মাহবুবুল হক : এক নিবিষ্ট ভাষা-ভাবুক

রাজীব চক্রবর্তী

২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির অতিথি ভবনে মাহবুবুল হক স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। সেটা ছিল দীর্ঘ বাইশ বছর পরে আমার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া। জন্মসূত্রে আমি বাংলাদেশের উত্তরসূরি – পূর্ব পাকিস্তান থেকে উন্মূলিত হয়ে আসা এক উদ্বাস্ত্ত পরিবারে নোয়াখাইল্যা বাবা এবং চাটগাঁইয়া মায়ের উত্তরাধিকার নিয়ে আমার পৃথিবীতে আসা। সে-হিসেবে বাংলাদেশ, তার মাটি এবং মানুষের প্রতি আমি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করি আজন্ম। ১৯৮৮ সালে যখন বাংলাদেশে যাই তখন আমি ১৪ বছরের কিশোর, আর ২০১০-এর যাওয়া পরিণত বয়সে অন্য এক চোখ নিয়ে। সে-চোখ প্রথম যাকে দেখল তিনি মাহবুবুল হক স্যার। নামের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আগেই – ওঁর বানানের বই সেই ছাত্রবয়সেই হাতে এসেছিল। আশা ছিল, বলা ভালো আশঙ্কা ছিল যে, ব্যাকরণের মতোই ঊষর-নিরম্বু হবেন ব্যাকরণিয়া। কিন্তু যাঁকে দেখলাম তাঁকে মামাবাড়ির দেশের (আমার মাতৃকুল চট্টলাবাসী হওয়ার কারণে সেখানে বসবাসকারী প্রত্যেকের সঙ্গেই মাতুলতুল্য আর্দ্রতার সম্পর্ক অনুভব করি আমি) মানুষ বলেই মনে হলো। বয়সে আমার পিতৃতুল্য, কিন্তু ‘আচরণ যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া বসে’! সদাহাস্য মুখাবয়ব, চোখে কৌতুকের ছোঁয়া, চলনে মাস্টারমশাই আর বলনে এক নির্ভরযোগ্য বন্ধু। প্রথম দিনেই তাই সখ্য হতে দেরি হয়নি। বয়স আর পদমর্যাদার ব্যবধান আমাদের মধ্যে কখনো প্রবেশ করেনি।

২০১০-এর এই বাংলাদেশযাত্রার কারণ একটু গম্ভীর। বাংলা একাডেমি একটি প্রামাণ্য বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়ন করতে চায় দুই বাংলার ব্যাকরণিয়া, ভাষা-ভাবুকদের সঙ্গে নিয়ে। সেই উদ্যোগে আমার মতো ছোকরা (যে বিশেষজ্ঞদল এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন তার সভ্যদের মধ্যে আমিই ছিলাম বয়োকনীয়ান) ভাষাকর্মী যে স্থান পেল তার পেছনে মূল অবদান (দায়-ই বলা ভালো!) আমার শিক্ষক অধ্যাপক পবিত্র সরকারের। ২০১০-এর ডিসেম্বরে পবিত্র স্যার আমাকে হঠাৎই একদিন জানালেন, ‘বাংলাদেশ যেতে হবে’ – আমিও দুপায়ে খাড়া! ভিসা হলো, যাওয়াও হলো। গিয়েই প্রথম পরিচয় মাহবুব স্যারের সঙ্গে – সঙ্গে ছিলেন স্বরোচিষদা, অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ বিষয়ক পঠনপাঠন কেন্দ্রের সর্বময় কর্তা বর্তমানে)। ব্যস! মুহূর্তে একান্ত নিজের জায়গা হয়ে উঠল টিএসসি।

প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণের কাজ শুরু হলো বাংলা একাডেমির প্রেস ভবনের দোতলায় মহাপরিচালকের তখনকার দফতর-সংলগ্ন সম্মেলন কক্ষে। সে-আসর চাঁদের হাট – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক পবিত্র সরকার, অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী, অধ্যাপক মাহবুবুল হক, অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার এবং এই অর্বাচীন। মাঝে মাঝে এসে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং খোশগল্পে আমাদের ঋদ্ধ করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান (কবিবর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে তিনিও এই প্রকল্পের সম্মাননীয় উপদেষ্টা ছিলেন)। ব্যাকরণের এই প্রকল্প বহু ভাষাপ্রেমী মানুষের ঔৎসুক্য উদ্রিক্ত করেছিল। সেই টানেই আরো নানা মানুষ ব্যাকরণের কর্মশালায় হাজির হয়ে কাজের অনুপ্রেরণার কারণ হয়েছেন – সৈয়দ শামসুল হক, খোন্দকার আশরাফ হোসেন (বড়ো অসময়ে তাঁকে আমরা হারিয়েছি), হাসান আজিজুল হক, জামিল চৌধুরী, গোলাম মুরশিদ (সেই সময় গোলাম মুরশিদ বাংলার বিবর্তনমূলক অভিধানের মতো একটি ঐতিহাসিক কর্মে বাংলা একাডেমিতেই নিমগ্ন ছিলেন), আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, ফকরুল আলম, মুহম্মদ আবদুল কাইয়ুম, আসাদ চৌধুরী। আর যাঁর উৎসাহে এবং অকৃপণ পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাকরণের এই শতাব্দীব্যাপী আরব্ধ কাজ সম্ভব হতে পেরেছিল তাঁর সোৎসাহ উপস্থিতি আমাদের উৎসাহে সমিধ সরবরাহ করেছে নিরন্তর – আবুল মাল আবদুল মুহিত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী।

যদিও ব্যাকরণের কাজ, তবু ব্যাকরণের মতো নীরস ছিল না আমাদের কর্মযাপন। হাসিতে, গল্পে, কথায় ভরে থাকত আমাদের কর্মশালা। এই হাসি-গল্প-আনন্দের এক অবিচল কা-ারি ছিলেন মাহবুব স্যার। ব্যাকরণের জটিল, কূট বিষয়ের মাঝে হালকা হাসির ফোয়ারা তুলতেন। বিচিত্র কাজ আর ভূরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ করেছে ওঁর জীবনবোধ। ছাত্রবয়স থেকেই বামপন্থী রাজনীতি, সংগঠন তৈরি করার অভিজ্ঞতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এক পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করেছে তাঁকে – সঙ্গে আছে বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এই পূর্ণতার স্পর্শ আমরা সকলেই পেতুম সে-কর্মশালায়। সবরকম প্রয়োজনে এবং বিপদে মাহবুব স্যারই ভরসা। কর্মশালা শুরুর দিকে যেমনটা হয়েই থাকে – কাগজ-আছে-কালি-নেই অবস্থা। সম্পাদনার কাজে লাল কালির কলম দরকার, কাঁচি দরকার, সেলোটেপ দরকার, পেপার ক্লিপ দরকার, বিভিন্ন বই দরকার, আরো হাজারটা জিনিস দরকার! বাংলা একাডেমি সে সবকিছুরই বন্দোবস্ত করেছিল সুচারুভাবে; কিন্তু ওই বন্দোবস্ত করার জন্য সরকারি পরিকাঠামোয় যে সময়টুকু লাগে তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়নি এক মুহূর্তও। মাহবুব স্যারের ঝুলিতে সবই আছে – শিবরামের ভাষায় বললে – যা এখন দরকার, যা পরে দরকার, যা অতীতে দরকার ছিল, যা অদূর-ভবিষ্যতে দরকার হবে, যা সুদূর-ভবিষ্যতে দরকার হবে, যা কখনোই দরকার হবে না, যা দরকার হবে কিনা জানি না – এমন সবকিছুই ওঁর ঝুলি থেকে বেরোত। একটা অসামান্য জীবনীশক্তি ওঁর আছে, যা দিয়ে সবাইকে কাছে টানতে পারেন, ভালোবাসতে পারেন, নিজের করে নিতে পারেন। ব্যাকরণের কাজে দীর্ঘ সময় নিজের বাড়িঘর থেকে দূরে থেকেও আমরা নিঃসঙ্গ হইনি তার একটা বড় কারণ মাহবুব স্যারের উপস্থিতি।

সারস্বত চর্চায় যে-ঐতিহ্য আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে তার উত্তরাধিকার ওঁর মধ্যে দেখেছি। বাঙালির ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি সবেতেই শিক্ষার্থীর অনুসন্ধিৎসা নিয়ে নিবিষ্ট হয়েছেন। যা দেখেছেন তাই নিয়েই ভেবেছেন – ভাবানোর চেষ্টা করেছেন অন্যদের। জ্ঞানের অন্বেষণে ওঁ এক নিরলস সাধক। আজ যখন সর্বত্র ফাঁকিবাজি, মিথ্যা অহংকার, উন্নাসিকতা আমাদের গ্রাস করছে, সেই সময়ে ওঁর নিষ্ঠা, একাগ্রতা, তন্মনস্কতা আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হতে পারে। ব্যাকরণের এই প্রকল্প আমাকে সুযোগ দিয়েছিল দীর্ঘ সময় ওঁর সঙ্গে কাটানোর। দিনের পর দিন দেখেছি কত পরিশ্রমে সাজিয়ে তুলছেন, গুছিয়ে নিচ্ছেন নিজের ভাবনাচিন্তাকে। দিনের প্রতিটি ক্ষণ নিমগ্ন হয়ে থাকতে দেখেছি বিদ্যাচর্চায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি বিদ্যালয় স্তরের পাঠক্রম তৈরি, তাদের জন্য বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন, ভাষা-ব্যাকরণ বিষয়ে জেলায় জেলায় সচেতনতা অভিযানে তাঁর উৎসাহ-উদ্দীপনায় অভাব হয়নি কখনো। গবেষণা, গ্রন্থ প্রণয়ন, সম্পাদনা, অনুবাদের কাজ, বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের এক পরম ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছেন। জটিল ও কঠিন বিষয়কে সহজ ও সাধারণবোধ্য করে তোলার সামর্থ্য আছে ওঁর। সেসঙ্গে নতুন ও অজানা বিষয়কে জানা এবং আয়ত্ত করার এক অসামান্য এষণা ওঁকে প্রণোদিত করে সর্বদা এই বয়সেও। গ্রন্থপ্রেমও তাঁর অসামান্য – চট্টগ্রাম শহরে ওঁর বাড়িতে গেলেই এ-কথার সারবত্তা বোঝা যায়। কী নেই সেই গ্রন্থাগারে? বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিবিষয়ক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থাদি, পত্রপত্রিকা, সংবাদপত্রের কর্তিকা ওঁর সংগ্রহে দেখেছি। অকাতরে প্রয়োজনে সেসব জিজ্ঞাসুকে ঋণ হিসেবেও দিয়েছেন। আমাকেই যে কত বই, পত্রিকা কপি করে দিয়েছেন! নিজের কাছে না থাকলে কার কাছে আছে সে-খোঁজ নিয়ে নিজেই তা হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। বিদ্যাচর্চার প্রতি শুদ্ধ প্রেম না থাকলে এভাবে কাজ করা যায় না। ওঁ আমাদের প্রজন্মের সামনে এক দৃষ্টান্ত।

না, ওঁর সামগ্রিক কাজের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে – গজ ফিতে দিয়ে পৃথিবীর আয়তন মাপা যায় না! সাহিত্য ও সংস্কৃতিই তাঁর বিচরণের প্রাথমিক ভূমি। সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং সুকান্ত ভট্টাচার্য – এই তিনজন আধুনিক কবি ও তাঁদের কাব্য নিয়ে তাঁর গবেষণা সারস্বত স্বীকৃতি পেয়েছে আগেই (তিনজন আধুনিক কবি : সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্য, ২০০৫, কলকাতা : নয়াউদ্যোগ)। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর কাজ (নজরুল তারিখ অভিধান, বাংলা একাডেমি) জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যে কঠিন শ্রম তিনি এ-কাজে দিয়েছেন তা বাঙালি জাতিকে কৃতজ্ঞ করেছে – এই কাজে তিনিই পথিকৃৎ। বাংলা সাহিত্য পর্যালোচনামূলক লেখা (বাংলা সাহিত্য : কয়েকটি প্রসঙ্গ, ২০০৪; বাংলা সাহিত্য : নানা নিবন্ধ, ২০১০) বাঙালির সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক লেখালেখি (লোকসংস্কৃতি : কয়েকটি প্রসঙ্গ, ২০০৮; বাংলার লোকসাহিত্য : সমাজ ও সংস্কৃতি, ২০১০), শিশুপাঠ্য বই (বীরশ্রেষ্ঠদের কথা, ২০০২; ছড়ায় ছড়ায় বাংলা বানান, ২০০১; গল্পে গল্পে নজরু, ২০০৯, ইত্যাদি); বিদেশি সাহিত্যের বঙ্গানুবাদ (সোভিয়েত রাশিয়ায় গমন এবং রুশ ভাষার পাঠগ্রহণ), জীবনী (আশুতোষ চৌধুরী, ১৯৯৪; লোকমান খান শিরওয়ানি, ২০১৬), বিদ্যালয়স্তরের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনা, সংবাদপত্রের জন্য স্টাইলশিট তৈরি, সেই সঙ্গে বিদ্যালয়স্তরের পাঠক্রম তৈরি এবং নিরন্তর পরিমার্জনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখা – এ সমস্তই তাঁর বিদ্যানিষ্ঠার পরিচয় বহন করে। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন একাধিক রচনাবলি, প্রবন্ধসংগ্রহ (বাঙালি
সংস্কৃতির রূপ, গোপাল হালদার
, ২০১১), সম্পাদিত পাঠ তৈরি করেছেন চর্যাপদের (চর্যাগীতি পাঠ, ২০০৯/ ২০১১)। সাহিত্য-সংস্কৃতির পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে তাঁর ভাবনা বিশিষ্টতা দাবি করে। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বানান, প্রয়োগ নিয়ে অসংখ্য রচনা বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাকেই সপ্রমাণ করে। অধ্যাপক মাহবুবুল হককে আমি তো ব্যাকরণচিন্তক হিসেবেই চিনতাম ওঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের আগে।

প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণের সম্পাদনার সূত্রে তাঁর ব্যাকরণ ভাবনার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক বেশি গভীর। ওঁর যে দুটি কাজ আমাকে ভাবিয়েছে তা নিয়ে দু-একটি কথা বলতে চাই। বাংলা বানান নিয়ে ভাবনাচিন্তার বয়স খুব বেশি নয়। তবে বাংলা বানানকে নিয়মে বাঁধার প্রচেষ্টাও কম হয়নি এ বাংলা-ও বাংলা মিলিয়ে। ১৯৯১ সালের ফেব্রম্নয়ারিতে যখন ওঁর বাংলা বানানের নিয়ম (সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা) প্রকাশ পাচ্ছে তখন বানান-চিন্তার ধারায় যুক্ত হয়েছে ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, অজরচন্দ্র সরকার, রাজশেখর বসু, দেবপ্রসাদ ঘোষ, সজনীকান্ত দাস, মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, প্রবোধচন্দ্র সেন,  প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, পরেশচন্দ্র মজুমদার, পবিত্র সরকারের মতো কিছু নাম। বেশ কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্‌যোগ এ-ব্যাপারে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, বাংলা একাডেমি (ঢাকা), বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ইত্যাদি। এই অবস্থায় বাংলা বানানের নিয়মের মতো একটা বইয়ের উপযোগিতা কোথায়?

প্রথমত, বাংলা বানানের নিয়ম বাংলাদেশের প্রেক্ষেতে বানানের প্রথম জনমুখী বই। ছাত্রছাত্রী, সাধারণ ভাষাজিজ্ঞাসু, ভাষাবিশেষজ্ঞ, লেখক, পাঠক সকলের কথা মনে রেখেই এই বই তৈরি হয়েছিল। আসলেই তো। দ্বিতীয়ত, শুধু বানানের নিয়মের কথা বললেই তো চলে না – দরকার হয় এমন পথনির্দেশিকা যা বানান ভুলের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করে তার থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়ে দেয়। বাংলা বানানের নিয়ম এ-কাজটি করেছে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। ঠিক বানান আয়ত্ত করা একটা অভ্যাসের ব্যাপার – সংস্কৃতির মতোই এটিও অভ্যাসে রুচিকর হয়। ইচ্ছে থাকলেও আমরা বুঝে উঠতে পারি না কীভাবে গড়ে তুলতে হবে এই অভ্যাস। সাতটি টোটকা বলে দিয়েছেন লেখক – বানান ভুলের তালিকা রাখা, অভিধানের সাহায্য নেওয়া, শব্দকে ছবির মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য করার চেষ্টা, লিখন অভ্যাস গড়ে তোলা, নতুন শব্দ শেখা, ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, সাধারণ ভাষা ব্যবহারকারী এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই নির্দেশিকাগুলো অত্যন্ত কাজের। আসলেই তো দরকার ছিল এমন একটা বই, যা হাতবই হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে সকলে, নিয়ম বলাটাই যথেষ্ট নয় – নিয়মের অভ্যাসটা অনুস্যূত করে দেওয়ার কাজটা আরো জরুরি। তৃতীয়ত, বাংলা লেখার ক্ষেত্রে স্বরচিহ্ন এবং যুক্তব্যঞ্জনের লিপি/ রূপ বৈচিত্র্যবিষয়ে তাঁর আলোচনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী অনেক সময়েই অবহিত নন বাংলা লিপির রূপবৈচিত্র্যের বিষয়ে। অবশ্যই বাংলা লিপির রূপগত জটিলতা এবং বৈচিত্র্য এর অন্যতম কারণ। অনেকটা একই রকম দেখতে ভিন্ন বর্ণসমন্বয়গুলোর প্রতিটি (যেমন : ক্ + ষ = ক্ষ বনাম হ্ + ম = হ্ম, জ্ + ঞ = জ্ঞ বনাম ঞ্ + জ = ঞ্জ, ঞ্ + চ = ঞ্চ বনাম ঞ্ + ছ = ঞ্ছ বনাম ঞ্ + ঝ = ঞ্ঝ বনাম চ্ + ঞ = চ্ঞ, হ্ + ন = হ্ন বনাম হ্ + ণ = হ্ণ বনাম হ্ + ঋ = হৃ, ইত্যাদি) আলাদা আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে এই বইয়ে। চতুর্থত, বানানের নিয়ম আলোচনার অনুষঙ্গে সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের একাধিক দীর্ঘ তালিকা (অর্থসহ) এই বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই জাতীয় শব্দগুলো (যেমন : বালি/ বালী, আসিত্মক/আসত্মীক, আভাস/ আভাষ, অণু/ অনু, ভাণ/ ভান, আপণ/ আপন, বাধা/ বাঁধা, ইত্যাদি) প্রায়ই আমাদের ধন্ধে ফেলে। বাংলা বানানের নিয়ম এই বিশেষ প্রয়োজনের জায়গাটিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে। পঞ্চমত, প্রতিটি নিয়ম, রীতি, তাদের ব্যতিক্রম নিয়ে পর্যাপ্ত উদাহরণ এই বইয়ের ব্যবহারযোগ্যতাকে বাড়িয়েছে বহুগুণ। প্রতিটি নিয়মের সঙ্গে লক্ষণীয়, সতর্কতা ও ব্যতিক্রম শিরোনামে যে সমস্ত সতর্কতামূলক আলোচনা রয়েছে তা একজন বানানজিজ্ঞাসুর সচেতনতা বাড়াবে নিঃসন্দেহে। এরই সঙ্গে দেখুন শিরোনামে ‘প্রয়োজনমতো প্রাসঙ্গিক ও অতিরিক্ত বিষয়-নির্দেশ সন্নিবেশিত হয়েছে।’ ষষ্ঠত, একই বইতে বাংলা একাডেমি, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গৃহীত বাংলা বানানের নিয়ম পরিশিষ্ট হিসেবে সন্নিবেশিত হওয়ায় বাংলা বানানের বিবর্তনের একটি চিত্রও আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বাস্তব অবস্থা এবং প্রয়োজনের জায়গাটি যথার্থভাবে বিশেস্নষণ করেই বইটি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে System Requirement Survey (SRS) বলে যে-কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি সে-কাজটি এই কথাটি চালু হওয়ার অনেক আগেই তিনি করেছেন নিজের ভাবনা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে। এ ব্যাপারে ওঁর দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা, সম্পাদনা এবং সংবাদপত্রে কাজের অভিজ্ঞতার ত্র্যহস্পর্শ আমাদেরই উপকারে লেগেছে।

আর একটি বইয়ের কথা এই প্রসঙ্গে চলে আসে – ২০১৭-র একুশে বইমেলায় প্রকাশিত খটকা বানান অভিধান (প্রথমা, ঢাকা)। এই বইটি তাঁর বানান-চিন্তার পরিণত ফসল। বানান অভিধান একাধিক রচিত হলেও খটকা বানানের এরকম অভিধানের পরিকল্পনা বাংলায় এর আগে আমরা দেখিনি। ইংরেজিতে কঠিন শব্দের অভিধান আছে একাধিক। বাংলার কঠিন শব্দ নিয়ে বিদ্যায়তনিক আলোচনা হলেও অভিধানের আকারে প্রকাশিত এই বইটি পথপ্রদর্শক। বইটির নামের মধ্যে ‘খটকা বানান’ শব্দবন্ধটি বইটির চৌহদ্দি নির্দেশ করে দেয়। শব্দের প্রাথমিক যে-রূপটি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে সেটা তার বানান – বানানই শব্দের পোশাকি রূপ, সচিত্র পরিচয়পত্র। খটকা বা ধন্দ তৈরি হয় কখন? যখন একটি শব্দের বানান লিখতে গিয়ে একাধিক সম্ভাবনার অবকাশ থাকে, অর্থ সম্পর্কে ধারণা অস্বচ্ছ হয়, তখনই এ ধরনের সংকটের সম্মুখীন হই আমরা। বাংলায় হ্রস্ব ই‌ বনাম দীর্ঘ ঈ,  হ্রস্ব উ বনাম দীর্ঘ ঊ, ণ বনাম ন, তিনটি শিস ধ্বনির (শ-ষ-স) উপস্থিতি, জ বনাম য, ঙ বনাম ং, একই বর্ণ সমবায়ের একাধিক রূপ, বর্ণ সমবায়ের স্বচ্ছ-অস্বচ্ছ রূপ, একই শব্দের একাধিক বিকল্প বানানের উপস্থিতি, একই উচ্চারণে একাধিক শব্দের অসিত্মত্ব, উচ্চারণের সঙ্গে বানানের দূরত্ব, ইত্যাদি বাংলা বানানে নানা রকম ধন্দ তৈরি করে। পৃথিবীর সমস্ত জীবিত ভাষাতেই এই সমস্যা, বলা ভালো – বৈচিত্র, আছে। বানানের সাধারণ অভিধানে ঠিক বা শুদ্ধ বানান লেখা থাকে – যেসব বানানে খটকা তৈরি হয় তাদের আলাদা কোনো তালিকা বা ব্যাখ্যা সেখানে সাধারণত থাকে না। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটির বিশিষ্টতা এখানেই। কোন কোন শব্দের বানানে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে সে নিয়ে সম্যক চিন্তা করেই লেখক শব্দ-সংকলন করেছেন। প্রতিটি শব্দের ভুল বানান নির্দেশ করেছেন ঠিক বানানের পাশাপাশি। যেখানে বিকল্প বানানের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে উচ্চারণানুগ সহজতর বানানকে অবিকল্প হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার পথ দেখিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বানানের ব্যুৎপত্তিগত উৎস নির্দেশ করেছেন। সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের ব্যাপারে অর্থসহ বানানের ভিন্নতা দেখিয়ে দিয়েছেন। কয়েকটি উদাহরণ আমাদের বক্তব্যকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে।

‘কর্ষণীয় [র-এর পর ষ। ষ-এর পর ণ। ঈয় প্রত্যয়ের ঈ-কার’ – এই ভুক্তিতে ষত্ব এবং ণত্ব বিধির উল্লেখ নেই; কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণ আছে। দীর্ঘ ঈ-কারের উপস্থিতির ব্যুৎপত্তিগত কারণটিও দেখিয়েছেন ব্যাকরণের জটিলতত্ত্বের অবতারণা না করেই।

‘অলংকার পরিহার্য অলঙ্কার’ – বিকল্প বানান বর্জনের নির্দেশ; কিন্তু ‘অলঙ্ঘন ভুল অলংঘনীয়’ – ঠিক বানানের সঙ্গে ভুল বানান দেখিয়ে দেওয়াটাও জরুরি।

কিন্তু একই শব্দের প্রচলিত বিকল্প রূপকে (বিকল্প বানান নয়) অস্বীকার করছেন না – ‘পিঁয়াজ [প-এ চন্দ্রবিন্দু] বিকল্প পেঁয়াজ’।

‘আভাষ (ভূমিকা) তুলনীয় আভাস’ বনাম ‘আভাস (ইঙ্গিত) তুলনীয় আভাষ’ – সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের ব্যাপারে অর্থসহ বানানের ভিন্নতা স্পষ্ট করেছেন।

এই উদাহরণগুলো থেকে এ-কথা বলাই যায় যে, একটা অতিরিক্ত বানান অভিধানমাত্র সংকলন না করে বাংলা বানানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সমস্যার জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একমাত্র খটকা বানান অভিধানের প্রণেতা হিসেবে তাঁকে আমাদের মনে রাখতেই হবে। তবে দু-একটি অপূর্ণতার কথাও বইটি সম্পর্কে এখানেই উল্লেখ করে রাখি – আশা করব পরবর্তী সংস্করণে এই অপূর্ণতা দূর হবে। প্রথমত, ‘প্রতিযোগিতা’ শব্দটি ভুক্তি হিসেবে আছে, অথচ ‘প্রতিযোগ’ বা ‘প্রতিযোগী’ শব্দগুলো আলাদা ভুক্তি হিসেবে নেই – ‘প্রতিযোগিতা’র সঙ্গেই ‘কিন্তু প্রতিযোগী’ তথ্যটি দেওয়া। ‘প্রতিযোগ’ শব্দটি নেই সম্ভবত সংকলক এই শব্দের বানানটিকে ‘খটকা’ বানানের বাইরে ফেলেছেন। তবে ‘সত্যবাদী’ এবং ‘সত্যবাদিতা’ দুটি আলাদা ভুক্তি হিসেবে থাকতে পারলে ‘প্রতিযোগী’ এবং ‘প্রতিযোগিতা’ও থাকা উচিত ছিল। এমনকি ‘প্রতিযোগিতা’র অনুষঙ্গে দীর্ঘ ঈ-কারের হ্রস্ব ই-কারে বদলে যাওয়ার পেছনে ক্রিয়াশীল ব্যাকরণের সূত্রটিও ধরিয়ে দেওয়া যেত (যেমনটা অন্য অনেক শব্দের ক্ষেত্রে করেছেন সংকলক)। বোঝা যায়, এই ত্রুটি সংকলকের অনবধানজনিত। আরো কয়েকটি শব্দের ক্ষেত্রে একইরকম অসাবধানতার ছাপ রয়েছে। আর একটি প্রশ্ন উঠতে পারে – এই অভিধানে সংকলিত সমস্ত শব্দের বানানেই কি আমাদের খটকা লাগে? কিছু কিছু বানানে খটকা আদৌ লাগে কিনা সেটাই একটা খটকা! যেমন ধরা যাক ‘তিথি’ শব্দটি। এই শব্দে খটকা লাগার খুব বেশি উপাদান নেই। এমনই আরো শব্দ – অগ্রিম, অদিতি, মুলুক, তিমি ইত্যাদি। /æ/ (অ্যা) ধ্বনির জন্য এই অভিধানে সংকলকের পরামর্শ ‘অ্যা’ ব্যবহার করার, কিন্তু academy-র প্রতিবর্ণীকরণের প্রশ্নটি বাদ রেখে গেছেন। এক্ষেত্রে কি বাংলা একাডেমির ‘একাডেমি’ বানানটি তাঁকে কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলেছে? তবে শেষের এই কয়েকটি আপাত অসম্পূর্ণতার কথা উল্লেখ করলাম যাতে পরবর্তী সংস্করণে এই দিকগুলোর সমেত্মাষজনক উত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছয় সে-কথা ভেবে। আমার মতো অনেক পাঠকই হয়তো এই প্রশ্নগুলো করবেন, এসবের সমেত্মাষজনক উত্তরও, আমি নিশ্চিত, সংকলকের কাছে আছে – শুধু দুপক্ষের মধ্যে এই উত্তরগুলো চলাচল করা দরকার পরের সংস্করণে। তবে এহ বাহ্য! শেষে আবারো যোগ করতে চাই – বাংলা ভাষা চর্চার ধারায় এই অভিধান একটি অতি আলোচিত সংযোজন বলেই আমার মনে হয়।

এই লেখা শুরু করেছিলাম ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে। শেষেও ফিরে আসতে চাই ব্যক্তিগত কথাতে। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় বিদ্যায়তনিক কাজের পরিসরে – সেই পরিসরের সীমা অতিক্রম করে কবে যে তাঁর পরিকরে পরিণত হয়েছি সে হিসাব রাখিনি। কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় এরকম অহৈতুকী হিসাবের মধ্য দিয়েই। কাছের করে নিয়েছিলেন আমার স্ত্রী-পুত্রকেও। ভালোবাসার একটা অসীম ক্ষমতা আছে ওঁর। পরিচয়ের পরে কলকাতায় যতবার এসেছেন আমাদের বাড়িতে এসেছেন, থেকেছেন আমাদের সঙ্গে। আমরাও সপরিবারে গিয়েছি চট্টগ্রামে ওঁর বাড়িতে – ভূরিভোজে ভুঁড়ির আয়তন বাড়িয়ে ফিরেছি। প্রয়োজনে তিরস্কারও করেছেন। আমাদের পুত্রের সঙ্গে তাঁর সখ্য তো আমাদের ঈর্ষার কারণ হয়েছে মাঝে মাঝে। আজ এই লেখা যখন শেষ করছি তখন তিনি জীবনের সত্তরতম জন্মদিনটি পালন করছেন। আমরা চাই এই দিন আরো সত্তরবার তিনি পালন করুন। তাঁর অভিভাবকত্বে থাকতে চাই আরো অনেক বছর। পৃথিবীতে অনেক আলোই তো নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে – ওঁর আলো আমাদের দিশা দেখাক, ঋদ্ধ করুক, ধীমান করুক। প্রণাম জানাই ওঁকে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply