শৈল্পিক আত্মপ্রকাশ

লেখক:

জাহিদ মুস্তফা

শিল্পের সঙ্গে ঘর করছেন চার দশক ধরে। দেশ-বিদেশে আয়োজিত নানা দলীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন, গ্রম্নপ-শো করেছেন, কিন্তু একক প্রদর্শনী করেননি। এবারই প্রথমবার ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর একক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। প্রচারবিমুখ এই শিল্পী হলেন – সিদ্ধার্থ তালুকদার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৮৪ সালে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষকতায় যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। ১৯৯৯ সালে শিল্পের ইতিহাস বিষয়ে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। বর্তমানে তিনি এই অংকন ও চিত্রায়ণ, প্রাচ্যকলা এবং ছাপচিত্র বিভাগের একজন অধ্যাপক।

শিল্পী সিদ্ধার্থ তালুকদারের প্রথম একক প্রদর্শনীর শিরোনাম – ‘আত্মপ্রকাশ’। তিনি এটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর সদ্যপ্রয়াত পিতা জামালপুরের প্রগতিশীল রাজনীতিক ক্ষিতিশ তালুকদারের স্মৃতির উদ্দেশে।

প্রৌঢ় বয়সে এসে শিল্পীর প্রথম ‘আত্মপ্রকাশ’ প্রদর্শনী শিল্পীমহলে আলোচিত হয়েছে। আমাদের অগ্রজ এই শিল্পীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি চারুকলায় একাডেমিক কাজে, শিল্পের চর্চায় সেই ১৯৭৯ সাল হতে পুরো আশির দশক অবধি, রাজশাহীতে তাঁর শিক্ষকতা করতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। তখন তাঁর একাডেমিক কাজ দেখেছি। বিষয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেটিকে যথাসম্ভব ফুটিয়ে তুলতে তিনি সচেষ্ট থাকতেন। ফলে তাঁর তখনকার একাডেমিক আঁকায় একপ্রকার পরিশীলিত সৌন্দর্য আমরা দেখেছি।

একক আত্মপ্রকাশে বিলম্ব ঘটলেও তাঁর সৃজনকর্মের ধারাবাহিকতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অব্যাহত আছে। কারণ দেশে-বিদেশে নানা যূথবদ্ধ প্রদর্শনী আয়োজনে তাঁর অংশগ্রহণ বরাবরই ছিল। নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন, তবে তাঁর শিল্পভাবনা স্বাচ্ছন্দ্য পায় পেইন্টিংয়ে।

সিদ্ধার্থ তালুকদার মূলত প্রকাশবাদী বিমূর্ত ধারার শিল্পী। বিমূর্ত বলতে চেনা মূর্তিময়তাকে অগ্রাহ্য করা। যত বস্ত্তনিরপেক্ষ বিমূর্ত ঘরানার শিল্পী আছেন দুনিয়ায়, তাঁরা সবাই সবার থেকে আলাদা – ব্যক্তিজীবনে, চিত্রভাষায়, অভিজ্ঞতায়, শিল্পের ইতিহাসপাঠে, রুচিতে, বর্ণপ্রয়োগে, ফর্ম ব্যবহারে। বিমূর্ততায় মুগ্ধ কজন শিল্পী নির্মাণ করেছেন এই শিল্পের মানদ-। তাঁরা হলেন – কান্দিনিস্কি, জ্যাকসন পোলক ও মার্ক রথকো। তাঁদের দেখানো পথ ধরে আধুনিক এই শিল্পরীতি আত্মস্থ করে আমাদের দেশের প্রকৃতি ও রঙের দ্যোতনায় নতুন করে তুলে ধরেছেন এদেশে বিমূর্তশিল্পের পথিকৃৎ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। তারপর আরো অনেক শিল্পীই বিমূর্তরীতির অনুসারী হয়েছেন। এই রীতির অনুশীলন ও চর্চা নানা প্রজন্মের শিল্পীরা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নিজ নিজ সৃজনে মূর্ততার চেনা প্রতিবেশ থেকে চেনা-অচেনা বিমূর্ততার রহস্যময়তায় অবগাহন করেছেন। শিল্পী সিদ্ধার্থ তালুকদার অনুরূপ একজন।

শিল্পীরা বিমূর্ত ছবি আঁকায় আশ্রয় নেন প্রকৃতির। এর রূপ-রং-রস নিয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে মনের ভেতরের অনুভূতিকে মেলে ধরেন চিত্রপটের ওপর, তারপর চলে পরিমার্জনা। আমাদের দেশের বিমূর্তরীতির শিল্পীরা আঁকেন প্রকৃতিকেন্দ্রিক ভাবনা ও চেতনাকে সঙ্গে করে। বাংলাদেশের ছয় ঋতুতে প্রকৃতির সদরে-অন্দরে যে পরিবর্তন ঘটে তার সঙ্গে শিল্পীমনেও এই পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়। এই প্রকৃতির মাঝেই জীবনব্যাপী মানুষের অধিবাস। এখানেই জন্মেছেন সিদ্ধার্থ। এ দেশের প্রকৃতি, জল-হাওয়া, কাদামাটিতে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা; এই নিসর্গের রং ও ফর্ম তাঁকে দিয়েছে শিল্পের চৈতন্য।

পলিমাটির দেশে জনম, সেখানে শৈশব-কৈশোর কাটানো  তারপর বরেন্দ্রভূমিতে দীর্ঘকাল বসবাস – এ দুই অঞ্চলের সঙ্গেই তাঁর সখ্য। তাঁর ছবির দিকে তাকাই, দেখি পলিমাটির পেলব চেহারা। আবার চৈত্রের নিদাঘে সেই মাটির রুক্ষতা কী রূপ নেয় সেটিও তিনি বিবৃত করেছেন তাঁর আঁকায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভারিমাটির কাঠিন্যকেও স্থৈর্যের প্রতীক হিসেবে শিল্পী তুলে এনেছেন তাঁর চিত্রকর্মে।

আকাশনীল বর্ণযোজনায় চাঁদের আলোয় পরিভ্রমণের সৌন্দর্যময় অনুভূতি আমরা অবলোকন করি শিল্পী সিদ্ধার্থের চিত্রপটে। এ-কাজটির শিরোনাম রেখেছেন – চন্দ্রালোকে নিসর্গ। আকাশে গোলচাঁদ, তার নিচে শস্যক্ষেত্র পেরিয়ে দিগন্তরেখা আর একেবারে নিচে স্ফীত এক নদীবক্ষ। বিমূর্ততার ঘেরাটোপে শিল্পী তো নিসর্গচিত্রই এঁকেছেন।

ভূ-দৃশ্য শিরোনামে মিশ্রমাধ্যমে শিল্পী রাঢ়বঙ্গের সেচনির্ভর শস্যক্ষেত্র এঁকেছেন। জমিনে নানাবর্ণে নানা রেখার কারিকুরি ও গতায়াত, শিল্পী সেই মাটির বৈশিষ্ট্য তার রূপবৈচিত্র্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। কখনো কাগজে, কখনো ক্যানভাসে হালকা রঙের ওয়াশ দিয়ে জমি তৈরি করে খড়িরঙের প্রলেপ দিয়েছেন, এরপর দিয়েছেন চারকোল রেখার আঁকাবাঁকা টান। কম সময়ে, স্বল্প ফর্ম ও রেখায় ভূমির অবয়ব তুলে ধরেছেন শিল্পী এই সিরিজে।

কতক চিত্রের গড়ন গঠন এমন যে, মনে হয় এসব চিত্র যেন জড়জীবনের বিন্যাসে আঁকা। যেমন শিরোনামহীন সিরিজের কাজগুলোর কথাই ধরা যাক, পুরনো স্থাপনা ভেঙে যাওয়ার মতো রূপ তুলে ধরেছেন শিল্পী এই চিত্রমালায়। ক্যানভাসে তেলরঙে ভেতরের আঁধার থেকে সামনের ফর্মকে শিল্পী তুলে এনেছেন উজ্জ্বল রঙের বাহারি স্ট্রোকে। অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা শিরোনামহীন-৮ শীর্ষক চিত্রটি আলোছায়ার চমৎকারিত্বে, বর্ণবিভায় ভারি মিষ্টি একটি কাজ। ক্যানভাসের কেন্দ্রস্থলে সোনালি আভার এক বর্ণমাস্ত্তলের ওপর বড় গোল চাকতির ফর্ম, সেটির মাঝামাঝি অনুভূমিক আলোর উৎসারণ আর ওপরে ও নিচে নীলাভ বর্ণের অতল গভীরতা।

সমান দুটি ক্যানভাস জোড়া দিয়ে জেনোসাইড শিরোনামে সাদাকালো, লাল-হলুদ আর সবুজের প্রয়োগে ছবি এঁকেছেন, যেটি দর্শক অনুভূতিকে নাড়া দেওয়ার মতো। এটি মনে করায় বাঙালির রক্ত আর ত্যাগের স্বাধীনতা, গণহত্যার একাত্তর। বেশ কতক অবয়বিক ছবিও এঁকেছেন শিল্পী। ফলে বৈচিত্র্য এসেছে দেয়ালে। r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার