লড়াই ৩২

লেখক:

কাজী রোজী

ভালোবাসার আয়নাপথে আনিলা কী দেখতে পায় – আমি জানতে চেয়েছিলাম। বারো বছরের আনিলা এমন জবাব দেবে বুঝতে পারিনি। প্রতিবন্ধিতা দিয়ে যার সমস্ত অস্তিত্ব জড়ানো – মনন-মেধার সাথে সারাক্ষণ যুদ্ধ – দারুণ হুইল চেয়ার যার চলনশক্তির ধারাপাত – যার বলনের উৎসে অদ্ভুত অস্পষ্টতার এলোমেলো ভাব – যার উচ্চারণে ছবি কথা বলে – সাহস প্রজ্বালিত হয় – দাঁড়াবার নিজস্ব জায়গা করে দেয় – তার ভালোবাসার আয়নাপথে ভালোবাসাই তো থাকবে।

আনিলা  :       আন্টি আমি তোমাকে ছবি দেবো!

আমি  :  ছবি দেবে! কই দেখি!

আনিলা  :       এই তো দেখো – সবুজের বুকে লাল টিপ। সুন্দর হয়েছে না?

আমি  :  খুব সুন্দর হয়েছে আনিলা। তুমি আর কী অাঁকতে পারো?

আনিলা  :       পুলিশ – পুলিশ অাঁকতে পারি। ওরা আমাদের রাস্তা পার করে দেয় না। কেন দেয় না বলো তো। ওরা তো আমাদের বন্ধু।

আমি  :  বন্ধু! কে বলেছে?

আনিলা  :       কেন, বাবা বলেছেন। টিচার বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন। আমি শুনেছি। জানো, আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি         লিখেছি – আমাদের জন্যে সহজ রাস্তা বানিয়ে দিতে। বাবাকে জিগ্যেস করে দেখো – বাবা জানে। কি বাবা ঠিক না? আমি এখন একটা গান বলবো!

আমি :  আনিলা, গান গাইবে। বেশ তো গাও। কোন গানটা বেশি পছন্দ?

আনিলা  :       আমরা করবো জয়…

আমি  :  বাহ্! খুব সুন্দর। আর কোনটা বলো –

আনিলা  :       এক সাগর রক্তের বিনিময়ে…

আমি  :  আর – আর কোনটা!

আনিলা  :       আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…

আমি  :  আচ্ছা আনিলা – তুমি সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাস? মাকে, বাবাকে, নাকি…

আনিলা  :       আরে না… না অ্যান্টি – আমি আমার নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।

আনিলা ওর ডান হাতটা একটুখানি উঁচু করে বুকের ওপর রাখলো। ওর বাবা ওর মা ওর ভালোবাসার আয়নাপথে শুধু তাকিয়ে রইলেন।

বাবা   :  দুটি সন্তান হারানোর পর – আনিলা আমাদের তৃতীয় সন্তান।

আমি :  ওর অস্বাভাবিকতা কবে থেকে টের পেলেন?

বাবা   :  জন্মের পর মাস তিনেকের মধ্যেই বুঝতে পারি।

মা     :  এরপর ওকে যা দিয়েছি তা হলো যত্ন, সাহস আর সচেতনবোধ।

আমি :  আপনাদের অপরিসীম ধৈর্য এবং সততা আনিলাকে এখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীর ভালোবাসা দিয়েছে।

বাবা   :  আমি আনিলার বিশ বছর বয়সের কালে বলবো – ‘তোমরা নিজেদের বিশ্বাস থেকে নিজেরা কথা বলো।’ ওরা মানিক মিয়া এভিনিউতে সারিবদ্ধ হুইল চেয়ারের মিছিল নিয়ে বলবে – ‘আমরা মানুষ। দারুণ মশাল হয়ে জ্বলছি। তোমরা আমাদের সবটা দেখ, জানো, বোঝো – তারপর গ্রহণ করো।’

আমি :  নিশ্চয়ই ওদের কথা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

মা     :  আমরা ওদের সেই প্রত্যয়ী পথ তৈরি করে দেবো।

আমি  :  আপনাদের একনিষ্ঠতা ওদের সেই সোনালি সকাল এনে দিক – এই প্রত্যাশা।

আনিলা  :       আন্টি, আমি তোমাকে একটু আদর দেবো।

           এসো কাছে এসো।

শেয়ার করুন

Leave a Reply