শ্রীমতীর আর্তস্বর

লেখক:

মুস্তাইন সুজাত

পরপর যে-পাঁচটা মঠ দাঁড়িয়ে আছে গাঙকিনার-ঘেঁষে ভাটিতে, সেগুলোর গা থেকে আস্তর এই পরিমাণে খসে পড়েছে যে, মরা কাছিমের পিঠের মতো ছালছোবড়া উঠে গেছে। গোড়ার দিকটায় আকন্দ পাতা আর নিমুইন্দার ঘন জঙ্গল। মাঝের উঁচু মঠের গায়ে খোদাই করে লেখা শ্রীমতী সরজাবালার নামটা প্রায় অস্পষ্ট এখন, তবু আবছা আবছা চোখে পড়ছে। যারা মঠগুলোর সঙ্গে পরিচিত, মানে এ-অঞ্চলে যাদের বসতি, তারা জানে, সরজাবালার ডানে রয়েছে কমলা-নির্মলা আর বাঁয়ে শ্যামলা-রূপক। অন্যদের বাঁশঝাড়ের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে বেশ কায়দা করে, গু-মুত মাড়িয়ে, জঙ্গলের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে চোখ রাখতে হবে মঠের গায়ে – তবেই নামটা দেখতে পাবে।

জীবিতকালে শ্রীমতী সরজাবালাকে তার রূপ নিয়ে কেউ কিছু বললেই মুখ ঝামটা দিয়ে যখন বলত রূপের বালাই ষাট – ঘটনা তখনকার।

বিগতযৌবনা সরজাবালার দেহরূপে তখনো চোখ ঝলসায়। শেষবেলায় এসেও যেন কাঁচা হলদি রং ঠিকরে ঠিকরে ঝরে গতর থেকে। পাড়াত নারীরা ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয় আর সমবয়সী সইদের ঈর্ষা যেন বাঁধ মানে না, ভিসুভিয়াসের লাভার মতো উতলায়। পুরুষমাত্রেরই গোপন অভিলাষে ঝড় বয়। নিজের পুরুষেরও কি এমন হতো না এককালে? সে-ভাবনায় ভাটা পড়েছে অনেকদিন।

তবে সরজাবালা ভগবানকে শাপান্ত করে সকাল-সন্ধ্যা।

কারণ সরজাবালার প্রতি তার ভগবান একটু বেশিই নিষ্ঠুর। উপেক্ষা যেন জীবনপরতের কোনা-কাঞ্চায়, প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে। একদিকে হিঁদু সমাজের নিম্নবর্ণের পদটা তার দখলে, অন্যদিকে স্বামী শশধরের ছিল ভাদাইম্মা জীবন। রুজি-রোজগারের ধান্ধাফান্দা কোনোকালেই ছিল না আফাইত্যা লোকটার, শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিয়েছে গোটা জীবন। ‘ছিল’ বললাম এ-কারণে যে, শশধর এখন আর বর্তমান নেই, লাপাত্তা। শশধর এখনো বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, তা জানে না সরজাবালা। জানার কথাও নয়। সে কি আর বলেকয়ে গেছে? সেই কবে একদিন সন্ধ্যার ঘুটঘুটে আন্ধারে টুক করে হারিয়ে গেল শশধর। গেল তো গেল, আর ফিরল না। কত তলস্নাশি, কত খোঁজাখুঁজি, কত অপেক্ষা! রাত গিয়ে দিন ফেরে, মাস গিয়ে মাস ফেরে-বছর ফেরে, শশধরের আর ফেরা হয় না। ‘ছিল’ সময়ে যাও একজন পুরুষমানুষ ছিল মাথার ওপর, যেদিন বুঝল শশধরের আর ফেরা হবে না, সেদিন থেকে সরজাবালার অভাগী জীবনের যেন ষোলোকলা পূর্ণ হলো।

তবু সব দুঃখ, সব অভিমান গলে যায় এক জায়গায়, সরজাবালা যখন একজন জননী হয়ে ওঠে তখন। যখন তিন মেয়ে আর এক  ছেলে তার জীর্ণ আঁচলতলে কাতরায়, যখন ওরা গতরের উম নেয় তখন। মেয়েরা মায়ের মতো অসম্ভব রূপবতী। আশ্চর্য খেয়ালের বিষয়, এই পরিবারে রূপের সঙ্গে অর্থ-বর্ণে যেন সাপে-নেউলের পরম শত্রম্নতা! একটা উত্তরে হলে অন্যটা দক্ষিণে, একটা ভাটিতে হলে অন্যটা উজানে। সরজাবালার বয়সটা স্রোতের টানের দিকে, ফলে নিজেকে নিয়ে তেমন ভয় নেই তার কিন্তু মেয়েদের এই আগুনরূপই যত ভয়ের মূল। কতজনা যে আসে এই রূপসাগরে নাইতে, আর কতজনা যে আসে ডুবতে – তার কি হিসাব মেলে এক জীবনে? নাকি মেলানো যায়? মাথার ওপর নাই পুরুষমানুষ। চারদিক থেকে কত ঝড়ঝাপটা ধেয়ে আসে!

ছেলেটা যখন কোলে আসে সরজাবালা তখন পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশে। বড় মেয়ে কমলা তখন পনেরোতে, তেরোতে নির্মলা আর শ্যামলার এগারো। ছেলেকে পৃথিবীর মুখ দেখানোর পরই যেন সরজাবালার সব দায়িত্ব শেষ। ছেলেকে নিয়ে তেমন ভাবতে হয়নি তাকে। তিন দিদির কোলে চড়ে চড়ে রূপকের হামাগুড়ি থেকে বয়স ছয়ে পৌঁছা।

 

দুই

বর্ষায় ধুপাজুড়ি বিল যখন কলকলিয়ে ওঠে আর আসেত্ম আসেত্ম বিলের বিস্তার বাড়তে থাকে, তখন দেওয়ানবাজার-নিদারাবাদ-বুল­v-পাইকপাড়া-শ্যামরা-মানিকপুর-জগৎপুর হয়ে পুরো ভাটি অঞ্চলটা জলচাপা পড়ে। বর্ষার এই জলকে স্থানীয় ভাষায় বলে বাইশ্শার জল। এই জল হুট করেই ঢুকে পড়ে ময়ালে, বৃষ্টির জমাট জল আর ধুপাজুড়ির জলের সঙ্গে মিশে গিয়ে স্থির হয়। জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে একটু একটু করে জমতে থাকা এই জল আষাঢ়ে যেন কানায় কানায় পূর্ণতা পায়। তখন মরা মহিষের পেটের মতো ফুলে ওঠা জলমগ্ন ময়াল যেন উপচায় চারিধারে। এই জল ভাদ্রেও থাকে একই মাপে। শুধু রং বদলায় আকাশের রঙের সঙ্গে। ধূসর-বাদামি-নীল। বানের শুরুর দিকের ঘোলা জল কিছুদিন পর হয় স্বচ্ছ। পাতা-আবর্জনা পড়ে পচে পচে স্বচ্ছ জল কালচে খয়েরি রং ধারণ করে। এই জল গতরে লাগলে চুলকায়, পায়ে মাড়ালে ঘা হয়। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে সেই ঘা চুনসাদা হয়ে থকথক করে। এই জল কেটে ডিঙিও চলে অতি সাবধানে।

জলের পরিমাণ এক থাকে ফি-বছর। এমনকি বাইশ্শাকালেও জল ওঠানামা করে। কোনো কোনো সময় হাতচারেক ছাড়িয়ে যায় উচ্চতায়। আর তখন চারদিকে শুধু পোক্ত পাটগাছের হলদে-সবুজ ঝুপড়ি নজরে পড়ে। সারা কা- পানির নিচে চুবানো, মাথার পাতাগুচ্ছ যেন দোল খায় বাতাসে। আউশ ধান ডুবে গিয়ে শাপলার দাম বাঁধে ময়ালজুড়ে। উজান থেকে আসা যে-গাঙটা চলে গেছে দেওয়ানগঞ্জ-বুল­v-শ্যামরা হয়ে বুধন্তির দিকে, বছরের বাদবাকি পুরোটা সময় তার অসিত্মত্ব সরব থাকলেও এই জলাবদ্ধতায় খুঁজে পাওয়া যায় না। ময়ালের জল, বিলের জল আর গাঙের জল একাকার হয়ে মিশে যায়। এখানে যাদের স্থায়ী বাস অনেক বছর ধরে, কেবল তারাই বোঝে গাঙের সঠিক নিশানা। তাও খুব সন্তর্পণে খেয়াল করলে দেখা যায়, কোনো কোনো স্থানে ধীরগতিতে চলমান ঘোলা জলের প্রবাহ আর তা লক্ষ করে নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে লম্বা লগি ডুবালেই কেবল গাঙের গহিনতা টের পাওয়া যায়। এই গহিনে ভর করেই গাঙ যেন তার অসিত্মত্ব জানান দেয় ভরামৌসুমে।

বেশ কদিন ধরে গাঙে গহিন জায়গা খুঁজছিল একটা ছোট্ট পালের নৌকা আর তার দুজন চালক। এখানে-ওখানে লগি ডুবিয়ে জলের গভীরতা মাপে বলে সন্দেহ হয় দূর থেকে। গহিনের সঙ্গে সঙ্গে যেন নিরাপদ হয় জায়গাটা, তাও বোঝা যায় যখন কলমি দামের ভেতর নৌকা ঠেলে। এমনিতেই বর্ষাকালে এ-অঞ্চলের মানুষের নৌকায় চড়ে যাতায়াত করতে হয়। পালের নৌকা, পানসি নৌকা, শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকাসহ আরো নানা ধরনের নৌকা দেখা যায় ময়ালে। তালগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি বিশেষ রকমের ডিঙি নিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে যেখানে-সেখানে ঢুকে পড়ে শাপলা আর শালুকের খোঁজে। হয়তো ছেলেমেয়েদের এই উৎপাত এড়িয়ে যাওয়ার জন্য পালের নৌকাটার নিরাপদ গহিনের সন্ধান করা। যে-পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করবে বলে তাদের ইচ্ছা, এর সঙ্গে পালের নৌকাটার অযথা ঘোরাঘুরির একটা পারস্পরিক সম্পর্ক আছে। তারা মাঝে মাঝেই একটা বাড়িকে লক্ষ করে চক্কর কাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শিস তোলে ঠোঁটে।

গাঙের খাড়া পাড় বেয়ে বেশ খানিকটা উজানে গেলে মানুষের বসতির শুরু। চারপাশ গাছপালায় ঘেরা, লাল মাটির একাধিক ঘর ছড়ানো-ছিটানো। দূর থেকে দেখেই বোঝা যায় দেয়ালগুলোতে দারিদ্রে্যর ছাপ স্পষ্ট। নৌকা নিয়ে ওধার ঘেঁষলে আগর আর ধূপের গন্ধ নাকে লাগে। তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলে প্রতি সন্ধ্যায়। উলুধ্বনির সঙ্গে শঙ্খের আওয়াজ ভাসে গাঙের বাতাসে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ছড়িয়ে যায় অনেকটা দূর পর্যন্ত। অপরিচিত কাউকে বলে দিতে হয় না যে, এই বাড়িগুলো হিঁদুদের। আপনাই জানা হয়ে যায়। তারও কিছুটা উজানে কৈবর্তপাড়া। কৈবর্তপাড়াকে ডানে রেখে মুসলমানপাড়া অনেকটা বিসত্মৃতি নিয়ে। এ-পাড়ায় ঢোকার মুখে বাঁদিকে শ’সালের পুরনো গম্বুজওয়ালা আধাপাকা মসজিদ এখন কেবল মুসলমানি নিশানা। বাদবাকি কৈবর্তপাড়া-মুসলমানপাড়া শ্রীহীনতা আর উদোম দৈন্যে মিলেমিশে একাকার। দারিদ্রে্যর অর্ধ-উলঙ্গ পোশাক আর নেংটি পরে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ঘুরে বেড়ায় এ-পাড়ার রাস্তায়, বর্ষার কাদাজলে মাখামাখি হয়। ও-পাড়ায়ও একই চিত্র। তবে এখানে যারা বাস করে তারা মুসলমান হলেও অধিকাংশই মাছধরা পেশার সঙ্গে জড়িত। কিছু লোকজন যারা সরাসরি নিজেরাই জাল দিয়ে মাছ ধরে, তারা কৈবর্ত বনে যায় স্ব-ইচ্ছায়। সমাজের যে-শ্রেণিতে গিয়ে মানুষে-পশুতে ভেদাভেদ থাকে না – কেবল বেঁচে থাকাটাই হয় জীবনের ধ্যান – এই গাঙপাড়ের সমাজ ওদের ঘিরেই। মুসলমানপাড়ার যে দু-চারটা পরিবার মোটামুটি সামর্থ্যবান গেরস্ত, পালের নৌকায় ঘুরে বেড়ানো দুজনের একজন কানু মিয়া তাদেরই কোনো এক পরিবারের সদস্য। অন্যজন হিঁদুপাড়ার করম দাস। করম দাসের দাদা-পরদাদা ছিল পেশায় মুচি। বড় হয়ে করম দাসও মুচির কাজটাই বেছে নিয়েছে।

 

তিন

সরজাবালার বাড়িটা ঠিক গাঙপাড় ঘেঁষে উজানে। এমনিতেই জ্যোৎস্নারাতে গাঙের দশা হয় দেখার মতো। আর যদি তখন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি থাকে আর বিদ্যুৎ চমকায়, যেন উছলে ওঠে গাঙ। ভাঙের নেশায় বুঁদ হয়ে যেন গাঙ মাতলামি করে। আর ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে ফেলে পাড়ে। ঢেউ ভাঙার শব্দ, ঢেউয়ের ওপর
বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার সৌন্দর্যে মনে ভাব জাগে। চাঁদের রুপালি আলোয় চিকচিক করা গাঙের ঢেউগুলোয় রাজ্যের মোহনীয়তা লুকিয়ে থাকে। তার ওপর সরজাবালার মেয়েদের উচ্ছ্বাসে, কলহাস্যে গাঙ যেন আরো খলখলিয়ে ওঠে। মেয়েদের এই উচ্ছ্বাস ভালো লাগে না তার। নানা কিসিমের ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়।

সরজাবালার বড় মেয়ে কমলা ছিল মুচির বেটা করম দাসের স্বপ্নকুমারী। ছোটবেলার খেলার সাথি ওরা। একসঙ্গে স্কুলে গিয়েছে, পাশাপাশি বসেছে। সেই থেকে একতরফা ভালোবাসা করম দাসের। কমলার চাহনিতে কি তার প্রতি ফিরতি ভালোবাসা এক পলকের জন্যও ঠিকরে পড়তে দেখেনি? দেখেছে করম, নিত্যই দেখেছে। দেখেছে বলেই তো কতবার সে কমলাকে যে ভালোবাসে কথাটা বলতে চেয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন যেন বলা হয়ে ওঠেনি। ভেবেছে, একেবারে বিয়ের পাকা কথাই বলতে পাঠাবে বাপকে। কিন্তু আট ক্লাস পাড়ি দেওয়া কমলা, সে কি মুচির ছেলে মুচিকে বিয়ে করবে? আর করম দাস, সেও কি কমলা বিহনে একদিনও বাঁচতে পারবে, নাকি একবেলা? এসব জট-পাকানো চিমত্মা করমকে স্বসিত্ম দেয় না। দিনরাত ভাবে আর ভাবে। দেওয়ান বাজারে আসা যাত্রাপালা কমলার বনবাস দেখতে গিয়ে যেন অদৃশ্য কষ্টের ফাঁস লাগে তার গলায়। সেই ফাঁসে করম হাঁসফাঁস করে।

করম দাসের সঙ্গে কমলার কিন্তু বিয়ে হয় না। হঠাৎ এক বিহানে কোথাকার কোন এক অজানা-অচেনা লোক এসে কমলাকে বউ করে নিয়ে গেল চোখের সামনে, করম কিচ্ছু করতে পারেনি। এই যে কমলার সঙ্গে তার বিয়ে হয়নি তা বলে সে কিন্তু মরেও যায়নি। দিব্যি হেসেখেলে বেঁচে আছে করম। দিন যাচ্ছে তার আগের মতোই। মুচিগিরি করছে, দু-পয়সা রোজগার করে বাপের হাতে তুলে দিচ্ছে। তবে কমলাবিহনের কষ্টের চেয়েও তার বাপকে ফিরিয়ে দেওয়ার অপমান করম সয়ে বেড়াচ্ছে। সরজাবালা তার বাপকে এভাবে অপমান না করলেও পারত।

জুতা সেলাই করতে গিয়েই কথায় কথায় কানু মিয়ার সঙ্গে ভাব হয় করমের। কানু মিয়া বিবাহিত, দুই সমত্মানের জনক। তার মেয়েটা বছরদশেকের আর ছেলেটার বয়স সাতে। বয়সের দীর্ঘ ফারাক থাকা সত্ত্বেও কানু-করমের এই ভাব গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয়। কানু মিয়া খুব সুবিধার লোক নয় জেনেও করম মেশে তার সঙ্গে। কানু মিয়াও প্রায় ছেলের বয়সী করমকে বন্ধু বানায়। এই বন্ধুত্বের পেছনে থাকে নিজেদের গোপন বোঝাপড়া। কানুর যেমন প্রয়োজন করমকে তেমনি করমেরও কানুকে। অবশ্য চলাফেরা আর মেশামেশিতে কেউ কাউকে ঠাহর করতে দেয় না ব্যাপারটা।

 

চার

বিকেলের দিকে খুব একটা কাজ থাকে না করমের। সপ্তাহে দুটো হাটবার বাদে বাকি দিনগুলোতে কানু মিয়ার নৌকায় ঘুরে বেড়ানো এখন তার নিত্যরুটিন। নৌকা ভাসিয়ে কানু যখন দাঁড় বায় করম তখন হুক্কা সাজায়। আবার করম দাঁড় টানে কানু গান ধরে। কানু মিয়ার নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দকে ভর করে এই গান গিয়ে ঠেকে সরজাবালার মাটির ঘরের দেয়ালে। তখনই ওইখানে একটা সুন্দর মুখের উঁকিঝুঁকি দেখা যায়। করমের মুখে বাঁকা হাসি ফোটে। আর তেরছা দৃষ্টিতে দেখে নেয় কানু মিয়াকে। কানু মিয়ার মন মজে ভবতরঙ্গে, যেন সাধ জাগে সাঁতরে গাঙ পাড়ি দেওয়ার দৃপ্ত বাসনা। আর করমের মনের ভেজা ক্ষত গাঙের বাতাসে আরো আউলা হয়। সেই ক্ষত শুকানোর অপেক্ষায় করম দাঁতে দাঁত চাপে। দীর্ঘদিন চলাফেরায় কানু-করমে আপনাই বুঝে গেছে দুজনের চিমত্মাভাবনা, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন হলেও গন্তব্য এক।

নির্মলাকে দূর থেকে দেখেই যেন কানু মিয়ার ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়। গান থেমে যায়, নৌকার পাল বাতাসে টানে, কোনাকুনি ছোটে। গত সাত-আট মাস ধরে দেখাদেখির খেলা চলছে তাদের মাঝে। দু-একবার কথা বলতে গিয়েও কানু মিয়া সাহস পায়নি। বিবাহিত মানুষের বড় ভয় ঘরের বউ। আর গাঙপাড়ের মানুষ যারা, গাঙ যেন নিত্য টানে তাদের। সব বয়সীকে, নারী-পুরুষদের, শিশু-বৃদ্ধ-জোয়ানদের। সে-টানেই বোধহয় কানু মিয়ার বউটা মাঝে মাঝেই গাঙে আসে। সরজাবালার বাড়ির পেছনে লাগোয়া ঘাটে বসে ঘষে ঘষে উদোম পিঠের ময়লা তোলে। মনে হয় বুঝি রাজ্যের সব ক্লান্তি আর গস্নানি ধুয়েমুছে সাফ করে দেবে একেবারে। বউকে খুব ডরায় কানু মিয়া। বউয়ের কথা মনে পড়তেই কানু মিয়া মিইয়ে যায় একেবারে। ছালছাড়া বাঘিনির হুঙ্কার কানে বাজতে থাকে তার। কানু মিয়ার দমে ভাটা পড়ে।

দিন যায় মাস যায়। বছরের চাকা ঘোরে। নির্মলাকে না পাওয়ার বেদনা-কস ঝরে কানুর মনে। ততদিনে গাঙ আবার জেগে ওঠে। বানের পানি ধীরে ধীরে নেমে যায় রোগ-শোক ছড়িয়ে। মহামারিতে প্রতিবছর এখানে মড়ক লাগে মানুষে-পশুতে। তখন আকাশের কূলঘেঁষে শত শত ক্ষুধার্ত শকুনির ডানা মেলা বিস্তার চোখে পড়ে। ফাঁকা জায়গায় ফেলে রাখা মৃত পশুপাখি নিয়ে তাদের মধ্যে আহারের বাটোয়ারা চলে। আর কানু মিয়ার হৃদয়ে হাহাকার জাগে।

বর্ষা গিয়ে বর্ষা আসে।

এক বর্ষার বিকেলে পালতোলা ছোট্ট নৌকাটা ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, অনেকক্ষণ। জায়গাটা বেশ নির্জন, নৌকাও খুব একটা আসে না এখান দিয়ে। গাঙপাড়ের বন্য ঝোপঝাড় যেন আরো বেশি আড়াল করে রেখেছে। ওরা নিশ্চুপ গহিনে সেঁধিয়ে যায়। নৌকায়ও শব্দ হয় না। শুধু দুজন লোককে দেখা যায় আবছা, বসে আছে মুখোমুখি। সন্ধ্যা আরো ঘনিয়ে এলে চারদিকের নিস্তব্ধতা জোরদার হয়। দূরে কখানা নৌকার আলো দেখা যায়। এগিয়ে আসে তাদেরই দিকে। ঢেউ লাগে নৌকার গলুইয়ে। ঢেউ জাগে জলে। নৌকা দোলে একটু একটু করে। কাছে আসতেই টর্চের আলোয় সংকেত বিনিময় হয়।

এই গাঙপাড়ের সমাজে ঘুম আসে অনেকটা আগেভাগেই। রাত বাড়ে আর এক এক করে সবাই ঘুমের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হিঁদুপাড়া, কৈবর্তপাড়া আর মুসলমানপাড়ার ঘরে ঘরে জ্বলা কুপি-হারিকেনের সলতে নিভে যায় আসেত্ম আসেত্ম।

নৌকায় চুপচাপ বসে ওরা নীরবতায় প্রহর গুনে। ইশারা পেতেই কানু মিয়ার নৌকাটা দুলে ওঠে। পরপর পাঁচটা নৌকা ভেড়ে সরজাবালার বাড়ির পেছনের গাঙঘাটে। মুখোশধারী মোট সাতজনের দলটা সরজাবালার বাড়িতে ঢোকে। অপারেশনটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে যে, কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সরজাবালাদের চিৎকার পাশের বাড়িতেও পৌঁছায় না। কাজশেষে নৌকা করে সবাই জড়ো হয় গহিনের জায়গাটাতে। কিছুটা সময় নেয় ওরা। অবস্থা দেখে এগোয়। কেবল কানু মিয়ার নৌকাটা থেকে যায়, বাকিগুলো আসেত্ম আসেত্ম মিলিয়ে যায় দূরে।

পরদিন সকালে একটা খবর ত্বরিত ছড়িয়ে যায় পাড়ায় পাড়ায়, সরজাবালারা সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে রাতের আঁধারে, হিঁদুর দেশ ভারতে। নানাজনের মুখে নানা শঙ্কার কথা। কোনো কোনো হিঁদু বুক চাপড়ায় নিজেদের ভবিতব্যের কথা চিমত্মা করে। কেউ কেউ সরজাবালাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বেশ সুখীই হয়। আর কানু মিয়া দলিল দেখায় বাড়িঘর কিনে রাখার। সরজাবালার টিপসইসহ দলিল, করম দাস সাক্ষী কেনাবেচার। অবিশ্বাস করে না কেউ। এদিকে পানি নেমে গেলেই গাঙপাড়ের বড় জমিটায় হাল জুতবে, যেন আর তর সয় না করম দাসেরও।

 

পাঁচ

বাইশ্শার জল কমতে শুরু করলে পাটগাছের পুষ্টপ্রায় উলঙ্গ দেহ প্রকাশ পায় খয়েরি-সবুজ শ্যাওলা জড়িয়ে। গাজী মাস্টার প্রতিদিন ডিঙি করে স্কুলে যায় এই ময়ালের ওপর দিয়ে। বারো বছরের নাতিকে নিয়ে ফতেহ মিয়া ডিঙি বায়। নাতিটা স্কুলে পড়ে। গাজী মাস্টারের সঙ্গে আসা-যাওয়া করে। শাপলার ডগা আর শালুক দেখলে মিয়ার নাতিটার চোখে খুশি খেলে যায়, ডিঙি থেকে লাফ দিতে চায়। আজ একটু তাড়া আছে গাজী মাস্টারের। কথামতো ধুপাজুড়ি বিল-কোনাকুনি নৌকা ছোটায় ফতেহ মিয়া। একটা নির্জন জায়গায় রক্তলাল শাপলা ফুল দেখে ফতেহ মিয়ার বয়সী চোখও চিকচিক করে ওঠে। লোভে পড়ে যায় ফতেহ মিয়া, মাস্টারকে পৌঁছে দিয়েই শালুক তুলতে আসবে এখানে। আহা, কতদিন এরকম ফুল দেখে না! সামনে লগি ঠেলে সে। একটু এগোতেই বুঝতে পারে তার লগি যেন কিসের সঙ্গে আটকে যায়।

– স্যার, লগি কিতানো যানি বাড়ি লাগলো? দেহুম না কিতা ফানিত লাইম্যা?

– বাঁশটাস অইব মিয়া। নাওডা ইকটু কাইট্টা নেউ। ইস্কুলের দেরি অইয়া যাইতাসে গা।

আবারো ঢং করে শব্দ হয়, ফতেহ মিয়া ঠিক বুঝতে পারে।

– বাঁশ না স্যার, মনয় অন্য কুস্তা অইব।

শব্দটা যে গাজী মাস্টারেরও কানে যায়নি তা না; কিন্তু তার একটু তাড়া আছে আজ। অন্য সময় হলে নিজেই নেমে যেত জলে কিন্তু আজকে কিনা শিক্ষা কর্মকর্তা স্কুল ইন্সপেকশনে আসবেন, একটু সকাল সকাল পৌঁছাতে হবে। ফতেহ মিয়া মাস্টারের আদেশের তোয়াক্কা করে না। তার মনে সন্দেহ হয়েছে, তাই কী আছে জলের নিচে দেখা চাই। গাজী মাস্টারও দেখে, ডিঙি ততক্ষণে দাঁড়িয়ে গেছে আর শীর্ণ হাতে ফতেহ মিয়া লগি ঘোরাচ্ছে ডিঙির চারদিকে। লগি ঢং করে একবার বাড়ি খায় আর শব্দটা জলের নিচ থেকে ওপরে উঠে যেন ছড়িয়ে যায় বাতাসে। একবার-দুবার-তিনবার ঢং ঢং ঢং। দুরন্ত সাহসী নাতিটা আগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।

– মিয়া তাড়াতাড়ি করবা কইলাম। ফানিত লাইম্যা দেহ কিতা ইডা।

দাদা ডাক ছাড়ে,

– অ নাতি, লগি কিয়ের মাইজ্জ্যে বাড়ি খাইতাসে রে দেকসাইন ফানিত লাইম্মা।

বলেই ফতেহ মিয়া লগি পোঁতে নরম কাদায়। ডিঙি বাঁধতে দেরি হয়, বেপরোয়া নাতির জলে ঝাঁপাতে দেরি হয় না। গাজী মাস্টার হায় হায় করে ওঠে। লাফ দিয়ে জলে পড়ে আর ছিটকা জল পড়ে ডিঙিতে। নিদারুণভাবে ভিজে যায় ফতেহ মিয়ায় লুঙ্গিটা। নাইলনের ফ্যালফ্যালে লুঙ্গি, যেন একটু টানেই ছিঁড়ে খানখান হয়ে যাবে। রাগে গালি দেয়,

– হালার হালা। হারামজাদা কোনহানের। তর সয় না এক্কেবারে।

ডুব দিয়ে অল্প পরেই ভয়ার্ত চোখে জলের ওপর ভেসে ওঠে নাতি, ভুশ ভুশ করে নিশ্বাস ছাড়ে। গাজী মাস্টার ও ফতেহ মিয়া ভয় পেয়ে যায়। সস্নেহে নাতিকে টেনে ডিঙিতে তোলে। এবার বোল পালটায়।

– ও নাতি, কিতা দেখছত নিচে?

– ডাম। দাদা, তেলের ডাম। কেডা জেনে বাইন্দা রাকসে খুডির মাইদ্যে।

– ধুর, ইতা কিতা কস? তেলের ডাম ইগানো বানবো কেডা?

নাতি উত্তর দেয় না। দীর্ঘ দম ফেলে জিরায়। ফতেহ মিয়া শীর্ণ হাতে ভেজা লুঙ্গিটা মালকোঁচা মারে। ডিঙি কাত হয়, সে পানিতে নামে। তাই তো, মোটা মোটা তিনটা বাঁশের খুঁটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে তিনটা ড্রাম বাঁধা!

 

ড্রাম

থানায় খবর যায়, পুলিশের লোক আসে ভ্যানভর্তি হয়ে। হইহই করে যখন ড্রামগুলো তীরে ভেড়ানো হয় তখন ভাটিদুপুর। সরজাবালার উঠানে ড্রামের মুখ খোলা হয় এক এক করে। আর লবণ-মেশানো রক্তপানি গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে গাঙের দিকে। মাংস পচা তীব্র গন্ধে উপস্থিত লোকজন নাক চাপা দেয়। আর শ্রীমতীদের শূন্য করোটিরা ঠোকাঠুকি করে উঠানে। হাহাকার ওঠে ভিড় করা মানুষের মাঝে।

সেদিন বিকেলের পর থেকে করম দাসকে খুঁজে পাওয়া যায় না আর। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply