ভোরের যূথিকার সঙ্গে আলাপ

লেখক:

Zuthika
Zuthika

আবুল আহসান চৌধুরী

তিরিশের দশক বাংলা গানের মোড় ফেরার কাল। বিশেষ করে আধুনিক বাংলা গান নতুন আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্যে জন্ম নেয় এই সময়েই। এই যে কালান্তর – তার মূলে ছিলেন এক কিশোরী – তাঁর নাম যূথিকা রায়। ১৯৩৪-এ মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে তাঁর প্রথম রেকর্ড বেরুল এইচএমভি থেকে – আধুনিক বাংলা গানের রূপটা তিনি পালটে দিলেন – সে-এক বিস্ময়ের ইতিহাস। এই যে পালাবদলের অবিস্মরণীয় ঘটনা, সে সম্পর্কে আরেক সুরশিল্পী বিমান মুখোপাধ্যায় বলেছেন : ‘যূথিকা রায়ের নামে বাজারে রেকর্ড বেরুল – আমি ভোরের যূথিকা আর ওই বিখ্যাত সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে – যে গানটাকে এখনকার গবেষক বিশেষজ্ঞরাও অনেকে, আধুনিক বাংলা গান সরণীটির প্রথম মাইলফলক বলে চিহ্নিত করেছেন। কারুর কাছে এটা হয়ত প্রশ্নাতীত নাও হতে পারে, তবু এ গান যে ইতিহাসের উপাদান হয়ে গেছে – তাতে কিন্তু কোনরকম দ্বিমত নেই। সেই বোধহয় রেকর্ডের বাংলা গানে, প্রথম অর্কেস্ট্রা তৈরি হল।… তা, রেকর্ডখানা বাজারে বেরুল। আর মাত্র তিন মাসের মধ্যে যূথিকাদির এই রেকর্ডখানা ষাট হাজার কপি বিক্রী হয়ে গিয়ে বাজারে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিল। রাতারাতি যূথিকাদি হয়ে গেলো আর্টিস্ট, স্টার।’ (‘বিমানে বিমানে আলোকের গানে’ : সিতাংশুশেখর ঘোষ, কলকাতা, ২০০৩; পৃ ১৫৪-৫৫)। ‘চিরকালীন সুপারহিট’ এই রেকর্ড বেরুনোর পর কি ডিলার কি শ্রোতা, সবাই মুখিয়ে থাকতেন শিল্পীর নতুন রেকর্ডের জন্যে।
দুই
যূথিকা রায়ের জন্ম ২০ এপ্রিল ১৯২০ হাওড়ার আমতায়। রায়-পরিবারের আদিবাড়ি খুলনার সেনহাটিতে। ছেলেবেলা থেকেই গানের প্রতি তাঁর ঝোঁক। বাবা-মায়ের উৎসাহে শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ হয়। রেকর্ডে গান দেওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন – মূলত গেয়েছেন এইচএমভির কুকুর-মার্কা লেবেলেই। শুরুটা বাংলা গান দিয়ে হলেও পরে হিন্দি-উর্দু-তামিল – নানা ভাষায় গান করেছেন। আধুনিক বাংলা গান, রজনীকান্ত-অতুলপ্রসাদ-নজরুলের গান, কিংবা ভক্তিগীতি, কীর্তন – আবার ভিন্ন ভাষায় গীত-গজল-ভজন-না’ত-বারোমাসি-ঋতুসংগীত-হোলি-দেওয়ালি-রামধুন, দেশগান এবং সেইসঙ্গে ফিল্মের গান গেয়ে বাংলা মুলুক ছাড়িয়ে সারা ভারত ও ভারতের বাইরেও নানা দেশে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর কণ্ঠে মীরার ভজন মানুষের মনে এক গভীর আবেগ ও আবেদন সৃষ্টি করে। বহুকাল পর্যন্ত রেকর্ড-লেবেলে তাঁর মূল নামের সঙ্গে বন্ধনীর মধ্যে ‘রেণু’ – এই ডাকনামটিও লেখা থাকতো। আরো পরে নাম থেকে ঝরে যায় ‘রেণু’, থাকে শুধু ‘যূথিকা রায়’।

তিন
সেকালে গানের জগতে যূথিকা রায়ের নাম-যশ-গুরুত্ব কেমন ছিল, তার পরিচয় মেলে সংগীতশিল্পীদের ভাষ্যে আর গ্রামোফোন কোম্পানির ক্যাটালগের বিবরণে। ‘আমি ভোরের যূথিকা’ ও ‘সাঁঝের তারকা আমি’ – এই দুটি গান (রেকর্ড নম্বর : এন ৭২৯৭) নিয়ে যূথিকার প্রথম রেকর্ড প্রকাশ পায় নভেম্বর ১৯৩৪-এ। ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েসে’র নভেম্বর ১৯৩৪-এর ‘নূতন বাংলা রেকর্ডে’র তালিকা-পুস্তিকায় এই গান ও শিল্পী সম্পর্কে বলা হয় : ‘বিজন বনে কত মুকুল শোভায়-সৌরভে আপনি ফুটে ওঠে, অথচ লোকে তার কথা জানতে পায় না। তেমনি দুটি ফুল এবার আমরা আপনাদের উপহার দিলাম। এই ফুল দুটি কুমারী যূথিকার দু’খানি গান। কুমারী যূথিকার গানের সঙ্গে আপনাদের এই প্রথম পরিচয়, কিন্তু মনে হবে যেন ভোরের আধোঘুমে আধোস্বপ্নে এই গান কতদিন মনের দুয়ারে বেজেছে। এমনিই তাঁর কণ্ঠের গান। তাঁর স্বভাব-সুন্দর সুর যেন গিরিনির্ঝরিণীর রূপালী জলধারার মত আপনি উৎসারিত হ’য়ে ওঠে, দূর-থেকে ভেসে-আসা সানায়ের মতই ঘুমন্ত মনকে জাগিয়ে তোলে। রেকর্ডে গায়িকার গান এই প্রথম। এবারে তিনি ভোরের যূথিকা আর সাঁঝের তারকার গান শুনিয়েছেন। প্রভাতের অরুণ যে যূথিকার বন্ধু, আকাশের যে সন্ধ্যাতারা মাটীর প্রদীপ হ’য়ে তুলসীতলায় নেমে এসেছে, এই দুটি গানে তাদেরই মর্ম্মকথা মর্ম্মরিত হ’য়ে উঠেছে। নবীনের মধ্যেই সুন্দরের আবির্ভাব, নূতন কণ্ঠে নূতন গান কত সুন্দর হয়েছে, আপনাদের তা’ শুনতে অনুরোধ করি।’
আত্মপ্রকাশের চার বছর পর স্বাভাবিক নিয়মে যূথিকা যখন আরো পরিণত ও বিকশিত, তাঁর গান নানা ধারায় তখন প্রবহমান। আধুনিক বাংলা গানের সূচনা যেমন তাঁর হাতে হয়েছে, তেমনি গীতি-চিত্রেরও তিনি প্রথম রূপকার। প্রণব রায়ের কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘পাহাড়-দেশের বন্ধু আমার স্বপ্নে আমায় ডাকো গো’ ও ‘রূপ-কাহিনীর দেশে রে, নাম-না-জানা দেশে’ – এই দু’খানি গান নিয়ে জুন ১৯৩৮-এ যূথিকার যে-রেকর্ড (এন ১৭০৮২) বের হলো, তা ছিল এইচএমভির ‘গীতি-চিত্র-মালার প্রথম নিবেদন’। জুন ১৯৩৮-এর ক্যাটালগ থেকে এ-বিষয়ে জানা যায় : ‘বর্ত্তমান জুন মাস হইতে আমাদের রেকর্ডের আসরে একটি নতুন বিভাগ খোলা হইল। আমরা এই বিভাগের নাম দিয়াছি ‘গীতি-চিত্র-মালা’। কথার তুলিকায় ও সুরের রঙে বিভিন্ন এক-একটি সুন্দর গীতি-চিত্র রচনা করিয়া আমরা গীত-রসিক শ্রোতাদের মাঝে মাঝে উপহার দিব। শুধু আধুনিক ভাব-প্রধান গান এবং মামুলী ভক্তিমূলক ভজন শুনিয়া শুনিয়া যাঁহারা ক্লান্ত, গীতি-চিত্র-মালা তাঁহাদের মনে নতুন আনন্দের রসদ জোগাইবে আশা করি।’ এরপর গানের আবহ ও এর রূপকার সম্পর্কে মন্তব্য করা হয় : ‘আমাদের গীতি-চিত্র-মালায় প্রথম ফুল গাঁথিয়াছেন বাংলার শ্রেষ্ঠতমা গায়িকা কুমারী যূথিকা।সুর-সংযোজনা এবং পরিচালনা করিয়াছেন কমল দাশগুপ্ত। প্রথম চিত্রটি একটি পাহাড়িয়া যুবকের বন্য সৌন্দর্য্যের – যে সৌন্দর্য্য আমাদের নাগরিক-সভ্যতা-ক্লান্ত মনকে স্বপ্নে ডাক দেয়। দ্বিতীয় চিত্রটি রূপ-কাহিনীর রাজ্যের – যে রাজ্য আমাদের মনে চিরকালের মায়া রচনা করিয়া রাখিয়াছে। দুইটি চিত্রই কথায়, সুরে, কণ্ঠ ও যন্ত্র-সঙ্গীতে এমনই সুন্দর হইয়াছে যে ইহা বাংলা রেকর্ড-জগতে শুধু অভিনব নহে, অতুলনীয়।’
ওই বছরেই – ১৯৩৮-এ, কুমারী যূথিকা রায়ের (রেণু) ‘যদি যমুনার জলে ফুল হয়ে ভেসে যাই’ ও ‘মন-বৃন্দাবনে রাস-মঞ্চে বেঁধেছি গোপনে’ – দুটি ভজন-গানের রেকর্ড (এন ১৭১৮২) বের হয়। গানের কথা প্রণব রায়ের, আর সুর-যোজনা করেন কমল দাশগুপ্ত। এই রেকর্ডটির পরিচিতি প্রসঙ্গে এইচএমভির সেপ্টেম্বর ১৯৩৮-এর ক্যাটালগে উল্লেখ করা হয় : ‘গীত-ভারতীর মানস-কন্যা কুমারী যূথিকার এই নতুন ভজন গান দু’টির ভাব সম্পূর্ণ নতুন।’ কমল-প্রণব-যূথিকার অনন্য সম্মিলনে জন্ম নেওয়া আরেকটি কাব্যগীতির রেকর্ড (নভেম্বর ১৯৩৮, এন ১৭২১৬), – ‘বনপথে যবে নিরজনে’ ও ‘ওরে আমার গান’ – সম্পর্কে ওই মাসের এইচএমভির ক্যাটালগের ভাষ্য : ‘বাংলার অন্যতমা শ্রেষ্ঠা গায়িকা কুমারী যূথিকা এ-মাসে দু’টি নতুন গান আপনাদের উপহার দিয়েছেন। কুমারী যূথিকার গানের যাঁরা অনুরাগী, তাঁরা হয়ত লক্ষ্য করেছেন যে, গায়িকার প্রত্যেকটি গান রচনা ও সুরের দিক থেকে নব নব বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্যময়। কুমারী যূথিকার মতো এমন অপরূপ মায়া-কণ্ঠ শিল্পীর পক্ষেই এত বিভিন্ন বৈচিত্র্য পরিবেশন করা সম্ভব।’ এইচএমভির তরফ থেকে যূথিকা রায়ের গান ও গায়কি সম্পর্কে এমন প্রশংসামূলক মন্তব্য হামেশাই প্রকাশিত হয়েছে। এ-থেকে স্পষ্টই ধারণা করা যায়, যূথিকা কতো বড়ো মাপের ও মানের শিল্পী।

চার
আমাদের সৌভাগ্য – সেকালের বাংলা গানের অনুরাগীদের সৌভাগ্য – যুগন্ধর এই শিল্পী আজও আমাদের মধ্যে আছেন – গানের জগৎ থেকে অবসর নেননি। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ ২০১০-এর ২৩ মে তাঁর উত্তর কলকাতার বাড়িতে। সেদিন সকাল এগারোটা থেকে দুপুর প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ হয়। পরে আফসোস্ জাগে, এই কথাগুলো ধরে রাখতে পারলে কতোই না ভালো হতো! অবশেষে সেই সুযোগ মেলে প্রায় দেড় বছর পর।
আগেই দিনক্ষণ ঠিক করা ছিল – ২৬ নভেম্বর ২০১১ শনিবার বিকেল চারটে। বনেদি উত্তর কলকাতার ৫-বি শ্যামপুকুর স্ট্রিটের তেতলা বাড়িটিতে পৌঁছতে ঘণ্টাখানেক প্রায় দেরিই হয়ে গেল। সংস্কারহীন প্রায় একশো বছরের পুরনো বেশ বড়ো-সড়ো বাড়িটির পেছন দিকে একতলা-দোতলা-তেতলা মিলিয়ে বেশ অনেকগুলো ঘর নিয়ে থাকেন যূথিকা রায় – বাড়ির ডানপাশের একটি অপরিসর গলি পেরিয়ে তারপর পাওয়া যাবে তাঁর দরোজার সন্ধান। জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে – প্রায় পঞ্চান্ন বছর এই বাড়িতে আছেন তিনি। তবে কিছুকালের মধ্যেই এখানকার বাস তুলতে হবে – ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে’ – হয়তো বরানগরে। কেননা বাড়ির মালিকেরা এই ভগ্ন-জীর্ণ বাড়িটিকে ভেঙে ফেলে এখানে আকাশচুম্বী অট্টালিকা গড়বেন। এই শিল্পীর জীবনের কতো স্মৃতি – হাসি-বেদনার, দুঃখ-সুখের, দীর্ঘশ্বাস-হাহাকারের, নিঃসঙ্গতার সাক্ষী এই বাড়িটির অস্তিত্ব অচিরেই ধুলোয় মিশে যাবে।
দোতলার বসার ঘরটি পরিচ্ছন্ন অথচ নিরাভরণ – ঠিক যেন শুভ্র শাড়ি-পরা তাঁরই মতো। বোঝা গেল অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর বিধবা বউদি পথ দেখিয়ে দোরগোড়ায় নিয়ে এলেন। কিশোরী রেণুর মতো একমুখ হাসি নিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। বাড়িতে জনমনিষ্যি বলতে এই দু’জনই। নানা কথা শুরু হলো, সেইসঙ্গে ছবি তোলাও। তাঁর জানাই ছিল যন্ত্রে ধারণ করবো তাঁর কথা। আমার সঙ্গে আছে যূথিকাভক্ত সোমনাথ – কলকাতারই ছেলে সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় – আমার ছায়া-সহচর। মূল আলাপের আগে সে কথার ফোয়ারা ছোটালো – যূথিকা রায় দু’একটি কথা আর হাসি দিয়ে – মৃদু মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলেন। জলখাবার এলে সোমনাথের কথা বন্ধ হলো – যূথিকা রায়ের সঙ্গে আলাপ শুরু করলাম আমি। থেমে-জিরিয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা উতোরচাপান চললো। ধীরে ধীরে কথা বললেন – জবাব দিলেন সব প্রশ্নের। কখনও চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক – আবার কখনও বিষাদ-বেদনায় আচ্ছন্ন – দূর অতীতের কথা বলতে গিয়ে কখনও বা আনমনা ভাব লক্ষ করা যায়। এই যে বড়ো একটা সময় ধরে কথা বললেন, তাতে কিন্তু ক্লান্তি কিংবা বিরক্তির ছাপ চেহারায় পড়েনি। তাঁর অর্জনের কথা – খ্যাতির কথা – স্বীকৃতির কথা জানাতে গিয়ে স্বভাবতই কিছুটা আনন্দিত-উচ্ছল হয়ে উঠেছেন। নজরুলই যে তাঁর খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার ভিত-রচনার কারিগর, আলাপচারিতায় সে-কথা বারবার শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন। সুরের গুরু কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথায় কণ্ঠে হতাশা, বেদনা ও ক্ষোভের সুর বেজে উঠেছে। যে ‘কমলদা’কে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই কমল দাশগুপ্ত যখন ফিরোজা বেগমকে বিয়ে করলেন, তখন সেটা তিনি মেনে নিতে পারেননি। এ-বড়ো বিস্ময়ের ব্যাপার! বাইরে প্রত্যাখ্যান করলেও ভেতরে ভেতরে তাঁর জন্যে তবে কী একটা দুর্বলতা ছিল যূথিকার? তাঁকে তিনি গ্রহণও করবেন না, আবার ত্যাগও করবেন না – এ-এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব!

পাঁচ
যূথিকা রায়ের প্রায় দেড় ঘণ্টার আলাপচারিতা টেপ-রেকর্ডারে ধারণ করি। কথোপকথন শেষে এবারে বিদায়ের পালা। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আসুন, ওপরের তলায় আমার ঘরে – একটা অনুষ্ঠানের কার্ড দেবো।’ ওঁর ঘরেও কিছু কথা হলো, আরেকটি ঘরে সাজানো রয়েছে তাঁর সম্মাননা-স্বীকৃতির সব স্মারক। একধরনের তৃপ্তির আনন্দ নিয়ে রাস্তায় নামলাম – অন্ধকার তখন বেশ ঘন হয়ে উঠেছে। আলো-অাঁধারি আবহে পথ-চলা শুরু হলো। হঠাৎ মনে হলো বহুদূর থেকে যেন নিঃসঙ্গতার বেদনা নিয়ে কোনো সুর ভেসে আসছে – ‘চাঁদ ডুবেছে তবু প্রিয় নাহি আসে’।

ছয়
যূথিকা রায়ের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর একান্ত স্নেহভাজন ও অনুরাগী সংগীতপ্রিয় তপনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় – তাঁর আন্তরিক সহায়তার কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। এবারের সাক্ষাতের ব্যবস্থাও তিনিই করেন। আমার বন্ধু ‘সূরাজ-শ্রুতি-সদনে’র অমিত গুহের কাছে প্রাসঙ্গিক নানা তথ্যের জন্যে গভীরভাবে ঋণী। লোকগানের বিশিষ্ট শিল্পী রমেন সাহা আমাকে দিনের পর দিন সঙ্গ দিয়েছেন। সোমনাথের কথা তো আগেই বলেছি। বাংলা একাডেমীর উপপরিচালক ডক্টর তপন বাগচী কলকাতা থেকে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এনে দিয়েছেন। ক্যাসেট-রেকর্ডার থেকে সাক্ষাৎকারটি লিখে দেওয়ার দুরূহ ও শ্রমসাধ্য কাজটি করেছেন অধ্যাপক-প্রাবন্ধিক-গবেষক ডক্টর মাসুদ রহমান। দ্রুত কম্পোজের জন্যে মোঃ হুসাইন টিটু যথেষ্ট শ্রম-স্বীকার করেছেন।
সাক্ষাৎকারটি ছাপার উপযোগী করার জন্যে প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করতে গিয়ে কোনো কোনো অংশ বাদ দিতে হয়েছে। আবার জবাবের অসম্পূর্ণ বাক্য পুনর্গঠিত কিংবা প্রশ্নের সঙ্গে সংগতিহীন জবাবের কারণে প্রশ্নের ধরনও পালটাতে হয়েছে। সেইসঙ্গে পুনরুক্তি বা অপ্রয়োজনীয় বক্তব্যও বর্জন করতে হয়েছে – এমনকি কিছু ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর বিষয়ও। স্মৃতিভ্রমের কারণে কিছু তথ্যভ্রান্তি ঘটেছে, সেগুলো যথাসম্ভব সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছে! কখনো আবার কথার খেই ধরিয়ে দিতে হয়েছে।
শেষে বলতে হয়, এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার কালি ও কলম ছাড়া অন্য কোথাও ছাপার সুযোগ ছিল না – এ-জন্যে সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আবুল হাসনাতের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
প্রিয় পাঠক – আসুন, এবারে আমরা যূথিকা রায়ের মুখোমুখি হই।
আবুল আহসান চৌধুরী
আবুল আহসান চৌধুরী : নিতান্তই ঘরোয়া মেজাজে আজ আপনার সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপের জন্যে এসেছি। আমরা যেসব কথা জানতে চাইবো তার কিছু কিছু আপনার স্মৃতিকথায় আপনি বলেছেন। কিন্তু স্মৃতিচর্চায় তো খুঁটিনাটি সব কথা উঠে আসে না, তাই আলাদা করে এই কথা বলা। প্রথমেই জানতে চাই, গানের জগতে আসার পেছনে – বিশেষ করে এই যে গ্রামোফোনে গান দেওয়ার ব্যাপারে প্রেরণাটা কিভাবে পেয়েছিলেন?
যূথিকা রায় : আমার বাবা, আমার মা এঁরা গান খুব ভালোবাসতেন এবং আমার বাবা নিজেও গাইতে পারতেন। ছোটবেলায় বাবাই আমাকে শিখিয়েছেন। আর মা সব স্তব-স্ত্ততি দিয়ে যখন পুজো করতেন তখন শুনতাম পাশে দাঁড়িয়ে। আমার খুব ভালো লাগতো সেই স্ত্ততি-স্তব, সেগুলো আমাকে শেখাতেন। কবে যে আমার গানের একটা ভাব এসে গিয়েছিল আমি নিজেও বলতে পারবো না, কতো বছরে কতো সময়ে আমার এটা হয়েছিল। সেটা মা-বাবা বলতে পারবেন। আমি হয়তো কোথাও গান শুনলাম বা কোথাও কেউ কোনো কলের গানের রেকর্ড বাজাচ্ছে, সেই গান যদি আমার ভালো লাগতো আমি সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিতাম। সেটা আমার এমন একটা ভাব ছিল যে দু’তিনবার শুনলেই আমার গানটা মুখস্থ হয়ে যেতো। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলতে পারতাম, খুব বেশি সময় আমার লাগতো না। এই করেই আমার গানের জগৎটা শুরু হয় এবং বাবার ছিল চেঞ্জের চাকরি, নতুন নতুন কর্মস্থলে যেতেন –
আহসান : মানে বদলির চাকরি!
যূথিকা : বদলির চাকরি – দু’তিন বছর অন্তর অন্তর নতুন জায়গায় যেতে হতো এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও যেতে হতো। এতে আমাদের গান শেখা বা পড়াশোনার ক্ষতি হতো। কলের গানের একটা রেকর্ড ছিল আমাদের বাড়িতে, সেটা ছিল মাস্টার মদন বলে এক শিল্পীর – আর পাশেই ব্র্যাকেটে লেখা ছিল সাত বছর বয়সে গেয়েছিল যে গানটি – ‘একবার এসো শ্রী হরি’ – এই বলে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে গানটা করেছিল। আমার তো তখনো সাত বছর হয়নি – বাবা অফিস থেকে ফিরে এলেই আমাকে ডাকতেন, পাশে বসিয়ে আমাকে গান শেখাতেন, হাতে তালি দিয়ে গান শেখাতেন। সব ভালো ভালো শিল্পীর গান রেকর্ড থেকে তুলে এনে বাবা আমাকে শেখাতেন সেসব গান গাইবার জন্যে। কোনটা কী তাল কী রাগরাগিণী – আমাকে তখন সেগুলো বলতে হতো। এরকম করে বাবারই প্রেরণাটা বেশি ছিল। আর মাঝে মাঝে বলতেন, ‘দ্যাখ্ রেণু’ – আমার ডাকনাম রেণু – ‘দ্যাখ্ রেণু, তোকেও ঠিক এই মাস্টার মদনের মতো তোর সাত বছর বয়সে আমি রেকর্ড করাব।’ আমি তখন বলতাম, ‘তোমার কী মাথা খারাপ যে তুমি সাত বছর বয়সে আমার রেকর্ড করাবে? যারা গাইছে তাদের তো আমি ভগবান বলে মনে করি, আর তুমি বলছো আমাকে সাত বছর বয়সে রেকর্ড করাবে!’ আমি তখন একেবারে কিচ্ছুই শিখিনি, সবে শুরু। বলে, ‘না, না, যতোটুকু জানিস্ গাইবি, আমি তোকে রেকর্ড করাব।’ এভাবে আমার যখন সাত বছর বয়স হলো, বাবা আমাকে নিয়ে কলকাতায় চলে এলেন। এসে – আর ওই যে বলেছিলেন, তখন থেকেই বাবা – প্রথম থেকেই একেবারে গ্রামোফোনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মানে যখন নতুন রেকর্ড বেরোবে তখনই রেকর্ড যেন আমাদের পাঠিয়ে দেয়। আমরা থাকতাম তখন গ্রামে, আমার নিজের দেশে, সেটা হচ্ছে সেনহাটি – খুলনা জেলায়। নতুন রেকর্ড বেরোলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রামোফোন কোম্পানি পাঠিয়ে দিত – আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কে.সি. দে, কে. মল্লিক – এঁদের গানের রেকর্ড পাঠিয়ে দিত। আর তাঁরা চিঠিরও বেশ জবাব দিতেন। তা আমার যখন ঠিক সাত বছর বয়স, বাবা আমাকে কলকাতায় নিয়ে গেলেন, আমার পিসির বাড়িতে আমরা তখন উঠলাম। যখন কলকাতায় আসতাম তখন ওইখানেই উঠতাম। আমাকে বাবা গ্রামোফোন কোম্পানিতে নিয়ে গেলেন। গ্রামোফোন কোম্পানি আমার গান শুনে বলল যে, ‘হ্যাঁ, ভালো, ভালো গলা, কিন্তু এখন তো আমরা নিতে পারবো না, ও তো ছোটো, আমরা পরে আবার ডাকবো। আমাদের মনে থাকবে, আমরা পরে ডাকবো।’ তারপর আমরা সঙ্গে সঙ্গে আবার দেশে চলে এলাম – না না, দেশে যাইনি। আমরা যখন ফিরে আসছি, বাবার খুব মন খারাপ – তা বলছেন, ‘দ্যাখ্ রেণু, গান এখানে তো হলো না, তা চল্ আমরা বেতারকেন্দ্রে যাই।’ ১ নম্বর গারস্টিন রোডে – সেখানে বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন। গিয়ে সেখানে দেখলাম বেতার – আমাদের রেডিওর তখন দুটো ঘর মাত্র। আর একটা হলঘর, সেখানে একটা মাইক আর দাঁড়িয়ে আছেন ঘড়ি ধরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আর যিনি কর্তা তিনি বসে আছেন। আর কোনো লোকও নেই, কোনো ইন্সট্রুমেন্টও নেই। এমনকি হারমোনিয়াম, তানপুরা, তবলা এটুকু পর্যন্ত নেই। ফাঁকা-ফাঁকা ঘরটা। আমার অডিশন নেওয়া হলো এবং ওঁরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপ্রুভ করলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে আমার গান ওখানে ব্রডকাস্ট হলো। তখন ছিল সব হেডফোন। হেডফোনে গান শুনতে হতো। মানে এখন যেমন আমরা সাউন্ডবক্সের মধ্য দিয়ে গানটা শুনি, আবার রেকর্ডিংও হয়, সেই হয়তো পনেরো দিন একমাস আগে, দু’মাস আগে, এরকম অনেকটা টাইম নিয়ে ওরা দেখে সময় মতো বাজাতো। আমি সেদিন – আর সেটা ছিল বেতারকেন্দ্রের জন্মদিবস, জন্মবছর। আমি ঠিক বেতারকেন্দ্রের জন্মদিনে গাইনি। কিন্তু বেতারকেন্দ্রের জন্মবছরে আমি গেয়েছিলাম। ঠিক সেম বছরে। বেতারকেন্দ্র চালু হয় বোধহয় ১৯২৭ সালে, আর আমি তখন সাত বছরের। গানটা গাইলাম, আমি তখন খুব ছোটো, সাত বছর বয়স আর ওরকম বাইরে সকলে শুনছে একটা মাইকের মধ্য দিয়ে আমার গানটা যাচ্ছে। আমি গেয়েছিলাম রবীন্দ্রসংগীত – ‘আর রেখো না অাঁধারে আমায়, দেখতে দাও’ – সেটা দিয়েই শুরু। তারপর আমার খুব মন ছটফট করছে যে, কী রকম গাইলাম, তাঁদের কী রকম লাগলো! এখানে তো শুনতে পেলাম না। বাড়িতে গিয়ে – পিসিমার বিরাট বাড়ি – অনেক লোক। তা সেখানে গিয়ে আমি ওঁদের কাছ থেকে শুনবো যে কী রকম লেগেছে! আমি তখন খুব উৎসাহ নিয়ে বাবার সঙ্গে আমার পিসিমার বাড়িতে গেলাম। সব সার সার করে দাঁড়িয়ে আছে আমার আসার অপেক্ষায়। আমি ঢুকেই প্রথমজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘গান কী রকম হলো?’ জবাব পেলাম, ‘গান কী আর শুনতে পেলাম, মাত্র দু’লাইন শুনেছি।’ তারপরের জনকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী রকম লাগলো?’ তখন বললো যে, ‘আমি তো কানে দেওয়া মাত্র কে যেন ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। আমি কিছুই শুনতে পাইনি। তার পরের জনকে যখন জিজ্ঞেস করছি, ‘তা, কেমন লেগেছে তোমার?’ তো সে বলছে, ‘আমি কানে দেওয়া মাত্তর শুনলাম সমাপ্তির ঘোষণা।’ তা আমি তখন মনে মনে কষ্ট পেলাম। আমার আর শোনা হলো না যে কী রকম আমি গেয়েছি! ওদের ভালো লেগেছে – কিন্তু সম্পূর্ণটা তো শুনতে পেলাম না! সেই একটা আমার আক্ষেপ। আমি আর কিছু বললাম না। তারপর সেই পিসিমার বাড়ি থেকে আমরা আবার দেশে চলে এলাম – সেনহাটিতে। এ রকম মাঝে মাঝে বাবা আমাকে কলকাতায় নিয়ে আসতেন এবং ওখানে জানালে আমাকে ওরা প্রোগ্রাম দিতো। এটা যে সময়ের কথা বলছি তখনও আমরা কলকাতায় আসিনি। আমরা স্থায়ীভাবে কলকাতায় এসেছি ১৯৩০ সালে। গ্রামে থাকতে মা বলতেন যে, ‘না, এখন আমরা গ্রামে বাস করতে পারবো না – আমাদের গান শেখা হচ্ছে না, এসব হচ্ছে না, পড়াশোনা হচ্ছে না, ভালো ইস্কুলে যাচ্ছি না, ভালো মাস্টার পাচ্ছি না। সেজন্যে আমরা কলকাতায় চলে এলাম।
আহসান : এই গান গাওয়া নিয়ে কি খুব উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতি মনকে নাড়া দেয়?
যূথিকা : ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ – প্রথম স্বাধীনতা দিবসে আমাকে দিল্লির রেডিও থেকে ওঁরা ডাকলেন – ওনারা আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। এটা ঠিক সেই স্বাধীনতা দিবস বলে আমাকে জানাননি, এটা মানে এমনিই প্রতি বছর আমাকে ডাকতেন – যেমন গান্ধীজির জন্মদিন, বড়ো একটা ফেস্টিভাল, কিছু এসেছে – এরকম হলেই আমাকে ডাকেন। তখন ছিল তিনটি করে সিটিং – তিনটে করে সিটিং থাকতো। প্রথমে সকালে একটা সিটিং থাকতো, সেটা পনেরো মিনিট। তারপরে সন্ধের দিকে একটা সিটিং থাকতো, সেটাও পনেরো মিনিট। তারপর রাত্তিরে – শেষের দিকে একটা থাকতো, সেটাও পনেরো মিনিট। কী গাইবো সেটা ওখানে লেখা থাকতো, যে এই গান তোমাকে গাইতে হবে – পনেরো মিনিট সময়। বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন দিল্লি স্টেশনে সকালবেলা – এই ছটা-সাতটা এরকম – রেকর্ডিং শেষ করে আমি সবে বাইরে এসেছি, তখন দেখি যে অফিসরুম থেকে একটা অফিসার ছুটতে ছুটতে এসে হন্তদন্ত হয়ে বাবাকে বলছেন, ‘যাবেন না, যাবেন না, দাঁড়ান আমাদের বিশেষ কথা আছে।’ বাবা দাঁড়াতেই তখন বললেন যে, ‘এইমাত্র আমি ত্রিমূর্তি হাউস থেকে ফোন পেয়েছি। আমাকে ফোন দিয়েছে পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহেরুর তরফ থেকে – তিনি জানিয়েছেন যে, আমাদের প্রসেশন এখন লালকেল্লায় যাচ্ছে, ওখানে ভাষণ দেওয়া হবে এবং ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে আমাদের জাতীয় পতাকা তোলা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন যূথিকা গান গেয়ে যায়। ওদের তখন প্রসেশন বেরিয়ে গেছে। আমাকে তখন অফিসার বললেন, ‘আপনি শিগগিরই স্টুডিওতে ঢুকে পড়ুন, ঢুকে গান শুরু করুন।’ আমি তখন খুব মুশকিলে পড়েছি। কী গান গাইবো – এত বড়ো একটা অকেশন! তারপরে যেমন আনন্দ হয়েছে, তেমন ভয়ও হচ্ছে যে, কোন গান দিয়ে শুরু করবো! ওই অফিসার বলছেন যে, ‘হ্যাঁ, মহাত্মা গান্ধীজি তোমার ভজন ভালোবাসেন, তোমার ভজন রোজ শোনেন রেকর্ড বাজিয়ে, তুমি সেই ভজন দিয়ে শুরু করো। পরপর তুমি গেয়ে যাবে, থামবে না। পরপর গেয়ে যাবে – যতক্ষণ না আমরা তোমায় ইশারায় জানাবো – এখন থামো – ততক্ষণ পর্যন্ত গাইবে।’ আমি তো ঢুকে পড়লুম – ঢুকে পড়ে, এটা ঠাকুরেরই আশীর্বাদ, আমার মনে পড়লো একটা স্বাধীনতার গান – ‘সোনেকা হিন্দুস্তান মেরা – সোনেকা হিন্দুস্তান মেরা’, এটা দিয়েই আমি আরম্ভ করেছিলাম। তখন তো রেকর্ড হতো – রেকর্ডে দুটো গান থাকতো, ‘হিন্দুস্তান মেরা’র অপর পিঠে ছিল – ‘ভারত মেরি জন্মভূমি হ্যায়’। তা আমি ‘হিন্দুস্তান মেরা’ দিয়ে আরম্ভ করলাম এবং তারপরে গান্ধীজি যে সমস্ত ভজন ভালোবাসতেন, যেমন – ‘ম্যায় তো গিরধর্ আগে নাচুঙ্গি’ – তারপর এই ভজন যতো ছিল আমার সেই গানগুলো দিয়ে আমি প্রায় একঘণ্টার মতো গেয়ে তারপর ওখান থেকে সংকেত পেলাম যে – ‘বন্ধ করো’। বন্ধ করে আমি বেরিয়ে এলাম। তা সেটা আমার সংগীতজীবনের একটা খুব বড়ো স্মৃতি। এখনও যখন আমাকে কেউ বলে যে, ‘তোমার বড়ো স্মৃতি কী’, – তখন আমি এই ঘটনাটা বলি। বলে আমার খুব ভালোও লাগে যে, এখনও আমার খুব মনে আছে, আমি ঠিক বলতে পারছি – এইটুকু আমার আনন্দ।
আহসান : আচ্ছা, যূথিকাদি আপনার বয়স তো নববই পেরিয়ে গেছে –
যূথিকা : হ্যাঁ, বয়স আমার এখন বিরানববই।
আহসান: এই বিরানববই বছর বয়সে আপনি এখনও গানের চর্চার সঙ্গে জড়িত আছেন এবং পুরনো দিনের সেই জীবনের স্মৃতি আর গানের স্মৃতি মিলিয়ে ‘আজও মনে পড়ে’ বলে একখানা খুব সুখপাঠ্য বইও লিখেছেন। তো পেছনে ফিরে গান শেখার কলকাতা-পর্বের কথা কিছু বলুন।
যূথিকা : কলকাতায় এসে পেলাম জ্ঞানরঞ্জন সেনকে – তিনি আমাকে প্রথমে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখাতেন এবং খুব ভালো গাইতেন, গলা খুব দরাজ ছিল, মিষ্টি গলা। কিন্তু তখন তো এই রকম রেডিও-টিভি এসব হয়নি, আর প্রোগ্রামও সেরকমভাবে কোনো হলঘরে মানে প্রোগ্রাম করতে গেলে হয় স্টার, নয় তো ওইসব থিয়েটারের সব স্টেজে গাইতে হতো। এখন যেমন রবীন্দ্রভবন আছে, তখন এতোটা চর্চা ছিল না যে তিনি পপুলার হবেন। আমাকে শেখাতেন খুব দরদ দিয়ে, আর খুব স্নেহ দিয়েছেন মানে আমাকে একদম ভাইয়ের মতো করে নিজের বোন, ছোট বোন এরকমভাবে শেখাতেন। তিনিই একদিন বলেছিলেন আমার বাবার কাছে যে, ‘সত্যেনবাবু, আমার সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের খুব বন্ধুত্ব। কাজী নজরুল ইসলামকে আমি যখনই বলবো ‘আসুন’, তিনি সেই কথাটা কোনো দিন ছেড়ে দেননি – সঙ্গে সঙ্গে আসতেন। তা এখন কাজী নজরুল গ্রামোফোন কোম্পানির সর্বেসর্বা। তিনি লেখক, কবি এবং গায়ক, নির্দেশক সবকিছু – অধিকর্তা, মানে গ্রামোফোনে কাকে নেওয়া হবে কী করা হবে – এ সমস্ত তিনিই করেন।’ তা জ্ঞানবাবু বললেন, ‘কাজীদা গ্রামোফোন কোম্পানির অধিকর্তা এবং লেখক – সবকিছুর গুণ তাঁর আছে। তিনি এখন সর্বেসর্বা।’ বাবা বললেন, ‘আমার তো অনেক – অনেকদিনের সাধ রেণুর রেকর্ডের গান হোক। আপনি একটু যদি করে দেন, তাহলে বড়ো ভালো হয়। ওর গানটা একটু শোনান না!’ তো উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ আমরা রবিবার রবিবার যেতাম – বরানগরে থাকতেন তিনি। তা বললেন যে, ‘ঠিক আছে, আমি এরপরের সপ্তাহে নিয়ে আসবো তাঁকে।’ তা আমরা পরের সপ্তাহে যখন গেলাম, দেখি কাজীদা বসে আছেন, সেখানে আমাদের আগেই চলে গেছেন।
আহসান : রিহার্সেল রুমে?
যূথিকা : না, এটা জ্ঞানবাবুর বাড়িতে। তখন আমি গ্রামোফোন কোম্পানিতে ঢুকিনি। আমি তখন শিখছি সবে। আমি জ্ঞানবাবুর কাছে শিখেছি, ভীষ্মদেবের কাছে তখনও যেতে পারিনি – ওনার কাছে শিখেছি, কমল দাশগুপ্ত – ওনার কাছে শিখেছি। আমার রেকর্ডের প্রায় সমস্ত সুর কমল দাশগুপ্তের। কাওয়ালি, মেড্রাসি গান, তামিল, উর্দু এসমস্ত – হিন্দি, ভজন – সব ওনার সুর, উনি এতো সুন্দর সুর দিতেন যে, আমি আর অন্য কোনো ট্রেনারের কাছে যাইনি, ওনার কাছে ছাড়া।
আহসান : আচ্ছা, আমরা কাজী নজরুল ইসলামের কথায় ফিরে আসি আবার।
যূথিকা : কাজীদা আমার গান শুনে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপ্রুভ্ করলেন যে, ‘হ্যাঁ, যূথিকার গান হবে। এই আমি অ্যাপ্রুভ করছি। আমিই ওকে আগে শেখাব’ – এই বলে উনি নিজেই দুটো গান লিখলেন – ‘স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণা’ এই গানটা – আরেকটা ঠিক মনে করতে পারছি না। আর নিজেই তিনি সুর দিলেন, আমাকে শেখালেন, তারপরে রেকর্ডও হলো। কিন্তু কোনো কারণে সেই রেকর্ডটা আর রিলিজ হলো না। সেই রিজেক্টেড রেকর্ডটা গ্রামোফোন কোম্পানিতে ছিল। তার পরের বছর – কমল দাশগুপ্ত নতুন ট্রেনার – উনি তখন টুইন বলে একটা কোম্পানিতে কাজ করতেন – কমল দাশগুপ্তকে এরকম বলা হলো যে, আমাকে তো কাজীদা অ্যাপ্রুভ্ করে দিয়েছেন আর ওনার কাছে একটা গান রেকর্ড করেও সেটা মানে প্রকাশিত হলো না এবং আমাকে তখন আর ডাকা হয়নি। আর কমল দাশগুপ্তকে পরের বছর বলা হলো, ‘আপনি পাঁচজন শিল্পীকে আপনার চয়েসে ডাকুন। আর আপনার যাকে ইচ্ছে, যার রেকর্ড হয়ে গেছে তাকেও ডাকতে পারেন বা যার হয়নি – নতুন কোনো আর্টিস্টকেও তুলতে পারেন। এইসব আর্টিস্টের একজনও যদি আপনার হাতে পপুলার হয় – এই রেকর্ডে যদি পপুলার হয়, তাহলে আমরা আপনাকে এইচএমভিতে তুলে নেব, আপনি তখন এইচএমভিতে ট্রেনার হবেন। ওটা একটু ফার্স্ট স্টেজের। ওখানে আসবেন।’ তখন যারা যারা এসেছিল, যেমন – হরিমতী, কমলা ঝরিয়া, তারপর ছেলেদের মধ্যেও কেউ কেউ।
আহসান : টুইন তো এইচএমভিরই সিস্টার কনসার্ন, কিন্তু সস্তা দামের রেকর্ড বের করতো টুইন।
যূথিকা : হ্যাঁ, সস্ত। শিখলে হবে – একটা ভবিষ্যৎ আছে, তখন হয়তো তৈরি হয়নি, কিন্তু ছেড়ে দিতো না। তখন যে তৈরি হয়নি, তাকে চান্স দিতো ওই টুইন রেকর্ডে। তো কমলদাকে বলা হলো, আমার ওই রিজেক্টেড স্যাম্পল নিয়ে আমি নিজে ওনার সামনে যাইনি, যাই হোক ওই রিজেক্টেড স্যাম্পলটা শুনে উনি বললেন যে, ‘একে আমি নিলাম।’ হরিমতী – তারপর আর কে কে ছিল আমার মনে নেই। আর বাড়িতে তখন ভগবতীবাবু – গ্রামোফোন কোম্পানির অধিকর্তা – উনি নিজে এসে বাবাকে বলে আমাকে নিয়ে গেলেন। তখন সেখানে কমল দাশগুপ্তের কাছেই আমি প্রথম রেকর্ড করি – ‘আমি ভোরের যূথিকা’ আর ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’। এ গান দুটো খুব পপুলার হয়েছিল।
আহসান : তাহলে আপনার প্রথম রেকর্ড হয়েছিল ‘স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণা’ – নজরুলের এই গানটি – কিন্তু যে কোনো কারণে হোক রেকর্ডটির রিলিজ হয়নি। এই ‘ভোরের যূথিকা’ –
যূথিকা : হ্যাঁ, ‘ভোরের যূথিকা’ আর ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ – এটা প্রণব রায় লিখেছিলেন এবং আমার এই ফার্স্ট রেকর্ডে কমল দাশগুপ্ত সুর দিয়েছিলেন।
আহসান : সাল-তারিখ কী মনে পড়ে?
যূথিকা : হ্যাঁ, ১৯৩৪ সাল। ৩৩ সালে আমি কাজীদার কাছে শিখতাম, তারপরে – হ্যাঁ, ৩৪ সাল।
আহসান : তো এই গান বেরুনোর পর কেমন সাড়া পড়েছিল সেই কথা আপনার স্মৃতি হাতড়ে যদি বলেন!
যূথিকা : হ্যাঁ, সে গান খুব পপুলার হয়েছিল। তার মধ্যেও কাজীদার একটা অবদান আছে। তখন রেকর্ড কোম্পানিগুলোর কলকাতায় প্রচুর ডিলার ছিলেন। আর প্রতি মাসেই রেকর্ড হতো যাঁদের হওয়ার কথা – যাঁরা শিল্পী হয়ে গেছেন – তাঁদের, নতুন যাঁরা আসতেন – তাঁদেরও হতো। আর সমস্ত রেকর্ড একটা একটা করে ডিলাররা এসে নিয়ে যেতো, এবং যার যেটা বিক্রি হতো না সেটা ফেরত যেতো আবার কোম্পানিতে – এরকমভাবে নিয়মটা ছিল। কিন্তু আমার যখন ‘ভোরের যূথিকা’ রেকর্ডটি হলো, তখন ডিলাররা এসে আর-সব রেকর্ড নিলেন, কিন্তু আমার রেকর্ডটা নিলেন না – বললেন, ‘না, গান একেবারে সোজা সোজা – এ গান কেউ কিনবে না, পছন্দ করবে না। এ সুর কী রকম – এতো অন্যরকম মানে যে রকম ক্ল্যাসিকাল ওরা চায়, অতোটা ক্ল্যাসিকাল ভাব এতে নেই। এটা বিক্রি হবে না।’ ওরা কেউ কিনবে না – সেইসব ডিলার। কাজীদা ওখানে ছিলেন, ওখানে বসে ছিলেন। উনি বললেন যে, ‘কেন কিনবে না?’ কাজীদা খুব রেগে গিয়েছিলেন। ‘কেন তোমরা রেকর্ড নেবে না? তোমাদের যদি বিক্রি না হয় তাহলে আমাদের তো সেটা ফিরিয়ে দিতে পারো। তার জন্যে তো আমরা বলছি না যে, না, এটা তোমাদের কাছেই থাকবে! তোমরা যদি যূথিকার রেকর্ড না নাও তাহলে আমি কোনো রেকর্ড তোমাদের দেবো না।’ এরকমভাবে কাজীদা সেই ডিলারদের মত করিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রেকর্ড যখন বেরুলো – ছ-মাসের মধ্যেই হিট হয়ে গেল। হিট হতেই কমল দাশগুপ্ত এইচএমভির পার্মানেন্ট হয়ে গেলেন। আমিও ঢুকে গেলোম – আমারও স্থান হয়ে গেল, সেইখান থেকে।
আহসান : মানে আপনার জয়যাত্রা শুরু হলো।
যূথিকা : শুরু হলো, হ্যাঁ। মানে এই যে বাবার যে ইচ্ছে, সেই ইচ্ছাটা আমি পূরণ করতে পেরেছি।
আহসান : আপনার সময়ে বা আপনার আগে যাঁরা গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে জড়িত ছিলেন শিল্পী হিসেবে, তাঁদের কার কার গান আপনার খুব ভালো লাগতো, প্রেরণা পেতেন – সেইরকম কয়েকজন শিল্পীর কথা যদি বলেন।
যূথিকা : দেখুন, আমাদের মতো ঘরের মেয়েরা তখনও যেতো না, তখনও আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতী – এরাই কিন্তু গাইছে। আমি যখন প্রথম যাই, তার আগে কমল দাশগুপ্তের বোন এসেছিলেন। কিন্তু একটা না দুটো গান করে তার বিয়েথা হয়ে গেল, তারপর বাইরে চলে গেল। কিন্তু এরপরে আমি প্রথম ওখানকার শিল্পী এবং তারপরে আমার প্রথম গান ‘সাঁঝের তারকা’ যখন খুব হিট করলো তখন আমার মতো সব মেয়ে ওখানে ঢুকতে আরম্ভ করলো। তারপর ছেলে – এই জগন্ময়, হেমন্ত, সত্য চৌধুরী – এরা তখন শুরু করলো। আর এদের মধ্যে আমি ছিলাম ওখানে সব থেকে সিনিয়র। তখন আর যারা আসতো তাদের কিরকম – খুব একটা শেখেনি, কিন্তু আমার ভালো লাগতো রেণুকা ভৌমিকের গলাটা। ভালো লাগতো পারুল কর – তার গলাটা একটু মোটা – তাহলেও ওকে কমল দাশগুপ্তই সব সুর করে দিতেন।
আহসান : কমলা ঝরিয়া?
যূথিকা : কমলা ঝরিয়াকে খুব ভালো লাগতো। কমলা ঝরিয়ার গানও আমি তখন শিখতাম। ওর ঠুমরি তালের যেসব গান বেরুতো, আমি ওই রেকর্ড কিনে কিনে সব শুনতাম – ওর গান রামপ্রসাদী, কীর্তন – আর ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা এদের গানও শিখতাম। ওদের গানও আমার ভালো লাগতো।
আহসান : আপনি কী কে. মল্লিককে দেখেছেন?
যূথিকা : হ্যাঁ, কে. মল্লিককে দেখেছি।
আহসান : ওঁর গান সম্পর্কে কিছু বলুন না!
যূথিকা : হ্যাঁ, উনি আগমনী, রজনীকান্তের গান-অতুলপ্রসাদ – এসব গানই গাইতেন এবং সেই প্রথম থেকেই আমরা যখন দেশে থাকি – সেনহাটিতে, তখন আমার ঠাকুরদা থেকে আরম্ভ করে বাবা এঁরা সব ওঁদের গানই কিনতেন। ওর (কে. মল্লিক) গলা আমার খুব ভালো লাগতো – পরিষ্কার গলা, মিষ্টি গলা। ওনার কাছ থেকেই আমরা ভাব পেয়েছি – ওইসব গান করতাম খুব। কে.সি. দে – কে.সি. দের গলার তো আর তুলনা করা যায় না। কে.সি. দের কীর্তন-টির্তন অপূর্ব। আববাসউদ্দীন – আববাসউদ্দীনের গান – আববাসউদ্দীন যে ভাটিয়ালিগুলো গাইতেন – অপূর্ব!
আহসান : ওঁর ভাওয়াইয়া?
যূথিকা : হ্যাঁ, দারুণ, দারুণ।
আহসান : সেই সময়টা তো ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ – তাই না!
যূথিকা : হ্যাঁ –
আহসান : আপনি অনেক গীতিকারের কথায় এবং অনেক সুরকারের সুরে গান করেছেন। তো সুরকারদের মধ্যে আপনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন কার নির্দেশনায় গান করতে?
যূথিকা : তখন সুরকার ছিলেন যেমন পঙ্কজ মল্লিক, যদিও আমাদের কোম্পানিতে নয় – তাহলেও পঙ্কজ মল্লিকের সুরটা আমার ভালো লাগতো। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় যে বাংলা গানগুলো করেছেন তা তো অপূর্ব। তখন ভীষ্মদেবের গান আমি গাইতে পারতাম না – মানে সবে গেছি শিখতে। আর সুরকার বলতে দুর্গা সেন, কমল দাশগুপ্ত। কমল দাশগুপ্তের কাছে আমি যেভাবে সুর পেয়েছি, আমার কিন্তু তখন মনে হতো যে, আমি একটা নতুন কোনো সুরের রাস্তায় গিয়েছি। মানে আগের সুরটুর সেখানে নেই, এটা নতুন ধারায় মনে হচ্ছে যেন একটা নতুন জীবন পেলাম। এরকম আমার মনে হতো। আমার যতো গান – যতো রেকর্ড আমি করেছি প্রায় সবই কমল দাশগুপ্তের সুরে। এবং কাজীদার সুরে কিছু আছে। কাজীদার সুরটাও আমার খুব প্রিয়। তিনি না হলে তো আমি ওখানে ঢুকতেই পারতাম না। তাঁর কাছে আমি চিরঋণী। কেননা সেখানে না ঢুকলে আজ আমি এখানে দাঁড়াতে পারতাম না। আর সুর আমার ভালো লাগতো কে.সি. দে, মৃণালকান্তি ঘোষ, জগন্ময় মিত্রের।
আহসান : আর রাইচাঁদ বড়াল?
যূথিকা : রাইচাঁদ বড়াল খুব ভালো সুরকার। ওনার মিউজিকটা আমার খুব ভালো লাগতো। সিনেমা দেখতে যেতাম যখন, তখন যে মিউজিকটা বাজতো – অপূর্ব! ওরকম মানে ঠিক যে ভাব যে ধারায় যাবে সেই জিনিসটা উনি সেই মিউজিকের মধ্যে ফোটাতেন আর যে কটি হ্যান্ডস বাজাতো, তার তুলনা নেই। সেসমস্ত সুর আর সেরকম সুন্দরভাবে বাজানো এখন পর্যন্ত শুনিনি।
আহসান : অনেকের লেখা গানই তো আপনি গেয়েছেন। অনেক গীতিকবির বাণী আপনি সুরের ভেতর দিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন শ্রোতাদের কাছে। তো গীতিকারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আপনার ভালো লাগতো কার বা কাদের গান করতে?
যূথিকা : কাজীদার লেখা গান আমার খুব ভালো লাগতো। তবে শেষের দিকে কাজীদা নিজেই এসে কমল দাশগুপ্তকে অনেক গান দিয়ে বলতেন, ‘তুই – এই যতো শিল্পী এসেছে নতুন নতুন – যাকে ইচ্ছে – যাদের ইচ্ছে তুই তাদের দিবি – আমি গান লিখে দিলাম, এবার তুই সুর দে।’ উনি নিজেই সুর দিতেন। আর কাজীদার সুর তো অনেক রকম আছে, ওঁর তো তুলনা নেই, ওঁনার সঙ্গে আমি কাউকে যোগ করছি না। কাজীদা, প্রণব রায়, শৈলেন রায়, তারপর আরো ছিল মোহিনী চৌধুরী।
আহসান : অজয় ভট্টাচার্যের গান কী করেছেন আপনি?
যূথিকা : না।
আহসান : সুবোধ পুরকায়স্থ?
যূথিকা : হ্যাঁ, সুবোধ পুরকায়স্থ করেছি।
আহসান : তা, এই যে কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য যাঁদের গান করেছেন তাঁদের মধ্যে বাণী-ভাব এসব মিলিয়ে কার লেখা গান আপনার বেশি পছন্দ হতো?
যূথিকা : তখন তো আধুনিক গানটাই বেশি চলতো। তা সেখানে আমার প্রণব রায়ের গানটা সব থেকে ভালো লাগতো।
আহসান : তাহলে কাজী নজরুল ইসলামকে আপনি সবার উপরে স্থান দিচ্ছেন?
যূথিকা : হ্যাঁ, কাজীদা তো সম্মানের – আমি দিচ্ছি না, সকলেই দেয়। রবীন্দ্রনাথ – কাজী নজরুল – ওঁরা সমান সমান হতে পারেন। কিন্তু কাজীদার সঙ্গে এঁদের তুলনা হয় না। এঁরা তো কাজীদা-রবীন্দ্রনাথের কথা নিয়েই গান লিখেছেন। এঁরা সব লেখেন – সুন্দর গান লেখেন, কিন্তু প্রণব রায়ের মতন না। এই যে, ‘ভোরের যূথিকা’ – সাধারণ লোকে লিখলে কী হতো জানি না! প্রণব রায় সত্যিই খুব সুন্দর গান লিখেছেন, অনেক সুন্দর সুন্দর গান লিখেছেন। আর যখন গানটা সুন্দর লেখা হয়, সেখানে সুরটাও স্বাভাবিক সুন্দর হয়।
আহসান : আপনার মতানুসারে নজরুলকে সবার উপরে রেখেই এ-বিষয়ে কথা বলছি। তো আপনার প্রিয় সুরকার কমল দাশগুপ্ত এবং প্রিয় গীতিকার প্রণব রায় – এ দুজনেই খুব বন্ধু ছিলেন এবং দুজনের মধ্যে ভারি ভাব ছিল এবং দুজনেরই এ বছর (২০১১) জন্মের একশো বছর পূর্ণ হলো – জন্মশতবর্ষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এঁদের দুজনের কাউকে নিয়েই কেউ কোনো কিছু লিখলেনও না, কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজনও করলেন না, স্মরণও করলেন না! এই বিষয়ে আপনি কিছু বলুন – আপনার কী বক্তব্য?
যূথিকা : এটা খুব দুঃখের বিষয় যে, এতো বড়ো একজন সুরকার কমল দাশগুপ্ত, এতো বড়ো একজন নির্দেশক – এতো সুন্দরভাবে শেখাতেন, যে কোনো শিল্পীকে মানে যে রকমেরই গলা হোক না কেন – তিনি তাকে ঠিক পপুলার করে দিতেন একটা গানেতেই। আবার একজন ট্রেনার হতে গেলে যতো রকম তার গুণ থাকা দরকার সবকিছু ছিল কমল দাশগুপ্তের। সেই কমল দাশগুপ্তের নাম কিন্তু আমি শুনি না। এতো লোকের নাম করে, এতো লোকের স্মৃতি রাখছে – দ্যাট ইজ অল রাইট, কিন্তু কমল দাশগুপ্তের কথা কেউ বলেও না, আর কেউ একটা কিছু তাঁর স্মৃতি রাখার চেষ্টাও করে না – সেটা কিন্তু ঢাকাতেও হয়নি, আমার যা মনে হয়। ঢাকায় যে তিনি চলে গেলেন, সেখানেও কিছু হয়নি। আর আমাদের এইখানে তাঁর জন্ম তাঁর জায়গা, নিজে এখান থেকে উঠেছেন – এই যে এতো বড়ো দান তিনি করে গেছেন – তাঁর এতোখানি দান, সেটাকে কেউ একটু মনে করে না! আর এটা আমি এখন হা-হা করে বললে তো তা ঠিক হয় না। যাঁরা ওপরআলা, যাঁরা গান বিচার করেন, যাঁরা গান নিয়ে চলেছেন একেবারে শীর্ষে, তাঁদের কারো মুখে কিন্তু কখনও আমি শুনিনি এঁর নাম। সেটা আমার খুব একটা বড়ো দুঃখ আছে।
আহসান : প্রণব রায়েরও তো এবারে এই বছর জন্মশতবর্ষ। তাঁকে নিয়েও তো কিছু হলো না!
যূথিকা : প্রণব রায়ের জন্মদিন একটা হয়েছিল কিছুদিন আগে। আমার কাছে আসেনি।
আহসান : যূথিকাদি, আপনি আমাদের পুরনো দিনের কথা কিছু বললেন, গানের জগতে কীভাবে এলেন সে-কথা জানালেন, এসব কথার খেই ধরে আমরা আপনার মুখ থেকে আরো কিছু শুনতে চাই। সেকালে এইচএমভি তো সাহেব কোম্পানির ছিল, তার পাশাপাশি বাঙালিরাও গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরির কোম্পানি গড়ে তুলেছিলেন। আপনি কী বরাবর এইচএমভিতেই গান রেকর্ড করেছেন, না অন্য কোনো কোম্পানি থেকেও ডাক পড়েছে?
যূথিকা : না। প্রথম থেকেই আমি এইচএমভিতেই আছি বরাবর। অন্য কোনো কোম্পানিতে আমি যাইনি – যাওয়ার দরকারও হয়নি। এখানে যে ট্রেনার আমি পেয়েছি। কাজীদার গান, আরো ভালো ভালো লেখকের গান – আমার প্রাণটা ভরে গিয়েছিল। আর কোথাও যাবার দরকার হয়নি।
আহসান : মেগাফোন, হিন্দুস্তান রেকর্ড, সেনোলা বা পাশাপাশি আরো দু’একটি বাঙালি রেকর্ড কোম্পানিও তো গড়ে উঠেছিল, তাঁরা কী আপনাকে কখনো আমন্ত্রণ জানিয়েছেন অথবা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন গান রেকর্ড করার জন্যে?
যূথিকা : একবার হয়েছিল, প্রথম যখন আমি গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান করলাম। কাজীদার গান আমি প্রথম করেছিলাম, কিন্তু সেটা যখন রিজেক্ট হলো, কোনো কারণে বের হলো না, আমাকে তখন একটা বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেইসময় আমাকে ‘হিন্দুস্তান’ থেকে ওরা খুব ডেকেছিল। ‘হিন্দুস্তানে’ আমার যাওয়া যখন প্রায় ফাইনাল, কন্ট্রাক্ট সই করবার দিন হঠাৎ দেখি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ভগবতীবাবু (ভগবতীচরণ ভট্টাচার্য) – উনি ওখানকার সর্বেসর্বা, – তিনি আমার বাড়িতে এসে সেটা ক্যানসেল করে আমাকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে নিয়েছিলেন।
আহসান : আসলে আপনাদের কালের ভদ্র-শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরা সাধারণত মঞ্চে অভিনয়ও যেমন করতেন না, বাইরে গানও করতেন না কিংবা গ্রামোফোন রেকর্ডে গান দেওয়ার ব্যাপারটিও ছিল না। একটা বিশেষ জায়গা থেকে শিল্পীরা আসতেন। তো আমরা দেখলাম যে, যূথিকা রায় মানে আপনি, প্রতিভা সোম পরে যিনি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে বিয়ে হয়ে প্রতিভা বসু নামে পরিচিত হন – এরকম দু’চারজনকে দেখি যে, ভদ্র-শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে – তাঁরা রেকর্ডে গান দিলেন। যুগটা তো অন্যরকম ছিল – এই যে একটা ব্যাপার এ সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?
যূথিকা : না, তখনকার দিনটা ছিল যে, ভদ্রঘরের মেয়েদের গান কেউ ঘরে বসে শুনতে পারে, কিন্তু তারা গাইবে না তো গলা ছেড়ে, কোথাও বাইরে তো গাইবেই না এবং পড়াশোনাও কিছু শিখতে পারবে না – এটা একটা খুব জটিল ব্যাপার ছিল। কিন্তু আমার মা এ বিষয়ে কিছুই মানতেন না। উনি বলতেন যে, ‘মেয়েরা গান শিখবে না, পড়াশোনা কিছুই শিখবে না, শুধু অল্প বয়সে তাদের বিয়ে হয়ে যাবে যে সংসারই করবে, তাহলে কোনো দিন আমাদের সমাজের উন্নতি হতে পারে না।’ পড়াশোনা আমাদের গ্রামের থেকেই আরম্ভ হয়েছে। আমাদের দেশে যখন ভালো স্কুল হয়েছে – ‘প্রতিভাময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ – সেই স্কুলে তিনি আমাদের ভর্তি করে দিয়েছেন।
আহসান : সেটা কোথায়?
যূথিকা : সেনহাটিতে – খুলনার সেনহাটিতে। সেখানে ছেলেদের স্কুলে – সব ছেলে হাইস্কুলে পড়তো, তারা পাশ করতো – সবকিছু। কিন্তু আমাদের দেশে – সেনহাটিতে ‘প্রতিভাময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ থাকা সত্ত্বেও কোনো মেয়ে যেতো না, সেটা ফাঁকাই পড়ে থাকতো। কিন্তু আমরা যখন সেনহাটিতে গেলাম, তখন মা এরকম দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন এবং আমাদের গ্রামের যাঁরা মোড়ল ছিলেন, যাঁরা কর্তা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁকে অসম্ভব তর্ক করতে হতো। তাঁরা বলতেন যে, ‘না, মেয়েরা বাইরে যেতে পারবে না, গাইতে পারবে না।’ আমি গাইতাম – বাইরে কোনো ফাংশন হলে আমাকে যেতে দেবে না – এই করে করে একেবারে মৃত করে রেখেছিল আমাদের গ্রামটাকে। কিন্তু মা সেকথা শোনেননি। তিনি আমাকে, আমার দিদিকে, আমার ছোটবানকে গ্রামের ওই ‘প্রতিভাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে’ ভর্তি করে দেন। মাকে অনেক অপ্রিয় কথা শুনতে হয়েছে, তাঁকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভর্তি করলেন জোর করে – ওই রকম অপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও। তাছাড়া তিনি সমস্ত গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকল মাকে বোঝাতেন – তাদের বাড়িতেও আমাদের মতো সব মেয়েরা ছিল। তাদের বোঝাতেন যে, ‘তোমরা এইরকম করে চুপ করে থাকবে না। তোমরাও মেয়েদেরকে লেখাপড়া শেখাও, তা না হলে তাদের উন্নতি কী করে হবে?’ এই করে মা সমস্ত বাড়ি থেকে মেয়েদের নিয়ে নিয়ে নিজেই গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। গ্রামের যিনি মোড়ল ছিলেন – কর্তা ছিলেন, তাঁর মেয়েকে তিনি আটকে রেখেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল তাঁর মেয়েও আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এভাবে আমারও একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে গ্রাম সম্বন্ধে। এখনও আমি সেই ঘটনাগুলো ভুলতে পারিনি। আমি যখন গাইতাম – বাড়িতে গাইতাম, সকলেই শুনতে আসতো, বাড়ি ভরে লোক হয়ে যেতো। একদল যেতো, আবার ফিরে আরেক দল আসতো। আমাকে এই গান গাওয়ার জন্য মাঝিরা পর্যন্ত চিনে গিয়েছিল। মাঝিরা নৌকাতে উঠলে বলতো, ‘দিদি তুমি গান শুরু করো’ – এরকম। আবার একবার আমরা ট্রেনে করে আসছি, কলকাতা থেকে দেশে ফিরে যাচ্ছি। তখন আমার বাবা আমাদের সঙ্গে ছিলেন না। আমার ঠাকুমা অসুস্থ, বাবা তাই তাঁকে দিল্লিতে দেখবার জন্য গিয়েছিলেন। এতো সন্তানকে নিয়ে মা একলাই যাচ্ছিলেন। তা সেখানে হঠাৎ আমার পরিচিত একজন আমাকে দেখে বললেন, ‘এই তো আমাদের রেণু এখানে আছে। টাইমটা খুব ভালো করে কেটে যাবে। এই রেণু, তুই একটা গান কর্।’ আর আমিও এমন ছিলাম, কেউ যদি আমাকে গান গাইতে বলতো সেইসময় – আমি খালি গলায় একটার পর একটা গান গাইতাম। আমার এটাতে নিজেরই একটা আনন্দ ছিল। আর তারাও খুব খুশি হতো। আমরা তখন আসছি ট্রেনে করে, কলকাতা থেকে দেশে যাচ্ছি – আর মা খুব চিন্তা করছেন, ‘আমি এতো বাচ্চা নিয়ে, জিনিসপত্র নিয়ে কী করে দৌলতপুর স্টেশনে নামবো!’ আর দৌলতপুরে একটু সময় থামে, বেশিক্ষণ থামে না, একটা ভীষণ আতঙ্ক-ভাবনা এই নিয়ে। মা সারারাস্তা চিন্তা করতে করতে আসছে। আর আমরা সব বাচ্চা ভাইবোন জানালার কাছে বসে দেখছি যেই স্টেশন আসছে, চা কী করে বিক্রি করছে – এসব নিয়ে খুব আনন্দ করছি। আমাকে দেখে আমার পরিচিত এক পিসি বললেন, ‘রেণু, একটু গান করো আমরা শুনি, দেখো সময়টা কাটছে না।’ তা আমি তো গান ধরে দিয়েছি। স্টেশনে সবে থামছে, আস্তেআস্তে গাড়িটা ঢুকছে – আমি গান গাইছি – আমি তখন বেশ জোরেই গাইতাম। প্রথম গাইতে গাইতে গলা ভারি হয়ে যায়, জোর কমে যায়, জোর থাকে না। কারণ ওখানে খুব চেঁচিয়ে গাইতে হয়। তা আমি গান ধরেছি এমনই জোরে, খালি গলায় তখন খুব জোর ছিল – আমি যখন থেকেই গাইছি তখন থেকেই যিনি গার্ডসাহেব – গাড়িতে থাকেন, ইনচার্জ যিনি, পতাকাও ওড়ান, তারই নির্দেশে গাড়ি ছাড়ে, এরকম – আমাকে গাইতে দেখে একটু দাঁড়িয়ে থেকে অন্য কামরায় চলে গেলেন। পরের স্টেশনে যখন থেমেছে গার্ডসাহেব আমাদের গাড়িতে ঢুকেছেন। ঢুকে সকলকে জিজ্ঞেস করছে, ‘কে গাইছিল গাড়িতে?’ তখন সকলেই আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, ‘এই যে রেণু গাইছিল।’ তা বলছে, ‘আমি একটা গান শুনে তারপর গাড়ি ছাড়বো।’ তখন মা বললেন, ‘গাও।’ আমি তখন গাইতে শুরু করলাম। পুরো গান শুনে উনি চলে গেলেন। আর মা আবার তাকে একটু জানিয়েছিলেন, ‘আমি একলা একলা যাচ্ছি এতো বাচ্চা নিয়ে, আপনি একটু দেখবেন দৌলতপুর স্টেশনে যেন আমরা ঠিকমতো নামতে পারি।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে মা, আপনি কিচ্ছু ভাববেন না’ – বলে তিনি গাড়ি ছেড়ে দিলেন। তারপর যখন দৌলতপুর স্টেশন এলো, আমরা নামতে না নামতেই গার্ডসাহেব আমাদের কামরায় এসে ঢুকলেন। বললেন, ‘মা, আপনি কিচ্ছু তাড়াতাড়ি করবেন না। আপনি আগে নামুন – তারপর সকলে জিনিসপত্র নিয়ে নামলে তবেই আমি সবুজ পতাকা ওঠাবো।’ মাকে অনেক সাহায্য করলেন, সব জিনিস ধরে নামিয়েও দিলেন। আমার খুব মনে আছে সেই স্টেশন-গার্ডটার কথা। আমরা খুব নিশ্চিন্তে নেবে গেলাম। গার্ডসাহেব সবুজ পতাকা উড়িয়ে দিলেন।
আহসান : বেশ মজার ঘটনা যে গান গেয়ে মুশকিল আসান হলো। যাই হোক – আমরা একটু জানতে চাইছি, যে সময়ে আপনারা গান করতেন – বিশেষ করে গ্রামোফোনে গান দিতেন – সেই সময়ে তো ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, কমলা ঝরিয়া এঁরা গান করতেন, আরো আশ্চর্যময়ী, বেদানা দাসী, হরিমতী এরকম নানা শিল্পী ছিলেন, তাঁরা তো একটু ভিন্ন পাড়া থেকে আসতেন – তো এঁদের সঙ্গে কী আপনার কোনো কথাবার্তা হতো কিংবা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এই গানের ভেতর দিয়ে?
যূথিকা : না, সেটা হতো না। কারণ এ-বিষয়ে মা খুব কনজারভেটিভ ছিলেন। মা যখন আমাকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে দেন ভগবতীবাবুর কাছে, এরকম কথা নিয়েছিলেন যে, ‘আমার মেয়ে যখন যাবে তখন সে ঘরে আর কেউ থাকবে না। সেখানে শুধু ট্রেনার থাকবে আর অধিকর্তা থাকতে পারেন আর যিনি লিখেছেন গান ইনি থাকবেন আর সঙ্গে যাঁরা যাবেন – যে যাবে ওর ভাই কি বোন, তাকেও ওর সাথে রাখতে হবে। ওকে ট্যাক্সি করে নিয়ে যাবেন, আবার গান হয়ে গেলে এক মিনিট দেরি না করে ওকে ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরিয়ে দেবেন।’ এরকমভাবে আমাদের যাতায়াতটা ছিল। আর প্রথম থেকে যাঁরা গাইছেন, মানে আলাদা জায়গা থেকে এসেছেন তাঁদের সঙ্গে যেন কোনোরকম মেলামেশা না হয় – নিষেধ ছিল। তা আমরা সেরকমভাবেই চলেছি। যতো বছর গান করেছি এটা কিন্তু ভগবতীবাবু একদম মেনে চলেছেন। আমার গানের ঘরে কাউকে যেতে দিতেন না। আমার কেন – আমাদের মতন ঘরের যারা যেতো তাদের ঘরেও কাউকে যেতে দিতেন না – ওরকম ট্যাক্সি করে তাদেরও নিয়ে আসা হতো, দিয়ে আসা হতো। আর কমলবাবু তো একেবারে অসম্ভব স্ট্রিক্ট ছিলেন এ-বিষয়ে। তিনি যখন গান শেখাতেন বা তোলাতেন অর্কেস্ট্রার সঙ্গে – যখন আমরা গান করতাম, তখন হয়তো একজন শিল্পী এসে গেছে – আমার তখন গান শেষ হয়েছে – তার সঙ্গে পর্যন্ত আমি কথা বলতে পারবো না। হয়তো আমার গান শেষ হওয়ার সময় জগন্ময় এসেছেন, কিন্তু একদিনের তরে এক মিনিটের জন্যেও মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে দিতেন না। একদম কথা বলতে দিতেন না। আমরা এইরকমভাবে সারাজীবন – যতোদিন আমার সংগীতজীবনে গ্রামোফোন কোম্পানিতে ছিলাম ততোদিন পর্যন্ত এই যে, ভগবতীবাবু আমার মাকে যে কথা দিয়েছিলেন, সেটা রেখেছিলেন।
আহসান : পরে কী কখনই ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, কমলা ঝরিয়া বা কানন দেবী – এঁদের সঙ্গে আপনার কথা হয়নি, আলাপ হয়নি?
যূথিকা : যখন প্রণব রায় মারা গেলেন, তাঁর স্মৃতিসভায় সেখানে কানন দেবী ছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে কথা হলো। আবার এক জায়গায় হয়েছিল, বাইরের জগতে – যেমন এই কলকাতাতে একটা মিউজিক কম্পিটিশন হয়েছিল বাচ্চাদের, তা সেখানে তাঁরা আমাকেও জাজ করেছিলেন আবার আঙ্গুরবালাকেও জাজ করেছিলেন, আমরা একসঙ্গে সেখানে বসে কাজ করেছিলাম।
আহসান : সেখানে কী কথাবার্তা হয়নি?
যূথিকা : হ্যাঁ, কথাবার্তা হয়েছে। এই ‘কেমন আছেন দিদি’ – এরকম কিছু কথাবার্তা। আমি তখন একটু ইয়ে ছিলাম, মানে বেশি কথাবার্তা বলতে পারতাম না। এখন যেমন বকবক করে যাই, তখন কিন্তু আমি একদম কথাবার্তা বলতাম না, মানে কী দিয়ে আরম্ভ করবো, যদি কিছু মনে করে! আমি খুব কম কথা বলতাম।
আহসান : না, অনেক সময় তো থাকে যে কোনো কোনো মানুষকে শ্রদ্ধা কিংবা স্নেহ কিংবা এমনি প্রীতির বশে মানুষের সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে – তেমন কী কোনো শিল্পীর সঙ্গে গড়ে ওঠেনি?
যূথিকা : সেরকম হয়েছে – যেমন পারুল কর, ওর সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল। আমার বাড়ির পাশেই তার শ্বশুরবাড়ি। তারপর পদ্মরাণী চট্টোপাধ্যায় – তার সঙ্গেও খুব ভাব ছিল, একসঙ্গে আমরা গান গাইতে যেতাম। এরকম রেণুকা ভৌমিক, তারপরে আরেকজন ছিল গায়ত্রী বসু – এঁদের সঙ্গে খুব ভাব ছিল।
আহসান : এমনি শিল্পী হিসেবে ইন্দুবালা বা আঙ্গুরবালা বা কমলা ঝরিয়া বা কানন দেবী – এঁদেরকে কীভাবে – এঁদের গানকে কীভাবে আপনি বিচার করবেন?
যূথিকা : না, এঁদের গান তো আমি খুবই ভালোবাসতাম ছোটবেলায়। এঁদের গান শিখেই তো আমি দেখতাম যে ওঁরা কোথায় টানটা ছাড়ছেন, কোথায় আবার তারপরেই ধরছেন – এসব জিনিস আমি খুব লক্ষ করতাম, ওঁদের রেকর্ড বাজিয়ে শুনে শুনে।
আহসান : যূথিকাদি, এবারে আমরা জানতে চাইবো, ফিল্মে প্লেব্যাক বলতে গেলে আপনি করেনইনি, – কিন্তু কেন?
যূথিকা : ফিল্মে আমার খুব একটা বেশি ইচ্ছে ছিল না। আমি অনেকদিন পর্যন্ত ফিল্ম লাইনটাকে আটকেছিলাম। এর কারণ আমি যে ভজন গানটা গাইতাম – সকলে খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে আমার এ-ভজনটাকে নিয়েছিল। তারা যে খুব ভালোবেসেছিল, সেটা আমি বুঝতাম। যখন সেখানে প্রোগ্রাম করতে যেতাম তখন দেখতাম তাদের চোখের ধারায় জল পড়ছে আর আমার কাছে এসে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতো। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার! সেই স্মৃতি আমি কোনোদিন ভুলবো না। সেই যে ভাবটা – আমিও বোধহয় অতোটা ভাবতাম না, ভজন গাইতাম। এই যে আমার শ্রোতারা যারা আসতেন তাদের ভাব দেখে আমিও এই ভজনকে অসম্ভব ভালোবাসলাম, অসম্ভব প্রিয় ছিল আমার। এই ভজন ছাড়া আমার কিছু গাইতেই ভালো লাগতো না। তখন যদি সিনেমাতে আমি গাই – আমাদের সিনেমার জগৎটা তখনো এতোটা অ্যাডভান্স হয়নি। তখন বেশিরভাগ ওখানে বাইজিদের গান-টান এসব করাতো। এমন একটা যে, সাধারণভাবে একে-ওকে দিয়ে গাইয়ে দিলো। সেইসব দেখে, আমি তো দেখতাম সিনেমা, সেসব দেখে আমার কোনোদিন ওখানে যাবার ইচ্ছে ছিল না। এতো ভালো ভালো গানও ছিল না – তখন লতাও আসেনি। এতো সুন্দর মিউজিক ডিরেক্টর যাঁরা এসেছিলেন, পরে তাদের মতো ওই সময় মিউজিক ডিরেক্টরও ছিল না – বাজে সাধারণ সুর দিয়ে তারা চালিয়ে দিতো। তাই আমি এই ভজনের ভাবটা যাতে নষ্ট না হয়, আমি ঠিক করেছিলাম যে, আমি কোনোদিন ওইখানে গাইবো না। কিন্তু আমার সংগীতজীবনের যখন শেষসীমায় আমি এসেছি, আমার রেকর্ড করা যখন বন্ধ হয়ে এসেছে, প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো তখন দেবকী বোস – উনি বলে পাঠালেন। আমি বন্ধ করেছিলাম এই ভেবে যে, যে রেটটা সিনেমা জগতে আর্টিস্টরা পায়, যে টাকাটা পায়, আমি তা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি এটা ইচ্ছা করে করেছিলাম। শিল্পীরা কোনো স্যাম্পল পাবে না, তারা কোনো রয়্যালিটি পাবে না, তারা ওই যে একবার যে সিনেমাতে যা পাবে তাই – সেইটিই শেষ তাদের। এসব জেনে আমি তখন আমার রেটটাকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম যাতে আর আমাকে না বলতে হয় – আমি সিনেমায় গাইবো না, এটা না বলতে হয়। কিন্তু দেবকী বোস যাঁর ছবি আমরা অত্যন্ত ভালোবাসি – যখনই তাঁর ছবি আসতো আমরা দেখতাম – তিনি এতো সুন্দর ছবি করতেন। তিনি আমাদের বাড়িতে বলে পাঠিয়েছিলেন – গ্রামোফোন কোম্পানিতে বলে পাঠিয়েছিলেন যে, ‘যূথিকা যে টাকা চায়, যেভাবে করতে চায়, সে গান ও করবে – আমি ঠিক ওর মতো করে সেই সিনটা করবো। ও যেন আমার ‘রতনদ্বীপে’ দুটো গান গায়।’ তা আমি সেখানে গেয়েছিলাম, ‘রতনদ্বীপ’ হিন্দি ছবি – এটাতেই আমার প্রথম প্লেব্যাক।
আহসান : কোন সালে ছবিটি হয়েছিল?
যূথিকা : আমার ঠিক মনে নেই।
আহসান : অনুমান করে কী বলা যায়?
যূথিকা : হ্যাঁ, অনুমান হয়তো ষাট সালে।
আহসান : ষাট? মনে হয় ষাটের আগে হবে। কেননা দেবকী বসুর বাংলায় ‘রত্নদ্বীপ’ মুক্তি পায় ১৯৫১-তে।
যূথিকা : তাহলে পঞ্চাশ কী ষাট – ওর মধ্যেই।
আহসান : আচ্ছা, এ তো গেল প্রথম ছবি। এরপরে যেসব ছবিতে আপনি গান গেয়েছেন, সেসব ছবি সম্পর্কে – গান সম্পর্কে যদি কিছু বলেন!
যূথিকা : যখন আমি সিনেমায় গাইছি – সেখানে দেবকী বোস যেটা রেট করেছিলেন, সেটা পরেও আমাকে দিয়েছেন – কেননা উনি কথা দিয়েছিলেন। আর এইখানে বাংলাতে আমি গেয়েছিলাম ‘ঢুলি’তে। রাজেন সরকার সুর দিয়েছিলেন এবং গান লিখেছিলেন প্রণব রায়।
আহসান : হ্যাঁ, ‘ঢুলি’ তো চুয়ান্ন সালের ছবি। মনে পড়ে গানটির কথা?
যূথিকা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওটা মনে পড়ে, – ‘এই যমুনারই তীরে মুরলি বাজিত যেথা রাধা রাধা সুরে’। আর ছিল একটা হিন্দি ভজন। ওটা মনে হয় মাধুর পন্ডিতেরই লেখা, যতদূর আমার মনে হয়।
আহসান : আচ্ছা, গানটার কথা মনে পড়ে?
যূথিকা : এই গানটা দরবারি কানাড়ার ওপর সুর দিয়ে – এটা রাজেন সরকারই সুর দিয়েছিলেন। আর বোম্বেতে ‘লালক্যর’ বলে একটা বই হয়েছিল। তা সেখানে আমি দুটো গান গেয়েছিলাম। সে দুটোও ভজন – একটা শিবের স্ত্ততি কোরাসে, মানে সেটা কোরাসে ছিল। আর একটা ছিল ওই ভজনই। আর মিউজিক ডিরেক্টর যিনি ছিলেন তিনি নতুন, আমার নামটা ঠিক মনে নেই। তিনি খুব নতুন – অল্পবয়েস, তিনি সুরটা খুব ভালো দিয়েছিলেন।
আহসান : এরপরে কী আর কোনো বাংলা বা হিন্দি ছবিতে আপনি গান গেয়েছেন?
যূথিকা : না, এরপরে আর গাইনি। এরপরে আমি গান বাইরে গাওয়াটাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলাম। বাইরে এমনি ফাংশন করতাম। রেকর্ডও যেমন ছাড়লাম, তেমনি সিনেমাও ছাড়লাম। কারণ তখন গলা আস্তে আস্তে একটু নিচু হচ্ছে, ঠিক যতোটা গাইতাম – সেরকম হতো না। এটা ভেবে নিই যে, এখন গানটা ঠিক হচ্ছে না। আমি বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
আহসান : আপনার শেষ রেকর্ড কোন্ সালে বেরুলো?
যূথিকা : ছিয়াত্তর সালে, সেটা সাঁইবাবার ভজন। আমি বাহাত্তর সালে সাঁইবাবার কাছে গিয়েছিলাম। তারপর সাঁইবাবা আমাকে আমার ভজন শুনবার জন্য ডেকেছিলেন। আমাকে খুব আশীর্বাদ করেছিলেন – রত্নমালা দিয়ে, একটি কৃষ্ণমূর্তি দিয়ে, তারপর শাড়ি, বিভূতি – এসব দিয়ে আমাকে প্রচুর আশীর্বাদ করেছিলেন এবং বলেছিলেন ‘আমি সবসময় তোমার কাছে আছি – আমি তোমার কাছে থাকবো, তুমি কোনো চিন্তা করবে না, তুমি অতো চিন্তা করো কেন? এসব চিন্তা করবে না, তোমাকে আমি সবসময় রক্ষা করবো।’
আহসান : সেই রেকর্ডটিই তাহলে শেষ রেকর্ড – সেটি বের হয়েছিল কোন কোম্পানি থেকে?
যূথিকা : গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে।
আহসান : এইচএমভি?
যূথিকা : এইচএমভি। কারণ তখন গ্রামোফোন কোম্পানির অধিকর্তা যিনি ছিলেন, তিনিও সাঁইভক্ত। আমি সাঁইবাবার কাছ থেকে ফিরে এসে – ওখানে যে ভজন হতো – ওই গানগুলো এইখানে যাঁরা ভক্ত তাঁদের কাছে শিখে শিখে বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার সেটা করতাম – মানে বাবার পুজোটুজো করতাম। যদিও আমরা দীক্ষিত বেলুড় মঠের – স্বামী বিরজানন্দের কাছে। তা সেখান থেকে – বেলুড় মঠ থেকে আমাকে খুব বাধা দিয়েছিল যে, ‘তুমি মঠে ঠাকুরের নাম ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারো না। তা তুমি এইটা কেন এতো সাধনা করছো!’ আমি তখন শুনে শুনে ঘরে প্রায় বারো বছর ধরে করে তারপর বন্ধ করেছি। সেটা আমার অসুবিধে ছিল, আমি বন্ধ করেছি।
আহসান : আচ্ছা, আমরা জানলাম যে ছিয়াত্তর সালে – ১৯৭৬-এ আপনার শেষ রেকর্ড বের হলো। এটি ভজনের – সাঁইবাবার ভজন।
যূথিকা : অতি সুন্দর সাঁইবাবার ভজনের সেই রেকর্ডটি। সেটা সাঁইবাবার যখন পঞ্চান্ন বছর বয়স – সেই বছরে আমাদের কমিটি থেকে ওই ভজনের রেকর্ডটি সাঁইবাবার হাতে দিয়ে এসেছিল।
আহসান : এ তো গেল আপনার ভজনের শেষ রেকর্ড। বাংলা গানের শেষ রেকর্ড করলেন কোন সালে?
যূথিকা : হ্যাঁ, কমল দাশগুপ্তের তখন সুরের খুব খরা – তিনি সুর করতে পারতেন না। তার একটা গলস্টোন ছিল। সেটা তিনি অপারেশন করলেন না। মানে তাঁর মা চাইলেন না, সেইজন্য তিনি সেটা অপারেশন করলেন না, তারপর থেকে তিনি আর সুর করতে পারতেন না কোনো। সোজাভাবে দাঁড়াতে পারতেন না – কাঁপতেন। আর সুর করার সময় তাঁর সেই নোটেশনগুলো যেটা আমরা পেতাম – তারপর অন্যরকম হয়ে যেতো। সেজন্যে উনি নিজেই আমাদের গান রেকর্ড করা বন্ধ করেছিলেন। আমার তখন খুব ভালো টাইম। আমি ভালোভাবেই চলছি। এদেশ-ওদেশ ঘুরছি এই ভজন নিয়ে। তারপরে বাংলা গান চাইছে। তখন বন্ধ করতে বাবাও বারণ করলেন যে, ‘তুমি এখনই বন্ধ করলে তোমার আর কোনো কাজ থাকবে না। এখনও তো তুমি ভালো করে গাইতে পারছো। তুমি একটা অন্য রাস্তা নাও।’ কমল দাশগুপ্তের কাছে যখন গান করা বন্ধ হলো, গ্রামোফোন কোম্পানি তখন আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যেই ট্রেনারই চাইবে, আমরা সেই ট্রেনারই দেবো।’ কমল দাশগুপ্ত যখন পারবে না, তখন ওখানে আমি আর কাউকে আনতে পারিনি। আমি তখন অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত – এসব গান করতে আরম্ভ করলাম। সেটা ছোটবেলায় যেসব গান আমি গাইতাম, বাবার কাছে শিখেছিলাম। তা সেই গানগুলো এখানে দিলীপ রায় – রজনীকান্তের নাতি আমাকে একেবারে কারেক্টভাবে শেখাতেন। তারপরে বাংলায় ওই রজনীকান্তের গানগুলো গাইতাম।
আহসান : শেষ বাংলা রেকর্ডটি কবে বের হলো?
যূথিকা : শেষ রেকর্ডটি? গ্রামোফোন কোম্পানি – ওখানকার যিনি রিপ্রেজেন্টেটিভ – তিনি বললেন যে, ‘এই যে যূথিকা, তুমি তো কমল দাশগুপ্তের কাছে প্রচুর গান শিখেছো, ভালো ভালো সুরও শিখেছো, তুমি তো পনেরো বছর ওনার কাছে গান শিখেছো – ভীষ্মবাবুর কাছেও শিখেছো। আচ্ছা, তা এতো বছর শিখে তুমি একটু সুর দিতে পারো না? একটু চেষ্টা করো না! তুমি তো সুর দিয়ে রেকর্ড করতে পারো।’ তা আমি তখন চেষ্টা করতে আরম্ভ করি। আমি কোনোদিন সুর দিইনি। আমি কমল দাশগুপ্তের যেদিন রেকর্ড করেছি সেদিন ছবির মতো সমস্ত লিখে উনি দিতেন – কোন লাইন কতো বার হবে – মানে ভাবতে হতো না – সুন্দরভাবে উনি শেখাতেন। তো সেই যূথিকাকে বলছেন যে, ‘তুমি নিজে সুর করো।’ তাহলে তো সমস্ত দায়িত্ব আমার। ওখানে যে রেকর্ড আমি করবো, সেই রেকর্ডের সমস্ত দায়িত্ব আমার। আবার ভালো করে গাইবো। ভাবলাম তখন, ধরেছে যখন আমি গাইবো, আমি চেষ্টা করি। এই করে আমি দুটো গান রেকর্ড করলাম। প্রণবের না, এটা শ্যামল গুপ্তের লেখা। সন্ধ্যার স্বামী – মারা গেছে।
আহসান : মনে পড়ে গান দুটির কথা?
যূথিকা : হ্যাঁ, ‘দীপ যদি নিভে যায় রাতের ঝড়ে’ – এই গানটা ছিল। আর ওপিঠে কী ছিল আমার ঠিক মনে আসছে না এখন। তারপরে আমি যেগুলো সুর দিয়েছি, উনি গান লিখে দিয়েছেন। এরপরে লিখেছিলেন – ‘আলোর পিছনে ছায়া’ – খুব সুন্দর লিখতেন – ‘রাতের পিছনে আসে দিন অলখ টানে’ – এইটা। আরো দিয়েছিলেন – ‘মন্দিরে নয় সেথায় যাবো প্রাণের কুসুম লয়ে’। এই গানটা দিয়ে শেষ হয়েছিল। তারপরে সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি গানও করেছিলাম।
আহসান : হিন্দি গানেও আপনি সুর করেছিলেন?
যূথিকা : আমি সুর করেছিলাম – ‘আকাশ তলে যব দীপ জ্বলে’ – এটা খুব সুন্দর সুর হয়েছিল।
আহসান : তাহলে আপনি তো বাংলা ও হিন্দি অনেক গানেরই সুর করেছেন এবং সেইসঙ্গে নিজে রেকর্ডও করেছেন –
যূথিকা : নিজেই রেকর্ড করেছি। গানের যেরকম মিউজিক ওই কমল দাশগুপ্ত দিতেন – মানে প্রথমে খানিকটা মিউজিক হবে, মাঝে ছোট ছোট মিউজিক হবে, যেখানে ফাঁক সেখানে কোন মিউজিক দিলে সেটা সুন্দর হবে – সেরকমভাবে আমি খুব ভালোভাবে সাজিয়েছিলাম। ওটাও বেশ ভালো বিক্রি হয়েছিল।
আহসান : তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, আপনি যখন সুর করলেন বাংলা কিংবা হিন্দি গানের – কমল দাশগুপ্তের একটা ছায়া মনে হয় সে সুরের ওপর পড়েছিল!
যূথিকা : হ্যাঁ, এটা ঠিক – এটা তো আমার পড়বেই। আমি তো প্রথম থেকেই উনার সুরে গেয়ে আসছি – আর সেটা পড়বে – পড়েছেও। মানে আমি বুঝতে পারি ঠিক যে, হ্যাঁ এখানটায় পড়েছে। কিন্তু অনেকে কিন্তু সেরকম বলেনি। তাঁরা বলেছেন, কমল দাশগুপ্তের মতো হয়নি তোমার।
আহসান : আসলে কমল দাশগুপ্ত সম্পর্কে একটা কথা বলাই যায় যে, ওঁর সুরে গান জনপ্রিয় হয়নি এমন গানের সংখ্যা খুবই কম। এই যে, কমল দাশগুপ্ত সুর করলে সেটা লোকের মনে গভীর দাগ কাটতো – ভালো লাগতো, জনপ্রিয়তা পেতো – এর মূল কারণ কী বলে মনে হয় আপনার?
যূথিকা : যেটা আমি বললাম, উনি যেটা সুর করতেন সেটা স্বাভাবিক – মানে তাঁর ভেতরেই ছিল। তাঁর দাদাও সুর করতেন। ওঁদের বাড়িটা একটা মিউজিক্যাল বাড়ি – মানে প্রত্যেকেই সুর করে গায়।
আহসান : ওঁর ছোট ভাই সুবল দাশগুপ্ত!
যূথিকা : সে তবলা বাজায়, সেও খুব সুন্দর গায়। সেও সুর করে। আবার সুধীরা – সে হয়তো সুর করবার চান্স পায়নি, কিন্তু গায়িকা অপূর্ব। তাঁর গানটা শুনি প্রথম আমি দেশেতে – সেনহাটিতে ওঁর গান শুনেছিলাম। আর সেই থেকে আমার মনের মধ্যে ওঁর একটা আদর্শ তৈরি হয়েছিল যে, আমি ওঁর মতো করে গাইবো – অতো পরিষ্কার – অতো নিট অ্যান্ড ক্লিন – কাজগুলো অতো সুন্দর হবে, টানগুলো অতো কারেক্ট টান হবে। এসব আমি খুব মনে রাখতাম যে, আমি যদি কখনো গান করি বাইরে, তাহলে আমি ঠিক ওঁর মতো করে গাইবো। এটা আমার মনে একেবারে গেঁথে গিয়েছিল। সেইটা – আমি যেটা মনে করতাম যে আমি এইরকম গাইবো – এই গানটা আমি শিখবো – ওই গানটা ও ভালো গাইছে – ওই গানটা আমি তুলবো – আমার সে আশা পূর্ণ হয়ে গেছে।
আহসান : আপনার গাওয়া গানের ভেতরে – বাংলা গানের কথাই বলি, একটা বিষয় লক্ষ করার মতো যে, একটা রোমান্টিক অনুভূতি – একটা বিষণ্ণতা-বিরহের ছায়া – সব মিলিয়ে গানের কথার সঙ্গে সুরের সহযোগে এবং সবচেয়ে বড়ো কথা তো গায়কি – সেটি অনন্য এক রূপ পেতো। আপনি কী নিজে এই ধরনের গান বেছে নিতেন?
যূথিকা : না, ওটা কমল দাশগুপ্তই দিতেন। ওটা যিনি ট্রেনার তিনিই বুঝিয়ে দেবেন আমার গলায় কোন কথার কোন সুরটা ঠিক ভালো হবে। এটা তাঁর বিশেষ গুণ ছিল ট্রেনার হিসেবে। মানে আমার গলায় কতোদূর যাবে, গলার কাজটা সুন্দর – ওটাকে মার্জিত করলে আরো সুন্দর হবে, আমার গলা কতো নিচে যায়, কতোখানি স্কেলের নিচে যাবে, কতোখানি স্কেলের উঁচুতে যাবে, আর কোন জায়গাটায় গেলে আমার গলাটা সুন্দর খুলবে, সুন্দর লাগবে – সেটা ওনার খুব ভালোভাবে জানা ছিল। তার জন্যে ওনার প্রতিটি রেকর্ড হিট হতো। উনি যেগুলো সুর দিতেন, যার গলায়ই সুর দিতেন উনি – এইটে খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন। আগে গান শুনতেন, শুনে বুঝে নিতেন – বলতেন, ‘একটু গাও তো?’ উনি বুঝে নিতেন কার গলায় সুরটা মানাবে, কতোদূর যাবে, কোনখানটায় কাজটা দিলে ভালো হবে। এইটা ওনার স্বাভাবিক প্রতিভা। যার জন্যে একটা তাঁর সুরে স্পেশাল রেকর্ডটা হতো।
আহসান : অনেক সময় আমরা দেখি – অনেকে বলেও থাকেন যে, একটা অদ্ভুত সংযোগ রচিত হয়েছিল – গান লিখছেন প্রণব রায়, সুর দিচ্ছেন কমল দাশগুপ্ত এবং সেই গানটি গাইছেন যূথিকা রায় – এ যেন গানের ত্রিভুজ। আর এই তিনজনের সংযোগে সেই গানটি অনিবার্যভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অন্যদের বেলায় এইরকম উদাহরণ খুব বেশি দেওয়া যায় না।
যূথিকা : একদম প্রথম থেকে – মানে প্রথম গানের থেকে কিন্তু জনপ্রিয় হয়েছে তাঁর সুর। এটা আধুনিক শিক্ষিত বাইরের লোকে বলে যে, আমি নাকি ওটার ফার্স্ট লাইনআপ্ আধুনিক – আর সেখানে সাকসেসফুলও হলাম। আর যেটা আমার আগে একজন গেয়েছিলেন তিনি সাকসেসফুল হননি, যদিও আধুনিক বলেই গেয়েছিলেন। আধুনিকটা কিন্তু আমাকেই বলে যে, ‘তুমি আধুনিক প্রথম দেখিয়েছ।’ এটার সুরও কিন্তু সৃষ্টি করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত, লিখেছিলেন প্রণব রায়। আমি যখন প্রথম গ্রামোফোন কোম্পানিতে যাই, আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে একটা খুব – যেমন ইন্দুবালা – তারপরে আঙ্গুরবালা – এঁরা যে ধরনের উঁচু ক্ল্যাসিকাল ধারা নিয়ে যেমন গাইছে – আমাকেও কমল দাশগুপ্ত সে-রকম একটা দেবেন। আর সুধীরার কাছেও আমি যেটা শুনেছিলাম – যেটা আমার ভেতরে একেবারে বসে গিয়েছিল, সেটাও আমি ভেবেছিলুম যে, ওঁরই তো ভাই – নিশ্চয় ওই সুধীরার মতো আমাকে বেশ ভালো একটা মজার গান দেবেন। কিন্তু সেটা তো আমি দেখলাম না, দেখলাম আমাদের নামের ওপর গান লেখা। আমি গানটা পড়ে বললাম – ‘এ কী রকম গান? এ যে নামের ওপরে লেখা গান! এতোদিন যা গাইতুম, যেটুকু সময় গেয়েছি, আমি তো এরকম গান কখনো গাইওনি, শুনিওনি। আমি এ গান গাইবো না।’ প্রথমেই আমার সবার সামনে এই কথা। তখন উনি খুব শান্ত হয়ে বললেন, ‘না, আমরা একটু নতুন রাস্তা ধরেছি। আর এটা তুমি যে শাদা কাপড়-টাপড় পরে আসো ওই জন্যে আমরা তোমাকেই বেছে নিয়েছি।’ এইভাবে আমাদের গানের সেই প্রথম ধারা আরম্ভ হয়েছে।
আহসান : ‘ভোরের যূথিকা’ই তো প্রথম রেকর্ড হলো? অপর পৃষ্ঠার গানটি পরে রেকর্ড হলো ‘সাঁঝের তারকা’!
যূথিকা : না, দুটো গানের ওই একটা রেকর্ড।
আহসান : না, আমি বলতে চাচ্ছি যে, প্রথমে তো গেয়েছিলেন ‘ভোরের যূথিকা’ই!
যূথিকা : ‘ভোরের যূথিকা’।
আহসান : আমাদের একটা দুর্লভ সুযোগ আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারছি। সৌভাগ্যও বটে। তো আমরা একটু অনুরোধ আপনার কাছে সবিনয়ে করতেই পারি যে, ‘ভোরের যূথিকা’ একটু গুনগুন করে আমাদের শোনান না?
যূথিকা : দেখুন, আমার আজকে গলা ভাঙা, এতক্ষণ বকবক করলাম। আজকে হবে না –
আহসান : ঠিক আছে। আধুনিক বাংলা গানের একটা নতুন ধারার প্রবর্তন তো আপনার কাছ থেকেই হয়েছে – তাই না?
যূথিকা : সে তো কমলদা এবং কাজীদার জন্যে হয়েছে। তা না হলে হতো না। এই যে নতুন ধারা, নতুন রাস্তা দেখানো – নতুনভাবে সুর করা – এটা কিন্তু ওনারা যদি না থাকতেন, ওনারা যদি না করতেন – তাহলে কিন্তু এটা হওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না। আর কেউ করতে পারতো না। এখনও – এই পর্যন্ত এখনও কারো দেখিনি যে, এই ধারায় তারা গাইছে – এরকম নতুন আরেকটা রাস্তা দেখিয়েছে। এ দেখানো তো আমি প্রথম দেখালাম – দেখাতে পেরেছি।
আহসান : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, সে-কথা তো আজ বাংলা গানের ইতিহাসের অন্তর্গত। তো এইচএমভির কথায় আরেকটু আমাদের জানতে ইচ্ছে করে যে, তখন তো ট্রেনার হিসেবে ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খাঁ সাহেব ছিলেন – তাঁর সঙ্গে কী আপনার কোনো যোগাযোগ বা কোনো আলাপ অথবা এই যে নির্দেশনা লাভের সুযোগ হয়েছে?
যূথিকা : না, আমি কিন্তু জানতামই না যে জমিরউদ্দিন খাঁ এখানে ওই স্টুডিওতে আসেন। আর বললাম যে, আমরা যখন যেতাম আমাদের কারো সঙ্গে কথা বলতে দিতেন না, কারো দিকে তাকাতে দিতেন না, কারো সঙ্গে মিশতে দিতেন না, কোথায় কে আছে তা জানতে দিতেন না। সেইজন্যে ওইসব বিষয় আমি জানিই না। কিন্তু জমিরউদ্দিন খাঁর সুরে এবং তাঁরই নির্দেশনায় আমার ছোট বোন মল্লিকা রায় একটি রেকর্ড করেছিল হিন্দিতে। জমিরউদ্দিন খাঁকে তখন আমি –
আহসান : আপনার আপন বোন?
যূথিকা : হ্যাঁ, সে মারা গেছে। আমার পরের ছোট বোন – মল্লিকা রায় তার নাম ছিল।
আহসান : ক’টি রেকর্ড করেছিলেন উনি?
যূথিকা : একটা – হিন্দি ওই একটাই করেছিল। জমিরউদ্দিন খাঁ খুব সুন্দর – অপূর্ব সব কাজ দিয়ে গেছেন। ওঁর শিষ্য ভীষ্মদেবের কাছে ওঁর যে গান ছিল, সেই গানটিই ওকে শিখিয়েছিলেন – আর সেটা রেকর্ড হয়েছিল। আর তাছাড়া বাংলায় গানটা লিখে নির্মল ভট্টাচার্য – উনি শিখিয়েছিলেন।
আহসান : আপনি তো বাংলা ছাড়াও নানা ভাষায় গান করেছেন, নানা ধরনের গান করেছেন, তো সে সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন?
যূথিকা : আমি যখন প্রথম ওখানে বাংলায় গান করছি তখন কিন্তু ওখানে কোনো হিন্দি বা অন্য কোনো ভাষারই গান হয়নি। এমনকি এই যে, ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, কে.সি. দে হয়তো ফিল্মের গান করেছেন – সেটা না, কিন্তু ওখানে ওসব নিয়ে কোনো আলোচনাও শুনিনি, কোনোদিন রেকর্ডও দেখিনি। এরপর প্রথমে কমল দাশগুপ্ত আমাকে একটা মীরার ভজন শেখালেন, সেই মীরার ভজন যখন দাঁড়িয়ে গেল, পপুলার হলো, ফার্স্ট যখন ‘মীরা কে প্রভু সাঁচী দাসী বানাও’ – এই গানটা বেরিয়ে পপুলার হলো, তখন ওই গ্রামোফোন কোম্পানির থেকে বলা হলো, যতগুলো মীরার ভজন আছে সব যূথিকাকে দিয়ে গাওয়ানো হবে। তা আমাকে দিয়ে মীরার ভজন, এরপর দেখি উর্দু না’ত, কাওয়ালি – এসমস্ত তখন আমাকে ওখানে শিখিয়ে নেওয়া হলো। কিন্তু ভাষাগুলো তখন আমি জানতাম না, পরে আমি হিন্দিটা মাস্টার রেখে শিখেছিলাম। কিন্তু উর্দু আমি তখন অ-আ-ক-খ-র মতো ওইটুকু জানতাম – আলিফ-বে-তে-ছে। বাবার একজন অফিসার ছিলেন, বাবার সঙ্গে কাজ করতেন, তো তাঁর কাছ থেকে আমরা শিখতাম। আমি আর দিদি। তারপর দেখি তামিল – আমার উর্দু গানটা খুব পপুলার হয়েছিল – তো পরপর দেখি খুব উর্দু গান আমাকে করাতেন। আর সেটা যখন আমি মন দিয়ে গাইতাম, দু-একটা তখন ওরাও শুনতো। কিন্তু ওখানে তো মুসলমান – নানা জাত আসতো প্রোগ্রামে – তাদের খুব ভালো লাগতো – মানে খুব অ্যাপ্রিসিয়েট করেছিল। আর মুসলমানেরা একটা সংস্কার থেকে তারা আবার একটা প্রোগ্রামও করেছিল শুধু উর্দু ভাষার গানগুলো করবার জন্যে। তারপরে বলে যে, ‘তুমি ভজনও গাইতে পারো, আমরা ভজন শুনবো।’ কিন্তু উর্দুটা বেশিদিন আমাকে চালাতে দেয়নি গুজরাটিরা – ওরা তো অসম্ভব ভজনের ভক্ত – তারা বলে যে, ‘না, যে ভজন এতো সুন্দর গাইছে, তার আমরা উর্দু গান শুনতে চাই না।’
আহসান : এই রেকর্ডগুলো কারা বের করতেন?
যূথিকা : সব গ্রামোফোন কোম্পানি।
আহসান : এগুলোর রেকর্ডিং কি কলকাতাতেই হতো?
যূথিকা : হ্যাঁ, সব কলকাতায়।
আহসান : আপনি হিন্দি-উর্দু-গুজরাটি ভাষায় তাহলে গান রেকর্ড করেছেন!
যূথিকা : গুজরাটি না, হিন্দি-উর্দু-তামিল।
আহসান : এই তিন ভাষায় – পাঞ্জাবিতে কি করেছেন?
যূথিকা : না, তামিল হচ্ছে ম্যাড্রাসি, ম্যাড্রাসি ভাষায় যখন সিনেমাটা – ফার্স্ট সিনেমায় গান করলাম, তখন হিন্দিতে দুটো গান ছিল। আর দুটো তামিল বইতেও আমি গেয়েছিলাম।
আহসান : আচ্ছা, সেই তামিল ফিল্ম দুটির নাম কি মনে পড়ে?
যূথিকা : ওই একই বই – ওই রতনদ্বীপ। দেবকী বসু রতনদ্বীপ হিন্দিতে করেছিলেন, বাংলায় করেছিলেন, তামিলে করেছিলেন।
আহসান : ও আচ্ছা, তাহলে রতনদ্বীপ ছবিটি তিন ভাষাতেই হয়েছিল আর কী!
যূথিকা : তামিল গান আমি দুটো করেছিলাম – আর হিন্দি গান করেছিলাম – এই কলকাতায় বসেই।
আহসান : আপনি এই উর্দু-হিন্দি-তামিল এসব ভাষায় গান গেয়ে এক সর্বভারতীয় পরিচিতি ও খ্যাতি পেয়েছিলেন এবং এখনো পাচ্ছেন। তো সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
যূথিকা : আমি তো কোনোদিন ভাবতে পারিনি যে, আমি আজ এখানে এসে দাঁড়াবো, যার জন্যে ১৯৭২ সালে আমাকে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধি দিলো গভর্নমেন্ট থেকে। তখন ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর ওই সময় যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন উনি হচ্ছেন – আমার এখন ঠিক মনে আসছে না।
আহসান : ভিভি গিরি সম্ভবত।
যূথিকা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভিভি গিরির হাত থেকে আমি ‘পদ্মশ্রী’ মেডেল নিয়েছিলাম।
আহসান : এই যে গানগুলো আপনি গাইলেন, সারা ভারতবর্ষে আপনার নাম ছড়িয়ে পড়লো – এর জন্যে তো নানা অনুষ্ঠানে আপনাকে বাইরে গিয়ে গাইতে হয়েছে – বাংলার বাইরে গিয়ে। তো সেই সম্পর্কে কিছু বলুন না!
যূথিকা : বোম্বেতে যে আমি গিয়েছিলাম সেই একটা প্রোগ্রামের জন্যে, সেবার তিনটে প্রোগ্রাম আমাকে করতে হয়েছিল এবং আমি যে মায়ের কাছে কথা দিয়েছিলাম আমি আর যাবো না – এই শেষ। তা সেইখানে আমাকে এখনো পর্যন্ত বলে, আমাকে ওরা ডাকে, আবার অনেক প্রোগ্রাম করে, ওখান থেকে সারা গুজরাটও ঘোরায়। আরো অন্য অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। হায়দরাবাদে গিয়েছিলাম। হায়দরাবাদ থেকে বোম্বে, বোম্বে আমার সেন্টার হয়ে গিয়েছিল। বোম্বে ছিলাম – সেখান থেকে একটা গ্রুপ করে আমরা তিন মাস ধরে প্রোগ্রাম করবো এই বলে ইস্ট আফ্রিকায় গিয়েছিলাম সে-সময়। আর এ-ছাড়া সিংহল, ম্যাড্রাস, হায়দরাবাদ – এদিকে বোম্বে, পুনা, নাসিক – ওইদিকে মানে গুজরাটের প্রায় সব জায়গায় আমাকে প্রায়ই ঘুরতে হতো।
আহসান : মানে এইসব জায়গায় আপনার গানের বেশ আদর-কদর হয়েছে।
যূথিকা : আর এখানে আমাদের ভারতের মধ্যে আরো দিল্লি, তারপরে এলাহাবাদ, কানপুর, লক্ষ্ণৌ – এগুলো আমাকে গানের জন্যে ঘুরতে হয়েছে। তারপর গ্রাম-ট্রাম সব আছেই। তারপরে সাঁইবাবার যখন ভজন আরম্ভ করলাম, রেকর্ড যখন বেরুলো, তখনও সব চারিদিক থেকে আমাকেই ডাকা শুরু হলো, সাঁইবাবার ভজন করবার জন্যে লিড করতে হয়েছে। ভজনে একজন লিড করে আর কোরাস হয়। ভক্ত যারা প্রত্যেককে গাইতে হবে একসঙ্গে।
আহসান : তো, এই যে আপনি ধীরে ধীরে গানের জগতে নিজেকে বিস্তারিত করলেন – আধুনিক বাংলা গান থেকে উর্দু-হিন্দি-তামিল ভাষায় গান, ফিল্মের গান, ভজন-ভক্তিগীতি এসব গান যে করলেন – সর্বভারতীয় স্বীকৃতিটা আদায় করে নিলেন, সেটাকে তো দুর্লভ ব্যাপারই বলতে হয় আর কী!
যূথিকা : দুর্লভই। কিন্তু আমি কোনোদিন ভাবতে পারিনি যে, যেই গ্রামটায় আমার জন্ম – সেখান থেকে আমি যে আজকে সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বেরিয়েছি – মানে আমার বাইরে যাওয়ার তেমন সৌভাগ্য হয়নি কিংবা চান্স এসেছে কিন্তু হয়নি, তাহলেও আমি যে এতোটা ভারতবর্ষজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, নানান লোকের সঙ্গে মেলামেশা, নানা ভাষা, নানা তাদের সাজপোশাক কতোরকম যে আমার মনকে একেবারে আনন্দে ভরিয়ে রেখেছে – সে আমি বলতে পারবো না। আমার গ্রাম, তারাও আমাকে ভোলেনি, যেখানে আমি জন্ম নিয়েছি – যেখান থেকে আমি প্রথম গান নিয়ে উঠেছি, সেই জায়গা আজও আমাকে মনে রেখেছে। এইটাই আমার সব থেকে বেশি আনন্দ।
আহসান : আপনি যেসব গান করেছেন, রেকর্ড বেরিয়েছে যে গানগুলোর – যদি বাংলা গানের কথাই বলা হয় – এরমধ্যে সবচেয়ে প্রিয় গান আপনার কোনটি?
যূথিকা : আমার কিন্তু সব গানই প্রিয়। কিন্তু তার মধ্যে দু-একটি গান, যেমন আছে ‘চুপকে চুপকে বোল, ময়না চুপকে চুপকে বোল’ – এই গানটা গুজরাটিদের অসম্ভব প্রিয়।
আহসান : বাংলা গানের কথা বলছি আমরা।
যূথিকা : বাংলা গানের? বাংলা গানের মধ্যে আমার কয়েকটি রেকর্ড আছে কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের, যেমন ওই গানটি – ‘স্বপ্নে দেখি একটি নতুন ঘর’, তারপরে আরো অনেক। যেমন – ‘আমি ঝর্ণাধারা’ – এই বলে একটা গান আছে।
আহসান : এটি কী নজরুলের?
যূথিকা : না, এটা প্রণব রায়ের। ‘সাঁঝের তারকা আমি’। তারপরে নজরুলের – ‘দিনগুলি মোর পদ্মেরই দল, যায় ভেসে যায় কালের স্রোতে’ – এইটি আছে। নজরুলের অনেক আছে। এখন হয়তো আমার ঠিক মনে পড়ছে না। কিন্তু নজরুলের প্রচুর গান আমার প্রিয়। নজরুলের আমার সবচেয়ে প্রিয় গান মানে যতো গান আমি করেছি তার মধ্যে সব থেকে আমার প্রিয় গান – ‘ওরে নীল যমুনার জল’, আর ওপিঠে হচ্ছে – ‘তোমার কালো রূপে যাক না ডুবে সকল কালো মম, হে কৃষ্ণ প্রিয়তম’। এটার যেমন সুন্দর সুর দিয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত তেমনি কাজীদা লিখেছিলেন। কাজীদাকে আমার মা একটু অনুরোধ করেছিলেন – আমি সেটা মাকে বলতে বলেছিলাম যে, ‘আমি আধুনিক গান অনেক করেছি। আমার এখন আর আধুনিক গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আমি ছোটবেলা থেকে ভক্তিমূলক গান ভালোবাসি। মা, তুমি কাজীদার কাছে গিয়ে বলবে যে, রেণু খুব ভক্তিমূলক গান গাইতে ভালোবাসে, আপনি ওকে যদি দুটো ভক্তিমূলক গান লিখে দেন, মানে ছোট মেয়ে গাইবে – সরল-সহজ ভাষায়।’ তা-ও বলেছিলেন মা, ‘সরল ভাষায় যদি দুটো গান রেণুকে লিখে দেন, যূথিকাকে লিখে দেন – সে খুব খুশি হবে।’
আহসান : এই গান দুটি বুঝি?
যূথিকা : হ্যাঁ, আর সেটা কাজীদাকে বলার সঙ্গে সঙ্গে কাজীদা বললেন, ‘ঠিক আছে মা, আপনি আমার বাড়িতে আসুন, আমার যতো গান খাতায় লেখা আছে, আপনাকে দেবো, যে গানই ইচ্ছে সে গান আপনি যূথিকার জন্যে নিয়ে যাবেন।’ তা মা সকালবেলায় উঠে কাজীদার বাড়িতে গিয়েছিলেন। কাজীদার সমস্ত খাতার চারশো-পাঁচশো গান মা বসে বসে দেখে দুটোর সময় বাড়ি এলেন। বাড়ি এলে আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা, কোনো গান নিয়ে এসেছো? কোন্ গানটা? কী গান এনেছো আমাকে দেখাও।’ তখন বললেন, ‘আমার একটা গানও পছন্দ হয়নি।’ আমি বললাম, ‘কী সর্বনাশ, তোমাকে কাজীদা অমন করে দিলেন!’ মা বললেন, ‘ওগুলো বেশি বয়স যাদের তাদের জন্যে। বড়োরা গাইলে ভালো লাগবে।’ তা আমি বললাম, ‘এবার কী হবে?’ তখন মা জানালেন তিনি কাজীদাকে বলেছেন, ‘আপনি যদি নতুন করে যূথিকার গান লিখে দেন, তাহলে খুব ভালো হয়।’ বললেন, ‘ঠিক আছে।’ কাজীদা যে এতো ভালোবাসতেন আর এতো তাঁর প্রাণ ছিল যে, আমাদের তখন কদিনই আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে – যতোটুকু ওই রেকর্ড কোম্পানির ওইখান থেকে। তাতেই তিনি মায়ের পরে এতোটুকু রাগ করলেন না। আমি তো ভেবেছিলাম উনি রেগে যাবেন। রাগ করলেন না, একেবারে শান্তভাবে বললেন, ‘মা, আপনি কিছু ভাববেন না। আমি যূথিকার জন্যে নতুন করে লিখে দেবো।’ তিনি দিন দুই পরেই ‘নীল যমুনার জল’ আর ওই গানটা লিখে দিলেন। আমার তো প্রাণটা একেবারে আনন্দে ভরে গেছে। আর তখন কমল দাশগুপ্তও দুদিন-তিনদিনের মধ্যে সুর দিয়ে দিলেন। মিউজিশিয়ানকে নিয়ে, রিহার্সেল করে আমিও দুদিনের মধ্যে ও গান রেকর্ড করলাম। রেকর্ড করাটাও আমার ভালো হলো। গানটা আমার প্রাণে লেগেছে তো, গানটার রেকর্ডও ভালো হলো। খুব সুন্দর, আমি ওটাকে সব থেকে উপরে রাখি।
আহসান : এই গান দুটি – আপনি যতো বাংলা গান করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বলে আপনার কাছে মনে হয়?
যূথিকা : হ্যাঁ, এই গান দুটি আমার সকলের চেয়ে প্রিয়। তারপরে তাঁর সব গানই আমার ভালো লাগে।
আহসান : গানের সঙ্গে মানুষের জীবনের অনেক সময় মিল ঘটে যায়। যেমন আপনার প্রথম গানটি আপনার নাম দিয়ে রচিত হয়েছিল। তো সেটি যেমন ব্যাপার, আবার অনেক সময় গানের বাণী গায়কের জীবনে, শিল্পীর জীবনে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়, বা তিনি অনুভব করেন সেই গানের ভেতর দিয়ে তাঁর জীবনকে। তো আপনার কী কখনও এইরকম গানের কথার সঙ্গে আপনার জীবনের কোনো মিল ঘটে গেছে?
যূথিকা : না, আমি ওটা খুব বেশি ভাবিনি। তবে শেষের দিকে আমি যখন গাইতাম, আমায় যে গানগুলো দিতেন সে গানগুলো খুব বিষাদের গান। তা আমি তখন চাইতাম না। আমার মনে তখন ভীষণ আনন্দ যে, আমি এতো নানান ভাবে এতো রকমের সুরের গান গাইলাম, আর সেগুলো ভারতের সকলের কাছে প্রিয়ও হলো – তবে আমি কেন এতো বিষাদের গান গাইবো? এটা আমার খুব মনে পড়তো। আর আমার মনটাও তখন খুব খারাপ হয়ে যেতো। শেষ দিকের গান কতোগুলো – প্রথমের না – শেষের দিকের গানের কথা আমার ওইরকম খুব মনকে খারাপ করতো। আর সে গানগুলো আমি গাইতামও – আবার সে গানগুলো খুব সুন্দরও হতো।
আহসান : জনপ্রিয়ও তো হতো!
যূথিকা : হ্যাঁ, জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। কিন্তু সেটা আমার ঠিক প্রাণে লাগতো না। আমার মন তখন চাইতো যে, আমি আনন্দের গান গাইবো। আমি তো সাকসেসফুল, আমি যে রাস্তায় গেছি আমি সফল হয়েছি। আমি কেন বিষাদের গান গাইবো!
আহসান : করুণ সুর আর ভাবের গান!
যূথিকা : হ্যাঁ, সেইভাবেই গাইতাম – করুণভাবেই গাইতাম। আর শিল্পী হলে তাকে সবরকমই করতে হবে – এটাই হচ্ছে নিয়ম। শিল্পীকে সবরকম – আনন্দও করতে হবে, দুঃখও করতে হবে – আবার হাসতেও হবে। সবকিছুই করতে হবে। তো সেইটেই প্রকাশ পেল যে, হ্যাঁ যদি শিল্পী ঠিক হয় তবে সবরকমই গাইবে। কিন্তু ওটা গাইতে আমার একটু খারাপ লাগতো। আর তখন মনে হতো যে, এতো সকলকে আনন্দ দিচ্ছি, এতো আনন্দের গান করছি, সুরগুলোও ভালো হচ্ছে। আমি শুনতাম, আমার হয়তো স্যুট করেছে, আমি তাঁকে হয়তো বলতাম যে, ‘আমি এই গানটা গাইবো, খুব ভালো লেগেছে এই গানটা।’ তখন বলেছেন, ‘না তুমি গাইবে না, অন্য শিল্পীরা তাহলে কী গাইবে!’ তা এতো খুব কঠিন গান – আর হতাশ সুরের গান, যারা না জানে তারা বুঝবে না। আমাকে একটা সুর দিলেন, আবার পাশে হয়তো আরেকটা করলেন – আনন্দের, খুব সুন্দর। ‘আমি যার নূপুরের ছন্দ’ – গানটা কতো সুন্দর – কতো সুন্দর সুর! আমি যখন বললাম, ‘আমি এই গানটা গাইবো। আমার প্রাণ চাইছে আমি এ গানটা রেকর্ড করবো।’ বললেন, ‘তুমি কেন সব ভালো ভালো গান গাইবে? অন্য শিল্পীরা কী করবে? তাদের দিতে হবে।’ এই – এইগুলো আমার শুনতে খুব খারাপ লাগতো।
আহসান : আসলে আপনার জীবনের স্বর্ণসময় গানের জগতে ছিল এবং এখনো ভাবতে ভালো লাগে যে, আপনি পুরোপুরি গান ছাড়েননি – আপনি গানের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। কোনো না কোনোভাবে, পরোক্ষভাবে হোক, বিচ্ছিন্নভাবে হোক, অসংলগ্নভাবে হোক গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।
যূথিকা : এখনও আমি বিচ্ছিন্ন হইনি। কারণ আমি শেখাই। তারা কিছু চায় – ওই কমল দাশগুপ্তের সুরের ভজন, গীত, বাংলা গান – এইগুলোই কিন্তু তারা শিখতে আসে। আমার চর্চাটা থেকে যায়। তারা বলে, ‘ওই গানটা শিখবো, ওই গানটা শিখবো।’ আমি হয়তো সেই গানটা গাইছি না, কিন্তু সেটা আমাকে শিখে নিতে হয় তখন রেকর্ড থেকে। আর সুরের জগতে আমাকে থাকতেই হবে – না থাকলে তো আমি মরে যাবো সেখানে, সেখানটায় তো আমি মৃত। আমি কিন্তু সবসময় চেষ্টা করি, আমার সুরটা যাতে বেঁচে থাকে। এটা আমার নয়, এটা হচ্ছে সকলের এটা আমার দেশের। এই সুরটা – এই ভজন – ওই গীত – মানে গীত আর ভজনের কী তফাৎ সেটা কমল দাশগুপ্ত দেখিয়ে গেছেন। এই জিনিসটা যেন তাদের মনে থাকে, মানে তারা শিখতে পারে যে, হ্যাঁ ভজন আর গীত এক জিনিস নয়। হোলির সময় একরকম সুর, আপনার দেওয়ালির সময় একরকম সুর, বর্ষাতে একরকম সুর। একদম অপূর্ব তাঁর ভাবনা। তা সেই জিনিসটা যাতে বেঁচে থাকে আমি মরে গেলেও – তিনিও গত হয়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সুরটা আমি বাঁচাবার জন্যে – যতোদিন আমার প্রাণ থাকবে আমি সেটা বাঁচাবার চেষ্টা করবো। আমি তাঁর গান এখনও গাই। যখনই গান করি, আমি তাঁর গানই গাই। আবার সেই সুরগুলো তো তাঁরই। আমার সমস্ত রেকর্ড গ্রামোফোন কোম্পানির। কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে কীভাবে ওনাদের একটু ঝগড়া, মানে ঝগড়া না, একটু মনোমালিন্য হয়েছিল, তাতে গ্রামোফোন কোম্পানি আমার সমস্ত রেকর্ড ক্যানসেল করে দিলো। তখন ওরা করলো কী, না আর রেকর্ড থাকবে না, এবার আমরা ক্যাসেট করবো। ক্যাসেট-যুগ পড়লো – সব ক্যাসেট। কিন্তু আমার গান একটাও হচ্ছে না, বুঝলেন? আম

শেয়ার করুন

১ thought on “ভোরের যূথিকার সঙ্গে আলাপ

Leave a Reply