রঙের অক্ষরের ছবি

লেখক: সেলিনা হোসেন

সামাদিনের কাছে দূর-দূরান্তের পথ মানে বুনোফুলের গন্ধ। সেই পথে হাঁটলে গন্ধের ছবি আঁকা যায়। নিজের জীবনযাপনকে ও এভাবে সাজিয়ে নিয়েছে। যখন-তখন বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। চলে যায় দূরে কোথাও। বন্ধুদের বলে, এভাবে আনন্দে দিন কাটাই। আমার আনন্দ তোদের মতো নয়। আমি আনন্দ খুঁজি পথে-প্রান্তরে। পথ-প্রান্তর আমাকে গন্ধের ছবি আঁকায় ভরিয়ে দেয়।

বন্ধুরা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, গন্ধের আবার ছবি কী?

ও নিজেই হা-হা করে হেসে নিজেকেই প্রশ্ন করে, গন্ধের আবার ছবি কী? নিজেকেই বলে, বুঝবে না তুমি। এসব বুঝতে অন্যরকম মেধা লাগে। সবার মেধায় ধরা পড়ে না।

– বুঝেছি, তোমার মেধা পাগলের মেধা। যার কোনো স্পষ্ট দিক নেই।

– পাগলের মেধা নিয়ে তুমি কতদূর যাবে?

– যাব লম্বা পথ। যাব উৎসবের রথযাত্রায়, যে-উৎসব দেখতে ছুটে যাই মণিপুরিদের মাঝে। ওদের রাস উৎসব আমার সৃজনের আনন্দ। জীবনের ক্যানভাসে সে-আনন্দ ফুটে ওঠে।

নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার আনন্দে ও সময় ভরিয়ে তোলে। একা থাকার বিষয়টা মাথা থেকে নেমে যায়। আবার নিজেকেই প্রশ্ন করে, পথে কি শুধু গন্ধ পাওয়া যায়, পথে কি মানুষ থাকে না? নিজেকেই বলে, এর উত্তর তো সহজ। পথ মানে মানুষের পদশব্দ। হা-হা হাসিতে নিজেকে ভরিয়ে তুলে বলে, শিল্পীর কাছে পথ তো এমনই হবে – গন্ধ আর শব্দ। এ দুয়ের সঙ্গে পুরোপুরি বাকিটুকু মিলে শিল্পের ক্যানভাস। এভাবে সামাদিন নিজের মনের বিশাল ক্যানভাস ভরিয়ে তোলে রঙের অক্ষরে।

ওর কাছে রংই অক্ষর।

রংকে অক্ষর বলতে শুনলে বন্ধুরা বলে, তোর কল্পনা হাতি। বিশাল আর ভোঁতা।

খবরদার হাতি বলবি না।

– বলব, একশবার বলব। তোর কাছে কি মানুষও অক্ষর।

– না, আমি মানুষকে অক্ষর বলি না। মানুষকে বলি রং। সব রঙের ক্যানভাস মানুষ।

– তাহলে ফুল-পাখি কী?

ও খেপে উঠে বলে, এত কথা জিজ্ঞেস করবি না। যখন যা মনে আসে তখন তা বলব। এত নির্দিষ্ট করে রাখি না।

– বল তো এই জিনিসটা কী?

– মার্বেল।

– মার্বেল? বন্ধুরা তিক্তকণ্ঠে বলে। এটা মার্বেল না।

– মার্বেলই। মার্বেল রঙিন এবং গোল। গড়াতে গড়াতে যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে। সমুদ্রে বা আকাশে। চাঁদ কিংবা মঙ্গলগ্রহে। আফ্রিকা কিংবা ল্যাটিন আমেরিকায়।

– কী বলছিস? বন্ধুদের চোখে কৌতূহল।

– ঠিকই বলছি। ও তো ওইভাবে গড়াতে গড়াতে সব জায়গায় পৌঁছে যাবে।

– শালা। চিন্তাও করতে পারে।

– তোরা সব ভাগ এখন। এখন আমার ক্যানভাসে অক্ষর ফুটবে।

– ঢাকা ছেড়ে ভাগবি কবে?

– ঠিক নাই। যখন খুশি তখন।

– বাপের টাকা থাকলে আমরাও তোর মতো জীবন কাটাতে পারতাম।

– পারতি না।

– পারতাম না?

– কেন?

– কারণ পারাটা অত সোজা না।

– বাহাদুরি দেখাচ্ছিস।

– বাহাদুরি দেখানোর মতো সাহস আছে তো। দেখাব না? তোদের কাছে সময় কুঁকড়ে থাকা বাদুড়। ঝুলে থাকে গাছের ডালে।

– আর তোর সময়?

– আমার সময় পথের অক্ষর। লিখতে লিখতে হাঁটতে পারি।

– শালা। বন্ধুরা দাঁত-মুখ খিঁচায়।

– খবরদার গালি দিবি না। ভাগ তোরা। নইলে তোদেরকে রং ছিটিয়ে ভূত বানাব।

– শালা! যাচ্ছি আমরা।

হা-হা করে হাসতে হাসতে ওরা বেরিয়ে যায়। সোহেল আবার ফিরে এসে বলে, ‘ঠিক করে বল আমরা কী?’

– টুনটুনি, ময়না।

– ধুত, এটা হলো না।

– তাহলে প্যাঁচা। শকুন।

– শালা। সোহেল দপদপিয়ে বেরিয়ে যায়।

সামাদিন নিজের আঁকা ছবির সামনে দাঁড়ায়। ভাবে, এটা আর আঁকা হবে না। বুকের ভেতর পথের শব্দ জেগে ওঠে। সেইসঙ্গে বুনোফুলের সৌরভ। বুঝে যায় বাড়ি ছাড়ার ডাক এসেছে। পথে পথে ঘোরা আর ক্যানভাসে রং লাগানো ওর জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।

ঘুরে বেড়ানো ওর স্বভাব। শুধু স্বভাব না, নেশাও বলা যায়। প্রাণের টানও বলা যায়। ওর মনে হয় সজীব-সতেজ দিন কাটানোর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় উপায়। পথে যদি দুঃখ সঙ্গী হয়, তারপরও দিন দুঃখে ডোবে না। সতেজই থাকে। ওর কাছে এটাই বেঁচে থাকার সহজ উপায়। বলতে চায় উজ্জ্বল উদ্ধার। সামাদিন নিজের ভালোবাসার আলোকে বেঁচে থাকার সঙ্গে খুনসুটি করে। এটা-ওটা বলে মজা পায়। এসবও সামাদিনের আনন্দের জায়গা। ও ক্যানভাসে হাতের সঞ্চালন ঘটায়। ফুটে উঠতে থাকে রং। রঙের সঙ্গে চিত্রের আকার নারীর অবয়ব। অথচ এখনো কাউকে ভালোবাসার কথা বলা হয়নি। তাতে ওর মন খারাপ নেই।

অনেক রাত পর্যন্ত ছবি আঁকে।

রাতের খাবারের জন্য দুবার তাগাদা দিয়েছে হালিম। একপর্যায়ে মুখ গম্ভীর করে কথা বলেছে। সামাদিন ধমক দিয়ে বলে, চা নিয়ে আয়।

– এত চা খেলে রাতে ঘুম হবে না।

– সেটা তোর দেখার বিষয় নয়।

– হ্যাঁ, আমারই দেখার বিষয়। আপনাকে আর কে দেখবে?

– কী বললি?

– ঠিক বলেছি। তেরো বছর ধরে এই বাড়িতে আমি তো একলাই আছি। আপনি যখন ঘুরতে যান তখনো বাড়ি পাহারা দিই।

– বেশি কথা বলছিস।

– ঘুরতে তো সাতদিনের জন্য যান না। কখনো ছয় মাসও থাকেন।

– সেটা আমার খুশি। তোর কী? তোকে তো না খেয়ে থাকতে হয় না।

– না খেয়ে থাকতে হলে তো চোর হতাম।

সামাদিন হা-হা করে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে বলে, এজন্য তোকে ভালোবাসি। তুই মজা করে কথা বলিস। মনে হচ্ছে আজকে তোকে ফুর্তিতে পেয়েছে।

– আমি দোতারা বাজিয়ে গান গাইতে পারি। ফুর্তি আমার সারাক্ষণের সঙ্গী।

– হ্যাঁ, দারুণ লাগে তোর গান শুনতে। মনে হয় আমার ছবি আঁকা কোন ছাই। তুই আমার চেয়ে বড় শিল্পী। যা এখন ভাগ।

হালিম দুহাতে তালি বাজাতে বাজাতে নিজের ঘরে যায়। সামাদিন একটু পরে শুনতে পায় ওর গানের শব্দ। ও গাইছে, ভাত খাবে না তো আমার কী – আমি গানের সুর খাই – না ঘুমালে আমার কী – সে তুলির রং খায় – হা-হা-হা – রাত এখন দিনের মতো – কথা কয় – চাঁদ হাসে।

বেশ কিছুক্ষণ গাওয়ার পরে আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে আসে হালিমের কণ্ঠস্বর। মৃদু শব্দে বাজতে থাকে দোতারা। বারান্দার কোনায় বসে বাজাচ্ছে। সামাদিন কান খাড়া করে মনে মনে ভাবে সুরের রেশ ছড়িয়ে যাচ্ছে ওর রঙের অক্ষরে। অক্ষরের আকার বদলাচ্ছে। অবয়ব সমান হয়ে যাচ্ছে এবং ও ছবিতে শেষ পোঁচ দিচ্ছে।

একসময় শেষরাত এগিয়ে আসে। ক্যানভাস ছেড়ে শোবার ঘরে এলে বাবা-মায়ের ছবিটাই ঘরজুড়ে দেখতে পায় ও। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে ও। চোখ বোজে। শুনতে পায় সূর্যরথ বলছে, আপনি অনেকদিন ভানুগাছ আসেননি সামাদিনভাই। কবে আসবেন?

– জানি না তো কবে। গতবার ভানুগাছে যা ঘটেছে তার জন্য আমার আর ভানুগাছ তো যাওয়া উচিত নয় সূর্যরথ।

– হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে আপনি এখানে এসে থাকবেন না। আমি আপনাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাব। আপনার ছবি আঁকার জন্য কোনো সুন্দর জায়গায়।

আচ্ছা তাহলে আমি আসব। শোন সূর্যরথ কাউকে যদি আমার ছবির রঙের মানুষ মনে হয় তখন আমি তাকে নিয়ে আচ্ছন্ন হই। অন্য আর সবকিছু ভুলে যাই। রেণুবালাকে আমি যেভাবে দেখেছিলাম।

ও টের পায় ওর ঘরের চারদিকে ভানুগাছের সেদিনের ঘটনা ফুটে উঠেছে। বাবা-মায়ের ছবি কোথাও নেই। কোনো আসবাবপত্র না। ঘরটা এখন একটা গ্রাম। এই গ্রামের স্কুলে সূর্যরথ ওকে ড্রয়িং মাস্টার করে দিয়েছে।

দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত স্কুলে থাকতে হয়। ঢুকেছিল ড্রয়িং মাস্টার হিসেবে, তবে ইংরেজিও পড়াতে হতো। পড়াতে খারাপ লাগেনি ওর।

 

একসময় রাত ফুরিয়ে যায়। জানালা দিয়ে আলো আসে। ও আর ঘুমুতে পারে না। বাথরুমে অনেকক্ষণ শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। আস্তে আস্তে শরীর শীতল হয়। মনের ভেতরেও স্নিগ্ধতা অনুভব করে। কোথাও ক্লান্তি নেই। ভাবে, রাতের ট্রেনে চলে যাবে শ্যামকুড়ির কাছে। চা-বাগানের সৌন্দর্য এবং মানুষেরা ওর আনন্দের জায়গা। ওদের জীবনে ভিন্ন রং দেখা হয় সামাদিনের।

বাথরুম থেকে বের হলে হালিম বলে, নাস্তা রেডি।

এত ভোরে বানিয়েছিস।

রাতে কিছু খাননি? খিদে পায়নি?

পেয়েছে। ভীষণ খিদে পেয়েছে।

চা বানাব, না কফি?

কফি। গাঢ় করে বানাবি।

হালিম রান্নাঘরে যায়। শাহরিয়ার ড্রেসিং টেবিলের সামনে আসে। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ায়। ঘুরেফিরে নিজেকে দেখে। লাল রঙের টি-শার্ট গায়ে দেয়। ভাবে, সকালে কোথাও বেরোবে। কিন্তু কোথায় সেটা আর ঠিক করা হয় না। টেবিলে এসে কর্নফ্লেক্স খেয়ে ডিম-পরোটা খায়। গাজরের হালুয়া বানিয়েছে হালিম। একটি বাটিতে পরিমাণমতো দেওয়া আছে। সেটাও শেষ করে। তারপর কফির মগ টেনে নেয়।

টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে হালিম বলে, আমি জানতাম খাওয়াটা এমনই হবে। এবার একবাটি ফল এনেছি।

– বেশ। থ্যাঙ্কু।

– আজ কী?

– আজ উৎসব।

– কী উৎসব? বাইরে কোথাও যাবেন?

– হ্যাঁ। আজ রাতের ট্রেনে।

– কোথায়?

– অনেক দূরে।

– জানি তো অনেক দূরে। তবে কতদূরে?

– এসব শুনে তোর কী হবে হালিম?

– মনটা উড়ে যাবে সেখানে। আমি তো কখনো যেতে পারি না সেখানে। মনে মনে সুখ পাওয়া যাকে বলে।

– চোখে না দেখলে শুধু মন দিয়ে কি সব দেখা হয়?

– সব হয় না, একটু হয়।

– ব্যস, ওতেই খুশি থাক।

সামাদিন নিজের ঘরে আসে। কোথাও আর বের হওয়ার চিন্তা করে না। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছায়। যত্ন নিয়ে ছবি আঁকার উপকরণ জড়ো করে। দূরে যাওয়ার আসল প্রাণ তো এখানে।

একসময় ফুরোয় দিনের আলো।

 

সন্ধ্যায় ও কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে ট্রেনে ওঠে। ট্রেন ছাড়ে। মনে হয় কোথাও কেউ বুঝি ঘণ্টা বাজাচ্ছে। মাথার ভেতর ঢং ঢং শব্দ ক্রমাগত বাজতে থাকে।

শ্যামকুড়ির কাছে সামাদিন যখন এলো তখন মানসিক দিক থেকে শ্যামকুড়ি খুব বিধ্বস্ত। তবু শ্যামকুড়ি ওকে বন্ধুর মতো কাছে টেনে নেয়। যত্ন করে এবং একদম নিজের ঘরের মতো থাকতে বলে। সামাদিন বর্তে যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলে না এবং সাতদিনের ভেতরে শ্যামকুড়ির জীবনে যে-ঘটনাটি ঘটে সেটি নীরব দর্শকের মতো দেখে। কোনো সান্ত্বনার কথা নয়, কোনো প্রশ্ন নয়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা নিয়ে এসেছে ভানুগাছ থেকে, এটা সব সময়ে মনে করে। জানতে পেরেছে শ্যামকুড়ির বাবা দেবাজির যখন-তখন অবস্থা। শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে আর যন্ত্রণায় ককায়। কখনো চিৎকার করে কাঁদে। শ্যামকুড়ির মনে হয়, ওর বাবার বোধহয় গগন ফাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা হয়। দেহে শক্তি নেই বলে শুধু পারে না। শ্যামকুড়ির এ-কথা মনে হলে হা-হা হাসি পায়। বুঝতে পারে নিজের ইচ্ছার কাছে পরাজিত হওয়া মানুষের নিয়তি।

দেবাজির বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালে সামাদিন বুঝতে পারে লোকটার জীবনের শেষ ঘণ্টা বাজছে। নিজে নিজে চমকে ওঠে ও। ভাবে, এমন একটি মৃত্যু দেখতে হবে বলে কি কমলাপুর স্টেশনে ও ঘণ্টার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল? ওর ভেতরটা হিমশীতল হয়ে যায়।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি, সঙ্গে দমকা বাতাসের জোর দাপট। বিকেল সত্ত্বেও চারদিকে অন্ধকার। সামাদিনের মনে হয় পরিবেশটা ভুতুড়ে হয়ে উঠছে, গা ছমছম করে। বাইরে বেরোতে পারছে না শ্যামকুড়ি, অন্তত একটা কবিরাজের জন্য ওর মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। দেবাজির মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে। একটু আগে থেমে থেমে কথা বলছিল।

– আমি মরে গেলে এই ঘরে তুই থাকবি শ্যামকুড়ি। ঘর তোর হবে।

– তোমাকে বাদ দিয়ে আমি ঘর চাই না বাবা। আমি হাজার হাজারটা পাতার কুটির বানিয়ে থাকতে পারব বাবা।

– তোর দুদিন বয়সে তোকে কোলে নিয়ে পাত্রখোলা চা-বাগান থেকে আমি এখানে চলে এসেছিলাম।

অসুখের কদিন ধরেই দেবাজি ওকে এসব কথা বলে আসছে। দেবাজি জানে, সে আর বাঁচবে না। তাই শ্যামকুড়িকে আসল ঘটনা বলা দরকার। পৃথিবীর সব মানুষেরই নিজের পরিচয় জানতে হয়। মিথ্যা পরিচয় থাকলে মানুষের জন্ম সার্থক হয় না। শ্যামকুড়ি স্তব্ধ হয়ে থাকে। হাতের আঙুল কামড়ায়। সামাদিন ওর দিকে তাকায় না।

কিন্তু বাবা, তুমি আমাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিলে কেন? আমি তোমার কে?

দেবাজি এতদিন এ-প্রশ্নের জবাব দেয়নি। সামাদিন ভেবেছে দুজনকে রেখে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু গল্পের মতো এই ঘটনা জানার আকাঙ্ক্ষা ওকে চুম্বকের মতো ধরে রেখেছে। পাত্রখোলা বাগান ছেড়ে জরিনের এই আনারস-বাগানের নির্জন প্রকৃতি দেবাজির জন্য আরামদায়ক ছিল। আনারস-বাগানের মালিক তহুর মিয়া ওকে বিশ্বাস করত আপন ভাইয়ের চেয়ে বেশি। দেবাজি একদিনের জন্যও সে বিশ্বাসের বরখেলাপ করেনি। শ্যামকুড়িকেও সেভাবে গড়ে তুলেছে।

বেশ কিছুক্ষণ দেবাজির গোঙানি নেই। চোখ খুলে ডাকে, শ্যাম?

– বাবা?

– জল।

– তোকে আমি পাত্রখোলা চা-বাগানের পদ্মপুকুরের ধারে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম শ্যাম। চিৎকার করতে করতে তোর নড়ার শক্তিও কমে গিয়েছিল। একটা শেয়াল আমাকে দেখে দৌড়ে পালিয়ে না গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল বলে আমার সন্দেহ হয়েছিল। আমি সামনে এগিয়ে দেখি তুই হাত-পা ছুড়ছিস।

– বাবা? শ্যামকুড়ি চিৎকার করে ওঠে।

– তোকে পেয়ে আমার ভীষণ আনন্দ হয়েছিল। আমি বুকে নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম।

দেবাজি জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটে। বেশিক্ষণ কথা বললে গলা শুকিয়ে যায়। শ্যামকুড়ির বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় বাবার চোখের মণিদুটো ছিটকে বেরিয়ে যাবে। পদ্মপুকুরের নীলপদ্মের কথা ও অনেক শুনেছে, কিন্তু কোনোদিন দেখা হয়নি। নীলপদ্মের সৌরভ কি ওর শরীরে ছিল?

– বাবা, আমাকে যখন কুড়িয়ে পেয়েছিলে, আমার শরীরে কি তখন গন্ধ ছিল?

– হ্যাঁ। পদ্মফুলের গন্ধ ছিল।

চিৎকার করে কাঁদতে থাকে শ্যামকুড়ি। কাঁদতে কাঁদতেই বলে, আমাকে শেয়ালে খেয়ে ফেললেই তো ভালো ছিল।

ঘরে আর কোনো কথা নেই।

সামাদিন নির্বাক দর্শক। ওর কেবলই মনে হয় ওর সামনে আজ জন্ম ও মৃত্যুর উৎসব। জন্মের উৎসবে ও দীর্ঘ সময় কাটাতে পারবে। জন্মের এমন একটি উৎসব ওর ক্যানভাস রঙের অক্ষরে ভরিয়ে দেবে।

বাইরে বৃষ্টি কমে এসেছে। দেবাজি এখন শান্ত, নিশ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক। শ্যামকুড়ি দরজা খুলে দেয়, ঝলক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আসছে। শান্তির স্নিগ্ধ বাতাস। এ-বাতাস বুকে টানলে জীবন জুড়িয়ে যায়।

– সামাদিনভাই বাইরে যাবে?

– চলো।

দুজনে বাইরে এসে দাঁড়ায়। কেউ কারো সঙ্গে কোনো কথা বলে না। শ্যামকুড়ির মনে হয় বৃষ্টিধোয়া গাছপালা গোসল-সারা সোনাইর মতো। যেন ভেজা চুল বেয়ে জল গড়ায়! শরীরে ফোঁটা ফোঁটা জল থাকে। ভিজে শরীরে একটা ভারি অদ্ভুত গন্ধ থাকে। জড়িয়ে ধরলে একদম অন্যরকম লাগে। নিজের জন্মের এই গল্প ওর কাছে আনন্দ। সবাইকে বলবে, ওর জন্ম হয়েছে পদ্মফুলের কুঁড়ি থেকে। সোনাইয়ের শরীর যেমন মাঝেমধ্যে ওর কাছে পদ্মফুলের সৌরভ হয় জন্মের গল্প এখন ওর সামনে দারুণ গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ও সামাদিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে, আমার জন্মের গল্পটা দারুণ। খুব আনন্দ হচ্ছে। তুমি কি এমন জন্মের মানুষ দেখেছ সামাদিনভাই?

– না, দেখিনি। তোমার জন্মের গল্প আমার কাছে উৎসবের মতো লাগছে।

ও প্রাণখোলা হাসিতে নিজেকে মাতিয়ে তোলে। পরক্ষণে চোখ বড় করে বলে, চলো বাবার মৃত্যুর আনন্দ দেখি।

ঘরে ঢুকে ওরা দেখতে পায় দেবাজি মারা গেছে। ঘাড় কাত করে দুচোখ বুজে শেষ ঘুম ঘুমিয়েছে। বাবার মরদেহে হাত রেখে ও বলে, আমি ঠিক করেছি, কাল এখান থেকে চলে যাব।

কোথায়?

– যেদিকে দুচোখ যায়। জানি না কোথায়। তুমিও চলে যাও।

– কোথায় যাব? এখানকার কোথাও? নাকি অন্য কোনো চা-বাগানে?

তোমার জন্য ঢাকা শহর আছে। তুমি সেখানে যাবে। তুমি ছবি আঁকার জন্য যখন খুশি আসবে। আমি তোমার দেখাশোনা করব। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বলব, আমাকে আঁকো। আমার শরীরজুড়ে নীলপদ্ম দেবে। তোমার ক্যানভাসে আমাকে নানা ঢঙে আঁকা হবে তোমার উৎসব। দেখবে উৎসবের আনন্দ কত সুন্দর।

– ঠিক বলেছ। আমি তোমাকে এভাবে আঁকব। তাছাড়া এখানে আসার আরো একটি কারণ আছে।

– কারণ? কী কারণ? দুচোখ ভরে জায়গা দেখা?

সামাদিন বলে না, তা নয়। এখানে আমি তোমার কাছে থেকে যা পেয়েছি তা আমি হারাতে চাই না। তুমি তো পদ্মকুঁড়ির ছেলে। যে-মানুষ জীবনকে এমন সুন্দরভাবে গ্রহণ করতে পারে তার জন্ম সার্থক।

শ্যামকুড়ি হা-হা করে হাসে।

হাসতে হাসতে নৃত্যের ঢঙে হাত-পা ছোড়ে। পায়ের তলে নন্দিত হয় পদশব্দ। সামাদিন সেই শব্দে রঙের অক্ষর অনুভব করে।

ও বিড়বিড়িয়ে বলে, আমার একজীবনে কত যে দেখা হলো। যখন যা দেখি সে-দেখা আমার সামনে পূর্ণ ছবি হয়। আমি আরো হাজার হাজার ছবি দেখতে চাই। সব দেখাই হবে রঙের অক্ষরে আমার আঁকা ছবি। আমি গন্ধ আর শব্দ নিয়ে পথে হাঁটি। আজ আমার জীবন ধন্য। বুঝতে পারলাম অবৈধ জন্মেরও আনন্দ আছে। অবৈধ শিশুর ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ আছে।

এত কিছু নিয়ে বেঁচে থাকা আমার আনন্দ। আমার উৎসব। জন্ম, মৃত্যু, বেঁচে থাকা নিয়ে আমি খুঁজে বেড়াই এসবের সত্য। যা কিছু ঘটে তাকেই আমার আলিঙ্গন। আমি কোনো কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করতে চাই না।

 

দুদিন পরে চা-বাগানের ভেতরের পথটুকু পার হয়ে ও লোকালয়ে আসে। দেখতে পায় স্টেশন। একটু পরে ট্রেন আসবে। ঝম ঝম শব্দটি ক্যানভাসের রং। দেখতে পায় অনেক দূর থেকে ট্রেন আসছে। ওকে ফিরতে হচ্ছে ঢাকা শহরে – সঙ্গে আছে ওর ভাবনা। নিজেকেই বলে সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা-জীবন-মৃত্যু এবং বৈধ-অবৈধ জন্ম নিয়ে জীবন আমার কাছে রঙের অক্ষরের ছবি। হা-হা-হা – ও হাসতে থাকে। আশপাশের দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তাকায় ওর দিকে। সবাই ভাবে, ওর হাসি শুনতে ভীষণ ভালো লাগছে। এই মধুর হাসি সহজে শোনা যায় না। কোন আনন্দ থেকে লোকটা এই হাসি হাসছে?

 

সামাদিন সবার দিকে তাকায়। একজন এগিয়ে এসে বলে, আসেন হাসির জন্য হাততালি দিই।

সবাই হাততালি দিলে সামাদিন মাথা ঝাঁকায়। ছুটে আসছে ট্রেন।

সামাদিনের দুকান ভরে বাজে রঙের অক্ষর। হঠাৎ মনে হয় এই হাততালি শ্যামকুড়ির জন্মদিনের উৎসব। চা-বাগানের বিশাল প্রান্তরে ওর জন্য কেক কাটা হচ্ছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply