যে আসার কথা ছিলো

লেখক:

আকিমুন রহমান

আমি নিশ্চিত, খুবই নিশ্চিত যে, আমি অবশেষে এসে যেতে পেরেছি সঠিক নগরটিতে। অবশেষে! অযুত-নিযুত বছর ধরে সন্ধান করেছি যার, যার সন্ধানে সন্ধানে বিরামহীন পরিব্রাজন – কতকাল থেকে কতকালে, কত লোকালয়ে লোকালয়ে, অন্তহীন ভিখিরি চোখে হেঁটে চলা! কতবার নৈরাশ্য এসে স্তব্ধ করে দিয়েছে আমাকে! অন্তর তখন আর বিশ্বাস রাখতে পারেনি আমার অনুসন্ধান শক্তিতে। আমি আর তখন বিশ্বাস রাখতে পারিনি আমার ওপর। আমি টলে গেছি, থুবড়ে পড়ে গেছি ধুলোয়। হাহাকার করে উঠেছে আমার অন্তর-বাহির – হায়! পাব না – পাওয়া হবে না তাকে! পাব না সেই ভূখন্ডের খোঁজ কোনোদিন! পরিত্রাণও পাব না তাই কোনোদিন! মুক্তি মিলবে না! রয়ে যেতে হবে এখানে, এই মনুষ্যলোকে, এই অন্য জাতের সুখ-দুঃখ ও বাসনা
ধারণকারীগণের ভূভাগে! রয়ে যেতে হবে একা, নিরুদ্ধার গত্যন্তরহীন। বৃদ্ধ একা। রয়ে যেতে হবে এখানে, মনুষ্যগণের বাসনা দুঃখ-তরঙ্গকল্লোলের এক নির্বিকার দর্শক হয়ে! আমি কে এখানে? কেউ না। কেউ না! এখানে, এই ভূলোকে, আমি কারো কিছু নই। আমি কারো বান্ধব নই, মিত্র নই, কুটুম নই, পিতা নই, মাতা নই, সহচর নই। আমি কারো সন্তান নই, পতি নই, প্রণয়ী নই, এমনকি একটুখানি সময়ের চেনা-পরিচিত একজনও নই আমি কারো! আমি একা। সদা পরিব্রাজনরত। অস্থির আমার বক্ষ, কিন্তু অটল-স্থির আমার ভঙ্গি। কেন স্থির তবে আমার ভঙ্গি? আমার বুভুক্ষু ও পিয়াস-কাতর অন্তর আমাকে শিখিয়েছে, ধীর থির গভীর যদি না থাকা যায়, তবে আমি নির্ভুল হতে ব্যর্থ হব। নির্ভুল হতে যত ব্যর্থ হব, তত দীর্ঘ হবে আমার নির্বাসনদন্ড ভোগের কাল। ক্রমে অসম্ভব হয়ে উঠবে আমার অন্বিষ্টের সন্ধান লাভ। আমি খুঁজে চলছিলাম তাকে, সেই নগরীকে, যে-নগরীর সঙ্গে আমার নিয়তি জড়িয়ে আছে, যে আমার নির্বন্ধ। তার খোঁজে খোঁজে উন্মত্ত বিকল চিত্ত আমার, অযুত-নিযুত বছর ধরে। আহ্! তাকে না পেলে যে আমার উদ্ধার নেই! উদ্ধার নেই।
কতবার এই মনুষ্যলোকের মৃত্তিকায় লুটিয়ে পড়ে নিজেকে লুপ্ত করে দেওয়ার কামনায় কাতরে উঠেছি আমি! কতবার নিজেকে ছিন্নভিন্ন করতে চেয়েছি আমি! কত সহস্রবার! কে কাকে চূর্ণবিচূর্ণ, ছিন্নভিন্ন করে! আমার যে লয়-ক্ষয় বিনাশগ্রস্ত হওয়ার শরীরকাঠামো নেই! আমি মনুষ্যগোত্রভুক্ত কি? না তো – নয় নয়! আমি অন্য, আমি আলোকগঠিত। আমার ক্ষয় কে আনে! আমার বিলুপ্তি আনার সাধ্য আমারও কি আছে! নিরাশার ভার আমার দেহ থুবড়ে ফেলে দিয়েছে ভূমিতে, হরণ করে নিয়েছে উদ্যম-বাসনা; আমি বিনাশকে প্রার্থনা করে করে হয়রান হয়ে গেছি। কোথায় বিনাশ! হায়! তিক্ত, খেদ-জরজর চিত্ত নিয়ে ভূশয়ানে পড়ে থেকেছি আমি, পড়ে থেকে থেকে আমি গড়ে উঠতে দেখেছি কত নতুন নগর ও রাষ্ট্র। শ্লথ বিবশ পরান কোনোমতে ঠেলেঠুলে তখন আবার উঠে দাঁড়িয়েছি আমি। বাসনাশূন্য, বাঞ্ছাহীন পদযুগলকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে গেছি সেসব নগরীর দরজায় দরজায়। কত নিযুত রজনী ও দিবস ধরে খরচোখে, তন্নতন্ন দেখে চলেছি সেসব নগরীর বিধিবন্দোবস্তকে, লোকগণের বাসনা ও বাসনামৃত্যুকে, ক্লেদ ও স্বেচ্ছাচারকে, বিক্রম ও ঔদ্ধত্যের নিভে যাওয়াকে। আর মেলাতে চেয়েছি কঠিন হিসাব কষে কষে – সেই সবকিছু আছে কি-না এখানে! সেসব কিছু আছে কি? আমাকে পরিত্যাগ করার আগে, আমার নির্বাসনদন্ড ঘোষণার কালে, আমার ঊর্ধ্বতনদ্বয় এক নগরীর যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলে গিয়েছিল, সেসব কিছু আছে কি এখানে? এই নগরে?
হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়েছে, আছে আছে! পুরো মিল আছে! মিলে যাচ্ছে এই তো সকল লক্ষণ! মিলে যাচ্ছে এই তো সকলই। তবে আর বিলম্ব করা কেন! সম্পন্ন করা যাক তবে আমার আরব্ধ কর্ম। পলকে আমি তখন নগরীর প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে আমার বাঁহাত প্রসারিত করেছি। লাফ দিয়ে আকাশ ছুঁয়েছে অগ্নি, কোন পাতাল থেকে উঠে এসে অগ্নি আচমকা দগ্ধ করা ধরেছে নগরীটিকে। তারপর বিস্তার করেছি ডান বাহু। মড়ক নেমেছে নগরীজুড়ে, চক্ষের পলকে। বহু রকম মড়ক। বিলাপ, গোঙানি, আর্তচিৎকার, ফোঁপানি নিয়ে থকথকানো ধরেছে দগ্ধ নগর। আমার একপাশে অগ্নির নির্দয় ঝাপটা, একপাশে মড়কের তীব্র দংশন। নগর মৃত্যুময়, পোড়া আংড়া, বিরান হয়েছে – পলক না ফুরাতে। আর কী বিপত্তি দেখো! সেই ধ্বংসের ভেতরে থির দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে, হঠাৎই তখন আমার মনে হওয়া ধরেছে যে, না না না না – এটা সেই নগর নয়। এ অন্য কেউ, পূর্বকথিত সেই ভূভাগ এ নয়! নয়। ভুল হলো, ভুল! ওফ্! এ যে ভুল নগরীতে অকারণ প্রলয় আনা! এটা সে নয়, সে-নগর নয় – যাকে ধ্বংস করাই আমার নিয়তি! তখন, যে-আমি অন্তঃকরণশূন্য – যে-আমি শুধুই তেজ ও আলোকগঠিত, যে-আমি সৃজিত শুধু আজ্ঞাবহ হওয়ার জন্য – সেই আমি দেখো, গ্লানি আর অপরাধবোধে উন্মত্ত ছুটেছি, ত্রাস আর ঘৃণা আমাকে ফালাফালা করেছে। কতবার নিজেকে সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি অতল খাদে, ফেলে দিয়েছি ভয়াল জলরাশিতে! যে-নগর জীবিত ও প্রাণময় থাকার অধিকার রাখে, তাকে আমি হত্যা করেছি! আমার ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল হিসাব তাকে হত্যা করেছে! আমি, আমি তবে বেঁচে থাকি কেমন করে! কেন বেঁচে থাকতে যাই তবে আমি! আমি নিজেকে হনন করতে ছুটেছি। মৃত্যুবরণ করার যত উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, নিয়ে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি। মৃত্যু আসেনি।
সেই কবে – যখন পরিত্যক্ত হয়েছি, নিজেকে দেখেছি দন্ডগ্রস্ত, নিজলোকে ফিরে যাওয়ার অধিকারহীন, বেদনা ও ঘৃণায় মৃত্যুর দিকে যাত্রা করা ধরেছি সেই তখন থেকে। ডাকা ধরেছি তাকে কত নামে – ওহে করাল তিমির, ওহে ত্রাণ, ওহে উদ্ধার, ওহে নির্বিকার – আমাকে মুক্তি দাও। পরিত্রাণ হয়ে আসো তুমি, ওহে! মৃত্যু যোজন যোজন দূর থেকে আমাকে উপহাস করে গেছে শুধু, নিকট হয়নি কদাপি! কী নির্বন্ধ! কী নিদারুণ নির্বন্ধ! আমি মৃত্যুহীন! আমি যে আলোয় গড়া, আমি যে শুধু তেজরাশির স্তূপ! আমার মুক্তি হয়ে মরণ আসতে পারে না কখনো আমার কাছে। আমি ঊর্ধ্বচারী দেবদূত।
আমি তা-ই বটে, তবে ঊর্ধ্বলোকে দেবদূতের জীবন আমার যাপন করা হয়নি কোনোদিন। একদন্ডের জন্যও নয়। আমার দেহ গঠিত হওয়ার প্রায় পরমুহূর্ত থেকে এইখানে আমি, এই ভূলোকে। নিযুত-সহস্র বছর ধরে। অদৃষ্টের ক্রিয়া কী নিদারুণ! কী পরিহাস! আমি ঊর্ধ্বলোকের, কিন্তু আমি ঊর্ধ্বলোকের কেউ নই। আমি কত সহস্র বছর ধরে এই ভূলোকচারী, অথচ আমি এই ভূলোকেরও কেউ কি? ভূলোকেরও কেউ নই আমি।
আকাশমন্ডলীর পঞ্চম মন্ডলে ত্রিসহস্র বছর ধরে পুঞ্জীভূত হওয়া আলো, মেঘ, তড়িৎশক্তি, বর্ণময় ও বর্ণহীন তপ্ত বাষ্পরাশি, দুরন্ত গতিশীল পদার্থ কণা তখন পরস্পর একীভূত হওয়ার বিপুল আয়োজনে ব্যাপৃত ছিল। ঘর্ষণ, বিলোড়ন, মিশ্রণপ্রক্রিয়া ক্রমে গড়ে তুলছিল পুঞ্জ পুঞ্জ দীপ্তি; ওই দীপ্তিদেরই এক গোত্র দেহ নেয় নক্ষত্রের, এক গোত্র নেয় দেবদূত দেহকাঠামো। তেমন একগুচ্ছ বিভাবতী নববাষ্প এলোমেলো ভেঙে গলে মিশে গিয়ে গড়ে তুলছিল তিলে তিলে, একটি দেহ। আমার দেহ।
তখন শুধু আমার দেহখানাই গঠন পেয়ে বিরাজ করছিল জ্যোতিধারী বাষ্পসমূহে। সেই দেহ ছিল সুগঠিত, কিন্তু তা চেতনাহীন। দেহে দেহে চেতনা যে ধরায়, সেই দেবদূত সেইক্ষণে অন্যত্র অন্যকর্ম সম্পন্ন করার তাড়ায় ছিল, সেই কারণে চেতনদশাপ্রাপ্তিতে আমার বিলম্ব ঘটছিল। আমার দেহ তার আসার প্রতীক্ষায় ছিল; ছিল তুমুল ধীর ও নিঃসাড়। ছিল পূর্ণগঠিত, কিন্তু অচেতন; আর বাষ্পমন্ডলে ভাসমান। তেমন ক্ষণে, দৈবের কী লীলা কে জানে! সেই সময় কি-না বাষ্পলোকে নিথর ভেসে থাকা আমার পাশ দিয়েই দ্রুত ছুটে যাওয়ার দায় পড়ে দুই দেবদূতের! তারা তো নাকি ব্যাপৃত ছিল গুরুতর বিষয়াদির আলোচনায়, কোনোদিকে নজর রাখার অবকাশশূন্য, তা-ও তাদের চোখে পড়তেই হবে আমাকে! দুই দেবদূতের চোখে পড়ে আমার অজাগ্রত দেহ। তারা তখনই মীমাংসিত হয়ে ওঠে যে, আমাকে তাদের সঙ্গে পাওয়া চাই।
তারা তাড়ায় ছিল। যে লোকের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল তারা, সেই লোকে আরাধ্য কর্ম সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য তাদের আরেকজন সঙ্গীর প্রয়োজন ছিল। ঊর্ধ্বলোকে দেবদূতেরা বহুজন আছে, বহুজনের বহু রকম দায়দায়িত্ব পালনও আছে, আর সকলেরই আছে পূর্বনির্ধারিত গুরুতর কর্মসকল। এদিকে হঠাৎই অন্যলোকে যাত্রা শুরু করা দরকার হয়ে পড়ে দেবদূত দুজনের। বিলম্ব করার পরিস্থিতি নেই, নিতান্তই দরকার আরেক দেবদূত পাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে না তাদের! কেননা, অন্য সকল দেবদূতই পূর্বনির্ধারিত কর্মে ব্যাপৃত; সে-কারণে তারা দুজন অন্য কাউকেই সঙ্গে নিতে সমর্থ হয় না। যথাসময়ে কর্মসম্পাদনের প্রবল তাড়ায় থাকা তারা দুজন; অনুচর জোটানোর জন্য কালক্ষেপণের কিছুমাত্র অনুকূল নয় তাদের পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল রকম বিপাকে ঘেরাও হয়ে যায় বটে তারা, কিন্তু যাত্রা শুরু করে দুজনই। তারা অগ্রসর হতে থাকে, তবে চিত্ত তাদের থাকে বিচলনগ্রস্ত। এ কেমন পরিস্থিতি যে, নিদারুণ প্রয়োজনের কালে অনুচরজন মিলবে না! এ তো ঘোর অরাজকতা! অমন ক্ষুব্ধ, অধৈর্য চিত্তদশার কালে একের পর এক ঊর্ধ্বলোকমন্ডল পেরিয়ে চলে তারা। পেরোতে পেরোতে আসে পঞ্চম মন্ডলে। আর, পঞ্চম মন্ডল পেরোতে গিয়ে তারা সন্ধান পায় আমার অচেতন শরীরের, যে-শরীর চেতনা লাভের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। দেবদূত দুজন – শক্তি, সামর্থ্য ও পদমর্যাদায় ঊর্ধ্বতন শ্রেষ্ঠগণের মধ্যেও অগ্রগামী দুই শক্তিমান। আমাতে চেতনা সঞ্চার তাদের জন্য অতি তুচ্ছ এক কর্মমাত্র। তারা সে-কর্ম অতি অবহেলার সঙ্গেই সম্পন্ন করে নেয় – নিমেষের মধ্যে।
আমি চেতনাপ্রাপ্ত হই। সদ্য চেতনা পাওয়া আমার চোখ তখন মাত্র দেখা ধরেছে বর্ণ ও গতির তীব্র সুষমাকে; সেই আমার বিভোর-বিহবল দিশেহারা ক্ষণে কোথায় শ্রবণেন্দ্রিয় পাবে কোমল মেঘতরঙ্গ নাদ, আমাকে বাজিয়ে তুলবে রিনঝিন রিনঝিন – তা তো নয়, হুংকার দিয়ে ওঠে গনগনা ধাতব হুকুম। আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ে ধাক্কা দেয় জোর হুকুম; ওহে! অনুসারী হও। এক্ষণ। আমি আমার বহু পূর্ববর্তী, অতি ক্ষমতাময়, ঊর্ধ্বতন দুজনকে অনুসরণ করা ধরি। আমি আমার নক্ষত্রলোকের তেজালো বর্ণবিভা দিয়ে বেষ্টিত থাকি বটে, কিন্তু আমার চোখ সেই সুন্দরের দিকে তাকাতে ভয় পেতে থাকে। ধারালো কঠিন নজর দিয়ে রাখে ঊর্ধ্বতন দুইজন, আমার চোখের দিকে, আমার পুরোটা শরীরের দিকে! সে-দৃষ্টি থেকে থেকে খালি হুকুম দিয়ে যায়, অনুসরণ করো! বেদিশা আমি অনুসরণ করে যেতে থাকি। অনুসরণ করে করে পার হই আকাশমন্ডল, পার হই বায়ুলোক, পেরোই মেঘ ও শূন্যতার বিপুল এলাকা; তীব্র সে-ছুট। বড় দ্রুত সেই পরিক্রমণ। আমি, সেই অবোধ সেই সদ্য জেগেওঠা জন, দিশেহারা ছুটি তাদের পিছু পিছু। কেন! আমার তা কিছুই জানা নেই।
তারপর হঠাৎ তারা ধীরগতি হয়। আমিও। ধীর অবতরণ শেষে আমার চোখে পড়ে, আমার সামনে এক অচিন ভূভাগ! খুব অচেনা! এই ভূলোক – এর প্রান্তর, এর আকাশ ভিন্ন বড়! একদম নবরূপা। আমার পেরিয়ে আসা বায়ুমন্ডল বা বাষ্পমন্ডল বা আলোকমন্ডল – কোনো মন্ডলের মতোই নয় এই ভূভাগ! এখানে বাসকারীগণ মৃত্তিকালগ্ন, গৃহবাসী। এই মৃত্তিকা আহার্যও দান করে। এখানে শস্য ফলে, লতাগুল্ম জন্মে, বৃক্ষ মাথা উঁচোয়। জল ঝরে এখানে মেঘ থেকে। জল বয়ে বয়ে যায়, দূর থেকে দূরে! আহ! তার নাম দেখো নদী! সেই জল কখনো কখনো লোকসকলের চক্ষে, তার নাম অশ্রু। এখানে ক্ষুধাহীন বহুজন, তারা সন্তুষ্ট। তারা পরিতোষে ধীর। কিন্তু বহু বহু লোক শ্রমক্লিষ্ট, অর্ধাহারী। নিরন্ন, দীনদরিদ্র বহুজন। আমার অন্তর বলে ওঠে, আহা্! ভূলোকে পদযাত্রা শুরু করার একেবারে গোড়ায় যখন পেরোচ্ছিলাম বিরান এক ভূভাগ, তখন ধু-ধু প্রান্তরের একখানে আমার চোখে পড়ে ছোট্ট এক ঝাড়। তার ক্ষুদে শ্বেত পুষ্পে সোনালি মৌমাছির কত যে ওড়াউড়ি! ওইটুকু সবুজ, ওই তার শুভ্র ক্ষুদ্র পুষ্পসকল – পুরো বিরান রুক্ষ প্রান্তরকে করে দিয়েছে জ্যান্ত। সুন্দর জ্যান্ত! এমন জীবন্ত সুন্দর আমি তো কোনোদিন দেখিনি! আমার চিত্ত পুলকে টলে উঠে বলে : আহ্! কী অপরূপ! আমি একটু এগিয়েই দেখতে পাই একটি পক্ষী। দুই ডানা বুজে বসে আছে ঝুম, প্রান্তরের ঘাসে। চোখ টলটল তার, থির চেয়ে আছে। কী দেখে সে! কী! আমি বুঝে উঠতেই পারি না! কিছু কি দেখে ভূলোকের এই পক্ষী? নাকি সে শুধু চেয়েই আছে, হাওয়াকে দেখাচ্ছে তার ঝলমল চোখের শোভা! আমার অন্তরাত্মা ফেড়ে উড়ে যেতে চায়! কী সুন্দর! তুমি কী সুন্দর রে পক্ষী!
সেই ধ্বনিগুচ্ছ আমার কণ্ঠে অস্ফুট বেজে ওঠামাত্র আমার ঊর্ধ্বতন দুজন চলা বন্ধ করে নিয়ে হিম, তীব্র, নিঃশব্দ চোখে তাকায় আমার দিকে! কুণ্ঠা ও অপরাধবোধে আমি নুয়ে যেতে থাকি কিছু না বুঝেই। কী আমার অপরাধ? কী দোষ পেল তারা! কী ভুল করেছি? আমার ভুল ভয়াবহ আর মারাত্মক। বিধি আছে যে, দেবদূতগণ কদাপি ভূলোকের দুঃখ-সুখ-শোক-উল্লাস-রূপ ও শোভায় দ্রবীভূত হবে না। হওয়ার বিধান নেই। নির্বিকার, অসম্পৃক্ত, অসম্পর্কিত থাকবে সে, দেবদূত, এইখানে। মোহ ও শোকের অতীত হয়ে সে নির্ধারিত কর্ম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করবে। তারপর প্রত্যাবর্তন করবে নিজ লোকে, বিকারশূন্য চিত্ত নিয়ে। এ-তাবৎকালে কখনো কোনো দেবদূত তো মানবিক বিষাদে ও ভূভাগের শোভায় উদ্বেলিত হয়নি কদাপি। আর দেবদূতগণের অন্তর্লোক অমন আবেগে কম্পমান হওয়ার ক্ষমতাসম্পন্নও তো নয়! কিন্তু সঙ্গে আনা এই নব অধস্তনজন হচ্ছে যে! ঊর্ধ্বতনদ্বয় ঈষৎ ভাবিত হয়। তারপর অজস্র রকম নিষেধবিধি নবজনকে জ্ঞাত করায়। আত্মস্থও করায়; এবং বারংবার সতর্কও করে দেয়, ভূশোভায় মোহিত হওয়া দেবদূত শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। হলে পরিণাম ভয়াবহ হবে। হবেই।
আমাকে সতর্ক করে দেয় তারা কঠিন হুশিয়ার বাণী দিয়ে দিয়ে। দেয় জোর গলায়, চড়া স্বরে। দেয় দেয়, কিছুক্ষণ থামে, তারপর তারা নিজেরা খুব নিচুস্বরে কী জানি বলে, বলেই যায়। কী! সে-কথা শুনে নিতে আর বুঝে নিতে আমার আর কতক্ষণ! তাদের নিচুস্বরে বলা কথা খুব মন পেতে শুনে শুনে আমি বুঝে নিই যে, আমার ঊর্ধ্বতনদ্বয় আমাকে নিয়ে ক্রুদ্ধ। তারা বুঝে গেছে, আমার অন্তর্লোকে দূষণ প্রবেশ করেছে। দেবদূতদের যা কখনো ঘটে না, আমার তা-ই ঘটেছে। মনুষ্যগণ যে সামান্য ভাবালুতা দিয়ে চালিত হয়, সেই তুচ্ছ ভাবালুতার সংক্রমণ ঘটেছে আমার চিত্তে। কীভাবে এমন দুষ্কর্মটি সম্পন্ন হওয়া সম্ভব হয়েছে! ঊর্ধ্বতনদ্বয় কারণ নির্ণয়ও করে উঠতে সমর্থ হয়েছে। আমার চেতনা তো আর ঊর্ধ্ব দেবলোকে জাগ্রত হয়নি। সেই চেতনাকে গড়তে গড়তে, জাগিয়ে তুলতে তুলতে আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বতনদ্বয় প্রবেশ করেছে এই সামান্য ভূলোকে। এই লোকের বাতাসে চিরদিন ধরে ভেসে যায় বিষ! ভেসে যায় মায়া, মমতা, কাম, রতিবাঞ্ছা, হিংস্রতা, নির্দয়তা, লোভ আর দয়া। খুব সম্ভব, প্রথম বিষটি – মায়া যার নাম – একঝলক আমার ভেতরে প্রবেশ করে থাকবে! তাই আমার মধ্যে অমন অদেবদূত রকম আকুলতা! ঊর্ধ্বতনদ্বয় ওই বিষ আমার অন্তর্লোক থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তীব্র গতিশালী অনেক মন্ত্রকে আমার ভেতরে পাঠায়। তারা আশা করে, ওতে ভালো কাজ হবে; কিন্তু কাজ হয় না। আমি কী করব তবে! তারা জানায়, তারা দুজন যে নিয়ম মান্য করে চলতে বলেছে আমাকে, আমি তা মান্য করে গেলেই হবে। তারা আমাকে মূক, ধীরমতি, অনুসরণকারী হয়ে থাকতে বলে। আমি তা হয়ে থাকার জন্য প্রাণপণে সতর্ক থাকি। আর, যেতে থাকি তাদের পিছু পিছু।
তপ্ত গ্রীষ্মদিনের অপরাহ্ণে আমরা যেখানে পৌঁছাই, সে এক মস্ত নগরীর প্রধান প্রবেশদ্বার। এই নগরীতে বসত করে এক ব্যক্তি। দয়াবান সে। আর, ন্যায়-অন্যায় ও হিতাহিত জ্ঞানপূর্ণও তার অন্তঃকরণ। সদা সেই সকলের অনুশীলনও করে সেই মানুষ। হিত, কল্যাণ ও মঙ্গলের পক্ষে তার অবস্থান গাঢ়। তার নাম প্রলুত। সাদোম নগরে বসত তার। এই সাদোম নগরীতে অন্য সকল পুরুষ মত্ত সম্ভোগে, পশ্বাচারে ও অযাচারে। পুরুষমাত্রকেই এখানে পুরুষ গণ্য করে সম্ভোগ ও রতিক্রিয়া সম্পন্নকরণের উপকরণরূপে। এই নগরীর ভূমি উর্বরা, তাতে শস্য ফলে সুপ্রচুর। এর দ্রাক্ষাকুঞ্জ দ্রাক্ষাভারে ন্যুব্জ। পশুপাল অগণিত। যব, দুগ্ধ, মধু ও দ্রাক্ষারস অঢেল এখানে; এই সাদোম নগরীকে প্লাবিত করে দেওয়ার মতো অঢেল। নারীগণ এই নগরীতে একদা সন্তানবতী হতো, এখন দুযুগ ধরে সাদোম শিশুশূন্য। কেননা সাদোমের পুরুষ আর নারীমুখী নয়। সাদোমের পুরুষ এখন পুরুষভোগে তীব্ররকম মত্ত। বহু অভুক্ত, কাম-উপোসী নারী স্বেচ্ছায় নিজেকে তুলে দিয়েছে মরুভূমির তস্করদের হাতে। নগর প্রাচীরের চারপাশে মরুভূমি। তার হু-হু ধু-ধু বালুকারাশিতে তপ্ত ধূলিঝড় তুলে ছুটে বেড়ায় অশ্বারোহী তস্করগণ। স্বেচ্ছাসমর্পিত নারীদের নিয়ে দূর বাজারে বাজারে বিক্রি করছে তারা, কিন্তু তাতেও তারা তৃপ্ত হয়নি। সাদোমের নারীরা নয়, সাদোমের ধনসম্পদ শুধু তাদের তৃপ্তি দেওয়ার শক্তি রাখে; কিন্তু নগরপ্রাচীর তার এত সুনির্মিত ও পোক্ত যে, তস্করেরা তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে না। যে কয়জন নারী এখনো সাদোমের নানা গৃহে বিরাজ করে, তারা হয় উন্মাদ রোগগ্রস্ত, নয় ঘোর রুগ্ণ। তারা দেহধারী, কিন্তু মৃত। বহু দিবস ও মাস নিবিড় পর্যবেক্ষণ শেষে; সতর্ক হওয়ার বহু ডাক পাঠানোর শেষে; আমার ঊর্ধ্বতনদ্বয়ের সশরীরে আসা, সাদোম নগরে। এবার সাদোমের দন্ড পাওয়ার পালা। আর পরিত্রাণের পথ নেই, আর রেহাই নেই। সাদোমের পাপ অতিশয় ভারী – ঊর্ধ্বতনদ্বয় তা জানে। দন্ড তারা ঊর্ধ্বলোক থেকেই প্রেরণ করতে পারত! তা-ও তারা নিজে এসে দেখে নিতে চায়, সাদোম যা করছে তা কতটা খারাপ। আদপেই কি বিবমিষা-উদ্রেককর তা! না, এখনো সহ্য করা যায় সাদোমকে! তাই এই আগমন। জানা আছে যে, এইখানে, এই সাদোমে, সকলেই পাপাসক্ত, একজন শুধু আছে যেন ন্যায় ও সততার আরাধনারত। সে-ই শুধু শুদ্ধ যৌনাচারের বিধিমাফিক জীবনযাপনরত, এখানে। সে প্রলুত। তাই তার সন্ধান করা সর্বাগ্রে।
প্রলুত তিন আগন্তুককে দেখে কী বোঝে আমি তা বুঝি না, তবে সে মাটিতে উবুড় হয়ে প্রণিপাত করা চালিয়ে যেতেই থাকে; আর তার আতিথ্য নেওয়ার জন্য মিনতি করে চলে। সে বলে, এই দাসের গৃহে পদার্পণ করে রাত্রিবাস করুন; তার আগে হাত-পা ধুয়ে কিছু আহার্য মুখে দিন। প্রভুগণ, বিনয় করি! আমায় আপনাদিগের পদধূলি ধুয়ে নিতে পারার অধিকার দিন। বিনয় করি হে! আমার ঊর্ধ্বতনদ্বয় ঠান্ডা গলায় সেই সব অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। আর জানায় যে, আমরা তিনজন ওই নগরের কোনো চাতালেই রাত কাটিয়ে নেব। আমাদের তাতে কোনোই বিঘ্ন ঘটবে না। এই সিদ্ধান্ত শুনে প্রলুত আতঙ্কিত হয়ে ওঠে, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে প্রভু! বিনয় করি, এই দাসের গৃহকে নিজ আবাস বলে গ্রহণ করুন! নতুবা ঘোর সর্বনাশ ঘনাবে! কী সেই সর্বনাশ। সেটি জানা যায় অচিরেই। প্রলুতের গৃহে একটু স্থির হয়ে বসার পরেই দেখা দেয় সাদোম, তার নিজ চেহারায়। রাত্রি প্রথম প্রহর অতীত তখন। ভোজন সমাপ্ত, শরীর শিথিল – তখন প্রলুতের সদর দরজায় হামলে পড়ে সাদোমের পুরুষেরা। নগরের জোয়ান, বৃদ্ধ – সকল পুরুষ বাড়ি ঘেরাও দিয়ে দেয়, আর ডাকচিৎকার শুরু করে। তারা জেনে গেছে, নগরে তিনজন নতুন পুরুষের আগমন ঘটেছে। প্রলুতের অতিথি তারা তিনজন। এই নতুন তিন শরীরকে ভোগ করা চাই-ই তাদের, এই রাতে, এই প্রহরেই। বহুদিন ধরে তারা আছে নগরের পুরনো পুরুষশরীর নিয়ে। আর কত! তাদের গর্জনে কেঁপে ওঠা ধরে রাত, আর লজ্জায় কাঁপতে থাকে সাদোম নগরী। কিন্তু সাদোমের পুরুষের কামগর্জন থামে না। তারা প্রলুতকে হুমকি দিতে থাকে, আজ রাতে যে তিনজন লোক এসেছে, তারা কোথায়? তাদের বের করে আমাদের কাছে নিয়ে আসো। আমাদের ভোগ করতে দাও। এক্ষণ দাও।
প্রলুত লজ্জায় অধোবদিত হয়, নিজ নগরবাসীকে শান্ত করার জন্য সদর দরজার বাইরে ছুটে যায়। তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টায় ছুটে ছুটে একেকজনের হাত-পা ধরে মিনতি জানাতে থাকে। কিন্তু কোনোজনই প্রলুতের কথায় কান দেয় না। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একজন প্রলুতকে ঝটকা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়, কয়েকজন প্রলুতকে পদাঘাত করতে থাকে, কয়েকজন এসে প্রলুতের ফটক ভাঙা শুরু করে। ফটক ভেঙে নিতে তাদের বেশি সময় লাগে না। তারপর পালে পালে পুরুষ ঢুকতে থাকে প্রলুতের আঙিনায়। লালা সপ্সপ্ করতে থাকা মুখ তাদের শীৎকারের গোঙানিতে ভরে ওঠে। আইস, আইস নবশরীর! আমাদের নবত্ব আস্বাদ করতে দাও! বলে ডাকাডাকি দিতে থাকে নগরের সর্দারগোছের দু-চারজন, বাকিরা সিটি দেওয়া ধরে তুমুল রকম। আমার ঊর্ধ্বতনদ্বয় তখন শান্ত শিথিল দেহ নিয়ে এগোয় সেই সকল লোকের মুখোমুখি দাঁড়াতে। প্রলুতের গৃহদ্বারে দাঁড়ায় তারা পাশাপাশি। তাদের দেখামাত্র কাম চিৎকারে সাদোমকে ছিন্নভিন্ন করতে থাকে, তার পুরুষেরা। দর্শনমাত্রই দু-চার পুরুষের রতিপাত ঘটে যায়। তারা অপরিতোষের যন্ত্রণায় চাপা চিৎকার দিতে থাকে, কঁকাতে থাকে। তাদের কঁকানিকে তাচ্ছিল্য দিয়ে ফেড়ে ফেলতে ফেলতে অন্য পুরুষগণ এগোনো ধরে। তুমুল উল্লাস ও ব্যগ্রতার গোঙানি ছড়াতে ছড়াতে সাদোমপুরুষ এগোনো ধরে দন্ডায়মান দুজনের দিকে। পেছনে, একটু ভেতরে আমি। প্রলুত বিষয়ে আমাকে যে-নির্দেশ দেওয়া আছে, আমি তা পালনের জন্য প্রস্ত্তত।
কিছুক্ষণ থির দাঁড়িয়ে থেকে, হঠাৎই, এগোতে থাকা কামক্ষুধার্তদের দিকে ধীর পদক্ষেপে হাঁটা ধরে আমার ঊর্ধ্বতন দেবদূত দুজন। কামার্তরা হুড়মুড় ঝাঁপ দেয়, তাদের দিকে। তারা ঊর্ধ্বতন দুজনকে জাপটে ধরতে যায়, ফসকে যায় হাত। হাতে বাতাস ছাড়া অন্য কিছুর স্পর্শ লাগে না। আবার তারা লাফিয়ে পড়ে আমার প্রভু দুজনের ওপর; দেখো, তাদের ভেদ করে কামার্তগণ হুমড়ি দিয়ে পড়ে যায় ভূমিতে। আমি ওই কামপরবশ বেপরোয়াদের এড়িয়ে দ্রুত ছুটি প্রলুতকে তুলে নিয়ে নগর ত্যাগ করার জন্য। কেননা, আমার ওপর এমনই নির্দেশ দেওয়া আছে। প্রলুত রক্তাক্ত, অচেতন। আমি ছুটি, ছুটতে থাকি। তারপর পৌঁছি নগরদ্বারের থেকে অনেক দূরে। পৌঁছি হু-হু শীতল বালুকারাশির অথই প্রান্তরে। সেখানে, সে-রাত্রির আকাশের নিচে, হিম বালুকারাশিতে প্রলুতকে শুইয়ে দিই। আর তো কিছু করার নেই আমার, প্রলুতের জন্য। আর কোনো হুকুম পাইনি তো! শুধু হুকুম আছে অপেক্ষা করার। নির্দেশ আছে, এখানে স্থির অপেক্ষা করার জন্য। ঊর্ধ্বতন সঙ্গী দুজনের এসে পৌঁছানোর অপেক্ষা। আমি অপেক্ষা করতে থাকি, থাকি। তারপর ধীরে, অপেক্ষা করতে করতে, আচমকা আমার মধ্যে ইচ্ছে হতে থাকে যে, যাই, সাদোমে ফিরে গিয়ে একটুখানি দেখে আসি তাদের, তাদের কর্মসর্ম জেনে আসি! কী করছে তারা! এসব জানতে ইচ্ছে হতে থাকে আমার, ক্ষণে ক্ষণে। তবে এমন ইচ্ছা জাগার পরক্ষণেই সতর্ক হয়ে যাই আমি – এমন ইচ্ছা জাগা আমার জন্য অন্যায়! আমি কি অমন অন্যায্য ইচ্ছা পোষণ করতে পারি! না না না তো! আমি দেবদূত। আমি তো দেবদূত! তখন, তখনই আমি দেখি, দূরের অন্ধকারে আগুন জ্বলে উঠছে। অন্ধকার ভূমি থেকে আগুন লাফিয়ে উঠে দাউদাউ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। আর, ওপরের ঘন অন্ধকার আকাশ থেকে নামা ধরছে বৃষ্টি – আগুনের বৃষ্টি। পুড়ছে সাদোম। তার সকল বৃক্ষ, অট্টালিকা, ধাতু, খাদ্যপরিপূর্ণ ভাঁড়ার, পশুপাল, তৃণগুচ্ছ ও পুষ্পসকল নিয়ে দাউদাউ পুড়ে শেষ হতে দেখতে থাকি আমি সাদোমকে। পুড়ে ভস্ম হয়ে যেতে দেখি তার পুরুষদের, অন্দরবাসী নারীদেরও। নারীরাও একইভাবে দগ্ধ হচ্ছে, পুরুষদের সঙ্গে। তারা কেন! তাদের কী অপরাধ? এ-কথা আমার মনে আসে যে-ই, আমি প্রলুতকে ভূশয়ানে রেখেই ছোটা ধরি উচ্ছিন্ন হতে থাকা সাদোমের দিকে। নারীদের উদ্ধার করে দেই তবে। ভুখা, উপোসী, বঞ্চিত সাদোম-নারীরা প্রাণে বেঁচে থাকুক অন্তত!
আমার আস্পর্ধায় হতবাক, স্তব্ধ হয়ে যায় আমার ঊর্ধ্বতন দেবদূত দুজন। হুকুম প্রতিপালনের বাইরে যাওয়ার স্পর্ধা কীভাবে পায় অধস্তনজন! নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে যায় মঙ্গল ও অমঙ্গল সাধনের! ভবিতব্য বদলে ফেলার জন্য পা বাড়ায়! মূঢ়! মূঢ়! তাদের চোখে আমার জন্য এসব ঘৃণা-তাচ্ছিল্য-উপহাস বেজে উঠতে শুনি, এবং দেখি। আমি নতশির, নতনেত্র হয়ে মার্জনা ভিক্ষা করা ধরি। সীমা লঙ্ঘন করার লজ্জায় পুড়তে থাকি নিঃশব্দে। তারা ক্রুব্ধ চোখে আমাকে ধিক্কার দিয়েই চলে। অপরাধবোধে জর্জরিত, নতজানু আমি ক্ষমা ভিক্ষা করে চলি বিধি মোতাবেক। হেঁটমাথা, মার্জনা ভিক্ষারত আমার মধ্যে সে-সময়েই কিনা অকস্মাৎ জেগে ওঠে আরো গর্হিত ভাবনাসকল! আমার মনে আসে প্রলুতের আঙিনার দাড়িম্ব ঝোপটির কথা। ফলে ও পুষ্পে কী পূত, পবিত্র, দীপ্তিময় দেখাচ্ছিল ওটিকে! জামির ওপর জন্মেছে সে, জন্মেছে সাদোমে; তাকেও তাই কি এই ভয়াল পরিণতি পেতে হলো! আয়ু আরেকটু পেতে কি পারত না সে! আমার অন্তর বেদনা-টলমল হয় দাড়িম্ব ঝোপটির জন্য,তার ফুল ও ফলদের জন্য। আহা!
অন্তর্লোকের চঞ্চলতা, অধীরতা, ভাবনা, কী আলোড়ন – পড়ে ওঠায় দেবদূতদের চেয়ে পারঙ্গম কে আর! নতজানু, ক্ষমাবাঞ্ছাকারী এই নব্য কাঠামো-পাওয়া আমাকে আমার ঊর্ধ্বতনদ্বয় ক্ষমা করার জন্য যখন মনস্থির করে নিয়েছে, তখন তারা দেখে আমার ভেতরে নড়ে যাচ্ছে শোক ও বেদনা। বিধান আছে, কৃতকর্ম নিয়ে শোকতাপ বা পিছুটান, দেবদূত কদাপি বোধ করবে না। আমি এইখানে নতশির, কিন্তু ভেতরে অনুতাপ। একেবারে তু্চ্ছ মনুষ্যসুলভ অনুতাপ আহাজারি, আমার ভেতরে – দেবদূত হয়েও নিজেদের কৃতকর্মের কারণে অনুতাপ বোধ করা! পামর! মূর্খ! বিধি লঙ্ঘনকারী অজ্ঞান! প্রাজ্ঞ ঊর্ধ্বতন দুজন দন্ডাদেশ ঘোষণা করে আমার জন্য। নির্বাসনদন্ড। আকাশমন্ডলে দেবদূতলোকে ফিরে যাওয়ার অধিকারবিহীন আমি। আমি বিধান অমান্যকারী, মায়ামমতা নামক তুচ্ছ দুর্বলতাগ্রস্ত। অজস্রবার সতর্ককরণ সত্ত্বেও নিজেকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হওয়া, অযোগ্য একজন। আমাকে থাকতে হবে এইখানে, ভূলোকে। অপর ও অন্যরকমদের দেশে অনামা একজন হয়ে। চিরকাল! হায় রে – আমার অন্তর মাথাকোটা শুরু করে আমার ভেতরে। আমি তো দেবদূতলোকও চিনে উঠিনি ভালো করে! সেইখানে ফিরে যাওয়ার জন্য অধীর আকুল হয়ে তো আছি! সেখানে, আমার গোত্রের সঙ্গে চেনাশোনার জন্য অপেক্ষা না করছি? এই প্রাজ্ঞ দুজনের পিছু পিছু চলতে চলতে ক্ষণ গুনছি না আকাশমন্ডলে, নিজ ভূখন্ডে প্রত্যাবর্তনের? আহ্! এ কী ভয়ংকর দন্ড তবে আমার জন্য আসে! পরিত্যক্ত, দন্ডিত একজন হয়ে এখানে কীভাবে থাকব! আমি তো এখানের কেউ না! প্রভুগণ, হে শক্তিমান পূর্বসূরি, অগ্রবর্তীগণ – আমার জন্য দয়া আসুক! বিভ্রান্ত, দুর্বলকে ক্ষমা দিন। দন্ডাদেশ থেকে পরিত্রাণ দিন প্রভু!
কিন্তু তারা আমার ক্রন্দন-আহাজারিতে কর্ণপাত করে না, ভ্রুক্ষেপও করে না আমার বিলাপে। অটল, নির্বিকার পায়ে যাত্রা শুরু করে আকাশমন্ডলের দিকে। তাদের পেছনে ছুটতে ছুটতে ছুটতে থাকি আমি, ক্ষমাভিক্ষা করতে থাকি। একা পরবাসে থাকার আশঙ্কা আমাকে উন্মত্তপ্রায় করে তোলে। আমি আঘাত করতে থাকি আমার বক্ষে, আমার মস্তকে, আমার মুখমন্ডলে, আর তাদের পিছু পিছু ছুটতে থাকি। ক্ষমাভিক্ষা দিন প্রভু – ক্ষমা!
প্রভুগণ নিরুত্তর থাকে।
তবে মুক্তির উপায় অন্তত বলে দিন – প্রভু! পরিত্রাণ কি কোনোদিন আসবে না? মুক্তি কি নেই?
হায় রে!

কঠোর কণ্ঠ বলে :
যদি খুঁজে পাও সেই এক নারকী নগর – পাপে ও অযাচারে যে সাদোমতুল্য শুধু নয়, সাদোমকে অতিক্রমকারী।
নির্দয়তা যেখানে সম্ভ্রম উদ্রেককর –
দুশ্চরিত্রতা যেখানে কুর্নিশ পায়
হত্যাকারী যেখানে দাপটের সঙ্গে বিরাজ করে
অপরাধ যেখানে নিত্য ক্ষমা পায় ও অপরাধ বলে গণ্য হয় না আর খাদ্য যেখানে বিষমাখা,
বাতাসে বিষ জমে আছে যেইখানে
জল যেখানে পূতিগন্ধময়।
একটি বৃক্ষ যেখানে মাথা তোলার মৃত্তিকা পায় না –
অন্তর্লোক যেখানে বিবেকশূন্য ও প্রস্তর অসাড় – অন্ধ-মমত্বহীন-পাপিষ্ঠ। যদি সে-নগরের সন্ধান পাও – যদি তাকে ধ্বংস করতে পারো – মুক্তি পাবে তুমি।
দেবদূতলোক তোমার জন্য সে-পর্যন্ত কাল অপেক্ষায় থাকবে। দন্ডমুক্ত হওয়া তোমারই হাতে।

তারপর, তারপর পরিত্রাণহীন দন্ডভোগের কাল শুরু হওয়া – শেষ নেই তার, শেষ নেই। ভূলোকে কত সভ্যতা গড়ে উঠল আমার চোখের সামনে। আধিপত্য বিস্তার করল, লয় হলো – তার সবকিছু এই গৃহহীন শরীর দেখে নিল কত অজস্রবার। বিরাম-বিশ্রাম পাওয়ার অধিকারহীন এই চোখ তা দেখল কতবার! আর থাকল সে ভাগ্যহীন পরিভ্রমণরত চিরকাল।
কতবার লুপ্ত করে দিলাম কত নগর, প্রলয় বইয়ে দিলাম কতভাবে, আর তারপর নিজেকে অভিশাপমুক্ত দেখার জন্য কী বিপুল ধুকপুকিয়ে উঠলাম! কিন্তু কোথায় মুক্তি! দন্ডগ্রস্ত আমি চলতে চলতে চলতে এখন এই নগরে। এই জীবনচর্যা, লোকসকলের প্রবৃত্তি ও ক্ষুধা, সংঘের কার্যক্রম ও দাপট, বাতাসের গন্ধ, জলের গতিপ্রকৃতি – এই সকলের রূপ বুঝে উঠতে গেল এইখানে, কিছুকাল। বাতাসের মধ্যে ধূলিকণার মতো মিশে থাকা গেল দিনকতক। হয়ে থাকা গেল নিরবয়ব অদৃশ্য। অমন লুপ্ত, নিরাকার হয়ে থাকা যে বড় দরকারি – সে আমি জেনে উঠেছি ক্রমে! অমনটা হওয়া চাই-ই, নতুবা প্রকৃত দশা ও পরিস্থিতিকে নির্ভুল জেনে ওঠায় সমস্যা হয়। নির্বিঘ্ন অনুধাবনের জন্য অদৃশ্য আর কণ্ঠস্বরহীন যদি হও, সুফল পাবে। যদি স্বরূপে থাকো, যদি ঘটনার অংশ হয়ে যাও – তখন বিভ্রান্ত, প্রমাদগ্রস্ত হয়ে থাকবে তোমার বিচারবোধ আর বিবেচনাশক্তি। আর তখন, অসঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যাবে, হয়ে যায়! ভুল করা হয়ে যায়। বহু ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে, ভুল প্রলয় সম্পন্ন করে করে যে-অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি আমি, তার আলো দিয়ে দেখে দেখে আমি বুঝতে পেরেছি, আমি তার দেখা পেয়েছি। আমি বুঝতে পারছি আমি সন্ধান পেয়েছি সেই পাপনগরীর, যাকে ধ্বংস করার দৈবাদেশপ্রাপ্ত আমি, আমি পেয়েছি তার খোঁজ। অবশেষে! আহ্, অবশেষে! আর তবে বিলম্ব কেন! শুরু করা যাক তবে প্রলয়যজ্ঞ! চলো বিনাশ – চলো সংহার – চলো ধস – চলো – এই অসাড়, অন্ধ, ভোগবাঞ্ছায় সদা গোঙানি দিতে নগরকে ভয়াল ধ্বংস ও মৃত্যুগ্রস্ত করা শুরু করি তবে! চলো করি! চলো!

শেয়ার করুন

Leave a Reply