শুধু একজন জানে

লেখক:

অঞ্জন ব্যানার্জী

 এই বাড়িতে দুটো পুজোর ঘর আছে, একটা বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। শুধু ওপার বাংলার দিদা এসে এই বাড়িতে থাকলে সেটা খোলা হয়। সেই ঘরটাতে কোরান রাখা থাকে বারোমাস, ওইপারের দিদা ঠাট্টা করে বলে, ‘এ কি নারায়ণশিলা যে তুলে নিয়ে যাবো আবার না থাকলে ফেলে রাখা যাবে না।’

আজ সেই বিখ্যাত গায়ক মানুষটি মারা গেছেন, বিকেলের আমেজে তার গান এই বাড়ির রাধাকৃষ্ণ আঁকড়ে পড়ে থাকা দিদার ঘরে বাজছে – ‘গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা/ আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা-যমুনা।’

বাড়ির একমাত্র কলকাকলি-ছড়ানো বাচ্চা মেয়েটি, নাম তার তুন্নী, দিদাকে বিরক্ত করতে লেগেছে, ‘দিদা ও-দেশেও কি একটা যমুনা আছে? যমুনা তো আমাদের আছে তাজমহলের পাশে, তাহলে?’ দিদা একটু হাসিমুখ করে বলেন, ‘তাতে কি তুন্নীরানী! আমাদের যেমন বাংলাভাষা আছে, ওদেরও আছে; সেইরকম আমাদের গঙ্গা ওদের কাছে না গিয়ে পারে? গঙ্গা হয়েছে পদ্মা আর ব্রহ্মপুত্র একটু সাজ বদলে হলো যমুনা। আমাকে পুজোর সময় বিরক্ত করো ঠিক আছে; কিন্তু মনে থাকে যেন, ছোটদিদা এলে পরে তাকে নামাজের সময় কিন্তু ডাকাডাকি করো না!’

তুন্নী হেসে বলে, ‘তাহলে এখন তোমায় ছেড়ে দিয়ে মিনাখাদিকে বিরক্ত করি!’ বলে তুন্নী ছুটে বাগানে চলে যায়।

মিনাখার দুটো নাম এই বাড়িতে। যখন ছোটদিদার পুজোর ঘর সামলায় তখন মিনাখা আর যখন বড়দিদার পুজোর ঘরে ঢোকে, তখন তাকে সাড়া দিতে হয় মীনাক্ষী নামে। এইভাবে একবার এই নাম আরেকবার ওইনামে দুই দিদাই তাদের নিজ নিজ উপাসনা-আজানঘরে তাকে গ্রহণ করেন। দুই দিদাই এই অদ্ভুত ব্যবস্থা করেছেন।

তুন্নী দেখে বাগানে গিয়ে মিনাখাদিকে দেখতে পরীর মতো লাগছে। একটা সাদা কামিজ পরেছে, ওড়নাটা পাখির পালকের মতো যেন উড়ছে। সে টগর ফুল তুলছে তার ওড়নার ভেতরে।

তুন্নীকে দেখেই বলে ওঠে, ‘প্রশ্নবুড়ি এসে গেছিস। তা এলি যখন প্রশ্ন করেই ফ্যাল!’ তুন্নী গোল গোল চোখ করে বলে ওঠে, ‘মিনাখাদি আমাকে মালা গাঁথতে শিখিয়ে দেবে? ছোটদিদার নামাজেও কি ফুল লাগে?’

মিনাখা বলে ওঠে, ‘যে ফুল চেনে না, সে তো আল্লাহকেও চেনে না। ওই ফুলরা ছিল বলে আমরা বেঁচে গেছি, কৃষ্ণ বা করিম ফুল দিয়ে সাজালে দুজনকেই দেখতে কি সুন্দর লাগে না?’

 

দুই

তুন্নীর বড়দিদা রোহিণীপ্রভা বারান্দায় বসে আছেন বোনের আসার অপেক্ষায়। ‘মৈত্রী’ এক্সপ্রেস আজ ঠিক সময়ে আসছে তো? দেশভাগ হয়েছিল লোকে বলে, আসলে তো তাদের দুই বোনের বন্ধুত্ব, সান্নিধ্য ভাগ হয়েছিল।

আজ বড্ড শীত পড়েছে। ডিসেম্বরেই বিজয় দিবস না! এই রে, তারিখটা মনে পড়ছে না, ছোট বোন সামনে থাকলে ঠিক বলতো ‘তোর অনেক মেহেরবানি রে দিদি, স্বাধীনতা দিবস, তোর ঠাকুরের জন্মদিন ঠিক তো দিমাগে থাকে, আর বিজয় দিবস থাকে না – না থাকারই কথা।’

মনে মনে ভাবেন, বারান্দা থেকে উঠে সরে যাবেন কিনা। মীনাক্ষী দেখলে বড্ড বকাবকি করবে। এই মেয়েটা ঠিক তাদের বাবার মতো।

এই পৌষেই তো বাবা গত হয়েছিলেন। বাবার কথা মনে এলেই একটা গল্প মনে পড়ে রোহিণীর। গল্পই বটে! হিন্দু-মুসলমান যখন ’৪৭ সালজুড়ে বাংলার পূর্বে না পশ্চিমে কে কোন দিকে যাবে, এই নিয়ে এক্কা-দোক্কা খেলছে, তখন বাবা তাদের নিয়ে পালিয়ে আসেননি। সেদিন সংক্রান্তি, মনসার ভাসান। মধুমতি নদীতে একটাও ভাসান হয়নি। বাবা তাদের গোটা গাঁয়ের মুরুবিব না হলেও সম্প্রীতির জিন্দা পীরসাহেব, তাদের গাঁয়ে হিন্দু-মুসলিম কেউ কারো গায়ে হাত দেয়নি, সেই রাতে স্বয়ং মৌলভিসাহেব তাদের গোটা পরিবারকে নিয়ে নদীতীরে চলেছেন, উদ্দেশ্য সহি-সলামাৎ নৌকায় তুলে দেওয়া।

গাঁয়ের একমাত্র ডাক্তার পরিবার চলে যাচ্ছে শুনে অনেক অনেক ভালোবাসার মানুষ, গোল বাধানোর মানুষও তাদের সঙ্গে চলেছে। সঙ্গে আছে দুই বোন রোহিণী আর সোহিনী। নৌকায় উঠতে যাবে, তাদের বাবা এমন সময় সমবেত জনতার উদ্দেশে ঘুরে তাকালেন। মৌলভিসাহেব আর তার ছেলে জিশান কাছেই দাঁড়িয়েছিল। সোহিনীকে হঠাৎ নৌকা থেকে নামিয়ে দিলেন।

বললেন, ‘জিশান বাপ আমার। সোহিনীকে তোদের কাছে রাইখ্যা গেলাম, অরে তুই নিকা করিস!’ নৌকার ভেতর থেকে          মা-দিদিমা ডুকরে কেঁদেছিল কি? আমার ভীষণ গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল, বাবাকে ধাক্কা মেরে জলে ফেলে দেব নৌকা জলের গভীরে গেলে। আর তারপর মধুমতি সাঁতরে পারে গিয়ে বোনকে সঙ্গে করে নিয়ে আসব, কেন যে কিচ্ছুটি করিনি!

মৌলভিসাহেব বলেছেন যেই, ‘ভট্চায্যি মশাই আপনি কলকাতা যান, কেউ আপনার গায়ে অাঁচড়টিও কাটবে না, তার জন্য এসবের দরকার নেই!’ ‘দরকার আছে!’ – বাবা তখন শান্ত অথচ ভৈরব কণ্ঠে বলে চলেছেন, ‘আজ থেকে সত্তর-আশি বছর পরও কাঁটাতারের এপারে-ওপারে বাংলা ভাষা যেমন থাকবে, তেমন ধর্মও থাকবে। দেখবেন তখনও যতই আসছে শতাব্দীর পুব-পশ্চিমের বাঙালিরা ভাষা নিয়ে সকালবেলা গলা জড়াজড়ি করলেও রাত হলেই ধর্ম তাদের এক থাকতে, এক হতে দেবে না।’

মধুমতি নদী যেন থেমে গেছে ভাদ্রের সেই সন্ধেবেলা, বাবার কথা তো নয়, যেন পাঠশালায় গুরুমশাইয়ের বচন, জনতা হাঁ করে শুনে যাচ্ছে। কী জানি, যাদের হাতে কাটারি ছিল সেই কাটারিগুলো তখন মুখ লুকিয়েছিল কিনা? কবেকার কথা – কত্তদিন আগের। এখন আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে পঁচাত্তরের রোহিণীপ্রভার যেন মনে হয়, এই তো এই বছর ভাদ্রসংক্রান্তির ঘটনা।

বাবা নৌকার কাছি খুলে দেওয়ার আগে আর কী বলেছিল? হ্যাঁ মনে পড়ছে – ‘সুধীমন্ডলী আপনারা কেউ যেন মনে কইরেন না আমি এই মাইয়া রে লগে আর অন্যটারে রাইখ্যা গেলাম যোগাযোগ যাতে না বাঁধে সেই কৌশলে, আমি পলাইয়া গেলাম না, এইটা জানান দিয়া গেলাম দুই পাড়ে দুই কলিজা রাইখ্যা গেলাম, তারা দুদিকের ধর্মে লালিত হোক। কারণ ধর্ম আমাগো চালায়, যতই ভাষা লইয়া অঙ্গটা দ্যাখাই কাঁচকলায়।’

সেই থেকে এপার-ওপার চলেছে। বাবার মৃত্যুদিন এলে ছোটবোন আসে বাবার পশ্চিমবাংলার নতুন বানানো বাড়িতে; আর তার জন্মদিনে দিদি যায় বাংলাদেশে বাবার ভিটেতে। বয়েস আর ধর্ম তাদের দুই বোনকে এই কর্তব্য, পিছুটান থেকে দূরে রাখতে পারেনি। তবে মাঝে-মাঝেই রাজনৈতিক ডামাডোল তাদের থামিয়েছে ঠিকই।

 

তিন

‘অ্যাই হালার বেটি, তোকে না আমি কখন বলেছি আমার গোসলের গরম পানি যেন তৈরি থাকে।’ – ছোট বোনের শোরগোলে দিদি রোহিণীর মালা জপে বিঘ্ন উপস্থিত। কথাগুলো মীনাক্ষীকে বলা কিন্তু একটু পরে বোন তার একটা অন্য প্রসঙ্গে তাকে আক্রমণ শানাবে রোহিণী বিলক্ষণ জানেন, হলোও তাই।

তুন্নী শীতের রোববারে আজ মোবাইল ফোন নিয়ে বারান্দা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তার মোবাইল থেকে হালের জনপ্রিয় গান ভেসে আসছে – ‘তু মেরি ছম্মকছল্লো।’ ব্যস! তুন্নীর দিকে তার ছোটদিদা তেড়ে আসেন ‘হ্যাঁরে, বাংলা গান শুনতে পারিস না? নজরুলের ‘বাগিচায় বুলবুলি’ বা ‘তেপান্তরের মাঠে’। আমার সাথে বাংলাদেশ চল্, দেখবি বাংলাকে আমরা কত্ত যত্নে রেখেছি। আর তোরা! সক্কাল সক্কাল বেহস্তের ভাষা।’

তুন্নী যেই না বলেছে – ‘ছোটন্যানি তুমি বড্ড ব্যাক্ডেটেড! আমরা বুঝি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গোয়েজ স্কুলে স্টাডি করি না? আমরা নজরুলের বি-ডে জানি না, কিন্তু গান আমরা গাই, পোয়েম রিসাইট করি।’

তুন্নীর ছোটদিদা এবার জ্বলে ওঠেন, ‘এতক্ষণ কথা বললি তার মধ্যে কটা বাংলা শব্দ ছিল গুনে বলতে পারবি? হায় আল্লাহ! আমার তৌসিফের ছেলেটা সাচ্চা বাংলা বলে গড়গড় করে, জানিস।’

তুন্নীর পক্ষ নিতে এবার তার বড়দিদা বেরিয়ে এসেছে শোরগোলের আঙিনায়। ‘সোহিনী আর তোরা যে ভূরি ভূরি উর্দু শব্দ কওস, তার বেলা?’

‘দিদি তোর বয়স তো কম হলো না! নিজের ধর্ম নিয়ে থাক। আমাদের বাংলায় দুটো-একটা আরবি, উর্দু শব্দ তো আসবেই, তোদের ধর্ম তো পাঁচমিশেলি পাঁচ তরকারি – সব ভাষার শব্দ বলবি আর বলবি ওগুলো বাংলাভাষাতে আগে থেকে পহেচান্ ছিল। আর আমার পুরো নামটা ভুলে যাস যে বড়! শাহনারা খাতুন সোহিনী।’

রোহিণী হেসে ওঠেন, ‘বেশ তো আমাকেও জাহানারা দিদি ডাকিস এবার থেকে।’ শাহনারা চোখ পাকিয়ে আরো কিছু বলতে যান। তার চোখ যায় মিনাখার দিকে। মিনাখা বলে ওঠে, ‘জাফরানি বিরিয়ানি বানাবো নানি? তোমরা আজ দুপুরের খানা একসঙ্গে খাও দেখি। কত্তদিন তোমাকে একসঙ্গে খেতে দেখি না দিদার সঙ্গে।’

রোহিণী বলেন, ‘ওরে বাবা গোপালকে, কৃষ্ণকে কি আমিষ খাওয়াবো নাকি? তুই কি যে করিস না মীনাক্ষী!’ ‘না গো দিদা এ নিরামিষ বিরিয়ানি, কাল টিভিতে ‘মাধবীলতার রান্নাঘর’ দেখে শিখেছি। তোমার গোপালকে দিয়ে তারপর নানির সাথে খেতে পারবে।’

শাহনারা হাসি-হাসি মুখে বলে ওঠেন, ‘আমার এখনো নাহানো হলো না। দিদি আজ একসঙ্গে খাবো, তোমার জপ কখন শেষ হবে? হ্যাঁ রে তুন্নী, বাবা-মাকে জিগ্যেস করে আয় তো, তোকে আমাদের সঙ্গে খেতে দেবে কিনা? দিদি ঝগড়াটা বিকেলে শেষ করবো।’

শাহনারা স্নানঘরের দিকে এগিয়ে যান। রোহিণী মীনাক্ষীর দিকে তাকিয়ে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বলেন, ‘তোকে যদি পারতাম দুদেশের নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে কীসব চুক্তি হয় শুনি, তা মিটমাট করতে পাঠাতাম, সত্যি আমাদের ঝগড়া তুমুলে উঠলে তু্ই কি বুদ্ধি দিয়ে যে থামাস!’

মীনাক্ষী একটু যেন গম্ভীর হয়। তুন্নী বলে ওঠে, ‘তোমরা দুই দিদা ওকে তাই তো দুটো নাম দিয়ে নিজেদের ঝামেলা মেটাতে দিয়েছো, তাই না?’ রোহিণী মনে মনে বলে ওঠে, ‘তুন্নী তুই বড্ড সত্যি কথা বলিস। সোহিনীটা শুনলে বেশ হতো!’

 

চার

অনেক রাতে বড়দিদি অশক্ত শরীরে উঠে বসে, বাইরে আসে নিঃশব্দ চরণে – সেখানে তখন হিঃ হিঃ শীত। কে যেন গান গায় – আস্তে আস্তে এগিয়ে যান বোনের ঘরের দিকে, গানের কথাগুলো আরো পরিষ্কারভাবে শুনতে পান – ‘প্রতিদিন দেখতো যারে আর তো তারে দেখতে না পায়/ তবু সে নিত্যি আসে গাছের শাখে সেইখানেতে বসে থাকে, সারাদিন সেই গানটি গায়। সন্ধে হলে কোথায় চলে যায়!’

বোনের ঘরের দরজা ফাঁক করে রোহিণী দ্যাখেন শাহনারা বাবার ছবিটিকে কোলে নিয়ে গেয়ে চলেছে। রবিঠাকুরের এই গান বাবা প্রায়ই গাইতেন – মৃত্যুযন্ত্রণাতেও এই গান তার থেমে যায়নি।

শাহনারা দিদিকে দেখে গান থামায়, একটু হাসেওবা – ‘আর দিদি বুড়ি হয়েছি, সেই গলা কি আছে রে? তবু রবিঠাকুর বলেই বোধহয় হিম্মত আসে, হয়তো উনি আড়াল থেকে মাফ করেও দেন।’ কিছুক্ষণ দুইবোনই চুপ – তারপর ছোটজন আবার বলে ওঠে – ‘হ্যাঁ রে, বাবা রাত্রিবেলাই মারা গিয়েছিল না, আমার কথা কিছু তোকে জিগায়নি সেই সময়?’

রোহিণীর চোখ জ্বলে ওঠে, হঠাৎ সে ছুটে গিয়ে বোনের কাছটিতে বসে পড়ে – ‘বোন আমরা এপারে এখনো যারা মনেপ্রাণে বাঙাল, যাদের এখনো ঘটিগুলো কোথাও একটা ছিন্নমূলভাবে তাদের সববাইকে একবার কাঁটাতার খুলে ওইপারে নিতে পারিস না? বাবা কি বলেছিল মরণের আগে, জানতে চাইছিলি না? বাবা বলেছিল, মধুমতি নদীর পারে যাবে, ছট্ফট্ করছিল। আমি বললাম, বাবা এপার-ওপারের মাঝে এখন কাঁটাতার, মধুমতি ইছামতি আর তো এক নেই। সকাল হলেও তোমাকে নিয়ে যাবো কী করে – ভিসা লাগে যে!’

শাহনারা চোখের জল গাল ছাপিয়ে পড়তে দেন না। বলেন, ‘দিদি পশ্চিমের বাংলায় এই আমার শেষ আসা, জিসান – তার ছেলেরা আমায় শাসিয়েছে। বলে আমি যেন আর ঢং দেখিয়ে তোমার কাছে না আসি। ভারত আমাদের আসলে ঠকায় – ভাগের জল দেয় না, ছিটমহল প্রসঙ্গ ঝুলিয়ে রাখে। সবসময় দাদাগিরি! মুখেই খালি বন্ধুত্বের কথা। কাল বাবার মউতের দিনটা পেরোলে পরশুই আমি চলে যাবো রে!’

রোহিণীর চোখ চলে যায় যেখানে কোরান রাখা আছে, সেইখানটায় – চাঁদের আলো এসে পড়েছে কোরানের ওপর, রোহিণী বুঝতে পারেন তার হঠাৎ আসা জ্বরটা বোধহয় চড়চড়িয়ে বাড়ছে। উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যান। শাহনারা দ্যাখে, দিদি অাঁচলের ভেতর থেকে কী একটা বের করে কোরানের পাশে রাখে, একটু পরে দিদি সরে গেলে সে চমকে ওঠে।

রোহিণী আগের মতো এসে বোনের পাশে বসে, বোনকে জড়িয়ে ধরে, বলে খানিকটা ফিসফিসিয়ে – ‘এই বাড়িতে একটাই পুজোর ঘর থাক, বুঝলি। রাতে বাবা মরেছিল, আমার গোঁড়ামিটাকেই মেরে ফেললাম এই রাতেই! তোদের ওইদিক থেকে এখানে যারা থাকতে আসে, তাদেরও আমরা থাকতে দিতে পারি কি, তাদেরও পাততাড়ি গোটাতে হয় নির্বাসনের দ্বীপে। কে জানে, বন্ধুই যদি হবো তাহলে তোদের আমরা আর তোরাই বা আমাদের এত ভয় করে চলবি কেন?’

শাহনারা বোঝে দিদির গায়ে অনেক জ্বর – এ হয়তো জ্বরের প্রলাপ! ‘দিদি চল্, ঘরে শুবি চল্, তোর কৃষ্ণকে আমি আজ আমার কাছেই রাখছি, কাল নিয়ে যাস্! ধর্ম নিয়ে কি ছেলেখেলা করতে আছে?’

রোহিণী হো-হো শব্দে হাসেন – ‘এবার থেকে যাবো তোর কাছে বাবার মৃত্যুদিনে, জিসান যদি তোকে আসতে না দেয়!’ ‘দিদি বাবার জন্য সারাজীবন বিয়ে করলি না, আর কত ছাইচাপা আগুন থামাবি? ছাড়্ তো! আমরা দুবোন যদি আর মিলতে নাও পারি – আমরা যে এক – সে-খবর শুধু একজন তো জানবে?’ – শাহনারা এইটুকু বলে দম নেন।

‘কে রে? কে জানে?’ – রোহিণী একটু নেশামাখানো সুরে জিগ্যেস করেন। ‘দিদি, অ্যাই দিদি, সাহেব বিবি গোলাম মনে আছে, সেই ছবিটা? তুই তো সুমিত্রা দেবীর মতো বললি কথাটা’, দুই বোন একসঙ্গে হেসে ওঠে।

দরজার বাইরে এতক্ষণ আরো একজন নীরব সাক্ষী ছিল দুই বোনের রাতের কথাগুলোর – তুন্নী এবার আস্তে আস্তে তার মিনাখাদির ঘরের দিকে পা বাড়ায়। আজো সে তার নিজের ঘর ছেড়ে এই বাড়িতে চলে এসেছে – যেমন প্রায়দিন আসে। বাবা আজো মায়ের সঙ্গে ঝগড়া জুড়েছে। মাকে মেয়ের বদলে ছেলে কেন দিতে পারে না,সেই নিয়ে কত্ত খারাপ খারাপ কথা বলছে।

বারান্দা ধরে তুন্নী জ্যোৎস্নায় পা ডুবিয়ে হাঁটে আর ছড়া কাটে – ‘শুধু একজন জানে,/বাংলা মিলতে পারে কোনখানে?/ সেই একজন অন্য ঠাকুর বা পীর/ চলতে চলতে আমি যেমন করছি বিড়্বিড়্।’

ওদিকে তখন দিদির অচেতন দেহ কোলে নিয়ে শাহনারা আবার গান ধরেছে – ‘শুধু সে পাখিটি, মুদিয়া অাঁখিটি – সারাদিন একলা বসে গান গাহিতেছে… ফুলটি ঝরে গেছে রে – বুঝি সে ঊষার আলো ঊষার দেশে চলে গেছে।’

বাইরে তখন সকাল হতে ঢের দেরি। তবে এই বাড়িতে আজ রাত থেকে একটাই পুজোর ঘর, নামাজের ঘর – রাত অন্তত তাই জানে!

শেয়ার করুন

Leave a Reply