সর্বনাম

লেখক:

জফির সেতু

লোকটা সত্যিই আচানক। পোশাকের মতোই তার কথাবার্তা অসংলগ্ন, ছেঁড়াছেঁড়া। যেমন তামুকে চুমুক দিতে দিতে বলল, আসলে আমরা গতকাল ছিলাম নির্বোধ, বিবেচনাহীন আর নীচ!
লোকটার দার্শনিকতা ও কালচেতনা আমাকে ভাবিত করে তুলল। আমি বললাম, আর আজ?
জয় আমাকে বাধা দিলো, প্রশ্ন করছিস কেন? শুনতে থাক।
তারপর লোকটাকে অনুরোধের স্বরে বলে, কাকা, আপনি বলে যান। আমরা শুনি।
লোকটা অর্থাৎ মানিক কাকা জয়েরই আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের জন্য পুরো কৃতিত্ব আমি জয়কেই দিতে চাই। কারণ মানিক কাকার সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি সভ্যতাকেই জানতে পারতাম না। মানুষের ইতিহাসটাই আমার কাছে অস্পষ্ট থেকে যেত। জয় নয় বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাটিয়ে সদ্য দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, আর অবসর মুহূর্তে, বিশেষত সন্ধের পর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। জয়ই সবিস্তারে লোকটার বর্ণনা আমাকে দেয়, আর আমি তাকে স্বচক্ষে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করি। কেননা জয় লোকটার সঙ্গে সভ্যতার উন্মেষ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব, সামন্তবাদ থেকে শুরু করে সামরিকতন্ত্র, দাসব্যবসা থেকে বেশ্যাবৃত্তি, পুঁজির উদ্ভব থেকে করপোরেট পৃথিবী – এমনকি আফগানিস্তানযুদ্ধ থেকে সাদ্দামের পতন, আর হালের গাদ্দাফি-নাটকের অদ্ভুত এক যোগসূত্রে একীভূত করে ফেলেছে। আমার কাছে কিন্তু তা অতিকথন তো মনেই হয় না, বরং মনে হয় এটাই মানবজাতির অমোঘ জীবনবেদ।
জয় বলে, আজকালকার সাহিত্য যে আমি পড়ি না তার বড় কারণ হলো, তাতে জীবনকে বড় ক্লিশে বলে মনে হয়। অবশ্য আজকের সাহিত্য-বিষয় থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখাটা একটা বড় কারণ। ধর, যে লোকটার কথা বলছি, তাকে নিয়ে তোদের লেখার সাহস তো নেই-ই, মুরোদটুকুও নেই! আমি মনে করি, মানিক কাকারাই হচ্ছেন আজকের যুগের সাহিত্যের সত্যিকার নায়ক। তার মডেলটা নিয়েই তবে আজকের মানুষের আসল স্বরূপ বিনির্মাণ করতে হবে, জীবনবোধকে উসকে দিতে হবে, নতুবা বাদবাকি হবে একেবারেই ফাঁকি।
আমরা লোকটার আস্তানার দিকে হাঁটতে-হাঁটতে কথা চালিয়ে যাই। জয় আমাকে ধারণা দেয় যে, লোকটা সপরিবারেই শহরে বাস করে অথচ লোকটার কোনো ঘর নেই। লোকটা সদর্পে নাকি বলেও যে, আমার তো বাপজান মনে করেন, ঘরের দরকার তো দেকি না!
আসলেও লোকটার ঘরের দরকার নেই। রাত নটার দিকে রাস্তার পাশেই ১০ মিনিটের মাথায় তৈরি হয়ে যায় তার স্বনির্মিত চটের ঘর। এবং তার ভেতরে একটা মশারি টাঙানো থাকে। ব্যস! অনেকটা তাঁবুর আদলে নির্মিত গৃহ – চারটে গাছের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয় ঘর বা মশারির খুট। অতঃপর ঘরের ভেতরে পাঁচ-পাঁচটি জলজ্যান্ত মানবসন্তানের নাকডেকে নিদ্রাযাপন ভোর-অবধি। তারপর নতুন দিন, জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়া।
জয় এতদিনে এদের স্বজনে পরিণত হয়ে গেছে। আর এখন, পৃথিবীতে তার একমাত্র আগ্রহের বিষয় হচ্ছে রহস্যেঘেরা কিংবা সাদামাটা এই লোকটা। জয় রীতিমতো লোকটাকে নিয়ে গবেষণা করেছে, এখনও করছে। অথচ, এই মহানগরটিতে যারা বসবাস করেন, অন্তত দরগাহ-মিরের ময়দান অঞ্চলে, তারা অদ্ভুতবেশী একমাথাচুলের ঝুঁটিবাঁধা লোকটিকে দেখেননি এমন নয়। আবার তাকে নিয়ে আলাদাভাবে কেউ ভেবেছে, এমনটাও হওয়ার কথা নয়। আর জয় কিনা প্রতি রাতে একবার এখানে এসে আড্ডা জমিয়ে, চা খেয়েই তবে যাবে।
মানুষের অন্তত রাতের বেলা কিছুক্ষণের জন্যেও আলোর দরকার পড়ে। কিন্তু লোকটার তারও যেন দরকার হয় না। আকাশে চাঁদ থাকলে তা দিয়ে চলে। আবার, রাস্তার সোডিয়াম বাতি দিয়েও চালিয়ে নেওয়া যায়। আকাশে চাঁদ থাকলে বেজায় ভালো। কেননা গ্যাসের আলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর!
আর, গায়ের কাপড়ের বেলা, জয় বলে, দ্যাখ, লোকটা বাজার থেকে কোনো কাপড় কেনে না, আবার কারো কাছ থেকে চেয়েও নেয় না। নিজের পোশাক নিজেই জোগাড় করে। আর এখানেই সে ক্যাপিটালিজমের পোঁদ মারে! আমি অবাক হই, জিজ্ঞেস করি তাকে, কীভাবে?
কীভাবে আবার? জয় বলে, ক্যাপিটালিজম কী চায়? স্রেফ কনজিউমার! আর কনজিউমারের জন্য দরকার বিজ্ঞাপন, তাই তো?.. .তো, মানিক কাকা নগরে যত বিজ্ঞাপনীব্যানার পরিত্যক্ত অবস্থায় পায়, তা সংগ্রহ করে। নানান রঙের, নানান আকৃতির। আর এগুলো দিয়ে তৈরি করে যত শখের পোশাক। নিজের জন্য, বউয়ের জন্য, সন্তানদের জন্য। তার কিন্তু পোশাকের অভাব নেই। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ক্যাপিটালিস্টদের কাছে বিজ্ঞাপনের একটা মূল্য আছে, কিন্তু মানিক কাকার কাছে তার কোনো মূল্যই নেই। এটা তার ভাবিত কিছু নয়। তিনি শুধু পাহারা দেন বাতাসে ব্যানারগুলো কখন মাটিতে পড়বে, বা রাজনৈতিক দলের ব্যানার-নির্দেশিত কর্মকান্ড কখন শেষ হবে! তারপর দুহাতে সুই-সুতো নিয়ে জামা বানাতে বসে গেল মানিক কাকা। বলতে গেলে এটা লোকটার একটা বিদ্রূপ, ব্যঙ্গ। ক্যাপিটালিজমের গালে ঠাস করে এক-একটা চপেটাঘাতও।
জয় এসব কত কিছু ভেবে রেখেছে তার নিজের মতো করে। লোকটার ব্যাপারে আমার ঔৎসুক্য কেবল বাড়ে।
লোকটা শৌখিন সন্দেহ নেই। হাতে এতগুলো চুড়ি, নানা রঙের। চোখে সুরমা। জামায় আতরের সুগন্ধ। কিন্তু পায়ে জুতো নেই। জয় একবার জুতো-প্রসঙ্গ তুলেছিল। মানিক কাকা নাকি হেসে বলেছিল, দরকার কী? আর এসব বিবেচনায়, জয় এটুকু সিদ্ধান্ত নেয়, মানিক কাকায় এসে সভ্যতা শেষ হয়েছে অথবা একটা সভ্যতার সূত্রপাত এখান থেকেই। কথাটি আমার বেশ মনে হয়। জয়ের যুক্তি অকাট্য। মানুষ সভ্যতা নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্রথম কোন জায়গাটা বেছে নেয়? নিশ্চয়ই নদীতীর। নদীতে আমিষ আছে, পলিবাহী অববাহিকায় ফসল বা খাবার আছে, আর যোগাযোগ একটা তো আছেই। আর মানিক কাকা? সেও বেছে নিয়েছে এমন জায়গা প্রতি সন্ধ্যায় নগরের বাসাবাড়ি-হোটেল আর কমিউনিটি সেন্টারগুলোর বর্জ্য যেখানে ফেলা হয়, সেখানকার পাশটিতে। এখান থেকেই পরিবারটির অর্ধেক খাবার যেমন জোটে, তেমনি প্রাপ্ত নানা জিনিস আয়েরও একটা প্রধান উৎস। তাই দিনের বেলা যে যেখানেই থাকুক না কেন সন্ধেবেলা পরিবারের সদস্য সবাই চলে আসে চারিদিক থেকে আসা ভ্যানগুলোর গন্ধ শুঁকে-শুঁকে। তাদের ১০টি চোখ তখন চকচক করতে থাকে।
লোকটাকে দেখে আমাকে জাদুকরের মতোই মনে হয়। রঙচঙের ব্যানারে-তৈরি পোশাক আলখেল্লার মতো। কোথাও কোথাও তালিমারা। মুখখানি প্রশান্তিতে ভরা। চটে-তৈরি ঘরের বাইরে বাচ্চা ছেলে দুটি ধুলো নিয়ে খেলছে। পাশে লোকটার ছোটখাটো স্ত্রী চুলোয় হাঁড়ি চাপিয়ে রান্না করছে। কিশোরী মেয়েটি মশারির নিচে শুয়ে। আর ঘরের আশেপাশে মানিক কাকা পায়চারি করছেন।
জয়কে দেখেই লোকটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। শুভেচ্ছাবিনিময় করে। জয় বলে, কাকা, আপনার আরেক ভাতিজাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম আজ। দ্রুতই লোকটার সঙ্গে আমি খাতির জমাতে চেষ্টা করি। আমি বলি, কাকা এখানে যে থাকেন কোনো অসুবিধা হয় না?
অসুবিধা হবে কেন? ত্বরিত জবাব দেন মানিক কাকা। আমি বলি, আপনারা পানি পান কোথায়?
কেন, ওই যে, সকালবেলা ওই কলোনির ট্যাংকি থেকে কম করে হলেও তিন ঘণ্টা পানি পড়ে! আমি কাকা-নির্দেশিত সরকারি কলোনির দিকে তাকাই।
আমি বলি, হ্যাঁ, তাই তো। কিন্তু ধরেন এই পায়খানা ইত্যাদি…
মানিক কাকা নির্বিকার বলেন, কেন পাশেই তো ড্রেইন আছে।
আমি মাথা নাড়ি। এবার বলি, আর চোর-বাটপার?
এবার তিনি হেসে দেন, শোনেন আপনারা হলেন গিয়ে শিক্ষিত মানুষ। মনে করেন ধনী মানুষ। সমস্যা আপনাদের। নেংটার নাই বাটপারের ভয়, একটা কথা আছে না?
আমি বলি, তাও ঠিক।
মানিক কাকা আমাকে একবার পরখ করে বলেন, কিন্তু আমি তো আপনাদের বসতে দিতে পারছি না বাপজান। আমার তো মনে করেন এখানে বসার কোনো বন্দোবস্ত নাই।
আমি বলি, না না, তা লাগবে না। এমনিতেই আমাদের ভালো লাগছে।
মানিক কাকার চেহারা দরবেশী – কোথাও একটা মরমি ব্যাপার আছে। নাভি-অবধি সোনালি রঙের দাড়ি। আমি বলি, কাকা দাড়ি কাটেন না কেন?
বেলেট আপনি দেবেন? আর সে সময় কই? আর বলতে পারেন এটা হকমৌলার ইচ্ছা। বলে কাকা আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। এবার আমি তার দুই হাতের মণিবন্ধে নানান কিসিমের চুড়ির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই ‘ও এগুলো!’
মানিক কাকা যেন জানতেন এ-বিষয়ে আমি প্রশ্ন তুলবই। এটা হলো গিয়ে বয়লা-পাঁচ পাঞ্জাতন – ও আপনারা বুঝবেন না!
কাকার মুখে অমলিন হাসি। জয় ফিসফিসিয়ে আমাকে বলে, দ্যাখ না মানুষটার মুখে কী অকৃত্রিম হাসি!
আমি এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করি, কাকার নাম কী?
এই প্রশ্নে মানিক কাকা চটে গেলেন কিনা বোঝা গেল না। বললেন, নাম জেনে কী হইব আপনার? আপনি চলেন পেলেনে, আমি মাটিতে – আমার নাম দিয়া কী হইব!
না কাকা, আমি আসলে আপনার মতোই গরিব।
আমি গরিব এটা আপনাকে কে বলল? আর শোনেন আমাদের অবস্থা নিয়ে ঠাট্টা করবেন না!
মহাবিপদে পড়ে গিয়ে আমি নিষ্কৃতি পেতে চাইলাম, আমি আসলে তা বলতে চাইনি! আমি আপনার সম্পর্কে একটু জানতে চাচ্ছি!
সেইটা বলেন। আমরা মাছুয়া। বুঝলেন না? ফিশারম্যান। আসল কথা আমরা বাইদ্দে।
কিন্তু বেদেরা তো সাপ ধরে!
কিছু বাইদ্দে সাপ ধরে না। তারা মাস্তা। আমরা হলাম গিয়ে মাস্তা। আমরা মাছুয়া!
আমার আগ্রহ বেপরোয়া হয়ে যায়। আপনিও তাইলে মাছ ধরতেন?
আমি মাস্তার পোলা। লোকটার কণ্ঠে গর্ব। আমি কত মাছ ধরেছি সমুদ্দুরে। ওরে মাছ, কত মাছ। বাপজান, এখন তো মাছ চোখেও দেকি না।
কিন্তু সেই জীবন আপনি ফেলে এলেন কেন?
লোকটা চোখেমুখে এবার আয়েশি ভঙ্গি। এই এতক্ষণে একটা আসল কথা পাড়লেন বাপজান। আসলাম কেন? দেশের বাড়ি ভাত নাইগো বাপজান। দেশের বাড়ি ভাত নাই! আমরা মনে করেন ডিঙি নৌকোতে মাছ ধরতাম। তারপর কোথা থেকে এলো ট্রলার। সারা সমুদ্দুর ট্রলারে-ট্রলারে ছেয়ে গেল। আর আমাদের পেটে পড়ল লাথি…
মানিক কাকা অতীতদিনের স্মৃতির অতলে যখন হারিয়ে যাচ্ছেন, তখন আমার কানে বাজে দরাজ কণ্ঠে তার স্থায়ী ঠিকানার অনুস্মৃতি।
ভান্ডারিয়া নাম শুনিছেন? বরিশালের ভান্ডারিয়া। সেইখানে মুগোর বাড়ি, ভিটাবাড়িয়া। বাপজান, মুগোর ঘরবাড়ি সবই ছিল, এখন কিচ্ছু নাই। আমরা দিশেহারা। বুঝলেন, আমাদের কিচু নাই।
স্মৃতির সমুদ্র থেকে উঠে এসে মানিক কাকা উলটো আমাকে প্রশ্ন করে বসেন। আপনি এত কিছু জানতে চান কেন? আপনি কী করেন? আপনি সাম্বাদিক? সাম্বাদিক হলে তো কথা বলব না!
না কাকা, আমি সাংবাদিক না। আমি আপনার ওই ভাতিজার মতোই পড়াই। আমি জয়কে নির্দেশ করি।
লোকটার চোখ দুটো এবার চকচক করে ওঠে।
ওই যে আমার মায়, শুয়ে আছে, তাকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াব। স্বগত ভঙ্গিতে মানিক কাকা উচ্চারণ করেন।
আমি অকাতরে ঘুমিয়ে থাকা ফাতেমার দিকে তাকাই। মানিক চাচার ওটা বড় সন্তান। বয়স আর কত হবে, বড়জোর আট-নয়। এখনো স্কুলে যায়নি। হয়তো যাবেও না কোনোদিন। কিন্তু একজন পিতার স্বপ্ন আমাকে ছুঁয়ে যায়। ওপাশে ধুলো নিয়ে খেলা করছে ওসমান ও ঈদ মোবারক। ঈদের দিনে হয়েছে বলে ছোট ছেলের নাম রেখেছে ঈদ মোবারক!
আমি বলি, নিশ্চয়ই পড়াবেন।
এবার আমি কিঞ্চিত অসভ্য হয়ে উঠি, কাকা আপনার বয়েস তো অনেক, কিন্তু সে তুলনায় বাচ্চাদের বয়স খুব কম।
কাকা যেন ব্যাকুলভাবে চোখ বোজেন। জানু, ওরফে জাহানারা বেগম, কাকার কমবয়েসি স্ত্রী বিছানায় বসে কী এক ঘরকন্নায় ব্যস্ত। জয় আমাকে আগেই বলেছিল, বউয়ের সঙ্গে কাকার বয়সের তফাৎ হবে কমসে-কম কুড়ি বছরের। আমি ব্যাপারটি আন্দাজ করতে চেয়েছিলাম। জয়ের ধারণাই ঠিক। শীর্ণ চেহারার পানচিবানো জানু বিবি যেন জগতের সুখী এক নারীর প্রতিমূর্তি। স্বামীর প্রতি কতটা অনুগত নানা ক্রিয়াকর্মে সন্ধে থেকে আমরা তা টের পাচ্ছি। আর মানিক কাকারও সকল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু যে এই নারীপ্রতিমাটি তাও টের পেতে আমাদের বেগ পেতে হয়নি।
প্রথমে বাপজান বিয়েথা করতে চাইনি। এ-তো নানা ঝক্কি-ঝামেলা। কিন্তু শরীর বলতে একটা জিনিস আছে না? শরীর তো একটা পশু, বদ। আর, পরে বুঝতে পারলাম, মানুষের জন্ম পেয়ে মানুষ জন্ম দিতে না পারলে জীবনটাও বৃথা! ই জীবনের কোনো মূল্য নাইগো বাপজান। মানুষের জন্ম না হলে এই ভব মিছে। তাই …
ভাবালু চোখ মানিক কাকার।
এইসব তো তত্ত্বকথা। এসব জানলেন কোথা থেকে?
কেন, বাবার মাজারে গিয়া? আজমির শরিফের নাম শুনেননি?
আমার অবাক হওয়ার পালা, আপনি আজমির শরিফ গেছেন? বলেন কি!
জয় সম্মতি দেয়, হ্যাঁ কাকার আজমির শরিফ যেতে পয়সা তো লাগে না!
আমি বলি, কেন? পাসপোর্ট-ভিসা?
ওসব আমাদের কিচ্ছু লাগে না। কাকা বলেন। শুনেন বাপজান, মাবুদ-সাঁই বানাইছে এই দুনিয়া। আর আপনারা বানাইছেন দেশ। মাবুদের দুনিয়ায় আপনেরা কাঁটাতার দিছেন! কিন্তু আমাদের ওসব দিয়া আটকাতে পারবেন কই? শুনেন, আপনারা নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছেন। মাত্র পঞ্চাশ টাকা দিলে আপনারা বিক্রি হয়ে যান। তখন ভিসা-পাসপোর্ট কিছুই লাগে না! ফুড়ুত করে আমরা এদেশ-ওদেশ পগারপার হই। বুঝলেন?
একটু থেমে মানিক কাকা বহুদূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন, ওই তো আগামী মাসেই আজমির শরিফ যাচ্ছি। খাজার মাজার আমারে ডাকছে। আন্দামান রোড, বকুলগাছ তলা, আয়নাতলা, বোম্বাই হাজিঘাট আমাকে সারাবছর ডাকে।
আমি বলি, মক্কা শরিফ যেতে ইচ্ছে করে না?
ইচ্ছে করে। ওইখানে তো পেলেনে যাইতে হয়। পেলেন পামু কই? তবে বাবার দরগাতে যাওয়ার খুব খায়েশ।
কোন বাবা?
আবদুল কাদের জিলানি রহমত-উল্লাহ আলাইহি!
সে তো অনেকদূর, বাগদাদে।
হ্যাঁ বাপজান, বোগদাদে। আমি যামু ওখানে, নিয়ত করে রাখছি।
আপনার পরিবার…
পরিবার নিয়া যামু সঙ্গে করে। তবে বাচ্চা তিনটে রাইখা যামু এখানে, দেশের মাটিতে। হায়াত-মউতের কথা তো আর বলা যায় না।
একটু থেমে, মানিক কাকা আবার বলেন, বলছিলেন না বাচ্চাদের কথা? তন-মন দুটারই বড় প্রয়োজন। সন্তান হলো গিয়ো তনের খাজনা। খাজনা আমি দিয়ে দিয়েছি বাপজান। পৃথিবীকে উপহার দিলাম। একটা নারী, দুটা পুরুষ। নারী হলো গিয়া প্রকৃতি। জননী। আমি জননী পয়দা দিলাম। পুরুষ হলো গিয়া নারীর সঙ্গী। আবার কারণ। তাও আমি পয়দা দিলাম। মনে করেন, আমার তনের জন্ম সার্থক।
আর সন্তান নেবেন না?
না।
কেন?
এইটা মওলার ইচ্ছা!
কিন্তু আপনারা দুজনই তো সক্ষম নারী-পুরুষ। আপনারা কি মিলিত হন না কাকা?
হবো না কেন বাবা? রোজই হই। ওইটা তো মওলার নিয়ামত। আর পুরুষের মণি হলো গিয়া মাওলার নূরের তৈরি। বীর্যটাই তো বাপজান আসল। এই পৃথিবীর সার। এইটা বুঝলেন নষ্ট করা ঠিক না। কিন্তু দুঃখ কি জানেন, আপনারা এটা নষ্ট করে দিচ্ছেন। পৃথিবী কি এমনি এমনি পুড়ছে? আপনারা বলছেন, আমেরিকা বিরান করে ফেলছে পৃথিবী, এই সেই। আমি বলি, আপনাদের প্রত্যেকের পাপেই আগুন লাগছে দুনিয়ায়। এই আগুন নিভবে না বাপজান। মিছে আমেরিকার দোষ পাড়েন ক্যান? জানেন বাপজান, একফোঁটা বীর্য জমিনে পড়লে সত্তর হাত পর্যন্ত মাটি পুড়ে খাক হয়ে যায়!
কিন্তু বীর্য নষ্ট না করে তো উপায় নেই কাকা।
এইটা কোনো কথা না। আপনি চাইলেই মণির হেফাজত হয়। আর এই জন্য জ্ঞানসাধনার দরকার। মনে করেন, নারী হলো গিয়ে জমিন। আপনি মণি কোথায় রাখবেন এইটা নির্ভর করছে আপনার মকসুদের ওপর। আপনি জমিনের নিচের অংশেও এই মূল্যবান জিনিসটা রাখতে পারেন, ওপরের অংশেও পারেন। নিচের অংশে যদি রাখেন তাতে ফল ধরবে, আর ওপরের অংশে রাখলে বীজ রক্ষা পাবে। এর বাইরে যদি রাখতে যান, তাহলে গিয়া বিপদ, আপনার আর মুক্তি নাই। আমার বেলায় বাপজান, আমি এখন বীজ রক্ষা করছি, আর একসময় তা মাটিতে মিশে যাবে। বুঝলেন বাপজান, বীর্য হলো গিয়া একটা চক্র। একটা গায়েবি পবিত্র চক্র। এই চক্রের আদিও নাই, অন্তও নাই!
কথায় কথায় যেন নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন মানিক কাকা। বললেন, এবার একটু তামুকে টান মারার দরকার।
আমি জিজ্ঞেস করি, আপনি তামুক টানেন?
হ্যাঁ বাবা একটু-আধটু খেতে হয়। তবে আমি গাঁজা বা আফিম কিচ্ছু খাই না। যারা খায় তাদের একটুও ঠাঁই দেই না। আমি আর কোনো নেশাও করি না। তামুকই আমার নেশা বলতে পারেন।
নারকেলের মালার একটা হুঁকা বিছানার নিচ থেকে বের করে তাতে তামাক সাজান মানিক কাকা। একসময় তাতে দম মারেন। কয়েক দম মারতেই যেন নেশায় বুঁদ হয়ে যান। অস্পষ্টভাবে বলেন, আসলে আমরা গতকাল ছিলাম নির্বোধ, বিবেচনাহীন আর নীচ!
আমি আবারো খুব মনোযোগী হয়ে উঠি। তাহলে আমাদের বর্তমান আর ভবিষ্যৎটা কী, অন্তত লোকটার বিবেচনায়? আমি তৎপর হয়ে উঠলে, জয় আমাকে বাধা দেয়। আর লোকটাও একটা গভীর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই আচ্ছন্নতা তার অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎকে ঘিরে।
জয় বলে, এই তার চরিত্র! কোনো বিষয়ে তুমি খুব আগ্রহী হয়ে উঠলে ভাবনার অতলে ডুবে যান উনি। তামুকে টান দিলে তো কথাই নেই।
আমি মানিক কাকার অদ্ভুত ঘরটির চারপাশ অবলোকন করি। ঘরের বাইরে দুটো চটের বস্তায় তার ঘরকন্নার যাবতীয় বিষয়আশয় গোটানো। কদিন ধরে মানিক কাকা যাই-যাই করছেন। কারণ আসন্ন কোরবানির ঈদে তার আস্তানায় কোরবানির গরুর হাট বসবে। তাই ক্ষমতাসীন দলের মিরাসদাররা মানিক কাকাকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে অন্যত্র চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। বারকয়েক। আর এ-নির্দেশ উপেক্ষা করা যাবে না।
ঠিক তখন ক্ষমতাসীন দলের একটা উমেদার কোথা থেকে তেড়ে আসে। মানিক কাকার নেশা টুটে যায়। ভাবনান্তর হয় তার। উমেদার বলে, ও চাচা হুনো, বিছনার তলর্ ইট কাইল সকালে সাজাইয়া রাকইন্ যে! আর আমার দড়ির সীমানায় কেউরে ঢুকতে দেইন না যে। কেউ আইলে আমার নাম খইবা।
জয় বলে, দ্যাখ লোকটার বিছানার নিচের ইটও অন্যজনের।
আমি বলি, লোকটা তার পাহারাদার মাত্র!
উমেদার চলে যায়।
লোকটার আগামীদিনের কথা ভেবে আমি আতঙ্কিত হই। কিন্তু মানিক কাকা নির্বিকার। রাত ১১টা বাজে। দরগাহের ঘড়িতে ঘণ্টা বাজে। বাচ্চাগুলো ও জানু বিবি ততক্ষণে শুয়ে পড়েছেন। মানিক কাকা হাই তোলেন। তার চোখেমুখে সহসাই যেন ঘুম ছেয়ে বসেছে। কে জানে ভবিতব্যের আতঙ্কে কিনা।
আমার চোখে পড়ে সামনের দেয়ালে ছোট, বড় ও পাতিনেতাদের মুখসংবলিত পোস্টার। সারাশহর পোস্টারে-পোস্টারে ছেয়ে গেছে। জয় সন্ধেবলা হাঁটতে-হাঁটতে বলেছিল, কোরবানির সময়, কোথায় গরুর মুখ দেখব যত্রতত্র, তা আর দেখি না। গরুর মুখের বদলে শুধু এইসব মানুষের মুখ দেখি! মানুষের মুখ দেখতে-দেখতে আর ভালো লাগে নারে!
জবাবে বলেছিলাম, আমিও ওসব দেখে-দেখে ক্লান্ত আর বিরক্ত হয়ে পড়েছি দোস্ত!
তারপর দুজনের কত হাসি। আমাদের হাসি দেখে রাস্তার অনেকে অবাক হয়ে গিয়েছিল।
আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে জয় মানিক কাকার উদ্দেশে বলল, দেখছেন চাচা, শহরের সব জায়গায় কেবল ছুরি আর ছুরি। মানুষ এখন কেবল ছুরি শান দিচ্ছে! পত্রিকার পাতা উলটালেও ছুরির বিজ্ঞাপন!
মানিক কাকা মশারির ভেতর ঢুকতে-ঢুকতে বলেন, বলেন তো বাপজান, সারাবছর আপনারা এত-এত মাংস খান, আপনাদের ফিরিজ ভরতি কেবল মাংস, ওরে আল্লা! তারপরও কোরবানির সময় এলে মাংস খাওয়ার জন্যে আপনেরা সবাই এত পাগল হয়ে যান কেন? এই একটা জিনিস আমি বুঝি না!
তারপর ‘ওয়াক থু’ বলে মশারির বাইরে একদলা থুথু নিক্ষেপ করে বলেন, মানুষের উপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে! বুঝলেন, ঘেন্না ধরে গেছে!
জয় আর আমি, আমরা দুজন পরদিন সন্ধেবেলা হাঁটতে-¬হাঁটতে লোকটার আস্তানার দিকে পা বাড়াই। ওখানে আজ কোরবানির পশুর হাট বসেছে। কিন্তু লোকটার সংসারের চিহ্ন কোথাও নেই। আমরা এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করি। এমনকি নগরের নানা রাস্তায় তার সন্ধান চালাই। অনেক রাত-অবধি। আমাদের পায়ে ব্যথা ধরে যায়। বউরা ঘনঘন ফোন করতে থাকে। আমরা রাস্তায় অর্থহীন হাঁটি। কিন্তু কোথাও লোকটার কোনো হদিস নেই। পায়ের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার