মূর্ত-বিমূর্ত জীবনধারা

লেখক:

জাহিদ মুস্তাফা3

চার দশকের বেশি সময় ধরে আমাদের চারুশিল্পে সক্রিয় নম্র-নিভৃতচারী শিল্পী বীরেন সোম। বিংশ শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি তিনি চিত্রকলায় শিক্ষা নিতে এসেছিলেন ঢাকার তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। তখন মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী আনোয়ারুল হক। জামালপুর থেকে কৈশোর-উত্তীর্ণ বয়সে ঢাকায় এসে চারুকলায় ভর্তি হয়েছিলেন শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার আগ্রহ নিয়েই। প্রায় চার যুগ আগে শুরু হওয়া তাঁর শিল্প-অভিযাত্রা এখন অনেক ক্ষেত্রেই সফল।
নতুন বছরের পহেলা তারিখ থেকে অর্থাৎ ২০১৩ সালের একেবারে শুরু থেকে জানুয়ারির ১২ তারিখ পর্যন্ত ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শিল্পী বীরেন সোমের অষ্টম একক চিত্রপ্রদর্শনী। তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় একক অনুষ্ঠিত হয় চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে যথাক্রমে ১৯৭৯ ও ১৯৮৫ সালে। ২০১০ সালে ধানমণ্ডির সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনে তাঁর সপ্তম একক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন বছর ধরে নেওয়া প্রস্তুতির ফসল এবারের অষ্টম একক চিত্রপ্রদর্শনী।
বীরেন সোম দীর্ঘকাল কাজ করেছেন ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে। মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন জায়গায় ছিল তাঁর কর্মস্থল। পত্র-পত্রিকায় ইলাস্ট্রেশন করেছেন প্রচুর। শতাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। ১৯৯৮ সালে অধুনালুপ্ত গ্যালারি টোনে তাঁর গ্রাফিক শিল্পকর্মের একটি প্রদর্শনীও আয়োজিত হয়েছিল। সমাজ-প্রগতির সংগ্রাম ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের তথ্য দফতরে শিল্পী হিসেবে তিনি অংশ নিয়েছেন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তৎপর ছিলেন ছবি আঁকায়। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন কয়েক বছর – এখনো তিনি আঁকছেন। বরং বলা যায়, তাঁর আঁকার পরিমাণগত ও গুণগত মান এ-সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বীরেন সোম শুরু করেছিলেন প্রকৃতিকেন্দ্রিক জলরং দিয়ে। জলরঙের হাত ছিল তাঁর ভারী মিষ্টি। স্বচ্ছ ওয়াশে বিষয়কে তিনি ফুটিয়ে তুলতে পারঙ্গম ছিলেন। এখনো তাঁর জলরং কাজে আমরা সেই মিষ্টতা পাই। প্রচুর গ্রাফিক কাজ বিশেষ করে পত্রপত্রিকায় ইলাস্ট্রেশন করেছেন দীর্ঘকাল। অসংখ্য গ্রন্থের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদও এঁকেছেন তিনি।
সবকিছু ছাপিয়ে বীরেন সোম একজন সৃজনশীল চিত্রশিল্পী। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে শিল্পী জ্যামিতিক রীতিকে সঙ্গে নিয়ে ছবি এঁকেছেন। তাঁর সে-সময়কার উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম – উপজাতি দম্পতি, মৃত পাখি ও বালক, বাগানের প্রেমিক প্রভৃতি। জ্যামিতিক ফর্মে বিষয়বস্তুকে তুলে আনার এ-প্রবণতা সত্তরের মাঝামাঝি এসে পরিবর্তিত হয়। এ-সময়ে তিনি বিমূর্ত চিত্ররীতিতে ছবি আঁকা শুরু করেন। তাঁর এ-সময়কার উল্লেখযোগ্য সিরিজ চিত্রকর্ম হচ্ছে ‘হোমেজ টু ন্যাচার’। হালকা রঙে চিত্রতলকে রঞ্জিত করে বর্ণের সামান্য হেরফেরে প্রকৃতির বিশালতাকে তুলে ধরেছেন শিল্পী। আবার তিনি ইম্প্রেশনিস্ট অঙ্কনরীতি ধারণ করে অসংখ্য ছবিও এঁকেছেন। এর মানে হলো – শিল্পী বীরেন সোম ছবি এঁকেছেন নানা রীতিতে, নানা ধরনে। একদিকে তিনি কিবরিয়া-অনুসারী, অন্যদিকে তিনি শিল্পী কাজী আবদুল বাসেতের ড্রয়িংনির্ভর কাজেরও অনুরাগী। এমনকি কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্ররচনার নানা বৈশিষ্ট্যে বীরেনের অনুরাগের প্রতিফলন আমরা পেয়ে যাই তাঁর চিত্রকর্মে।
বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত বীরেন সোমের একক চিত্রপ্রদর্শনীতে মূলত বিমূর্তধারার চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে, যাতে আমাদের দেখার নিবিড়তা প্রতিফলিত হয়েছে। আমাদের চারপাশের প্রকৃতি ও জীবনকে নিয়েই তাঁর বিমূর্ততার পথে যাত্রা। বাংলাদেশের আকাশ ও নদী, মাটি ও বালুচর, পলাশ আর আকাশের বর্ণিলতার আভা এসবের অনেককিছুই পেয়ে যাই তাঁর চিত্রকর্মে। জীবনচেতনার বিমূর্ততার মধ্যেও বাস্তব জীবনের নানা অভিঘাত অনুভূতি যেন ওঠে আসে তাঁর ছবিতে।
আমাদের চারপাশের আটপৌরে জীবনে কতকিছু না জড়িয়ে আছে – সেসব নানাভাবে নানা মাত্রায় চলে আসে আমাদের শিল্পীদের চিত্রকর্মে। বীরেন সোমের কাজেও আমরা ওইসব উপকরণের প্রয়োগ দেখি। পুরনো স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে দীর্ঘদিনের বৃষ্টির রেখা, বৃষ্টি-ধোয়া মাটির রূপ, মেঘের বৈচিত্র্যময় বর্ণচ্ছটা শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন তাঁর চিত্রপটে। গাছের পাতার ফাঁকে আলোর রেখা যেন জীবনের নতুন এক আলো-ছায়ারই উদ্ভাসন। যেন জীবনকে তিনি দেখেছেন রঙে-রেখায় বিমূর্ততায়, আভাস থেকে নির্বস্তুকতার পথে।
‘স্বাধীনতা’ আমাদের শিল্পীদের অনেকেরই একটি প্রিয় বিষয়। বীরেন সোমের ক্ষেত্রেও এ-বিষয়টির প্রতি তাঁর আবেগ উপলব্ধি করি আমরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে কলকাতায় বাংলার শিল্পীদের যে চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজিত হয়, বীরেন সোম তাতে অংশগ্রহণকারীদের একজন। সেই স্মৃতি, বাংলার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তাঁর চোখে এখনো সমুজ্জ্বল। সেই চেতনার প্রতিফলন আমরা পাই শিল্পীর ‘স্বাধীনতা’ শীর্ষক চিত্রকর্মে। ১২২ গুণিতক ১৬৮ সেন্টিমিটার আয়তনের ক্যানভাসে শিল্পী লালবর্ণে রঞ্জিত করেছেন বাঙালির আত্মদানের রক্তাক্ত স্মৃতিকে। লাল বর্ণের মাঝে, আশপাশে কখনো কালো, কখনো হলুদ-সাদা বর্ণের আলিম্পন দিয়েছেন। সবমিলিয়ে তাঁর এ-কাজটি আমাদের দেশের মানুষের আত্মদানের একটি প্রতীকী উপস্থাপন হয়ে উঠেছে।
লাল বর্ণের প্রতি শিল্পীর বিশেষ ঝোঁক আছে। তাঁর বেশ কিছু চিত্রকর্মে আমরা এর স্বাক্ষর পাই। যেমন – ‘এমারজেন্স অব লাইট ইন সানসেট’ শীর্ষক চিত্রে আমরা অবলোকন করি সূর্যাস্তের লালচে আভার আকাশ আর আকাশে ভেসে-বেড়ানো মেঘের শুভ্রতা কিংবা বৃষ্টি হয়ে ঝরার আগের কালচে মেঘমালা। লাল এমনিতে উষ্ণবর্ণ; কিন্তু একে বীরেন সোম সহনীয় করে তুলেছেন দর্শকের চোখে।
আবার আমাদের প্রকৃতির সবুজ-শ্যামল রূপটিকেও সার্থকভাবে তুলে ধরেন শিল্পী। ‘রিফ্লেকশন অব গ্রিন ইন ন্যাচার’ চিত্রে আমাদের সবুজ প্রকৃতিকে পেয়ে যাই অন্যরকমভাবে – যেন দ্রুতগামী যানবাহনে চড়ে সবুজ উপত্যকা বনবাদাড় পেরিয়ে যাওয়ার সময় চোখের সামনে দিয়ে সা-সা করে ছুটে চলা সবুজের সমারোহ অনুভব করা যায়। ‘রিফ্লেকশন অব প্যাস্টোরাল লাইফ’ নামের আরেকটি চিত্রকর্মে সবুজাভ বর্ণবিভার একটি জলাশয় যেন আমাদের চোখে আবিষ্কৃত হয়। এই শান্ত-নমিত রূপটি বেশ দক্ষতার সঙ্গে শিল্পী তুলে ধরেছেন। প্রকৃতি ঘরানার আরেকটি চিত্র ‘শেড অব ন্যাচারে’ বৃক্ষের ছায়া যেন মানুষের অবয়বের সঙ্গে মিলে যায়।
কোলাগ্রাফ মাধ্যমে বেশ কয়েকটি চিত্রকর্ম অঙ্কন করেছেন শিল্পী। এর একটির শিরোনাম ‘ট্রিবিউট টু টেগোর-১’। ৫৮ গুণিতক ৪৪ সেন্টিমিটার আকৃতির এ-চিত্রে প্রাচীন নকশাকৃত এক জানালায় রবীন্দ্রনাথের হলুদাভ অবয়ব। পুরনো হয়েও কবি সমকালে যে প্রাসঙ্গিক, নানাভাবে সে-অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে এ-কাজে।
সব মিলিয়ে এবারের এ-প্রদর্শনীতে আমরা অপেক্ষাকৃত শক্তিমান এক বীরেন সোমকে পাই। তাঁর শিল্পীজীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস হয়ে উঠেছে এ-প্রদর্শনী।

শেয়ার করুন

Leave a Reply