লোক-ঐতিহ্যের সন্ধানে

লেখক:

মোবাশ্বির আলম মজুমদার

আমি তো ওরাং জাতি,

বৃক্ষবাসী, বৃক্ষের পাতায় লেগে আছে

পৌরাণিক ঘ্রাণ আমার জন্মের।

পূর্বে বৃক্ষ ছিলো, ফুল পাখি লতা ছিলো

বিবর্ণ, বন্ধনহীন;

মধ্যে আমি।

– ‘প্রত্নজীব’, অলকা নন্দিতা

 

হাজার বছরের গ্রামীণ জনপদের দেখা-অদেখা,

শ্রম্নত-অশ্রম্নত গীতি-আলেখ্য, গল্প, আখ্যান বাঙালির দীর্ঘ বছরের সংস্কৃতিরই নাম। আবদুস শাকুর শাহ্ বাংলার লোকজ সংস্কৃতির উপাদান নিয়ে ক্যানভাস গড়েন। গীতিকাব্য, পালাগান, জারি সারি, নকশিকাঁথার নকশা, পটচিত্রের উপাদান হলো শাকুরের ছবির বিষয়। আবহমান বাংলার লোক-ঐতিহ্যের সিঁড়ি বেয়েই আমাদের অগ্রযাত্রা। আবদুস শাকুর লোককলার ভেতরে নির্মাণ করেন উত্তরাধুনিক গীতিকাব্য। মিথের ভেতর থেকে রং ও আকৃতি নিয়ে নতুন করে গড়ে তোলেন লোক-আধুনিক গল্প।

আদিম মানুষের গুহাচিত্রে একরকম সফলতার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। লোককলায় কোনোরকমের আশা সঞ্চার করে না, বরং লোকশিল্প আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচারের সঙ্গে মিলেমিশে শুধু আনন্দের বাণী শোনায়। কোনো কোনো গল্পে ঈশ্বর-বন্দনা দেখা যায়; সেটিকে সুর, ছন্দ ও তাল আরোপ করেই তাঁরা সৃষ্টি করেছেন। ঈশ্বর-বন্দনার সঙ্গে তাঁরা প্রকৃতিকে হাজির করেন, যেমন – ‘আদিতে বন্দিয়া গাই অনাদি ঈশ্বর। দেবের মধ্যে বন্দি গাই ভোলা মহেশ্বর \ দেবীর মধ্যে বন্দি গাই শ্রীদুর্গা ভবানী। লক্ষ্মী সরস্বতী বন্দুম যুগল নন্দিনী \ ধন সম্পদ মিলে লক্ষ্মীরে পূজিলে। সরস্বতী বন্দি গাই বিদ্যা যাতে মিলে \ কার্ত্তিক গণেশ বন্দুম যত দেবগণ।’ দেবী সরস্বতীর বন্দনায় যে-কাব্য রচনা করেছেন

নাম-না-জানা কবিগণ, এগুলো সংগ্রহ করেছেন ময়মনসিংহের অধিবাসী কবি চন্দ্রকুমার দে। তৃণমূল কবিদের কাব্যের সরলতা, পলিস্নর মেঠো সুর, পলিস্নর মাধুর্যম–ত রূপায়ণ সকলকে মুগ্ধ করেছে। লোককলার সমৃদ্ধ ভা-ারে এক অভিনব মহার্ঘ লাভে সমৃদ্ধতর হয়েছে বলে মনে হয়। প্রায় পাঁচ দশক আগে মুদ্রিত এ-গাথাগুলি প্রকাশিত হলে আমাদের কাছে লোকমানসের চেতনা প্রকাশ  পায়। তারপর বহুদিন অতীত হয়েছে। লোককলার এ-চরণে কৃত্রিম-অকৃত্রিমতার বিতর্ক খানিক মস্নান করে দিলো। বাংলা সাহিত্যের মহুয়া, মঞ্জুর মা, ধোপার ঘাট, কাজলরেখা, শ্যাম রায় চতুর্দশ শতাব্দীর রচনা বলে মনে করা হয়। সে-মতের পক্ষে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। আবদুস শাকুর শাহ্ মহুয়ার আখ্যান উদ্ধৃত করেছেন কোনো কোনো ছবিতে। এ-শিল্পকর্মে চরিত্রগুলির মুখাবয়ব, দেহভঙ্গি, পোশাক-পরিচ্ছদ বর্ণনা করেছেন। তিনি আলাদা করে মৈমনসিং গীতিকা অধ্যয়ন করেন। কিছু কাজে লোকজ ফর্মের উপস্থিতি দেখা যায়। সে-লোককলার আকৃতিগুলো নেওয়া হয়েছে পটচিত্রের আদল থেকে। মহুয়া, কাজলরেখা এসব আখ্যান থেকে শুধু চরিত্র চিত্রণ করে সঙ্গে লোকগাথা লিখে দেন এভাবে –

ভাটিয়াল মুলস্নুকে আছিল এক সদাগর।

কুঠীয়াল আছিল সাধু নামের ধনেশ্বর \

এক কইন্যা এক পুত্র ছিল সাধুর ঘরে।

ধনী আদ হইল সাধু মা লক্ষ্মীর বরে \

দশ না বচ্ছরের কন্যা কাজলরেখা নাম।

দেখিতে সুন্দর কন্যা অতি অনুপম \

হীরা মতি জ্বলে কন্যা যখন নাকি হাসে।

সুজাতি বর্ষার জলেরে যেমন পদ্মফুল ভাসে \

কবিগুরম্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৈমনসিং গীতিকা নিয়ে বলেন এভাবে – ‘কোনো শহুরে পাবলিকের দ্রম্নত ফরমায়েশের ছাঁচে ঢালা সাহিত্য সে তো নয়। মানুষের চিরকালের সুখ-দুঃখের প্রেরণায় লেখা সেই গাথা। যদি বা ভিড়ের মধ্যে গাওয়া হয়ে থাকে, তবু এ ভিড় বিশেষ কালের বিশেষ ভিড় নয়। তাই, এ সাহিত্য সেই ফসলের মতো যা গ্রামের লোক আপন মাটির বাসনে ভোগ করে থাকে বটে তবুও তা বিশ্বেরই ফসল – তা ধানের মঞ্জরী।’

আবদুস শাকুর শাহ্ ঐতিহ্যাশ্রয়ী আধুনিক শিল্পী। তাঁর ক্যানভাসে ভর করে ঐতিহ্যের সরল ভাষা, রঙের আধুনিক ভাষা। ছবির বিষয় নির্মাণে তিনি সরলতার সঙ্গে নাটকীয়তা সৃষ্টি করেছেন, যেমনটি অনুসৃত হয়েছে লোককাহিনির নানা পালা, জারি, সারিতে। তাঁর চিত্র-নির্মাণে রং এক বিশেষ রূপ ধারণ করেছে। যে-রংগুলো সরল। কোনো মিশ্রণ নেই। পশ্চিমা রীতির করণকৌশল কোনো কাজে আভাস দেয়। যেমন বুনট সৃষ্টি বা ভারী রঙের প্রলেপ। তারপরই আবার সে-আচরণ থেকে শাকুর শাহ্ সরে এসেছেন।

কবিগানের পালায় যেমন কবিত্ব-চাতুর্যের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে লোকগল্পের মাঝে দ্যোতনা তৈরি হয়েছে, শাকুর শাহ্র ছবিতে আমরা সেই নাটকীয়তাও লক্ষ করি। প্রাচীন কাব্য-অনুপ্রেরণার ভূমিকায় দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এভাবে শিল্প সৃষ্টি করেছেন। ভারতের বরোদার এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শিল্পশিক্ষক কেজি সুব্রাহ্মণ্যনের উৎসাহে আবদুস শাকুর যামিনী রায়, কামরম্নল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী অনুসৃত পথ ধরে এগিয়ে যান। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য পটচিত্রের রেখা ও মৌলিক রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নেন জ্যামিতি আর নকশিকাঁথার নকশা। কাজের মূল কেন্দ্রে আবর্তিত হয় নকশিকাঁথার সুই-সুতার ফোঁড়ের চিহ্ন। বাংলার চিরায়ত নকশার জমিন নকশিকাঁথা আবদুস শাকুরকে প্রাণিত করে। দেশজ নানা প্রাচীন গল্পের অংশ নিয়ে ছবির বিশেষ কোনো জায়গায় স্থাপন করে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্যের পরম্পরা অনুসরণ করেছেন।

আবদুস শাকুর শাহ্র একেকটি শিল্পকর্ম একেক গল্পের অবতারণা করে। শিরোনামের সঙ্গে ছবির বর্ণনা হুবহু মিলে যায়। তবে এ-প্রদর্শনীতে দুটি নতুন মাধ্যমের কাজ আমরা দেখতে পাই, যেগুলো সাধারণত তিনি করেন না। কোলাজ ও ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক মিশিয়ে তিনি বেশ কিছু কাজ রেখেছেন। আবার জাপানি ভাষার খবরের কাগজ কেটে কালো কাগজ যুক্ত করে কিছু কোলাজ তৈরি করেছেন। প্রাচ্যের ফর্মের সঙ্গে পাশ্চাত্যের টাইপোগ্রাফি এক্ষেত্রে গুরম্নত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনেন। আবার কিছু কালো রঙের বর্গাকৃতির মাঝে সাদা রঙের সূক্ষ্ম রেখায় লোকজ আকৃতি তৈরি করে একটি ফ্রেমে বন্দি করেছেন বারোটি করে বর্গাকৃতিকে। কালো বর্গের ভেতরে সরল বিষয় বর্ণনা করে তাঁর গতানুগতিক কাজের বাইরে এক নতুন সৃষ্টির দৃষ্টামত্ম রেখেছেন।

তাঁর শিল্পকর্মের মূল চরিত্র ‘মহুয়া’ এবং ‘নদের চাঁদ’। মহুয়া পালার নায়িকা মহুয়া বিস্ময়কর প্রাণবমত্ম। মহুয়া নদের চাঁদকে প্রথম থেকেই ভালোবেসে ছিল। এবং তার জন্যে আহার-নিদ্রা ত্যাগ করেছিল।

কিন্তু তার প্রেমের আমত্মরিকতা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়ার আগে তাকে সে ধরা দেয়নি। সব সন্দেহের যখন অবসান হয়েছে, তখন মহুয়া তার ভালোবাসাকে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি। তার

পালক-পিতা হুমরার আদেশ লঙ্ঘন করে দলের মায়া কাটিয়ে প্রণয়ীর সঙ্গে অজানা পথে পাড়ি জমিয়েছে। অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে অাঁকা মহুয়ার পোশাকে আবহমান ঐতিহ্যিক চিহ্ন লেগে আছে। নদের চাঁদের ঘাড়ে একটা গামছা দেখা যায়। এত সব সাজে সেজেছে মহুয়া শুধু তার প্রিয় মানুষটির জন্যে। শাকুর শাহ্র লোকমানসের চিহ্ন এখানে দেখা যায়। মহুয়া পাঠে তিনি যে-রসবোধ অর্জন করেছেন সেটি প্রকাশ করেন রঙের কাব্যে। তাই শাকুরের ‘মহুয়া’ হয়ে ওঠে জীবমত্ম। ‘কোলাজ-৬’ ও ‘কোলাজ-৭’ ছবিতে বাদামি রঙের জমিন বেছে নিয়েছেন। কালো কালির রেখায় বৃত্ত, সরল মুখ ও কাগজের সঙ্গে থাকা টাইপোগ্রাফি এক বিশেষ রূপবন্ধ তৈরি করে।

শুধু গল্পে তিনি প্রাণ খোঁজেন না, ঐতিহ্যবাহী চিহ্নগুলোকে  শাকুর শাহ্ একসঙ্গে করে এক চিত্রতলে সাজিয়েছেন। যেমন ‘ট্রাডিশান-৪’, ‘ট্রাডিশান-৬’ – এ-কাজদুটোতে লাল ও কালো রঙের ব্যবহার দেখা যায়। প্রজাপতি, পাখি, পাতা, মাছ, অন্যান্য প্রাণীর অবয়ব তৈরি করেছেন সরলরেখার প্রয়োগে, গ্রামীণ সরল জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি রেখা ও রঙের ব্যবহার করেন।

আবদুস শাকুর শাহ্র ‘মিথ অ্যান্ড মিউজ’ শিরোনামের এ-প্রদর্শনীর ৪৮টি কাজে একটির সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্র তৈরি করা আছে। ভাব ও বিষয় যেমন ঐক্য তৈরি করেছে তেমনি রং ও রেখার বিন্যাসে তৈরি হয়েছে ঐক্য। শাকুর এখানে বিশেষভাবে সফল একজন শিল্পী। ঐতিহ্য-চেতনা ও আধুনিকমনস্ক একজন শিল্পীর জন্যে আমাদের শুভকামনা রইল। গত ৯ অক্টোবর ২০১৫ বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে শুরম্ন হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ২৯ অক্টোবর।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার