মাজহারুল ইসলামের পরলোকগমন ও আধুনিকতাবাদের অন্তিম মুহূর্তে কিছু কথা

লেখক:

কাজী খালিদ আশরাফ

Charu o Kola Onushad

 

একজন মানুষ ও তাঁর কর্ম, এ দুইয়ের সম্পর্ক বড় করে দেখা দেয় সে-মানুষটার মৃত্যুর পর। আর মানুষটা যদি হয় একজন স্থপতি, ব্যাপারটা আরো ভাবার বিষয় হয়ে ওঠে। তখন ভাবনায় দোলা দেয় দেহ আর গেহর এক প্রাচীন সামঞ্জস্য।
লুই কানের সন্তান, ন্যাথানিয়েল, তাঁর স্বনামধন্য স্থপতি পিতার মৃত্যুবরণের বহু বছর পর একটা অতুলনীয় ছবি তৈরি করেন। ছবির নাম মাই আর্কিটেক্ট। একমাত্র পুত্রসন্তান হওয়া সত্ত্বেও ন্যাথানিয়েল তাঁর বাবাকে কাছে পাননি। বাবার স্নেহ-সান্নিধ্য অনুভব করার খুব একটা সুযোগ হয়নি। বাবা কী বলতেন, কী বিশ্বাস করতেন – এসব থেকে প্রায় বঞ্চিত ন্যাথানিয়েল। ছবিটার মূল উদ্দেশ্য সেই অজানা পিতাকে খুঁজে ফেরা। ছবিতে দেখতে পাই ন্যাথানিয়েল বাবার স্থাপত্যকর্ম ঘুরে ঘুরে দেখছেন, একের পর এক কাজের অবস্থানগুলোতে যাত্রা করে সেখানকার পরিবেশ অবলোকন করছেন। শেষে, ন্যাথানিয়েলের  একটা ধারণা জন্মায় যে, তাঁর বাবার নশ্বর দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ, শ্বাস-প্রশ্বাস কণাবিন্দুতে পরিণত হয়ে ইট, পাথর ও কংক্রিটে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। দেহ এখন সম্পূর্ণভাবে গেহ।
মৃত্যুর পর যখন মাজহারুল ইসলামের মরদেহ তাঁরই ডিজাইন করা আর্ট কলেজ বা চারুকলা ইনস্টিটিউট চত্বরে এনে রাখা হলো, তখন এই দেহ আর গেহর কথাই বারবার মনে পড়ছিল। জীবন্ত মানুষ মানেই মরণশীল, চলে যাবে। তার কর্মগুলো রয়ে যায় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য মানুষটা কে ছিলেন, কেমন ছিলেন, আমাদের সবাইকে কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
একসময়ের অদম্য এই স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ১৪ জুলাই মাঝরাতে নীরবেই আমাদের মাঝ থেকে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। এবং এরই সঙ্গে বাংলাদেশের স্থাপত্যকে আধুনিকতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আজীবন প্রচেষ্টারও সমাপ্তি ঘটল। তাঁর মৃতদেহকে আর্ট কলেজে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর বন্ধু-বান্ধব, শিষ্য এবং শুভানুধ্যায়ীরা, এমনকি একসময়ে যাঁরা তাঁর সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন, তাঁরাও এই শেষ আধুনিকতাবাদীকে বিদায় জানানোর জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
মৃত্যু মাজহারুল ইসলামকে তাঁরই ডিজাইন করা প্রথম বাড়ি আর্ট কলেজে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই ভবনের ডিজাইনের মাধ্যমেই তাঁর অবিশ্বাস্য কর্মজীবনের সূচনা ঘটেছিল, যার মধ্যে দিয়ে জাতি গঠনের আকাক্সক্ষার সঙ্গে স্থাপত্যশিল্পের অবস্থান, আধুনিকতার মূল্যবোধের সঙ্গে স্থানিকতার প্রেরণা মিশে এক হয়ে গিয়েছিল। মাজহারুল ইসলামের বিদায়কে অনেকেই একটি যুগের অবসান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আসলে মাজহারুল ইসলাম একাই এই যুগের প্রতিবিম্ব। এই এক ব্যক্তিই ধারণ করেছেন ১৯৫০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যকলার ইতিহাস আর বিকাশকে। মাজহারুল ইসলামের জীবন ও কর্ম বহুদিন ধরে আমাদের স্থাপত্যকলায় গতিমুখের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে, যেখানে আধুনিকতা, পশ্চিমায়ন, ঐতিহ্য এবং জাতি গঠনের জটিল মিলন ঘটেছে।
পাঁচ দশক ধরে মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের স্থাপত্যকলার রূপ ও ধরন নির্ধারণ করে গেছেন। তাঁর কাছে আধুনিকতা ছিল স্থাপত্য ভাষা ও নান্দনিকতার চেয়ে আরো বেশি কিছু। সেটি মূলত ছিল সামাজিক বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি নীতিগত এবং যৌক্তিক হাতিয়ার। মার্কসবাদ এবং রাবীন্দ্রিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর লক্ষ্যের ধারণা ছিল কখনো চ্যালেঞ্জিং আবার কখনো অপূর্ণ। আধুনিকতার প্রতি তাঁর এই দৃঢ় অঙ্গীকার সৃষ্টি হয়েছিল সমাজ পরিবর্তনের একটি আশাবাদী ইউটোপিয়ান ভাবনা থেকে। তাঁর প্রচেষ্টা ছিল বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ডিজাইন সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং সেখানে একটি নৈতিক পরিবর্তন আনা, এবং এমন একটা সমাজে যেখানে একজন স্থপতির সমাজের মঙ্গল ও পরিবর্তনের পুরোধা হওয়ার চেয়ে ব্যবসায়িক এবং আলংকারিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হওয়া সহজ।
মাজহারুল ইসলাম একটি নতুন দেশে (প্রথমে পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ) স্থাপত্য সংস্কৃতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। এজন্যে তাঁকে আমলা ও প্রকৌশলীদের কাছ থেকে বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, এমনকি অনেক স্থাপত্য শিক্ষাবিদও এ-ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে মাজহারুল ইসলাম নানা স্থাপত্যকর্ম সৃষ্টিতে দারুণ অবদান রেখেছিলেন। তিনি বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক সম্মিলনের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে লুই কান, পল রুডলফ এবং স্ট্যানলি টাইগারম্যানের মতো জগৎবিখ্যাত স্থাপত্যবিদরা যোগ দিয়েছিলেন এবং অমূল্য সব স্থাপত্য তৈরি করেছিলেন। তাঁর অফিস ‘বাস্তুকলাবিদ’ ছিল প্রতিশ্র“তিশীল তরুণদের স্থাপত্য-আন্দোলনের প্রেরণাস্থল। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৮৩ সালে জন্ম নেওয়া ‘চেতনা স্থাপত্য গবেষণা সমাজ’। তখন থেকেই এ-সংগঠনটি এ-অঞ্চলের স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাস ও সমভবনা নিয়ে অভিনব গবেষণা উপহার দিয়েছে।
মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যচিন্তা বাড়িঘরের সাধারণ সমস্যার সমাধান ছাড়াও আরো উচ্চতায় পৌঁছত। তিনি শুধু একজন পেশাদার স্থাপত্যবিদ ছিলেন না, বরং তীক্ষè সাংস্কৃতিক ও মানববাদী চিন্তার অধিকারী ছিলেন। তাঁর চিন্তা ছিল একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক লক্ষ্য যা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার পুরনো দ্বন্দ্বকে সার্থকভাবে মোকাবেলা করতে পারবে। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমরা কীভাবে একুশ শতকে প্রবেশ করবো?’ তাঁর এই অবস্থান ছিল সংকোচহীন ও আদর্শগতভাবে আধুনিকতার পক্ষে। তাঁর কাছে আধুনিকতা ছিল যতখানি,  নিজ থেকে দূরে যাওয়া ঠিক ততখানি ফিরে আসা। এই দূরে যাওয়ার অর্থ হলো নিকট অতীতের ঔপনিবেশিকতা থেকে একটি দৃঢ় অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে বিভাজন সৃষ্টিকারী ধর্মীয় মতাদর্শ, পীড়াদায়ক ঐতিহ্য, প্রতিক্রিয়াশীল প্রচারণা এবং ফাঁপা প্রতীকপূজার কোনো স্থান হবে না। বাঙালি রাজনৈতিক পরিচয়ের দৃঢ় আস্থা থাকা সত্ত্বেও  তিনি স্থাপত্যকর্মে কোনো সস্তা জাতীয়তাবাদের আশ্রয় নেননি।
মাজহারুল ইসলামের অবস্থান এ ক্ষেত্রে সংলাপমূলক। যদিও তাঁর অবস্থান ছিল একটি নির্দিষ্ট স্থান-কালে, তা কখনই তাঁর ‘বিশ্ব সংলাপ’কে বাধাগ্রস্ত করেনি। দার্শনিক জেএল মেহতার মতে, ‘বর্তমান সময়ে মানুষের অবস্থান এমন জায়গায় যেখানে সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ধর্ম একে অপরকে ছুঁয়ে আছে, যেখানে বিভিন্নতার স্থান ও সময় একসাথে বয়ে চলছে।’ এটাই বিশ্ব-সংলাপ। মাজহারুল ইসলাম সাংস্কৃতিক স্থানিকতা এবং ‘পৃথিবী-আমার পরিসর’ এই দুইয়ের মধ্যে কাজ করতে চেয়েছিলেন। এই দুই কর্তব্যপরায়ণতা তাঁর প্রথম কাজ আর্ট কলেজ থেকে তাঁকে পরিচালিত করে আসছে।
পঞ্চাশের-ষাটের দশকে যখন মাজহারুল ইসলাম কর্মচঞ্চল ছিলেন সে-সময় পাকিস্তান উত্তপ্ত সময় পার করছিল। সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক চৈতন্যের জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানের দুই প্রদেশের বৈষম্য থেকে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বিপক্ষে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার স্ফূরণ থেকে। মাজহারুল ইসলাম ছিলেন এই দলের অন্যতম কর্ণধার। তখন থেকেই যুক্তিবাদী এবং বস্তুবাদী দর্শনের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা তাঁকে সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রচণ্ড বিরোধী করে তুলেছিল। তিনি তাঁর কাজে বৈষম্য সৃষ্টিকারী স্থাপত্যকলার পরিবর্তে সাধকসুলভ সামান্যতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর এই মনোভাবের জন্য অনেকে তাঁর কাজ একমনা ভেবে ভুল বুঝেছেন।
মাজহারুল ইসলামের কাজের পরিসর ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তিনি বহু ধরনের ডিজাইনে জড়িত ছিলেন, যেমন বিশ্ববিদ্যালয় (চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিকল্পনা), বড় আকারের অট্টালিকা, সরকারি দালান ও প্রতিষ্ঠান, এবং অসংখ্য আবাসিক ভবন (প্রায় ১০০-এর বেশি কাজ আছে বলে শোনা যায়)। প্যাভিলিয়ন প্যারাডাইমে গড়া তাঁর শুরুর দিককার স্থাপত্যগুলো, যেমন চারু ও কারুকলা ভবন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপা ভবন, আন্তর্জাতিক আধুনিক স্থাপত্যকলায় ট্রপিক্যাল অঞ্চলের অবদান হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে। গরম ও জলীয়বাষ্পপ্রধান অঞ্চলে খোলামেলা এবং আলো-বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থাসম্পন্ন ভবন নির্মাণ প্যাভালিয়ন প্যারাডাইমের বৈশিষ্ট্য।
ষাট বছর বয়সী আর্ট কলেজটি অবহেলা সত্ত্বেও এখনো প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকা চমৎকার একটি স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সত্তর এবং এর পরবর্তী সময়কার মাজহারুল ইসলামের কাজ অনেক বেশি মাটিঘেঁষা এবং যার বড় পরিষ্কার একটি নমুনা ইটের স্থাপত্যের মহাযজ্ঞ জাতীয় গ্রন্থাগার ভবনটি। যদিও পরবর্তী সময়কার কাজগুলো আধুনিক স্থাপত্যকলা ও জ্যামিতিক কাঠামোর আত্মীকরণে তৈরি হয়েছে, তারপরও সেসব কাজে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাঁর সব স্থাপত্যকর্মই এই ট্রপিক্যাল অঞ্চলের আলো, বাতাস আর সবুজের আধার হয়ে আছে।
বাড়িঘর আর ভবন তৈরির বাইরেও মাজহারুল ইসলাম আঞ্চলিক পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশের জন্য বৃহৎ পরিসরে পরিকল্পনার ওপর জোর দিতেন। যেখানে সম্পদ ও স্থান সীমিত সেখানে সৃষ্টিশীলতার জোর বেশি থাকা প্রয়োজন, এটাই তিনি মনে করতেন। তাঁর গভীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাঁকে দৃঢ় বিশ্বাস দিয়েছিল যে, দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক প্রতিকূলতাসমূহকে মোকাবেলা এবং পরিবর্তনের জন্য স্থাপত্যকলার ভূমিকা অনিবার্য ও জরুরি। মাজহারুল ইসলাম মনে করতেন, স্থাপত্যকলা একটি দীর্ঘ এবং অবিরাম সংগ্রাম; ভীতু এবং সুবিধাবাদীদের সেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার নয়। মাজহারুল ইসলামের জীবনটাই ছিল এই চ্যালেঞ্জের আত্তীকরণ বা দেহমূর্তকরণ (embodiment)|

শেয়ার করুন

Leave a Reply