ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশ

লেখক:

নীলিমা আফরিনNm-1

২০১৩ সালের ৫৫তম ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ একটি বিরাট স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইতিহাস। সে-ইতিহাসের সূচনাপর্বটি রচিত হয় ২০১১ সালের অক্টোবরে Culture Association Utopia-র পরিচালক শিল্পী ফ্রান্সিসকো করদোবার রোমের গ্যালারিতে শিল্পী মোখলেসুর রহমানের একক ছাপচিত্র প্রদর্শনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

এই প্রদর্শনী  ৮ অক্টোবর ২০১১ থেকে ২১ অক্টোবর ২০১১ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেন ইতালির খ্যাতিমান শিল্পসমালোচক প্রফেসর ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি। উল্লেখ্য, ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি ইতিপূর্বে একাধিকবার ভেনিস বিয়েনালে বিভিন্ন দেশের কিউরেটর ও কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রোমে মোখলেসের প্রদর্শনীতে অরিজিনাল ছাপাই ছবি দেখে অ্যালিসি খুব অভিভূত হন এবং তাঁর বক্তৃতায় বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কৌতূহলের কথা জানান। সেদিনই করডোবা ও অ্যালিসি বাংলাদেশে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। মোখলেস, আমি ও উত্তম কর্মকার তাঁদের ইচ্ছাকে স্বাগত জানাই।

এরপর আমি ও মোখলেস ৫৪তম ভেনিস বিয়েনাল দেখতে ভেনিসে চলে যাই। জার্দিনি ও আর্সেনালে ঊননববইটি দেশের জাতীয় প্যাভিলিয়ন, বিসে কুরিগার আর্টিস্টিক ডিরেক্টর দ্বারা নির্বাচিত বিশ্বের তিরাশিজন শিল্পীর শিল্পকর্ম, সাঁইত্রিশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কোলেটারাল প্রজেক্ট, মূল বিয়েনালের বাইরের প্রচুর প্যাভিলিয়নসহ বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের কাজ দেখে অবচেতন মনেই একটা স্বপ্ন বুনতে থাকি। উদ্বোধনের সময়েই উত্তম খুব ভালো করে প্যাভিলিয়নগুলো ঘুরে দেখে গেছে।

রোমে ফিরে মোখলেস, আমি ও উত্তম আমাদের মনের সুপ্ত ইচ্ছাগুলো নিয়ে আলাপ করি। উত্তমের আগ্রহ দেখে মোখলেসও অনুপ্রাণিত হয়। উত্তমের পরামর্শে ঢাকা ফিরে মোখলেস তার ছয় সহপাঠী বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলে ছক্কা শিল্পী পরিষদ। যুক্ত হয় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে যৌথ প্রদর্শনী আয়োজনে। জাদুঘরের (১৯১৩-২০১২) শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী  উপলক্ষে দু-বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে ছক্কা শিল্পী পরিষদের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত হয় ‘পরিবেশের প্রতিবেশ’ (Enviromental Obsessions) শীর্ষক প্রদর্শনী। এ-প্রদর্শনীও কিউরেট করেন ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি। ছক্কা শিল্পী পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হন কোস্টারিকার শিল্পী ফ্রান্সিসকো করদোবা এবং জার্মান শিল্পী হর্স্ট উহলেমান। তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে এক আন্তরিক মেলবন্ধন, এগিয়ে চলে তাঁদের পথচলা। জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে এ-প্রদর্শনী চলে ২৯ এপ্রিল থেকে ৯ মে ২০১২ পর্যন্ত। ছক্কার এ-প্রদর্শনী উপলক্ষে কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে একটি সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কিউরেটর অধ্যাপক ড. ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি। আলোচক ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের (প্রাক্তন) ডিন অধ্যাপক আ.হ.ম. মতলুব আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

এরই  মধ্যে অ্যালিসি ঢাকার বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে শিল্পীদের কাজ দেখেন, এতে বাংলাদেশের শিল্পকলা সম্পর্কে তাঁর উচ্চ ধারণা হয়। ফিরে যাওয়ার সময়ে অ্যালিসি ৫৫তম ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশকে নিয়ে কিউরেটিং করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা ছক্কা শিল্পী পরিষদের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে জানালে, অর্থের ব্যাপারটি তিনি দেখবেন বলে জানান। প্রায় ছ-সাত মাসের মধ্যেই অ্যালিসি ইতালি থেকে স্পন্সর জোগাড় করা হয়েছে বলে জানান এবং ছক্কা শিল্পী পরিষদের কথা উলে�খ করে ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাসে তাঁকে কিউরেটর ও কমিশনার নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। এ ব্যাপারে পুরো প্রক্রিয়াটিকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন ইতালিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব ও শিল্পসমালোচক মিজারুল কায়েস। পরবর্তীকালে ইতালির বর্তমান রাষ্ট্রদূত মো. শাহাদাত হোসেন ও কাউন্সিলর ফেরদৌসী শাহরিয়ারের আন্তরিক সহায়তা অবশ্য স্মরণযোগ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে দ্বিতীয়বার যখন ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি ঢাকায় আসেন তখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ অ্যালিসিকে তাঁর দপ্তরে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিস্তারিত অবহিত হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সার্বিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশি�­ষ্ট সকলকে নির্দেশ দেন। তাঁর এই দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণ ও আন্তরিকার জন্য অনেক কাজ সহজ হয়েছে।

ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি ৫৫তম ভেনিস বিয়েনাল ২০১৩-র জন্য ছক্কা শিল্পী পরিষদের ছয়জন শিল্পীকে মনোনীত করেন। ছক্কা শিল্পী পরিষদের পক্ষ থেকে আরো কয়েকজন শিল্পীকে সুযোগ দিতে অনুরোধ জানালে অ্যালিসি এ-প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেন। ছক্কার শিল্পীদের সঙ্গে আরো কয়েকজন শিল্পীর তালিকা চেয়ে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানালে মন্ত্রণালয় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালককে কো-অর্ডিনেটর করে একটি জাতীয় কমিটির মাধ্যমে অন্য শিল্পীদের তালিকা দিয়ে তাঁকে সহায়তা করেন। জাতীয় কমিটির দেওয়া শিল্পীদের কাজের ইমেজ ও সিভি দেখে কমিশনার অ্যালিসি ছক্কার শিল্পীদেরসহ আরো দুজন শিল্পী – ঢালী আল মামুন ও ইয়াসমিন জাহানকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট আটজন শিল্পীকে ৫৫তম ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল প্যাভিলিয়নে অংশগ্রহণের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত করেন। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নসহ সামগ্রিক বিয়েনাল প্রত্যক্ষ করে বিস্তারিত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য শিল্পরূপ-সম্পাদক হিসেবে আমি আমন্ত্রিত হই। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের সমন্বয়কারী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকীকেও অতিথি হিসেবে ভেনিসে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া যশোর চারুপীঠের পাঁচজন শিশুশিল্পীর সমন্বিত একটি শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এটি ভেনিস বিয়েনালের ইতিহাসে নতুন সংযোজন। ইতিপূর্বে কোনো শিশুশিল্পীর শিল্পকর্ম ভেনিস বিয়েনালে প্রদর্শিত হয়নি।

এবারের ৫৫তম  দ্বিবার্ষিক ভেনিস আন্তর্জাতিক শিল্পকলা প্রদর্শনীর মূল থিম ছিল The Encyclopedic Palace। ৭৮টি দেশের জাতীয় প্যাভিলিয়ন, ৪৭টি কোলেটারাল ইভেন্ট, জাপানের একটি স্পেশাল প্রজেক্ট (Madama Butterfly), ৫৫তম ভেনিস বিয়েনালের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর ও কিউরেটর ম্যাসিমিনিয়ানো জিওনি দ্বারা নির্বাচিত ১৫৮ জন শিল্পীর শিল্পকর্মে যেন অন্তহীন ভাবনার মহাসমাবেশ, শিল্পকলার এক বর্ণাঢ্য আয়োজন। আর্সেনাল ও জার্দিনি ছাড়াও ভেনিস জুড়েই ছিল অসংখ্য প্যাভিলিয়ন। ভেনিসের অলিগলি, খাল ও অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের কিনারে কিনারে শিল্পকলার এক মায়াবী হাতছানি।

এবার Golden Lions for Lifetime Achievement-এ ভূষিত হয়েছেন অস্ট্রিয়ার মারিয়া লাসনিং (জ. ১৯১৯) ও ইতালির মারিসা মার্জ (জ. ১৯৩১)। Golden Lion পুরস্কার পেয়েছেন অ্যাঙ্গোলার টিনো সেহগাল, Silver Lion পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের ক্যামিল হেনরো, Special Mention award পেয়েছেন অ্যায়ারল্যান্ডের রিচার্ড মোস (Irish Pavilion)। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের শিল্পীদের শিল্পকর্মের থিম ছিল Supernatural।

রেনেসাঁসের সময়কাল থেকেই ইতালিতে সুপারন্যাচারাল অর্থাৎ নন্দনতাত্ত্বিক এ-বিষয়টি নিয়ে চিন্তার সূত্রপাত। পরবর্তীকালে উনিশ শতকের শেষের দিকে দার্শনিক ভিলার ফন অরমান কিন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, নৃতাত্ত্বিকভাবেই মানুষ তার লক্ষ্য দ্বারা চালিত, ফলে সে তার বাস্তবতাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। বিজ্ঞান মৌলিক; কিন্তু এটা আসলে দৃশ্যগত ইন্দ্রিয়ানুভূতির একটা শৈল্পিক ফর্ম যা আমরা কে, আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং আমরা কোথায় যাচ্ছি – এ-প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রথম শিক্ষামূলক পাঠদান করে। প্রকৃতির বিভিন্ন যে-উপাদান আছে তারা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত : উপাদানগুলো পরিবর্তনশীল ও পরিবর্তনহীন দুটোই হতে পারে। মানুষের যে-নৃতত্ত্ব আছে সেটা এর অংশ এবং সব সময়ে নিয়মমাফিক আশেপাশের পরিবেশের সঙ্গে এর একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। প্রকৃতির মধ্যে যে-সৃষ্টিশীল উপাদান আছে সেটাকে মানুষ নিজের মধ্যে ধারণ করে এবং শৈল্পিক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তা প্রবাহিত করে।

ফিলিপপো ব্রুনেলেশির মতে,  আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করি, তার যে কম্পোজিশন আছে, তার যে হিসাব আছে, যে বোঝাপড়া আছে, বা পুনর্নির্মাণ আছে, সেটা আসতে পারে কেবলমাত্র সংবেদনশীল পরিপ্রেক্ষিত পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার মাধ্যমে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি Dust Style-এর মাধ্যমে এটাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, বাস্তবতার অনেক কিছুই নগ্ন চোখে ধরা পড়ে না যখন এগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত থাকে। যখন তা একসঙ্গে হয় তখন তার একটা রূপ দাঁড়ায়। তাঁর মতে, ‘…When all is lost, all that remains is nature…’। গ্যালিলিও যখন তাঁর গবেষণার সময়ে চাঁদ এবং আলো পর্যবেক্ষণ করতেন তখন তিনি রেখার চাইতে ছায়াকে, আলোছায়ার পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিতেন। শুধু টেকনিকগুলো আমাদের শৈল্পিক চেতনাকে জাগায় না, আমাদের বোধশক্তি পরিমাপকে বাড়ায় এবং এই টেকনিকগুলো বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করে আমাদের বাস্তবতার গভীরতা।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল প্যাভিলিয়নের যে-কনসেপ্ট ‘Supernatural’, তা উপরিউক্ত বিষয়গুলো ভেবেই ফ্রান্সেসকো অ্যালিসি ঠিক করেন। বিয়েনালের মূল যে কনসেপ্ট ‘The Encyclopedic Palace’, তাঁর সঙ্গে এ-ধারণা সাধারণভাবেই চলে আসে। মহাজগতের কোনো কিছুরই সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না, শুধু পরিবর্তন হয়, আর এটাই হচ্ছে শিল্পের মৌলিক যোগ এবং মৌলিক অধিকার।

২৪ মে রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে টার্কিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে আমরা আটজন ভেনিসের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই। উত্তম কর্মকার রোম থেকে ভেনিসে পৌঁছায়। ইস্তাম্বুল হয়ে ২৫ মে দুপুরে আমরা ভেনিসে পৌঁছাই। ওয়াটারবাসে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা জাত্রেতে পৌঁছে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করলাম। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো আমাদের শিল্পকর্ম ও উপকরণগুলো আরো দুদিন পরে, ২৭ তারিখে, ভেনিসে এলো। ২৯ তারিখের মধ্যেই আমরা যার যার কাজ ডিসপ্লে করলাম এবং ৩০ তারিখ সকালে বিয়েনালের কর্মকর্তা ও জুরি কমিটি এসে প্যাভিলিয়নের সবার কাজ দেখে গেলেন এবং কাজের মান ও ডিসপ্লে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করলেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, যুগ্ম সচিব, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও রোমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমাদের প্যাভিলিয়নে এসে পৌঁছোন। বিকেলে চমৎকার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হলভর্তি লোকজনের মাঝে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের শুভ উদ্বোধন হলো। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইতালিস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শাহাদত হোসেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রণজিৎকুমার বিশ্বাস, যুগ্ম সচিব মিস পরাগ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী এবং ভেনিসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা।

ভাস্কর মাহবুব জামাল দুর্গতিনাশিনী দুর্গা, জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রেমের প্রতীক রাধাকৃষ্ণ এবং জগতের সকল মানুষের মঙ্গলপ্রার্থী বুদ্ধকে আহবান করেছেন পুনরায় ফিরে আসতে। শামিমের কাজের শিরোনাম –  Bangladesh : a jungle of humanity. আমাদের যে-বিশাল মানবগোষ্ঠীর বিপুল পরিমাণ হাত, তা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত না হয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ ১৯৭১-এ আমরা সবাই এক হয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছিলাম। ‘দুর্গা’কে শামিম কোটি কোটি হাতের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তাঁর উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন। বাংলার লৌকিক ভাবনাকে তিনি টুকরো টুকরো ড্রইংয়ের মাধ্যমে একটি বিশাল কাগজে সেঁটে পেছনের দেয়ালে সংযোজন করেছেন। সামনে মেঝেতে গ্রামের কৃষক মানবের কর্মমুখর নানা কর্মযজ্ঞ নিজস্ব আঙ্গিকে ভাস্কর্যে রূপায়িত করেছেন। কাগজের মন্ড দিয়ে তৈরি একটি পেশিবহুল কৃষকের ভাস্কর্য এবং অনেক ছোট আকারের মাটির ভাস্কর্যের কম্পোজিশন রয়েছে এখানে। আরো সামনের দিকে দালানের আদলে শহুরে মানুষের ভাস্কর্যটি যেন সমস্ত ভূমিকে দখল করে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের প্রতিটি দালানই যেন মানুষরূপী। এ-ভাস্কর্যটি শামিমের নিজস্ব আঙ্গিকে সাদা মার্বেল ও সাদা সিমেন্টে তৈরি। মেঝেতে সলিড থ্রি ডাইমেনশনের ভাস্কর্যের কম্পোজিশনের সঙ্গে পেছনের দেয়ালে ফ্ল্যাট সারফেসে অসংখ্য ড্রইংয়ের মাধ্যমে বাংলার লৌকিক ভাবনাগুলো যেন ঐতিহ্যের মিশেলে সমকালীন বাংলাদেশের শৈল্পিক উপস্থাপন। ভাস্কর মাহবুব জামালের কাজে বাংলাদেশের সমকালীন ভাবনা অত্যন্ত সুন্দর ও বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

প্রকৃতির প্রতি মানুষের বিরূপ আচরণে প্রকৃতি যখন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তখন তা রূপ নেয় ধ্বংসযজ্ঞে। মানুষের কষ্টবোধের যন্ত্রণা যেমন তার চোখে-মুখে ফুটে ওঠে, সে বিস্মিত হয়, আবেগাপ্লুত হয়, অশ্রুসজল হয়, তেমনি প্রকৃতির মধ্যেও বয়ে যায় ঝড়-তুফান, বন্যা-খরা, সাইক্লোন, টর্নেডো – এগুলো সবই প্রকৃতির কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। শিল্পী জাহিদ মুস্তাফার ভিডিও আর্ট উপস্থাপনার শিরোনাম : Emotion of Earth। সব ধরনের দূষণসীমা ও প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞের অবসান ঘটিয়ে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তৈরি তাঁর দুই মিনিটের এই ভিডিও-আর্ট উপস্থাপনা। এখানে তিনি নারী ও পুরুষের মুখাবয়বের নানা অভিব্যক্তি ও শব্দের মাধ্যমে তাঁর ভাবনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন।

মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে ঐতিহ্যের, ভূখন্ডের সঙ্গে ভূখন্ডের গভীর এক বিচ্ছিন্নতার মহাকাল যেন ঘনিয়ে আসছে। এই ঘনায়মান অন্ধকার রোধ করে আলোর পথে পৌঁছানোর এক বার্তা, সকল ভাঙন রোধ করে প্রবহমান জীবনের খোঁজে প্রতিনিয়ত হেঁটে চলার এক আশাবাদ শিল্পী অশোক কর্মকারের স্থাপনাশিল্প  The codes of Ruptured Communication। অশোক কাঠের গুঁড়ার সঙ্গে আইকা ও বাইন্ডার মিশিয়ে ঘুঁটের আকৃতিতে মানুষের ইশারা ভাষার নানা ফর্মকে রিলিফ করে দেয়ালে সেঁটে উপস্থাপন করেছেন। সাউন্ড, ভিডিও ও আলোক প্রক্ষেপণের মাধ্যমে অশোক তাঁর স্থাপনা-শিল্পকর্মটি উপস্থাপন করেছেন।

লালা রুখ সেলিমের স্থাপনাশিল্পের শিরোনাম  Life on the Delta। তাঁর স্থাপনাশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে নারী, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর চির প্রবহমান শিল্পোপলব্ধি। একজন নারী যে কেবল জটিল জীবনযাপন করে তাই নয়, সে একজন দেবীর প্রতীকও বটে, যে দৈনন্দিন জীবনের সবকিছু সুসমন্বয় করে থাকে। মা হিসেবে, গৃহিণী  হিসেবে, রাঁধুনি হিসেবে পরিবারের সবার ভরণপোষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি সে সমাজ এবং সংস্কৃতির একজন ধারক ও বাহকও বটে। লালা রুখ তাঁর কাজে একটি কাঠের ভাস্কর্যে অর্ধাঙ্গী নারীর অবয়ব তুলে ধরেছেন। পা থেকে কাঁধ পর্যন্ত নগ্ন দন্ডায়মান নারী অবিচল দাঁড়িয়ে। কাঁধের ওপর থেকে সিনথেটিক ফাইবারের লম্বা চুলগুলো পা পর্যন্ত নেমে এসেছে। চুল ছুঁয়ে লাল কাপড় ছড়িয়ে আছে আরো পেছন পর্যন্ত। মেঝেতে কাঠের বেদির ওপর দন্ডায়মান নারী অবয়বের চারপাশ মুঠি-মুঠি ধানের খড় দ্বারা পরিবেষ্টিত। একেবারে সামনাসামনি নারীর সংসারে প্রত্যহ ব্যবহারের উপকরণ লোহার বঁটিটিও অবিচল। আশেপাশে ছড়ানো লাল টকটকে পাকা লঙ্কা। সামগ্রিকভাবে এটি একটি স্থাপনাশিল্প। তবে এটিকে ভাস্কর্য ও স্থাপনাশিল্প বলা যেতে পারে।

১৯৭১ সালে যে গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল তারই প্রতীকী উপস্থাপনা ঢালী আল মামুনের স্থাপনাশিল্প Elimination – অপনয়ন বা অপসারণ। শিল্পী সমস্ত অশুভ শক্তির অপসারণ চাইছেন, বিশেষ করে নারীরা যে যৌন হয়রানির শিকার হন, তা যেন দূরীভূত হয়। ঢালী তাঁর কাজে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন পাটের অাঁশ, সিনথেটিক চুল, ফাইবার গ��স, Motorized Metal armature. একটি ঘরের মাঝখানে মাছ ধরার  পলোর আকারে সিনথেটিক কালো চুল পরিবেষ্টিত। ওপরে ছাদ থেকে ঝুলন্ত অসংখ্য হাত মেঝেতে পরিবেষ্টিত কালো ফর্মকে ঘিরে রয়েছে। মেঝেতে  অসংখ্য নারীর নগ্ন পা – ’৭১-এর নারীদের সম্ভ্রমহানির এক অসহায় অবস্থার প্রতীকী উপস্থাপন। ওপর থেকে প্রসারিত হাতগুলো ফাইবার গ্লাস তৈরি। চমৎকার এক শিল্পস্থাপনা এটি।

ইয়াসমিন জাহান নূপুরের ভিডিও স্থাপনাশিল্পের শিরোনাম – Crossing the Border, Being together। নূপুর তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমান্তের বেড়া তুলে দিয়ে সারা পৃথিবী একই ভূখন্ড হয়ে যাক – এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। মানবীয় মর্যাদাবোধ, ধর্ম, রাজনীতি, বৈশ্বিক ভাবনা এবং জাতীয়তাবাদ যা আমাদের মাঝে সীমান্ত দেয়াল তুলে দিচ্ছে, তা ভেঙে দিতে চাইছেন নূপুর, কারণ আমরা সবাই মানুষ এবং পৃথিবীতে আমাদের অধিকার সমান। একটি বিশাল কাপড়ে সুঁই-সুতোর বুননে পৃথিবীর মানচিত্র এঁকে তার ওপর ভিডিও প্রজেকশন করে ইয়াসমিন তাঁর কাজ উপস্থাপন করেছেন। উদ্বোধনের পরে শিল্পী ইয়াসমিন জাহান একটি পারফরম্যান্স করেন, তা প্রচুর দর্শক উপভোগ করেছিলেন।

রোমে প্রবাসী উত্তম কর্মকারের কাজের শিরোনাম Art and Nature। শিল্পকর্মের মাধ্যমে উত্তম যে বার্তাটি পৌঁছে দিতে চেয়েছেন, তা হলো, প্রকৃতিকে সম্মান করতে এবং ভালোবাসতে হবে। এই সুন্দর পৃথিবী এবং প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে, দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে হলে একে অপরের সঙ্গে হাত ধরে মেলবন্ধন তৈরি করতে হবে। জীবনের প্রতিটি ফর্মই গুরুত্বপূর্ণ – মানুষ, প্রকৃতি বা পশুপাখি যা-ই হোক না কেন। প্রকৃতিকে বিনষ্ট না করলে প্রকৃতিও কখনো মানুষের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে না। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, প্রকৃতিই সকল শিল্পকর্মের আধার। উত্তম বিশাল আকারের চারটি ক্যানভাসে তাঁর কনসেপ্টকে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। অ্যাক্রিলিক পেইন্টিংয়ের সঙ্গে পেন্সিলে বাংলাদেশের কিছু পরিচিত বস্ত্ত, যেমন কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু উপকরণ – লাঙল, মই, পলো ইত্যাদির – ড্রইং সংযুক্ত করেছেন। প্রকৃতির বিমূর্ত ইমেজের সঙ্গে বাস্তবধর্মী ড্রইংয়ের সংযোগে তিনি ক্যানভাস সাজিয়েছেন।

ভৌগোলিক অবস্থানের ফলে বাংলাদেশ একটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল। জালের মতো বিস্তৃত অসংখ্য নদনদী-ঘেরা ছয় ঋতুর এ-দেশ হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। ছয় ঋতুর এ-দেশে পালাক্রমে আসে বারো মাসে তেরো পার্বণ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতি বিচিত্ররূপে সজ্জিত হয়, পরিবর্তন আসে মানুষের জীবনযাপনে। শিল্পী মোখলেস তাঁর শিল্পকর্মে বাংলার অপরূপ প্রকৃতির নানা রূপকে তিনটি পর্বে উপস্থাপন করেছেন। বিখ্যাত বাঙালি কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান – ‘ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’কে অবলম্বন করে ছাপচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর শিল্পকর্মের শিরোনাম The Nature of Bengal Mother’s বা ‘বাংলা মায়ের প্রকৃতি’ – প্রকৃতি যেন বাংলা মায়ের আঁচল। তাঁতে-বোনা ঐতিহ্যবাহী তিন ধরনের শাড়ির ওপর তিনি কাঠখোদাই ছাপাইয়ের মাধ্যমে তাঁর শিল্পকর্ম তিনটি প্যানেলে উপস্থাপন করেছেন। দেয়ালের ওপরের অংশ থেকে লম্বালম্বিভাবে নিচে মেঝে পর্যন্ত পুরো শাড়িতে তিনি প্রিন্ট করেছেন। শাড়ির আঁচলটি মেঝেতে ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং আঁচলের ওপরে সুতো দিয়ে নকশিকাঁথার ঢঙে গানের কথাকে বাংলা ও ইংরেজি বর্ণে উপস্থাপন করেছেন। শাড়িকে তিনি মায়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। মায়ের সমস্ত গায়ে যেন ‘রূপসী বাংলা’র নানা রূপ। রূপসী বাংলা মাকে তিনি বিশ্বমানবকুলের মায়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। মোখলেস ‘বাংলা মায়ের প্রকৃতি’ শিরোনামের শিল্পকর্মগুলোকে তিনটি উপ-শিরোনাম দিয়েছেন – ‘আমার জন্মভূমি-১’, ‘আমার জন্মভূমি-২’ ও ‘আমার জন্মভূমি-৩’।

এই তিনটি ছাপচিত্রের সঙ্গে তিনি কাঠের ব­কটি সংযুক্ত করে ব­কটিকেও কাজের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি বিশ্ব-ছাপচিত্র অঙ্গনে একটি নতুন সংযোজন হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। মোখলেস তাঁর কাজে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সংমিশ্রণে সমকালীনতা ধারণ করে এক নতুন আঙ্গিক সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর তিনটি কাজের ইমেজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই মিনিটের তিনটি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক উপস্থাপন করেছেন। প্রথম ছবি ‘আমার জন্মভূমি-১’-এ যখন আলো জ্বলবে তখন ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’ গানটি অন্তরালে বাজবে, গানটি শেষ হলে প্রথম ছবির আলো নিভে যাবে এবং পরবর্তী ছবি ‘আমার জন্মভূমি-২’-এর ওপর স্পটলাইট জ্বলবে ও সিডরের লন্ডভন্ড প্রকৃতির শব্দ শোনা যাবে। এভাবে ‘আমার জন্মভূমি-৩’ ছবিতে আলো জ্বলবে এবং ‘ভাটিয়ালি ধুন’ রাগে পান্নালাল ভট্টাচার্যের বাঁশির সুর ভেসে আসবে, যেন মানুষের স্বপ্ন বহুদূর পর্যন্ত দিগন্ত ছুঁয়ে যায়। এ-ছবিতে শিল্পী  এস এম সুলতানের ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’-অবলম্বনে মানুষের আদি পিতা একজন কৃষক একটি গাছের চারা রোপণ করছেন, পেছনে ভোরের সূর্যোদয়ে চমৎকার লাল ও সোনালি আলোর আভা উদ্ভাসিত হচ্ছে। দুর্যোগে লন্ডভন্ড প্রকৃতিকে আবার সাজাতে মানুষ স্বপ্ন দেখছে, আগামী পৃথিবী আবার নতুন সাজে ভরে উঠবে। ‘আমরা করবো জয়, We shall overcome’। মোখলেসের কাজ দেখে প্যারিস থেকে আগত শিল্পী অলিভিয়ার ফ্রান্স তাঁর কাজের একটি একক প্রদর্শনী করার আমন্ত্রণ জানান।

বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে প্রতিদিন প্রচুর দর্শক সমাগম হয়। প্রতিদিনের দর্শকদের উপস্থিতি দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের সবার কাজই দর্শকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। আগামী ২৪ নভেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত এ-প্রদর্শনী বিশ্ববাসীর জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার