সভ্যতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ

লেখক:

আনিসুজ্জামান

মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে নিজের আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ যে-অভিভাষণ রচনা করেন, তার নাম দিয়েছিলেন সভ্যতার সংকট। জন্মোৎসবে সেটি পাঠ করে শোনান ক্ষিতিমোহন সেন। এর একটি ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন ক্ষিতীশ রায়, তা পরিমার্জনা করেন কৃষ্ণ কৃপালনী এবং চূড়ান্তভাবে দেখে দেন রবীন্দ্রনাথ। শুনেছি, এর শিরোনাম Crisis of Civilization হবে না Crisis in Civilization, তা নিয়ে মতান্তর ছিল। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ শেষের নামটিই পছন্দ করেন। এ-কথার উল্লেখ করলাম এই আশায় যে তা থেকে বক্তৃতার বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।

ভাষণটির গোড়ার দিকেই রবীন্দ্রনাথ বলে দিয়েছিলেন যে, আমরা যদিও সিভিলিজেশন শব্দটির তরজমা করে নিয়েছি সভ্যতা বলে, তবু ওই ইংরেজি শব্দের যথাযথ প্রতিশব্দ ‘আমাদের ভাষায়’ পাওয়া সহজ নয়। ‘এই সভ্যতার যে রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার।’ ভারতবর্ষের যে-অংশ ‘ব্রহ্মাবর্ত নামে বিখ্যাত ছিল সেই দেশে যে আচার পারম্পর্যক্রমে চলে এসেছে তাকেই বলে সদাচার।’ আমরা যখন ছোটো ছেলেকে বলি ‘সভ্য হয়ে বসে থাকো’ কিংবা কাউকে বলি ‘অসভ্যতা কোরো না’, তখন সভ্যতা অর্থে এই সদাচারই বোঝায়। তবে সেই সদাচার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা ছিল তীব্র এবং তার বদলে নতুন একটা আদর্শ গ্রহণের তাগাদাও ছিল প্রবল :

এই আচারের ভিত্তি প্রথার উপরেই প্রতিষ্ঠিত – তার মধ্যে যত নিষ্ঠুরতা, যত অবিচারই থাক। এই কারণে প্রচলিত সংস্কার আমাদের আচার-ব্যবহারকেই প্রাধান্য দিয়ে চিত্তের স্বাধীনতা নির্বিচারে হরণ করেছিল। …আমি যখন জীবন আরম্ভ করেছিলুম তখন ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে এই বাহ্য আচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেশের শিক্ষিত মনে পরিব্যাপ্ত হয়েছিল।… এই সদাচারের স্থলে সভ্যতার আদর্শকে আমরা ইংরেজ জাতির চরিত্রের সঙ্গে মিলিত করে গ্রহণ করেছিলেম। আমাদের পরিবারে এই পরিবর্তন, কী ধর্মমতে, কী লোকব্যবহারে, ন্যায়বুদ্ধির অনুশাসনে পূর্ণভাবে গৃহীত হয়েছিল। আমি সেই ভাবের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলুম এবং সেই সঙ্গে আমাদের সাহিত্যানুরাগ ইংরেজকে উচ্চাসনে বসিয়েছিল। এই গেল জীবনের প্রথম ভাগ। তারপর থেকে ছেদ আরম্ভ হল কঠিন দুঃখে। প্রত্যহ দেখতে পেলুম – সভ্যতাকে যারা চরিত্র-উৎস থেকে উৎসারিতরূপে স্বীকার করেছে,  রিপুর প্রবর্তনায় তারা তাকে কী অনায়াসে লঙ্ঘন করতে পারে।

জীবনের প্রথমে ইংরেজের যে-ঔদার্যে রবীন্দ্রনাথ আস্থা পোষণ করেছিলেন, পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখতে পেলেন, ইংরেজ শাসনাধীন দেশের মানুষের জন্যে তার প্রয়োগ নেই। যে-ভারতবর্ষ ইংরেজকে দীর্ঘকাল ধরে ঐশ্বর্য জুগিয়ে এসেছে, সে-ভারতবর্ষেরই হৃদয়বিদারক অভাব অন্ন-বস্ত্র-পানীয়-শিক্ষা-আরোগ্যের। ‘সভ্যনামধারী মানব-আদর্শের এত বড়ো নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই’ পারেননি তিনি। সোভিয়েত রাশিয়া ও পারস্যের সঙ্গে এই অবস্থার প্রতিতুলনা করেছেন তিনি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে। সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রিক সম্বন্ধ আছে যেসব মরুচর মুসলমান জাতির, তাদেরকে সকল দিক দিয়ে শক্তিমান করে তোলার নিরন্তর অধ্যবসায় দেখেছেন রাষ্ট্রের। আরো দেখেছেন, রাষ্ট্র-অধিকারের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মুসলমান-অমুসলমানে কোনো বিরোধ ঘটে না। তেমনি জরথুস্ট্রিয়দের সঙ্গে মুসলমানদের যে-সাংঘাতিক প্রতিযোগিতা পারস্যে ছিল এককালে, ইউরোপীয় জাতির চক্রান্তজাল থেকে মুক্ত সভ্যশাসনে তার সম্পূর্ণ উপশম ঘটেছে। এমনকি, আফগানিস্তানকে সভ্যতাগর্বিত কোনো ইউরোপীয় জাতি আজো অভিভূত করতে পারেনি বলে, শিক্ষা ও সমাজনীতির সার্বজনীন উৎকর্ষ না ঘটা সত্ত্বেও, তার সম্ভাবনা সেখানে অক্ষুণ্ণ। কবির মতে, ‘এরা দেখতে দেখতে চার দিকে উন্নতির পথে, মুক্তির পথে, অগ্রসর হতে চলল।’

ইংরেজদের সভ্যশাসনের জগদ্দল পাথর বুকে নিয়ে কেবল ভারতবর্ষই নিরুপায় নিশ্চলতার মধ্যে তলিয়ে পড়েনি, চীনাদের মতো এতবড়ো প্রাচীন সভ্যজাতিকে ইংরেজ স্বজাতির স্বার্থ-সাধনের জন্যে বলপূর্বক অহিফেনবিষে জর্জরিত করে চীনের অংশবিশেষ আত্মসাৎ করে নিয়েছে। অবশ্য জাপানও যে উত্তর চীনকে গলাধঃকরণ করতে প্রবৃত্ত, তাও রবীন্দ্রনাথ ভোলেননি। দ্বন্দ্বটা যে কেবল ইউরোপীয়-অন-ইউরোপীয় নয়, তা যেমন বোঝা যায় জাপানের আগ্রাসী ভাব থেকে, তেমনি স্পেনের প্রজাতন্ত্র সরকারের বিরুদ্ধে ইংরেজের কূটকৌশল প্রয়োগের দৃষ্টান্ত থেকে।

এতসব কালো মেঘের মধ্যেও রুপোলি আভা দেখা গিয়েছিল। সে হলো স্পেনের জন্যে কিছুসংখ্যক ইংরেজ বীরের আত্মত্যাগ। এমন ইংরেজ মিত্র ভারতবর্ষও লাভ করেছে। ইংরেজের এই মানবহিতৈষী চরিত্রকেই একদা রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সমসাময়িক অনেকে বিশ্বাসের সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে মান্য করেছিলেন। কিন্তু সে-বিশ্বাস কেমন করে হারাতে হলো, তার কথাই জানালেন এই অভিভাষণে। ‘সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যর শোকাবহ অভাব মাত্র নয়; সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ, যার কোনো তুলনা দেখতে পাইনি ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান স্বায়ত্তশাসন-চালিত দেশে।’ রবীন্দ্রনাথ জানেন, এই দুর্গতির জন্যে আমাদের সমাজকেই দায়ী করা হবে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, ‘এই দুর্গতির রূপ যে প্রত্যহই ক্রমশ উৎকট হয়ে উঠেছে, সে যদি ভারত-শাসনযন্ত্রের ঊর্ধ্বস্তরের কোনো-এক গোপন কেন্দ্র থেকে প্রশ্রয়ের দ্বারা পোষিত না হত তা হলে কখনোই ভারত-ইতিহাসের এতবড়ো অপমানকর অসভ্য পরিণাম ঘটতে পারত না।’

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ জাপানের দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যেখানে এই ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব নেই। আরো একটি বিষয়ে তিনি ভারতবর্ষ ও জাপানের তুলনা করেছেন। যে-যন্ত্রশক্তির কল্যাণে জাপান সর্বতোভাবে সম্পদবান হয়ে উঠেছে, যে-যন্ত্রশক্তির সাহায্যে ইংরেজ নিজের বিশ্বকর্তৃত্ব রক্ষা করে এসেছে, ‘তার যথোচিত চর্চা থেকে এই নিঃসহায় দেশ বঞ্চিত।’ রবীন্দ্রনাথ সখেদে বলেছেন,

এই বিদেশীয় সভ্যতা, যদি একে সভ্যতা বলো, আমাদের কী অপহরণ করেছে তা জানি, সে তার বদলে দন্ড হাতে স্থাপন করেছে যাকে নাম দিয়েছে Law and Order, বিধি এবং ব্যবস্থা, যা সম্পূর্ণ বাইরের জিনিস, যা দারোয়ানি মাত্র। পাশ্চাত্য জাতির সভ্যতা-অভিমানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা অসাধ্য হয়েছে। সে তার শক্তিরূপ আমাদের দেখিয়েছে, মুক্তিরূপ দেখাতে পারেনি।

তিনি ভৎর্সনা করেছেন, ‘এই মানবপীড়নের মহামারী পাশ্চাত্য সভ্যতার মজ্জার ভিতর থেকে জাগ্রত হয়ে উঠে আজ মানবাত্মার অপমানে দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত বাতাস কলুষিত করে দিয়েছে।’

পরিশেষে কবি যা বলেছেন, তাঁর মুখের ভাষায় তা না শুনলে তার বেদনাসুন্দর প্রকাশ উপলব্ধি করা যাবে না :

ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনের দ্বারা একদিন না একদিন ইংরেজকে এই ভারতসাম্রাজ্য ত্যাগ করে যেতে হবে। কিন্তু কোন্ ভারতবর্ষকে সে পিছনে ত্যাগ করে যাবে? কী লক্ষ্মীছাড়া দীনতার আবর্জনাকে। একাধিক শতাব্দীর শাসনধারা যখন শুষ্ক হয়ে যাবে, তখন এ কী বিস্তীর্ণ পঙ্কশয্যা দুর্বিষহ নিষ্ফলতাকে বহন করতে থাকবে। জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের অন্তরের সম্পদ এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল। আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটীরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই। আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি – পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিমানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি।

তাই এত দুঃখের মধ্যেও তিনি আশার কথা জানিয়েছেন, আস্থার কথা বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের পর সাত দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। ভারতবর্ষ থেকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের প্রস্থানও ঘটেছে প্রায় সাত দশক পূর্বে। তার পরও সভ্যতার সংকট এখনো প্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক শুধু তার ইতিহাস-বিশ্লেষণের কারণে নয়। সাম্রাজ্যবাদের চরিত্রের যে-ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন, তা আজো নির্মমভাবে সত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে যদিও আর মহাসমর সংঘটিত হয়নি, তবু এমন সময় যায়নি যেখানে আমরা মানুষে-মানুষে জাতিতে-জাতিতে সংঘাত দেখিনি। এশিয়া মহাদেশ তার মূল ঘটনাস্থল, তবে ইউরোপ, আফ্রিকা ও লাটিন আমেরিকাও তার থেকে বাদ যায়নি। বৃহৎ শক্তির লোভ মানুষের শান্তি ও সম্পদ হরণে ক্ষান্তিহীন। সভ্যতার দাবি আবার তাদেরই প্রবল। কোথাও সংঘর্ষ দেখা দিলে বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্যে শক্তিমান দেশগুলি ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আবার তারাই যুদ্ধরত জাতিগুলোর কাছে মারণাস্ত্র বিক্রি করে সে-সংঘাতকে প্রলম্বিত করার ব্যবস্থা করছে। সভ্যজাতির ক্ষেত্রে এবং অপরের ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায় উচিত-অনুচিতের মাপকাঠি তাদের কাছে এখনো ভিন্ন। আমরা যখন যুদ্ধাপরাধের জন্যে বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করি. তখন তারা আন্তর্জাতিক মানের কথা বলে বারবার। তারা যখন ওসামা বিন-লাদেনের গোপন আস্তানায় বলপূর্বক প্রবেশ করে তাকে হত্যা করে সমুদ্রে ফেলে দেয় তখন আর কোনো মানের প্রশ্ন ওঠে না। সভ্যজাতির এই ভাবলেশহীন দ্বিচারণ রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়ায়নি। ১৯১৭ সালে Nationalism বইতে তিনি প্রথমবার পাশ্চাত্য সভ্যতার স্বার্থপরতার কথা বলেছিলেন, এবং তার অনুকরণে জাপানের মতো প্রাচ্যদেশেও যে-অনাচার ঘটছিল, তার নিন্দাজ্ঞাপন করেছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সভ্যতার সংকটে শেষবারের মতো মানুষের প্রতি কৃত মানুষের অবিচার-অন্যায়ের একটা সূত্রবদ্ধ পরিচয় তুলে ধরলেন এবং মানুষের ওপরেই আস্থা রাখলেন সেই সংকট থেকে মুক্তিলাভের। এসব কথা অবিনাশী, এসব কথা কালোত্তীর্ণ।

শেয়ার করুন

Leave a Reply