সবচেয়ে সুন্দর করুণ

লেখক:

আ হ মা দ  মো স্ত ফা  কা মা ল

এই অবেলায় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টিতে এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু। এটা বৃষ্টির ঋতু নয়, যে-কোনো সময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামার কথাও নয়, ঝড় তো দূরের কথা। বৃষ্টির দিনে প্রস্ত্ততি থাকে সবারই, এখন কারোরই নেই। এটুকু পথ আসতে-আসতে তাই ভিজে একাকার হয়ে গেল সুমন। বৃষ্টিবাদলের দিনে রিকশায় যেমন পলিথিনের পর্দা থাকে, একটু ঢেকেঢুকে বসলে খানিকটা বাঁচানো যায় নিজেকে, এখন তা নেই, থাকার কথাও নয়, কোনো রিকশাওয়ালাই এই সময়ে পর্দা রাখে না, যেমন সে রাখে না ছাতা, যদিও বর্ষাকালে সেটি সঙ্গেই থাকে। টুকিটাকি বেশকিছু কাজ জমে আছে, আলস্যের জন্য করাই হচ্ছে না। সুমন ভেবে রেখেছিল – আজকে বাসায় ফেরার আগে কাজগুলো সেরে যাবে, কিন্তু তা বোধহয় আর হলো না। এই ভেজা কাপড়ে কতক্ষণই বা থাকা যাবে? একবার বাসায় চলে যাওয়ার কথা ভাবলেও পরমুহূর্তে মত বদলালো সে। কাজ ফেলে রাখলে এরকম ঝামেলা লাগেই, করা আর হয় না। কালকে করবো ভেবে যতোদিন কোনো কাজ ফেলে রেখেছে, ততোদিন

কোনো-না-কোনো ঝামেলা এসে হাজির হয়েছে। বাসায় না ফিরে সে তাই মাঝপথেই নেমে পড়লো। নামলো বটে, কিন্তু আবার দাঁড়িয়ে পড়লো সেখানেই। দেখলো – দূর থেকে হেঁটে আসছে একটা মেয়ে, খুব চেনা ওই হাঁটার ভঙ্গি। একটু এলোমেলোভাবে পা ফেলে হাঁটা, যেন দ্বিধান্বিত, নিজের অজান্তেই ভেবে চলেছে – কোথায় পা ফেললে পথ ভুল হবে না! কিন্তু ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই পা পড়ছে আপন নিয়মে, আবার সেই দ্বিধা, আবার সেই এলোমেলো পা ফেলা! হ্যাঁ, খুব চেনা ওই ভঙ্গি; কিন্তু চেনা যাচ্ছে না কেন? বৃষ্টিতে শাড়িটা ভিজে লেপ্টে আছে শরীরে, মাথায় ধরে রাখা ছাতাটা প্রায় নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, ওটা যে আদৌ কোনো কাজে লাগছে তা-ও মনে হচ্ছে না, তবু সেটি গুটিয়ে রাখছে না মেয়েটি। যেন ওই নড়বড়ে বস্ত্তটিই তার একমাত্র অবলম্বন, তার আশ্রয়। হয়তো মানুষের কৌতূহলী চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। ঝড়-বৃষ্টির রাস্তায় মানুষ প্রায় নেই, রিকশাগুলোও থেমে আছে, লোকজন আশ্রয় নিয়েছে দোকানে-মার্কেটে-মসজিদে। তবে গাড়িগুলো চলছে দাপটের সঙ্গে – পানি ছিটিয়ে, বৃষ্টিভেজা নির্জন পথ নিশ্চয়ই তাদের খুব পছন্দ! মেয়েটির হাঁটার ভঙ্গি, শাড়ি পরার ধরন, আবছায়াভাবে দেখা মুখ, এতো চেনা লাগছে কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না। বৃষ্টির তোড়ে একটু দূরে থাকা সবকিছু প্রায় ঝাপসা দেখাচ্ছে। ভালো করে দেখার জন্য চোখে-মুখে জমে থাকা পানি হাত দিয়ে মুছে নিলে সুমনের সামনে থেকে দৃশ্যপট পালটে যায় – নিজেকে সে আবিষ্কার করে গ্রামের পথে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়। ছোটবেলা। রাস্তার পাশে ছোট্ট বাড়ি। একটা টিনের ঘরে নানা-নানি, ছোট খালা, মা আর সে – এই পাঁচজনের সংসার। বাবা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, আর ফেরেননি। দাদার বাড়িতে আশ্রয় মেলেনি বলে নানা গিয়ে নিয়ে এসেছেন মাকে। সুমন তখন কোলের

শিশু। দুই মামার বড়জন বিদেশে, আরেকজন আন্ডারগ্রাউন্ডে; দুজনেই নিরুদ্দেশ। ছোট মামা নাকি রাজনীতি করেন, তাই পুলিশ

খুঁজছে। এতো মানুষ রাজনীতি করে, সবাইকে বাদ দিয়ে মামাকেই কেন খুঁজছে পুলিশ, এ-প্রশ্নের উত্তর সুমন জানে না। তার ছোট্ট মাথায় এতোকিছু ধরেও না। এই যে মা এখনো ফেরেনি, অথচ আকাশের ঘন মেঘ সন্ধ্যার আগেই অন্ধকার নামিয়ে এনেছে, এতেই তার অস্থির লাগছে। ঝড়ো বাতাস। বড়ো-বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি তুমুল ঝরছে। একটু আগে ধুলো উড়ছিল, বৃষ্টির তোড়ে ওড়াউড়ি থেমে গেছে, কিন্তু অন্ধকার ভাবটা কাটেনি। মা যে এখনো এলো না! মনের চাপ সইতে না পেরে নানির নিষেধ অগ্রাহ্য করে দৌড়ে গিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালো সুমন। পাকা রাস্তা নয়, কাঁচা। এ-পথে গাড়ি চলে না, রিকশাও নেই। গ-গ্রাম, হতদরিদ্র মানুষের বসবাস, গাড়ি আসবে কোত্থেকে? ঠিকমতো খাবার জোটে না, রিকশায়ই-বা চড়বে কে? সাইকেল চলে বটে, দু-একটা মোটরসাইকেলও, সংখ্যায় তাও খুব কম। মানুষের হাঁটাচলার জন্যই ব্যবহৃত হয় রাস্তাটি। কাঁচা বলে একটু বৃষ্টিতেই কাদা জমে যায়। এখনো জমেছে। এই পথেই মা আসবে, দু-মাইল দূর থেকে, হেঁটে-হেঁটে। পথের দিকে তাকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সুমন। রাস্তা ফাঁকা, জনশূন্য। এই ঝড়-বাদলে কে-ই বা বাইরে থাকে, কেনই-বা থাকবে? শূন্য রাস্তায় অনেকদূর পর্যন্ত চোখ চলে যায়, তবু মাকে চোখে পড়ে না। প্রতিদিন এই সময়েই মা আসে, কিন্তু আজকে এই ঝড়ের মধ্যে আসবে কীভাবে? রাত যে হয়ে এলো, কোথাও আটকা পড়লো না তো! নানা দুর্ভাবনায় তার কিশোর মস্তিষ্কে ঝড় ওঠে। মা চাকরি করে। হাসপাতালে। ডাক্তার নয়, স্বাস্থ্যকর্মী। একসময় গ্রামে-গ্রামে ঘুরে কাজ করতে হতো। বাচ্চাদের টিকা-ইনজেকশন দেওয়া, পোয়াতি মেয়েদের পরামর্শ দেওয়া, এসব। এখন হাসপাতালে বসেই কাজ করে, আর পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামে যায়। সদাশয় মেডিক্যাল অফিসার দয়াপরবশ হয়ে মাকে গ্রামের পথে-পথে ঘোরার ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এই নিয়েও কতো কথা! গ্রামে নোংরা মনের মানুষের অভাব নেই, ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে মাকে জড়িয়ে নানান কতোকথা বলে। লোকজন নানা-নানিকে এসে দোষারোপ করে, মেয়েকে আবার বিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়, ‘ভালো’ পাত্রের সন্ধান দেয়! সুমনকে যেন এসব কথা শুনতে না হয় সেজন্য নানা-নানির চেষ্টার শেষ নেই, কিন্তু লোকজন যেন এককাঠি সরেস, তাকে

শুনিয়ে-শুনিয়েই বলে। আহ, ছোটবেলা! ভীতিকর, বিভীষিকাময় ছোটবেলা! মায়ের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে অস্থির লাগে, কথা না আবার শুনতে হয় মাকে! বিকেলে ছুটি হয়। দু-মাইল দূরের হাসপাতাল থেকে হেঁটে আসতে সন্ধ্যা ঘনায় প্রায় প্রতিদিন। সে-হিসাবে আসার সময় পেরিয়ে যায়নি এখনো, তবু দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আজ যে

ঝড়-বাদলের দিন, আজ যে দুর্যোগের দিন! এতো কাদা-পানি ভেঙে মা আসবে কীভাবে? এগিয়ে যাবে নাকি সে? গেলে মা যদি বকে?

ভাবতে-ভাবতেই সে দ্যাখে – মা আসছে। মাথার ওপর ধরে রাখা ছাতাটার অবস্থা করুণ, তবু হাতেই ধরা।

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-হেমন্ত-বসন্ত সব ঋতুতেই মায়ের ব্যাগে ছাতা থাকে। সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা, রোদে-ছায়ায়-বৃষ্টিতে, মানে সব-সময়ই ছাতা আগলে ধরে পথ চলে মা। অনেক পরে বুঝেছে সুমন, মা আসলে মানুষের চোখ থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইতো। কেন চাইতো? কিসের এতো সংকোচ ছিল তার, কিসের লজ্জা? কথাটি কোনোদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি। দূর থেকে মাকে দেখে দৌড় লাগালো সুমন, আর ওভাবে পাগলের মতো ছেলেকে ছুটে আসতে দেখেই হয়তো ছাতা গুটিয়ে দুহাত সামনে বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন আফরোজা বেগম, সুমন গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো তাঁর বুকে। শক্ত করে ছেলেকে বুকে চেপে ধরে তিনি বললেন –

বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

তোমার জন্য মা।

আহা রে আমার বাবা! আমার সোনামানিক।

তারপর কপালে, গালে, গলায় চুমু দিতে-দিতে বললেন – যা ভয় পেয়েছিলাম, আরেকটু এগিয়ে গিয়ে মাকে নিয়ে আসতে পারলি না!

যেতেই তো চেয়েছিলাম। তুমি যদি বকো…

দূর বোকা! তুই আমার বাবা না? মেয়ের বিপদে বাপ এগিয়ে গেলে মেয়ে বুঝি বকে? চল যাই, বাড়ি যাই। বৃষ্টি হচ্ছে দেখে ডিম কিনে এনেছি। আজকে গরম ডিম ভেজে খিচুড়ি খাবো। ঠিক আছে?

মায়ের বুকের ওমে, সম্ভাব্য ডিমভাজা আর খিচুড়ির গন্ধে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আহ্ ছোটবেলা। ডিম ভাজা আর খিচুড়ি নামক ভালো খাবারের উৎসবমুখর বৃষ্টিভেজা ছোটবেলা! শীত-শীত শরীরে মায়ের বুকের ওম মেখে উষ্ণ হয়ে-ওঠার মধুময় ছোটবেলা! সে হয়তো হারিয়েই গিয়েছিল, আর তখনই তার সম্বিৎ ফেরে হঠাৎ ডাকে –

অ্যাই সুমন, বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কী করছো?

সুমন এবার বাস্তবে ফেরে, দ্যাখে, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যে-মেয়েটি সে তার এককালের সহপাঠী-বন্ধু দীপা। এতোকাল পরও বুকের ভেতর শিরশির করে ওঠে সুমনের, ঠিক যেমন উঠতো

বিশ-বাইশ বছর আগে – যদিও কোনোদিনই সে-কথা জানানো হয়নি। সাহসই হয়নি আসলে। অথচ কী সূক্ষ্মভাবেই না ওকে পর্যবেক্ষণ করতো সে, হয়তো সেজন্যই হাঁটার ভঙ্গি, শাড়ি পরার ধরন সব মনে আছে। অবশ্য এর মধ্যে দেখা হয়েছে অনেকবার, নানা

আড্ডায়-আয়োজনে-উপলক্ষে। তবু সবসময়ই ওকে দেখে মনে হয়, এই প্রথম দেখলাম!

দীপার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে সুমন হেসে বলে – ও তুমি! সেজন্যই তো এতো চেনা-চেনা লাগছিল!

মানে? তুমি আমাকে আগে চিনতে পারোনি?

উঁহু। চেনা-চেনা লাগছিল, কিন্তু…

পাগল নাকি? তাহলে হাঁ করে তাকিয়েছিলে কেন?

হাঁ করে ছিলাম নাকি?

অবশ্যই হাঁ করে ছিলে। সেজন্যই তো এগিয়ে এলাম!

সুন্দরী মেয়েদের দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকলে দোষ হয় না!

ওরে আমার রঙ্গ রে! ঢং করার আর জায়গা পাও না!

তা পাবো না কেন? এই যে তোমার কাছে পেলাম!

ফাজলামো করো না। বলো, আমাকে চিনতে পারোনি কেন? আমি কি খুব বদলে গেছি?

নাহ্। আগের মতোই সুন্দর আছো।

সত্যি?

না, সত্যি না। আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছো।

আবার ঢং!

সত্যি বললাম। তোমাকে দেখে একেবারে তরুণী মেয়েদের মতো লাগছে।

বুড়ি হয়ে গেছি নাকি? তরুণীই তো!

বুড়ি না হলেও বয়স তো আর কম হলো না!

বয়স তোমার হয়েছে, আমার হয়নি! হি-হি-হি…

আমার তো হয়েছেই। চলিস্ন­শ পেরিয়েছি তাও কয়েক বছর হয়ে গেল! তা, তোমার বয়স না বাড়ার কারণ কী শুনি?

সত্যি ওরকম লাগছে নাকি?

ওরকম মানে?

ওই যে বললে, তরুণী মেয়েদের মতো!

হ্যাঁ, সত্যিই। মনে হচ্ছিল চবিবশ-পঁচিশ বছরের সেই দ্বিধাজর্জরিত মেয়েটি, বহু বছর আগে যাকে রেখে এসেছিলাম ক্যাম্পাসের সবুজ প্রাঙ্গণে।

ও মা! কবিদের মতো কথা বলছো দেখছি!

সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় সব পুরুষই একটু কবি হয়ে যায়!

হুম, বুঝলাম, আপনি একজন পুরুষ মানুষ!

সত্যি বলছি। তোমাকে সেই আগের মতো লাগছে। হয়তো সেজন্যই চিনতে পারিনি।

উঁহু। অন্য কিছু। তুমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলে। অনেকক্ষণ ধরে। অনেক দূর থেকে আমি খেয়াল করেছি। অমন করে তাকিয়ে ছিলে কেন? কখনো তো এমন করে দ্যাখোনি!

বলবো। তার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো!

কী প্রশ্ন?

তুমি নিজেকে এতো আড়াল করে রাখো কেন?

মানে?

মানে নিজেকে লুকিয়ে রাখো কেন?

মানে কী? আড়াল করে রাখা, লুকিয়ে রাখা – এসব কী বলছো?

এই যে মাথার ওপর একটা ছাতা ধরে…

ও মা! বৃষ্টি হলে ছাতা ধরবো না!

শুধু বৃষ্টিতেই? সারা বছর তোমার ব্যাগে একটা ছাতা থাকে না?

হ্যাঁ, থাকে।

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতেই ছাতা ইউজ করো না?

হ্যাঁ, করি। তুমি জানলে কীভাবে? গোয়েন্দাগিরি করো নাকি?

নাহ। তোমাকে নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করে কী লাভ?

তাহলে? জানলে কীভাবে?

আগে তো এরকম করতে না! এখন করো কেন?

ছাতা ইউজ করা কি এমন কোনো বিশেষ ব্যাপার?

না, ঠিক তা নয়। আগে এরকম করতে না, এখন নিজেকে আড়াল করো, তাই বললাম।

আড়াল? আড়াল করি?

করো না?

কী জানি! হয়তো করি।

কেন করো?

হয়তো করতে ভালো লাগে।

কেন লাগে? তুমি এতো সু্ন্দর একটা মেয়ে…

আচ্ছা, এই বৃষ্টিতে দাঁড়িয়েই কথা বলবে? কোথাও বসা যায় না?

এই ভেজা কাপড়ে কেউ বসতে-টসতে দেবে বলে মনে হয় না। বাসায় যাবে?

না, বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। তার চেয়ে চলো হাঁটি। এই বৃষ্টি সহজে থামবে না। হাঁটতে ভালোই লাগবে।

ঠান্ডা লাগানোর ফন্দি!

লাগলোই না-হয় একটু। চলো তো!

হাঁটতে শুরু করেই ছাতা গুটিয়ে ফেললো দীপা। সুমন জিজ্ঞেস করলো –

এখন যে ছাতা ছাড়াই হাঁটছো?

এখন তো তুমি পাশে আছো!

আমার থাকা-না-থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

সম্পর্ক হলো – কেউ উলটাপালটা কিছু ভাববে না। বড়জোর মনে করবে আমি তোমার বউ, শখ করে দুজন বৃষ্টিতে ভিজছি।

বউ ভাববে? পাগল নাকি?

বউ না হলে এই ভেজা শরীরে কেউ পরপুরুষের সঙ্গে হাঁটে?

কেন? ভেজা শরীরের সমস্যা কী?

সমস্যা বোঝো না? গাধা নাকি?

গাধা তো চিরকালই ছিলাম।

নাহ, গাধা নও। তোমার চোখে পাপ নেই, মনেও নেই…

বুঝলে কী করে?

বোঝা যায়।

বলো না!

ওই যে বললে, ভেজা শরীরের সমস্যা কী?

হ্যাঁ, সমস্যা কী? আর এই কথা শুনে চোখ আর মনের পাপপুণ্য কী করে বুঝলে?

বোকা ছেলে, ভেজা শরীরে শাড়ি লেপ্টে থাকে, শরীরের বাঁকটাক সব স্পষ্ট দেখা যায়।

ও!

‘ও’ মানে কী?

মানে, এদিকটা ভেবে দেখিনি।

সেজন্যই বললাম, তোমার মনে পাপ নেই।

হুঁ।

এই, আমার দিকে তাকাও তো।

তাকালাম।

তুমি না বললে, আমি আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছি!

হ্যাঁ। হয়েছো তো!

কী দেখে বললে? শরীরের দিকে তাকাওনি? শুধু মুখ দেখে বলেছো?

আচ্ছা, কাউকে সুন্দর লাগলে তার সারা শরীর খুঁটিয়ে দেখতে হয় নাকি?

হয় না?

না।

তাহলে কী দেখে সুন্দর মনে হয়?

তা বলতে পারবো না। সবমিলিয়ে একটা সুন্দরের অনুভূতি হয়।

কী রকম?

কী মুশকিল! আমি সত্যিই কবি নাকি যে তোমাকে বুঝিয়ে বলবো?

আমি তোমার কথাই জানতে চাইছি। কবিরা আকাশে থাকুক।

ঠিক আছে। ধরো, একটা শিশু যখন অবুঝ হাসিতে চারপাশ ভরিয়ে তোলে, আমাদের কাছে সুন্দর লাগে না? কিংবা কোনো নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখে আমরা যে বলে উঠি – বাহ কী সুন্দর, সেটা কি সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে বলি? সবমিলিয়ে আমাদের কাছে ব্যাপারটা সুন্দর লেগে ওঠে বোধহয়।

হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। এবার আমাকে একটু খুঁটিয়ে দ্যাখো তো!

মানে?

মানে, আমার শরীরের দিকে তাকাও।

কী পাগলামি করছো! লোকে কী মনে করবে!

মনে করবে, আমি তোমার বউ!

তোমার মাথা!

সত্যি বলছি!

তুমি বেশ সাহসী হয়েছো দেখছি।

কেন? আগে কি ভীতু ছিলাম?

না, তা ছিলে না। একটু লাজুক-লাজুক ছিলে।

তাহলে বলো, নির্লজ্জ হয়েছি।

তা বলবো কেন?

লজ্জার বিপরীত শব্দ তো নির্লজ্জ!

তা একটু হয়েছো। তোমার ভেজা শরীরের দিকে তাকাতে বলছো।

বলছি তো! তাকাও না! কেউ কিছু মনে করবে না।

তুমি সবার মন জেনে বসে আছো?

হ্যাঁ আছি। তোমার সঙ্গে যদি সত্যিই বাইশ-তেইশ বছরের একটা মেয়ে থাকতো, তাহলে লোকজন ভাবতো তুমি একজন লম্পট পুরুষ, কোনো কচি মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে এসেছো!

কেন তা মনে করবে? আমার বয়স যা-ই হোক, দেখতে লাগে পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই, বাইশ-তেইশ বছর বয়সী একটা কন্যাও তো আমার থাকতে পারতো!

তা পারতো! কিন্তু লোকে তা ভাববে না।

 

আর যদি তোমার সঙ্গে কোনো ছোকরা ছেলে থাকতো?

তবু ওরকম কিছু ভাবতো না।

কেন?

কমবয়সী ছেলেরা যে বয়স্ক মেয়েদের প্রেমে পড়তে পারে, এটা আমাদের সমাজে ভাবা হয় না।

কিন্তু পড়ে তো!

তা তো পড়েই। অহরহ পড়ে। আমাদের সামাজিক মন বড়ো অদ্ভুত। এবার তাকাও তো আমার দিকে।

সুমন পূর্ণচোখে তাকায়।

কী দেখলে? আমার শরীর সুন্দর?

হ্যাঁ সুন্দর।

আকর্ষণ করে?

করে।

তোমার কখনো ইচ্ছে করেনি?

না দীপা, করেনি।

কেন করেনি?

আমি কখনো কামনার চোখে তোমার দিকে তাকাইনি।

কেন তাকাওনি?

শোনো দীপা, কেন মনে করো, জগতের সকল পুরুষ লোলুপ চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে?

থাকে তো!

না, সবাই থাকে না। এতো জেনারালাইজ করো না।

রাগ করলে?

করলাম। সেই তখন থেকে কী যে শরীর-শরীর শুরু করেছো!

জানি সুমন, তোমাকে তো আমি জানি। সেজন্যই তো এতো নির্ভয়ে নির্লজ্জভাবে এসব প্রসঙ্গে কথা বলতে পারি। কিন্তু জগৎটা আমার জন্য আনন্দময় হয়নি এই শরীরের কারণে।

সুমন চুপ করে রইলো।

তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে না, কেন আড়াল করি? আমি একটা ডিভোর্সি মেয়ে। দেখতে সুন্দর। লোকজন ভাবে, আমি শরীরভরা আগুন নিয়ে কোথায়-কোথায় কী-না-কী করে বেড়াচ্ছি!

তোমাকে বলেছে কেউ এমন কথা? নাকি মনগড়া কথা বলছো?

না, সরাসরি তো বলে না। আকার-ইঙ্গিতে বলে আর কি! বয়স তো আর সত্যিই কম নয়, অভিজ্ঞতাও কম নয়। ওসব বুঝি। সেজন্যই তো বাসা থেকে এই বয়সে আবার বিয়ের জন্য চাপাচাপি… বোঝো তাহলে!

সুমন একটু আনমনা গলায় বললো, তোমাকে এ-কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন জানো?

কেন?

আমার মা-ও এরকম আড়াল নিয়ে থাকতেন। ছাতা মাথায় দিয়ে তোমার হেঁটে আসা দেখে সেই কথা মনে পড়েছিল আমার। সেজন্যই ওরকম তাকিয়ে ছিলাম।

ও! মা-ও এরকম করতেন!

হুঁ।

তাঁর ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। তিনি তো আর ডিভোর্সি ছিলেন না। স্বামীকে হারিয়েছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধে। কতো গৌরবের একটা ব্যাপার!

তোমার কাছে গৌরবের মনে হচ্ছে। কিন্তু সেই দিনগুলো কী যে কষ্টে কাটিয়েছেন তিনি! আমার ছোটবেলা খুব একটা সুখের ছিল না দীপা।

হ্যাঁ, জানি।

মায়ের কাছে যাবে?

হ্যাঁ, যাবো। আজকে নয়। এ-অবস্থায় যাওয়া ভালো দেখায় না।

মা তোমার কথা মাঝে-মাঝে জিজ্ঞেস করেন। সেই কতো বছর আগে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলাম মাকে, তুমি তোমাদের বাসায় নিয়ে কয়েকদিন রেখেছিলে, সেই কথা এখনো বলেন!

তাই? কী সৌভাগ্য আমার!

যাবে? চলো না!

না, আজকে থাক। আর এতো যে যেতে বলছো, তোমার বউ কিছু মনে করবে না?

কী মনে করবে? তোমাকে তো চেনেই।

আহা, তা তো চেনে। এই ভেজা কাপড়ে গিয়ে উঠলে…

তুমি দেখি ভেজা শরীর ভেজা কাপড় নিয়ে খুব চিন্তিত!

তা চিন্তিত।

অবশ্য চিন্তিত হওয়ারই কথা। যা লাগছে না তোমাকে!

ইয়ার্কি করো না কিন্তু।

শোনো, বাসা থেকে যেহেতু বিয়ের কথা বলছে, বিয়ে করে ফেলো। সুন্দর-টুন্দর আছো এখনো, ভালো বর পাবে।

তুমি বিয়ে করবে?

আমি করবো কেন? আমার বউ-বাচ্চা আছে না?

দুটো বউ তো রাখা যায়, করবে বিয়ে?

নাহ, করবো না।

কেন? করো না!

সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। ওই সময়ে ফিরেও তাকাওনি, এখন ধরা খেয়ে বিয়ে করতে বলছো!

ছি-ছি, এগুলো কেমন কথা! ধরা খেয়ে!

মিথ্যে বলিনি তো! তখন পাত্তা দাওনি কেন? এখন তো আর সেই সময় নেই। সময় গেলে সাধন হয় না, বুঝলে?

হুম, বুঝলাম। কিন্তু দোষটা কেবল আমাকেই দিয়ো না। তুমিও তো বলোনি কখনো!

বলিনি, কিন্তু বুঝতে তো পেরেছিলে?

তা পেরেছিলাম।

তাহলে?

মেয়েদেরকে মুখে উচ্চারণ করে বলতে হয়। নইলে যতোই বুঝুক না কেন, ওরা না বোঝার ভান করে। তুমি বলোনি কেন?

সেটা তো তুমি ভালো করেই জানো।

না জানি না, সত্যিই জানি না।

আমি একজন রুটলেস মানুষ। ঘরবাড়ি নেই, স্থায়ী ঠিকানা নেই, মায়ের কোলে থাকতে বাবাকে হারিয়েছি, বড় হয়েছি নিদারুণ কষ্ট নিয়ে। এই ধরনের মানুষদের তোমার মতো ঝলমলে মেয়েকে কিছু বলার সাহস থাকে না।

তাহলে তো হলোই। ভীতু লোকদের এতো ঝলমলে সুন্দরী মেয়েদের পাওয়ার অধিকারও থাকে না।

জানি তো। সেজন্যই বলিনি।

বুদ্ধু কোথাকার। বলেই দেখতে!

বললে রাজি হতে?

না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। তোমার অ্যাড্রেস আছে কি নেই সেটা তো আমার কাছে কোনো ম্যাটার ছিল না। তুমি একজন শহীদের সন্তান, এটাই তো বড়ো পরিচয়।

এই পরিচয়ের কোনো সামাজিক মূল্য ছিল না, এখনো নেই। অন্তত আমি কখনো দেখিনি। তোমার ফ্যামিলি রাজি হতো না।

তা সত্যি। এটাই হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে বড়ো সম্মানজনক পরিচয়, হয়নি। আমার ফ্যামিলিও হয়তো রাজি হতো না। কিন্তু আমি তো হতাম।

তাতে কী লাভ হতো?

লাভ-ক্ষতির ব্যাপার নয়। তুমি অন্তত জানতে পারতে, তোমার রুটলেসনেস আমার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না, তোমার পরিচয়ই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর মানুষ হিসেবেই আমি তোমাকে ভালোবাসি।

এখনো বাসো?

হুঁ, বাসি।

কেন বাসো? কী এমন দেখেছো আমার মধ্যে?

তুমি মানুষ হিসেবে খুব অন্যরকম।

কী রকম?

অনেক কথাই বলা যায়। দু-একটা বলি। যে-কোনো পরিস্থিতিতে তুমি ধৈর্য হারাও না, অবিচল থাকতে পারো, শান্ত থাকতে পারো। আমাদের বন্ধুদের অনেক জটিল সমস্যার চমৎকার সব সমাধান তোমার মাথা থেকে এসেছে। সেগুলো কাজেও লেগেছে। এরকম বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

পোড়-খাওয়া মানুষদের অবিচল থাকতে হয়।

পোড়-খাওয়া অশান্ত-অস্থির মানুষও তো কম দেখিনি জীবনে। যাহোক, আরেকটা বলি। অন্য মানুষ সম্পর্কে তোমার কোনো অশোভন কৌতূহল নেই। নাগরিক মানুষদের এরকমই হওয়ার কথা, কিন্তু এ-শহরের মানুষ এখনো গ্রাম্য স্বভাব ত্যাগ করতে পারেনি। সবার ব্যাপারেই তাদের ভীষণ কৌতূহল! অথচ গ্রামের মানুষ হয়েও তুমি অন্যরকম। আমার ডিভোর্স নিয়ে আমাদের বন্ধুদের কৌতূহলের শেষ নেই, অনেক অকথা-কুকথাও শুনেছি কারো-কারো কাছে। অথচ তুমি সেসব আলোচনায় থাকোনি কখনো, আমাকেও জিজ্ঞেস করোনি কেন ডিভোর্স হলো!

ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি মাকে নিয়ে মানুষের ভীষণ কৌতূহল। খুব ঠেকে শিখেছি যে, এটা ভীষণ অন্যায়, অশোভন।

অন্য মানুষের কৌতূহল সবাইকেই বিব্রত করে, কিন্তু কেউ ঠেকে শেখে না। সে নিজেও ওই একই কাজ করতে থাকে।

হুম। এবার বলো তো, তোমার ডিভোর্স কেন হলো?

সে অনেক কথা। ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করতে হবে না।

ভদ্রতা করে নয়, সত্যিই জানতে চাইছি।

নিশ্চয় আমারই দোষ ছিল!

এ আবার কেমন কথা? আমি কি বলেছি সেটা?

না, তুমি বলোনি। কিন্তু এ-সমাজে ডিভোর্স মানেই মেয়েদের দোষ। ছেলেরা তো পূতপবিত্র!

হুম। খুব ডিস্টার্বড হয়ে আছো দেখছি।

তা আছি। আর পারা যাচ্ছে না।

কেন ডিভোর্স হলো, বললে না কিন্তু।

অন্য কোনোদিন শুনো, আজকে যাই।

চলো পৌঁছে দিয়ে আসি তোমাকে।

থাক লাগবে না, একাই তো যাই। যেতে পারবো।

তা পারবে, জানি। তাও যাই।

তুমি আবার যাবে এতোদূর! এমনিতেই ভেজা কাপড়ে আটকে রেখেছি অনেকক্ষণ।

আরো কিছুক্ষণ তোমার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করছে যে!

দীপা চকিতে একবার তাকালো সুমনের দিকে, মৃদু হাসলো লাজুক ভঙ্গিতে, তারপর বললো – আহা, বিশ বছর আগে যদি এভাবে বলতে!

বললে কিছুই হতো না!

তা তুমি নিশ্চিত করে বলতে পারো না।

আচ্ছা, পারি না। জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি – কুড়ি বছরের পার, এখন ওসব কথা তুলে লাভ কী?

লাভ নেই। তবু বলতে ভালো লাগে।

এবার চলো তো, তোমাকে দিয়ে আসি।

ঠিক আছে চলো।

একটা রিকশা ডেকে উঠে বসলো তারা। কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটলো। তারপর সুমন একহাতে দীপাকে জড়িয়ে ধরে বসলো। চকিতে একবার তার দিকে তাকিয়ে, মৃদু একটু হেসে, আরো একটু তার বুকের কাছে সরে এসে দীপা বললো – ডিভোর্সি মেয়ে পেয়ে সুযোগ নিচ্ছো?

সুযোগ নিচ্ছি বটে, তবে ডিভোর্সি বলে নয়। ভালোবাসার কথা বলেছো বলে।

একটা কথা বলবো?

বলো।

আমি মনে-মনে খুব চাইছিলাম তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরো। কিন্তু তুমি যে ভীতু, মনে হয়নি যে পারবে! আবার আমিও তো অতোটা নির্লজ্জ হইনি যে নিজে থেকে বলবো…

এরকম চাওয়ার মানে কী? ডিভোর্সি মেয়েদের চাওয়া-টাওয়া বেড়ে যায় নাকি?

খোঁচাটা গায়ে মাখলো না দীপা, বললো – হ্যাঁ বেড়ে যায়, কিন্তু সেটা পূরণের জন্য তারা যার-তার কাছে যায় না, যায় প্রেমিকের কাছে, বুঝেছো?

হুম বুঝেছি। উত্তর সবই রেডি করা আছে।

দীপা আর খুনসুটিতে যোগ দিলো না। খুব ধীরে সুমনের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে বসলো সে। তার অকারণ কান্না পাচ্ছে। বহুদিন ধরে সে কাঁদে না। এখন সে কাঁদবে, মনভরে কাঁদবে।

 

দুই

দীপাকে বাসার গেটে নামিয়ে দিয়ে একই রিকশায় ফিরতি পথ ধরলো সুমন। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর ঝিরিঝিরি একটা হাওয়া বইছে চারপাশে। শীত-শীত লাগছে, আবার আরামও লাগছে। যে-হাতে দীপার কোমর পেঁচিয়ে ধরে বসেছিল সে, সেই হাতে এখনো

কোমল উষ্ণতা লেগে আছে। কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিল দীপা, সেখানেও উষ্ণতার পরশ। বাকি পথ দীপা কোনো কথা বলেনি, সম্ভবত কাঁদছিল, বুঝতে পেরেও সুমন তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেনি। মানুষ কতো কারণে কাঁদে, কতো ভাবে

কাঁদে! তাকে কাঁদতে দিতে হয়। নিঃশব্দ কান্নার সময় সান্তবনাবাক্য

উচ্চারণ করা প্রায় অপরাধের সমতুল্য। মানুষ বড়ো দুঃখী, বড়ো একা। কেঁদে তার বুক হালকা হয়, তখন কথা না বলে বরং তাকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ বসে থাকা ভালো। এসব কথা ভাবছিল সুমন। ভাবছিল, আজকে কতো সহজেই না দীপাকে জড়িয়ে ধরতে পারলো সে, অথচ কোনোদিন কিছু বলারই সাহস হয়নি। বয়স মানুষকে কতো পালটে দেয়! যৌবনে যে-শরীরকে এতো মহার্ঘ মনে হয়, মনে হয় – ছুঁয়ে দিলেই মহামূল্যবান শরীরটি অপবিত্র হয়ে যাবে, পড়ন্ত বেলায় সেই স্পর্শটিই কতো কাঙ্ক্ষিত, কতো আনন্দের হয়ে ওঠে! তখন আর শরীর মানে কামনা নয়, যৌনতা নয়, বরং প্রেম, নির্ভরতা, আশ্রয়। পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছিল সুমনের। কী যে ভালো লাগতো দীপাকে! উচ্ছল, প্রাণবন্ত একটা মেয়ে। সবকিছুতে সক্রিয়। পড়াশোনায় ভালো, আবার রাজনীতি করে বেড়াচ্ছে,

গান-আবৃত্তি-পথনাটক ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকা– সোৎসাহে অংশ নিচ্ছে, ‘বুর্জোয়া রাজনীতি’র সমর্থক-কর্মী বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল তর্কে মেতে উঠছে, আবার বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে, বেইলি রোডে নাটক দেখতে যাচ্ছে, সময়ে-অসময়ে পিকনিকের তাল তুলছে। সর্বদা ব্যস্ত, কর্মমুখর। অবশ্য সুমনকে দীপা আকর্ষণ করতো অন্য কারণে। ওর ছিল অসম্ভব সুন্দর একটা মন, যে-মনে কখনো দাগ পড়েনি, কালি লাগেনি, ধুলো জমেনি। মানুষের জন্য তার হৃদয়ে ছিল এক অনিঃশেষ মমতা, ছিল ভালোবাসা। নেতিবাচক কথাবার্তা সে পছন্দ করতো না – নিজে যেমন বলতো না, শুনতেও চাইতো না। মানুষকে মনে করতো অপরিমেয় সম্ভাবনাময় প্রাণী, মানুষের প্রতি অগাধ আস্থা ছিল বলে একটা অপূর্ব আশাবাদ তার মনে অনির্বাণ প্রদীপ হয়ে জ্বলতো। সুমন ছিল ঠিক এর উলটো, ঘা খেতে-খেতে মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল সে, নৈরাশ্যপীড়িত হয়ে উঠেছিল মন, তারপর এসবকিছুকে অনিবার্য বাস্তবতা বলে মেনে নিতে শিখেছিল। দীপার সেই আশাবাদের প্রদীপটি হয়তো এতোদিনে নিভে গেছে। আজকের কথাবার্তায় অনেকখানি হতাশার সুর, অনেকটুকু ক্লান্তি। কোনো কারণে মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে গেলে সেটা আবার ফিরিয়ে আনা কঠিন। দীপার জীবনে হয়তো সেটিই ঘটেছে। কেন হলো এমন? ডিভোর্সের ব্যাপারটা যে বড় একটা কারণ, সন্দেহ নেই। দাম্পত্য জীবনে দুজনের মধ্যে অমিলগুলো অসহনীয় হয়ে উঠলে ডিভোর্স হয়ে যাওয়াই ভালো, কিন্তু সমাজ বা পরিবারের মানুষ ব্যাপারটাকে মোটেই ভালো চোখে দ্যাখে না। পরিবারটি ভোগে, মানুষটি ভোগে, সমাজের মানুষ তাদের সানন্দে ভোগায়। শেষ পর্যন্ত সব দোষ গিয়ে পড়ে মেয়েটির ওপর। একটা ডিভোর্সি ছেলে যতোটা না প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি হয় মেয়েটি। দীপার ক্লান্ত কণ্ঠস্বরই বলে দিচ্ছিল, ও সেই ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

আচ্ছা, কী হতে পারতো, যদি সেই দুরন্ত যৌবনবেলায় সে দীপাকে সাহস করে বলেই ফেলতো তার ভালো লাগার কথা, প্রেমের কথা? প্রেম? হ্যাঁ, প্রেমই। সুমন সত্যিই প্রেমে পড়েছিল। দীপাকে দেখলে বুক ঢিপঢিপ করতো, সারাক্ষণ দীপার কথা ভাবতো, কথা বলতে গেলে গলা শুকিয়ে যেতো, হাজারটা রঙিন কল্পনায় নিজেকে ভেসে যেতে দিতো, সারারাত ধরে ভাবতো কালকে দীপাকে কী কী বলবে; কিন্তু দেখা হলে কোনোটিই বলতে পারতো না। প্রতিদিন দেখা হতো, কথা হতো, আড্ডা হতো, কিন্তু ভালো লাগার কথাগুলো অপ্রকাশিতই থেকে যেতো। বন্ধুরা সবাই সুমনের প্রেমে পড়ার ব্যাপারটা ধরতে পেরেছিল, কিন্তু দীপার ব্যাপারটা বোঝা যেতো না। এতো সহজ ছিল ওর আচরণ যে, সে যে প্রেমে পড়তে পারে সেটাই মনে হতো না কখনো। ভাবাবেগের বালাই ছিল না তার আচরণে। সম্ভবত সেটি তার রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ছিল। তবে বন্ধুরা কখনো ভুলেভালে ঠাট্টার সুরে সুমনকে জড়িয়ে কিছু বললে ভীষণ লজ্জা পেত সে! বন্ধুত্ব রক্ষার খাতিরেই তাই এসব ঠাট্টা-দুষ্টুমি বন্ধ করে দিয়েছিল সবাই। পাঁচজন বন্ধুর এক চমৎকার গ্রম্নপ ছিল তাদের। নিজেদের মধ্যে কোনো আড়াল ছিল না, যে-কোনো কথা বলা যেতো, যে-কোনো চিন্তা বিনিময় করা যেতো, যে-কোনো সুখ বা দুঃখ বিনিময় করে নেওয়া যেতো। অ্যাডাল্ট জোকস বলাবলিও কম হতো না, শরীর-টরীর নিয়ে কথাবার্তাও চলতো অবলীলায়, তবু তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল একটু অন্যরকম। এমনকি পরস্পরকে কখনো ‘তুই’ বলে সম্বোধনও করতে পারেনি তারা, ‘তুমি’ই বহাল থেকেছে, যদিও অন্য সবার সঙ্গেই তুই-তোকারি সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল খুব তাড়াতাড়িই।

আজ এতোদিন পর প্রেম নিয়ে খোলামেলা স্বীকারোক্তির পর সুমনের মনে হচ্ছে – এই ভালো হয়েছে। তখন বললে কী হতো বলা যায় না। প্রেম হতেও পারতো, না-ও হতে পারতো, হলেও বিয়ে পর্যন্ত গড়াতো কিনা সন্দেহ। বিয়ে হলেও সম্পর্কের এই মাধুর্যটি নষ্ট হয়ে যেতো। জটিল এক জীবন তার, অনেক উত্থান-পতন, অনেক সংগ্রাম, অনেক যুদ্ধ, অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা, অনেক বিপর্যয় – এসব পেরিয়ে আজ সে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে আসতে বহু রক্তক্ষরণের স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে। জীবনসঙ্গী হলে দীপাকেও সেই চিহ্নগুলো বহন করতে হতো। দীপার সঙ্গে প্রেম বা

দাম্পত্য-সম্পর্ক রচিত হয়নি বলে তাই তার দুঃখ নেই, বেদনা নেই, বুকের ভেতরে কোথাও শূন্যতার হাহাকার নেই।

আর তাছাড়া, সে তো নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট নয়। যে-জীবন পেয়েছে, সুমন তাতেই সুখী, দারুণ সুখী। এতোখানি পাওয়ার কথা সে কল্পনাও করেনি। গভীরভাবে ভেবে দেখেছে সুমন, সে যেখানে এসেছে সেখানে তার আসার কথাই ছিল না। সব মানুষ নিজেদের জীবন এক জায়গা থেকে শুরু করে না। কেউ শূন্য থেকে শুরু করে, কেউ বেশ খানিকটা এগিয়ে থেকে শুরু করে, আর কেউ শূন্যেরও অনেক পেছন থেকে শুরু করে, শূন্যে পৌঁছাতেই তাদের জীবন অর্ধেক পার হয়ে যায়। সে ওই তৃতীয় দলের মানুষ। গ-গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছে সে, নানারকম গস্নানি আর বেদনার ভেতর দিয়ে, অভাব আর দারিদ্রে্যর ভেতর দিয়ে, শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে সুমন, তাঁর কথা আর কিছুই মনে নেই এখন। অকাল-বৈধব্য তার রূপবতী মাকে উপহার দিয়েছিল নানা বিপদ ও বিপর্যয়, লোকনিন্দা আর নিরাপত্তাহীনতা। এসব দেখে-দেখে বড় হয়েছে সে। একাত্তরে, বাবা মারা যাওয়ার সময়, তার বয়স ছিল বোধহয় কয়েক মাস, এমনকি সে তার সঠিক জন্মতারিখটাও জানে না। বাবার মৃত্যুর পর মা অনেকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন, যখন সুস্থ হলেন পেছনের কোনো কথাই ঠিকঠাক মনে করতে পারতেন না, একমাত্র বাবার প্রসঙ্গ ছাড়া। দাদার বাড়িতে থাকতে পারেনি তারা, নানা গিয়ে তার মেয়েকে শিশুপুত্রসহ নিয়ে এসেছিলেন নিজের কাছে। নানা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, সংসারে সচ্ছলতা ছিল না তাঁর, তবু মেয়েকে বাড়তি বোঝা বলে মনে করেননি, বরং পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি একা আর কতোটা পারবেন, চারপাশের মানুষ তাকে একেবারে পাগল বানিয়ে তুলেছিল মেয়েকে আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য। সোমত্ত মেয়ে, দেখতেও সুশ্রী, এই মেয়েকে কি এভাবে ঘরে রাখা যায়? কিন্তু মাকে বিয়ের কথা বলাই যেতো না। এই প্রসঙ্গ উঠলেই এমন পাগলামি শুরু করতো যে, সামলানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াতো। সামাজিক চাপ থাকা সত্ত্বেও নানাকে তাই এই প্রসঙ্গ থেকে দূরে থাকতে হতো। এসব কথা সুমনের মনে নেই, বড় হয়ে বিভিন্নজনের কাছে শুনেছে। কিন্তু সে যা দেখেছে এবং নিজ কানে শুনেছে তার ক্ষত এখনো শুকোয়নি। নানার সংসারে টানাটানি, উপায়ান্তর না দেখে মা ছোট্ট একটা সরকারি চাকরিতে ঢুকেছিলেন –  স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে। থানা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে কাজ করতেন তিনি, গ্রামে ঘোরাঘুরির দায়িত্ব থেকে কী কারণে যেন নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু রক্ষা পাননি কতোৎসিত সব নিন্দামন্দ থেকে। হাসপাতালের ডাক্তারদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে মনগড়া কুকথা বলে বেড়াতো লোকজন। দিনদুপুরে অজস্র লোকের আনাগোনার মধ্যে মায়ের চাকরি, কোনোদিন সন্ধ্যা করে বাড়ি ফেরেননি, তাদের বাড়িতে কোনোদিন কোনো ডাক্তারকে আসতে দেখা যায়নি, তবু লোকজন যে কেন এসব কথা বলতো – এখনো সে বুঝে উঠতে পারেনি। বড় হয়ে উঠতে-উঠতে, স্কুলে পড়ার সময়ই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, এই গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু চাইলেই তো সেটা সম্ভব নয়। নানার আর্থিক সামর্থ্য নেই, মামাদের খবর নেই, তার এই ইচ্ছা পূরণ করবে কে? স্কুল-কলেজ পেরিয়ে সে যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো, এখানে-ওখানে কয়েকটা টিউশনি জুটিয়ে মাকে নিয়ে আসার তোড়জোড় শুরু করলো। কিন্তু মা

যথারীতি দৃঢ়চেতা, হেসে বললেন – ‘পাগল রে, আগে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নে, তারপর এসব ভাবিস।’ সে যে টিউশনি করে অনেক টাকা কামায়, পুরান ঢাকায় একটা রুম ভাড়া করে মাকে নিয়ে থাকার সামর্থ্য তার আছে, মাকে এটা বোঝাতেই পারে না। মায়ের বুঝ তার চাইতে বেশি – ‘খামোকা চাপ নিবি কেন বাবা? এখানে তো ভালোই আছি আমি। টিউশনি কোনো চাকরি নাকি? আজ আছে কাল নাই। হাত খালি হয়ে গেলে বাসাভাড়া দিবি কীভাবে? আমাদের কি জমানো টাকা আছে? তার চেয়ে চেষ্টা করে দ্যাখ, হলে সিট পাওয়া যায় কি-না। পেলে টিউশনির টাকা একটু-একটু করে জমাবি, যেন চাকরি পাওয়ার পর ঢাকায় বাসা নিয়েই তোকে একটা বিয়ে করাতে পারি।’

জমানো হয়নি তার, অচিরেই সে আবিষ্কার করে – মায়ের কথাই ঠিক। টিউশনির কোনো ঠিকঠিকানা নেই – এই আছে তো এই চলে যায়। তখন সামরিক শাসকের স্বেচ্ছাচারিতার কাল। যখন-তখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য, অল্প সময়ের মধ্যে হল খালি করে দেওয়ার নির্দেশ আসে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। ব্যাগ গুছিয়ে বাড়িতে চলে যেতে হয়, আর অনেকদিন পর ইউনিভার্সিটি খোলার খবর পেয়ে ফিরে এলে দেখা যায় – টিউশনিটা আর নেই। গৃহকর্তা নতুন কাউকে নিয়োগ দিয়েছেন। সত্যিই, বাসা ভাড়া নিলে দারুণ অনিশ্চয়তায় পড়তে হতো। তবে সে একাধিক টিউশনি করতো বলে একটা না একটা থাকতোই, সেটা দিয়ে নিজের খরচ চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না, আর বেশি থাকলে মাকে প্রতিমাসেই কিছু-না-কিছু পাঠাতো। এই সময়েই তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সহপাঠীদের সঙ্গে। প্রথমদিকে নিজের সম্পর্কে কিছুই বলতো না সুমন, কিন্তু পরিচয় গাঢ় হওয়ার পর সে যখন জানায় – তার বাবা যুদ্ধের সময় মারা গেছেন, তার বন্ধুরা কৌতূহলী হয়ে ওঠে।

মারা গেছেন মানে? কীভাবে মারা গেছেন?

যুদ্ধ করতে গিয়ে।

যুদ্ধ করতে গিয়ে?

হুঁ।

মানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?

হুঁ।

মানে তুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান?

হ্যাঁ। তোদের ভাষায় ব্যাপারটা ওরকমই।

আমাদের ভাষা মানে? তোর ভাষা কি আমাদের চেয়ে আলাদা?

আলাদা তো বটেই। আমি গ্রাম থেকে এসেছি না?

গাধা। আমরা সবাই তো গ্রাম থেকেই এসেছি।

সবাই না, কেউ-কেউ।

ওই হলো। যারা শহরে থাকে, তাদের বাপ-চাচারা হয়তো গ্রাম থেকে এসেছিলেন। মানে এক প্রজন্মের পার্থক্য।

এটা অনেক বড় পার্থক্য।

পার্থক্য থাকলেই কী? শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা সব কালে সব জায়গায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাই। গ্রাম আর শহরবিশেষে সেটা পালটে যায় না।

যায় বন্ধু, যায়।

এরকম ইডিয়টের মতো কথা বলছিস কেন?

আমার জায়গায় থাকলে তোরাও এভাবেই বলতি!

কেন বল তো! কী হয়েছে?

আমি যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এটা প্রথম বুঝতে পেরেছি শহরে এসে। আমাদের গ্রামে এর কোনো বালাই নেই। কারো কাছ থেকে কোনোদিন আলাদা মনোযোগ পাইনি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে আমার মা কোনোদিন বিশেষ মর্যাদা পাননি, বরং নানারকম গঞ্জনা সইতে হয়েছে। আমাদের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে রাজাকাররাই বেশি পাওয়ারফুল। তাদের অনেক টাকা, তারাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়, এমপি হয়, মন্ত্রী হয়। তারাই দেশটাকে চালায়। এই বাস্তবতার ভেতরে থেকেও তোরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার ঘটনাকে বিশেষ ব্যাপার বলে মনে করিস?

অবশ্যই করি। দেশের এ-অবস্থা চিরদিন থাকবে না। ক্ষমতাসীনরা রাজাকারদের কাছে টেনে নিয়েছে, ক্ষমতার স্বাদ দিয়েছে, সারাদেশে রাজাকারদের প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, কিন্তু এটাই তো শেষ কথা নয়। এই বিশ্ববেহায়ার পতন হয়ে এলো বলে। আমরা কি সাধে এই আন্দোলন করছি?

এই সরকারের পতন হলেই কী? সমাজ থেকে, দেশ থেকে রাজাকাররা কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? ওরাই ক্ষমতায় আসবে আবার। সরাসরি না হলেও অন্য কোনো দলের হাত ধরে আসবে।

এতো নেগেটিভ কথা বলিস না তো! আমরা বেঁচে থাকতেই ওদের কবর দিয়ে যাবো।

দিস। দিতে পারলে তো ভালোই। আমার কেন যেন বিশ্বাস হয় না। মাঝে-মাঝে মনে হয়, বাবা যদি যুদ্ধে না গিয়ে পালিয়ে-টালিয়ে হলেও বেঁচে থাকতো, তাহলে মাকে এতো যন্ত্রণা পোহাতে হতো না।

বেঁচে থাকলে ভালো হতো, কিন্তু যুদ্ধে গিয়ে তিনি কোনো ভুল করেননি।

তা হয়তো করেননি। কিন্তু আমরা যে কী পরিমাণ দুর্ভোগ সহ্য করেছি, যদি জানতি!

হ্যাঁ, বুঝি দোস্ত। কোনোকিছুই তোদের অনুকূলে ছিল না। কিন্তু তাই বলে সব ছেড়ে দেওয়ারও কোনো কারণ নেই। এখন তুই বড়ো হয়েছিস, মায়ের সব দুঃখ মুছে দিবি।

আমি কি তা পারবো, দোস্ত?

অবশ্যই পারবি। আর তুই একা নাকি? আমরা আছি না? তোর মা তো আমাদেরও মা।

হ্যাঁ, কেবল কথার কথা ছিল না, ওরা সত্যিই সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে। দল ধরে তাদের বাড়িতে গিয়েছে মাকে দেখতে, সমস্বরে মা বলে ডেকেছে, এতোগুলো সন্তান একসঙ্গে পেয়ে মা তো কেঁদেকেটে একাকার। শুধু কি তাই? মাকে ঢাকায় বেড়াতে নিয়ে এসেছে ওরা – সে থাকে হলে, মা থাকবে কোথায়? এই চিন্তাও তাকে করতে হয়নি। যাদের ঢাকায় বাসা আছে সেসব বন্ধু-বান্ধবী রীতিমতো মাকে নিয়ে টানাটানি করেছে নিজেদের বাসায় রাখার জন্য। শুধু তাই নয়, মাকে নিয়ে কতো জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে ওরা! সে কখনো যা করতে পারেনি, ওরা সবাই মিলে সেটিই করেছে মায়ের জন্য। সবার কাছেই তাঁর পরিচয় ‘মা’। এই সম্মান তো অভাবনীয় ছিল। শুধু মাকে সম্মান জানানোই নয়, পরিচয় পাওয়ার পর থেকে বন্ধুরা যেন তাকে আগলে রেখেছে। কখনো এতোটুকু বিপদে পড়তে দেয়নি, এতোটুকু ঝামেলায় পড়তে দেয়নি। বন্ধুদের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এতোখানি সম্মান আর ভালোবাসা তার প্রত্যাশিত ছিল না।

এই বন্ধুরাই তাকে এক জটিল মানসিক সংকট থেকে মুক্তি দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকে যে-অপমানের ভেতর দিয়ে সে বড়

হয়ে উঠছিলো, তাতে তার একরকম বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল যে, এই দেশের জন্য বাবার প্রাণ দেওয়া একেবারে বৃথা গেছে, নিছক অপচয়। গর্ব করা তো দূরের ব্যাপার, বাবার অনুপস্থিতিতে মায়ের এই দুর্দশা তার মনকে ক্রমশ তিক্ততায় ভরে তুলেছিল। বন্ধুরা সেই তেতো অনুভূতিকে বদলে দিয়ে তার মনকে মাধুর্যে ভরে দিয়েছে।

হ্যাঁ, এখন সে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে আসার কথাই ছিল না। বড়ো ক্লান্তিকর ছিল সেই যুদ্ধ, বড়ো বেদনাময়। তার অবস্থাও হতে পারতো সিদ্দিকের মতো। তারই গ্রামের আরেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রতনের সন্তান সিদ্দিক। রতন নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের যুবক, একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। বুড়ো বাপ-মা, বউ আর ছোট্ট সন্তান নিয়ে তার দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনযাপন। তবু সে যুদ্ধে গেল এবং ফিরে এলো লাশ হয়ে। রতনের বাবাকে শেষ জীবনে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে পথে নামতে হয়েছে, তার স্ত্রী বাকি জীবন পার করেছে ঢাকায় মানুষের বাসায় কাজের মেয়ে হিসেবে। আর সিদ্দিক – বাবা নেই, মা শহরে – বুড়ো দাদার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতো এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রামে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে কোনো বাড়তি মনোযোগ পায়নি কখনো সে, বুড়ো বাপটিও পায়নি কোনো সম্মান। বড়ো গ্লানিময় সময় ছিল সেটি, বড়ো অবহেলার। আজকে, এই এতোদিন পর, শহুরে মানুষজন যতো কথাই বলুক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, রতনরা রয়ে গেছে ইতিহাসের আড়ালে। হয়তো কোনোদিনই তাদের কথা জানবে না কেউ। তার অবস্থা তো ওরকম হতেই পারতো! কোন ভাগ্যে যে সে পড়াশোনার সুযোগটুকু পেয়েছিল, নইলে পড়ে থাকতে হতো ওই গ্রামেই। না, গ্রাম নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। অতি মনোহর সেই গ্রাম। কিন্তু কিছু মানুষ এমনভাবে বিষাক্ত করে তুলেছিল তাদের জীবনটিকে যে, সুন্দর কোনো স্মৃতি আর মনে পড়ে না।

এসব ভাবতে-ভাবতে বাসায় এসে পৌঁছলো সে। দরজা খুললো সোমা, আর তার পেছনে দুটো দেবদূত উঁকি দিলো। ঢোকার আগেই বললো – বাবা, তুমি বৃষ্টিতে ভিজেছো?

হ্যাঁ গো মা, ভিজে গেলাম তো!

আমরাও ভিজবো!

এখন তো বৃষ্টি নেই, ভিজবে কী করে?

তুমি তাহলে আগে এলে না কেন?

আগে এলে কী হতো?

তোমার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজতাম!

আমি না থাকলে বুঝি ভেজা যায় না?

যেতে চেয়েছিলাম তো, মা যেতে দেয়নি। দাদাকে বললাম, দাদাও নিয়ে গেল না!

দাদা এসেছে নাকি?

হ্যাঁ। কতো গল্প করলো সারাদিন! শুনবে?

সোমা বললো – নাও হয়েছে, বাবাকে আগে ফ্রেশ হতে দাও, তারপর তোমাদের গল্প শুনবে।

সুমন ভেতরে ঢুকে অভ্যাসবশত মায়ের রুমে গেল। এটা তার চিরকালীন রুটিন। বাইরে যাওয়ার সময় একবার মায়ের কাছে যাবে, ফিরে এসে নিজের রুমে যাওয়ার আগে মায়ের সঙ্গে দেখা করবে। মা দেখে বললেন –

ভিজে তো চুপচুপে হয়ে গেছিস! এই অবেলায় এরকম ভিজে আবার জ্বরটর না বাঁধাস!

না মা, জ্বর আসবে না। রোদ-বৃষ্টিতে আমার কিছু হয় না, জানোই তো। প্রুফ হয়ে গেছি।

হয়েছে, আর বাহাদুরি করতে হবে না। যা গোসল করে নে। বউমা, একটু গরম পানি করে দাও তো।

গরম পানি লাগবে না মা। বৃষ্টির পানির চেয়ে কলের পানি এমনিতেই গরম।

বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াতেই তার মনে হলো, শরীরে এখনো দীপার গায়ের গন্ধ লেগে আছে। ভারি মিষ্টি একটা গন্ধ ওর শরীরে, খুব মৃদু, কাছে ঘেঁষে না দাঁড়ালে বোঝা যায় না। কোন পারফিউম ব্যবহার করে কে জানে! এতোকাল ধরে ওই একই পারফিউম, ওর একঘেয়ে লাগে না? নাকি গন্ধটা ওর নিজস্ব? আজকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল বলে এখনো সেটি হারিয়ে যায়নি। সে খুব মায়াভরে হাত বুলালো নিজের বুকের কাছে, যেখানে দীপা মাথা ঠেকিয়ে বসেছিল। নিজের হাতটিকেও বড়ো সৌভাগ্যবান মনে হলো, এই হাতই তো জড়িয়ে ধরেছিল দীপাকে! মনে পড়লো কবিতার পঙ্ক্তি – ‘এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এই হাতে কোনো পাপ করতে পারি?’ হা-হা-হা … কবিরা পারেনও বটে। এরকম দু-চারটে পঙ্ক্তি লিখতে পারলে জীবন ধন্য হয়ে যেতো।

ভিজতে-ভিজতে অনেকক্ষণ পর তার মনে হলো, বড়ো দীর্ঘ সময় নিচ্ছে সে গোসল করার জন্য। ঘোর লেগে আছে শরীরে ও মনে, ধুয়েমুছে ফেলতে ইচ্ছে করছে না। নিজের ওপর জোর খাটালো সে, এভাবে তো চলবে না! স্বাভাবিক থাকতে হবে। গোসল সেরে এক কাপ চা নিয়ে মায়ের কাছে বসলো আবার।

তোর ছোট মামা এসেছে, শুনেছিস?

হ্যাঁ, শুনলাম।

দেখা করিসনি?

না করিনি। করবো।

কী যে করি ওকে নিয়ে!

কী আর করবে! এখন তো আর করার সময় নেই।

এটা একটা জীবন হলো? কোথাও থিতু হয়ে বসে না। এখানে কিছুদিন তো রানুর বাসায় কিছুদিন, আবার মাঝে-মাঝে কোথায় যে যায় জানতেও পারি না।

ওটাই মামার ধরন মা, বদলানো যাবে না।

কিন্তু এভাবে আর কতোদিন? বয়স হয়েছে না? এরকম অনিয়ম করলে শরীর ভেঙে পড়বে না?

তা পড়বে না। পোড়-খাওয়া মানুষ তো, এতো সহজে রোগশোক ধরবে না।

কোনো একটা কাজে ঢুকিয়ে দিতে পারিস না?

না, মা। থাকুক এভাবে। সারাজীবন বাইরে-বাইরে কাটিয়েছে, এখন কোনো কাজে মন বসবে না।

কী একটা জীবন হলো ওর! কেন যে রাজনীতির পোকা মাথায় ঢুকেছিল! কতো ভালো ছাত্র ছিল, পড়াশোনাটাও শেষ করলো না। যুদ্ধে গেল, ফিরে এলো ভিন্ন মানুষ হয়ে। তারপর সেই যে বাড়ি ছেড়ে গেল…

এসব তো তার জানাই, মা কতোবার বলেছে! তবু বারবার এই কথা তোলে। যুদ্ধ থেকে ফিরে মামা আর পড়াশোনায় ফিরে যায়নি, জড়িয়ে পড়েছিল আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির সঙ্গে। একদিন কাউকে কিছু না বলে চলে গিয়েছিল কোথায় যেন, তারপর বিশ বছর ধরে আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। একদিন কে যেন এসে জানায় –  মামাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভাগ্যিস তখন ক্রসফায়ারের রীতি ছিল না, থাকলে নিশ্চয়ই বাঁচিয়ে রাখা হতো না! নানান মামলায় প্রায় সতেরো-আঠারো বছর জেল খেটে বেরিয়ে এসেছে মামা। তারপর থেকে এখানে-ওখানে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। এর মাঝখানেই ঘটে গেছে কতো-কতো ঘটনা। বড় মামা বিদেশে চলে গেছে, আর ফেরেনি, কোনো যোগাযোগও রাখেনি কারো সঙ্গে। সুমনের পড়াশোনা, খালার পড়াশোনা আর বিয়ে ইত্যাদি ঝামেলা সারতে গিয়ে নানা নিজের ভিটেবাড়িটুকু বন্ধক রেখেছিলেন, যতোদিন নানা-নানি বেঁচে ছিলেন ততোদিন বাড়িটা ছিল বটে, কিন্তু তাঁরা মারা যাওয়ার পর সেটা দখল করে নিয়েছে সেই লোক, যার কাছে বন্ধক ছিল বাড়িটি। দুই মামার কাউকেই তখন পাওয়া যায়নি এই দুর্যোগ থেকে পরিবারটিকে উদ্ধার করার জন্য। খালা তো তার শ্বশুরবাড়িতেই, সুমন মাকে নিয়ে এসেছিল নিজের কাছে। গ্রামের পর্ব ওখানেই শেষ! এগুলোর অনেককিছুই তাকে সামাল দিতে হয়েছে। সেসব কথা সুমন মনে করতে চায় না, কিন্তু মাকে তো আর না করা যায় না। এসব বলে বলে নিশ্চয়ই বুকটাকে হালকা করতে চায় মা!

সুমন আসলে মায়ের কথা শুনছিল না, আনমনা হয়ে পড়ছিল বারবার। থেকে-থেকে দীপার মুখটা ভেসে উঠছিল চোখে আর বুকের রক্ত চলকে উঠছিল। আজকে শুধু শরীর নয়, মনটাও ভিজে কাদা হয়ে আছে। কেমন একটা অস্থিরতা, সেই প্রথম প্রেমে পড়ার মতো, যেন একা-একা সামলে ওঠা যাচ্ছে না। কাউকে বলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু কাকে বলবে? কী-ইবা বলবে? বন্ধুদের কাউকে ফোন করে বলবে যে দীপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল? এটা তো ঘটা করে বলার মতো কোনো বিষয় নয়! দেখা তো হয়ই। নিয়মিত না হলেও বন্ধুদের গেট টুগেদারে, বিভিন্ন আয়োজন-অনুষ্ঠানে তো দেখা হয়ই। কিন্তু আজকের দেখাটি যে অন্যরকম! আজকেই যে পরস্পরকে খোলাখুলিভাবে ভালো লাগার কথা জানালো তারা, প্রেম শব্দটি উচ্চারিত হলো, ভালোবাসার ব্যাপারটি প্রকাশিত হয়ে পড়লো। এসব কি বলা যায়? না, যায় না। যদিও দীপা এবং সুমন দুজনেই ওদের খুব প্রিয় বন্ধু, তবু সম্পর্কের এই নতুন মাত্রাকে কেউ ভালো চোখে দেখবে না। জীবনের এই পর্যায়ে এসে নতুন কোনো সম্পর্ক শুরু করা যায় না। হ্যাঁ, যেতো, যদি এতোদিন ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা জীবনটির কোথাও কোনো খাদ থাকতো, কোনো ভাঙন থাকতো, যেমনটি আছে দীপার। এরকম একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলে সেটা দীপার জন্য হয়তো তা গড়ে ওঠা; কিন্তু সুমনের জন্য তা সমূহ ভাঙন। শুধু সুমনের জন্যই নয়, তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-মা সবার জন্যই ভাঙন। কিন্তু কেনই-বা এতো ভাবছে সে এসব নিয়ে? এমন তো নয় যে সত্যিই সে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, এতো ভাবনা কিসের?

আরেকটা খবর আছে! – নিজের ভাবনায় বুঁদ হয়ে ছিল সুমন, মায়ের কথায় ছেদ পড়লো আবার।

কী খবর, মা?

তোর বড় মামা আসছে।

তাই নাকি? কবে?

আগামী মাসে।

সুমন খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করে দেখলো – মা একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলো, ঠোঁটের কোণে হাসি নেই, মুখটা গম্ভীর।

এতো বছর পর বড় মামা আসছেন, এ তো খুশির খবর মা, তোমার মন খারাপ কেন?

খুশির খবর কি-না, বুঝতে পারছি না যে!

কেন? কী হয়েছে?

তোর মামি আসবে না, ছেলেমেয়েরাও না।

ওদের হয়তো ছুটি নেই। মামা একা এলে সমস্যা কী?

সমস্যা নাই। কিন্তু তোর মামা জানিয়েছে, আর বিদেশে ফিরে যাবে না, এখানেই থাকবে।

ও! তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে?

হয়েছে, কিন্তু আমাকে এসব কিছু বলেনি। বলেছে রানুকে।

খালা জিজ্ঞেস করেনি কিছু?

করেছে হয়তো। আমাকে তো সব কথা বলে না।

আচ্ছা, আমি জেনে নেবো। এতো ভাবছো কেন তুমি? থাকতে চাইলে থাকবে।

এটা একটা কথা বললি? বউ-বাচ্চা রেখে এই বয়সে একা একা থাকবে? আর এখানে বাড়িঘর আছে নাকি? থাকবে কোথায়?

থাকার জায়গার অভাব হবে নাকি? আমাদের কাছে থাকবে!

তোর কাছে তো কোনো কিছুই কোনো সমস্যা না। এলে দেখবি, কতো ঝামেলা হয়!

সুমন হাসে – এর চেয়ে অনেক বড়ো-বড়ো ঝামেলা আমরা পেরিয়ে এসেছি মা। এগুলো আসলেই কোনো সমস্যা না। অতো ভেবো না তো! আগে আসুক তো, তারপর দেখা যাবে।

মায়ের সঙ্গে নিত্যদিনের গল্পটল্প করে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে সুমন। ক্লান্ত লাগছে অকারণে। শরীরে একটু-একটু ব্যথা। বৃষ্টিতে ভেজার ফল। ছেলেমেয়ে দুটো টিচারের কাছে পড়ছে, নইলে ওদের সঙ্গে খেলাধুলা করে একটু চাঙ্গা হওয়া যেতো। সোমা এলো  এই সময়ে। বললো –

অসময়ে শুয়ে আছো যে? শরীর খারাপ লাগছে?

না। এই একটু ম্যাজম্যাজ করছে।

বৃষ্টিতে ভিজেছো, করবে না? তেল মালিশ করে দিই?

আরে না। ওসব কিছু লাগবে না।

আহা, না করছো কেন? দিই একটু। আরাম লাগবে।

আচ্ছা দাও।

তেল মালিশ করতে-করতে সোমা একসময় জিজ্ঞেস করলো – কোথায় গিয়েছিলে আজকে?

সুমন আরামে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। অসময়ে ঘুমালে রাতে আর ঘুম আসবে না, তবু। সোমার প্রশ্ন শুনে বললো, কোথায় আর যাবো? টুকিটাকি কাজগুলো সারতে চেয়েছিলাম বলে…

কোন কাজ?

ওই যে তুমি একটা লিস্ট ধরিয়ে দিলে না? ভাবলাম কিনে নিয়ে যাই…

কেনোনি তো!

না, কেনা আর হলো না!

কেন? কোথায় গিয়েছিলে?

সন্দেহ করো নাকি বউ?

নাহ। তুমি সন্দেহ করার মতো লোক নও।

তাহলে?

 

তোমার গা থেকে একটা অন্যরকম গন্ধ ভেসে আসছে। এ-গন্ধ তোমার গায়ে থাকে না, তাই জিজ্ঞেস করলাম।

সুমন চমকে উঠলো। দীপার গায়ের গন্ধ কি এখনো লেগে আছে গায়ে। গোসল করার পরও? উপুড় হয়ে শুয়ে-শুয়ে আরাম খাচ্ছিল সুমন, এবার সোজা হয়ে শুয়ে জিজ্ঞেস করলো –

তুমি সত্যিই বোঝো? নাকি আন্দাজে ঢিল ছুড়লে?

না গো, সত্যিই বুঝি। নিজের স্বামীর গায়ের গন্ধ সব মেয়েই চেনে।

হুম। বটে। দীপার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ওকে এগিয়ে দিয়ে এলাম।

ও, এই কথা! এটা বলতে এতো সংকোচ করছো কেন?

দীপা’পার সঙ্গে তো এই প্রথম দেখা হলো না!

না, তা নয়। এটা বলার মতো কোনো কথা বলে মনে হয়নি।

তা ঠিক।

তুমি সত্যিই বুঝতে পেরেছিলে?

কী?

গায়ের গন্ধ?

না পারলে বললাম কীভাবে?

দীপার কথা শুনে তোমার খারাপ লাগেনি?

খারাপ লাগবে কেন? উনি তো তোমার বন্ধু!

যদি এমন হয়, ওকে আমি জড়িয়ে ধরেছি?

না হয় একটু ধরলেই!

তুমি কষ্ট পাবে না?

তুমি তো সেটা করবেই না, কষ্ট পাবো কেন?

এতো বিশ্বাস করো কেন সোমা? পুরুষ মানুষের চরিত্র…

তুমি খুব ভালো মানুষ। সেজন্যই বিশ্বাস করি। তোমরা সবাই আসলে খুব ভালো মানুষ। তুমি ভালো, মা ভালো, মামাও খুব ভালো। খালাও। এমন ভালো মানুষে ভরা একটা পরিবার বোধহয় জগতে আর একটাও নেই।

তোমার মনটা খুব ভালো সোমা, সেজন্যই সবাইকে ভালো মনে হয়।

তা নয় গো, খারাপ মানুষ আমি অনেক দেখেছি জীবনে। ভালো-খারাপ দুটোই বুঝি।

সুমনের একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ হতে লাগলো। সোমা আসলে খুব সরল আর মায়াবী। মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছে সুমন,       কোথাও ভুল হয়নি তাঁর, এমন মেয়ে বউ হিসেবে পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। বিয়ের পর মায়ের সঙ্গে মিলেমিশে চমৎকার এক সংসার গড়ে তুলেছে সোমা। কিছুই তো ছিল না সুমনের, এই শহরে সে বহিরাগত, গ্রামের বাড়ি বলতেও কিছু নেই, দাদার বাড়ি কখনো চোখেই দেখেনি, নানার বাড়িতেও প্রায় আশ্রিত জীবন কেটেছে। ফলে সংসার গড়ে তুলতে হয়েছে একেবারে শূন্য থেকে, একটু-একটু করে তিলে-তিলে সোমা সাজিয়ে তুলেছে সবকিছু। এখন আর কোথাও কোনো অপূর্ণতা নেই, সাজানো-গোছানো ছোট্ট সুখের সংসার, পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সংসার, কোথাও কোনো খুঁত নেই।

পাশ করার পর বন্ধুদের মতো সে-ও ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছিল, ঝুঁকিপূর্ণ বেসরকারি চাকরিতে যাওয়ার সাহস হয়নি বলে সরকারি ব্যাংকে যোগ দিয়েছে। বন্ধুরা বলেছিল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে কোটার সুবিধা নিতে। তার ইচ্ছে করেনি। তাছাড়া, তার বাবা যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এরকম কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রও তাদের কাছে নেই বা জোগাড় করার কথা এতোকালেও তার বা মায়ের মনে হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে সেসব ব্যবস্থা করা দারুণ ঝক্কির ব্যাপার বলে মনে হলো সুমনের। তাছাড়া, মা যেখানে কোনোদিন বিশেষ সুবিধা নেওয়ার কথা ভাবেনি, সে কেন নেবে?

মাকে দেখে সে বরাবর অবাক হয়। এতো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সয়েও মহিলা এতো শক্ত থাকে কীভাবে? এতো শক্তি তার আসে কোত্থেকে? একবার সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, এতো যন্ত্রণা সয়েছে তবু বিয়ে করেনি কেন, মা বলেছিল – ‘যে-মানুষটি দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন, তার স্ত্রী কি অন্য কোনো পুরুষকে মেনে নিতে পারে? অন্য কোনো মানুষ কি তার সমান হতে পারবে কোনোদিন?’

বাবাকে সুমনের মনে পড়ে না, কিন্তু মা যেন বাবার বলা প্রতিটি শব্দ মুখস্থ করে রেখেছে – ‘তোর বাবা কিন্তু ঝোঁকের মাথায় যুদ্ধে যাননি, খুব সচেতনভাবে ভেবেচিন্তে গিয়েছেন। বলতেন – ব্যক্তিগত লাভের কথা ভেবে বা কোনোকিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করছি না। এটা হলো সময়ের ডাকে সাড়া দেওয়া, নইলে যে নিজের কাছে ছোট হয়ে যাবো। দেশটা স্বাধীন হোক, আমরা এমনিতেই ভালো থাকবো।’ ভালো ছিল না মা, তবু কখনো বিশেষ সুবিধা নেয়নি বা চায়নি। বাবা তো বিনিময় চাননি, মা কেন চাইবে? আর তাঁদের সন্তান হয়ে সে-ই বা চাইবে কেন?

এমনই দুর্ভাগ্য মায়ের যে, জানতেও পারেনি, তার স্বামী কোথায় মারা গেছেন, কোথায় তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছে। এক রাতে সহযোদ্ধারা এসে বাড়িতে খবর দিয়ে সেই রাতেই ফিরে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে অনেকদিনের কোনো স্মৃতি নেই মায়ের, অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে।

চাকরিতে যোগ দিয়ে মাকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় নিয়ে এসেছে সে, মায়ের পছন্দেই বিয়ে করেছে, দুটো ফুটফুটে বাচ্চা হয়েছে তাদের। মা তাদেরকে নিয়ে দারুণ ব্যস্ত, পুত্রবধূর সঙ্গে তার সম্পর্কও অতি স্নেহের-মমতার-ভালোবাসার। যেন আর কোনো অপূর্ণতা নেই; তার চিরদুঃখী মুখে এখন যেন আর কোনো বেদনার চিহ্ন নেই। একটু টানাটানি আছে সংসারে। তাতে কী? এই গরিব দেশে এর চেয়ে ভালো থাকাও এক ধরনের অপরাধ বলেই মনে হয় সুমনের।

সোমা একেবারে মিশে গেছে এই পরিবারের সবার সঙ্গে। মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা এতো মধুর, এতো প্রাণবন্ত যে, নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। সে কি তবে আজকে প্রতারণা করলো সোমার সঙ্গে? দীপার সঙ্গে ওই কথোপকথন, ওই আলিঙ্গন কি খুব অপরাধ হয়ে গেল? সে ভেবে কূল পায় না।

 

তিন

বাসায় ঢুকতে-ঢুকতে দীপা ভাবছিল, আজকে মায়ের বকুনি থেকে আর মুক্তি নেই। ভেজা কাপড়ে তাকে ঢুকতে দেখে মা কটমট করে তাকালো বটে; কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজের রুমে ঢুকে গেল দীপা এবং দেরি না করে বাথরুমে চলে গেল। গোসল করবে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মেজাজ খিটমিটে হয়ে যাচ্ছে, অথচ কী মিষ্টি এক মহিলা ছিলেন! বেশি বয়সে মেয়ের ডিভোর্সের চাপ সইতে পারছেন না বোধহয়! কিন্তু তার তো কিছু করারও ছিল না! সে তো বহু বছর ধরেই সবকিছু মেনে নিচ্ছিল, কিন্তু দু-তিন বছর ধরে এতো অসহনীয় হয়ে উঠেছিল মাহবুবের, মানে স্বামী পরিচয়ধারী লোকটার ব্যবহার, কারণে-অকারণে এতো অসম্মান করতো তাকে যে, আর সহ্য করা গেল না। যাকগে, এসব কথা এখন ভাবতে ভালো লাগছে না, সারাক্ষণই তো ভাবে! বরং এখন সুমনের কথা ভাবতে ইচ্ছা করছে। লাজুক ছেলেটা আজকে এমন সাহসী হয়ে উঠলো কী করে কে জানে! কোমর জড়িয়ে বসেছিল রিকশায়, আর তার কী যে ভালো লাগছিল! সত্যি বলতে কী, কামনায় উষ্ণ হয়ে উঠেছিল তার শরীর! এখন ভেবে লজ্জা হচ্ছে। কি বেহায়ার মতো আচরণ করেছে আজকে সে! ভেজা শরীরের দিকে তাকাতে বলেছে, সুমনের ইচ্ছা করে কি-না জানতে চেয়েছে! ছিঃ! কী ভেবেছে সুমন! নাহ! কী ভাববে? ও তো খুব ভালো করেই চেনে দীপাকে। সে তো কখনো শরীরসর্বস্ব মেয়ে ছিল না। সুন্দরী সে, আকর্ষণীয়, নিজেও তা জানে, কিন্তু সেটিকে কখনো প্রদর্শনযোগ্য করে তোলেনি। কখনো কারো মনোযোগ আকর্ষণের জন্য শরীরী সৌন্দর্যকে ব্যবহার করেনি, বরং যথাসম্ভব মার্জিত থেকেছে সবসময়। তাতে অবশ্য লাভ হয়নি কিছুই। মাহবুবের সন্দেহের তীব্র বিষ-মাখানো তীর এসে তাকে বিদ্ধ করেছে বারবার, সে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, চুপ করে মেনেও নিয়েছে সবকিছু অনেক বছর ধরে। কিছুই করেনি সে কোনোদিন, কারো সঙ্গে বিশেষ কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি, এমনকি বন্ধুদের সঙ্গেও এক ধরনের দূরত্ব বজায় রেখেছে দাম্পত্য জীবনকে সুস্থির রাখতে, তবু মাহবুবের সন্দেহ থেকে সে মুক্তি পায়নি কোনোদিন। অদ্ভুত ছিল লোকটা, সব অর্থেই। দীপার সঙ্গে কোনো মিলই নেই। নিজে দেখেশুনে বিয়ে করলে নিশ্চয়ই এই ধরনের লোককে পছন্দ করতো না! অবশ্য যারা মুখোশ পরে থাকে, খুব কাছে না গেলে তাদেরকে চেনাও যায় না। নইলে বাবা তো দেখেশুনেই বিয়ে দিয়েছিলেন, দীপার নিজের কোনো পছন্দ ছিল না বলে এ ছাড়া বাবার কোনো উপায়ও ছিল না। দেখতে-শুনতে ভদ্রলোক, কথাবার্তায় ভদ্রলোক, শিক্ষিত-মার্জিত ধোপদুরস্ত একজন লোকের ভেতরে যে অমন কদর্য একটা মন লুকিয়ে আছে, কে-ই বা ভেবেছিল? অমন কুৎসিত ভাষায় সে গালমন্দ করতে পারে, তাই-বা কে জানতো? বাইরে প্রগতিশীল অথচ ভেতরে ভীষণ রক্ষণশীল, দীপার চাকরি করাটা পছন্দ করতো না, অথচ তার টাকার প্রতি লোভ ছিল। কোনো পুরুষ-মানুষের সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করতো না অথচ তার

বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে হাসিমুখে কথা না বললে মেজাজ দেখাতো – এ-ধরনের অজস্র স্ববিরোধিতায় ভরা একটা লোকের সঙ্গে সংসার করতে গিয়ে সে হাঁপিয়ে উঠেছিল। আরেকটা বড় সমস্যা ছিল – রাজনৈতিক ব্যাপারে মতবিরোধ। দীপা বরাবরই রাজনীতি সচেতন, এক সময়ের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীও বটে। চাকরি-বিয়ে-সংসার এসবের ঘেরাটোপে, এবং খানিকটা বিরক্তি থেকেও বটে, সক্রিয় রাজনীতি সে ছেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মতাদর্শটি বিসর্জন দেয়নি। স্বাভাবিকভাবেই এসব ব্যাপারে তার পরিষ্কার মতামত ও অবস্থান ছিল, সেটা মাহবুবেরও ছিল – তবে একবারে বিপরীত মেরুর। নানারকম ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে এতোদিনে দীপা বুঝে গিয়েছে, রাজনীতি সচেতন না হওয়াই ভালো, সুখী হওয়া যায় না। কিন্তু তারা এমন এক সময়ের মানুষ, যখন রাজনীতি ছিল জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ, সচেতন না হয়ে উপায়ও ছিল না। তাছাড়া বাসায় একটা রাজনৈতিক আবহ ছিল, বাবা সক্রিয় রাজনীতি না করলেও এসব নিয়ে প্রায়ই আলাপ তুলতেন, মুক্তিযুদ্ধের গল্প করতেন, ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতেন, আর সেসব কথাবার্তা শুনতে-শুনতে দীপা আর সজীব – তার ছোট ভাই – দুজনেই রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। তার ফল ভালো হয়নি। সচেতন হওয়ার ভার এখনো বহন করে চলতে হচ্ছে দুজনকেই। তার নিজের জীবন তো এলোমেলো হয়েছেই, সজীবেরটাও হয়েছে।

দীপা মাঝে-মাঝে ভাবে, তার যদি একটা সন্তান হতো তাহলে কি মাহবুবের সঙ্গে সম্পর্কটা একটু সহনীয় হয়ে উঠতো? এতো বছরেও কোনো সন্তান হলো না, ঘরের মধ্যে দুজনমাত্র মানুষ, সেই দুজনের মধ্যে যদি এতো প্রশ্নবোধক চিহ্ন থাকে তাহলে ঘরটিই তো বিষাক্ত হয়ে ওঠে! তবু সামলে-সুমলে চলছিল দীপা, এসব যন্ত্রণা নিয়েই চলছিল তার জীবন। কিন্তু প্রায় থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো শাহবাগের সেই বিস্ময়কর উত্তাল দিনগুলো শুরু হওয়ার পর থেকে। অন্য অনেকের মতো ওই সময় দীপার গতানুগতিক রুটিনেও বেশ চমকপ্রদ পরিবর্তন এসেছিল, বাসায় ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল প্রতিদিন। শাহবাগে গিয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে বেশ খানিকটা সময় না কাটিয়ে পারতো না সে। পারবেই বা কীভাবে? এরকম জাদুকরী ঘটনা নিজ চোখে দেখার সুযোগ কজন মানুষই বা পায়? কয়েকদিন ধরে প্রায় লাখখানেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে এখানে। শাহবাগকে কেন্দ্র করে চারপাশের রাস্তায় এই এতো মানুষ। রূপসী বাংলার মোড় থেকে টিএসসি পর্যন্ত আর ওদিকে আজিজ মার্কেট থেকে রমনা-সোহরাওয়ার্দী পার্কের ফুটওভার ব্রিজ পর্যন্ত কেবল মানুষ আর মানুষ! ক্ষণে-ক্ষণে সেস্ন­vগান হচ্ছে, নিত্যনতুন সব সেস্ন­vগান, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই হারিয়ে-যাওয়া সেস্ন­vগানও ফিরে এসেছে নতুন করে। শুনলেই শরীরে শিহরণ জাগে, রক্তে কী যেন এক দ্রোহের নাচন লাগে। কী চায় এই মানুষগুলো? রাজাকারদের শাস্তি! আশ্চর্য লাগতো দীপার। মানুষের মধ্যে এতো তীব্র ক্ষোভ জমে ছিল? কই, বোঝা তো যায়নি কখনো! আন্দোলনটি গড়ে উঠেছে তরুণদের আহবানে-উদ্যোগে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কিন্তু এসে জড়ো হয়েছে সব বয়সের মানুষই। দেশে তো বটেই, সারা পৃথিবীর গণমাধ্যমেই এখন এই আন্দোলনের খবর। আগে যারা রাজাকারদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতো ইসলামি আন্দোলনের নেতা হিসেবে, বিচারের ব্যাপারটাকে দেখাতে চাইতো সরকারের রাজনৈতিক আক্রোশ হিসেবে, এই আন্দোলন দেখে তারাও বলতে বাধ্য হচ্ছে – যাদের বিচার হচ্ছে তারা সব যুদ্ধাপরাধী। কোটি-কোটি টাকা দিয়ে লবিস্ট নিয়োগ করে রাজাকাররা সারা পৃথিবীর কাছে যে অপপ্রচারটিকে প্রায় ‘সত্য’ বলে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল, তরুণরা কেবল রাজপথে বসে থেকেই তা ভ-ুল করে দিলো। কম বড় কথা নয়! কতো খেলাই না দেখালো এই রাজাকারগুলো! যাদের ঝোলার কথা ফাঁসির দড়িতে, তারা বসেছে মন্ত্রিত্বের চেয়ারে! আর কী আস্ফালন তাদের, কোনো ভুলই নাকি করেনি একাত্তরে! ভাবা যায়? এরকম অদ্ভুত ঘটনা বোধহয় পৃথিবীর আর কোনো দেশে ঘটেনি। এসবের বিরুদ্ধে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ আর দিনরাত একাকার করে একটানা সতেরো দিন অবস্থান নেওয়ার মতো ঘটনাও বোধহয় এর আগে ঘটেনি কোথাও। যাহোক, এসব কর্মসূচির ব্যাপারে দীপা খুব একটা মাথা ঘামাতো না। এতো মানুষের সমাগম, এতো সরগরম, যেন উৎসব লেগেছে, সে সেটুকুই দেখতে যেতো। সেস্ন­vগানে গলাও মেলাতো, আর ফিরে-ফিরে আসতো তার তারুণ্যের কাল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়, ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলনের সেই অভূতপূর্ব সময় সব মনে পড়ে যেতো। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যেতো। রাজনীতির সহযোদ্ধা বন্ধু, সহপাঠী বন্ধু সবাই যেন এসে মিশেছিল শাহবাগের মোহনায়। সুমনের সঙ্গেও দেখা হতো, সে নাকি প্রতিদিনই আসে এখানে। ওর ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত। রাজনীতি নিয়ে তার ভাবনাগুলো কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া আর কেউই জানে না, কারণ এসব ব্যাপারে তার মতামত সে কারো কাছেই প্রকাশ করে না। সেই ছাত্রজীবনে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বন্ধুরা যখন দলবেঁধে মিছিলে যেতো, সে বসে থাকতো ঘরে, বলতো –

তোরা যা, আমার ভয় করে!

গাধা নাকি! আমরা সবাই যাচ্ছি, আর তুই একা ভয় পাচ্ছিস?

পাচ্ছি তো, পেলে কী করবো!

ভয় পাবি কেন? কী হবে গেলে?

যদি গুলি করে দেয়!

ইডিয়ট! রোজ-রোজ গুলি করে নাকি?

আমি যেদিন যাবো সেদিন নিশ্চিত গুলি করবে।

গাধার মতো কথা বলিস না। হাজার-হাজার মানুষ যাচ্ছে মিছিলে, কারো কিছু হচ্ছে না, আর তোকে দেখলেই গুলি করবে?

কারো কিছু হচ্ছে না মানে? মানুষ মরছে না? প্রায়ই তো মরছে!

হ্যাঁ মরছে, তাই বলে সবাই তো আর মরে যাচ্ছে না!

আমি গেলে মরে যাবো। আমার কপালটাই খারাপ। বিপদ আমার সাথে-সাথে চলে।

আচ্ছা থাক বসে গাধা। বসে-বসে ঘাস খা।

ঘাস সে খেতো না, কিন্তু তার নাকি বুক ধুকধুক করতো। ওরা যে গেল, ঠিকঠাক মতো ফিরে আসবে তো! যা সব ঘটনা ঘটছে! তখন সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মরিয়া

হয়ে উঠেছে সরকার। মিছিলে যাওয়া ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন গুলি না খেলেও টিয়ার গ্যাস বা পুলিশের লাঠির বাড়ি খাচ্ছে প্রায় নিয়মিতই। সরকারের ক্যাডার বাহিনীও খুব সক্রিয়। একটা-দুটো লাশ না ফেললে নাকি তাদের সেদিন পেটের ভাত হজম হয় না! এসব জেনেও কোন সাহসে যে এরা যায়! এসব ভাবতে-ভাবতেই বন্ধুরা ফিরে এসে বিপুল উচ্ছ্বাস নিয়ে সেদিনের কর্মসূচির বিবরণ দিতো, আর সুমন নাকি অবাক হয়ে ভাবতো – এগুলোর মনে অসুরের শক্তি, নইলে কি কেউ আর্মি ডিক্টেটরের গুলির সামনে দাঁড়ায়? এসব কথা দীপা পরে শুনেছে সুমনের কাছে। অবশ্য শেষের দিকে, সরকারের সমস্ত প্রতিরোধের বাঁধ যখন ভেঙে পড়েছিল তখন সুমনও যেতো মিছিলে। আর শেষ চার-পাঁচদিনে, রাজপথ দখল করে মঞ্চ বানিয়ে সারা দিনরাত গান-আবৃত্তি-নাটকের সেই দিনগুলোতে, সেও বন্ধুদের সঙ্গে ওখানেই পড়ে থাকতো। সে ভীতু বটে; কিন্তু রোমাঞ্চকর সেই অভিজ্ঞতার আনন্দ কে-ই বা মিস করতে চায়? কে জানে সে সত্যিই ভীতু ছিল কি-না, নাকি বানিয়ে-বানিয়ে এসব বলে বোকা বানাতো বন্ধুদের! কারণ এর বছর দুয়েকের মাথায় শহিদজননীর নেতৃত্বে রাজাকারদের বিচারের দাবিতে সেই অবিস্মরণীয় আন্দোলন শুরু হলে সুমন  একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সবার আগে। হয়তো তার ব্যক্তিগত দুঃখবোধ তাকে এতোটা সক্রিয় করে তুলেছিল। একদিন কথা প্রসঙ্গে সুমন বলেছিল – মানুষের এই ধরনের জাগরণ দেখতে তার ভালো লাগে। মনে হয়, প্রতিদিনের ভাত-কাপড়ের চিন্তার বাইরেও মানুষ আসলে আরো অনেক কিছু নিয়ে ভাবে। শুধু নিজের ঘরে বন্দি না থেকে তারা নিজেদেরকে ছড়িয়ে দেয় সমাজ ও দেশের অনেক মানুষের মধ্যে। নিঃসন্দেহে এই ধরনের মানুষ তার মতো ছাপোষা-নিরাপত্তাকামী মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নিজেদের জীবন বিপন্ন করার মতো ঝুঁকি নেয় তারা অন্য অনেক মানুষের কথা ভেবে, অন্যদের কল্যাণচিন্তায়। বলেছিল, রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ সে বুঝে উঠতে পারেনি কোনোদিন, হয়তো সেজন্যই অগ্নিগর্ভ সময়ের মানুষ হয়েও রাজনীতি ব্যাপারটাকে সে পছন্দই করতে পারলো না। যেমন আজ পর্যন্ত কোনোভাবেই সে বুঝতে পারেনি – যুদ্ধের সময় এতো অপরাধ করা সত্ত্বেও স্বাধীনতাবিরোধী দলটিকে রাজনীতি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেন? সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও সর্বহারা পার্টির মতো প্রগতিশীল দলকে যদি চরমপন্থী সন্ত্রাসের অভিযোগে নিষিদ্ধ করে রাখা যায়, তাহলে স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে রাখলে কী ক্ষতি হতো? সে এ-ও বোঝেনি কোনোদিন, দেশে এতো মানুষ থাকতে আর্মি শাসকরা কেন মন্ত্রী বানানোর জন্য রাজাকারদের বেছে নিয়েছিল? কেনই-বা প্রধান দলগুলো এইরকম একটা তৃতীয় সারির দলকে কাছে টানার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর সে পায় না। সবই যদি ক্ষমতার জন্য হয়, ক্ষমতার জন্য যদি এতোটা আপস করা যায়, যদি এতোটা ভ্রষ্ট হওয়া যায়, তাহলে সেই রাজনীতি নিয়ে কথা বলার মানেই হয় না। সে বলেও না। কিন্তু এই দেশে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির বাইরে থাকাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ যদি ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে চায় তবু পারবে না, রাজনীতি নিজেই ঢুকে পড়বে ঘরের ভেতরে।

যাহোক, এই যে প্রতিদিন শাহবাগে যেতো দীপা, এটা মোটেই পছন্দ করেনি মাহবুব। কুৎসিত সব কথাবার্তা বলতো সে এই আন্দোলন আর আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে। এমনিতেই মাহবুব এই বিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, তার ওপর এসব বিষ-মাখানো কথাবার্তা দীপার গায়ে জ্বলুনি ধরিয়ে দিতো। সে কিছুতেই বুঝতে পারতো না, রাজাকারদের জন্য লোকটার এতো দরদ কেন? এমন তো নয় যে, তার কোনো আত্মীয়স্বজনের বিচার করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে জাতীয় বিষয়ের ওপর, এমনও নয় যে, সে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, তবু কেন তার এতো দরদ তাদের জন্য? এর ছিটেফোঁটাও তো তার মধ্যে দেখা যায় না মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য, শহিদের জন্য, ধর্ষিত নারীদের জন্য। এসব নিয়ে খিটিমিটি লেগেই থাকতো প্রতিদিন। দীপা অনেক কিছু সহ্য করেছে, কিন্তু এই ব্যাপারটি মানতেই পারলো না, চুপ করেও থাকতে পারলো না। ধীরে-ধীরে এতোটাই তিক্ত হয়ে উঠলো দুজনের সম্পর্ক যে, একসঙ্গে থাকাটা আর সমীচীন মনে হলো না।

হঠাৎ দীপার মনে হলো, এই এতোক্ষণ ধরে সে মাহবুবের সঙ্গে সেই তিক্ত স্মৃতিগুলোর কথাই ভেবেছে, যদিও ভাবতে চাইছিল কেবল সুমনের কথা। সদ্য সুখস্মৃতির চেয়ে পুরনো দিনের তিক্ত স্মৃতিই তাহলে বেশি শক্তিশালী? মানতে কষ্ট হলো দীপার। একবার ভাবলো, শুয়ে পড়বে; ঘর অন্ধকার করে সুমনের কথা ভাববে। আবার মনে হলো, সেটা ঠিক হবে না। বাইরে থেকে ফিরে মায়ের সঙ্গে কথা বলেনি, এখন না খেয়ে শুয়ে পড়লে খামোকা তার দুশ্চিন্তা বাড়বে। মা নিশ্চয়ই খাবার দিয়ে দিয়েছে টেবিলে। গিয়ে দেখলো, হ্যাঁ, তাই। খাবার নিয়ে চুপচাপ বসে আছে মা। দীপা বললো –

বাবা খেয়ে নিয়েছে, মা?

না খায়নি। আজকে শরীরটা আবার খারাপ করেছে। ভাত খেতে চাইছে না। সাগু খেলো।

ও! সজীব? ও খাবে না?

বললো তো খাবে না।

খাবে না কেন? কী হয়েছে?

জানি না।

যাই ডেকে নিয়ে আসি।

থাক। ও এখন খাবে না। তুই খা।

তুমি খাবে না?

হ্যাঁ খাবো। তোর জন্য বসে ছিলাম।

স্যরি মা, আজকে অনেক দেরি করে ফেললাম।

হুঁ। দেরি হলো কেন? কোথায় গিয়েছিলি?

কোথাও যাইনি মা, এমনিই একটু ঘুরলাম।

গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছিস!

হ্যাঁ, মা। বৃষ্টিটা দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না।

তাই বলে একা-একা এতো রাত পর্যন্ত!

তাতে কী মা? আর তাছাড়া, এতোক্ষণ তো আর একা ছিলাম না।

কে ছিল?

সুমন।

ও! ওর সঙ্গে দেখা হলো কোথায়?

রাস্তাতেই। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন চিনতেই পারছে না।

এ আবার কেমন কথা? চিনবে না কেন? তোরা এতোদিনের বন্ধু!

আমিও অবাক হয়েছিলাম। পরে মনে হলো, অন্য কারণে চিনতে পারেনি।

কী কারণ?

আমি ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটছিলাম, ওটা দেখে নাকি ওর মায়ের কথা মনে পড়ছিল। তিনি নাকি সারাবছরই ছাতা ব্যবহার করতেন!

ওটা অনেকেই করে।

না, মা। ওনার তো অন্য ব্যাপার। তিনি নাকি নিজেকে আড়াল করার জন্য…

কেন? নিজেকে আড়াল করার কী হলো?

কী জানি! তুমি তো জানোই, গ্রামের লোকেরা নানা ধরনের কথা বলতো, হয়তো সেজন্যই…

হ্যাঁ, গ্রাম হোক, শহর হোক কারণে-অকারণে মেয়েদের সবসময় কথাই শুনে যেতে হয়!

দীপা চুপ করে রইলো। মা-ই আবার বললেন –

কেমন আছেন তিনি?

ভালোই আছেন। নাতি-নাতনি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, অনেকদিন পর ভাইকে ফিরে পেয়েছেন, সেই স্বস্তিও আছে…

অনেক কষ্ট করেছেন মহিলা। সুমনের খবর কী?

সে-ও ভালোই আছে।

এখন পোস্টিং কোথায়?

ঢাকাতেই। ফার্মগেট ব্রাঞ্চের ম্যানেজার।

বাহ, ভালো তো! অনেকদিন আসে না এদিকে। আজকে নিয়ে এলি না কেন?

এতো রাত হয়ে গেল! আর তাছাড়া…

তাছাড়া কী?

আমি ভেবেছিলাম, তুমি রাগ করবে।

রাগ করবো কেন?

না মানে, এতো রাতে…

সুমনকে কি আমি আজকে থেকে চিনি? ও কি আজকেই প্রথম আসছে? কতোদিন এসেছে, আপাও তো এসেছেন, থেকেছেন। কী ভালো ছেলেটা!

তুমি ওকে এতো পছন্দ করো, মা?

করবো না? হার-না-মানা একটা ছেলে। পছন্দ না করে উপায় আছে?

কখনো বলোনি তো!

আমি তো ভেবেছিলাম, তুই-ই আমাদের বলবি!

ও! তোমরা এরকম ভেবে রেখেছিলে?

সেটা কি খুব দোষের?

না, দোষের নয়। কিন্তু কখনো আমাকে বুঝতে দাওনি তো!

খেয়াল করলে বুঝতে পারতি।

আমি তো তোমাদের বোকা মেয়ে, মা। কতো ভুল করলাম জীবনভর! তোমরা একটু বোঝালেই পারতে। তোমাদের অবাধ্য তো কখনো হইনি।

আমরা ভেবেছি, তোর পছন্দ নয়, পছন্দের হলে তো বলতিই!

হয়েছে উলটোটা, মা। তোমরা পছন্দ করবে না ভেবে বলিনি!

সুমনকেও বলিসনি?

নাহ। ওকে আমি বলবো কেন? ও বলতে পারেনি কেন?

সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করিস।

করেছি।

কী বলে?

সে-ও ভয়ে বলেনি!

ভালোই! সবাই মনে-মনে ভেবে বসে আছে, কেউ মুখ খোলেনি!

দীপা চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ পর মা-ই বললেন –

আমার জীবনটা কেমন হয়ে গেল! ছেলেটা অসুস্থ, তোর সুখ হলো না, তোর বাবাও মুখ গোমড়া করে রাখে সারাদিন। একা-একা কী যেন ভাবে। আমারও মন-মেজাজ ভালো থাকে না।

কারণে-অকারণে তোদের বকি।

এসব কথা থাক না মা!

হ্যাঁ, বলেই বা কী হবে? যাকগে, সুমনকে একদিন আসতে বলিস। কতোদিন ওকে দেখি না! আপাকেও নিয়ে আসতে বলিস, বউ-বাচ্চাও যেন আসে।…

দীপা এবারো কোনো কথা বললো না। এ-বাড়ির কেউ কখনো নিজের দুঃখের কথা অন্য কাউকে বলে না। মা বলে না, বাবা বলে না, সজীব বলে না, দীপা নিজেও নিজের ক্ষোভ-দুঃখ-হতাশা গোপন করে রাখে। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা যেন একেবারেই আলাদা ধরনের। সুমনকে নিয়ে যে বাবা-মায়ের এ-ধরনের চিন্তা ছিল, সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। কেন পায়নি? সে কি এতোই বোকা? না, তা নয়। সে সত্যিই তেমন লক্ষ করে দেখেনি ব্যাপারটা। সুমনের মা যখন প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলেন, তখন দীপা তাঁকে নিয়ে এসেছিল এই বাসায়। বাবা-মা খুবই সমাদর করেছিলেন তাঁকে। বেশ কয়েকদিন রেখে দিয়েছিলেন জোর করে। প্রতি বেলায় বিশেষ কিছু রান্না করতো মা, তারপর নিয়ে বেড়াতে বেরোতো। সুমনকেও খুব আদর করতো মা-বাবা দুজনেই। একেবারে নিজের ছেলের মতোই। সজীবের সঙ্গেও ছিল দারুণ সখ্য। নিজের আঁকাআঁকি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুমনের সঙ্গে গল্প করতো সজীব, যে-গল্প শোনার অধিকার আর কারোরই ছিল না। দীপা ভেবেছে, শহিদের সন্তান বলেই মা-বাবার একটা বিশেষ স্নেহ পায় সুমন। বাবা নিজেও মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাঁর যে একটা দুর্বলতা থাকবে শহিদ-সন্তানদের প্রতি, এ আর অস্বাভাবিক কী? কিন্তু মেয়ের জীবনসঙ্গী হিসেবে যে ওকে মনে-মনে নির্বাচন করতে পারেন তাঁরা, এমনটি কখনো মনে হয়নি দীপার। তারই ভুল। শ্রেণি-সচেতন রাজনীতি করতো সে, ভাবতো, এই শ্রেণিবৈষম্যের সমাজটি ভাঙতে না পারলে এদেশের মুক্তি মিলবে না। কিন্তু সে নিজেই সেটি ভাঙতে পারেনি। এমনকি নিজের

মা-বাবাকেও বুঝতে পারেনি। তাঁরা যে চিন্তার দিক থেকে অনেক বেশি অগ্রসর হতে পারেন, সে-কথা ভেবেই দেখেনি কখনো। মা-বাবা সুমনের শ্রেণি বিচার করেননি, করেছে সে-ই। হয়তো রাজনীতিটা তার কাছে ছিল নিছকই রোমান্টিকতা, বইয়ের পাতায় ওসব বিপস্নব বেশ মানায়, নিজের জীবনে সেটি করে দেখানোর সাহস থাকে না। অথচ বাবা সেটি কতো সহজেই পেরেছেন। কীভাবে পারলেন? মুক্তিযুদ্ধই কি তাঁকে শ্রেণির গ– ভেঙে বেরোতে শিখিয়েছিল?

রাতে শুয়ে-শুয়ে এসব আকাশ-পাতাল ভাবছিল দীপা। সারারাত একটুও ঘুম হলো না। নিজের জীবনটাকে ভীষণ ফাঁপা মনে হলো। ভুলে ভরা, গস্ন­vনিমাখা তুচ্ছ এই জীবনটাকে বয়ে বেড়াতে হবে বাকিটা সময়, ভাবতেই কান্না পেলো তার। হয়তো কাঁদলোও গোপনে, একা-একা, যেমন করে কেঁদেছে সে অনেক দিন, অনেক রাত; কেউ তার খবরও পায়নি।

 

চার

ভালো ঘুম হলো না রাতে, তবু ঘাপটি মেরে শুয়েই থাকতে হলো সুমনকে। এপাশ-ওপাশ করলেও সোমা বুঝে যাবে যে, সে ঘুমায়নি। তখন নিজেও উঠে বসে থাকবে। গভীর ঘুমের ভেতরেও মেয়েটা যে কীভাবে তার জেগে থাকার ব্যাপারটি টের পেয়ে যায়, সে বোঝে না। কিছুই লুকানোর উপায় নেই, ঠিক বুঝে ফেলে। কেন? তাকে নিয়ে কি খুব দুশ্চিন্তায় ভোগে সোমা? নাকি অপ্রতিরোধ্য ভালোবাসাই তাকে অমন সচকিত করে রাখে? বুঝতে পারে না সুমন।

ভোর হয়েছে। আজান শোনা গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। এখন ও-ঘর থেকে মায়ের সুললিত কণ্ঠে কোরান তেলাওয়াত শোনা যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে সুমন, মায়ের এই রুটিনের ব্যতিক্রম ঘটে না কখনো। এমন একটি দিনও নেই যেদিন ভোরে মায়ের তেলাওয়াত শোনা যায়নি। ছোটবেলায় ঘুমের ঘোরে ওই সুরেলা পাঠ শুনতে ভারি ভালো লাগতো। এখন অবশ্য প্রতিদিন আর শোনার সুযোগ হয় না। ঘুমই ভাঙে না এতো ভোরে। আজকে অনেকদিন পর সেই ছোটবেলার অনুভূতি হলো তার। অনেকক্ষণ শুয়ে-শুয়ে শুনলো সে, তারপর উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। কী নির্মল-শুভ্র ভোর, কী অপূর্ব নির্জনতা! সামনের বাসাটিতে বেশকিছু গাছপালা, অনেক পাখির বাসা, সেখানে তাদের জেগে ওঠার লক্ষণ, অথচ একটুক্ষণ ডেকেই থেমে যাচ্ছে। সুমনের মনে হলো, পাখিরাও যেন মুগ্ধ হয়ে শুনছে মায়ের তেলাওয়াত। অপূর্ব সুরেলা ধ্বনি যেন ভোরের বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে অনাস্বাদিত এক পবিত্রতা। মনটা অন্যরকম হয়ে যায়। সে জানে, একটু পরই মা-ও বেরিয়ে আসবে তার ব্যালকনিতে। পাখিরা উড়ে আসবে তার কাছে, তাদেরকে খাবার দিতে-দিতে আপনমনে কথা বলবে মা। তেলাওয়াত থামার পর সে তাই গেল মায়ের রুমে। হ্যাঁ, তাই। মা ব্যালকনিতে। পাখিগুলো এসে বসেছে রেলিংয়ে।

মা।

কিরে, আজকে এতো সকালে উঠলি যে!

ঘুমটা ভেঙে গেল।

ভেঙে গেল নাকি ঘুমই হয়নি?

না, তেমন ভালো হয়নি।

দুশ্চিন্তা করছিলি কিছু নিয়ে?

না। কী নিয়ে দুশ্চিন্তা করবো?

তা কি আর আমি জানি!

তুমি তো সবই জানো। এই যে ঘুম হয়নি তাও তো জানো।

এটা তো এমনিতেই বোঝা যায়, জানতে হয় না।

আর কী বোঝা যায় মা?

সব তো তোকে বলা যাবে না!

হুম! আচ্ছা, এই যে তুমি পাখিদের সঙ্গে কথা বলো, ওরা বোঝে?

কি জানি! বুঝলে বুঝুক না বুঝলে নাই। আমার বলতে ইচ্ছে করে বলে বলি।

কেউ কথা না বুঝলে তাকে বলে লাভ কী?

ওটা মানুষের জন্য খাটে, পাখিদের বেলায় নয়।

মানে?

মানে আর কী! যে-মানুষ তোর কথা বোঝে না, তার সঙ্গে কথা চালিয়েই যাবি নাকি বন্ধ করে দিবি সেই সিদ্ধান্ত তুই নিতে পারিস, কিন্তু পাখিদের বেলায় কি এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? কেউ তো আশাই করে না যে, পাখিরা তার কথা বুঝবে!

সুমন উত্তরে কিছু বললো না। কথাটা তার মনে ধরেছে। মাঝে-মাঝে এমন অদ্ভুত-অদ্ভুত কথা বলে মা, যে, অবাক লাগে। সে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মায়ের কা-কারখানা দেখতে লাগলো। খাবার দিতে-দিতে পাখিদের সঙ্গে কথা বলছে মা, আপনমনে। কুশলাদি জিজ্ঞেস করছে – কিরে আজকে শরীরটা ভালো? কালকে তো বেশ কাহিল লাগছিল, আজকে দেখি ঝরঝরে হয়ে গেছিস! রোদে-রোদে এতো ঘুরিস কেন, ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নিলে কী হয়! তোর বাচ্চাগুলোর কী অবস্থা? উড়তে শিখবে কবে? – এরকম হরেকরকম আলাপ। পাখিরাও কখনো উৎকর্ণ হয়ে শুনছে, কখনো কিচিরমিচির করে কী যেন বলছে, কখনো চুপ করে খাবার খাচ্ছে। পাখিসেবা শেষ হলে মা ঘরে গিয়ে বসে, সুমনও আসে পিছুপিছু। দ্যাখে, চায়ের কাপ হাতে ঢুকেছে সোমা, সঙ্গে বিস্কুট। দুজনের জন্য দু-কাপ চা রেখে সে চলে গেল রান্নাঘরে, নাস্তা বানাবে। সুমন বললো –

আচ্ছা মা, বড় মামা কি ছোট মামার ব্যাপারটা জানেন?

কোন ব্যাপারটা?

এই যে ফিরে আসার ব্যাপারটা?

তা তো কতোদিন আগেই জেনেছে।

কিছু বলেননি?

নাহ। শুনে চুপ করে ছিল।

তোমার ভাই দুটো একটু অদ্ভুত কিসিমের, মা।

কেন রে? হঠাৎ এই কথা মনে হলো কেন তোর?

দুই বোনকে রেখে দুই ভাই দুদিকে চলে গেল। এটা কোনো কথা হলো?

এ নিয়ে কি তোর মনে কোনো ক্ষোভ আছে?

না, মা, ক্ষোভ নেই। এসব নিয়ে ভাবিওনি কোনোদিন। বড় মামা আসছেন শুনে হঠাৎ মনে হলো।

এসব নিয়ে ভেবেছিস নাকি সারারাত?

না, সারারাত ধরে ভাবার মতো বিষয় তো না।

ঘুম হয়নি বললি যে!

মাঝে-মাঝে এমনিতেই হয় না। আচ্ছা মা, মামাদের ওপর তোমাদের এ নিয়ে কোনো অভিমান নেই, অভিযোগ নেই?

আমার নেই। তোর খালার হয়তো আছে।

তোমারও তো থাকার কথা!

না রে। থাকার কথা নয়। আমাদের সবার জীবনই বদলে গেছে যুদ্ধের সময়। ওটা তো অনেক বড়ো একটা ব্যাপার ছিল, অভিঘাতটাও ছিল অনেক বড়ো। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল সবাই, উদ্ভ্রান্তের মতো মুক্তির পথ খুঁজেছে। খুঁজতে গিয়ে গোছানো পথে হাঁটতে পারেনি অনেকেই। তোর মামারাও সেরকম।

তা হয়তো ঠিক। ছোট মামার ব্যাপারটা আমি কিছুটা বুঝতেও পারি, কিন্তু বড় মামা…

সেও হয়তো ভেবেছিল, সব সম্পর্ক অস্বীকার করলেই স্বস্তি মিলবে।

সেজন্যই তো অদ্ভুত বলি। অস্বীকার করেছিল, আবার এই পড়ন্ত বয়সে এসে দেশে থাকতে চাইছে, একটু কেমন যেন মনে হচ্ছে না?

তা তো হচ্ছেই। কোনো একটা কারণ নিশ্চয়ই আছে। এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করেছিস নাকি সারারাত?

না মা, দুশ্চিন্তার কী হলো? তোমার সঙ্গে গল্প করতে এসে মনে হলো, তাই বললাম।

তুই যে নানান বিষয়ে চিন্তা করিস সেটা আমি বুঝিরে। আমাকে নিয়ে ভাবিস, মামাদের নিয়ে ভাবিস, খালাকে নিয়ে ভাবিস। কী কপাল! আমাদের নিয়ে ভাবার মতো আর কেউ নেই। সবকিছু নিয়ে একা তোকেই ভাবতে হয়।

এভাবে দেখছো কেন মা? আমার যদি আরো ভাইবোন থাকতো, বাবা থাকতো, তাহলে ভাবতাম না?

মা চুপ করে গেল। বাবার কথা উঠলে আজকাল মা খুব বিষণ্ণ হয়ে যায়। কী যে ভাবে বসে-বসে, বোঝা যায় না। সুমন মাকে জড়িয়ে ধরলো – এতো ভেবো না তো মা! কিছুই ঠেকে থাকবে না। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবেই।

তুই সাহসী ছেলে, তাই এভাবে ভাবতে পারিস। কিন্তু বুঝি তো, সংসারটা চালাতে তোর কতো কষ্ট হয়। বাজারে আগুন লেগেছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে, বাড়িভাড়াও বাড়ছে প্রতিবছর, খরচ বাড়ছে তো বাড়ছেই। তোর একার আয়ে এতোকিছু সামাল দিতে হয়…

তাতে কী মা? চলে যাচ্ছে না? এসব চিন্তা ছাড়ো তো। যাই, একবার বাজার থেকে ঘুরে আসি।

মায়ের মুখে এসব প্রসঙ্গে কথা শুনতে ভালো লাগে না সুমনের। হ্যাঁ, তার কষ্ট হচ্ছে বইকি। এই বাজারে কেবলমাত্র বেতনের টাকা দিয়ে চলা দুষ্কর। তাও আবার সরকারি চাকরি! আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি সে করতে পারবে না মরে গেলেও, কষ্ট করা ছাড়া আর উপায় কী? কিন্তু মা যখন এগুলো বলে, তখন ভারি অসহায় লাগে।

মায়ের কাছ থেকে এসে কাপড় পালটে বাজারে যাওয়ার আগে মামার কাছে গেল সুমন।

কী খবর মামা, আছো কেমন?

আছি ভালোই। তোর খবর কী?

ওই একইরকম। বাজারে যাচ্ছি, যাবে নাকি?

বাজারে!

হ্যাঁ। যাবে?

বাজারে গিয়ে কী করবো?

কী আর করবে! একটু ঘোরাঘুরি হলো, সময় কাটলো।

সময় কাটানো নিয়ে আমার কোনো সমস্যা তো নাই। বাজারে যাবো কেন?

আচ্ছা যেও না। এমনি বললাম আরকি! গেলাম মামা, ঘুরে আসি।

সুমন, শোন।

বলো।

এই যে বাজারে যাস, তোর খারাপ লাগে না?

কেন, খারাপ লাগবে কেন?

না, মানে, জিনিসপত্রের এতো দাম, মানুষের নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। এসব দেখে তোর মন খারাপ হয় না?

নাহ।

হয় না! কী বলছিস?

অভ্যাস হয়ে গেছে মামা, তাই খারাপ লাগে না।

অভ্যাস হয়ে গেছে? এগুলোও অভ্যাসের ব্যাপার?

হ্যাঁ, অভ্যাস হয়ে যায়। তুমি কখনো জীবনের মধ্যে থাকোনি। বইয়ের পাতায় বাস্তবতা খুঁজেছো, হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছো, তাই তোমার ওরকম মনে হয়।

আমি হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছি? তোর তাই মনে হয়?

এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে তো আমার বাজার করা হবে না, মামা। যাই। পরে কথা বলবো।

বাইরে বেরিয়ে একটু খারাপ লাগলো সুমনের। মামাকে এভাবে না বললেও হতো। মামার যুদ্ধটা তো ছিল আদর্শিক। সেই আদর্শের সঙ্গে আমি একমত না-ও হতে পারি, কিন্তু তার স্যাক্রিফাইসটা তো মিথ্যে ছিল না। সব বুঝেও কেন যে মাঝে-মাঝে রাগ উঠে যায়!  যাকগে, এ নিয়ে বেশি ভাবার মানে হয় না, পরে একসময় স্যরি বলে নিলেই চলবে।

অবশ্য সেটা বলার আগেই, বাজার থেকে ফিরতে না ফিরতে, মামার ডাক পেলো সুমন। নিজে না গিয়ে সোমাকে দিয়ে বলে পাঠালো যে, গোসল-নাস্তা সেরে মামার সঙ্গে গল্প করবে সে। নাস্তার টেবিলে মামা খুব চুপচাপ, এমনিতেও প্রায় বোবাই হয়ে থাকে, বাচ্চাদের সঙ্গেই কেবল সবসময় কথা বলে, অন্যদের সঙ্গে নয়। আজকে ওদের নানান প্রশ্নেও নিরুত্তর রইলো মামা, হুঁ-হাঁ করে কাটিয়ে দিলো। ওঠার সময় বললো – নাস্তা শেষ করে আসিস তো সুমন। কিছু কথা আছে।

আসছি মামা।

মা জিজ্ঞেস করলেন – কী হয়েছে রে সুমন?

কী আর হবে!

তোর মামা এই সাতসকালে এতো গম্ভীর কেন? কী নিয়ে কথা বলবে?

জানি না মা। বাজারে যাওয়ার আগে একটু খোঁচা দিয়েছিলাম, হয়তো সেজন্যই…

কী খোঁচা দিলি আবার?

তেমন কিছু না। বলেছি, সংসারের মধ্যে কখনো থাকেনি, বাস্তবতা খুঁজেছে বইয়ের পাতায়, তাই সবকিছু অস্বাভাবিক লাগে…

এসব কথা বলে আর লাভ কী, বল? জীবন তো পার করেই এসেছে। এখন আর কিছুই বদলাবে না।

সব কথা কি আমরা কিছু বদলানোর জন্য বলি, মা?

না, তা নয়। তবে অনেক কথাই বলি।

আমি তেমন কোনো ইনটেনশন নিয়ে মামার সঙ্গে কথা বলি না, মা। মানুষ হিসেবে মামা তো ইন্টারেস্টিং, ঘটনাবহুল জীবন,   মাঝে-মাঝে খোঁচা দিয়ে দেখি…

তোর কোনো রাগ নেই তো ওর ওপর?

থাকতেও পারে। থাকাটা কি খুব অস্বাভাবিক?

না, অস্বাভাবিক নয়। তবু, কষ্ট পায় এমন কিছু বলিস না।

হা-হা-হা…, এতো ভেবো না, মা। সে কি কেবল তোমার ভাই? আমারও তো মামা, কতোটুকুই বা বলা যায়!

মা মুচকি একটু হাসলেন, মধুর হাসি। সুমন সেই হাসিটুকু সঙ্গে নিয়ে যেতে-যেতে সোমাকে ডেকে বললো, চা-টা ওই ঘরেই পাঠিয়ো সোমা।

সুমন গিয়ে দেখলো, মামা খবরের কাগজ খুলে বসেছে। গভীর মনোযোগ। সুমন ডাকতে চোখ না তুলেই বললো, দেশে কী সব হচ্ছে দেখেছিস?

আবার কী হলো?

রংপুরে একজন জাপানি নাগরিককে খুন করা হয়েছে।

ও। এটা তো কালকের খবর। আগেই শুনেছি।

কীভাবে শুনলি?

টেলিভিশনে। তুমি তো টিভি দ্যাখো না, তাই জানো না। সব খবর এখন আগেই চলে আসে। ইন্টারনেটেও আসে। যখনকার খবর তখনই পাওয়া যায়। পরেরদিনের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।

হুম। আমি পুরনো দিনের মানুষ, পত্রিকাতেই ভরসা রাখি। আচ্ছা, এই যে কিছুদিন পরপর ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে, ব্যাপারটা কী রে? জানিস কিছু?

সেসব অনেক কথা মামা। পরে কখনো বলবো।

ব্লগাররা খুন হচ্ছে, বিদেশিরা খুন হচ্ছে, ধর্মযাজকরা খুন হচ্ছে –  লক্ষণ তো ভালো মনে হচ্ছে না।

লক্ষণ ভালো নয়, মামা, সবাই জানে সে-কথা, কিন্তু কারো কিছু করার নেই। এসব বাদ দাও, তুমি কী যেন বলতে চেয়েছিলে, সেটাই বলো।

না, বিশেষ কিছু নয়। তখন তুই বেশ ক্ষেপে গেলি, তাই মনে হলো একটু কথা বলি।

না মামা, ক্ষেপিনি। তোমাকে ওভাবে বলাটা ঠিক হয়নি। স্যরি।

না না, স্যরি বলার কিছু নাই। কিন্তু তুই কি সত্যিই মনে করিস যে, বাস্তবতার সঙ্গে আমার বা আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না? আমরা কেবল হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছি?

শোনো মামা, তোমাকে একটা উদাহরণ দিই। তুমি চলে গেলে আন্ডারগ্রাউন্ডে, বড় মামা বিদেশে, দুজনেই নিরুদ্দেশ। নানা তাঁর দুই তরুণী মেয়েকে নিয়ে পড়লেন মহাবিপদে। একজন বিধবা, আরেকজন বিবাহযোগ্য যুবতী। বিধবা মেয়েকে নিয়ে লোকজন আজেবাজে কথা বলে, ছোটটাকে নিয়েও বলে। আবার ছোট মেয়ের পড়াশোনা আর বিয়ে দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হলেন তিনি। বাড়িটা পর্যন্ত বন্ধক দিতে হলো। টাকা শোধ করতে না পারায় সেই বাড়িটা একদিন দখলও হয়ে গেল। এই যে ঘটনাপ্রবাহ, একটা পরিবারের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার প্রাণপণ যুদ্ধ, তুমি এটা দ্যাখোনি, আমি দেখেছি। এখন তুমি যদি এমন একজন লোককে দ্যাখো যাকে তার বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, তোমার যেভাবে মন খারাপ হবে, আমার ঠিক সেভাবে হবে না, অন্যভাবে হবে। কারণ আমি নিজেই ভুক্তভোগী।

ভুক্তভোগী হলে বুঝি অন্যের দুঃখ দেখে মন খারাপ হয় না?

হয়, নিশ্চয়ই হয়। কিন্তু আমি বলতে চেয়েছি, তুমি এই কষ্টের স্বরূপটা বুঝবে না, আমি বুঝবো। কারণ আমি এর ভেতর দিয়ে গিয়েছি।

কারো দুঃখ-কষ্ট বোঝার জন্য কি ওই দুঃখের ভেতর দিয়ে যেতেই হবে?

যেতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু না গেলে প্রকৃত ব্যাপারটা বোঝা যাবে না। এই যেমন, তুমি সকালে জিজ্ঞেস করলে –  বাজারে গেলে লোকজনের কষ্ট দেখে আমার মন খারাপ হয়  কি-না, আর আমি বললাম যে হয় না। কেন হয় না জানো? কারণ আমি নিজেই একই অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আমি একটা ব্যাংকের ম্যানেজার, তোমাদের রাজনীতির ভাষায় একজন শ্রেণিশত্রু, কিন্তু তুমি কি জানো – এই সংসার চালাতে গিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে? কখনো খেয়াল করে দেখেছো, এই বাসায় কতোদিন পরপর ভালো রান্না হয়? শাকপাতা, পচা মাছ, আর মাসে বড়োজোর দুদিন ফার্মের মুরগির মাংস! বাচ্চা দুটো মাংস খেতে এতো পছন্দ করে, কিন্তু আমার সামর্থ্য নাই। গরু বা খাসির মাংস তো ধরাছোঁয়ার বাইরে, ওরকম অখাদ্য ফার্মের মুরগির ব্যবস্থাও করতে পারি না। অন্যকে দেখে যে কষ্ট পাবো, আমার নিজের অবস্থাই তো করুণ, মামা। আমার দুঃখের ভাগ কে নেয় যে, আমি কারো দুঃখের ভাগীদার হবো?

মামা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর বললো – তোকে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না, সুমন।

বোঝা যায় না, কারণ আমি বলি না। মা বোঝে, সোমাও বোঝে সেটা। নানাও বুঝতেন; কিন্তু তুমি বোঝো না। কারণ এই বাস্তবতা তোমাকে মোকাবেলা করতে হয়নি কোনোদিন।

হ্যাঁ। ঠিকই বলেছিস। আমি এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাইনি।

কোনো ব্যাপারেই ঠিকঠাক মতো ঘামাওনি। যাদেরকে শ্রেণিশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছ, তাদের অনেকেই যে শ্রেণিশত্রু ছিল না, তাও বুঝতে চাওনি।

মামা এবারো চুপ করে রইলো।

আচ্ছা মামা, বাবার কবরটা কোথায় হয়েছিল, জানো তুমি?

প্রশ্নটা শুনে চমকে উঠলো মামা। হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে গিয়ে এরকম একটা ব্যাপার সামনে চলে আসবে, হয়তো ভাবতেই পারেনি। চমকে উঠেছিল, চুপ করে রইলো বেশ কিছুক্ষণ, তারপর বললো, এতোদিন পর এ-কথা জানতে চাইছিস কেন?

এতোদিন পর নয় মামা, এটা আমার সব সময়ের প্রশ্ন ছিল। তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনো, মায়ের কাছে জানতে চেয়েছি অনেকবার। জানো তুমি?

না রে, জানি না।

জানার চেষ্টা করেছিলে?

নাহ।

তোমার কখনো মনে হয়নি যে, বড় হয়ে আমি এ-কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারি?

মামা চুপ করে রইলেন।

বলো মামা, মনে হয়নি?

তোর বাবার খবরটা আমি তাৎক্ষণিকভাবে পাইনি, পেয়েছি যুদ্ধের পর যখন বাড়িতে ফিরে এলাম তখন।

যুদ্ধের সময় বাড়িতে যেতে না?

একবার মাত্র গিয়েছিলাম। তখনো এরকম কিছু ঘটেনি।

যখন ফিরে এলে, তখন তো খোঁজ নিতে পারতে!

পারতাম। কেন যে নেওয়া হয়নি তোকে বোঝাতে পারবো না।

বলো। দেখি বুঝি কি-না।

খুব অস্থির সময় ছিল ওটা। প্রায় সব পরিবারেই কিছু না কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এরকম ব্যাপার শুধু তোর বাবার ক্ষেত্রেই ঘটেনি, যাঁরা শহিদ হতেন তাঁদের অধিকাংশই নিজের বাড়ি থেকে অনেক দূরে অচেনা কোনো জায়গায় ঘুমিয়ে আছেন। তখন মৃতদেহ বাড়ি পর্যন্ত বয়ে আনার বাস্তবতা ছিল না। আবার অনেকে কোনো মাটিও পাননি। ওই বছর বর্ষাকালটা বেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল তো, অনেক এলাকাই ডুবে গিয়েছিল, কবরের জায়গা পাওয়া যেতো না, পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো…

সুমন হঠাৎ বলে ওঠে – থাক মামা, আর বলো না।

কিন্তু তিনি যেন আত্মমগ্ন, একটু চুপ থেকে আবার বলে চললেন –  শরৎকালের প্রায় পুরোটা জুড়ে বর্ষা রয়ে গিয়েছিল, আশ্বিনেও ছিল বর্ষার প্রকোপ। বহু মানুষ বেঁচে গিয়েছিল এই দীর্ঘস্থায়ী বর্ষার কারণে। পাকিস্তানিরা পানিকে ভয় পেতো, ওরকম থইথই বর্ষা দেখে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। এমন অনেক এলাকা ছিল যেখানে নৌকা ছাড়া যাওয়াই যেতো না। ওরকম মনুষ্যচালিত ধীরগতির জলযান নিয়ে যুদ্ধ করা যায় নাকি? তাও এমন একটা দেশে যেখানে ঝোপজঙ্গলের আড়ালেও মুক্তিযোদ্ধারা ওঁত পেতে বসে থাকে, যেখানে কয়েকটা রাজাকার ছাড়া বাকি সবাই স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে! যুদ্ধ করতে গেলে বিপক্ষ দলের যোদ্ধাদের ব্যাপারে যুদ্ধকৌশল তৈরি করা যায়, কিন্তু দেশের সব মানুষই যদি বিপক্ষের হয় তাহলে যুদ্ধ চলে কীভাবে? শহরে বা গ্রামের যে-কোনো বাড়িতে, হাটে-বাজারে, মসজিদে-মন্দিরে-গির্জায়, স্কুলে-কলেজে, এমনকি পতিতালয়েও একবার ঢুকে পড়তে পারলে তাদেরকে লুকিয়ে ফেলে স্থানীয় লোকজন, কোথায় যে লুকিয়ে রাখে খুঁজে বের করার উপায় নাই। অকথ্য নির্যাতনেও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য দেয় না মানুষগুলো। এভাবে যুদ্ধ হয় নাকি? তার ওপর এমন ঘোরতর বর্ষা! যেন প্রকৃতিও ওদের শক্র হয়ে উঠেছে!

বলতে-বলতে আবারো চুপ করে রইলো মামা। দৃষ্টিটা অনেক দূরে নিবদ্ধ, যেন বহুদূরের কোনো ঘটনা দেখতে পাচ্ছে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎই আবার বলতে শুরু করলো – আমি নিজেই কতোজনকে কবর দিয়েছি, আবার অনেককে কবর দিতে না পেরে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছি! তোরা কি এসব বুঝবি? সারাদেশে অসংখ্য গণকবর, অগুনতি নির্যাতিত মেয়েদের উদ্ধার করা হচ্ছে প্রতিদিন, তাদেরকে গ্রহণ করতে অসুবিধা হচ্ছে পরিবারগুলোর। ঘরে-ঘরে কান্না, স্বজন হারানোর হাহাকার, হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের জন্য অপেক্ষা। প্রতিটি দিন যেন বিপর্যয়ে ভরা। নিজের কথা ভাবার মতো অবস্থা ছিল না আমাদের।

বুঝতে পারছি মামা।

না রে, বুঝবি না। তোদের বাস্তবতা যেমন আমি বুঝি না, তেমনই আমাদের সময়ের বাস্তবতা তোরা বুঝবি না; ওই সময়ের ভেতর দিয়ে যারা গিয়েছে তারাই কেবল বুঝতে পারবে। এসব ব্যাপার কোনো গল্প-উপন্যাস লিখে বোঝানো যাবে না, কোনো সিনেমা-নাটক বানিয়েও বোঝানো যাবে না। ওদিকে আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়েই চলছিল। শাসকদল বর্বরের মতো বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। আমরা যারা যুদ্ধে গিয়েছিলাম, জীবনের মায়া ত্যাগ করেই গিয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পর যে এই অবস্থা হবে সেটা ভাবতে পারিনি। হচ্ছে দেখে মানতেও পারলাম না।

চলে গেলে?

হ্যাঁ। চলে গেলাম আবার।

একবারও মা-বাবার কথা ভাবলে না, বোনদের কথা ভাবলে না?

না, ভাবলাম না। তখন ব্যক্তিগত সব ব্যাপারকে তুচ্ছ মনে হতো।

ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলো কি এতো তুচ্ছ করার মতো বিষয়, মামা?

না, তুচ্ছ করার মতো বিষয় নয়। কিন্তু কখনো-কখনো এমন সময় আসে যখন নিজের দেশটাকে ছাড়া আর সবকিছুকেই তুচ্ছ মনে হয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে যাঁরা ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন, ষাটের দশকে যাঁরা স্বাধিকার আন্দোলনে গিয়েছিলেন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, এই যে তোরা যে মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলি, কিংবা এই যে সেদিন যারা শাহবাগে জমায়েত হয়েছিল, তাদের সবারই তো জীবনের ঝুঁকি ছিল, যে-কোনো সময় মরে যেতে পারতো, মরেছেও অনেকে, এখনো মরছে, তবু কেন গিয়েছে জানিস? দেশের ডাকে। দেশ কখনো-কখনো ডাক দেয়, তখন অন্যসব পিছুটান তুচ্ছ হয়ে যায়।

মামার কথা শুনতে-শুনতে বছর দুয়েক আগের একটা ঘটনা মনে পড়ছিল সুমনের। তখন শাহবাগ উত্তাল। লাখো মানুষের ভিড় জমেছে সেখানে। হঠাৎ করেই পালটে গেছে সারা দেশের ছবি। যেন সত্যিই ডাক দিয়েছে মা আর সন্তানেরা বাঁধভাঙা স্রোতের মতো গিয়ে হাজির হয়েছে একটি মোহনায়। তখনকার ঘটনা। সুমন গিয়েছিল সোহেলের শালির বিয়েতে, সেনাকুঞ্জে। বিলাসবহুল চোখ-ধাঁধানো আয়োজন থেকে বেরিয়ে ফিরে আসার মতো কোনো বাহন না পেয়ে মনে-মনে ভীষণ রেগে উঠেছিল সে। মনে হচ্ছিল – নিজে গরিব হয়ে বড়লোকদের বন্ধু হওয়ার মতো বিপজ্জনক ব্যাপার আর নেই। এদের নানারকম বাহানা থাকে, বায়নাও থাকে, গরিব বন্ধুদের সেসব মেটাতে গিয়ে অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। এই যেমন আজকের ব্যাপারটাই ধরা যাক। তোর শালির বিয়ে, ভালো কথা, তুই যতো খুশি মজা কর, কেউ তো তোকে না করেনি, সব বন্ধুবান্ধবকে দাওয়াত দেওয়ার দরকারটা কী? তাও সপরিবারে? আর এদের বিয়ের অনুষ্ঠানও হয় এমনসব জায়গায় যে, সেখানে আসা-যাওয়াও এক যুদ্ধেরই নামান্তর। বৃষ্টিভেজা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেটি আরো তীব্রভাবে মনে হচ্ছিল সুমনের। তার গাড়ি নেই। এই দুর্গম অঞ্চলে এই প্রায়-মধ্যরাতে সিএনজি পাওয়া এক অর্থে লটারিতে কোটি টাকা পাওয়ার মতোই দূরবর্তী সম্ভাবনার ব্যাপার। সে এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে আজিমপুর যায় কীভাবে? একা থাকলে না-হয় হাঁটা দেওয়া যেতো, কিন্তু সাজুগুজু করা বউ, নিজেও কিছু কম করেনি অবশ্য, আর দুই বাচ্চা সঙ্গে, এদেরকে নিয়ে সে হাঁটবেই বা কীভাবে? কতোদূর হাঁটতে হবে, তারও তো ঠিক নেই কিছু। এমনিতেই সে এখানকার কিছু চেনে না, ক্যান্টনমেন্টে সে সারাজীবনে হাতে গুনে তিন-চারবার এসেছে, আন্দাজে একদিকে হাঁটতে শুরু করলেই তো চলবে না!

সোহেলের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে। কী দরকার ছিল এই ঝামেলায় ফেলার? সুমন আগে থেকেই ব্যাপারটা নিয়ে সচেতন ছিল, বলেছিল, ‘আমার তো গাড়ি নাই, ওখানে যাওয়া-আসা ভীষণ ঝামেলা। আমাকে বাদ দে।’ সোহেল হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে ব্যাপারটা – ‘এই শহরের নববই ভাগ লোকের গাড়ি নাই। তাদের জীবন কি থেমে আছে? তোর নিজের জীবন কি থেমে আছে? শালা ঘরকুনো ব্যাঙ। হাঙ্কিপাঙ্কি বাদ দিয়ে চলে আয়। শালির

বিয়ে-টিয়ে বড় ব্যাপার নয়। অনেকদিন বন্ধু-বান্ধব একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া হয় না, সবাইকে বলেছি – একটা গেট টুগেদার হয়ে যাবে।’ যাদের গাড়ি নেই তারা যে সবসময় যাতায়াতের চিন্তায় কাহিল হয়ে থাকে, এই ব্যাপারটা গাড়িওয়ালারা বোঝে না। শ্রেণি-সমস্যা। এই শহরে আসলে দুটো শ্রেণি – এক শ্রেণির গাড়ি আছে, আরেক শ্রেণির নেই। আর দেশটা চালায় গাড়িওয়ালারাই, সর্বস্তরের নীতিনির্ধারকদের গাড়ি আছে, ফলে তাদের পক্ষে গাড়িহীনদের সমস্যা বোঝার কথা নয়। সেজন্যই তো যখন-তখন যে-কোনো রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ আসে। নববইভাগ মানুষের কথা ভাবার সময় নেই কারো, নিজেদের গাড়ি চলার পথ কণ্টকমুক্ত রাখা দরকার! সোহেলকেও ব্যাপারটা বোঝানো গেল না। যেন সুমন না এলে তার শালির বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানটিই অপূর্ণ থেকে যাবে! অবশ্য সত্যিই একটা চমৎকার গেট টুগেদার হয়ে গেল আজকে। বন্ধু-বান্ধবী আর তাদের পরিবার-পরিজন মিলে পঞ্চাশ-ষাটজনের একটা দল! তারা চুটিয়ে আড্ডা দিলো, ঠাট্টা-দুষ্টুমি চললো, এক বন্ধু আরেকজনের বউকে ক্ষেপালো, বান্ধবীদের বরদের নাজেহাল করলো অন্য বান্ধবীরা, দেশের অবস্থা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলো অনেক, কিন্তু তর্ক উত্তেজনার দিকে গড়াতে না গড়াতেই কেউ একজন হয়তো একটা চুটকি শুনিয়ে আবার হাস্যমুখর আড্ডা ফিরিয়ে আনলো – এসব যা হয় আর কি! সোহেল, বোধগম্য কারণেই ব্যস্ত, তারচেয়ে ব্যস্ত তার বউ লুনা। মাঝেমধ্যে এসে আড্ডায় যোগ দিচ্ছে তো পরমুহূর্তেই ছুটে যাচ্ছে আরেক অতিথিকে দেখভাল করার জন্য। বোঝাই যাচ্ছে সোহেল-লুনাই মূল হোস্ট, মানে এই বিশাল আয়োজনটা তাদের উদ্যোগেই করা হয়েছে। একবার সুমনের এ-কথাও মনে হলো – সোহেল যদি বড়লোক না হতো, তাহলে কি পারতো এভাবে বন্ধুদের দাওয়াত করতে? তার শালির বিয়েতে সে কি পারবে? না, পারবে না। তার শ্বশুর বড়লোক নয়, সে-ও নয়। লুনার বাবাও বড়লোক নয়; কিন্তু সোহেলের নিজের সামর্থ্য আছে এরকম আয়োজন করার, বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা বসানোর, তার নেই। বরং ভবিষ্যতে শালা-শালির বিয়েতে ভগ্নিপতি হিসেবে তার যেটুকু করা কর্তব্য সেটুকুও করতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। অবশ্য ভাবনাটাকে সে বেশিক্ষণ বয়ে বেড়াতে পারলো না, এতোগুলো বন্ধুর মাঝখানে বসে সেটা পারাও যায় না। আর আড্ডাটাও হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী, সম্ভবত সোহেলের বুদ্ধির কারণেই। এসে বলেছে – ‘গল্পটল্প কর, আগে বাচ্চাদের খাইয়ে ছেড়ে দে, ওরা বাইরে খেলুক, তোরা এখন খেতে বসিস না। একসঙ্গে সবাই মিলে খাবো।’ তারা তা-ই করেছে। হোস্ট যদি খেতে না করে তাহলে খাওয়ার উপায় কী? পরপর দুটো ব্যাচ খেলো, তারা বসলো না। অধিকাংশ অতিথি বিদায় করে তারপর সময় হলো সোহেল-লুনার। সবাই মিলে বিশাল এক টেবিলে বসলো, হাসিঠাট্টা করতে-করতে পেটপুরে ও মনভরে খেলো। এরপর আর আড্ডা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁইছুঁই করছে, সবারই ঘরে ফেরার তাড়া আছে। সারারাত বাইরে-বাইরে ঘুরে বেড়ানোর বয়স আর নেই, সবাই সংসারী, সবার সঙ্গেই আরো দু-তিনজন বাড়তি মানুষ – বউ বা বর, এবং বাচ্চাকাচ্চা।

রাত হয়েছে, তার ওপর এই মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টি হচ্ছে। বিকেল থেকেই মুখ ভার করে ছিল আকাশ, এরপর গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি, তারপর বেশ জোরেশোরে, এখন কমে গিয়ে আবার গুঁড়িগুঁড়ি। বৃষ্টির এই ভাবসাব দেখে এমনিতেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল সুমন। এই দুর্যোগের রাতে সে ফিরবে কীভাবে? এসব চিন্তা করতে-করতে সে আনমনা হয়ে যাচ্ছিল বারবার, যদিও বেশিক্ষণ আনমনা হয়ে থাকার সুযোগ ছিল না পরিবেশের কারণেই। কিন্তু ফেরার সময় হয়ে এলে দুশ্চিন্তাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। একবার ভাবলো, সোহেলকে ডেকে দু-কথা শুনিয়ে দেয়, কিংবা পৌঁছে দেওয়ার আবদার করে, কিন্তু ও এতো আন্তরিক, এতো বন্ধুত্বপরায়ণ যে ওকে কোনো কথা শোনানো কঠিন। হয়তো পৌঁছে দেওয়ার কথা বললে দেবেও, কিন্তু তা বলা যায় নাকি? বিদায় নেওয়ার সময় সোহেল জড়িয়ে ধরেছিল তাকে; উষ্ণ ও আন্তরিক আলিঙ্গন; গভীর আবেগমাখানো গলায় বললো, ‘তুই না এলে আমার কোনোকিছুই পূর্ণ হয় না রে দোস্ত। তোকে যে কতো মিস করি!’ সুমন এ-ব্যাপারে নিঃসন্দেহ। ছোটবেলা থেকে নানা বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে-হতে একসময় তার মনে হতো – পৃথিবীটা দারুণ নির্দয় একটা জায়গা, কোথাও এক টুকরো ভালোবাসা নেই; আর পরে এই বন্ধুদের কাছ থেকে অসামান্য শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা পেয়ে তার মনে হয়েছে – এতোটা পাওয়ার কথা ছিল না তার।

বাইরে বেরিয়ে বন্ধুরা যেন বিপদেই পড়ে গেল। এমন নয় যে, সবারই গাড়ি আছে। কিন্তু যাদের আছে তারাও অন্যদের রেখে চট করে চলে যেতে পারছে না। পথের মিল থাকায় একজনের গাড়িতে হয়তো উঠে যাচ্ছে আরেক বন্ধু সপরিবারে, তাতে গাড়িহীনদের একটা গতি হচ্ছে, কিন্তু কেউ-ই আজিমপুরের দিকে যাবে না। মানে, ওদিকে কারোরই বাসা নয়। কারো বাচ্চা ঘুমের জন্য কাঁদছে, ছোটগুলো কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে, সবারই বাসায় ফেরার তাড়া। তবু কেউ-কেউ বললো, চল তোকে নামিয়ে দিয়ে আসি। কিন্তু গাড়িতে জায়গার সংকট, অন্য কোনো গাড়িহীন বন্ধু হয়তো সপরিবারে সঙ্গী হয়েছে, আর সুমনকে পৌঁছে দিতে হলে এই বন্ধুকে যেতে হবে উলটোপথে, সে তাই হাসিমুখে সবাইকে মানা করলো। ভাবলো, গাড়ি তো নেই-ই, থাকিও এমন এক জায়গায় যেখানে কেবল মৃত মানুষরাই থাকে, নইলে তো কারো না কারো সঙ্গে পথ মিলতোই। কোলের বাচ্চাটা ঘুমিয়ে গেছে, আরেকটাও দাঁড়িয়ে

থাকতে পারছে না, ঝিমুচ্ছে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, এই অকূল পাথার থেকে তাকে এখন উদ্ধার করবে কে? অসহায়ের মতো পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সুমন। হাঁটা সম্ভব নয়, এই বৃষ্টিতে এই পোশাকে ঘুমন্ত বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটা যায় নাকি? যদি একটা সিএনজি আসে তবেই রক্ষা। সে একবার বউয়ের দিকে তাকিয়ে আপনমনেই বলেছে, ‘কী করা যায় বলো তো!’ আর সোমা কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিয়েছে – ‘বুঝতে পারছি না তো!’ আহা রে! বেচারি আজকে এতো সুন্দর করে সেজেছে! সুমন সারাজীবনই সাদাসিধে, আটপৌরে। প্যান্টের ওপরে একটা শার্ট চাপিয়ে আর স্যান্ডেল পরেই জীবন পার করে দিচ্ছে। কালেভদ্রে শার্ট ইন করে কিংবা জুতো পরে, অফিসে পার্টি থাকলে স্যুট-টাই পরে, কিন্তু সেটা তার প্রধান পোশাক নয়। সে সাদাসিধে সাজেই আসতে চেয়েছিল, কিন্তু বউয়ের অনুরোধে পাঞ্জাবি-পাজামা পরেছে, একটা শালও চাপিয়েছে কাঁধে। বউকেও সাজিয়েছে সুন্দর করে। নিজে শাড়ি পছন্দ করে দিয়েছে, টিপ লাগিয়ে দিয়েছে, মিল রেখে লিপস্টিকের শেড বেছে দিয়েছে, চুলে এলোখোঁপা করে ফুল গুঁজে দিয়েছে; তারপর কানে-কানে বলেছে – ‘তোমাকে পরস্ত্রীর মতো সুন্দর লাগছে।’ কন্যাকে সাজিয়েছে পরীর মতো করে, আর কোলের ছেলেটাকে রাজপুত্রের সাজে! বউয়ের শখটাই বেশি ছিল। কোনোদিন সেনাকুঞ্জে আসেনি সে, এই প্রথম। এসে জাঁকজমক দেখে আর বন্ধু-বান্ধবীদের ঠাট্টা-দুষ্টুমিতে সে মুগ্ধ। এদের কতো গল্প শুনেছে সে! নিজের বাসায় দাওয়াত করে খাওয়ানোর সামর্থ্য হয়নি কখনো! আর বাসার যে হাল, পুরনো দিনের বাড়ি, যতোই গোছাও, মলিন হয়ে থাকবেই! কাউকে আসতে বলতেও লজ্জা লাগে!

কিন্তু রাত যে বেড়েই চলেছে, ফিরবে কীভাবে সে? নাকি সোহেলকে একটা ব্যবস্থা করতে বলবে? হ্যাঁ, এ ছাড়া আর উপায় নেই। যদিও ব্যাপারটা খুবই অশোভন দেখাবে, শালির বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা নিশ্চয়ই শেষ হয়নি এখনো! কিন্তু কী-ই বা করার আছে? তাকে তো ফিরতে হবে! সেটা অবশ্য করতে হলো না, পকেট থেকে ফোন বের করার ঠিক আগমুহূর্তে একটা সিএনজির দেখা পাওয়া গেল। ঝড়ের বেগে এদিকে আসছে। সব ভুলে পথের মাঝখানে গিয়ে হাত উঁচু করে দাঁড়ালো সুমন। ড্রাইভারের বোধহয় থামার ইচ্ছে ছিল না, পাশ কাটাতে গিয়ে হার্ড ব্রেক করে থামলো।

কই যাইবেন?

আজিমপুর।

নাহ, ওদিকে যামু না।

যেদিকেই যান, আমাদেরকে একটু মেইন রোড পর্যন্ত নিয়ে যান। মহাবিপদে পড়েছি।

ড্রাইভার এবার এক পলক তাকিয়ে তার বউ-বাচ্চাদের দেখলো, বললো – হ, বুঝছি। ঠিক আছে ওঠেন, শাহবাগ পর্যন্ত যাইতে পারবেন। আজিমপুর যামু না।

শাহবাগ পর্যন্ত যেতে পারলে তো হয়েই গেল। তার মন খুশিতে প্রায় নেচেই উঠলো। তবু অভ্যাসবশত বলে ফেললো –

মিটার আছে না?

মিটার দিয়া কী করবেন?

তাহলে কতো নেবেন?

দিয়েন যা ইচ্ছা।

এই তো ভেজালে ফেললেন। আমার ইচ্ছায় তো আপনি খুশি হবেন না।

আরে স্যার, এই রাইতের বেলা কী শুরু করলেন? শোনেন, যদি আমার লগে শাহবাগ যান, কিছুক্ষণ সেইখানে বসেন, তাইলে ভাড়া নিমু না।

সুমন মৃদু হাসে। হ্যাঁ, সে শুনেছে, শাহবাগে যাওয়ার জন্য রিকশাওয়ালা-সিএনজি ড্রাইভাররা ভাড়া নিচ্ছে না, ঝালমুড়ি-চানাচুর-চটপটি-ফুচকাওয়ালারা ফ্রি খাওয়াচ্ছে, শ্রমিকরা-ভিখারিরা তাদের সারাদিনের উপার্জনের টাকা দিয়ে খাবার কিনে এনে খাইয়ে দিচ্ছে ওখানে অবস্থান নেওয়া ছেলেমেয়েদের। এসব কতো-কতো আবেগময় ইতিহাস তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন! সে নিজেও অফিস থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তরুণদের এই জেগে-ওঠা দ্যাখে মুগ্ধ চোখে।

রাতের ঢাকায় ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে সিএনজি। অল্প সময়েই ফার্মগেট চলে এসেছে। সুমন ভাবলো, ড্রাইভারের সঙ্গে একটু কথাটথা বলা যাক।

প্রতিদিনই যান নাকি চাচা?

হ, যাই। দুই-তিনবার যাই, যাওয়ার পথে কেউ যাইতে চাইলে ফ্রি নিয়া যাই।

ফ্রি নেন কেন? লস হয় না?

এইডা তো আপনেরে বুঝানো যাইবো না বাবা। যুদ্ধ করছি, কিন্তু যুদ্ধের পরপরই ওই হারামিগুলারে মাইরা ফেলি নাই বইলা এরা এতো বাড় বাড়ছে। দেশটারে গিলা খাইবার চায়। আমাগো তো বয়স হইছে, এখন কিছু করবার পারুম না। কিন্তু এই যে পুলাপানগুলা এক জায়গায় খাড়াইছে, এইবার আর উপায় নাই। হারামিগুলার মরণ ছাড়া আর কোনো পথ নাই।

সে একটু চমকালো। লোকটা মুক্তিযোদ্ধা ছিল! সেজন্যই তো এমন আগুন বয়ে বেড়াচ্ছে ভেতরে! একবার তার মুখটা দেখার খুব ইচ্ছা হলো সুমনের। কিন্তু লোকটা সামনের দিকে স্থির তাকানো, ঘুরে না তাকালে পেছন থেকে তো মুখ দেখা সম্ভব নয়। কথা বলার সময় তার বাবড়ি চুলগুলো বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে নড়ছে, দৃশ্যটা দেখতে ভারি ভালো লাগছে তার। বাবারও নাকি এরকম বাবড়ি চুল ছিল, মায়ের কাছে শুনেছে।

গল্প করতে-করতে শাহবাগ পৌঁছে গেল তারা। রূপসী বাংলা হোটেলের মোড়েই থামতে হলো, এরপর আর যাওয়ার উপায় নেই। নেমে পড়লো তারা, ড্রাইভারও। তারপর কোনো এক অপ্রতিরোধ্য আবেগে ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে সোমার কোলে দিয়ে সুমন হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে ড্রাইভারের পা ছুঁলো, লোকটা অপ্রস্ত্তত হয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। সে মৃদুকণ্ঠে বললো, এই প্রথমবারের মতো কাউকে – ‘আমার বাবাও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, শহিদ হয়েছেন। তাঁর কথা মনে নেই আমার, কবরটা কোথায় তাও জানি না। আপনাকে সালাম করে আমি আমার ভালোবাসাটুকু তাঁকে পৌঁছে দিলাম।’ তিনি বোধহয় হতভম্ব হয়ে গেলেন, শক্ত করে সুমনকে ধরে রাখলেন বুকের ভেতর, এলোপাতাড়ি চুমু খেতে লাগলেন সুমনের কপালে-গালে-চোখে, যেন অনেকদিন পর হারানো শিশুপুত্রকে খুঁজে পেয়েছেন। মুখে কথা জুটছে না, ইশারায় সোমাকে কাছে ডাকলেন তিনি, তারপর দুই বাচ্চাকে একসঙ্গে কোলে তুলে নিলেন। বিস্ময় নিয়ে তারা দেখলো – লোকটার দুই গাল ভেসে যাচ্ছে জলে। স্ট্রিট-লাইটের আলোয় চিকচিক করছে অশ্রম্নবিন্দু, মুক্তোদানার মতো। ওদেরকে সঙ্গে নিয়েই তিনি এগিয়ে চললেন শাহবাগের দিকে। এই মোড় এমনিতেই কখনো ঘুমাতো না, আর এখন এখানে জমেছে লাখো প্রাণের মেলা। রাতের শহর কেঁপে উঠছে বিবিধ

শিহরণ-জাগানো স্লোগানে। আহা! কী অসামান্য এই জেগে থাকা!

পারবে তো ওরা? ঘাতকদের বিচার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই আন্দোলনকে টেনে নিয়ে যেতে পারবে তো? – সুমন ভাবলো। যদি পারে, যদি ওই ঘাতকগুলোর বিচার হয়, তাহলে এবার সে সত্যি-সত্যি বাবার কবরটা খুঁজে বের করবে। সৌধ নির্মাণ করতে না পারুক, একগুচ্ছ বেলিফুল দিয়ে কবরটা সাজিয়ে তুলবে, আর চারপাশে লাগিয়ে দিয়ে আসবে বেলিফুলগাছের চারা। মায়ের কাছে সে শুনেছে – বেলিফুল বাবার খুব প্রিয় ছিল।

 

পাঁচ

শাহবাগে মানুষের এই বিপুল জাগরণ দেখতে গিয়ে, হ্যাঁ, স্রেফ দেখতে গিয়ে, সেও যে এক জটিল আবর্তে জড়িয়ে পড়ছে, বুঝতে পারেনি সুমন। কবে কখন কোনদিক থেকে নাস্তিক-নাস্তিক রব উঠলো, কোন এক উদ্ভট পত্রিকার ধান্দাবাজ সম্পাদক শাহবাগের তরুণদের চরিত্রহরণের জন্য একের পর এক ছাপিয়ে চললেন মনগড়া সব প্রতিবেদন, সেটাও তখন খেয়াল করেনি। কিন্তু ব্যাপারটা যখন দেশের একমাত্র আলোচনার বিষয়বস্ত্ত হয়ে উঠলো, যখন উসকানি দিয়ে মাদ্রাসা থেকে বের করে আনা হলো কোমলমতি-মায়াময়-দরিদ্র শিশুদের, ব্যবহার করা হলো রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে, তখন আর চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেনি। ততোদিনে শহরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে শ্বাপদের দল – নিঃশব্দে অনুসরণ করে তারা,  সময়-সুযোগমতো হামলা করে। একদিন এক বিচিত্র ঘটনা ঘটলো তার জীবনে। প্রতিদিনের মতো শাহবাগ হয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করেছিল সে, পরিবাগের কাছে আসতেই একদল তরুণ তাকে থামালো।

ওইদিকে কই যাইতেছেন?

ওদিকে মানে?

শাহবাগের দিকে!

বাসায় যাচ্ছি।

বাসা কই?

আজিমপুর।

তাইলে শাহবাগে যাইতেছেন ক্যান? সোজা বাসায় গেলেই পারেন!

সব সময় তো এই পথেই বাসায় যাই।

না, আপনে বাসায় যাওয়ার জন্য শাহবাগ যান না, অন্য কারণে যান।

আরে কী আশ্চর্য! আমি বছরের পর বছর ধরে এই পথে যাচ্ছি!

সবসময় যাওয়া আর এখনকার যাওয়া তো একরকম না!

কেন একরকম হবে না? আমার হাঁটতে ভালো লাগে বলে হাঁটি। আপনাদের সমস্যা কী?

তা আপনে হাঁটেন। মাইলের পর মাইল হাঁটেন। সারা দুনিয়ায় চক্কর দেন। কেউ তো মানা করে নাই; কিন্তু শাহবাগে যান ক্যান?

আশ্চর্য তো! অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা হেঁটে  শাহবাগ-টিএসসি হয়ে বাসায় যাই। এটাই তো সহজ পথ।

এইটাই সহজ পথ, তা আপনেরে কে কইলো?

আমি হাঁটি আর আমি বুঝবো না, কোনটা সহজ?

না-ও তো বুঝতে পারেন! আপনি তো সার্ক ফোয়ারা থিকা সোজা না আইসা হাতিরপুল-কাঁটাবন-নীলক্ষেত-পলাশী মোড় হয়া আজিমপুর যাইতে পারতেন! সেইটা কি আরো সহজ হইতো না?

কোনটা সহজ আর কোনটা কঠিন সেটা তো প্রশ্ন নয়। আমার এই পথে হেঁটে যেতে ভালো লাগে, তাই…

ক্যান ভাল লাগে?

এটা কোনো প্রশ্ন হলো?

হ হইলো, কারণ, শাহবাগ যান বইলাই প্রশ্নটা উঠলো।

শাহবাগের সমস্যা কী?

ওইখানে যারা যায় তারা সবাই নাস্তিক!

নাস্তিক! বাহ, ভালো বলেছেন তো! শাহবাগ গেলেই যে কেউ নাস্তিক হয়ে যাবে?

হ।

তাহলে তো ওখানকার দোকানদাররাও নাস্তিক।

খালি দোকানদাররা না, শাহবাগের দোকানপাট, জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি সব নাস্তিক। গাছপালাও নাস্তিক!

বাহ বাহ, দারুণ!

হ, এইটাই আমাগো সিদ্ধান্ত।

আপনারা সিদ্ধান্ত দেওয়ার কে? এই অথরিটি আপনারা কোথায় পেলেন?

সেইটা একটু পরই বুঝবেন। তার আগে বলেন, কেন এই রুটটাই আপনার পছন্দ? আমরা যে-রুটের কথা বললাম, ওইদিক দিয়া যাইতে আপনার অসুবিধা কী?

কোনো অসুবিধা নাই।

তাইলে এই পথে যান ক্যান?

আরে কী আশ্চর্য! কোন পথে যাবো, এই প্রশ্ন তো কোনোদিন ওঠে নাই! কেন জিজ্ঞেস করছেন?

কোনোদিন ওঠে নাই, আইজকা উঠছে। উঠছে বইলাই উত্তরটা আপনাকে দিতে হবে!

কেন দেবো? আপনারা সেটা জিজ্ঞেস করার কে?

আপনে তো দেখি আমাগো পরিচয় নিয়া খুব চিন্তিত। কল্লাটা কাইটা হাতে ধরায়া দিলে বুঝবেন আমরা কারা! যা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দেন।

তার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের শিরশিরে একটা ঢেউ বয়ে গেল, বলল – বললাম তো ভালো লাগে!

কেন ভালো লাগে?

দেখুন, আমি আপনাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই। আমি এই ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলাম, ক্যাম্পাসের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি, প্রতিদিন ওখান দিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে বলেই যাই!

অ! আপনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন! তাইলে তো আপনে ডবল নাস্তিক!

মানে?

মানে তো পরিষ্কার! ওইখানে যারা পড়ে তারা সবাই নাস্তিক!

বাহ বাহ! খুবই ভালো কথা শোনালেন আপনারা।

হ, আমরা যা বলি সেইটাই সঠিক। আপনেরে আমরা নাস্তিক বইলা সাব্যস্ত করছি, এবং আপনেরে কতল করা আমাদের জন্য অবশ্যকর্তব্য! তবে আপনে চাইলে একটা সুযোগ আমরা দিতে চাই…

কতলের কথা শুনে সুমন এমনিতেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল, সে তাই কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো –

কী সুযোগ?

আপনে আমাগো লাইনে আসেন।

আপনাদের লাইন মানে?

মানে তো বোঝেনই। আপনে তো এতো বোকা না। আইজকা আর আপনেরে কিছু কইলাম না। কিন্তু আর কোনোদিন যদি শাহবাগের আশেপাশে দেখি…

তাহলে আমি বাসায় যাবো কোন পথে?

সেইটা আপনার ব্যাপার। আমরা তো একটা রুট কইলামই। শাহবাগের চেয়ে কাঁটাবনের রুটটা ভালো। এখন আপনে ওদিক দিয়াই যাইবেন!

আর কথা না বাড়িয়ে পরিবাগের ভেতর দিয়ে হাতিরপুলে রাজীবের বাসায় গিয়ে কলবেল বাজালো সুমন। একটু সুস্থির হওয়া দরকার। সবচেয়ে ভালো হয় একটু গলা ভিজিয়ে মাথাটা পরিষ্কার করতে পারলে।

সুমন ভীষণ অবাক হয়েছিল। এই পথে সে এই প্রথম হাঁটছে না। হাঁটতে ভালো লাগে তার, বহুদিন ধরেই অফিস থেকে বেরিয়ে খানিকটা আড্ডা দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে আসতে-আসতে শরীরের ঘাম ঝরায়, তারপর বাসায় ফিরে একটা দীর্ঘ গোসল দিয়ে চমৎকার ফ্রেশ হয়ে যায় সে। অফিসটা ফার্মগেটে আর তার বাসা আজিমপুর, সে সোজা হেঁটে কারওয়ানবাজার-সার্ক ফোয়ারা-বাংলামোটর-পরিবাগ-শাহবাগ পেরিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে, আর তার শরীরজুড়ে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। আহা! কী আরামদায়ক এই জায়গাটা! কতো স্মৃতি, কতো স্মৃতি! ক্যাম্পাসের মায়া সে ছাড়তেই পারলো না আজ পর্যন্ত, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাট চুকিয়েছে বছর বিশেক আগেই, সেজন্যই সে এমন এক জায়গায় বাসা নিয়েছে যেন ইচ্ছে করলেই ক্যাম্পাসে আসা যায় বা যাওয়া-আসার পথে ক্যাম্পাসটা দেখে যাওয়া যায়। মায়া! কেন এতো মায়া এই জায়গাটার জন্য? বন্ধুরাও পারতপক্ষে এখানে আসে না আর, সে একা-একাই ঘোরে, তবু কী যে ভালো লাগে! তারপর আবার শরীরে ক্লান্তি নেমে এলে সে টিএসসির পাশ দিয়ে সোজা হেঁটে জগন্নাথ হলকে ডানে রেখে পলাশীর মোড় হয়ে আজিমপুরের দিকে চলে যায়। এই তার নিত্যদিনের হাঁটাপথ। আর আজ কিনা সেই পথ আগলে দাঁড়ালো উদ্ভট কতোগুলো লোক! সত্যিই তার বিস্ময় যাচ্ছে না।

এরকম ঘোরতর দুঃসময়ে, সন্ধ্যা পার হওয়া ভীতিকর শ্বাপদসংকুল শহরে কলবেল বেজে উঠলেও হয়তো আতঙ্ক লাগে, কে এলো এই দুর্যোগের ভেতর? ফলে রাজীবের দরজায় দাঁড়িয়ে কলবেল বাজিয়েও অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে হলো সুমনকে। পিনহোলে চোখ রেখে সুমনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও যেন ঠিক বিশ্বাস হয় না রাজীবের, বারবার জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে চায়। একসময় সুমন খেঁকিয়ে উঠলে দরজা খুলে অবাক গলায় প্রশ্ন করে রাজীব –

তুই? এই অসময়ে?

অসময় কোথায়? অফিস থেকে ফিরছিলাম কেবল।

এ-পথে তো কখনো ফিরিস না!

হ্যাঁ, ফিরি না। আজকে ফিরতে হলো।

কেন?

সে অনেক কথা। আগে বল, গলা ভেজানোর মতো কিছু আছে বাসায়?

না, নেই তো!

হতভাগা! ভাবলাম, তোর কাছে এলে কিছু পাওয়া যাবে। খাওয়া বাদ দিয়েছিস নাকি?

আরে নাহ, বাদ দেবো কেন? মা বাসায় আছেন বলে খাচ্ছি না।

চল বেরোই।

কোথায়?

একটু গলা ভিজিয়ে আসি। মন-মেজাজ ভালো নাই।

থাকার কথাও নয়। কিন্তু বার কি খোলা পাবি?

ওটা খোলাই থাকে। সব বন্ধ হয়ে গেলেও বার বন্ধ হবে না।

কিন্তু… এই রাতের বেলা…

রাত দেখলি কোথায়? কেবল তো সন্ধ্যা!

ফিরতে তো রাত হয়ে যাবে!

তুই এতো ভীতুর ডিম হলি কবে? ভীতু তো ছিলাম আমি!

বয়স হয়েছে না? শরীর-স্বাস্থ্য তো আগের মতো নেই!

আচ্ছা, আমি তোকে পৌঁছে দিয়ে যাবো। এবার চল তো!

বেশি রাতে চলাফেরা করা তোর জন্যও তো রিস্কি!

রাতে এখন রিস্ক কম দোস্ত। জানোয়ারগুলো শহর দখলে নিয়েছে, চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারী বিদায় নিয়েছে অথবা রিটায়ারমেন্টে গেছে। দিনের বেলাতেই বেশি বিপদ। আর এই সন্ধ্যার সময়টা।

বাধ্য হয়েই বেরোলো রাজীব। বেরোনোর সময় অনিকার শঙ্কিত মুখ, দোয়া-দরুদ পড়ে কয়েকবার ফু-ও দিয়ে দিলো দুজনকে! বেচারি! মেয়েটা ভারি শঙ্কায় থাকে আজকাল। গর্ভকালীন সময়টা এমনিতেই মেয়েরা নানা রকম দুশ্চিন্তায় ভোগে, নানা জটিল সব মানসিক সংকট দেখা দেয়, আপনজনের কাছে ঘেঁষে বসে থাকতে চায়, বিশেষ করে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য মন ছুটে যায়। অনিকার কী দুর্ভাগ্য, সেই সুযোগ তার নেই! বিয়ের পর এতো বছর হয়ে গেল, মা-বাবা-ভাই-বোন তাকে একবার দেখতেও আসেনি! ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করেছে সে, সেই অপরাধ ক্ষমা করেননি তারা! অনিকার জন্য খারাপই লাগে রাজীবের। স্বজনহীন একটা জীবন! যদিও এখন মা আছেন বাসায়, বউকে তিনি আদরও করেন খুব, কিন্তু তিনি তো আর সবসময় থাকেন না! ঢাকায় নাকি তাঁর দমবন্ধ লাগে, কিছুদিন থাকলেই হাঁপিয়ে ওঠেন, তাদের মুন্সিগঞ্জের বাড়িটাও শহরেই, তবু ওখানেই ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। সারা বছর অনিকা প্রায় একা-একাই থাকে। এখন তো আরো জটিল অবস্থা। মানসিকভাবে এতোই দুর্বল থাকে যে, বিছানা থেকে উঠতেও ভয় পায়! তার ওপর যদি চারপাশে এতো-এতো দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে প্রতিদিন, তাহলে মনের অবস্থা যে কী হতে পারে তা তো বোঝাই যায়। রাজীব জানে, সে না ফেরা পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পাবে না অনিকা। মনের ভেতরে একটু খচখচানিও নিয়েও সে বেরোলো। তার নিজেরও একটু রিলিফ দরকার। সবকিছুর ওপর এতো বিরক্ত হয়ে থাকা ভালো নয়।

প্রথমে ভেবেছিল শ্যালেতেই বসবে, ওটা হাঁটা-দূরত্বে। বেরিয়ে একটা রিকশা পেয়ে সাকুরার দিকে রওনা হলো তারা। এই ভরসন্ধ্যায় যেখানে রাস্তাঘাটে উপচে পড়ে মানুষ, এখন প্রায় সুনসান ফাঁকা।

রাজীব বললো – রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখেছিস?

হ্যাঁ, একেবারে আতঙ্কের শহর।

হরতাল-অবরোধ তো আমাদের দেশের জন্য নতুন কিছু নয়! এরশাদের আমলে আমরাও তো কতো পিকেটিং করেছি…

আমি করিনি। আমি ছিলাম ভীতু। ওসব তোরা করেছিস।

ওই হলো আর কি! এরশাদ-আমলের পরও তো কম হরতাল হয়নি! কিন্তু এখন যেসব হচ্ছে, আগে কখনো হয়নি। এতো নৃশংসতা, নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারা – এরকম অবস্থা আর কখনো ছিল না।

না রে, আগেও হয়েছে, তবে মাত্রাটা বেড়ে গেছে অনেক।

আগে কখন হলো?

কেন? দোতলা বিআরটিসি বাসে আগুন দেওয়ার কথা ভুলে গেছিস? কতোগুলো লোক মরে গিয়েছিল, কতোগুলো মানুষ সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল, ভুলে গেলি কীভাবে?

না ভুলিনি। আসলে এখন ব্যাপারটা এতোই নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে যে, কালকের ঘটনা মস্নান হয়ে আজকেরটাই জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে।

রাজনীতির ধরনটাই পালটে গেছে। দুই দল মারামারি করছে, করুক। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে মরতে হয় কেন? আমাদের অপরাধটা কী?

এই দেশে জন্মেছিস, এটাই অপরাধ।

আরেকটা ঘটনা মনে পড়লো। বছর বিশেক আগে এক হরতালের দিন এক অফিসগামী বয়স্ক লোককে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে দেওয়া হয়েছিল। মনে আছে তোর?

হ্যাঁ। আছে। সাধারণ মানুষকে চরম হেনস্থা করার ব্যাপারটাও বোধহয় শুরু হয়েছিল ওই ঘটনায়। তার আগে যতোই পিকেটিং হোক না কেন, গাড়িটাড়ি ভাঙা হোক না কেন, যাত্রীদের ক্ষতি করা হতো না।

আমার অবাক লাগে জানিস – যারা চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে, নিরীহ পথচারীদের ওপর ককটেল ছুড়ে মারে, তারা কেমন মানুষ?

ওরা মানুষ না রে। এগুলো পশুরও অধম।

এইসব হতাশার গল্প করতে-করতে তারা পৌঁছে গেল সাকুরার গেটে। সুস্থির হয়ে আজকের ঘটনাটা খুলে বললো সুমন, শুনে রাজীব অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। তারপর বললো –

কোত্থেকে কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এরকম অদ্ভুত সিচুয়েশন আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। একদল অমানুষ বিরুদ্ধ মতের সবাইকে নাস্তিক বলে গাল দিচ্ছে, আবার মতের সামান্য অমিল হলেও আরেকদল গাল দিচ্ছে রাজাকার বলে। এই দুই দলের বাইরে যেন আর কেউ নাই। এদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়, এই দেশের অর্ধেক মানুষ নাস্তিক, বাকি অর্ধেক রাজাকার!

শুধু কি তাই? এখন তো কারো সঙ্গে কথাই বলা যায় না। সবাই সারাক্ষণ উত্তেজিত, কথা বলতে গেলেই কঠিন ঝগড়া বেধে যায়।

ঝগড়া কী নিয়ে?

সবকিছু নিয়েই। পলিটিক্যাল ইস্যু নিয়েই বেশি হচ্ছে।

তা তো সারা জীবনই হয়েছে। যার-যার পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড নিয়ে গলা ফাটিয়ে তর্ক করা তো বাঙালির পুরনো স্বভাব।

এখনকার বিষয়গুলো সেরকম নয়।

কী রকম?

তর্ক তো হচ্ছে না, হচ্ছে ঝগড়া, হচ্ছে গালাগালি, হচ্ছে ট্যাগিং।

তুইও ট্যাগ খেয়েছিস নাকি?

এই তো কিছুক্ষণ আগে নাস্তিক ট্যাগ খেলাম।

হা-হা-হা… শাহবাগ হয়ে বাসায় যাস বলে নাস্তিক! দারুণ ট্যাগ।

ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্ররাও নাস্তিক। সেই অর্থে তুইও তো নাস্তিক।

এভাবে বলিস না দোস্ত, ভয় লাগে। মদটদ খাই বলে এমনিতেই মনের মধ্যে সবসময় কুটকুট করে – আলস্নাহ যে কী শাস্তি দেবেন, ভেবে অস্থির লাগে। তার ওপর যদি নাস্তিক বলিস…

আরে এই নাস্তিক মানে আলস্ন­vহকে অবিশ্বাস করা না। এইটা হইলো পলিটিক্যাল নাস্তিক। হা-হা-হা…

নাস্তিক তো নাস্তিকই, পলিটিক্যাল নাস্তিক আবার কী জিনিস?

পলিটিক্সে নতুন-নতুন টার্ম যুক্ত হয় না? এটা হলো আরেকটা টার্ম। এইখানে রাজাকারদের বিচার চাওয়া মানেই নাস্তিকতা। আলস্নাহ-খোদার কোনো ব্যাপারই নাই এইখানে।

যাক বাঁচাইলি! কবে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ছিলাম, সেই অপরাধে যদি নাস্তিক হইতে হয়, তাইলে আলস্নাহর কাছে গিয়া কী জবাব দিমু, ক?

তোর কাছে জবাব চাইবে না বোধহয়। আল্লাহ তো কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নন যে কেউ তোকে নাস্তিক বললেই তিনি তা মেনে নেবেন! তিনি মানুষের মন দেখেন! এতোগুলো মানুষকে নাস্তিক বলে গালাগালি করার অপরাধে এইগুলার কী শাস্তি দেন তিনি, সেইটা দেখিস। বদমায়েশগুলা ধ্বংস হয়ে যাবে!

ওরা মরুকগা, আমার কী? যাকগে, আমি জানতে চাচ্ছিলাম, অন্য কারো কাছে ট্যাগ খেয়েছিস নাকি?

না, তা খাইনি। অফিসে তো আমি কথাই বলি না। কলিগরা ঝগড়া করে, আমি মুখে কলুপ এঁটে থাকি। দরকারটা কী এসব ঝামেলায় জড়ানোর? তবে প্রায়ই দেখি এ ওকে ট্যাগ করছে, ও একে। বাদ দে, এসব বলতে ভালো লাগছে না। অন্য গল্প বল।

অন্য গল্প তো হারিয়ে গেছে। আমরা এখন রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবতে পারছি না!

কপাল খারাপ দোস্ত। রাজনীতি জিনিসটাকে সারাজীবন এড়িয়ে

চলেছি। এখন দেখছি ওটা কাঁধের ওপর উঠে বসে আছে! নামাতেই পারছি না।

পারবি না। এরকম জটিল সময়ে কেউই পারে না। এ হলো ক্রান্তিকালের চরিত্র।

এই ‘ক্রান্তিকাল’ শব্দটা খুব শুনি আজকাল। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবি?

বুঝিয়ে বলা কঠিন। এটাকে টার্নিং পয়েন্টও বলতে পারিস।

কিসের টার্নিং?

ইতিহাসের।

বুঝলাম না।

কীভাবে বোঝাই তোকে! মানে, এটা হলো এমন এক সময় যখন সবাইকে একটা পক্ষ-বিপক্ষ বেছে নিতেই হয়। মানে, বেছে নিতে তুই বাধ্য থাকিস। হয়তো এর আগে বিষয়টি নিয়ে খুব গভীরভাবে কখনো ভেবে দেখিসনি তুই, অথচ এখন যখন কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছিস, মাঝামাঝি থাকার কোনো পথ যখন আর খোলা নাই, নিরপেক্ষ শব্দটি যখন হাস্যকরভাবে বেমানান, এবং পক্ষ-বিপক্ষ যেটিই বেছে নিস না কেন – দুটোরই তীব্রতা খুব বেশি, তখন আর সেই ভার বহন করা তোর পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠছে না। এরকম পরিস্থিতিতে তো আগে কখনো পড়িসনি, পারবিই বা কীভাবে?

এক্সাটলি! আমার ঠিক এরকমই মনে হয়। কোনো একটা পক্ষে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর উপায় নাই।

অথচ ভেবে দ্যাখ, আমরা জাতিগতভাবে কিন্তু মধ্যপন্থী। কোনো ব্যাপারেই খুব চূড়ান্ত কোনো অবস্থানে যেতে আমরা অভ্যস্ত নই। ক্রান্তিকাল আমাদেরকে বাধ্য করে চূড়ান্তপন্থী হতে। পরিস্থিতিটা সামলাতে ব্যর্থ হয়ে আমরা অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি, তীব্র ক্রোধ আর বিদ্বেষ আমাদের মনকে তছনছ করে ফেলে। আর তছনছ হয়ে যাওয়া মন নিয়ে, একা-বিচ্ছিন্ন-বন্ধুহীন হয়ে আমরা বিহবল-অসহায়ের মতো বসে থাকি। বহমানতার বদলে স্তব্ধতা আমাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে।

কী সুন্দর করে কথা বলিস তুই, রাজীব! লিখে ফেলিস না কেন?

ধুর! আমি লেখক নাকি যে লিখবো?

লেখকই হতে হবে এমন তো কোনো কথা নাই। এতো গুছিয়ে ভাবিস তুই, এতো সুন্দর করে বলিস, লিখলেই তো দারুণ কিছু হয়ে যায়!

বিলটা কে দেবে?

মানে?

মানে আজকে খাওয়ার বিলটা কে দেবে?

হঠাৎ করে বিলের কথা বললি কেন?

না, মানে, যে-হারে প্রশংসা করছিস, মনে হচ্ছে বিলটা আমার ঘাড়েই চাপাবি!

শালা! ভালো কথা বললাম, গায়ে মাখলি না!

না মাখাই ভালো দোস্ত। মাস্টারি করি, ক্লাসে সুন্দর করে কথা বলতে হয়, তাই অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই বলে লেখালেখি? এসব ভেজালের মধ্যে আমি নাই।

হোপলেস! তোর মতো ইয়ে আর কখনো দেখিনি।

ওরকম ‘ইয়ে’ না হলে বেঁচে থাকার উপায় নাই। দেখছিস না, লেখালেখি করতে গিয়ে কী ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছে বস্ন­গাররা। চাপাতির কোপ খেয়ে মরছে একেকজন।

মন খারাপ হয়ে যায় দোস্ত। এরকম তো ছিল না আমাদের দেশটা। কী যে দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে, ভাবতে গেলেও দমবন্ধ হয়ে আসে। নাহ, আর ভালো লাগে না এসব। চল উঠি এবার।

হ্যাঁ চল। বেশি দেরি করলে বউরা হার্টফেল করবে।

বেরিয়েই রিকশা পাওয়া গেল। বারের বাইরে সবসময়ই কিছু রিকশা আর সিএনজি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকে, তারা সাধারণ কোনো যাত্রীকে নেয় না, বার থেকে কেউ বেরিয়ে ডাকলেই নিঃশব্দে এসে হাজির হয়। কে কোথায় যাবে, জিজ্ঞেসও করে না। এরা বিশ্বস্ত চালক, শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেও আপত্তি নেই তাদের। তারা জানে পানশালা থেকে বেরিয়ে স্যারদের মন ও হাত দুটোই খুলে যায়, বিশ টাকার দূরত্বে গিয়ে একশ টাকা ধরিয়ে দেয়! দূরত্ব বেশি হলে তো কথাই নেই, দুশো-তিনশো-পাঁচশো পর্যন্ত পাওয়া যায়! বিনিময়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি তাই তারা ভালোবেসেই করে। এরা সবাই তাদেরকে চেনে, এমনকি বাসাও চেনে। অনিরাপদ-অবিশ্বস্ত শহরে এরাই এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বস্ত মানুষ। রাজীব বললো –

চল তোকে বাসায় দিয়ে আসি।

পাগল নাকি! তুই অতোদূর যাবি কেন?

একটা ঝামেলায় যেহেতু পড়েছিস, একা যাওয়া ঠিক হবে না।

একা আর কোথায়? শহীদুল তো আছেই!

শহীদুল মানে রিকশাওয়ালা। এবার সে-ই রাজীবকে বললো –  দুইজনই ওঠেন স্যার। আপনেরে নামায়া দিয়া এই স্যাররে দিয়া আসুমনে।

পারবা তো?

পারুম না ক্যান? চিন্তা কইরেন না স্যার। আইজ পর্যন্ত আমার রিকশারে কেউ থামাইতে পারে নাই।

তাইলে আর আমারে আগে নামাইবা ক্যান? ওই স্যাররে আগে দিয়া আসি চলো।

আইচ্ছা স্যার। আমারে তো ফিরতেই অইবো, আপনেরে সঙ্গে নিয়া যাই।

রিকশায় উঠে সুমন বললো, কাঁটাবন হয়ে যাও শহীদুল।

রাজীব বললো, কেন? কাঁটাবন হয়ে যাবে কেন? শাহবাগ হয়ে যাক!

না, মানে, ওভাবে হুমকি দিলো…

হাহাহা… ডরাইছিস দোস্ত? হুমকি দিলো আর তুই শাহবাগ যাওয়া ছেড়ে দিলি!

শহীদুল শাহবাগের দিকেই রিকশা ছোটালো, বললো – বুঝছি স্যার। ডরায়েন না।

কী বুঝছো শহীদুল?

আপনেরে কারা হুমকি দিছে সেইটা বুঝছি।

কেমনে বুঝলা?

এইটা তো রোজই দেখতেছি। একটা না একটা ঘটনা ঘটতেছেই।

রোজ ঘটে?

হ স্যার। রোজই ঘটে।

পত্রপত্রিকায় তো আসে না!

পত্রিকায় কেম্নে যাইব? এই যে আপনেরে আইজকা হুমকি দিলো, আপনে গিয়া পত্রিকায় কইবেন নাকি?

হুম বুঝছি।

এইগুলারে পাত্তা দিয়েন না স্যার। পাত্তা দিলেই মাথায় উঠবো। ওরা কইলেই হইবো নাকি? আমরা শাহবাগের দখল ছাড়ি নাই।

শাবাশ শহীদুল!

শহীদুল মুখ ঘুরিয়ে একটু হেসে বাতাসের বেগে রিকশা ছোটালো। রাস্তাঘাট খালি, একটা প্রাণীও নেই। আজিমপুর পৌঁছতে লাগলো পনেরো মিনিট! সুমন বললো –

এখন তুই একা যাবি, আমার টেনশন হতে থাকবে। গিয়েই জানাবি কিন্তু।

আরে বাদ দে তো! এতো টেনশন করে কিছু হয় নাকি?

তবু জানাবি।

আচ্ছা ঠিক আছে।

রিকশা ঘুরিয়ে আবার ছুটলো শহীদুল। রিকশা তো নয়, যেন পঙ্খিরাজ ছুটিয়েছে। যেতে-যেতে বললো – স্যার, দ্যাশের অবস্থা কেমন বুঝতেছেন?

কেমনে কমু শহীদুল? কিছুই তো বুঝতেছি না!

কী যে কন স্যার! আপনে রিকশায় উঠলে কতো কিছু শিখি! কতো জ্ঞানগরিমার কথা কন! আপনে না বুঝলে বুঝবো কেডা?

এখন আর বুঝতেছি না কিছু। তোমার কী মনে হয়?

আমার তো মনে অয় অবস্থা একটু খারাপ অইলে সব ঠিক অইয়া যাইবো।

কেমনে বুঝলা?

শেখের বেটি শক্ত আছে, হরতাল-ফরতাল দিয়া হেরে টলানো যায় নাই, এইসব খুনখারাবি কইরাও তারে হারানো যাইবো না।

তা যাইবো না বুঝলাম। কিন্তু যদি ওরা আসে?

মনে অয় না স্যার।

ক্যান?

শেখের বেটির অনেক বুদ্ধি। উনাগো আইতে দিবো না।

রাজীব ভাবলো – কী সহজ বুঝ এদের, কী অবিচল আস্থা! সরকারের মুখপাত্র সেজে টকশোতে যারা প্রতিদিন প্যাঁচাল পাড়েন, পত্রিকায় যারা অবিরাম লিখে চলেন, তাদেরও এই বুঝ নেই, আস্থাও নেই। তাদের কথাবার্তা শুনলেই বোঝা যায়, যুক্তির ধার কমে গেছে বলে গলার রগ ফুলিয়ে ঝগড়া করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। অথচ দলটির প্রধান শক্তি এই সাধারণ মানুষগুলোর নীরব সমর্থন। দুঃখ এই যে, যারা ক্ষমতায় যায় তারা এইসব ‘সাধারণ’ মানুষের কথা ভুলে যায়, আর যায় বলেই নিজেদের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে তারা।

 

ছয়

সেদিনের পর আর দীপার সঙ্গে দেখা হয়নি। ফোনে কথা হয় অবশ্য, প্রায়ই হয়, এবং এখনকার কথাবার্তা ঠিক আগের মতো নয়, একটু যেন বদলে যাওয়া। যেমন একদিন বললো – মা তোমাকে বাসায় আসতে বলেছে, খালাম্মাকেও নিয়ে আসতে বলেছে। বউবাচ্চাকেও এনো কিন্তু, মা ওদেরকে দেখতে চেয়েছে।

সুমন মজা পায়, বলে – এমনভাবে বলছো যেন তোমার কোনো আগ্রহই নেই এ-ব্যাপারে। যেন টেলিভিশনের খবর পাঠিকার মতো কেবল নিউজটা জানাচ্ছো।

আমার আগ্রহ থাকবে কেন? তুমি এলেই কী আর না এলেই কী?

অভিমান! দীপা কখনো এমন করে অভিমান করেনি তার ওপরে। তার ভালো লাগে। খুনসুটি করে, ক্ষেপায়। তারপর আলতো করে বলে – আমি কিন্তু ভালোবাসি তোমাকে, জানো তো?

ভালোবাসার কথা শুনলেই চুপ হয়ে যায় দীপা। যেন উচ্চারণ-অযোগ্য নিষিদ্ধ কোনো বাক্য উচ্চারিত হলো এইমাত্র!

সুমনের সঙ্গে যতোই নরম-কোমল হোক না কেন, শাহবাগ আন্দোলনের সময় সেই যে আগুন জ্বলেছিল সোমার ভেতরে, আর নেভেনি। আন্দোলনটা আর নেই, কিন্তু দীপা তার আগুনঝরানো কথাবার্তা বলেই চলেছে। ক্রমাগত লিখে চলেছে ফেসবুকে, বস্নগে। ইতিমধ্যেই সে তার লেখালেখির কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক আইকনিক ফিগারে পরিণত হয়েছে। অবশ্য ফলও পেয়েছে হাতেনাতেই। কয়েকবার হুমকি দেওয়া হয়েছে তাকে। বলা হয়েছে ‘এসব’ লেখালেখি বন্ধ না করলে খুব খারাপ পরিণতি হবে তার। হুমকি পেয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিল দীপা সাধারণ ডায়েরি করার জন্য, তারা তাকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে!

জনে-জনে নিরাপত্তা দেওয়া নাকি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়! দীপা অবশ্য পুলিশকে কথা শোনাতে ছাড়েনি, বলেছে – ‘থানায় বসে না থেকে বাসায় গিয়ে শুয়ে-শুয়ে ফিডার খেলেই পারেন! নিরাপত্তা দিতে পারবেন না, কেউ খুন হলে খুনিদের ধরতে পারবেন না, উলটো দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেবেন, তাহলে আর এখানে বসে থাকার দরকারটা কী আপনাদের?’

হুমকি পেয়েছে সুমনও। একবার নয়, বেশ কয়েকবার। কারণটা তার নিজের কাছেই পরিষ্কার নয়। সে তো ‘এসব’ লেখে না, তাহলে তাকে হুমকি দেওয়ার কারণটা কী? সম্ভবত তার ‘শহীদ-সন্তান’ পরিচয়টিই হুমকিদাতাদের কাছে বিপজ্জনক বলে মনে হয়েছে। অবশ্য দেশটাই এখন হুমকির দেশ হয়ে গেছে। কে যে কাকে কখন কী কারণে হুমকি দিচ্ছে, কে যে কখন খুন হয়ে যাচ্ছে তার কিছুরই ঠিক-ঠিকানা নেই। পুলিশও বোধহয় হাল ছেড়ে দিয়েছে। হুমকি পাওয়া সত্ত্বেও তাই দীপার মতো পুলিশের কাছে যায়নি সুমন। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ গ্রহণের মতো মন তার নেই। এ-ধরনের কিছু শুনলে নিশ্চিতভাবেই তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে। এদেশ তার বাবার রক্তে রঞ্জিত, কেন তাকে কেউ দেশ ছেড়ে যেতে বলবে? দীপাকে অবশ্য হুমকি-টুমকি দিয়ে থামানো যায়নি, সে আরো রাগি ভঙ্গিতে লিখে চলেছে রাজাকারদের কুকীর্তির কথা, তাদের অপরাধের কথা, এবং স্পষ্ট ভাষাতেই জানিয়ে দিচ্ছে – এদের বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত সে থামবে না।

দীপার সাহস সুমনকে বিস্মিত এবং মুগ্ধ করে। এমন কোমল একটা মেয়ের ভেতরে এতো আগুন থাকে কীভাবে? দেখে তার নিজেরও সাহস বাড়ে। অবশ্য সাহসী না হয়ে তার উপায়ই-বা কী? ভয় পেয়ে বাসায় বসে থাকলে তো আর তার চলবে না!

একদিন হঠাৎ করেই সুমন গিয়ে হাজির হয় দীপাদের বাসায়। দীপা বাসায় ছিল না, দরজা খুললেন খালাম্মা। কী বিমর্ষ একটা মুখ! সুমন পা ছুঁয়ে সালাম করলো, এই পুরনো অভ্যাসগুলো সে এখনো ছাড়েনি। তিনি খুশি হলেন, মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন, বললেন –

এসো বাবা, কতোদিন পর তোমাকে দেখলাম! বউমা কেমন আছে? আমার দাদুরা? তোমার মা?

জি সবাই ভালো আছে। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একবার দেখা করে যাই।

খুব খুশি হয়েছি বাবা।

আপনি কেমন আছেন খালাম্মা? সজীবের এখন কী অবস্থা?

নিজের কথা আর কী বলবো, ছেলেটার যে কী হলো সেই চিন্তাতেই মরি। অবস্থা দিন-দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

কী হয়েছে বলেন তো!

আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না। পরিচিত মানুষ ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না। ভয় পায়। বলে, সবাই নাকি ওকে মেরে ফেলতে চায়!

বাইরে-টাইরে যায় না?

যেতে চায় না। গেলেও একটা ছুরি নিয়ে বেরোয়।

ও! চিন্তার ব্যাপার হয়ে গেল। ডাক্তারের কাছে যায় না?

যায়। লাভ হচ্ছে না।

একবার হাসপাতালে নিয়ে গেলে হতো না?

একবার তো পাঠালাম। লাভ তো হলোই না, উলটো ঝামেলা। ও নাকি রংতুলি ছাড়া থাকতেই পারবে না। কী সব পাগলামি যে করলো!

এখনো আঁকে?

কী জানি! ক্যানভাস ভরে রাখে কালো রং দিয়ে। ওটাই নাকি ছবি! মাথামু-ু কিছু বুঝি না।

আমি একটু কথা বলে দেখি?

দ্যাখো।

সজীবের রুমে গিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল সুমনের, কী চেহারা হয়েছে ছেলেটার! শরীর ভেঙে পড়েছে, টকটকে লাল চোখ, চোখের নিচে কালি, উসকোখুসকো চুল, উদ্ভ্রান্ত চেহারা, একেবারে চেনাই যায় না! অথচ কী আকর্ষণীয়, উজ্জ্বল, ক্রিয়েটিভ একটা ছেলে ছিল! প্রতিভাবান শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে পেরেছিল অল্প সময়েই, শিল্পীমহলে তাকে দেখা হতো সমীহের চোখে। ছবি আঁকা

নিয়ে তার ধ্যান ও মগ্নতায় কোনো ঘাটতি নেই, আর ওই একটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে গিয়ে অবৈষয়িক-উদাসীন একটা জীবনই বেছে নিয়েছে সে। এতো যার ডেডিকেশন, একসময় দেখা গেল, সে আর কোনো ছবিই আঁকতে পারছে না। ডিপ্রেশন এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছলো যে, কোনো রংই নাকি তার তুলিতে আর ধরা দেয় না, যদিও প্রকৃতির বিবিধ রং, শব্দ ও নীরবতা সে তার তুলিতে ধরতে চেয়েছে সবসময়। চারদিকে কেবল কালো ছাড়া সে নাকি আর কোনো রংও দেখতে পায় না কোথাও। অথচ সে জানে, কালো আসলে কোনো রং নয়, বরং রঙের অনুপস্থিতি! আঁকতে না পারার এ-বিষয়টি সুমনের বুঝতে পারার কথা নয়, তবে সে শুনেছে –  শিল্পীদের এরকম কিছু সময় আসে যখন তারা কিছু লিখতে বা আঁকতে পারে না। সমস্যাটা নাকি সাময়িক, কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যায়। কিন্তু অনেকদিন পেরিয়ে গেলেও সজীবের সমস্যাগুলো কমলো তো না-ই, বরং আরো জটিল আকার ধারণ করলো।

অবশ্য শুধু আঁকাই নয়, আরো অনেক কাজ করতো সজীব। লেখালেখি করতো, সক্রিয় রাজনীতি করতো, নানারকম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে ধীরে-ধীরে কাজের ক্ষেত্র কমিয়ে এনেছিল বটে; কিন্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতো না, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে সে পরিষ্কার অবস্থান নিতো এবং প্রয়োজনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতো। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও ক্যাম্পাসে সে পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট হিসেবেই পরিচিত ছিল। ফলে, সিভিল সোসাইটির কোলে চড়ে দেশে আবার ছদ্মবেশী সামরিক শাসন শুরু হলে যে সে চুপ করে বসে থাকবে না, এ তো জানা কথাই। তার ফলও সে পেয়েছে হাতেনাতেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবিতে যে-বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতার হওয়া ছাত্র-শিক্ষক-রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সজীবও ছিল একজন! ব্যাপারটা নিয়ে কারো কিছু করার ছিল না। সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় থাকতে তুমি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, আর তারা বসে-বসে দৃশ্যটি দেখবে – তা তো হয় না! অনেকদিন পর সজীব ছাড়া পেলো ঠিকই, কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হলো এই ডিপ্রেশন। ফেরার পর কাউকেই কিছু বলেনি সে, তবে একদিন সুমনের কাছে বন্দিজীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে-বলতে কেঁদে ফেলেছিল, বলেছিল – ‘নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়া যায়, কিন্তু যে-অপমানটা ওরা করে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যারা নির্যাতনের শিকার হয় তারা কোনোদিনই বলতে পারে না, কী নির্মম অপমানের শিকার হয়েছে! আমিও পারবো না।’ বলেছিল, ফিরে আসার পর থেকে সে ছবি আঁকতে পারছে না, মনই বসাতে পারছে না কোনো কাজে। কোনো চিন্তাই সুস্থির হয়ে করতে পারে না, সারাক্ষণ অস্থির লাগে, অস্বস্তি লাগে, মনে হয় – কোথায় কী যেন একটা খারাপ কিছু ঘটে চলেছে। রাতে ঘুম হয় না, কখনো তন্দ্রার মতো এলেও চমকে জেগে ওঠে। সুমন আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি, তবে বুঝে নিয়েছে – এরকম শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে যে-কোনো মানুষেরই অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা।

এখন তাকে দেখে কে ভাববে যে, এই যুবকটিই একসময় ছবি আঁকা নিয়ে কী যে অলৌলিক সব কথাবার্তা বলতো! সত্যি কথা বলতে কি, সুমন ছবিটবি অতো বোঝে না, সে কেবল সজীবের কথা শুনতে যেতো। ছবি নিয়ে যে এতো চমৎকার কথা বলা যায়, সুমনের তা জানাই ছিল না।

সুমন একদিন জিজ্ঞেস করেছিল – তোমার আঁকার ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলো না!

কী বলবো?

ধরো, কেন আঁকো, কী আঁকতে চাও, যেটুকু চাও তার কতোটুকু পারো, কতোটুকু পারো না, এসব।

কী আঁকতে চাই? হয়তো প্রকৃতির সব রং, সব শব্দ, সব নীরবতা…

প্রথম কথাতেই চমকে উঠেছিল সুমন। প্রকৃতির সব রং আঁকতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা একজন শিল্পীর ভেতরে থাকতেই পারে, কিন্তু শব্দ আর নীরবতা আঁকতে চাওয়া! এ তো এক অতি জটিল আকাঙ্ক্ষা! তার বুঝতে দেরি হলো না যে, ওর ভাবনার জগৎটাই ভিন্নরকম। কোনো প্রশ্ন করলো না সে, কোনো বাধাও দিলো না; আর সজীব বলে চললো –

ভরা বর্ষায় আমাদের গ্রামের মাঠ-ঘাট সব ডুবে থাকে পানিতে, তখন কেবল পানি ছাড়া আর কিছুই নেই। আর জোৎস্নারাতে সেই দিগন্তবিসত্মৃত জলের ওপর বাতাসের হুটোপুটি শুরু হলে মনে হয়, জোৎস্নার ঢেউ উঠেছে। মাখন রঙের সেই জোৎস্না-ঢেউ কখনো কোনো রংতুলিতে ধরা দেয় না, জানেন! আবার শরতের সময় নদীর পাড়জুড়ে কাশবনে ধবধবে সাদা ফুলের বাহার। আচ্ছা, কখনো কচুরিফুল দেখেছেন আপনি? কচুরিফুলের রংটা একটু বেগুনি; না ঠিক বেগুনি নয়, একটু দীপাভ; না ঠিক তা-ও নয়; নীল-সাদা-বেগুনির একটা মিশ্রণ; না… মানে, বোঝানো মুশকিল। আমি কখনো আমার রংতুলিতে কচুরিফুলের রংটাকে ধরতে পারিনি। এমনকি কাশফুলের সাদাকেও না। আবার শীতের সময় কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে সারা গ্রাম ঘুমায়। কুয়াশার রংটাও কেমন যেন ধাঁধাময়, আঁকা যায় না। কিংবা ধরুন কৃষ্ণচূড়া বা শিমুলফুলের কথা। দুটোই লাল ফুল, কিন্তু একইরকম লাল নয়। সন্ধ্যায় পদ্মার বুকে সূর্য ডুব দিলে পশ্চিম আকাশের সেই মন ভোলানো আবির রং চোখে ঘোর লাগায়। ওই রংটিকেও লাল মনে হতে পারে, আসলে ঠিক লাল নয়! কিংবা সর্ষে ফুলের কথাই ভাবুন, মাঠের-পর-মাঠ কেবল হলুদ আর হলুদ। এমনকি বিভিন্ন পাতার যে সবুজ রং, তা-ও আলাদা আলাদা। ধানপাতার সবুজ আর মটরশুঁটির সবুজ এক নয়, যেমন এক নয় আমপাতার সবুজ আর ডালিমপাতার সবুজ। আমি কখনো এই হলুদ, সবুজ, শিমুলের লাল বা কৃষ্ণচূড়ার লালকেও ধরতে পারিনি। কবিতা সম্পর্কে একটা কথা আছে না – কবিতা হচ্ছে সেই শিল্প, যা অনুবাদে হারিয়ে যায়! আমার কী মনে হয় জানেন? প্রকৃতির এসব রং হচ্ছে সেই রং যা রংতুলিতে ধরতে গেলে হারিয়ে যায়…

সজীবের কথা চলতে থাকে, সবই নিসর্গ আর তার রং নিয়ে। আকাশ, মেঘ, চাঁদ, জোৎস্না, গাছ, পাতা, ফুল, নদী, পাখি, ফল আর সবকিছুর রং, আর এসব কিছু রংতুলিতে ধরতে না পারার ব্যর্থতার কথা! সুমন মুগ্ধ হয়ে শোনে। তারপর জিজ্ঞেস করে – শব্দ আর নীরবতা আঁকার ব্যাপারটা কী রকম?

সেটা তো আরো কঠিন। কতোরকমের রহস্যময় শব্দ যে শুনেছি এ-জীবনে, বলার নয়। ধরুন, সামান্য বাতাসেই বাঁশঝাড়ে

যে-শব্দ তৈরি হয়, শোঁ-শোঁ শব্দ, কোনো নাম হয় না ওটার, আমি যদি আঁকতে চাই, পারবো? বাতাসে নুইয়ে পড়া বাঁশঝাড়ের ছবি আঁকলে কি শব্দটার রহস্যময়তা বোঝা যাবে? যদি না যায়, তাহলে এই ছবি এঁকে লাভ কী?

কিন্তু, ছবিতে কি শব্দ ধরা যায় কখনো?

যাবে না কেন? কবিতায় বা গল্পে যদি শব্দ দিয়ে ছবি আঁকা যায়, মানে ওগুলো পড়ার পর যদি আমাদের চোখে একটা ছবি ভেসে ওঠে, ওখানে তো কোনো রংতুলি ব্যবহার করা হয়নি, অক্ষরের পর অক্ষর, শব্দের পর শব্দ, বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে যদি একটা ছবি ফুটিয়ে তোলা যায়, তাহলে রংতুলি দিয়ে কেন শব্দ আঁকা যাবে না?

হুম! তা বটে।

অগ্রহায়ণ মাসে রাতের বেলা টিনের চালে টুপটাপ শিশির পড়ার শব্দ শুনেছেন সুমন ভাই? বা বর্ষায় নিঝুম বৃষ্টির শব্দ? পদ্মার রহস্যময় গর্জন? বড়ো আবেশ জড়ানো ছিল শব্দ সেসব, জানেন! প্রহরজাগা পাখির ডাক, প্যাঁচার ডাক, শেয়ালের ডাক, কুকুরের কান্না – এইরকম বিবিধ শব্দ রাতগুলোকে অদ্ভুত সব রহস্যময়তায় ভরে তুলতো। সেসব শব্দকে আঁকতে না পারলে কি সেই রহস্যময়তার সন্ধান মিলবে?

ব্যাপারটা আমার জন্য বোঝা কঠিন, তবু চেষ্টা করছি। – সুমন ততোক্ষণে স্তব্ধ। মনে হচ্ছিল, রংতুলি আর ছবি আঁকা নিয়ে এরকম কথাবার্তা সে সারাজীবনেও শোনেননি। ব্যাপারটাকে সবসময়ই ধোঁয়াটে আর রহস্যময় মনে হতো বলে বোঝার চেষ্টাও করেনি খুব একটা। হয়তো সজীবকে খানিকটা উসকে দেওয়ার জন্যই আবার জিজ্ঞেস করলো সে –

শব্দের ব্যাপারটা বুঝলাম, কিন্তু নীরবতার ব্যাপারটা কী?

কোনো-কোনো দৃশ্য যেমন শব্দের জাদুতে মুখর থাকে, তেমনি নীরবতার ভাষাকে অনুবাদ করা ছাড়া কিছু দৃশ্য রংতুলিতে ধরা দেবে না।

কী রকম?

নীরবতার মুহূর্তের কথা ভাবতে গেলে আমাদের সাধারণত রাতের কথা মনে আসে, কিন্তু এরকম মুহূর্ত প্রকৃতি আরো অনেক সময়ই উপহার দেয়। যেমন, বিকেল আর সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণটা।

গোধূলি?

ঠিক গোধূলি না। সূর্য ডোবার পরপর আকাশটা যখন আবির রঙে সাজে, আর পৃথিবী ভরে যায় কনে দেখা আলোয়, ঠিক ওই মুহূর্তে প্রকৃতিজুড়ে এক ভয়াবহ নীরবতা আর নির্জনতা নেমে আসে। মানুষের চোখেমুখে লেপ্টে থাকে বিষণ্ণতা। কোনো কথা নেই, কোনো শব্দ নেই, যেন হাজার বছরের স্মৃতিচিহ্ন বয়ে নিয়ে এসেছে একেকজন মানুষ, এমনই তাদের মুখভঙ্গি। নদীর পাড়ে গেলে এই সময়ের নির্জনতাকে আরো গভীরভাবে বোঝা যায়। ওই আলো আর এই নির্জনতা মিলেমিশে কী যে অপরূপ রূপে সাজে এই পৃথিবী! এই রঙের কি কোনো নাম হয়? কোনো শিল্পী কি আঁকতে পারেন এই রং? আমার বিশ্বাস হয় না! আবার বিবিধ কোলাহলের ভেতরেও থাকে অপার নীরবতা। হয়তো সেটিই নীরবতার প্রকৃত রূপ। যেমন, অনির্দিষ্ট অপেক্ষায় বসে থাকা একজন বিষণ্ণ মানুষের কথা ভাবুন। তার চারপাশে কোলাহল, তবু সে নিজে একা, আর তাকে ঘিরে রেখেছে এক মায়াময় নীরবতা।

ছবি নিয়ে এতো গভীর ভাবনা যার, তার আঁকতে না পারার ব্যাপারটা সত্যিই মর্মান্তিক। সজীবের ঘরে ঢুকে সুমন দেখলো, ছড়ানো-ছিটানো এলোমেলো অনেক ছবি, ক্যানভাস ঝুলছে একটা, কিন্তু সবগুলোতেই কালো রঙের প্রাচুর্য! আগেই জানতো সে, ওদিকে তাই মনোযোগ দিলো না। তাকে দেখে সজীব প্রথমে চোখ কুঁচকে তাকিয়েছিল, চিনতে পেরে মৃদু একটু হাসলো। কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে সুমন বললো –

কেমন আছো সজীব?

ভালো নেই সুমনদা, একদম ভালো নেই।

কেন ভাইয়া? কী হয়েছে তোমার?

অনেকদিন ধরে যে কিছু আঁকতে পারছি না!

পারছো না! কেন?

তা তো বুঝতে পারি না। এখন আর কোনো রংই আর আমার তুলিতে উঠে আসে না, কালো ছাড়া। কালো রং দিয়ে কি ছবি আঁকা যায়, বলেন?

শুধু কালো রং কেন? অন্য রং দিয়েও তো আঁকতে পারো!

ওগুলোও তো সব কালো হয়ে গেছে!

কালো রং তোমাকে এতো জ্বালাচ্ছে কেন সজীব?

কেন, আপনি জানেন না?

কোন ব্যাপারটার কথা বলছো?

সেই যে কয়েকবছর আগে হঠাৎ তারা আবির্ভূত হলেন আমাদের জীবনে! সুসজ্জিত। হাতে অস্ত্র, চোখে সানগস্ন­vস, মাথায় কাপড়ের পট্টি!

হুম, বুঝতে পারছি।

উঁহু, আপনি বুঝতে পারবেন না। ওরা যদিও সর্বত্রগামী, ঈশ্বরের মতো ক্ষমতাবান, যখন যেখানে ইচ্ছে যেতে পারে, যাকে ইচ্ছে তাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে, এমনকি মায়ের কোল থেকে শিশুকে নিয়ে গেলেও কারো কিছু বলার থাকবে না, কারো কাছে তাদের কোনো জবাবদিহির ব্যাপার নেই, তবু ওরা কখনো আপনাকে ধরতে আসবে না। কারণ আপনি প্রতিষ্ঠিত মানুষ, আপনি খুনি হলেও আপনাকে তারা কিছু বলবে না, আপনার সামাজিক পরিচয় ও প্রতিষ্ঠাই আপনাকে বাঁচিয়ে দেবে। বিপদ তাদেরই, যাদের কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠা নেই, যাদেরকে মেরে ফেললে সমাজের কোনো তরফ থেকেই কোনো কথা উঠবে না।

বুঝলাম। কিন্তু তাতে তোমার সমস্যা কী? ওরা তো শুধু অপরাধীদের ধরছে!

আপনি দেখি সত্যিই কিছু জানেন না সুমনদা। জানার দরকারও নেই অবশ্য। আপনি তো আর ভুগবেন না কখনো! কিন্তু যারা সাধারণ, যাদের কোনো পরিচয় নেই, তারা তো সবসময়ই দুশ্চিন্তায় থাকে। নইলে একজন কলেজছাত্রকে ধরে এনে তার পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে বলেন? আর ঘটার পরও ব্যাপারটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। এদিকে টিয়াপাখির মতো লম্বা নাকওয়ালা চশমাধারী এক মহিলা বাজখাঁই গলায় বলেই চলেছেন –  সবকিছু ঠিকঠাক আছে, আটচলিস্ন­শ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত করে দেখা হবে!

ওটা তো অনেকদিন আগের কথা। এসব মনে রাখলে চলে, বলো? ভুলে যেতে হয়। আমরা সবাই তো ভুলে যাই।

কতো ভুলবো? একের পর এক মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, মানুষ বাসা থেকে বেরুচ্ছে আশঙ্কা নিয়ে যে, আদৌ আর বাসায় ফেরা হবে কি-না, আপনজনেরা আতঙ্কে ভুগছে – প্রিয়জনকে কি আবার ফিরে পাবে, নাকি এটাই শেষ বিদায়, কালো ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, ছেয়ে ফেলছে আমাদের সমগ্র জীবন,

আমাদের পৃথিবী, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার… ঠা-ঠা-ঠা-ঠা… কালো কালো কালো… সর্বত্র কালো… অথচ… সব নাকি ঠিক আছে… দেশে নাকি এরচেয়ে শান্তি আর কখনো ছিল না!

সুমন বুঝে গেল, এই ছবিটবি নিয়ে কথা বলতে গেলে ঝামেলা আরো বাড়বে। প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্যই বললো –

ঘরে ভালো লাগছে না। চলো তো একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।

কেন, ঘরে ভালো লাগছে না কেন?

সবসময় ঘরে বসে থাকি তো, তাই। চলো।

কোথায় যাবেন?

আশেপাশে কোথাও চলো, কিছু খেতে-খেতে গল্প করি।

খিদে লেগেছে? মাকে রান্না করতে বলি?

আরে না-না। খালাম্মার রান্না ফিরে এসে খাবো। চলো শর্মা আর ভুনা কাবাব খেয়ে আসি। তুমি না খুব পছন্দ করো!

হ্যাঁ, খুব পছন্দ করি। অনেকদিন খাই না। কিন্তু ওরা কি এই বেলা দোকান খুলবে?

গিয়ে দেখি। খুলতেও পারে।

আচ্ছা দাঁড়ান, রেডি হয়ে নিই।

সজীব প্যান্ট আর টিশার্ট পরলো, তারপর টেবিল থেকে চকচকে একটা ছুরি নিয়ে কোমরে গুঁজলো।

ওটা কী সজীব?

ছুরিটা সঙ্গে নিলাম!

ছুরি! ছুরি কেন?

বোঝেন না, বাইরে কতো লোক, কার মনে কী আছে বলা তো যায় না! আমার কাছে তো আর পিস্তল নেই, মারতে এলে অন্তত ছুরিটা তো কাজে লাগবে!

তোমাকে মারতে আসবে কেন?

বলা তো যায় না!

ধুর! কী যে বলো না তুমি!

আপনি তো দেশের অবস্থা জানেন না সুমনদা। যখন-তখন মানুষ মারা যাচ্ছে। বইমেলা থেকে বেরিয়ে কোপ খাচ্ছে লেখক, বাসার সামনের গলিতে কুপিয়ে মারা হচ্ছে তরুণ লেখকদেরকে, অহরহ অপহরণ হচ্ছে, ধর্ষণ হচ্ছে, আগুনে পুড়ছে মানুষ, পেট্রোল বোমায় মরছে মানুষ…

জানি তো! তাই বলে আমি থাকতে তোমাকে কেউ মারতে আসবে আর আমি বসে-বসে দেখবো নাকি?

কথাটা বললো বটে সুমন, কিন্তু মনে মনে স্বীকার করলো – যা সব ঘটে যাচ্ছে, ভয় না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। সময়টা এতো খারাপ, এতো চোরাগোপ্তা হামলা হচ্ছে, কার জীবনে যে কখন কী ঘটে যায় কে জানে! কোনো ঝুট-ঝামেলায় নেই এরকম মানুষও স্রেফ পরিস্থিতির শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে, তার ওপর যদি কেউ বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, হায়েনাদের টার্গেটে পরিণত হয় তাহলে নিরাপত্তার বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট থাকে না। যারা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তারা যে মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে চায় তাতে সন্দেহ নেই,  আর সরকারও কী এক অজানা কারণে আশ্চর্য নীরবতা পালন করছে! শুধু সরকার কেন, কেউই তো কথা বলছে না! দেশটা যে কী গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, ভাবলেও আতঙ্ক লাগে।

সজীবকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুমন আবার বলে –

ছুরিটা রাখো তো!

সঙ্গে থাকুক না সুমনদা! অসুবিধা কী?

না, ওটা রাখো। ছুরি নিয়ে ঘুরছো, শুনতেও তো কেমন যেন লাগে!

খুব খারাপ লাগছে আপনার সুমনদা?

হ্যাঁ লাগছে। ওটা রাখো। আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি, খামোকা ভয় পাচ্ছো কেন?

আচ্ছা ঠিক আছে, রেখে যাচ্ছি।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সুমন। যাক, কথা শুনেছে! দেখা যাক কী হয়।

বাইরে বেরিয়েই সজীবের মুড পালটে গেল, আনন্দিত গলায় বললো – আহ! কতোদিন পর বাইরে এলাম! বাসায় বসে থাকতে থাকতে একদম পচে গেছি। কী যে ভালো লাগছে! থ্যাংকস সুমনদা! একটু রিকশায় করে ঘুরে বেড়ানো যায় না?

যায়। চলো ঘুরেটুরে এসে খেতে বসবো।

একটা রিকশা নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরেই ঘুরলো তারা অনেকক্ষণ। সজীব আর খুব বেশি কথা বলেনি, তবে গুনগুন করে গান গাইছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, মনটা একটু হালকা হয়েছে তার। শর্মা হাউসে ঢুকে খাবারের অর্ডার দিয়ে সুমন তাই বললো –

তোমাকে একটা কথা বলি সজীব?

বলেন না! জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি?

না, মানে, যে-বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো আমি তো সেটা ঠিক বুঝি না, তাই জিজ্ঞেস করলাম।

কী কথা সুমনদা?

এই যে তোমার ছবি আঁকার ব্যাপারটা।

মুহূর্তের মধ্যে মুখটা কালো হয়ে গেল সজীবের, সুমনের চোখ এড়ালো না, তবু বললো – বলবো?

হ্যাঁ, বলেন।

আমার মনে হয় কি জানো, এই যে তুমি আঁকতে পারছো না, এটা নিয়ে তুমি অনেক বেশি ভাবছো। ভাবতে-ভাবতে ব্যাপারটা আরো জটিল হয়ে যাচ্ছে, সমস্যাটা থেকে বেরোতে চাইছো কিন্তু পারছো না।

সজীব চুপ করে রইলো।

ছবি আঁকার কথা বাদ দাও, তোমার নিজের কথাও বাদ দাও। আমার কথাই ভাবো। কোনো একটা কাজ করতে আমি ভালোবাসি, কিন্তু কোনো কারণে করতে পারছি না। এখন আমি যদি পারছি না কেন, পারছি না কেন বলে নিজেকে জর্জরিত করে ফেলি, তারপর পারছি না, পারছি না বলে নিজের মনটাকে আরো দুর্বল করে ফেলি, তাহলে কি আর কাজটা করতে পারবো?

হ্যাঁ, সুমনদা, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি অতিরিক্ত ভাবছি। মনে হচ্ছে ছবি আঁকতে পারলেই আমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, অথচ পারছি না।

পারবে, অবশ্যই পারবে। তার আগে একটা কথা শুনবে?

বলেন।

কিছুদিনের জন্য ছবি আঁকার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফ্যালো।

এটা কীভাবে সম্ভব?

কেন সম্ভব নয়? চবিবশ ঘণ্টাই ছবি নিয়ে ভাবতে হবে এমন কোনো কথা আছে নাকি? তুমি কি আগেও এরকম ভাবতে? অন্য কোনো কাজ করতে না?

না, তা ভাবতাম না। অন্য অনেক কাজও করতাম। কিন্তু আঁকতে পারছি না বলেই আরো বেশি-বেশি আঁকতে ইচ্ছে করে।

এখন এসব ভেবো না তো! কিছুদিন নিজেকে রেহাই দাও।

হ্যাঁ। আমার সুস্থ হওয়াটা খুব দরকার। মা-বাবা কী যে কষ্ট পাচ্ছে! আপার জীবনটাও যে কতো কষ্টের হলো! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি সুমনদা?

করো!

আপনি আপাকে বিয়ে করলেন না কেন?

করার কথা ছিল নাকি?

না, তা নয়। মানে, আমি ভেবেছিলাম, আপনারা বিয়ে করবেন।

তাই নাকি?

হুঁ। শুধু আমি না, বাবা, মা সবাই ভেবেছিল…

বলো কী!

সত্যিই। কেন করলেন না?

আমাদের ভেতরে যে ওই বোঝাপড়াটা ছিল না!

ও! অবশ্য সোমাভাবিও খুব ভালো। ভালো এবং বুদ্ধিমতী। আপা ভালো, তবে বোকা!

তাই নাকি? দীপা যে বোকা সেটা তো জানতাম না।

বোকাই তো। ওকে যতোটা স্মার্ট আর বুদ্ধিমতী মনে হয়, আসলে তা নয়। বুদ্ধিমতী হলে তো আপনাকেই বিয়ে করতো!

হা-হা-হা… এই তোমার বুদ্ধি মাপার পদ্ধতি?

এটা তো ছোট কোনো ব্যাপার নয়। সারাটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে।

যদিও বিষয়টি বিব্রতকর, তবু সজীবের কথা শুনতে ভালো লাগছিল সুমনের। একদম সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো ভাবছে ও। প্রসঙ্গ ঘোরাতে সুমন জিজ্ঞেস করলো – আমাদের বাসায় যাবে? কয়েকদিন থাকো, দ্যাখো ভালো লাগে কি-না।

যাওয়া যায়। কিন্তু…

কিন্তু কী?

না মানে, আমি গিয়ে থাকলে আপনাদের অসুবিধা হবে না?

অসুবিধা? কীসের অসুবিধা?

মানে, বাইরের একজন মানুষ!

তুমি বাইরের মানুষ? এসব কী বলো?

আত্মীয় তো আর নই!

শোনো সজীব, আমি গ্রামের মানুষ। শহুরে মানুষদের কাছে এসব সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই, আমার কাছে আছে। মা এসে বেশ কিছুদিন তোমাদের বাসায় ছিলেন, আমিও এসেছি বহুবার, তোমাদের কোনো অসুবিধা হয়েছে?

কী যে বলেন সুমনদা!

তাহলে?

আচ্ছা, ঠিক আছে যাবো।

আমার বাচ্চারা আছে, ওদের সঙ্গে গল্প করো, দেখো, তোমার সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। দুঃসময় সব মানুষের জীবনেই আসে, একেকজনের জীবনে একেক রূপ ধরে আসে। ওগুলো ধরে বসে থাকতে হয় না। যেমন আসে, তেমন চলেও যায়। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কী যে ভালো লাগছে আপনার কথা শুনে! আচ্ছা ঠিক আছে সুমনদা। আমি আসলে এখান থেকে বেরোতে চাইছি, পারছি না। জায়গা পরিবর্তন করে দেখি, কী হয়!

 

সাত

দিন-দিন সবকিছু বদলে যেতে থাকে। চিরচেনা এই দেশ ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠতে থাকে। সহিংস রাজনীতিতে ছেয়ে যায় দেশ। হরতাল-অবরোধ, বাসে পেট্রোল বোমা মেরে নিরীহ মানুষ হত্যা, ট্রেনলাইন উপড়ে ফেলা, পুলিশের ওপর আক্রমণ, গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা, গুম-খুন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে ওঠে। মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে কিন্তু উত্তরণের পথ খুঁজে পায় না। জীবন তবু থেমে থাকে না কারো। সুমন প্রতিদিন নিয়ম করে অফিসে যায়, বাসায় ফেরে, কোনো কোনোদিন মন খারাপ হলে একা-একা রিকশায় করে ঘুরে বেড়ায়। তার যাওয়ার জায়গা নেই, কোনো স্থায়ী ঠিকানাও নেই। এই শহরই তার আশ্রয়, তার ঠিকানা, যদিও জানে সে – ভাসমান মানুষের জন্য এই শহরের ভা-ারে সঞ্চিত কিছু নেই। কখনো দীপার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, হয়তো অকস্মাৎই, অথবা দুজনে মিলে সময় ঠিক করে আয়োজন করে দেখা করে। দুজনে হেঁটে বেড়ায়, গল্প করে, কিন্তু কেউ কোথাও পৌঁছতে পারে না। পৌঁছানোর জায়গাই নেই আসলে। দীপা হয়তো একেকদিন গেয়ে ওঠে – আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে…। সেদিন হয়তো সুমনের মনটা উদাস হয়ে থাকে। বাসায় এসে হয়তো ব্যালকনিতে দাঁড়ায়, হয়তো আকাশে একটা চাঁদও থাকে, কুয়াশা বা মেঘে ঢাকা ছায়াচ্ছন্ন চাঁদ, ভরা চাঁদটিকেও মনে হয় অভিমানী এক কিশোরীর মতো, দীপার ঠোঁটের কোণে যেরকম এক টুকরো অভিমান জমে থাকে, সেরকম।

প্রকাশ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ কিছুটা থিতিয়ে আসে একসময়, শুরু হয় নতুন উৎপাত। তরুণ লেখকরা একের পর এক খুন হতে থাকে প্রকাশ্য রাস্তায়, গলির মুখে, বাসার সামনে, এমনকি বাসার ভেতরে ঢুকে তাদের খুন করে রেখে যায় কারা যেন, কেউ তার কূলকিনারা করতে পারে না। লেখক খুন হয়, প্রকাশক খুন হয়, যাজকদের হত্যার চেষ্টা করা হয়, বিদেশিদের মেরে ফেলা হয় প্রকাশ্য রাজপথে। শঙ্কা বাড়ে, ভয় বাড়ে, অনিশ্চয়তা বাড়ে। সুমনের কিছুই ভালো লাগে না। যতোই এড়াতে চেষ্টা করুক, ‘দেশ’ নামক এক ভয়ংকর পোকা তার মাথার ভেতর বসে কুটকুট করে কামড়াতেই থাকে, তাড়ানো যায় না। কোনদিকে যে যাচ্ছে দেশটা, বুঝে উঠতে পারে না সে। অসহায় লাগে, বিষণ্ণ হয়ে থাকে মন। এতো ত্যাগ, এতো সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত দেশটা শেষ পর্যন্ত উগ্র চরমপন্থীদের দখলে চলে যাবে নাকি?

যখন তীব্র হতাশা তাকে গ্রাস করে নিতে চায় তখন সে মামার কাছে গিয়ে বসে। মামা বলে –

কোনো অবস্থাতেই আশা হারাবি না। যখন খুব হতাশ লাগবে তখন গ্রামে চলে যাবি। দেখবি এখনো মানুষ কী বিপুল প্রাণশক্তি নিয়ে বেঁচে আছে! তারা হারতে শেখেনি, কখনো হারবে না।

গ্রামে যে যেতে বলো, কোথায় যাবো মামা? আমার তো কোনো গ্রাম নেই!

পুরো দেশটাই তো তোর! সব গ্রামই তোর গ্রাম। যে-দেশের জন্য তোর বাবা প্রাণ দিয়েছে, যে-দেশের ধূলিকণায় মিশে আছে তাঁর রক্ত, সে-দেশের প্রতিটি ইঞ্চিতে তোর পূর্ণ অধিকার। আলাদাভাবে তোর কোনো গ্রাম থাকার দরকার আছে নাকি রে বোকা?

আচ্ছা মামা, তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে, এদেশের মানুষ হারবে না? দেশটা শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তান-পাকিস্তান-সিরিয়ার মতো হয়ে যাবে না?

হ্যাঁ, বিশ্বাস করি।

কেন করো? কোন যুক্তিতে করো?

এদেশের মানুষকে আমি চিনেছি। তারা কখনো ভুল করে না। উগ্রপন্থাকে তারা কখনো গ্রহণ করেনি। হাজারটা সংকট আছে তাদের, অনেক অভাব আছে, দারিদ্র্য আছে, কিন্তু সবকিছুর পরও তাদের একটা স্বাধীন স্বয়ংসম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক জীবন আছে। তারা মিলেমিশে থাকে, থাকতে পছন্দ করে। গ্রামের নারীরা শহুরে নারীদের চেয়ে অনেক বেশি উদার, স্বাধীনচেতা। পুরুষের সঙ্গে তারাও ঘরে-বাইরে কাজ করে। তারা গান গায়, গান বাঁধে, কথাও বলে সুরেলা গলায়। এসব চরমপন্থীর আদর্শ বাস্তবায়িত হলে বা ওরা ক্ষমতায় গেলে মানুষের এই সাংস্কৃতিক জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে, সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। তারা তা হতে দেবে না। নিজেদের ভালোমন্দ তারা ভালো করেই বোঝে। বোঝে না শিক্ষিতরা, বোঝে না রাজনীতিবিদরা। এরা আগুন নিয়ে খেলে, খেলতে-খেলতে একসময় নিজেরাই পুড়ে যায়।

শুধু কি নিজেরা পোড়ে? পোড়ে তো জনগণও।

হ্যাঁ, জনগণও পোড়ে বটে। তবে রাজনীতিবিদরা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, আর জনগণ পুড়তে শুরু করলে নিজেরাই আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে।

মামার এই অনিঃশেষ আশাবাদ দেখে সুমন বিস্ময়ে অভিভূত হয়। এই প্রজন্মের প্রায় সবাই বেশ আশাবাদী, সুমন খেয়াল করে দেখেছে। কী জানি, হয়তো এই আশাবাদের পেছনে শক্ত ভিত্তি আছে

তাদের। একাত্তর সালে এক অসম্ভব-অকল্পনীয় যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল তারা, আশাবাদী হওয়া তো তাদেরই মানায়। কিন্তু দেশের এরকম এক জট-পাকানো অবস্থায় সুমনের মন জুড়ে শঙ্কার কালো মেঘ ওড়াউড়ি করতেই থাকে, করতেই থাকে।

একদিন ছোট মামা বেরিয়ে পড়ে বাসা থেকে, কাউকে কিছু না বলেই, যেমনটি এর আগেও অনেকবার গিয়েছে। তবে এবার আর আগের মতো নিখোঁজ হয়ে থাকে না, মাঝে-মাঝে সোমার কাছে চিঠি লেখে। তার কাছ থেকেই সুমন জানতে পারে, ছোট মামা সুমনের বাবার কবরের খোঁজে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড় মামা বহুকাল পর দেশে ফিরে আসে। কিছুই পরিষ্কার করে বলেন না তিনি, তবে বোঝা যায় – কিছু একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে তার জীবনে। মাঝে-মাঝে মায়ের কাছে বসে জীবনটাকে অপচয় করার দুঃখে কাঁদেন বড় মামা। কৌতূহল হলেও সুমন আর কিছু জানার চেষ্টা করে না। তার মন ভালো থাকে না আজকাল। দেশটা ভালো নেই, এই সময়ে কী হবে এতোসব ব্যক্তিগত দুঃখের গল্প শুনে?

একদিন সজীব তার রংতুলি আর ক্যানভাস সমেত হাজির হয় সুমনের বাসায়। দীপাই নিয়ে আসে। মায়ের সঙ্গে বসে-বসে গল্প করে দীপা, আর সজীব ভাব জমায় বাচ্চাদের সঙ্গে। শিশুদের জগৎটা অদ্ভুত, খানিকটা রহস্যময় এবং এখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত। ফলে তারা যে কাকে পছন্দ করবে আর কাকে করবে না, আগে থেকে কিছুতেই আন্দাজ করা যায় না। যাদের পছন্দ করে ফেলে তাদের সঙ্গে ভাব জমাতে নেয় কয়েক মিনিট, আর যাদের করে না তাদের কতো চেষ্টাতেও সাড়া দেয় না। সজীবকে হয়তো পছন্দই হয়ে যায় ওদের, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দেখা যায় – তিনজনে মিলে হইচই করে কী যেন খেলছে ওরা। দুদিনের মধ্যেই যেন এ-বাসারই ছেলে হয়ে যায় সজীব। সারাদিন বাচ্চাদের সঙ্গে হই-হলস্ন­v করে, ওদের মতো করেই খেলে, দুষ্টুমি করে, সোমাকে ক্ষিপায়, জ্বালায়। সজীব অনুভব করে ওঠে, বাচ্চাদের জগৎটা এতো সরল-সুন্দর-নিষ্পাপ যে, ওদের কাছে থাকলে, ওদের সঙ্গে গল্প করলে মনটা শুদ্ধ হয়ে ওঠে।

কিছুদিন পর এক গভীর রাতে দীপাকে ফোন করে সুমন, বলে –

জানো, একটা ম্যাজিক্যাল পরিবর্তন এসেছে সজীবের মধ্যে!

কী রকম?

ও আবার আঁকতে শুরু করেছে।

সত্যি?

হ্যাঁ। প্রথম দু-একদিন কেবল রঙের খেলা, আমি তো অতো বুঝি না, কতোরকম যে কালার কম্বিনেশন করলো, উজ্জ্বল সব রং, চোখে ধাঁধা লেগে যায়। তারপর হঠাৎ করেই পোর্ট্রেট আঁকা শুরু করলো। ওকে তো কখনো পোর্ট্রেট আঁকতে দেখিনি, এই প্রথম। বাচ্চাদের ছবি আঁকছে, মায়ের ছবি আঁকছে, সোমার ছবি আঁকছে…

বাহ! খেলা বাদ দিয়ে ছবি ধরেছে!

আরে না। বাচ্চাদের স্কুল নেই, ওরা তো সারাক্ষণ ওর পেছনে লেগে আছে, জ্বালাচ্ছে। কিন্তু একটুও বিরক্ত হচ্ছে না ও। হাসিমুখে বলছে – এই দাঁড়া, এই একটু পর খেলবো। কিংবা বলছে, এখানে চুপ করে বসে থাক, তোর একটা ছবি এঁকে দিই। বাচ্চা কোলে সোমার একটা ছবি এঁকেছে, এত্ত সুন্দর, সোমা তো দেখে কেঁদে ফেলেছে।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। কালকে এসো না! দেখে যাও। খালাম্মাকেও নিয়ে এসো।

পরদিন দীপা আসে, আসেন খালাম্মাও। সারাদিন ধরে সজীবের কাণ্ডকারখানা দেখতে-দেখতে মুখে আঁচল চেপে ধরে কাঁদেন তিনি। অনেক দিনের চেপে রাখা কান্না।

সজীবের সঙ্গে গল্প করে দীপা।

কেমন আছিস ভাইয়া?

ভালো আছি আপা, খুব ভালো আছি। সুমনদার পরামর্শটা খুব কাজে লেগেছে। অনেক চেষ্টা করেও যে-সমস্যাটা দূর করতে পারছিলাম না, দুটো ছোট্ট দেবদূত মুহূর্তের মধ্যে সেই সমস্যা দূর করে ফেলেছে।

কী রকম?

আমাকে বলে, তুমি নাকি শুধু কালো রং দ্যাখো কাকু? তোমার চোখে সমস্যা আছে নাকি? তারপর লাল রঙের একটা পোঁচ দিয়ে বলে – এটা হলো লাল, নীল রঙের একটা পোঁচ দিয়ে বলে – এটা হলো নীল, সবুজ রঙের একটা টান দিয়ে বলে – এটা হলো সবুজ। আমাকে রং চেনায় ওরা! হা-হা-হা। আর কী আশ্চর্য, সত্যি সত্যিই রংগুলো ফিরে আসে আমার কাছে!

বাহ, দারুণ তো!

আরো গল্প আছে। অন্তহীন গল্প। পরে বলবো তোকে।

চকিতে একবার দীপা এসে সুমনের কানে-কানে বলে যায় – ভালোই জাদু জানো। তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে মন্দ হতো না। তুমি আমাকে ঠকিয়েছো!

সুমন কিছু বলে না। জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি – কুড়ি বছরের পার…

একদিন রাজীব আসে অনিকাকে নিয়ে। দুই বউ মিলে এবার সজীবকে ধরে – এবার তোমাকে বিয়ে না করিয়ে ছাড়ছি না।

সজীব আঁতকে ওঠে – আমি আবার তোমাদের কী ক্ষতি করলাম?

করোনি! হিসাব দেবো?

আরে কী আশ্চর্য! কীসের হিসাব?

আগে বিয়েটা করিয়ে তারপর হিসাব…।

ঝেড়ে ফ্যালো, মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফ্যালো। ঘুষ দেবো।

সজীবের মনে কী আছে বোঝা যায় না। দু-তিনদিন পর হাতে বেশ বড়োসড়ো একটা ক্যানভাস নিয়ে রাজীবের বাসায় যাওয়ার প্রস্ত্ততি নেয় সে। সুমন তাকে একা ছাড়ার সাহস পায় না। সোমা আর দুই বাচ্চাসহ সজীবের সঙ্গী হয় সুমন, দীপাকেও ফোন করে বলে দেয় ওখানে যেতে।

এতো অতিথি একসঙ্গে দেখে দারুণ অবাক আর খুশি হলো রাজীব। শব্দ পেয়ে বেরিয়ে এলো অনিকাও।

সজীব কাগজের আড়াল থেকে মুক্ত করলো তার ছবিটাকে। অপূর্ব চোখ-ধাঁধানো এক ছবি। আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিকা, খোলা চুল আর শাড়ির আঁচল উড়ছে বাতাসে, কিন্তু সেদিকে নজর নেই ওর, আকুল হয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, আর মেঘ ফুঁড়ে তার বাড়ানো হাতের দিকে উড়ে আসছে দেবদূতের মতো এক শিশু। অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো সবাই ছবিটার দিকে, তারপর চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলো অনিকা। হা-হা-হা করে হেসে উঠলো সজীব –

অ্যাই বউদি, কাঁদছো কেন? তোমার সত্যিই এরকম একটা বেবি হবে। আমি স্বপ্ন দেখে ছবিটা এঁকেছি! তোমরা যে কী না! সোমা ভাবিকে একটা ছবি এঁকে দিলাম, সে কেঁদেই অস্থির, তোমাকে একটা দিলাম, তুমিও কাঁদছো। সব ছিঁচকাঁদুনের দল!

অনিকা হেসে ফেললো। কান্নাভেজা চোখে হাসিটা এতো সুন্দর লাগলো! বললো –

কাঁদবো না? বউদির কোনো খবর নাও? ভাবির কোনো খবর নাও? পরের বাড়ির মেয়ে বলে কত্ত অবহেলা করো! কাঁদবো না তো কী করবো!

এই রে! পাগল খেপালাম বোধহয়। ভাবিও এসব বলে! ইয়ে মানে, আমি তো একটু ওরকমই…

না, তুমি মোটেই এরকম না। তোমাকে কি আজকে থেকে চিনি? আগে কতো খোঁজখবর নিতে…

আচ্ছা, আচ্ছা। আবার সব আগের মতো হবে। একটু শান্ত হয়ে বসো তো!

তা বসছি। কিন্তু তোমাকে ছাড়ছি না।

ঘুষ দিলাম তো!

এই ঘুষে হবে না!

আচ্ছা, বেবিটা হোক, তোমাদের সবাইকে নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে যাবো। হলো?

উঁহু। আগে তোমাকে একটা বিয়ে করাবো!

তুমি তো দেখি সোমা ভাবির নকল করছো! শলাপরামর্শ করেছো নাকি?

হি-হি-হি… সোমাও বলে নাকি?

বলে মানে? মাথা খেয়ে ফেলছে। শোনো, আপা আর ভাইয়াদের সামনে এসব বলো না, এদের মাথায় যদি একবার পোকা ঢোকে…

দীপা, রাজীব আর সুমন – মুগ্ধ চোখে সজীবের কীর্তিকলাপ দ্যাখে, হয়তো তাদের মনে হয় – সজীবটা এখনো শিশুই রয়ে গেল। সেই ভালো, বড়ো হয়ে গেলে মানুষের এরকম সারল্য থাকে না!

সজীব নতুন করে আঁকতে শুরু করার পর আবার বাসায় ফিরে যায় আর তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলার জন্য দীপা প্রাণপণ চেষ্টা করে যায়।

যতো কিছুই ঘটুক, কোনোকিছুতেই জীবন থেমে থাকে না,   কোথাও একটা আশার প্রদীপ টিমটিমিয়ে জ্বলতেই থাকে।

দিন চলে যায়। অনেকদিন পর দেশে আবার হেমন্তকাল আসে। এই ঋতুটি বড়ো প্রিয় সুমনের, বড়ো আপন আপন লাগে সবকিছু। এমনই এক হেমন্তের শুরুতে, অনেক বছর আগে, নভেম্বরের প্রথমদিকে বাবার মৃত্যুর খবর এসেছিল মায়ের কাছে। হেমন্ত এলেই সুমনের মনে হয় – এই শিশিরভেজা মায়াময় হেমন্তে এই দেশেরই কোনো এক অজানা প্রান্তে বাবা ঘুমিয়ে আছে চিরকালের জন্য। মামা কবরটা খুঁজছে। হয়তো পাবে, হয়তো পাবে না। না পাওয়ারই কথা। কেউ তো আর চিহ্ন দিয়ে রাখেনি! এতোকাল পর কীভাবে তার খোঁজ পাওয়া সম্ভব? আর না পেলেই-বা কী? পুরো দেশটিই তো এক বিশাল সমাধিক্ষেত্র। তিরিশ লাখ শহিদের পবিত্র রক্তে সণান করেছে এই দেশ। আলাদাভাবে বাবার কবর খুঁজে না পেলে কীই-বা যায় আসে?

এরকমই কোনো এক হেমন্তের অপূর্ব রাতে রাজীবের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে শহীদুলের পঙ্খিরাজে চড়ে বসে সুমন। মাথার ভেতরে কোমল এক ঘোর, আকাশে নয়নাভিরাম এক চাঁদ উঠেছে, আবহাওয়াটাও ভারি আরামদায়ক। ভ্যাপসা গরম নেই, বর্ষা-বাদলের উৎপাত নেই, শীতের প্রকোপও নেই। কেবল একটা মনোরম শীত-শীত ভাব বয়ে আনছে উদাসীন বাতাস। এই ঋতুটা কী যে সুন্দর! ভোরে শিশিরে ভিজে থাকছে ঘাস, সেই শিশির-ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে হাঁটলে সারা শরীর জুড়িয়ে যায় আরামপ্রদ শীতলতায়, মনে হয় –

জীবন-যন্ত্রণার অবসান হলো এতোদিনে। সকালে মৃদু কুয়াশার আড়াল ভেঙে ফুটে উঠছে নরম-মায়াবী রোদ। দুপুরের রোদও তীব্র নয়, বরং আদরমাখা, মনকাড়া। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসে দ্রম্নত, রোদটা আবারো হয়ে ওঠে মিষ্টি-মায়াবী এবং বিষণ্ণ। বিকেলটাও দীর্ঘস্থায়ী নয়। শুরু হতে-না-হতে তার যাবার সময় হয়ে আসে, রোদের রং হলুদাভ থেকে কমলা হয়, আর তারপরই আকাশ ভরে ওঠে কনে-দেখা আলোয়! এই আলোর অন্য কোনো নাম হয় না, অন্য কোনো ভাষায় এরকম অদ্ভুত নাম আছে বলেও শোনেনি সে। সম্ভবত, এ একান্তই আমাদের শব্দ, এরকম আলো বোধহয় আমাদের আকাশেই শুধু ফোটে। একসময় সেই আলোর অপরূপ রং মুছে গিয়ে নেমে আসে রহস্যময় বিষণ্ণ সন্ধ্যা, আবার মৃদু কুয়াশায় ভিজে যায় সব – সবকিছু। কী যে মায়াময় একটা শীত নামে রাতে! যেন, দীর্ঘ গরমে পুড়ে যাওয়া মানুষকে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়ার জন্য তার এই প্রীতিকর আয়োজন। অথবা আগামী শীতের জন্য প্রস্ত্তত করে তোলার জন্য, তীব্র শীতের নির্দয় কামড়কে সহনীয় করে তোলার জন্য আসে হেমন্ত, মায়ের মমতা নিয়ে। এমন মমতা নিয়ে নিসর্গ তার আয়োজন সাজায় আর কোন দেশে, বাংলাদেশ ছাড়া? সুমন মাঝে-মাঝে ভাবে – মানুষের এতোসব নিষ্ঠুরতা, এতো নৃশংসতা, এতো অমানবিক কর্মকা- সত্ত্বেও নিসর্গ তার

অকৃপণ হাতে মমতায় ভরিয়ে দিচ্ছে আমাদের পুড়ে যাওয়া জীবন। কী যে মায়াময়, কী যে সুন্দর। ঠিক যেন জীবনানন্দের কবিতার মতো, সুন্দর-করুণ। সুমন তাঁর কবিতা পড়তে-পড়তেই একসময় জেনে গিয়েছিল – এই দেশের আপাততুচ্ছ নানা অনুষঙ্গের ভেতরেও কী অপরূপ লাবণ্য জড়িয়ে থাকে! কতো কিছু না-বোঝা থেকে গেছে সেইসব অপূর্ব কবিতার, কতো কিছু বোঝার অপেক্ষায় পড়ে থেকেছে বছরের পর বছর! যেমন, সেই অদ্ভুত পঙ্ক্তিটি – ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে – সবচেয়ে সুন্দর করুণ’ – পড়ার পর অনেক ভেবেও সে বুঝে উঠতে পারেনি, সবচেয়ে সুন্দর হলে তা আবার করুণ হয় কী করে? কিংবা করুণ কোনো বিষয় কি সবচেয়ে

সুন্দর হতে পারে? কোনো যতিচিহ্ন ছাড়া পাশাপাশি ওই দুটো আপাত-বিরোধপূর্ণ শব্দ দিয়ে তিনি আসলে কী বোঝাতে চাইলেন? ব্যাখ্যা পায়নি সে, শুধু অপেক্ষায় থেকেছে – কোনো একদিন অনুভবের ভেতরে ধরা দেবে এই কবিতা, এই অপূর্ব পঙ্ক্তি। আজ তার মনে হলো, যেন এতোদিন পর ধরা দিয়েছে পঙ্ক্তিটি। সবচেয়ে সুন্দর, তবু, তাকে ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে – এই ভাবনা যখন গভীরভাবে মনে গেঁথে বসে, যখন মৃত্যু এসে হানা দেয় দরোজায়, তখন তো তা করুণই হয়ে ওঠে! ভাবতে-ভাবতে ঘোর লেগে গেল সুমনের, ফিসফিসিয়ে বললো – প্রিয় জীবনানন্দ, যা কিছু ঘটুক, আপনার এই ‘সবচেয়ে সুন্দর করুণ’ বাংলা ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার