যে পালাতে চায়, যে হারায়

লেখক:

পূরবী বসু

স্বেছায় যে-জন ঘর ছেড়ে চলে যায় অথবা হারিয়ে যায়, সে আর কখনো ঘরে ফেরে না। এমন কথা অনেকের কাছে, বহু জায়গায় শুনেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কথাটার সত্যতা পরীক্ষিত হতেও দেখেছি। ব্যর্থ হতে একেবারে দেখিনি তাও হলফ করে বলতে পারব না। তবে নিজের সংসারেই তার বাস্তবায়নের কথা ভাবিনি কখনো। অথচ হারিয়ে যাবার কথা ছিল আমারই। গোটা জীবনে কতবার যে এই চিন্তা মাথায় এসেছে! সত্যি সত্যিই তা করার কথা ভেবেছি আমি। চেষ্টাও করেছিলাম একবার। কিন্তু না, পারিনি, চলতে গিয়ে পথ থেকে ফিরে আসা নয়, শুরু করার আগে চিন্তার পর্যাতেই থেমে গেছি। অথচ ভাবতে গেলে

মানসিকভাবে কতটাই না এগিয়ে গিয়েছিলাম! কী সাংঘাতিক প্রস্ত্তত ছিলাম আমি। হঠাৎ এক রাতে – বাসস্থান থেকে দূরে – নির্জন পাহাড়ঘেরা এক শহরতলিতে। সত্যি কথা বলতে কি, সেই রাতে অকস্মাৎই মোটামুটি স্থির ও দৃঢ় এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম! সারাজীবন ধরে অন্যের কথা ভাবলেও সেই রাতে নিজের দিকে ফিরে তাকিয়েছিলাম। শুধু নিজের কথাই ভেবেছিলাম সেদিন। একবার।

তবে কার্যত যে আদৌ চলে যায়নি বা হারায়নি, তার তো ফিরে আসার প্রশ্নও আসে না! ফলে যাওয়া যখন হয়নি, হারিয়ে বা চলে যাবার জন্য আমার পূর্বপ্রস্ত্ততির কোনো গুরুত্ব বা মূল্যই নেই। এমন অজ্ঞাত, একান্ত গোপনীয় প্রস্থান বা হারিয়ে যাবার ইচ্ছা, কেবল যে আমার জীবনেই প্রথম ঘটেছে, তা নয়। অনেকের জন্যেই তা সত্য। এ ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত।  তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ধরনটা হয় আলাদা। ফলে যে হারাবার গল্প পরিবার বন্ধুবান্ধব সকলেই জানে, সেই গল্পই বলি আজ। আমার কথা, হারাতে গিয়েও যে হারাতে পারিনি, সে-কথা আপাতত নাই-বা বললাম। পরে দেখা যাবে। সময়, স্থান ও সুযোগের মিলন ঘটলে বলেও ফেলতে পারি এক ফাঁকে।

যার কথা বলছিলাম সেই বুদবুদ আসলে মানুষ নয়, যদিও মানবিক গুণ বা স্বভাব অনেকটাই নিজের মধ্যে ধারণ করত সে। সুযোগ পেলেই হলো। নিজের ইচ্ছায় ঘর ছেড়ে নির্ঘাত বেরিয়ে পড়ত। কিন্তু বেরিয়ে গেলেও আমার ধারণা, হারাবার মতলব তার কখনো থাকত না। খেলাপ্রিয় এই প্রাণীটি আমাদের সঙ্গে এক ধরনের কৌতুকপূর্ণ খেলা করত, সুযোগ পেলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে। ও চাইত আমরা তার পিছু পিছু ছুটে গিয়ে বহু কায়দা-কসরত করে, বহু দুশ্চিন্তা-পরিশ্রম শেষে কোনোমতে তাকে ধরে আবার ঘরে ফিরিয়ে আনি পরম যত্নে – আদর করে। সমস্ত ড্রামা শেষ হলে সে সম্রাজ্ঞীর মতো মাথা উঁচু করে গাড়ির জানালা দিয়ে চারদিকে তাকাতে তাকাতে প্রবল প্রতাপে ঘরে ফিরত – আমার পুত্রের গাড়িতে চড়ে। এভাবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বহুবার। ফলে চূড়ান্ত ঘটনাটা ঘটার অনেক আগেই যেন আমি তা টের পেয়েছিলাম – চোখের সামনে স্পষ্ট ঘটতে দেখতাম প্রায়ই। কেননা এই সর্বশেষ নাটকটির শেষ অঙ্কের মহড়া আমার ঘরেই চলেছিল অনেক দিন ধরেই।

বলছিলাম, আমাদের কুকুর বুদবুদের কথা। এমনিতে তো তার শরীরে দারুণ মায়া। নিজে অবশ্য আদুরে কিশোরী মেয়ের মতো কথায় কথায় অভিমান করে। ঠিক সময় তার খাবার পরিবেশন না করলে। তাকে তার মনমতো কিছু করতে না দিলে বা আমরা কেউ তার ইচ্ছেমতো কিছু না করলে। দুষ্টুমি করার জন্যে ধমক দিলে বা ওকে একা ঘরে রেখে কোথাও গেলে তো কথাই নেই, মুখ ফুলিয়ে খাটের নিচে সোজা চলে যাবে নিঃশব্দে। সেখান থেকে তাকে বের করা এক মস্তবড় হাঙ্গামা। খাটের নিচে যদি নাও যায় সামনের দুই পা ছড়িয়ে দিয়েই তার ওপর সম্পূর্ণ মাথাটা রেখে দুঃখী দুঃখী চোখে তাকিয়ে থাকবে।

আমি, আমার স্ত্রী  বা আমার পুত্র কোথাও গিয়ে কিছু সময়ের ব্যবধানে ফিরে এলে সে যে পরিমাণ খুশিতে, আনন্দে উত্তেজিত হয়ে পড়ে, লেজ নাড়িয়ে অনবরত দ্রুত ছোটাছুটি শুরু করে, আমাদের হাতে-পায়ে চেটেপুটে, উঁ-উঁ আওয়াজ তুলে তার মনের ভাব প্রকাশ করে, সেখানে সুযোগ পেলেই সে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাবে, নিজে থেকে ফিরে আসবে না, তার পিছু পিছু পাড়াময় কেউ হেঁটে, কেউ গাড়িতে ছুটে বেরিয়ে অবশেষে তাকে কোনোমতে ধরে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে, এটা কোনোমতেই আশা করা যায় না। তবু সে এ রকমই। বইতেও পড়েছি, এই জাতীয়, অর্থাৎ জাপানিজ পিউর ব্রিড ‘শিবা ইনো’, কুকুরের এটা স্বভাব বা জাতিগত বৈশিষ্ট্যও বটে। পশু ডাক্তারও বোঝান আমাদের, ‘এরা মূলত স্বাধীনতাপ্রিয়। মনিবের প্রতি যথেষ্ট মায়া থাকলেও এ-বন্দিদশা থেকে সবসময় তারা মুক্তি চায়। তারা খোলা আকাশের নিচে বন্ধনহীন ঘুরে বেড়াতে চায়। সাধারণত গৃহপালিত জীব বিশেষ করে কুকুররা এটা করে না। মনিবের প্রতি শুধু আনুগত্য নয়, তাদের অতি ঘনিষ্ঠতা, নির্ভরশীলতা ও নিষ্ঠাশীলতার অনেক গল্প চালু আছে। আমরা নিজেরাও দেখেছি জীবদ্দশায় সে রকম দু-চারটি ঘটনা। আর কিছু করুক না করুক গৃহপালিত কুকুর খোলা দরজা পেলেই পাঁচ বছর পরও ঘর ছেড়ে পড়িমরি করে ছুটে পালায়, এটা বড় শোনা যায় না। কিন্তু আমাদের আদরের বুদবুদ যে প্রতি ভোরে আমার স্ত্রীর ঘুম ভাঙিয়ে দিত তার শিয়রে এসে বালিশের ওপর বসে কপাল, গাল, হাত চেটে আদর করে, সত্যি সত্যিই একদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেল, হারিয়ে গেল। গেল তো গেলই। কোথাও আর তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।

আমি কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমি যেন দিব্য চোখে দেখতে পেতাম এই যে বুদবুদ ঘর ছেড়ে মাঝেমধ্যে পালিয়ে যায়, কিছুদিন পরপর একই নাটকের মঞ্চায়ন ঘটায় আর বাধ্য হয়ে আমরা তিনজন যে যার ভূমিকা পালন করে চলি যে নাটকের সমাপ্তি সব সময়ই হয় মিলনাত্মক এবং প্রতিবার নাটকের শেষ দৃশ্যে স্পষ্ট দেখি, হারানো কুকুর ফেরত পেয়ে (নিজের একক চেষ্টায় বা             পাড়া-প্রতিবেশীর সাহায্যে) তৃপ্ত পুত্র আমার ঘরে ফিরছে তার অতি আদরের বাহনকে ধরে গাড়ির সামনের সিটে তার পাশে বসিয়ে নিয়ে। কিন্তু আমাদের আদুরে নায়িকা বুদবুদ (যার মনুষ্য সমকক্ষ বয়স এখন অতি লোভনীয়, সে পূর্ণ যৌবনবতী মানে সবে মধ্য তিরিশের কোঠায় তার বয়স), যদিও তার কুকুর-বয়স সবে সাড়ে পাঁচ, সে কি আর বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে গাড়ির সিটে?  বুদবুদ দিব্যি সিটের ওপর টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আধখোলা জানালা দিয় মুখ বের করে দিয়ে পৃথিবী দেখতে দেখতে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘরে ফিরছে। ঘর ছেড়ে পালিয়ে এতগুলো মানুষকে যে ঘর্মাক্তই শুধু করেনি, প্রায় হার্ট অ্যাটাক করে দিচ্ছিল, সে ব্যাপারে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।

আমি ও আমার স্ত্রী প্রতিবারই তখন পর্যন্ত আমাদের বাড়ির আশপাশে বুদবুদের নাম ধরে কাতর স্বরে ডাকতে ডাকতে তাকে খুঁজে বেড়াতে থাকি, যখন আমাদের পুত্রকে বুদবুদসহ বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে স্মিত মুখে ফিরে আসতে দেখি গাড়িতে। আর প্রত্যেকবার আমার মনে হয়, একদিন এমন হবে, আমি চোখের সামনে নিশ্চিত দেখতে পাই, একদিন এমন হবে যখন আমার ছেলেকে দেখব তার গাড়ি নিয়ে মুখ কালো করে একাই ফিরে আসছে। পাশের সিট খালি। সেখানে বসে আধখোলা জানালায় মুখ বের করে বুদবুদ তাকিয়ে নেই। আমি চোখ বুঁজলেই স্পষ্ট দেখতে পেতাম, বুদবুদ সারাজীবনের জন্যে হারিয়ে গেছে, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পদে পদে সে বহু দৃষ্টান্ত রেখেছে, যার থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি সে আসলে হারাতে চায় না, মাঝেমধ্যে কিছুটা মুক্তির আনন্দ পেতে চায় কেবল। একা একা বন্ধনহীন বাইরের খোলামেলা পৃথিবীটাকে জানতে ও বুঝতে চায় খানিকক্ষণের জন্যে। তার চেয়েও বড় কথা, সে খেলতে চায়। সে বড় মজা পায় দেখতে যে, সে প্রাণপণে ছুটছে আর তার পেছনে পেছনে আমরা তিনজন সাবালক মানুষ পাগলের মতো দিগ্বিদিক ভুলে দৌড়ুচ্ছি তাকে ধরতে। এটা দেখে সে খুব মজা পায়, ভীষণ আনন্দ হয় তার। হয়তো খানিকটা আত্মগরিমাও হয়। তখন পড়িমরি করে সে আরো জোরে ছোটে। কোথায় চলে যাচ্ছে না ভেবেই ছোটে। সবটাই তার জন্যে খেলা। সে ভালো করেই জানে, যেখানেই যাক না কেন, তাকে আমরা যে করে হোক খুঁজে বের করে ফিরিয়ে আনবই। সে যেটা বুঝতে পারে না, এমনি করে খেলতে গিয়ে বাড়িঘর, গাছপালা, জঙ্গল, বড় রাস্তা, গাড়ি ইত্যাদির মাঝখানে সে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে অথবা গাড়িচাপা পড়তে পারে।

আর আশ্চর্য, আমি যেমনটি ভেবেছিলাম, ঠিক তেমনি ঘটে গেল এক বিকেলে। মানে অবশেষে সত্যি সত্যি সেই দিনটি আসে, যেদিন আমার পুত্র বুদবুদের পেছনে পেছনে ছুটে সমস্ত অঞ্চল তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাকে পায় না। না পেয়ে সন্ধ্যার পর বিমর্ষ মুখে একাই ঘরে ফিরে আসে। ওর নীল রঙের টয়োটা ক্যামরি গাড়ির পাশের সিট আজ খালি। সম্রাজ্ঞীর মতো বসে জানালা দিয়ে শহর দেখছে না বুদবুদ। বুদবুদ হারিয়ে গেছে। তাকে আজ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কানামাছি কানামাছি খেলতে গিয়ে আজ নিজেই হয়তো কোথায় কানামাছি হয়ে হারিয়ে গেছে।               এ-অঞ্চলের ভেতরে ও আশপাশের রাস্তাগুলো বড় বিদ্ঘুটে। লম্বা লম্বা ও সিধে নয়। প্রতিটি রাস্তা গোল গোল করে বেঁকে গিয়ে অন্য এক রাস্তায় গিয়ে পড়ে একরকম গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছে। এই জটিল বিন্যাসের সড়কগুলো ভালোমতো চেনা না থাকলে কাছাকাছি থাকলেও নিজের ঘরে ফিরে আসাই শক্ত। তার জন্যেই হয়তো ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বুদবুদ ফিরে আসতে পারছে না। পুত্র আমার সন্ধ্যার পরও অনেকক্ষণ খুঁজেছে তাকে। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো গাড়ি চড়ে। তারপর অন্ধকার গাঢ় হলে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছে সে। এ অসময়ে কারো বাড়ির সামনে বা পেছনের বাগানে ঢোকা যায় না কুকুরের খোঁজে। এদিকে আমি এবং আমার স্ত্রীও বাড়ির দুদিকে দুজন পায়ে হেঁটে গিয়ে সারাটা সময়েই বুদবুদের নাম ধরে ডেকে তাকে খুঁজে বেড়িয়েছি। রাতে কিছু না খেয়ে ছেলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার আগে কেবল বলে, কাল খুব ভোরে উঠে গিয়ে আবার খুঁজবে। পুলিশকে, গৃহপালিত পশুদের শেল্টারগুলোতে খবর দেওয়া হলো। পুলিশ আশ্বস্ত করল, হয়তো কোনো দয়ালু, ভালো মানুষ খোঁজ পেয়ে ফেরত দিয়ে যাবে বা ফোন করবে। গলায় রঙিন কলার-বেল্টের সঙ্গে ছোট্ট একটি ঘুঙুর ও কয়েকটি ধাতব চাকতির মতো লকেটে তার নাম, জলাতঙ্ক ও অন্যান্য জরুরি টিকার তারিখ, মালিকের নাম,  ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব দেওয়া আছে। এছাড়া সে এই দেশের রেজিস্টার্ড কুকুর। তার ঘাড়ের ভেতর চামড়ার নিচে রেডিওঅ্যাক্টিভিটি দিয়ে খোদাই করে একটা নাম্বার দেওয়া আছে, যার থেকে তার সব তথ্য বের করা সম্ভব। কিন্তু কথা হলো, যদি প্রাপক কুকুরটিকে ফেরত দিতে চায় তবেই না সে সব তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবে! এমন সুন্দর কুকুর পেলে কেউ কি ফেরত দেবে? ছবিসহ খবরের কাগজ ও লাইটপোস্টে বিজ্ঞাপন কিছুই বাকি থাকেনি। বহুদিন পর্যন্ত আমরা আশায় থাকতাম কেউ নিয়ে আসবে সঙ্গে করে আমাদের বুদবুদকে। জিজ্ঞেস করবে, ‘এটা আপনাদের কুকুর?’ অথবা সে নিজেই খুঁজে পেতে একদিন ঠিক বাড়িতে চলে আসবে। এসব কথা ভেবেই বুঝি, আশায় আন্দোলিত হয়ে সময়ে-অসময়ে সামনের সদর দরোজা খুলে আশপাশে, ঝোপঝাড়ে তাকে খুঁজত আমার স্ত্রী। বুদবুদের নাম ধরে ডাকত। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরত তখন।

দুই

বুদবুদ হারিয়ে যাবার পর আমাদের জীবন বেশকিছু দিনের জন্য কেমন যেন থমকে গিয়েছিল। সবাই স্থবির হয়ে পড়েছিলাম। এর চেয়ে কোনো কঠিন অসুখে ভুগে, চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পর যদি বুদবুদ মরে যেত,  তাহলেও বোধ হয় যন্ত্রণাটা কিছুটা কম হতো। বুদবুদ এমন উলোটপালোট করে দেয় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছু যে, অনেক দিন পর্যন্ত আমরা পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তায় পারতপক্ষে তার নাম উচ্চারণ করতাম না। বুদবুদের ব্যবহৃত সব জিনিসপত্র আমাদের পুত্র ঘর থেকে সরিয়ে ফেলে। বিশেষ করে আমার স্ত্রীর মানসিক অবস্থা ভেবে। বুদবুদের জন্য সে মাঝেমধ্যেই এমন উচ্চস্বরে বিলাপ করে কাঁদতে শুরু করে যে, তা দেখে আমি ও পুত্র ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। অবস্থা যতই সঙ্গিন বা শোচনীয় হোক না কেন, আমার স্ত্রীর অনুভূতির প্রকাশ  থাকত বরাবরই নিয়ন্ত্রিত ও শালীন। আমার জীবনে আমি আর কখনো তাকে এমন ভেঙে পড়তে দেখিনি। অসময়ে তার বাবা মারা যাবার পরও নয়। যে বাঞ্ছিত কন্যা জীবনে ধারণ করা সম্ভব হয়নি, বুদবুদ এক রকম করে সেই খালি জায়গাটাই বোধ হয় দখল করে নিয়েছিল তার।

জীবনকে সহনীয় করে তুলতে, বুদবুদের চিহ্ন মুছে ফেলে দিতে, এক-এক করে দেয়াল ও অ্যালবাম থেকে বুদবুদের সব ছবি নামিয়ে নেওয়া হয়। সবই করে আমাদের পুত্র যে নিজে দিনের পর দিন ডজন ডজন কুকুরের মৌলিক ও শংকর জাতির চেহারা ও বৈশিষ্ট্য পড়ে ও জেনে এবং নিজ চোখে শত শত কুকুর দেখে নিজের হাতে দু-সপ্তাহ বয়সী বুদবুদকে পছন্দ করে কিনে এনে তুলেছিল ঘরে নেব্রাস্কার একটা নামকরা ফার্ম থেকে। গত সাড়ে পাঁচ বছর ২০ এপ্রিল বুদবুদের জন্মদিন পালন করতে সে একবারো ভোলেনি। ঘরময় ছড়ানো বুদবুদের সব ছবি সরাবার পর সবশেষে সে ঢোকে আমাদের শোবার ঘরে। সেখানে দেয়ালে আমাদের তিনজনের মাঝে বুদবুদের এনলার্জ করা ভারি জ্যান্ত একটা ছবি তখনো টাঙানো। কিন্তু ওটার গায়ে আমার স্ত্রী কাউকে হাত দিতে দেয় না।

‘তোমরা কী মনে করেছ বলো দেখি? তোমাদের ব্যবহার দেখে মনে হয় ও কোনোদিন এখানে ছিল না। যেন জ্যান্ত কোনো প্রাণী নয়, পোস্টারের একটা ছবি কেবল। ওকি একটা কল্পনা? আজ না হয় নেই। কিন্তু ও তো ছিল একদিন! এই বাড়িতেই। না কি?’ আমরা চোখ চাওয়াচাওয়ি করি, কিন্তু ছবিখানা নামানো দূরে থাক, স্পর্শ করার সাহসও হয় না। ওটা আজো আমাদের শোবার ঘরে দেয়ালজুড়ে শোভা পায়।

এর ভেতর বছর না ঘুরতেই ছেলে কলেজে চলে যায়। আমিও যতটা সম্ভব প্র্যাকটিস গুটিয়ে আনি। দুটা কি তিনটা জীবন, একটি সংসার চালানোর জন্য আর কত টাকা লাগে! গ্রুপ প্র্যাকটিসের মজা তো এটাই। অনেক রকম চয়েস থাকে। তবে শহরের প্র্যাকটিস কমিয়ে দিলেও আগের মতো শনি-রোববারগুলোতে নববই মাইল ড্রাইভ করে উত্তরের সেই পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট ক্লিনিকটাতে নিয়মিত ঠিকই যাই। যাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচার জন্য। এই কোলাহলপূর্ণ বড় শহরের নষ্ট বায়ু ছেড়ে নির্মল বাতাস বুকভরে টেনে নেওয়ার জন্য। দীর্ঘ জীবন ধরে আস্তে আস্তে তলানিতে যত ক্লেদ, গ্লানি, বিতৃষ্ণা, ক্লান্তি, হতাশা জমা হয়েছিল, এখন নিচ থেকে তা ধীরে ধীরে উঠে এসে সাগরে পড়া জাহাজের পোড়া তেলের মতো হৃদয়ের ওপরের স্তরে ভাসতে থাকে। আটান্ন বছর বয়সী শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ আমি যখনই রাজধানী ছেড়ে ওই ছোট্ট গ্রামীণ শহরটাতে যাই, প্রতিবারই নতুন করে অনুভব করি, এখনো বেঁচে আছি। জীবনটাতে সুন্দর, হালকা, ফুরফুরে আনন্দ বলে কিছু রয়েছে। সপ্তাহান্তে দুদিনের এই নির্জনবাস, এই নিরিবিলি, নৈঃশব্দ্য, শান্ত পরিবেশ – এর চেয়ে শ্রেয়, এর চেয়ে শান্তির বুঝি কিছু নেই। হোতে পারে না। এখানে এলেই মনে হয়, জীবন থেকে ভালোলাগার বস্ত্তর পুরোপুরি নির্বাসন ঘটেনি। আর তাই শনিবার হলেই ছুটে আসি। শুধু সহজ-সরল পাহাড়বাসী রোগীদের জন্যই নয়, একা একা মুক্তমনে ড্রাইভ করতেও ভারি মজা লাগে। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসার কথা মনে হয় না আমার। সারাদিন তো ক্লিনিকেই থাকি, সঙ্গে এলে হোটেল রুমে করার কীই-বা থাকত তার! সে নিজেও আসার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেনি কখনো। তাছাড়া আমি মনে করি প্রতিটি মানুষেরই কিছুটা নিজস্ব সময় থাকা দরকার – একা নিজের মতো করে থাকা দরকার। এই স্পেসটুকু না থাকলে মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে। নিদারুণ সংসার, পরিচিত ভুবন ফেলে তাই কেউ কেউ পালিয়ে আসে, হোক তা দুদিন বা দু-ঘণ্টার জন্য। নিজেকে সতেজ ও সবুজ করে তুলতে এটুকু ছাড় দিতে হয় নিজেকে, মনে মনে নিজেকে বোঝাই আমি। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট এই জায়গাটিতে সপ্তাহের ওই ছত্রিশ ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্ত আমি টের পেতাম, আমি একেবারে শেষ হয়ে যাইনি। আমি স্পষ্ট বুঝতাম, একটি মারাত্মক একঘেয়ে, নিরানন্দ জীবন টেনে বেড়ানোর কোনো অর্থ হয় না। কারো জন্যই। আমার আরো অনেক আগেই বেরিয়ে পড়া উচিত ছিল।

এক সন্ধেয় স্ত্রীর রেঁধে দেওয়া খাবারের সঙ্গে ওই ক্লিনিকের রেজিস্টার্ড নার্স মনিকার ঘর থেকে রেঁধে আনা খাবার একত্রে করে আমার জন্য বরাদ্দ করা সপ্তাহান্তের নির্ধারিত হোটেল রুমে বসে দুজনে ডিনার খাচ্ছিলাম। এটিই এখানে বসে প্রথম মনিকার সঙ্গে একত্রে আহার গ্রহণ নয়। কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে আমরা খাচ্ছি। কী বলে একচোট হাসাল আমাকে মনিকা। নেপথ্যে মৃদু আওয়াজে জুবিন মেহেতার কনসার্টের রেকর্ড বাজছে হোটেলের স্টেরিওতে দূরের কোনো এএম রেডিও স্টেশন থেকে। খাওয়া শেষে প্লেটগুলো ডিশ ওয়াশারে দিয়ে সোফায় এসে বসে মনিকা। সামনের অটোমনে পা দুটো বিছিয়ে। মনিকাকে দেখলে মনে হয় ওর মধ্যে যেন কোনো টেনশন নেই, সর্বদা কেমন এক প্রশান্তির ছায়া সমস্ত অবয়বজুড়ে। বন্ধ টেলিভিশনের সামনে বসে বসে আনমনে বাঁ কপালের ওপরের ছোট চুলগুলো ডান হাতের তর্জনীতে একবার পেঁচাচ্ছে, একবার খুলছে সে। সাঁইত্রিশ বছরের মনিকার ছিপছিপে অ্যাথলেটিক স্বাস্থ্য ও পূর্ণ যৌবন তার খাটো স্কার্ট আর সিল্কের ব্লাউজে উদ্ভাসিত হলেও বসার ধরনে তা যথেষ্ট অবগুণ্ঠিত। গানের তালে তালে পা নাড়াচ্ছে মনিকা। আমার হঠাৎ মনে হলো, এত বছর ধরে যে জীবন আমি যাপন করছি, তা আমার হবার কথা ছিল না। আমি টের পাই, জীবন অতিসংক্ষিপ্ত ও অনিশ্চিত। সে-সন্ধ্যায় বা বিকেলে কোনো মদ্যপান করিনি আমরা। আমি সম্পূর্ণ সজাগ ও সতেজ। কিন্তু অতি আকস্মিকভাবেই আমি স্থির করে ফেলি, সম্পূর্ণ একা একাই স্থির করি, এই পাহাড়ি ঝরনাস্নাত ছোট্ট উপশহরেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। এই মাসের শেষ সপ্তাহে যখন আসব এখানে আর কোনোদিন ওই মহানগর, পরিচিত বাড়ি, বা গ্রুপ প্র্যাকটিসে ফিরে যাব না। শহরের বাড়িঘর, গাড়ি, ব্যাংকে যত টাকা সব ভাগ করে দিয়ে দেব স্ত্রী-পুত্রকে। আমি জানতাম মনিকা লাফিয়ে উঠত কথাটা শুনলে। কিন্তু আমার এই পরিকল্পনা আজ প্রকাশ করার ইচ্ছে হলো না। এমন কি মনিকার কাছেও নয়। আমি নিশ্চিত যা করতে যাচ্ছি, সেটা প্রধানত নিজের কথা ভেবেই। সব জেনেবুঝে কেউ যদি পাশাপাশি চলতে চায়, বিশেষ করে মনিকার মতো উচ্ছল এক নারী, বাধা দিই কী করে? সেই ছোটবেলা থেকে মা, ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব নেওয়া থেকে শুরু করে আজো সংসারের একটানা-একঘেয়ে ঘানি টেনে বেড়াচ্ছি। অথচ দিন-রাত্রি কেবল নিজের অক্ষমতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান জীবনের ধরন – এখনকার বেঁচে থাকা। আমি ভেবে দেখি, অন্যদের জন্য এক গোটা জীবনের প্রায় সবটাই উৎসর্গ করে দিয়েছি। আর যে-কদিন বাঁচব,  নিজের মতো করে বাঁচার ইচ্ছা। মনিকা এই জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হলেও সব নয়। শুধু তার জন্য আমি ঘর ছাড়ছি না।

সিদ্ধান্তটা নিয়ে কিছুটা উৎফুল্ল ও হালকা মনে ঘরে ফিরি পরদিন।

গত কিছুকাল ধরে আমার স্ত্রীর সিঁড়ি ভাঙতে বা হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। অস্টিও বা রিমোটয়েড আর্থ্রাইটিস, এ বয়সে বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে খুব কমন ভেবে ব্যথার ওষুধ ও অ্যান্টাই ইনফ্লেমমেটরি বড়ি দিচ্ছিলাম। সে সঙ্গে জয়েন্টের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যে গ্লুকোসোমাইন, কন্ড্রাইটিস, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি। উপশম না হওয়ায় অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে। গত দু-সপ্তাহ ধরে তার যে অগুনতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল, একে একে সেসব পরীক্ষার ফল আসতে শুরু করে। আজকের ফল দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই। যা ভাবা গেছিল তার চেয়ে বিস্তর খারাপ ও জটিল অবস্থা। মাল্টিপল স্কেরোসিস। ধীরে ধীরে আরো খারাপ হবে শারীরিক অবস্থা। প্রোগ্রেসিভ ডিজেনারেটিভ অসুখ। ভবিষ্যতে ভালো হবার কোনো আশা নেই। আর কিছুকাল পরই হুইল চেয়ার ছাড়া চলাফেরা করা যাবে না।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা এখন আমার। ভাবার বেশি কিছু ছিল না। অতঃপর, শহরের গ্রুপ প্র্যাকটিস নয়, ঝরনাস্নাত পাহাড়ি শহরই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। স্ত্রীর পক্ষে একা বাস করা আর সম্ভব নয়। তার দেখাশোনার জন্য সার্বক্ষণিক একজন বিশ্বস্ত লোক দরকার। পুত্র এ-বছরই কলেজ শেষ করবে, তাই বলে কলেজ পাশ করে ঘরে বসে মায়ের সেবা করবে না সে, বলাই বাহুল্য। কেউই করে না। অন্তত এই সংস্কৃতিতে। আমার স্ত্রী অবশ্য বারবারই লং টার্ম কেয়ারের জন্য নার্সিংহোমে চলে যাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। তার অসুস্থতার জন্য আমি সুস্থ মানুষ কেন এমন কঠিন জীবনযাপন করব? এর সঠিক উত্তর আমিও জানি না। তবে ওই ঝরনাতলার ক্লিনিকে বা ওই পাহাড়তলির শহরে আর কখনই আমি ফিরে যাইনি। সপ্তাহ ও সপ্তাহান্ত উভয়ই কাটে এখন এই বাড়িতেই, মাঝেমধ্যে দু-একটি রোগী দেখা ছাড়া। গ্রুপ প্র্যাকটিসও এক রকম ছেড়েই দিয়েছি, নামটা যদিও রয়েছে সেখানে। ফলে মাঝেমধ্যে  দু-একটা কেস নিই। এভাবেই কেটে গেছে গত পাঁচ বছর। মনিকা এসেছিল বার দুয়েক। টুকটাক কথা বলে বিদায় নিয়েছে। অনেকদিন সে আর আসে না এদিকে।

 

তিন

অফিস থেকে মোবাইল ফোনে খবর পেয়ে আর জরুরির মাত্রাটা বেশি দেখে দেরি করি না। প্রথমে গাড়ি নিয়ে যাবার কথাই ভেবেছিলাম। পরে জিপিএসের ম্যাপ ও দূরত্ব দেখে বুঝলাম জায়গাটা আমার বাড়ির একেবারে কাছে, আধ মাইলেরও কম। ফলে বিকেলের হাঁটা ও রোগী দেখা দুটোই হবে ভেবে ছোট্ট ডাক্তারি ব্যাগটা হাতে নিয়ে হেঁটেই রওনা হলাম। এমনিতেই তো উলটো যাত্রা। হাউস কল প্রায় কেউ করে না। সে প্রথা প্রায় উঠে গেছে। রোগী দেখতে ডাক্তাররা বাড়ি বাড়ি আর ছোটে না এখন। দরিদ্র দেশে গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু তা আজো চালু থাকলেও এখানে প্রায় নেই। রোগীর পক্ষে চলাফেরা করা একান্ত অসম্ভব হলে বড়জোর নার্স অথবা ডাক্তারের সহকারী আসতে পারেন। তার চেয়ে অনেক বেশি চালু, তেমন গুরুতর কিছু হলে সরাসরি ৯১১ কল করে অ্যাম্বুলেন্সে ইমার্জেন্সিতে চলে যাওয়া। কিছুক্ষণ আগে টেক্সট মেসেজের সারাংশে বুঝি রোগীর অবস্থা তেমন গুরুতর নয় – নতুন বা আকস্মিক কোনো উপসর্গও নয়, বাড়াবাড়ি হাঁপানি। কিন্তু সে হাসপাতালে কিছুতেই যেতে চায় না। ভয় তাকে সারারাত ধরে রাখবে হাসপাতালে। অথচ ঘরে তার দেখাশোনার জন্য কেউ নেই। সে একা।

অাঁকাবাঁকা রাস্তায় একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, একবার হারিয়ে, পুনয়ায় সঠিক পথ বের করে অবশেষে নির্দিষ্ট বাড়িতে এসে পৌঁছি। ছোট্ট দোতলা বাড়ি। সামনের দরজায় টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে। লনের ঘাস বেশ বড় হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ঘন আগাছা-ঝাড়ে অবহেলিত ফুলের উঁকিঝুঁকি, প্রধানত ড্যান্ডেলায়নের হলুদ ফুল। সামনের  দরোজায় বেল বাজালে ভেতর থেকে খড়খড়ে গলায় ভেসে আসে দুটি শব্দ, ‘দরজা খোলা’।

বুঝি আমার অপেক্ষাতেই বসেছিল সে। ঘরে ঢুকে স্বল্প আলোতে বাইরের ঘরের মাঝখানে পাতা একটি ডাবল বেডে এক বৃদ্ধকে একটি সাদা চাদর গায়ে শুয়ে থাকতে দেখি। তার শিয়রের কাছে বসে আছে একটি কুকুর। বালিশের ওপর বসে সামনের এক পা পরম আদরে বুড়োর কপাল স্পর্শ করে আছে। আমি হঠাৎ ভীষণ চমকে যাই। তারপর গায়ে চিমটি কেটে নিজেকে স্থির করে নেওয়ার চেষ্টা করি। মনে হয় একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেয়ে জ্বর ছাড়ল। আমার মনে হলো সেই প্রতিষ্ঠিত সত্যের কথা। এই জাতের মানে জাপানিজ শিবা ইনো জাতের সব কুকুরেরই মুখের আকৃতি ও চোখের গড়ন একদম এক রকম। লম্বাটে মুখ ও বাদামি-সাদায় (ক্বচিৎ সাদা-কালোয়) শিবা ইনোরা প্রত্যেকে দেখতে প্রায় এক রকম আইডেন্টিকেল টুইনের মতো। হঠাৎ দেখলে তাদের খেঁকশিয়াল বলে ভুল হয়। আমার পুত্র এই জাতের কুকুরের ওপর ছবিসহ বেশ কয়েকটি বই, ক্যালেন্ডার ও ডায়েরি কিনেছিল, যা থেকে এই সত্য আবিষ্কার করেছিলাম। প্রতিটি কুকুরকেই বুদবুদ মনে হতো।

বৃদ্ধের কুকুর কিন্তু আমাকে দেখামাত্র বিছানা ও বালিশ ছেড়ে দৌড়ে ছুটে আসে আমার কাছে। কুঁইকুঁই শব্দ করতে করতে আমার পা, হাত চাটতে শুরু করে পাগলের মতো। বৃদ্ধ প্রবল হাঁপানির টানের মধ্যেও অতিকষ্টে মাঝেমধ্যে দম নিয়ে বলে, ‘তোমাকে দেখছি সে খুব পছন্দ করেছে। সাধারণত কোনো অপরিচিত মানুষ দেখলে ভীষণ রেগেমেগে উত্তেজিত হয়ে প্রাণপণে চেঁচায়।’

আমার সমস্ত বুকে তখন তোলপাড়। কোনোমতে বলি, ‘শিবা ইনো। এরা সত্যি অসাধারণ।’

‘তোমার কুকুরও বুঝি শিবা ইনো?’

আমি ততক্ষণে দেখতে অবিকল বুদবুদের মতো, আরেকটু ক্ষীণকায়, বৃদ্ধের কুকুরটিকে দুহাতে ধরে কোলে তুলে নিই। তা করার আগে অবশ্যই কুকুরের মালিকের অনুমতি নিয়ে নিই তাকে ছোঁয়ার। বৃদ্ধের প্রশ্নের উত্তরে বলি, ‘আমার একটি শিবা ইনো কুকুর ছিল।’

‘আমি দুঃখিত। না বুঝে তোমাকে কষ্ট দিয়ে দিলাম বলে। এটা সত্যি খুব পরিতাপের বিষয় যে, ওরা এত মিষ্টি, কিন্তু বেশিদিন বাঁচে না।’

‘আমার কুকুরটি হারিয়ে গেছে।’ আমি বৃদ্ধের কথা বা ধারণা দৃঢ়ভাবে সংশোধন করে দিই।

ততক্ষণে শান্তভাবে আমার কোলে বসা কুকুরটিকে ভালো করে দেখি। আশ্চর্য সাদৃশ্য! কিন্তু তার বাঁ চোখের ঠিক নিচে একটি ছোট্ট কালো বৃত্ত দেখে আমার আর সংশয় থাকে না। সাদা-বাদামি কুকুরের গায়ে এই অনন্য একটিমাত্র কালো স্পট বুদবুদকে আর সব শিবা ইনো থেকে আলাদা করত। খবরের কাগজের হারানো বিজ্ঞাপনেও তার মুখমন্ডলের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ ছিল। আমি আরো শক্ত করে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরি কুকুরটিকে, ওর নিশ্বাস-প্রশ্বাস, বুকের ঘড়ঘড় আওয়াজ স্পষ্ট টের পাই। সেও তখন তাঁর চরম আদর দেখাতে আমার গাল, কপাল, গলা চেটে দেয়। আমি ওকে খাটে নামিয়ে দিই।

বৃদ্ধের পুরনো হাঁপানির জন্য তেমন কিছু করার ছিল না। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আনার ও বিছানা, জামা-কাপড় ধুলামুক্ত করে রাখতে হবে। এছাড়া এই ধরনের ঋতুভিত্তিক অ্যালার্জিতে কী-ইবা করার আছে? অবস্থা এতটা সংকটাপন্ন নয় যে, অ্যাড্রিনালিন ইনজেকশন দিতে হবে। আমি তার বুক, পিঠ ভালো করে স্টেথিস্কোপ দিয়ে দেখলাম। তারপর ব্লাড প্রেসার, শরীরের তাপমাত্রা, হৃৎপিন্ডের গতি মেপে তাকে ঘরের ভেতর সার্বক্ষণিকভাবে, অন্তত রাতের বেলায়, একটি হিউমিডিফাইয়ার চালিয়ে রাখতে বললাম। আর ২৪ ঘণ্টায় তিন থেকে চারবার ইনহেলার নিতে বললাম। কুকুরটি তখনো আমার পাশে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে আমার মুখের দিকে।

‘তোমার কুকুরের নাম কী ছিল?’ বৃদ্ধ আবার প্রশ্ন করে।

আমি একটু ভাবি। বলি, ‘ওকে অতীতকালের প্রাণী হিসেবে আমরা এখনো দেখি না। তোমার ওই ‘ছিল’ শব্দটা কানে বড্ড লাগছে আমার। যাই হোক, ওর নাম বুদবুদ।’ পরে আবার অনুবাদ করে বলি, ‘বাবল্স্’।

তারপর নিজের কাছে নিজেই বলছি এমনি স্বরে নিচু গলায় বলি, ‘বুদবুদ। বুদবুদ।’

আমার মুখে ওই বিশেষ শব্দটা দুবার উচ্চারণ করতে শুনে খাট থেকে এক লাফে আবার আমার কোলে চলে আসে কুটুরটি। বিক্ষুব্ধ-বিস্মিত বৃদ্ধ খাটের ওপর শোয়া থেকে উঠে বসে। আর তার কুকুর পরম আদরে তার মাথাটি গুঁজে দেয় তখন আমার বুকে। আমি বৃদ্ধের চোখে-মুখে অস্বস্তির ও অস্থিরতার  চিহ্ন দেখি। নাকি ওটা আতঙ্ক? সে অনবরত কাশতে শুরু করে।  কাশতে কাশতেই সে তার কুকুরকে ডাকে, ‘টিলা, টিলা, এদিকে আয়।’

আমার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা কুকুর একবার বৃদ্ধের মুখের দিকে, একবার আমার মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু নড়ে না।

আমি আস্তে ওকে বৃদ্ধের মাথার কাছে নামিয়ে দিই।

‘দরজাটার দিকে একটু লক্ষ করবেন? আমি যাচ্ছি। টিলা আবার না পালায়।’

‘না, পালাবে না। তুমি দরজা হাট করে খুলে রেখে যাও। ও তবু যাবে না। আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না টিলা।’ একটু চুপ করে থেকে বৃদ্ধ বলে, ‘ঘরে যা গরম! তুমি সত্যি সত্যিই দরজাটা খুলে রেখে যাও। আমি পরে বন্ধ করে দেব। এ-পাড়া সেইফ। তেমন ভয় নেই। তাছাড়া আছেইবা কী ঘরে যে চোর আসবে?’

আমি হিসাব করে দেখলাম, বুদবুদের মানুষ সমতুল্য বয়স এখন প্রায় পঁচাত্তর-আশি। বুদবুদেরও যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আমি বৃদ্ধের ঘরের সামনের দরজার দুটি পাটই টানটান খোলা রেখে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসি। বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর একবার ফিরে তাকাই। স্বল্প আলোকে দেখি পা থেকে গলা পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢাকা বৃদ্ধ জোরে জোরে হাঁপানির দম নিচ্ছে। হাঁপরের মতো বড় বড় নিশ্বাসের সঙ্গে বুকের পুরো খাঁচাটা প্রবলবেগে ওঠানামা করছে। আর শিয়রের কাছে বালিশের ওপর চুপ করে বসে আছে কুকুরটি।

সে এখন সম্পূর্ণ মুক্ত। তাকে কোনো কিছু দিয়ে কারো সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়নি। ঘরের দরজাও বন্ধ নয়। তা সত্ত্বেও, খোলা দরজা পেয়েও ঘর ছেড়ে পালাবার ব্যাপারে আজ কোনো আগ্রহ দেখা যায় না শিবা ইনোর।

শেয়ার করুন

Leave a Reply