শুদ্ধ মানুষের স্তুতি

লেখক:

গৌতম নিয়োগী
বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ
সনৎকুমার সাহা সম্মাননা গ্রন্থ
সম্পাদক হাসান আজিজুল হক

সময় প্রকাশন
ঢাকা, ২০১২
৬০০ টাকা

হাসান আজিজুল হক আফসোস করেছেন বইটি সময়মতো বের করা যায়নি বলে, আমরা কিন্তু ভীষণ খুশি; শুধু খুশি না, এই বইটি প্রকাশ তথা সম্পাদনাকর্মে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের বাঙালিমাত্রই এমন একটা প্রকাশনা হাতে পেয়ে আনন্দিত হবেন, অন্তত যাঁরা শুভবুদ্ধিমান, যাঁরা চিন্তার দাসত্বে বিশ্বাসী নন, যাঁরা উদার মানবিকতায় আস্থাশীল। হাসান আজিজুল হক-সম্পাদিত বৃহদায়তন বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ বইটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল হালফিল বাঙালি মনীষায় শিল্পিত সুষমার এক সংগৃহীত ভাণ্ডার গড়ে তোলা। আর উপলক্ষও একটি ছিল : তা হলো, আমাদের কালের এক স্মরণীয় বাঙালি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক-চিন্তক অধ্যাপক সনৎকুমার সাহাকে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো।
মননশীল রচনাবলির সেই স্বর্ণাভ ভাণ্ডার সনৎকুমারের হাতে তুলে দেওয়া গেছে, এর চেয়ে বড়ো তৃপ্তি আর কী হতে পারত?
জানি, সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত, নির্লোভ ও নিরহঙ্কারী মানুষ সনৎকুমার বলবেন : এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। এও জানি, আরো অনেক বিষয়সমৃদ্ধ অধিকতর বাঙালির রচনা পেলে ভালো হতো। তবু যা পেলাম তার জন্যে হাসান আজিজুল হক, স্বরোচিষ সরকার, আনিসুজ্জামান মানিক, মোহাম্মেদ নাসের, এস এম আবুবকরসহ প্রত্যেককে এবং সেইসঙ্গে প্রকাশক ফরিদ আহমেদকে আবারো কৃতজ্ঞতা জানাই। এই শ্রদ্ধেয় বাঙালি গুণীজনকে সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি ছিল। ২০১১-তে তাঁর সত্তরতম জন্মদিনে বই বেরোতে পারেনি বলে সম্পাদকের আফসোসকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যেই রাখছি না।
সম্পাদক নিজেই আন্তরিক ভঙ্গিতে লিখিত ‘সম্পাদকের একান্ত বলা’ শীর্ষাঙ্কিত মিতভাষে সনৎকুমার সাহার বাহিক অবয়বের একটু পরিচয় দিয়েছেন : ‘তাঁর ক্ষীণ এতটুকু একটা শরীর, খুঁটিয়ে দেখলে সুপুরুষ, নইলে একেবারেই সাদাসিধে বাঙালি। ভিড়ে মিশে যাবেন, আলাদা চোখে পড়বেন না। প্যান্ট-শার্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি যাই পরুন, কিছুতেই তাতে বিশেষ কিছু থাকে না। মৃদুভাষী ধীরভাষী। আগে কথা পরে চিন্তা নয়। আগে চিন্তা। অনেকটা সময় নিয়ে বিবেচনা। অপেক্ষা করতে করতে ক্রেতা যখন প্রায় অতিষ্ঠ, তখনই মোক্ষম কথাটি। সর্বশেষ চূড়ান্ত চিন্তাটি।’
একটি আশঙ্কা উত্থাপন করতে পারি, এই বাংলায় অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে আমাদের মতো অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকদেরও কিছু খোঁজখবর রাখেন এমন মানুষ বাদ দিলে সনৎকুমার সাহা হয়তো ব্যাপকভাবে পরিচিত নন, তাই সাধারণ পাঠক-পাঠিকার কথা বিবেচনা করে কিছু গোপনীয় পরিচয় দিলে বোধকরি অসংগত হবে না। সনৎকুমার সাহা একজন প্রকৃত পণ্ডিত, সজ্জন এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি। ১৯৪১-এর ১৮ ফেব্র“য়ারি রাজশাহী জেলায় শচীকান্ত সাহা ও শান্তিলতা সাহার পুত্র সনৎকুমারের জন্ম। আগাগোড়া ঝকঝকে আর মেধাবী তাঁর ছাত্রজীবন – প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক (১৯৫৫), প্রথম বিভাগে আইএ (১৯৫৭), অর্থনীতিতে অনার্স (১৯৫৯) এবং এমএ (১৯১১), প্রথম শ্রেণিতে। সংস্পর্শে এসেছেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, এনামুল হক, মুশাররফ হোসেন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, বদরুদ্দীন উমর, সালাহউদ্দিন আহমদ, আজিজুর রহমান মল্লিক, ফজলুল হালিম চৌধুরী প্রমুখের। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের এমএসসি (১৯৬৫)। অধ্যাপনাজীবনের শুরু থেকে অবসর (১৯৬২-২০০৬) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, মাঝে অনেকবার বিদেশে গেছেন।
পণ্ডিত তো অনেকেই হন; কিন্তু সৎ এবং শুদ্ধ মানুষ কজন? সনৎকুমার সাহা তেমনই ব্যতিক্রমী একজন। অর্থনীতির জটিল তত্ত্বের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা আঙিনায় তাঁর বিচরণ। সমাজ সংসার কলরব তাঁর প্রকাশিত প্রথম বাংলা প্রবন্ধের বই; এরপর অনেক বই লিখেছেন, যার মধ্যে মনে পড়ে আকাশ পৃথিবী রবীন্দ্রনাথ। সামান্য  লিখলাম, বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ বইয়ে তাঁকে বিস্তারিতভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন আনিসুজ্জামান মানিক। এ-বিষয়ে তাঁর চেয়ে যোগ্য আর কে-ই-বা আছেন? মানিক লিখেছেন এক মোক্ষম বাক্য : ‘তাঁর ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা সবকিছু ছাপিয়ে নিজস্ব মহিমায় নিজেকে নিজেই প্রকাশিত করে। এখানে অন্যের প্রবেশাধিকার সামান্যই।’
এর সঙ্গে আবারো শরণাপন্ন হই হাসান আজিজুল হকের একান্তে বলা মন্তব্যের : ‘আমার মনে হয়েছে সনতের মানসিক গড়নটা খানিকটা মিশ্র, যাকে সৃজনশীল বস্তুবাদী মার্ক্সিস্ট বললে বোধহয় আপত্তি উঠবে না। সঙ্গে আছে র‌্যাডিক্যাল মানবতন্ত্র, আদর্শ-আশ্রয়ী কল্যাণ-চেতনা। জীবনের কলরব-কল্লোলমুখর বাস্তবের অভিজ্ঞতার কিছু অভাব তাঁর মিটেছে নিস্পৃহ-নিঃশব্দ উত্তুঙ্গ বুদ্ধিভিত্তিক বিচার-বিবেচনার ওপর আস্থা রেখে। তিনি একালের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের কঠোর সমালোচক, সবচেয়ে বড়ো সমালোচনা তাঁর পণ্যনির্ভর ভোগবাদী বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার। নতুন, একেবারে একালের সাহিত্য দর্শন সমাজতত্ত্বগুলিকেও তিনি তেমন অনুমোদন করেন না।’
এমন একজন মানুষের সম্মাননা গ্রন্থের অভিপ্রায় ছিল বাংলার (অর্থাৎ বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের) ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতির মূল বিন্দুগুলিকে স্পর্শ করা। অতীত সন্ধান আবশ্যিক কৃত্য নতুবা বর্তমানকে বুঝব কী করে, ভবিষ্যৎ গড়ব কীভাবে। যে ‘বৃহৎ বঙ্গে’র ওপর ভিত্তি করে বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে, তা জানা জরুরি। অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক অবশ্যই অধ্যাপক সনৎকুমার সাহার আগ্রহের কেন্দ্রগুলোকে সামনে রেখেই লেখাগুলো সংগ্রহ করতে চেয়েছেন। ৩০ জন খ্যাতিমান লেখক-লেখিকা তাঁদের রচনা দিয়ে বইটি সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা হলেন : অনুপম সেন, আলী আনোয়ার, অরুণ সেন, পবিত্র সরকার, অশ্র“কুমার সিকদার, কেতকী কুশারী ডাইসন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সুজিত ঘোষ, হাসানুজ্জামান চৌধুরী, এম এম আকাশ, আতিউর রহমান, হাসান ফেরদৌস, আবু মুহাম্মদ, অমলেন্দু দে, শামসুজ্জামান খান, সুনীতিকুমার ঘোষ, রতন খাসনবিশ, সালাউদ্দীন আহমদ, মিহির সেনগুপ্ত, শিশির কুমার ভট্টচার্য, দেবেশ রায়, হায়াৎ মামুদ, স্বরোচিষ সরাকর, দিনেন্দ্র চৌধুরী, অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইরাবান বসুরায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুব্রত মুজমদার, গোলাম মুরশিদ এবং আনিসুজ্জামান মানিক। অধিকাংশকেই জানি। কয়েকজনকে জানি না, তাই একটি লেখক-পরিচিতি থাকলে ভালো হতো।
প্রতিটি লেখা নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই।  প্রত্যেক লেখকই আন্তরিক হলেও রচনাগুলোর মধ্যে ভিন্নতা আছে। কোনো কোনোটি বেশ ভারি, অ্যাকাডেমিক গোত্রের কোনো কোনোটি আবার সহজবোধ্য বিশ্লেষণাত্মক। কোনো রচনায় তথ্যের পালা ভারি, কোনোটিতে স্মৃতি। এমনই স্মৃতিমূলক একটি অসামান্য রচনা উপহার দিয়েছেন গোলাম মুরশিদ। সৎ মানুষের  সংখ্যা বাড়লে পাঠকরাও সাক্ষাৎ পেয়ে যাবেন। বাঙালির পরিচয় নিয়ে লিখেছেন হায়াৎ মামুদ; বাংলা সাহিত্য নিয়ে অশ্র“কুমার সিকদার, কেতকী কুশারী ডাইসন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। ধর্ম, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এসব নিয়ে সালাউদ্দীন আহমদ, হাসান ফেরদৌস, শামসুজ্জামান খান মূল্যবান আলোচনা করেছেন। আবু মুহাম্মদ, হাসানুজ্জামান চৌধুরী, এম এম আকাশ এবং অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের রচনাও আমাদের খুব ভালো লেগেছে। বঙ্গ বাংলা বাংলাদেশ বইটি যে-কোনো শিক্ষিত বাঙালি সংগ্রহ করতে চাইবেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply