যমে, কর্মের মাধ্যমে, সৃষ্টির মাধ্যমে স্থাপত্য আচার্য হিসেবে আপনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে, সাথি হবেন আমাদের পথচলায় – যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে হবে আমাদের পদচারণা, যখন দেশীয় স্থাপত্যের শিকড় খুঁজব আমরা নিবিড় অহংকারে, আপনার সৃষ্ট বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটকে গর্বিত অহংকার নিয়ে তুলে ধরব বিশ্বস্থাপত্যের আঙিনায়।
আপনার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের স্থাপত্য অঙ্গনে যে- শূন্যতার সৃষ্টি, সে-শূন্যতা পূরণ করা না গেলেও পূরণের জন্য আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা থাকুক, নতুন প্রজন্ম আপনার দর্শনকে বুকে নিয়ে এগিয়ে আসুক নতুন উদ্যমে বাংলাদেশকে নতুনভাবে সাজানোর প্রত্যয়ে।
স্থাপত্য আচার্য মাজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের উনিশতম কার্যনির্বাহী পরিষদ আর সব সদস্যের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply