সাহিত্যিক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন

লেখক:

আবদুল্লাহ আল আমিন

১৯৪৭ সালের দেশভাগ তো কেবল ভূখ–র বিভাজন নয়, এ যেন ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়া ছিন্নমূল মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ – কোথায় যাব, কী করব – এমন দ্বিধাদীর্ণ মনের বিভাজন। এই বিভাজনের মাধ্যমে দুই বাংলার জনমানস পতিত হয় এক অপরিসীম দুঃখদহনে। দীর্ঘদিনের লালিত সুখস্বপ্নের ওপর অপ্রত্যাশিত আঘাতে সবকিছু ল-ভ- হয়ে যায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই এটি সংবেদনশীলচিত্তে গভীরতর রক্তক্ষরণ ও স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে ওঠে। দেশভাগের পর বসতবাড়ি, জমিজমা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের অনেকেই পূর্ববঙ্গ অভিমুখে পাড়ি দিয়েছিলেন; তেমনি পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা দেশ নামক বস্ত্তটির জন্য ভিটেবাড়ি, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, চাকরিস্থল ছেড়ে ছিলেন বা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন দলে-দলে। সাতচলিস্নশের দেশভাগ কেবল ভূখ-কে বিভক্ত করেনি, বিভক্ত করেছে বাংলা ভাষা-শিল্প-সাহিত্যের ভূগোলকে, অনেকের আবেগ ও শৈশবস্মৃতিকে করেছে দ্বিখ–ত এবং ক্ষত-বিক্ষত – যেমন করেছে কেতকী কুশারীর। পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে আসা বাঙালি মুসলমান জীবনের সমীকরণটি যেমন জটিল মনে হয়, তেমনি পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়া বাঙালি হিন্দুজীবনের জলছবিটিও কম জটিল ও বেদনার নয়। কেতকী কুশারীর জীবনের কাহিনিটাও বেদনার ও বেশ জটিলতর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পূর্বপুরুষের ভিটে এবং বাবার কর্মস্থল ছাড়েন বাধ্য হয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এককালের কৃতী ছাত্র এবং ডাকসাইটে সিভিলিয়ান। দেশভাগের পর কেতকী কুশারী কিছু সময় কলকাতায়, তারপর ১৯৬৪ সাল থেকে বলতে গেলে স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে স্থিত হন। শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুর ও নীলফামারী ছেড়েছেন ১৯৪৭-এ, জন্মভূমি কলকাতার পাট চুকিয়ে দেন ১৯৬৪-তে। তারপর ৬৪ বছর পর ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবর্ষ উদযাপন করতে। এসেই রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, ফকির লালন শাহের মাজার দেখতে গিয়েছিলেন আবুল আহসান চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে। কুষ্টিয়া থেকে ফিরে এসেই বৈকালিক চা-আড্ডায় মেতে ওঠেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অফিসকক্ষে। সৌভাগ্যক্রমে সেদিনের সেই বৈকালিক আড্ডায় আমিও উপস্থিত ছিলাম। সেদিন শিল্প-সাহিত্য ও দর্শনের নানা দিক নিয়ে কেতকী কথা বলছিলেন পবিত্র সরকার, গোলাম মুরশিদ, শামসুজ্জামান খান, আবুল আহসান চৌধুরী ও রফিকুর রশীদের সঙ্গে। আমি মেহেরপুরের মানুষ জেনে আমার সঙ্গেও আলাপ জমিয়ে ফেললেন তিনি। কথা বললেন তাঁর স্মৃতির শহর মেহেরপুর, শহরের গা-ঘেঁষে বয়ে-যাওয়া ভৈরব নদ, মহকুমা প্রশাসকের লাল দালানসহ আরো কত কী নিয়ে! গত শতকের চলিস্নশের দশকে মেহেরপুরের গ্রাম-গঞ্জের রূপ কেমন ছিল সে-সম্পর্কে কত অজানা কথা বললেন তিনি! তেতালিস্নশের মন্বন্তরের সময় তিনি মেহেরপুরে বাবার বাংলোয় থাকতেন, তাও আমাদের জানালেন। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপস্নুত ও স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন সাতচলিস্নশ-পূর্ব মেহেরপুরে।

সাহিত্যিক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসনের জন্ম ২৩ জুন, ১৯৪০ সালে মহানগর কলকাতায়; শৈশব কেটেছে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মেহেরপুরে। বড় হয়েছেন সাহিত্যিক পরিম-লে; বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে ছিলেন তাঁর বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাবা অবনীমোহন কুশারী ছিলেন অবিভক্ত নদীয়া জেলার মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক। তিনি ১৯৪২-৪৫ সময়ে মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, পরবর্তীকালে স্বল্প সময়ের জন্য নীলফামারীতে। অবনীমোহন কুশারী ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ সমর্থন করেননি, তারপরও বাধ্য হয়ে দেশভাগের পর মালদাতে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে পোস্টিং নেন। কেতকীর পৈতৃক ভিটে ঢাকার বিক্রমপুরে এবং মাতুলালয় ফরিদপুরে। মাতার নাম অমিতা কুশারী। তাঁর পিতামহ ছিলেন সেকালের খ্যাতিমান স্কুল-শিক্ষক। অগাধ পা–ত্যের জন্য তিনি শিক্ষেত মহলে ‘শেক্সপিয়র কুশারী’ নামে পরিচিত ছিলেন। কেতকী কুশারীর প্রথম পুত্র ভার্জিল পূজারী ডাইসন ১৯৬৭ সালে এবং কনিষ্ঠ পুত্র ইগোর নীলাদ্রি ডাইসন ১৯৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার ও অন্যজন প্রকৌশলী।

ছাত্রী হিসেবে কিংবদমিন্ততুল্য প্রতিভার অধিকারী কেতকী কুশারী কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন এন্ট্রান্স থেকে এমএ পর্যন্ত। ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে রেকর্ড মার্কস পেয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। মাত্র উনিশ বছর বয়সে তাঁর চোখে বিপর্যয় ঘটে। ১৯৬০ সালে স্কলারশিপ পেয়ে অক্সফোর্ডে চলে আসেন এবং সেখানে ১৯৬৩ সালে পুনরায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর কলকাতায় ফিরে যান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অধ্যাপনা করেন। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় রবার্ট ডেভিড ডাইসনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়; এরপর থেকে যুক্তরাজ্যের কিডলিংটনে স্থিত হয়েছেন। অক্সফোর্ডের একেবারে গা-ঘেঁষে ছোট গ্রাম কিডলিংটন ছাড়িয়ে সোজা এগিয়ে চলেছে যে-পথ, সে-পথের নাম ব্যানবেরি রোড। পোস্ট অফিস, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকান, ব্যাংক আর চৌমাথা ছাড়িয়ে যেখানে পথটি বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটি ছিমছাম বাড়ি রয়েছে। এ-বাড়িতে কেতকী কুশারী ডাইসন বাস করেন। বিয়ের পর বছরদেড়েকের জন্য কানাডায় ছিলেন। ১৯৬৮ সালের শেষদিকে বিলেতে ফিরে আসেন এবং ১৯৬৯-এর শেষে অক্সফোর্ডে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা আরম্ভ করেন। পাঁচ-ছয় বছর গবেষণাকর্মের পর ১৯৭৫ সালে ডি. ফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল – ‘এ ভ্যারিয়াস য়ুনিভার্স : এ স্টাডি অব দ্য জার্নাল অ্যান্ড মেমোরিস অব ব্রিটিশ মেন অ্যান্ড উইমেন, ১৭৬৫-১৮৫৬’। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দিলিস্ন অভিসন্দর্ভটি ১৯৭৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি অক্সফোর্ডে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণি পান। ইংরেজি সাহিত্যের এই মেধাবী, মনস্বী ছাত্রীটি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই সমান স্বচ্ছন্দ। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এই অভিবাসী লেখিকা তাঁর সৃষ্টিশীলতা দিয়ে পাঠককুলকে আবিষ্ট করে রেখেছেন। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং অনুবাদকর্ম-সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার সর্বক্ষেত্রে তাঁর অবাধ ও অনায়াস বিচরণ। তিনি সেই স্বল্পসংখ্যক দ্বিভাষিক কবিদের একজন, যিনি বাংলা ও ইংরেজিতে মৌলিক কবিতা রচনা করেছেন এবং দুই ভাষাতেই কবিতা অনুবাদের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর নাটক ভারত ও ব্রিটেনের বিভিন্ন মঞ্চে অভিনীত হয়েছে। এ-কারণেই বোধ হয় কলকাতা শহরে একটি পদ্য চালু ছিল একসময় – ‘গদ্যে পদ্যে ধোপদুরস্ত/ কেতকী কুশারী ডাইসন/ ফেমিনিস্ট তিনি জবরদস্ত/ ত্রস্ত পুরুষ বাইসন’। পদ্যটি যত লঘু রসেরই হোক না কেন, এ-কথা অনস্বীকার্য যে, কেতকী কুশারী বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই ‘ধোপদুরস্ত’ লেখার দৌলতে পরিণত হয়েছেন অভিবাসী বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বলতম প্রতিনিধিতে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। দুবার আনন্দ পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক ছাড়াও সম্মানিত হয়েছেন ২০০৯ সালের সেরা বাঙালি হিসেবে। তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর সন্ধানে (১৯৮৫), ইন ইয়োর বেস্নাসোমিং ফ্লাওয়ার গার্ডেন বা রঙের রবীন্দ্রনাথ (১৯৯৭) ইত্যাদি গ্রন্থ তাঁকে রবীন্দ্র-গবেষণার ক্ষেত্রে আলোচনা ও বিতর্কের শীর্ষে নিয়ে গেছে। তাঁর অনুবাদকর্মের মাধ্যমে প্রতীচ্যের সাহিত্য-সমালোচকরা জেনেছেন, রবীন্দ্রনাথ কেবল রোমান্টিক কবি নন, তিনি আধুনিক কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁরা আরো জেনেছেন, আধুনিকতার সব লক্ষণ রয়েছে রবীন্দ্রনাথে। বল্কল (১৯৭৭), সবীজ পৃথিবী (১৯৮০), জলের করিডর ধরে (১৯৮১), ফুল ফুটেছে দোলনচাঁপায় প্রভৃতি কবিতাগ্রন্থ তাঁকে এনে দেয় কবিখ্যাতি।

কেতকী মৌলিক রচনার ক্ষেত্রে যেমন, অনুবাদের ক্ষেত্রেও তেমন সপ্রাণ ও স্বচ্ছন্দ। বহুপ্রজ এই লেখক বাংলা ও ইরেজি দুটো ভাষাই সমভাবে ব্যবহারে বিশেষ পারদর্শী। তিনি বাঙালি সংস্কৃতির দ্যুতি যেমন বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, তেমনি বিশ্বকেও বৈদগ্ধ্যময় উপলব্ধি ও গভীর মমতা দিয়ে বাংলায় ধরতে চেয়েছেন গভীরভাবে। রাতের রোদ (১৯৯৭), মোৎসার্ট চকোলেট (সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮) নাটক দুটি তিনি নিজেই অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর কবিতার অনুবাদ করেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ইংরেজিতে অনূদিত চার খ–র কবিতাগ্রন্থ তাঁকে ভারতের ইংরেজি জানা পাঠকদের কাছাকাছি নিয়ে আসে। তাঁর বিখ্যাত অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে দ্য সিলেক্টেড পয়েমস অব রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোর (১৯৯১), দ্য সিলেক্টেড পয়েমস অব বুদ্ধদেব বোস (২০০৩) ও অ্যাংলো স্যাক্সন কবিতা (১৯৮৭) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

দুই

ইংরেজিতে উপন্যাস লিখে সাম্প্রতিককালে যাঁরা লেখক-খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে বাঙালি ও ভারতীয় লেখকদের সংখ্যাই বেশি। কেবল সংখ্যার দিক দিয়ে নয়, উৎকর্ষের দিক থেকেও এঁদের লেখা বিশ্বমানের। এঁদের অনেকেই ব্রিটেন ও আমেরিকায় ইংরেজিতে লিখে পুরস্কৃতও হয়েছেন, কেউ-কেউ বুকার পেয়েছেন। এই উপমহাদেশের যাঁরা ইংরেজিতে লিখছেন তাঁদের অধিকাংশই প্রবাসী, কেউ-কেউ ভারতে অবস্থান করে মাঝে-মাঝে বিদেশে যাতায়াত করেন। ভারতীয় লেখকদের যাঁরা অভিবাসিত সাহিত্যে প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁদের মধ্যে নীরদ সি চৌধুরী, সালমান রুশদী, বিক্রম শেঠ, অমিতাভ ঘোষ, ঝুম্পা লাহিড়ী, কিরণ দেশাই, মিরা নায়ার, সাগরিকা ঘোষ এবং কেতকী কুশারী ডাইসন অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের সৌভাগ্য যে, বিশ শতকের প্রারম্ভে অভিবাসিত সাহিত্য বলে কোনো কিছু ছিল না, তা হলে রবীন্দ্রনাথও নোবেল পুরস্কার পেয়ে ওই একই দলে পঙ্ক্তিভুক্ত হতেন, তাঁকে আর বিশ্বকবি বলা যেত না। আর এ-কথাও সত্য যে, বাংলা ভাষায় না লিখলে কেবল ইংরেজিতে লিখে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পারতেন না। বাংলাদেশের যে-কজন লেখক ইংরেজিতে লিখছেন তাঁদের মধ্যে মনিকা আলী, মঞ্জুরুল ইসলাম ও তাহমিমা আনামের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এঁদের লেখার পটভূমি, বিষয় ও চরিত্র সবই বাংলাদেশের। এঁরা সবাই প্রবাসী। একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভাগ্যচক্রে অনেক বাঙালি ও ভারতীয় লেখককে প্রবাসজীবন বেছে নিতে হয়েছে। কেউ কর্মসূত্রে, কেউ স্থায়ীভাবে অভিবাসী হিসেবে দীর্ঘদিন প্রবাসে আছেন। ভিন্ন ভূগোল ও সংস্কৃতির জল-হাওয়া তাঁদের মনস্তত্ত্বের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই লেখকদের শরীর বিদেশে পড়ে থাকলেও মন পড়ে আছে দেশে, স্বদেশের মাটি-মানুষ-নিসর্গ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না।স্বদেশ-সংস্কৃতির সঙ্গে এ-ধরনের নিবিড়তার কারণে তাঁদের ভাষাভঙ্গিতে ভিন্নতা লক্ষ করা যায় – তাঁরা হয়ে ওঠেন ডায়াস্পোরা বা অভিবাসিত লেখক। আমেরিকা প্রবাসী ভারতীয় লেখক ঝুম্পা লাহিড়ীর ইন্টারপ্রেটার অব ম্যালাডিজ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সমালোচক মন্তব্য করেন, ঝুম্পা লাহিড়ীর জীবনটাই অভিবাসিত সাহিত্যের নমুনা। তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করেও তিনি নিজেকে ‘একটু বহিরাগত’ (অ্যা বিট অব অ্যান আউটসাইডার) ভাবেন। তিনি স্বীকার করেন যে, ভারতবর্ষে অতিবাহিত সময়টাতে তিনি সেখানে খুব একটা জড়িত ছিলেন না, তারপরও এ-কথা অনস্বীকার্য যে, তিনি মনেপ্রাণে ভারতীয়। তাঁর গল্পসংগ্রহ আন্তপরিচয়ের প্রশ্ন তোলে… সব প্রবাসী ভারতীয়ই এক ধরনের ক্লেশে ভোগে যে, তারা বহিরাগত (অ্যা সেন্স অব এক্সাইল)। সত্যিই তাই। এ-প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক আবু সাঈদ ওবাইদুল্লাহ বলেন, ‘আজ আমরা মুখে মুখে যতই জিও পলিটিক্স বা জিও লিটারেচারের কথা বলি না কেন, বাঙালি কবি-লেখক মানসিকভাবে নিজ দেশের ভাষা, মানুষ, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যনির্ভর। তার চিন্তা-প্রক্রিয়া কেবল স্বদেশবিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিগত চকিত অভিজ্ঞতা, একান্ত বস্ত্তঘন সত্তার চূর্ণপ্রভা প্রকাশ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। তার চিন্তার সঙ্গে তার দেশ সব সময়ই অবিচ্ছিন্নভাবে একটি অদৃশ্য রক্তবন্ধন গড়ে তুলেছে। সে সব সময়ই স্বদেশমুখী, তার সংজ্ঞায় তার মাতৃমূর্তি তথা মাতৃভাষা কখনো দুগ্ধফোঁটা কখনো সমুদ্রের উত্তাল স্রোতের মতো হানা দেয়।’ (প্রবাসে দৈবের বশে : ‘আহা বিদেশি বাতাস!’, প্রথম আলো, ৬ জুন, ২০১৪।) যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী কেতকী কুশারীর ক্ষেত্রেও ওই একই কথা প্রযোজ্য। তিনি ষাটের দশক থেকে বিলেতে বসবাস করছেন, তারপরও দেশি চরিত্র ও পটভূমি বেছে নিয়ে লিখছেন। কবিতাটা ইংরেজিতে লিখলেও উপন্যাস তিনি বাংলাতে লিখে থাকেন। ঝুম্পা লাহিড়ীর প্রথম উপন্যাস দ্য নেমসেক লো ল্যান্ডে যেমন আমেরিকা প্রবাসী ভারতীয়দের জীবনযাপনের চালচিত্র উঠে এসেছে, ঠিক তেমনি কেতকী কুশারীর কবিতা, উপন্যাস, স্মৃতিকথনে বিলেত প্রবাসী বাঙালি ও ভারতীয়দের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত (১৯৮১-৮২) প্রথম দিকের উপন্যাস নোটন নোটন পায়রাগুলোয় তিনি বিলেতে বসবাসকারী বাঙালিদের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এই উপন্যাসে, বাংলা উপন্যাসে এমনটা ইতিপূর্বে লক্ষ করা যায়নি। সত্যিকারের আন্তর্জাতিকমানের উপন্যাস বলতে যা বোঝায় তা-ই এটা। এর ভাষাশৈলী, প্রকরণ, উপস্থাপনা সবই অসাধারণ।’ (উত্তরাধিকার, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৩)। কলকাতার আনন্দবাজার লেখিকাকে অভিনন্দন জানায় তাঁর ঈর্ষণীয় সাফল্যের জন্য। তাঁর এই উপন্যাসে যেমন বাঙালি পরিবার আছে, তেমনি রয়েছে আলজেরিয়ান, উত্তর আইরিশ, দক্ষিণ আইরিশ, ক্যারাবিয়ান চরিত্র। তিনি মূলত বাঙালি নারীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিদেশি নারীদের জবানবন্দিটা তৈরি করতে চেয়েছেন। তিনি তাঁর চারপাশের যেসব বিদেশি মেয়েকে দেখেছেন, তাঁদের তিনি বাঙালি পাঠকের কাছে আনতে চেয়েছেন। তারপর ২০০৩ সালে বের হয় উপন্যাস জল ফুঁড়ে আগুন। এ-উপন্যাসে তিনি বাঙালি ও ইংরেজদের অসবর্ণ বিবাহের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। এখানে না বলে পারছি না যে, কেতকীর বাবা-মায়ের অসবর্ণ বিবাহটাও তখনকার দিনে অমৃতবাজার, যুগান্তর ইত্যাদি সংবাদপত্রে স্থান পাওয়ার মতো ঘটনা।

তিসিডোর লিখেছেন বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশের সাহিত্য এবং জীবনালেখ্য অবলম্বনে। এটি উপন্যাস নয়, আন্তজীবনী নয়, সমালোচনা-সাহিত্য নয়, আবার গল্প কিংবা অনুবাদও নয়। অথচ বইয়ের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এসবের কিছু কিছু উপাদানের ছাপ। ছড়ানো বলতে এলোমেলো-অগোছালোভাবে নয়; বরং সুশৃঙ্খলভাবে সন্নিবেশন করা হয়েছে সব। ভূমেন্দ্র গুহের সম্পাদনায় প্রকাশিত সফলতা-নিষ্ফলতা উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসুকে খানিকটা হেয়, ক্ষুদ্র করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু যে ক্ষুদ্র, অপাঙ্ক্তেয়, উপেক্ষার পাত্র নন, সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন কেতকী কুশারী ডাইসন তিসিডোরে। ব্যক্তিগত দায় ও অনুরাগ থেকেই তিনি এটা করেছেন। কেতকীর পরিবার ও বুদ্ধদেব বসু কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে পাশাপাশি বাস করতেন। তিনি খুব কাছ থেকে বুদ্ধদেব বসুকে দেখেছেন – তাঁর অনুরাগী ছিলেন। ব্যঙ্গান্তক চরিত্র হিসেবে বুদ্ধদেবকে তুলে ধরা যে জীবনানন্দের যথাযথ হয়নি, সঠিক হয়নি – নানা যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে কেতকী কুশারী সেটা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন এই গ্রন্থে। তিসিডোরে কেতকী আবির্ভূত হয়েছেন একাধারে গবেষক ও সমালোচক হিসেবে। তবে অনেকের কাছে তিসিডোর খানিকটা একঘেয়ে ক্লামিন্তকর মনে হয়েছে। একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বিভিন্ন অংশে। অনেকে মনে করেন, কেতকী এ-গ্রন্থে গবেষক ও সমালোচক হিসেবে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে পারেননি। বুদ্ধদেবের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতের কারণে এই পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে সাহিত্য-সমালোচকরা মনে করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘কর্ণ-কুমত্মী সংবাদ’ কবিতার ইংরেজি নাট্যরূপ দিয়েছেন তিনি। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ স্কুলের অধ্যাপক, গবেষষক ও অনুবাদক ড. উইলিয়াম র‌্যাডিচে কেতকীর রাতের রোদের ইংরেজি নাট্যরূপ নাইটস সানলাইটকে অসাধারণ নাটক হিসেবে মন্তব্য করেছেন।

কেতকীর বেড়ে ওঠা থেকে পূর্ণতাপ্রাপ্তির বিভিন্ন পর্বে দেখা যায়, পারিবারিক ও পৈতৃক অবস্থানের দিক থেকে তিনি বিশ্বনাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন পেয়েছেন, তেমনি রবার্ট ডাইসনকে বিবাহ করার সূত্রও পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক ও বিশ্বমুখীন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যাবে তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে উপন্যাসে। এটি বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য সৃষ্টি। এই উপন্যাসে সেফার্দিক ইহুদি চরিত্র আছে, সেফার্দিক গানের অনুবাদও রয়েছে। কেতকী পাঁচ-ছয় বছর ধরে রবীন্দ্রনাথের বর্ণভাবনা নিয়ে কাজ করেছেন সুশোভন অধিকারী, অ্যাড্রিয়ান হিল ও রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে। এটি একটি বড়মাপের কাজ এবং পশ্চিমবঙ্গের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা এটি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেছেন। একসময়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ কেন তাঁর গানে-কবিতায় হেমস্তের বর্ণনা দেননি। বিষয়টি তখন কেউ পরিষ্কারভাবে বুঝতে ও বোঝাতে পারেননি। কেতকী তাঁর রঙের রবীন্দ্রনাথে বিষয়টি খোলাসা করে দিয়েছেন আমাদের কাছে। তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ আসলে হেমস্তের লাল-গেরুয়া রংটা দেখতে পেতেন না, তাই তাঁর লেখায় তেমন হেমস্তের পাতা ঝরার কথা নেই।

 

তিন

‘কবিসত্তাই হলো আমার সব লেখার মূল চালিকাশক্তি’ – এ-কথা এক সাক্ষাৎকারে কেতকী দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বলেছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমি উপন্যাস বা নাটক যা-ই লিখি না কেন, কিংবা গবেষণায় নিয়োজিত থাকি না কেন, সব সময়ই আমার ভেতরে কবিসত্তা কাজ করে।’ সাহিত্যের একাধিক শাখায় কাজ করার পরও তাঁর কবি-পরিচয়টি নিষ্প্রভ হয়ে যায়নি। তিন-চার বছর বয়স থেকেই তিনি কবিতা লেখেন। তিনি মনে করেন, লেখক হিসেবেই তাঁর জন্ম, তাই তাঁকে লিখতে হবেই। লেখাই তাঁর কাজ, লেখাই তাঁর জীবন। তাই নিরলসভাবে তিনি লিখে চলেছেন। নতুন অভিজ্ঞতাকে কীভাবে বাংলা ভাষায় মেলে ধরা যায়, সেটা তিনি নিজের ভেতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন অনেক আগে থেকে এবং সেই চ্যালেঞ্জেই মগ্ন আছেন দীর্ঘ দিবস-রজনী। তাঁর ‘বল্কল’, ‘জলের করিডর ধরে’, ‘সবীজ পৃথিবী’ কবিতাগুলো পাঠ করলে স্বচ্ছভাবে বোঝা যাবে যে, এসব কবিতায় তিনি ভিন্ন ভূগোল ও ঋতুচক্রের বয়ানের মাধ্যমে পরম নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নতুন ভাষাশৈলী নির্মাণ করেছেন। হয়তো সাহিত্যের সমালোচকরা এটা সেভাবে খেয়াল করেননি। তাঁর ‘শীতের শরৎ’ কবিতায় রয়েছে শীতের মধ্যে শরৎ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি। ‘ব্রাইটনে গ্রীষ্ম শেষ’ কবিতাটি বিদগ্ধ পাঠককুলের সমাদর পেয়েছে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, কেতকী কুশারী ডাইসন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে বিদ্যা ও বৈদগ্ধ্যে ছিলেন অনন্য। কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন প্রথম যৌবনেই। সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় যখন তাঁর কবিতা মুদ্রিত হতো, তরুণ পাঠকরা আগ্রহভরে তা পড়ত। দীর্ঘকাল ভারতবর্ষের বাইরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন তিনি, ফলে তাঁর কবিতায় লেগেছে বিশ্বমুখীন ও কসমোপলিটান ভাব-ভাবুকতার প্রলেপ। তিনি প্রাচ্য-প্রতীচ্য দুটোই নিয়েছেন, কোনোটাই উপেক্ষা করেননি, তা সে যতই তুচ্ছ হোক। বাঙালির গ্রামীণ গানে-পালায়, সুফি-সহজিয়া-মরমি দর্শনে যে-বিশ্বমুখিনতা রয়েছে, তার অনেক কিছুই তিনি নিয়েছেন অকাতরে। লালনের গানের সহজিয়া ভাবধারা তাঁকে মুগ্ধ করেছে গভীরভাবে। লালন কিংবা অন্যান্য মরমি ভাবুকের কাছ থেকেও তিনি তাঁর কবিতার রসদ সংগ্রহ করেন। তাঁর বারবারই মনে হয়েছে, শাক্ত, বৈষ্ণব, সহজিয়া ভাবধারা – এসব তত্ত্ব যদি আমরা সঠিকভাবে আমাদের চিন্তন-মনন ও জীবনচর্যায় ব্যবহার করতে পারতাম, তা হলে হয়তো আমরা অনেকদূর যেতে পারতাম। কিন্তু ধর্মীয় ফান্ডামেন্টালিজম সব এলোমেলো করে দিয়েছে, আগে বাঙালির নিজস্ব মানবতন্ত্র ছিল, এখন আর সেটা নেই বললেই চলে।

কেতকীর শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের মেহেরপুর শহরে। তাঁর ছোট বোন করবীর জন্ম মেহেরপুর শহরে। সেই কবে তিনি মেহেরপুর ছেড়েছেন, তারপরও জন্মস্থানের মতই তাঁর স্মৃতির শহরটিকে আজো বুকের মধ্যে আগলে রেখেছেন। মহকুমা প্রশাসকের বাংলোয় খুব ভোরে তাঁর ঘুম ভাঙত। পাখির ডাক শুনতে-শুনতে জেগে উঠে দেখতেন, – ‘প্রতি সকালে উঠে আমার মনে হতো যে জগৎটা পুনর্জন্ম লাভ করেছে।’ সম্প্রতি প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন কাছে দূরের কক্ষপথের বিভিন্ন নিবন্ধেও তিনি মেহেরপুরের স্মৃতিচারণ করেছেন। সব কবিই নিজস্ব স্বপ্ন, কল্পনা, আবেগ, চৈতন্য, মনের মাধুরী মিশিয়ে কবিতার শরীর নির্মাণ করেন, কেতকীও তাই করেছেন। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ বল্কলে তিনি পরিশীলিত রুচি, বোধের সঙ্গে আবেগের মিলন ঘটিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। বলা বাহুল্য হবে না যে, তিরিশের কবিদের আধুনিকতাকে মর্মমূলে ধারণ করে আধুনিক বাংলা কবিতার যাত্রা শুরু। পঞ্চকবির মধ্যে জীবনানন্দের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বহুমাত্রিকতার অধিকারী ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। এরপর যাঁর নাম আসে, তিনি হলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। বুদ্ধদেবের সচ্ছল, স্মার্ট কাব্যভাষা এবং সুধীন্দ্রনাথের ভারি শব্দের নিরাবেগ প্রকাশ, মিথকথন আধুনিক কবিদের টেনেছিল দারুণভাবে। কেতকীর কবিতা পাঠ করলে বুদ্ধদেব ও সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর কবিতায় হৃদয় নয়, উদ্দীপ্ত হয় বোধ। ‘অ্যাকসিলরেশন’ কবিতায় কেতকী লিখেছেন, ‘আজ চক্রবৃদ্ধিহারে পূর্ণতম হলো জাগরণ/ শ্বেত ময়ূরের মতো জ্যোৎস্না নেমে এসেছে মাটিতে।’ এ-কবিতায় তিনি আধুনিক মানুষের আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গি, দুটোই নিয়েছেন। অক্সফোর্ড কিংবা কিডলিংটনের কোনো এক বাংলোয় বসে দিবস-রজনী তিনি স্মৃতির যমুনায় হাবুডুবু খান। বকুলের গন্ধেভরা ঋতুতে তিনি দেখতে পান তুষারকণা জানালার কাচে জ্যামিতিক চিত্র আঁকছে। ‘নববর্ষ’ কবিতায় তাঁর হৃদয় উৎসারিত প্রেমের তুলিতে আঁকা প্রেমিকের মনোহরণ রূপটি বড় মধুর, বড় আকর্ষণীয়। ‘মদের মতো পাগল করা ছেলে,/ পদাবলীর সখার মতো কালো’ – সব উজাড় করে দিয়ে কেতকী কুশারী তাঁকে ভালবেসেছিলেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘সবীজ পৃথিবী’তে কবির ভাবোচ্ছ্বাস আর আবেগময়তার সঙ্গে বিদেশের গাছপালা, পত্র-পুষ্প-পলস্নবের রূপ-রং-গন্ধ ও গঠন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ‘হানিসাকল’ কবিতায় কবি ছেলেবেলার মতো মিষ্টি ছড়া কেটে বলেছেন, ‘বাপের বাড়ি লেবুপাতা,/ শ্বশুরবাড়ির দই,/ আমের বনে হাওয়ার আমেজ,/ গন্ধ-আতপ কই?’ চাঁদের আলোয় আকাশ, নদী, সমুদ্রসৈকত মোহনীয় হয়ে ওঠে সব কবির কাছে, একদিন সমুদ্রসৈকত অপরূপ রূপে ধরা দেয় কেতকীর কাছে। তিনি লেখেন, ‘দেখেছি ভাস্বর/ অনন্তশয়নে বিষ্ণু, ব্রহ্মা–আংটির একটি নীলা।’ (‘শীতের শরৎ’)।

কেম্পটাউনে হেরিং মাছ কিনতে গিয়ে কবির মনে পড়ে যায় বাঙালির চিরায়ত রন্ধন ঐতিহ্যের কথা, তাঁর মায়ের রান্নাঘরের স্মৃতি। স্মৃতিকাতর কবি লেখেন – ‘মা গো, তোমার শিলনোড়া বেয়ে এখনও হলুদজল পড়ে,/ উনুনে উথলে-উঠা ডালের ছোপ,/ খুরিতে পাঁচফোড়ন, কালো জিরে’। কবিতায় আঁকা ছবিটি শিলনোড়া, খুরিতে পাঁচফোড়ন, ডালের ছোপের মত একবারেই আটপৌরে, সাদামাটা কিংবা সদ্য গাছ থেকে তোলা কাঁচামরিচের মতই সতেজ ও সজীব। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় কেতকী কুশারী ডাইসনের তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ জলের করিডর ধরে। ‘যদি হাজার কিলোমিটার হাঁটতে হয়’ কবিতায় কবি গভীর অরণ্যে দীর্ঘপথ হাঁটবার জন্য সহযাত্রী বন্ধুদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি লিখেছেন – ‘লাল ফুটবলের মতো যে-অস্তসূর্যটাকে/ লাফাতে লাফাতে তালবনে নেমে যেতে দেখেছি,/ উলটো দিকের মাঠে দৌড়তে দৌড়তে/ আবার বর্তুল তাকেই খপ করে ধরে ফেলবো’। তাঁর বিশ্বাস অরণ্যের শেষপ্রাস্তে পৌঁছতে পারলে আছে সব প্রতিকারহীন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কবি মাঝে মাঝে চিরচেনা প্রতিবেশেও খুঁজে পেয়েছেন অচেনা-অজানা দেশের খনি, অজ্ঞাত ভাবনার সূত্র। তারপর অনেক পথ হেঁটে সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের কোনো এক ছায়াঢাকা গ্রামের কাছে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা পৌঁছলেন। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল জলের বোতল খালি। সে-গ্রামে তিনি দেখলেন শৈবদের আড্ডার পাশাপাশি বৈষ্ণবদের আশ্রম। সেই আশ্রমে শীর্ণ, হাস্যোজ্জ্বল, তাম্বুলরাঙা এক বৈষ্ণবীর সাক্ষাৎ পেলেন তাঁরা। নদীর জল পানযোগ্য নয় জেনে তিনি বৈষ্ণবীকে জল ফুটিয়ে দিতে বললেন। বৈষ্ণবী শুকনো ডালপালা জ্বেলে জল ফুটিয়ে দিলেন এবং ব্যাখ্যা করে শোনালেন দেহান্তবাদের নিগূঢ় তত্ত্ব, যা রসিকচিত্তে ভাবরসের জন্ম দেয়। বোষ্টমির ভাষায় কেতকী বলছেন, ‘এতক্ষণে জীবগুলো নাশ হইলো,/ চক্ষে যাদের যায় না দেখন,/ জলের দেহে বিলীন ছিলেন আত্মাগুলি,/ ভবে যেমন অরূপরতন’ (‘অরূপরতন’)। এ-কবিতাটি কবি বৈরাগ্যের ধূপছায়ায় মগ্ন, প্রামিন্তক ও সামাজিকভাবে দীর্ণ মানুষগুলোর উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত কথা বলতে দাও কবিতাগ্রন্থে কেতকী কুশারীর যাপিতজীবনের প্রসন্নতা ও হার্দিক অনুভূতি মিশে আছে গভীরভাবে। ‘গল্প নয়’ কবিতায় কবি বারাণসীর এক মাতৃহারা কিশোরীর জীবনচিত্র এঁকেছেন গভীর মমতায় ও স্নিগ্ধ দরদে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কেতকীর মা বেড়ে ওঠেন বারাণসীতে এবং সেখানে তিনি তাঁর কাজিনদের সঙ্গে হিন্দি মিডিয়াম শিক্ষায়তনে পড়াশোনা করেন। সেতার, ভজন ও গান্ধীবাদ ভালবাসতে শিখেছিলেন তাঁরা বারাণসীতেই।

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় কেতকী কুশারীর জাদুকর প্রেম, জাদুকর মৃত্যু। এ-কবিতাগ্রন্থে এমন এক কবিকে আমরা পাই, যিনি নিরন্তর সাধনা, অধ্যবসায়, নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আয়ত্ত করে নেন মহৎ কবির অভিধা। সবল, সতেজ ও স্বতন্ত্র কাব্যভাষায় নির্মাণ করেন গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর শরীর। এ-কাব্যে তাঁর যে-স্বাতন্ত্র্য তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত বল্কলেই সেই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন তিনি প্রবলভাবে। কবিমাত্রই এক নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক, যাঁকে একলব্যের মতোই দৃঢ়সংকল্প ও গভীর আন্তবিশ্বাসের সঙ্গে নিঃসঙ্গতার শরে রক্তাক্ত হয়ে পথ চলতে হয়। শুরু থেকেই কেতকী একলব্যের মতো কঠিন পথটি বেছে নিয়েছেন। জাদুকর প্রেম, জাদুকর মৃত্যুতে বহতা নদীর মতোই স্বচ্ছন্দ, স্বতঃস্ফূর্ত ও অকুণ্ঠ কবির চেতনা, ভাব-ভাষা, বিশ্বাস, আবেগের গতিবেগ। জ্যোৎস্নায় ভেসে-যাওয়া রাতে এক গায়কের গান শুনে কবি চাঁদকে বলছেন, ‘সুরের জাল পাতো, নামাও, নাচাও।/ মানুষের জালে যারা মরতে বসেছে তোমার জালে তারা দুদ- বাচুক।’ তাঁর মনে হয়েছে, গানের সুরে পাথর গলে, গান শুনে বর্বর ঘাসে ধরে বীজ। ‘সূর্য চলেছে দক্ষেণায়নে’ কবিতায় সূর্যদেব কবিকে পরামর্শ দিয়ে বলছেন, ‘থতমত খাবি না, ভয় পাবি না পৃথিবীতে কাউকে,/ যে কটা দিন পারিস স্রেফ জ্বলে যাবি।’ কবির প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, তিন-চার বছর বয়স থেকে তিনি কবিতা লিখছেন। সেই হিসাবে ধরে নেওয়া যায়, কেতকী কুশারীর কাব্যযাত্রা শুরু গত শতকের চলিস্নশের দশকের শেষার্ধ থেকে। তারপর থেকে লিখছেন আর লিখছেন। সাত দশকের সাহিত্য-পরিক্রমায় বহুমাত্রিক সৃজনকুশলতা দিয়ে সাহিত্যের সব শাখা ঋদ্ধ করেছেন তিনি, তারপরও কবিতার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।

শক্তিমানদের অনুকম্পা লাভ কিংবা বিলেতে এস্টাবলিশমেন্টের জন্য লেখালেখি তিনি করেন না, পেশা ও ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন লেখকজীবন। ভেবে বিস্মিত হতে হয় যে, কেবল বই লেখার জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত গিয়েছেন, তারপর গবেষণা করেছেন এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ওপর দুটো বই লিখেছেন। তাঁর লেখা ইন ইয়োর বেস্নাসোমিং ফ্লাওয়ার-গার্ডেন : রবীন্দ্রনাথ টেগোর অ্যান্ড ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো লাতিন আমেরিকার প্রচুর পাঠক পড়েছেন। এটি স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি সারাক্ষণ কেবল লিখছেন আর লিখছেন, লেখার শেষ নেই তাঁর, কাজেরও শেষ নেই। তাঁর পানে চেয়ে বিস্মিত হতে হয় যে, এত বড়মাপের লেখক হয়েও তিনি কিনা কলকাতার লিটলম্যাগের জন্যও লেখা পাঠাচ্ছেন। বিভিন্ন ভাষার কবিতা অনুবাদের কাজও করছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন, আবার অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতা বাংলায় রূপান্তর করেছেন। অনুবাদ করেছেন বাংলা থেকে ইংরেজিতে, ইংরেজি থেকে বাংলায় এবং স্প্যানিশ থেকেও কিছু। ব্রিটিশ কবিদের মধ্যে ডিএম টোমাস, ডেভিড কন্সটান্টাইন, আর্জেন্টাইন কবি কিম ট্যাপলিন, রাফায়েল ফেলিপে ওতেরিনিয়োসহ বেশ কজন কবির কবিতা অনুবাদ করেছেন। সেস্নাভেনিয়ায় এক পোয়েট্রি ওয়ার্কশপে ফিনল্যান্ডের কবিদের ইংরেজিতে অনুবাদ করা কবিতা তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বুঝে নিয়ে কেতকী পুনরায় ইংরেজিতে অনুবাদ করেন।

১৯৬০ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে দেশ ছাড়ার সময় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির বুনিয়াদটা সঙ্গে করে নিয়ে যান তিনি, আর এ-কারণে ব্যস্ততার মধ্যেও ভুলে যাননি বাঙালি, বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্য। এক চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তিনি লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে যোগদান করেন ১৯৭১-এ। (এই রচনার লেখককে লেখা কেতকী কুশারী ডাইসনের চিঠি, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। সে-সময়ে তিনি অক্সফোর্ডে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট করছিলেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি লেখকদের যেমন জেনেছেন এবং পড়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলীও পড়েছেন। গভীর সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল শামসুর রাহমান, রফিক আজাদের সঙ্গে; আজো নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বদরুদ্দীন উমর, হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, নির্মলেন্দু গুণ, সেলিনা হোসেন, মহাদেব সাহা, বেলাল চৌধুরী, দিলারা হাসেম, তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে। অথচ অক্সফোর্ডে পাশাপাশি বসবাস করেও তিনি নীরদ সি চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারেননি, কারণ নীরদবাবু পূর্ববঙ্গের মানুষ হয়েও কেতকীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে তেমন আগ্রহ দেখাননি। বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার প্রতিও তাঁর বেশ আগ্রহ ও জানাশোনা রয়েছে। বাংলাদেশের কবিতায় দেশপ্রেম, রাজনীতি ও আবেগের প্রাবল্য বেশি এবং ক্ষেত্রবিশেষে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে অতিমাত্রায়। এ-প্রবণতা কবিতার জন্য কিছুটা বিপজ্জনক বলে মনে করেন তিনি।

কেতকী কুশারী ডাইসনের শিকড় দুটি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত, এ-কারণে তিনি অখ- বাংলার মাটি ও জল-হাওয়া যেমন বোঝেন, তেমনি উপলব্ধি করতে পারেন বিলেতের হিম-তুষার আবহাওয়া। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও মিশ্রণের মধ্য দিয়ে একজন লেখকের লেখা সমৃদ্ধ হয়, ভাষার মধ্যে শিকড় না থাকলে কবিতা লেখা যায় না। তিনি নিজেকে একজন শিকড়বদ্ধ লেখক বলে মনে করেন। বহুপ্রজ এই লেখক অনুবাদের মাধ্যমে বাংলাকে মেলে ধরেছেন বিশ্বসভায়, আবার বাংলা ভাষার মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যকেও হাজির করিয়েছেন বাঙালির মহাআঙিনায়। বিশ্ব পরিভ্রমণে তিনি সঙ্গী করেছেন ছেড়ে-আসা বাংলাদেশের সোনালি স্মৃতি এবং সুফি-সহজিয়া গান ও গ্রামবাংলার লোকায়ত পালাকে। তাঁর ডানায় রয়েছে শিকড়, যা অবিভক্ত বাংলার মৃত্তিকার গভীরে প্রোথিত, আবার শিকড়ে রয়েছে সুনীল আকাশ পরিভ্রমণের স্বপ্নডানা। তা-ই তো ঘর ও বাহির দুটির মেলবন্ধনে এখনো তিনি অক্লান্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত। r

শেয়ার করুন