সম্পাদকীয়

লেখক:

এ সম্পাদকীয়ের প্রারম্ভে আমরা বেদনাহত চিত্তে জানাচ্ছি যে, বিগত ৩০ নভেম্বর উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে দেশের খ্যাতনামা চিত্রকর, কালি ও কলমের সুহৃদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বহু কর্মের সঙ্গী ও শিল্পনির্দেশক কাইয়ুম চৌধুরী তিরোধান করেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত। কালি ও কলমের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমাদের পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশিত হবে তাঁর সম্পর্কে লেখার সম্ভার নিয়ে।
আচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবর্ষ (১৯১৪-২০১৪) উপলক্ষে কালি ও কলম বর্ধিত কলেবরে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করল। এ-সংখ্যায় নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর সৃজন, সুকীর্তি ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আলোকপাতের চেষ্টা করা হয়েছে। জয়নুল আবেদিন এ-দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার যে-সূচনা করেছিলেন ১৯৪৮ সালে, তা বিকশিত হয়ে আন্তর্জাতিক মানে এখন পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনেও মর্যাদার আসন লাভ করছে। এ-ক্ষেত্রে জয়নুল আবেদিন যে-দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন, তা হয়ে আছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
জয়নুল আবেদিন বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা অঙ্কনের মধ্য দিয়ে কলারসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন। একই সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিগুচ্ছ হয়ে ওঠে সমকালের অসামান্য রূপায়ণ। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ক্ষুধা, আর্তি, সংগ্রাম ও মর্মবেদনা তাঁর তুলিতে প্রাণবন্ত ও সজীব হয়ে ওঠে। এই সৃষ্টিগুচ্ছে তাঁর রেখার দীপ্তি, শক্তি ও সৃজনকুশলতা নবীন মাত্রা অর্জন করেছিল। শহরের রাস্তায় অন্নের খোঁজে কঙ্কালসার মানুষের মিছিল, অনাহারী মানুষের আর্তনাদ, তাদের হাহাকার, মৃত্যুর ভয়াবহতা রেখানির্ভর কাজে চিত্রিত হয়েছিল।
পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে তাঁর নির্মাণ ও সৃষ্টিতে আমরা ঐতিহ্য-জিজ্ঞাসার সঙ্গে আধুনিকতার যে-অনুষঙ্গ দেখতে পাই তাতে তাঁর মৌলিকত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৫১-৫২ সালে ইউরোপ ভ্রমণ করেন। সে-সময়ে আধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর যে-ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে, তাতে তাঁর শিল্পরীতি নতুন বাঁক নিয়েছিল। দেশে ফেরার পর কয়েক বছর ধরে তিনি জলরং, তেলরং বা গুয়াশে যেসব ছবি এঁকেছিলেন, তাতে দেশীয় ও বিদেশীয় রীতির আশ্চর্য সমন্বয় দেখা যায়। বিষয়ের দিক দিয়ে এসব ছবিতে প্রতিফলিত হয় পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষ ও প্রকৃতি, কিন্তু তাদের উপস্থাপনে তিনি আর পুরোপুরি বস্তুধর্মী থাকেননি। ওইসব মানুষ তাঁর চিত্রে ধরা দিয়েছে পাশ্চাত্য ধরনে রীতিবদ্ধ হয়ে। তাঁর সৃজনে বাংলা ও বাঙালির জীবনধারা আশ্চর্য শিল্পসুষমায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর এই শৈলী ও বৈশিষ্ট্য জয়নুলকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল। বাংলাদেশের লোকশিল্পের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও আগ্রহের ফলেই লোকশিল্প নবীন আবেগ নিয়ে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে।
এছাড়া দেশের যেকোনো দুর্যোগ ও সংকটে তিনি ছিলেন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। সৃজনশীল কর্ম ও সামাজিক অঙ্গীকার তাঁকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল এবং শিল্পাচার্যের অভিধায় অভিষিক্ত করেছিল।
জন্মশতবর্ষে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।
এ-সংখ্যায় সম্প্রতি লোকান্তরিত দুই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও রামকানাই দাশ সম্পর্কে দুটি শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং সদ্য সমাপ্ত বেঙ্গল ফাউন্ডেশন-আয়োজিত তৃতীয় উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসব নিয়ে একটি সমীক্ষা পত্রস্থ হলো।

শেয়ার করুন

Leave a Reply