শামসুর রাহমানের চারটি কবিতার নিবিড় পাঠ রূপালি স্নান : কবির অপ্সুদীক্ষা

লেখক:

বেগম আকতার কামাল

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায়, পরে সংকলিত হয় প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্যগ্রন্থে। আলোড়িত চৈতন্যধারী এক নিরালা কবির ধ্বনিদৃশ্যময় কল্পোক্তিকে এখানে চিহ্নিত করা যায়। নিওক্রিটিসিজম কাব্যতত্ত্বের প্রবক্তা আই এ রিচার্ডস কথিত pseudo-statement তথা কল্পোক্তির অবিরাম নিবিড় চর্চা করেছেন শামসুর রাহমান। রোমান্টিক কবিদের কাব্য-কল্পনাতত্ত্ব থেকে আলাদা এই কল্পোক্তি, একে কল্পনামনীষা বলাই শ্রেয়। কবি তাঁর কল্পনামনীষায় ‘বস্তুসঙ্গতি’ প্রসব করেন [জীবনানন্দ, ১৯৩৮] এবং প্রশ্নজর্জরিত বিরোধপূর্ণ বাস্তব থেকে ঊর্ধ্বগামী হয়ে ক্ষমতা ও অনুধ্যানের বলয়ে ভেসে বেড়ান। এই কল্পোক্তি তাঁকে সুবেদী কান্তিময় ক্ষমতা দেয়। রিচার্ডসের মতে, কবিতা যেহেতু সৌন্দর্যতাত্ত্বিকভাবেই মূল্যবহ, তাই সামগ্রিকভাবে তার মূল্য ভাষার আবেগোদ্দীপক কল্পোক্তি দিয়েই অর্জিত হওয়া সম্ভব। আধুনিক কবির যে-উৎসাহ ছড়িয়ে থাকে আত্মসন্ধিৎসায় ও মননভাবনায় তা একভাবে, কল্পোক্তির মাধ্যমেও কবিতায় অন্তর্বয়িত হতে পারে। ‘রূপালি স্নানে’ এই অন্তর্বয়ন ঘটে বিরোধাভাস-অলংকৃত বাক্যে ও আঙিকে, কতিপয় শব্দানুষঙ্গে। কবি ‘স্নানক্রিয়ায় রূপালি বিশেষণ আরোপ করে ঢাকা শহরের নতুন বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত শ্রেণির একজন কবির নান্দনিক-স্পৃহার উজ্জ্বল পুনরুজ্জীবন ঘটাতে উৎসাহী হন এবং তাঁর নাগরিক সত্তাকে ব্যক্তিসত্তার মুখশ্রীতে ঢেকে দিতে চান নিপুণভাবে। তাই নীপবনে নবধারাজলে অবগাহনের রাবীন্দ্রিক আহ্বান থেকে এই স্নান অধিক আত্মবিজ্ঞাপিত। কবিতাটি তর্পণ নয়, কবির ইশতেহার, আত্মত্রাণের ঘোষণাপত্র।
কবিজীবনের প্রথম পর্যায়ে রাহমান হতে চেয়েছিলেন অর্ধবিকশিত ঢাকা শহরের বুর্জোয়া-বিদগ্ধ কবি, যে-বুর্জোয়া নিজের অস্তিত্বকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছিল নাগরিক সত্তায় ও ব্যক্তিসত্তায়। আবার বিরুদ্ধরাষ্ট্রে বুর্জোয়ার কাছে যেহেতু তার নাগরিক তথা সমাজসত্তাটি অধরা থাকে, সেহেতু বাস্তবের বিপরীতে কাব্যসংস্কৃতির পাঠ-সরণিতে তাকে হাঁটতে হয়। সবচেয়ে প্যারাডক্স হচ্ছে অর্ধসামন্ত অর্ধউপনিবেশবাদের এই ঢাকা শহরে রাহমান পূর্ণ, সবল স্বাধীন বুর্জোয়া ব্যক্তিত্ব ও অভিজ্ঞতা অর্জনেও সমর্থ হন না। তাই প্রতীচ্য কবিতার সংস্কৃতি থেকে তাঁকে আহরণ করতে হয় কবিতার অনুষঙ্গ, অনুগামী হতে হয় পূর্বজদের, আধুনিক বাংলা কবিতার তিরিশি পরিমণ্ডলের সঙ্গে গড়ে নিতে হয় মননসেতু। যেমন, কবিতাটির প্রথম পঙ্ক্তিটি প্রতীচ্য কাব্যানুষঙ্গের দ্যোতক – ‘শুধু দুটুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ।’ ‘রুটি’ শব্দে শহুরেপনা প্রকাশ পেলেও ‘আঁজলা ভরানো পানীয়ের খোঁজ’ বাক্যাংশ তাঁর দ্বিধাবিভক্ত সত্তার দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর ব্যক্তিসত্তা রুটি আর পানীয়ের খোঁজে শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্ণের কাছে প্রত্যহ প্রার্থী হয় না। জৈবিক ক্ষুধা থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের এই অমল বাসনা ধেয়ে যায় শিল্পক্ষুধার দিকে। অবশ্য দৈনন্দিন বাস্তবকে পরিহারের ঘোষণা নতুন কোনো বার্তা নয়, বহু সৎ কবিই তা অতীতে করেছেন। বিশেষ করে রোম্যান্টিক কবিরা তো মলিন বাস্তব আর বিরূপ প্রাত্যহিকতা থেকে সরে গিয়েছিলেন অন্যতর প্রাণময় জগতে। রাহমানের নিভৃত চেতনায় রোমান্টিসিজমের গূঢ় অস্তিত্ব খুবই প্রীতিøিগ্ধ ও নিবিড়। তারই উন্মোচন ঘটে তাঁর প্রকৃতিভাবনায় আর অনেকাংশ জীবনানন্দীয় কাব্য-সংস্কৃতি ও প্রতিমা-অনুষঙ্গের দ্বারা প্রেরণায়িত।
উনিশ-বিশ শতকে আধুনিক জাতীয় সংস্কৃতির যে ধরন ও গড়ন তৈরির চেষ্টা ছিল, তার মূলে ছিল ঐতিহ্য-সন্ধান, দেশজতায় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু বিশ শতকের তিরিশের দশকের দিকে দেখা গেল এই আধুনিক জাতীয় সংস্কৃতি অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। এই সময়ের কবিরা ইউরোপীয় হাই-মডার্নিজমের দ্বারস্থ হলেন। শুধু জীবনানন্দকে দেখি নির্দ্বন্দ্ব ঐতিহ্যিক প্রকৃতির আশ্রয়ী হতে, জাতীয় সংস্কৃতির রূপসী বাংলাকে বিনির্মাণ করতে। আমরা তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পরে প্রকৃতিকে ঘিরে কাব্যসংস্কৃতি রচনার দৃষ্টান্ত পেলাম। যদিও এই প্রকৃতি-সংস্কৃতি যে কলকাতার বাস্তবতায় খাপ খায় না – এ সত্য জানেন বলে তিনি থাকেন অন্তর্নিঃসহায় ও বিষাদগ্রস্ত। রাহমানের উন্মেষকালে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ভৌগোলিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উক্ত জীবনানন্দীয় প্রকৃতি সংস্কৃতি রাষ্ট্রের নগরায়ণের সঙ্গে সংঘর্ষরত শিক্ষিত শ্রেণিটির সত্তাকে একভাবে আত্মিক শুশ্রƒষা করেছিল, অন্তত রাহমানকে তো বটেই। তাঁর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির যাবতীয় বৈপরীত্য তীক্ষè রূপ পায় এই প্রকৃতি ও নগরায়ণের দ্বৈততায়। তিনি মাঝে মাঝে পলায়ন-তৎপর হয়ে দুটুকরো রুটির নিরাপত্তার বদলে বিভোর হতে চান ভীরু øিগ্ধ নির্দ্বন্দ্ব সরল প্রকৃতিতে। মানবেতর প্রাণীদের সঙ্গে খরগোশ, হরিণ, কাঠবিড়ালি, মৌমাছি আর অপরাহত সুন্দর মেঠো চাঁদ, সন্ধ্যানদীর আঁকাবাঁকা জল আর তারার উৎসরূপী আকাশের সঙ্গে হার্দ্যসম্পর্ক গড়ার জীবনানন্দীয় প্রস্বরে নিজেকে জড়িয়ে নেন। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দের মতোই প্রকৃতির দৃশ্যকল্পে তিনি প্রত্যাশিত স্পেসটি খুঁজে নিতে চাইলেন। এসব দৃশ্য-দর্শনে চোখই কেবল নয়, রাহমানের শ্র“তিকল্পও অংশগ্রহণ করে এবং কবিতায় sense of impression তৈরি করে। নৈঃশব্দ্য রচনার জীবনানন্দীয় প্রকরণকৌশলটিও তাঁকে প্রলুব্ধ করে। যেমন, ‘ঝিঁঝির কোরাসে স্তব্ধ, বিগত রাত মনে করে, উন্মনা-মনে হরিণের মতো দাঁতে ছিঁড়ি খাঘ, এখানে হরিণ উপমা আর ঘাস অনুষঙ্গ হৃদয় ও প্রকৃতির অবিনশ্বরতার দ্যোতনা আনে। ‘সোনালি অলস মৌমাছিদের পাখার গুঞ্জনধ্বনি’ লিবিডোর আবহ রচনা করে। শ্রুতি ও স্মৃতিকল্পে এভাবেই ধরা দেয় অবচেতনা।
এসব স্পেস ছাড়িয়ে এরপর কবি উল্লম্ব রেখায় আঁকেন নক্ষত্রভরা রাতের আকাশের অনন্ত বিস্তারকে। স্পেসের অসীমতার সঙ্গে যুক্ত হয় ধাবমান সময়ের গতিময়তা – ‘হাজার যুগের তারার উৎস ঐ যে আকাশ/ তাকে ডেকে আনি হৃদয়ের কাছে।’ সংখ্যাহীন নক্ষত্রখচিত, বর্ণিল আকাশকে হৃদয়ের কাছে ডেকে আনার মধ্যে দিয়ে কবি কী বলতে চাইছেন? নক্ষত্র তো নির্জ্ঞানের প্রতীক, রাহমান সামূহিক নির্জ্ঞানের বিস্তৃত জগৎকে তুলে আনতে চাইছেন কবিহৃদয়ে – নান্দনিক সত্তার মধ্যে। প্রতীকগুলো উঠে আসে অবচেতনার হাত ধরে। সঙ্গে আসে অনন্ত সময়ব্যাপ্ত পুরনো প্রেমের কাব্যজগৎ। প্রকৃতি থেকে অবচেতন, তারপর নির্জ্ঞান – এই ক্রমরেখায় রাহমান অবশেষে পুরনো প্রেমের কবিতার রোদে পিঠ দিয়ে বসেন। রবীন্দ্রনাথের ‘অনন্ত প্রেম’ [মানসী কাব্য] কবিতার অনাদি সময়জুড়ে প্রেমের প্রবাহ যে রোমান্টিক ভাবনাকে সত্য করে তোলে, তার আধুনিক সংস্করণ এই ‘হাজার বছরের ঢের পুরানো প্রেমের কবিতা’র স্মরণোপমা, আর তাতে উষ্ণ অবগাহন। এটাই কবির রূপালি স্নান। বর্তমানে, তবে কি কবি প্রেমশূন্য অথবা আধুনিক কবিতা মাত্রে প্রেমহীন? অথচ প্রকৃতি-পরিবেশ যা রচিত হলো কবিতায় তা তো প্রেমের অনুকূল। পুরনো প্রেমের প্রতীতি দিয়ে তিনি যেন অবচেতনা-লিবিডোর সঙ্গে বৈপরীত্য গড়ে দিচ্ছেন? নইলে ‘প্রগাঢ় মদের মতো চঞ্চলা সেই রসে টুপটুপ নর্তকীর নূপুরনৃত্য’ কবির শূন্য দুপুরের একাকিত্বকে কেন ভরিয়ে দেয়! কেন তাঁর প্রেমহীনতাকে, সকল ক্ষয়ক্ষতিকে পরিপূর্ণ করে দেয়! নেকড়েতুল্য বাস্তবতা তাঁর চারপাশকে ঘিরে থাকলেও কবি ওই প্রেম-কবিতাতেই থাকবেন বুঁদ হয়ে, থাকবেন সন্নত, সমর্পিত। এই প্রয়াস আসলে কাব্যপ্রেম।
পরের স্তবকে দ্বান্দ্বিক রীতিতে আঁকা হয় নেতিবাচক জীবনের রূপচিত্র। জল যেহেতু কবিতাটির মৌল প্রতীক, রূপালি স্নান সে-সূত্রে কবির বাসনা-উজ্জ্বল অপ্সুদীক্ষা। রাহমান যে বহু জলের কথা বলেন, তা গভীরতা বোঝাতে নয়, বহুস্বরের ব্যঞ্জনা আভাসিত করতে। জলে রেখা আঁকার অসম্ভব প্রয়াসের ইঙ্গিত দেন। কিন্তু এই জলই রূপান্তরিত হয়ে যায় চোখের অতল হ্রদে এবং তাতে ধূপছায়ার রং অনুরঞ্জিত হতে থাকে। অর্থাৎ চোখের জলের এই রৌদ্রছায়ার ইম্প্রেশন কি জীবনের কান্নাহাসির দ্বৈততাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে না? কেননা, এরপরই কবি গোধূলির গোলাপি আভার প্রসঙ্গ আনেন, একদিন ঘাসের শয্যায় আশ্রয় নেওয়ার কথাও বলেন। এ যেন অবসান বা মৃত্যুর ইঙ্গিত? ঘাস তো আবার যৌনতারও দ্যোতক, গোধূলির রং ও রক্তিম কামনা-বাসনার রূপাভাস। কবিতা-প্রেমের জন্যে হৃদয়কে অভিজ্ঞতার রৌদ্রছায়ায় মাখামাখি করতেই হয়। কবিতার দুটি লাইন হচ্ছে ‘ছন্দে ও মিলে কথা বানানোর আরক্ত কতো তীক্ষè লজ্জা/ দৃষ্টিতে পুষে হাঁটি মানুষের ধূসর মেলায়।’ রূপালি øানের কল্পনা কিংবা প্রেমের কবিতার উষ্ণতা বুকে নিয়ে তিনি ছন্দমিলে পঙ্ক্তি রচনার লজ্জা পুষে মানবসমাজের ধূসরতায় পথ হাঁটেন। কল্পনা আর প্রকৃতি রংবহুল, কিন্তু মানবসমাজ তাঁর কাছে বর্ণহীন, ধূসর। এ হচ্ছে বুর্জোয়া ব্যক্তির সেই সমাজবিচ্ছিন্নতা। কবিকে চারপাশের মানুষজন বোঝে না, অবজ্ঞা ও অবহেলা করে, তাঁর কবিতাকে তাচ্ছিল্য করে। কবি ও মানবসমাজের বিরোধী সম্পর্ক তো অতীত থেকেই চলে আসছে। এখানে কবির আত্মসমালোচনার ভাষাটি সত্য উচ্চারণ করে সমাজ চোখ ঠেরে বলে তিনি মধুভুক, বিভিন্ন কাব্যজগৎ থেকে তিনি কবিতামধু আহরণ করেন। বিষয়টি তাঁর মৌলিকতার প্রশ্ন তুলে ধরে।
কিন্তু কবি তাতে বিচলিত হন না। এলিয়ট তো কবিকে মৌলিক বলতে রাজিই নন, সব কবিই পূর্বসূরিদের নবায়ন। কিন্তু পূর্বজরা ছাড়াও রাহমানের অন্তর্সঙ্গী হয়ে আছে আকাশ, স্বর্গ-শিশির, জোনাকির আলোর নূপুর আর সেসব অবপ্রাণী। এটাই কবির স্বরাজ্য, এখানে তিনি সম্রাট। প্রকৃতিই কবির পরমাশ্রয়।
পরের স্তবকে শিশিরের জলে স্নানের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। এই স্নান নৈঃশব্দ্যের এবং জীবনানন্দীয়। বিবর্ণ ক্লান্ত দুপুরগুলো মুছে দিয়ে কবির মন চলে যায় পৃথিবীর রূপালি প্রান্তে। এখানে চাঁদের প্রতিমা উঁকি দেয়, কিংবা চাঁদকে ঘিরে কবির গড়ে ওঠা কল্পজগতের কথাও ভাবা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তব প্রেতচ্ছায়া হয়ে শুকনো রুটির অভাবে তাড়নায় তাকে বিদ্ধ করে প্রতিমুহূর্তে। জৈবিক ক্ষুধা তাঁর টুঁটি টিপে ছিঁড়ে ফেললেও তিনি শিল্পক্ষুধায় কেবলই উজ্জ্বল কথা বুনে যাবেন, – ‘তুলে দিয়ে দরজায় খিল/ সত্তাসূর্যে সেমাসের ক্ষমা মেখে নিয়ে।’ যিশুর প্রসঙ্গ ব্যবহার করায় ক্রুসিফিকেশনের ব্যঞ্জনা মনে আসা স্বাভাবিক। কবিমাত্রে মানবসংসারের যূপকাষ্ঠে বলি প্রদত্ত, সর্বদাই তিনি ক্রুসিফায়েড। কবির মৃতদেহটি ঠান্ডা হয়ে পড়ে থাকবে নর্দমার পিচ্ছিল জলে, যদিও বাস্তবে তিনি স্নাত হন ক্লেদগ্লানিভরা নোংরা নর্দমায়। প্রেতায়িত বাস্তবতায়, এই শহরে তবু তিনি ‘শান্ত রূপালি স্বর্গ শিশিরে স্নান’ করার কল্পনায় রত থাকবেন। পুরো কবিতাটি একধরনের আত্মনাট্য।
‘রূপালি স্নানে’র গঠনরূপে অন্ত্যমিলের প্রয়োগ ঘটিয়ে রাহমান মাঝে মাঝে দুয়েক পঙ্ক্তিতে মিল ভেঙে দেন। প্রকৃতি অবচেতন ও নির্জনলোক বিনির্মাণে অন্ত্যমিল সুরের স্পন্দন রচনা করে। কিন্তু যখন নেকড়ের হিংস্রপাল আর ধূসর বাস্তবতা স্তবকপ্রান্তে হানা দেয় তখন মিল ভেঙে যায়। কবির এই ছন্দপরিকল্পনা গীতস্পন্দন ও মিলহীনতার দ্বন্দ্ব রচনা করে। রাহমানের নান্দনিক রূপকল্পের যে-বৈশিষ্ট্য কবিতাটিতে পরিস্ফুট হয়েছে তা হলো, চিত্রকে ধ্বনিস্পর্শী করে তোলা, ছবিকে সুরে রূপান্তরিত করা। বাংলা কবিতার মূল ধরনটাই হচ্ছে ধ্বনিময়তা, সুরের প্রবলতা। চিত্রকেও এখানে ধ্বনির রথে চড়তে হয়। আর যে নাগরিক সত্তা বাস্তব পৃথিবীতে রুটিমদের নেকড়ের পালের সঙ্গে লড়াই করে, তার দৃশ্যায়নে ভর করে গদ্যময়তা। কিন্তু ব্যক্তিসত্তার রূপালি স্নানের যাবতীয় কল্পোক্তি অন্তর্বয়িত হয় লিরিক্যাল বুনটে। তাই রাহমান কল্পোক্তির মধ্যে যে রোমান্টিক আত্মময়তার স্বাধীনতা রয়েছে সেটির তুমুল ব্যবহার ঘটান কবিতালিখনে। অন্তত এই কবিতায় তাঁর দ্বৈত অস্তিত্বের বিচিত্র মুহূর্তলালিত রম্য স্বাধীনতা শিল্পিত সংবেদন তৈরিতে সমর্থ হয়েছে – এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

অ্যাপোলোর জন্যে : নান্দনিক প্রার্থনাগীত
কবির পৃথিবী আর কবিতার পৃথিবী সমতলিক নয়। তবে দুইয়ের মধ্যে নিত্য মিথস্ক্রিয়া ঘটে। অভিজ্ঞতা আর সময়যাপন কবির সীমাবদ্ধ পৃথিবীর পরিসর বাড়ায়, যদিও তার সবটুকু আঁকাড়াভাবে কবিতার পৃথিবীতে ঠাঁই পায় না। যেখানে থাকে প্রেরণা, আইডিয়া, অবচেতন, সংবেদন, মুড আর শিল্পব্যাকরণের নিয়ম-কানুন। তবে, প্রতিশ্রুতিশীল কবিপ্রতিভা নিজের ছোট্ট পৃথিবী আর অভিজ্ঞতার নির্যাস নিয়ে সাহসের সঙ্গে ঢুকে পড়েন কবিতা-সৃষ্টির রহস্যময় জগতে। রাহমান নিজের রচনাকাজের এই রহস্যকে এভাবে বর্ণনা করেন, বলেন : কবিতা লেখার সময়, কোনো এক রহস্যময় কারণে, আমি শুনতে পাই চাবুকের তুখোড় শব্দ, কোনো নারীর আর্তনাদ, একটি মোরগের দৃপ্ত ভঙ্গিমা, কিছু পেয়ারা গাছ, বাগানঘেরা একতলা বাড়ি, একটি মুখচ্ছবি, তুঁত গাছের ডালের কম্পন, ধিকিয়ে চলা ঘোড়ার গাড়ি, ঘুমন্ত সহিস ভেসে ওঠে দৃষ্টিপথে বারবার।
বস্তুজগতের দৃশ্যকোলাজ আর ধ্বনিই যে কবিকে প্রেরণায়িত করে এখানে তার উদ্দীপ্ত ইশারা মেলে। তবে রাহমানের সৃজনকাজে অবচেতনও অংশ নেয়। তাঁর কবিতা রচনার শুরুর দিকে লক্ষ করা যায় অবচেতনের ভগ্নাংশ অভিজ্ঞতার অনুপল আর অব্যবস্থিত অল্পবয়সের সংকোচ একধরনের দ্বিধাসুন্দর ছাপ ফেলেছে। সেইসঙ্গে ছিল পঠনপাঠন ও পূর্বসূরি কবিদের প্রভাব। তা যেমন বিষয় খোঁজাখুঁজির ক্ষেত্রে, তেমনি শব্দছন্দ অলংকারের প্রশ্নেও। কী নিয়ে লিখবেন, কেমন করে লিখবেন – এসব নিয়ে শৈল্পিক সংশয় ও অনিশ্চয়তা কমবেশি ছিল দৃশ্যমান। প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কবিতাগ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় তার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ফলে কাব্যঐতিহ্য, মোটিফ, রূপকল্প ইত্যাকার দিকে পূর্বসূরিদের প্রচ্ছায়া নানাভাবেই ধরা পড়ে, উঁকি দেয় কবির নিজেরও ইপ্সা-বাসনা ও কবিসত্তা নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা, বিক্ষেপ। এমনি একটি কবিতা ‘অ্যাপোলোর জন্যে’।
সংগীত, যৌবন প্রজ্ঞা ও আলোকের পুরাণপ্রতিমা গ্রিকদেবতা অ্যাপোলো সৌন্দর্যেরও দ্যোতক। সে একসময় জলপরী রূপসী দাফনির পশ্চাতে ধাবিত। পুরুষসঙ্গ ও প্রেম দাফনির কাম্য ছিল না বলে অ্যাপোলো তাকে আয়ত্ত করতে পারেনি। আত্মরক্ষার জন্যে সে নিজেকে চিরসবুজ লরেল বৃক্ষে রূপান্তর করে। অ্যাপোলোর আলো অর্থাৎ জ্ঞান ও সংগীত এখানে সৌন্দর্য প্রেমের জন্য। কবিতাটিতে রাহমানের তরুণ বয়স আর কবিতা-ভুবনটি যেন এক ছোট্ট পৃথিবী – সদ্যবিকাশমান ‘শিশুপৃথিবী’। ঢাকা শহররের্ অধবকশিতির্ বুজোয়া জীবন হচ্ছে এই শিশুপৃথিবী যেখানে বাস্তবতা অর্থাৎ পাহাড়টা সুউচ্চ ও ধূসর। শুধু ধূসরই নয়, বন্ধ্যা, বন্ধুর ও কবির বিরোধী। অ্যাপোলোর ‘মেধাবী হাসির সোনালি ঝরনা’ এই পাহাড়ে এখন লুপ্ত। ধূসরতা গ্রাস করেছে সোনালি ঝরনাকে। মননশীলতা, জ্ঞান ও স্বর্ণাভ মহার্ঘ্য মেধার জন্যে কবি কাতর। আধুনিক কবিমাত্রে মেধাবী চেতনাশ্রয়ী। আর পঞ্চাশের বাংলা কবিতা তো ‘মেধাবী লিরিক’ রচনায় উৎসাহী ও ব্রতশীল করেছিল একঝাঁক কবিকে। কৃত্তিবাস, শতভিষা পত্রিকার লক্ষ্যই ছিল তা-ই। রাহমান তারই অনুক্রমে নিজের শিশুপৃথিবীতে অ্যাপোলোর লুপ্ত ঝরনাটি বইয়ে দিতে চান অর্থাৎ নিজেকে করতে চান চলচ্ছল জ্ঞানপ্রবাহ। জ্ঞান বিনা জীবন ধূসরবর্ণ। অ্যাপোলোর ‘সোনালি রূপালি’ গানের ‘গভীর ঝংকার’ এই জীবনে অন্তর্হিত। শুধু ধূসরতাই নয়, এখানে আছে ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের রংহীন হৃদয়, তাদের মনন মধু ও মন্ত্র হারিয়ে গেছে। অথচ শানিত চেতনায় কল্পশক্তিরূপে জীবনবাঞ্ছা মালবীর মায়াময় কণ্ঠে কবিকে ডাকে। অর্থাৎ জীবননদী আর মায়াবী মানবীরা – দুটোই প্রজ্ঞাচ্যুত, আলোরিক্ত, সংগীতহীন।
কবিতাটির পটভূমি রাত্রি অর্থেই রাত্রি – বিশাল ব্যাপ্তি বোঝাতে সমুদ্রের সঙ্গে উপমায়িত। তবে সে-সমুদ্রও বেদনার্ত, তার কান্নার ঢেউ মনের তটে উদ্বেলিত, ফুলে-ফুলে উঠছে। জীবনকে প্রথাগত নদীর রূপকে ধরা হলেও কবিমন কিন্তু ব্যাপ্ত-সমুদ্র। কবিতাটিতে কিছু পঙ্ক্তি রচিত হয়েছে কলমের স্বতঃস্ফূর্ত টানে, কখনো অবচেতন ঘোরে। ফলে উল্লম্ফন ঘটেছে – কাব্যতাত্ত্বিকেরা যাকে আধুনিক কবিতার অন্যতম টেকনিক হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এ-কবিতায়ও ‘সমুদ্রমন’ প্রসঙ্গটি হঠাৎ বদলে যায় নির্জন আকাশপ্রদীপে। এতে তরঙ্গ ও আলোর দ্বিরাবর্ত তৈরি হয়েছে। এরপর তিনি এক ‘ধু-ধু সময়হীনতার’ কথা বলেন অর্থাৎ নিঃসময়ের ইঙ্গিত আসে কবিতায়, একইসঙ্গে আসে খণ্ড সময়ের প্রসঙ্গ। নিঃসীম সময়হীনতা খণ্ড, সময়ের ‘কোনো তন্দ্রাকে মুছে’ দিয়ে আকাশপ্রদীপে আর ‘শিশিরের জলে কাঁপছে’। আকাশপ্রদীপ কি রচ্যিুয়াল, না সন্ধ্যাতারা! প্রথমটিই ঠিক মনে হয় – পরলোকগত আত্মাকে পথ দেখানোর ঊর্ধ্ব সংকেত, যদিও আমরা নিঃসময়ের গর্ভে খণ্ড সময়কে ঢুকে যেতে দেখি। ফলে অ্যাপোলো আর আকাশপ্রদীপ সমার্থক হয়ে উঠল, তাতে বিরোধ আর রইল না। সময়হীনতা হয়ে গেল অ্যাপোলো তথা আর্নন্ত্যের পথনির্দেশনার আলোক।
কিন্তু আমরা তো খণ্ড সময় থেকে, বর্তমান থেকে পালাতে পারি না। খণ্ড সময়ই আমাদের দেয় বেদনাময় জীবনাভিজ্ঞতা, দেয় যা কিছু প্রার্থিত, বাঞ্ছিত। তবে কবির বার্তা হলো শিল্প বর্তমানের সঙ্গে চিরন্তন সময়কে একসূত্রে গাঁথে – আলো দিয়ে, কান্না দিয়ে, সংগীত দিয়ে। কবি তাঁর শিল্প তথা শিশুপৃথিবীর জন্যে এই চিরন্তন নিরবকাশ প্রার্থনা করছেন, এক অর্থে নৈঃশব্দ্যেও যেতে চাইছেন না কি?
এরপর কবির দৃষ্টি প্রক্ষেপিত হয় আনুভূমিক অরণ্যের জগতে। না তিনি ওই অরণ্য পরিবেশে অবস্থান করছেন না। ঘরের দেয়ালে টানানো হরিণের ছাল দেখে অরণ্যবতী জীবনের কান্নার কথা মনে আসে। এ যেন লরেল বৃক্ষে রূপান্তরিত দাফনির নিঃসঙ্গ কান্নার প্রতিধ্বনি – যদিও কান্না অবশেষে মহতী গানের সুর হয়ে ওঠে ও অরণ্যের কথা ভুলিয়ে দেয়। সংগীত যেন অরণ্যের কান্নার বিকল্প। অরণ্য যদি হয় প্রাকৃতিকতা, তবে সংগীত হচ্ছে সংস্কৃতি। প্রকৃতিও সংস্কৃতির বৈপরীত্য, যা আধুনিকদের নগরপ্রীতির আতিশয্যে কবিকে গ্রাস করেছিল – বুদ্ধদেব বসুর সেই কবিতাবাক্য – ‘জানলায় পর্দা টেনে দে, প্রান্তরে কিছুই নেই’ স্মরণযোগ্য। এই চিন্তাটি রাহমানকে খুব বেশি প্রভাবিত করেনি। বরং জীবনানন্দীয় প্রকৃতিচেতনা আর অনুষঙ্গেই তিনি সমর্পিত। প্রকৃতিকে সংস্কৃতিতে বদলে দেওয়ার সভ্যতাগর্বী ক্ষমতার উত্তরাধিকার বহনকারী অ্যাপোলো যেহেতু কবিতার শিরোনাম, তাই এখানে ভাবা যেতে পারে নারীর ও বৃক্ষসত্তার কথা, তার রোদন-কথা। কান্নাই তো সংগীতশিল্পের উৎস। অ্যাপোলো তো সংগীতেরও দেবতা। আর নারীটি বোধকরি কবির মিউজ, শব্দবন্দি কবিতা যে সংগীতসীমাকে ছুঁতে যায়, এ-কথা তো পুরনো। কবিতা পারমিতার মুখশ্রী, চিত্তচমৎকারী মনোহর রূপ এখন দুর্বোধ্য ভাষার মধ্যে ক্ষুদ্ধ – অপরূপ শব্দে কবি কি রোম্যান্টিক কাব্যশ্রীর প্রতি ইশারা করছেন! কারণ আধুনিক কবিরা তো একভাবে নিও-রোম্যান্টিকও বটে। কিন্তু আধুনিক মনের ক্লান্তিবশত গৌধূলির রঙিন মুহূর্তেও ওই অপরূপ মুখটি কেবল ক্ষোভই জাগায়। এই স্তবকে আকাশপ্রদীপরূপী সন্ধ্যাতারা কবির ক্ষীণ অপরিপক্ব মেধাবী আলোর প্রমাণ দিচ্ছে। এখনো তিনি মননশীল বেদনাকে সম্পূর্ণ আয়ত্ত করতে পারেননি। তাই তাঁর বেদনা-ক্ষোভ কাস্পিয়ান সমুদ্রের নীলজলের মতো ক্রন্দনশীল। নীলজল-শব্দানুষঙ্গ রোম্যান্টিসিজমের চিহ্নক হলেও কবি নিজেই বুকের সোনালি হরিণকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছেন। বাক্যগুলির অর্থ যদি হয় রোম্যান্টিক চিহ্নকগুলির দ্যোতনা, তা তো আধুনিক কবিতায় আর পূর্বতন রূপে নেই। কবি যেন সেসবের জন্যেই সৌন্দর্যকাতর। সেসব কল্পনার সোনালি দিব্যতা আর সেই সে-প্রকৃতির নিভৃতে, শিহরণে গাঢ় আকুলতায় উদ্বেলিত থাকার কাব্যকল্পনা। সেখানে ছিল না আধুনিক খণ্ড সময়ের-ব্যথা-ক্লান্তি বিবর্ণধূসরতা-নৈঃসঙ্গ-ক্ষোভ। একটি দীর্ণ নারীর প্রসঙ্গ আসে, যে কি-না তার ফাল্গুনি মন হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ বসন্তবাসনাটি অপহৃত, একালের যৌবনে নেই বসন্তযাপনের প্রপঞ্চ। নারীটি কবিহৃদয়ের প্রতীক, সেটি মেধার জন্য প্রার্থনায় রূপালি পূর্ণিমার মতো জ্বলছে। এই ক্লীব জীর্ণ কাব্যসমাজের প্রবীণ ক্ষমতাবানেরা প্রণয়োজ্জ্বল হৃদয়কে, কবিতা-প্রেমকে, অবচেতনাকে অর্থাৎ কবিসত্তাকে তছতছ করে, পর্যুদস্ত করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত কবি তো সমাজের প্রত্যাখ্যান, মনোহীনতার গল্পই বলছেন। মেধা ও হৃদয়ের মধ্যে মেরুদূর বৈপরীত্য রচনা করছেন না, আধুনিক কবিতায় এই পার্থক্য নেই।
আগেই বলেছি, রাহমানের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দের শব্দানুষঙ্গ, পঙ্ক্তির চূর্ণ প্রয়োগ প্রচুর। এই দুই কবিকে মিশিয়ে ফেলে কাব্যপঙ্ক্তি রচনার দৃষ্টান্ত কম নয়, যা কবি বিষ্ণু দে-র কথা মনে করিয়ে দেয় ‘এখানে নামল সন্ধ্যা, পৌষ এসে ডাক দিয়েছে তাদের শূন্য ভাঁড়ারে/ ঠোঁটে তুলে নিতে ইঁদুরের মতো মৃত্যু।’ রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর পৌষের ডাক এ-কালে শোনা যায় না, এখন ফসলের ভাঁড়ার শূন্য, ধুলার আঁচল পাকা ফসলে ভরে ওঠে না আর। তাই এই পৌষ মৃত্যুকে আহ্বানের সংকেত। কবি যেন রবীন্দ্রনাথের বৈভবপূর্ণ-বসুন্ধরা আর জীবনানন্দের চিন্তাহীন নিশ্চেতন প্রাণের সম্প্রসারণশীল জগৎকে মৃত্যুগ্রস্ত রূপে দেখছেন। নইলে ‘ধু-ধু’ সময়হীনতার আনন্ত্য কেন বন্ধ্যা ‘ধু-ধু’ প্রান্তরে পর্যবসিত হয়ে গেল এলিয়টীয় পোড়ো জমির মতো। এই প্রাচ্য এশিয়ায় বঙ্গদেশে কবি শুধু প্রাচীনের কায়াহীন ছায়া ও অবক্ষয়িত সামন্তযুগের ক্লান্ত বুড়ো ম্লানতেজ ঘোড়াদের আর্ত চোখই দেখতে পান। পুরনো ঢাকার সামন্ত অবশেষ সংস্কৃতির মধ্যে বসবাসের অভিজ্ঞতা কবিকে এইসব দৃশ্য-সংকেত দেয়। কবির নিয়তি হচ্ছে বর্তমান জীবনপ্রবাহে ও কাব্যাদর্শে নিজেকে প্রতিনিয়ত বিজড়িত রাখা। জীবনই কবিতার আকাশ। অবধারিত এই নিয়তি তাঁকে আরো নিয়ে যায় অনুপুঙ্খ প্রাণের কাছে, চেতনাপ্রসূত সোনালি-রূপালি নারীদের কাছে। অন্তত এই কবিতায় এটাই তাঁর প্রত্যাশা। কবিতাটি নারীসংগীত, আলো, জ্ঞান সমবায়ে কবিতা-রচনাক্রিয়ার স্বরলিপি। আধুনিক কবির মননশীল হয়ে-ওঠার – অ্যাপোলিয়ান হয়ে-ওঠার লিরিক্যাল আর্তি।
মোট চারটি স্তবকে নয়টি করে পঙ্ক্তি। শুধু দ্বিতীয় স্তবকে এক পঙ্ক্তি কম। কবিতায় পঙ্ক্তিসাম্য গঠনে রাহমান সফল কবি, বিশেষ করে জীবনানন্দের এলায়িত দীর্ঘ কাব্যপঙ্ক্তির আয়তন সংহত করে তিনি তৎকালীন অনতিপ্রসারিত ঢাকা শহরের নাগরিক ছন্দস্পন্দকে পঙ্ক্তিবদ্ধ করেন। এই নিরীক্ষা পরে আরো সুগঠিত হয়েছে। পুরাণ প্রতিমা বিনির্মাণের নৈপুণ্য রাহমান আরো করেছেন পঠনপাঠন ও তিরিশি কাব্যঐতিহ্যের অনুসরণে। ব্যক্তিপুরান সৃষ্টিতে যেমন কবিসত্তাকে রূপান্তরিত করেন, তেমনি স্বদেশ সময়ের সামূহিক জীবনেতিহাস প্রতীকায়নেও পুরাণচরিত্র বিনির্মাণ করেন। তবে তাঁর কবিতার বিষয়ভাবনায় পুরানকাঠামো বা mythical way পদ্ধতিটি ব্যবহারের এলিয়টীয় টেকনিকচর্যা নেই। বরং আছে রোম্যান্টিক কবিতার মতো কল্পোক্তি করার আঙ্গিক। আলোচ্য কবিতাটিকে আমরা ব্যক্তিপুরাণ রূপেই পাঠ করতে চাইছি। এই ব্যক্তি ‘শহুরে রোম্যান্টিক’, যিনি আধুনিক বোধে দৃপ্তদৃঢ় হতে চান। এই বাংলার আধা সামন্তগ্রামঘেঁষা নগরে, নবাবি সংস্কৃতির স্মৃতি প্রতিবেশে বেড়ে ওঠা, পাশ্চাত্য সাহিত্যপাঠলব্ধ কাব্যবোধে গঠিত রাহমানের কবিমানস তিরিশি কাব্যঐতিহ্যের ধারানুগামী। তবে তিনি যে এদেশের ইতিহাস-ভূগোল আর ঘটনা-দুর্ঘটনাময় জীবনকে শব্দবন্দি করবেন তার ইঙ্গিত প্রথম কাব্যেই দেখা যাচ্ছিল।
তাঁর রীতি হচ্ছে স্মৃতিকাতর মুহূর্তে, বর্তমানের সঙ্গে সংলাপিতার প্রাক্কালে, চলমান ঘটনাদৃশ্যে শব্দকে চলচঞ্চল করে তোলা। এবং যুগ্মশব্দ ব্যবহার করা – ধু-ধু অথই রাত্রি, সোনালি রূপালি ইত্যাদি লক্ষ করা যেতে পারে। তবে ছন্দকে সুরের মূর্ছনায় আচ্ছন্ন করার প্রয়াস তাঁর ছিল না। তিনি বরং সুরকে ছন্দবন্দি করেন অনুভূতির ছবি আঁকার জন্যে। বাংলা কবিতার ধ্বনিরূপ জীবনানন্দের হাতে ছবির ফ্রেমে বাধা পড়েছিল – এ-কথা রবীন্দ্রনাথ বহু আগে বলে গেছেন। রাহমান সেই ছবি আঁকার রঙে-রেখায় সংগীতের ধ্বনি যোজনার জন্যে অন্তত টেকনিকের ক্ষেত্রে, অ্যাপোলোর উদ্দেশে এই প্রার্থনাগীতটি রচনা করলেন।

কবিকে দিও না দুঃখ : দুঃখ যদি নাইবা দিলে
একটা জরিপ করলে জানা যাবে যে, বাংলা ভাষায় দুঃখের কবিতার সংখ্যা সুখের কবিতার চেয়ে বেশি। বাঙালি দুঃখস্বভাবী, তার নৃতাত্ত্বিক আবেগসত্তা নানা সংঘাত-সংঘর্ষ-আপসকামিতায় দুঃখের সাধনা করেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। দুঃখ তার প্রেমে, অপ্রাপ্তিতে, বাসনাবোধে, মরমীয়-চিন্তায়। কিন্তু দুঃখকেই সাবজেক্ট করে কবিতা লেখার রাহমানীয় স্টাইল বেশ চিত্তচমৎকারী, তাঁর কবিস্বভাবোচিত আলাপচারিতার জমে ওঠা মৌতাত। দ্বিতীয় কাব্য রৌদ্র করোটিতেই ‘দুঃখ’ নামের ক্যাটালগধর্মী কবিতাটি পাঠকমহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল। অনেকেরই পছন্দের তালিকাভুক্ত। আমরা আরো দুঃখবিষয়ক কবিতা রচিত হতে দেখি আমি অনাহারী কাব্যে : যেমন, ‘কবিকে দিও না দুঃখ’, ‘দুঃখ পেতে থাকি’। বোঝাই যাচ্ছে দুঃখ কবির আমিকেন্দ্রিক প্রপঞ্চের আধার।
যদিও আমরা দুঃখকে সাবজেক্ট রূপে গ্রহণের কথা বলছি প্রকৃতপক্ষে রাহমান দুঃখকে অবজেক্টিফায়েড করছেন বুদ্ধ বা শোপেনহাওয়ারের মতো ফিলোসোফাইজ করার বদলে। এই ভঙ্গি তাঁর এই দৃষ্টিলোককে নির্দেশ করে যে – ‘কেন রে এই দুয়ারটুকু’ বলে তিনি অধিবাস্তবে পালানোর দুয়ার খুলবেন না। চারপাশকে অবলোকনের যে নিবিড় চোখ তাঁর কবিতায় অতন্ত্র জেগে থাকে, তা বড়জোর কল্পনাতন্তু দিয়ে বুনে যায় সোনালি-রূপালি জাল, জ্যোৎøাপ্লাবী মনোভূমিতে লিরিক ভ্রমণ করে, কিন্তু অধিবাস্তবে বা মরমিয়াবোধে পাঁক খায় না। এটাই রাহমানের নাগরিকসত্তার খাঁটিত্ব। তবে বাংলা কবিতার শরীরে অন্তঃপ্রবিষ্ট হয়ে থাকা দুঃখ-ঐতিহ্যের ব্রতশীলিত মর্মদ্রাবী রূপটির ইতিউতি ছিন্ন বাক্যাংশ কি তাঁর কবিতাকে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যায় না? যদিও ‘দুঃখ’ কবিতায় কোনো বিবাগী বৈরাগ্য বা মরমিরূপ নেই, নেহাতই তা – দুঃখের জাগতিক গার্হস্থ্যে লেপ্টে থাকে, বড়জোর ‘নীল আকাশের/ মিহি বাতাসের/ সুন্দর পাখির মতো’ কমনীয় হয়ে ওঠে, তবু কিছুটা হলেও দুঃখের সর্বব্যাপ্ত মসৃণ প্রসৃতি দর্শন করে আত্মার শিহরণ অনুভবের বীক্ষা লাভ করা যায়। আমাদের মনে হয়, কবি এভাবে মরমীয়/ অধিবিদ্যক চিন্তার বাইরে অবস্থান করতে আগ্রহী। ‘কবিকে দিও না দুঃখ’ – এই নিষেধার্তিতে আছে কি দুঃখময় জীবনের বাইরে কবিকে থাকতে দেওয়ার প্রার্থনা? রাহমান বরাবরই তাঁর আকাক্সক্ষা-এষণা-প্রত্যাখ্যান-প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন নম্রভাষণে, বিষাদময় স্বরে। যে নাগরিক বৈদগ্ধ্য অর্জন করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বুর্জোয়া হতে চায়। কিন্তু প্রতিবেশ আর রাষ্ট্রীয় বৈরিতায় হয়ে থাকে দুর্বল, পঙ্গু তার কণ্ঠস্বর যতটা না সতেজ, তারও বেশি বিপন্ন ও নিঃসহায়। কবিতাটির বাক্যে পঙ্ক্তিতে গেঁথে আছে বিপন্নতা। বহুস্তরিক জনজীবন লগ্ন হয়ে বা আদিঅদিতি প্রকৃতির আশ্রয়-শুশ্রƒষায় প্রাণের আরাম সন্ধানের প্রয়াস তাঁর মধ্যে নেই। তাই জীবন পলাতক হওয়া বা আত্মবৃত্তের পরিধিতে ছড়িয়ে পড়ার ভাবনায় তাঁকে লুকোচুরিতে মাততে দেখা যায় না। খানিকটা স্বাচ্ছন্দ্যে, সরলতায় এই জীবনই তিনি যাপন করতে চান – তবে কবিতাযাপনে রত থেকেই।
দুঃখ যে জীবনকে অগ্নিশুদ্ধ করে, পরমব্রতী হতে তাপ জোগায় কবি তা মানেন। কবিতাটিতে ব্যাজস্তুতি উচ্চারিত হয় – জলস্থল-হাওয়ায়-নীলিমায় – সমগ্র নিসর্গে দুঃখ ছড়িয়ে দেন যে-কবি, তিনি নিজেই স্বযাচিত দুঃখজর্জরিত থাকেন। অর্থাৎ বাঁচার অভিজ্ঞতা থেকে অভিজ্ঞান উৎসারিত হয় – এ তো সহজ কথা। নিশ্চয়ই এত সরল কথন কবির উদ্দেশ্য নয়, কারণ পরের পঙ্ক্তিতেই অন্তর্বরিত হয় জীবনাভিজ্ঞতার ধরনধারণ। কবি মর্মগাঁথা নিঃসঙ্গতাকে বয়ে বেড়ান একা-একা কারণ তাঁকে যত্রতত্র দালানের চূড়ায় চূড়ায় দিগন্তে নক্ষত্র ছিটাতে হয়’ – এই অকাজের কোনো অন্তসঙ্গী থাকে না। কারণ নির্জ্ঞান অচেতন লোক থেকে নৈঃশব্দ্য আর নৈঃসঙ্গ্যের অতলে নেমে গিয়ে তাঁকে একাই মুঠো মুঠো তুলে আনতে হয় নক্ষত্ররাজি। ফুল চাঁদ নক্ষত্র কবির লেখনীতেই সত্য হয় – এ হচ্ছে সেই রাবীন্দ্রিক বিজ্ঞান সত্য – আমারই ‘চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ।’ – ‘আমি’ না থাকলে জগৎ থাকে না। আমার মনে হয় না রাহমান এরকম ভাববাদ -বস্তুবাদের সমীকরণে চিন্তাকুল, তাঁর বলার কথা হলো কবিকে দুঃখ দিলে, প্রত্যাখ্যান করলে নান্দনিক সত্য রচিত হবে না। চাঁদফুলনক্ষত্র নিয়ে রোম্যান্টিক কাব্যময়তা ঘুচে যাবে। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, রাহমানের কবিতায় রোম্যান্টিক জগতের জন্যে একটি গোপন হাহাকার আছে। অর্ধবিকশিত বুর্জোয়ার কাব্যসংস্কার যেন গোপনে বহন করে ওই জগতের খানিকটা বিভূতি।
পরের স্তবকে দুঃখের অনুষঙ্গী হয়ে আসে আধুনিক কবিদের বহুচর্চিত ও অর্জিত বিষাদময়তা। সীমাহীন রিক্ত আর বান্ধববিহীন কবি নিজেই বিষাদ হয়ে রেস্তোরাঁয় বসে থাকেন, এ যেন প্যারিসীয় নগরশিল্পীর পরিমণ্ডল। ক্রমাগত নগর হয়ে-ওঠা ঢাকার রাস্তা-ফুটপাত-পার্ক-রেস্তোরাঁ নিয়ে রাহমানের অবশেসন রয়েছে। তাঁর সুবিনীত কৃতি হচ্ছে নগরের খিন্ন, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমানুষের শ্রেণিপরিচিতির বাইরে গিয়ে তাদের একাকিত্ব, স্বাদ-সাধ আর আস্পৃহ অবলোকনকে কবিতাভুক্ত করা – সে-ভুক্তিতে হাত মিলেমিশে আছে চিত্রকলার আঙ্গিককে বিজড়নের নান্দনিক উৎসাহ, প্রতীচ্য নগরদৃশ্যের অনুপুঙ্খ রূপটি ঢাকার প্রতিবেশে ফুটিয়ে তোলার আগ্রহ। সেইসঙ্গে বোদলেয়রীয় বিষাদ-নৈঃসঙ্গ্যত অবধারিত হয়ে ওঠে। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার যে,প্রসার্য-ঢাকার [’৭১-পরবর্তী ঢাকার ক্ষেত্রেও শব্দটি প্রযোজ্য] নব্যবুর্জোয়া হয়ে-ওঠার পর্বে-পর্বান্তরে রাহমান অতটা নেতিবাদী হন না, তাঁর মধ্যে প্রাণঃস্ফূর্তি, উত্তেজনাও কাজ করে, কেননা ঢাকা কল্লোলিত এক শহর, যেখানে আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতিটা খুবই দৃশ্যমান বাস্তবতা। তাই তাঁকে চৌরাস্তার মোড়ে গোপন ফোয়ারা খুঁড়ে তোলার দায়দায়িত্ব বহন করতে হয়। বস্তুত এ-ফোয়ারা নগর-সৌন্দর্য বিধায়ক, পিপাসার্ত জীবনের – ‘জল দাও আমার শিকড়ে’ জাতীয় rebirth archetype নয়। তবে নগরসভ্যতার চোর-পুলিশ খেলাও যে তাঁর মগজে জমে ওঠে – এ-তথ্যও কবি আমাদের জানিয়ে দেন। রাহমানের কবিতার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, নগরপরিক্রমণ নির্ভরতায় – এটি তো একটি প্রচলিত সিদ্ধান্ত।
তবে, প্রেমের রূপায়ণে কিন্তু নাগরিক চতুরালির বদলে বন্দনায়িত হয় চিরাচরিত, ঐতিহ্যিক সংস্কার। প্রেমের কাছে তাঁকে অসহায় রূপেই আমরা দেখি, যদিও তিনি নগরকবিদের সম্মেলনে উপস্থিত হন তেজি যুবরাজের মতো, নিজের জন্য রচনা করে নেন, দ্বৈপায়নতা – ‘স্বকীয় গোপন ঘুলঘুলি’, যার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টিপাত করেন নীলিমার বিস্তারে। তাঁর ঐতিহ্যপরিস্রুতিনির্ভর মনের একাংশভাবে সুদূর অনন্তের সন্ধানে রত হওয়ার কথা। রবীন্দ্রনাথই আমাদের সুদূর আনন্ত্যের ফ্যাকাল্টি খুলে দিয়ে গেছেন। এ এক সহজিয়া মায়াবী হাতছানি, যা কবিদের আনুভূমিক জগৎ থেকে উল্লম্ব মাত্রায় ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে বিষয়টা ছিল ঔপনিবেশিক সীমাবদ্ধ বাস্তবতা পরিহার করে জগতের পরিসর বাড়িয়ে তাকে অসীমত্ব দেওয়া, আমাদের মগজে সীমাহীনতার ব্যাপ্তি তৈরি করা কিন্তু রাহমানের এরূপ আকল্প নেই। সুদূর অনন্তের হাতছানি থাকলেও, বিদীর্ণ কালতাড়িত নব্যঔপনিবেশিত নগরের কবিকে তা এড়িয়ে ভিন্ন সন্ধানে স্বরায়িত হতে হয়। সে-স্বরায়নে দেখি, কবি সীমিত স্পেসকেই আরো ছোট আয়তনে নিয়ে যান এবং তাতে আত্মগোপনের আরাম অনুভব করেন, অরব অন্ধকারে ডুবে গিয়েও বোধতাড়িত জীবনানন্দ ইতিহাসচেতনাশ্রয়ী হয়ে মহাজাগতিক পরিসরসন্ধানী হতে পেরেছিলেন। ওইরকম গভীর আঁধার রাহমানে নেই, তার তাৎপর্যও নেই, তাই দুঃখবোধই তাঁর পারানির কড়ি, সে-দুঃখও তাঁর। ‘আপন দুঃখ’ – অপরের প্রদত্ত দুঃখ এখানে প্রত্যাশিত নয়। তাঁর জীবন গচ্ছিত সবার কাছে নানান ধরনে অকপট থাকলেও ভিড়ের মধ্যে একাকিত্ব বুকে পুষে রাখার কৌশল আয়ত্ত করে নেন; তিনি জানেন ছায়াচ্ছন্ন পথ হাঁটতে, বায়ুস্তরে একলা সাঁতার কাটতে। এসবই কি কবির দুঃখের উৎস ও উপকরণ? তাঁর একান্ত আপন দুঃখ’? তাতে বিলসিত হওয়ার নান্দনিক আনন্দ? এ যেন মানুষের কাছে তাঁর প্রার্থনা নিবেদন যে, কবির নৈঃসঙ্গ্য বিষাদ-একাকিত্বের বিলাস যেন কেউ নষ্ট না করে। রাহমানীয় শহুরে রোম্যান্টিকতা এই কবিতায় এভাবেই আত্মসংরক্ষণবাদী হয়ে ওঠে। নিজের ভেতরে ডুবে গিয়ে কবি যে ক্রমে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যান – এ সত্য উচ্চারিত হয় ‘দুঃখ পেতে থাকি’ কবিতায়। সত্যটি তাকে ভীত করে, নিদ্রাহীন রাখে। নিঃসঙ্গতার আরেক অর্থ তো মৃত্যুই – কবিতার জগৎ কিংবা চার পাশের আত্মপরিজনের সঙ্গে লগ্নতাও ওই নিঃসঙ্গতা ঘুচাতে পারে না – এই যে ভাবনা তা-ও কোনো গূঢ়ভাষ নয়; কবিতা রচনা শুরু থেকেই ভাবনাটি চেতনায় জেকে বসে আছে। তবে অভিনব হচ্ছে, রাহমানের বলার ধরনটা তাঁর ধ্বনিকেন্দ্রিকতা, সংলাপিতা আর মাপাছন্দে নাগরিকতা অন্তর্বয়নের কুশলতাটুকু। এই কুশলতা কি আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন-জাতীয় রাবীন্দ্রিকতাকেও একভাবে ভাংচুর করে? দুঃখ না পাওয়ার অভিলাষ জ্ঞাপনের মধ্যে জীবন যে দুঃখময় এই ধ্বনিকেন্দ্রিক বাচনই আসলে সুস্থিত থাকে, আর তাতে নেই অমৃতের সোনার ফলের দুরাশা। তাই ‘দুঃখ দিও না’ – এই নিষেধের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ‘দুঃখ যদি নাই দিলে’ তবে জীবনলগ্ন ও কবিতা প্রাণিত হওয়া যায় কী করে!

একজন কবি : তার মৃত্যু : বিশ্ব ও প্রতিবিশ্ব
প্রতিটি প্রাণী প্রাকৃতিকভাবে ‘মরণজিন’ বয়ে বেড়ায়। পরিকল্পিত রূপে এই মৃত্যুকে বাস্তবায়িত করে। মানুষ মৃত্যুকে ভুলে থাকে আবার থাকে না – দার্শনিকদের কথিত থানাটস যেমন তাকে তাড়না করে, তেমনি প্রতিমুহূর্তে তার অস্তিত্ব আত্মরক্ষার টানে প্রাণপণে নির্জিত করে মৃত্যুকে। প্রতিটি ভাষাঐতিহ্যে মৃত্যুভাবনার ছাঁচ আছে, তার প্রকাশের চিহ্নগুলোও স্বকীয়। এরকম ছাঁচ ও স্বকীয়ত্বকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুদর্শনের যে-দিব্যবিভা রচনা করেন যৌবনে, তা শেষ বয়সে এসে প্রশ্নকণ্টকিত হয় এই বার্তায় যে, ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে’। এই চত্রিকল্পটি রচনার সময়-পরিপ্রেক্ষিত ও প্রেক্ষণী হয়তো খুবই জটিল বাস্তবতা ও কবির অভিজ্ঞানের উৎসারণে ঋদ্ধ, কিন্তু তা যে অস্তিবাদী জীবনসত্যের বিপরীতে অনস্তিত্বে বিলীন হবার প্রাকৃতিক নিশ্চেতনা মাত্র তা বোঝা সম্ভব। রাহমানের কবিতায় মৃত্যুর ডিসকোর্স সন্ধান করা একটু ঝামেলাপূর্ণ, কেননা তিনি রাজনৈতিক মাত্রায় মৃত্যু নিয়ে যতটা উদ্দীপ্ত ও কাব্য সংস্কার তৈরিতে সফল, ততটা মৃত্যুকেন্দ্রিক দার্শনিকতা নিয়ে অনুৎসাহী।
আলোচ্য কবিতাটিতে মৃত্যুকে বিম্ব হিসেবে বিশেষায়িত করা হয়েছে – একজন কবির মৃত্যুর দৃশ্যপট রচনার সূত্রে যে নিজেই তা অবলোকন করছে। এখানে দুই ব্যক্তিতা – একজন উচ্চারণ করছে আরেকজন দেখার কাজটি করছে। মানুষমাত্রে ঘরবসতকারী, অথচ ‘সে নয় ঘরের কেউ, তবু ঘরেই ঘুমন্ত।’ বসতি শব্দটি এখানে মরমিয়া অর্থে নয়, গার্হস্থ্য তাৎপর্যে ব্যবহৃত; ‘সে’ এই সর্বনামধারী যে কবি স্বয়ং তা আমরা আগেই বলেছি। অর্থাৎ এই মৃতব্যক্তিটি কবি হলেও গৃহস্থ। তাকে মৃত না বলে ‘ঘুমন্ত’ বলা হলো কেন? তাহলে কি সে মৃত নয়? ‘ঘুমন্ত’ শব্দে নিহিত এই সংশয়ের পেছনে কবির কোনো দ্ব্যর্থকবোধ বা সচেতনতা কাজ করেছে বলে মনে হয় না। এমনকি তাকে যেসব বিশেষণে অবয়ববদ্ধ করেন, তাও যেন শুধু চিত্রবর্ণনা মাত্র। শীর্ণ শরীর, দীর্ঘ চুলের এলোমেলো ভঙ্গি ইত্যাদিও সাধারণ, ঋজু বর্ণনা। যেন ‘তারহীন বীণা’ – এই উৎপ্রেক্ষাটি ব্যঞ্জনার মোচড় তৈরি করে দেয়। দেহের সঙ্গে বীণার উপমায়ন ঐতিহ্যলালিত ও রাবীন্দ্রিক অনুষঙ্গলালিত। এরপরই একে একে দৃশ্যায়িত হতে থাকে নাট্যঘটনা ও চলচ্চিত্রিক মুভমেন্ট। গৃহবাসীর সঙ্গী টিকটিকি একমুহূর্ত শুধু মৃতকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে তার খাদ্যবস্তু সুদর্শনা পোকার দিকে ধাবিত হয়। অর্থাৎ অপ্রাণীজগতে খাদ্যচক্রের ফাঁদে যে মৃত্যুসংঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত, তার ইঙ্গিত দেওয়া হলো। প্রকৃতিজগতের ক্ষুধা আর মৃত্যুর দর্পণে ঝলকে ওঠে ভাষা-অন্তরিত সাহিত্যোতিহাসের অনুষঙ্গাদি – সুদর্শনা পোকার উল্লেখে মনে পড়ে বিভূতিভূষণের দুর্গার বিয়ের স্মৃতি আর মৃত্যুর অমোচনীয় দুঃখাবর্ত এবং জীবনানন্দের কীটপতঙ্গের অনুষঙ্গাদি – যারা প্রতিনিয়ত লড়ছে ‘মৃত্যুর সঙ্গে’। ঐতহ্যিকি কাব্যানুষঙ্গ কবতিার শব্দবন্ধে ইঙ্গতিময় করে তোলার স্বতঃস্ফূর্ত কারুবাসনায় কবি নিপুণ। এই স্তবকের শেষ পঙ্ক্তি দুটোতে আকস্মিকতার আবর্ত ঘনিয়ে ওঠে – জানালায় ছায়াছন্ন বকুলতলার পাখি এসে বলে ‘নেই নেই’। স্মৃতি-গন্ধ ও প্রেমানুষঙ্গবহ বকুলতলা এখন ছায়াচ্ছন্ন – এই ছায়া কি মৃত্যুর না হারিয়ে ফেলা কোনো ভালোবাসার? তবে পাখিটি ‘সংগীতপ্রবণ’। ‘যাও পাখি উড়ে/ বল গিয়ে তারে’। – ইত্যাকার কৈশোরক হৃদয়দ্রাবী প্রেমার্তি – যুগপৎ প্রাপ্তবয়সে কৈশোরে প্রত্যাবর্তন-বাসনা আর প্রেম-এষণা। চিত্র-চলচ্চিত্র ধ্বনির বিন্যাসপরম্পরায় প্রথম স্তবকটি হয়ে ওঠে মৃত্যুকাতর নয়, জীবনবান্ধব।
এরপরের প্রতিবেশ হয়ে উঠতে থাকে গন্ধময় ও ছায়াপ্রতিচ্ছায়াচ্ছন্ন। মৃত্যুর সঙ্গে জুড়ে যায় রিচ্যুয়াল – ‘পুড়ছে আগরবাতি, বিবাগী লোবান।’ ‘বিবাগী’ বিশেষণে জীবনবিবিক্ত উদাসীন বিরহ ছড়িয়ে পড়তে থাকে, পুড়তে থাকে সাধ-সাধনা, বাস ও বাসনা। এ গেল মৃত কবির মৃত্যুর সাপেক্ষ দ্যোতকাদি। পাঁশুটে দেয়ালে জড়ো-হওয়া আত্মীয়স্বজনদের ছায়াদোলে। এই গৃহ যে কবির মতোই বয়সজীর্ণ – তা পাঁশুটে শব্দে প্রতীকায়িত। সংগীতপ্রবণ পাখিই শুধু মৃত্যুবার্তা রটায় না, অনুরাগী বন্ধুজনের চোখেও মৃত্যুদৃশ্য বিম্বিত হয়; তারা দেখে, কবির দেহে লেখা হয়ে গেছে ‘মৃত্যুর অব্যয় মাতৃভাষা’। এ-জাতীয় দর্শনভাবুকতা ইতিউতি বাক্যে গেঁথে থাকলেও তা খুব একটা গূঢ়ার্থব্যঞ্জক নয়। আমরা এ পর্যন্ত কবিতাটিতে তাঁর কোনো মৃত্যুদর্শন পাইনি। একটু ইশারা মেলে যখন বলা হয় সাংবাদিক-সমালোচকেরা, নাগরিক সুধীজনেরা কবির জীবনচরিত্রের পুরো পাঠ কোথাও পাবেন না, এইসব সমাজ-ইতিহাসের সম্বন্ধ-শৃঙ্খলার সঙ্গে কবির কোনো আন্তর্ব্যক্তিকতা গড়ে ওঠেনি, তিনি অনন্বিত। এই অনন্বয় মনস্তাত্ত্বিক নয়, শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ গড়ে তোলার জন্য যাতে তিনি প্রতিবেশকে দেখতে পান। কারণ জীবন নয় উন্মোচিত পৃষ্ঠা, যা সহজে পড়ে ফেলা যায়। ‘জীবন খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে যায়’ – এই বাক্যে কবি প্রতিশ্র“তি দেন যে, সেই গোপনতা মৃত্যুতেও উন্মুক্ত করা যাবে না। একালে মৃত্যু মহান করে না কবিকে, আমাদের কাছে তা শুধু ‘গহন ক্ষতি’। প্রশ্ন হলো, কবি কি মৃত্যুর মধ্যে নিজেকে লীন/ অন্তর্হিত করতে চাইছেন কোনো মনোবৈকল্যের অন্তশ্চাপে? মৃত্যু-বিম্বে অন্তরিত নিজের প্রতিবিম্বকে মুছে দিতে চাইছেন? গদ্যময় কথনের পরে তৃতীয় স্তবকে রাহমানের লিরিক্যাল বাচন আবার ফিরে আসে – ছোট ছোট সুমিত বাক্যে, দ্বিত্ব শব্দসংযোজনায় ধ্বনিময় আবর্তে ধরা দেয় কবির টিপিক্যাল কাব্যভঙ্গি। তাঁর সেই ‘সোনালি-রূপালি’ মাছেদের ঝলকানি দৃশ্যমান হয়। কিন্তু এইসব লোবান, শোকাশ্র“, সুরেলা পাখি, সোনালি-রূপালি মাছ – কিছুই মৃতের ওপর আত্মীয়তার দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। অথচ তাদের সঙ্গে একসময় কবির ছিল গাঢ় সম্বন্ধ-যা বহু কবিতার শব্দে-বাক্যে প্রতিবিম্বিত। কবিজীবনের শুরু থেকেই রাহমানের উচ্চারণে এরকম রূপালি-সোনালি বর্ণপ্রতিমার প্রতি গাঢ় পক্ষপাত লক্ষযোগ্য, আবার একইসঙ্গে ওই বর্ণবাসনা থেকে ছিটকে নর্দমার নোংরা জলে গড়িয়ে পড়ার বিপরীত বাস্তবতাও সমতলিক। আমরা তাঁর কবিতায় নর্দমার ঠান্ডা হিমে মৃতের মতো পড়ে থাকার অনেক কথন শুনেছি। এটা যেন তাঁর প্রবল আমি কেন্দ্রিক অবস্থানকে ভেঙে দিয়ে ভিন্নভিন্ন স্পেসে ছড়িয়ে দেওয়া। তাই এ-কবিতায়ও আছে মৃত্যুর পরেও রোমান্টিক কল্পনাশ্রয়ে সুস্থিতির আকাক্সক্ষার জন্য কবিচিত্তের যে ব্যাকুলতা তা প্রজাপতির দূরে উড়ে যাওয়ার মৃত্যুস্পন্দে বিলীয়মান –
– ‘কোথায় কোথায়’ আর্তনাদে সেটাই প্রতীত হয়।
রাহমানকে নম্র ধীর সুশান্ত বিনত ইত্যাদি বিশেষণে অভিষিক্ত করা যায় খুব সহজেই। এসবের তলে-তলে একধরনের অহং-তাড়না ও আস্পৃহাও যে কাজ করে যায়, তা অস্পষ্ট নয়। কবিতা থেকে কবিকে মুছে ফেলে পাঠের অনুজ্ঞা মান্য করলেও রাহমানের কবিতায় সাবজেকটিভিটির ছায়া থেকেই যায়। মৃত্যুশয্যায় যেসব পুষ্পস্তবক হাতে তরুণীদের আসা-যাওয়া চলে, তারাও অনুপুঙ্খরূপে উপস্থাপিত। তাদের কেউ কেউ হাহাকারমন্দ্রিত অন্তর নিয়ে চলে যায় – কবিকে না পাওয়ার দুঃখে। কিন্তু ভিন্নস্বরে যদি পাঠ করা যায় পঙ্ক্তিগুলোকে তবে বলতে হয়, কোনো কোনো সহৃদয়সংবেদী পাঠিকাদের ‘হে মেধা হে কাল/ পাইনি পাইনি’ – অন্তর-রণিত এই হতাশা আসলে ভিন্নার্থক। তারাও কি হতে চেয়েছিল মেধাবিনী – সেইসব জীবনানন্দীয় নারী সবিতা বা যাদের মেধার কাছে নতজানু সন্নত হতে চায় কবিমন? ‘পাইনি’ – উচ্চারণটি যেন কবিরও অভাবাত্মক দিকের প্রতি ইঙ্গিত করছে। বাংলা কবিতায় পদকবিরা রাধার উচ্চারণকে সংগীতাত্মক করে রুদ্ধ নারীভাষাকে বাক্সময় করতে পেরেছিলেন, এরপর ওই উচ্চারণটি হস্তগত করেন মহতী কবিরা স্ব-স্ব অনুভূতিতে রাঙিয়ে। রাহমানের কবিতায় নারী প্রতিবেশিনী, সহচরী, ভীরুপ্রেমিকা, শরীরসর্বস্ব ইত্যাকার ভূমিকায় কখনো কাম্যরূপিণী, কখনোবা অধস্তন অস্তিত্ব। তারা শুধু কবির কাক্সিক্ষতাই নয়, কবিও তাদের প্রার্থিত। কিন্তু কবি অধরা হলেও নারীর সত্তা নিজের কাছেই স্পষ্টতা পায় না। নারীকে এখানে আমরা ঊর্ধ্বতম সত্তা/ absolute-কে বাদ দিয়ে ভাবতে পারি তার অনিশ্চিত সত্তাকে – যাকে হাতের মুঠোয় ধরা যায় না। নারীর এই রূপকে নারীবাদীদের ভাষায় বলা হয়েছে feminine – নারীধর্ম।
পুর ও পরিজনেরা ধূপের গন্ধ বুকে ঢুকিয়ে নিয়ে যেন মৃত্যু উপলব্ধি করে। জাগতিক দৃশ্যপট সরে গিয়ে কবিতা ভর করে দর্শনসিক্ত কল্পোক্তিতে। মৃতের ঘরে একঝাঁক হাঁসের অবতরণ ঘটে, তাদের পাকসাট ‘শূন্যে ঝলসিত’। মুহূর্তেই রচিত হয় মায়াকানন, চৌদিক হয় প্রস্ফুটিত শোভাময়, মৃতদেহ স্নাত হতে থাকে সমুদ্রের কোমল নীলজলে। এ-জল বাস্তবের সামুদ্রিক লোনা জল নয় নিশ্চয়ই। অর্থাৎ রোমান্টিক সমুদ্র। মৃতের জগৎ বদলে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের হংসশ্রেণি [বলাকা, ১৯১৬] ও মায়াকাননে রূপান্তরিত হয়। সমুদ্রের নীলজলে স্নান (এখানে আর রূপালি øান নেই, মৃত্যুর সূত্রে তা নীল রং ধারণ করল), রিলকের গোলাপ, জীবনানন্দের খরগোশ-হরিণেরা, আর রাহমানীয় ঝিরিঝিরি ঝরনা সবকিছু নিয়ে কল্পলতার জাল বিছিয়ে দেয়। মৃত্যু হয়ে ওঠে শিল্পসুন্দর ও আত্মপরায়ণ কল্পনার নিরবচ্ছিন্নতা। এই মৃত্যু আর গড়মাপের ব্যক্তির মৃত্যু রইল না, তা হয়ে উঠল একজন কল্পনাকুশলী কবির মৃত্যু, অনাবশ্যক, স্মৃতিহীন, স্বপ্নরিক্ত নিঃসঙ্গ মৃত শরীর যা পড়ে থাকে, ‘অনেক চোখের নিচে’, কবির কল্পোক্তি তা যেমন বস্তুজগতের বর্ণচিহ্নরূপ পেল, তেমনি হংসপ্রতীকের অধিবিদ্যক অর্থের পোষকতা করল। হংস ভারতীয় মতে আত্মার প্রতীক, এই ‘আত্মা তার একটি অদৃশ্য/ মালা হয়ে দোলে ঘরে অগোচরে’। কিন্তু প্রচল অর্থে আত্মাটি দ্যোতিত হয় না, কবি একে বলেন ‘মনোভূমিপ্লাবী জ্যোস্না’। এও এক বিম্ব। এই অলৌকিক জ্যোৎস্নাবিম্বটি এখন পৃথিবী ছেড়ে যাবার নিয়তিকে মেনে নেয়। ‘বিদায়’ সম্বোধনে কবি প্রস্তুত হয়ে বলেন ‘যাই’ – যিনি আসলে ইতোমধ্যে সকল সক্রিয়তা আর সৃজনশক্তি, কল্পনাপ্রতিভার দায়ভার ছেড়ে নিথর হয়ে গেছেন। আসলে গেছেন কি? নাকি অন্য কোনো বিম্বে নিজেকে দেখার বাসনায় দিকবদল করলেন?
এরপর সুনসান নীরবতা তৈরি হলে মৃতের ঘরে ‘নীলিমার থেকে এল এক নারী কেমন আলাদা’। ওইসব অনুরাগসিক্ত প্রেমপ্রার্থী নারীদের মতো যে নয়। সে সংগীতের তেজে ঋজু, এবং সে নিঃসঙ্গ। কবির মালারূপী আত্মাটি এখন তার গলায় দোলে, আমরা এমনটি দেখেছি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আগে লেখা শেষ কবিতাটিতে [শেষ লেখা কাব্যের ১৫নং কবিতা]। সেখানেও এক নারীপ্রতিমা ‘তুমি’ হয়ে সৃষ্টির পথ আকীর্ণ করে রাখে – বিচিত্র ছলনাজালে। সে-নারী কবির সারাজীবনের কৌতুকময়ী ও রহস্যময়ী সৃজনীশক্তিই তো, যা তাঁর ঈশ্বরী – যার গর্ভে কবিতার জন্ম, যা তাঁর সৃষ্টিসত্তা। রাহমানের এই ‘তুমি’ অত বহুমাত্রিক নয়, তবু সে যে তাঁর মিউজ তা সংকেতিত হয় ওই সংগীতময় শব্দে ‘সংগীতের অস্তিত্বময় তেজে ঋজু’। কিন্তু তার আগমন প্রতীতি ও প্রজ্ঞানে কবিকে ঋদ্ধ করে না, মৃত্যুর শেষ অঙ্কে চোখ রেখে সে অচিরে বিদায় নেয়। এবারের কবি মিউজহীন হয়ে চিরকালের মৃতে পরিণত হন। রাবীন্দ্রিক প্রতীতি ও অনুষঙ্গকে খুব সরলতায় মুছে দেয় ও কবিতাটি জৈবিক মৃত্যুর দুয়ার পেরিয়ে পারলৌকিক পরিসরে যাবার অধিবিদ্যক চিন্তাকে পরিহার করে। মৃত্যুর এই মর্তজগতে জীবনের বেঁচেবর্তে থাকার অনিবার্য যবনিকাপাত মাত্র। এ সাধারণ বক্তব্য নিশ্চয়ই কবিতাটির আধেয় নয়। কারণ মিউজের আর্বিভাব ও তিরোভাব ঘটে কবির সৃজনীসত্তা মালাটি গলায় দুলিয়ে নিয়ে। জৈবিক শরীর আর সৃষ্টিসত্তার – দুটোরই অন্তর্হিত হওয়ার বার্তা কবিতায় ঘোষিত। এর প্রকাশকাল ১৩৮২ [১৯৭৫] সাল। যখন আমাদের রাষ্ট্রীয় সত্তার নানা অপঘাত হত্যা আর অশুভের পদপাতের মধ্য দিয়ে মনুষ্যসত্তার ক্রমাগত মৃত্যুর নাট্যপালার শুরু। রাজনৈতিক মৃত্যুমঞ্চ বদলে গিয়ে কবির মৃত্যুদৃশ্য রচনা করল – যা শেষ পর্যন্ত কোনো মহানতা, গভীরতা ইত্যাদি প্রপঞ্চে অর্থকেন্দ্র সৃষ্টি করে না। রচনাটি গভীর তলে প্রতিরূপকীও [allegorical] বটে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপরিসরে কবির সৃজনীশক্তির আদৌ কোনো সংযোগ ও প্রাণস্ফূর্তি ঘটে কি-না তা তো বহুকাল ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। অবশ্য তাঁদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি প্রযোজ্য যাঁরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাতত্ত্বের টাইপে নিজেকে বাঁধেন না। রাহমান তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সত্তা গঠনের সঙ্গে কাব্যিকসূত্রে অঙ্গাঙ্গী জড়িত, কিন্তু তাঁর অনেক কবিতাই শাসন, ক্ষমতা ও মানুষকে টাইপ গড়ার জালের ফাঁক-ফোকর এড়িয়ে মুক্ত থাকার অভীপ্সালালিত। এ-কবিতায় মৃত্যুর বিম্বে কবির ও তাঁর প্রতিবেশের যে আত্মবিম্বের ক্রীড়াশৈলী জমে ওঠে তা আত্মদর্শনের প্রথাকে ভাঙে, তাকে অধিবিদ্যক বলয়চ্যুত করে নামিয়ে আনে জীবনযাপনের ধমনিজালে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply