মুরাসাকি শিকিবু এবং তাঁর গেঞ্জি উপন্যাস

লেখক:

আবুল কাসেম

সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে ৯৭৮ (মতান্তরে ৯৭৩) খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু।১ তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১০১৪ খ্রিষ্টাব্দে।২ এক অভিজাত পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন হেইয়ান সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক গভর্নর। পদটি সম্মানজনক হলেও রাজধানীর রাজ-অমাত্যদের মতো সমান মর্যাদার ছিল না। অথচ নবম শতক থেকে তাদের অভিজাত গোষ্ঠীর ফুজিওয়ারারা সম্রাটদের পারিষদ হিসেবে দরবার আলোকিত করেছেন এবং প্রভাব খাটিয়েছেন। ফুজিওয়ারা ললনারা সম্রাজ্ঞী হয়েছেন। দশম শতকের শেষ এবং একাদশ শতকের শুরুতে শুধু ফুজিওয়ারা নো মিচিনাগা তাঁর চার কন্যাকে সম্রাটদের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। এই ফুজিওয়ারা গোষ্ঠীর প্রভাব-প্রতিপত্তি তখন হেইয়ান সাম্রাজ্যে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল।৩

মুরাসাকির প্রপিতামহ ফুজিওয়ারা নো কানেসুকে রাজকীয় আভিজাত্যের চরম শিখরে উঠেছিলেন। কিন্তু তার পরবর্তীকালে বংশধরেরা ক্রমান্বয়ে আভিজাত্য এবং ক্ষমতা হারাতে থাকেন। মুরাসাকির জন্মের সময় তা তলানিতে গিয়ে না ঠেকলেও নিম্নমধ্যবিত্ত আভিজাত্যের প্রান্তিক রেখায় গিয়ে ঠেকে।৪

হেইয়ান আভিজাত্যে প্রাদেশিক গভর্নরদের মর্যাদা উচ্চপদের রাজপারিষদের তুলনায় নিম্ন পর্যায়ের। অভিজাত এবং ক্ষমতাশালী রাজপারিষদের সন্তান-সন্ততিরা যখন কেন্দ্র থেকে ছিটকে গিয়ে প্রদেশে পৌঁছে যায়, তখন তাঁদের আভিজাত্য, মর্যাদা এবং ক্ষমতা কমতে থাকে। আর তা কখনো গৌরবের হয় না। প্রাচীন জাপানের কিউটো সম্রাটদের অভিজাত পারিষদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। মুরাসাকির বাবা সেরকম একটি অবস্থার শিকার হয়েছিলেন।

রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হলেও মুরাসাকিদের পরিবার অভিজাত সাহিত্যামোদীদের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানজনক স্থানটি ধরে রেখেছিল। তাঁর প্রপিতামহ এবং পিতামহ দুজনই প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন। তাঁর প্রপিতামহ ফুজিওয়ারা নো কানেসুকের তেরোটি কবিতা অভিজাত রাজকীয় সংকলন টোয়েন্টি ওয়ান ইম্পেরিয়াল এনথোলজিতে স্থান পেয়েছিল। ছত্রিশজন প্রসিদ্ধ কবির কবিতা রয়েছে এ-সংকলনে। মুরাসাকির প্রপিতামহ এবং পিতামহ দুজনই সমকালীন বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবি কি নো সুরেইয়োকির সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন।৫ মুরাসাকির পিতা ফুজিওয়ারা নো তামেতোকি ‘ডেইগাকু রিউ’র (রাজ আকাদেমি) সদস্য ছিলেন এবং চীনা ক্লাসিক সাহিত্য ও কবিতায় প্রগাঢ় পা–ত্যের জন্য সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর কবিতাও অভিজাত কবিদের সংকলনে স্থান পেয়েছিল।৬

ফুজিওয়ারা নো তামেতোকি ৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ছোট পদে রাজকীয় চাকরিতে যোগ দেন। ৯৯৬ সালে গভর্নর নিযুক্ত হন। তিনি ১০১৪ (মতান্তরে ১০১৮) সাল অবধি চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন। মুরাসাকির মা একই গোত্র থেকে অর্থাৎ উত্তর ফুজিওয়ারা গোত্রের একটি শাখা থেকে এসেছিলেন। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে একটি ছেলে এবং দুটি মেয়ে।৭

হেইয়ান সাম্রাজ্যে স্বামী এবং স্ত্রী আলাদা বাড়িতে থাকতেন। সন্তানেরা মায়ের কাছে লালিত-পালিত হতো। এরকম ব্যবস্থা এখনো জাপানে চালু আছে।৮ মুরাসাকির জীবনে তার ব্যতিক্রম ঘটে। তিনি তাঁর ছোট ভাই নোবুনোরিসহ পিতার সঙ্গে কিউটোর তেরামাচি লেনে থাকতেন। সম্ভবত তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছিল তাঁর বাল্যকালেই। তিনি তাঁর বোনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বোনটি মারা যায় যখন তাঁর বয়স বিশের কোঠায়।৯

 

দুই

মুরাসাকির জন্মের আগে জাপান বন্ধুহীন এবং বিচ্ছিন্ন এক সাম্রাজ্য ছিল। চীনের তেঙ সম্রাটদের আমলে (সপ্তম থেকে নবম শতক) জাপান থেকে ২০টি দল চীনে নানা মিশনে যায়। এরা ফিরে এসে জাপানের পুরো সাংস্কৃতিক পরিম-লে পরিবর্তন আনে। এতে চীনা ভাষা এবং সংস্কৃতির সংস্পর্শে গিয়ে জাপানের জাতীয় সংস্কৃতির এক শক্তিশালী উত্থান ঘটে। জাপানিরা ক্রমান্বয়ে কানা ভাষাকে চায়নিজ ভাষার বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ করে তুলতে থাকে। মুরাসাকির সময়ে পুরুষেরা চায়নিজ ভাষায় লিখতেন আর মেয়েরা কানা ভাষায়। দুই ভাষায়ই জাপানি সাহিত্য সমৃদ্ধ হতে থাকে।১০

মুরাসাকি সে-সময়কার সৌভাগ্যবতীদের একজন। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে চায়নিজ ক্লাসিক্যাল ভাষা এবং সাহিত্যে শিক্ষা লাভ করেছেন। মুরাসাকি শিকিবুর লেখা ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর ছোট ভাইকে এক গৃহশিক্ষক এ-ভাষা শেখাতেন। শুনে-শুনে মুরাসাকি এ-ভাষা শিখে ফেলেন। তাঁর ভাষা শেখার দক্ষতা দেখে তাঁর পিতা বলেছিলেন, তুই যদি আমার ছেলে হতিস, আমার জন্য তা হতো বড় সৌভাগ্যের। মনে করা হয়, তিনি ঐতিহ্যগতভাবে সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীত, লিখনশৈলী এবং চিত্রকলায়ও সমান ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। তবে তাঁর শিক্ষাটা সাধারণ্যে গৃহীতব্য ছিল না। কারণ তাতে প্রচলিত গোঁড়ামির প্রশ্রয় ছিল না। লুইস পেরেজের জাপানের ইতিহাস থেকে জানা যায়, তখন মনে করা হতো নারীরা কর্মে অসমর্থ এবং বুদ্ধিতে অপরিপক্ব। তাই তাদের চায়নিজ শিখতে দেওয়া হতো না। চায়নিজ ক্লাসিক্যাল জানার কারণে কিছু বিপত্তিও মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে।১১ অভিজাত হেইয়ান ভদ্রমহিলাগণ বাঁধাধরা নিয়মরীতির মধ্যে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন। শুধু পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের সঙ্গেই কথা বলতে পারতেন। মুরাসাকির আত্মজৈবনিক কবিতায় দেখা যায়, তিনি সামাজিকভাবে মেলামেশার সুযোগ পেতেন শুধু মহিলা আর পুরুষ বলতে বাবা এবং ভাইদের সঙ্গে। স্বামীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মাঝেমধ্যে মহিলাদের সঙ্গে কবিতা বিনিময় করেছেন, কখনো কোনো পুরুষের সঙ্গে নয়। তাঁর সমপর্যায়ের সম্ভ্রান্ত নারী ছাড়া কারো সঙ্গে মেলামেশা করেননি। পিত্রালয়ে অবস্থানকালে পঁচিশ-তিরিশ বছর পর্যন্ত বিয়ে-শাদি কিংবা বয়োসন্ধির কাল থেকে পুরুষের সান্নিধ্য কোনোটাই লাভ করা সম্ভব হয়নি।১২

 

তিন

৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে মুরাসাকির বাবা চার বছরের জন্য ইচিঝেন প্রদেশে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। সম্ভ্রান্ত নারীর প্রথাগত প্রতিবন্ধকতাকে অস্বীকার করে মুরাসাকি পাঁচ দিনের লম্বা এক ভ্রমণে পিতার সঙ্গে সেখানে উপস্থিত হন।

তিন বছর পর কিউটোতে ফিরে আসেন বিয়ে করার জন্য। বর তাঁর পিতার এক বন্ধু। পিতার প্রায় সমবয়সী। নাম ফুজিওয়ারা নো নোবুতাকা (৯৫০-১০০১ খ্রি.)। একই বংশ। সম্রাটের দরবারে চাকুরে, আমলা। অনুষ্ঠান-উৎসববিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। পোশাক-আশাকে অপচয়কারী। তবে প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী। পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই এই পাত্র আরো কিছু সুনামের (?) অধিকারী ছিলেন। তাঁর অনেক বাড়িঘর, আর ছিল অজ্ঞাতসংখ্যক স্ত্রী এবং রক্ষিতা। সম্রাটের দরবারে তাঁর সন্তান-সন্ততিসহ এসব রোমাঞ্চকর ব্যাপার কারো অজানা নয়। মুরাসাকির সঙ্গে বিয়ের পরও এ-ভদ্রলোক অন্যদের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।১৩ প্রথা অনুসারে মুরাসাকি পিত্রালয়ে অবস্থান করতেন। স্বামী মাঝেমধ্যে সেখানে মিলিত হতেন। নোবুতাকা একাধিক প্রদেশের গভর্নর ছিলেন এবং বিপুল সম্পদের অধিকারী হন। রিচার্ড বাওরিং মনে করেন, তারপরও এঁরা সুখী দম্পতি ছিলেন। কিন্তু জাপানি সাহিত্য-সমালোচক হারুশিরেন দ্বিমত পোষণ করে বলেন, মুরাসাকির কবিতা আভাস দেয় তিনি স্বামীকে নিয়ে অসুখী ছিলেন তা তাঁর সব সময়কার রাগান্বিত মনোভাব থেকে স্পষ্ট।১৪ তাদের এক কন্যা কেনসি (কাতাইকো) ৯৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করে। এর দুবছর পর নোবুতাকা কলেরায় মারা যান।১৫

 

চার

স্বামীর মৃত্যুতে মুরাসাকি ভেঙে পড়েন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে সে-সময়কার অনুভূতির কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে – ‘আমি মানসিক চাপের মধ্যে বিষাদগ্রস্ত হয়ে গেলাম। দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং সিদ্ধান্তহীনতা পেয়ে বসল আমাকে। কয়েক বছর এতটাই উদাসীন হয়ে রইলাম যে, সময় আর পোশাক-পরিচ্ছদের কোনোই ঠিক-ঠিকানা রইল না। আমার অশেষ নিঃসঙ্গতা এক সময় খুবই অসহ্য হয়ে উঠল।’১৬

মুরাসাকি কিউটো ছেড়ে বিওয়া হ্রদের পাশে ইশিয়ামা ডেরায় উঠলেন। ধনী লোকের বিধবা স্ত্রী হিসেবে ধন-সম্পদ আর চাকর-বাকরের অভাব ছিল না। চাকর-বাকররাই তাঁর মেয়েকে দেখাশোনা করত। তাঁর অফুরন্ত অবসর। সময় কাটতে চায় না। তিনি দুঃসময় কীভাবে কাটাবেন? বই পড়তে শুরু করলেন। কবিতা আর উপাখ্যান, বাঁশ কর্তনকারীর উপাখ্যান (দ্য টেল অব বামবো কাটার), ইছের নানা উপাখ্যান (টেলস অব ইছে) প্রভৃতি।

কথিত আছে, জ্যোৎস্নারাতের অপূর্ব সৌন্দর্যের মধ্যে বিওয়া হ্রদের পাড়ে ইশিয়ামা ডেরায় বসে আগস্টের কোনো এক রাতে মুরাসাকি গেঞ্জি উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। তবে কোনো-কোনো জাপানি লেখক এ-গল্পকে বাস্তবনিষ্ঠ মনে করেন না। কেউ-কেউ বলেছেন, ইশিয়ামা প্যাগোডায় গিয়ে চন্দ্রালোকে মুগ্ধ হয়ে তিনি লেখার অনুপ্রেরণা লাভ করেন।১৭

তাঁদের মতের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও চাঁদের জ্যোৎস্না যে অনুপ্রেরণা, তাতে মতপার্থক্য নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সে-সময় তাঁর হাতে কলম তুলে দিয়েছে, এ-ব্যাপারে সন্দেহ নেই। গেঞ্জি উপন্যাসের সর্বত্র সৌন্দর্য বর্ণনা কিংবা সৌন্দর্যে অবগাহন নিত্য ঘটনা।

 

পাঁচ

মুরাসাকি শিকিবু স্বামীর মৃত্যুর পর ইম্পেরিয়াল লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে সম্রাটের অমত্মঃপুরে প্রবেশ করেন। সে-সময় জাপানের সম্রাট ছিলেন ইচিজো। তাঁর একাধিক সম্রাজ্ঞীর পরিচয় জানা যায়। এঁদের একজন ছিলেন শোশি। সম্রাটের সঙ্গে বারো বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। সম্রাজ্ঞী শোশির পিতা মিচিনাগা অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন সম্রাটের দরবারে। তিনি তাঁর চার কন্যাকেই সম্রাটদের সঙ্গে বিয়ে দেন। সম্রাজ্ঞী শোশির বয়স কম হওয়ায় মিচিনাগা কন্যার সহচরী হিসেবে মুরাসাকিকে সম্রাটের অমত্মঃপুরে নিয়োগলাভে সাহায্য করেন। মুরাসাকির লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে নিযুক্তির পেছনে আরো কিছু কারণ অনুসন্ধান করেছেন প–ত-গবেষকরা। সে-কথা বিস্তারিত বলার আগে হেইয়ান সাম্রাজ্য এবং সে-সময়কার সম্রাটের দরবার এবং রাজঅমত্মঃপুর সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যেতে পারে।

 

পাঁচ (এক)

দশম-একাদশ শতকে মুরাসাকির সময়ে হেইয়ান সংস্কৃতি এবং রাজকীয় জীবন সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়েছিল। রাজধানী কিউটোতে তখন প্রায় এক লাখ মানুষের বাস। রাজপ্রাসাদের ভেতরে-বাইরে অভিজাত মানুষের বিচরণ পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিকতাকে উজ্জ্বল করে রাখে। সম্রাটের অমাত্য আর প্রাসাদের যারা বাসিন্দা এরা নিজেদের যথেষ্ট পরিমাণে পরিশোধিত করে নিয়েছেন আভিজাত্য আর চিন্তাভাবনায়। এসবের পরিচয় পাওয়া যায় তাদের দামি
পোশাক-আশাকের কারুকার্যে। পোশাকের রং, পোশাকে অঙ্কন, শিল্পের অলংকরণ, দরবারের আবহ এবং ঋতুবৈচিত্র্য অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন, সুগন্ধি ব্যবহার, কবিত্ব কিংবা সাহিত্যিক-মনোভাব তাদের উন্নত রুচিবোধের পরিচায়ক। এ-কাজে কোনো অবস্থায়ই পিছিয়েপড়া চলবে না। পিছিয়ে গেলে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে তাকে অভিজাত সমাজ থেকে ছিটকে পড়তে হবে। অভিজাত নারীদের ক্ষেত্রে তাদের জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করত মাটিস্পর্শ লম্বা চুল, গায়ের চামড়া কতটা সাদাটে ও উজ্জ্বল, তিনি লাস্যময়ী কিনা, ভালোবাসতে জানেন কিনা, তাঁর প্রেমিক কোনো অভিজাত অমাত্য, কবিতা আর ডায়েরি লেখেন কিনা – এসবের ওপর। হেইয়ান সম্রাটদের দরবারে অভিজাত রমণীদের সাহিত্যকীর্তি তাদের মর্যাদার অন্যতম কারণ বলে বিবেচনা করা হতো।১৮

 

পাঁচ (দুই)

সব রাজা বা সম্রাটদের প্রাসাদ-অভ্যন্তরেই ক্ষমতা বা প্রভাবের নানা বলয় তৈরি হয়। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলতে থাকে। মুরাসাকির সময়ের হেইয়ান সাম্রাজ্যও তার ব্যতিক্রম নয়। ৯৯৫ সালে ফুজিওয়ারা মিচিনাগার দুভাই মিচিতাকা এবং মিচিকানে মারা যান। এরা এত কাল প্রাসাদ-অভ্যন্তরে প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে আসছিলেন। মিচিনাগা এ সময় তাঁর ভাইপো কোরেচিকাকে কোণঠাসা করে ফেলেন। কোরেচিকা ছিলেন সম্রাট ইচিজোর অপর সম্রাজ্ঞী তেইশির ভ্রাতা। মিচিনাগা তাঁর বোন সেনশিকে সঙ্গে নিয়ে নিজে অপ্রতিরোধ্য ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। সম্রাজ্ঞী তেইশি ভাইকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেও ক্ষমতা-বলয়ে আটকে রাখতে পারেননি। তাকে রাজপ্রাসাদ থেকে বিদায় নিতে হয়। চার বছর পর মিচিনাগা তাঁর মেয়ে শোশিকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এসে সম্রাটের সঙ্গে বিয়ে দেন। খুব কমবয়সী শোশির দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতে সম্রাজ্ঞী তেইশির সঙ্গে পেরে ওঠার কথা নয়। বাস্তবেও তাই ঘটে। শোশি সম্রাজ্ঞী হলেন বটে কিন্তু প্রভাবটা রয়ে গেল সম্রাজ্ঞী তেইশিরই। প্রাসাদে সবাই সম্রাজ্ঞী তেইশিকে ‘উজ্জ্বল কুন্তলা সুন্দরী’র (কোগো) খেতাব দিয়ে রেখেছে। সে-জায়গায় শোশিকে মনে করছে ভেতরে রুচিকর এক শান্ত তরুণী (চুগু)। মিচিনাগার তা পছন্দ ছিল না। তিনি তাঁর মেয়ে শোশিকে পরিপক্ব করে তুলতে চাইলেন যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁর মেয়ে এগিয়ে থাকেন এবং সম্রাজ্ঞী খেতাবটা শুধু তাঁরই থাকে। মুলহার্ন মনে করেন, শোশির শিক্ষার জন্যই মুরাসাকিকে আনা হয়। আরো একটি বড় রকমের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র ছিল। সম্রাজ্ঞী তেইশির লেডি-ইন-ওয়েটিং ছিলেন সেইশোনাগন। তিনি সম্রাজ্ঞী তেইশির সভা ও ভাবমূর্তিকে আলোকিত করেছেন। শোশিকে ভাবমূর্তি বাড়াতে হলে এরকম প্রতিভা তাঁর কাছাকাছি রাখা প্রয়োজন। জাপানি সাহিত্য-সমালোচক জোশোয়া মোসতোও বিশ্বাস করেন, মিচিনাগা এ-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মুরাসাকিকে শোশির দরবারে এনেছিলেন। কিন মনে করেন, মুরাসাকিকে রাজপ্রাসাদে আনা হয়েছিল শোনাগনের জনপ্রিয় বই দ্য পিলু বুকের মুখোমুখি দ্য টেল অব গেঞ্জিকে দাঁড় করানোর জন্য। মুরাসাকি ততদিনে গেঞ্জি উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছেন। মুরাসাকি তাঁর নতুন লেখাগুলো বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এগুলোর অনুলিপি বন্ধুরা অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে করে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সুনাম ছড়াচ্ছে। ঠিক এ-সময়ই সম্রাজ্ঞী শোশির লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে মুরাসাকিকে নির্বাচন করা হয়।১৯

মুরাসাকি যখন লেডি-ইন-ওয়েটিং হিসেবে আসেন, তখন সম্রাজ্ঞী শোশির বয়স ষোলো বছর। আর্থার ওয়ালের মতে, শোশি সিরিয়াস ধরনের কমবয়সী মহিলা ছিলেন, যিনি বাবার বাড়ি এবং রাজপ্রাসাদকে আলাদাভাবে গ্রহণ করেছিলেন।২০ তিনি উচ্চাভিলাষী নারী ছিলেন। মুরাসাকির আগে তিনি লেখিকা ইজুমি শিকিবু এবং আকাঝুমি ইমোনকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসেন। তিনি চায়নিজ ক্লাসিক্যাল সাহিত্য পাঠ করে শোনানোর জন্য যে মুরাসাকিকে অনুরোধ জানাতেন, তা মুরাসাকির ডায়েরি থেকে জানা যায়। চায়নিজ জানাটা মুরাসাকির জন্য আলাদা একটা গুরুত্বের পরিচায়ক। এই গুরুত্ব শোশির প্রতিদ্বন্দ্বী অপর সম্রাজ্ঞীর বিরুদ্ধে মূলধন হিসেবে কাজ করেছে।২১

হেইয়ান সাম্রাজ্যে রাজকীয় জীবন ছিল বাহ্যিকভাবে ফ্যাশনেবল ও চাকচিক্যপূর্ণ। তবে ভেতরে ছিল অনৈতিক অন্ধকারে ঢাকা। নারীরা সেখানে নিঃসঙ্গ নিভৃত জীবনযাপন করতেন ছদ্মনামে। প্রথাগত বিয়ে-শাদির মাধ্যমে এরা যেমন ক্ষমতাশালী হয়ে যেতেন, তাদের আত্মীয়স্বজনও ক্ষমতাবান হয়ে উঠতেন। নিভৃতে জীবনযাপন করলেও কোনো-কোনো নারী উলেস্নখযোগ্য রকম প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটাতেন। সম্রাট ইচিজোর মাতা এবং মিচিনাগার বোন সেনশি বেশ প্রভাবশালী মহিলা ছিলেন। এই কেতাদুরস্ত মহিলার কাছে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল। মিচিনাগা চাইতেন শোশিও এরকম বিদগ্ধ রমণীতে পরিণত হোক এবং মুরাসাকির সংস্পর্শ তাকে গড়ে উঠতে সাহায্য করুক।

 

পাঁচ (তিন)

রাজপ্রাসাদে অবস্থানের দিনগুলো সম্পর্কে মুরাসাকি বেশকিছু কথা বলেছেন তাঁর ডায়েরি ইমাকিতে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ডায়েরি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে। হেইয়ান সম্রাটদের আমলে রাজপ্রাসাদের বিদগ্ধ নারী-পুরুষ প্রায় সবাই ডায়েরি লিখতেন। মুরাসাকি ১০০৮ হতে ১০১০ সময়ে যে-ডায়েরি লিখেছেন তাকে মাস্টারপিস মনে করা হয়।২২ তিন বছরের এ-ডায়েরিতে হেইয়ান সাম্রাজ্যের অমত্মঃপুরের অনেক অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে। রাজকীয় ঘটনার পাশাপাশি মুরাসাকি তাঁর নিজস্ব আবেগ, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, সম্পর্কের ধরন, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজকবি, লেখক প্রমুখের সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা, রাজপ্রাসাদের পরিবেশ, তাঁর ভালোলাগা-মন্দলাগা প্রভৃতি বিষয় স্পষ্টভাবে ডায়েরিতে বর্ণনা করেছেন। ব্যক্তি হিসেবে সম্রাজ্ঞী শোশি, মিচিনাগা, রাজসভা কবি ফুজিওয়ারা নো কিনতু, দ্য পিলু বুক গ্রন্থের কবি শোনাগন, কবি ইজোমি শিকিবু, আকাঝোমি ইমোন, সম্রাজ্ঞী শোশির সতীন তেইশি এবং নবজাতক শোশিপুত্র যুবরাজ অতসুনাগা শিননুর (পরে যিনি সম্রাট গো সুজাকো নামে পরিচিত হয়েছিলেন) কথা ডায়েরিতে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। যুবরাজ শিননুর জন্মের পর পঞ্চাশ দিন ধরে উৎসব-অনুষ্ঠান হয়। মুরাসাকি ওইসব দিনের আনুষ্ঠানিকতার কথা লিখেছেন তাঁর ডায়েরিতে।

 

পাঁচ (চার)

রাজপ্রাসাদে তাঁর জীবনটা সুখের ছিল বলে মনে হয় না। ডায়েরিতে আছে যুবরাজেরা প্রায়ই মদ্যপান করে মাতলামি করতেন। নারীদের সম্ভ্রমের প্রতি, প্রাইভেসির প্রতি তাদের সম্মানবোধ ছিল না। সম্রাজ্ঞী শোশি এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। এক রাতে কাউন্সিলর তাকাই লেডি বুসের রাজপোশাক ধরে টানাটানি করছিলেন, ভয়ংকর সব গান গাইছিলেন চিৎকার করে; কিন্তু সম্রাট কিছুই বললেন না। এ-অবস্থায় লেডি সেইন্সু এবং মুরাসাকি সভা ত্যাগ করেন। কবি ইজোমি শিকিবু সম্পর্কে এক জায়গায় লিখেছেন, ইজোমি শিকিবু একজন স্রেফ কৌতুকাবিষ্ট পত্র-লেখিকা। তাঁর সম্পর্কে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো আর কিছু নেই। তিনি হচ্ছেন বেপরোয়া ধরনের লেখিকা, যাঁর লেখা লৌকিকতা-বিবর্জিত। যাহোক তাঁকে আমার কখনো কবি মনে হয়নি।২৩ সেই শোনাগন সম্পর্কে ডায়েরিতে লিখেছেন, হঠাৎই তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি এবং তাঁর লেখায় প্রভাবান্বিত হই। আরেক জায়গায় লেখেন, তিনি অতিমাত্রায় আত্মগর্ব নিয়ে থাকেন, নিজের সম্পর্কে ধারণা মারাত্মক রকম উঁচু। তিনি নিজেকে খুব বুদ্ধিমতী ভাবেন। চায়নিজ ভাষাবৈশিষ্ট্য আরোপ করে লেখাকে অগোছালো করে তোলেন, বাঞ্ছিত মহৎ বিষয়গুলো দূরে ঠেলে দেন।২৪

 

পাঁচ (পাঁচ)

মিচিনাগা সম্পর্কে ডায়েরিতে প্রচুর কথা বলা আছে। মিচিনাগার প্রভাব-প্রতিপত্তি, মেয়ের কর্তৃত্ব রক্ষা বা বজায় রাখার জন্য প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং নিজের অবস্থান সুদৃঢ়করণ ছাড়াও মুরাসাকি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়ে মিচিনাগার সংশিস্নষ্টতা নিয়ে নানা কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি মিচিনাগার সঙ্গে কবিতা বিনিময় করতেন। এক কবিতায় লেখেন, আপনি না পড়েছেন আমার কবিতা, না পেয়েছেন আমার ভালোবাসা।২৫ ডায়েরিতে মিচিনাগাকে এড়িয়ে চলার ইঙ্গিত রয়েছে। ডায়েরি থেকেই জানা যায়, একরাতে মিচিনাগা মুরাসাকির কক্ষে প্রবেশ করেন এবং নতুন লেখা গেঞ্জির এক অধ্যায় চুরি করে নিয়ে আসেন।২৬ তবে এটা ঠিক যে, মুরাসাকিকে লেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মিচিনাগার পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন ছিল।২৭ ওয়ালে মনে করেন, মুরাসাকি মিচিনাগার সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১০১০ সালে লেখা ডায়েরিতে এরকম ইঙ্গিতও রয়েছে যে, মিচিনাগা তাকে অত্যন্ত শক্তভাবে প্রস্তাব করেছিলেন। মিচিনাগার কোনো-কোনো কাজ অপছন্দ করতেন মুরাসাকি। মিচিনাগা একবার বাগান থেকে লুকিয়ে জানালা দিয়ে মুরাসাকিকে দেখছিলেন। তখন মেয়েদের প্রাইভেসি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। চেইকো মুলহার্ন জাপানিজ ওম্যান : অ্যা বায়োক্রিটিক্যাল সোর্সবুকে অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, মধ্যতিরিশে তাঁর মতো একজন খ্যাতিমান লেখিকা কেন শেষ বয়সে এখানে আসবেন? তাঁর তো খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছিলই।২৮

বাওরিং বলেন, আমরা এমন কোনো প্রমাণ পাই না যে, তাঁকে প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়েছিল মিচিনাগার উপভোগের পাত্রী হিসেবে। তিনি অবশ্য এভাবে নিয়ে আসার ক্ষমতাও রাখতেন। মুলহার্ন বিশ্বাস করেন, মেয়েকে শিক্ষিত করে তোলার জন্যই মুরাসাকিকে সম্রাটের প্রাসাদে নিয়ে আসেন মিচিনাগা।২৯

মিচিনাগার কন্যা সম্রাজ্ঞী শোশির কথাও আছে ডায়েরিতে। তিনি লিখেছেন, শোশি কতগুলো কমবয়সী যুবতীকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, যা পূর্বে অর্জন সম্ভব হয়নি, কিন্তু তাঁর পারিষদ মনে করছেন তা সম্রাজ্ঞীর নির্বুদ্ধিতাকে স্পষ্ট করছে।৩০

মুরাসাকি ডায়েরিতে সম্রাজ্ঞী শোশির রাজদরবারিক কাযক্রম, রাজকীয় অনুষ্ঠানাদি, জটিল রাজকীয় প্রথাবদ্ধতা, বিয়ের জটিল পদ্ধতি প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করেছেন। তবে বিস্তারিত এসেছে সম্রাজ্ঞী শোশির দুই পুত্রের জন্ম ও তা ঘিরে নানা উৎসব-অনুষ্ঠানের কথা।

মুরাসাকির ডায়েরির সঙ্গে গেঞ্জি উপন্যাসের সম্পর্ক নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন কোনো-কোনো গবেষক। উপন্যাসের কথা তেমন একটা দেখা যায় না ডায়েরিতে, সেরকম গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনেও হয় না। তিনি বলেছেন, তাঁর লেখাগুলো সম্রাট প্রায়ই পাঠ করতেন। বিশেষ করে মিচিনাগা যখন-তখন তাঁর কক্ষে যেতেন এবং তাঁর থেকে পা-ুলিপি নিয়ে পড়তেন। তবে গেঞ্জি উপন্যাসের ৩৩ অধ্যায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে গেঞ্জি স্কলার হারুশিরেন বলেন, ১০০৮ সালে মিচিনাগার ম্যানসনে যাওয়ার সময় সম্রাট ইচিজোর মিছিলের একটি দারুণ বর্ণনা রয়েছে ডায়েরিতে। এই বর্ণনার সঙ্গে উপন্যাসের বর্ণনা মিলে যায়। সম্ভবত দুটি একই সময়ে লেখা হয়ে থাকবে।

 

পাঁচ (ছয়)

মুরাসাকি রাজপ্রাসাদে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। তিনি তাঁর ডায়েরিতে বলেছেন, প্রাসাদজীবন তিনি পছন্দ করেন না। তবে ওয়ালে মনে করেন, তিনি অসুখী নন, রাজপ্রাসাদে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন। তিনি সেখানে শুধু লেডি সেনশিকে পছন্দ করতেন। তাঁর ঘরে কড়াকড়ি ছিল না, ছিল না রাজকীয় পাথরচাপা ভাব।৩১

রাজপ্রাসাদে তিনি আরেক লেডি-ইন-ওয়েটিং সাইশোকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন। এক শীতে তাকে তিনি লিখেছিলেন, এখানে আমি বরফ দেখতে ভালোবাসি।৩২ এটা সত্য যে, মুরাসাকি নির্জনতার মধ্যে লেখাটা বেশ উপভোগ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি রাজপ্রাসাদের কোলাহল এবং প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্যে বেমানান। এ সম্পর্কে ডায়েরিতে লিখেছেন, আমি আমাকে গুটিয়ে নিয়ে শুধু প্রাচীন গল্প পাঠে মনোনিবেশ করেছি। সব সময় কবিতার জগতে ডুবে থাকি আর উপলব্ধি করার চেষ্টা করি অন্য লোকেদের অসিস্ত কীভাবে টিকে আছে। যখন তারা আমাকে জানতে পারে, এরা অবাক হয়ে দেখে আমি কত দয়াশীল এবং ভদ্র।৩৩ তাঁর সম্পর্কে অন্যেরা কী ভাবছে তা তিনি জানতেন। থমাস ইনজে এ-সম্পর্কে ‘লেডি মুরাসাকি অ্যান্ড দ্য ক্রাফট অব ফিকশন’ প্রবন্ধে বলেন, অন্যেরা যে মুরাসাকিকে বিরাট কৃতিত্বের দাবিদার, আত্মাভিমানী, উদ্ধত অহংকারী, তাচ্ছিল্যপূর্ণ মনোভাবাপন্ন, বাগ-না-মানা, কাঁটাযুক্ত, কলহপ্রবণ, বদমেজাজি, সান্নিধ্যের অতীত (দুর্গম্য), অপ্রিয় আত্মকথক এবং বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মনে করেন, তা তাঁর অজানা নয়। ইনজে মনে করেন, মুরাসাকি অত্যন্ত সোজা কথার মানুষ ছিলেন, স্পষ্ট কথা বলতেন। রাজপ্রাসাদের অন্য সভা-কবিদের তুলনায় তিনি শান্ত ছিলেন। মুলহার্ন আরো মনে করেন, তিনি কবি ইজোমির কবিতার সমালোচনা করেননি, করেছেন তাঁর ভাবের, নৈতিক অধঃপতন এবং প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া তিনি কোনোভাবেই বরদাশত করতেন না।৩৪

হেইয়ান সাম্রাজ্যে, বিশেষ করে সম্রাটের দরবারে পদবি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। মুরাসাকি উচ্চপদ পাওয়ার ব্যাপারে নির্মোহ ছিলেন। সাধারণভাবে যে উচ্চপদ বা ক্ষমতা ফুজিওয়ারারা পেয়ে থাকেন, তার মধ্যেই তাঁর উচ্চাশা সীমিত রাখতে চেয়েছেন। তার কারণও আছে। তাঁর উপলব্ধির ব্যাপারটা ডায়েরিতে এসেছে। তিনি লিখেছেন, আমি উপলব্ধি করি অতীতে আমার পরিবারের শাখা ছিল বিনয়ী ও ভদ্র। এ-ব্যাপারটাই আমাকে ভোগায়। সে-দিনগুলোর কথা হীনমন্যতাবোধকেই যেন জাগিয়ে দিয়ে রাজপ্রাসাদে আমাকে অনবরত নিদারুণ যন্ত্রণা দিতে থাকে।৩৫

রাজপ্রাসাদে বড় পদ বা অবস্থান নিঃসন্দেহে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে, তার চেয়েও যা বড় তা হচ্ছে সে-অভিজ্ঞতা যা তাঁর লেখায় প্রতিফলন ঘটায়।

হেইয়ান সাম্রাজ্যের শেষের দিকে চায়নিজ ভাষার জনপ্রিয়তা কমে এলেও চায়নিজ গীতিকা তখনো বেশ জনপ্রিয়। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি সম্রাজ্ঞী শোশি মুরাসাকির কাছে চায়নিজ শিখতেন এবং চায়নিজ কবি বাইজুরির ব্যালাড বা গীতিকা শুনতে চাইতেন। প্রথাগতভাবে মেয়েরা চায়নিজ শিখতে পারত না। তাদের চায়নিজ সাহিত্য কিংবা সরকারি ভাষা বা ক্ষমতা কাঠামোয় প্রবেশাধিকার তাতেই রহিত হয়ে যায়। মুরাসাকি প্রথা ভেঙে ক্লাসিক্যাল চায়নিজ শিখেছিলেন এবং সম্রাজ্ঞী শোশিকে এ-ভাষা শিখিয়েছিলেন। বাওরিং লিখেছেন, এটা ছিল রীতিমতো রাষ্ট্রবিরোধী কাজ।৩৬ এ-কাজটা অবশ্য গোপনে হয়েছে দুই অভিজাত মহিলার মধ্যে। মুরাসাকি ডায়েরিতে লিখেছেন, গত গ্রীষ্ম থেকে খুবই গোপনীয়তার সঙ্গে, অস্বাভাবিক মুহূর্তে একান্তে আমি মহামান্যার সঙ্গে বসে একত্রে পাঠ করেছি, নিয়মতান্ত্রিক কিছু ছিল না, আমি ভেবেছি উচিত হবে এ-বিষয়ে কাউকে কিছু না বলা।৩৭

রাজপ্রাসাদের একজন লেডি-ইন-ওয়েটিং মুরাসাকিকে পছন্দ করতেন না। চায়নিজ বলার জন্য মুরাসাকিকে দোষারোপ করে তিনি তাকে ‘নিহোনজি নো সুবোনে’ বলে ডাকতে শুরু করেন। এই কথাটির ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ‘আওয়ার লেডি অব দ্য ক্রোনিক্যালস’।

এক ঘটনার পর গেঞ্জি উপন্যাসের একটি অধ্যায় সম্রাট এবং তাঁর পারিষদের সামনে পাঠ করা হয়। এক অমাত্য মন্তব্য করেন, মনে হচ্ছে লেখিকা অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের শিক্ষিতা। এ-প্রসঙ্গে মুরাসাকি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, একেবারে উদ্ভট! যে কিনা বাড়ির মহিলাদেরও জানাতে দ্বিধাবোধ করে সে কী জানে, সে তা সম্রাটের দরবারে জানাতে যাবে?৩৮ তাঁর জন্য এরকম উক্তি এবং আচরণ নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর ও অপমানজনক ছিল। তাকে ‘নিহোনজি নো সুবোন’ বলে চাটুক্তি করা হয়েছিল।৩৯

হেইয়ান প্রাসাদে চায়নিজ ভাষা ব্যবহার নিয়ে স্ববিরোধী অবস্থা বিরাজ করছিল। সম্রাজ্ঞী তেইশির দরবারে চায়নিজ ভাষা সদর্পে বিরাজমান ছিল এবং তাকে রাজকীয় বিধিব্যবস্থা ও অভিজাত সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনাও করা হতো। সম্রাজ্ঞী শোশির বেলায় ছিল তার ব্যতিক্রম। কারণটা রাজনৈতিক। এ বৈরীভাব মুরাসাকি এবং তাঁর মতামতকেও প্রভাবান্বিত করেছে, তাঁকে বাধ্য করেছে চায়নিজ জানার বিষয়টা গোপন করতে। শোনাগনের মতো লোক-দেখানো জাঁকজমকপূর্ণ কিংবা প্রণয়বিলাসী, এমনকি মুখরা ছিলেন না মুরাসাকি, নম্রভদ্র থাকতে চেয়েছেন। এ-ভাবমূর্তিটাই সম্ভবত মিচিনাগা পছন্দ করেছেন। তিনি বা তাঁর কন্যা শোশিকে প্রতিপক্ষ স্পর্শ করতে না পারলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ওরা মুরাসাকির ওপরই হামলে পড়েছে।৪০ তাই দৃশ্যত সাধারণ্যে চায়নিজ চর্চা ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। তবে তিনি লেখায় তাঁর ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।

 

পাঁচ (সাত)

সম্রাট ইচিজো মৃত্যুবরণ করেন ১০১১ খ্রিষ্টাব্দে। সম্রাজ্ঞী শোশি সম্রাটের প্রাসাদ ছেড়ে বিওয়া হ্রদের পাড়ে ফুজিওয়ারা প্রাসাদে চলে যান। মুরাসাকি তাঁর সঙ্গী হন এবং রেকর্ডমতে ১০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।৪১ সেখানে গিয়ে তিনি আবারো ইশিইয়ামা-ডেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। জায়গাটা ছিল নান্দনিক, সাহিত্যচর্চা এবং ধর্মচর্চা উভয়ের জন্যই অনুকূল।

মুরাসাকি ১০১৪ সালে মারা যান। ‘অ্যা ব্রিজ অব ড্রিমস : অ্যা পয়েটিক্স অব দ্য টেল অব গেঞ্জি’ শিরোনামের এক লেখায় হারুশিরেন বলেন, ১০১৪ সালই গ্রহণযোগ্য।৪২ তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। বাওরিংয়ের বিবেচনায় তা ধারণা মাত্র, তাঁর মতে শোশির সঙ্গে তিনি ১০২৫ সাল পর্যন্ত বসবাস করেছেন।৪৩ তার আগে ওয়ালে এমতই প্রকাশ করে দিলেন, মুরাসাকি খুবসম্ভব শোশিপুত্র সম্রাট গো-ইচিজোর রাজ্যাভিষেকে যোগ দিয়েছিলেন। রাজ্যাভিষেকটি হয় ১০২৫ সালে।৪৪

তাদের বক্তব্যের পেছনে অবশ্য কোনো কার্যকারণ বা যুক্তি প্রদর্শন করা হয়নি। ১০১৪ সালে মুরাসাকির মৃত্যুসংবাদ পেয়েই সম্ভবত তাঁর পিতা ইচিগো প্রদেশ থেকে কিউটোতে ফিরে আসেন। মুরাসাকির ভাই নুবোনোরি মারা যান তিন বছর আগে অর্থাৎ ১০১১ সালে। পুত্র-কন্যার মৃত্যুতে তাঁর পিতা বিমর্ষ এবং হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। বাকি জীবনটা চাকরি ছেড়ে তিনি উপাসনার কাজে মিদেরা প্যাগোডায় কাটিয়ে দেন এবং ১০২৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

১০১৪ সালের পর মুরাসাকির ডায়েরি বা কোনো লেখার পরিচয় পাওয়া যায় না। জীবিত থাকলে তাঁর লেখালেখি করারই কথা। জীবিত থাকলেও হয়তো অসুস্থ ছিলেন অথবা এতটাই ধর্মীয় কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, সৃষ্টিশীল লেখা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তাঁর কন্যা অবশ্য কবি হয়ে ওঠেন এবং কবি দাইনি নো সানমি নামে পরিচিতি লাভ করেন।

রাজপ্রাসাদে ১০২৫ সালে চাকরিও লাভ করেন। সে-সময়টা ছিল সম্রাট গো-রেইঝেইয়ের (১০২৫-৬৮) শাসনকাল।৪৫

 

পাঁচ (আট)

মুরাসাকি শিকিবু তাঁর আসল নাম নয়, ছদ্মনাম। তাঁর ছদ্মনামটা খুব সম্ভব সম্রাটের প্রাসাদে কোনো এক নৈশভোজসভায় ঘটনাক্রমে প্রদান করা হয়। এ-সম্পর্কে তাঁর ডায়েরিতে বলা হয়েছে, ১০০৮ সালে তখনকার সুখ্যাত সভাকবি ফুজিওয়ারা নো কিন্তু গেঞ্জি উপন্যাসের চরিত্র ‘মুরাসাকি’কে পরোক্ষভাবে লেখিকা নিজে কিনা তাঁর প্রতি ইঙ্গিত করেন।৪৬ সেই থেকে সম্ভবত তাঁর নাম মুরাসাকি হয়ে যায়। মিচিনাগার ১০০৭ সালের ডায়েরিকে অনুসরণ করে কেউ-কেউ মনে করেন, তাঁর নাম ছিল ফুজিওয়ারা তাকাকু। তবে তিনি মুরাসাকি শিকিবু নামেই সারা বিশ্বে পরিচিত।

 

ছয়

মুরাসাকি শিকিবু ঔপন্যাসিক এবং কবি। তাঁর লেখা ডায়েরিও সাহিত্যিক মূল্যসম্পন্ন।

মুরাসাকি শিকিবুর প্রধান কীর্তি হচ্ছে গেঞ্জি মনোগাতারি বা গেঞ্জি উপন্যাস, ইংরেজিতে দ্য টেল অব গেঞ্জি। বিশ্বের প্রথম উপন্যাস বলা হয় একে। তিন খ– চুয়ান্ন অধ্যায় বিশিষ্ট এগারশো পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাস এটি।

 

ছয় (এক)

উপন্যাসের কাহিনি খুব সংক্ষেপে এরকম : সম্রাট কিরিতসুবোর দ্বিতীয় সন্তান গেঞ্জি। তিন বছর বয়সে গেঞ্জির মাতৃবিয়োগ ঘটে। উপপত্নীর সন্তান হলেও সম্রাট তাকে খুব পছন্দ করতেন। সম্রাট তাঁর সন্তানের মায়ের কথা ভুলতে পারেন না। সম্রাট এমন এক রমণীর কথা শুনলেন, যে কিনা দেখতে তাঁর পরলোকগত উপপত্নী, গেঞ্জির মায়ের মতো। এই মহিলার নাম ফুজিতসুবো। তিনি পূর্ববর্তী এক সম্রাটের কন্যা। সম্রাট তাঁকে বিয়ে করলেন। গেঞ্জি এ-মহিলাকে মান্য করে। তাঁর কাছে লালিত-পালিত হয়।

যৌবনে উপনীত হয় গেঞ্জি। অত্যন্ত সুদর্শন, ‘হিকারো’ বা সাইনিং গেঞ্জি। তবে রাজনৈতিক কারণে অবনমিত মর্যাদায় নিম্ন পর্যায়ের রাজকর্মচারী হিসেবে তাকে কর্মজীবন শুরু করতে হয়। এ সময় হিকারো গেঞ্জি তাঁর সৎমা ফুজিতসুবোর প্রেমে পড়ে যায়। তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

তার আগে নো অয়ী নামের এক যুবতীর সঙ্গে বিয়ে হয় গেঞ্জির। সৎমায়ের সঙ্গে সম্পর্কের কথা জেনে গেলে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। গেঞ্জির সঙ্গে ফুজিতসুবোর অবৈধ সম্পর্কের কথা প্রকাশ পেয়ে গেলে গেঞ্জি খুব হতাশ হয়ে পড়ে।

স্ত্রীর সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ। তখন সে অনেক নারীর সঙ্গে অতৃপ্ত ও অসম্পূর্ণ প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে অবজ্ঞা ও বোকামির শিকার হতে হয়। কেউ-কেউ তাকে হতাশ করে অসময়ে মারাও যায়।

একবার সে দেখতে পায় এক সুন্দরী মহিলা তার জানালায় দাঁড়িয়ে আছে। গেঞ্জি অনুমতি ছাড়াই তার কক্ষে প্রবেশ করে। মহিলাকে বিছানায় যেতে বাধ্য করে। ক্ষমতাধর ব্যক্তি বলে মহিলা গেঞ্জিকে বাধা দেয় না। আরেকবার গেঞ্জি উত্তর পল্লির কিতাইয়ামা পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণে যায়। কিতাইয়ামা কিয়োটোতে অবস্থিত। সেখানে সে দশ বছর বয়সী এক মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটি দেখতে ঠিক ফুজিতসুবোর মতো। সে এ-বালিকাকে অপহরণ করে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসে এবং ফুজিতসুবোর মতো তাকে শিক্ষিত ও মার্জিতভাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। মেয়েটির নাম মুরাসাকি। এ-সময় গেঞ্জি গোপনে সম্রাজ্ঞী ফুজিতসুবোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাতে সম্রাজ্ঞী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে এই ছেলের নাম রাখা হয় রেইঝেই। এরা দুজন ছাড়া সবাই জানে এই ছেলের পিতা সম্রাট কিরিতসুবো। পরে এই ছেলে ক্রাউনপ্রিন্স এবং লেডি ফুজিতসুবো সম্রাজ্ঞী হন। গেঞ্জি এবং ফুজিতসুবো প্রতিজ্ঞা করে যে, এরা এ গোপন তথ্য কখনো ফাঁস করবে না। সবকিছু গোপন রাখবে।

এ গোপনীয়তার মধ্যে গেঞ্জি এবং তার স্ত্রী অয়ীর সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। তার স্ত্রী একটি সন্তান জন্ম দেয়। তবে সন্তানটি মারা যায়। গেঞ্জি দুঃখ পেয়ে আবার হতাশ হয়ে পড়ে। দুঃখ ভুলে যাওয়ার জন্য গেঞ্জি এবার মুরাসাকিকে কাছে পায়। তাকে নিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে ওঠে এবং এক সময় তাকে বিয়ে করে।

গেঞ্জির পিতা সম্রাট কিরিতসুবো এ-সময় মারা যান। তার বড় ছেলে সুজেকো সম্রাট হন। সম্রাটের মাতা কোকিডেন কিরিতসুবোর রাজনৈতিক শত্রম্নদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুত্রের ক্ষমতা সংহত করেন।

গেঞ্জি রাজদ–র ব্যাপারে মোটেও উৎসাহী নয়। এ-সময় তার আরেকটি গোপন প্রেমের তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। সম্রাট সুজেকো গেঞ্জির সঙ্গে তার এক রক্ষিতার মিলনদৃশ্য দেখে ফেলেন। সম্রাটের এই গোপন রক্ষিতার কথা শুধু গেঞ্জি জানত।

সম্রাট রক্ষিতাকে উপভোগের বিষয়টি শুধু তার ভাই গেঞ্জিকে বলেছিলেন। সম্রাট বিশ্বাসভঙ্গের কারণে গেঞ্জিকে শাস্তিস্বরূপ প্রত্যন্ত হারিমা প্রদেশের সুমা নগরীতে পাঠিয়ে দেন। সুমা নগরীতে আকাশি নভিস নামে পরিচিত এক ভদ্রলোক গেঞ্জিকে আতিথ্য দেন। গেঞ্জি আকাশির এক কন্যার প্রেমে পড়ে যায়। সে-প্রেমের ফসল হিসেবে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।

এদিকে রাজধানীতে সম্রাট সুজেকো তার বাবাকে স্বপ্নে দেখে মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হন। তার হৃদয় ভেঙে যায়। মা কোকিডেন অসুস্থ। তার সিংহাসন ধরে রাখার ক্ষমতা নেই। এই মানসিক অবস্থায় সম্রাট গেঞ্জিকে ক্ষমা করে দেন। গেঞ্জি রাজধানী কিয়োটোতে প্রত্যাবর্তন করে। এ পর্যায়ে সম্রাটের ভ্রাতা রেইঝেই সম্রাট হন। গেঞ্জি রাজকর্মচারীর কাজে ইস্তফা দেয়। এক সময় নতুন সম্রাট জানতে পারেন যে, গেঞ্জিই তার আসল পিতা। সম্রাট পিতার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে গেঞ্জিকে সর্বোচ্চ রাজপদ প্রদান করেন।

বয়সের কারণে গেঞ্জির স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করে। দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য রাজকীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হলেও গেঞ্জির প্রেম ও আবেগময় জীবনে ধীরে-ধীরে অধঃপতন নেমে আসে। সে আরেকটি বিয়ে করে। তাকে ‘ওন্যা সান নো মিয়া’ অর্থাৎ থার্ড প্রিন্সেস বা তৃতীয় রাজকুমারী বলা হয় (এ-নামে জাপানের কানসাইতে একটি শহর রয়েছে)। এই রাজকুমারীর সঙ্গে গেঞ্জির ভাইপোর প্রেম এবং দৈহিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তাতে জন্ম হয় প্রিন্স কাওরোর। সবাই জানে কাওরো গেঞ্জির সন্তান, আসলে তা নয়।

বৃদ্ধ বয়সে গেঞ্জির বিয়ে মুরাসাকির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায়। মুরাসাকি ‘বিকুনি’র (সন্ন্যাসিনী) জীবন বেছে নেন। সন্ন্যাসিনী অবস্থায় মুরাসাকি মারা যান। এ মৃত্যু গেঞ্জিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। জীবনের কি তা হলে এই পরিণতি? মৃত্যুচিন্তা তাকে পেয়ে বসে। গেঞ্জি এক সময় মারা যায়।

উপন্যাসটি এখানে শেষ হতে পারত। কিন্তু তা বাড়ানো হয়েছে গেঞ্জির পরবর্তী আরো দুই প্রজন্ম পর্যন্ত। উপন্যাসের ৪৫ থেকে ৫৪ অধ্যায় পর্যন্ত তার ব্যাপ্তি। এ অধ্যায়গুলোকে বলা হয় ‘টেন উজি চ্যাপ্টার’। উজির পটভূমিতে এ অধ্যায়গুলো রচিত বলে এরকম নাম। এ অধ্যায়গুলোও প্রেম আর বিরহের।

 

ছয় (দুই)

উপন্যাসটি এক হাজার বছর আগে লেখা হলেও তার কয়েকটি দিক বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এটি শুধু প্রথম উপন্যাসই নয়, প্রথম আধুনিক উপন্যাসও। প্রাচীন সাহিত্যে আমরা শুধু দেখি ধর্ম আর দেব-দেবীদের প্রাধান্য। সেখানে মানুষ গৌণ। প্রাচীন জাপান অর্থাৎ মুরাসাকির সমসাময়িককালে যেসব উপাখ্যান বা মনোগাতারি রচিত হয়েছে সেগুলোয় দেব-দেবীর প্রাধান্য, কম করে হলেও রূপকথা অথবা ফ্যান্টাসিতে ভরপুর। জাপানের ঐতিহ্যগত ‘মনোগাতারি সাহিত্যে’ পাঠক এ সবই দেখে এসেছে।৪৭

এই ধারায় ব্যতিক্রম নিয়ে এলেন মুরাসাকি। এখানে প্রাধান্য পেল মানুষ এবং মানুষের বাস্তব জীবন। সেই মানুষেরা হচ্ছে তাঁর চারপাশের মানুষ, যাদের সঙ্গে তাঁর প্রতিদিনই সাক্ষাৎ ঘটে। সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, যুবরাজ এবং রাজন্যবর্গ। আর লিখলেন রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস। এমন উপন্যাস, যা আমাদের খেলা রাম খেলে যা উপন্যাসকেও হার মানায়। গ্রন্থটি প্রথম মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসেরও গৌরব পেল। আধুনিক মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক সংকট তা উঠে এলো এই উপন্যাসে। ব্যাখ্যা ও বিশেস্নষণগুলো একই সঙ্গে নৈতিক ও নিয়তিনির্ভর এবং বৈজ্ঞানিক। সমালোচকেরা মনে করেন, এই উপন্যাস আজ পর্যন্ত আদর্শ ক্লাসিক্যাল উপন্যাসের প্রতিভূ।

 

ছয় (তিন)

উপন্যাসের পটভূমি দশম-একাদশ শতকের সমৃদ্ধ হেইয়ান সাম্রাজ্য। সম্রাট এবং তাঁর দরবারের অভিজাত মানুষ, যেমন : সম্রাজ্ঞী, রাজপুত্র-রাজকন্যা, মন্ত্রী, গভর্নর, সেনা কর্মকর্তা, রাজকর্মচারী, রাজকবি প্রভৃতি উচ্চপর্যায়ের মানুষের জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন তিনি। তবে তা বাস্তবের আদলে কাল্পনিক চিত্র।

চরিত্র-চিত্রণে মুরাসাকি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। হেইয়ান রাজসভাকেন্দ্রিক উপন্যাসে রাজকীয় পটভূমি ও আবহের পাশাপাশি রাজকীয় চরিত্রের অবতারণা যেমন খুবই প্রাসঙ্গিক ছিল, তেমনি তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলা ছিল উপন্যাসের বাস্তবিক ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরিচায়ক। তা করা হয়েছে সতর্কতার সঙ্গে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, মুরাসাকি চরিত্রগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভোগ-লালসা, ক্ষমতার পরিণাম, বিশেষ করে রোমাঞ্চ ও সম্ভোগের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা তখনকার ধ্যান-ধারণায় বিরলতম।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হিকারু গেঞ্জি। সে সম্রাটের পুত্র, যুবরাজ। উপপত্নীর সন্তান। মাতার মৃত্যুর পর বিমাতা ফুজিতসুবোর কাছে মানুষ হয়। নো অয়ী নামে ষোলো বছর বয়সের এক যুবতীর সঙ্গে তার বিয়ে হয় মাত্র বারো বছর বয়সে। বয়সের ব্যবধান গেঞ্জির জীবনকে প্রথম জটিল এক পথের সন্ধান দেয়। কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিয়েই সে বিমাতা ফুজিতসুবোর প্রেমে পড়ে, তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। লোকে জানে এই সন্তান সম্রাটের।

গেঞ্জি খুব সুদর্শন। সৎমা যেমন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, তেমনি আরো বহু নারীর সান্নিধ্য পেয়েছে সে। গেঞ্জির ভোগ মানসিকতার মধ্যে আধুনিককালের ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের বিকাশ সুস্পষ্ট। তার ভোগজীবন স্বাভাবিক নয়। ভিন্নপথে পরিচালিত। বয়োজ্যেষ্ঠ প্রথম স্ত্রী যেন তার ভোগজীবনের মূল কুঁড়িটি ভেঙে দিয়ে বহু কুঁড়ি গজানোর সুযোগ করে দিয়েছে। প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রে সে ক্ষমতালোভী নয়, তবে ভোগ মানসিকতায় সুযোগ-সন্ধানী। কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতে চায় না।

ঔপন্যাসিক ভোগের পাশাপাশি নৈতিকবোধ এবং নিয়তিনির্ভর কর্মফলবাদের ওপর গেঞ্জির পরিণাম নির্ধারণ করেছেন। দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য গেঞ্জির প্রেম ও আবেগময় জীবনে ধীরে-ধীরে অধঃপতন নেমে আসে। সে আরেক রমণীকে বিয়ে করে। তাকে বলা হয় ‘থার্ড প্রিন্সেস’। এই রাজকুমারীর সঙ্গে গেঞ্জির ভাইপোর দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং তাতে জন্ম হয় প্রিন্স কাওরোর। লোকজন জানে সে গেঞ্জির সন্তান। আসলে বাস্তবে তা নয়।

গেঞ্জির মডেল মনে করা হয় মিচিনাগাকে। মিচিনাগা সম্পর্কে মুরাসাকির ডায়েরি থেকে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়। গেঞ্জি জোর করে যে মুরাসাকিকে রাজপ্রাসাদে তুলে আনে, অনেক সমালোচক তাঁর মধ্যে ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবুকে আবিষ্কার করেন। তখন মিচিনাগাকেও এরা সামনে নিয়ে আসেন। তবে মিচিনাগা মডেল হিসেবে সামনে থাকলেও মুরাসাকির নির্মাণ করা গেঞ্জি চরিত্র অনেক উঁচুদরের, যার সঙ্গে মিচিনাগার তুলনা চলে সামান্যই।

 

ছয় (চার)

সমকালীন বিষয় নিয়ে কাজ করার মধ্যে ঝামেলাও ছিল। তা ছিল খুব স্পর্শকাতর বিষয়। তিনি রাজপ্রাসাদে কাজ করলেও রাজকবি কিংবা কাহিনিকারদের মতো রাজা বা সম্রাটের প্রশস্তিমূলক সাহিত্য রচনা করতে যাননি। লেখার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করতে চেয়েছেন। এক রাতের ভোজসভায় সভাকবি (কোর্টপয়েট) ফুজিওয়ারা নো কিন্তু মুরাসাকিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য হঠাৎ করেই প্রশ্ন করেন, তোমার গেঞ্জি মনোগাতারিতে এই রাজপ্রাসাদের কোন-কোন চরিত্রের কথা বলেছো? মুরাসাকি তাৎক্ষণিক জবাব দেন, আমার কোনো চরিত্র এখানে বাস করে না।৪৮ তিনি তাঁর ডায়েরিতে বিষয়টি উলেস্নখ করেন। সম্রাট, সম্রাজ্ঞী ও মিচিনাগা নিয়মিতই তাঁর লেখা পড়তেন। তারপরও চরিত্র সৃষ্টি কিংবা গল্প বর্ণনায় কাউকে খুশি করতে তৎপর হননি। বরং যা দেখাতে চেয়েছেন তা হলো ক্ষমতার নির্মম বা অন্যায় ব্যবহারে নশ্বর সুখ শুধু মানব অস্তিত্বে দুঃখই বয়ে আনে। উপন্যাসের অন্তত এক হাজার জায়গায় তিনি ‘মোনো নো এওয়্যার’ অর্থাৎ ‘দ্য সরো অব হিউম্যান এক্সিসট্যান্স’ কথাটি ব্যবহার করেছেন।৪৯

মুরাসাকি চাইলে রাজপ্রাসাদে তাঁর অবস্থানের কথা বিবেচনায় এনে সুবিধাভোগীর মতো আইডিয়ালিস্টিক ভাবনায় উপন্যাসকে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে গেঞ্জি উপন্যাসে মানবজীবনের বাস্তব কিছু দিকের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যেখানে ভোগ, ক্ষমতা, বাসনা, বাস্তবিকভাবেই পরিদৃশ্যমান। তাঁর জন্য আছে নির্লিপ্ততা, আত্ম-প্রক্ষেপশূন্যতা (চরিত্র সৃষ্টিতে, কাহিনি রূপায়ণে কিংবা ঘটনার বর্ণনায়) যা নায়কের জন্য সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও অনাকাঙিক্ষত কোনো ভাবলোকের জন্ম দেয়নি এবং উপন্যাসে তা অভিপ্রেতও নয়। তবে টেলরের মতে, মুরাসাকি চরিত্রে নিজের জীবনের প্রতিফলন ঘটালেও তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর নতুন সৃষ্টির ঈশ্বরই থাকতে চেয়েছেন, নিজে উপন্যাসের চরিত্র হতে যাননি।৫০

 

ছয় (পাঁচ)

উপন্যাসের সর্বত্র হেইয়ান সাম্রাজ্যের আভিজাত্য, ঐশ্বর্য এবং উচ্চতর জীবনমানের পরিচয় আছে। উচ্চ সমাজের পরিপূর্ণ একটি সমাজচিত্র আছে। এই সমাজের সঙ্গে মুরাসাকির পরিচয় ছিল প্রত্যক্ষ। একজন মেধাবী ও প্রতিভাময়ী লেখিকা হিসেবে তাঁর উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় ও পটভূমি নির্বাচনের মধ্যে যতটা পরিচয় পরিব্যাপ্ত তার চেয়ে বেশি প্রতিভার সাক্ষাৎ মেলে চিত্রকল্প ও চরিত্র-সৃষ্টিতে। গেঞ্জি উপন্যাসের ৪৫তম অধ্যায়ে একটি দৃশ্যবর্ণনা এরকম : এক দারুণ বসন্তদিন। অষ্টম যুবরাজ উজির রাজপ্রাসাদে বসে প্রাকৃতিক বাগানের দিকে তাকিয়ে আছেন। সেখানে পুকুরে সন্তরণশীল একজোড়া খুদে বুনোহাঁস। বাঁশ গাছের নুয়েপড়া অগ্রভাগ পানি স্পর্শ করে দুলছে। তার মনে কবিতার জন্ম হলো। তিনি কবিতা আওড়াতে লাগলেন। স্ত্রী বিয়োগের আগে যখন এ-দৃশ্য দেখতেন তখন তার মনে হতো, ছোট্ট এসব বুনোহাঁস অনিশ্চিত অসিস্ত নিয়ে পানির ওপর বাঁচে খামোখাই। এখন তার ঈর্ষাই হয় যখন দেখেন যে, এরা পানির ওপর পা ফেলে-ফেলে একে অন্যের কাছে সুখে ছুটে যাচ্ছে পাখা মেলে।

মুরাসাকি মূলত একজন কবি। ১২৮টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতা-সংকলন, যার ইংরেজি নাম পয়েটিক মেমোরিজ।৫১ বহু কবিতা আছে গেঞ্জি উপন্যাসে। গদ্য উপন্যাসে তাঁর কবি-প্রতিভার প্রকাশ সর্বত্র। আমাদের কালিদাসের মেঘদূতের সে-বর্ণনা ‘বসন ধরে আছে শিথিল হাতে যেন, তেমনি নুয়ে আছে বেতের শাখা, মুক্ত কর সখা তট নিতম্বরে, সরিয়ে নিয়ে নীল সলিলবাস’ কিংবা, রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের ‘স্বপ্ন’ কবিতার উজ্জয়িনীর দৃশ্যবর্ণনা বা চিত্রকল্পের কথা মনে করিয়ে দেবে প্রেম ও প্রকৃতিসচেতন মুরাসাকির চিত্রকল্পগুলো।

মানব সম্পর্ক বিশেস্নষণে মুরাসাকি উচ্চতর শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বহু চরিত্র এসেছে উপন্যাসে। চরিত্রগুলোর মানবিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ও রাজকীয় অবস্থান, পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার, বিশেষ করে নারী-চরিত্রের ভালোবাসার অনুভূতি এবং অন্তরের ভেতরকার সৌন্দর্যগুলো এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তার পরিপ্রেক্ষিতে হেলেন ম্যাককলাফ বলেন, মুরাসাকির লেখার আবেদন বিশ্বজনীনই হয়ে ওঠেনি, মানুষের অভিজ্ঞতা, যুক্তি, বিশ্বাস ও বর্ণনাশক্তির সীমা ছাড়িয়ে তা সকল যুগকে অতিক্রম করেছে।৫২

 

ছয় (ছয়)

গেঞ্জি উপন্যাসের প্রথম ইংরেজ অনুবাদক আর্থার ওয়ালে মনে করেন, উপন্যাসটি লেখার কাজ শেষ করেছিলেন মুরাসাকি।৫৩ আইভান মরিচ, দ্য ওয়ার্ল্ড অব দ্য শাইনিং গেঞ্জি বইয়ের লেখক, মনে করেন, উপন্যাসটির কাজ শেষ হয়নি। অথবা শেষাংশটি হারিয়ে গেছে।৫৪ দ্বিতীয় ইংরেজ অনুবাদক সেইডেন স্টাইকার বিশ্বাস করেন, মুরাসাকি শিকিবুর বোধহয় শেষ করার মতো কোনো গল্প-কাঠামো জানা ছিল না, যতদূর সম্ভব লিখে যেতে চেয়েছেন।৫৫

এসব কথা বলার কারণ আছে। এ-উপন্যাসের দুর্বল দিক হচ্ছে এটি। উপন্যাসের কাঠামোগত দিক বিশেস্নষণ করলে দেখা যাবে তার বিসত্মৃতি ঘটেছে তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত। ঐতিহ্যগতভাবে তিনভাগে বিভক্ত উপন্যাসটির প্রথম দুভাগ গেঞ্জির জীবনভিত্তিক। শেষের ভাগ গেঞ্জির উত্তরাধিকারী নাইও এবং কাওরোদের কাহিনি। উপন্যাসের ১ থেকে ৩৩ অধ্যায় প্রেম ও রোমান্স, ৩৪ থেকে ৪১-এ সাফল্য ও ব্যর্থতা, ৪২ থেকে ৪৪ ক্রান্তিকাল এবং ৪৫ থেকে ৫৪ পর্যন্ত বহুল আলোচিত উজি অধ্যায়। কেউ-কেউ মনে করেন, মূল উপন্যাস শেষ হয়ে গেছে ৩৩ নং অধ্যায়েই। ইয়াসানো আকিকো, যিনি প্রথম আধুনিক জাপানি ভাষায় উপন্যাসটির ভাষান্তর করেন। তিনি বলেন, ১ থেকে ৩৩ অধ্যায় পর্যন্ত মুরাসাকি নিজে লিখেছিলেন। বাকি ৩৪ থেকে ৫৪ অধ্যায় পর্যন্ত লিখেছেন তাঁর কন্যা দাইনি নো সানমি।৫৬ কেউ-কেউ বলেন, ৪২ থেকে ৫৪ অধ্যায়গুলো বিশেষ করে ৪৪ অধ্যায় একজন লেখকই লিখেছেন – এমন মনে হয় না। রয়েল টেইলর তাঁর ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকায় কম্পিউটার বিশেস্নষণ করে দেখিয়েছেন, পরিসংখ্যানগত তাৎপর্য যা-ই থাকুক, ৪৫-৫৪ অধ্যায়ের সঙ্গে অপরাপর অধ্যায়গুলোর রচনাশৈলীতে বেশ অসংগতি রয়েছে।

সাধারণভাবে মনে করা হয়, উপন্যাসটি সমাপ্ত হয়েছে ১০২১ সালের মধ্যেই। এরকম মনে করার কারণ হচ্ছে, সেই সময়ে সারাসিনা নিক্কি গ্রন্থের লেখিকা তাঁর ১০২১ সালের ডায়েরিতে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখেছেন – তিনি গেঞ্জি উপন্যাসের সবগুলো অধ্যায় পেয়ে গেছেন। পঞ্চাশটির বেশি অধ্যায় এবং একটি চরিত্রের উলেস্নখও করেছেন তিনি।৫৭ তাই প–তেরা মনে করেন, যদি কেউ মুরাসাকির উপন্যাসের শেষাংশের কাজ করেও থাকেন তা তাঁর লেখার খুবই কাছাকাছি সময়ে। মুরাসাকির ডায়েরির একটি সূত্রও উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ‘মুরাসাকি’র যে-ইঙ্গিত বহন করে, তা নিশ্চিত করে পুরো উপন্যাসটি তখন শেষের দিকে।৫৮ উলেস্নখ্য, ডায়েরিটি ১০০৮ সালে লেখা।

 

ছয় (সাত)

একাদশ শতকের জাপানি সম্রাট এবং তাঁর সভাসদদের রুচিবোধ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে উপন্যাসটি রচিত। আধুনিক পাঠকের কাছে তাই তা অনেকাংশেই বেশ কঠিন। ভাষার দিক থেকে রীতিমতো দুর্বোধ্য। তাই বিশ শতকে এসেও ইয়াসানো আকিকোকে আধুনিক জাপানি ভাষায় তা আবার অনুবাদ করতে হয়েছে। সে-অনুবাদও যে সুখপাঠ্য তা কিন্তু নয়। হেইয়ান রাজসভার ভাষা ছিল বেশ বাঁকানো এবং ব্যাকরণগতভাবে অত্যন্ত জটিল। হেইয়ান রাজভাষার অপর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবিত্ব। ভাষা কাব্যধর্মী নয়। কথোপকথনে ছন্দময় পদ্যের ব্যবহার। সে-পদ্য হতো ইঙ্গিতধর্মী, যা এখন সন্ধ্যাভাষার মতোই রহস্যময়। চলমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে ক্লাসিককাব্য করা ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। সবটা বলে ফেললে কিংবা বুঝতে দিলে যেন আভিজাত্য থাকে না। মুরাসাকি উপন্যাসে জাপানি তানকা রীতির কবিতা ব্যবহার করেছেন। এই কবিতার সবটা পাত্রপাত্রীরা উচ্চারণ করে না, কারণ এসব কবিতা তাদের জানা আছে বলে শুধু দু-এক পঙ্ক্তি উচ্চারণ করে।৫৯

 

ছয় (আট)

উপন্যাসটির মূল পা-ুলিপি, মুরাসাকি শিকিবু স্বহসেত্ম যেটি তৈরি করেছিলেন, তা আজো পাওয়া যায়নি। মনে করা হয় কালের অতল গহবরে এটি হারিয়ে গেছে। তবে বিপুলসংখ্যক নকল কপি, ইকেদা কিকানের মতে তিনশোর কাছাকাছি, সংগৃহীত হয়েছে। মনে করা হয় যে, তাঁর সময়ে কোনো-কোনো কপি মুরাসাকি সংশোধন করেছিলেন। পরবর্তীকালে লিপিকররা উভয় কপি নকল করে এরকম সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন। পা-ুলিপির কপিগুলো জাপানি পা-ুলিপি বিশেষজ্ঞরা তিন ভাগে ভাগ করেছেন : ক. কাওয়াচিবুন খ. আওবাইয়োশিবুন এবং গ. বেপপন।

ত্রয়োদশ শতকে মিনামোত-নো-চিকাইয়োকি এবং ফুজিওয়ারা তেইকা পাণ্ডুলিপিগুলো সম্পাদনা এবং সংশোধনের দুটো বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চিকাইয়োকির পা-ুলিপিগুলোকে বলা হয় কাওয়াচিবুন। এ-কাজটি শুরু হয় ১২৩৬-এ এবং শেষ হয় ১২৫৫-তে। তেইকা পা-ুলিপিকে বলা হয় আওবাইয়োশিবুন। মূলকে অধিকতর অনুসরণ করে এ-পা-ুলিপি সম্পাদনা করা হয়। বেপপন হচ্ছে এগুলোর বাইরে অপরাপর পা-ুলিপি। ২০০৮ সালের ১০ মার্চ তারিখে প্রচার করা হয় যে, কামাকুরা সময়ের একটি পা-ুলিপি কিউটোতে পাওয়া গেছে। এটি উপন্যাসের ষষ্ঠ অধ্যায়, যার পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬৫। এ-পা-ুলিপিটির ওপর কারো প্রভাব পড়েনি। প্রফেসর ইয়ামামোতু তোকুরা পরীক্ষা করে বলেন, এই পান্ডুলিপিটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং দুর্লভ। প্রফেসর কাতু ইউসুকো মনে করেন, এ-আবিষ্কারের তুলনা হয় না। কেননা তেইকা নয় এমন পা-ুলিপি কামাকুরা সময়ে পাঠ করা হয়েছে, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

ওই বছরই ২৯ অক্টোবর কুনান মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রচার করা হয় যে, মধ্য কামাকুরা সময়ের একটি পা-ুলিপি পাওয়া গেছে। ৩২তম অধ্যায়ের পা-ুলিপি এটি। মনে করা হয়, পা-ুলিপিটি প্রস্ত্তত করা হয়েছে ১২৪০-৮০ এর মধ্যে। ৭৪ পৃষ্ঠার এ-পান্ডুলিপিটি সম্পর্কে বলা হয়, সম্ভবত এটি মুরাসাকি শিকিবুর অনাবিষ্কৃত মূল পা-ুলিপির বেশি কাছাকাছি। উপন্যাসটির একাদশ কিংবা দ্বাদশ শতকের পান্ডুলিপি পাওয়া না গেলেও দ্বাদশ শতকের সচিত্র লেখ্যপট (Illustrated Scroll) পাওয়া গেছে। প্রাচীন জাপানে এ-লেখ্যপটগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিল। পরবর্তীকালেও প্রচুর সচিত্র লেখ্যপট অঙ্কন করতে দেখা যায়। উপন্যাসের ঘটনা বা পাত্রপাত্রীকে কেন্দ্র করে অজস্র চিত্রও আঁকা হয়েছে। দ্বাদশ শতক থেকে অদ্যাবধি এসব চিত্র আঁকা হচ্ছে। এগুলো বেশ জনপ্রিয়ও।

 

ছয় (নয়)

মনে করা হয়, উপন্যাসটি জাপানি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আদি কানা ভাষায় রচিত। এ ছাড়া একই শব্দের নানারকম ব্যবহারে আধুনিক পাঠক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যেতে বাধ্য। উপন্যাসের চরিত্রগুলোও নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। এদের নাম, পেশা ও সামাজিক মর্যাদা নির্ণয় করা এখন বেশ শক্ত। কোনো নারী-চরিত্র তাঁর স্বামীর পদবির সঙ্গে সম্পর্কিত ও পরিচিত। কেউ-কেউ পোশাকের রং বা ধরনের ওপর সম্বোধন পেয়েছে অথবা অ্যাবসার্ড নাটকের চরিত্রের মতো ইঙ্গিতে-ইশারায় পরিচিতি লাভ করেছে। একই ব্যক্তিকে দেওয়া নানা খেতাব এবং উপাধি তাকে শনাক্তকরণের প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তুলেছে। তাই গেঞ্জি উপন্যাসকে হতাশাবাদীরা মনে করেন, হেইয়ান রাজসভার কোটনি, পঠন-অযোগ্য সেকেলে অপরিচিত রাজভাষার উপন্যাস।৬০

মুরাসাকি শিকিবুর সামনে তখন অনুসরণযোগ্য আধুনিক উপন্যাসের কোনো নমুনা বা মডেল ছিল না। সাহিত্যের যা উদ্দেশ্য পাঠককে আনন্দদান এবং আদর্শগত ও নৈতিকতার পথপ্রদর্শন, তা সামনে রেখেই প্রচলিত ধারা ও বিশ্বাসকে দুদিকে ঠেলে এগিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর সমকাল এ-প্রচেষ্টাকে গ্রহণ করেছে। সারাসিনা নিক্কি গ্রন্থের লেখিকার ১০২১ সালে লেখা ডায়েরিতে প্রকাশিত উচ্ছ্বাস থেকেই বোঝা যায়, এ-উপন্যাস তখনই কতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দ্বাদশ শতকে এ-উপন্যাসের আলোকে বহু চিত্রকলা অঙ্কিত হয়েছে, কাঠ খোদাই হয়েছে, যা এত শতাব্দী পর আজো চালু আছে। উপন্যাসটি বর্তমান জাপানেও সমান জনপ্রিয়, মূলভাষার অংশবিশেষ স্কুলে পাঠ্য। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘মাস্টারপিস’।

 

সাত

জর্জ লুইস বর্গেস যে-কথা বলেছেন তার সঙ্গে একমত না হয়ে পারা যায় না। তিনি বলেছেন, অদ্ভুত স্বাভাবিকত্বে লেখা উপন্যাসটি মানব মনস্তত্ত্বের যে-বার্তা নিয়ে এসেছে তার প্রতি আগ্রহ না জন্মে পারে না।৬১ জাপানি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর নোবেল বক্তৃতায় বলেন, গেঞ্জি উপন্যাস জাপানি সাহিত্যের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করে আছে। আমাদের আজকের দিনেও এমন কোনো উপন্যাস নেই যার সঙ্গে তার তুলনা করা চলে। আমার কাছে খুবই অলৌকিক মনে হয়, একাদশ শতকে এমন একটি আধুনিক সাহিত্য রচিত হয়েছে।৬২ এই উপন্যাসের ভেতরকার গঠনশৈলীর সুসংহতরূপ ও শিল্পিত বাঁধুনি, জটিল মনস্তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, চরিত্র-চিত্রণে বিশেস্নষণধর্মিতা ও সুস্পষ্টতা, শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চ, উৎসব/ ঐতিহ্যের প্রাসঙ্গিক আবাহন, রাজকীয় পটভূমিতেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অবগাহন, কনফুসিয়ান দর্শনের রূপায়ণ এবং পাশাপাশি উজি তথা কিউটোর স্পিরিচুয়াল দিকের আঙ্গিকরণ মেধাবী পাঠককে না টেনে পারে না। এই উপন্যাসের আবেদন বিশ্বজনীন এবং সর্বকালের পাঠকের উপযোগী। ম্যাককলাফ ঠিকই বলেছেন, মুরাসাকি ইজ বোথ, দ্য কুইনটেসেনশিয়াল রিপ্রেজেনটেটিভ অব অ্যা ইউনিক সোসাইটি অ্যান্ড অ্যা রাইটার হু স্পিকস টু ইউনিভার্সেল হিউম্যান কনসার্নস উইথ অ্যা টাইমলেস ভয়েস।৬৩ আমাদের বিচারে এ-মূল্যায়ন যথার্থ।

 

তথ্যসূত্র

১. জন রিচার্ড বাওরিং (১৯৯৬), ‘ইনট্রোডাকশন’ ইন দ্য ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি লন্ডন, পেঙ্গুইন, পৃ ৪।

২. হারুশিরেন (১৯৮৭), দ্য ব্রিজ অব ড্রিমস : অ্যা পয়েটিকস অব ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’, স্ট্যানফোর্ড, পৃ ২১৫।

৩. কেনিথ হেনশেল (১৯৯৯), অ্যা হিস্ট্রি অব জাপান, নিউইয়র্ক, পৃ ২৪-২৫।

৪. হারুশিরেন (১৯৮৭), পৃ ২৯৩।

৫. জন রিচার্ড বাওরিং (২০০৪), দ্য কালাচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড ইন দ্য টেল অব গেঞ্জি, কেমব্রিজ ইউপি, পৃ ৪।

৬. চেইকো মুলহার্ন (১৯৯৪), জাপানিজ ওমেন রাইটার : অ্যা বায়োক্রিটিক্যাল সোর্সবুক, ওয়েস্ট পোর্ট সিটি, পৃ ২৫৭।

৭. চেইকো মুলহার্ন (১৯৯১), হিরোয়িক উইথ গ্রেস : লিজেনডারি ওমেন অব জাপান, আরমোনক, পৃ ৭৯।

৮. চিঝিকো ও য়েনো (২০০৯), মডার্ন ফ্যামিলি ইন জাপান : ইটস রাইজ অ্যান্ড ফল, মেলবোর্ন, পৃ ২৫৪।

৯. মিখাইল এডোলফ্সন (২০০৭), হেইয়ান জাপান : সেন্টারস অ্যান্ড পেরিফেরিজ, হনলুলু, পৃ ১১১।

১০. এডউইন রেসচাওয়ার (১৯৯৯), জাপান : দ্য হিস্ট্রি অব অ্যা নেশন, নিউইয়র্ক, পৃ ২৯।

১১. থমাস ইনজে (১৯৯০), লেডি মুরাসাকি অ্যান্ড দ্য ক্রাফট অব ফিকশন, আটলান্টিক রিভিউ, পৃ ৯।

১২. শিরেন (১৯৮৭), পৃ ২১৮।

১৩. ওই।

১৪. ওই।

১৫. ওই।

১৬. মুলহার্ন (১৯৯১), পৃ ৮৪।

১৭. ক্রেইগ লকার্ড (২০০৮), সোসাইটিজ, নেটওয়ার্কস অ্যান্ড ট্রানজিশানস, ভলিউম-১, বোস্টন, পৃ ২৯২।

১৮. জশোয়া মোসতো (২০০১), মাদার টাং অ্যান্ড ফাদার স্ক্রিপ্ট, হনলুলু, পৃ ১৩০।

১৯. আর্থার ওয়ালে (১৯৬০), ইনট্রোডাকশন ইন শিকিবু, মুরাসাকি, দ্য টেল অব গেঞ্জি : অ্যা নভেল ইন চিক্র পাট্স, নিউইয়র্ক, পৃ ৭।

২০. হেনশেল (১৯৯৯), পৃ ২৫।

২১. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ৭।

২২. ডোনাল্ড কিন (১৯৮৮), পেস্নজার্স অব জাপানিজ লিটারেচার, নিউইয়র্ক, পৃ ৪১৪।

২৩. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১০।

২৪. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৬০।

২৫. শিরেন (১৯৮৭), পৃ ২২২।

২৬. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৫৮।

২৭. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৫৯।

২৮. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ৭।

২৯. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ৭।

৩০. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ৭।

৩১. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১৫।

৩২. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ১৫৬।

৩৩. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১৪।

৩৪. এডোলফসন (২০০৭), পৃ ১১০।

৩৫. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১১।

৩৬. মোসতো (২০০১), পৃ ১৩৩।

৩৭. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৫৯।

৩৮. মোসতো (২০০১), পৃ ১৩৭।

৩৯. শিরেন (১৯৮৭), পৃ ২২১।

৪০. বাওরিং (২০০৪), পৃ ৩।

৪১. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১৫।

৪২. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৫৯।

৪৩. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৫৯।

৪৪. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১৪।

৪৫. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৫৯।

৪৬. রিচার্ড বাওরিং, মুরাসাকি শিকিবু : দ্য ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি (২০০৫), পেঙ্গুইন, পৃ ২৩।

৪৭. রিচার্ড বাওরিং, মুরাসাকি শিকিবু : দ্য ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি (২০০৫), পেঙ্গুইন, পৃ ২৪।

৪৮. রিচার্ড বাওরিং, মুরাসাকি শিকিবু : দ্য ডায়েরি অব লেডি মুরাসাকি (২০০৫), পেঙ্গুইন, পৃ ২৪-২৫।

৪৯. হেনশেল (১৯৯৯), পৃ ২৭।

৫০. হেলেন ম্যাককলাফ (১৯৯০), ক্লাসিক্যাল জাপানি প্রোজ : এন অ্যানথোলজি, স্ট্যানফোর্ড, পৃ ৯।

৫১. মুলহার্ন (১৯৯৪), পৃ ২৬১।

৫২. ম্যাককলাফ (১৯৯০), পৃ ৯।

৫৩. ওয়ালে (১৯৬০), পৃ ১২।

৫৪. আইভান মরিচ (১৯৬৪), দ্য ওয়ার্ল্ড অব সাইনিং গেঞ্জি, কোর্ট লাইফ ইন এনশিয়েন্ট, জাপান, পৃ ৮৮।

৫৫. এডওয়ার্ড সেইডেন স্টাইকার (১৯৭৬), দ্য টেল অব গেঞ্জি, টারটল পাবলিশিং, লন্ডন, পৃ ১১।

৫৬. রয়েল টেইলার (২০০২), মুরাসাকি শিকিবু, ভিকিং, পৃ ১০।

৫৭. রিচার্ড বাওরিং (২০০৫), পেঙ্গুইন ক্লাসিকস, পৃ ৩১।

৫৮. জি, ডরিস বার্জেন (১৯৯৭), এ ওমেনস উইপোন : স্পিরিট পজেশন ইন দ্য টেল অব গেঞ্জি, হনলুলু, পৃ ৪৮।

৫৯. টেইলর (২০০২), পৃ ৭।

৬০. টেইলর (২০০২), পৃ ৭।

৬১. জর্জ লুইস বর্গেস, দ্য টেল অব গেঞ্জি এজ ট্রানস্লেটেড বাই আর্থার ওয়ালে, পৃ ৫৭।

৬২. জাপান, দ্য বিউটিফুল অ্যা- মাইসেলফ, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, নোবেল লেকচার, ডিসেম্বর ১৯৬৮।

৬৩. ম্যাককলাফ (১৯৯৪) পৃ ৯। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply