রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীত : মাতৃকল্পের রূপক

লেখক:

বেগম আকতার কামাল

টিএস এলিয়ট তো বটেই, উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকেরাও খুব বেশি জোরেশোরে জানান যে, লেখা থেকে লেখককে মুছে ফেলাই বাঞ্ছনীয়। কোনো রচনা পঠনপাঠনে লেখকের জীবনী ও আত্মপ্রসঙ্গ খুব একটা কাজের কথা নয়। কারণ লেখায় ও তাঁর ভাষায় লেখক যা বলতে চান, তা অন্তর্ঘাত করে অন্য কিছু লেখা হয়ে যায়, যা পাঠকেরা আবিষ্কার ও চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু যিনি আমাদের জীবন ও শিল্পসাহিত্যের আইকন, বিচিত্র সৃষ্টি-কাজের মধ্যে দীর্ঘজীবন বহমান থেকেছেন, সাহিত্যিক ভাষা নির্মাণ করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মভাবনার মধ্যে তাঁর আত্মজৈবনিকতার প্রসঙ্গ অবান্তর নয়; বরং তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্যক্তিসত্তা শূন্য, তা ভরিয়ে তোলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক কাঠামো এবং নৈতিকতার বিধিবিধান। অনেক ক্ষেত্রে যা নিপুণ হাতে গড়া ‘মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ হয়ে যায় সরল জীবনে’। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণ কৃপালনী থেকে শুরম্ন করে প্রশান্তকুমার পাল, আবদুস শাকুর পর্যন্ত রচিত রবীন্দ্রজীবনীগুলো মহাজীবনের বয়ান হয়ে উঠেছে। আর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ-রচিত ছেলেবেলা (১৩৪৭) ও জীবনস্মৃতিতে (১৩১৯) আমরা খ–ত বা আংশিকভাবে যে রবীন্দ্রনাথকে পাই তাতে তো তাঁর চৈতন্য নির্মাণের প্রসঙ্গই বেশি জায়গা জুড়ে আছে। এখানে যতটুকু আত্মজৈবনিকতা আছে তারও বেশি আছে চেতনমনের ভাবুকতা ও পরিপার্শ্বের বয়ান। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ শীর্ষক রচনাংশের প্রথম বর্ণনাভাগ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের নিজের জননীর প্রসঙ্গ সম্ভবত নেই। তাও এই মৃত্যুশোক দার্শনিক ও কবিমনের ভাবুকতার প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জননী সারদা দেবীকে কোনো রচনাও উৎসর্গ করেননি।

নন্দনতত্ত্বের অলংকারশাস্ত্রে রূপক একটি প্রাথমিক ও প্রভাবশালী অলংকার। বৈসাদৃশ্য সত্ত্বেও একটি বস্ত্ত বা ভাবকে আরেকটি বস্ত্তর প্রতিতুলনায় অসিত্মত্ববান করে তোলাই রূপকের কাজ। এই প্রক্রিয়াটি আমাদের শৈশবের ভাষাশিক্ষণ ও অসিত্মত্ব গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এটি আমাদের পার্থক্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। দুটি আলাদা বস্ত্তর মধ্যে সম্বন্ধবাচকতা তৈরির এই ধারায় একটি বস্ত্ত আরেকটি বস্ত্তর ওপর প্রতিস্থাপিত হয়। পরে এই প্রতিস্থাপিত বস্ত্তটির অর্থ তৈরি হয়, অনবরত এই কাজ চলতে থাকে। বস্ত্ত নিজে একটি বলয়ের মধ্যে পরস্পরের মধ্যে প্রতিফলিত হতে থাকে। এই অপরিমেয় প্রতিতুলনার জগৎটিই রূপকজগৎ। ক্রমে আমরা বস্ত্তর মধ্যে অদৃশ্য ভাব বা বস্ত্তর উপস্থিতিও আবিষ্কার করতে থাকি, আরোপ করতে থাকি। এভাবে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য ঈশ্বরের রূপকমূর্তি প্রতিমার মধ্যে। জাক লাকাঁর মতে, সকল ভাষাই রূপকাত্মক এ-কারণে যে, কোনো বস্ত্তর কোনো সরাসরি ও নিঃশব্দ গুণের বিকল্প হিসেবে ভাষার উপস্থাপনা ঘটে। শৈশব থেকেই আমরা অবচেতনভাবে এই বিকল্পকে পেতে থাকি, যেমন করে পাই পিতার উপস্থিতি, মাতার সঙ্গে সম্পর্কায়ন। পিতার সঙ্গে মাতার সম্পর্কও আমরা সামাজিক অর্থে বুঝে নিই। এখানে মাতার সঙ্গে সম্পর্কটি থাকে বিয়োগান্তক বা বিচ্ছিন্নতার সত্মরে আবদ্ধ। আমরা বুঝি যে, মাতৃগর্ভ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন, আর কখনোই মাতৃশরীরে প্রবেশ করতে পারব না। এ থেকে যেসব আকাঙক্ষার অবদমন ঘটে, বিকল্প তৈরি হয়, তা আমাদের অসিত্মত্বকে অর্থ দিতে থাকে। আমরা ‘বিকল্প থেকে বিকল্পে তথা রূপক থেকে রূপকে, রূপকের পর রূপকে যাই’ (লাকাঁ, ১৯৭৭)। বস্ত্তত এই বিকল্প জগৎ-সন্ধানের মধ্য দিয়ে আমরা এক বিশুদ্ধ আত্মপরিচয় ও আত্মপূর্তির দিকে ধাবিত হতে চাই, যা কখনোই সম্ভব হয় না। এ-পথেই মানুষ বা শিল্পীরা তাদের রচনাশীলতায় স্বাতিক্রমণের বলয় তৈরি করেন, স্বাতিক্রমী (transcendence) হয়ে ওঠেন। এই স্বাতিক্রমণ (transcendental signifier) কোনো বস্ত্ত বা বাসত্মবতা নয়, এটি নেহাত শূন্যতা এবং তার কাজ হলো প্রতীক-শৃঙ্খলার মধ্যে আমাদের পূর্বনির্ধারিত স্থানে স্থাপিত করা। অর্থাৎ মাতৃশরীর বিচ্ছিন্নতায় আমরা যে বিকল্প ভুবন রচনা করি তাও পূর্বনির্ধারিত সামাজিক বিধিনিষেধের শৃঙ্খলা মাত্র, আর তা ইতোমধ্যেই ভাষায় বর্তমান। যেমন, দেবীকে মাতৃ সম্বোধন, বসুন্ধরাকে ‘মা’ বলা, প্রেমিকার মধ্যে বিকল্প মায়ের অনুসন্ধান করা। এসব রূপক ও অর্থশৃঙ্খলার নামান্তরই ভাষার বাসত্মবতা, যার অর্থ সুস্থির নয়, নানা অর্থের শৃঙ্খলা তাদের মধ্যে থাকতে পারে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকাজে আমরা এই বিকল্প রূপক ও অর্থশৃঙ্খলা দেখতে পাই, অন্তত মাতৃকল্পের বিবিধ রূপক তো বটেই। তাঁর কবিতা ও গল্পগুচ্ছে-উপন্যাসে জননীর উপস্থিতি খুব একটা প্রবল নয়, বহু তাৎপর্যময় নয়, ব্যতিক্রম চোখের বালির মা রাজেশ্বরী। সেও ঈর্ষা ও অধিকারবোধের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যধৃত মাত্র।

আমাদের আলোচ্য ব্রহ্মসংগীতের মধ্যে গীতবিতানের (১৩৩৮) ৪১৬ নম্বর গানটিতে বিশ্বজননী হিসেবে মাতৃরূপকের বন্দনা রয়েছে। জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অংশে মায়ের মৃত্যুর বর্ণনায় স্মৃতিকাতর যে রবীন্দ্রনাথকে পাই তা মৃত্যু-পরবর্তী কালের ভাবনা। তাতে মায়ের স্মৃতি এভাবে বর্ণিত হয়েছে।

১. প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যু সংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে-দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না – সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনামেত্মর বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমসত্ম ঝড় যেন একেবারে এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। (জীবনস্মৃতি)

২. ইহার পরে বড়ো হইলে যখন বসন্তপ্রভাতে একমুঠো অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রামেত্ম বাঁধিয়া খ্যাপার মতো বেড়াইতাম – তখন সেই কোমল চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত – আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম যে-স্পর্শ সেই সুন্দর আঙুলের আগায় ছিল সেই স্পর্শই প্রতিদিন এই বেলফুল-গুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে; জগতে তাহার আর অন্ত নাই – তা আমরা ভুলিই আর মনে রাখি। (তদেব)

এই যে স্পর্শকল্প ও বিশ্বব্যাপ্ত অন্তহীনতা এটাই বিকল্পভুবন তথা রূপক। তাঁর আত্মপরিচয় (প্রকাশ ১৩৫০) রচনায়ও আমরা যে প্রকৃতিভাবনার পরিচয় পাই তা রবীন্দ্রনাথের নিজ অসিত্মত্ব পরমাশ্রয়রূপে প্রকৃতিকে মাতৃশরীরের মতোই আঁকড়ে ধরেছে; তার সঙ্গে সম্বন্ধযোজনায় ব্যাকুলায়িত হয়েছে। এ নিছক প্রবৃত্তির তাণ্ডব থেকে বা মাতৃজনিত বিচ্ছিন্নতা থেকে আত্মপ্রাণের পরিকল্প নয়, এ হচ্ছে বিকল্প প্রকৃতির মধ্যে আত্মপ্রসার, বাসনা-আকাঙক্ষার অবদমনের বা সংকোচনের মধ্য থেকে ঊর্ধবায়ন, নিজেকে বর্ধিতকরণ, নিজের অসিত্মত্বগত শূন্যতার পরিপূরণ। আমরা সোনার তরী কাব্যে ‘মানসসুন্দরী’ নামের দীর্ঘ কবিতায় আত্মময়তা ও কাব্যময়তার যে মিথস্ক্রিয়া দেখি সেখানে অনন্য দুটি পঙ্ক্তি স্মরণযোগ্য ও ইঙ্গিতময় – ‘মাতৃহীন বালকের মতো সবে কাঁদি একা/ তখন করম্নণাময়ী দাও তুমি দেখা’। তাঁর করম্নণাময়ী ও ছলনাময়ীর যে যুগ্ম-বৈপরীত্য অথবা বিরোধ-আভাস অলংকৃতি, যা আমরা অনেক কবিতায় পাই, তাও রবীন্দ্রনাথের মাতৃকল্পের বিকল্প রূপক। ‘বসুন্ধরা’ কবিতাটিও জীবনরসে পরিপূর্ণ এই আদি অদিতিরূপী মাতৃছাঁচেরই পরাকাষ্ঠা।

তবে গদ্যরচনায় তিনি সমাজকাঠামো-নির্দেশিত লৈঙ্গিক বিভাজনের মধ্যেই পিতা ও মাতাকে বিবেচনা করেন, অন্তত তাঁর ব্রহ্মভাবনায় তো বটেই। প্রাচীন বেদ সমসত্ম মানবসম্বন্ধনের মধ্যে কেবল এই পিতার (পিতা নোহসি) সম্বন্ধটিকেই ঈশ্বরের মধ্যে বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছেন। মাতার সম্বন্ধকেও সেখানে তাঁরা স্থান দেননি। কারণ মাতার সম্বন্ধেও একদিকে যেন ওজন কম আছে, একদিকে সম্পূর্ণতার অভাব আছে। উদ্ধৃতি :

মাতা সমত্মানের সুখ দেখেন, আরাম দেখেন, তার ক্ষুধাতৃপ্তি করেন, তার শোকে সান্তবনা দেন, তার রোগে শুশ্রূষা করেন। এ সমসত্মই সমত্মানের উপস্থিত অভাবনিবৃত্তির প্রতিই লক্ষ করে।

পিতার দৃষ্টি সমত্মানের সমসত্ম জীবনের বৃহৎক্ষেত্রে। তার সমসত্ম জীবন সমগ্রভাবে সার্থক হবে এই তিনি কামনা করেন। এইজন্যই সমত্মানের আরাম ও সুখই তাঁর কাছে একান্ত নয়। এইজন্য তিনি সমত্মানকে দুঃখও দেন। তাকে শাসন করেন, বঞ্চিত করেন, যাতে নিয়ম লঙ্ঘন করে ভ্রষ্টতাপ্রাপ্ত না হয়, সে দিকে তিনি সর্বদা সতর্ক থাকেন। (‘শামিত্মনিকেতন’, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ৪২৭, ১৩৪৯)

পিতার প্রবল ব্যক্তিত্ব ও সতর্ক পাহারা, অনুশাসন রবীন্দ্রনাথের জীবনে যতই ব্যাপ্ত ছিল, আরো ছিল গুণী অগ্রজদের পরিচর্যা, সে-তুলনায় মায়ের পরিচর্যা ছিল ন্যূন। কল্পনা কাব্যে ও গীতাঞ্জলিতে স্বদেশমূর্তির ভাবরূপকে জননীসত্তার আশ্রয় গ্রহণ করতে দেখি। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘একটি ঈশ্বরের জন্ম’ অধ্যায়ে এই স্বদেশজননীকে দেখিয়েছেন অবমানিত-উপনিবেশিত বঙ্গভূমির অন্ধকারগর্ভসদৃশ ঈশ্বরীমাতারূপে। বিভাবরী রূপে মাকে অবলম্বন করে কবির আত্মসাধনার ও দুঃখব্রতের মাঙ্গলিক ব্রতযাত্রাটি সম্পন্ন হয়েছে, এই ঈশ্বরীর অন্ধকার গর্ভ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্ম নিয়েছে পুরম্নষরূপী ঈশ্বর; রাজার রূপকের (অন্ধকার গর্ভগৃহে, মাটির তলায় অসুন্দর রাজার অবস্থান) দ্যোতনাটি এই দুইয়ের – পিতা ও মাতার সত্তার মধ্যবর্তী পর্যায়। স্বদেশভূমিকে মাতৃরূপকে রূপান্বিত করাটাও নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যিক এবং মনস্তাত্ত্বিকও বটে। দূরাতীতের মাতৃতান্ত্রিক আর্থসমাজব্যবস্থার স্মৃতির অবশেষ কেবল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে

আছে সমকালীন রাজনীতি, আর্থসমাজ প্রেক্ষাপটও, রবীন্দ্রনাথের শ্রেণিসংস্কৃতিও।

মাতৃসম্বন্ধের অন্য কয়েকটি প্রান্তকেও জীবনের জন্য অপরিহার্য করে গীতবিতানে তিনি যে-কয়টি মাতৃবন্দনাগীত রচনা করেছেন তা লৈঙ্গিক বিভাজনের কাঠামোকে একভাবে নস্যাৎ করেছে, কখনো আত্মসত্তা গঠনের সত্মরে-সত্মরে অঙ্গীভূত করে নিয়েছে। রবীন্দ্রচিত্ত অনুপ্রাণিত হয়েছিল মায়ের বিকল্পরূপে বসুন্ধরাকে আদিজননী বা বিশ্বজননীরূপে আত্তীকরণে – যা আমরা আগেই বলেছি। কেন এই আত্তীকরণ? এবং স্বদেশমাতৃকাকে লক্ষ্মী সৌন্দর্যময়ী, করম্নণাদাত্রী অথচ দরিদ্রা হিসেবে বর্ণনা করা।

উপনিবেশিত বঙ্গদেশ যে শোষণ-নিপীড়ন ও শাসনে পর্যুদসত্ম, অসহায় হয়ে পড়েছিল তিনি জমিদার হিসেবে তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন গ্রামবাংলায় এসে। এই নিপীড়ন ও অসহায় অবস্থাকে কখনো গল্পগুচ্ছেও আঙ্গিকে প্রত্যাঘাত করেছেন, উন্মোচন করেছেন, কখনো প্রকৃতি অবারিত নিসর্গ-ঐশ্বর্যে ভরিয়ে তুলেছেন। ইতিবাচক চিমত্মায় আঁকড়ে ধরেছেন উদার উদাসীন বিশ্বময়ীর সবুজ-শ্যামল আঁচলটিকে, এর নদনদী-ডোবাজলকে স্রোতবহ করে আবহমান সৌন্দর্যের আকর করে তুলেছেন – এরকম অভিমতই দেন সাহিত্যিক সমালোচক দেবেশ রায় (উপন্যাস নিয়ে, দ্রষ্টব্য)। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়, রবীন্দ্রনাথের স্বদেশজননীর কল্পনায় আরো একটি মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য বিদ্যমান।

মানুষের অহং নিজেকে অবদমিত করেই বেড়ে ওঠে, সামাজিক অনুশাসনের মধ্যে, নৈতিকতার বিধিবিধানের মধ্যে প্রবেশ করে। একজন সাহিত্যশিল্পী তাঁর রচনায় এই বেড়ে-ওঠাকে গোপন রাখেন, তাঁর সৃজনপ্রক্রিয়াকে আধেয় বস্ত্তর অংশ করে নেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তাঁর সৃজনপ্রক্রিয়াটি তাঁর টেক্সটের মধ্যে, ভাষার মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে মাতৃকল্পের গভীরে। জননী সৃষ্টিকর্ত্রী, পালনকারিণী, রক্ষয়িত্রী; রবীন্দ্রমতে ‘চির পুরাতনী’। নিজের সৃজনসত্তা – যা বারংবার গড়ছে-ভাঙছে নিজেকে, বেড়ে উঠেছে, তার চিহ্নক তো জননীই। সৃজনকর্মের আধার হিসেবে সৃষ্টির আধেয় বস্ত্তকে ধারণ করে থাকে, ঠিক মাতা যেমন করে পিতাকে ধারণ করে আপন গর্ভস্থ শিশুর ভ্রূণের জন্মের লক্ষ্য। তবে, অধিকাংশ সময় রবীন্দ্রনাথের এই সৃজনকর্ত্রীরূপী ‘আমি’ ‘অ্যানিমা’ সত্তা হয়ে রহস্যময়ী, spirit of muse-এর ভাবমূর্তি ধারণ করে থাকে। এরই আদি অদিতিরূপী এই মাতৃকামূর্তির স্বভাব হয়ে ওঠে, যা আরেক অর্থে নৈসর্গিক প্রতিভা, যা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিক্ষম-প্রজ্ঞার আদি কারণ। যদিও এই আদি কাল্পনিকতার সত্মরে যতটা থাকে, ততটা রাশি-রাশি প্রতীক-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে না; সেখানে থাকে পিতার প্রতীকতা, পিতৃতান্ত্রিক আর্থসমাজকাঠামোর দুর্দান্ত প্রতাপ। বিপরীতে মাতৃসত্তা একান্তই করম্নণাময়ী; তার কাছে মেলে পরমাশ্রয়। শরণ ও স্মরণরূপে এই করম্নণাময়ী সৃজনশীলতার গর্ভ এবং কর্ত্রী। গীতবিতানের উলিস্নখিত ৪১৬ নম্বর ব্রহ্মসংগীতটিতে আমরা এই আদি জননীর কাছে শরণ প্রার্থনা ও বাসনার সমর্পণ লক্ষ করি। মার্কস যেমন পৃথ্বীকে উৎপাদনের গর্ভ বলে অভিমত দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও তেমনি ভাবকে পুরম্নষ ও সৃজনপ্রক্রিয়াকে নারী-প্রতিমায় বর্ণনা করেছেন। বিষয়টা পুরম্নষতান্ত্রিকতা বা নারীতান্ত্রিকতার বিভাজন-দ্বন্দ্ব নয়, এটি হচ্ছে প্রাকৃতিকতা ও কাল্পনিকতার মিথস্ক্রিয়া। প্রাকৃতিকতা সৃজনের আদি কারণ আর কাল্পনিকতা আত্মতা গঠনের বিবিধ ক্রিয়া-বিক্রিয়া। সবকিছুর কারণ যদি ‘ব্রহ্ম’ শব্দে বোঝানো হয় তবে জননীর ভূমিকা হচ্ছে কারণটিকে ক্রিয়াশীলতায়, সৃজনময়তায় ফলিয়ে তোলা। যে আমি-সত্তাকে ধরা যায় না, পূর্ণ করা যায় না কোনোভাবেই, সেই আমি-সত্তা নিজ ঘটমান পর্যায়ে মাতৃসান্নিধ্যকামী হয়ে ওঠে, বাসনা করে সাহচর্য-শুশ্রূষা। উলেস্নখ্য, গানটি ‘আনন্দধাম’ (যা পিতার ভবন) সন্ধানে পথক্লান্ত, অন্ধ-আমির উচ্চারণ তাৎপর্যময় – ‘আমি শ্রান্ত, আমি অন্ধ, আমি পথ নাহি চিনি’। পিতার কাছে তথা ব্রহ্মের কাছে শরণ-যাচনায় শ্রামিত্ম ও অন্ধত্ব নেই, সেখানে আছে সংসারের মোহমেঘ, লোভ-চতুরতা-মালিন্য-মূঢ়তা থেকে আত্মরক্ষার বাসনা। কাজেই বিশ্বজনজননীর সমীপে উপনীত শ্রান্ত-পথ-না-চেনা ‘আমি’টি একান্তই শৈশবসত্মরের কাল্পনিকতা সত্মরের। এবং গানটিতে ‘আঁধারে ঢাকে ধরণী’ বাক্যাংশে একদিকে ব্যক্ত হচ্ছে বহির্জগতের অপবাসত্মবতার কথা আর অন্যদিকে অন্ধকার-গর্ভ, যা জন্মের আঁধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘মাতৃহীন বালকের মতো যবে’ একা কাঁদে যে সেই আমিকেই এখানে অভিব্যক্ত হতে দেখি – ‘করো কৃপা অনাথে হে বিশ্বজননী’। রবীন্দ্রনাথ এক অর্থে এখানে আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস ভেঙে বহির্গত হচ্ছেন বিশ্বজনের সঙ্গে ঐক্যের সম্বন্ধযোজনা-লক্ষ্য – তাই ‘বিশ্বজনজননী’ রূপে সম্বোধন করা হলো। ‘অনাথ’ বলতে পিতৃমাতৃহীন উভয়ই বোঝায়। পিতৃ-অনুশাসনের মধ্যে প্রবেশের আগে নিজেকে নিঃসম্পর্কিত করে, অনাথ করে উপস্থাপনা করেছেন বিশ্বমাতার কাছে। এ তো একপ্রকার অনুশাসন-মুক্তির প্রয়াস, যা আসলে কখনো সফল হয় না, তাতে বাঁধা পড়তেই হয়। রবীন্দ্রনাথ পুনঃপুন ঐক্যের কথা বলেন বৃহত্তর মুক্তিপ্রাণতার লক্ষক্ষ্য। নিসর্গবিশ্বের সঙ্গে, সৃজনকর্ত্রীর সঙ্গে ঐকাত্ম্য সম্পর্ক-বাঁধনেই মিলতে পারে সেই মুক্তি। সেজন্যেই ‘বিশ্বজনজননী’ বলেন, কিন্তু বিশ্বজনপিতা বলেন না, বলেন বিশ্বপিতা।

গানটিতে কাল্পনিকতার শৈশব-সত্মরের ভক্ত আমির জন্যেই একটি চরণে উচ্চারিত হয়েছে – ‘অতৃপ্ত বাসনার-লাগি ফিরিয়াছে – পথে পথে’। এবং সেই বাসনা – desire – যা থেকে মানুষের মুক্তি নেই। অথচ বাসনা পরিহার করাও সম্ভবপর নয়, বুদ্ধের নির্বাণ সাধনা সত্ত্বেও নয়। শুধুই উত্তরণের প্রয়াস করা যায় মাত্র ব্যর্থতা মেনে নিয়ে – ‘বৃথা খেলা মেলা, বৃথা বেলা গেল বহে’। এই ব্যর্থতা শুধু গ্রহণ করেন জননী, পিতা নন। অতএব মাতৃসম্বোধনের সন্নিধানে এই কামনার্তি – ‘স্নেহকরপরশনে চিরশামিত্ম দেহো আনি’। পিতার প্রতীক-শৃঙ্খলার গানগুলোতে এই ধরনের স্পর্শাকুল স্নেহকাতরতা নেই। রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সংগীতবিষয়ক যতগুলো রচনা আছে সেসবের (গীতবিতান দ্রষ্টব্য) অধিকাংশে আছে মাতৃছায়াস্পর্শের ব্যাকুলতা, শামিত্ম ও করম্নণা প্রত্যাশার আর্তি। ৪৬৫ নম্বর গানটিতেও (‘পূজা’ পর্যায়ের) এই আধারময়ী জননীর পুণ্যপরশপুলকের প্রার্থনা উদ্গীত হয়েছে। আমরা আরো লক্ষ করি, তিনি মাতৃরূপকে স্পর্শকল্প ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার বেশি করেছেন। জননীর সরাসরি দেহস্পর্শলাভের জন্যে আকুল হয়েছেন। জননী বিমূর্ত নন, তাঁর দেহীরূপই এই বিশ্বপ্রকৃতির রূপক। এর আগের গানটি অর্থাৎ ৪৬৪ নম্বর গানেও জননীর করম্নণ চরণ স্পর্শের বাসনা ব্যক্ত হয়েছে। অমত্মঃপুরচারিণীর গোপন অসিত্মত্বের মতোই জননীর ‘মরণহরণ বাণী/ জীবনে গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে’। এই প্রকৃতির কাছে দেহ-মন-প্রাণ-সত্তার সম্পূর্ণ নিবেদন ঘটে ওই স্পর্শেন্দ্রিয়ের হাত ধরে। তাঁর বাণী ও ভাষাকে বলা হয়েছে ‘নীরব গগন’ ভরিয়ে তোলার ক্ষমতাসম্পন্ন। এখানে নেই কোনো সমাজ সংগঠন, নেই বাঁধাধরা নিয়মের অনুসরণ, তাই তাঁর প্রকাশ ‘অরম্নণকিরণরূপে’ – অন্ধকার ভেদ করে। অথচ ব্রহ্মকে ‘জাগ্রত বিশ্বকোলাহল মাঝে/ তুমি গম্ভীর, সত্মব্ধ শান্ত, নির্বিকতার/ পরিপূর্ণ মহাজ্ঞান’রূপে (৩৭০ নম্বর গান, ‘পূজাপর্যায়’) অর্থাৎ পূর্বেই সৃষ্ট সমাজকাঠামোর আর্কেটাইপ্যাল রূপের মধ্যে কবির চিন্তনপ্রক্রিয়া পিতৃমাতৃ-প্রতীক রূপকের মডেলই অনুসরণ করে। এখানে জাক লাকাঁ-কথিত জন্মের পূর্বেই ভাষা বা ভাবের মধ্যেই চেতনালাভের ব্যাখ্যাটির যাথার্থ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ৪২৪ নং গানেও (‘পূজাপর্যায়ের’) করম্নণাময়ী জননীর ‘তাপহরণ স্নেহকোল’ প্রত্যাশা সংগীতময় হয়ে উঠেছে।

সূর্যের মতোই দীপ জ্বালানোর মোটিফ গানগুলোতে অজস্রবার ব্যবহৃত হয়েছে। আলোর বহুমাত্রিক বাসনার রবীন্দ্ররচনা আকীর্ণ (দ্রষ্টব্য সিরাজ সালেকীন ২০১০), ব্রহ্মসংগীতগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। ব্রহ্ম ও জননী – দুই সূত্রেই রবীন্দ্রনাথ অন্তরতিথির বিদারণকারী দীপ জ্বালানোর কথা বলেন। অবশ্যই এই দীপ প্রজ্বলিত হবে ‘অবচেতন চিতে’। অবচেতন থেকে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়েই তিনি দীপ্রপ্রজ্ঞা অর্জন করতে চান। হতে চান মুক্ত, ঐক্যীভূত, স্বায়ত্তশাসিত ও আত্মতা-উৎপাদনকারী ব্যক্তিমানুষ – যে-রকমটি চেয়েছিলেন রেনেসাঁসীয় ও এনলাইটেনমেন্টেড ব্যক্তিবর্গ। একইসঙ্গে তিনি ভাবতে চাইছেন যে, জগৎ তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁর আমিত্বে কেন্দ্রীভূত হোক। এটাই রবীন্দ্রনাথের ভাবাদর্শ (আলথুসারের ভাবনায় – আইডিওলজি), তাঁর বিশ্বাস ও কর্মের সমষ্টি যা দিয়ে ওই কেন্দ্রভূত হবার/ করার কাজটি সচল থাকে। তাই মনে হয়, তাঁর এই ভাবাদর্শ শুধু আসিত্মক্যের তত্ত্বসমাহার নয়, তা আরো বেশি সূক্ষ্ম, ব্যাপ্ত ও অবচেতন-লগ্ন। এই পথেই তিনি যখন ব্রহ্মের সঙ্গে জননী ও পুরম্নষরূপী রূপক-প্রতীকে নিজেকে বাঁধেন, তখন আসলে তাঁর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও সমাজ-সম্পর্ককেই যাপন করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি আমিকে, সমাজ-সম্পর্কে নিয়ে আসেন, সুনিয়মিত উদ্দেশ্য ও সুবিনীত পরিচয়ের বোধে উপনীত হন। এভাবে আসিত্মক্যবোধ আসলে ‘সমাজ-সম্পর্কেরই এক রকম ডিসকোর্স হয়ে ওঠে, যা ব্যক্তির চিন্তনে স্বাধীন আইডিওলজিক্যাল ধারণার বিভ্রম তৈরি করে। বলা হয় ধর্ম বা আসিত্মক্যবোধ ব্যক্তিক, কিন্তু তা নয়, এটি সর্বাংশে সমাজ-সম্পর্কযুক্ত । যদিও রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর ও আধ্যাত্মিকতা একান্ত স্বকীয় বলে মনে হয়, প্রাতিস্বিক বলে মনে হয়।’  কিন্তু তাও সমাজকাঠামোর রূপ-রূপান্তরের সঙ্গে তাঁর রচনাকর্মের ও সৃজনক্ষমতার সংশিস্নষ্টতারই ফসল মাত্র। নিজেকেই বিষয় (subject) করে একটি একীভূত সত্তার ইমেজ, তার রূপক-প্রতীকান্বিত ভাষার সঙ্গে ঐকাত্মকরণের মাধ্যম হয়ে ওঠেন। এবং বাসত্মব জগতে নিজের খ–বিখ-, অসংহত অসিত্মত্বকে পিতা ও মাতার আর্কেটাইপে সংহত করেন, রূপস্পন্দিত করেন। এভাবে নিজেকে বাসত্মব পরিস্থিতিতে আদর্শায়িত করার নামই ভাবাদর্শ গড়ে তোলা। নিজ সত্তাকে এই দুই প্রতীক-রূপকের ইমেজের মধ্যে অধীনস্থ করে আবার মুক্ত করে নিজে হয়ে ওঠেন subject। ব্রহ্মসংগীতে তাই খুব বেশি ‘আমি’ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। তবে, একথা স্মরণযোগ্য যে, তাতে গভীরভাবে আছে মুক্তির ঈপ্সা, আনন্দ ও প্রেম।

এই যে আসিত্মক্য ভাবাদর্শের মোড়কে সামাজিক-সম্পর্কায়ন তা ফ্রয়েডীয় অবচেতনা-প্রবৃত্তি মাত্র নয়। অবচেতনকে ভেতরে বদ্ধ না রেখে রবীন্দ্রনাথ বাইরের ভাষাকাঠামোর রূপক-প্রতীকে বিকীর্ণ করে দিয়েছেন এবং নিজের অসিত্মত্বতন্তুকে রয়ন ও বয়ান করে গেছেন। ভাষায় পূর্বসৃষ্ট এইসব অলংকার দিয়েই আমাদের কামনা-বাসনা-আকাঙক্ষা নিয়ন্ত্রিত হয়। আমরা গড়ে উঠি লিঙ্গভিত্তিক শ্রমবিভাজনের কার্যপ্রক্রিয়ায়। রবীন্দ্রনাথও তাই। সামন্ত-পরিবারে পিতৃকর্তৃত্বের তিনি যে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাও সামন্ত সমাজব্যবস্থা, অন্যদিকে মাতা তাঁকে দিয়েছেন ভবিষ্যতের রবীন্দ্র-আমিকে – যে-আমি ভাবুক ও সৃজনক্ষমতার অধিকারী, তাঁকে বস্ত্তগত ও আবেগগত রক্ষণাবেক্ষণ (তাঁর দিদিরা – কাদম্বরী দেবীসহ) – স্নেহস্পর্শকামনার লুব্ধতায় মাকে তিনি স্বাতিক্রমী করে বিশ্বে পরিব্যাপ্ত-রূপে দেখেন বাসত্মবের শূন্যতায়। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে পিতা যতটা অনুশাসনকর্তা ও কঠোর, যাঁর ওপর রবীন্দ্রনাথের আর্থিক নির্ভরশীলতা ভিন্ন অন্য উপায় ছিল না, বিপরীতে জননী অনুপস্থিত থেকে সংবেদনশীলতার উৎস হয়েছেন, আবেগময়তায় ও মানবিকতায় তাঁকে ঘিরে আছেন।

এ-সূত্রেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তর্জগতের ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন যার একটি রূপ প্রেমিকের। এবং নিজ অধ্যাত্মবোধকে বিনির্মাণ করেছেন। তাঁর গানগুলোকে করে তুলেছেন একটি পরম আশ্বাসদায়ী প্রভাবক, তা আমাদের উদ্বেগকে প্রশমিত করে, চিত্তকে উচ্চসত্মরে উড্ডীন করে, যাবতীয় বঞ্চনার সঙ্গে লড়াই করে। জীবন, ভালোবাসা এবং শৃঙ্খলার প্রীতি আমাদের নিষ্ঠাকে – যাতে আমরা বাঁধা আছি ও থাকি, তাকে নান্দনিকতায় উদ্যাপন করে। এতে নিজের সুপার ইগোকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এখানেই রবীন্দ্রনাথ মডার্নিস্টদের চেয়ে আলাদা। মডার্নরা এই শৃঙ্খলাকে অবিন্যসত্ম ও নস্যাৎ করতে উৎসাহী, যেমন সুধীন্দ্রনাথের ঈশ্বর-বিষয়ক কবিতাগুলো, যা আমাদের আত্ম-নিশ্চয়তাকে বিস্ফোরিত করে, জীবনের নৌকাডুবি ঘটায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, পিতৃপ্রতীকের মধ্য দিয়ে শৃঙ্খলা ও স্থিতাবস্থার কোনো সীমানা ভেঙেছেন কিনা! কারণ নারী বা জননী সর্বদাই প্রতীক-শৃঙ্খলার ভেতরে যে-সীমানা তার প্রান্তবর্তী অবস্থানে থাকেন। অথচ তাঁর আবির্ভাব ও অসিত্মত্ব সামাজিক প্রতীক-শৃঙ্খলার মধ্যেই – পিতার বিপরীতেই জননীর জন্ম বা সংজ্ঞা তৈরি হয়। এই মাতৃরূপক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর করম্নণা-স্পর্শের বাসনায় ঈশ্বর-পিতৃত্বের বহিরাঙ্গনে ঠেলে দিতে চেয়েছেন, রোম্যান্টিকতায় আদর্শায়িত করেছেন জননীকে। তিনি একটি শৃঙ্খলাগত ইমেজ হয়েও এক ধরনের নঞর্থক উপাদান হয়ে ওঠেন। এবং কঠোর পিতৃত্বের বিপরীতে করম্নণাময়ী হন, স্পর্শময়ী হন – যাঁর অন্তর্ধানের স্পর্শ রয়ে যায় প্রকৃতিতে। হয়ে ওঠেন ব্রহ্ম-ভাবনার পরিম-লে একটি শক্তি – যার স্বীকৃতি নেই ব্রাহ্মধর্মে। যে রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক সংস্কৃতির ধারায় ব্রাহ্মধর্মের প্রচারণা-প্রধাবনা – যদিও এ-ধর্মের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা নিবারণী আইন প্রচারের উদ্যোক্তা ছিলেন, সেখানে জননী রূপটি চিহ্নায়ক হয়ে একীভূত, কেন্দ্রীভূত পিতৃত্বকে খ–ত করে, যুগ্ম-বৈপরীত্যের চাপে খ- বিদারণ করে। ফলে আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘আমি’ সাবজেক্ট তৈরির – যাকে আমরা ব্রেশটের নন্দননীতি মেনে নিয়ে বলতে পারি, নতুন ধরনের মানব-সাবজেক্ট তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। এই মানব-সাবজেক্ট শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রভাবাদর্শে হয়ে ওঠে পিতৃপ্রাধান্য থেকে মানবব্রহ্ম – জননী থাকেন এর মধ্যবর্তী সত্মরে।

 

গ্রন্থপঞ্জি

১.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনস্মৃতি, বিশ্বভারতী, ১৩১৯।

২.    গীতবিতান, বিশ্বভারতী, ১৩৩৮।

৩.    রবীন্দ্র-রচনাবলী, চতুর্দশ-খ-, বিশ্বভারতী, ১৩৫৯।

৪.    দেবেশ রায়, উপন্যাস নিয়ে, দেশ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯১।

৫.    সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, আলো-আঁধারের সেতু : রবীন্দ্র-চিত্রকল্প, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৮৪।

৬.    সিরাজ সালেকীন, রবীন্দ্রনাথের আলোকভাবনা, ধ্রম্নবপদ, ২০১০।

৭.    খোন্দকার আশরাফ হোসেন, সাহিত্যতত্ত্ব (অনুবাদ), নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ২০০৪।

৯.    Terry Eagleton, Literary  Theory : An Introduction, London, 1983.

১০. Harold Bloor, Poetry and Reception, New Heaven, Conn 1976.

১১. Jaques Lacan, The Four Fundamental Concepts of Phycho-Analysis, London, 1977.

১২. Julias Kristeva, About Chinese Women, New York, 1977.

শেয়ার করুন

Leave a Reply