যে-জীবন শিল্পের, যে-শিল্প জীবনের

লেখক:

ফেরদৌস আরা আলীম

তাঁকে যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন যে, তিনি উপমহাদেশের খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর স্ত্রী। জন্মসূত্রে নারায়ণগঞ্জের এই মেয়েটি একদা প্রতিভা মোদক ছিলেন, এ-ও অনেকে জানেন। আফরোজা বুলবুল – বুলবুল চৌধুরীর নাচের দলে ছিলেন এবং বুলবুলের ছায়াসঙ্গিনী হয়েই ছিলেন – এসবও আমাদের অনেকের জানা। কিন্তু নিজে তিনি যে অনেক বড়মাপের একজন শিল্পী ছিলেন, আমরা অনেকেই তা জানি না। তাঁর শিল্পসাধনার ইতিবৃত্তটি তিনি নিজের মুখে না শোনালে বা লিপিবদ্ধ না করে গেলে তাঁর সঙ্গে-সঙ্গে একটা শিল্পময় জীবনের, সমাজের বা বিশেষ একটা সময়ের ইতিহাসের অনেকটাই বিলুপ্ত হতো। সেদিক থেকে সম্প্রতি অ্যাডর্ন পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতি-আলেখ্য সুন্দর এই পৃথিবী আমার গ্রন্থটির মূল্য অনেক।

বলা হয়েছে, গ্রন্থটি তিনি অসমাপ্ত রেখে গেছেন। তাঁর কন্যা নার্গিস বুলবুল চৌধুরী ‘শেষের স্মৃতি’ অধ্যায়টি লিখে মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছেন। নার্গিস মাতৃকর্তব্য পালন করেছেন; তাঁর প্রতি এ-গ্রন্থের পাঠক কৃতজ্ঞ থাকবেন। নার্গিস বুলবুলের লেখাটুকুর গুরুত্ব কোনোক্রমে খাটো না করেই আমরা আফরোজা বুলবুলের গ্রন্থটিকে একটি সম্পূর্ণ গ্রন্থের মর্যাদা দেব। কারণ তাঁর যে-পৃথিবীটাকে তিনি সুন্দর বলেছেন, সেটি তাঁর বুলবুলময় পৃথিবী। বুলবুলবিহীন একার জীবনের স্মৃতিচারণে তাঁর মন হয়তো আর সায় দেয়নি। অথবা তাঁর একার যুদ্ধক্লান্ত জীবনটাকে তিনি আর ফিরে দেখতে চাননি। তৃতীয়ত, তাঁর গ্রন্থের শুরুর ধরন থেকে সমাপ্তির রকম দেখে বোঝা যায়, এভাবেই শেষ করতে চেয়েছেন তিনি। কন্যার ওপর কিছু সত্য প্রকাশের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন মাত্র।

স্মৃতিচারণার বিশেষ বিন্যাসে, ভাষার সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত সৌকর্যে এবং স্থান-কাল-পাত্রের সুষম ঐক্যে উপন্যাসোপম এ  স্মৃতি-আলেখ্যটিকে নানা কারণে একটি আকরগ্রন্থও বলা যায়।  অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন যে, ‘বুলবুল চৌধুরীকে নিয়ে আফরোজা বুলবুলের এ-স্মৃতিচারণ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির জগতে মহামূল্যবান।’

এ-গ্রন্থের পাঠক জানবেন বুলবুলকে ভালোবেসে আফরোজা বুলবুল কী করেছেন, কতটা করেছেন এবং কতটুকু পেয়েছেন। আমরা জানি, ঈর্ষণীয় বন্ধুভাগ্য ছিল বুলবুলের। তাঁর উপচেপড়া সৌন্দর্যের সঙ্গে সহজাত নৃত্যপ্রতিভার সহজ সংমিশ্রণের স্বীকৃতি তিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই পেয়ে গেছেন। প্রচুর লেখালেখি হয়েছে তাঁকে নিয়ে। তাঁর একাধিক জীবনীগ্রন্থও লেখা হয়েছে। কিন্তু নৃত্য, অভিনয় এবং সংগীতে সাধনালব্ধ পারদর্শিতায় কিশোরী প্রতিভা মোদক যে-খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার যাবতীয় সুযোগ বা আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে বুলবুলের ডাকে যেভাবে সাড়া দিয়েছিলেন এবং বুলবুল-প্রতিভার ছায়ায় নিজেকে যেভাবে বিলীন করে দিয়েছিলেন, বুলবুল-জীবনীগ্রন্থের কোথাও তিনি সেভাবে আসেননি। ‘১৯৪২ সালে বুলবুল প্রতিভা মোদককে বিয়ে করেন’ জীবনীগ্রন্থে ব্যবহৃত এমন একটি বাক্যকে বুলবুলের কৃতিত বলেই মনে হয়। অথচ এ-তথ্যটিও সঠিক নয়। কারণ বিয়ের তিন মাস আগেই প্রতিভা বুলবুলের নির্দেশমতো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং নিয়মানুযায়ী তাঁর একটি ইসলামি নামকরণও হয়েছিল নিশ্চয়ই।

সুন্দর এই পৃথিবী আমার গ্রন্থে বুলবুল-চরিত্রের গোপন-গভীর এমন অনেক ক্ষেত্রে আলোকপাত করেছেন আফরোজা বুলবুল, বুলবুল-জীবনীগ্রন্থগুলোতে যা নেই।

সমগ্র বুলবুলকে জানার জন্য তাঁর বিক্ষুব্ধ, রক্তাক্ত যন্ত্রণাময় জীবনের কথা জীবনীগ্রন্থগুলোতে সেভাবে আসেনি। কলকাতায় তথাকথিত অভিজাত সোসাইটিতে বুলবুল কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছেন বা মন্বন্তর নৃত্যনাট্যে গ্রামের বুভুক্ষু গরিব চাষির চরিত্র করতে গিয়ে ক্ষুধার জ্বালায় নিজের হাত চিবিয়ে খেতে-খেতে স্টেজময় ছোটাছুটির দৃশ্য শেষে বুলবুলের  ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত হাতের শুশ্রূষা করতে গিয়ে আফরোজা বুলবুলকে কাঁদতে হতো প্রতিবার, বারবার। জীবনীগ্রন্থে এসব কথা আসেনি, আসার কথাও নয়।

বুলবুলের জীবনকথায় তাঁর সৌম্যদর্শন রাজসিক আভিজাত্য ও প্রবল ব্যক্তিত্বের কথা রয়েছে। কিন্তু শুধু দলের স্বার্থে দলের সদস্যদের কারো-কারো ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ সম্পর্কে কিছু না-দেখা বা না-জানার ভান করা বুলবুলকে দেখেছেন আফরোজা বুলবুল। দলভুক্ত নারী-সদস্যদের কারো কারো সঙ্গে বুলবুলের থেকে-থেকে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে আফরোজা বুলবুল আপন ঔদার্যে সামলে নিয়েছেন। বুলবুলের মানবিক দুর্বলতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব দিয়ে তাঁর একনিষ্ঠ প্রেম বা তাঁর সততাকে অপমান করা যায় না।’

সাহিত্যকর্মে বুলবুল চৌধুরীর সাফল্যের কথা আমরা জানি। তিনি প্রাচীর মতো একটি  উপন্যাস লিখেছেন। কথাশিল্পী, সমালোচক ও সংস্কৃতি-বিশেষজ্ঞ গোপাল হালদারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ-গ্রন্থ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। শিল্পী কামরুল হাসান এ-গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছিলেন। ছোটগল্পেও তাঁর খ্যাতির কথা আমরা জানি। পরিচয় পত্রিকায় ছাপা হতো তাঁর গল্প। চিত্রাঙ্কনেও আগ্রহ ছিল বুলবুলের; অাঁকার হাতও ছিল ভালো। ইচ্ছা করলে বড় অাঁকিয়েও হতে পারতেন। প্রসঙ্গত, আফরোজা বুলবুল বলেছেন যে, সময়টাই তখন ছিল সৃজনের। যুদ্ধ, দাঙ্গা ও মন্বন্তর তখনকার কথাশিল্পী, সংগীতশিল্পী, নৃত্য ও চিত্রশিল্পীদের সবাইকে নতুন সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। বুলবুল চৌধুরীও তখন ‘আগুন’, ‘পয়মাল’, ‘ব্লাড হাউন্ড’, ‘অনির্বাণ’ ও ‘রক্তের ডাকে’র মতো গল্প লিখে গেছেন একের পর এক। পরিচয় তাঁর সবকটা গল্পই ছেপেছিল। শিল্পীজীবনের এমন একটা উত্তুঙ্গ পর্যায়ে নজরুলকে আমরা নির্বাক হতে দেখেছি। আমাদের উপন্যাস-সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃৎ মাহমুদুল হককে আমরা ভিন্ন জগতের বাসিন্দা হতে দেখেছি। জীবনের এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণাম থেকে বুলবুলকে রক্ষা করেছেন আফরোজা বুলবুল। এ-গ্রন্থটি না হলে এসবের বিন্দুবিসর্গও আমাদের জানা হতো না। চতুর্থত, জীবনীগ্রন্থে বুলবুলের এমএ পাশের কথা আছে। যা নেই তা হচ্ছে, প্রতিভা মোদক পাশে না দাঁড়ালে এমএ পাশ তো দূরের কথা, এমএ পরীক্ষায় বসাও বুলবুলের পক্ষে সম্ভব হতো না। শুধু তাই নয়, মারাত্মক চক্ষুরোগে আক্রান্ত বুলবুলের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল পরীক্ষার কিছুদিন আগে। বুলবুলের বন্ধু সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (বাংলা সাহিত্য বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থানপ্রাপ্ত) নির্দেশমতো বুলবুলকে পাঠের বিষয় পড়ে শোনাতেন প্রতিভা মোদক। এভাবে এর আগেও একবার চর্মরোগে শয্যাগত বুলবুলকে সারিয়ে তুলেছিলেন প্রতিভা ও তাঁর মা হাসি মোদক, যিনি বুলবুলকে তাঁর ‘গোপাল ঠাকুর’ বলে জানতেন। বস্ত্তত চার বছরের প্রেম এবং এক যুগের দাম্পত্য জীবনে আফরোজা বুলবুলের কাছে আমাদের অপরিমেয় ঋণের কথা এ-গ্রন্থ না হলে অজানাই থেকে যেত।

জাতশিল্পী ছিলেন প্রতিভা মোদক। দিনাজপুরের বালুরহাট স্কুলে মায়ের সঙ্গে থাকাকালে মাত্র চার বছর বয়সে মন্মথ রায়ের পরিচালনায় শকুন্তলা নাটকে হরিণশিশুর ভূমিকায় এবং ত্রয়স্পর্শী চলচ্চিত্রে শিশু চরিত্রে অভিনয় করেন। বন্দে মাতরম-মুখরিত বিপ্লবী আন্দোলনের ঘাঁটি বালুরহাট তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল ছিল সারাজীবন। দেশ, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা শব্দগুলোর সঙ্গে ওইটুকু বয়সে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। মিটিং-মিছিল, পিকেটিং-মুখরিত  বালুরহাটের জেলখানায় বন্দি বিপ্লবী কয়েদিদেরও তিনি দেখেছেন। এই বালুরহাট তাঁর নাচের প্রেরণাও জুগিয়েছিল। অদূরে মাইহার ও মাইসন্তোষ গ্রাম থেকে সাঁওতালের দল দুর্গাপুজোর সময় আত্রাই নদীর পারে নাচতে আসত। স্মৃতি থেকে ওদের নাচের ধরনটির বর্ণনায় আফরোজা বুলবুলের ভাষাজ্ঞানের নমুনা : ‘একটা হাত কোমরে এবং আরেকটা হাত মাথায় রেখে ছোটকি হোকে না-চ করো তাগর ধিনা, তাগর ধিনা, তাগর ধিনা গাইতে গাইতে কোমর দুলিয়ে বসার ভঙ্গিতে পৌঁছুলেই গাইয়ের দল বড়কি হো-কে নাচ করো তাগর ধিনা, তাগর ধিনা গাইতে গাইতে ওরা দুলে দুলে সোজা হয়ে দাঁড়াত।’

কলকাতায় প্রতিভার শিল্পসাধনার ক্ষেত্রে তাঁর মায়ের অবদান ছিল অপার। ওস্তাদ ঝান্ডে খাঁর কাছে খেয়ালের তালিম নিয়েছিলেন ঘরে বসে। গায়ক পন্ডিত নুটু মুখোপাধ্যায়ের কাছে গান ও ওস্তাদ অলি আহমদ খাঁর কাছে সেতারের তালিম নিয়েছিলেন তিনি। ডাববু কাকু (পুটিয়ার রানীর পুত্র) নিয়মিত তবলা সংগত করতেন এঁদের সঙ্গে। এই কাকু একদিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে এসেছিলেন ওঁদের বাসায়। এই খাঁসাহেব ওদের মা-মেয়েকে উদয়শঙ্করের নাচ দেখাতে নিয়ে যান। উদয়ের দলের নৃত্যশিল্পী অমলা নন্দী (তখনো অমলা শঙ্কর হননি) ছিলেন মায়ের ছাত্রী। এঁদের দেখাদেখি মা তাঁর মেয়েটিকে সর্ববিদ্যায় পারদর্শী করে তুলতে চেয়েছেন। লাঠিয়াল পুলিশ দত্তের কাছে প্রতিভা লাঠি, ছোরা, তলোয়ার খেলা ও সাইকেল চালানো শিখেছিলেন। অল্পদিনের মধ্যে উদয়শঙ্করের দলে ডাক পেলেন প্রতিভা। মা প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে প্রতিভার ভবিষ্যৎ অন্যরকম হতো। ওইটুকু বয়সে জীবনটাকে সোনায় মুড়িয়ে নেওয়ার মতো আরো দুটি সুযোগ পেয়েছিলেন প্রতিভা।

মায়ের সঙ্গে লখ্নৌ বেড়াতে গিয়ে অযোধ্যার বিধবা রানীর নজরে পড়েছিলেন প্রতিভা। নিঃসন্তান বিধবা রানী তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করবেন বলে প্রতিভাকে দত্তক চান। দ্বিতীয়বার এলাহাবাদে প্রতিভার নাচ দেখে সেখানকার এক রানীমা পুত্রবধূ করতে চান প্রতিভাকে। প্রসঙ্গত বলতে হয় যে, সে-কালে ভারতবর্ষের তৎকালীন সংস্কৃতিজগৎটি এই রাজা-রানীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। মা চেয়েছিলেন তাঁর মেয়েটি প্রথমত ব্যারিস্টার হবে। দ্বিতীয়ত, নামকরা শিল্পী হিসেবে খ্যাত হবে তাঁর নাম।

কলকাতায় বিখ্যাত নাচের স্কুল কলাভবনের ছাত্রী প্রতিভার প্রথম নৃত্যগুরু হরিসাধন তাঁকে মা বলে ডাকতেন। তিনি তাঁকে নাচ-গান ও অভিনয়ে সমান পারদর্শী করে তোলেন। এই কলাভবনেরই আরেকজন শিক্ষক অনিল কৃষ্ণ বসু একদিন তাঁদের বাড়ির অদূরে ‘ছায়া’ সিনেমাহলে প্রতিভা ও তাঁর মাকে একটি নাচের শো দেখাতে নিয়ে যান। দলটি ছিল বুলবুলের। বুলবুল জীবনী অনুসরণ করে আমরা দেখি যে, ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র বুলবুল কলেজের পুরস্কার বিতরণী সভায় তাঁর সহজাত নৃত্য প্রতিভায় যাঁদের মুগ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে অতিথি হিসেবে লেডি হেমলতা মিত্রও ছিলেন। তাঁর স্নেহ এবং মনোযোগধন্য বুলবুল অতঃপর স্কটিশ চার্চ কলেজে বিএ পড়ার সময় নিজের দল গঠন করেন। এ-দলে বিশিষ্ট শিল্পী মণিকা দেশাই, অঞ্জলি দাশগুপ্ত (সুরকার কমল দাশগুপ্তের বোন) প্রমুখ শিল্পী ছিলেন। এঁদের নাচ দেখে প্রতিভার মনে হয়েছে, শাস্ত্রীয় নিয়মের বিধি না মেনেও সহজ ভঙ্গিতে কাহিনি ব্যক্ত করা যায়। এলাহাবাদে অল ইন্ডিয়া কনফারেন্সে ভারতের যশস্বী ওস্তাদদের উপস্থিতিতে ওস্তাদজির শেখানো বেহুলানাচে প্রশংসিত প্রতিভা মোদকের মনে হলো, বুলবুলের পদ্ধতি যুক্ত করে সে-নৃত্যকে আরো সুন্দর করা সম্ভব। অন্যদিকে বুলবুলকে দেখে এবং তাঁর বিনীত ব্যবহারের সৌন্দর্যে মা মুগ্ধ। অল্পদিনের মধ্যে বুলবুল প্রতিভাদের বাড়িতে অবারিত দ্বার হবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিভা মোদক ও বুলবুলের বিয়েটা খুব সহজে সম্পন্ন হয়নি। না হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে বুলবুলের  চরিত্র এবং চিন্তাধারার এমন কিছু দিক উঠে আসে, যার পরিচয় বুলবুল-জীবনীতে নেই। সুন্দর এই পৃথিবী আমার গ্রন্থটি এঁদের যুগল জীবনীগ্রন্থও বটে।

সামনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা। কলকাতা রেডিওর তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে প্রতিভা তখন গাইছেন এবং বাণীকুমারের প্রযোজনায় অভিনয় করছেন। কলকাতা রেডিওতে কাজী নজরুল ইসলাম তখন সুপ্রভা ঘোষ (সরকার) এবং শৈল দেবীকে গান শেখাচ্ছেন। মুগ্ধবিস্ময়ে প্রতিভাকে এঁদের গান শুনতে দেখে নজরুল নিজেই একদিন তাঁকে ডেকে নিয়ে দুটো গান শিখিয়ে এইচএমভির কমল দাশগুপ্তকে গান দুটি রেকর্ড করাবার দায়িত্ব দিলেন। কাজীদার রুম থেকে বেরিয়ে প্রতিভা বাণীবাবুর কক্ষে রিহার্সেলে মাত্র ঢুকেছেন। অকস্মাৎ প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আশরাফুজ্জামান বাণীবাবুর অনুমতি নিয়ে প্রতিভাকে নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে রেডিওর নিয়ম ভঙ্গ করলেন। তাঁর কক্ষে অপেক্ষমাণ বুলবুল প্রতিভাকে নিয়ে যান গড়ের মাঠে। প্রতিভাকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে পিতার কাছে যে-চিঠিটা লিখেছিলেন তার উত্তর এসেছে। পিতা খুব স্পষ্ট করেই লিখেছেন, এর আগেও বুলবুলের এ-ধরনের পত্র তিনি পেয়েছিলেন। সুতরাং পিতা নিশ্চিত যে, বুলবুলের এ-মোহও কেটে যাবে। আমরা বিস্মিত হই যখন দেখি সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ একটি মেয়ে এ-চিঠিতে কোনো দোষ খুঁজে পাননি। না পিতার, না পুত্রের। তিনি বরং পিতার ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে কিছুদিনের জন্য চুনতি (চট্টগ্রামে) যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। চুনতিতে বসে এ-সময় বুলবুল লিখে ফেলেন প্রাচী উপন্যাস, যে-উপন্যাসটি পরবর্তীকালে কথাশিল্পী, সমালোচক এবং সংস্কৃতি-বিশেষজ্ঞ গোপাল হালদারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত হয়। এ-গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পী কামরুল হাসান।

এদিকে রেডিওর নিয়ম ভঙ্গ করার দায়ে প্রতিভাকে শোকজ করা হলে তিনি আর সেখানে যাননি। মিথ্যা বলে অথবা করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে পার পেতে চাননি তিনি। আফরোজা বুলবুলের চরিত্রে এমন সততা ও দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত বিরল ছিল না। এ-সময় তাঁর কত্থক নাচের গুরু যমুনা পান্ডের দলের সঙ্গে গুরুর দেশ রাজপুতনার বিকানীরে যাওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন প্রতিভা। রাজপুতনার নৈসর্গিক সৌন্দর্য তো বটেই, সেখানকার রাস্তাঘাট, বাড়িঘর সবই তাঁকে মুগ্ধ করেছে। বিকানীরের মেয়েদের দৈনন্দিন ব্যবহারের কাপড়-চোপড়ও তাঁর মনে হতো যেন নাচের পোশাক। রাস্তা দিয়ে যখন ওরা চলত ‘চোলি ঘাগড়া পরে, সর্বাঙ্গে গহনায় তাক লাগিয়ে মাথায় চুটকি পরে যেন শ্রীকৃষ্ণের গোপিনীরা হেলেদুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ বিকানীর থেকে ফেরার সঙ্গে-সঙ্গে সিংহলের থিয়োসফিক্যাল সোসাইটির শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রতিভা আমন্ত্রণ পান তাঁর মণিপুরি নৃত্যগুরু সেনরিক রাজকুমার ও তাঁর স্ত্রী বীরবালা দেবীসহ। এ উপলক্ষে দিল্লি, বম্বে, মাদ্রাজ ও বাংলা থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরা বম্বেতে মিলিত হয়ে নতুন নৃত্যপরিকল্পনা তৈরি থেকে চূড়ান্ত রিহার্সেল শেষে মাদ্রাজের ধনুস্কোটি হয়ে সমুদ্রের অপর পারে কলম্বোতে যান দলবেঁধে। সিংহলের নানা জায়গায় মাসখানেক তাঁরা অনুষ্ঠান করেন। প্রতিটি শোতে নৃত্য ছাড়া প্রতিভা সংগীত-শিক্ষক বিভূতি বটব্যালের সঙ্গে ডুয়েট ধুমরি ও ভজন গেয়েছেন। কলকাতায় ফিরে বুলবুলকে পেলেন প্রতিভা। বুলবুল তখন রিপন কলেজে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন এবং একই সঙ্গে হিন্দু মাইথোলজির মূর্তিগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। বুলবুলের সঙ্গে মান-অভিমানের একপর্যায়ে বম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই) সিরকো প্রোডাকশনের চাকরি নিয়ে মেজ বোন ও বোনের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বম্বে চলে যান প্রতিভা। বম্বের নামকরা পরিচালকদের সঙ্গে তাঁদের ছবির নৃত্যপরিচালক ও প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৪১ সালে বম্বের চিত্রপরিচালক মেহবুব খানের বেহান ছবিতে অভিনয় এবং আসরা ছবিতে সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। তবে অরুচিকর পোশাক এবং নৃত্যদৃশ্যের সেট পরিকল্পনায় আপত্তি জানিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত এ-জগৎ ছেড়ে দেন। স্মৃতিকথায় তিন বছর ধরে দেখা চলচ্চিত্র-জগতের যে-বিশদ চিত্র তিনি এঁকেছেন তার সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক মূল্য অনেক।

কলকাতায় ফিরে এসেই প্রতিভা বুলবুলের সঙ্গে চিয়াংকাইশেক দম্পতির আগমন উপলক্ষে নাচের শো করেন। বুলবুল আইন পড়া ছেড়ে দেন এ-সময়। প্রতিভার সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে বুলবুল তখনো পিতার অনুমতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পিতার অনুমতির জন্য প্রতিভাকে দিয়েও চিঠি লেখাতে থাকেন বুলবুল। এই সময়টাতে প্রতিভা তাঁকে এমএ পরীক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বস্ত্তত চার বছরের প্রেম এবং বারো বছরের দাম্পত্যে আফরোজা বুলবুলকে নিরন্তর কঠিন এক জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর লড়াইটা ছিল মূলত বুলবুলের জন্যই। কখনো তাঁর সম্মান রক্ষার জন্য, কখনো তাঁকে সুস্থ রাখার জন্য তিনি নিবেদিত থেকেছেন। মান, যশ ও খ্যাতি বুলবুল তাঁর স্বল্পপরিসরের জীবনে কম পাননি; কিন্তু কপর্দকহীন অবস্থায় দুরারোগ্য ক্যান্সারে তাঁর জীবনাবসান হলে আফরোজা বুলবুলকে নতুন করে আবার জীবনযুদ্ধে নামতে হয়। সে-যুদ্ধ একদিকে বুলবুলের নাম ও কীর্তি রক্ষার জন্য, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য। নিজের মুখে সে-সংগ্রামের কথা তিনি হয়তো বলতে চাননি বা যুদ্ধবিধ্বস্ত সে-জীবনটাকে আর ফিরে দেখতে চাননি। এ-গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ‘শেষের স্মৃতি’ পর্বে সেসব কথা সবিস্তারে লিখেছেন নার্গিস বুলবুল চৌধুরী। মায়ের স্মৃতির সঙ্গে নিজের কিছু স্মৃতি, কিছু স্বপ্ন এবং কিছু বেদনার কথাও যোগ করেছেন তিনি।

সবশেষে আমরা ফিরে যাচ্ছি স্মৃতি-আলেখ্যের প্রারম্ভিক পর্বে। একটি তারিখ দিয়ে এ-পর্বের সূচনা হয়। ২৪ নভেম্বর, ১৯৫৩ সাল। এই দিনে সাউথ হ্যাম্পটন জাহাজঘাটা থেকে পোলিশ জাহাজ ব্যাটরিতে চড়ে বিলেতের মাটি ছেড়ে স্বদেশাভিমুখে রওনা হন শিশুকন্যা নার্গিসসহ আফরোজা বুলবুল ও তাঁদের দল। পাকিস্তান সরকারের ইংরেজ-তোষণনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিলেতের মাটিতে মন্বন্তর এবং লিস্ট উই ফরগেট নৃত্যনাট্যের শো করার অপরাধে বুলবুলকে যে-জাহাজটিতে চড়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে সেটি ভিড়াক্রান্ত কমদামি জাহাজমাত্র নয়, কমিউনিস্টদের জাহাজ বলে এটিকে করাচি বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয় না। অর্থাৎ অসুস্থ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত বুলবুলকে নামতে হবে মুম্বাই বন্দরে। অথচ বিলেতের নানা জায়গায় বুলবুলের দল যখন তাঁদের পরিবেশনায় মুগ্ধ, তখন করাচির ডন পত্রিকার লন্ডন প্রতিনিধি নাসিম আহমেদ লিখেছেন, ‘বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এবং বাংলার বুলবুল চৌধুরী – একজন রাজনীতির দিক থেকে এবং অন্যজন শিল্পের দিক থেকে  পাকিস্তানকে বিদেশে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।’ অতঃপর ২৬ পৃষ্ঠা অবধি এই জাহাজটির চলমানতার সঙ্গে তাঁদের দলের প্রায় বছরব্যাপী ইউরোপ ভ্রমণের নিটোল এক ভাষাচিত্র তিনি এঁকেছেন আপনমনে। বিকানীর থেকে সেই যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ইউরোপ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে মুম্বাই বন্দরে এসে তার সমাপ্তি ঘটল। দল নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি জেলাশহরে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি, লাহোর ও মুলতানের নানা জায়গায় ভ্রমণের সময় কোথায় কার বাড়িতে উঠেছেন, কোন হলে শো করেছেন, সেসব এলাকার লোকজন, বাড়িঘরসহ রাস্তার দুধারের সৌন্দর্য – প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়েছেন তিনি। ইউরোপ ভ্রমণের সময় জলপথে কোন ঘাট থেকে কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় নেমে ট্রেন বা বাস ধরেছেন, কোন স্টেশনে কী দেখেছেন, কী খেয়েছেন, সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে পাঠক নিজের অজান্তেই চমৎকার একটি ভ্রমণ গ্রন্থের আনন্দপাঠে মুগ্ধ হবেন।

তাঁর সুন্দর পৃথিবীটাতে উপমহাদেশের খ্যাতনামা কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদের মিলনমেলা বসিয়েছেন তিনি। সুদিনে এঁদের সান্নিধ্য এবং দুর্দিনে এঁদের দাক্ষিণ্য পেয়েছিল বুলবুল দম্পতি। বলা বাহুল্য, ব্যক্তিগত বা কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থে নয়, বুলবুল চৌধুরী এদেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের স্বার্থেই এঁদের শরণাপন্ন হয়েছেন কখনো-কখনো। ‘আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার নানা উপকরণ’ আফরোজা বুলবুলের গ্রন্থটিকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তাঁর স্মৃতিযাত্রার তিনশো পৃষ্ঠা শেষে জাহাজ ভিড়েছে মুম্বাই বন্দরে। পরবর্তী অধ্যায়ে বুলবুল জীবনের শেষ তিনটি মাসের প্রায় প্রতিটি দিনের প্রতিটি শঙ্কাকুল মুহূর্তের বর্ণনায় আমরা এক ট্র্যাজিক হিরোর মহাপতনের দৃশ্যাবলি একের পর এক মঞ্চস্থ হতে দেখি। দম-দেওয়া পুতুলের মতো এক আফরোজা বুলবুলের তখন নিজের বলে আর কিছু ছিল না। একটা সময়ে আমরা তাঁর হাত থেকে কলম খসে পড়ার শব্দটিও শুনতে পাই।

স্বজন-প্রিয়জন, পরিচিতজন এবং বিখ্যাতজনদের প্রচুর ছবিসহ তাঁদের দলীয় প্রদর্শনীগুলোর ছবি, দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন এবং প্রচুর প্রশংসাপত্র এ-গ্রন্থের মূল্যবান সংযোজন নিঃসন্দেহে। গ্রন্থ-শিরোনামের মধ্য দিয়ে তিনি যেন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। সিদ্ধান্তটি কী? না, আমার পৃথিবীটা সুন্দর। সেখানে দুঃখ-বেদনা, আঘাত-অসুন্দর সবই আছে। তবু সুন্দর এই পৃথিবী আমার গ্রন্থটি, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে উদ্ধৃত করে বলি, ‘আমাদের সমাজের জন্য তো বটেই, পাঠকের জন্যও বড় প্রাপ্তি।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply