শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ড্রামবাদক গুন্টার গ্রাস

লেখক:

ভূমিকা ও অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

‘শিল্পে কোনো সমঝোতা নেই, কিন্তু জীবনটাই সমঝোতায় ভরা।’ ‘মানুষের মাথা পৃথিবীর চেয়ে বড়।… মানুষের মাথা দানবীয়।’

‘বিশ্বাস করা মানে আমাদের নিজেদের মিথ্যাকে বিশ্বাস করা। আমি বলতে পারি, আমি কৃতজ্ঞ যে, এই শিক্ষাটা আমি খুব বয়সেই পেয়েছি।’ – গুন্টার গ্রাস

গুন্টার গ্রাস (১৬ অক্টোবর ১৯২৭-১৩ এপ্রিল ২০১৫) দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর স্বপ্নহীন ভগ্নবিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ‘বিবেক’ হিসেবে আবির্ভূত। বত্রিশ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে বড়ো হতে অস্বীকার করা মানসিক স্বাস্থ্যনিবাসের ক্ষুদে বাসিন্দা অস্কার মাতজেরাথের হাতে দুটো ড্রাম স্টিক দিয়ে গোটা সাহিত্যজগৎ মাতিয়ে তুললেন। শুরুতেই খ্যাতির শীর্ষে।

ড্রাম স্টিক গুন্টার গ্রাস হাতছাড়া করেননি। নিজেও আমৃত্যু প্রবল বাদন শুনিয়ে গেছেন। ছিঁড়ে ফেলেছেন পাশ্চাত্যের শঠতার মুখোশ। কলকাতা ও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নিবিড়তা বাঙালিরা এতোটাই অনুভব করেছে যে, ১৯৯৯ সালে যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, আতিশয্য আমাদের বলিয়ে ছেড়েছে : সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের পর নোবেল বিজয়ী দ্বিতীয় বাঙালি।

গুন্টার গ্রাসের জন্ম পোল্যান্ডের ফ্রিসিটি অব ড্যানজিগে (পরবর্তী সময়ে রুশ-অধিকৃত পোল্যান্ডের গদানস্ক নামে সুবিদিত)। ড্যানজিগ জিমনেশিয়াম স্কুলে ভর্তি হন। মহাযুদ্ধ এসে যায়। পনেরো বছর বয়সী কিশোরকে বাধ্যতামূলক সৈনিক হতে হয়। বিতর্ক গুন্টার গ্রাসের সাবমেরিন সার্ভিসে যোগদান নিয়ে।

১৯৪৫ সালের এপ্রিলে যুদ্ধে আহত হন। যুদ্ধবন্দি হিসেবে আমেরিকানদের হাতে ধরা পড়ে বন্দিশিবিরে চালান হয়ে যান। সোভিয়েত সেনাবাহিনী ড্যানজিগ দখল করার পর সেখানকার জার্মানদের দেশছাড়া করে। গুন্টার গ্রাসও ফিরে যেতে পারেননি,  শরণার্থী হিসেবে তাঁর ঠাঁই হয় জার্মানিতে।

গুন্টার গ্রাসের শ্রেষ্ঠ কাজ ড্যানজিগ ট্রিলজি : দ্য টিন ড্রাম (১৯৫৯), ক্যাট অ্যান্ড মাউস (১৯৬৯) এবং ডগ ইয়ার্স (১৯৬৩)।

তাঁর প্রথম বই কবিতা ও ড্রইংয়ের মিশেল। তারপর একাধিক নাটক। টিন ড্রামের পর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি, তাকিয়েছেন লেখার রসদের জন্য।

তাঁর তিন খন্ড আত্মকথা : পিলিং দ্য ওনিয়ন (২০০৬), দ্য বক্স (২০০৮) এবং গ্রিমস ব্রাদার্স (২০১০)।

তাঁর বিখ্যাত একটি উপন্যাস ফ্লাউন্ডার (১৯৭৮)। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – লোকাল অ্যানেসথেটিক (১৯৬৯), ফ্রম দ্য ডায়েরি অব অ্যা স্নেইল (১৯৭৩), দ্য র‌্যাট (১৯৮৬), দ্য কল অব দ্য টোড (১৯৯২), ক্র্যাবওয়ার (২০০২)।

২০১২-তে হোয়াট মাস্ট বি সেইড বা, যে-কথা অবশ্যই বলতে হবে শিরোনামের কবিতা লিখে ইসরায়েলে নিষিদ্ধ হন। তিনি অনড় থাকেন তাঁর অবস্থানে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর দুজন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের নাম যদি জোর গলায় উচ্চারণ করতে বলা হয় তাদের একজন নিঃসন্দেহে ল্যাটিন আমেরিকার গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ। অন্যজন কি গুন্টার গ্রাস নন?

গুন্টার গ্রাস কবিতা ও চিত্রশিল্পে অত্যন্ত সমাদৃত। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার ও রচনার অংশবিশেষের বাংলা ভাষান্তর প্রকাশ করা হলো। মুদ্রিত হলো তাঁর কয়েকটি শিল্পকর্মের ছবি।

 

সাক্ষাৎকার

গুন্টার গ্রাসের যে-কটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে তাঁকে সবচেয়ে বেশি ধারণ করেছে ১৯৯১ সালের গ্রীষ্মসংখ্যা প্যারিস রিভিউ। দু-দফায় তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এলিজাবেথ গ্যাফনি। প্রথম দফা যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটানে, জনসমক্ষে; দ্বিতীয় দফা তাঁর একটি যাত্রাবিরতির সময় বার্লিনের নিকস্ট্র্যাবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আপনি কেমন করে লেখক হলেন?

গুন্টার গ্রাস : আমার মনে হয় আমি যে সামাজিক পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছি তার সঙ্গে লেখক হয়ে ওঠার একটা সম্পর্ক রয়েছে। আমাদেরটা একটা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, আমাদের ছোট দুই রুমের অ্যাপার্টমেন্ট। আমার বোন আর নিজের কোনো রুম ছিল না, কিংবা আমাদের জন্য অন্য কোনো জায়গাও ছিল না। লিভিংরুমে দুই জানালার পেছনে এক চিলতে কোণে আমার বইপত্র ও অন্যান্য জিনিস, যেমন আমার জলরং, রাখা থাকত। যেসব জিনিস আমার প্রয়োজন আমি কেবল সেগুলো কল্পনা করতাম। হইচইয়ের মধ্যে আমি খুব কম বয়সে পড়তে শিখি। আর লিখতে-অাঁকতে শুরু করি সেই কম বয়সেই। এর আরেকটি ফল হচ্ছে, এখন আমার অনেক রুম। আমার পাঠাগার চারটি রুমে বিস্তৃত। আমার শৈশবের সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে আমি ভয় পাই – একটি ছোট কক্ষের কেবল একটি কোণ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : এই পরিস্থিতিতে খেলাধুলায় না মজে বা অন্য কোনোদিকে না গিয়ে কী কারণে পড়া ও লেখায় ঝুঁকলেন?

গুন্টার গ্রাস : শিশু হিসেবে আমি ছিলাম বড় মিথ্যাবাদী। ভাগ্য ভালো, আমার মা আমার এ-মিথ্যা পছন্দ করতেন। আমি তাকে বিস্ময়কর কত কিছু দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে বসতাম। আমার বয়স যখন দশ বছর মা আমাকে পিয়ার জিন্ট বলে ডাকতেন। মা বলতেন, পিয়ার জিন্ট আমরা যে ন্যাপলস যাবো আমাদের সেই সফরের চমৎকার গল্পগুলো শোনাচ্ছ তো? এরকম আরো কত কিছু। কম বয়সেই আমার মিথ্যাগুলোকে লিখতে শুরু করি। আর তা করেই চলেছি। আমার বয়স যখন বারো বছর আমি উপন্যাস রচনায় হাত দিই। এটা কাশুবিয়ানদের নিয়ে লেখা, যা অনেক বছর পর আমার দ্য টিন ড্রাম উপন্যাসে ফিরে আসে, যেখানে অস্কারের দাদি আন্না (আমার নিজের দাদির মতো) কাশুবিয়ান। কিন্তু আমার প্রথম উপন্যাসে আমি একটি ভুল করে ফেলি : যেসব চরিত্র নিয়ে আমি শুরু করেছিলাম প্রথম অধ্যায়ের শেষে, তাদের সবার মৃত্যু ঘটে। আমি আর এগোতে পারিনি। যেখান থেকে লেখালেখিতে আমার প্রথম শিক্ষা : চরিত্রের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : কোন মিথ্যা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে?

গুন্টার গ্রাস : যে-মিথ্যা আঘাত দেয় না, যা সেসব মিথ্যা থেকে ভিন্ন, যেখানে মিথ্যা নিজেকে রক্ষা করে কিন্তু অন্য কাউকে আঘাত করে। সেটা আমার কাজ নয়। কিন্তু সত্য সাধারণত খুবই বিরক্তিকর। এর সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে বিরক্তি কাটানো যায়। এতে কোনো ক্ষতি নেই। আমি জেনেছি, আমার ভয়ংকর সব মিথ্যায় কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। যদি বেশ ক-বছর আগে জার্মানির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতাম, মানুষ বলত, কী মিথ্যাবাদী!

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : ব্যর্থ এই উপন্যাসের পর আপনি কোন কাজে হাত দিলেন?

গুন্টার গ্রাস : আমার প্রথম বইটি কবিতা ও ড্রইংয়ের। আমার কবিতার প্রথম খসড়া অবশ্যই আমার কবিতা আর অাঁকাঅাঁকির মিশেল – যা কখনো চিত্রকল্প থেকে উঠে এসেছে, কখনো শব্দগুচ্ছ থেকে। তারপর আমার বয়স যখন পঁচিশ, আমার যখন একটি টাইপরাইটার কেনার সংগতি হলো, আমার নিজস্ব দু-আঙুল পদ্ধতিতে টাইপ করাটা পছন্দের হয়ে উঠল। আমার দ্য টিন ড্রাম উপন্যাসের প্রথম খসড়া এভাবেই টাইপরাইটারে লেখা হয়ে গেল। তখন আমার বয়স হচ্ছে, শুনছি আমার সহকর্মীরা লেখালেখির জন্য কম্পিউটারের শরণাপন্ন হচ্ছে, আমি ফিরে গেছি হাতের লেখার ওপর; প্রথম খসড়া হাতেই লিখছি। আমার দ্য র‌্যাট উপন্যাসের প্রথম খসড়া আমার মুদ্রণের কাজ থেকে পাওয়া লাইনছাড়া কাগজের একটি বড় খাতায় লিখেছি। যখন আমার একটি বই ছাপা হওয়ার জন্য তৈরি, পরবর্তী পান্ডুলিপির জন্য তখন আরেকটি শূন্য খাতা চেয়ে নিই। কাজেই আজকাল প্রথম খসড়া হাতেই লিখি, সঙ্গে থাকে আমার ড্রইং, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খসড়া তৈরি হয় টাইপরাইটারে। অন্তত তিনটি খসড়া ছাড়া আমি কখনো বইয়ের কাজ শেষ করতে পারিনি। সাধারণত চারটি লেগে যায় – সেইসঙ্গে প্রচুর সংশোধনী।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : প্রতিটি খসড়াই কি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লিখতে হয়?

গুন্টার গ্রাস : প্রথম খসড়া আমি দ্রুতই লিখি। যদি এর মধ্যে কোনো ফাঁকফোকর থেকে যায় তা নিয়ে তখন মাথা ঘামাই না। আমার দ্বিতীয় খসড়াটি সাধারণত বেশ বড় বিস্তারিত এবং সম্পূর্ণ। তাতে আর ফাঁকফোকর থাকে না; কিন্তু তখন লেখাটা বেশ শুকনো, খটমটে। তৃতীয় খসড়ায় আমি প্রথম খসড়ার স্বতঃস্ফূর্ততা ফিরিয়ে আনি এবং দ্বিতীয় খসড়ার প্রয়োজনীয় অংশ এতে সংযোজন করি। কাজটা বেশ জটিল।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনি যখন লেখালেখির কাজ করেন, আপনার তখনকার নিত্যকার রুটিন কী?

গুন্টার গ্রাস : যখন প্রথম খসড়া লিখি, প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত পৃষ্ঠা শেষ করি। তৃতীয় খসড়ার সময় প্রতিদিন তিন পৃষ্ঠা। তখন এগোই বেশ ধীরে ধীরে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : কখন কাজ করেন – সকালে, দুপুরে, না রাতে?

গুন্টার গ্রাস : রাতে কখনো নয়। খুব সহজে রাতে লেখা আসে, এ-কারণে আমি রাতে লেখাতে বিশ্বাসী নই। সকালে যখন লেখাটা পড়ি, তেমন ভালো লাগে না। কাজ শুরু করার জন্য আমার দিনের আলো চাই। নটা থেকে দশটার মধ্যে আমি বেশ সময় নিয়ে নাশতা করি, পড়ি, গান শুনি। নাশতার পর আমি কাজ শুরু করি, বিকেলে কফি ব্রেক নিই, আবার লিখতে শুরু করি, সন্ধ্যে সাতটায় শেষ করি।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : বইটি শেষ হয়েছে আপনি কেমন করে বুঝতে পারেন?

গুন্টার গ্রাস : যখন মহাকাব্য আকারের একটি লেখায় হাত দিই, লেখালেখি প্রক্রিয়াটি বেশ বড়। সব খসড়া হাতে পেতে চার থেকে পাঁচ বছর লেগে যায়। আমি যখন নিঃশেষ হয়ে পড়ি বইটিও শেষ হয়ে যায়।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : ব্রেখট সবসময় তাঁর বই পুনরায় লিখতে বাধ্য হতেন। এমনকি প্রকাশিত হওয়ার পরও তিনি লেখাটি শেষ হয়েছে বলে মনে করতেন না।

গুন্টার গ্রাস : আমি এমন করব বলে মনে করি না। আমার জীবনের এক-একটি বিশেষ সময়ে যেমন দ্য টিন ড্রাম কিংবা ফ্রম দ্য ডায়েরি অব অ্যা স্নেইল লিখেছি, এভাবেই লিখে যাব। লেখার সময় আমি কেমন অনুভব করি, কেমন ভাবি তা থেকেই বইটা আসে। আমি নিশ্চিত, আমাকে যদি আবার বসে দ্য টিন ড্রাম, ডগ ইয়ার্স কিংবা ফ্রম দ্য ডায়েরি অব অ্যা স্নেইল পুনরায় লিখতে বসতে হয়, আমি এগুলোকে নষ্ট করে ফেলব।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনি নন-ফিকশন থেকে ফিকশনের পার্থক্য কেমন করে আনেন?

গুন্টার গ্রাস : ‘ফিকশন বনাম নন-ফিকশন’ বিতর্কটি অর্থহীন। বিষয় অনুযায়ী বইয়ের বিভাজন বই-বিক্রেতাদের জন্য উপকারী হতে পারে, কিন্তু এভাবে শ্রেণিবিন্যাস আমি পছন্দ করি না। আমি সবসময়ই ভেবেছি, বই-বিক্রেতাদের কোনো কমিটি সভা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোন বইটি ফিকশন আর কোনটিকে বলা হবে           নন-ফিকশন। আমি বরং বলতে চাই, বিক্রেতারা যে-কাজটি করছে তা হচ্ছে ফিকশন।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : বেশ, আপনি যখন প্রবন্ধ কিংবা ভাষণ লিখেন এবং যখন গল্প লিখেন বা ওরকম জিনিস তৈরি করেন, দুটোর পদ্ধতি ও লিখনশৈলী কি ভিন্ন নয়?

গুন্টার গ্রাস : হ্যাঁ, ভিন্ন। কারণ আমি তখন তথ্যকে মোকাবেলা করছি যা আমি বদলে দিতে পারব না। এমন নয় যে, আমি সবসময় ডায়েরি লিখি, কিন্তু ফ্রম দ্য ডায়েরি অব অ্যা স্নেইল লেখার সময় আমি প্রস্ত্ততি নিয়েছি। আমার মনে হচ্ছিল ১৯৬৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হবে – বছরটি কেবল নতুন সরকার আনার চেয়েও বড় ধরনের সত্যিকারের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

১৯৬৯ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লম্বা সময় আমি যখন রাস্তায় নেমে রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতাম আমি তখনকার ডায়েরি লিখে রেখেছি। কলকাতায়ও আমি তা-ই করেছি। এই ডায়েরি থেকেই রচিত হয়েছে আমার শো ইয়োর টাং।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনার চিত্রকলা আর লেখালেখির সঙ্গে রাজনৈতিক সক্রিয়তার ভোজবাজি কেমন করে করছেন?

গুন্টার গ্রাস : লেখকরা কেবল তাদের অন্তর্গত বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের সঙ্গেই জড়িত নন, দৈনন্দিন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। আমার বেলায় লেখালেখি, অাঁকাঅাঁকি এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তা তিনটি ভিন্ন পশ্চাদ্ধাবন – প্রতিটিরই নিজস্ব ঐকান্তিকতা রয়েছে। যে-সমাজে আমার বসবাস আমার সম্পৃক্ততা ও কর্মনিবিষ্টতা          সে-সমাজেরই সঙ্গে। আমি চাই বা  না-ই চাই আমার লেখা এবং ছবি অনিবার্যভাবেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমি যা লিখছি, পরিকল্পিতভাবে তাতে যে রাজনীতি নিয়ে আসছি এমন নয় – যখন একটি বিষয় নিয়ে ঘষটাতে থাকি ইতিহাস-উপেক্ষিত বিষয় আমার নজরে আসে। সাধারণভাবে এবং বিশেষভাবে কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে কেবল তা নিয়ে আমি গল্প লিখতে যাব না, কিন্তু আমাদের জীবনের ওপর যে রাজনীতির বিশাল ও নির্ধারণী ক্ষমতা তা মুছে দেওয়ার কোনো কারণও দেখি না। কোনো না কোনোভাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনি আপনার রচনায় ইতিহাস, রান্নার রেসিপি, গীতিকাব্য অনেককিছুর মিশেল দিয়ে থাকেন…

গুন্টার গ্রাস : আরো আছে… ড্রইং, কবিতা, কথোপকথন, উদ্ধৃতি, বক্তৃতা, চিঠি! আমি যখন মহাকাব্যিক ধারণা থেকে কাজ শুরু করি আমি প্রাপ্ত ভাষার সব ধরনের বহুমুখী কাঠামো ও প্রকরণ ব্যবহার করে থাকি। স্মরণ রাখবেন, আমার কয়েকটি গ্রন্থ কাঠামোগত দিক দিয়ে একেবারে খাঁটি – যেমন ছোট উপন্যাস ক্যাট অ্যান্ড মাউস এবং দ্য মিটিং অ্যাট টেলট।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনার হাতে শব্দ ও ড্রইংয়ের পারস্পরিক বন্ধন অপূর্ব।

গুন্টার গ্রাস : আমার কাজের প্রাথমিক উপাদান হচ্ছে লেখা আর অাঁকা, তাই বলে কেবল ড্রইংই নয়; যখন আমি সময় পাই ভাস্কর্যও করে থাকি। আমার বেলায় শিল্প ও লেখালেখির মধ্যে স্পষ্টতই দেওয়া-নেওয়ার একটি সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক কখনো খুবই জোরদার, কখনো কমজোর। গত ক-বছর ধরে এই সম্পর্কটি বেশ জোরালো। কলকাতার প্রেক্ষাপটে আমার শো ইয়োর টাং এরই একটি উদাহরণ। ছবি না এঁকে আমি কখনো এই গ্রন্থটির অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারতাম না। কলকাতায় অবিশ্বাস্য দারিদ্র্য একজন দর্শনার্থীকে এমন একটি জায়গায় ঠেলে দেয়, যেখানে ভাষা রুদ্ধ – শব্দ মেলে না। আমি যখন কলকাতায় ছিলাম ড্রইং আমাকে শব্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : আপনার সেই বইটিতে কবিতা যে শুধু ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছে তা-ই নয়, আপনার ড্রইংয়ের ওপর হাতের লেখাও সুপার-ইম্পোজ করা হয়েছে। হাতে লেখা শব্দগুলো কি গ্রাফিক উপাদান এবং আপনার ড্রইংয়ের অংশ?

গুন্টার গ্রাস : ড্রইংয়ের মাধ্যমে কবিতার কিছু উপাদান তৈরি করা হয়েছে কিংবা ইঙ্গিত করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যখন শব্দ আমার কাছে এলো, আমি যা এঁকেছিলাম তার ওপর লিখতে  শুরু করলাম। টেক্সট ও ড্রইং – একটার ওপর অন্যটা সুপার-ইম্পোজ করা। ড্রইংয়ের ভেতর দিয়ে যদি শব্দগুলো বানিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে তো চমৎকার, সেগুলো পাঠ করা যাবে। তবে ড্রইংগুলো সাধারণত আমার প্রথম খসড়া; আমি টাইপরাইটারে বসে প্রথম যা লিখতাম এটা ঠিক তা-ই। এই বইটা লেখা বেশ কঠিন কাজ ছিল – কিন্তু কেন কঠিন আমি বুঝতে পারিনি – সম্ভবত বিষয় কলকাতা বলেই। আমি দুবার কলকাতায় ছিলাম। শো ইয়োর টাং লিখতে শুরু করার এগারো বছর আগে প্রথমবারের মতো ভারত গেলাম। আমি অল্প কদিন কলকাতায় কাটিয়েছি। আমি প্রচন্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম। শুরু খেকেই আমি আবার ফিরে আসতে চেয়েছি, দীর্ঘ-সময় থাকতে, আরো বেশি দেখতে চেয়েছি – তারপর তা লিখতে চেয়েছি। আমি এশিয়ায় আফ্রিকায় আরো সফরে বের হয়েছি – কিন্তু যখনই হংকং কিংবা ম্যানিলা কিংবা জাকার্তার বস্তি দেখেছি, আমার সামনে কলকাতার বস্তির অবস্থা ভেসে উঠেছে। আমার চেনা আর কোনো স্থান পৃথিবীতে নেই যেখানে প্রথম-বিশ্বের সমস্যা এত উন্মুক্তভাবে তৃতীয় বিশ্বের সমস্যার সঙ্গে – প্রকাশ্য দিবালোকে।

তাই আমি আবার কলকাতা গেলাম। আমি ভাষা ব্যবহারের সামর্থ্য হারিয়ে ফেললাম। আমি একটি পঙ্ক্তিও লিখতে পারলাম না। সে-সময় ড্রইং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। কলকাতার বাস্তবতা ধরে রাখার এটি অন্য একটি প্রক্রিয়া। ড্রইংয়ের সাহায্য নিয়ে শেষ পর্যন্ত আমি গদ্য লেখার সামর্থ্য আবার ফিরে পেলাম – সেটিই এই বইয়ের প্রথম অধ্যায় – এক ধরনের প্রবন্ধ। এরপর আমি দ্বিতীয় তৃতীয় লিখতে শুরু করি – বারো খন্ডে একটি দীর্ঘ কবিতা। এটি শহরের কবিতা – কলকাতাকে নিয়ে। একসঙ্গে গদ্য, ড্রইং ও কবিতার দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে পরস্পর সম্পর্কিত হলেও তিনটি মাধ্যম আলাদাভাবে বিষয়কে প্রকাশ করেছে।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : তিনটির মধ্যে কোনো একটি কি অন্যগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

গুন্টার গ্রাস : আমি বলতে পারি, আমার জন্য কবিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি উপন্যাসের জন্মের সূচনা কবিতা দিয়ে। আমি বলব না শেষ পর্যন্ত এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ – এ ছাড়া আমার হবেও না। সূচনাবিন্দু হিসেবে আমি কবিতাকে চাই।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী : সম্ভবত অন্যগুলোর চেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন শিল্প?

গুন্টার গ্রাস : না, না, না! গদ্য কবিতা এবং ড্রইং আমার কাজে গণতান্ত্রিকভাবে পাশাপাশি অবস্থান করে।

[আংশিক অনূদিত]

 

ফ্লাউন্ডারের প্রথম কাহিনি

তৃতীয় স্তন

ইলসেবিল আরো লবণ দিলো।

গর্ভসঞ্চারের আগে সময়টা অক্টোবর হওয়ায় অাঁশযুক্ত শিম আর কাঁচা নাশপাতি দিয়ে ভেড়ার মাংস রান্না করা হয়েছে। এখনো টেবিলে আছে। এখনো তার মুখভর্তি। ইলসেবিল জিজ্ঞেস করল, আমরা কি এখন সরাসরি বিছানায় যাবো না? কবে, কোথায়, কেমন করে আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছে সে-বৃত্তান্ত আমাকে শোনাবে?

যুগের আবর্তনে আমি আমিই রয়ে গেছি। আর ইলসেবিলও তাই, একেবারে শুরু থেকেই।

আমাদের প্রথম ঝগড়ার কথা মনে পড়ছে, তখন নব্য প্রস্তর যুগের শেষভাগ। আমাদের ভগবানের শরীরী অভ্যুদয়ের দু-হাজার বছর আগেকার কথা। তখন উপকথার ইতিহাস কেবল কাঁচা খাবার ও রান্না করা খাবারের মধ্যে পার্থক্য করতে শুরু করেছে।

আজো অাঁশযুক্ত শিম আর কাঁচা নাশপাতি দিয়ে রান্না ভেড়ার মাংস খাবার আগে ইলসেবিল ও আমার সন্তানদের নিয়ে আমাদের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়েছে।

আমাদের নব্য প্রস্তর যুগের ভাষা সাধ্যমতো ব্যবহার করে ভিস্তলা নদীর মোহনায় স্যাঁতসেঁতে মাটিতে ইলসেবিলের নয় সন্তানের মধ্যে অন্তত তিনটি আমার এই দাবি জানিয়ে ঝগড়া চালাতে থাকি।

কিন্তু আমি হেরে যাই। আমার পরিশ্রমী ও তৎপর জিহবা নব্য প্রস্তর যুগের ভাষা উচ্চারণের যতোগুলো একক আয়ত্তে আনতে পেরেছি সব যোগ করেও ‘বাবা’র মতো একটি সুন্দর শব্দ উচ্চারণ করতে পারিনি। আমি পেরেছি কেবল ‘মা’ উচ্চারণ করতে।

সে আমলে আমার স্ত্রী ইলসেবিলের নাম ছিল আওয়া। আর আমারও একটা ভিন্ন নাম ছিল। কিন্তু আওয়া হওয়াটা ইলসেবিলের জন্য মোটেও আবেদনময় কিছু নয়।

ভেড়ার কাঁধের মাংসে রসুনের কোয়া ছড়িয়ে ছিলাম, মাখনে আলতো করে নাশপাতি ভেজে মাংস আর নাশপাতি অাঁশযুক্ত শিমের ওপর বিছিয়ে দিলাম।

মুখভর্তি খাবার নিয়ে ইলসেবিল বলল, এটা না হওয়ার কোনো কারণ নেই। ইলসেবিল গর্ভবতী হয়ে যাওয়ার কথা সরাসরি আমাকে বলল, কারণ ডাক্তারের পরামর্শে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়িগুলো নিজেই টয়লেটে ফেলে ফ্লাশ করে দিয়েছে। ইলসেবিলের কাছেই শুনলাম, নব্য প্রস্তর যুগের রান্নার চেয়ে আমাদের বিছানা যাওয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

অনাদিকাল ধরে আমরা যেভাবে করে আসছি, আমরা শুয়ে পড়লাম একই উদ্দেশ্যে; দুজনেই হাত ও পা দিয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ফেললাম। বিছানায় কখনো আমি ওপরে, কখনো ইলসেবিল।

ইলসেবিল মনে করে ছেলেদের বেলায় অনুপ্রবিষ্ট করার যে-সুযোগ, আর মেয়েদের বেলায় তাদের ভেতরে অনুপ্রবিষ্ট হতে না দেওয়ার যে তুচ্ছ অধিকার তা দিয়ে কখনো ক্ষতিপূরণ হয় না। ব্যাপারটা অবশ্য দুজনের মধ্যেই সমান। কিন্তু আমরা যেহেতু ভালোবাসে মিলিত হয়েছি, আমাদের দুজনের অনুভূতি বিস্তৃত পরিসরে সময় ও সময়ের টিকটিককে অতিক্রম করেছে। আমাদের দুজনের অনুভূতি সকলকে ধারণ করেছে। পৃথিবী অভিমুখী বিছানার ভার থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের পক্ষে একটি উচ্চমার্গীয় সঙ্গম অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল – যেন ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি তীব্র ধাক্কায় আনন্দের অনুভূতি আমার শরীরে প্রবেশ করেছে। আমরা কাজটা করেছি যূথবদ্ধ হয়ে এবং ভালোভাবে।

শিম ও নাশপাতির সঙ্গে ভেড়ার মাংস, কত মাছের মাথা গনগনে আগুনে সেদ্ধ করে তৈরি করা ইলসেবিলের ফিশ স্যুপ সম্ভবত আমার ভেতরে অনুঘটক উপাদান তৈরি করে, আর যুগের পর যুগ পেরিয়ে আমাদের ভেতরের পাচক আমন্ত্রণ জানায়; আকস্মিকভাবে কিংবা নিয়তি-নির্দিষ্ট হয়ে একটি গর্ভসঞ্চারের ঘটনা ঘটে যায়, কিংবা কোনো উপাদান ছাড়াই এই ব্যাপারটা ঘটে, তারপর গর্ভাবস্থা চলে আসে।

যখন আমি বের হলাম যেন আমি বহিষ্কৃত – পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিয়ে ইলসেবিল আমাকে বলল, দেখো, এবার একটা ছেলে হবে।

রসনা মেটানো খাবারের কথা কিন্তু ভুলো না। সিদ্ধ আলু কিংবা ঐতিহাসিকভাবে চলে এসেছে ভুট্টা। আমাদের সুস্বাদু মাংস সবসময়ই সেভাবে উপস্থাপনের কথা বলা হয় – এখানেও গরম থালাতেই পরিবেশন করা হয়েছে।

আমার অসাবধানতা ক্ষমা করো। তারপরও আমাদের চুম্বন চর্বিতে আবৃত ছিল। সুগন্ধি লতা ও গুল্ম মিশিয়ে ইলসেবিল আমাদের স্যুপটা সবুজ রঙের করে ফেলেছে – এতে ভাসছে কড মাছের সাদা চোখ এবং সুখের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গর্ভসঞ্চারের নিশ্চয়তার পর আমরা আবার একসঙ্গে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ধূমপান সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা নিয়ে আমরা সিগারেট টানলাম। (আমি সময়ের ফাঁক গলিয়ে নেমে পালিয়ে গেলাম)।

ইলসেবিল বলল, তুমি এখন যা ইচ্ছে বলতে পারো। আমাদের কিন্তু একটা ডিশওয়াশার দরকার। কেনার এটাই সঠিক সময়।

অন্য কোনো বিপরীতধর্মী ভূমিকা নিয়ে চিন্তায় ডুবে যাওয়ার আগে ইলসেবিলকে বললাম, আশা করি তোমাকে গর্ভবতী অবস্থায় দেখতে পাবো।

তারপর আমি তাকে আওয়া এবং তার তিনটি স্তন সম্পর্কে বলতে শুরু করলাম। কাজেই আমাকে সাহায্য করো ইলসেবিল। আওয়ার ছিল তিনটি স্তন।

প্রকৃতি যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারে। ঈশ্বরের দোহাই তিনটি স্তন। স্মৃতি যদি আমাকে প্রতারণা না করে থাকে তাহলে প্রস্তর যুগের সব মহিলার নাম ছিল আওয়া। আর আমরা যারা পুরুষ তাদের নাম এডেক। সব এডেক একই রকম, সব আওয়া একই রকম।

এক দুই তিন। তিনটি স্তন। শুরুতে আমরা বড় অঙ্ক কষতে বা বড় সংখ্যা গুনতে জানতাম না। নিচেও না, ওপরেও না, ঠিক মাঝখানে। বহুবচন শুরু হতো তিন দিয়ে। আমার কথাটাকে পেঁচিয়ে জটিল করার দরকার নেই। কিছু কিছু অঙ্ক আমরা পরে পেয়েছি।

আমাদের অঞ্চলে নদীর পূর্বাংশে রয়েছে পত্রিমপোস। পিকোলোস ও পেরকুনোসের সঙ্গে পত্রিমপোসও প্রুশিয়ানদের ঈশ্বরে পরিণত হন। পত্রিমপোসের ছিল তিনটি অন্ডকোষ। হ্যাঁ, ঠিকই, তিনটি স্তন বেশিই। অন্তত বেশি দেখায়। তিনটি মানে আরো বেশি। তিনটি হলে তা অতিপর্যাপ্ততা প্রমাণ করে। তিনটি হতে তা উদারতার বিজ্ঞাপন দেয়, তিনের মধ্যে পেটপুরে খাবার পাওয়ার একটি অনন্ত নিশ্চয়তা রয়েছে। তারপরও যখন কেউ তিনের কাছে আসবে মনে হবে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, যদিও বা তা দুর্বোধ্য হবে না।

তিন স্তনের ব্যাপারটি স্বাভাবিকভাবে পুরুষের কামনার একটি প্রকাশ। আমি জানি তুমি এটাই বলবে। হতে পারে শরীরের গঠন অনুযায়ী তিনটি স্তন অসম্ভব এক ব্যাপার; কিন্তু সেই আমলে যখন পুরাণের ছায়া পড়ত আওয়ার তিনটি স্তনই ছিল। আর আজকের দিনে সত্যি বলতে কী তৃতীয় স্তনের অভাবটাই বেশি করে দেখা দিচ্ছে।

সেই স্তনটিই চাই, তিনটির মধ্যে তৃতীয় স্তনটি।

[আংশিক অনূদিত]

গুন্টার গ্রাসের কবিতা

 

 

আমি কী নিয়ে লিখি

খাবার নিয়ে এবং খাবার শেষ হলে এর স্বাদ নিয়ে লিখি

আর যেসব অতিথি বিনা নিমন্ত্রণে

অথবা এক শতাব্দী দেরি করে এসেছে তাদের নিয়ে

লেবুর রসের জন্য ম্যাকরেল মাছের প্রত্যাশা নিয়ে

আর মাছের মধ্যে আমি লিখি

মূলত রাঘব বোয়াল নিয়ে।

 

আমি অতি পর্যাপ্ততা নিয়ে লিখি

উপবাস নিয়ে এবং পেটুকেরা কেন

উপবাস আবিষ্কার করেছে তা নিয়ে লিখি

ধনী মানুষের টেবিলে রুটির শক্ত ছাল এবং

তাদের খাবারের খাদ্যমূল্য নিয়ে লিখি।

 

খাদ্যের স্নেহ ও মানববর্জ্য

লবণ ও অভাবগ্রস্ততা নিয়ে লিখি

ভুট্টার স্তূপের মধ্যে থেকে

শেখার মতো একটি সম্পর্ক দেখাবো –

কেমন করে মদ্য পিত্তের মতো তিতকুটে হলো

আর পাকস্থলি হয়ে গেল পাগলাটে।

 

 

খাওয়া

আমার মায়ের স্তন বড় এবং সাদা

স্নেহের ঘর্ষণে আমি বৃন্ত পর্যন্ত পৌঁছি।

বোতল কিংবা অন্য কোনো শান্তকরণ নিপল

মুখে দেবার আগ পর্যন্ত আমি সবটুকু পথ পেরিয়ে যাই

যদি এসব সরিয়ে নেওয়া হয়

তোতলামো আর সব জটিলতার হুমকি

স্তন থেকে সন্তান সরাবে না।

 

এ দুধে থাকুক স্বচ্ছ গরুর মাংসের ঝোল

কিংবা কড মাছের মুড়ো সেদ্ধ করা অস্বচ্ছ স্যুপ

তবুও অন্ধ চোখ ঘুরপাক খায় মোটামুটি

মুখের দিকেই।

 

পুরুষ তো চুষতে দেয় না

বড় ওলান ঝুলিয়ে গাভি যখন

বাড়ির পথে রাস্তা পেরোয়, যানবাহন থামিয়ে

পুরুষেরা আড়চোখে তাকিয়ে থাকে।

পুরুষ কেবল তৃতীয় স্তনের স্বপ্ন দেখে

পুরুষ দুগ্ধপোষ্য শিশুকেও ঈর্ষা করে

আর সবসময়ই পুরুষ কিছু না কিছু হারায়।

 

আমাদের শ্মশ্রুমন্ডিত দুগ্ধপোষ্যরা

যারা আমাদের জন্য ট্যাক্স পরিশোধ করে

সাক্ষাতের আগে ঠোঁট চাটে

এবং সিগারেট দিয়ে নিজেদের সবোধ দেয়।

 

চলিলশের পর মানুষ আবার দুগ্ধপোষ্য হোক

জনসমক্ষে নির্ধারিত ফি দিয়ে যতোক্ষণ না তারা তৃপ্ত

আবার খাবার ইচ্ছে নেই, তাদের রোদন থেমে গেছে,

টয়লেটে নিঃসঙ্গ কান্নাকাটি বন্ধ হোক।

 

 

আমি স্তন নিয়ে লিখি

 

ইলসেবিলের গর্ভধারণ নিয়ে (টক আচারের জন্য

তার আকুলতা)

যতোক্ষণ না গর্ভাবস্থা থাকে, ততোক্ষণ।

খাবারের শেষ কামড়টা ভাগাভাগি নিয়ে

সে সময়টা কেটেছে একজন বন্ধুর সাথে

রুটি পনির বাদাম ও মদ খেয়ে।

 

(চিবুতে চিবুতে আমরা এটা, ওটা এবং অন্যটার

কথা বলেছি, আমাদের পেটুকবৃত্তি নিয়েও,

এসবই ভয়ের একটি ধরন।)

 

আমি ক্ষুধা নিয়ে লিখি

কেমন করে ক্ষুধার বর্ণনা দেওয়া হয়

লিখিন শব্দে কেমন করে প্রচার করা হয়,

মশলা নিয়ে লিখি (যখন ভাস্কো দ্য গামা ও

আমি মিলে মরিচ আরো সস্তা করে দিয়েছি।)

আমি লিখব আমার কলকাতা যাবার পথে।

 

পথের খাবার

 

আমি সমাহিত হতে চাই

এক ব্যাগ বাদাম আর

সবশেষে বাঁধানো দাঁতের সেট নিয়ে

আমি যেখানে শায়িত

সেখানে কুড়কুড়-মুড়মুড় শব্দ

অনুমান করিয়ে ছাড়বে

ওই তো সে আছে

এখনো সে।

 

অমর

চারপাশে সবদিকেই

প্রতিশ্রুত জানালাগুলোতে ধাক্কা দিয়ে খুললাম

আমি নিশ্চিত ছিলাম

একবার যখন মৃত, কিছুই দেখতে পাবো না আর।

কিন্তু সমতল সুচারু সাজানো

গ্রামের ওপর চোখ রেখে

এবং রাস্তা দিয়ে কতিপয় বুড়ো ও বুড়ি

বাইরে তাকিয়ে

এবং আংশিক মেঘলা আকাশে

নাশপাতির গাছে কলতানের পাখি স্টার্লিং

বাস বয়ে এনেছে স্কুলের ছেলে ও মেয়ে

সঞ্চয় ব্যাংকের ভবন

এবং চার্চ, উপরে তার ঘড়ি

সময় তখন একটা বেজে তিরিশ মিনিট।

 

আমার আর্জির জবাব এসেছে

এ ধরনের মরণোত্তর জীবন হয়েই থাকে

এবং শিগগির থেমেও যাবে।

 

আমার পুরনো প্রতিবেশীরা এর মধ্যেই আমাকে

শুভেচ্ছা জানাচ্ছে,

জানালা থেকে ওরা আমাকে দেখতে পেয়েছে বলে

সত্যি সত্যিই দাবি করেছে।

আর ওই যে বোঝাটা বেশিই

আসছে ইলসেবিল কেনাকাটা সব শেষ করে।

কাল রোববার।

 

আওয়া

 

এবং যদি আমি তিন স্তনের মুখোমুখি হতাম

এবং যদি এই কিংবা সেই স্তনের মধ্যে ভাগাভাগি না হতাম

এবং যদি স্বাভাবিক বিভাজনে দুটো না হতাম

আর কোনটা পছন্দ করবো যদি সে-সমস্যা না থাকতো

এবং কখনো যদি এটা কিংবা ওটার মুখোমুখি না হতে হতো

এবং দুটোর মধ্যে কোনো আক্রোশ না থাকতো

এবং অন্য কোনো ইচ্ছে না জাগতো

 

কিন্তু আমার অন্য আরেকটা পছন্দ আছে

অন্য একগুচ্ছ স্তনবৃন্তে আমি আসক্ত

আমি জোড়কে ঈর্ষা করি

আমার অন্য ইচ্ছে বরাবরের মতোই খন্ডিত।

যদিও আস্ত, আমার কেবল অর্ধেক আর অর্ধেক

পছন্দ সবসময়। মাঝামাঝিতে।

 

কেবল মৃৎশিল্পে (তারিখ অনিশ্চিত)

আওয়া (বোধহয়) এখনো আছেন

তিন স্তনের ঈশ্বরী

 

এর মধ্যে একটি স্তন (বরাবরই তৃতীয়টি) জানে

প্রথমটি কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে

আর দ্বিতীয়টি কী ধরে রেখেছে।

 

কে তোমাকে বাদ দিলো, আমাদের বানালো দরিদ্র,

কে বলল, দুটো স্তনই যথেষ্ট

স্বল্পাহার আর রেশন তো তখন থেকেই।

দিমেতার

 

খোলা চোখে

দেবী দেখেন

ঈশ্বর অন্ধ কেমন।

 

প্রস্ত্তরীভূত চোখের পাতা চারদিকে ছায়া ছড়ায়

কোনো পাতাই পড়তে রাজি নয় এবং ঘুম আনতে

 

ঈশ্বরকে দেখার পর

দেবী ভীতসন্ত্রস্ত সারাক্ষণ

এইখানে এই পতিত জমিতে

লাঙলের ফলা যেখানে জন্ম নিয়েছে

 

ইচ্ছে করেই ছুঁচো তার বালির উপর ঘুরে আর

ঘুরে বেড়ায়। এর কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 

আমরা যারা বৃত্ত থেকে ঝরে পড়েছি

তুলে নিই একটি অতিপ্রকাশিত

ফটোগ্রাফ।

 

পারিবারিক বিষয়

 

আমাদের জাদুঘরে – আমরা সবসময় রোববারে

সেখানে যাই

ওরা একটা নতুন বিভাগ খুলেছে

আমাদের গর্ভপাত করা শিশুরা, পান্ডুর রাশভারী ভ্রূণগুলো

সাদামাটা কাচের জারে বসে থাকে

আর তাদের বাবা-মার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ হয়।

 

গিটার হাতে ক্ষমতাহীন

 

আমরা নাপামের কথা পড়ি, নাপাম কল্পনা করি

যেহেতু নাপাম আমাদের কল্পনায় আসে না

আমরা নাপামের কথা পড়ি যতক্ষণ না

নাপাম নিয়ে আমরা আরো কল্পনা করতে পারি

এখন আমরা নাপামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি।

 

নবীদের মেলা

 

যখন পঙ্গপাল আমাদের শহর দখল করে নেয়

আমাদের বাড়িতে আর দুধ আসে না

খবরের কাগজগুলো শ্বাসরুদ্ধ

কারাগারের প্রকোষ্ঠ সব খোলা, নবীরা মুক্ত

মিছিল করে তারা রাস্তায় নেমেছেন, সংখ্যায় ৩৮০০;

দায়হীনভাবে তারা নসিহত করতে পারেন, পেটপুরে তারা

পঙ্গপাল খেলেন, এর ধূসর আস্তরণ –

তাকে আমরা মহামারি বলেছি।

 

আমরা অন্য কোনো ফলাফল আশা করতে পারতাম।

 

শিগগিরই দুধ আমাদের কাছে ফিরে আসে

খবরের কাগজগুলো শ্বাস ফিরে পায়

নবীরা কারাগারের প্রকোষ্ঠগুলো আবার ভরে তোলেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply