লজ্জিত ঘাস

লেখক:

শাহ্নাজ মুন্নী

 

হেমমেত্মর মধ্যরাত। মৃদুমন্দ ঠান্ডা হাওয়া বইছে। রংপুর শহরের সব মানুষ সারাদিনের কাজকর্ম সেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাস্তাঘাটে সুনসান নীরবতা। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের সামনে এসে থামল একটা অ্যাম্বুলেন্স আর চারটা সরকারি গাড়ি। গাড়িবহরের সামনের সাদা জিপ থেকে দ্রুত নেমে এলেন রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রিয়সিন্ধু তালুকদার। অন্য গাড়িগুলোর একটিতে পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আরেকটিতে মেয়র কার্যালয়ের সেক্রেটারি ও আরো কয়েকজন লোক। বাকি গাড়িদুটোতে আছেন গোটা দশেক পুলিশ কনস্টেবল ও দুজন তরুণ মৌলবি।

আগেই হয়তো এখানে খবর দেওয়া ছিল। তাই বেশিক্ষণ সময় লাগল না। একটু পরেই,

হিমঘরের বরফঠান্ডা কেবিন থেকে মৃত্যুর ১০ দিন পর বের করে আনা হলো পলিথিনে মোড়ানো একজন মানুষের শক্ত শীতল মৃতদেহ।

মরদেহটি কাঠের কফিনে ভরে দ্রুত তুলে নেওয়া হলো অ্যাম্বুলেন্সে। দাঁড়িয়ে থেকেই চটপট কয়েকটা প্রয়োজনীয় কাগজে সই করলেন প্রিয়সিন্ধু তালুকদার। তারপর, চাপাস্বরে কারো কাছে জানতে চাইলেন, ‘হয়েছে?’

নিস্তব্ধ রাতে সেই চাপা কথাটাই খুব জোরে শোনা গেল।

‘ইয়েস, স্যার।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন সঙ্গে থাকা কেউ একজন।

‘চলেন, তাহলে রওনা দেয়া যাক।’

চারটা গাড়ি আর একটি অ্যাম্বুলেন্স রংপুর শহরের নীরব রাস্তা চিরে দ্রুতবেগে ছুটে চলল তিন কিলোমিটার দূরের মুন্সীপাড়া পৌর কবরস্থানের দিকে। এ-অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো আর বড় কবরস্থান এটি। আগে থেকেই নির্দেশনা থাকায় কবর খুঁড়েই রাখা হয়েছিল।

কাঠের কফিনটা সামনে রেখে জানাজা পড়ানোর প্রস্ত্ততি নিলেন একজন মৌলবি। পেছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন কয়েকজন মানুষ। তারা মৃতদেহের সঙ্গে আসা পুলিশ ও সরকারি লোকজন, কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক, গোরখোদক, পাশ্ববর্তী কেরামতিয়া মসজিদের মুয়াজ্জিন ও কবরস্থানে ঘুরতে থাকা দুয়েকজন ভবঘুরে।

 

‘আলস্নাহু আকবর’, ‘আলস্নাহু আকবর’ বলে তাকবির পড়ে উচ্চৈঃস্বরে জানাজার নামাজের নিয়ত করলেন মৌলবি সাহেব। তারপর দোয়া পড়লেন, ‘আলস্নাহুম্মাগফিরলি হ্যায়্যি না ওয়া মায়্যিতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া ছাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা…

হে আলস্নাহ, আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, বালক ও বৃদ্ধ, পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগকে ক্ষমা করো… ’

কাতারের একটু পেছনে আলাদা হয়ে একাই দাঁড়িয়ে থাকলেন প্রিয়সিন্ধু তালুকদার। হাতদুটো শক্ত করে বুকের কাছে বেঁধে, চোখ বন্ধ করে, মনে-মনে প্রার্থনা করলেন,

‘অকারণে খুন হয়ে যাওয়া এই ভিনদেশি মানুষটির আত্মার শামিত্ম দিও ভগবান।’

কুনিও হোশি ওরফে গোলাম কিবরিয়ার দাফন যখন শেষ হলো, তখন সুবেহ সাদেকের নরম আলো এসে পড়েছে পৃথিবীতে। ছাইরঙা শহরটা সূর্যের আলোয় ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন এসেছিল তেমনভাবেই দ্রুত ফিরে যাচ্ছে একটা অ্যাম্বুলেন্স ও চারটা সরকারি গাড়ি।

 

দুই

সাইদুর রহমান যখন প্রথম জাপানে যান, তখন তার ধারণাই ছিল না যে, জাপানের মতো এত ধনী, উন্নত আর আধুনিক দেশেও জীর্ণ, মলিন, পোশাক পরা ভিখিরিগোছের মানুষজন থাকতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটা দরিদ্র দেশে দরিদ্র মানুষজন থাকবেন, এ তো জানা কথাই; কিন্তু জাপানে এই দরিদ্র মানুষরা কেন?

তিনি নিজে হতদরিদ্র অবস্থায় সেই ১৯৭৮ সালে বহু ঘাটের পানি খেয়ে শেষ পর্যন্ত জাপানে এসে ঠাঁই নিয়েছিলেন। টোকিও শহরের সেই হাড়-কাঁপানো শীতে একটা অপরিচিত দেশে, আত্মীয়-পরিজনহীন অবস্থায় দয়াপরবশ হয়ে তাকে আশ্রয় দিয়েছিল সেণহময়ী বুড়ি তানাকা মেগুমি। কৃতজ্ঞতায় আপস্নুত সাইদুর মা ডেকেছিল সেই দয়ালু মমতাময়ী নিঃসন্তান জাপানি বুড়িকে। মা শুধু তাকে আশ্রয়ই দেয়নি, পালিত কন্যা আইকোর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, নিজের ছোট্ট রেস্টুরেন্টের ভারও বিশ্বাস করে তুলে দিয়েছিল সাইদুরের হাতে।

মেগুমির প্রত্যাশামতোই সাইদুর যত্ন করে ব্যবসা বাড়িয়েছে, তার হাতে সেই ছোট্ট রেস্টুরেন্ট আরো বড় হয়েছে, কিন্তু বুড়ি মেগুমির উপদেশমতো এখনো সকালবেলা নিজ হাতে দোকান খোলে সাইদুর, কর্মচারীদের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে সে আর আইকো।

ভবঘুরে কুনিও হোশির সঙ্গে তার দেখা হয় একদিন সকালে রেস্টুরেন্ট খোলার সময়। সাইদুর হঠাৎ করে খেয়াল করে, তার রেস্টুরেন্টের দরজা-ঘেঁষে ফুটপাতের ওপর কেউ একজন গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। সাইদুর কাছে গিয়ে, ভালো করে তাকিয়ে দেখে লোকটাকে, শতচ্ছিন্ন একটা কোট গায়ে এক মাঝবয়সী হতদরিদ্র জাপানি, চোখদুটো বন্ধ।

‘নানো ওশিতে ইরো নো দেস কা? কী করছো তুমি এখানে?’

একটু উঁচু গলায় জানতে চায় সাইদুর। ধড়ফড় করে উঠে বসে শুয়ে থাকা জাপানি লোকটা। ভয় পাওয়া গলায় বলে, ‘নানিমো নাইন। ইয়েকোতে তোয়ত্তে মাস। কিছু করছি না, শুয়ে আছি শুধু। ক্ষমা করো।’

সাইদুরের হঠাৎ কেমন মায়া হয়, লোকটার অসহায় শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে, কেন যেন নিজের মৃত বাবার মুখটা মনে পড়ে যায় তার। বুকের মধ্যে হঠাৎ একটা তীব্র ধাক্কা খায় সে। নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,

‘তাবে মাস তাকা? খেয়েছো কিছু?

শুকনো মুখে মাথা নাড়ে লোকটা। ‘ইয়ে।’

ভবঘুরে লোকটাকে রেস্টুরেন্টের ভেতর নিয়ে বসায় সাইদুর। আইকোকে ডেকে বলে কিছু খাবার দিতে। বুভুক্ষুর মতো গোগ্রাসে খাওয়া শেষ করে লোকটা। এর মধ্যেই সাইদুর প্রশ্ন করে জেনে নেয়, ওর নাম কুনিও হোশি, ধনী দেশের এক গৃহহীন দরিদ্র নাগরিক সে। হিনোহারা গ্রামে বাপের সামান্য জমি পেয়েছিল কুনিও,
চাষাবাদও করত। একটা সময় কুসঙ্গে পড়ে মদ আর জুয়ার নেশায় ডুবে যায়। জমি হারায়, একদিন বউও ছেড়ে চলে যায় তাকে। এরপর থেকে কপর্দকহীন অবস্থায় জাপানের শহরগুলোতে ঘুরে বেড়ায় হোশি। মানুষের বারান্দায়, পার্কে, রেলস্টেশনের বেঞ্চিতে রাত কাটায়। মাঝে-সাঝে এখানে-ওখানে দিনমজুরি করে, কদিন ধরে জ্বরে ভুগে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে সে, কাজকর্মও করতে পারছে না। তাই অসুস্থ শরীরে রাতে এসে শুয়ে পড়েছে এখানে।

কুনিও হোশিকে আশ্রয় দেয় সাইদুর।

ওষুধ খাওয়ায়, সুস্থ করে তোলে। হোটেলের টুকটাক কাজে এখন সাহায্য করতে পারে বুড়ো লোকটা। কিন্তু সাইদুর তাকে পছন্দ করলেও আইকোর দুচোখের বিষ যেন কুনিও হোশি। সারাক্ষণই গজগজ করে, ‘বুড়াটা একটা মিচকা শয়তান, ভালো মানুষের মতো মুখ করে থাকে এখন, কিন্তু সুযোগ পেলেই দেখবে সব চুরি করে পালাবে, এদের একদম বিশ্বাস করি না আমি।’

সাইদুর বউকে বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘দেখো গরিব মানুষ ও। বেচারা থাকুক না আমাদের সঙ্গে… ’

‘ইয়ে। না। থাকতে পারব না ও। তাড়াতাড়ি বিদায় করো ওকে।’

গৃহের এই অশামিত্মর ব্যাপারটা ঠিকই টের পেয়ে যায় বুড়ো। একদিন নিজে থেকেই বলে,

‘মেলা দিন তো থাকলাম বাবা, শরীরটাও ঠিক হয়েছে, এবার বিদায় দেও। অন্য কোথাও যাই।’

‘কই যাবা তুমি?’ সাইদুর জিজ্ঞেস করে।

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর চোখ তুলে বলে, ‘পথের মানুষ পথেই ফিরে যাবো।’

সাইদুরের মাথায় হঠাৎ করেই অন্য একটা চিন্তা খেলে যায়। সাত পাঁচ না ভেবেই সে জিজ্ঞেস করে, ‘ওয়াতামিনু কুনিনি ইকো না দারোকা? আমার দেশে যাবা?’

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত এক অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ যেন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। একটুও ইতস্তত করে না সে। বলে, ‘হাইয়ি। ইকি মাস।’

কুনিওর কাছে বাংলাদেশ মানেই সাইদুরের দেশ। যেহেতু সাইদুর ভালো মানুষ তাই তার দেশের মানুষগুলোও ভালো হবে বলে বিশ্বাস তার। কুনিওর মতামত পেয়ে সাইদুর আর দেরি করে না, বাংলাদেশে, রংপুরের মুন্সীপাড়ায় তার বন্ধু মিশনকে ফোন করে সে। পরবর্তী ঘটনাগুলো বেশ দ্রুতই ঘটে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়ে পেস্ননের টিকিট কেটে এক মাসের মধ্যেই কুনিও হোশি চলে যায় বাংলাদেশে।

ঢাকায় তাকে রিসিভ করে রংপুর নিয়ে যায় মিশন। মুন্সীপাড়ায় দুই রুমের একটা বাসা ঠিক করে দেয়। শরীফ মিয়া নামের এক কিশোরকে ঠিক করে দেয় তার দেখাশোনা আর রান্নাবান্না করে দেওয়ার জন্য।

কুনিও হোশির চেহারাটা হাসি-হাসি। আর গড়পড়তা জাপানিদের মতোই খুব বিনয়ী একটা ভঙ্গি আছে তার। সাইদুর আগে থেকেই

তাকে ‘কেমন আছেন?’, ‘ধন্যবাদ’, ‘ভাত খাব’, ‘পানি খাব’ এমন কিছু সাধারণ বাংলা শিখিয়ে দিয়েছিল। বাকি কথা শেখানোর দায়িত্ব নিল শরীফ মিয়া। মুন্সীপাড়ার লোকজন প্রথম-প্রথম কুনিও হোশির ব্যাপারে বাড়তি কৌতূহল দেখালেও ধীরে-ধীরে সেটা কমে গেল। এলাকায় জাপানি বুড়া হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল হোশি। তবে সবাই জানত তার নাম হিতা কুচি। মুন্সীপাড়ার শিশুরা হিতা কুচির বাংলা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ত। তারা ওকে নিয়ে ছড়া কাটত,

‘হিতা কুচি, গুচি পুচি,

খাও শুধু আলু, লুচি।’

ওদের কথা শুনে হিতা কুচি ওরফে কুনিও হোশিও দাঁত বের করে, চোখ ছোট-ছোট করে হাসত। বাচ্চাদের চকোলেট কিনে দিত।

মিশন ব্যস্ত মানুষ। তবু নিয়মিত কুনিওর খোঁজখবর করে। হাজার হলেও সাইদুরের অতিথি সে। একদিন মিশনের কাছে একটা আবদার করে বসে কুনিও, ভাঙাচোরা বাংলায় বলে, ‘বসে থেকে সময় কাটে না, আমাকে এক টুকরা জমির ব্যবস্থা করে দেও, চাষাবাদ করব।’

মিশন একটু চমকিত হয়। বলে, ‘কী চাষ করতে চাও তুমি?’

হোশি একটু ভাবে। তারপর বলে, ‘এক ধরনের বীজ আছে আমার কাছে। সেই বীজ দিয়ে ঘাস চাষ করতে পারি।’

‘ঘাস? ঘাস তো এমনি-এমনিই জন্মায়। কেউ আবার ঘাস চাষ করে নাকি?’

‘না, না, এটা অন্য জাতের ঘাস। খুব ভালো জিনিস।’

কুনিওকে আর কিছু বলে না মিশন। জাপানে সাইদুরের সঙ্গে কথা বলে সে।

‘দোস্ত, তোর অতিথি তো দেখি চাষবাস করতে চায়। কী করি?’

সাইদুর বলে, ‘কাজ ছাড়া বসে থাকতে হয়তো বেচারার ভালো লাগছে না। দেখ, যদি আশপাশে খালি জমি পাস, তাহলে লিজ-টিজ নিয়ে দে। চাষাবাদ করতে চাইলে করুক। অসুবিধা কী? টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তা করিস না, আমি পাঠাব।’

মিশন তার লোকজনকে দিয়ে খোঁজ লাগায়। শেষ পর্যন্ত কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি গ্রামে ১২ কাঠার একখ- জমি লিজ নিয়ে দেয় হোশিকে। জমি পেয়ে বুড়ো তো খুব খুশি। নিজেই খালি পায়ে মাটিতে নেমে পড়ে, মুঠো ধরে মাটি তুলে নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোঁকে, কোদাল দিয়ে মাটি কোপায়, কি করে, না করে! আলুটারি গ্রামের শিশু-কিশোররা সে-দৃশ্য দেখে দাঁত বের করে হাসে। বয়স্করাও হাঁটাচলার পথে বুড়োর কা- দেখে মুচকি হাসে। চায়ের দোকানে নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করে, ‘বুড়াটা বোধহয় পাগলা কিসিমের মানুষ! নাইলে কেউ জাপান দেশ ছাইড়ে এই গেরামে আসে!’

চা-পানকারীরা মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়। ‘ঠিক কহিছো, বাহে।’

মিশন দুজন দিনমজুর ঠিক করে দেয় হোশির সঙ্গে কাজ করার জন্য। দেখতে-দেখতে জমিটার চেহারা পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রথমে হালকা সবুজ আবরণ, তারপর দিনে-দিনে মাঠে সবুজের উঁকিঝুঁকি বাড়তে থাকে, হোশির উৎসাহও পালস্না দিয়ে বাড়ে, মজুরদের সঙ্গে সেও বসে যায় আগাছা বাছতে, পাইপ দিয়ে ক্ষেতে পানি ছিটায়। গরু-ছাগল, পাখ-পাখালির হাত থেকে বাঁচতে চারদিকে জাল দিয়ে জমি ঘিরে রাখার বন্দোবস্ত করে।

দিনমজুরদের পিঠ চাপড়ে ভাঙা বাংলায় বলে, ‘কুব বালো, কুববালো।’

প্রতিদিন সকালবেলা শরীফ মিয়া কুনিওর নাশতা বানিয়ে দেয়। নাশতা শেষ করে একটা রিকশায় চড়ে আলুটারি গ্রামে রওনা দেয় হোশি। সারাদিন জমিতে কাটিয়ে সন্ধ্যার আগে-আগে মুন্সীপাড়ায় নিজের ডেরায় ফিরে আসে সে।

এদেশের সবকিছু নিয়েই ব্যাপক কৌতূহল কুনিওর। ছোট চোখদুটো মেলে হাসি-হাসি মুখে সবকিছু দেখতে থাকে সে। কান পেতে বুঝতে চেষ্টা করে আশপাশের মানুষ কী বলছে, নিজের সামান্য বাংলা জ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সেসব কথার মর্মার্থ।

বাড়ির পাশের কেরামতিয়া মসজিদ থেকে প্রতিদিনই পাঁচবার ভেসে আসে আজানের শব্দ। হোশি কান পেতে শোনে সেই সুরেলা আওয়াজ। একদিন শরীফকে বলে, ‘এই বাংলা কথাগুলি আমি বুঝতে পারি না। কী কথা এইগুলি?’

শরীফ প্রথমে কুনিওর কথা বুঝতে পারে না। যখন বোঝে তখন সে হেসেই কুটিপাটি।

‘আরে, ওগুলা কি বাংলা কথা যে বুঝতে পারবা? ওগুলা আরবি কথা গো, আরবি কথা…’

শরীফ তাকে বুঝিয়ে বলে কাকে বলে আজান, কাকে বলে নামাজ। কুনিও চোখদুটি বড়-বড় করে শোনে। কিছু হয়তো বোঝে কিছু বোঝে না।

‘তোমার কী ধর্ম? খিরিষ্টান?’

শরীফ টেবিলে ভাত বেড়ে দিতে-দিতে জিজ্ঞেস করে। কুনিও হোশি সঙ্গে-সঙ্গে এ-প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তার হয়তো বলতে ইচ্ছা হয়, পৃথিবীজুড়েই গরিব মানুষের ধর্ম শুধু বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করা। সেই সংগ্রাম এতটাই তীব্র যে, প্রচলিত ধর্মবোধ হয়তো তাকে আচ্ছন্ন করে না। যেমনটি হয়েছে তার নিজের বেলায়। ছোটবেলা মা কুনিওকে বলেছিল, ওদের ধর্মের নাম শিন্টো আর দেবতার নাম কামি। ধর্ম মানে তাই কুনিওর কাছে মায়ের কাছে শোনা কয়েকটা গল্প।

সূর্যদেবী ‘আমাতেরাসু’র গল্প বলত মা।

আমাতেরাসু একদিন তার ভাই ঝড়ের দেবতা সুসানুর ওপর রাগ করে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিল, আর তখন সূর্যের অভাবে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।

স্বর্গের দেব-দেবীরা অনেক চেষ্টা করল আমাতেরাসুকে ঝোপের অন্ধকার আড়াল থেকে বের করে আনতে, কিন্তু কিছুতেই বেরিয়ে এলো না আমাতেরাসু। তখন সুসানুর স্ত্রী, আমে-নো-উজুমী, যিনি আনন্দ ও ভোরের দেবী, তিনি উদ্দাম নৃত্য শুরু করলেন, সেই নাচে এমন শব্দ তৈরি হলো যে, লুকিয়ে থাকা আমাতেরাসু কামির কাছে জানতে চাইল, ‘এ কিসের শব্দ? কী ঘটছে স্বর্গরাজ্যে?’ কামি বলল, ‘স্বর্গে তোমার চাইতে ভালো আরেকজন সূর্যদেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। এ তারই উলস্নাসধ্বনি।’

একথা শুনে আমাতেরাসু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে রাগ-অভিমান ভুলে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। তাতেই আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ আর পৃথিবী রক্ষা পেল এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে।

ছোটবেলায় শোনা এসব গল্পও এতদিন কীভাবে যেন কুনিও হোশির মনের অতলে চাপা পড়েছিল। ধর্মের প্রসঙ্গ উঠে আসায় মনে পড়ল সেসব, উঠে এলো মনের ওপরের স্তরে।

মা কিছু-কিছু ধর্মাচার পালন করত হয়তো, বউও করত হয়তো, কিন্তু সে নিজে কখনো সেভাবে কোনো আচার-অনুষ্ঠান পালন করেনি, হয়তো ধর্ম তাকে সেভাবে প্রাণিত করতে পারেনি।

‘তুমি কি তাইলে হিন্দু?’ কুনিওকে চুপ করে থাকতে দেখে আবারো শরীফের নির্দোষ জিজ্ঞাসা। কুনিও বলে,

‘না। আমি শিন্টো ছিলাম। এখন কিছুই না।’

শরীফ তার স্বল্পজ্ঞানে কুনিওর কথার মাজেজা বুঝতে পারে না। শিন্টো ব্যাপারটা কি, সেটাও ঠিকমতো বুঝতে না পেরে সে

ফ্যালফ্যাল করে বুড়ো লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘আমাকে তোমার মসজিদে নিবা?’ শরীফকে জিজ্ঞেস করে কুনিও।

শরীফ এবার সমস্যায় পড়ে। মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষকে কি মসজিদে নেওয়া যায়? ইমাম সাহেব তো বলেন, এরা কাফের। কাফেরকে মসজিদে নিয়ে আবার কোন পাপ করে ফেলবে কে জানে?

‘আমি মসজিদে যাইতে চাই। শুককুর বারে যাইব।’ কুনিও বলে।

শুক্রবার শুনে একটু আশ্বস্ত হয় শরীফ। হাতে দুদিন সময় আছে। এর মধ্যে চট করে ইমাম সাহেবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নেওয়া যাবে।

শরীফের কাছ থেকে কুনিওর মসজিদে আসার আগ্রহের কথা শুনে ডান হাত দিয়ে নিজের লম্বা দাড়িতে বিলি কাটেন ইমাম সাহেব। তারপর বলেন, ‘নিয়া আসিস। বিধর্মীরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়া মসজিদে আসলে ক্ষতি নাই।’

পরের জুম্মাবারে নামাজ শুরু হওয়ার আগেই পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে হোশি গিয়ে হাজির হয় কেরামতিয়া মসজিদে। ইমাম সাহেব তাকে হাতে ধরে ভেতরে নিয়ে বসান। একে-একে মুসলিস্নরা জমা হতে থাকে। তাদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। এই বিদেশি বিধর্মী এখানে কী করছে – এই প্রশ্ন সবার মধ্যে।

নামাজ শেষে গোমর ফাঁস করেন স্বয়ং ইমাম সাহেব। তিনি মাইকে ঘোষণা দেন, ‘প্রিয় মুসলিস্নগণ, অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাইতেছি যে, জনাব কুনিও হোশি জাপান দেশের শিন্টো ধর্মের মানুষ। তবে তিনি অদ্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়াছেন।’

‘মারহাবা, মারহাবা। সোবহান আলস্নাহ। সোবহান আলস্নাহ।’

রোল পড়ে যায় মসজিদে। কেউ একজন এসে কুনিওর মাথায় একটা টুপি পরিয়ে দেয়। সবার সামনে কলেমা পড়িয়ে কুনিও হোশিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন ইমাম সাহেব। তার নতুন নাম রাখা হয় গোলাম কিবরিয়া। কয়েকজন তরুণ মুসলিস্ন অতিউৎসাহে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে নও-মুসলিম কুনিওর ছবি তোলে। সম্ভবত একজন বিধর্মীকে নিজ ধর্মে দীক্ষেত করার স্বর্গীয় উন্মাদনায় তারা উদ্বেলিত হয়।

কুনিও হোশি বা গোলাম কিবরিয়ার আলুটারি গ্রামের ক্ষেতে ঘাস কিংবা ঘাসসদৃশ গুল্মগুলো বড় হতে থাকে। কুনিওর চেহারায় হাসি আরো বিসত্মৃত হয়। সে হাত দিয়ে গাছের উচ্চতা মাপে আর মাথা ঝুলিয়ে মুচকি-মুচকি হাসে। কখনো-কখনো দিনমজুর আবেদ আলীর পিঠ চাপড়ে দেয়, আর আকাশের দিকে দুই হাত তুলে ভাঙা বাংলায় বলে, ‘পেরেছি, পেরেছি, আমি পেরেছি।’

তারপর আসে সেই দিন। ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর, শনিবার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও কুনিও হোশি সকালের নাশতা সেরে বাসা থেকে বেরিয়ে একটু হেঁটে সামনে গিয়ে একটা রিকশা নিয়েছেন। চমৎকার রোদ উঠেছে। বাংলাদেশে এটা শরৎকাল চলছে, জাপানে শরৎ নেই, শরতের সোনালি রোদ গায়ে মেখে কুনিও হোশির রিকশা মাহিগঞ্জ-হারাগাছা সড়ক ছেড়ে আলুটারি মহিষওয়ালা মোড়ে এসে পৌঁছাল।

পরপর তিনটা গুলির শব্দ হলো। হিতা কুচি, কুনিও হোশি বা গোলাম কিবরিয়ার হঠাৎ মনে হলো, তার চোখের ওপর কেউ যেন ঝপ করে কালো একটা পর্দা টেনে দিয়েছে, সূর্যদেবী আমাতেরাসু আবার বুঝি তার ভাইয়ের ওপর রাগ করে চলে গেছে কোনো অন্ধকার ঝোপের আড়ালে, ফলে পৃথিবীতে আচমকা নেমে এসেছে এক আশ্চর্য আঁধার।

… আততায়ীরা সড়কের পাশে মোটরসাইকেলটা দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করছিল। তাদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল, কেউ বলে, তারা মুখোশে তাদের মুখ ঢেকে রেখেছিল।

‘দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে তাকে তিনটি গুলি করে। একটি গুলি তার বুকে, একটি ডান হাতে এবং আরেকটি কাঁধে বিদ্ধ হয়।’ কাউনিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে এসব কথা জানান।

তখন শরতের উজ্জ্বল রোদের ওপর একখ- কালো মেঘ হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে মস্নান করে দিলো সব আলো, ভয়ের বিষণ্ণ কুয়াশা ঢেকে দিলো আলুটারি গ্রামের মাঠে বেড়ে ওঠা ঘাসগুলোর সতেজ মুখ, কিছু ঘাস তখন লজ্জায় মাটিতে মুখ লুকাতে চাইল, কিছু ঘাস মুষড়ে পড়ল ক্ষোভ ও ঘৃণায়।  r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার