মহিফুল বেওয়ার প্লাবনযাত্রা

লেখক:

পাপড়ি রহমান

‘হেই সাতদিন শ্যাষ হইয়া গেলে দুনিয়াতে বাইস্যা নামলো। হেরও সতেরো দিন বাদে জমিনের তলায় বেবাক পানি বাইর অইয়া আইতে লাগল। আর আসমানও ফাইট্যা গেল। চল্লিশ দিন চল্লিশ রাইত ধইরা দুনিয়ার উপ্রে ম্যাঘ ঝরতে লাগলো। বাপরে বাপ – এমুন বিষ্টি আর বিষ্টি। এমুন ম্যাঘের নিদান। কষ্মিনকালেও এমুন ম্যাঘ কেউ-ই দেহে নাই!’ এরকম তন্ময় হয়ে বলতে বলতেই রহিমন বেওয়া যেন বৃষ্টি নামিয়ে দিত। মাথার ওপরে টিনের চালায় শোনা যেত সেই বৃষ্টির শব্দ। ভয়ে, আতঙ্কে, দুর্ভাবনায় মহিফুল, অহিফুল, জুঁুইফুল, দাদিজানের আরো সন্নিকট। গুটিসুটি মেরে একবারে তার পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে চাইতো। রহিমন বেওয়া তখন নিজেই জলের ওপর ভাসমান। তিন নাতনিকে বুকের ওমে নিবিড় করে বলতো – ‘বুবুজানেরা কি ডরাইছ? ডরাইও না!
ডরাইও না! এমুন বান কেউ জন্মেও চক্ষে দেহে নাই। ওই বান আছিল খোদার গজব।’
‘খোদার গজব’ বলেই সে চোখ মুদে ফেলতো। সামান্য আগেই চোখ জোড়া খোলা ছিল। এক্ষণে তা যেন আঠা দিয়ে সাঁটানো। কোনোভাবেই আর রহিমন বেওয়ার চক্ষু খোলা যাবে না। তার মুদিত চক্ষুর দুই পাশে শুকিয়ে যাওয়া জলচিহ্ন। রহিমন বেওয়া কখন কেঁদেছিল? সে হাসুক বা কাঁদুক তা নিয়ে মহিফুল, অহিফুল বা জুঁইফুলের ভাবনা-চিন্তা নাই। গপ্পো শোনার আশায় তারা উদগ্রীব হয়ে আছে। অধৈর্য হয়ে দুই-চারবার দাদিজানকে ঠেলাঠুলি দিয়েছে –
‘উ-রে হেরপর কী টল দাদিজান?’
তিন নাতনি মিলে যতই ঠেলাঠুলি মারুক, রহিমন বেওয়া নিঃসাড়। কে বলবে সামান্য আগে সে গপ্পের তুবড়ি ছুটিয়েছিল। বরং এখন তার যে-দশা তাতে সেও যেন মহাপ্লাবনে ডুবন্ত। কোনোদিন রহিমন বেওয়ার আর জেগে ওঠার সম্ভাবনা নেই। এমত অবস্থায় সে হঠাৎ ভুশ করে মাথা তুলেই শুরু করতো –
‘পানি এক্করে বাইড়া গেলো আর জাহাজডাও ভাইসা উডলো। নুহ্ নবীর নাও। গোফর কাড দিয়া এই নাও নবীয়ে বানাইছে। ভেতরে আর বাইয়ে আলকাতরার লেপ দিছে। এই নাও হইলো লম্বায় তিনশো হাত, চওড়ায় পঞ্চাশ হাত আর উঁচায় ত্রিশ হাত। একতালা, দুইতালা, না তিনতালা জাহাজ। এই এও উঁচা।’
রহিমন বেওয়া ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়তো। হাত দুটো মাথার ওপরে তুলে দুই পায়ে বুড়া আঙুলে ঢেউ দিয়ে আরেকটু উঁচু হতো। ফের হাত লম্বা করার চেষ্টা করে বলতো –
‘অই এমুন উঁচা!’
মহিফুল, অহিফুল, জুঁুইফুল উঁচা-ফুচা কিচ্ছু দেখে না। তারা তখন নাও না জাহাজ, জাহাজ না নাও – এই ধন্দের ভেতর। তারা তখন বৃষ্টির শব্দের ভেতর অবিরাম জল ঝরে। চল্লিশ দিন আর চল্লিশ রাইত। নুহ্ নবীর নাওয়ে চড়ে তারাও ভাসতে শুরু করে। চারপাশে শুধু জল আর জল। কোথাও এক বিঘত ভূমি নাই। জমিন নাই। গাছ-লতা কিচ্ছু নাই। রহিমন বেওয়া ডুবন্ত না ভাসমান বুঝা প্রায় অসাধ্য। তার স্বর ঘ্যাসঘ্যাসে শোনায়।
‘খুদায়ে কয় কী – আমি যাগো যাগো বানাইছি তাগো মুইছা ফেলাইবো। আর তাগো লগে যতডি জীবজন্তু আছে, বুক-হাঁটা-পরানি, এমুনকি আসমানের চিল-শকুনগুলানও মুইছা ফেলাইবো। বেবাক তো আমিই বানাইছি তাই হেগো মারতে ময়া লাগতেছে। নুহ্ নবীর উপ্রে মাবুদ কিন্তুক বেজার আছিল না।’
রহিমন বেওয়ার এসব গপ্পে তিন বোন একেবারে ভয়ে একশা হয়ে যায়। শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্ষীণস্বরে বলে –
‘বেবাক মুইছা ফেলাইব! আমাগোরেও? দাদিজান তুমারেও?’
দাদিজানের জবাব দেওয়ার মতো অবস্থা আর নাই। গপ্পের বস্তা সে অাঁটসাঁট করে বেঁধেছে। লোহার হামানদিস্তা তখন বুড়ির হাতের তলায়। তাতে পান আর সুপারি ঝুরঝুরা করে উন্মুখ হয়ে তাকায়। তিন আঙুলের ডগায় পানছেঁচা মুখে পুরে দুই আঙুলে দোক্তা চালান করে দেয়। দাঁতহীন মাঢ়ি দিয়ে তড়বড় করে চিবায়। চিবায় না এক গালের পান অন্য গালে চালান করে ধরা যায় না। দুই গাল মার্বেলের মতো গর্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে আছে। পান-সুপারি-দোক্তায় খুশবু ছুটিয়ে দিয়ে ফের সে নুহ্ নবীর জাহাজে চড়ে বসে।
‘নুহ্ নবীরে মাবুদ কয় কি তুমি আর তোমার পরিবার নাওয়ে উঠবা। আর পাক পশুর জাত থিক্যা মাইয়া-পোলা মিলাইয়া সাত জোড়া আর নাপাক পশুগো থিক্যা এক জোড়া কইরা নিবা। হেগো বংশ রাহনের লাইগা এই কাম করবা। হের সাতদিন পরে আমি দুনিয়ায় ম্যাঘ পাঠামু। ওই ম্যাঘ বিষ্টি নামাইব। আর চল্লিশ দিন চল্লিশ রাইত বৃষ্টি পড়তে থাকবো। নুহ্ নবীর মাবুদে কয় কী জমিনের বেবাক পরানি আমি মুইছা ফেলাইব।’
মহিফুল বুঝে উঠতে পারে না এত পানি, এত বিষ্টি অথচ তার দাদিজান দিব্যি বেঁচে আছে। সে উৎসুক হয়ে জানতে চায় –
‘দাদিজান তুমি তাইলে বাঁইচা রইলা কেমতে?’
পানের পিক গলায় আটকে বুড়ি ততক্ষণে ঘড়ঘড় শব্দ করে। পুচুত করে পিকটা ফেলে ফ্যা-ফ্যা করে দন্তহীন হাসি হাসে –
‘ধুর-অ-মাগি, কস কি তুই এতক্ষণে! আমি কেন তহন তো আমি কোন ছার আমার বাপ-দাদা, দাদার বাপ এমনকি তার বাপও কি আছিল নাহি? আর যদি কেউ থাইক্যাও থাকে হেয় হইলো নুহ্ নবীর বংশধর।’
এইবার তিন বোন যেন হুশে ফিরে আসে।
‘মাবুদ আমরাও কি নুহ্ নবীর বংশধর?’
‘হ তাহলে কই কী?’
‘আইচ্ছা, আইচ্ছা। হের হরে পানির কী হইলো? হেই জাহাজডার কী হইলো?’
‘হেরপর আর কী? পানি আর পানি। পানি, খালি পানি। পানির উপ্রে নবীর জাহাজ।
নবীর নাও ভাসে আর বেবাক পাহাড় তলাইয়া যায়। পানি আর কমে না। শুকনা মাটি কুনখানে নাই, বেবাক জান খতম। মানুষ, পশু, কীট, বুকে-হাঁটা-পরানি, আসমানের পক্ষী বেবাক অচিন হইয়া যায়। নুহ্ নবী আর তার নাওয়ের বেবাক জন্তু মানুষ বাঁইচা থাকে। দুনিয়া একশ পঞ্চাশ দিন পানির তলায় ডুইবা থাকে।’
মহিফুল, অহিফুল অথবা জুঁুইফুল কেউই জানে না, একশ পঞ্চাশ দিন কত মাসে হয়? কত দিনে এক মাস হয়। কিন্তু রহিমন বেওয়া সব জানে। ফলে সে তার হাত দুইটা ক্রমাগত নাড়িয়ে-চাড়িয়ে গপ্পো বলে। নাতনিরা দেখে দাদিজানের নড়ন্ত হাত দুইটাতে মাংসের ছিটেফোঁটা নাই। কেবল চামড়া কুঁচকিয়ে ঝুলে আছে। জোঁকের মতো কালো দাদিজানের হাতের রং। ফের তারা বিভ্রমে পড়ে –
‘দাদিজান কি হাছা কতা কয়? ওই নুহ্ নবীর নাওয়ে দাদিজানও আছিল। পানিতে থাইক্যা থাইক্যা হের গতরে শ্যাওলা ধইরা গেছে। নাইলে এত্ত কালাও মাইনষে অয়?’
তারা এমন ভাবে; কিন্তু নিজেদের গতরের রং সম্পর্কে তখনো কিছুই তাদের আন্দাজ নাই। তারা তখনো জানে না রহিমন বেওয়ার মতো তারাও জোঁকের মতো কালো। অনেক পরে বড় হয়ে জেনেছিল। যখন বিয়ের পয়গাম আসে আর তাদের অপছন্দ করে ফিরে যায়। মা হাজেরা বেগম অস্থির হয়ে ওঠে। বাবাও। শুভ-সংবাদের জন্য তারাও অপেক্ষা করে। মনে মনে ভাবে, কেউ এসে বলবে –
‘মহিফুলকে আমাগো মনে ধরেছে। মহিফুলকে আমরা ঘরে তুলবার চাই।’
অনেক বছর বাদে এমন কথা তারা শুনেছিল। শুনে লাল-নীল-হলুদ কাগজের পতাকা লাগিয়ে বাড়িঘরে উৎসব বসিয়েছিল। শুধু রহিমন বেওয়া তখন বিছানায় শোয়া। তার হাঁটাচলার ক্ষমতা ছিল না। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে নুহ্ নবীর জাহাজের মতো অন্য পৃথিবীর তালাশে রত।

দুই
এই ডুবিগাঁওয়ে দিনমজুর সাইদুলের সংসারে আসতে মহিফুলকে ম্যালা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। একে তো মেয়েমানুষ, তদুপরি যক্ষকালো। মেয়েমানুষ হওয়ার কারণে না ঝিমকালো হওয়ার কারণে মা হাজেরা বেগমের তারা চক্ষুশূল বলা মুশকিল। হাজেরা বেগমের চ্যালাকাঠ মহিফুল, অহিফুল, জুঁুইফুলের পিঠের ছাল তুলে নিত। এই তিনজনের পরে আরো চারজন। এবং তারাও মেয়েমানুষ। হাজেরার গর্ভে ছেলে নাই, ছেলে হয় নাই। এটা ছিল মারাত্মক যন্ত্রণা। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজেরা বেগম প্রায় উন্মাদ। এর মাঝে হঠাৎ করেই চারদিনের জ্বরে বাপ মোসাদ্দেক ঘরামির ডানদিক অবশ হয়ে গেলো আর মায়ের বাই চড়লো আসমানে। এক বা আধবেলা ভরপেট খাওয়া জোটাতেই ত্রাহি অবস্থা। এক্ষণে সাত মেয়েমানুষ আর পঙ্গু স্বামী। হাজেরা বেগমের রাগ, ক্রোধ বা অসহায় অবস্থায় যত কিছু পড়তো মেয়েদের ওপর।
‘কী কাম করনের লাইগ্যা এই জানুয়ারগুলা জন্মাইছে? কী উদ্ধার হেরা আমারে করবো?’
হাজেরা বেগম জানে, পেঁপেগাছ আর মেয়েমানুষে তেমন ফারাক নাই। দুইটাই তরতরিয়ে বাড়ে। দুইটাই দ্রুত ফল দেয়। দুইটাই এতই নাজুক যে, যখন-তখন ভেঙে ঘাড়ে পড়তে পারে।
মহিফুলরা সাত বোন তরতরিয়ে বাড়লো। যেন বর্ষার কলমিলতা। তাদের এই বাড়-বাড়ন্ত নিয়েও হাজেরা বেগমের আক্রোশের অন্ত নাই।
‘ভাত-পানি-নুন না-পাইয়াও এমন ডাঙ্গরপনা মাইয়ানুকের! কলিকালের মুসিবত এরেই কইতে অয়।’
হাজেরা বেগম ধাঁধার ভেতর। শাকপাতা, কচু-ঘেঁচু আর নুন-ভাতেও মাইয়া মানুষ এমন লকলক করে! সত্য-সত্যই লকলকিয়ে সাত মাইয়া মানুষ বাড়ে। বাড়তে বাড়তে তাদের গায়ের রং গাঢ় কালো হয়। শীতকালে টাকি বা শোলমাছের মতো কালো। এবং টাকি বা শোলমাছের মতোই তাদের পিছলানো গতর। কিন্তু গতরে চেকনাইয়ের ঘাটতি নাই।
শুধু চেকনাইয়ে কি কিছু হয়? হয় না। ফলে সাত মাইয়া মানুষ আবিয়াত থাকে। আর যারা আসে তারা লুলা-টুন্ডা-বেকার। অথবা হা-ভাতে ঘরের। হাজেরা বেগম রাগে-দুঃখে কাঁদে। বসে বসে নিজের মাথার চুল নিজেই ছিঁড়ে।
‘মাইয়া মানুষ! মাইয়া মানুষে আমার ঘরভরা। এতডি মাইয়া পয়দা হইলো ক্যান? আহা রে, যদি একডা বেডা ছাওয়াল পেটে ধরতাম আমি!’
মায়ের এসব আহাজারি দেখে সাত বোন একেবারে গুটিয়ে থাকে। গুটিয়ে মটরদানার মতো ছোট হয়ে থাকতে চায় এবং তাদের এই মাইয়া মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার রহস্য জানতে চায়। জানতে না পেরে বিমর্ষ হয়ে থাকে। দিনের সূর্য পাটে গেলে তারা ফিসফিস করে কথা বলে।
‘মাইয়া মানুষ হইয়া পয়দা হইলাম ক্যান? কে আমাগোরে মাইয়া মানুষ বানাইলো? আমাগেরো তো পুরুষের লাহান দুইডা চক্ষু আছে। দুইটা তেমুনই হাত-পা আছে। মাথা-কান আছে। দুই-তিনটা জিনিসে গড়বড়। মিলান্তি হয় না। কিন্তুক আমরা মাইয়া মানুষ, আমাগোরে গতিক কী?’
এই গতিক কী ভাবনার ভেতরে তারা ধামাধাম চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়। তাদের বেঢপ চেহারা, সমতল লিঙ্গ আর জোয়ারে পানির মতো ফুলে ওঠা বুক নিয়ে হাজেরা বেগম অনর্গল কটূক্তি করে। এ চ্যালাকাঠের বাড়ি আর কটূক্তির ভেতরই মহিফুলের বিয়ের পয়গাম আসে। সাইদুল লুলা-কানা নয়। বেকারও নয়। কাজ করে খায়। কিন্তু খুঁত সাইদুলের না থাকলেও তার গেরামের আছে। সাইদুলের গেরামের নাম ডুবিগাঁও। এই গেরাম ছয় মাস থাকে জলের তলায়, ছয় মাস জলের ওপরে। হাজেরা বেগম পাখির মতো করে মহিফুলকে বোঝায় –
‘গেরাম পানির তলায় ডুইবা গেলে বেবাকে নাওয়ে নাওয়ে ঘোরে। বাইদাগো লাহান। পানি নাইমা গেলে ঘরে ফিরা যায় লোকজন। হাল বায়। ফসল বুনে। গরু চড়ায়, ছাগল পালে। গেরস্তি সাজায়। ফের পানিতে ভাসে। ফের শুকনা জমিন।’
মহিফুল তাকিয়ে দেখে, হাজেরা বেগম কবুতরের মতন ঘাড় ফুলিয়ে ডুবিগাঁওয়ের আদ্যপ্রান্ত বলে যায়। তার চেহারায় খুশির আভা।
মহিফুল যদি জলে ডুবে, যদি তারে কুমিরে খায়, ডাঙায় থাকলে যদি বাঘে খায় – হাজেরা বেগমের করনের কিচ্ছু নাই। বেঢপ ঝিমকালো মাইয়া মানুষ হইলো আপদ। এ আপদ জলে ডুবলেই কী আর ডাঙায় থাকলেই কী – বেবাকই সমান দেখে হাজেরা বেগম।

তিন
মহিফুলের বিয়ের বছর থেকেই ডুবিগাঁওয়ের জল যেন হঠাৎ নির্বিষ হয়ে যায়। তার সেই আগের ফণা নাই। ফোঁস-ফোঁসানো নাই। ফলে ঘরবাড়ি জলের তলায় ছয় মাসের জন্য তলিয়ে গেলো না। কিন্তু পৈঠা-উঠান-গোয়ালঘর একেবারে জলমগ্ন। পালানের মরসুমি সবজি, আনাজ জলের তলায়। জল ফুলে ওঠার আগেই মহিফুল যতটা পারে মজুদ করে। গোয়ালের গরু মাচানের ওপরে তুলে দেয়। চারপাশের জল অথই দেখে প্রায়ই শঙ্কায় তার বুক ঢিপঢিপ করে।
‘এইবার বুঝি নুহ্ নবীর নাও বানাইতে অইবো।’
ছেলেসন্তানের আশায় আশায় মহিফুলের গর্ভেও জন্ম নিয়েছে ছয় মাইয়া মানুষ। মায়ের মতোই তাদের যক্ষকালো রং। বেঢপ ছিরি। মহিফুল এতদিন বাদে হাজেরা বেগমের উষ্মার কারণ ধরতে পারে –
‘সমান ভিটি নিয়া জন্ম নিল মাইয়া লোক। এই ভিটির পহরায় মায়ের জেবন শ্যাষ। এই ভিটির পহর নিজেগোও দিতে হয়। না-দিলে লুটপাট অইয়া যায় জেবন-যৌবন।’
তীব্র কালো রং আর কুৎসিত চেহারার কারণে মহিফুলের গর্ভে জন্মানো মাইয়া মানুষদের বিয়ের পয়গাম আসে না। দুই-একজন হাই তুলে যা বলে, তাতে বিস্তর টাকা-পয়সার ইঙ্গিত থাকে। সাইদুলের একার কামাই। সংসারে শ্রী তাতে ফেরে না। কিন্তু ছয় মাইয়া মানুষ লকলকিয়ে বাড়ে। জলকলমির মতো তারা বাড়বাড়ন্ত। মহিফুল বেওয়া ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দেখে তাদের সমতল লিঙ্গ সামান্য উঁচু ঢিবির মতো দেখায়। জোয়ারের জলের মতো উপচানো স্তন আর জোঁকের মতো মিশমিশে কালো গায়ের রং। মেয়েদের জলকলমির মতো বাড়তে দেখে সে পালানো সবজি তুলতে যায়। মাটির স্পর্শ এত বেশি ভেজা! এমন স্যাঁতসেঁতে। সাইদুল কোদাল দিয়ে এক চাঙর মাটি তুলতেই জল ভরে ওঠে। মাটির শূন্যস্থান এখন জলময়। সাইদুল অাঁচ করে ডুবিগাঁও ম্যালা দিন বাদে জলের তলায় তলিয়ে যাবে। সাইদুল এমন দেখেছে বহুবার। শুধু মহিফুল নতুন দর্শক। ফলে তার চিন্তাও বেশি।
‘একশ পঞ্চাশ দিন বাদেও যুদি শুকনা জমিন না ভাসে?’
ডুবিগাঁও জলে ভাসার প্রস্ত্ততি নিতে শুরু করে। সাইদুল বড় বড় কাঠ দিয়ে মস্ত একখানা নৌকা বানাতে বসে। মহিফুল ছোটাছুটি করে। তার গর্ভের ছয় মাইয়ানুকও ছোটাছুটি করে। তারা ধান-জাল গোছগাছ করে। কাপড়-চোপড়, হাঁড়ি-পাতিল-কড়াই। চুল বাঁধার ফিতা। মুখ দেখার আয়না। মাটির মটকা-কলস। ধামার চাল বস্তায় ভরতে ভরতে মহিফুল বেওয়া শোনে –
‘হেই সাতদিন শ্যাষ হইয়া গেলে দুনিয়াতে বাইস্যা নামলো। হেয়ও সতেরো দিন বাদে জমিনের তলায় বেবাক পানি বাইর অইয়া আইতে লাগলো। আর আসমানও ফাইট্যা গেল। চল্লিশ দিন চল্লিশ রাইত ধইরা দুনিয়ার উপ্রে ম্যাঘ ঝরতে লাগলো। বাপরে বাপ – এমুন বিষ্টি আর বিষ্টি! এমুন ম্যাঘের নিদান! কষ্মিনকালেও এমুন ম্যাঘ কেউ-ই দেহে নাই।’
ডুবিগাঁওয়ে সত্যি সত্যি যখন বৃষ্টি নামলো তখন সাইদুলের নৌকা বানানো শেষ। মাটি ফুঁড়ে থইথই জলে চারপাশ সয়লাব। আর আসমানেও মেঘের পুরু আস্তর। এই আসমান কবে ফর্সা হবে আর রোদ্দুর ঝকমক করবে বলা কঠিন।
দুই মানুষ সমান উঁচু জল ডুবিগাঁওকে গ্রাস করে ফেললো। সাইদুল তেমন ঘাবড়ালো না। কারণ এ-দৃশ্য তার চেনা। স্থির হাতে সে বৈঠা বাইতে লাগলো। নৌকা বোঝাই হাঁড়ি-পাতিল, জিনিসপত্র। কাপড়ের গাঁট্টি, চাউলের বস্তা, ধানের জালা, ডাল, আটা, লবণ, মরিচ, আচারের বৈয়াম এমনকি ঘরের চারখানা শিকাও ছইয়ের সঙ্গে ঝুলন্ত। সাইদুল প্রথমে কান পাতলো, না, কোনো কথাবার্তা শোনা গেল না! সুপ্ত জিনিসের ভেতর সে দৃষ্টি গলিয়ে দিলো।
‘কেউ কোত্থাও নাই।’
সাইদুল ভাবলো দেখার ভুল। কোনো বিভ্রমে সে ঢুকে পড়েছে। ফলে পুনরায় সে তন্নতন্ন করে তাদের খুঁজলো। কিন্তু মহিফুলের গর্ভের ছয় মাইয়ানুককে কোথাও দেখা গেল না। তক্ষুণি দুই মুরগি, তিনটা কবুতর আর একটা ছাগল সমবেত ডাক ছাড়লো।
সমস্ত ভজঘটের ভেতর থেকেও সাইদুল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মহিফুলকে দেখার চেষ্টা করলো। মহিফুলের মুখ সামান্য ঘোমটায় অস্পষ্ট।
জলমগ্ন ডুবিগাঁওয়ের ওপর সাইদুলের হাতের বৈঠা ভাসতে লাগলো।
বৈঠা পতনের ঝপাৎ শব্দের সঙ্গে আরো একটি শব্দ মিশেছিল –
‘ডাইনি!’

শেয়ার করুন

Leave a Reply