সূর্যের দিকে হাত বাড়িয়ে

লেখক:

মোবাশ্বির আলম মজুমদারMobashir Alam Majumder

হামিদুজ্জামান খানের কাজে নানা বৈচিত্র্য ও লক্ষণ প্রতিভাত হয়। সৌন্দর্য-সৃষ্টির সহজাত প্রক্রিয়ায় থেকেও তিনি ভাস্কর্যের বিষয়ে আনেন সরলতা, জ্যামিতি, কৌণিক ঊর্ধ্বমুখী ভাবনা। আকৃতিতে বিশিষ্টতা এনে সৃষ্ট ভাস্কর্যে দর্শক মনের সঙ্গে শিল্পীর ভাবনা যুক্ত হয়। এবারের প্রদর্শনীতে ব্রোঞ্জ, মেটাল, অ্যাক্রিলিক, জলরং ছাড়াও একটি নতুন মাধ্যম যোগ করেছেন, সেটি হলো কাঠ। বাংলাদেশের শিল্পান্দোলনে বাস্তবরীতির ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বিষয়ে জ্যামিতির আশ্রয়ে ভাস্কর্য গড়ার প্রবণতা তৈরি হয় ভাষা-আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ভাস্কর নভেরা আহমদের কাজের মাধ্যমে। গড়নে সরল, উল্লম্ব আকৃতির গায়ে একটি (Holo) বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে দিয়ে ভাস্কর্যের সঙ্গে যুক্ত করেন প্রকৃতিকে। পরবর্তীকালে শিল্পী হামিদুর রাহমানের শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বহিরাঙ্গন শিল্পকর্মে সরল অথচ আবেগ-অনুভূতিপ্রধান রূপ প্রাধান্য পায়। শিল্পী আবদুর রাজ্জাক বিমূর্তায়নের সঙ্গে বিষয়ের উপস্থাপনা শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের ভাস্কর্যে। হামিদুজ্জামান খান শিল্পকর্মে ধ্বনি ও রূপের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য নির্মাণ করেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে ভাস্কর্যকে মিলিয়ে দিয়ে আকাশ, মেঘের গর্জন, বায়ুর গতি, মানুষ ও পাখপাখালির কলকাকলিকে শিল্পকর্মের অংশ করে নিয়েছেন। দৃশ্যমান প্রকৃতি থেকে বর্ণ ও আকৃতির রূপ সৃজন করেছেন। প্রকৃতিজাত বর্ণ ও শব্দ থেকে আকৃতির অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছেন। বাংলার ভাস্কর্যের ইতিহাসে নানা মাধ্যমের মূর্তি বা ভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়া যায়, যা থেকে আমরা শিল্প-চেতনার উৎকর্ষ জানতে পারি। হামিদুজ্জামান তাঁর নিজের কাজ প্রসঙ্গে মতপ্রকাশ করেন এভাবে, ‘ভাস্কর্য কোনো মায়াবী সৃষ্টি নয়। এটি হলো আলো, স্থান ও প্রকৃতির বন্ধন। আমি সৃষ্টি করেছি উৎসাহ ও উদ্দীপনাকে, যেটি আমাদের নির্ভর করতে শেখায় প্রকৃতি ও পরম দয়ালুর প্রতি।’ প্রকৃতিতে বড় হতে থাকা বৃক্ষের একটি লুকানো গল্প আছে, তাতে শুধু লড়াই আর বেঁচে থাকার সংগ্রামই প্রধান হয়ে ওঠে। শিল্পী তাঁর এবারের সৃষ্টিতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দেখিয়েছেন। এবারের প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আর্থলি ট্রেজারারস’; পৃথিবীর জল-হাওয়া-আকাশের সঙ্গে ভূমি ও আকৃতির সম্পর্ক তৈরি। মোট কাজের সংখ্যা ব্রোঞ্জ ১৭টি, কাঠ সাতটি এবং অ্যাক্রিলিক ও জলরং ১৫টি। ‘সিড অব হোপ’ কাজটি কাঠমাধ্যমে গড়া। একটি বীজের আকৃতি আকাশের দিকে ছুটছে। বীজের মাঝে বিভক্তি টেনে স্পেসের সঙ্গে শূন্যতা সৃষ্টি করেছেন। আশা আর উৎকর্ষতা দেখিয়েছেন এ-বীজ আকৃতিতে। প্রতিদিনের রুটিনে আমরা আশার বাণী শুনে যাই।  এ-বীজের মাঝে তারই প্রতিফলন দেখা যায়। কাঠে তৈরি আরেকটি ভাস্কর্যের শিরোনাম ‘রেসপনসিবিলিটি’; ঊর্ধ্বমুখী জ্যামিতিক উল্লম্ব আকৃতির মাথায় গোলাকৃতির অবস্থান। আকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বৃত্তের অবস্থান নির্ণয় করেছেন। এ-প্রদর্শনীতে হামিদুজ্জামান কিছু মানুষের অভিব্যক্তি ব্রোঞ্জে নির্মাণ করেছেন। শিরোনাম ‘ইমোশন হ্যাভ মেনি ফেসেস’। মুখাবয়বে রাগ, আনন্দ, বিষণ্ণতা, স্থিরতা, উষ্মা, শান্ত অবস্থা নির্মাণ করে তার মাঝে একরকম ভাঙন বা জ্যামিতিক আকৃতি দেখিয়েছেন। শিল্পীর এ-জাতীয় মুখাবয়বের অভিব্যক্তির প্রতি ঝোঁক ইতিপূর্বের জলরঙের কাজেও উপস্থিত হতে দেখা যায়। ‘সিড অব লাইফ’ শিরোনামের স্থাপনাশিল্পে সিলিং থেকে ঝুলন্ত রেখায় যুক্ত করেছেন কাঠের টুকরো। নীলে আবৃত কাঠ ভেসে চলেছে ব্রোঞ্জ নির্মিত বীজের গা ঘেঁষে। আলো, স্থান আর আকৃতির সৃষ্ট জীবনবোধের রূপ সৃজন এখানে স্পষ্ট হয়েছে। হামিদুজ্জামানের ভাস্কর্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য কৌণিক গতি নির্ণয় করা, তার সঙ্গে বিশাল প্রকৃতি মিশে গিয়ে ভাস্কর্যকে প্রকৃতির অংশ করে তোলা। ‘সিড অব লাইফ’ কাজটি গ্যালারির এক কোণে অবস্থান করলেও মাটি আর আকাশের মাঝামাঝি অবস্থান করছে মানব জীবনযাপনের মতো করে। ভাস্কর্যগুলোর বেস বা ভূমি চৌকোনো বাক্স হলেও কিছু কাজে ভূমির কাজ করেছে সিমেন্ট ও পাথরের তৈরি আকৃতি। নিরেট জড়বস্ত্তর বাইরে হামিদুজ্জামানের করা অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের কাজেও জ্যামিতি প্রধান হয়ে ধরা দেয়। রঙের উল্লম্ফনের হাতছানি নেই। পোড়া দগদগে ঘা আছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ হাজির হয়েছে কোনো কাজে। ইম্প্রেশনিজমের সঙ্গে বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদের যোগাযোগ তৈরির প্রচেষ্টা অ্যাক্রিলিকের রিফ্লেকশন ‘রানিং ইন দ্য সার্কেল’ ও অন্যান্য কাজে। অন্তর্দহনের বহিঃরূপ চিত্রতলকে সমৃদ্ধি দিয়েছে। রঙের প্রলেপে ঘূর্ণন, স্থিরতা আর রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরের কথা মনে করায়।

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে হামিদুজ্জামান ভারতের বরোদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্পকলায় উচ্চশিক্ষা লাভ করে ভাস্কর্য বিষয়ে আমেরিকার নিউইয়র্কে স্কাল্পচার সেন্টারে ভাস্কর্যে গবেষণা করেন। বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর সৃজনচিন্তা গণমানুষের কাছে ভাস্কর্যের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। ত্রিমাত্রিক নির্মাণ, মাধ্যমের বৈচিত্র্য, স্থানের সঙ্গে শিল্পকর্মের সাযুজ্য, উন্মুক্ত বিশাল পরিধিতে ভাস্কর্যের যোগাযোগ তৈরি হামিদুজ্জামানের সৃষ্টিকর্ম। নগরায়ণের এ-সময়ে প্রকৃতির উপস্থিতি জরুরি মনে করিয়ে দেয় এবারের প্রদর্শনী। এথেনা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের আয়োজনে গত ৮ মার্চ শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ৩১ মার্চ।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার