মামুন যখন ইউরোপে

লেখক:

তানভীর মোকাম্মেল

লন্ডনে পৌঁছে মামুন উঠল সেলিমভাইয়ের বাসায়। সেলিমভাই পরদিনই বললেন, ‘ভাই রে, তোর তো একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগে।’ ভাতিজা রূপশও তখন লন্ডনে। এখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। তো দুজনে গেল ব্যাংকে। মামুনের ভালো নাম যে মামুন নোমানি, এটা দেখে ব্যাংকের কাউন্টারের মেয়েটা তো হেসেই খুন! ‘নামটা কী বললে’? মামুন বলল, ‘নোমানি’। ‘নো-মানি! তো অ্যাকাউন্ট খুলবে কী করে? তোমার তো কোনো টাকাই নেই!’ বলেই মেয়েটি আবার খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। তারপর কাউন্টারের পেছনে গিয়ে মামুনের দিকে তাকিয়ে ওর অফিসের কলিগদের সঙ্গেও কিছুটা হাসাহাসি করল। শেষমেশ পাঁচ পাউন্ড জমা দিয়ে মামুনের অ্যাকাউন্টটা খোলা গেল।

সেলিমভাইয়ের বাসার পেছনে বেশ বড় একটা বাগান। কয়েকদিন ধরেই বাড়ির সামনের গ্যারেজটাতে গাড়ি রাখার সময় লক্ষ করা যাচ্ছিল যে, গ্যারেজের পাশের গাছটায় বেশ উঁচু একটা ডালে বড়সড় একটা মৌচাকের বাসা। সেদিন সন্ধ্যায় সেলিমভাই বললেন, ‘চল, মামুন। মৌচাকটা ভাঙি। মধু খাওয়া যাবে। খাঁটি মধু খেলে সব বাত বাপ বাপ বলে পালাবে।’ যেমন কথা তেমন কাজ। লম্বা একটা লাঠির আগায় ন্যাকড়া বাঁধা হলো। তাতে ঢালা হলো কিছুটা পেট্রোল। গরমকালের সন্ধ্যা। মৌমাছি যাতে না কামড়ায় সেলিমভাই তাই ভাবির কালো একটা ওভারকোট পরলেন। মাথায়-মুখে জড়ালেন হাতের কাছে পাওয়া ভাবির একটা লাল স্কার্ফ। আর হাতে পরলেন রান্নাঘরের বাসন ধোয়ার গোলাপি রঙের রবারের দস্তানা। দেখতে লাগছিল যেন এক্কেবারে একজন মহিলা! সেলিমভাইয়ের অবশ্য সেদিকে ভ্রূক্ষেপ  নেই। উনি তখন মৌচাক-অভিযান ও মধুর লোভে মহাউত্তেজিত। মামুনকে বললেন, ‘তুই এক বালতি পানি নিয়ে দরজার কাচের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকবি। আগুন যদি এদিকে আসে তাহলে পানি ঢেলে দিবি।’ যথারীতি অপারেশন শুরু হলো। সেলিমভাই পা টিপে টিপে মৌচাকের তলায় উপস্থিত হলেন। একটা দিয়াশলাই বের করে লাঠির আগার ন্যাকড়ায় আগুন জ্বালিয়ে আগুনটা নিয়ে গেলেন মৌচাকটার তলায়। তাপ পেয়ে  মৌমাছিগুলো তো ভোঁ-ভোঁ করে উড়তে শুরু করল। এদিকে হয়েছে কী? গরমকালে গাছের শুকনো পাতাগুলো তো প্রায় দাহ্য পদার্থের মতোই হয়েছিল। আগুনের ছোঁয়া পেতেই গাছের পাতাগুলো দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। একটু পরে গাছটার ডালপালাগুলোও। সে এক মস্ত আগুন! মামুন ওর এক বালতি জল ঢেলে কোনো কূলই পেল না। এদিকে দলে দলে মৌমাছি ছোটাছুটি করছে। মৌমাছির তাড়া খেয়ে সেলিমভাই তো আর ঘরেই ঢুকতে পারলেন না। বড় লাঠিটা কাঁধে নিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে অনেকটা পথ দৌড়ে গিয়ে বাড়ির পেছনের বাগানের দেয়াল টপকে পেছনের কাচের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ তুলতে থাকলেন। মামুন দরজা খুলে ওকে ভেতরে আনল। সমস্ত  মুখ-মাথা ঢাকা থাকলেও বেশ কয়েকটা কামড় উনি খেয়েছেন! ঘরে ঢুকেই সেলিমভাই মাথার স্কার্ফ, ভাবির ওভারকোট ছেড়েছুড়ে দিব্যি ফের ঘরোয়া পোশাকে। এদিকে হয়েছে কী? প্রতিবেশী এক বাড়িতে মেরামতির কাজ চলছিল। মিস্ত্রি অবশ্য সেলিমভাইদের বিশেষ পরিচিত আফ্রিকার ইয়োহান। ইয়োহান সেলিমভাইদের বাড়িতেও মাঝেমধ্যে এসে মেরামতির নানা কাজ করে। তো গরমের সেই সন্ধ্যায় দু-বাড়ি পরই ওই বাড়ির জানালা খুলে ইয়োহান তো এক পা বাইরে ঝুলিয়ে বেশ আরামেই গুনগুন করে আফ্রিকার গান গাইতে গাইতে জানালা মেরামতের কাজ করছিল। এমন সময় মৌমাছির ঝাঁক ওকে জেঁকে ধরে কামড়ে শেষ! পরে ইয়োহান বলল, ‘আমি শুধু দেখলাম, আগুনটা লাগিয়ে এক মহিলা বড় একটা লাঠি নিয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে।’

কিন্তু বিপদটা এলো অন্যদিক দিয়ে। একটু পরই ভোঁ-ভোঁ সাইরেন বাজিয়ে বিশাল দুই ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি কোথা থেকে এসে উপস্থিত। মামুন ও সেলিমভাই দুজনে হাতে খুন্তি ও চামচ নিয়ে বের হলো, যেন ওরা এতক্ষণ ভেতরের রান্নাঘরে কাজ করছিল। কিছুই জানে না! প্রায় যুদ্ধকালীন দ্রুততায় ফায়ার ব্রিগেডের লোকেরা এক মিনিটেই আগুনটা নিভিয়ে ফেলল।  রাস্তার ওপাশে কয়েকটা বাড়ি পরই থাকে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা মিস্টার এবং মিসেস জোনস। ফায়ার ব্রিগেডকে তাঁরাই ফোন করেছিলেন। এদিকে ইয়োহান তো বারবার জোর দিয়ে বলছে, ও দেখেছে কাঁধে লাঠি, মাথায় স্কার্ফ আর গোলাপি দস্তানা পরা এক মহিলা বাড়িটাতে আগুন লাগিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে! ফায়ার ব্রিগেডের লোকরা তখন ওখান থেকেই পুলিশকে ফোন করল। অল্পক্ষণ পরই সাঁইসাঁই সাইরেন বাজিয়ে দুই পুলিশ এসে উপস্থিত। তাঁরা তো নেমেই সব শুনে বাড়ির সামনে-পেছনে, ঘুরে ঘুরে নানা কিছু দেখতে থাকল ও নোট নিতে লাগল। ইতোমধ্যে পাড়া-প্রতিবেশী অনেকেই এসে উপস্থিত। আগুন লাগতে লাগতে সেলিম সাহেবের বাড়িটা বেঁচে গেছে, প্রতিবেশীদের সহানুভূতি তো হবেই। বেশ ভিড়। পুলিশটি জিজ্ঞেস করল সেলিমভাইকে – ‘আপনার কী মনে হয়? কারা করতে পারে কাজটা?’ সেলিমভাই কিছু বলার আগেই প্রতিবেশী হোসেন আলী সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন, ‘এ রেসিয়াল অ্যাটাক। এ রেসিয়াল আর্সন অ্যাটাক। দেখছ না, হাতে লাঠিও ছিল।’ মামুন উঁকি দিয়ে দেখল ইংরেজ পুলিশটিও মনোযোগের সঙ্গে ওর নোটবইতে লিখল, ‘অ্যা রেসিয়াল আর্সন অ্যাটাক’!

মামুনের তখনো ভর্তি হতে কয়েক সপ্তাহ বাকি। মামুন চাইল এই কয়েকটা দিন একটা কিছু কাজ করবে। তাতে হাতখরচটা হবে। কিছু অভিজ্ঞতাও হবে। আর লন্ডন শহরের হালচালটাও কিছুটা বোঝা যাবে। দিনতিনেক পর সেলিমভাই বললেন, ‘অক্সফোর্ড সার্কাসের একটা কাপড়ের দোকানে পার্টটাইম কাজ করতে  পারিস। মালিক আমাদের রাজশাহীরই লোক। জহির, মানে জহিরুল ইসলাম, আমাদের সঙ্গে কলেজে পড়ত।’ সেলিমভাইয়ের স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। একবার কাউকে দেখলে আর কখনো ভোলেন না। ট্রেনে, বাসে, মার্কেটে, বাঙালি কারো সঙ্গে দেখা হলেই – ‘আরে শাহাদাৎ না?’ সে-লোক কিছুটা হকচকিয়ে গেলে; ‘আরে চিনলি না! বগুড়ায় প্রাইমারি স্কুলে একসঙ্গে পড়েছি। ইন দ্য ইয়ার অব নাইনটিন ফিফটি ওয়ান।’ এরকমটি প্রায়ই ঘটে। বরিশালে কার সঙ্গে পড়েছেন ক্লাস সেভেনে, কার সঙ্গে ১৯৬৩ সালে একবার সিরাজগঞ্জ রেলস্টেশনে ঘণ্টাখানেকের জন্য দেখা হয়েছিল, কার সঙ্গে নওগাঁয় একসঙ্গে দেড় মাস চাকরি করেছিলেন – সেলিমভাই কাউকেই ভোলেন না। তাঁর বাবার ছিল সরকারি চাকরি। ফলে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই চাকরি করেছেন। ফলে সেলিমভাইয়ের চেনাজানা মানুষেরও কোনো কমতি  নেই। আর এসব পরিচয়ই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের। কারণ সত্তরের দশকের শুরু থেকেই তো উনি লন্ডনে। তো যা হোক, পথেঘাটে-দোকানে-এয়ারপোর্টে সেলিমভাইয়ের পরিচিত মানুষ কারো না কারো দেখা মিলবেই। আর সেলিমভাইও একগাল হেসে এগিয়ে গিয়ে – ‘আরে তরীকুল না? চিনতে পারলি না! একসঙ্গে ময়মনসিংহে ইন দ্য ইয়ার…’। সেই থেকে সেলিমভাই ওর পুরনো দিনের কোনো গল্প শুরু করলেই ছেলেমেয়েরা সমস্বরে বলে ওঠে – ‘ইন দ্য ইয়ার অব…!’ তো দিনদুয়েক পরে সেলিমভাই মামুনকে নিয়ে গেলেন অক্সফোর্ড সার্কাসের কাপড়ের দোকানটিতে। ওরা এসে দেখে জহিরুল ইসলামের নাম এখানে জহুর খান। কারণ ওর বউ পাকিস্তানি। বউ ও শ্যালকদের সামনে জহিরুল ইসলাম স্বীকার করতে চান না যে উনি বাঙালি। লোকজনকে বলে থাকেন, ওদের পরিবার আসলে উত্তর ভারত থেকে এসেছিল – উর্দুভাষী। বউয়ের সঙ্গে তাই উর্দুতেই কথা বলেন। সব শুনে জহিরুল তথা জহুর খান বললেন, ‘কুছ পরোয়া নেই। আজ থেকেই কাজে লেগে যাও ভাই। এখন সামারের হাই সিজন। আমি কাউন্টারে লোকের অভাবে ভুগছি।’

মামুন অবশ্য সেদিন নয়, পরদিন থেকে কাজে যোগ দিলো। জহিরভাইয়ের লম্বা-চওড়া মোটা পাকিস্তানি বউটা মাঝেমধ্যে এসে দোকানে ঢুঁ মেরে যায়। তবে দোকানটা চালান জহিরভাই-ই। মামুন ছাড়াও দোকানে আরেকজন বাঙালি কর্মচারী আছে। রাজ্জাক মিয়া নাম। বরিশালে বাড়ি। তো কাজে যোগ দেওয়ার দিনই জহিরভাই মামুনকে এক কোণে ডেকে ফিসফিস করে বললেন, ‘দেখো ভাই, তোমার ভাবির সামনে আমার সঙ্গে ভুলেও বাংলায় কথা বলো না।’

মামুন : ‘কেন, জহিরভাই?’

জহির সাহেব : ‘আরে, জহির না, জহির না, বলো জহুর খান। শোনো ভাই, আমি তো বিয়ের আগে তোমাদের ভাবিকে বলেছি আমি উর্দুভাষী। উত্তর ভারতে বাড়ি। না হলে তো বিয়ে করত না। তোমার ভাবি পাকিস্তানি, জানো তো? ওর সব ভাইও  পাকিস্তানি।’ মামুন সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। যখন ভাবি দোকানে থাকেন না, মামুন বাংলাতেই চালায়। তবে ভাবি দোকানে উপস্থিত থাকলে ওর ‘এয়সা … যায়সা’ জাতীয় ভাঙা ভাঙা উর্দুতে কথাবার্তা বলে। বরিশালের রাজ্জাক মিয়াও তাই করে।

মামুন লক্ষ করল, জহিরভাই ওর স্ত্রীকে ভয় পান ঠিক যমের মতো। কয়েকদিন পর ঘনিষ্ঠতা কিছুটা বাড়লে মামুন একদিন জিজ্ঞেস করল : ‘আচ্ছা জহিরভাই, ভাবিকে আপনি এত ভয় পান কেন?’ জহিরভাই মুখে আঙুল তুলে ‘স-শস্’ করলেন। তারপর দোকানের এক কোণে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন : ‘আসলে এ-দোকানটা আমারই। কিন্তু ব্রিটিশওয়ালাদের ট্যাক্স ফাঁকি দেব বলে একদিন নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দিলাম। ফলে কাগজে-কলমে তিন বছর আমি কোনো সম্পত্তির মালিক হতে পারব না। দোকানটা তাই তোমাদের ভাবির নামে করে দিয়েছি। তাইতেই ওর এত দাপট। একটা বছর পার হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে আর দুটো বছরও পার হবে। তখন দেখবে। হুঁ!’

তো সেদিন জহিরভাই তথা জহুর খান মামুনকে বললেন, ‘ভাই, কতদিন ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাই না! এত পাউন্ড-ডলার দিয়ে আমার লাভটা কী, ইলিশই যদি খেতে না পারলাম!’ মামুন বলল, ‘বাড়িতে রাঁধলেই পারেন।’ জহুর খান একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সে উপায় কী আছে রে ভাই? বউ বলবে যে, ‘মছলিখোর বাঙালি’! মামুন সেদিন বাড়িতে ফিরে ভাবিকে বলল কথাটা। দুদিন পর মামুন একটা টিফিন ক্যারিয়ারে ভাবির ভালো করে রান্না বড়সড় বেশ কয়েক পিস ইলিশের তরকারি ও ভাত নিয়ে গেল দোকানে। মামুনের মুখে শুনে ও টিফিন ক্যারিয়ারটা দেখে জহুর খানের চোখে-মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি খেলে গেল। ফিসফিস করে বলল, ‘লাঞ্চের সময় হবে।’ সাধারণত জহুর খানের বউটি লাঞ্চের সময় বাড়িতে চলে যায়। কিন্তু সেদিন ক্যাশ মেলাতে কী এক সমস্যা হচ্ছিল। বউটি আর যাচ্ছেই না। ক্যাশে বসে নানা হিসাব-পত্তর করেই চলেছে। এদিকে লাঞ্চের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। জহুর খানের আর তর সয় না! মামুনকে ফিসফিস করে বলল, ‘টিফিন ক্যারিয়ারটা দোকানের পেছনে নিয়ে চলো।’ ওদিকে সব বড় বড় কাপড়ের গাঁট ও অন্যান্য জিনিস থাকে। ফলে বেশ একটা নিরিবিলি আড়াল রয়েছে। টিফিন ক্যারিয়ারটা খুলে ঝোলে ভাসা ইলিশের বিশাল বিশাল পেটি দেখে জহিরভাইয়ের চোখ তো খুশিতে চকচক করে উঠল। প্লেটে ভাত মাখিয়ে সুখ করে ইলিশের টুকরোয় সবে একটা কামড় দিতে যাওয়ার সময়ই যেখানে-বাঘের-ভয়, সেখানেই-সন্ধ্যা-হয়ের মতো এক্কেবারে বাঘিনী বউয়ের মুখোমুখি! আসলে ওই জায়গাটার পাশেই ছিল টয়লেটে যাওয়ার প্যাসেজ। বেচারা রাজ্জাকও একটা প্লেট নিয়ে সবে ওদের সঙ্গে বসেছিল। এক নজর তাকিয়েই জহুর খানের বউ হঙ্কার ছাড়ল : ‘সব শালে মছলিখোর। হঠা দিউঙ্গি সব কো!’ ধরা পড়ে জহিরভাইয়ের মুখ তো চুন। আর রাজ্জাক মিনমিন করে বলল, ‘মোর তো ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার দশা! মাছে একটা কামড়ও দেবার হারলাম না। হুদাই গালি খেলাম এক গন্ডা!’ বউ চোখের আড়াল হতেই জহিরভাই তথা জহুর খান অবশ্য হুঙ্কার ছাড়লেন : ‘আর মাত্র দুবছর। তারপর দেখিয়ে ছাড়ব!’

সেলিমভাইয়ের লন্ডনে একটা বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্টমতো রয়েছে। নানা কিসিমের লোকজন ওখানে এসে মাঝেমধ্যে থাকে। একদিন সেলিমভাই বেশ চিন্তিতমুখে বলল, ‘বুঝলি মামুন, এক ব্যাটা আজ তিন সপ্তাহ ধরে হোটেলটাতে আছে, ভাড়া দিচ্ছে না। ভাড়া চাইতে গেলে তেড়ে উঠছে। তোকে এক কাজ করতে হবে।’

– ‘কী কাজ সেলিমভাই?’

– ‘তুই ভাব ধরবি যেন তুই স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোক। বাকিটা আমি ম্যানেজ করব।’

তো সেদিন সন্ধ্যায় মামুন কালো ট্রাউজারের ওপর নীল একটা জ্যাকেট চাপিয়ে সেলিমভাইয়ের সঙ্গে গাড়িতে চেপে হোটেলটাতে গেল। মাঝবয়সী গোঁফওয়ালা শ্বেতাঙ্গ লোকটা তো সেলিমভাইকে দেখেই খেপে উঠল, ‘তোমার বাথরুম ফ্লাশ ঠিকমতো কাজ করে না, বেসিনের সিঙ্ক ভাঙা আবার ভাড়া চাইতে এসেছ!’ সেলিমভাই গলায় বেশ একটা গুরুগম্ভীর ভাব এনে বললেন, ‘দেখো, ভালো চাও তো ভাড়াটা দিয়ে দাও, অন্যথায় রুম ছাড়ো। আমি সঙ্গে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোক নিয়ে এসেছি।’ মামুন জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সেলিমভাইয়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর জ্যাকেটের কলারটা ওঠানো। লোকটা প্রায় ফাটা বেলুনের মতোই চুপসে গেল। মিনমিন করে বলল : ‘না, ভাড়া আমি দেবো না, তা তো বলিনি। … বলছিলাম আমার অবস্থাটা এ-সপ্তাহেও তেমন ভালো যাচ্ছে না।’ সেলিমভাই এবার গলা বেশ উঁচিয়ে – ‘সপ্তাহ-টপ্তাহ বুঝি না। তোমাকে এখনই ঘর ছাড়তে হবে।’ মামুন আরো দুপা এগিয়ে এলো সামনে। লোকটা এবার খুব কাঁচুমাচু স্বরে : ‘তা’… ঠিক আছে। রুমটা আমি ছেড়ে দিচ্ছি। অত ঝামেলা করার কী দরকার!’ আধঘণ্টার মধ্যে লোকটা ওর পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে হোটেল ছাড়ল। সেলিমভাইয়ের মুখে তখন এক অনাবিল হাসি – ‘একেই বলে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড! বুঝলি মামুন, এদেশের মানুষ পুলিশকে ভয় পায় যমের মতো।’

সেলিমভাইয়ের সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি হচ্ছে ওঁর গাড়ি চালানো। এদেশে সেলিমভাইয়ের বাড়ি কেনাবেচার শখ আছে। লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে উনি মাঝেমধ্যে পুরো মুখটাই দিব্যি পেছনে ফিরে তাকিয়ে : ‘বুঝলি মামুন, ওই যে বাড়িটা দেখছিস, দোকানঘরটার পেছনে, ওটা আড়াই লাখ পাউন্ড চেয়েছিল। আমি মর্টগেজ পেয়েছিলাম দুই লাখ তিরিশ… হলো না রে! … এখন দাম সাড়ে পাঁচ লাখ!’ এদিকে গাড়ি তো জোরে সামনে ছুটে চলেছে! দুপাশ দিয়ে সাঁইসাঁই করে অন্যসব গাড়ি ছুটছে। মামুন তো অাঁতকে ওঠে; ‘করেন কী! করেন কী! … সামনে তাকান।’ সেলিমভাই দিব্যি আবার সামনে তাকিয়ে ইতিউতি চাইতে থাকেন – কোথায় কোন বাড়ির সামনে ‘ফর সেল’ লেখা!

সেলিমভাইয়ের গাড়ি চালানোর ব্যাপারটাই আসলে অদ্ভুত। যেমন সেদিন রাস্তার দুপাশে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে তাকাতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ ওদের সামনে পড়ল ‘রোড ক্লোজড অ্যাহেড’ লেখা। সামনের রাস্তা বন্ধ। রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে। কিসের কী? সেলিমভাই দিব্যি গাড়িটা সামনে চালিয়ে যেতে থাকলেন। রাস্তা বন্ধের যে রঙিন ফিতাগুলো টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা সেলিমভাইয়ের গাড়ির চারদিকে জড়িয়ে পতপত করে উড়তে থাকল। তখন সেলিমভাইয়ের হুঁশ হলো!

‘কী হলো রে, মামুন? এত কাগজ কিসের রে!’ তারপর গাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ির সারা গায়ে জড়ানো সেসব রঙিন কাগজ আর দড়িদড়া কোনো রকমে খুলে-ছিঁড়ে ওরা দুজনে ওই তল্লাট ছাড়ল। পুলিশ এসে পড়ার আগেই!

অবশ্য সেলিমভাইয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ঘটনাটাও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। দুবার ফেল করে তৃতীয়বার যখন লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিতে গেছেন, সেদিন যে সার্জেন্ট ওঁর গাড়িতে চাপল তার চেহারা দেখেই তো সেলিমভাইয়ের আক্কেলগুড়ুম! বেশ বুড়ো এক সার্জেন্ট। আর সেলিমভাই                 এ-দেশে ওঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় জানেন যে, ইংরেজ বুড়ো-বুড়িরা নিয়মের ব্যাপারে খুবই কড়া। তো যে পাঁচ-ছয়রকম টেস্ট বৃদ্ধ সার্জেন্টটি দিলো সেলিমভাই তার প্রায় সবগুলোতেই ফেল করলেন। সার্জেন্ট বলল, বাঁয়ে ঘোরো। সেলিমভাই দিব্যি গাড়িটা ডাইনে ঘুরিয়ে দিলেন। হতাশ হয়ে বৃদ্ধ সার্জেন্টটি বলল : ‘আজ আমার চাকরির শেষ দিন। কাল রিটায়ার্ড করব। আজ আর কাউকে ফেল করাতে চাই না। যাও, তোমাকে পাশ করিয়ে দিলাম। কিন্তু দেখো, আমাকে ডুবিও না!’

যে-কোনো জায়গায় যাওয়ার পথে সেলিমভাই বলবেনই; ‘আরে ও-রাস্তা কেন? …ধুর, আমি একটা শর্টকাট রাস্তা চিনি। তিরিশ বছর ধরে লন্ডনে আছি না?’ তো সেই শর্টকাট রাস্তাটা ধরতে গিয়ে বেশ বড় একটা লম্বা কাট ঘুরে দেড়-দুঘণ্টা পর যখন দাওয়াতের বাড়িতে পৌঁছানো হোত, ততক্ষণে খাবার-দাবার সব ঠান্ডা। অনেক অতিথি বিদায়ও নিয়ে ফেলেছে! সেলিমভাই তাই কোনো শর্টকাট রাস্তার কথা বললেই ভাবি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন, ‘রাখো তোমার শর্টকাট! লংকাটই ভালো।’ সেবার মামুন যাবে স্পেনে। হিথরো এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে সময় হিসাব করে প্রায় দেড় ঘণ্টা আগেই ওরা রওনা দিয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে সেলিমভাই হঠাৎ বললেন, ‘বুঝলে মামুন, হিথরোতে যাবার একটা শর্টকাট পথ আমি চিনি, চলো, ওটা দিয়ে যাই।’ তো সে-পথ ধরে ওরা যখন শেষমেশ হিথরোতে গিয়ে পৌঁছল ততক্ষণে বিমানের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। মামুনের কপালে সেদিন আর স্পেনে যাওয়া ঘটল না।

এখন অবশ্য গাড়িতে জিপিএস লাগানো হয়েছে। কিন্তু সেলিমভাই তা মানলে তো! সারাটা পথ জিপিএসের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে যান। ‘আরে, ও কি আমার চেয়ে লন্ডন শহর ভালো চেনে! তিরিশ বছর ধরে এ শহরে আছি’ ইত্যাদি। তো সেবার ওরা সপরিবারে অক্সফোর্ডে চলেছে। পারিবারিক বন্ধু আওয়ালভাই দাওয়াত দিয়েছেন। প্রথম কিছুটা পথ ভালোয় ভালোয় কাটল। তারপরই সেলিমভাইয়ের অসন্তোষ শুরু হলো জিপিএসের ব্যাপারে। ‘আরে, এটা অক্সফোর্ডের রাস্তা  হলো? আমি কতবার অক্সফোর্ডে গেছি। ও কম্পিউটার ব্যাটা জানে কী! অক্সফোর্ড যাওয়ার সবচেয়ে ভালো রাস্তা হলো’ ইত্যাদি। তো জিপিএস যদি বলে, এবারে ডানে ঘোর তো সেলিমভাই বাঁয়ে ঘোরেন! লন্ডন থেকে অক্সফোর্ড যাওয়ার পথ দু-ঘণ্টার বেশি নয়। কিন্তু সাড়ে তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, অক্সফোর্ডের আর দেখা নেই। হঠাৎ গাড়িটা মোটর হাইওয়ের মাঝখানে এসে এক্কেবারেই থেমে গেল। জিপিএস ওর যান্ত্রিক স্বরে বলল, ‘ইউ হ্যাভ রিচ্ড দ্য ডেস্টিনেশন!’ কে বলে, প্রযুক্তির মান-অভিমান নেই!!

সেলিমভাইয়ের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে বের হলে একটা না একটা কান্ড ঘটবেই। সেদিন এক বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে আসতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। রাস্তাঘাট কিছুটা ফাঁকাফাঁকা। ঝিরঝির করে বৃষ্টিও হচ্ছিল। সামনে একটা গাড়ি কিছুতেই ওদের গাড়িটাকে সাইড দিচ্ছিল না। সেলিমভাই হর্ন বাজালেন। ইউরোপে হর্ন বাজানো রীতিমতো একটা ঘটনা। কেউ ট্রাফিক আইনের কোনো উল্টোপাল্টা করলেই কেবল তাকে লক্ষ্য করে, অন্য গাড়ির ড্রাইভাররা হর্ন বাজায়। হর্ন খাওয়া তাই বেশ অপমানের একটা ব্যাপার। সেলিমভাই অবশ্য প্রতিদিনই বেশ কিছু হর্ন খান। উনি বাড়ি ফিরলেই ছেলেমেয়েরা জিজ্ঞেস করে; ‘আববু, আজ কটা হর্ন খেলে?’ সেলিমভাইয়ের সহজ স্বীকারোক্তি, ‘আজ চারটে খেয়েছি রে!’ তা সেলিমভাই তো হর্ন বাজিয়ে সামনের গাড়িটাকে ওভারটেক করে গেলেন। হঠাৎ ওই গাড়িটা পেছন থেকে অনেক জোর গতিতে এসে সেলিমভাইয়ের গাড়ির সামনে ব্রেক করে দাঁড়িয়ে গেল আর গাড়ি থেকে নামল            লম্বা-চাওড়া মস্ত সাইজের এক কৃষ্ণকায়। ‘হে ম্যান, হোয়াই ডিড ইউ হন্ক মি?’ রীতিমতো মারমুখো লোকটা। সেলিমভাইও ছেড়ে কথা বলার মানুষ নন। লন্ডনের রাস্তায় তখন বাঙালি ইংরেজি ও ক্যারিবীয় ইংরেজির তুবড়ি ফুটছে! হঠাৎ সেলিমভাই গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির পেছনের বনেটটা খুলে ফেললেন। গাড়িতে কালো রঙের একটা ভাঙা ছাতা ছিল। সেলিমভাই ছাতাটা খুলতে গেলে খটাখট একটা আওয়াজ উঠল। মস্ত সাইজের কৃষ্ণকায়টি হঠাৎ করে চুপসে গেল। অন্ধকারে কালো লাঠির মতো কিছু, ও ভেবেছে বোধহয় বন্দুক! বলে উঠল, ‘ইট্স অলরাইট ম্যান !… ইট্স অলরাইট! টেক ইট ইজি, ম্যান!’ বলতে বলতে লোকটা পিছু-হটে গাড়িতে চেপেই ভোঁ করে ছুটে বেরিয়ে গেল। মামুনের তখন মন খুলে গাইতে ইচ্ছা করছিল :

আমার ছেঁড়া কাঁথা রে

আমার ভাঙা ছাতি রে

অসহায় নিদানের বন্ধু

সঙ্গে থাইকো রে\

সেলিমভাইয়ের বন্ধুগুলোও যেন কেমন কেমন। যেমন নজরুলভাই ও আশরাফভাই। ‘বুঝলে ভায়া’, নজরুলভাই একদিন বললেন মামুনকে, ‘প্রথম যখন এদেশে আসলাম, ছাত্রবৃত্তির সামান্য পয়সা তো, সারাদিন তাই শুধু খিদে খিদে লাগত। তো একদিন পার্কে ঘুরতে গিয়ে দেখি, লেকের ধারে বেশকিছু বড় বড় হাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ বলেই নজরুলভাই হেসে গড়িয়ে পড়লেন; ‘আশরাফ, বাকিটা তুই বল!’ নজরুলভাইয়ের এই এক স্বভাব। কোনো মজার গল্প বলতে গেলে নিজেই সজোরে হাসতে শুরু করেন। তারপর আর পুরো গল্পটা শেষই করে উঠতে পারেন না। এদিকে বিপদ হচ্ছে, আশরাফভাই আবার কিছুটা তোতলা। উনি তুতলিয়ে তুতলিয়ে যা বললেন, আর হেসে গড়িয়ে পড়ার মধ্যেও নজরুলভাই যেসব ভুলে যাওয়া তথ্য জুগিয়ে গেলেন, তাতে ঘটনাটা বোঝা গেল এই যে, ওরকম তেলেভরা মোটাতাজা হাঁস চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ-দৃশ্য দেখতে দেখতে দুজনের আর সহ্য হলো না। এক ইংরেজ বুড়ির বাড়িতে দুজনে তখন সাবলেট থাকতেন। তো এক রাতে দুজনে একটা বস্তা, একটা  টর্চলাইট আর কিছু দড়ি নিয়ে বের হলেন। রাতের বেলা, চারদিকে ছিমছাম। দুজনে পাঁচিল টপকে পার্কের ভেতরে ঢুকলেন। কিছুটা অন্ধকারে হাতড়ে-পাঁচড়ে হাঁসগুলোর প্রায় গায়ের ওপর গিয়ে পড়তেই হাঁসগুলো তারস্বরে ‘আ … আ’ করে ডাকতে শুরু করল। তাই শুনে গোটা লেকে যেখানে যত পাখি ছিল সবগুলোই নানা সুরে ডাকা শুরু করল। সে এক বিচিত্র কনসার্ট! এদিকে আশরাফভাই তো ‘ন… ন… নজরুল… তা’… তা’… তাড়াতাড়ি ক… ক… কর্। …পু… পু… পুলিশ… এসে… যা… যাবে’ বলে চেঁচাচ্ছেন। নজরুলভাই আর দেরি করলেন না। বড় একটা চিনে হাঁসের ওপরে বস্তাটার মুখটা ফেলে দিয়ে হাঁসটাকে বস্তাবন্দি করে ফেললেন। আর নজরুলভাই দড়ি দিয়ে বস্তার মুখটা আটকালেন। তারপর দুজনে দ্রুত পার্কের পাঁচিল টপকে ফের পথে। এদিকে বস্তায় আটকানো বড়সড় হাঁসটা সারাটা পথ বস্তার ভেতরে সমানে নড়াচড়া করতে আর ডাকতে থাকল। প্রায় দৌড়ে কোনো রকমে বাড়ি পৌঁছেই নিজেদের ঘরে ঢুকে ওঁরা দরজা বন্ধ করে দিলেন। কপাল ভালো, অত রাতে বাড়িওয়ালি বুড়িটা তখন আরেক ঘরে গভীর ঘুমে নিদ্রামগ্ন।

তারপর গভীর রাতে কীভাবে সেই হাঁসটা কাটা হলো, কীভাবে লোম ছাড়ানো হলো, কীভাবে রান্না হলো, সে এক লম্বা ইতিহাস। তবে বোঝা গেল, তরতাজা জীবন্ত হাঁস চোখের সামনে চরতে দেখা আর সেটা মাংসের টুকরো হয়ে পাতে পড়ার মধ্যে রয়েছে বিশাল এক দুর্গমগিরি-কান্তার-মরু পার হওয়ার মতোই কঠিন এক পথ। তবে সবচেয়ে বিপদ হলো হাঁসটার বড় বড় পশম ও লোমগুলো কীভাবে ফেলা যাবে? আবার সেই বস্তা, আবার টর্চলাইট। প্রায় ভোররাতে পা টিপে টিপে রাস্তার ওপাশের ডাস্টবিনটায় ওগুলো যখন ওরা ফেলছিলেন তখন গোল বাধাল সামনের বাড়ির বড় অ্যালসেসিয়ান কুকুরটা। ঘেউ ঘেউ করে ভয়াল-দর্শন কুকুরটা পারলে চেন ছিঁড়ে ওদের দিকে ছুটে আসে। আবার দৌড়, আবার পাঁচিল টপকানো, এবার নিজেদেরই বাড়ির দেয়ালের। তারপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়া। পরদিন সকালে বাড়িওয়ালি বুড়ি রান্নাঘরে ঢুকে বলল, ‘কিসের যেন একটা গন্ধ!’ নজরুলভাই-আশরাফভাই বললেন, ‘কই না তো’। তারপর নাক লম্বা করে শ্বাস টেনে চারদিকে শুঁকে বললেন, ‘কই, কিছু না তো।’ বুড়ি ওর কফির কাপে চিনি দিয়ে নাড়াতে নাড়াতে বললেন; ‘বয়স হলে মানুষের কত কিছুই না হয়! যেমন কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম, সারারাত ধরে আমার বাড়িতে অনেকগুলো চোর দৌড়াদৌড়ি করছে আর পাশের বাড়ির কুকুরটা খুব জোরে জোরে ডাকছে।’ নজরুলভাই আর আশরাফভাই এমন ভাব করলেন যে, সত্যিই, বুড়ো বয়সে মানুষ কত আজব সব স্বপ্নই না দেখে!!

তো সেবার সেলিমভাই ও ওর দুই বন্ধুর পরিবার মিলে ঠিক হলো স্কটল্যান্ডে বেড়াতে যাওয়া হবে। দুটো বড় গাড়ি ভাড়া করে নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে যাওয়া হবে। সঙ্গে শুকনো খাবার-দাবার অনেক নেওয়া হলো। এছাড়া নেওয়া হয়েছে কিছু চাল-ডাল। উদ্দেশ্য মাঝেমধ্যে খিচুড়ি রান্না করে খাওয়া হবে। সঙ্গে ডিমভাজা। তাই সঙ্গে একটা স্টোভও নেওয়া হয়েছে। মামুনও অন্যতম ভ্রমণসঙ্গী। স্কটল্যান্ড সুন্দর জায়গা। ভ্রমণটা তাই চলছিল খুবই চমৎকার। মাঝেমধ্যে থেমে কোনো রেস্তোরাঁয় নেমে এদেশের খাবার খাওয়া। মামুনের তো বেশ লাগছিল। কিন্তু হোসেন আলীভাইয়ের আর সহ্য হলো না। বললেন, ‘সেলিম, ব্রেড আর ল্যাম্ব চপ খেয়ে খেয়ে পেটে তো চর পড়ে গেল! আজ খিচুড়ি রান্না হোক।’

তো সেদিন রাতে ওরা ছিলেন গ্রামের ভেতরে এক স্কটিশ মহিলার বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্টের হোটেলে। মালকিন ও তার মেয়ে দোতলায় থাকে। নিচের তলায় বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্টের ঘরগুলো। তো শোবার ঘরের ভেতরে স্টোভ জ্বালিয়ে খিচুড়ি তো চাপানো হলো। সবাই-ই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। খিচুড়িতে ঘি দেওয়া হয়েছে। সারা ঘরে একটা ঘি-ঘি গন্ধ। এমন সময় দরজায় নক্! সেলিমভাই কি-হোল দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেন মালকিন ও ওর মেয়েটা দাঁড়িয়ে। ঝটপট স্টোভটা নিভিয়ে ফেলা হলো। ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ির হাঁড়ি চালান গেল খাটের নিচে। দু-তিনজন মিলে কাপড় দিয়ে ঝেড়েঝুড়ে ঘরের ধোঁয়া ও ঘিয়ের গন্ধ দূর করার চেষ্টা হলো। তারপর দরজাটা খোলা হলো। মহিলা ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তোমরা কি কিছু রাঁধছিলে না কি? জানো না, ঘরের ভেতরে রান্না নিষেধ।’ হোসেন আলীভাই বললেন, ‘ন্-না। রাঁধব কেন? কিছুই রাঁধছি না।’ মহিলা শ্বাস টেনে টেনে নিঃশ্বাস নিয়ে চারদিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে – ‘কিসের যেন গন্ধ!’ ‘ও কিছু না, কিছু না, এটা ইন্ডিয়ান বডি স্প্রের গন্ধ’ –  বললেন সেলিমভাই। মহিলা তবু সন্দিগ্ধ চোখে চারদিকে তাকাতে তাকাতে ঘর থেকে বের হলেন। অর্ধদগ্ধ খিচুড়ির হাঁড়িটা তো সারাটা রাত খাটের নিচেই পড়ে রইল। সেলিম ভাইয়েরা পরদিন সকালেই ওই হোটেল ছাড়লেন। ওরা যাবেন লক নেসের  হ্রদে মনস্টার দেখতে। তো হ্রদটার পারে পার্কের মতো একটা জায়গায় গাড়িদুটো দাঁড় করানো হলো। হোসেন আলীভাই আর সেলিমভাইয়ের উৎসাহ দেখে কে! এবার খিচুড়ি খাওয়া যাবে। আবার স্টোভ জ্বালানো, আবার সেই অর্ধরান্না খিচুড়ির হাঁড়িটা চাপানো। এক সময় রান্না শেষ হলো। ছেলেমেয়েরা সব পাত পেড়ে বসল। পরিবেশনার আগে হোসেন আলীভাই বললেন, ‘সেলিম, একটু চেখে দেখ্ তো। সব ঠিক আছে কিনা?’ সেলিমভাই চামচের ডগায় কিছুটা খিচুড়ি তুলে মুখে দিয়ে মুখটা অনেকটা কুঁচকে, কিছুটা খাবি খাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ন্-না। ঠিকই তো আছে মনে হচ্ছে।’ ভাবির কেমন জানি সন্দেহ হলো। ‘দেখি তোমাদের খিচুড়ি’ বলে কিছুটা খিচুড়ি মুখে দিয়েই ওয়াক্ ওয়াক্ করে পারলে ভাবি বমি করেন! খিচুড়িতে টক্ টক্ বিশ্রী একটা গন্ধ। পুরোটাই পচে গেছে। ভাবি খেপে গিয়ে বললেন, ‘এই খিচুড়ি তোমরা বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছিলে! ফেলো সব। এক্ষুনি ফেলো!’ সেলিমভাই-হোসেন আলীভাই কী আর করেন! মনে অনেক দুঃখ নিয়ে খিচুড়ির হাঁড়িটা নিয়ে লক নেসের জলে ফেলে দেওয়ার সময় হোসেন আলীভাই মুখ ভার করে বললেন, ‘কপাল মন্দ রে সেলিম, বাকি কয়দিন আবার সেই রুটি আর ল্যাম্ব চপ!’

লন্ডনে সেলিমভাইদের পরিচিত আরেক আজব চরিত্র রজব আলী সাহেব। বেঁটেখাটো রজব আলী ষাটের দশকে সাইকেল চালিয়ে রাজশাহীর নওহাটা থেকে এক সময় ইংল্যান্ডে পেঁŠছেছিলেন। তখন থেকেই এদেশে আছেন। মাঝে কয়েক বছর মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন। তাই আরবি ভাষাটা রজব আলী জানেন কিছুটা। তো রজব আলী সাহেব লন্ডনে একটা ‘ইসলামি রেনেসাঁ সেন্টার’ খুলেছেন। নামেই অবশ্য সেন্টার। উনিই সভাপতি, তাঁর স্ত্রী সাধারণ সম্পাদক, এক মেয়ে কোষাধ্যক্ষ আর ছেলেমেয়েরা সব সদস্য। তাঁর অবশ্য ছেলেমেয়ে কম নয় – ছয় ছয়টা।

তো রজব আলী বেশ বিত্তবান মানুষ হলেও থাকেন গরিবদের বসবাসের জন্য ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া কাউন্সিল ফ্ল্যাটে। কাউন্সিল ফ্ল্যাটে কেন থাকেন এ-প্রশ্ন করলে রজব আলী সাহেবের সাফ জবাব, ‘এই ব্রিটিশ কুইত্তাদের কিছু পয়সা খসাই।’ ইংরেজদের তিনি ‘ব্রিটিশ কুইত্তা’ ছাড়া কিছু বলতেন না। ‘আপনি ইংরেজদের এত ঘৃণা করেন, তাহলে এ-দেশে থাকেন কেন?’ মামুনের এ-প্রশ্নের জবাবে রজব আলী ব্যাখ্যা দিলেন, ‘বুইঝ্লে না, এরা ইসলামের কিছু নিয়ম মেনে চলে। যেমন ইসলাম বলে রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে গরিবদের দেখভাল করা। এরা সেটা করে। সে-কারণেই এই ব্রিটিশ কুইত্তাদের দেশে পড়ে আছি।’

অবশ্য শুধু ব্রিটিশরা নয়, আরবদের ব্যাপারেও উনি ‘আরব কুইত্তা’ ছাড়া বলেন না। আর কৃষ্ণাঙ্গদের সম্পর্কে বলেন, ‘কেলে জংলি’! মামুনকে একদিন বোঝালেন, এই যে আরব দেশগুলো তেলের পয়সা পেয়ে এত ধনী হয়েছে, একজন মুসলমান হিসেবে সে-টাকায় ওরও হক আছে। আরবদের ঠকিয়ে  দু-চার পয়সা নিলে তাই কোনো ক্ষতি নেই। তো সেদিন সকালে রজব আলী সাহেব মামুনকে ফোন করে বললেন, ‘আমার সঙ্গে এক জায়গায় যেতে হবে, ভাই।’ মামুন জিজ্ঞেস করল ‘কোথায়’? ‘চলই না, নিজের চোখেই দেখতে পাবে। তোমার স্টুডেন্ট কার্ডটা সঙ্গে নিও’ – বললেন রজব আলী।

রিজেন্ট পার্কের পাশে এক মসজিদে মামুনকে নিয়ে গেলেন রজব আলী। মামুন ওর পেছনে পেছনে গিয়ে ঢুকল মসজিদের পেছনে বেশ সাজানো-গোছানো একটা ঘরে। দেখল মোটাসোটা একটা আরবকে ঘিরে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি চেহারার লোক বসা। আরব লোকটা যে বেশ কেউকেটা কিছু হবেন তা বোঝা যাচ্ছিল তাঁর বসার ভঙ্গি ও অন্য লোকগুলো যেভাবে তাঁকে তোয়াজ করছিল তা দেখে। কিছুক্ষণ বসে থেকে রজব আলী মামুনকে সামনে এগোতে বলে নাদুস-নুদুস মোটা আরবটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। মামুনও পাশে গিয়ে বসল। দুজনের মধ্যে আরবিতে কী সব কথাবার্তা হলো। মামুন বুঝতে পারল রজব আলী ওর দিকে ইংগিত করে আরবটিকে কিছু বলছিলেন। মামুন দু-তিনবার কেবল ‘মিসকিন’ শব্দটা শুনতে পেল। কিছুক্ষণ শুনে আরব লোকটি কাকে যেন ডাকল। পাশের ঘর থেকে আরবি পোশাকের লম্বা রোগামতো একটা লোক বেরিয়ে এলো। বোঝা গেল দ্বিতীয় লোকটি মোটা আরবটির প্রাইভেট সেক্রেটারি-জাতীয় কিছু। রজব আলী বললেন, ‘তোমার স্টুডেন্ট কার্ডটা বের করো তো।’ মামুন কার্ডটা বের করল। মোটা আরবটি কী বলাতে রোগা আরবটি মামুনের হাত থেকে কার্ডটি নিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো হাতে দুটি চেক ও মামুনের কার্ডটার ফটোকপি করে নিয়ে। চেকদুটোর একটা সাড়ে তিনশো পাউন্ডের, আরেকটা দেড়শো পাউন্ডের। মামুন বুঝল, দেড়শো পাউন্ডটা ওর জন্য আর সাড়ে তিনশো পাউন্ডটা রজব আলী সাহেবের জন্য। চেক দুটো পকেটে ঢুকিয়ে রজব আলী সাহেব মোটা আরবটাকে বারবার সালাম জানিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। মামুনও বের হলো ওর পিছু পিছু। বাইরে বেরিয়ে মামুনের দিকে ফিরে বললেন, ‘দেখলে তো, আরব কুইত্তাটারে কেমন ছিল্ দিলাম!’ এরপর দেড়শো পাউন্ডের চেকটা বুক পকেট থেকে একটু বের করে ‘এটা তোমার লাগবে?’ গোটা ব্যাপারটায় মামুন এতই বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে আরবটার সামনে ওকে বারবার ‘মিসকিন’ বলায় যে ও বেশ জোরেশোরেই বলল, ‘না, লাগবে না।’ শুনে রজব আলীর মুখে একটা খুশির আভা খেলে গেল – ‘ভালো, ভালো। বুঝলে না, বৌ-বাচ্চা নিয়ে থাকি। অনেক খরচ!’

মসজিদটা থেকে বেরিয়ে দুজনে টিউব স্টেশনে এলো। স্টেশনের সামনে দেখা গেল হ্যাগেনডাস কোম্পানি একটা নতুন আইসক্রিম প্রচারের জন্য বিনে পয়সায় আইসক্রিম বিলি করছে। দুটো লাইন পড়েছে সামনে। রজব আলী সাহেব দ্রুত একটা লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মামুনকে বললেন, আরেকটা লাইনে দাঁড়াতে। ঘটনাচক্রে মামুনই আগে ওর লাইনটার কাউন্টারের সামনে পৌঁছল। ও একটা বেশ বড়সড় সাইজের আইসক্রিম হাতে পেল। রজব আলী সাহেবও ওর লাইনের সামনের সারিতে তখন পৌঁছে গেছেন। কিন্তু ততক্ষণে ওই ঘরটার আইসক্রিম সব শেষ। ওরা জানাল ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করলে আবার আইসক্রিম বিলি শুরু করা হবে। মামুন আর থাকতে রাজি নয়। রজব আলী বললেন, ‘যাবে? তো যাও।… আমি থাকি। আইসক্রিমটা নিয়েই যাই।’ বলে করুণ দৃষ্টিতে মামুনের হাতের আইসক্রিমটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মামুন তখন ওর হাতের আইসক্রিমটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি বরং এটাই নিয়ে যান।’ রজব আলী দিব্যি ওটা মামুনের হাত থেকে নিজের হাতে নিয়ে বললেন, ‘আরে আরেকটাও নিয়েই যাই। বাড়িতে বাল-বাচ্চা আছে।’ মামুন বলল, ‘তাহলে তো আপনাকে আরো এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। ততক্ষণে তো আপনার হাতের এই আইসক্রিমটা পুরো গলে যাবে।’ রজব আলী দৃঢ় অবস্থানে; ‘কী যে বলো! বাড়িতে ফ্রিজ আছে না? ফ্রিজে রাখলেই গলা আইসক্রিম আবার আগের মতো হয়ে যাবে।’

তো ‘আরব কুইত্তা’দের ছিল দেওয়ার ব্যাপারে রজব আলী নিত্যনতুন কৌশল বের করতেন। সেদিন সেলিমভাইকে বললেন, ‘কাল আমার বড় মেয়েটার জন্মদিন। আর ছোট ছেলেটারও করে দিচ্ছি। দুজনের কিন্তু আলাদা জন্মদিন।’ আর মামুনকে ফোন করে বারবার বললেন, ‘তোমার কিন্তু ভাই আলাদা দাওয়াত।’ রজব আলী একাধিকবার ফোন করে এ-কথা বলাতে মামুন ভাবিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি তো এ-বাড়িতেই থাকি। আমাকে বারবার ‘আলাদা দাওয়াত’, ‘আলাদা দাওয়াত’ বলার দরকার কী?’

– ‘বুঝলে না, তোমাকে আলাদা দাওয়াত মানে তোমাকে আলাদা প্রেজেন্টেশন দিতে হবে’ – বললেন ভাবি।

– ‘আর দুজনের একসঙ্গে বার্থডে করার কারণটা বুঝলি না?’ সেলিমভাই চোখ মটকে যোগ করলেন, ‘ছেলেমেয়ে দুজনকেই তা হলে আলাদা করে দুটো গিফ্ট দিতে হবে। খাওয়া কিন্তু ওই একটাই।’ ওঁরা অনেক দিন থেকেই রজব আলীকে চেনেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন এলো রজব আলীর। সেলিমভাইকে বললেন, ‘ছোট মেয়েটাও কান্নাকাটি করছিল। তাই ওর জন্মদিনটাও একসঙ্গে লাগিয়ে দিলাম। মামুনের কিন্তু আলাদা দাওয়াত।’ এক বাড়ি থেকে মোটামুটি ছয়টি উপহার নিশ্চিত হলো।

তবে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে মামুন রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। নানা কিসিমের আরবীয় ও উত্তর আফ্রিকার লোকে ঘর প্রায় ভরা। জানল, অনুষ্ঠানের তিন সপ্তাহ আগে থেকেই রজব আলী সাহেব লন্ডনের বিভিন্ন মসজিদে ঘুরে ঘুরে যত আরব পেয়েছেন সবাইকে ওর ছেলেমেয়েদের জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে এসেছেন। মুখে অবশ্য বলেছেন, ‘ইসলামে জন্মদিনের বিধান নেই জানি। তবু ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে চেয়ে একটা দিন…।’ আরবদেরও বউ-বাচ্চা আছে। বিষয়টা ওরা বুঝেছে এবং দলে দলে এসেছে। আর আরবদের উপহার বেশ ভারীই হয়। সবাই বিদায় নেওয়ার পর রজব আলী হেসে হেসে বললেন, ‘দেখলেন তো, আরব কুইত্তাগুলোরে কেমন…।’

লন্ডনে রজব আলী খোঁজ পেলেন যে ওর দেশের এক মানুষ এক আরব শেখের বাবুর্চির চাকরি করে এবং শেখের বেশ প্রিয়। শেখ যখন লন্ডনে থাকে ওই-ই রান্নাবান্না সব করে। রজব আলী তো তক্কে তক্কে থাকেন! খবর পেলেন একদিন ওই শেখ সত্যি সত্যিই লন্ডনে এসে গেছে। বাবুর্চিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে রজব আলী তো এক সকালে শেখের সামনে উপস্থিত। ঘরে ঢুকেই না কী উনি শেখের পা জড়িয়ে ধরে সমানে কান্না। শেখ তো শশব্যস্ত হয়ে, ‘আরে করো কী? করো কী? পা ছাড়ো!’ অনেক কষ্টে উদ্ধার পেয়ে শেখ জানতে চাইলেন, ব্যাপারটা কী? কাঁদো কাঁদো মুখে রজব আলী বললেন, আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে উনি এই কাফেরের দেশে ইসলাম প্রচার করে আসছেন। তবু কেবল দুটো পয়সার অভাবে আজো তার হজে যাওয়া হলো না। মৃত্যুর আগে কি একবার রসুলের রওজা মোবারক দেখতে পারবেন না! শুনে শেখ ওঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি সুন্দরী ইংরেজ মহিলাটিকে ডেকে রজব আলীর হজে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করতে বলে দিলেন। রজব আলী বললেন, ‘আমি একা কী করে যাই? আমার পরিবার আছে।’ শেখ বললেন, ‘তোমার পরিবারও যাবে। হজের দিনগুলোতে তোমরা আমার মেহমান হবে।’ বউ ও ছয় বাচ্চাসমেত হজ করে ফিরলেন রজব আলী। আর লন্ডনে ফিরেই বন্ধুমহলে বলতে থাকলেন, ‘পরের হজটাও ম্যানেজ করে এলাম।’

– ‘কী রকম?’ সবার কৌতূহলী প্রশ্ন।

– ‘আরে ছিলাম তো আরব কুইত্তাটার মেহমান। সে তো এলাহি ব্যাপার-স্যাপার! তো ওর বাড়িতে আরেক মেহ্মান ছিল শেখের বন্ধু টয়োটা কোম্পানির আবুধাবির প্রতিনিধি। তো ওকে ধরে বসলাম। একবার হজে কি মন ভরে? খুব ইচ্ছা, আরেকবার হজ করি। উনি বলে দিলেন, ঠিক আছে। আসছে হজে তুমি আমার মেহমান হবে। আমিও কম না কি? বললাম, আমার        বউ-বাচ্চা? উনি বলে দিলেন, তারাও আমার মেহমান হবে। তারপর আরব কুইত্তাটা ওর প্রাইভেট সেক্রেটারিকে ডেকে বলে দিলো সব ব্যবস্থা করে দিতে।’

ঘটনা সত্যি। রজব আলী তার পরের বছরও নিখরচায় সপরিবারে হজ করে এসেছিলেন। শুধু যেটা আর বলেননি যে, লন্ডন-মক্কা কতগুলো টিকিট লাগবে টয়োটা কোম্পানির প্রতিনিধির প্রাইভেট সেক্রেটারির এ-প্রশ্নটার জবাবে রজব আলী যখন বলেছিলেন, আটটা, আমি আমার বউ আর ছয় বাচ্চা, তখন প্রাইভেট সেক্রেটারিটার মুখে যেন একটা ভ্রুকুটি খেলে গিয়েছিল, কলমটাও যেন ক্ষণিকের জন্য থমকে গিয়েছিল। এমনকি, শেখের বন্ধু অত ধনী ‘আরব কুইত্তাটা’র মুখেও মেঘের একটা ছায়া দেখা দিয়েই ফের মিলিয়ে গেল। তবে সেটা অন্যদের দেখার ভুলও হতে পারে!

রজব আলীর গল্প অবশ্য এখানেই শেষ নয়। শুধু ‘আরব কুইত্তা’ নয়, ‘ব্রিটিশ কুইত্তা’দের ছাড়বারও পাত্র নন রজব আলী। ব্রিটিশ পপগায়ক ক্যাট স্টিভেনসন তখন ‘ইউসুফ ইসলাম’ নাম নিয়ে নতুন মুসলমান হয়েছে। চারদিকে তখন সেটাই গরম খবর। ক্যাট স্টিভেনসন তখন একটা নতুন মুসলিম প্রাইভেট স্কুল খুলেছে, যেখানে শুধু ইসলামি কেতায় লেখাপড়া শেখানো হবে। তবে কায়দা-কানুন হবে সব ব্রিটিশ প্রাইভেট স্কুলের মতোই। আর খরচও তেমনই উচ্চ মাপের। তো রজব আলী সাহেব একদিন গিয়ে ক্যাট স্টিভেনসন তথা ইউসুফ ইসলামের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলেন। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ ক্যাট স্টিভেনসন তো এরকমটি জন্মেও দেখেননি! ‘আরে করো কী? করো কী?’ বলে যতই পা ছাড়াতে যায়, রজব আলী ততই কাঁদতে থাকেন। অবশেষে তাকে জোর করে ছাড়িয়ে ক্যাট যখন বিষয়টা জানতে চাইল তখন কাঁদো কাঁদো মুখে রজব আলী বললেন, উনি সারাজীবন এদেশে ইসলাম প্রসারে কাজ করেছেন। আর আজ পয়সার অভাবে ওর ছেলেমেয়ে দুটোকে উনি ভালো প্রাইভেট ইসলামি স্কুলে ভর্তি করাতে পারছেন না। ক্যাট স্টিভেনসন তখন ওর সেক্রেটারিকে ডাকলেন। বলে দিলেন যে, রজব আলীর দুই ছেলেমেয়ে ওঁর প্রাইভেট স্কুলে পড়বে। টিউশন ফি, বই-খাতা কেনা, সব ফ্রি। রজব আলী বললেন, লন্ডন শহরে যাতায়াতের এত খরচ! শুনে ক্যাট স্টিভেনসন তথা ইউসুফ ইসলাম ওর সেক্রেটারিকে এটাও             বলে দিলেন যে, যতদিন রজব আলীর ছেলেমেয়েরা পড়বে ট্রেনে-বাসে ওদের যাতায়াতের জন্য ওঁর স্কুল থেকে ওদের যেন ফ্রি পাস দেওয়া হয়। রজব আলী পরে বাঙালি সমাজে গর্ব করে বলে বেড়াতেন, ‘মুসলমান হয়েছে তো কী হয়েছে! ব্রিটিশ কুইত্তাটারে কেমন ছিল দিলাম!’

সেলিমভাই ব্যবসা করবেন স্পেনে। একদিন বললেন, ‘চল রে মামুন। স্পেন দেশটা দেখে আসি।’ স্পেনের এক গহিন গ্রামে একটা ফ্যাক্টরি দেখতে যাওয়া হলো। স্পেনের এসব গ্রামাঞ্চলে ইংরেজি কেউ কিছুই বোঝে না। সেদিন খুব খিদে পেয়েছিল ওদের। সাগরপারের এক গ্রামীণ রেস্তোরাঁয় গাড়ি থামিয়ে ওরা ভেতরে ঢুকল। সেলিমভাইয়ের মনোবাঞ্ছা, সাগরপারের রেস্তোরাঁটায় উনি মাছ খাবেন। তো ওয়েটারটাকে উনি ‘ফিশ, সি ফিশ, মাছলি’ এসব যতই বলেন, সে-ব্যাটা কিছুই বোঝে না। তখন সেলিমভাইয়ের মাথায় একটা বুদ্ধির ঝিলিক খেলে গেল! কোথায় যেন পড়েছিলেন, এরকম এক পরিস্থিতিতে পিকাসো নাকি টিস্যুপেপারে খাদ্যদ্রব্যটার ছবি এঁকে দিতেন। আর স্পেন তো পিকাসোরই দেশ। সেলিমভাই তাই পকেট থেকে কলম বের করে টিস্যুপেপারে কী যেন অাঁকলেন। মামুনও উঁকি মেরে দেখল, তবে নকশাটার কিছুই বুঝল না। আর ওয়েটারটা টিস্যুপেপারটা অনেকক্ষণ হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে শেষে ওটা সেলিমভাইয়ের হাতেই ফেরত দিয়ে বলল, ‘আমরা সাবমেরিন বিক্রি করি না!’

সেবারে স্পেনে মামুনের টানা প্রায় এক মাস থাকা হলো। ভাত জুটছে না কপালে। কাঁহাতক আর রুটি, পিৎজা আর স্পাগেত্তি খাওয়া যায়! মামুনের সমস্যা দেখে ওদের ব্যবসায়ের প্রিন্সিপাল ইগনোসিও মেজিকা বললেন, ‘বিশ মাইল দূরে একটা চীনা রেস্তোরাঁ আছে। সান সেবাস্তিয়ানে। ওখানে রাইস মিলবে।’

সাবমেরিনের ঘটনাটার পর থেকে মামুন সঙ্গে ‘স্প্যানিশ টু ইংলিশে’র একটা পকেট ডিকশনারি নিয়ে ঘুরত। সাগরপারে ছোট রেস্তোরাঁ। এক চীনা মেয়ে ও মা চালায়। মেয়েটি আবার চীনা ও স্প্যানিশ ছাড়া অন্য ভাষা বোঝে না। আর মা জানে শুধুই চীনা। মামুন জিজ্ঞেস করল, ‘রাইস আছে?’

ইংরেজি রাইস শব্দটা মেয়েটা বুঝল। মাথা নেড়ে বলল, ‘আছে।’ সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল, ‘সিড্রো?’ মামুন তো বোঝে না। তাড়াতাড়ি ‘স্প্যানিশ টু ইংলিশ’ বইটা খুলে দেখল ‘সিড্রো’ মানে শুয়োরের মাংস। মামুন তো ‘না না’ করে খুব জোরে মাথা ঝাঁকাল ‘নো…নো সিড্রো’। ও রাইস, ভেজিটেবল আর ফিশ অর্ডার দিয়ে বেশ আয়েশ করে বসল। খাবার এলো। খাওয়ার সময় মামুন লক্ষ করল, ভাতের সঙ্গে ছোট ছোট করে কাটা গাজরের মতো লাল লাল কী যেন। ওর একটু সন্দেহ হলো। মেয়েটাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী এটা?’ মেয়েটা ওকে খুব আশ্বস্ত করে বলল, ‘নো সিড্রো। …ইট ইজ জ্যামোন।’ মামুন ওর পকেট ডিকশনারিটা আবার খুলে বের করল। দেখল, লেখা আছে, ‘জ্যামোন’ মানে হচ্ছে ‘কচি শুয়োরের মাংস!’ মেয়েটা ওকে কোনো ধাড়ি শূকর দেয়নি। কচি শূকর তো আলাদা ব্যাপারে! মামুনের মাথায় হাত!!

তো সেবার মামুন একাই গেছে স্পেনে। যাদের সঙ্গে ওদের ব্যবসা সেই কোম্পানির তরুণ ইঞ্জিনিয়ার আলবার্তো বালতানাসের সঙ্গে ওর খুব খাতির হয়ে গেল। একদিন আলবার্তো বলল, ‘চলো, তোমাকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাই। ওখানে আমার মা আর বোন থাকে।’ তো একদিন মাদ্রিদ ছেড়ে অনেক অনেক ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে, অনেক ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চল পেরিয়ে এক সময় ওরা ক্যাটালিনা অঞ্চলের সানহোসে নামে এক পাহাড়ি গ্রামে এসে উপস্থিত হলো। ওখানেই আলবার্তোদের বাড়ি। আলবার্তোর বিধবা মা আর বোন থাকে বাড়িটাতে। মামুনরা খুবই উষ্ণ অভ্যর্থনা পেল। আলবার্তোর বৃদ্ধ মা তো মামুনকে এটা খাওয়ায়, ওটা দেখায়। আলবার্তোর বোনটি ফুটবল খেলে। লম্বায়-চওড়ায় মামুনের প্রায় দেড়গুণ। সহজ-সরল মেয়েটি ওর ঘরে নিয়ে মামুনকে দেখাল ফুটবল খেলে ও কী কী পদক পেয়েছে। তিন-চারদিন মামুন থাকল ওই বাড়িতে। একদিন বুড়ি বলল, ‘দাঁড়াও, তোমাকে পায়েলা খাওয়াব।’ পায়েলা কী জিনিস মামুন তো বোঝেই না। পরে বুঝল মাছ সেদ্ধ আর মোটা চালের অাঁটালো ভাত। একসঙ্গে ঘুঁটে রান্না। চরম বিস্বাদ! মামুন অবশ্য বুড়িকে বলল, ‘আসাধারণ      রান্না!’ বুড়ি তো খুব খুশি। আরেকদিন বুড়ি বলল, ‘তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। তোমরা বাঙালিরা খুব ভদ্র। তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে করবে?’ শুনে তো চরম ঘাবড়ে              মামুনের মনশ্চক্ষে শুধু ভাসতে থাকল ওর চেয়ে দেড়গুণ লম্বা ফুটবল-খেলোয়াড় মেয়েটির বিশালদেহী চেহারা। ঢোঁক গিলে বানিয়ে বলল, ‘আমার তো দেশে একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। আমি তো ওকে বিয়ে করব বলে কথা দিয়ে ফেলেছি।’ এ-রকম ভদ্র একটা ছেলেকে জামাই হিসেবে না পাওয়াতে বুড়িকে সত্যিই খুব দুঃখিত দেখাল। বিকেলেই মামুন আলবার্তোকে বলল, লন্ডনে ওর একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে! না গেলে ব্যবসায়ে বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। পরদিনই ক্যাটালিনা, তথা স্পেন ছেড়ে মামুন ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল।

রাজশাহীর মানুষ নিখিলদা, মানে নিখিল চন্দ্র সাহা একদিন লন্ডনে ফোন করে মামুনকে বললেন, ‘ইউরোপে এসেছো, রোম বেরিয়ে যাও।’ উনি রোমে থাকেন। সেই ছেলেবেলা থেকেই রোম দেখার খুব ইচ্ছা মামুনের। লন্ডন থেকে সস্তায় টিকিট কেটে খুবই ছোট একটা প্লেনে চাপল। জনাতিরিশেক যাত্রী। সব ইতালিয়ান। প্লেনটা এতই ছোট যে, স্বামী হচ্ছে পাইলট আর পাইলটেরই স্ত্রী হচ্ছে এয়ার হোস্টেস। আর সে-রাতেই ইউরোপে উঠল কিনা প্রচন্ড তুষারঝড়! ছোট প্লেনটা সেই             ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কাঁপতে কাঁপতে কোনো রকমে ইতালিতে পৌঁছল, কিন্তু দেরিতে আসার ফলে রোমের মূল বিমানবন্দরে নামার অনুমতি আর পেল না। নামতে হলো রোমের উত্তরে এক ছোট্ট অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে। ইতালীয় যাত্রীরা তো ‘গ্রাৎসি’, ‘গ্রাৎসি’ বলতে বলতে সব বেরিয়ে গেল। এখন মামুনের চিন্তা এই ডমেস্টিক বিমানবন্দরে তো ওর পাসপোর্টে সিল দেওয়ার কেউ নেই। ব্রিটেনে ফিরবে কী করে? আসলে অভ্যন্তরীণ এই বিমানবন্দরে পাসপোর্ট-সিলের কোনো লোকজনই নেই। একজন সিকিউরিটির লোক পেয়ে মামুন ওর দিকে পাসপোর্টটা এগিয়ে ওর কী করা উচিত জিজ্ঞেস করল। সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা বোমা পড়ল! লোকটা শশব্যস্ত হয়ে একটা বেল টিপল। গাঁট্টাগোঁট্টা দুই পুলিশ এসে হাজির। কোমরে রিভলবার গোঁজা। খুব গুরুগম্ভীর তাদের মুখ। মামুনকে ওরা নাম জিজ্ঞেস করল। নাম বলাতে এ.টি. দেবের ডিকশনারির মতো মোটা একটা বই বের করল ওরা। মামুন আড়চোখে চেয়ে দেখল বইটার ওপরে লেখা, ‘লিস্ট অব টেররিস্টস’। মামুন ভাবল, ‘হায় আল্লাহ, এ কী চক্করে পড়লাম!’ পুলিশ দুটি অনেক তন্নতন্ন করে গোটা বইটা খুঁজে মামুনের মতো চেহারা বা ওর নামটা কোথাও পেল না। তখন পাসপোর্টটা নিয়ে‘ গ্রাৎসি’ বলে ওতে একটা সিল লাগিয়ে তবে মামুনকে ছাড়ল ওরা।

ছাড়া পেয়ে মামুন নিখিলদাকে ফোন করল। ফোনটা বেজেই চলে, কিন্তু কেউই ধরে না। মামুন এয়ারপোর্টের বাইরে এলো। নিখিলদা থাকেন ভিলা দ্য ফ্রান্সিসকোর আশপাশে। হঠাৎ ওর মনে পড়ল, নিখিলদা বলেছিলেন, আমাকে না পেলে টার্মিনিতে চলে এসো। তখন রাত নেমে এসেছে। ছোট এয়ারপোর্টটার বাইরে এখন লোকজনও কেউ নেই। সুনসান। মামুন দেখল একটা বাসস্ট্যান্ডের মতো জায়গায় এক বৃদ্ধা নান একটা স্যুটকেসের পাশে বসে আছে। মামুনকে দেখে বৃদ্ধা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, ‘লন্ডন থেকে?’ মামুন বলল, ‘হ্যাঁ’। বুড়ি বলল, ‘আমিও। এক ঘণ্টা পর রোমে যাওয়ার বাস আসবে।’ তারপর বলল, বাসের টিকিট কিন্তু কাটতে হবে অ্যারাইভাল টার্মিনালে নয়, ডিপারচার টার্মিনালে। আজব ব্যাপার! তো মামুন অনেকটা হেঁটে গিয়ে বুড়ির আর ওর নিজের জন্য দুটো বাসের টিকিট কিনে নিয়ে এলো।

রোমে পৌঁছে ও ভাবল টার্মিনিতেই যাই। টার্মিনিতে পৌঁছে মামুন তো মহাবিস্মিত। এ কোথায় এলাম রে বাবা! এতো ঢাকার গুলিস্তান মনে হচ্ছে! এই রাতে শত শত বাঙালি দলবেঁধে ঘুরছে, নানা জায়গায় বসে, দাঁড়িয়ে সব জটলা করছে। মামুন এক বাঙালিকে জিজ্ঞেস করল, ‘এত বাংলাদেশি?’ লোকটা ওর এই বোকার মতো প্রশ্ন শুনে ওর দিকে আপাদমস্তক একবার তাকিয়ে রেগে বলল, ‘জানেন না, মিয়া? ইতালিতে সব লিগ্যাল করে দিচ্ছে। সারা ইউরোপ থেকে সব বাঙালি তাই দলে দলে আসছে। এই সপ্তাহে লাস্ট ডেট।’ নববইয়ের দশকের ওই সময়টাতে ইতালীয় সরকার তখন অনুমতিহীন বিদেশিদের ইতালিতে থাকার বিশেষ অনুমতি দিচ্ছিল।

শত শত বাঙালির মধ্যে বাংলা কথা শুনতে শুনতে মামুন টার্মিনিতে ঘুরতে থাকল। শেষে গেল টেলিফোন বক্সগুলোর দিকে। হঠাৎ খেয়াল করল ওর পাশের বুথে টেলিফোনে একজন পুরান ঢাকার ভাষায় খুব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাকে যেন বলছে, ‘সালাউদ্দীন ভাই… সালাউদ্দীন ভাই।’ মামুনের হঠাৎ মনে পড়ল রূপশের খুব পরিচিত পুরান ঢাকার নারিন্দার এক সালাউদ্দীন রোমে থাকে এরকমটি যেন বলেছিল রূপশ। লোকটি ফোন রাখলে মামুন জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, আপনি কী নারিন্দার সালাউদ্দীনের সঙ্গে কথা বলছিলেন?’ লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ। তা আপনি ক্যাঠা?’ মামুন বলল, ও এইমাত্র লন্ডন থেকে পৌঁছেছে। সব শুনে লোকটা বলল, নিখিলদাকে ও চেনে না, তবে সালাউদ্দীনকে বিলক্ষণ চেনে। বলল, ‘খাড়ান, খাড়ান, সালাউদ্দীন ভাই রে একটা ফোন লাগাই।’ ফোন করা হলো। মামুনের কাছে সব শুনে ফোনের ওপার থেকে সালাউদ্দীন বলল, ‘আরে, আপনি রূপশের চাচা, সেডা কইবেন তো! খাড়ান, ওইহানেই খাড়ান। আমি এহনি টার্মিনি আইতাছি।’

ওরা দুজনে কথাবার্তা বলছে এমন সময় একটা লোক এসে মামুনকে ব্যাগ হাতে নতুন মানুষ দেখে বলল, ‘আপনি কার্ড করাবেন?’ টেলিফোন করা লোকটা খেপে গেল। ‘তোমারে দিয়ে কার্ড করাবে ক্যান? করালে আমি করুম।’ দ্বিতীয় লোকটিও ছাড়বার পাত্র নয়। বলে, ‘কার্ড করার তুই কী জানস? ইতালিতে কয় দিন আইছস? দুদিনের পোলা!’ চরম ঝগড়া বেঁধে গেল। প্রায় হাতাহাতির অবস্থা! আশপাশের লোকজনেরা দুজনকে দুদিকে সরিয়ে দিলো।

অবশেষে সালাউদ্দীন এলো। মামুন বলল, ‘আমি নিখিলদার কাছে যাব।’ সালাউদ্দীন বলল, ‘কিয়ের নিখিলদা! আপনি আমার লগে থাকবেন।’

তো সালাউদ্দীন রোমের গরিব এলাকার এক গলির ভেতরে এক বাসায় নিয়ে গেল মামুনকে। দরজা দিয়ে ঢুকেই ওরা পেল বেশ বিরূপ অভ্যর্থনা। আরেকজন তেড়ে বলল, ‘এমনিই আমাদের থাকার জায়গা নেই! সালাউদ্দীন আবার নতুন লোক নিয়ে এসেছে!!’ একজন ফোঁড়ন কাটল, ‘পুরনো পাগলে ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানি!’ দুটো ঘরে এরা মোট আটজন থাকে। ফলে কথাটা খুব মিথ্যা নয়। মামুন একটু সংকুচিত হয়ে পড়ল। কিন্তু আজাদ নামে বয়সে তরুণ একটা ছেলে মামুনকে বলল, ‘আমি তো আইসক্রিমের দোকানে কাজ করি। সারারাত ডিউটি। আপনি আমার বেডে ঘুমায়েন। কেবল ভোর ৫টায় আমি ফিরলে বেডটা ছেড়ে দিয়েন।’ মামুন আর কী করে! রাজি হয়ে মাথা ঝাঁকাল।

বোঝা গেল, বাসাটা শফিকভাই নামে একজনের নামে। উনি ভাড়া নিয়ে এসব ছেলেকে সাবলেট দিয়েছেন। একজন জানাল, ‘আজ রাতটা থাকছে থাকুক। আর বেশি থাকতে হলে শফিকভাইয়ের ইন্টারভিউ লাগবে কিন্তু।’

বেশ রাতে শফিকভাই এলেন। সব শুনে মামুনকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তলস্তয়ের বই পড়েছেন?’ মামুনের এক ভাই ছাত্র ইউনিয়ন করত। ফলে ‘প্রগতি প্রকাশনী’র কল্যাণে বাড়িতে তলস্তয়, পুশকিন, গোর্কি, এঁদের অনেক বই-ই ছিল। মামুন গড়গড় করে বলল, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘আনা কারেনিনা…’। শফিকভাই খুশি হয়ে বললেন, ‘আপনি সলিড। আপনি যতদিন খুশি থাকেন।’

শফিকভাইয়ের ঘরেই মামুনের ঘুমানোর জায়গাটি জুটল। দেখা গেল আজাদসহ অন্যরা সবাই-ই প্রায় রাতে বাইরে কাজ করে। সে অর্থে ঘর দুটো রাতে ফাঁকাই থাকে। কিন্তু শফিকভাইয়ের জ্বালায় কী ঘুম আসার উপায় আছে! প্রায় সারারাত ধরে উনি রিমোট হাতে একটার পর একটা চ্যানেল টিপে চলেন। কোনো চ্যানেলই আবার দশ সেকেন্ডের বেশি দেখেন না। আবার আরেকটা চ্যানেল! চোখের সামনে লাইটের এই নড়ানড়িতে মামুনের তো ঘুমের দফারফা। না পেরে শেষমেশ বলেই ফেলল, ‘শফিকভাই, আপনি ঘুমাবেন না?’ শফিকভাই বললেন, ‘ঘুম কী আসে রে ভাই? দেশে বউ-বাচ্চা আছে। সারাক্ষণ ওদের কথা মনে পড়ে।’ তারপর নিজের থেকেই তার জীবনের গল্প বলা             শুরু করলেন, ‘ঢাকায় চাকরি করতাম এক প্রাইভেট ফার্মে। টাকা-পয়সা কিছু উল্টাপাল্টা হয়েছিল। আমি অবশ্য একা না, ম্যানেজার ব্যাটাও ছিল। কিন্তু ওয়ারেন্টটা হলো আমার নামে। তাই ইতালিতে চলে এলাম। এখন আর দেশে যেতে পারি না।’

এদিকে কাকডাকা-ভোরে আজাদ ফিরে এলো। ফলে মামুনকে উঠে গিয়ে কোণের এক চেয়ারে বসে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সকাল পর্যন্ত কাটাতে হলো।

সকালবেলা দেখল ওরা দলবেঁধে কোথায় যেন যাচ্ছে। মামুন ওদের সঙ্গে যেতে চাইলে সালাউদ্দীন বলল, ‘এ-কাজ আপনি পারবেন না।’ মামুনের জোরাজুরিতে পরে ওরা মামুনকেও সঙ্গে নিল। সবাই মিলে বাসে চেপে নামল রোমের উপকণ্ঠে চারটে হাইওয়ে যেখানে মিলেছে সে-রকম একটা মোড়ে। প্রচুর গাড়ি যাচ্ছে নানা দিক দিয়ে। বাস থেকে নেমেই ওরা একটা ঝোপের ভেতর থেকে প্লাস্টিকের ছোট বালতি, ব্রাশ, সাবান নিয়ে পাশের পেট্রোল পাম্পটা থেকে বালতিতে পানি ভরে মোড়ের কোনায় কোনায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্রাফিক সিগনালে গাড়ি একটু দাঁড়াতেই কেউ দৌড়ে গিয়ে গাড়িটার কাচ মুছে দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায়। গাড়িচালকরা তখন কিছু পয়সা ছুড়ে দেয়। ওরা                সে-পয়সাগুলো কৌটায় তুলে নেয়। একজন বলল, ‘মামুনভাই, আপনি তো এ কাজ পারবেন না। আপনি বরং পয়সাগুলো কুড়িয়ে কৌটায় রাখেন। তাতে আমাদের সময় বাঁচবে।’ মামুন সেটাই করছিল। এমন সময় লক্ষ্য করল, একটা থামানো গাড়ি থেকে একটা বুড়ি ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। মামুন গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। বুড়িটা গাড়ির চালকটিকে, দেখে মনে হলো ওর ছেলে, ইতালীয় ভাষায় কী যেন বলল। ছেলেটা গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে একগাদা খুচরা পয়সা নিয়ে মামুনের হাতে তুলে দিলো। মামুনের দুহাত ভরেও উপচেপড়ে, এত পয়সা! যারা গাড়ির কাচ মুছছিল তারা ঠিকই খেয়াল করল ব্যাপারটা। ওরা ছুটে এলো। একজন বলল, ‘এ পয়সা কিন্তু চার ভাগে ভাগ হবে।’ তাই-ই হলো।

অনেকেই পয়সা দেয় না বা গাড়ি মোছাতে চায় না। কেউ কেউ আবার গালিও দেয়। তো বাঙাল কি ছেড়ে দেওয়ার পাত্র! সিগনালটা উঠলে গাড়িটা স্টার্ট দিলেই ওরাও চেঁচিয়ে পাল্টা গালি দেয়। এতদিনে ইতালীয় কিছু গালিগালাজ ওরাও ভালোই শিখে ফেলেছে। আর গালি দেওয়াটাও বেশ নিরাপদ। কারণ ওই ড্রাইভার ব্যাটা তো এই হাইওয়েতে গাড়িটা আবার ঘুরিয়ে আনতে পারছে না!

 

মোড়ের কাছেই পেট্রোল পাম্পটায় একজন বাঙালি কাজ করে। পাকা চাকরি বলে তার দেমাগই আলাদা। এদের একজন বলল, ‘মিজানভাই। আপনার মালিককে বলে একটা চাকরি…’। মিজানভাই খুব ভাব নিয়ে, ‘মালিক তো বেশি আসে না। এবার এলে… দেখি, …তোদের দুজনের চাকরির কথা বলব। এই, তোদের কাছে সিগারেট আছে?’ একজন তাড়াতাড়ি পকেট থেকে সিগারেট বের করে মিজানভাইকে দিলো। আরেকজন লাইটার দিয়ে তা ধরিয়ে দিলো। একটা গাড়িতে হেলান দিয়ে মিজানভাই পরম আয়েশে তা টানতে থাকল।

সারাদিনের পর টিনের কৌটায় খুচরা পয়সা প্রায় উপচে পড়ছে। ওদের সবার পকেটও পয়সায় ভরা। হাঁটলে ঝনঝন আওয়াজ ওঠে। মামুন শুধু ভাবছিল, এত খুচরা পয়সা দিয়ে কী হবে? কিছুক্ষণ পরই অবশ্য বুঝল। সন্ধ্যায় সবাই-ই এক পাবে গিয়ে ঢুকল। বোঝা গেল পাবের মেয়েটা ওদের খুবই পরিচিত। মেয়েটা বলল, ‘এনেছ?’ ওরা কৌটাটা ঝাঁকিয়ে ঝনঝন শব্দ শোনাল। মেয়েটা বেজায় খুশি। ওদের কাছ থেকে খুচরোগুলো গুনে গুনে নিয়ে ওদেরকে কিছু নোট দিলো। মদের দোকানে খুচরার দরকার পড়ে খুব। আর নোটগুলো হাতে নিয়েই ওরা ছুটল সুপার স্টোরে। ডিম কিনল, আলু কিনল, কিনল চাল আর টমেটো। অন্য কিছু তেমন কিনল না। মামুন জিজ্ঞেস করাতে একজন বলল, ‘চিনলে তো কিনব? কোন্টার মধ্যে যে কী আছে! চাল-ডাল, ডিম-আলু এসব চিনি, তাই ওগুলোই কিনি।’ রাতে ওসব দিয়ে রান্না হলো। আর পরদিন সকালে আবার ওরা দলবেঁধে বের হলো। সেদিন আরেকটা চৌরাস্তার মোড়ে।

রোমে যার চাকরি আছে তার ঠাটবাটই আলাদা। যেমন ‘চিক্কো দি গ্রানো’, মানে মুরগি ফ্রাইয়ের দোকানে কাজ করে বিক্রমপুরের খালেকভাই। তো খালেকভাইয়ের ভাবভঙ্গি দেখে মামুনের মনে হলো, ইতালির প্রধানমন্ত্রীর পরের গুরুত্বপূর্ণ পদটাই বোধহয় ওর। রোমের এক ব্যস্ত রাস্তায় ওই দোকানে গেলে খালেকভাই ওদের দিকে চোখ ভারি করে তাকাল। সালাউদ্দীন ওকে চাকরির কথা বললে বলল, ‘চাকরি কি এত সোজা! আচ্ছা, দেখবখন।’ মামুন লক্ষ করল ‘চিক্কো দি গ্রানো’ বা মুরগি ফ্রাইয়ের দোকানে কাজ পাওয়াটাকে সালাউদ্দীনরা মনে করে জীবনের শেষ কথা। আর সেজন্যে পারলে ওরা খালেকভাইয়ের হাত-পাও টিপে দেয়!

কেউ কেউ অবশ্য স্বাধীন ব্যবসা করে। স্বাধীন ব্যবসা মানে ট্রিভি ফাউন্টেন বা রোমের ট্যুরিস্টভরা এসব জায়গায় ছোট ছোট ভাসন্ত দোকান চালায়। এসব দোকানে ওরা ফুল, লাইটার, সিগারেট এসব বেচে। ভাসন্ত দোকান, কারণ ক্যারিবিয়ান                 বা পুলিশ দেখলেই, পুরো দোকানটা তুলে ছুটে কোনো             আধো-অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়তে হয়। পুলিশ চলে গেলেই আবার দোকান পেতে বসা।

সেদিন সালাউদ্দীন আর মামুন রোমের শহরতলির এক              রাস্তায় ঘুরছে। দেখল কালো কোট পরে অনেক লোক এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একটা কফিন। সালাউদ্দীন বলল, ‘চলেন, দেখি কীভাবে কবর দেয়।’ ওরা দুজনও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওই রকম ভাবগম্ভীর এক পরিবেশে দুজন অন্য রকম পোশাক পরা ভিনদেশিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সবাই ওদের দিকে বারবার তাকিয়ে দেখছিল। শেষে এক          বুড়ো মতো লোক ওদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘তু তো ইন্ডিয়ানো?’ সালাউদ্দীনও কম যায় কিসে! ও ওর ভাঙা ইতালীয়তে বলল, ‘তু তো ইতালিয়ানো?’ শুনে লোকটা বেজায় খেপে গেল। মামুন ভাবল মওতা বাড়িতে ঝামেলা পাকানো ঠিক নয়। মানে মানে কেটে পড়ল দুজনে। মামুন জিজ্ঞেস করল, ‘লোকটা অত খেপল কেন? আপনি কী বলেছেন?’ ‘কিছুই বলিনি। আমি কি ইতালি ভাষা জানি যে বলব?’ তারপর সালাউদ্দীন বিজ্ঞের মতো যোগ করল, আসলে এরা তো মৃত লোকটার আত্মীয়। আমাদেরকে দেখে ভেবেছে বোধহয়, এরা আবার ওই মরা লোকটার ছেলে কিনা! কে জানে ইন্ডিয়ায় গিয়ে ব্যাটা কখনো বিয়ে করেছিল কিনা? সম্পত্তির ভাগ চাইতে এসেছে বোধহয়! তাইতেই ওরকম খেপল।

– ‘বিয়ে’?’ মামুন অবাক হয়।

– ‘আরে, এরা যেখানে যায় সেখানেই বিয়ে করে। ইতালীয়দের আপনি চেনন না!’

মামুন ভাবল, হবেওবা!

পরদিন ভোরে ওদের আস্তানায় এলো একটা বাঙালি ছেলে। হাতে ব্যান্ডেজ। ও জার্মানি থেকে বর্ডার পার হতে গিয়ে সীমান্তরক্ষীর কুকুরের কামড় খেয়েছে? বলল, ‘কী বলব, ভাইজান? …শালা বাঘের মতো একেকটা কুত্তা। আমার বিশ মার্ক দিয়ে কেনা কোটটার কী অবস্থা করেছে, দেখেন!’ সত্যিই, কোটটা অনেক জায়গায় ছেঁড়া, প্যান্টটার অবস্থাও তথৈবচ!

ওরা প্রতিদিন সন্ধ্যাতেই টার্মিনিতে যেত। গোটা এলাকাজুড়ে একদিকে আফ্রিকানরা, একদিকে চীনারা, আরেক দিকে বাঙালিরা। প্রত্যেকে ছোটখাটো নানা ব্যবসা করে। আফ্রিকানরা মূলত সিগারেট-লাইটার বিক্রি করে, বাঙালিরা কেউ কেউ            ভাত-তরকারি রেঁধে এনে তা বিক্রি করে। তবে দেখাল বটে চীনারা! মামুন লক্ষ্য করল ওরা চাঁদা তুলে দলবেঁধে সেলাই মেশিন কিনে কাপড় সেলাই করে দিব্যি দু-পয়সা আয় করছে। রীতিমতো ভালো আয়!

দেখতে দেখতে লিগ্যাল হওয়ার দিন ঘনিয়ে এলো। মামুনের কাগজপত্রের দরকার নেই, কারণ ওর ইংল্যান্ডের ভিসা রয়েছে। তবুও কিছুটা সালাউদ্দীনদের সঙ্গে বন্ধুত্বের টানে, কিছুটা কৌতূহলে, ও-ও ওদের সঙ্গে গেল। রোজ কেয়ামতের মতো বিশাল লম্বা এক লাইন। সে লাইনে বাঙালি, আফ্রিকান, ভারতীয়, পাকিস্তানি, চীনা, নেই কে! ওরা বাংলায় কথা বলছিল। লাইন থেকে এক পাকিস্তানি টিটকারি মারল, ‘আরে আপনে জবান ভুল গ্যায়া তু!’ শুনে সালাউদ্দীন খেপে গিয়ে বলল, ‘হালার পো পাকিডা কয় কী!’ বড় ঝগড়া লাগার আগেই লাইনটা এগিয়ে গেল। সবাইকে ডেকে ডেকে ছোট সাক্ষাৎকার নিয়ে একটা করে কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তা এ-ধরনের সমাবেশে ধাক্কাধাক্কি হবেই। হঠাৎ মৃদু ধাক্কাধাক্কিটা রীতিমতো এক বিশৃঙ্খল ঠেলাঠেলিতে পরিণত হলো। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশদের আর সহ্য হলো না। এক মহিলা পুলিশ একজনকে কষে এক লাথি মারল। দেখা গেল, ছেলেটা বাঙালি। মাটি থেকে উঠতে উঠতে ছেলেটা বরিশালি বাংলায় বেশ খানিকটা কাঁচা খিস্তি করল। অন্য দু-চারজন ওর শরীর থেকে ধুলো-টুলো ঝেড়ে দিলো।

 

রোমে এসে ভ্যাটিকান না দেখে তো ফেরত যাওয়া যায় না। সালাউদ্দীন বলল, ‘কুছ পরোয়া নেই। আগামী রোববারেই হবে।’ সকালে বাসে চেপে ওরা দুজনে ভ্যাটিকানে এলো। দুজনের পকেটই গড়ের মাঠ। প্রথম কিছুক্ষণ তো সব দেখেশুনে সময়টা ভালোই কাটল। তারপর শুরু হলো খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ। চারদিকে এত ভালো ভালো সব খাবারের দোকান। কিন্তু পকেটে পয়সা থাকলে তো! হঠাৎ সালাউদ্দীন ছোট একটা পিৎজার দোকানের মালকিন এক বৃদ্ধাকে প্রায় জড়িয়ে আদরের ভঙ্গিতে ‘মাম্মো… মাম্মো’ বলে ডাকতে শুরু করল। ‘মাম্মো’ মানে মা আর ‘মা’ ডাক কোন নারীরই না ভালো লাগে! বৃদ্ধাও খুশিতে ইতালীয় ভাষায় নানা কিছু বলল। ওরা অবশ্য কিছুই বুঝল না। কিন্তু সালাউদ্দীন ওর ভাঙা ভাঙা ইতালীয়তে বোঝাতে পারল যে, ও বহুদিন দেশছাড়া। বুড়িকে দেখে ওর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ছে। লাভ যেটা হলো বুড়ি খুব খুশিমনে একটা পিৎজা থেকে ওদেরকে দুটো বড় বড় পিস কেটে দিলো। তা নিয়ে ওরা খুশিমনে ফের আবার পথে বেরিয়ে পড়ল। খাওয়ার সমস্যাটা মিটল। কিন্তু পানি? মামুনের খুব ইচ্ছা এক বোতল কোক খায়। কিন্তু পকেট যে খালি! সালাউদ্দীন দমবার পাত্র নয়। ভ্যাটিকানের বড় গির্জাটার পাদ্রিরা লাইন করে দাঁড়ানো লোকজনকে পবিত্র খ্রিষ্টীয় জল দিচ্ছিল। ভক্তরা পরম ভক্তিভরে সে-জল হাতে নিয়ে কেউ মাথায় দিচ্ছে, কেউবা মুখে দিচ্ছে। সালাউদ্দীন মামুনের হাত ধরে দিব্যি লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। দুহাতে অাঁজলা ভরে অনেকখানি পানি খেল দুজনে। ফ্রি!

সেদিন সালাউদ্দীন বলল, ‘চলেন, চাচা। আমাদের দাওয়াত আছে।’ ‘দাওয়াত?’ মামুন বিস্মিত হলো। ‘আরে আমাদের সবারই দাওয়াত। চলেন, চলেন।’ রাতে দাওয়াত। কারণ এখানে দিনে সবাই কাজে ব্যস্ত থাকে।

মেট্রোতে যাওয়ার পথে সালাউদ্দীন বলল, ‘চাচা, আপনার কাছে দু-এক পাউন্ড হবে?’ মামুন মানিব্যাগ খুলে দেখে বলল, ‘পাঁচ পাউন্ডের একটা নোট আছে।’ সালাউদ্দীন বলল, ‘ওতেই হবে।’ মামুন বলল, ‘কিছু কিনে নিয়ে যাই?’ সালাউদ্দীন বলল, ‘কিনতে হবে না। ক্যাশ দিতে হবে।’ মামুন বিষয়টা ঠিক বুঝল না।

রোমের বেশ গরিব এলাকায় এক বাঙালি মেসে গিয়ে পৌঁছল ওরা। বেশ কয়েকজন বাঙালি ছেলে থাকে এ-বাড়িটাতে। দরজার কাছে একটা কৌটা রাখা। যেই ওরা ঢুকল একজন হাত ধরে মামুনকে কৌটটার কাছে নিয়ে গেল। মুখে বলল, ‘ফেলেন।’ সালাউদ্দীনের চোখের ইশারায় মামুন ওর পাঁচ পাউন্ডের নোটটা কৌটাটায় ফেলতে যাবে, এমন সময় একজন ওর হাত চেপে ধরল। ‘কী দিচ্ছেন?’ ওরা পাউন্ড আগে তেমন দেখেনি। সালাউদ্দীন খেপে গেল, ‘এই মিয়া, পাউন্ড চেনেন না! এটা পাঁচ পাউন্ড। ভাঙালে পনেরো হাজার লিরা হবে। ওটা আমাদের দুজনের চাঁদা।’ মামুন খেয়াল করল ওর মর্যাদা হঠাৎ খুব খুব বেড়ে গেল। সবাই বলল, ‘এই সর, সর। উনি আমাদের ভিআইপি গেস্ট। লন্ডন থেকে এসেছেন।’ মামুন বুঝল, দাওয়াতের চাঁদা যেখানে হাজার লিরা, সেখানে ওর পনেরো হাজার লিরা চাঁদা দেওয়াটাই ওর সম্মানের এত কারণ।

হাতে হাতে প্লেট তুলে দেওয়া হলো। একজন মাইকে অ্যানাউন্সের মতো ঘোষণা করল, ‘কেউ দুবারের বেশি নিতে পারবেন না।’ তারপর হঠাৎ মামুনের দিকে চোখ পড়ায় ‘আপনি আলাদা। আপনি ভিআইপি। আপনি যতবার খুশি নিতে পারেন।’ মামুন শুনল পেছনে একজন আরেকজনকে বলছে, ‘লন্ডনে থাকে তো। …পয়সা আছে। আমরা তো ভাই দুবারের বেশি নিতে পারব না।’

 

মামুন প্লেট হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়াল। ওরাই তুলে দেবে যাতে কেউ বেশি না নিয়ে নেয়। খাবার মেন্যু অবশ্য সামান্যই – খিচুড়ি, ভেড়ার মাংসের ঝোল, ডিম ভাজা আর সালাদ। আর তাইতেই এত উত্তেজনা!

এসব নানা কান্ডকারখানা দেখে শেষমেশ মামুন ঠিক করল, যথেষ্ট রোম দেখা হয়েছে। দুদিন পর এক সকালে লন্ডনে ফেরার প্লেনে চাপল ও। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply