শিল্পী ও কর্মী মহাশ্বেতা দেবী দুই ভুবনের কারিগর

লেখক:

সুরঞ্জন মিদ্দে

একটি মুন্ডামেয়ে! মহাশ্বেতা দেবীর কাছে লাজুকভাবে প্রশ্ন করেছিল। স্কুলে তাদের মহাত্মা গান্ধীর কথা, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের কথা পড়তে হয়। আদিবাসীদের কি কোনো নায়ক নেই?

অখ- বিহার পরিভ্রমণে আর অনুসন্ধানে – এই  মুন্ডামেয়ের প্রশ্নটি তাঁকে সারাজীবন ভাবিয়েছে। শুরু করেছিলেন, আদিবাসীদের সংগ্রাম আর আন্দোলনের মর্মকথা নিয়ে গভীর চর্চা। লিখে ফেললেন আদিবাসী-প্রান্তজনদের নিয়ে অসংখ্য গল্প-উপন্যাস। তিনি আমাদের চিনিয়ে দিলেন, বুঝিয়ে দিলেন আদিবাসী অন্তেবাসী জগৎকে। আজ যাদের ডাকা হয় ‘চতুর্থ দুনিয়া’র অধিবাসী। হাজার বছর ধরে যারা অবহেলিত, অপমানিত, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত প্রান্তজন। শুধু তাদের হাহাকার নয়, উপজাতি সমাজসভ্যতার সংবেদনশীল এবং সৃজনশীল স্তরকে সামনে আনলেন। যেখানে বরপণ দেওয়ার অথবা নেওয়ার প্রথা নেই। বিধবাবিবাহ প্রচলিত আছে। সতীদাহ প্রথা রদ করার জন্য কোনো রামমোহনের প্রয়োজন পড়েনি। বাক্যহারা, নিপীড়িত মানুষের পাশে থেকে তিনি লড়াই করে গেছেন – আজীবন।

তিনি শুধু প্রান্তজনদের কথা লিখে থেমে যাননি। তাদের মুখের ভাষা জুগিয়েছেন। তাদের বুকে জ্বালিয়েছেন প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের আগুন। সমস্ত পৃথিবীর প্রান্তজনদের জন্য যে মা কাঁদেন – তাঁর নাম মহাশ্বেতা দেবী। তিনি শুধু বাংলা সাহিত্য, বাঙালির মা নন, ভারতীয় সাহিত্যের মা। তিনি ভারতবর্ষের মাতা। তিনি আত্মপীড়িত ভারতবর্ষের অনাথ জননী, যেখানে হিরোশিমা, প্যালেস্টাইনের ইহুদি আর নন্দীগ্রামের জমিহারা একই বিন্দুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তিনি ছুটে গেছেন কলকাতা থেকে দিল্লি, মুম্বাই, বরোদা, ছত্তিশগড়, পালামৌ, হাজারিবাগ। সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর সাহিত্যপ্রেরণা। শুধু সাহিত্য নয়, সংগ্রাম। স্বপ্নভঙ্গের মর্মযন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই। এ-লড়াই শেষ হওয়ার নয়। একটা সংগ্রাম শেষ হয়, শুরু হয় আরো একটা সংগ্রাম। অরণ্যের অধিকারে এ-বিপস্নবের শেষ নেই। এ-বিপস্নব শেষ হওয়ার নয়। উলগুলানের শেষ নেই – চিরন্তন।

বনদেবী : মহুলবনের মা

অরণ্য মানে রোমান্টিকতা নয়, গরম ভাতের স্বপ্ন। অরণ্য মানে ভ্রমণ নয়, নুন আর শাকের আন্দোলন। নববই বছরে থেমে গেলেও তাঁর অসংখ্য প্রতিবাদী সাহিত্য রয়ে গেল। থেকে গেল আদিম কালো মানুষের দারিদ্র্য আর সংগ্রামের আগুনঝরা কথাকাহিনি। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঝাঁসীর রাণীতেই ছিল বিদ্রোহিণীর আত্মহুংকার। সেই বিদ্রোহ একে-একে দ্রৌপদী, দৌলতী, মেরি ওরাঁও, যশোদা, সরস্বতী, সীতাতে প্রকাশিত হয়েছে। প্রস্ফুটিত হয়েছে বহুরূপী অত্যাচারিত নারী, যা মহাকাব্যের রামায়ণের সীতা আর মহাভারতের দ্রৌপদীদের জনজাতি আদিবাসী নারীদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। অরণ্য-প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে আদিবাসী জনজাতির জীবনযাপনের একাত্মতা। উপজাতি মানুষেরা শুধু অরণ্য-প্রকৃতির সম্পদ নয়, তারা অরণ্য-প্রকৃতির রক্ষাকর্তা। ত্রাণকর্তা বনদেবীর মতো বনকে মনের সঙ্গে অটুট বন্ধনে বাঁচিয়ে রাখে।

অরণ্যের অধিকার থেকে হুলমাহার মা উপন্যাসে মুন্ডা-সাঁওতালি নারীরা বারুদের মতো বিস্ফোরিত হয়েছে। ‘সালী’র মতো মুন্ডা নারীরা তো কালো আগুন। আর হুলমাহার মা ‘মহনি’র ডাকে ‘শত সন্তাল’ আসে। তারপর যুদ্ধ হয়। সম্মুখযুদ্ধ। অসম সেই যুদ্ধে বন্দুক-কামানের সঙ্গে তীরের লড়াই। সেই ভয়ংকর জলজঙ্গলের অধিকারের লড়াইয়ে ঝাঁসির রানির মতো মুন্ডাসাঁওতালি মেয়েরা সামনে থাকে। পিঠে শিশুসন্তানকে বেঁধে বলোয়া হাতে নিয়ে ইংরেজ সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে হাজির হয়। ইতিহাস আর কল্পনার বাস্তবতায় আদিবাসী নারীদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ভারতীয় সাহিত্যে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ইংরেজ সেনারা যখন বন্দুক ফায়ার করে শুট করে, তখন পুরুষ কিংবা নারী দেখে না। ইংরেজ পুলিশ গুলি চালায়। শুধু ওই মুন্ডানারী নয়, পিঠে বাঁধা  শিশুও সেই বুলেটে বিদ্ধ হয়। অরণ্যের অধিকারে এই নির্মম বর্ণনা তাঁকে একজন নিপুণ শিল্পীতে পরিণত করেছে। শুধু মুন্ডাদের জীবন নয়, তাঁর কথাশিল্পে চিত্রিত হয়েছে সাঁওতাল, শবর, লোধা, ওরাঁও, খেড়িয়া, কুর্মি, দুসাদ, ভাঙ্গিদের অসহায় জীবননাট্য। শুধু জনজাতি নয়, দলিত মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের কথাও। বাঙালি তথা ভারতীয় মধ্যবিত্ত জীবনচর্যায় মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) এক চিরন্তন ‘রেবেল’। তিনি আজীবন রাজশক্তির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই করেছেন। তাঁর সৃষ্টিসম্ভার আর সংগ্রাম একই বিন্দুতে মিলে গেছে। তাই তাঁর জীবৎকালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি। পারিবারিক উত্তরাধিকার বামপন্থা ছিল তাঁর রক্তের ভেতরে; কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে কৃষকের জমির দাবিতে তিনি বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। দৈনিক স্টেটসম্যানে তিনি আগুন ঝরিয়েছেন তাঁর বলিষ্ঠ লেখনী দিয়ে।

তাঁর ‘স্তনদায়িনী’ গল্পের যশোদা রুগ্ণ স্বামী আর সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে বারবার গর্ভধারণ করেছে। ‘রুদালি’ গল্পের শনিচরীর শুকনো অশ্রম্নহীন চোখে জল আসে মেয়ের মৃত্যুর খবরে। জংলি মেয়ে দ্রৌপদী মেঝেন বারবার ধর্ষিত হতে-হতে, অত্যাচারীর সামনে ক্ষত-বিক্ষত নগ্ন ধর্ষিত শরীরটা নিয়ে যখন দাঁড়ায়, তখন ভারতবর্ষের মণিপুর কিংবা কাশ্মিরের সমাজচিত্র এক অদৃশ্য সুতোয় মিলে যায়। এসব বনচারী নারীর জন্য শুধু লেখেন না, তাদের জন্য শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে, তাদের উন্নয়নে উদ্ধারের ব্রতে শামিল হন। হয়ে ওঠেন তাদের কাছে দিদি। কিংবা জননী – বনদেবীও। পুরুলিয়ার শবরদের কাছে তিনি শবরজননী আর মেদিনীপুরের লোধাদের কাছে লোধামাতা। পুরুলিয়া রাজনওয়াগড়ে একটি গোপীধ্বজ গাছটির নিচে বসে ‘শবরমেলার’ আয়োজন দেখাশোনা করতেন। আর কাছে ডেকে নিতেন শবর রমণীদের। তাদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতেন। শুনে নিতেন তাদের মান-অভিমানের ঘরকন্নার কথাকাহিনি। মহাশ্বেতা দেবীর কলমে এই নারীকণ্ঠ গর্জে ওঠে। তিনি কাছ থেকে দেখেছেন এই ধর্ষিত নারীদের। নিজের নারীসত্তা দিয়ে গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি। ডাইনি অপবাদে মরেও তারা। তবু তার মধ্যে কেউ-কেউ উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সেনানায়কের সামনে দাঁড়িয়ে ধর্ষিত নারী বজ্রকণ্ঠে এনকাউন্টারের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। হয়ে ওঠে আধুনিক নারী।

মুন্ডানারী : সাঁওতাল নারী

মুন্ডাসমাজ পুরুষশাসিত নয়। ওরা স্ত্রী-পুরুষ সমান খাটে। সমান আয় করে, সমান সম্মান পায়। মায়ের সম্মান মুন্ডাসমাজে খুব উঁচুতে। বীরসা ভগবান হলে মা করসী তো চিরকাল সেই সম্মান পেয়েছে। আবার মুন্ডারাজে লবণ পেলেও সমান ভাগ, আবার মাংস পেলেও সমান ভাগ। মুন্ডামেয়েগুলো কালো আগুন দেখলেও শরীরে রক্ত জ্বলে ওঠে।  মুন্ডানারীরা বেয়াড়া, বদজাত, হাত ধরলে ‘বলোয়া’ দিয়ে কাঁধ থেকে মাথা নামিয়ে দেবে। হাতিয়ার মুন্ডারীদের প্রধান সঙ্গী। মুন্ডা মেয়েরাও বলোয়া চালাতে নিপুণ। পিঠে ছেলেমেয়ে বেঁধে বন্দুকের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায় না। গৌরী মুন্ডানীর পিঠে সন্তান; হাতে পাথর। মহাবিদ্রোহের ডাকে মুন্ডানারীরা সমানভাবে অংশ নিয়ে মুন্ডা উলগুলানকে গতি দান করেছিল।

সোমা মুন্ডার চিৎকার; ‘মেয়ে ছেলা! পিঠে ছেলা বান্ধা আছে!’ কিন্তু রাইফেল বলল ‘শুট’!

মুন্ডারী মা, মুন্ডারী ছেলেকে দিকুদের কাছ থেকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সবসময় পারত না। তারপর একদিন মুন্ডারী মা ‘পাথর মা’ হয়ে যেত। মুন্ডারী মায়েরা ছেঁড়াকানির মতো সংসারটাকে দিনের আলো নিভে গেলে মহুয়ার তেলে, বাতি জ্বেলে দিত। ‘ভগবান বীরসার মাও হয়তো একদিন তাঁর ছেলের মতো সত্যিসত্যিই পাথরমায়ে পরিণত হবে।’

মুন্ডামেয়েরা কাপড় পরে উঁচা করে; চলে বেটাছেলের মতো। মেয়েছেলে যখন মেয়েমরদ হয় তখন কি মুন্ডারী সমাজের মরণ হয় না, জীবন বাড়ে। সালীর মতো উলগুলানের নারী পেট কাপড়ের মধ্যে বিষাক্ত তীরের বোঝা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ছদ্ম অভিনয় করে দারোগাকেও ভয় দেখায়। সফল হয় একশ শতাংশ – এই হচ্ছে মুন্ডানারীর দুঃসাহস। উলগুলানের প্রতি অসীম ভালোবাসা। স্বামীসহ পুত্রকে উলগুলানে যেতে উজ্জীবিত করেছে মুন্ডানারী। জেলের বাইরে থেকে উলগুলানকে সঞ্জীবিত রেখেছে দুর্গম অরণ্যের ভেতরে অসীম সাহসে। তারা জানে তাদের ইজ্জত বাঁচাতে। –

‘সালীর পেটকাপড় খুলে এক বোঝা বিষাক্ত তীরের ফলা যেন ইস্পাতের সূচিমুখ, মুন্ডারী যুবতীর মতো কালো। মুন্ডারী যুবতীদের মতোই লোভনীয়, মোহনীয়, উদ্ধত।’

মুন্ডানারীর এই বর্ণনা এক অসামান্য উপমায় সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী চিত্রিত করেছেন। অভাবে, ক্ষুধার্ত পেটে বহু মুন্ডা-মুন্ডানী মিশনে যায় – কিন্তু উলগুলানে অংশগ্রহণকারী বীরসাহিত  মুন্ডানারী সালী ক্রিশ্চান হতে যায়নি। সালী এখানে সুন্দরী, ডোনকার তৃতীয় বউ, আরান্দিতে সে সুখী না হয়েও মুন্ডা উলগুলানে তার অসামান্য অবদান, তার তুলনা নেই। শুধু সালী নয়, বহু মুন্ডানী সেই মহাবিদ্রোহে সবকিছু আত্মত্যাগ করে এক চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মুন্ডানারী শুধু নৃত্যে পটীয়সী নয়, সেই যুদ্ধে সে বীরাঙ্গনাও বটে। শিবন মেথরের কাছে দাঁড়িয়ে হাসল সালী, ‘গভীর, মধুর, আশ্চর্য’ সে হাসি। যাওয়ার সময় বলে গেল – ‘উলগুলানের শেষ নাই। ভগবানের মরণ নাই।’

মুন্ডারী নারীরা একই সঙ্গে মমতাময়ী মা এবং বিদ্রোহী বীরাঙ্গনাও। যে-কোনো বিপস্নবকে সার্থক করার জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীদের প্রয়োজন আর সেজন্যই সম্পূর্ণ বৃত্তটি পরিপূর্ণ হয়েছে – মুন্ডানীদের আত্মত্যাগ আর দুঃসাহসে।

প্রকৃতপক্ষে একজন সংগ্রামী যুবকের মাত্র পঁচিশ বছরের কাহিনি গ্রন্থনা করতে গিয়ে লেখিকা সমগ্র  উপজাতির পত্তন, প্রসার, সংকট, পতন ও প্রতিবাদের পাশাপাশি চিরন্তন বিপস্নবের এক অনন্য কাহিনি প্রকাশ করেছেন। সেই জীবন্ত চিত্র মুন্ডাজীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। অরণ্যের অধিকার উপন্যাসটির আরম্ভ ও শেষের ঘটনা একই। তাই প্রশ্ন জাগে – শেষ থেকে শুরু, না শুরু থেকে শেষ? মৃত্যু থেকে জন্মের এই কাহিনি কোনো উলটো যাত্রা নয় – বরং বিদ্রোহীর মৃত্যুতে বিদ্রোহের নতুনতর অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত দান করে। অন্তহীন সেই লড়াই। মরণের পরেও বিপস্নবের পথযাত্রী যোদ্ধাদের মনোবল, এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে ওঠে।

অরণ্যের অধিকার উপন্যাস প্রসঙ্গে আরণ্যক উপন্যাসটির কথা আসবে। আরণ্যকে কাহিনির গতির প্রচন্ডতা নেই। আরণ্যকে শুধু বিশেষ কোনো জনজাতি নয়, নানা জাতের মানুষের ভিড় আছে। মহাশ্বেতা তাঁর ক্যানভাসটি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধেছেন – একটি বিশেষ জীবনদর্শনে। অরণ্যের অধিকারে তাই শুধু আদিবাসী জনজাতি মুন্ডারীদের তথা ভগবান বীরসাই তাঁর কলমে ঝলসে উঠেছে। অরণ্যের অধিকারে বীরসার মৃত্যুতেই কাহিনির সূচনা – ফ্ল্যাশব্যাকে কাহিনির বিবৃতি, উপসংহার অংশে আইনি লড়াইয়ের বিশদ বর্ণনা হলেও সাধারণভাবে তথ্যগত ভ্রান্তি নেই। এমনকি সময়ের হিসাবেও কোনো গরমিল নেই। উপন্যাসের মুন্ডাসমাজ আবার একটি ধনতন্ত্রী আধাসামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসনের অধীন। তাই সেই মুন্ডাসমাজ থেকে বিদ্রোহী হতে গেলে ব্যক্তি নেতার মধ্যে ঐশীত্ব এবং ‘সম্ভোবামি যুগে যুগে’ Reincarnation-এর ধারণা আরোপিত করতে হয়। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয় একক নয়, যৌথ। ব্যক্তির মহিমায় নামকরণ নয়। উপন্যাসের নাম বীরসা  নয়, অরণ্যের অধিকার। যা মৃত্যুর পর শেষ হয় না। চলমান থাকে। চিরন্তন – আগামী প্রজন্মের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেরণা থাকে। শেষ পর্যন্ত তাই এক সামগ্রিক মুন্ডাজীবনের জীবন্ত দলিল হয়ে ওঠে। দেশকালমাটি ছাড়িয়ে চিরন্তন অধিকারের জন্য অপরাজেয় সংগ্রামের কথাই প্রধান হয়ে ওঠে। তাই ঔপন্যাসিক বলছেন, বীরসা জানত না, ও হেঁটেছিল একজন্ম, এক জীবন থেকে আরেক জীবনের দিকে। এখানে বীরসা কে? বীরসা তো দেশে-দেশে, যুগে-যুগে ফিরে আসা চিরবিদ্রোহী। ‘সময়ের আগে’ এবং ‘সময়’ দুই-ই বীরসাকে সৃষ্টি করেছে। সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসও তাই বলে। বস্ত্তবাদী ঐতিহাসিকের কাছে এক নতুন দৃষ্টিকোণের মাত্রা দিয়েছে। –

কিছুই ফুরায় না পৃথিবীতে মুন্ডারী দেশ-মাটি-পাথর-বন-নদী-ঋতুর পর ঋতুর আগমন – সংগ্রামও ফুরায় না, শেষ হতে পারে না। পরাজয়ে সংগ্রাম শেষ হয় না।

অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের ফ্রেম তাই মহাকাব্যিক। মুন্ডাজীবনের এক সামগ্রিক ছবি ঘরে বসে পেয়ে যাই। শাশ্বত জীবনবোধে অরণ্যের অধিকার মুন্ডাজীবনের মহাকাব্যের রসভাষ্য হয়ে উঠেছে।

জনজাতির জীবনশিল্পী : নিম্নবর্গ নির্মাণ

হাজার চুরাশির মা (১৯৭৫) ছাড়া আরো বেশ কয়েকটি উলেস্নখযোগ্য উপন্যাস তাঁকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছে। যা শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, ভারতীয় সাহিত্য হিসেবে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সেইসব জনজাতি প্রান্তিক মানুষেরা শুধু বঙ্গদেশের বাসিন্দা নন, তারা সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রত্যন্ত প্রদেশের আদিবাসী। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু (১৯৬৭), অরণ্যের অধিকার (১৯৭৭), মাস্টার সাব (১৯৭৯), চোট্টি মু-া এবং তার তীর (১৯৮০), শালগিরার ডাকে (১৯৮২), হুলমাহার মা (১৯৮২) প্রভৃতি উপন্যাস বাংলা তথা ভারতীয় সাহিত্যের এক মাইলস্টোন। হাজার চুরাশির মা আর হুলমাহার মা দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও কোথায় যেন একবিন্দুতে মিলে যায়। তবে হুলমাহার মা শুধু অনুভব করে না, সংগ্রামে শামিল হয়ে সাঁওতাল বীরাঙ্গনা রমণীর এক নয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে। –

– তার ছেলে সন্তাল কামিয়ারা,… তার পায়ে থাকে সরু শিকল।… ছেলে মায়ের কাছে পালিয়ে গিয়েছিল, সে হতে শিকল।… শিকল নিয়ে মহনি লালডির দিকে যায়। লালডিতে যাবে মহনি, শিকল ছেঁড়া লোহা কামারদের দিবে। কামাররা বান্ধাবেগারদের জন্য হাতিয়ার বানায়, নয়? তারপর?… হুলমাহা যা বলে সে তা করবে। হুলমাহার কাজ।

হুলমাহার মা মহনি ছেলের ছেঁড়া শেকল নিয়ে কামারদের কাছে যাবে। সেই হাতিয়ার বানিয়ে হুলমাহার জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে। এ তো ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার উপন্যাসকে অতিক্রম করে নয়া সৃষ্টির নজির গড়লেন হুলমাহার মা মহাশ্বেতা দেবী।

কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসে লোককথার সঙ্গে মিথপুরাকথার মিশ্রণ ঘটেছে। মধ্যযুগের এই আরণ্যক চুয়াড় যুবকের কাহিনি এ-উপন্যাস। চুয়াড়দের বিদ্রোহ ইতিহাসের পাতায় থাকলেও তাকে ব্যবহার করেছেন উপন্যাসের পটভূমিতে। মেদিনীপুরের ভীমদল রাজ্য ও পার্শ্ববর্তী নিদয়ার অরণ্য এই কাহিনির স্থানিক পটভূমি। চুয়াড় অমত্ম্যজ শ্রেণির মানুষ হয়েও কবি বন্দ্যঘটী গাঞি প্রতিভার গুণে কবি হতে পেরেছিল। শেষ পর্যন্ত কবি বন্দ্যঘটী গাঞির বর্ণশ্রেষ্ঠ হওয়ার আকাঙক্ষা অপূর্ণ থেকে গেলেও তাঁর লড়াই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যায়। অত্যাচারে বঞ্চিত বীর চুয়াড় যুবকের স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভাঙার ইতিহাস যেন এক ট্র্যাজিক পরাজয়। কবি বন্দ্যঘটী চুয়াড় সমাজের হয়েও তাঁর কাব্যে চুয়াড়দের কথা লেখেননি। তবু তাঁকে বন্দি হতে হয়েছে। পরিণত হয়েছে এক ট্র্যাজিক নায়কে। কবির গতি আটকে দিয়েছিল বর্ণবৈষম্যের বেড়াজাল। এভাবে নিম্নবর্ণের নির্মাণশৈলী ইতিহাসের হাহাকারে পরিণত হয়।

চোট্টি মু-া এবং তার তীর উপন্যাসটিকে নিম্নবর্গের নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহের স্বর হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। চোট্টি মুন্ডা কোনো বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন না কিন্তু চোট্টির তীর ঠিক লক্ষ্যই ভেদ করে। সেই তীরের মধ্যে চোট্টির কথা, মহাকথার যোগ থাকে। এমনকি মহাকাব্যের রাম বা অর্জুনের বাণের সঙ্গে চোট্টির তীরের মিল সৃষ্টি করেন। এভাবে নিম্নবর্ণের চোট্টি মুন্ডা মহাকাব্যের নায়কের মতো হয়ে ওঠেন। চোট্টি মুন্ডার মধ্য দিয়ে নিম্নবর্গের রাজনীতির নানা বিভঙ্গের স্তর চিত্রিত হয়েছে। স্বাধীন ভারত সরকার ও বুর্জোয়া শ্রেণির আধিপত্যে নিম্নবর্গের মানুষের নিষ্পেষণ দেখানো হয়েছে। সব ধরনের বিপন্নতার মধ্যে চোট্টি সমস্ত মুন্ডা সমাজের চালকশক্তি হয়ে কৌশলে বাঁচতে শিখেছে ও শিখিয়েছে। উচ্চবর্গের রাজনীতির শোষককে শনাক্ত করেছে চোট্টি মুন্ডা। মুন্ডা জনজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে চোট্টি। তাই চোট্টি প্রচ- প্রতাপের বিরুদ্ধে কখনো আপসে, কখনো বুদ্ধিবলে, কখনো সশস্ত্র সংগ্রামে নিম্নবর্গের প্রতিনিধিত্ব করেছে। চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর উপন্যাসে বীরসা মুন্ডার অসমাপ্ত আন্দোলনের সূচনা ও তার পরের ইতিহাস ব্যক্ত হয়েছে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত স্বাধীনতাউত্তর কালের মহাজন-সরকার-প্রশাসনের বিভিন্ন শোষণ চিত্র বিধৃত হয়েছে। গায়ত্রী স্পিভাক এ-উপন্যাসের মধ্যে আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ানদের নিজভূমিতে পরবাসী হওয়ার মিল খুঁজে পেয়েছেন।

শালগিরার ডাকে উপন্যাসে তিলকা মাঝির জন্ম ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে আসে বিহার-উড়িষ্যার ভার – শুরু হয় রাজস্ব আদায়ের শোষণ। আদিবাসী অঞ্চলে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন তিলকা মুরমু। কোম্পানির সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে তিলকা আহত হন। শেষ পর্যন্ত বন্দিও হন। ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ফাঁসি হয়।

– ঘোড়ার পায়ে বাঁধা তিলকা। ঘোড়া ছুটছে, তিলকার শরীর ছেঁচড়ে যাচ্ছে।… চেতনা আসছে যাচ্ছে। ঘোড়া থামল।…

আরে কথা বলছে।

কী বলছে? কী বলল?

কিন্তু হুলটা হবে।…

ভাগলপুরে বটগাছে বাবা তিলকা মাঝির রক্তাক্ত শরীর ফাঁসিতে ঝোলার জন্য জল্লাদ মেলে না কিছুতে। শেষে এক ইংরেজ সৈন্য উঠে এলো।

নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখিয়ে যান। তিলকা মাঝিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য কোনো সাঁওতালকে পাওয়া গেল না।

তিলকা মাঝি, সিধুকানু মুরমু ও বীরসা মুন্ডার তিন বিদ্রোহের কাহিনির মধ্যে এক ধারাবাহিক জনজাতির বিদ্রোহের ইতিহাসকে চিহ্নিত করেছে। মহাশ্বেতা দেবী নিম্নবর্গের মানুষের বিকল্প ইতিহাস খুঁজেছিলেন উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে তাঁর সমসময়ের অগ্নিময় সময় যেন মিলে গিয়েছিল অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতে। জনজাতি মানুষের দুঃসাহসের সংগ্রামের ইতিহাসের বিপরীতে ইংরেজ শাসকের লিখিত ইতিহাসের ফারাক আছে বিস্তর। বিদ্রোহীর সাহসী মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফাঁসুড়ে শাসকের ইতিহাস সাজিয়ে দিয়েছেন এক অমোঘ বিনির্মাণের ইতিবৃত্তে। ইতিহাসের নিম্নবর্গের স্বর শোনা যায় উপন্যাসের শিল্পসম্মত পাঠে। ভারতবর্ষের নিম্নবর্গের ইতিহাস আরো একবার সময়ের কষ্টিপাথরে যাচাই হয়। তাদের উপকথা, প্রচলিত গান আর কিংবদন্তির মধ্যে সেই ইতিহাসের অনুসন্ধানে মহাশ্বেতা শিল্পসম্মত সমাজ-বৈজ্ঞানিকের মতো, আমাদের চোখের জল ঝরিয়ে দেন।

‘অপারেশন? বসাই টুডু’ সত্তরের দশকের কাহিনি। এখানে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক কণ্ঠ সত্তরের দশকের রক্তাক্ত বধ্যভূমির স্পন্দন প্রকাশিত হয়েছে। বসাই টুডু বামপন্থী কৃষক-আন্দোলন করেছেন কালী সাঁতরার সঙ্গে; পরে তাদের মত ও পথের পরিবর্তন হয়। বসাই টুডু অ্যাকশন-অপারেশনে চলে যান। কিন্তু বসাই টুডুর বাবুদের অস্ত্রে বিশ্বাস ছিল না। বন্দুক, পাইপগানে তাঁর আস্থা গড়ে ওঠেনি। তাঁর শক্তি ও বিশ্বাস ছিল তীরে। ইতিহাসের দ্বিধারার উৎস এখানে বিধৃত হয়েছে। বসাই টুডু নকশাল আন্দোলনের অ্যাকশনের নেতা হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর জীবন ও বারবার মৃত্যু প্রচলিত রাজনৈতিক ইতিহাসের কাঠামোয় ধরা যায় না। বসাই টুডুর বাঁচামরার থই পায় না পুলিশসহ দুটি বাম রাজনৈতিক দলও। বসাই টুডুর সঙ্গে কালী সাঁতরার দলের বিভেদ ঘটে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু বসাই টুডুকে চিহ্নিত করতে বারবার ডাক পড়ে কালী সাঁতরাকে। বামপন্থী দল বিভক্ত হলেও বসাই ও সাঁতরার বর্গের তেমন পরিবর্তন হয় না। চিহ্নিতকরণের মধ্যে ফুটে ওঠে অন্য স্বর, নিম্নবর্গের আর্তনাদ। বসাই টুডু চারবার মরেও মরে না। মিথে পরিণত হয় বসাই টুডু। তখন আর ১৯৭০-৭৬-এর ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বসাই টুডু দেশকালের বাঁধনে বাঁধা থাকে না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে যায় বসাই টুডুর আন্দোলন। চিহ্নিত হয় এক নতুন স্বর যা নিম্নবর্গের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে নবমাত্রা এনে দেয়।

ব্যাধখ- (১৯৯৪) উপন্যাসে ব্যাধ ও শবর জীবনের কাহিনি চিত্রিত। অরণ্যনির্ভর আদিবাসী শবররা কীভাবে সামন্ততান্ত্রিক শোষণের শিকার হয়েছিল, তারই জীবন্ত দলিল ব্যাধখ-। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দ চক্রবর্তী অভয়ামঙ্গলের ব্যাধখ–র কাহিনিতে শবরজাতিকে মিশিয়ে এক নিম্নবর্গের নয়া ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার লোধাশবরদের ‘অপরাধপ্রবণ’ জাতি হিসেবে ঘোষণা করে। মূল সমাজ থেকে অপমানিত, বিতাড়িত শবরদের মূলস্রোতে আনার ব্রতে শবরচর্চা ব্যাধখ– এক নবযাত্রা পেয়েছে। মুকুন্দ চক্রবর্তীর ব্যাধ কালকেতুকে সমাজের সম্মানীয় স্তরে প্রতিষ্ঠার জন্য শবর জাতির এক সুচারু চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন – ব্যাধখ–। মহাশ্বেতা একটি সম্পূর্ণ কৌমজীবনকে উপস্থাপিত করেছেন ব্যাধখ–। এই কৌমজীবন হলো নিম্নবর্গের ভারতবর্ষ। চ-ীমঙ্গল হয়েছে নতুন মঙ্গল।

অরণ্যের অধিকার : জীবনের মহাকাব্য

মহাশ্বেতা দেবীর অরণ্যের অধিকার (১৯৭৭) উপন্যাসটি কোনো ব্যক্তির প্রায় অলৌকিক বৃত্তান্ত নয়। বীরসা দাউদ মুন্ডা এখানে কোনো অতিলৌকিক নায়ক নন। দেশে-দেশান্তরে কাল-কালান্তরে অপরাজেয় মানুষের সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। বীরসার সহযোগী মুন্ডারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আমরণ সংগ্রাম করেছে। সেই জীবন, গণসংগ্রাম দেখাতে গিয়ে এসেছে মুন্ডাজীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র। এসেছে মুন্ডাসমাজের সামাজিকসহ সামগ্রিক জীবনালেখ্য। এসেছে লোকসংস্কৃতির নানা অজানা কথা।

‘মুন্ডা’ জনগোষ্ঠী অনার্য – কৃষ্ণ ভারতের আদিম অধিবাসী। নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে অরণ্যের অধিকারের মুন্ডাসমাজ অস্ট্রিক গোষ্ঠীর আদিবাসী। দিকুআড়কাঠিদের লোভ, সামন্ত প্রভুদের শোষণ, ব্রিটিশ রাজের অত্যাচার, মহাজনের ঋণের চক্রবৃদ্ধি সুদ আর আড়কাঠির ফাঁকে অরণ্যের সন্তান মুন্ডারা নিঃস্ব হয়ে গেছে। অসহায় দিশাহীন মুন্ডারা খ্রিষ্টান মিশনে ধর্মান্তরিত হয়েছে, না হয় আজীবন দাসমজুরে পরিণত হয়েছে। তবু মুন্ডাসমাজের বৈশিষ্ট্যগুলি আমাদের চমকে দেয়। অসামান্য মনোবলের দৃঢ়তা আর শ্রমের সততা শিক্ষিত সভ্যতাকে ভাবায়।

মুন্ডা জনগোষ্ঠীর ধাত আর জাত আলাদা – যেন মুখ পাথরপারা থাকে। ফাঁসিতে চড়েও ভয়হীন, অশ্রম্নহীন এক অনন্য জাতি। একথালা ঘাটোতে তাদের দিন চলে। ওদের সামনে দিকুরা ভাত খেলেও একটা ছোট ছেলেও ভিখ মাঙবে না – একমুঠো ভাতের জন্যে – আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুন্ডাজাতির আভিজাত্য সহজসরল অরণ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর  মুন্ডামেয়েরা – পিঠে ছেলেকে বেঁধে, বলোয়া চালাতে পারে।

আগুনই মুন্ডার শীতবস্ত্র। মুন্ডা অন্য শীতবস্ত্র জানে না, পায়ও না। তাদের বিবাহউৎসবে সাতটি জিনিস প্রয়োজন – ১. জল ২. আগুন ৩. ধান ৪. দুধ ৫. তরোয়াল ৬. তীর ও ৭. ধনুক। মুন্ডাপুরুষ ও মেয়েরা লম্বা চুল রাখে। এদের রং অত্যন্ত কালো; মেয়েপুরুষ পার্থক্য করা যায় না। মুন্ডাসমাজ পুরুষশাসিত নয়। ওরা স্ত্রীপুরুষ সমান খাটে। সমান আয় করে; সমান সম্মান পায়। মায়ের সম্মান মুন্ডাসমাজে সবার ওপরে। বীরসার মা করমি, চিরকাল সেই সম্মান পেয়েছে।

মুন্ডা জনগোষ্ঠী শান্ত, নম্র, নিরীহ – দিনান্তে এক খুঁচি চিনাঘাসের দানার ঘাটোয় সে খুশি। পরনে সামান্য লেংটি, আগুন তাদের শীতবস্ত্র। হাতিয়ার তিরধনুক। কাঁধে তাদের ঋণের চক্রবৃদ্ধি সুদের ভার কিন্তু ব্রিটিশ সিংহের উদ্যত ভয়ানক থাবার সামনে অকুতোভয় – মরণের মুখোমুখি নির্ভীক।

মুন্ডারা জীবন্ত বারুদ। পাথর, পাহাড় আর জঙ্গলের আফলা মাটিতে ফসল ফলায় মুন্ডারা অক্লান্ত পরিশ্রমে। জঙ্গলে দাবানল, নদীতে হড়পাবান, বুনো হাতির পাল এলে মুন্ডারা নাগরায় ঘা দেয় দিম্দিম্দিম্। মুন্ডামেয়েরা কালো আগুন। দেখলেও শরীরে রক্ত জ্বলে ওঠে। বেয়াড়া, বদ্জাতও; হাত ধরলে বলোয়া দিয়ে কাঁধ থেকে মাথা নামিয়ে দিতে পারে। মুন্ডাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তিরধনুকবর্শাবল্লমের চেয়ে বড় অস্ত্র হলো মুন্ডারী ঐক্য। মুন্ডা যখন একত্রিত হয় – ছেলেমেয়ে, পুত্রপুত্রবধূ, কিশোরশিশুবৃদ্ধবৃদ্ধা সবাই একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মুন্ডা জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে – মুন্ডাদের ভগবান জন্ম নেবে মুন্ডাঘরে। সি যিশু নয়, কিষ্ণ নয়, সি মুন্ডা। হাটে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, শহরে – দুজন অচেনা মুন্ডা একসঙ্গে হলে – একজন বলে ‘উল’! অন্যজন বলে, ‘গুলান’!

শুধু কথাকার নন, কর্মসাধক

শুধু লেখেন না। যা লেখেন, তাই করেও দেখান। তাই তাঁর সাহিত্য আর কর্মজীবন একাত্ম সাধনার এক অনন্য প্রয়াস। সর্বস্বহারাদের জন্য লেখেন না, তাদের জন্য সর্বস্ব ত্যাগও করেন। সৃষ্টির প্রাপ্তি অর্থ নিয়ে কলকাতা শহরে বসে থাকেন না। চলে যান প্রান্তিক পুরুলিয়ায়। তিনি শুধু ভয়েসলেস সেকশনের রাইটার নন, নিরক্ষর বাক্যহারা মানুষের মনের সম্রাজ্ঞী। যেখানে অত্যাচার, নিপীড়ন সেখানেই সবার আগে ছুটে গেছেন জননী মহাশ্বেতা দেবী। কারোর কাছে তিনি দিদি কিংবা বহিন, আবার কারো কাছে মমতাময়ী মা। সর্বার্থেই তিনি একজন যোদ্ধাকর্মবীর। তিনি কর্মসাধক। ব্যক্তিগতকে গুরুত্ব না দিয়ে সমাজের অবহেলিতদের সংগঠিত করার দুর্বার ব্রতকে আজীবন পালন করেছেন। আদিবাসীজনজাতি সমাজ ও সংস্কৃতির ভ্রান্ত ভাবনাকে দূর করার জন্য আপসহীন লড়াই করেছেন।

পুরুলিয়া স্টেশনে নেমেই হাসিমুখে জড়িয়ে ধরতেন প্রান্তিক মানুষদের। বুকে টেনে নিতেন অস্পৃশ্যব্রাত্য মানুষদের। ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের ১০ লাখ টাকা শবর-উন্নয়নে দিয়ে দিয়েছিলেন। পুরুলিয়ায় আয়োজন করেছিলেন ‘শবরমেলা’। গঠন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়াশবর কল্যাণ সমিতি। কার্যকরী সভাপতি হিসেবে বারবার যেতেন পুরুলিয়ার গ্রামে গ্রামে। শবরদের উন্নয়নে আইনি সংগ্রামে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেছেন। ‘অপরাধপ্রবণ জনজাতি’ তকমাটা শবর-লোধাদের ওপর থেকে তুলে ফেলতে জীবনপণ করেছেন। কোনো শবর জলের কল বসেনি, লোধা যুবককে ব্যাংক ঋণ দিতে অস্বীকার করেছে – কাউকে ডাইনি অপবাদে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে – সঙ্গে-সঙ্গে তিনি সরকারি স্তরে আগুনঝরানো প্রতিরোধপত্র পাঠাতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি। শবরদের শিশুশিক্ষা, নারীশিক্ষার পাশাপাশি শবরদের মদ্যপানের বিরুদ্ধে সচেতন করেছিলেন। শবরদের হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে স্বনির্ভর করে তুলেছেন। চুনি কোটালের আত্মহত্যার পর, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে লোধাদের চাকরির জন্য আঁচল পেতে ভিক্ষা চেয়েছিলেন তিনি। শুধু পুরুলিয়া নয়, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের লোধা-শবরদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সর্বস্বপণ করেন। জনজাতিদের হস্তশিল্পের সৃষ্টিসম্ভার নিজের উদ্যোগে বিপণনের ব্যবস্থা করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের স্নেহের মহাশ্বেতা গ্রামীণ জনজাতির উন্নয়নে একক প্রচেষ্টায় শহরের সমস্ত সুখ বর্জন করেছিলেন।

একই বৃন্তে দুটি ফুল : সমাজকর্মী ও সাহিত্যিক

শবরদের একটি বিবাহানুষ্ঠান। শহরের শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। শবরদের বিবাহে পেলেন ‘মা শাড়ি’ উপহার। শবরসমাজ স্বসমাজের নিয়ম ভেঙে মহাশ্বেতাকে জননীর আসনে বসিয়ে দিলেন। বিশ্বখ্যাত লেখক মহাশ্বেতা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন তাঁর জীবনের সেরা পুরস্কার পেলেন। মহাজ্ঞান পীঠ!

তিনি একাধারে সমাজকর্মী এবং লেখক। বঙ্গদেশ তথা ভারতসহ বিশ্বক্ষেত্রে এমন দৃষ্টান্ত প্রায় নজিরবিহীন। মেধা পাটকারের মতে, মহাশ্বেতা মূলত সমাজকর্মী পরে সাহিত্যিক। আর আমরা যারা ‘টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় পিরথা’ পড়েছি, মনে করি তিনি আগে সাহিত্যিক পরে সমাজকর্মী। তবে আবেগ বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ বিচারে বলা যেতে পারে – মহাশ্বেতা দেবী এক বৃন্তে দুটি ফুল। একটি থেকে অন্যটিকে ছিন্ন করা অসম্ভব।

সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর স্পষ্ট মত হচ্ছে – বিনোদনের জন্য তিনি কলম ধরেননি। শুধু শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টি তাঁর প্রধান সাধনা নয়। রাজার ইতিবৃত্ত রচনা করা কাজ নয়, গণজীবনের দলিলীকরণে তিনি বিশ্বাস করেন। ইতিহাসচর্যা সাহিত্য স্রষ্টার আবশ্যিক এবং মূলক শিক্ষা। সেই শিক্ষাকে ইতিহাসের দর্পণে, সমসাময়িক, এমনকি ভবিষ্যৎকে ছুঁতে চান। ইতিহাসকে বিনির্মাণের স্রোতে আধুনিক করে দিলেন। সেই ইতিহাসে রাজা থাকেন, কিন্তু বেশি করে থাকেন প্রজা। নিরন্ন প্রজা, প্রতিবাদী প্রজা; প্রতিরোধকারী শুধু পুরুষ প্রজা নয়, দ্রৌপদীর মতো নারী প্রজাও। সেই নারী প্রজার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে যশোদার মতো স্তনদায়িণী। যারা মৃত্যুশয্যায় ক্যান্সারে মরতে-মরতে অনুভব করে – সবাই তার সন্তান। ভাত, জল, সবজি আর নুনের জন্য যারা আজীবন সংগ্রাম করে; তারাই তার সাহিত্যে সেরা নায়ক-নায়িকা। তাদের কথাই লিখে যেতে চান। তাই তাঁর সাহিত্য হয়ে ওঠে মানুষের জন্য সাহিত্য। চারদিকে থাকে শুধু অখ্যাত মানুষ। অমৃতের সন্তানেরা। তাদের প্রতি পরম বিশ্বাসে, মমতামাখানো অগ্নিকলম গর্জে উঠেছে। তিনি কোনো দলীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। ‘মানুষ’ নামক ‘মতবাদ’কে আন্তরিক সহমর্মিতায় তাঁর রাজনীতির পাঠ। নীতির রাজায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শুধুই মানুষ। সেই মানুষ অবহেলিত মানুষ। তাঁর সাক্ষাৎকারগুলোতে বারবার বলেছেন, ‘আমি শুধু মানুষ থেকে পাঠ নিয়েছি।’ বৃহৎ ভারতবর্ষকে জানতে হলে, যেতে হবে নিরন্ন-নিরক্ষর মানুষের কাছে। যারা এখনো মূলস্রোত থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। তারা কেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে গেলেন? কেন দোপ্দি (দ্রৌপদী) সেঝেন, তার স্বামী শহিদ হওয়ার পরও কাউন্টারে পুলিশের মোকাবেলা করে? কেন সে ‘মোস্ট নটোরিয়াস মেয়েছেলে’ হয়ে যায়? কেন তাদের শবদেহ শেয়ালশকুনপিঁপড়েকৃমির খাদ্য হয়? কেন তাদের ‘ঊরু ও যৌনিকেশে চাপ চাপ রক্ত’? কেন তাদের স্তনদুটিও ক্ষতবিক্ষত? এসব রক্তাক্ত প্রশ্ন তুলেছেন এমনভাবে – যা সৃজনের মহৎ গুণে মহৎ সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আবার ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত মেরুতে ‘যশোদা’ জননীর ‘বুক ফাটে ত মুখ ফোটে না’।  – ‘বিশ্বসংসারকে দুধে পাললে যশোদা হতে হয়। নির্বান্ধবে একলা মরতে হয়, মুখে জল দিতে কেউ থাকে না।’ বিচিত্ররূপা নারীমুখকে মর্মস্পর্শী করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন – সমাজকর্মী-সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী।

বিচিত্র সম্পদে ভরা এই ভারত উপমহাদেশ। আদিবাসীদের উন্নত সভ্যতা, সংস্কৃতিচেতনা, মূল্যবোধের বিপন্নতার কথা তাঁর কলমে চিত্রিত হয়েছে। আদিবাসী জনজাতিদের ভাষা আছে, লিপি নেই। মৌখিক সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য মূলস্রোতের ধাক্কায় ষড়যন্ত্রে বারবার দেশান্তরি হতে-হতে হারিয়ে যাচ্ছে। মেসোজোয়িক যুগের সেই টেরোড্যাকটিলকে আধুনিক মানুষ বুঝতে সমর্থ হতো না। নুন ছাড়া যারা শুধু ঘাটো সিদ্ধ খায়। ‘নাগেসিয়ারা’ পাহাড়ের ঢালে বাড়ি করে কেন? তারা আছে, কিন্তু নেই। সরকারি তালিকায় নেই। ‘হো’দের শ্রদ্ধাজ্ঞাপক শ্মশানপ্রস্তর কারা ধ্বংস করল? জ্যৈষ্ঠের উত্তাপে দামি বলদকে বাঁচাতে মালিক যাদের বাধ্য করে ধানবোঝাই গাড়ি টানতে – তাদের নাম ‘নাগেসিয়া’। জোয়ালের নিচে পড়ে কাঁধের হাড় ভেঙে যার নতুন নামকরণ হয় – ‘টেড়ানাগেসিয়া’। দুর্লভ আর বিরল প্রজাতির ‘টেরোড্যাকটিল’দের সাহিত্যে এমনভাবে প্রয়োগ করেছেন, যা বিশ্ববৃত্তে এক বিরল বৃত্তান্তের নবনির্মাণ হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য মহাশ্বেতার গ্রামীণ ভারত বিশ্বের সাহিত্যপাঠকের কাছে নির্মাণসাহিত্যের সন্ধান দিয়েছে।

বিশ্বসাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবী

মহাশ্বেতা দেবীর সমস্ত রচনাই ইতিহাসের উপাদানে সমৃদ্ধ। শুধু ইতিহাস নয়, ইতিহাসের সঙ্গে আছে সমাজতাত্ত্বিক উপাদান। তাঁর গল্প-উপন্যাসে ইতিহাসের সঙ্গে ভূগোল, লোককথা, লোককাহিনি; এমনকি দলিলদস্তাবেজ, এমনকি চিঠিপত্রও সাহিত্যের নতুন স্বাদ নিয়ে এলো। খুলে গেল ভারতীয় সাহিত্যের নতুন পথ। তাঁর ‘দ্রৌপদী’ যেন অতীত হয়েও বর্তমান – চুনি কোটাল থেকে রোহিত ভেমুলা আমাদের চিনিয়ে দেয় – পুরাণ এবং বর্তমান একই বিন্দুতে স্পর্শ করেছে। সর্বস্বহারা নিম্নবর্গের সমস্ত মানুষ এক মহাকাব্যিক বিভূতি নিয়ে এক চিরন্তন জগৎ সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস-ভূগোলের পরিসীমায় এক অনন্য জীবনবিজ্ঞানে পরিণত। ভারতীয় শব্দের ভাণ্ডার বৈচিত্র্যময়ের সন্ধানে এক নিজস্ব স্বর, অশ্রম্নত স্বর সৃষ্টি হয়েছে। সেই অশ্রম্নসিক্ত স্বর কখনো তির্যক, কখনো তীক্ষন, গভীর থেকে গভীরতর হয়ে এক বিকল্প ইতিহাসের সন্ধান দিয়েছে।

শুধু বৃহত্তর বঙ্গদেশ নয়, সমগ্র ভারতবর্ষ উঠে এসেছে তাঁর আশ্চর্য সৃষ্টিসম্ভারে। শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাস-ভূগোল নয়, বলা চলে অনুসন্ধান করেছেন আদিবাসী মানুষের প্রস্তরভাস্কর্যলিপি। লোকসংস্কৃতির সঙ্গে নৃতত্ত্বের সংমিশ্রণে আর আগুনঝরা বারুদের মতো বাক্যবাণ সাহিত্যের নয়া দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।

মহাশ্বেতা দেবীর জীবনে তিনটি বিশেষ গুণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে – প্রথমত তিনি সারস্বত সাধনায় নিমগ্ন। দ্বিতীয়ত, তিনি প্রতিবাদী, সংগ্রামী, উন্নয়নকারী এবং তৃতীয়ত তিনি মানবতাবাদী। তিনিই প্রথম বামপন্থী যিনি মানবিক ভাবনায় প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন। অরণ্যের আগুনখেকো লালমাটিতে লোধা, শবর, সাঁওতাল, মুন্ডা, দিখারো, কুর্মি, ওরাঁও, ভাঙ্গারিয়াদের জন্য সংগ্রাম করেছেন। শুধু তাদের কথাই সাহিত্যে তুলে এনেছেন। ব্রিটিশ আমলের তাদের নোটিফায়েড দাগি তকমাটার তিনিই বিলুপ্তি ঘটিয়েছেন। তিনি শুধু প্রান্তিক মানুষের কাছে যাননি, তাদের জন্য নিজের ঘরের দরজাও সর্বদা খুলে রেখেছিলেন। একই সঙ্গে দুটি স্বর তাঁর রচনায় উদ্ভাসিত হয় – নীরব কণ্ঠ এবং সরব কণ্ঠ। অতীত ইতিহাস যেন বর্তমান ইতিহাসের সঙ্গে মিলে গিয়ে সর্বকালের ইতিহাস হয়ে গেছে তাঁর অশ্রম্নত সাহিত্য, যা চলমান সময়ের ভিন্ন বৃত্তান্ত হয়ে উঠেছে। হাজার চুরাশির মা কিংবা হুলমাহার মার মধ্যে ভারতীয় লোকভাষা এক চলমান রূপকথার জন্ম দেয়। যা ভারতীয় জীবন ও সাহিত্যের সবচেয়ে জীবন্ত মনে হয়। মহাশ্বেতা দেবী সারাজীবন বাংলা ভাষায় তাঁর মাতৃভাষায় লিখেছেন। শুধু বাংলা ভাষায় লিখেছেন অথচ তাঁর সৃষ্টির সৌকর্য বঙ্গদেশের ভূখ– সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। শুধু ইংরেজিতে নয়, ফরাসি, জার্মানি, স্প্যানিশসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে মহাশ্বেতাসাহিত্য। বেস্ট স্টোরিজ, ইমাজিনারি ম্যাপ্সের ইংরেজি অনুবাদক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক মনে করেন – ‘মহাশ্বেতা দেবী অন্য বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের সমান। তাঁর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের মাধ্যমে ভারতের আদিবাসীদের গোপন ইতিহাস সারা পৃথিবীর সাহিত্যে সম্মানিত।’ ভারতবর্ষকে গভীরভাবে জানতে মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করেন বিদেশিরাও। তার অন্যতম প্রধান কারণ তাঁর
গল্প-উপন্যাসে শুধু কাহিনি আর ইতিহাস-ভূগোল নয়, তার সঙ্গে সংলিপ্ত আছে গবেষণার বহুমাত্রিক প্রিজম, যা বিশ্বসাহিত্যকে রামধনু রঙে আলোকিত করেছে।

মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় ৩৫০ আর উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় ১৫০। ইতোমধ্যে ২০ খ– প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রচনারাজি; আরো ১০ খ–র কাজ চলছে। এ ছাড়া ছড়িয়ে আছে আরো বহু রচনা যা আজ গবেষণার বিষয়। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে – মহাশ্বেতাসাহিত্য নিয়ে। আসলে মহাশ্বেতা দেবীর ‘চোট্টি মুন্ডারা’ নিরস্ত্র হয়ে সশস্ত্র। ‘দ্রৌপদী’রা নীরব হয়েও সরব। ‘স্তনদায়িনীরা’ অত্যাচারিত-ধর্ষিত হয়েও শক্তিশালিনী। মহাকাব্যিক ফ্রেমে এক চলমান সময় অতীতকে সামনে আনে বহুমাত্রিকতায়। বসাই টুডুর বিশ্বাসবাবুদের বেয়নেটে নেই। বসাইয়ের বিশ্বাস তীরে। বীরসা মুন্ডা বিনা বিচারে মারা গেলেও সে ভগবানে পরিণত হয়। তাঁর ভস্মীভূত ছাইও অর্ঘ্যবেদির জন্য মহামূল্যবান হয়ে ওঠে। তিলকা মাসিদের ফাঁসি দেওয়ার জন্য কোনো সাঁওতালকে পাওয়া যায় না। অবশেষে এগিয়ে আসে ইংরেজ শাসক। প্রকৃতির অকৃত্রিম সন্তানদের অপার্থিব সম্পদের চিত্রায়ণ যেন শুধু ইতিহাস নয়, আরো অন্যকিছু। শুধু মহাকাব্য নয়, বিশ্বকাব্যের কলতান ধ্বনিত হয়। মহাশ্বেতার আদিবাসী মহামানবেরা ভেরিয়ের এলউইনকে অতিক্রম করে যায়। চোট্টি মুন্ডা একা দাঁড়িয়ে থাকে, নিরস্ত্র। সে চিরকালের সঙ্গে মিলেমিশে হয়ে যায় নদী, কিংবদন্তি, অবিনশ্বর।… সামনে শূন্যে উত্তোলিত হাজার ধনুক।

 

তথ্যসূত্র

l     অরণ্যের অধিকার, মহাশ্বেতা দেবী, করুণা প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৮৪।

l     মহাশ্বেতা দেবীর একটি সাক্ষাৎকার – ‘আমার মতো করে আমি ইতিহাস খুঁজি’, দৈনিক স্টেটসম্যান বিচিত্রায় প্রকাশিত, ৫ ফেব্রম্নয়ারি ২০০৬।

l     মহাশ্বেতা দেবী, অপরাজেয় প্রতিবাদী মুখ, নির্মল ঘোষ, প্রকাশক, বামাচরণ মুখোপাধ্যায়, করুণা প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ বইমেলা ১৯৯৮।

l     বাংলা কথাসাহিত্যে ব্রাত্যসমাজ, সুবোধ দেবসেন, প্রকাশিকা কবিতা দেবসেন, প্রথম প্রকাশ, কলকাতা পুস্তকমেলা, জানুয়ারি ১৯৯৯।

l     মহাশ্বেতা দেবীর কথাসাহিত্যে আদিবাসী জীবন, শিপ্রা দত্ত, অক্ষর পাবলিকেশনস্, প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০০৯।

l     অরণ্যের অধিকার মানুষের উত্থান, সম্পাদনা রতনকুমার নন্দী, প্রকাশক দেবাশিস ভট্টাচার্য, প্রথম প্রকাশ গান্ধী জয়মত্মী, ২০০৫।

l     বাংলা উপন্যাসে আদিবাসী : আরণ্যক থেকে অরণ্যের অধিকার, দেবাংশু মাইতি, প্রকাশক ইন্দাস পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স, প্রথম ইন্দাস সংস্করণ, জানুয়ারি ২০১০।

l     আদিবাসী জীবন ও সংগ্রাম, অচিমত্ম্য বিশ্বাস, বৃন্দবাক, ১৯৯৭।

l     ভারতের আদিবাসী, সুবোধ ঘোষ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ১৯৯৫।

l     ভারতবর্ষের আদিবাসী পরিচয়, ননীমাধব চৌধুরী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৮০।

l     Annexure to the Tribal map of India, B. C. Gohain, Anthropological Survey of India, Government of India, Indian Museum, 2 January, 1971.

l     মহাশ্বেতা দেবী অম্নিবাস, সংকলক অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ২০১৪।

l     মহাশ্বেতা দেবীর পছন্দের পাঁচ উপন্যাস, প্রকাশক দেবারতি মল্লিক, দিয়া পাবলিকেশন, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ২০১৩।

l     মহাশ্বেতা দেবী বিশেষ সংখ্যা সমকালের জিয়নকঠি, সম্পাদক নাজিবুল ইসলাম ম-ল, প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি-জুন ২০১৫।

l     মহাশ্বেতা দেবী, শালগিরার ডাকে, করুণা প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ১৯৮২।

l     মহাশ্বেতা : নানা বর্ণে ও নানা রঙে, সম্পাদনা রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দিয়া পাবলিকেশনস্, প্রথম প্রকাশ ১৫ মে ২০১৫।

l     ‘সত্তর দশকের সমাজ দর্পণ : অপারেশন? বসাই টুডু’, সেলিমবক্স ম-ল, (মহাশ্বেতা : সম্পাদনা রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়), দিয়া পাবলিকেশনস্, প্রথম প্রকাশ ১৫ মে ২০১৫।

l     ‘অরণ্যের অধিকার : কাদের অধিকার এবং কেন?’, দীপঙ্কর মল্লিক (মহাশ্বেতা : সম্পাদনা রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়), দিয়া পাবলিকেশনস্, প্রথম প্রকাশ ১৫ মে ২০১৫।

l           ‘অরণ্যের অধিকার : মুন্ডাজীবনের মহাকাব্য’, ড. সুরঞ্জন মিদ্দে (মহাশ্বেতা : সম্পাদনা রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়), দিয়া পাবলিকেশনস্, প্রথম প্রকাশ ১৫ মে ২০১৫। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply