মহাশ্বেতার সাহিত্যস্বভাব

লেখক:

শহীদ ইকবাল

কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-এর ১৪ জানুয়ারি থেকে ২০১৬-এর ২৮ জুলাই)। তাঁকে আমরা চিনি হাজার চুরাশির মার কল্যাণে। পরে ক্রমশ আরো পরিচিতিতে বাঁধে চোট্টি মু-া এবং তার তীর, অরণ্যের অধিকার আর অনবদ্য চরিত্র রুদালি, টেরোড্যাকটিল প্রভৃতির মাধ্যমে। কী আছে এসব রচনায়? নিম্নবর্গীয়/ দলিত/ সাবঅলটার্ন মানুষের সংস্কৃতি, তাদের সংগ্রাম ও দ্বন্দ্বের ধ্রুপদী গাথা। তার রূপকার তিনি। তাই তো মহাশ্বেতা বলেন, ‘I have always believed that the real history is made by ordinary people. I constantly come across the reappearance, in various forms, of folklore, ballads, myths and legends, carried by ordinary people across generations…’ এমন লক্ষ্য-নির্দিষ্ট তাঁর শিল্প। তাঁর গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। কার্যত, মহাশ্বেতার রচনায় ব্যাপকভাবে অনুরুদ্ধ হয়েছে এই
উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্ব।

মহাশ্বেতা দেবী বাংলা ভাষার প্রবীণ লেখকদের অন্যতম। সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন ভারতের জ্ঞানপীঠ, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণসহ আরো নানা পুরস্কার। এ-নারী অ্যাকটিভিস্ট স্বপ্ন দেখেছেন আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদার। মানুষের স্বপ্নে হয়তো আবেগ থাকে, মোহান্ধও হন অনেকে; কিন্তু মহাশ্বেতা তা হননি। তিনি ঠিক উলটো। যা বলেছেন – তা করেছেন, পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে কাজ করেছেন। মাঠে গেছেন। মিশেছেন সবার সঙ্গে। একাকার হয়ে গেছেন। প্রসঙ্গত, কলেস্নালের কবি ও নাট্যকার মনীশ ঘটক (যুবনাশ্ব) তাঁর বাবা, নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য স্বামী আর কবি নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর একমাত্র সন্তান (যিনি দুবছর আগে প্রয়াত হয়েছেন) এবং বাংলা চলচ্চিত্রের আইকন ঋত্বিক ঘটক তাঁর কাকা। এমন লেখক-পরিবারে জন্মে মহাশ্বেতা অধিক জীবনঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতি ছিলেন তুমুল দায়বদ্ধ। নিছক শিল্পচর্চা তাঁর কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। শিল্পকে তিনি সমাজের প্রয়োজনে, অভ্যন্তরীণ সংগ্রামী-শক্তির উৎস হিসেবে দেখেছেন। এবং সেভাবেই কাজ করেছেন। তাঁর লেখায় ওই মানুষরাই এসেছে, সংঘবদ্ধভাবে। আদিবাসী, প্রান্তিক বা নিম্নবর্গীয় সব শ্রেণিহীন মানুষ তারা। যারা তাঁর প্রেরণার উৎস। কার্যত, তাদের শক্তিকেই তিনি শিল্পিত রূপ দিয়েছেন।

 

দুই

দে’জ পাবলিশিং কলকাতা মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র বের করেছে কুড়ি খ–। তাতে উপন্যাসের সংখ্যা মেলে ৫৯। গল্প অনেক। নানা রকমের গদ্য আছে এতে। মহাশ্বেতা লিখেছেন বেশুমার। তাঁর রচনার উচ্চতা শুধু অসামান্য বললেই চলে না। প্রচুর পড়াশোনা, দৈনন্দিন পরিশ্রম আর দায়বদ্ধতার নিষ্ঠায় গড়ে উঠেছে তাঁর শিল্পসত্তা। এজন্যে তিনি কোনো আপস করেননি। বলেছেন : ‘আমি লিখতে লিখতে লিখতে শিখেছি’ এবং ‘আমি কোথাও পৌঁছতে চাই বলেই পথ হাঁটছি’। জীবনকে সঁপেছেন তাঁরই আদর্শে ‘প্রয়োজন’ আর ‘অস্তিত্বে’র নিরিখে। প্রশ্ন ওঠে, কেন তিনি ঝাঁসীর রাণী (১৯৫৬) লিখবেন? ১৮৫৭-এর ইতিহাস তো নানা শ্রম্নতি আর স্মৃতিতে গড়া। এই ফাঁদ তাঁকে টানলো কেন! আরো পেছনে বর্গির ইতিহাস তো আরো রহস্যে ঘেরা। প্রায় সবটুকুই রূপকথা-লোককথার চাদরে মোড়ানো। তাতে আগ্রহ কেন! শুধু আগ্রহ নয়, প্রস্ত্ততি নেন তিনি। পড়তে গিয়ে ধন্দে পড়েন। বিপরীতে যুক্তিও গড়েন। কয়েক রকমের ইতিহাস পঠনে পাঠ-আয়ত্তে আনেন। খুঁজে বের করেন রাজবৃত্তের আড়ালে কীভাবে ঢাকা পড়ে আছে গণবৃত্তের ইতিহাস। তাঁর ঝোঁক তৈরি হয়। কারণ, তিনি তো রাজার যুদ্ধ-বিবাদ আর ক্ষমতার ইতিহাস তৈরি করতে বসেননি। রাজার প্রতিপক্ষ কারা ছিল? বা রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে প্রাণ যাওয়া ‘উলুখাগড়া’ইবা কারা! বিস্ময়করভাবে পর্যুদস্ত ওই দলিত শ্রেণির জীবনবৃত্ত। তাদের কথা কেউ জানে না! তাদের নাম-নিশানা কোথাও নেই। শুধু খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়ালোর ইতিহাস বলা হয়েছে। কে এরা? এদের শ্রেণিই বা কী? এভাবে প্রশ্নের ভেতর দিয়ে মহাশ্বেতা নিজেকে ভাঙেন, তৈরি করেন, গড়েন। বিস্তর বুদ্ধি আর চিন্তাশক্তির নিষ্ঠায় তিনি একের পর এক গণবৃত্তের মানুষের ইতিহাসে হাত দেন। তবে স্মর্তব্য, মহাশ্বেতা প্রথানুগ ইতিহাসকে একপ্রকার বাতিলই করে দিয়েছেন। কিংবা ‘ঐতিহাসিক উপন্যাসে’র নির্ধারিত সংজ্ঞাকেও আমলে নেননি। তিনি পুরাণ-শ্রেণি-অঞ্চল-লোকশ্রম্নতি-লোকসংস্কার-প্রত্নবীক্ষণের ভেতরে সমাজ-অর্থনীতির বিবর্তিত ধারাকে অনুসন্ধানের প্রয়াস পান। সেখানে কখনো নর্তকীর ইতিহাস, কখনোবা সার্কাসশিল্পীদের জীবনধারা বা ভঙ্গুর সামন্ত সমাজের চিত্র কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত – আবার কখনোবা অধিক অপরিচিত গণমানুষ, দলিত শ্রেণি তাঁর কাঙিক্ষত চরিত্র হয়েছে। কার্যত, সমাজ-মানুষের ধারাটি চিহ্নিত করাই তাঁর লক্ষ্য। বিষয়বস্ত্তও সেভাবে নির্ধারিত। এ-লক্ষ্যে তিনি শিল্পভাষা তৈরি করেন।

শিল্পবিচারে মহাশ্বেতার কথাশিল্প ত্রম্নটিমুক্ত বলা যাবে না। তবে অনেক রচনার ভেতর থেকে আঁধার মানিক, হাজার চুরাশির মা, অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মু-া এবং তার তীর ধ্রম্নপদী শিল্প বলা যায়। ‘A novelist can only begin to explore the value of human experiences by developing the characters of the story.’ মহাশ্বেতা চরিত্র সৃজন করেছেন ইতিহাসের ভেতর দিয়ে। সেক্ষেত্রে ইতিহাসই কখনো চরিত্রে পরিণত হয়েছে আবার ইতিহাস পস্নটও গড়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে ‘The period of the rise of the novel as a literary form has also been the period of really great experimentation with, and development of, techniques in the management of point of view’ – মহাশ্বেতার রচনার দৃষ্টিকোণটি এ লক্ষক্ষ্য পরিস্রুত হয়। দায়বদ্ধ শিল্পী হিসেবে উত্তর-উপনিবেশ ধারণার একটি বড় অংশ গ্রহণ করতে সামর্থ্য হন তিনি। সেখানে নিম্নবর্গের ইতিহাসও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। গ্রামসি কিংবা স্পিভাক তত্ত্ব সরাসরি বিশেস্নষিত হতে পারে তাঁর কথাসাহিত্যে। কেন্দ্র-প্রান্ত, ধনী-দরিদ্র,
ছোট-বড়, শোষক-শোষিত দ্বিবাচনিক স্বরও তীব্রভাবে সম্বন্ধ সৃষ্টি করে। সেক্ষেত্রে বাখতিনের তত্ত্বও প্রয়োগযোগ্য। আদিবাসী জনসংস্কৃতির যে-রূপ তাঁর লেখায় অনিবার্য তা বিচিত্রগামী, এ-পাঠে। আর মার্কসবাদ তো বটেই। বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদ তথা বিশ্বায়নবিরোধী দৃষ্টিকোণটি তাঁর উপন্যাসে অধিক তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে।

 

তিন

মহাশ্বেতার প্রথম গ্রন্থ ঝাঁসীর রাণী। এটি জীবনীগ্রন্থ। গ্রন্থটি সম্পর্কে তিনি বলেছেন : ‘এ গ্রন্থ প্রচলিত অর্থে ইতিহাস নয়, রাণীর
জীবন-চরিত লেখার প্রয়াস মাত্র।’ ইতিহাসের প্রতি আনুগত্য থেকেই তিনি এ-গ্রন্থ রচনা করেন। ‘ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে যায়’ – এই তাঁর লেখক-প্রত্যয়। ‘লেখক মহাশ্বেতা দেবী থেকে কর্মী-লেখকে পরিবর্তিত হয়ে ওঠার উৎসে তাঁর এই ‘অন্য’ ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধতাকে বুঝে নিতে হবে আজ। ঝাঁসীর রাণী-দ্রৌপদী-স্তনদায়িনী কিংবা আঁধার মানিক-বাসাই টুডু-হাজার চুরাশির মা-অরণ্যের অধিকার ইতিহাসের কাছেই তাঁর দায়বদ্ধতা।’ এমন উলেস্নখনীয় আখ্যানের বৈচিত্র্যের খাঁজেই গড়া ইতিহাস। তাঁর অনেক রচনাতেই হয়তো ইতিহাস আছে কিংবা একই ইতিহাসে হয়তো গড়ে উঠেছে অধিক চরিত্র। আরো একটি কথা স্পষ্ট করা যায়, ‘লোধা-শবর-সহিস-কিরিবুরু-সাঁওতাল-হরিজনদের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশকথা।’ – এই দেশকথাই তাঁর কাঙিক্ষত সৃজিত শিল্প, সন্দেহ নেই।

ইতিহাস কী? তা কি শুধুই রাজারাজড়াদের বিবাদ-বিসম্বাদ? তা নয়। মহাশ্বেতা বলেন : ‘ইতিহাসের ধারায় শিক্ষিত হতে হলে একজন বিবেকবান শিল্পীকে জানতে হবে সেই অঞ্চলের ভূগোলকে, সমগ্র মানব-সমাজকে, তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক পরিম-লকে।’ – এই ইতিহাসই শিল্পের উপলক্ষ। তবে প্রকৃত লেখক তো আটকে থাকেন না কোথাও। তিনি যুঝতে-যুঝতে চলেন। তাতে তাঁর যাথার্থ্য প্রকাশ পায়। পথরেখা তৈরি হয়, বিবর্তনের চাঞ্চল্যরেখাও ধরা পড়ে। শ্রেণিস্বার্থ, শ্রেণিসমাজ, আর্থ-সমাজ, ব্যক্তি-মনস্তত্ত্ব, আদিবাসী সমাজ, দারিদ্র্য, সংগ্রাম-আন্দোলন জনসংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় এমন বহু উপাদান উপলভ্য হয়ে ওঠে – এরূপ প্রস্তাবনায়। ষাটের দশকে মহাশ্বেতা দেবী অনেকটাই বিচিত্রমুখী, ‘দ্রোহচিহ্ন’ গল্পে যতটা ধরা পড়ে উপন্যাসে ততোটা নয়। ‘নিশি’ গল্পে দেখা যায় – কুসুম বলছে, ‘তোর নিঃশ্বাসে, তোর চোখে বিষ আছে। আমার ভয় করে।’ আবার ‘শকুন’ গল্পেও আছে কীভাবে দরিদ্র মানুষকে শকুনের চেয়েও হিংস্র ও ঘৃণ্য করে তোলা যায়। তবু সমালোচক ইরাবান বসুরায়কে প্রাসঙ্গিক করে বলা যায় : ‘প্রথম থেকেই মধ্যশ্রেণীর পরিচিত গ–কে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। ‘নটী’র ইতিহাসাশ্রিত তীব্র উত্তেজক পরিস্থিতিতে ছিল এক নর্তকীর কথা। মধুরে মধুর উপন্যাসটি তৈরি হয়েছিল নৃত্যশিল্পীদের নিয়েই।… উপন্যাসের চরিত্রগুলো মধ্যশ্রেণীর ‘ভদ্রলোক’ নয়, তাই তাদের প্রবৃত্তি, তার  প্রকাশে কোনো পালিশ নেই।’ তাই তো সার্কাস এরিনার জীবনে মনোহর ও প্রেমতারার প্রেম কীভাবে প্রতিরোধের বাঁক পেরিয়ে সত্যিকারের বাস্তবতা সিদ্ধি পেল – যেখানে নর-নারী সম্পর্কের তীব্রতার আকুলতাই জয়ী হলো : ব্যান্ডের ঝমাঝম্ বাজনা আর ভোর-রাতে রাউটির বাঁশি আর কোনোদিন ভুলিয়ে নিয়ে যাবে না সার্কাসের মেয়েকে। জীবনে বাঁচার নিশানা পেয়ে গেছে প্রেমতারা।

তারার আঁধারের যে নায়ক, তার জীবনের বিরাট ট্র্যাজেডির মধ্যে আছে একটা আঙ্কিক গোলযোগ। লেখকের কথায় : ‘প্রয়োজন’ ও ‘অস্তিত্বে’র বে-হিসেব। ‘এই হিসেব অনেকটা অর্থনীতির ‘ডিম্যান্ড’ ও ‘সাপস্নাই’য়ের মতো। মেপে-মেপে, ভেবে-ভেবে চলতে হয়। নইলে জীবনের জটিলতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।’ বিজয় দাশের ‘নার্সিসাস কমপেস্নক্স’ নিয়ে উপন্যাসটি রচিত। তবে শেষ পর্যন্ত বিজয়ের আত্মহত্যা অতিনাটকীয়। বিজয় দাশের পরিণতি তেমন শিল্পসফল মাত্রা পায় না। যেভাবে সে নির্বিকল্প-অসিস্ত ধারণ করে বাস্তব জগতে তা শুধুই তোষামোদী আর ভ্রান্তিতে ভরা। মেলাতে পারে না নিজেকে। অথচ বিপরীতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব তাকে উধাও হয়ে ধায়। এই শূন্যতার পরিণতিই এক অর্থে তার আত্মহত্যা। বিষয়ের ভিন্নতায় এটি তৃপ্তিকর উপন্যাস, একপ্রকার বাস্তবিক নতুন চরিত্রের অন্বেষণও বটে। কিন্তু ট্রিটমেন্ট দুর্বল। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে লেখা আঁধার মানিক (১৯৬৭) গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। এটি ভূমি মাটির সুপিনদ্ধ স্পন্দন। কালপ্রবাহের গতির যে শক্তি তা স্পষ্ট – কারণ, পিপাসার জল তো সাজানো পাত্রের জিনিস নয়, তা মাটির জলেই থাকে; তাই তো আঁধার মানিকের স্পন্দন এতো উজ্জ্বল আলোকময়। বর্গির অত্যাচার, রাজার লড়াই, জয়-পরাজয়ের বিবরণ কত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের তারে দৃঢ়ভাবে বাঁধা। নির্মম ইতিহাস শুধু বাজুবন্ধের ধ্বনি, তলোয়ারের রক্তাক্ত খাপের আলেখ্য বয়ন করে; কিন্তু সাধারণ প্রজার শোষণ-নিপীড়ন কিংবা শ্রম-শ্রেণির ইতিহাস বর্গির অত্যাচার অশ্বক্ষুরে ভূলুণ্ঠিত। তাই এটি ‘লোকবৃত্তের ইতিহাস। – কলকাতাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবন গড়ে ওঠার প্রাক-মুহূর্তের ইতিহাস।’ এর ক্যানভাস বড়। কাহিনির কেন্দ্র বর্ধমানের আঁধার মানিক গ্রাম। সমালোচক বলেছেন, ‘আঁধার মানিক গ্রামের কয়েকটি পরিবার দিয়ে যে কাহিনীর শুরু, তার বৃত্ত বড় হতে হতে ধরে ফেলেছে মেদেনীপুর থেকে মুর্শিদাবাদ, নগণ্য রামাই বাগদী থেকে নবাব আলিবর্দী, সুরাট সওদাগর থেকে ওলন্দাজ, ফরাসী, ইংরেজ কুঠিয়াল। তাদের সবাইকে বেঁধেছে একটিই সূত্র, বর্গী।’ বিস্তর ইতিহাসের পাখায় এর কাহিনি বিচিত্রগামী। বাগদীপাড়ার রামাই, আনন্দীরাম মুখোটি, সংসার-বৈরাগী সুরকণ্ঠ এর প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র। বর্গি আক্রমণে রামাই আহত হলে বউ পারী ধর্ষিত হয় আর আচার্যের কিশোরী কন্যা নির্মলার কোচড় থেকে স্বর্ণালঙ্কার লুট হয় – ফলে স্পর্শদোষে নির্মলা (যত উচ্চবংশীয়ই হোক) নিস্তার পায় না। তপ্ত ঘৃতপানের বিধান মানতে হবে। কিন্তু এতে তো মৃত্যু অবধারিত। তাই কৌশলে নির্বাসন দেওয়া হয়। এদিকে আনন্দীরামের স্ত্রী ফুলেশ্বরীর জীবনে সুরকণ্ঠ কীভাবে এলো জানে না। এবার সে পালাতে চায়। কিন্তু রেহাই নেই, কারণ সমস্ত বাংলার পথে-পথে এখন তারই ডাক। কারণ, যে গেরুয়াবসন বিন্যস্ত তার শরীরে – সেখানে পথের সবাই তার কাছে মুক্তি চায়। এদিকে তখন চার্চে বসে ফাদার আন্তেনিয়ে ডায়েরিতে লেখেন, এ তো যিশুর জন্মের আগের ইস্রাইলের কাল। ‘এক্সোডাস’। মানুষ ছুটে চলে তখন কলকাতার দিকে, গঙ্গা-যমুনা কিংবা জাত-পাত-শ্রেণিভেদ আর থাকে না। সবকিছু মিলে সবাই বাঁচতে চায়, চায় ‘নতুন আশ্রয়, নতুন যুগের সন্ধান।’ বর্গি হানার ইতিহাস চমৎকার মুনশিয়ানায় বুনে দেন লেখক। বুদ্ধির চাকচিক্য আবেগের লাটাইয়ে অনুরুদ্ধ হয়ে ব্যঞ্জনা দেয়। পেয়ে চলে ভিন্নমাত্রা। লেখকের এ-অনালোকিত ইতিহাসে প্রকোষ্ঠে ঢোকার পরিশ্রমটুকুতে যেন আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। অবশ্যপাঠ্য ও অনবদ্য এ-ইতিহাস গ্রন্থটিতে বর্গি আক্রমণের প্রেক্ষাপট ধরে বেরিয়ে আসে জনসমাজের কাহিনি। এ যেন রাজবৃত্ত থেকে লোকবৃত্তের ইতিবৃত্ত তৈরির পথরেখা। প্রসঙ্গত, লোকসমাজ এতে শিল্পিত হয়, জীবনের উৎসবকে অবলম্বন করে। এ উৎস কার? বেসরকারি জনতার। প্রান্তিক, আদিম, বঞ্চিত মানুষের। যাদের শ্রমে-হাহাকারে রচিত উচ্চবর্গের নহবতখানা। লেখকের দৃষ্টি প্রান্তে (periferal)। প্রান্ত তো অনেক উপাদানে উৎসবপ্রবণ। লোকাচার-সংস্কার-সারল্য-কিংবদন্তি আর রোমাঞ্চরসে ভরা তাদের কাহিনি। এতেই তাদের উৎসারণ ও ক্রমবিকাশ। তাই তো বাখতিন বলেন : ‘Carnival against Capital, Carnival against Power’। ১৯৬৭-তে লৌকিক কবি মুকুন্দরামের জীবন নিয়ে লেখা ভিন্ন ফর্মের উপন্যাস কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু। স্মর্তব্য যে, ‘Every age and culture has its characteristic narrative forms’ – ভীমাদল, নিদয়া অরণ্য, রাজা গর্গবল্লভ, চুয়াড় উপজাতি, কবি বন্দ্যঘটী ও ফুল্লরা সকলেই (associative rythm) মিথ বা পুরাণকথার বাসিন্দা। ‘গোলকশুঁড়ি তার শুঁড়িখানায় বসে এখনও গল্প করে থাকে’ – এই গল্পের কিংবদন্তিই উপন্যাসের বিন্যস্ত পস্নট। আদিবাসীর আদিম সংস্কৃতি ও আচারের অভীপ্সা উপন্যাসে ইতিহাসের গুরুত্বকে নতুন সংজ্ঞার্থ দান করে যেখানে ‘the why and how of the people’s evolution’।

 

চার

ষাটের পর মহাশ্বেতার স্বভাবসিদ্ধ পরিবর্তনটি লক্ষণাক্রান্ত হয়ে ওঠে। যে-পঞ্চাশ থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু সেটি ষাটে একপ্রকার বিশেষত্বপ্রবণ; নিম্নবর্গীয় চরিত্র-নির্মাণ তথা ইতিহাসের ধারাবাহী আদিবাসী প্রান্তজনের লৌকিক জীবনাচরণে তা পুনর্গঠিত – তীব্রতর, গুরুত্বপূর্ণও। মহাশ্বেতার লেখকপ্রবণতাও ষাটেই চিনে নেওয়া যায় – প্রতিরোধ, শ্রেণিচেতনার উচ্চনাদী দ্রোহচেতন স্বরে। যেটি সত্তরে এসে আরেকটি পর্যায়ে উপনীত। কর্মে-তত্ত্বে চিন্তায় একপ্রকার বুঝে নেওয়ার পালা চলতে তাকে। সেই ফলশ্রম্নতি সত্তরের মাঝামাঝি পাওয়া যায়। লেখা হয় নকশাল নিয়ে হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪)। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন :

লিখেছিলাম এক অরাজনীতিক জননীকে নিয়ে, যার সঙ্গে তার ছেলের সম্পর্ক এমনই, ছেলেকে পেয়ে ও নিজেকেও খুঁজে পায়। সুজাতা মানুষ হিসেবে এমন যে, সংসারের অবমাননাগুলির প্রতিবাদ চেঁচিয়ে করে না, নীরব থেকেই বুঝিয়ে দেয় ওই কুৎসিত আচরণে ওর এসে যায় না কিছু। ব্রতী ব্যতীত অন্যদের বেলা সুজাতার ভালোবাসার চেয়ে কর্তব্য পালনটাই বেশি। সুজাতার নীরবতা, ওর অন্তরের আভিজাত্যপূর্ণ উপেক্ষা। এবং রাজনীতিক মানুষও ও নয়। অরাজনীতিক এক মা, যার ছেলে রাজনীতি করতে গিয়েই মারা যায়। তারপর তো সন্তানের বিষয়ে সুজাতার প্রথম আঘাত, ছেলেকে ও চিনত না। ব্রতীরা কেন মরে – এই ‘কেন’ জানতে গিয়েই সুজাতা নিজেকেও আবিষ্কার করে। এই সুজাতা অন্তরে নিঃসঙ্গ ছিল। ব্রতী ওকে মানুষের হাটে এনে দিয়ে যায়। ‘হাজার চুরাশির মা’ সেই মায়ের কাহিনী।

হাজার চুরাশির মা একজন ‘মা’ (সুজাতা)-এর গল্প। যার পুত্র (ব্রতী) [মর্গে লাশ নম্বর ১০৮৪, নকশালবন্দির নম্বর] শ্রেণিশত্রম্ন খতমের ‘আদর্শে’র কারণে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত। পার্টির প্রতিবিপস্নবীর পরিণতি এ মৃত্যু। কাহিনির শুরু ব্রতীর মৃত্যুবার্ষিকীতে, যেখানে সুজাতার স্মৃতিতে ব্রতী ফিরে আসে, জন্মমুহূর্ত থেকে। সুজাতা ব্রতীকে মাতৃত্বের স্নেহ দিয়ে চিনতে চায়, বিচার করতে চায় তার বিপস্নবী মানসিকতার কারণসমূহ খুঁজে দেখে। গল্পের ভেতর দিয়ে প্রতিরোধী ও ন্যায়শীল ব্রতীর চর্চায় সে এক ‘যৌক্তিক মা’তে পরিণত। জনতার পক্ষে, ন্যায়সত্যের পক্ষে ছেলের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী করে বর্তমান ‘শুষ্ক গণতন্ত্রকে’ – যেখানে অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারিতাকে সমাজের অধিকাংশই প্রশ্রয় দেয়, সমর্থনও করে। মা হিসেবে সুজাতা উপন্যাসে কাহিনির কেন্দ্র (Protoganist), যেখানে সে নিজেকে পুনরুদ্ধার করে। এক মানবিক মুহূর্ত তৈরির ভেতর দিয়ে ‘রাষ্ট্রের মা’ হিসেবে দৃশ্যমান হয়। তরুণ প্রতিবিপস্নবীদের অস্থির ও রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক শক্তি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কর্তৃক নিষ্ঠুরভাবে দমনের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের বিপরীতে এক জাতীয় মাতৃমূর্তি এই হাজার চুরাশির মা। বেশ ভিন্ন স্বরে উপন্যাসের পস্নট নির্মিত। ‘মা’ ‘রাউন্ড ক্যারেকটার’ হয়ে ওঠে। পরিসর ছোট হলেও উপন্যাসটি বিপুলায়তন প্রবাহে যুক্ত হয়ে পড়ে। একজন নারী অনেক স্তরের ভেতর দিয়ে সম্মুখে এগোয়। কন্যা-জায়া-জননীর সর্বংসহা মূর্তি তৈরি হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রতিরোধগুলো স্বীকার করে নিতে হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবমূল্যায়ন, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গে’র ধারণা, কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা সুজাতার ‘মাদারহুড’ সত্তাকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করে। সে বলেছে : ‘গাঢ়, যেন কফবসা গলায় জিগ্যেস করেন দিব্যনাথ। কামনায় অস্থির হলে ওঁর গলায় যেন কফ জমে থকথকে হয়ে যায় স্বর। সুজাতা জানেন দিব্যনাথকে। দিব্যনাথ তাঁর শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নেবার একটি অর্থই হতে পারে।… তিনমাস পর আবার সুজাতা ব্যাংকে যেতে শুরু করেন।… সত্যি বলতে কি, তাঁর ছেলে এমন কলঙ্কিতভাবে মরেছে, এই খবরটা ঢাকবার জন্য জ্যোতির বাবা দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।… সেদিন ব্রতীর সঙ্গে সঙ্গে সুজাতার চেতনায় ব্রতীর বাবারও মৃত্যু ঘটে।…  ব্রতীর খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে সুজাতা ভুরু কুঁচকে ভাবতে চেষ্টা করেছিলেন, ব্রতীর হত্যার পেছনে তাঁর কি পরোক্ষ অবদান ছিল? কিভাবে তিনি তৈরি করেছিলেন ব্রতীকে যেজন্যে এই দশকে, যে দশক মুক্তির দশকে পরিণত হতে চলেছে সেই দশকে, ব্রতী হাজার চুরাশি হয়ে গেল! অথবা কী করতেন তিনি, অথচ করেননি বলে ব্রতী হাজার চুরাশি হয়ে গেল? কোথায় সুজাতা ব্যর্থ হয়েছিলেন?’ আর রাষ্ট্র? উপন্যাসে আছে :

ব্রতীর জন্য কাঁদতে কাঁদতেই জ্যোতি ও দিব্যনাথ তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, এ সমাজে বড় বড় হত্যাকারী, যারা খাবারে-ওষুধে-শিশুখাদ্যে ভেজাল মেশায় তাঁরা বেঁচে থাকতে পারে। এ সমাজে নেতারা গ্রামের জনগণকে পুলিসের গুলির মুখে ঠেলে দিয়ে বাড়ি-গাড়ি পুলিস পাহারায় নিরাপদ আশ্রয়ে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু ব্রতী তাদের চেয়ে বড় অপরাধী। কেননা সে এই মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের সমাজে বিশ্বাস হারিয়েছিল।

মা-ও তাই বলেছিল। এমন প্রশ্নের ভেতর দিয়ে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে একজন মা গড়ে ওঠে। সে পরিবারে ও ব্যক্তিতে, ব্যক্তি ও সন্তানে, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রে, ব্যক্তি-ব্যক্তিতে – রোধ-প্রতিরোধে, সত্য-অসত্যে, ন্যায়-অন্যায়ের দৃষ্টিকোণে সংশেস্নষিত। লক্ষ্য ‘মা’রূপে। সীমাবদ্ধতা ও সংকটে মা-র ভূমিকা, সন্তানের প্রতি স্নেহ-মমতার
তৃপ্তি – যেখানে স্বামী দিব্যনাথ এক ‘পুরুষ’। উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রশ্নশীল মা কমিউনিস্ট নকশাল মুভমেন্টে নিহত পুত্রের ভেতর দিয়ে সমাজ ও পরিবারতন্ত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকে চিহ্নিত করে। প্রশ্নের মাঝে উস্কে দেয় আত্ম-অসিস্ত, আত্মগ্লানি ও বিবমিষা।

প্রতীকী চারটি অংশে চিহ্নিত হাজার চুরাশির মা : ‘In the first chapter, significantly titled ‘DAWN’ (‘সকাল’), Sujata primarily returns to her interior, private world of personal suffering, torture, betrayal and loneliness. Negotiating the inner time in relation to her immediate familial situation,  she becomes aware of how she and Brati were not just fellow suffers but also soul mates.’ দ্বিতীয় অংশ ‘দুপুর’, এখানে প্রধান ঘটনা সমুর মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ – যেখানে মৃত্যুর আগে সে অবস্থান করছিল, এবং সমুর মা ও সুজাতা একই পরিণতির অংশ। সমুর মায়ের ভেতর দিয়ে সুজাতার অন্য একটি অংশ খুলে যায় – দরিদ্র, ডিগ্রেডেশন, সাব-হিউম্যান ধারণা ইত্যাদি। তৃতীয় অংশ ‘বিকেল’ – যেখানে সুজাতার সাক্ষাৎ হয় নন্দিনীর সঙ্গে। ‘It is Nandini who reconstructs for Sujata all the events leading up to Brati’s betrayal and murder… It’s through Nandini that Sujata is finally able to understand the reasons for Brati’s political convictions and his rejection of the bourgeoisie code.’ কার্যত এ-সমাজের আমরা কেউই ‘didn’t really know Brati’। শেষ অংশটি ‘সন্ধ্যা’। এখানে পরিবর্তিত মাতৃত্বের এক মূর্তিমান রূপ স্বতঃচাঞ্চল্যে সুনিপুণ। সে নীতিগতভাবে আত্মবিশ্বাসী এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। কারণ, ব্রতী যেখানে নেই সেখানে সে শূন্য, অবমূল্যায়িতও। মৃত্যুর পরও সে অবহেলিতই থেকে যাবে – ওই ‘পুরুষ’ দিব্যনাথের সংসারে। আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সুজাতা তার ডিক্লাসড, সাপ্রেসড – সে অবস্থা থেকে মুক্তির প্রশ্নটি উপন্যাসে গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে – যদিও পুত্র ব্রতীই তার প্রধান আবেগবিন্দু। একজন ‘মা’ও এ চিরন্তন সমাজের কর্তৃত্বের অধীন। তবে বুঝি হাজার চুরাশির মা সমকালের ‘জেনারেশন গ্যাপে’র গল্প! নকশাল আন্দোলনের সময়খ-টির ভেতরে শ্রেণিধারণাটি অপুষ্ট বা বেদনাবহ যেমনটিই হোক, হারিয়েছে ব্রতীরা। অনেকে সে তারুণ্যময় আবেগকে পুঁজিও করেছে – নিজের প্রয়োজনে। ব্যক্তিই এসব মুভমেন্টে মুখ্য ছিল – এর ফল শেষ পর্যন্ত স্বার্থেই লীন হয়েছে।

নকশাল আন্দোলন নয়। গ্রাম-ভারতের আধাসামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নগ্নভাবে উন্মোচন করাই অরণ্যের অধিকার (১৯৭৭) উপন্যাসের উদ্দেশ্য। এটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। ১৯০০ সালের মুন্ডা বিদ্রোহের ভিত্তিতে লেখা। উঠে এসেছে বীরসা মুন্ডার নেতৃত্ব। তিনি উনিশ শতকে মুন্ডা বিদ্রোহ গড়ে তোলেন। সাহেবদের ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন। পরে রাঁচি জেলে রহস্যজনকভাবে মারা যান। মিশনারিতে থাকে বীরসা। একসময় সে বুঝতে পারে, এদের উদ্দেশ্য অন্য। ‘তারা দু-চারজন আদিবাসী যুবককে খ্রিস্টান করে এবং চাকরি দিয়ে পিতৃসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে চায়। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠল বীরসা।’ লেখক বীরসাকে শুধু বিদ্রোহী বীরেই পরিণত করেন না, তাকে কিংবদন্তি-মিথ-ইতিহাস ও প্রত্নচোখে নবরূপায়ণ দেন। মুন্ডাদের কাছে বীরসা ‘অবতার’রূপে পরিগণিত হয়। সে বিদ্রোহী বাহিনী গঠন করে, তীর-ধনুক-বল্লম নিয়ে ন্যায়ানুগ অধিকারের বাণী প্রতিষ্ঠা করে। অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের শুরুতেই বীরসার মৃত্যুকে দেখান হয়। কী অমানুষিক নির্যাতনে তার মর্মান্তিক মৃত্যু! তারপর ফ্ল্যাশব্যাকে পুরো কাহিনির বয়ান। এই বীরসাকেই পরে পাওয়া যায় চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর-এ।

চোট্টি মু-া এবং তার তীর সম্পর্কে উচ্চাশা পোষণ করেন সাবঅলটার্ন-তাত্ত্বিক গায়ত্রী স্পিভাক। ‘Chotti is my best beloved book’ – এতে ‘একই সঙ্গে একটি মানুষ, তার সমাজ, একটি আন্দোলন, দীর্ঘ ব্যাপ্ত একটি এবং সেই সময়ের রাজনীতি, উত্থান-পতন ও অবক্ষয়ের বিশেস্নষণী বৃত্তান্ত বর্ণিত। কিন্তু বৃত্তান্তের বিবরণের ঢং হল একের পর এক tabuleau উন্মোচন। মহাশ্বেতা এতে নিছক গল্প বলেন না, ‘চোট্টি’, নদীর নাম, তরঙ্গের নাম, কান্না-হাসির প্রতীক। নামকরণের পশ্চাতে থাকে লোকজীবনের সংস্কার ও মূল্যবোধ। এখানে তীরেরও আখ্যান আছে। মুন্ডাদের গানের মতোই তা নিরুচ্চার কিন্তু প্রতিবাদী, ক্ষমতা আর পৌরুষে সবটুকু সৃজ্যমান। এই তীর মুন্ডাদের গানের মতো বীরসা মুন্ডা থেকে ধানী মুন্ডা হয়ে চোট্টি মুন্ডা অবধি ধারাটিকে বহতা রাখে। তীর দিয়েই কাহিনির গতি চিহ্নিত, চিত্রিত। চোট্টি তীরকে ব্যবহার করেনি, কারণ, কাউকে হত্যার জন্য এ-অস্ত্র নয় – সেটি তার স্বভাবও নয়, কিন্তু যখন শেষ রক্ষা হয় না তখন মিথ্যা দায় নিতে হয়। তখন তো তীরে জাদু বর্ষিত হলো, সে-রহস্যে সকলেই হতবুদ্ধি। ‘একদিকে চোট্টি, অন্যদিকে এসডিও, মাঝে শূন্যে উত্তোলিত হাজার ধনুক। আর অনেক উত্তেজিত হাতে সাবধান ঘোষণা।’ এটা অনেকটা ‘জাদু বাস্তব’ (Magic Realistic)।

ঐক্য দেখান। আদিবাসী-সংগ্রামের উচ্চতা নির্ধারিত হয়। অলৌকিক, কিংবদন্তি, করাল বাস্তবতা, রক্তপাত আর মৃত্যুর উৎসব মিলে এক হয়ে রয়। লুপ্ত ইতিহাস যেন জেগে ওঠে। বোর্হেস, মার্কেজের অলৌকিকত্বে যেমন বাঁধা পড়ে কাহিনি ও চরিত্র, তেমন চোট্টি মুন্ডার জাদু-তীর সাক্ষ্য হয়ে ওঠে :

কথা বলতে বলতেই ও তীর ছোঁড়ে আর নিশানী বাঁধে। যোনকা হাঁটু ছুঁয়ে সম্মান জানিয়েছিল। চোট্টি বলেছিল, যত জনা পারে নাই, তত জনার ধনুক নিয়ে দেখাব? মন্তর পড়া আছে বটে। কিন্তু মন্তরপড়া তীরটা দেখ ব্যবহার করি নাই। যেটাতে নিশানী বিঁধলাম, সেটা আমার নাতিটার তীর। এ কথাও সত্যি মন্তরপড়া তীর কাছে থাকতে আমি নিশানাছুট হব না।

মহাশ্বেতা দেবীর চোট্টি মু-া এবং তার তীর আলাদা মানের রচনা, সন্দেহ নেই। আদিবাসী আখ্যানের শুধু সীমিত দৃষ্টান্তেই মুগ্ধতা নয়, এতে ম্যাজিক-অন্বেষা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তীরের শক্তি, জনতার শক্তিতে পরিণত। পূর্বের মতো এ-জনতাও কার্নিভালপ্রিয়।

‘চোট্টি মুন্ডা আমার সমগ্র আদিবাসী চিন্তার সমাহার। সমগ্রটা এক জায়গায়’ – এর অর্থ কী? বিসত্মৃত করলে বলা যায়, অরণ্যের অধিকার গ্রন্থে ইতিহাসের বীর বীরসার তীর প্রান্তিক নেতা ধানী মুন্ডার মাধ্যমে পৌঁছে গেছে তীরন্দাজের মেলার চোট্টি মুন্ডার কাছে। এ চোট্টি তাঁর সৃজিত। এ-চরিত্রটি সৃজন করতে গিয়ে নির্ধারিত পরিবেশ, মানুষ, লোকজ সংস্কৃতি-আচার-আনুষ্ঠানিকতা চমৎকাররূপে প্রামাণ্য করে তুলেছেন। এজন্য তাঁর অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক। চোট্টি মুন্ডা কিংবা বীরসা আদিবাসী বীর, তাদের সংস্কৃতির অধিকার-মর্যাদা সম্পর্কে তারা সচেতন। সংস্কৃতি রক্ষার জন্য, কিংবা মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তারা মরতেও জানে। প্রস্ত্ততও। কিন্তু সে আত্মদান সহজ নয়। সংগ্রাম করে, প্রাণান্ত লড়ে, সভ্যতার ধারাকে চিরজীবিত করেই তাদের বাঁচার শক্তি অর্জিত হয়। সেজন্যে লক্ষণীয় যে, একপ্রকার মানবিক মর্যাদার উচ্চতা এতে তৈরি। তবে সে-কাহিনি নিছক রক্তশূন্যগ্রস্ত নয়, ইট-কাঠের পাথরের নয় – মানবিক জীবনাচরণের সমস্ত পরাকাষ্ঠা নিয়ে মহীয়ান। সেখানে লোকজ চিরায়ত বিশ্বাস-সংস্কার, মূল্যবোধ, নিম্ন-সংস্কৃতি, সংস্কার এক বর্ণিল প্রবাহে সুপিনদ্ধ। বাখতিন-কথিত ‘কার্নিভাল-তত্ত্বে’র প্রয়োগে তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে নিম্নবর্গীয় নেতা ‘বীরসা’। অরণ্যের অধিকার, এমন তীব্রভাবে সে উঠে আসে – আদিবাসী আন্দোলনের শক্তিতে প্রমত্ত, বর্ষীয়ান – সমস্ত গ– তাতে যেন অতিক্রম করে যায়; বীরসার চরিত্রায়ণ সমস্ত অন্তর্নিহিত শক্তিতে তুমুল প্রতিশ্রম্নতিমান। এগুলো যে শুধু তাৎক্ষণিক সমাজের বিবৃতি তা নয়, ইচ্ছাপূরণের আকাঙক্ষাও বলা যাবে না – এতে পুনর্গঠিত হয় দ্বন্দ্বসংকুল জীবনের অস্তিত্বিক সংগ্রামের ধ্রম্নপদী অভিমুখ। সেখানে নির্ধারিত বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ সরল ও সংঘবদ্ধ সৌন্দর্য নিয়ে চিরজীবিত। প্রসঙ্গত, আদিবাসী মুখের ভাষাও তাতে গুরুত্বশীল। চরিত্র সৃজনে মহাশ্বেতার এ-মানসিক শক্তি আর অবিকল রূপায়ণের কর্তব্য – নিশ্চয়ই অভিনব। নির্ণীত এ-কাঠামোতে তা সংস্কার ও সংস্কৃতির চিরউৎসবমুখর বারতা – তাই এ বর্ণিল রূপশুদ্ধ জয়ী মানবজীবনেরই ইঙ্গিত। এই অর্থে তা দায়বদ্ধও।

 

পাঁচ

মহাশ্বেতা দেবী ঠিক কোনো জায়গায় থেমে থাকেননি। সাহিত্যস্বভাবেও তাঁর বদল ঘটেছে। হাজার চুরাশির মা কিংবা চোট্টি মু-া ও তার তীরের রচনাকাল সত্তরের দশক। মহাশ্বেতা দেবীর শ্রেষ্ঠ গল্পের (১৯৮৪) ভূমিকায় বলছেন :

সত্তরের দশকে রচিত হাজার চুরাশির মা থেকে হঠাৎ কথাসাহিত্য রচনায় ‘নতুন পথ’ নিলেন কেন, ধারণাটি সম্ভবত তাঁর ক্ষেত্রে ঠিক নয়। … গোটা ভারতীয় বাংলা সাহিত্যেই একটা নতুন স্রোত এই দশকে এসেছিল, এবং বাংলা উপন্যাসের নানা ধরনের নানা বিশ্বাসের নানা প্রস্ত্ততির লেখকরা প্রায় কেউই এড়াতে পারেননি নকশালবাড়ি-আন্দোলনের ঝড়ের প্রভাব, মহাশ্বেতার ব্যক্তিগত পরিবর্তন, যা একরকমের উত্তরণ, গোটা বাংলা সাহিত্যের এ সময়ের পরিবর্তনের শ্রেষ্ঠ অংশ। [রচনাসমগ্র ৮, পৃ ৪৬৬]

সমালোচক ইরাবান বসুরায়ের ভাষ্যে আরো বলা যায় :

সত্তরের দশকের উপন্যাসে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটল অন্যভাবে। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ না রেখেও ঐ প্রবল আন্দোলনকে অনুভব করে তাকে রূপ দিতে গিয়ে একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনকে ও নিজের উপন্যাসকে ভাঙলেন ও নতুনভাবে গড়লেন একজন ঔপন্যাসিক – তিনি মহাশ্বেতা দেবী।

সত্তর পেরিয়ে আশিতে মহাশ্বেতার গল্প-উপন্যাসে (নৈঋতে মেঘ গল্পগ্রন্থ প্রভৃতি) প্রান্তিক মানুষ, আদিবাসী জনপদ, শ্রমশীল জীবনবৃত্তে জীবনের জয়ই দেখা যায়। অরণ্য-পাহাড়-বনজঙ্গল অধিবাসীরা নিজস্ব কৃষ্টি ও লোকাচারে সরল ও তীব্র জীবনবাদী। সভ্যতার বৈচিত্র্যও তারা। মনে পড়ে বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসের
কথা। আশিতে এমন বিবিধ গল্পে মহাশ্বেতার জীবনদর্শনের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও একপ্রকার ইতিহাসের আনুগত্যকে উচ্চতায় ছড়িয়ে দেন নিবিড় শিল্পকৌশলে। এর মধ্যে তাঁর টেরোড্যাকটিল আবার ফিরে আসে। টেরোড্যাকটিল, পূরণ সহায়পিরথা উপন্যাসে তিনি লেখেন : ‘ভারতের আদিবাসীদের দেশের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ আজ, নতুন শতকে।… টেরোড্যাকটিলকে আসতেই হতো। পৃথিবীতে জীবসৃষ্টির আদিপর্ব থেকে ১৯৮০-র দশকে মধ্যভারতে তাকে আসতেই হতো আদিবাসীদের মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্বেগ জানাতে। কিন্তু সে এ-কথাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের অসিস্তও বিপন্ন ছিল, তোমরাও আজ বিলুপ্তির সম্মুখীন। পূরণ সহায় এক সাংবাদিক।… আর ‘পিরথা’ শব্দটি পৃথিবীর সমার্থক…।’ টেরোড্যাকটিল একই সঙ্গে মিথ ও প্রতীক, এক বিবেকী সাংবাদিক যে কোনো কিছু করতে একেবারে অসমর্থ আর এই পৃথিবী (ভারতবর্ষ) এক আদিতম জাতিদের জগৎ – এই নিয়ে এ-উপন্যাস।

 

ছয়

মহাশ্বেতা এবম্প্রকার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, তাকে কল্পনার রঙে রাঙিয়েছেন, কিন্তু একপ্রকার জীবনধারার ইতিহাস গড়তে গিয়ে মানুষ-জঙ্গল-প্রতিবেশ-প্রকৃতি-নিসর্গকে ছাড়েননি। অনুষঙ্গী করেছেন। এর ভেতরে তাঁর সরল বিশ্বাসও বুনে দিয়েছেন। প্রশ্ন করেছেন। তাই তো ‘টেরোড্যাকটিল’ তৈরি। সে যেন পুনর্বার ফিরে আসে, প্রত্ন-ইতিহাসের চোখে। লেখকের জনপ্রিয় উপন্যাস হাজার চুরাশির মার মাতৃত্বও তীব্র পূর্ণতায় লাবণ্যময়। ম্যাক্সিম গোর্কির মার কথা স্মরণে আসে। আর এখানে এ ‘মা’তেও রাজনৈতিক উত্তাপ আছে, তা অন্যরকম শৈলীতে ব্যক্তিত্বময়। মা কি বদলায়? নিশ্চয়ই বদলায় না, সে আশ্রয়-অনুপ্রেরণা ও প্রতিশ্রম্নতিশীল। মহাশ্বেতায় তা আরো অভয়রূপে হাজার হয়ে বেজেছে। বস্ত্তত, ইতিহাসটা মহাশ্বেতায় সত্য ও কমিটেডরূপে প্রতিষ্ঠা পায়। ইতিহাসের অমোঘ দায় ও অনিবার্যতা তাঁর শিল্পিত জীবনের প্রেরণা। এ-লক্ষ্যে দেখা যায় ‘ফরেস্ট প্রটেকশন আইনে’র প্রশ্নবিদ্ধতা ও বিতর্ক, আদিবাসীদের অকুস্থল পাহাড়-অরণ্য নিয়ে নিরাপত্তার বসত গড়ার মমতাময় আনুগত্য, ‘পিরথা’ বা পৃথিবী যে সমান – সবার – সকলের, আর ভুঁইফোঁড় সভ্যতার নামে তার বিনষ্টি যে চলবে না – সেটি সামাজিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠা পাক – লেখক তা সমর্থনও করেন। সেজন্য নিজেও সক্রিয় হন। শুধু সমর্থন নয়, সংঘবদ্ধ করে প্রতিরোধী হন, সংগঠন গড়েন (পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় তাঁর আদিবাসী সংগঠন আছে), কাজে নিবিষ্ট হন। মহাশ্বেতা আমৃত্যু তা-ই করে গেছেন। তাঁর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বেঁচে থাকুন, সকলের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply