রশীদ করীমের একটি অপ্রকাশিত চিঠি, উত্তম পুরুষ এবং এক দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের আখ্যান

লেখক:

হামিদ কায়সার

চিঠিটাই আগে পড়ে নেওয়া যাক, তারপরই না হয় প্রাসঙ্গিক কথা হবে। যে-চিঠির কথা বলছি, তা লেখা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে, ঢাকা থেকে। আর পৌঁছেছিল কলকাতা। যিনি লিখেছিলেন, সেই রশীদ করীম আজ আর আমাদের মাঝে নেই। এই নভেম্বরের ২৬ তারিখে তাঁর মৃত্যুর দুবছর পূর্ণ হবে। আর কালের খেয়ালেই কিনা, চিঠিটা যাকে পাঠানো হয়েছিল, সেই সুস্মিতা ইসলাম এখন নিজেই ঢাকাতে, আজো সে-চিঠি গভীর যত্নে আগলে রেখেছেন অকৃত্রিম এক সুহৃদের অমলিন সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে। চিঠিটি যে এখন শুধু দুজনের স্মৃতি-নিবন্ধন তাই নয়, তারচেয়েও বেশি কিছু, অর্জন করে নিয়েছে সাহিত্য-মূল্য, কেন, তা পড়লেই বোঝা যাবে আর সে-কারণেই মনে হলো এটি সাহিত্যমোদীদেরও পাঠযোগ্য।

Dacca

1 feb, 1958

দিদি                                               

আমার উপন্যাসটিকে নিয়ে বড়ই বিব্রত হয়ে পড়েছি।

সুবোধ বালকের মত, লেখনী এতদিন বেশ বাধ্য ছিল –

যেদিকে যেভাবে চালনা করছিলাম সেদিকে সেইভাবেই

এগোচ্ছিল। কিছুদিন থেকে কি হয়েছে, কিছুতেই কথা

শোনে না!

নৌকা যেন চরায় ঠেকে গেছে – গুণ ধরে টেনে

টেনে কাহাতক এগোনো যায়!

কিছুদিন থেকে একটি অক্ষরও লিখতে পারিনি। একটি

কঠিন অধ্যায়ে পৌঁছে বড়ই কোণঠাসা হয়ে গেছি।

এমনটিই হয়। আবার হয়ত একদিনে বিশ পাতা লিখে

ফেলব। কিন্তু লেখা যদি মনের মত না হয়, তাহলে

না লেখাই ভাল।

আমার মুশকিল এই যে, কি লিখব আগে থেকেই

ঠিক। মনের মধ্যে যে ছবিটি আছে ঠিক সেই

ছবিটির উপযোগী রঙ যেন খুঁজে পাচ্ছি না। অন্য রঙ

ব্যবহার করা যায়, তাতে হয়ত ভাল ছবিও আঁকা

চলে, কিন্তু সে আর একটি অন্য ছবি হবে। আমার

মনের ভিতরকার ছবির সঙ্গে তার মিল থাকবে না।

ইত্যাকার কারণে বড়ই দুঃখের মধ্যে কালাতিপাত

করছি। অথচ এতটা এগিয়ে এখন পিছ্পা হতে

পারি না – তাহলে আত্মসম্মান আর আত্মনির্ভরশীলতার

তিলমাত্র অবশিষ্ট থাকবে না। জীবনে আর কোনদিন

লেখাও হবে না।

এতদিন লিখিনি – দিব্যি ছিলাম। এখন লিখতে

বসে লেখাই আমাকে পেয়ে বসেছে। সে কি

হয়রানি।

আমার পরিকল্পনা অনুসারে ‘উত্তম পুরুষ’ তিন

খন্ডে শেষ হবে। শ্রীকান্ত-র কথা মনে করিয়ে

দেয়? সে বিচার পরে হবে।

প্রথম খন্ডটি আর তিন মাসের মধ্যে শেষ করতেই

হবে। আমিন!

 

আপনারা ভাল আছেন?

দুদিন আমাদের বাবুর্চ্চি ছিল না। ফুল রান্নাবান্না

করেছে। তারপর হাত-পায়ে ব্যথা – এখন

প্রায় চিৎ।

অবশ্য রান্না তার ভালই হয়েছিল মানতেই হবে।

 

গোলাম মুরশেদ

 

গোলাম মুরশেদ রশীদ করীমের মূল নাম। এ-চিঠিটা যখন লিখেছেন, বোঝাই যাচ্ছে, উত্তম পুরুষ লেখা নিয়ে তিনি কতটা নিমগ্ন ছিলেন। লিখতে পারার আনন্দ, লিখতে না পারার বেদনা – সব মিলিয়ে অদ্ভুত মিশেল এক অনুভূতি। আর উত্তম পুরুষ যাঁরা পাঠ করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন, এ-উপন্যাসটিকে ঘিরে রশীদ করীমের যেমন পরিকল্পনা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। তিনি উত্তম পুরুষ লিখতে চেয়েছিলেন তিন খন্ডে। যেমনটি লেখা হয়েছিল শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত। শুধু এ-তথ্যটির জন্যই এ-চিঠিটা অন্তত রশীদ করীমের সাহিত্যমানস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উত্তম পুরুষ উপন্যাস নিয়ে তিনি নিজেও একটি লেখা লিখেছিলেন, সেটা অসুস্থ অবস্থায়, সে কারণেই বোধকরি সেখানে প্রকৃত তথ্য সেভাবে বের হয়ে আসেনি, আর এ-চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন উত্তম পুরুষ রচনার সময়। তাই এটি ছোট একটি চিঠি হলেও মূল্যবান।

এখন যদি এই চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে লক্ষ করা যাবে, রশীদ করীম যেভাবে উত্তম পুরুষ লিখতে চেয়েছিলেন, সেভাবে পরিকল্পনামতো হয়ে ওঠেনি। তিন খন্ডের বদলে এটি লেখা হয়েছিল এক খন্ডেই। এ-চিঠি তিনি লিখেছিলেন ১৯৫৮ সালে, আর উত্তম পুরুষ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে এমন কী কারণ ঘটল যে, লেখক তিন খন্ডে উপন্যাসটি লেখার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে এক খন্ডেই সমাপ্ত করেছেন! না, এর জবাব তিনি কোথাও লিখে যাননি, এমনকি ইঙ্গিতও রাখেননি। আমি নিজে একাধিকবার তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। কখনোই এ-বিষয়ে জানতে চাইনি, কৌতূহলও ছিল না। কীভাবে থাকবে, এ-চিঠিটা আবিষ্কার হলো মাত্র মাসখানেক আগে।

যা হোক, লেখক যেভাবে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে শেষ পর্যন্ত উপস্থাপন করেছেন সেটাকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। তবে, আমার মনে হয়, তিনি যেভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন, সেভাবেই যদি উত্তম পুরুষ লেখা হতো, নিঃসন্দেহে এটি আরো পরিপূর্ণতা পেত, এমনকি হয়ে উঠতে পারত এপিকও – যখন দেশবিভাগের মতো হৃদয়ভাগের অনুষঙ্গও জড়িয়ে আছে প্লটটিতে। উত্তম পুরুষ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সে-সময়ে বিশিষ্ট পন্ডিত আবুল ফজল স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে মাহে নাও সাময়িকীতে উপন্যাসটির ব্যাপক প্রশংসা করেছিলেন। তিনি অবশ্য এও বলেছিলেন, ‘এ যুগের এক মুসলমান নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের একটি ছেলের বাল্য ও স্কুল-জীবনের অভিজ্ঞতা ও তার মনের ছবিটা বেশ দক্ষতার সঙ্গে অাঁকা হয়েছে বইটির প্রথমাংশে। আমরা অনেকেই কাগজে প্রথমাংশ পড়ে আশা করেছিলাম, লেখক হয়ত শেষ পর্যন্ত এই দক্ষতা অব্যাহত রাখতে পারবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাঝপথেই ছন্দপতন ঘটেছে।… মনে হয় যেন-তেন প্রকারে বইটা শেষ করে দিয়ে লেখক যেন অব্যাহতি পেতে চাইছেন।’

ঠিক এই জায়গাটিতেই লেখকের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে আবুল ফজলের আক্ষেপের একটি সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। তৎকালীন কলকাতার সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে উপন্যাসটির প্রথমদিকে যেভাবে শাকের এবং ওর পরিবারের চিত্র অত্যন্ত ডিটেইলে ধরা পড়েছে, নানা গল্প, ঘাত-প্রতিঘাতের বর্ণনার মাধ্যমে খুলে যাচ্ছিল সময়ের ভাঁজ – শেষ পর্যন্ত সে-গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল। সম্ভবত আরো দু-খন্ডে রচিত হলে আমরা উপন্যাসটির ডিটেইলিংয়ের কাজ আরো সুবিন্যস্তভাবে পেয়ে যেতাম। তাতে শাকের চরিত্রের বিকাশ যেমন পাঠকের কাছে আরো ব্যপ্তিময় হয়ে উঠত, সেলিনা-নিহার ভাবিদের ছলাকলা নিয়েও সমালোচকদের পাড়ায় পাড়ায় হালকা ফিসফিসানিটুকুও থাকত না। রশীদ করীম যত না বড় মানুষ ছিলেন, তারচেয়েও বেশি ছিলেন একজন সৎশিল্পী। সে-কারণেই জীবনসায়াহ্নে এসে বলতে পেরেছেন, ‘উত্তম পুরুষ আমার বারোটি উপন্যাসের মধ্যে সর্বপ্রথম রচিত হয়। কোনটি শ্রেষ্ঠ? আপনারাই বলুন না? আমার পক্ষে বলা অসম্ভব। আমার শুধু এই গানটা মনে পড়ে : অল্প লইয়া থাকি তাই/ মোর যাহা যায় তাহা যায়। তবে এখন মনে হয় উত্তম পুরুষ আরো কিছুটা সুবিন্যস্ত হতে পারতো।’

তবে, রশীদ করীম বিনয় করে যা-ই বলুন, আর আবুল ফজলের যে সামান্য আক্ষেপ, সেসব সত্ত্বেও উত্তম পুরুষ কালের বিচারে আজ বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ উপন্যাস হিসেবে টিকে গেছে। সেই ১৯৬১ সালে প্রকাশ-পরবর্তীকালে লেখক সংঘ পত্রিকায় কবি আহসান হাবীব উত্তম পুরুষকে যে স্বীকৃতিটুকু দিয়েছিলেন, আজো তা সমান গুরুত্ব বহন করে, ‘আধুনিক মননশীলতা, পরিশীলিত আঙ্গিক এবং অভিজ্ঞতার নির্লিপ্ত বর্ণনায় ‘লাল সালু’ এ সমাজে পথিকৃতের চেহারায় আবির্ভূত হয়। অতঃপর ‘কাশবনের কন্যা’, ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’, ‘জননী’, ‘শেষ রজনীর চাঁদ’, ‘উত্তম পুরুষ’। ব্যতিক্রম হিসেবে যে কটি বইয়ের আমি নাম করেছি তারও মধ্যে ‘উত্তম পুরুষ’ আমার বিবেচনায় বিশিষ্ট এই জন্যে যে, মুসলমান সমাজের ঐতিহ্য, আবেগ-অভীপ্সা এবং বিশেষ চরিত্রের প্রতি একনিষ্ঠ ও সশ্রদ্ধ থেকেও নতুন মূল্যবোধে লেখক উদ্বুদ্ধ এবং নিঃসংশয়। একটা অনাচ্ছন্ন দৃষ্টিই তাঁকে উত্তীর্ণ করেছে এক সৎ কথাশিল্পীর আসনে। সৎ এই অর্থে যে, সেলিনা বা নীহার ভাবী অথবা যানি সাহেবের মত ব্যক্তিত্ব; এমন কি যে চন্দ্রা শাকেরের কিশোরচিত্তে ছিলো একটি অর্ধোস্ফুট স্বপ্নসম্ভাবনা, সেই চন্দ্রার রঙিন দুস্থতাও তাকে অবুঝ বিহবল স্বজনের ভূমিকায় নামিয়ে নিতে পারে নি। নিজের অভিজ্ঞতা তিনি পরিবেশন করেছেন মাত্র, আর সে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের দুর্গম ভ্রমণে ছিলো যে দুঃখদাহন, তা সমাজসম্পৃক্ত অনুভূতিলোকে এমন এক কথারূপ লাভ করেছে যে রূপ ফুটিয়ে তুলতে পারে কেবল শিল্পীজন।’

২০১২ সালে উত্তম পুরুষ পঞ্চাশ বছর অতিক্রম করেছে। অথচ এখনো এ-উপন্যাস সমান প্রাসঙ্গিক। উলটো নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে পুরনো সব সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করে। এই তো সেদিন এ-সময়ের  বিদগ্ধ সমালোচক রফিক কায়সার উত্তম পুরুষ সম্পর্কিত এক প্রবন্ধে আলোকপাত করেন, ‘উত্তম পুরুষ-এর অনেকটা অংশ জুড়ে আছে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের জটিলতা, সংঘাত ও বিরোধের বিষয়টি। ছেলেবেলায় স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার, ছুঁয়োছুঁয়ির বিষয়টিকে লেখক শাকের চরিত্রের অনুষঙ্গে তুলে ধরেছেন। শাকের নিজে জিন্নাহভক্ত, পাকিস্তান রাষ্ট্রে বিশ্বাসী, হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক অবস্থান এবং ভিন্নতাকে সে মানে। বিষয়গুলোর প্রাসঙ্গিকতাগুলো বস্ত্ততপক্ষে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাজনিত কারণে সৃষ্ট। রশীদ করীম কেবল কাহিনির অনুষঙ্গে এবং চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়গুলোকে ব্যবহার করেছেন। তৈরি করেছেন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে নিজস্ব বয়ান। এড়িয়ে যাননি। পাশ কাটাননি। এখানেই তার সততা ও আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। পঞ্চাশ বছর আগে সমকাল পত্রিকা রশীদ করীমের উত্তম পুরুষের ধারাবাহিক রচনা স্থগিত করে লেখকের ভিন্নমতকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেনি। দ্বিতীয়ত রশীদ করীম তাঁর রচনায় কখনই কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে আঘাত করে কিছু লিখেছেন বলে আমাদের জানা নেই। সমকালের উল্লিখিত কার্যক্রমটি অযৌক্তিক এবং অবিবেচনাপ্রসূত বলেই প্রতীয়মান হয়।’

১৯৬১ সালে প্রকাশিত উত্তম পুরুষ শুধু সেই সময়ের অত্যন্ত প্রেসটিজিয়াস আদমজী পুরস্কার-ই লাভ করেনি, একই সঙ্গে সমালোচকদের দ্বারা বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। লাভ করেছিল বিপুল পাঠকপ্রিয়তা। মাত্র পনেরো মাসের মধ্যে প্রথম প্রকাশের দুই হাজার ২৫০ কপি বই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তাই পরের বছরই দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে তিন হাজার ২৫০ কপি বাজারে আসে। যা তখনকার সময়ের জন্য অভাবনীয় তো বটেই, আধুনিক সময়ের জন্যও উল্লেখ করার মতো।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক পুথিগত বিদ্যাসর্বস্ব এবং মধ্যযুগীয়মুখী তথাকথিত সাহিত্য-সমালোচকগণ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্  বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসদের পাশে রশীদ করীম কিংবা আবু জাফর শামসুদ্দিনের মতো আরো অনেকের নাম বসাতে চান না। এঁরা ক্ষুদ্র গন্ডীয় কোনো মতাদর্শ অথবা অহমিকা বোধে নিজস্ব বিবরে বন্দি, কিন্তু সৃজনশীলতার আলো ফেলে যদি উদার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতেন, তাহলে আমাদের সাহিত্য-আকাশের ধ্রুবতারারা আরো স্পষ্ট ঝলমল করতো, সুখের কথা যে, এই দৈন্যের ভেতরেও বেশ কয়েকজন সৃজনশীল সমালোচকের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে বলে রশীদ করীমের নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। পূর্বসূরি এবং সমকালীন ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসগুলোর সঙ্গে যদি রশীদ করীমের উত্তম পুরুষের তুলনা করা যায়, একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে, তিনি উপন্যাসে আধুনিক ভাষার নির্মাতা। কি বলার ভঙ্গিতে, কি ভাষার বুননে বা শব্দ ব্যবহারে তিনি প্রচলিত রীতি একধাপ ভেঙে সহজ-সরল এবং স্বচ্ছন্দ। সুযোগ পেলেই স্যাটায়ার রসের প্রয়োগ করেছেন। প্রাঞ্জল তাঁর ভাষা। একটুকুও মেদ নেই, বাহুল্য নেই। রয়েছে একটি সরস এবং অভিজাত ছন্দময় গতি। সে-কারণেই উত্তম পুরুষ পঞ্চাশ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ক্লিশে হয়ে যায়নি, হয়তো আগামী পঞ্চাশ বছর পরও একই রকম থাকবে। বলা বাহুল্য, বর্তমানে এই ভাষাভঙ্গি কিংবা উপস্থাপনাই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

দুই

উত্তম পুরুষ নিয়ে অনেক কথাই হলো, কিন্তু যাঁকে লেখা রশীদ করীমের চিঠির সূত্র ধরে এই আলোচনা, তাঁর সম্পর্কেও কিছু বলার প্রয়োজন আছে। আসলে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে রশীদ করীমের সাহিত্য মনন এবং রুচিশীলতা কীভাবে গড়ে উঠেছিল সে-প্রসঙ্গও উঠে আসবে। সে-কারণেই বোধ করি, সুস্মিতা ইসলাম সম্পর্কে এখানে দু-কথা বলাটা অযৌক্তিক হবে না। সুস্মিতা ইসলাম নানাভাবেই জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে, আজ থেকে নয়, সেই দেশবিভাগের আগ থেকে। কলকাতার অত্যন্ত বনেদি পরিবারের মেয়ে তিনি, পিতামহ নিখিল রায় ছিলেন একজন ঐতিহাসিক। সুস্মিতা চক্রবর্তী থেকে তিনি কীভাবে সুস্মিতা আনোয়ার হয়ে উঠলেন সে অনেক কথা, অনেক ঘটনা, তবে এইটুকু বলি, কবি গোলাম মুস্তাফার বড় ছেলে তৎকালীন ভারতবর্ষের এক সুদক্ষ পাইলট এবং শৌখিন গায়ক মুস্তাফা আনোয়ারের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি কলকাতার ৫নং পার্ল রোডের ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। যেখানের একটি ফ্ল্যাটে আগে থেকেই থাকতেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র-গবেষক আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং আরেকটি ফ্ল্যাটে প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। ৫নং পার্ল রোডের এ-বাড়িটি এসব কারণেই আজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও ঠাঁই করে নিয়েছে।

তো, ও-বাড়িতেই সবচেয়ে কনিষ্ঠ লেখক হিসেবে আড্ডা দিতে আসতেন রশীদ করীম। তারপর কীভাবে রশীদ করীমের সঙ্গে সুস্মিতা ইসলামের পরিচয় হলো, পরিচয় থেকে অকৃত্রিম সুহৃদ সেটা সুস্মিতা ইসলামের স্মৃতিচারণা থেকেই জানা যাক, ‘আইয়ুব তখন চিকিৎসার পর সদ্য মদনপল্লী থেকে ফিরেছেন। সুস্থ হলেও তাঁর চলা-বলা, আহার সবকিছুতেই খুব সতর্কতা ছিল। কথাও বলতেন বেশ মৃদুস্বরে; কিন্তু দৃঢ় উচ্চারণে। আইয়ুব ও মুজতবা ছিলেন বন্ধু। চিন্তা-ভাবনায় মতৈক্যের চেয়ে মতানৈক্যই বেশি ছিল বলে মনে হতো। খালার এই প্রাতরাশের টেবিলে প্রতিদিন সকালে নানান বিষয়ে আলোচনা হতো। এই টেবিলের অপর দুজন উল্লে­খযোগ্য সদস্য ছিলেন – প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক রশীদ করীম ও আনোয়ারের বন্ধু, খালার ছোট ভাই মাহমুদুর রহমান ওরফে কচি। রশীদ করীম বসত মুজতবার পাশেই আর তার পাশে বসত কচি। যদিও তখন দেশবিভাগ, দাঙ্গা ইত্যাদির খবরে খবরের কাগজের পাতা ঠাসা, তবু এদের প্রত্যহের আলোচনা ও তর্কে প্রাধান্য পেত সাহিত্য এবং সংগীতের আলোচনা। এই গুণীজনসভায় আমার নিজেকে ভারী অপাঙক্তেয় বলে বোধ হতো। প্রথম প্রথম তো মুখই খুলতাম না। ক্রমে কখন একসময় আমিও যে কেমন করে তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জড়িয়ে পড়েছিলাম তা নিজেই টের পাইনি। কোনোদিন যেতে দেরি হলে বা একেবারেই না গেলে খালা লোক দিয়ে ডেকে পাঠাতেন। আজ লিখতে বসে ভারী দুঃখ হচ্ছে এই ভেবে যে, কেন তখন ডায়েরি লিখিনি। প্রতিদিন একযোগে আবু সয়ীদ আইয়ুব, সৈয়দ মুজতবা আলী ও রশীদ করীমের মতন ব্যক্তিত্বের সঙ্গ যে কতই দুর্লভ অভিজ্ঞতা – আজ তা মর্মে মর্মে অনুভব করি আর শুধু স্মৃতি হাতড়ে সেসব দিনের দুর্লভ মুহূর্তগুলোকে মনে করার চেষ্টা করি।

রশীদ করীম সেই বছর বিএ পরীক্ষার্থী, কিন্তু এরমধ্যেই তরুণ লেখক হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আর আইয়ুবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সে তখনই। তাছাড়া বুদ্ধদেব বসু তাঁর লেখা প্রথম গল্প ‘একটি মেয়ের আত্মকাহিনী’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন। সঞ্জয় ভট্টাচার্য পূর্বাশায় গল্প ছেপেছেন। রেডিওতে সাহিত্য আসরে প্রায়ই সে তাঁর লেখা ছোটগল্প পড়ত। কাজেই আইয়ুব মুজতবার সঙ্গে সঙ্গে এই আসরে নিজ গুণেই রশীদ করীমেরও একটি বিশেষ স্থান ছিল। খালার ছেলেমেয়েরা সকলেই আনোয়ারকে ‘আনোয়ারভাই’ বলত বলে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম দিন থেকে আমি তাদের সবার  ভাবি হয়ে উঠেছিলাম; কিন্তু রশীদ করীমের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর সে বলল, ‘আমি আপনাকে ভাবি বলবো না, আপনি আমার দিদি।’

সেই থেকে আজো আমি রশীদ করীমের দিদি হয়েই রইলাম। সেদিনকার সেই বাইশ বছরের স্বাস্থ্যবান সুন্দর, সুপুরুষ প্রাণবন্ত রশীদ করীমের কথা লিখতে বসে আজকের প্রয়াত রশীদ করীমের কথা মনে হতেই কলমটা আপনা থেকেই হোঁচট খেল। আজ থেকে প্রায় একুশ বছর আগে হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে বাঁ-হাতটি অকেজো হয়ে যাওয়ার পর আর কোনোদিনই রশীদ করীম কলম ধরেনি। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকদের কারোর অনুনয়েই সে আর অপরের সাহায্যে লিখতে রাজি হয়নি। এতে বাংলা সাহিত্যের বিরাট এক ক্ষতি হয়ে গেল। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তার স্মৃতিশক্তি, মেধা ও মনন অত্যন্ত প্রখর ছিল। যে-কোনো দিন, যে-কোনো সময় ওর কাছে গিয়ে বসলে দেশি-বিদেশি যে কোনো সাহিত্যের বিষয়ে তখনো তাকে আগ্রহী আলোচক হিসেবে পাওয়া যেত। যারা যেত তারা অনেকখানি আনন্দ পেয়ে ও ঋদ্ধ হয়েই ফিরে আসত।

দেশবিভাগের পর রশীদ করীম পুরো পরিবার নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে এলেও সুস্মিতা আনোয়াররা থেকে গিয়েছিলেন ভারতেই। পরে, অবশ্য ভারত ছেড়ে তারাও চলে আসেন পাকিস্তান এবং এক বিমান দুর্ঘটনায় ক্যাপ্টেন মুস্তাফা আনোয়ার অকালে চলে যান পৃথিবী ছেড়ে, সুস্মিতা আনোয়ারের জীবনে ঘটে ছন্দপতন। সে-সময়ে রশীদ করীম দিদির খোঁজখবর নিয়েছেন আপন ভাইয়ের মতোই। যে ধারা অব্যাহত ছিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। ২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর ভোরবেলা আমিই সুস্মিতা ইসলামকে মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলাম রশীদ করীমের চলে যাওয়ার সংবাদটা। দিদি অনেকক্ষণ কথা বলতে পারেননি, চুপ করেছিলেন। ভোরের নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল তার নিস্তব্ধতা।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার