সে এক আদিম অন্ধকারে

লেখক:

হামিদ কায়সার

রাত ঠিক ২টার সময় বাসটা তেঁতুলিয়া স্টেশনে থামল। অচিন ভেবেছিল বাকি রাতটা ও বাসে বসেই কাটিয়ে দেবে। মাত্র তো তিন-চার ঘণ্টার ব্যাপার, ভোরের আলো ফুটলেই ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয় উঠবে। কিন্তু ড্রাইভার গাড়ির কাজ গুছিয়ে বাস থেকে নেমে যাওয়ার মুহূর্তে জিগ্যেস করল, ‘কী ভাই নামবেন না?’ অচিন উনার গলা শুনেই বুঝল বিশেষ সুবিধা হবে না, তবু বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘ভাইয়া আমি তো এখানে বেড়াতে এসেছি। থাকার জায়গা নাই। রাতটা ভাবছি বাসেই কাটাব। সকাল হলে একটা ডাকবাংলোয় উঠব।’ ‘ডাকবাংলায় আপনি এখনো উঠতে পারেন। কোনো অসুবিধা নাই। নেমে একটা ভ্যান নেন, ওরাই পৌঁছে দেবে।’ ড্রাইভারের পরামর্শ।

ওর কোনো ওজরই যে খাটবে না, বুঝতে পেরে অচিন লোকটাকে আর দ্বিতীয়বার অনুরোধ করল না। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সোজা নেমে পড়ল বাস থেকে। আর অমনি ওর বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল। এ কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার! নিজেকে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। বাসের ড্রাইভার বলেছিল ভ্যানের কথা। ভ্যান তো ভ্যান, কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই, দোকানপাট সব বন্ধ, বিশাল একটা তেঁতুলগাছ ছিল, অন্ধকারে সেটাও কোথায় লোপাট হয়ে গেছে। এই বিপুল অন্ধকারে ও যে এখন কোথাও একটু বসবে বা দাঁড়াবে সে জো-ও নেই।

কে জানত এখানে এসে এমন একটা পরিস্থিতি হবে! তেঁতুলিয়ায় কি ওর একবার আসা? কতবার যে এ-জায়গায় ছুটে এসেছে! দুবছর আগেও যখন শেষবারের মতো এলো এমনই এক রাতের বেলা, ও একটু

অবাকই হয়েছিল। মধ্যরাতেও তেঁতুলিয়া আলোয় আলোয় সয়লাব হয়ে আছে। স্টেশনকে ঘিরে চারপাশের প্রায় সব দোকান খোলা। লোকজন সেসব দোকানের সামনের টুলে বসে দাঁড়িয়ে আলাপ করছে। চায়ের দোকান আড্ডায় জমজমাট। অনেকগুলো ভ্যান একসঙ্গে ছুটে এসেছিল ওর দিকে। তার থেকে একটাকে বেছে নিয়ে রাতদুপুরেই পৌঁছেছিল উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয়। ভ্যানওয়ালার ডাকে ঘুম থেকে ঠিকই উঠে এসেছিল কেয়ারটেকার মালেক, কিন্তু কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বড় বিরক্ত হয়েছিল। এবার তাই অচিন ভেবে রেখেছিল, মাঝরাতে মালেককে বিরক্ত করবে না। বাকি রাতটা বাসে কোনোমতো কাটিয়ে দিয়ে একটু সকাল হলেই সেই ডাকবাংলোয় গিয়ে উঠবে। কিন্তু এখানে আসার পর সব হিসাব এখন উলটে যেতে বসেছে।

ও বিমূঢ় অন্ধকারে একা একা পাথরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ড্রাইভারসহ বাসের লোক দুটোও কখন ভোঁজবাজির মতো হাওয়ায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। নিজেকে কখনো এতটা অসহায় মনে হয়নি অচিনের। ও এই নিবিড় অন্ধকারে হঠাৎ কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। এ স্টেশনেই কী কোথাও বসে রাতটা কাটিয়ে দেবে, নাকি আস্তে আস্তে সাহস করে ডাকবাংলোর পথে পা বাড়াবে!

পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল! প্রথম কথা হলো, এখন কোনদিকের পথ নেবে? শহীদ আইয়ুব আলী সড়ক ধরে এগোতে হবে মনে আছে; কিন্তু সে-রাস্তাটা কোনদিকে তা একদমই মনে পড়ছে না।  তাছাড়া হঠাৎ শহীদ আইয়ুব আলী সড়ক থেকে ডাকবাংলোর দিকে যাওয়ার কাঁচারাস্তার পাশের বড় পাকুড়গাছটার কথা মনে পড়তেই গা থমথমিয়ে কাঁপতে লাগল ওর। সেবার ভ্যানচালক কবিরাজ গাছটা দেখিয়ে বলেছিল, ‘রাত ১২টার পর এই গাছের চেহারা বদলাইয়া যায়। গাছটা খালি কাঁপে। মাঝেমইধ্যে আগুনের গোল্লা বের হয়ে আকাশের দিকে উঠে যায়। রাতবিরোতে অনেকেই দেখেছে এ-দৃশ্য।’ এক অমাবস্যার রাতে নাকি ও নিজেও দেখেছিল বটগাছের সেই রহস্যময় আগুন। অক্টোবরের এই শীত আসি আসি কোমলতায়ও সে-কথা মনে পড়ে ওর গা ঘামতে লাগল।

তখনই হঠাৎ কী একটা বস্ত্ত নাকি পিন্ড এসে ওর গায়ের ওপর পড়ল। টাল সামলাতে না পেরে ও পড়ে গেল মাটিতে। পড়তে পড়তেই ভয়ে-আতঙ্কে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠল – ‘ও মা! মা গো!’

মাটিতে পড়েও টের পেল সেই জীবটা ওকে জাপটে ধরে আছে। ওটা যে কোনো ভয়ংকর জীব নয়, মানুষ, বুঝতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না। ওকে জাপটে ধরে রেখেই চিৎকার দিয়ে উঠল সেই মনুষ্য কণ্ঠ, ‘অই! অই! কেরা?’

মানুষের কণ্ঠ শুনে এক নিমিষেই সাহস ফিরে এলো ওর। ছায়া-অন্ধকারে দেখল, ওর চেয়েও খানিকটা লম্বা এক লোক ওকে ধরে রেখেছে। লোকটার বাবড়ি চুল। মুখে দাড়ি। কাঁধে গামছা ঝোলানো। অন্ধকারে বয়স ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

দুজনই গা-হাত-পা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। অচিন কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘ভাই! আমি ঢাকা থেকে এসেছি। ২টার বাস থেকে মাত্র নামলাম। উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোয় যেতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু কোনো ভ্যানরিকশা না পেয়ে কী করবো ঠিক বুঝতে পারছি না।’

ব্যস, এই এক কথাতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হয়ে গেল। লোকটি পশ্চিমের দিকে হনহন করে হাঁটা শুরু করে ওকেও আহবান জানাল, ‘আসেন আমার সাথে!’

লোকটির পেছনে হাঁটতে-হাঁটতে অচিনের মনে খানিকটা স্বস্তি ফিরে এলো। যাক, এখন তো অন্তত ডাকবাংলোয় যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হলো। ওখানে পৌঁছাতে পারলেই নিশ্চিন্ত। কেয়ারটেকার মালেকেরও কাঁচাঘুম ভেঙে যাওয়ায় অতটা বিরক্ত হওয়ার কথা না, গতবার বিদায় নেওয়ার সময় লোকটাকে মেলা বখশিশ দিয়েছিল। খুশি হয়ে বলেছিল মালেক, ‘আবার আসবেন স্যার। কোনো অসুবিধা নাই।’

মনে স্বস্তি এলেও মাঝেমধ্যেই দুশ্চিন্তার কাঁটা খচখচ করে বিঁধতে থাকে। ডাকবাংলোয় গেলে আশ্রয় তো মিলবে ভালো কথা, কিন্তু লোকটা আমাকে সেখানেই নিয়ে যাচ্ছে তো? আগাগোড়াই ওকে কেমন রহস্যময় লাগছিল। এত রাতে হঠাৎ কোত্থেকেই বা উদয় হলো, আবার কী সুন্দর বলতে না বলতেই ওকে পৌঁছে দেওয়ার ভার নিয়েছে। এ-লোক যে বাস থেকে নামেনি, সে-ব্যাপারে ও একরকম নিশ্চিত। তাহলে? তাহলে এলো কোত্থেকে? স্টেশনে কোনো দোকানপাটও তো খোলা দেখল না। হয়তো বাসস্টেশনের ওপর দিয়েই কোথা থেকে ফিরছিল। কোথা থেকে ফিরছিল মানুষটা? এই রাত আড়াইটা-তিনটার সময় কী এমন কাজ থাকতে পারে ওর? আর, কেমন একটু অস্বাভাবিকও লাগছে আচরণে! পা ফেলছে এতো লম্বাভাবে যে, ওর সঙ্গে তাল মেলানোটাই মুশকিল হয়ে উঠছে। কথাটথা না বলায় ভেতরের অস্বস্তি আরো বেশি উস্কানি পাচ্ছে। এই যে এতক্ষণ ধরে ওরা একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে, একটা কথা বলা তো দূরের কথা, লোকটার নিশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।

শেষে অচিনই কথা শুরু করল, ‘ভাই। আপনে আমার জন্য কষ্ট করছেন।’ লোকটি কি কোনো উত্তর দিলো নাকি দিলো না, বুঝতে পারল না অচিন। ও আবার কথা তুলল, ‘আপনি কি এই বাসেই আসলেন?’ না, সাড়া নেই মানুষটার। কেন? বোবা? বোবা হতে যাবে কেন? স্টেশনে তো কথা বলেছিল, তবে সেটাও খুব সংক্ষিপ্ত ‘আসেন আমার সাথে।’ নাকি তখন বলেইনি কথা, ও-ই ভুলে শুনেছিল? না না, ভুল হবে কেন? ও স্পষ্ট শুনেছে। স্পষ্টই যদি শুনে, তাহলে এখন কেন কথা বলছে না? নাকি কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছে না।

ওরা কখন শহীদ আইয়ুব আলী পাকা সড়ক ছেড়ে উপজেলা ডাকবাংলোর দিকের কাঁচা রাস্তায় নেমে এসেছিল, নিজেরাও জানে না। ঘন গাছগাছালির কারণে অন্ধকার এখানে আরো গহন ও গভীর, যেন অন্ধকার পাতালে নেমে এসেছে ওরা। হঠাৎ অচিন দেখল, এই ঘন নিবিড় অন্ধকারেও দেখল, সেই রহস্যময় পাকুড়গাছটা অন্ধকারকে আরো জমাট তামা বাঁধিয়ে ওর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আর, তখনই ও দেখল, বিদ্যুচ্চমকের মতনই দেখল – সামনের মানুষটা হঠাৎ  পেছনমুখী ঘুরে দাঁড়িয়েছে, চেহারাটা ধীরে-ধীরে বিকট হয়ে উঠছে ওর, চোখ দিয়ে আগুনের গোলার মতো হলকা বেরোচ্ছে। সমস্ত শরীর হাত-পা শিথিল হয়ে এলো অচিনের। মাথার ভেতরটা কেমন চক্কর মেরে উঠল। নিজেকে কিছুতেই সামলাতে না পেরে পড়ে গেল মাটিতে।

লোকটা ওকে টেনে ধরে তুললো। সজোরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, ‘কী হইছে আপনার? ডরাইছেন?’

তখন তখনই হুঁশ ফিরল অচিনের। ও দেখল সে-লোকটি, যাকে ও মনে করেছিল অশরীরী কিছু, গভীর যত্নে ওকে আগলে ধরে আছে। লোকটি ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘চলেন হাঁটি। জায়গাটা ভালো না!’ কথাটা শুনেই সমস্ত ভয়ডর আপনা থেকেই মিলিয়ে গেল। যাক এ-লোকটিকে নিয়ে অন্তত ভয়ের কোনো কারণ নেই। ও মানুষটার হাত শক্ত করে ধরে রেখে জোরে জোরে পা ফেলতে লাগল। এতক্ষণে যেন মানুষটাও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠেছে, ‘আপনে তেঁতুলিয়ায় আসছেন কেন? বেড়াইতে?’

এবার অচিন চুপ। কী উত্তর দেবে ও? কী উত্তরই বা দেওয়ার আছে? কেন এসেছে তেঁতুলিয়ায় – ও নিজেও কী তা ভালো করে জানে? যদি বলে মহানন্দার ডাকে এসেছি। কেমন শোনাবে? আপনাদের মহানন্দা আমাকে বারবার ডাকে, আমি বুকের ভেতর ওর কলরোল শুনতে পাই। আমাকে ডাকে ওপারের কুয়াশামগ্ন দার্জিলিংয়ের পর্বতমালা! এসব বললে নিশ্চয়ই মানুষটা ওকে পাগল-টাগল বা এরকম গোছেরই একটা কিছু ভাববে? আরেকটা যে কারণ আছে, বড় গভীর বড় সংগোপন সে কারণ – তা কি কখনো মুখফুটে বলতে পারবে? বলা সম্ভব! নিজেই নিজের ভেতরের মুগ্ধতার আবেশে বুঁদ হয়ে থাকে। আহা! আবার যদি ফিরে আসত গোধূলির সেই কনেদেখা আলো? সন্ধ্যার সেই স্বর্গীয় ক্ষণ!

লোকটি আবারো জানতে চায় অচিনের তেঁতুলিয়ায় আসার কারণ। ওর সাদামাটা উত্তর, ‘এই ছোটখাটো একটা কাজ ছিল!’ ভাগ্য ভালো যে লোকটি আর ঘাঁটায় না, জানতে চায় না কী সেই কাজ, গুছিয়ে মিথ্যে বলার অভ্যেস ওর একদমই নেই।

উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোর গেটের কাছে পৌঁছাতেই যেন প্রাণ ফিরে পেল অচিন। যাক! সমস্ত ক্লান্তি এখনই বিছানার নরম চাদরে ঢেলে দেওয়া যাবে। ভেতর থেকে তালা দেওয়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ও লোকটির আগে আগেই সজোরে ডেকে উঠল, ‘মালেকভাই! মালেকভাই! মালেকভাই!’

মালেকভাইয়ের সাড়া নেই। সেটাই স্বাভাবিক। রাত তিনটের সময়ই সম্ভবত মানুষের ঘুম সবচেয়ে গভীরে পৌঁছে। তবু অচিন অনেক অনেকক্ষণ ধরে আবদুল মালেককে ডাকল। গলা ছেড়ে ডাকল। সঙ্গের মানুষটিও ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরো উঁচু স্বরে ডেকে যেতে লাগল। এত ডাকাডাকির পরও যখন কাজ হলো না, তখন মানুষটি দেয়াল টপকে ভেতরে চলে গেল। অচিন পেছন থেকে বলে দিলো, ‘বইলেন ঢাকা থেকে অচিন সাহেব এসেছেন।’

দশ-পনেরো মিনিট পরই মানুষটা ফিরে এসে জানাল, ‘মালেক গেট খুলব না। ডাকবাংলা নাকি এখন বন্ধ। কাউকে রাখার পারমিশন নাই।’

অচিন অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কেন? হঠাৎ এমন উদ্ভট সিদ্ধান্ত কারা নিল, কেন নিল? ডাকবাংলো কেন বন্ধ থাকবে? আর আবদুল মালেকের আচরণটাই বা কেমন! একবার নিজে এসেই তো বলতে পারত! প্রতিবারই তো তাই আসে! ঘুমে ঢুলু-ঢুলু চোখ নিয়েই উঠে আসে ঘর ছেড়ে। আজ এলো না কেন? নাকি লোকটি ওর পরিচয়টাই মালেককে জানায়নি! জানালে হয়তো ও আসত, ঠিক-ঠিক চলে আসত! এখন তো ওর সঙ্গে দেওয়া-নেওয়ার একটা ভালো বোঝাপড়াও তৈরি হয়েছে! কম বখশিশ দিয়েছিল মালেককে গতবার! একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। এখন ও কী করবে! কোথায় যাবে এই গভীর রাতে!

দুশ্চিন্তায় জ্বলতে জ্বলতেই হঠাৎ দপ করে আশার আলো জ্বলে উঠলো। চার-পাঁচ মিনিটের ব্যবধানেই তো একটু সামনেই সরকারি আরেকটি নতুন ডাকবাংলো হয়েছে। শেষবার যখন এসেছিল, কবিরাজ ওকে এই ডাকবাংলো ছাড়িয়ে ওখানে ওঠাতে চেয়েছিল – আরো স্ট্যান্ডার্ড বলে। জোর করে ওকে দেখিয়েও এনেছিল। সত্যিই স্ট্যান্ডার্ড! ঝকঝকে নতুন টাইলস, ক্লিন, রুমও বড়, সবচেয়ে বড় কথা, অ্যাটাচড বাথ আছে। ভালোই লেগেছিল অচিনের। তবু ও এ- ডাকবাংলো ছাড়েনি, ছেড়ে ওই নতুনটাতে ওঠেনি, এখানে বেশ কয়েকবার থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল বলে! এখন তো ওকেই ছেড়ে দিলো এই ডাকবাংলো। অচিন সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কাছে জানতে চায়, ‘ভাই, এদিকেই না কোথায় আরেকটা সরকারি ডাকবাংলো ছিল?’

‘হ, আছেই তো। চলেন আমার সাথে!’ মানুষটার মধ্যে যেন উৎসাহের কমতি নেই, নেই সামান্য বিরক্তিও।

সেখানে আরো বেশি হতাশ হতে হলো। আগেরটায় তো তবু ডাকার জন্য একজন আবদুল মালেক ছিলেন, নতুন ডাকবাংলোয় সেরকমও কেউ নেই। অনেকক্ষণ ডেকে-ডেকে কারো সাড়া না পেয়ে চুপচাপ শুধু-শুধু দাঁড়িয়ে রইল অচিন। ভাগ্য ভালো যে তবু এ-মানুষটিকে পাওয়া গিয়েছিল, তা নইলে যে কী হতো এই গা-ছমছম করা কালি-অন্ধকারে, ভেবে ভেবে ওর গা শিউরে উঠল। মানুষটা ওকে একা ফেলে যেতে পারছে না অথচ প্রচ্ছন্নভাবে বিদায়েরও একটা ইঙ্গিত যেন ওর কণ্ঠস্বরে, ‘বাসা তো পাইলেন না, কী করবেন এখন?’ অচিন হঠাৎ নিজের মনেই বলে উঠল, ‘আচ্ছা কবিরাজভাইয়ের বাড়ি চেনেন? ভ্যান চালায়। আমাকে বলছিল, তার নাম বললেই তেঁতুলিয়ার সব মানুষ তাকে চিনতে পারবে!’

‘চিনবো না ক্যানো। আমাদের বাড়ির সাইডেই তো ওর বাড়ি!’

অচিন যেন নতুন করে আরেকবার সাহস ফিরে পেল, ‘চলেন। আপাতত ওখানেই যাওয়া যাক।’

আবারো শহীদ আইয়ুব আলী সড়ক ধরে ভেতরের দিকে যেতে লাগল মানুষটা। অচিন ওকে নীরবে অনুসরণ করে। কবিরাজের সঙ্গে ওর পরিচয়টা একদিনের না। আজ থেকে তিন বছর আগে ও যখন এক বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো এলো তেঁতুলিয়ায়, সে-সময়েই একদিন পুরান বাজারে সাতসকালেই কবিরাজের সঙ্গে ওর পরিচয়। হাঁটতে হাঁটতে অবশ-ক্লান্ত অচিন কবিরাজের ভ্যান দেখেই থমকে দাঁড়িয়েছিল, ‘ভাই! যাবেন?’ ‘কোথায়?’ জানতে চেয়েছিল কবিরাজ।

অচিন তখন সুনির্দিষ্ট কোনো জায়গার নাম বলতে পারেনি। একবার বলেছিল ডাকবাংলোতে, আরেকবার বলেছিল বাজারের কোনো একটা হোটেলে নিয়ে চলেন। বাজারের হোটেলে খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই বলেছিল বাংলাবান্ধার রাস্তা ধরে মহানন্দার তীরের দিকে যেতে।

আসলে সেদিন একলা তেঁতুলিয়ায় ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার অগ্নিকুন্ডে ও পুড়ছিল। কবিরাজ ভাই ওকে সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছে। রাতের মহানন্দার তীরে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল ওপারের মহারহস্যময় অদৃশ্য পাহাড়গুলোর সামনে। সত্য-মিথ্যে কত গল্প, মিথ, ইতিহাস, ভূতের কাহিনি, জিনের কিসসা! সময়গুলো ওর ভরে উঠেছিল। তারপর সে-যাত্রায় যতদিন ও তেঁতুলিয়ায় থেকেছে কবিরাজভাই ওর ছায়াই হয়ে উঠেছিল। পুরো তেঁতুলিয়া থানাটাই সেবার ভ্যানে-ভ্যানে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। বাংলাবান্ধা থেকে দেবনগর, শালবাহান থেকে ভোজনপুর, বুড়াবুড়ি – কোনো জায়গাই বাদ যায়নি। এরপর, গত বছরও যখন এসেছে, সাতসকালেই কবিরাজভাইকে আগে খুঁজে বের করেছিল। সারামুখে বলিরেখা, ছোটখাটো সাইজের মানুষটাও যেন ওকে দেখে নতুন জীবন পেয়েছে। যতদিন অচিন তেঁতুলিয়ায় থেকেছে অন্য কোনো খেপ নেয়নি। অচিনও যাওয়ার সময় উপযুক্ত প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করেনি। সেই কবিরাজভাই এখন এই গভীর রাতে ওকে দেখলে কী ভাববে? যাই ভাবুক না কেন, আমার যে আর কোনো উপায় নেই কবিরাজ!

ঘন-গভীর অন্ধকারেও টের পেল কবিরাজের ছোট্ট ঘরটাকে। চালটা ছনের ছাওয়া। দরোজাটা কাঠের। খুব বেশিক্ষণ ডাকতে হলো না। সেই মানুষটাই ডাকছিল টেনে-টেনে, ‘কবিরাজ। ও কবিরাজ! কবিরাজ রে!’ এক-দুবার ডাকতেই ভেতর থেকে সাড়া এসেছিল, ‘অই! ক্যারা?’ ‘আমি শাহাব্দি। খোল। ঢাকা থেকে মেহমান এসেছে!’ মুহূর্তের মধ্যেই দরোজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল কবিরাজ। ছোটখাটো সে-মানুষটা। অন্ধকারে অচিনকে দেখে প্রথমে ঠিক ঠাহর করতে পারলো না। নাকি কল্পনাতেও ছিল না ওর, বোকার মতো শুধু শুধু হে-হে করতে লাগল, ‘ক্যারা?’

অচিন ওর মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে নিজের মুখের ওপর ধরতেই বিস্ময়ে-আনন্দে কবিরাজ চিৎকার করে উঠল, ‘ভাই! আপনে? এত রাতে কেমনে আসলেন?’ বিস্ময় যেন কাটতেই চায় না। ততক্ষণে ওর বউবাচ্চাও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কবিরাজ ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘অই, একটা চিয়ার এনে দে!’ কী করতে কী করবে দিশেহারা অবস্থা। দুয়ারের মাঝখানে অচিন চেয়ারে বসতেই শাহাব্দি বিদায় নিয়ে চলে গেল। কারই বা ভাল লাগে, মাঝরাতে ঘুম রেখে অন্যের বাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে।

শাহাব্দি চলে যেতেই এক মুহূর্তও দেরি না করল না অচিন। এই মাঝরাতেই ওর ব্যাগ খুলে বসল। ইচ্ছে ছিল ঢাকা থেকে বয়ে আনা উপহারগুলো চলে যাওয়ার সময় কবিরাজের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু এখন এই আকস্মিকভাবে ওর বাড়িতে চলে আসায় যাদের জন্য উপহার, ওদের হাতে তুলে দেওয়ার লোভ ও কিছুতেই সামলাতে পারল না। প্রথমেই কবিরাজের বউয়ের হাতে শাড়ি দিলো। ঈদের জাকাতের শাড়ি, তখনই রেখে দিয়েছিল, প্রায় এক মাস আগের কথা সেটা। এরপর বাচ্চার হাতে ধরিয়ে দিলো শার্ট, একটা পাঞ্জাবি আর প্যান্ট, কবিরাজকে দিলো শার্ট, প্যান্ট আর লুঙ্গি। অন্ধকারও ওদের খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠল। কবিরাজের ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গেই ড্রেস পরে ফেলল এই রাতের আঁধারে।

অচিনের বুক থেকে কখন দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তির কালোমেঘ সরে গিয়েছিল, এই প্রথম ও আকাশের দিকে তাকিয়ে বুকভরে শ্বাস নেয়। মাঝরাতের আকাশে গুচ্ছ-গুচ্ছ তারা ফুটে আছে। সীমান্তের দিকের আকাশটা অস্বাভাবিক আলোয় উজ্জ্বল। ব্যাপারটা কী? কিসের আলো ওটা মনে মনে যখন প্রশ্নটা গুনগুন করছে, তখন কবিরাজই জানাল, ‘ভাই, অরা তো বর্ডারের চাইরপাশে সারারাইত লাইট জ্বালিয়ে রাখে। কিয়ের যে লাইট। এত্ত পাওয়ার! একটা পিঁপড়া গেলেও দেখা যায়। ঝড়বৃষ্টির মধ্যেও জ্বলে। কোনো সময়ই দেখি অগো কারেন্ট যায় না।’ এভাবে গল্প জমে ওঠে, সীমান্তের, সীমান্তের পারের মানুষগুলোর, গরু চালান কীভাবে হয়, কীভাবে আসে অবৈধ পণ্যের চালান। এই প্রসঙ্গেই উঠে এলো শাহাব্দির কথা, কবিরাজ কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, ‘ভাই আপনে শাহাব্দিরে পাইলেন কেমনে?’

অচিন বলল, ‘রাস্তায়। আরে ওনারে না পেলে যে আমার কী হতো!’

‘ভাই! কি যে ডেঞ্জারাস মানুষ এই শাহাব্দি! আপনে তো ভাই জানেন না, গরুর চোরাচালানি থেকে জিএমবির বোমা বানানো! সব কাজের ওস্তাদ!’

‘বলেন কী!’

‘হ ভাই। আমি তো অর সাথে আপনারে দেখে চিন্তা করতে করতেছি, কেমনে কী হইল! এই যে তেঁতুলিয়ায় বোমা ব্রাস্ট হইলো… কারা করলো? এসব মানুষের সঙ্গে ভাই মেলামেশা করনের দরকার নাই।’

অচিন এসব কথা শুনে আগেই তব্দা মেরে বসেছিল, ঢোক গিলে বলল, ‘এর সঙ্গে আর দেখা হলে তো! তবে লোকটা কিন্তু আমার উপকারই করেছে!’

‘অগো আবার উপকার!’

গল্পে গল্পে এভাবেই সময় পার হতে থাকে, আর চোখে ঘুম নামে অচিনের, চোখভরা ঘুম। এমন ঘুম যে, ওর আর ঠিকমতো বসে থাকতেও ইচ্ছে করে না। মাঝেমধ্যেই টাল সামলাতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে পড়ে যায়। অথচ কবিরাজের এসব দিকে খেয়াল নেই। ও কি আজ অচিনকে ঘুমানোর কথা বলবে না! এ-কথা সে-কথা কত কথা ওর। শুধু ঘুমের কথাই নেই। শেষে থাকতে না পেরে বলল, ‘কবিরাজভাই, আপনে ঘুমাইবেন না?’ ‘না ভাই, ঘুমাতে হবে না। সকালই তো হয়ে আসলো।’

ভেতরে ভেতরে প্রমাদ গোনে অচিন, বলে কী কবিরাজ! আজ ঘুমানোর দরকার নেই? তোমার দরকার না থাকতে পারে ভাই কিন্তু আমার তো আছে! মনে মনে গজগজ করতে লাগল অচিন। সকাল হতে আরো প্রায় তিন ঘণ্টার মামলা। এতক্ষণ ও এই শক্তপোক্ত কাঠের চেয়ারটার মধ্যে বসে থাকবে? মাঝে মাঝে একটা দুটা মশা পায়ে স্টিমরোলার চালাচ্ছিল। শেষে এবার সোজাই বলে বসল, ‘কবিরাজভাই একটু যে ঘুমাতে হয়!’ কবিরাজ যেন কথাটা শুনেও শুনল না। নিশ্চুপ হয়ে রইল। ‘আপনার ঘরে একটু জায়গা হবে না? বাকি রাতটুকু আর কী, কোনোমতো!’ কবিরাজ তবু থম। হলো কী মানুষটার? এমন করছে কেন? অচিনের ঘুমের ঘোর কাটতেই চায় না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেও ও ভাবতে লাগল, কবিরাজ আসলে কী চায়? ওকে কি ঘরে কোনো কারণে জায়গা দিতে চাচ্ছে না? কী সেই কারণ? ঘরে স্থান সংকুলান নেই। আরে আমাদের টাউনের বাড়িতেও তো হঠাৎ অতিথি এসে হাজির হয়। আমরা থাকি না? মাথা গোঁজাগুঁজি করে হলেও তো কাটিয়ে দিই একসঙ্গে। আর, তোমার তো বাবা বিশাল গ্রাম, নাইবা নেই তোমার ঘরে বারান্দা, মেঝে তো আছে! কোনোমতো একটা পাটিটাটি বিছিয়ে দে না বাপ! রাতটা কাটিয়ে দিই। তোর কি বাবা একটুও ফিলিংস নেই? যার উদ্দেশে মনে মনে এসব খেদ-অভিমান, সে তখন কাঁচমাঁচু হয়ে মাথা গুঁজে রেখেছে দুহাঁটুর মাঝখানে।

শোয়ার আশা যখন একরকম ছেড়েই দিলো অচিন, তখনই কবিরাজের বউ বেরিয়ে এলো ঘর থেকে, আগের সেই সংকোচটুকু এখন নাই, ‘ভাই রে ঘুমাইতে দিবেন না? ভাই ঘরে এসে একটু ঘুমায়ে নেন।’ কবিরাজ সঙ্গে সঙ্গেই ওর প্রস্তাব সসংকোচে নাকচ করে দিলো, ‘না না। ঘুমান লাগবো না! রাইত বেশি নাই।’ কবিরাজের বউয়ের কণ্ঠে প্রতিবাদ, ‘হ। টাউইন্না মানুষ। সারারাত বাইরে বসে থাকবো! আসেন ভাই। ঘরে আসেন।’

ঘরের মানুষটার এই ডাক উপেক্ষা করতে পারল না অচিন। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল। ছোট্ট সেই দরোজা দিয়ে কোনোমতে মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল। আর ঘরে ঢুকতেই গরুর চনার তীব্র একটা গন্ধ নাকে ধক করে ধাক্কা মারল। সবিস্ময়ে দেখল পুরো ঘরের মেঝেতে খড় বিছানো। একপাশে দুটো গরু। একটা গাভি আর গাই। ওরাও মনে হয় এই গভীর রাতের অনাহূত অতিথির আগমনে জেগে উঠেছিল। অলস ভঙ্গিতে গাভিটা জাবর কাটছে। কবিরাজ ভাঙা-ভাঙা গলায় বলল, ‘কী করুম ভাই। গরুচোরের যে কী অইত্যাচার! বাইরে রাখলেই চুরি হয়ে যায়। আপনের কী আর ঘুম হবে!’ ‘না না। কোনো অসুবিধা নাই।’ অচিন কবিরাজের সংকোচ তাড়ানোর চেষ্টা করল।

টিমটিম করে একটা হারিকেন জ্বলছে। একপাশে ছোট নড়বড়ে চৌকিতে বুঝি ওরা তিনজন ঘুমায়। সে-সাইডে কবিরাজের ছেলের পাশে জায়গা দেওয়া হলো অচিনকে। চৌকির পাশ ঘেঁষেই বাঁশ দিয়ে আরেকটা বিছানার মতো জায়গা বানানো। সেখানে কবিরাজ ওর বউকে নিয়ে শুলো। শোয়ার পরই শুরু হলো ওর আফসোস, ‘ইস ভাই রে যে আজ কী কষ্টের মধ্যে ফেললাম! শহরে কী সুন্দর দালানকোঠার মধ্যে থাকে।’ অচিন কবিরাজকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়, ‘আপনে চুপ থাকেন তো। আমার সবরকম পরিবেশেই ঘুমানোর অভ্যেস আছে।’

সত্যিই কি আছে? জীবনে কখনো তুমি কুঁড়েঘরে রাত কাটিয়েছ? তোমার দৌড় তো বড়জোর টিনের ঘর পর্যন্ত। তারপরও টিনের ঘরে থাকতে তোমার কতরকমের বায়ানাক্কা। শীতের দিনে থাকলে অতিরিক্ত শীতে ঠান্ডা লেগে যায়, গরমের দিনে থাকলে অতিরিক্ত গরমেও ঠান্ডা লাগে। লাগবেই তো! তুমি যে শহরের দরদালানের নন্দপুতুল! সে-কারণেই বুঝি শুয়ে ওর যেটুকু ঘুম চোখে ছিল, সেটাও উধাও হয়ে গেল। তাছাড়া গরুর শরীরের একটা গন্ধ তো ছিলই, যে- কাঁথা জড়িয়ে ও শুয়ে আছে, তারও তীব্র গন্ধ এসে মস্তিষ্কে কশাঘাত করছিল। সারারাত এক ফোঁটা ঘুম এলো না। ঘুম এলো, যখন বেড়ার ফাঁক গলে ঘরে রোদ ঢুকেছে, তখন। নিজের অজান্তেই ও সাতসকালে ঘনগভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রইল।

ঘুম ভাঙতেই অচিনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ঘরভরা আলো। বেলা কত হলো কে জানে? সঙ্গে সঙ্গেই ঘড়ি দেখে মন আরো বিষণ্ণ হলো। ১০টা বেজে গেছে। এখনো ও ঘুমিয়ে আছে। মনে পড়ল এখনো একটা থাকার জায়গা ঠিক হয়নি।

অচিন লাফিয়ে বিছানা ছাড়ল। মানুষগুলো সব গেল কোথায়? ব্যাগ হাতে নিয়েই ও বেরিয়ে আসে! আগে তো ডাকবাংলোয় থাকার একটা ব্যবস্থা হোক! তারপর অন্য কথা। দুয়ারেই বসেছিল কবিরাজ, ওর বউ এবং পাঁচ-ছ বছরের ছেলেটা। ওর হাতে ব্যাগ দেখে সবাই একসঙ্গে হইহই করে উঠল। কবিরাজের বউ বলল, ‘ভাই কই যাচ্ছেন? হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে নিন।’ অচিন তাকাল মহিলার দিকে। দারিদ্রে্যর চিহ্ন লেগে রয়েছে সর্বাঙ্গজুড়ে অথচ মনের ভেতরটা কত সমৃদ্ধ, আন্তরিক। ও ভেবে রেখেছিল, তেঁতুলিয়াবাজারে নাস্তা সারবে। কিন্তু ওদের আন্তরিকতার কাছে শেষপর্যন্ত সমর্পণ করতে হলো।

নাস্তা খাওয়া শেষ করেই আবার শুরু হলো দুজনের সেই ভ্যানযাত্রা। একদিন যে-যাত্রায় ওরা চষে বেড়িয়েছে তেঁতুলিয়া থানার পুরো গ্রাম, আপাতত ছুটছে একটু আশ্রয়ের সন্ধানে। কিন্তু সরকারি ডাকবাংলোয় এসেই হোঁচট খেতে হলো। কেয়ারটেকার সোজা জানিয়ে দিলো, সারাদেশে একযোগে জিএমবির বোমাবাজির ঘটনার পর প্রশাসন ডাকবাংলো অতিথিদের জন্য আপাতত নিষেধ করে দিয়েছে, যাতে জঙ্গিরা কোথাও আশ্রয় না পায়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এখানে কাউকে থাকতে দেওয়ার পারমিশন নাই।

অচিন মধ্যবয়স্ক লোকটার হাতেপায়ে পর্যন্ত ধরল, ‘আংকেল! আমাকে দেখে কি আপনার সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে? আপনি যদি থাকতে না দেন, আমি ভীষণ বিপদে পড়ে যাবো। আমাকে তাহলে ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। তেঁতুলিয়ায় আর থাকা হবে না।’ লোকটি রূঢ় গলায় বলল, ‘আপনাকে থাকতে বলেছে কে? দিনের গাড়িতেই চলে যান। দেশের পরিস্থিতি যে কতটা খারাপ বুঝতে পারছেন না? যে- কোনো মুহূর্তে যে-কোনো জায়গায় জিএমবি হানা দিতে পারে। আপনার তো এ-সময়ে বের হওয়াই উচিত হয় নাই।’

আমি ঘটনার ভয়াবহতাকে ঠিক অনুধাবন করতে পারিনি কেয়ারটেকার সাহেব। অচিনের মনের ভেতরে হলাহল বয়ে চলল। যেদিন সারা বাংলাদেশ জুড়ে একসঙ্গে বোমাবাজির ঘটনা ঘটল, আমার অস্তিত্বও প্রবলভাবে নড়ে উঠেছিল। আমি আমার দেশ, আমার মাটি, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। তবু আমি সেই উদ্বিগ্নতার ভেতরেই ছুটে এসেছি বাংলার এই সবুজ প্রান্তে – আমি একটা অ্যাড ফার্মে চাকরি করি, ক্রিয়েটিভ সেকশনে, সেটা ফেলে, স্বাচ্ছন্দ্য ফেলে, বাবা-মায়ের বাঁধন ফেলে। মহানন্দার ডাক শুনে আমি যে কিছুতেই স্থির থাকতে পারি না। তখন শহরের ইট, কাঠ, রড, সিমেন্টের জীবন বড় বেশি অসহনীয় হয়ে ওঠে।

এবার কি তুমি শুধু মহানন্দার টানেই ছুটে এসেছ? আর কিছুর টান কি তুমি অনুভব করো নাই? মহানন্দা তোমার মন ধরে টান দেয়, আর মহানন্দার পারের মানুষ? তারা ডাকে না তোমাকে? এ-যাত্রায় তুমি কার মুখ দেখতে ছুটে এসেছ অচিন? সত্য করে বলো তো একবার! কবিরের বোনের সেই মুখচ্ছবিটা কি তুমি এ-যাত্রায় অন্তত একবারের জন্য হলেও দেখতে চাও না? গোধূলিবেলার সেই কনে-দেখা আলোয়?

সরকারি ডাকবাংলো থেকে নিরাশ হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের ডাকবাংলোর দিকে যেতে-যেতে গোধূলিবেলার কনে দেখা আলোয় দেখা কবিরের বোনের মুখটা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেটা ছিল গত বছরের আগের বছর, তারও আগের বছর, অর্থাৎ তেঁতুলিয়ায় ওর দ্বিতীয় ট্যুরের ঘটনা। বলা যায়, সে-ঘটনার টানেই ওর বারবার তেঁতুলিয়ায় ছুটে আসা। গোধূলির সোনা ধোয়া আলোয় সে মুখটাকে একবার দেখা – বড় বিস্ময়কর বড় বিমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা! ও কী করে  ভোলে!

সেবার তেঁতুলিয়ায় আসার পরের দিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধুর বলে দেওয়া ঠিকানামতো তেঁতুলিয়া বাসস্টেশন থেকে উত্তরদিকের নতুন পাকা রাস্তার পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। বন্ধু বলে দিয়েছিল তেঁতুলিয়ায় যাবি যখন আমার এক বন্ধু আছে কবির। ওর সঙ্গে দেখা করিস। তোর খুব হেল্প হবে। তো, সেটা ছিল সন্ধ্যাবেলা। তবে সন্ধ্যার অন্ধকার একেবারেই নামেনি। কনে-দেখা আলোয় অদ্ভুত মায়াময় হয়েছিল প্রকৃতি। নীল আকাশ আর সাদা মেঘ ঈষৎ লাল, কমলা আর হলুদের আঁচড়ে রঙিন হয়ে উঠেছিল। আর, পথ ছিল প্রায় নির্জন ফাঁকা। সে-পথে যেতে যেতে হঠাৎ সামনে ভেসে উঠলো এক অপূর্ব পূর্ণ যুবতী, যেমন লম্বা, তেমন ভরাট শরীর। চেহারা না দেখেও বোঝা যাচ্ছিল রূপের অন্য বিভূতি।

ও তখন পুরোই রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন থাকা এক যুবা। পেছন থেকে মেয়েটিকে দেখে ওর মনে পড়ে গিয়েছিল দেবী চৌধুরানীকে। শুনেছে অপরূপা সুন্দরী সেই দস্যুরানী এ-অঞ্চলেরই কোনো এক বৈকুণ্ঠপুরে নাকি রাতবিরেতে যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াত। একদিকে যেমন সাহসের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে, অন্যদিকে ভালোবাসার কঠিন পরীক্ষাতেও বারবার উত্তীর্ণ হয়েছে। সেরকমই একটু ভালোবাসার জন্য অচিনের মনে তখন কী যে কাঙালপনা, নিবিড় ঘন সন্ধ্যায় সে-যুবতীকে দেখে হঠাৎই তা আরো বেশি উস্কে উঠেছিল।

মেয়েটিকে ছাড়িয়ে যেতে যেতে একনজর পেছন ফিরে তাকাতেই ওর সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। এ তো সত্যিই দেবী চৌধুরানী! কনে-দেখা আলোর সবটুকু ঐশ্বরিক বিভাই যেন ওর মুখে এসে পড়েছে। সন্ধ্যার ফিকে আলোয় শুধু মনে হলো, এ কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। সৌন্দর্যের কী তীক্ষ্ণতা অথচ সারল্যের প্রতিমূর্তি, যেন কত যুগ-যুগ ধরে চেনা! কত আপন! খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছিল অচিনের, ইচ্ছে করছিল ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটার। সাহস হয়নি। হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল মনের অজান্তেই। নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হচ্ছিল, কথা বলবে কী বলবে না অথবা বললেও কীভাবে শুরু করা যায় – অদ্ভুত গোলকধাঁধা আর মনোবিকারে দিশে হারিয়ে ফেলেছিল তখন। নিজের ভীরুতার কাছে হার মানাটাই যেন ওর নিয়তি। অজানা-অচেনা জায়গা। কোথা থেকে আবার কোন বিপদ এসে হাজির হয়?

কিছুক্ষণ হাঁটার পর থমকে দাঁড়িয়েছিল অচিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুর বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। বিশাল একটা মাঠ সাইজের খলা। তার ওপাশে টিনের চালওয়ালা পাকা ঘর। মিলল তো বটে কিন্তু এটাই যে কবিরদের বাড়ি, নিশ্চিত হয় কীভাবে? মানুষজনের অস্তিত্ব চোখে পড়ল না। তখনই সেই পূর্ণ যুবতী, আশ্চর্য! পাকা রাস্তা ছেড়ে সে খলার দিকেই নেমে এলো। মেয়েটি সে-বাড়ির দিকে যেতে যেতে অচিনকে হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেও দাঁড়াল। অসংকোচেই জানতে চাইল, ‘আপনি?’

চাঁদ ওঠেনি। সন্ধ্যাতারার কোনো আলো এসে পড়েছিল ওর মুখে। সেদিকে তাকিয়ে অচিন কোনো কথা বলতে পারল না। থইথই জোছনা যেন চুঁইয়ে পড়ছে কলাপাতায়। ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘এটা কি কবিরদের বাড়ি?’

‘হ্যাঁ। আমার ভাই। আপনাকে তো চিনলাম না।’

‘আমি এসেছি ঢাকা থেকে।’

‘ওহ্! ঢাকা থেকে?’

ততক্ষণে ওরা নিজেদের অজান্তেই বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। কিন্তু গেটের মুখে এসে অচিন আর সে-বাড়িতে ঢুকল না। কিসের সংকোচে ও পাথর হয়েছিল। মেয়েটি বাড়িতে ঢুকল এবং একটু পরেই ফিরে এসে জানাল, ‘ভাইয়া তো নেই। আপনি বসেন।’ অচিন বলেছিল, ‘না। আজ আর বসবো না। আমি না-হয় সময় পেলে কাল একবার আসবো!’ ‘ভাইয়াকে কী বলব?’ ‘আমি আসলে ওনার এক বন্ধুর রেফারেন্সে এসেছি। কবির সাহেব আমাকে ঠিক ওভাবে চিনবেন না।’ মেয়েটা আর কথা বাড়ায়নি। অচিনও চলে এসেছিল। পরের দিন যাওয়া হয়নি, নিজের মনেই কেমন বাধো-বাধো ঠেকছিল ওর, চেনা নেই, জানা নেই, কী পরিচয় নিয়ে যাবে ও-বাড়িতে, তাছাড়া ও ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল ঘোরাঘুরি নিয়ে। সারাদিন সেদিন চষে বেড়িয়েছে বাংলাবান্ধা। পরদিনই আবার হুট করে চলে গিয়েছিল ঢাকায়। তখন মনটাই এমন অস্থির থাকত যে, ও কখন কী করে বসত, নিজেরও জানা থাকত না।

সেবার ঢাকা ফিরে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়েটার মুখ বিশেষ করে গোধূলিলগ্নের কনে-দেখা আলোয় ওর মুখচ্ছবিটাকে ও কিছুতেই ভুলতে পারল না। সেটা এমন এক ঐশ্বরিক আর রোমাঞ্চকর অনুভূতি যে, তার জন্য আর সবকিছু দূরে ঠেলে দেওয়া যায়। সব মিথ্যে শুধু ওই মেয়েটিই সত্য, ওই মুহূর্তটাই দামি। আশ্চর্য যে, সে-ঘটনার পর এতদিনেও ঢাকায় ওর সঙ্গে আর কোনো মেয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। মা-বাবা কবে থেকেই বিয়ের তাল উঠিয়েছে। অচিন শুধু সময়ের পর সময় চেয়ে নিয়েছে আর পারলে প্রতি বছরই কী এক তীব্র আকর্ষণে ছুটে এসেছে তেঁতুলিয়া। যতবার এসেছে সন্ধেবেলা তেঁতুলিয়া স্টেশন থেকে কবিরদের বাড়ির পথের দিকে আনমনে হেঁটেছে। না, সেই কনে-দেখার আলোর মুহূর্তও যেমন আসেনি, সে-আলোয় ও-মেয়ের মুখটিকেও আর দেখা হয়নি। তবে মেয়েটিকে যে দেখা হয়নি, তা নয়, পরেরবার আবার এসেই কবিরের সঙ্গে দেখা করার উছিলায় ও- বাড়িতে সে গিয়েছে, মেয়েটির সঙ্গে কথাও হয়েছে, নামও জেনেছে ওর – আফরিন।

আচ্ছা, আফরিনকে কি ও বিয়ে করতে চায়? ওকে পাওয়ার জন্যই কি ও বারবার ছুটে আসে তেঁতুলিয়ায়? সম্ভবত না। অচিন টের পায়, তাহলে আফরিনকে নিয়ে ওর ভেতরে যে অদ্ভুত রোমাঞ্চকর এক জগৎ আছে, তা হারিয়ে যেতে পারে – দুর্লভ এ-ঐশ্বর্যকে ও কিছুতেই হারাতে চায় না, বরং তা ঝালিয়ে নিতেই ও বারবার ছুটে আসে এখানে।

না না। আমি তো আফরিনের আকর্ষণে এখানে আসিনি। আমি এসেছি মহানন্দার টানে। মহানন্দার ডাক আমি শুনতে পাই। মহানন্দা আমাকে ডাকে। মাঝেমধ্যেই ডাকে। এখনো ডাকছে। কিন্তু যাবো কী করে! থাকার জায়গাই তো এখনো ঠিক হলো না। সরকারি ডাকবাংলোয় প্রত্যাখ্যাত হয়ে অচিন কবিরাজের ভ্যানে উপজেলা ডাকবাংলোয় পৌঁছাল।

এক-দুবার ডাকতেই ডাকবাংলোর বাইরে বেরিয়ে এলো কেয়ারটেকার আবদুল মালেক। শুকনো, কালো, ভারি গোঁফের সেই মানুষটা। এসেই অচিনকে দেখে নীরস গলায় বলল, ‘ওহ রাতে আপনেই আসছিলেন?’ চেনা মানুষ হয়েও কেমন অচেনা ভাব। অচিনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। অতিকষ্টে সামলাল নিজেকে। আক্ষেপের সুরে বলল, ‘রাতে কী যে কষ্ট পেয়েছি মালেক ভাই। আপনে আমাকে থাকতে দিলেন না!’ আবদুল মালেকও সেই আগের কেয়ারটেকারের সুরে সুর মিলিয়ে বলল, ‘আপনে এই সময়ে কেন বেড়াতে আসলেন ভাই। তেঁতুলিয়া বোমায় একেবারে ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে গেছে। ডাহুক নদীর ব্রিজে কম পাওয়ারের বোমা ফাটছে? প্রশাসন থেকে আমাদের পুরো নিষেধ করে দিয়েছে বাইরের লোকদের না রাখতে। ভাই আপনাকে রাখলেই আমার চাকরিটা চলে যাবে।’

‘কে জানবে বলেন? ওরা কি সব সময় চেক করতে আসে?’ ‘কী যে বলেন! বাতাসের আগে খবর চলে যাবে। এমনেই আমার চাকরির পিছনে লোক লাগছে।’ অচিন তবু হাল ছাড়ে না, ‘মালেকভাই আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না? আপনার এখানে আমি কবার এসে থেকে গেলাম।’ আবদুল মালেক ততই কঠিন দেয়াল, ‘ভাই আপনাকে তো আমি অবিশ্বাস করছি না। কিন্তু প্রশাসন থেকে বলেছে ডাকবাংলোয় কাউকে জায়গা না দিতে! বুঝতে পারছেন? মনে করেন আপনারও যদি কিছু একটা হয়ে যায়! ফ্রাইটের তো বিশ্বাস নাই!’

কোনোভাবেই অচিন আবদুল মালেককে বোঝাতে না পেরে হতাশ বিক্ষুব্ধ হয়ে নিজেকে কবিরাজের ভ্যানে ছেড়ে দেয়, ‘আমি কিছু জানি না কবিরাজ ভাই, আপনি কেমনে কী করবেন! তেঁতুলিয়ায় আমাকে অন্তত তিন-চারটা রাত থাকতেই হবে। এতদূর থেকে এসেছি।’ কবিরাজ ভ্যানের প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে সাহস দেয়, ‘চিন্তা কইরেন না ছে অচিন ভাই। ব্যবস্থা একটা হবেই!’ অচিন অলস ভঙ্গিতে বলল, ‘যারা চিনত তারাই জায়গা দিলো না, অচেনা মানুষরা তো কথাই বলবে না। আপনে কবিরাজ ভাই চললেন কোথায়?’ কবিরাজ চালাতে চালাতেই পেছন ফিরে বলল, ‘রোডস অ্যান্ড হাইওয়েরটায় যাই, হইলে ভাই অইখানেই হবে!’

অচিন চুপ মেরে থাকে। ওর কাছে এখন সমস্ত বিষয়টাই একটা চরম দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। যে তেঁতুলিয়ায় এসে ও যখন-তখন থাকার জায়গা পেয়েছে, ঘুরেছে নিজের মতো যত্রতত্র, সেখানে আজ ও অবাঞ্ছিত! হ্যাঁ, অবাঞ্ছিতই তো! ডাকবাংলো দুটোর একটাতেও আশ্রয় মিলল না, উলটো সবাই ওর দিকে কেমন সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে। ওর গলায় গভীর আক্ষেপ, ‘কবিরাজ ভাই। আপনারা আমাকে এত পর করে দিলেন!’ কবিরাজ ম্ল­ান হাসতে হাসতে বলল, ‘ভাই দেশের যে কী পরিস্থিতি, বুঝেন না? সারা বাংলাদেশে একসাথে বোমা মারল! এইটারে কি মনে করেন! আমগো তেঁতুলিয়ায় তো কেউ ঘর থেকেই বার হয় না।’

শহীদ আইয়ুব আলী সড়ক দিয়ে ভ্যানটা তেঁতুলিয়া বাসস্টেশনে আসতেই ভ্যান থামিয়ে কবিরাজ পেছন ফিরে অচিনের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, ‘অচিন ভাই মির্জাবাড়ি যাইবেন না?’ অচিন ভারি মজা পেল ওর কথায়। আফরিনের কথাটা মনে আছে দেখছি ওর। ও হেসে বললো, ‘আগে থাকার জায়গাটা ঠিক করে নিই। তারপর সন্ধেবেলায় দেখা যাবে!’ কবিরাজ ভ্যানের প্যাডেলে চাপ মারতে মারতে বললো, ‘ও হ। আপনার তো আবার এইটা সন্ধ্যার কেস!’ অচিন হেসে উঠে বলল, ‘দাঁড়ান ভাই। আপনার জন্য সিগারেট নিয়ে আসি। এতবড় দামি কথা বললেন।’

বাংলাবান্ধামুখী রাস্তা দিয়ে ভ্যান চালিয়ে কবিরাজ মহানন্দার বাঁকের সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলোয় যখন পৌঁছাল, তখন রোদের কোমলতা মরে যেতে শুরু করেছে। গরমের একটা ঝাঁঝ ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে। ‘ভাই। আপনে দাঁড়ান। আমি কথা বলে আসি।’ অচিনকে দাঁড় করিয়ে রেখে কবিরাজ একাই ছুটল ভেতরে।

অচিন হাঁটতে-হাঁটতে মহানন্দার পারের দিকটায় দাঁড়ায়। এখানে এই বিশাল উঁচু বাঁকটায় ও যতবারই এসে দাঁড়িয়েছে, মন অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছে। দক্ষিণ দিক থেকে এসে নদীটা একটু  ভেতরের দিকে বাঁক নিয়ে ডাকবাংলোর তীর ছুঁয়ে চলে গেছে উত্তর দিকে। এই বাঁকের মাথায় বড় বড় গাছের ছায়াতলে গড়ে উঠেছে একতলার এই ডাকবাংলো। একটা স্মারক স্তম্ভ না ছিল এখানে? যাতে লেখা আছে উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। কোথায় সেটা? অচিন ধীরপায়ে বাইরের গেট পেরিয়ে ডাকবাংলোর ভেতর ঢুকল। আছে, উঁচু বেদিমূলে স্মারকস্তম্ভটা এখনো আছে, লেখাটাও। তবে কতদিন থাকবে সেটাই প্রশ্ন। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবচিহ্নকে মুছে ফেলার যে চক্রান্ত শুরু হয়েছে, ওরা তো কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট রাখবে না।

যেভাবে সারা বাংলাদেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটাল, বাংলাদেশকে তো ওরা একরকম পঙ্গুই বানিয়ে দিয়েছে। বাংলাভাইয়ের নাম শুনলে আজ দেশসুদ্ধ কাঁপে! ছি, ওয়াক থু! অচিন ঘেন্নায় থুথু ফেললো! নিজেরা যুদ্ধ করে দেশটাকে যারা স্বাধীন করে আনল, তারা আজ সব জুজুর ভয়ে অস্থির। আজ ও তেঁতুলিয়ায় এসে থাকার জায়গা পাচ্ছে না। ঘুরতে হচ্ছে দ্বারে দ্বারে। কে জানে এখানেও ঠাঁই হবে কি-না, ওই তো কবিরাজ আসছে। ওর মুখ দেখেই যা বোঝার বুঝে নিল অচিন। ও স্মারকস্তম্ভ থেকে বেরিয়ে এসে বাঁকের মধ্যে বসলো। কবিরাজ পাশে এসে দাঁড়ায়, ‘ভাই। অনেক বুঝাইলাম। কাজ হলো না। এইখানে আরো বেশি কড়াকড়ি। বলছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও তো এইখানে থাকতে পারমিশন লাগে।’

অচিনের আর কিছুই ভাবতে ভালো লাগছে না। ও দূরে পাহাড় খোঁজে। এখান থেকে তো দার্জিলিংয়ের পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল সেবার। আজ কুয়াশায় ঢাকা। আকাশটাই ঝাপসা অস্পষ্ট। ডানদিকে তাকাতেই চোখে পড়লো অলস মন্থর মহানন্দাকে – কোনো প্রাণ নেই, প্রাণের উৎসব নেই। অথচ পাথর-কুড়ানো মানুষের পদচারণায় এই মহানন্দা সব সময়ই জেগে থাকত। বালুর সেই চড়াটা খাঁ-খাঁ করছে। কতবার ওখানে বসে থেকেছে এই কবিরাজ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে। হেঁটেছে খালি পায়ে। আজ ওখানে যাওয়ার উৎসাহই পাচ্ছে না। কীভাবে পাবে, থাকার জায়গাই তো এখনো ঠিক হলো না। অথচ ঘড়ির কাঁটা ১২টা সেই কখন পেরিয়েছে। কবিরাজই বুদ্ধি দিলো, ‘ভাই আপনে না একবার জ্যামকনে থাকতে চাইছিলেন। চলেন না গিয়া দেখি।’ কবিরাজের কথা শুনে আশান্বিত হয়ে ওঠে অচিন। সেইসঙ্গে একটা আশঙ্কাও জাগে। সেটা তো আবার এখান থেকে অনেক দূরের পথ। সেই শালবাহান ছাড়িয়ে রওশনপুর। ভ্যানে যেতে আসতেই প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে। ওখানেও যদি থাকার অনুমতি না মেলে! তখন তো দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে!

সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলো ছেড়ে কবিরাজ ভ্যান নিয়ে বাংলাবান্ধা-তেঁতুলিয়া সড়কে এসে নামল। তারপর তেঁতুলিয়া বাজার হয়ে ভ্যান চালাতে লাগল পঞ্চগড়মুখী মেইন রোড ধরে। ডাহুক নদীর ব্রিজে এসে ভ্যান থামিয়ে নেমে পড়ল কবিরাজ। গামছায় কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ‘এই জায়গাতেই সেদিন বোমা ফাটাইছিল ভাই। এত জোরে আওয়াজ হইছিল, পুরা গ্রামটাই কেঁপে উঠছিল। সেইদিন যে কী ভয়টাই আমরা পাইছি। ডরে কেউ ঘরতেই বের হয় নাই। গুজব ছড়াইয়া পড়ছিল, পুরো দেশে বলে মেলা মানুষ মারা গেছে। সেইদিনের পর থেকেই ভাই কী যে হইছে, সন্ধ্যা হইলেই মানুষ আর ঘর থেকে বার হয় না। বাইরের লোকজনও আসে না। ঢাকা থেকে মনে হয় সেই ঘটনার পর আপনেই প্রথম আসলেন।’

কবিরাজের কথা শুনতে-শুনতে অচিন জায়গাটা দেখল। বেশ বড় একটা ক্ষত তৈরি হয়েছে ব্রিজটার রেলিংয়ে। সারাদেশটার বুকেই তো লেগেছে এই ক্ষত, বুকের গভীরে গভীরেও। ‘তাই বলে থাকার জায়গাগুলো সব বন্ধ করে দিতে হবে?’ অচিন অভিমানের সুরে বলল। কবিরাজের উত্তর, ‘ভাই, মনে করেন বাইরের মানুষ এসেই তো সব করে! গ্রামের মানুষ কী আর গ্রামের অনিষ্ট করার সাহস পায়? সেই জন্যই মনে করেন এত কড়াকড়ি!’ অচিনের বলতে ইচ্ছে করল, বাইরের মানুষের দোষ কী, আপনি তো কালরাতেই বললেন শাহাব্দির কথা, ওরা কি বাইরের কেউ, এই তেঁতুলিয়ারই তো! বলতে গিয়েও চুপ করে রইল। কী লাভ! বেচারা নিজের মতো না হয় একটা কথা বলেই ফেলেছে।

ভজনপুর পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ৩টা বেজে গেল। অচিন বলল, ‘শালবাহানের হাটে তো আর ভাত খাওয়া হলো না। এখানেই কোথাও খেয়ে নিই।’ সস্তার একটা হোটেলে ভাত খেয়ে জ্যামকনের চাবাগান পেরিয়ে ওরা যখন বাগানবাড়ির গেটের সামনে থামল তখন ভাটি বেলা। সূর্যের তেজ মরে গেছে। অচিন ভেবে রেখেছিল আজ সন্ধ্যাবেলায়ই ও কবিরদের বাড়ির সে-পথ ধরে হাঁটবে, গোধূলি আলোয় খুঁজবে সেই অপার্থিব মুখ! কিন্তু সেটা কি আর সম্ভব হবে আজ? তেঁতুলিয়ায় ফিরতে ফিরতেই তো রাত হয়ে যাবে। রাত তো হবে, কিন্তু রাতে থাকা হবে কোথায়? অচিনের বুকের ভেতরটা তীব্রভাবে জ্বলে উঠল। তোমার যেখানে সাধ তুমি চলে যাও, আমি রয়ে যাবো এই বাংলায় – সেই বাংলাতেই এখন ঠাঁই নেই, একটা মায়ের কোল নেই, একটা নিবিড় আশ্রয় নেই। ওর চোখ দিয়ে জল নেমে আসতে চায়। নিজেকে কোনোমতে সংযত করে। হাঁটে কবিরাজ ভাইয়ের পিছু-পিছু। হয়তো এখানেই মিলে যেতে পারে থাকার জায়গা। আর যদি না মেলে?

কী আর হবে! কবিরাজভাইয়ের বাড়ি তো রয়েছেই! জ্যামকনের বাগানবাড়িতে থাকবে কি? মেইন রোড দিয়ে ঢোকার সুযোগই পেল না। কেউ এসে গেট খুলে দিলো না। গেটের দারোয়ান নিরস ভঙ্গিতে জানাল, ‘বাইরের লোকের থাকার ব্যবস্থা নেই।’ অচিন বলল, ‘আমি তো দুবছর আগে একবার এসেছিলাম। তখন কিন্তু বলেছিলেন থাকা যাবে।’ ‘দুবছর আগের কথা ভুলে যান। এর মধ্যে দেশে অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। এখন মালিকের অনুমতি ছাড়া কাউকে থাকতে দেওয়া হয় না। থানারও নিষেধ আছে।’ ‘ভাই আমি একজন মানুষ থাকলে কারো কী কোনো অসুবিধা হবে!’ লোকটা তিতিবিরক্ত হয়ে উঠল, ‘এত কথা আমরা বলতে পারব না ভাই। আপনে মাথা ঠুকে রক্ত বের করলেও আমাদের কিছু করার নাই। আপনে এখন যেতে পারেন!’ মানে লোকটা ওকে তাড়িয়ে দিচ্ছে! অচিন অপমানটুকু গায়ে সয়ে ভ্যানে উঠে বসল।

কবিরাজের মুখে কথা নাই। যেন সব দোষ ওর। এমন একটা দায়দায়িত্ব নিয়ে চুপচাপ অলসভঙ্গিতে ভ্যান চালাচ্ছে। কী করবে বেচারা! সেই সকাল ১০টা থেকে একটানা ভ্যান চালিয়ে যাচ্ছে। এখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে শুরু করেছে। তেঁতুলিয়া বাসস্টেশনে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে রাত ৯টা-১০টা বেজে যাবে একরকম। আবার যখন ভজনপুরের মেইন রোডে এসে দাঁড়াল ওরা, তখন সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে উঠেছে। কবিরাজ ভ্যান থামিয়ে জানতে চাইল, ‘ভাই এখন কী করবেন? থাকার জায়গা তো মিলল না।’ অচিন নিরুত্তাপ গলায় বললো, ‘আপনার বাড়িতে থাকবো।’

কবিরাজের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ও বোকার মতো হে-হে হাসতে লাগল। ‘কি রাখবেন না?’ সরস কণ্ঠে অচিনের প্রশ্ন। কবিরাজ নিরুত্তাপ গলায় বলল, ‘ভাই থানা থেকে তো বারবার মাইকিং করছে বাইরের মানুষকে আশ্রয় দিলে থানায় ধরে নিয়ে যাবে!’ ‘তাই নাকি?’ ‘হ!’ কবিরাজ আরো কী বলতে চাইল। অচিন নিজের অভিমান লুকাতে পারল না, ‘হ্যাঁ, আমি তো বাইরের মানুষ। আমি তো বাইরেরই মানুষ।’ এরপর ও আরো বেশি স্তম্ভিত হয়ে গেল, যখন কবিরাজ তেঁতুলিয়ার দিক থেকে আসা একটা বাস দেখিয়ে বলল, ‘ভাই আপনে এক কাম করেন। বাসে পঞ্চগড়ে চলে যান। ওখানে অনেক হোটেল পাবেন। এছাড়া কোনো উপায় নাই।’

ওকে তবু দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কবিরাজ তাড়া দিয়ে উঠল, ‘এটাই মনে হয় পঞ্চগড়ের শেষ বাস। ভাই দেরি কইরেন না। উঠে পড়েন।’ ও রীতিমতো অস্থির হয়ে উঠেছে। অভিমানে নাকি অপমানে অচিন আর কথা বলতে পারল না। চুপ করে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে পড়ল বাসে। সিটও পেল একটা জানালার পাশে।

কবিরাজ বাইরে থেকে কী কী সব বলছে, কানে আসছে না অচিনের অথবা ও শুনতে চাচ্ছে না। হঠাৎ দেখল কখন কবিরাজ বাসের মধ্যে উঠে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘ভাই ভাই’ বকতে বকতে ও অচিনের হাতটা ধরে যেন কান্না সামলানোর চেষ্টা করল, ‘ভাই! আমার ঘরে গরুর সাথে আপনারে আমি থাকতে দিতে পারবো না ভাই, আমারে আপনে মাফ করেন!’ বলতে বলতে মুখ লুকিয়ে ও বাস থেকে নেমে পড়ল!

একসময় বাস ছাড়ল। যত বাড়তে লাগল ওটার গতি, অচিনের মনের ভেতরও ততো ওলট-পালট হতে লাগল! ঢাকা থেকে এতদূর এসে গোধূলিবেলার সেই মুখ না দেখেই ওকে চলে যেতে হবে? না না না, এভাবে জিএমবির ভয়ে, যারা এদেশটার জন্ম চায়নি তাদের ভয়ে – কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। অচিন ক্ষ্যাপা ঝড়ের মতো সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গেটের কাছে পৌঁছে ড্রাইভারকে কড়া গলায় নির্দেশ দিলো, ‘বাস থামান। আমি নামবো।’

অচিন বাস থেকে নেমেই দেখল বীভৎস এক অন্ধকার। সেই আদিমতায় দাঁড়িয়ে ও মনে আনতে চেষ্টা করল কনে-দেখা আলোর সেই অপার্থিব মুখটিকে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply