মো ইয়ানের নোবেল পুরস্কারলাভ : শতবর্ষের স্বপ্নপূরণ

লেখক:

ভূমিকা ও অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

চীনা সরকার নোবেল পুরস্কারকে কখনো ভালো চোখে দেখেনি। একটি সাধারণ ধারণা সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দোসরদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে এই পুরস্কারটি দেওয়া হয়। গাও জিনজিয়ান জন্মসূত্রে চীনা হলেও ফরাসি নাগরিক। ২০০০ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিকে চীন স্বাগত জানায়নি, নিন্দাই করেছে। কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধবাদী লিও জিয়াওবোকে ২০১০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি চীনকে আরো ক্ষেপিয়ে তুলেছে।
এদিকে ‘জানালা খুলে যাবার পর’ চীনের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিক অঙ্গনে যে-চাঞ্চল্য আসে, তাতে, বিশেষ করে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অন্যতম আরাধ্যে পরিণত হয়। ‘বিভ্রম বাস্তবতা’র রূপকার আখ্যায়িত করে মো ইয়ানকে যখন এবারে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া হয় একেবারে উলটো। রাষ্ট্র মো ইয়ানকে শুধু স্বাগতই জানায়নি, উৎসবে মেতে উঠেছে সমগ্র চীন – শতবর্ষের স্বপ্নপূরণ হয়েছে। পরিবর্তন ঘটেছে সুইডিশ অ্যাকাডেমির পুরস্কার নীতিমালাতেও। নতুবা চীনের কমিউনিস্ট লেখক সংঘের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো ইয়ান হয়তো অ্যাকাডেমির বিবেচনাতেই আসতেন না।
মো ইয়ান (জন্ম ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫) শ্যানডং প্রদেশের গাওমি কাউন্টির কৃষক পরিবারের সন্তান। দারিদ্র্য ও ক্ষুধাকে অধিকাংশ গ্রামীণ চীনা নাগরিকের মতো তিনিও এড়াতে পারেননি। আট বছর বয়সে স্কুল ড্রপআউট, তারপর মাঠের রাখাল, তেলের কারখানার শ্রমিক, ২০ বছর বয়সে পিপলস লিবারেশনে আর্মির সৈনিক, তারপর সেনাস্কুলে শিক্ষকতা।
স্বশিক্ষিত এই মানুষটির আসল নাম গুয়ান মোয়ে। কিন্তু, তাঁর নিজের ভাষায়, শৈশবেই ‘খুব শিগগির আমি নিজের সঙ্গে কথা বলতে শিখলাম। আমার মধ্যে বর্ণনা দেওয়ার অসনাতন মেধার বিকাশ ঘটতে থাকল। আমি যে কেবল স্বাধীনভাবে কথা বলে যেতে থাকলাম তা-ই নয়, ছন্দোবদ্ধভাবেও। আমার মা একবার দূর থেকে শুনল আমি গাছের সঙ্গে কথা বলছি। আতঙ্কিত হয়ে আমার মা বাবাকে বলল, ‘তুমি কি মনে করো না যে ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’ মা চাইলেন তার কথা বলা বন্ধ হোক, মো নিজেও চাইলেন। সেখান থেকেই বেছে নিলেন নিজের নতুন নাম মো ইয়ান মানে’ ডোন্ট স্পিক – কথা বলো না।
কিন্তু তিনি কথা বলা বন্ধ করতে পারলেন না। সেই কথাগুলোই ধীরে ধীরে উপন্যাস হয়ে উঠল।
মো ইয়ান আলোচিত অনেককে ডিঙিয়ে নোবেল পুরস্কার পেলেন। ২০১২-র পুরস্কারের জন্য আরো যাঁরা আলোচিত হচ্ছিলেন, যাঁদের নিয়ে লন্ডনভিত্তিক সংস্থা ল্যাডব্রোকস বাজির আয়োজন করে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন : হারুকি মুরাকামি, অ্যাডোনিস, পিটার নাদাস, উইলিয়াম ট্রেভর, মিলান কুন্ডেরা, আসিয়া জেবার, জন ব্যানভিল, লেস মারে, মার্গারেট অটউড, ফিলিপ রথ, এলিস মুনরো, টম স্টপার্ড, নূরউদ্দীন ফারাহ, কো উন, অ্যামোজ ওজ, ওম্বার্তো একো, থমাস পিনসন, চিনুয়া আচেবে, দাসিয়া মারিয়ানি।
বাজিতে অংশগ্রহণকারীদের সমর্থনে হারুকি মুরাকামি শুরু থেকেই শীর্ষে ছিলেন। অ্যাডোনিসের সঙ্গে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন মো ইয়ান। কিন্তু পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার আগের দিন তাঁর অবস্থান প্রথম কুড়িজনের নিচে নেমে যায়।
মো ইয়ানের উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে : রেড সরগাম, দ্য গার্লিক ব্যালাড, দ্য রিপাবলিক অব ওয়াইন, লাইফ অ্যান্ড ডেথ আর উয়ারিং মি আউট, বিগ ব্রেস্টস অ্যান্ড ওয়াইড হিপস, হোয়াইট ডগ সুইং, স্যান্ডালউড ডেথ, ফ্রগস এবং প্রকাশিতব্য পিওডব্লিউ।
মোও ইয়ান বহুসংখ্যক স্মরণীয় গল্পের স্রষ্টা।
এই নিবন্ধটিতে মো ইয়ানের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিতে দেশে-বিদেশে চৈনিক প্রতিক্রিয়াসহ তাঁর দুটি রচনার অনূদিত অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হলো।

সাহিত্যে নোবেলের জন্য এক শতাব্দীর প্রতীক্ষা
মো ইয়ান, ইয়াও ইউয়ান এবং জিয়া জিয়াও তাদের স্বদেশি মো ইয়ানের নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে যা লিখেছেন তার সংক্ষিপ্তসার :
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের স্বপ্ন সত্যে পরিণত হতে চীনাদের এক শতাব্দীরও বেশি সময় লেগে গেল। মো ইয়ান হলেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারবিজয়ী প্রথম চীনা নাগরিক। লু সুন এবং লিন ইউতাংয়ের মতো আগের প্রজন্মের বড়মাপের লেখকদের কাছেও অধরা থেকে যায় নোবেল। স্বপ্নটা পূরণ হলো মো ইয়ানের মাধ্যমে। যেন বহুদিনের পাওনা ফেরত পেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশের মানুষ – সাহিত্য-সমালোচক, পাঠক, সকলেই – আপ্লুত। হাজার বছরের ইতিহাস, অনবদ্য ভাষা ও সংস্কৃতি এবং অসংখ্য মহান লেখককে নিয়ে চীনের যে-গর্ব নোবেল পুরস্কার তা উদ্যাপনের একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
মোর দীর্ঘদিনের লেখক-খ্যাতির পরও তিনি কিন্তু নিজ দেশে বহুলপঠিত একজন লেখক নন। তাঁর রচনা অশ্লীল, ভয়াল ও সহিংস বলে অনেকেই মনে করেন। সুইডিশ অ্যাকাডেমি তাঁর লেখায় আবিষ্কার করেছে চীনা লোক-ইতিহাস ও সমকালীন জীবনের সঙ্গে বিভ্রম বাস্তবতার এক মিশেল। অ্যাকাডেমি মোর সৃষ্ট জগতের সঙ্গে উইলিয়াম ফকনার ও গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের জগতের সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছে।
‘বিস্মিত ও আনন্দিত’ মোর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া – ‘একালে এতো ভালো লেখক রয়েছেন, আমি সম্ভবত তালিকার শেষে।’ ১৯৩৯ সালে জাপানের চীন আক্রমণ এবং চীন-জাপান যুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত উপন্যাস রেড সরগাম – লাল জোয়ার (ভুট্টাজাতীয় শস্য) – চীনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঝ্যাং ইমোর হাতে রুপালি পর্দায় প্রদর্শিত হওয়ার পর বার্লিন উৎসব থেকে গোল্ডেন বিয়ার জিতে নেয়। মোর খ্যাতি নিজ প্রদেশ শ্যানডংয়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তাঁকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগ্রহ বাড়তে থাকে। তিন দশকেরও বেশি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চায় তিনি যে-অবস্থানে পৌঁছেছেন তা স্বোপার্জিত। চীনা সরকার ও পার্টির বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা যা-ই বলুন তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি আধুনিক চীনা সাহিত্যের ব্যাপারে সাহিত্যবিশ্বকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলবে। চীন যখন অর্থনীতির দরজা খুলেছে, বিধিনিষেধ শিথিল করে সাহিত্য ও সংস্কৃতির দরজাও গ্রহণ ও প্রদানের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। স্বপ্ন তো পূরণ হলো, তারপর?

নোবেল পুরস্কারের জন্য অপর একজন খ্যাতিমান জাপানি প্রতিযোগী হারুকি মুরাকামি চীনে কম জনপ্রিয় নন। বিশ্বসাহিত্যের প্রবেশের পথে চীন এখন আর দরজা আগলে পাহারা দিচ্ছে না, কিন্তু নিজ দেশের শিল্প-সাহিত্যের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সংস্কৃতিটি বহাল রয়েছে। মো কমিউনিস্ট লেখক সংঘের ভাইস প্রেসিডেন্ট। পার্টি লাইনে হেঁটেও তাঁর উপন্যাস সরকার ও সরকারি নীতির সমালোচনা কম করেনি। তিনিও সেন্সরের শিকার হয়েছেন, তারপরও পার্টির সহনশীলতা বেড়েছে বলে মনে করা যায়। বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, পুরস্কারটি যতটা না মো ইয়ানের, তার চেয়ে বেশি চীনা ভাষা ও সাহিত্যের। চীনা সাহিত্যপাঠ অর্থহীন এবং হাস্যকর – একদা লালিত এ-ধারণা থেকে আন্তর্জাতিক পাঠক বেরিয়ে আসছেন। সবচেয়ে বড় লাভটি নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের দ্রুত পদক্ষেপে এগোনো – পশ্চিমের তুলনায় হেয় ও প্রান্তবর্তী বোধ করার যন্ত্রণা থেকে তাদের মুক্তি ঘটল।
কিন্তু সমস্যা রয়ে গেল অনুবাদের। চীনারা অন্য ভাষার বই নিজ ভাষায় দেদার অনুবাদ করে যাচ্ছেন, কিন্তু অন্য ভাষার লেখক চীনা ভাষা শিখে অনুবাদে তেমন এগিয়ে আসছেন না। কেউ কেউ মনে করেন, মোর মানের লেখক আরো আছেন, মেধাবী তরুণ লেখকরাও রয়েছেন, তাঁরা সঠিকভাবে দেশীয় সীমান্তের বাইরে উপস্থাপিত হচ্ছেন না। মো ভাগ্যবান – তিনি হাওয়ার্ড গডব্ল্যাট এবং আনা চেনের মতো অনুবাদক পেয়েছেন। প্রকাশকরা মনে করছেন, মোর সাফল্য চীনা সাহিত্যে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। মো বরং পশ্চিমের রুদ্ধ জানালা খুলতে সাহায্য করেছেন। এখন বিদেশি প্রকাশক এবং আন্তর্জাতিক পাঠক চীনের জানালায় উঁকি দেবেন। চীনের সাহিত্যকে এখন আর দূরের দুষ্প্রবেশ্য কোনো চীনা টাউনের সাহিত্য হিসেবে কেউ এড়িয়ে যাবেন না।
তারপরও অনুযোগ – মো ইয়ান তো জাতীয় নন, প্রাদেশিক। সমগ্র জাতি নিজের বলে দাবি করবে, এমন কোনো মাস্টারপিস সমকালীন চীনা সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেনি। চীনের কোনো লেভ তলস্তয় কিংবা আনাতোল ফ্রাঁস নেই।

মো ইয়ান সম্পর্কে বিরুদ্ধবাদী লেখকের বক্তব্য
মো ইয়ানের নোবেল পুরস্কারলাভ দেশত্যাগী চীনা সাহিত্যিক লিয়াও ইয়ু অনেকের মতো স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। জার্মান ওয়েব ম্যাগাজিন স্পিগেলের নেওয়া লিয়াও ইয়ুর সাক্ষাৎকার :
স্পিগেল : সাহিত্যে মো ইয়ানের নোবেল পুরস্কার লাভ আপনি কীভাবে নিচ্ছেন?
লিয়াও ইয়ু : আমি হতবাক হয়েছি। আমার কাছে এটা মুখে চড় খাওয়ার মতো। দুবছর আগে আমি ট্রেনে বার্লিন থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট যাওয়ার পথে শুনলাম আমার বন্ধু লেখক লিউ জিয়াওবো নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, তিনি তখন চীনের কারাগারে। আমি তখন আনন্দিত হয়েছিলাম। তাঁর এই পুরস্কারপ্রাপ্তি আমার কাছে মনে হয়েছে বৈশ্বিক মূল্যবোধের প্রত্যয়ন – নৈতিকতার একটি বিধান এখনো বহাল রয়েছে আর এই নৈতিক বিধির পক্ষে লেখকদের উৎসাহিত করতেই নোবেল পুরস্কার। গত বৃহস্পতিবারও (১১ অক্টোবর ২০১২) আমি আবার ট্রেনে বার্লিন থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টের পথে। আমি শুনলাম মো ইয়ান নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। মো তো রাজকবি – সরকারের লেখক। আমি পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছি। বৈশ্বিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব কি আর নেই? তাঁরা কি এমনই স্বৈরাচারী যে একবার পুরস্কার দেবেন কারাবাসী একজনকে যিনি মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করছেন আর পরের বছরই পুরস্কার দেবেন এমন একজনকে যিনি এই অধিকার হরণকারীদের সেবা করছেন?
স্পিগেল : আপনি কি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার আর সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কারের মধ্যে কোনো তফাৎ করতে চান না?
লিয়াও ইয়ু : আমার কাছে সত্যটা সবার আগে, তারপর সাহিত্য। চীনে আমরা একনায়কের শাসনে বাস করি – আমাদের লেখকদের এ-ব্যাপারে একটি ভূমিকা নেওয়ার কথা। মো ইয়ান কোনো ভূমিকা গ্রহণ করেছেন? শাসক কীভাবে সাহিত্যকে প্রভাবিত করতে পারে, তিনি তো তারই নজির। মাওয়ের প্রতি নৈবেদ্যস্বরূপ ক্যালিগ্রাফির গ্রন্থে তিনি স্বহস্তে লিখেছেন। আমার কাছে এটাই প্রমাণ করে যে, সত্য কখনো তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার নয়।
স্পিগেল : আপনি কি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন?
লিয়াও ইয়ু : হ্যাঁ, একসময়ে তিনি চেংডুতে বাস করতেন, সেখানে আমাদের দেখা হয়। তারপর আমাদের সাক্ষাৎ হওয়ার অনেক সুযোগ ছিল, কিন্তু সবসময়ে তিনি আমাকে এড়িয়ে চলতেন। তিনি জানতেন, তিনি চীনের একটি ভুয়া ও চাকচিক্যময় শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতেন, যেখানে আমার অবস্থান তৃণমূল সমাজের পক্ষে, সে-সমাজের অধঃপতিত মানুষ ও পঙ্কিলতার পক্ষে।
স্পিগেল : মো ইয়ান হয়তো তুলনামূলকভাবে সরকার মান্য করা ব্যক্তি, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম কিন্তু সরকারের সমালোচনাবর্জিত নয়।
লিয়াও ইয়ু : যখন ধাক্কা আসে তিনি শিল্পের জগতে ফিরে যান। এভাবে তিনি সত্যকে এড়িয়ে চলেন। আপনি যদি সত্য-সংলগ্ন থাকতে চান তাহলে চীনা সরকারের কাছ থেকে দূরে থাকবেন এবং গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিসহ যে-কোনো ধরনের সরকারি রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে থাকবেন। তিন বছর আগে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় চীন যখন বিশেষ অতিথি, মো ইয়ান ছিলেন সরকারি প্রতিনিধি দলের অংশ। তিনি হয়ে ওঠেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সংস্কৃতির প্রতীক। তিনি সরকারের সঙ্গে দূরত্ব রাখেননি।
স্পিগেল : তবু মো ইয়ানকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ায় চীনকে নতুন করে দেখার ডাক এসেছে। এর কি কোনো মূল্য নেই?
লিয়াও ইয়ু : না, নেই। যা ঘটেছে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। যা ঘটেছে তা পশ্চিমের ঘোলাটে নৈতিকতার দুর্ভাগ্যজনক একটি উদাহরণ। বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের সঙ্গে যে-আচরণ করা হয়েছে এবং এ-ধরনের পুরস্কারের মাধ্যমে তাদের যেভাবে অপমান করা হচ্ছে তাতে চীনা কর্মকর্তারা উৎসাহিত বোধ করছেন। চীনের ক্ষমতাসীনদের অধীনে সাধারণ মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। মো ইয়ানের পুরস্কার পাওয়ার খবর চীনে আমার বন্ধুদের কতটা ক্ষুব্ধ করেছে সে-সম্পর্কে আপনাদের কোনো ধারণাই নেই। একজন সংগীতশিল্পী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে চেয়েছেন। তাঁরা সবাই মুষড়ে পড়েছেন এবং জিজ্ঞেস করছেন – পশ্চিম কি চীনা পদ্ধতির একটি পরিবর্ধনমাত্র?
স্পিগেল : আপনি তো নিজেও এ-বছর জার্মান বুক ট্রেডে শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। এটা নিশ্চয়ই চীন সরকারের কাছে ভিন্ন বার্তা পাঠিয়েছে – তাঁরা বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের সঙ্গে যে-আচরণ করছে তার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
লিয়াউ ইয়ু : হ্যাঁ, পার্টির কর্মকর্তারা অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন, তাতেই প্রমাণিত হয় পুরস্কারটি কতটা কার্যকর। আমি পাঠক, নাগরিক সমাজ ও সত্যান্বেষী মানুষের ওপর আস্থা রাখছি। আমি এক বছর ধরে জার্মানিতে আছি। আমার এ-ধারণা জন্মেছে যে, এখানকার মানুষ সত্যান্বেষণ করছে। তারা অতীতের অবিচার অনুধাবন করবে, এখানে স্মরণ-কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, স্মরণ-প্রকল্প চালু হয়েছে। জার্মানি আমার আত্মিক নিবাস।
বিরুদ্ধবাদীরা আরো অনেক কথা বলেছেন। মো ইয়ান কমিউনিস্ট পার্টির ভাঁড়। চীনা শিল্পী আই উইউই বলেছেন, মোকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে সাহিত্য ও মানবতার অপমান করা হয়েছে।
কিংবা নোবেল পুরস্কারের যে প্রমিত মান মো ইয়ান তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেননি। মো ইয়ানের চেয়ে বড় মাপের লেখকরা সুইডিশ অ্যাকাডেমির দৃষ্টিতে পড়েননি। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, পার্টির জুতোতে পা গলালেও মো স্বাধীন লেখকসত্তা নিয়েই টিকে আছেন।

শেকড়ের সন্ধানে
শ্যানডং প্রদেশের ছোট্ট কৃষিভিত্তিক শহর গাওমি। কোন মাটিতে মো ইয়ানের সৃষ্টি তা-ই যাচাই করলেন আর এক চীনা লেখক ঝিয়াং জিউয়ান। মো ইয়ানের প্রায় সব উপন্যাসের ঘটনা ঘটেছে গাওমিতে কিংবা গাওমির প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে তাঁর উপন্যাসগুলো। মো বললেন, ‘আমার নিজের শহর আর আমার সাহিত্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। গাওমির আছে নিজস্ব লোকশিল্প, কাগজ-কাটা সজ্জা, চন্দ্রবর্ষ-উদযাপন, চিত্রকলা এবং মাওকিয়াংয়ে অপেরা। আমি এই ঐশ্বর্যমন্ডিত লোকসাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছি। যখনই আমি লেখার জন্য কলম হাতে নিই অবধারিতভাবে সেই সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে আমার উপন্যাসে। এটা আমাকে কেবল প্রভাবিত করেনি, আমার কাজের শৈল্পিক শৈলীও নির্ধারণ করেছে।’ তাঁর শৈশবের গাওমি অনেক বদলে গেছে। বিশেষ করে ছোট্ট শহরের মাঝখানে লাল জোয়ারের (ভুট্টার মতো শস্য) জমিনের আর দেখা মেলে না। সেখানে দাঁড়িয়েছে ইট-পাথরের দালান। জোয়ারের অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিলুপ্ত। লাল জোয়ার এখন আর মানুষের খাবার নয়, পশুর খাবারও নয়।
মো ইয়ানের বাড়িতে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসেনি।

রসুনের গাথা
গাও ইয়াংয়ের জিহবায় মধুর ছোঁয়া; ঠান্ডা ও মিষ্টি স্বাদ তার স্বাদ-গ্রন্থিকে তৃপ্তি দেয়। তাকে দেয় আয়েশ। সে তার তিন একর রসুনের জমি দেখতে থাকে। ভালো ফসল হয়েছে, সাদা গোলগাল রসুন গাছের চূড়া, কোনোটা বেঁকে উঠে এসেছে, কোনোটা তক্তার মতো সিধে। রসুনগুলো সিক্ত ও রসালো, নিচ থেকে মাটি ফুঁড়ে উঁকি দিচ্ছে।
পাশেই তার গর্ভবতী বউ হাঁটু ও হাতের ওপর ভর দিয়ে রসুনের জমিতে কাজ করছে, মাটির নিচ থেকে টেনে টেনে রসুন তুলছে। তার চেহারাটা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একটু বেশি কালচে মনে হচ্ছে, চোখের চারপাশের সূক্ষ্ম দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠছে – লোহার ওপর ছড়ানো মরিচার রেখার মতো। হাঁটু গেড়ে যেভাবে বসেছে, হাঁটু কাদায় লেপ্টে আছে, ছোটবেলার বিকলাঙ্গদশা নিত্যসঙ্গী, সে যা-ই করতে যায় খাটো হয়ে আসা বাম হাতটি অসুবিধে সৃষ্টি করে, কাজ যেমন হওয়ার কথা তার চেয়ে কঠিন করে তোলে।
গাও ইয়াং দেখল তার বউ নিচু হয়ে বাঁশের দুটো কঞ্চি দিয়ে রসুনের আটি খুঁড়ছে, যতবার কঞ্চি ব্যবহার করছে, ততবার ঠোঁট কামড়ে ধরছে। বউটার জন্য তার কষ্ট হলো। কিন্তু বউটার সাহায্য যে তার চাই। সে শুনেছে, সমবায়ের লোকেরা কাউন্টির শহরে দোকান পেতে বসছে, রসুন কিনবে। এক পাউন্ড ওজনের রসুনের জন্য দেবে ৫০ ফেনের কিছু বেশি। দাম ভালোই, গতবারের চেয়ে বেশি। গতবার তো ছিল ৪৫ ফেন। সে জেনেছে, কাউন্টি এবার রসুন চাষের জমির পরিমাণ বাড়িয়েছে। এদিকে বাম্পার ফলন, যে আগে ফসল তুলতে পারবে, বেচার বেলায়ও সে এগিয়ে থাকবে। সে কারণেই গ্রামের সবাই – নারী শিশু সকলেই – রসুনের জমিতে। বিপর্যস্ত গর্ভবতী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘একটু বিশ্রাম নিচ্ছ না কেন?’ ঘর্মাক্ত মুখ উঠিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী জন্য? আমি এখনো ক্লান্ত হইনি। আমার দুশ্চিন্তা একটাই – বাচ্চাটা না আবার বেরিয়ে আসে।’
উৎকণ্ঠা নিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, ‘বেরোতে শুরু করেছে?’
‘এখন কেন, আগামী কয়েক দিনের জন্য অন্তত ফসলটা তোলা পর্যন্ত যদি দেরি করত ভালো হতো।’
‘বাচ্চা বরাবরই ঠিক সময়মতো বের হয় নাকি?’
‘সবসময়ে তা হয় না। জিংহুয়ার বেলায় তো ১০ দিন দেরি হলো।’
দুজনেই পেছন দিকে ফিরে তাকালো, সেখানে তাদের মেয়েটি মাঠের প্রান্তে সুবোধ বালিকার মতো বসে আছে। তার দৃষ্টিহীন চোখ বড় করে খোলা। তার এক হাতে রসুনের বৃত্ত। এটা দিয়ে অন্য হাতের বৃত্তকে আঘাত করছে।
বাবা জিংহুয়াকে বলল, ‘রসুনের ব্যাপারে সাবধান। একটার দাম কয়েক ফেন।’
[মো ইয়ানের উপন্যাস দ্য গার্লিক ব্যালাডস (২০০৬) থেকে অনূদিত।]

যে কাউন্টিতে এই উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের বসবাস মো ইয়ান তার নাম রেখেছেন ‘প্যারাডাইস কাউন্টি’। প্যারাডাইস অলস ও স্বৈরাচারী শাসকদের কবলে, কৃষকরাও কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সহিংসতা সেখানে নিত্যকার ঘটনা। ‘রসুনের গাথা’ চীনা রাষ্ট্রব্যবস্থায় দরিদ্র কৃষকের দুর্ভাগ্য নিয়ে রচিত। একদল চীনা কৃষকের জীবন রসুন বিক্রির অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফলিত ফসলের পরিমাণ যখন সরকারের অনুমিত হিসাব ছাড়িয়ে যায়, রসুন-ক্রেতা সরকারি কর্মচারীরা রসুনবিক্রির সীমা বেধে দেয়। শুরু হয় বিক্রয়কেন্দ্রে আগে পৌঁছার প্রতিযোগিতা, সহিংসতা এবং কর্মচারীদের দুর্নীতি। সরকার প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে।
উদ্ধৃত অংশের রসুনচাষি গাও ইয়াং, এমনিতে অন্ধ মেয়ে নিয়ে সংকটে, স্ত্রী গর্ভবতী, তাকে পিটিয়ে আহত করে জেলে ঢোকানো হয়। বিপ্লবোত্তরকালে ১৯৮০-র মাঝামাঝি সময়ে একটি ভীতিকর সামাজিক বাস্তবতা গাও ইয়াং আরো কয়েকটি পরিবারের ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে মো ইয়ানের হাতে নির্মিত হয়েছে। এই উপন্যাসটিকে কেউ কেউ ফকনারের দ্য সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরির সমকক্ষ কিংবা তার চেয়ে ভালো মনে করছেন। কেউ কেউ মো ইয়ানের মধ্যে গার্সিয়া মার্কেজের প্রতিবিম্বও দেখছেন।
মো ইয়ান সরকারি অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নন, এ-অভিযোগ ‘রসুনের গাথা’র মতো উপন্যাস কেবল অস্বীকারই করে না, লেখক ও শিল্পীর কাজ যে মহাসড়কে নেমে প্রতিবাদের চিৎকার দেওয়া নয়, কাজের মাধ্যমে প্রতিভাত করা, সে-যুক্তিকেই এগিয়ে নিয়ে যায়।
পিংপং
১৯৭৩ সালের শরতে একটি কাপড়ের কলে আমি অস্থায়ী চাকরি পেলাম; আমার চাচা সেখানে হিসাবরক্ষক। অস্থায়ী চাকরি হতে পারে, মাসের শেষে প্রোডাকশন টিমকে ২৪ ইউয়ান দিয়ে ১৫ ইউয়ান নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। বাড়িতে ৭৫ সেন্ট দরে শূকরের মাংস আর ছয় সেন্ট করে একেকটা ডিম বেচতাম। ১৫ ইউয়ানে অনেক কিছুই করা যেত। আমি চটপটে পোশাকে নিজেকে সাজাতে থাকলাম, মাথার চুল বড় করলাম, কয়েক জোড়া দস্তানার মালিক হলাম। এতো সব সম্পদ আমার মাথা ঘুরিযে দিলো। কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর একদিন দেখি হি ঝিইউন আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। তার পুরনো জুতো আঙুলের দিকে ছিঁড়ে গেছে, কাঁধের ওপর ভাঁজ করা পুরনো কম্বল। তার চুলে জট লেগেছে, বহুদিন দাড়ি কাটেনি। কপালে তিনটি গভীর ভাঁজ।
হি ঝিইউন বলল, ‘আমাকে ১০ ইউয়ান ধার দাও। আমি উত্তরে চলে যাচ্ছি।’
‘তোমার পরিবারের কী হবে? তুমি চলে গেলে পরিবারের কী হবে?’
সে বলল, ‘কমিউনিস্ট পার্টি তাদের না খেয়ে মরতে দেবে না।’
‘কিন্তু তুমি সেখানে কী করবে?’
‘জানি না। কিন্তু মরার আগ পর্যন্ত এখানে ঝুলে থাকার চেয়ে এটা ভালো নয় কি? তুমি কী মনে কর? আমার দিকে তাকাও। বয়স আমার প্রায় ৩০ বছর হয়ে এলো, এখনো আমার একটা বউ জোটেনি। আমাকে এখান থেকে বের হতেই হবে। আমি জানি মানুষ বের হলে বৃক্ষ মারা পড়ে, কিন্তু তা মানুষকে তো বাঁচিয়ে রাখে।’
সত্যি বলতে কি তাকে ১০ ইউয়ান ধার দিতে রাজি হইনি। সেকালে ১০ ইউয়ান অনেক টাকা।
হি ঝিইউন বলল, ‘এটা কেমন কথা। আমি যদি একেবারে চিরদিনের জন্য চলে যাই তাহলে টাকাটা ফেরত পাবে না, এ-কথা ঠিক। কিন্তু যদি না যাই দরকার হলে আমার রক্ত বেচে পাইপাই করে তোমার টাকা শোধ করব।’
আমি তার যুক্তির আগামাথা কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত তাকে টাকাটা ধার দেওয়ার আগে অনেকক্ষণ আমতা আমতা করলাম।
স্কুলের আঙিনার দেয়ালে ঠেস দিয়ে যে-বিকেলে আমি বড়মুখো লিউ এবং লু ওয়েনলির মধ্যকার পিংপং খেলা দেখছিলাম সে-দৃশ্যটা মনে করছি। লিউ মাঝারি গোছের খেলোয়াড়, কিন্তু খেলাই তার ধ্যানজ্ঞান, তার পছন্দ টিমের মেয়েদের বিরুদ্ধে খেলা। মেয়েদের কেউই কম আকর্ষণীয় নয়, তবে লু ওয়েনলি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সুতরাং লু-ই তার সবচেয়ে প্রিয় প্রতিপক্ষ। যতবারই সে পিংপং বলে ব্যাট চালাত, ততবারই নিজের অজ্ঞাতে বড় করে হাঁ করত। মুখে হাঁ করে থাকাটাই বড় কথা নয়, তার গলার ভেতর থেকে এমন শব্দ বের হতো যেন বেশ কয়েকটি ব্যাঙ তার গলা থেকে ছুটে আসতে চাইছে। শব্দে ও দৃশ্যে তার খেলার শৈলী আমাদের বাকরুদ্ধ করে রাখত। তার ওপর লিউ আবার স্কুলের শিক্ষকও। লু ওয়েনলি এই শিক্ষকের সাথে খেলতে চাইত না। কিন্তু আমি জানি লিউ শিক্ষক হওয়াতে লুর এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খেলার সময়ে টেবিলের অপর প্রান্তে তার বিরক্তিকর মুখমন্ডল এবং এলেবেলে খেলার কারণ লিউ নিজেই আমাদের বলেছে, মেয়েটি প্রচন্ড ঘৃণা ও বিরক্তি নিয়ে খেলছে।
এতসব বকবকানির আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই নাটকীয় দৃশ্যটির কথা বলা। মুখ খোলা রেখে শিক্ষক লিউ একটি টপস্পিন বল মারতেই লু ওয়েনলি সাধারণভাবে ব্যাট ছুঁইয়ে বলটা ফিরিয়ে দিলো। কিন্তু বলটার যেন চোখ ছিল। চকচকে পিংপং বলটা সরাসরি তার মুখের ভেতর ঢুকে পড়ল।
আমরা কয়েকটি মুহূর্ত হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তারপর সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। মা নামের একজন শিক্ষকের মুখের রং এই দৃশ্য দেখে মোরগের ঝুঁটির মতো লাল হয়ে উঠল। লু ওয়েনলি বিষণ্ণ মুখে সজোরে ঢোক গিলতে শুরু করল। একমাত্র আমিই হেসে উঠিনি। কী ঘটল আমি কেবল বিস্মিত হয়ে দেখলাম এবং আমাদের দাদু ওয়াং গুইর মুখে গ্রামে শোনা একটি গল্পের কথা মনে পড়ল। জিয়াং জিয়া নামে এক আহম্মক বাজারে আটা বিক্রি করছিল, এমন সময় ঘূর্ণিঝড় এসে সব আটা উড়িয়ে নিল। তারপর সে কয়লা বেচতে শুরু করল। কিন্তু সেবারের শীতকালটা ছিল বেশ উষ্ণ। আকাশের অবস্থাটা কেমন বোঝার জন্য যখন সে হাঁ করে ওপরের দিকে তাকালো, উড়ন্ত পাখির বিষ্ঠা সরাসরি তার মুখের ভেতরই পড়ল। কুড়ি বছর পর ১৯৯৯ সালের শরতে আমার কর্মক্ষেত্র ‘প্রসিকিউটোরিয়াল ডেইলি’তে সাবওয়ে ধরে যাওয়ার পথে এক খবরের কাগজ বিক্রেতাকে চেঁচাতে শুনলাম : ‘খবরটা পড়ুন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত গোলন্দাজ বাহিনীর গোলা জার্মান গোলন্দাজ বাহিনীর ব্যারেলের ভেতর ঢুকে পড়েছিল।’
তখনই আমার মনে পড়ল লু ওয়েলির ফিরিয়ে দেওয়া পিংপং বলটা কেমন করে শিক্ষক লুইয়ের মুখে ঢুকে পড়েছে।
[মো ইয়ানের আত্মজৈবনিক উপন্যাস চেঞ্জ (২০১০) থেকে অনূদিত] 

সোশ্যাল মিডিয়া