সৈয়দ হক : অনন্যতার সূত্রসমূহ

লেখক:

মোস্তফা তারিকুল আহসান
আজ এখন স্পষ্ট করে, দৃঢ় স্বরে বলা যায় যে, সৈয়দ শামসুল হক বাংলা ভাষার অন্যতম লেখক; এই যুক্তির নেপথ্যে আবেগ কিছুটা নেই তা বলা যাবে না, তবে আমি দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে পারি এ-কথা। তিনি গত হয়েছেন। এখন তাঁর পক্ষে মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। কাজেই আমরা নিরপেক্ষভাবে আমাদের অবস্থান ও মতামত ব্যক্ত করতে পারি। সত্যিকার অর্থে একজন লেখক পৃথিবী থেকে বা তাঁর জনপদ থেকে শারীরিকভাবে বিদায় নেওয়ার পর তাঁর আসল লেখক-জীবনের কাজ শুরু হয় তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে। আমরা রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ দাশের দিকে লক্ষ করলে বুঝতে পারব, কী বিপুলভাবে, কী পরাক্রমে তাঁরা আমাদের মাঝে রয়েছেন, আমাদের সঙ্গ দিয়ে চলেছেন, আমাদের চিন্তাজগতে আসন গেড়েছেন শক্তিমান হয়ে। আমরা তাঁদের এড়াতে চাই না, কেউ চাইলেও পারেন না। আমাদের চারপাশের যাপিত জীবনজাত নানামাত্রিক অভিজ্ঞান ও বিভূতি যেভাবে বিস্তারলাভ করে আমাদের চিন্তাজগৎকে প্রসারিত করে, তাতে ব্যঞ্জনা এনে দেন সৃষ্টিশীল লেখকরা; সেই প্রণোদনা নিয়েই আমরা, সাধারণ মানুষেরা চলতে চাই, গর্ব অনুভব করি, পুলকিত হই কিংবা রোমাঞ্চিত হই। আর এসব সংশ্লেষ আমাদের মানবিক করে তোলে, পশু থেকে আলাদা করে। মরণের
পরেও লেখক যদি সে-কাজটি করতে পারেন তাহলে তিনি সত্যিকারের লেখক। আমি একজন পাঠক হিসেবে মনে করি, সৈয়দ হক সে-কাজটি ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে, তাঁর রচনা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে বিপুল আগ্রহ তা-ই প্রমাণ করে যে, তিনি আমাদের চিৎপ্রকর্ষের মধ্যে আছেন এবং থাকবেন।
আমার ভাবতে ভালো লাগে যে, লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচয় ছিল এবং তাঁর রচনা ব্যাপকভাবে পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। তাই যাঁরা তাঁর কোনো-কোনো পর্বের লেখাকে বাজেয়াপ্ত করতে চান, তাঁদের সঙ্গে আমি সবসময় একমত হতে পারি না। আমিও স্বীকার করি যে, তাঁর লেখার দুর্বলতা খুঁজে বের করা কঠিন কোনো কাজ নয়। সবার লেখায় কিছু-কিছু দুর্বল দিক লক্ষ করা যাবে। তবে তাঁর একটা বড় পর্যায়ের রচনা কিছুই হয় না – এটা বলা অবিবেচকের কাজ বলে আমার মনে হয়। সৈয়দ হকের লেখালেখি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি শক্তিমান মৌলিক কবি এবং লেখক ছিলেন এবং তিনি ছিলেন পরিশ্রমী ও জাত লেখক। লেখাকে তিনি তাঁর ধ্যানজ্ঞানের মধ্যে রেখেছিলেন। বাংলাদেশে তিনি বোধহয় একমাত্র লেখক, যিনি লিখেই বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর সামগ্রিক রচনার দিকে এবং এর বৈচিত্র্যের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কী অসম্ভব কাজ তিনি করেছেন পাঁচ-ছয় দশক ধরে।
আমার সর্বতো মনে হয়েছে, সৈয়দ হক মূলত কবি এবং শক্তিমান কবি। যদিও তাঁর প্রথম গ্রন্থটি ছোটগল্পের অর্থাৎ তিনি কবিতা ও গল্প একই সঙ্গে লিখতে শুরু করেন। সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাচীন মাধ্যম হলো কবিতা। আমাদের ধারণা, সব শাখাতেই কবিতার শক্তি কাজ করে – কখনো পরোক্ষভাবে, কখনো প্রত্যক্ষভাবে। একজন ঔপন্যাসিক হয়তো কবিতা লেখেন না সরাসরি বা আলাদাভাবে, তবে উপন্যাসের পরতে পরতে কবিতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, কবিতা কাজ করে নিভৃতে ফল্গুধারার মতো। আমরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়লে এ-কথার যুক্তি সহজেই খুঁজে পাব। বঙ্কিমের প্রায় সব উপন্যাসে কাব্য এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। কৃষ্ণকান্তের উইল বা আনন্দমঠ কিংবা দুর্গেশনন্দিনীতে আমরা লক্ষ করি, উপন্যাসের আখ্যানবিস্তারে, পরিবেশ উপস্থাপনে কিংবা চরিত্রের বিকাশে কবিতা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। সৈয়দ হকের বেলায় কেউ-কেউ এরকম ধারণা-বশবর্তী হন যে, যেহেতু তিনি কবি, সেহেতু তাঁর উপন্যাস কাব্যাক্রান্ত। কবিতা উপন্যাসকে যেমন সহায়তা করে, তেমনি এর অপরিমিত ও অসচেতন ব্যবহার কথাসাহিত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সৈয়দ হকের বেলায় কেউ কেউ বলেন, তিনি কথাসাহিত্যে ততটা সফল নন। এ-কথার যুক্তি তেমন নেই। কেউ-কেউ স্রেফ আবেগের বশবর্তী বা কখনো অসূয়াবশত বা তাঁর লেখা না-পড়েই এরকম মন্তব্য করেন। প্রথমত, আমরা বলতে পারি, সৈয়দ হকের গল্প-উপন্যাসের সংখ্যা বহুল পরিমাণ। অজস্র লেখার মধ্যে দু-এক জায়গায় দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে তাঁর শিল্পমানসে কথাসাহিত্যের বীজ বা অভিজ্ঞান পরিপূর্ণভাবে না থাকলে তিনি এত বৈচিত্র্যময় ও বিপুল রচনা তৈরি করতে পারতেন না। তিনি কবিতাকে সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। তবে যেখানে কাব্যময়তা যতটুকু দরকার সেটা রেখেছেন। টানটান নামক একটি উপন্যাসে তিনি শিল্পীর মুখে কবিতা ব্যবহার করেছিলেন এবং চরিত্রের প্রয়োজনে। অন্তর্গত নামক উপন্যাসে তিনি কবিতাকে ব্যবহার করেছেন মাধ্যম হিসেবে। সেখানে কবিতা আলাদা সম্ভাবনা নিয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এ-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পরিস্ফুট করার জন্য তাঁর এই প্রয়োগ যে নতুন মাত্রা পেয়েছে তা যে-কোনো পাঠক বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয় দিনের কাহিনী লেখা হয়েছে টানা গদ্যে, বিরতিহীন এই গদ্যকবিতাকে আশ্রয় হিসেবে নিয়েছেন তাঁর নিজস্ব প্রয়োজনে। এর বাইরে আমরা বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ উপন্যাসটি বিবেচনায় রাখতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা। অর্থাৎ সৈয়দ হক কাব্যকে উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন, তবে তাঁর মতো করে, সচেতনভাবে, উপন্যাসের কাঠামোগত বিন্যাস ও বিষয়বস্তুর বিস্তারের দাবিকে সামনে রেখে। আরো একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার যে, বর্তমানে উপন্যাস আর কোনো কাঠামোর মধ্যে পড়ে না, এবং তা হয়ে উঠেছে সর্বগ্রাসী। কাজেই পূর্বতন ধারা অনুসরণ করে গড়মন্তব্য করা যাবে না।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে সৈয়দ শামসুল হক বাবার হাত ধরে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছিলেন; জীবনের অনুভববেদ্য সূক্ষ্ম কিছু কৌতূহলোদ্দীপক ভাষা দিয়ে প্রকাশ করার দীপ্র প্রত্যয় নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন শিল্পীজীবন। বিচিত্র জীবনবিন্যাস আর শৈশবের স্মৃতি মানুষ আর জনপদকে আণুবীক্ষণিকভাবে দেখার দুর্মর লোভ আর অবিরাম প্রসন্ন বিস্ময়ের ঘেরাটোপে বন্দি লড়াকু এক কিশোর কলম তুলে নেয় বাংলা ভাষায় সাহিত্য করার মানসে। আরো পরে, যখন তাঁর অভিজ্ঞান বেশ পুষ্ট, শিল্পের অমোঘ ডাকে তিনি পরাজিত, ঘোষণা দিয়ে ফেলেন, লিখেই বেঁচে থাকব। বাংলাদেশে বা বাংলা ভাষাভাষী কোনো লেখক এরকম দৃঢ়প্রত্যয় আর কখনো ব্যক্ত করতে পারেননি। ততদিনে তিনি বুঝে নিয়েছেন, সাহিত্যসৃজন তাঁর একমাত্র পথ, শিল্পই তাঁর সংসার এবং জীবনের তরঙ্গের দোলায় দোলায়, উপলব্ধির শানুদেশে চলতে-চলতে, তাকে খুঁজে নিতে হবে লেখার মালমশলা।
আমাদের বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে তাঁর মতো নিবেদিত, লেখার জন্য সর্বক্ষণ উৎকণ্ঠিত এবং শিল্পের গতিমান নিরীক্ষায় নিপতিত লেখক দ্বিতীয় কেউ নেই। আমাদের হয়তো এযাবৎ অঙ্গুলমেয় সিরিয়াস লেখক আছেন, তবু তাঁরা সার্বক্ষণিক পাঠক বা লেখক নন। এর সঙ্গে আরো যোগ করতে হবে লেখার মান এবং বৈচিত্র্যকে। সৈয়দ হক বাংলা সাহিত্যের যাবতীয় মাধ্যমে স্বচ্ছন্দে লিখেছেন। এমন কয়েকটি ফর্মে তিনি লিখেছেন, যা তাঁর আগে কোনো বাংলাদেশি লেখক লেখেননি। কাব্যনাটককে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ নাটকের নানা নিরীক্ষা করেছিলেন, নৃত্যনাট্য, নাট্যকাব্য, রূপক ও সাংকেতিক নাটক ইত্যাদি লিখেছিলেন, কাব্যনাটক লেখেননি। সৈয়দ হক কাব্যনাট্য শুরু করেছিলেন অসামান্য সফলতা দিয়ে। নূূরলদীনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, গণনায়ক, এখানে এখন, ঈর্ষা তাঁর সফল কাব্যনাট্য। কাব্যনাট্য লেখার সময় তিনি মৈমনসিং গীতিকাকে আদি পাঠ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। আর এর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন টি. এস. এলিয়টের নাট্যভাবনা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলার হাজার বছরের কাব্যের মধ্যেই নাট্যবীজ লুকিয়ে আছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের নিবিড় পাঠের ফলে এই সত্য তিনি আবিষ্কার করেন। এর প্রয়োগ করেন কাব্যনাট্যে। তাঁর অন্যান্য নাটকও সমানভাবে মঞ্চসফল ও শিল্পোত্তীর্ণ। নাটকে বা অন্য শাখার অনুবাদে তাঁর সফলতা ঈর্ষণীয়। শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ, জুলিয়াস সিজার অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ করেছেন সল বেলোর উপন্যাস শ্রাবণরাজা নামে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার, বিশেষত ইংরেজি ভাষার কবিতা অনুবাদ করেছেন অজস্র। সে-অনুবাদ প্রাণবন্ত এবং তা এদেশীয় পটভূমিতে মিশে গেছে। উর্দু বা ফার্সি ভাষার বিখ্যাত কবিদের কবিতা অনুবাদ করেছেন গোলাপের বনে দীর্ঘশ্বাস নামক গ্রন্থে। অনুবাদ যে কত গতিশীল হতে পারে তা সৈয়দ হকের অনুবাদ পড়লে বোঝা যায়।
আগেই উল্লেখ করেছি, সৈয়দ হক মূলত কবি এবং তাঁর কাব্যশক্তিই চালিত হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথের দুটো প্রবন্ধ রয়েছে – ‘বাঙালি কবি নয়’, অন্যটি হলো ‘বাঙালি কেন কবি নয়’। তিনি বলতে চেয়েছেন, কবি হওয়ার জন্য জীবনে যে-বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতার দরকার হয়, বাঙালির তা নেই। আর সে-কারণে চিন্তা ও কল্পনার গভীরতা খুব বেশি ডানা মেলতে পারে না। সে-হিসেবে আমাদের দেশে সত্যিকারের কবির সংখ্যা কম। জীবনানন্দ তো বলেই ফেলেছিলেন, সকলেই কবি নন কেউ-কেউ কবি। সৈয়দ হক বাংলা কবিতায় বিচিত্র সংযোজন এনেছেন। পঞ্চাশের প্রথম পাদেই সব গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় তাঁর কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতার ফর্ম ও বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি বিস্তর কাজ করেছেন। স্বাভাবিক গড়নের বাইরে তিনি চিত্রধর্মী, এক লাইনের কবিতা, কোরাস জাতীয় কবিতা, দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। এর বাইরে রয়েছে আঞ্চলিক ভাষায় রচিত সনেটগুচ্ছ পরাণের গহীন ভিতর। নিরীক্ষাপ্রবণতার কারণে তাঁর কবিতা কখনো-কখনো স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়েছে, তবে তাঁর নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে অনেক উজ্জ্বল কবিতাও আমরা পেয়েছি, যা বাংলা কবিতাকে ধনী করেছে। কাব্যনাট্যে তাঁর যে অসামান্য অবদান তার মূলেও রয়েছে তাঁর কাব্যপ্রতিভার গভীরতা।
‘হৃদয় যেন। রংগপুরের কনকরঙা মেয়ে/ হঠাৎ সাড়া জাগিয়ে দিয়ে লুকায় পরানপণে’ (‘বুনোবৃষ্টির গান’)। এই কবিতাটি রচিত হয়েছিল পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে। একজন কবি হিসেবে তিনি সমান সতর্ক কবিতা রচনার সময়। তিনি জানেন, কবিতা হলো সেই উত্তীর্ণ পঙ্ক্তি, যা অনুভূতির রাঙা নির্যাস, সতত সঞ্চারিত এবং সংক্রামক। সেজন্য তিনি সব সময় উত্তীর্ণ পঙ্ক্তি রচনা করেন। এটাই বোধকরি একজন শিল্পীর জন্য খুব বেশি জরুরি। এমন কবি বা লেখক আছেন যাঁরা নিজেরা জানেন যে, তাঁরা ফুরিয়ে গেছেন, তাঁদের লেখায় পাঠকের বিরক্তি উৎপাদিত হচ্ছে তবু তিনি লিখে চলেছেন। বাংলাদেশে এরকম অনেকেই আছেন। সৈয়দ হককে সেরকম করতে হয়নি কখনো। তিনি নিজেকেই যেন বারবার অতিক্রম করেছেন। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু যে সবসময় নতুন হয়েছে তা নয়, তবে তিনি নতুনভাবে তাকে উপস্থাপন করেছেন, নতুন বাকভঙ্গি তৈরি করেছেন, নতুন প্রবণতা যোগ করেছেন, সর্বোপরি নিজে বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছেন। বায়ান্ন সালে রচিত কবিতার পাশে ২০১১ সালে প্রকাশিত কাব্য তোমার নক্ষত্র এই রক্তের লোহিতের কবিতা তুলনা করলে বোঝা যাবে এখনো কত তীক্ষè তাঁর অনুভূতির ফলা, কতটা অনুভববেদ্য এখনো তাঁর হৃদয়মানস। বয়সের কোনো ছাপ, বার্ধক্যের কোনো গ্লানিমা তাঁকে স্পর্শ করে না, যেন এখনো টগবগে তরুণ তিনি, আহ্বান করছেন নারীকে প্রথম যৌবনের মতো কোনো দ্বিধা ছাড়াই। এই হয়তো একজন কবির কাছে পাঠকের চিরচাওয়া। প্রবীণের অভিজ্ঞতা নিয়েও কবিতা হতে পারে। তবে হতাশা, মৃত্যু বা পরকাল নিয়ে যে-চিন্তা এসব কবিতার বিষয় করলে তাকে মানসিক বিকার মনে করবেন পাঠক, শিল্পের কোনো বিষয় হিসেবে তাকে বিবেচনা করবেন না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঈশ্বরভাবনা বা জগতের গ্লানি নিয়ে চমৎকার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন কবিতায়। সৈয়দ হক আধ্যত্মিকতা নিয়ে যেহেতু আগ্রহী কম, সেহেতু তাঁর অভিব্যক্তি অন্যরকম। অবিরাম গতিমান আর চঞ্চল এক তরুণ কবি তিনি। তাঁর রচিত নতুন বাক্য বা পদ তাই আমাদের প্রেরণার উৎসাহ হয়ে দাঁড়ায়। পঁচাত্তরতম জন্মবার্ষিকীতে প্রকাশিত কাব্যে (আগে উল্লিখিত) কবি লেখেন : ‘একটি নক্ষত্র ছিলো রক্তের লোহিতে;/ হৃদপি-ে ছিলো সৌরম-লের পুরোটা।/ বেড়াল বিক্ষুব্ধ ছিলো শরীরের ভিতে।/ নখের আঁচড় ত্বকে, ছিন্ন স্তন বোঁটা। তাহলে সমুদ্র ভালো? যে-জলে লবণ!/ যদিও অঢেল সেটি – পানীয় তো নয় হৃদয়ের মূল্য শোধ কে করে এখন? দুষ্ট কেউ? সাধু কেউ? আমিও তো নয়!’ মারা যাওয়ার আগে শব্দঘর পত্রিকায় তাঁর গুচ্ছকবিতা ছাপা হয়েছিল। সেখানেও ক্যান্সারের মরণকামড় বুকে নিয়ে তিনি লিখেছেন উত্তীর্ণ চরণ। বোঝা যায়, কবির শক্তি আর সুষমার সাযুজ্য মৃত্যুর কিছু আগেও সমানভাবে সক্রিয় ছিল। তিনি লিখেছেন, ‘সবার ভেতরেই নিঃসঙ্গ একটি প্রণালী আছে,/ শব্দহীন বহে যায় তার জল,/ তাকেই শব্দিত করা -/ একেই কী বলে কথা বলা!/ নাকি জলের পরিণতিই এই -/ যুক্ত হবে সে অন্য কোনো প্রণালীর জলে।/ কে জানে! এই ভাবে বহে যেতে যেতে/ নিজেদের নিঃসঙ্গ ভেতরে -/ সিন্ধুচিল ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখি;/ দেখি, তার ডানার তলায়/ স্বর্গের থেকে উড়ে আসা নাছোড় একটি ছবি -/ রোগবৃক্ষের সবুজ শব্দ শাখায়/ এখনো ঝুলে আছে সূর্য -/ অস্ত সে যাবে না কিছুতে।’ বোঝা যায় শব্দবোধ আর শব্দযোজনায় কত পারঙ্গম ছিলেন তিনি এবং এমন একটা উচ্চতায় তিনি কবিতাকে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, কবিতা তাঁর কাছে সহজে ধরা দিত সব সময়।
তিনি প্রধানত কবি হলেও তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ তাস ছিল একটি গল্পগ্রন্থ। তাঁর আগে চল্লিশের দশকে অনেকে কথাসাহিত্য রচনা করেছেন, তবে বাংলাসাহিত্যের অন্য কথাসাহিত্যিকদের তুল্য বিচারে মুসলিম সাহিত্যিকদের রচিত সাহিত্য দুর্বল ছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। কাজেই সৈয়দ হককে কথাসাহিত্যে নতুন বন-বাগান তৈরি করতে হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘বন কেটে চলেছি।’ সত্যিকার অর্থে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম জাতির চিন্তা-চেতনা, গ্রাম সমাজ সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র আকারের নগরায়ণ, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব, ইসলামি চেতনা – এসব গতানুগতিক বিষয়কে পাশ কাটিয়ে তিনি বাংলাদেশের উপন্যাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেন নতুন বিষয় ও আঙ্গিক রীতিতে। অচেনা, আনু বড় হয়, এক মহিলার ছবি, সীমানা পেরিয়ে তাঁর সে-সময়ে রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। পরবর্তীকালে এই রচনাধারাকে তিনি বহগুণে বিবর্ধিত করেছেন নিজস্ব রচনাশৈলীতে। বাংলাদেশের সামগ্রিক জনজীবন, আচার-আকাক্সক্ষা ও আধুনিকতার সমন্বয়ে তিনি অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এ-শাখায়।
সাহিত্যের বিচিত্র বিষয়, চরিত্র ও রচনাভঙ্গি তৈরি করার নেপথ্যে তাঁর কর্মপ্রয়াস লক্ষ করার মতো। তাঁর নিজের কথায়, ‘এমন কোনো পূর্ণিমা নেই যে বেরিয়ে পড়ি না।’ আপাতভাবে মনে হবে, তিনি নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত এবং গ্রামীণ জীবনে অভিজ্ঞতাহীন। বস্তুত, বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল বা জনপদ নেই যেখানে তাঁর পদধূলি পড়েনি। মূলত তিনি লেখক, দ্বিতীয়ত তিনি পর্যটক। শুধু নিজ দেশ ভ্রমণের নেশা তাঁকে চঞ্চল করে তোলে না, মূলত সারা পৃথিবী তাঁর ভ্রমণের ক্ষেত্র। তাঁর এই অভিজ্ঞতাকে তিনি শিল্পময় করে তুলেছেন তাঁর গদ্য রচনায়। এখানে ব্যক্তিজীবনের কথাও তিনি বলেছেন অভিজ্ঞতার সারাৎসার হিসেবে। বিচিত্র মানুষ আর জনপদ নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার শব্দশিল্প হিসেবে আমরা পেয়েছি বাংলার মুখ ও হৃৎকলমের টানে গ্রন্থ। হৃৎকলমের টানে গ্রন্থে অসাধারণভাবে তিনি তাঁর সমাজ ও ব্যক্তি-নিষিক্ত অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করেছেন। এখানে তাঁর শিল্পবোধ, এমনকি নিজের লেখালেখি সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। অসাধারণ বাক্যবিন্যাস আর অনুভবের সূক্ষ্ম কারুকার্যময় উপস্থাপনায় এই রচনাটি বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা রচনা হিসেবে স্বীকৃত হবে। বাংলা ভাষা যে কত শক্তিশালী এবং তা সৈয়দ হক কত শক্তিশালীভাবে ব্যবহার করতে পারেন তার প্রমাণ এই গ্রন্থ। আত্মজীবনীমূলক লেখা প্রণীত জীবনে রয়েছে তাঁর শিল্পজীবনের কিছু স্মারক, যা তাঁকে কবি করে তুলেছিল তার হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা। তাঁর লেখক-জীবন তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। বাংলাদেশের সামগ্রিক আচার-আচরণ বোধ, বিশ্বাস, সংস্কার ও প্রবহমান বাঙালির সংস্কৃতির গভীর পাঠ পাওয়া যায় কথা সামান্যই গ্রন্থে। মার্জিনে মন্তব্য, গল্পের কলকবজায় তিনি ছোটগল্পের শৈলী ও গঠন সম্পর্কে যে-বর্ণনা দিয়েছেন তা অসাধারণ। বাংলা বাক্যের গঠন নিয়ে তিনি অনেক নিরীক্ষা করেছেন। যতি চিহ্নের অজস্র ব্যবহারে, দীর্ঘ বাক্যের ব্যবহারে চিন্তার গভীরতা ও বৈচিত্র্য কীভাবে প্রকাশ করা সম্ভব সেটা সৈয়দ হকের গদ্য না পড়লে বোঝা যাবে না। এই অন্যরকম গদ্য নিয়ে কেউ আপত্তি তুলতে পারেন, তবে এটা যে একটা নতুন ও অসামান্য রচনাভঙ্গি এবং তা পাঠককে যে প্রচ-ভাবে আকর্ষণ করে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা ভাষা যে কত সমৃদ্ধ এবং তার গদ্য যে কত বৈচিত্র্যময় হতে পারে সেটা সৈয়দ হকের রচনা পড়লে বোঝা যাবে।
সৈয়দ হক জীবনের সব অলিগলিসন্ধিতে ঢুকেছেন – একজন সৎ শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা তাঁর সৃষ্ট চরিত্র আবার চোর, বেশ্যা, দালাল, জাদুকর, রাজাকার, বাজিকর, লম্পট, খুনিও তাঁর হাতে গড়া চরিত্র। ফলে একজন বাবর আলিকে দেখে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই, তারা এ-সমাজেরই অংশ। ফলত তারা শিল্পের উপাদান। বাজারসুন্দরী, বনবালা, পরান মাস্টার – সবাই এক লাইনে ভিড় করে উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে। বাংলাদেশের ছোটগল্পে যাঁরা বিষয় ও প্রকরণ নিয়ে কাজ করেছেন, উত্তীর্ণ মানের গল্প লিখেছেন সৈয়দ হক তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি প্রচল ধারার বাইরে লিখেছেন বরাবর। রোমান্টিক গল্পে তাঁর আগ্রহ কম, যা দু-একটা লিখেছেন তা ব্যতিক্রম। ‘রুটি ও গোলাপ’ নামে তাঁর অসাধারণ প্রেমের গল্প রয়েছে। দুর্ভিক্ষপীড়িত উত্তরাঞ্চলের মানুষকে নিয়ে অসাধারণ কিছু গল্প (‘কোথায় ঘুমাবে করিমন বেওয়া’, ‘পূর্ণিমায় বেচাকেনা’, ‘কালাম মাঝির চড়নদার’, ‘প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান’) লিখেছেন। আঞ্চলিক-ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের কারণে ও লোকজ সংলাপের জন্য তাঁর গল্পগুলো বিশ্বাস্য হয়ে উঠেছে। জলেশ্বরীর গল্পগুলো গ্রন্থে তিনি কুড়িগ্রাম অঞ্চলের জীবন ও জনপদ এবং মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করেছেন। এই পর্বের গল্পের বর্ণনাকৌশল সম্পূর্ণ নতুন। লক্ষণীয় যে, বহুবচনে প্রেক্ষণবিন্দু ব্যবহার করে বিরতিহীন বর্ণনার এই শৈলী পরবর্তীকালে অনেকেই ব্যবহার করেছেন সৈয়দ হকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। এখানেও উত্তরবঙ্গ ও মুক্তিযুদ্ধ অন্যতম বিষয়। গল্পকথকের বর্ণনাভঙ্গি ব্যবহারে স্বতন্ত্র ধারা তিনি প্রবর্তন করেছেন। ‘আমার বন্ধু আবদুল খালেক’ সিরিজের গল্পে ঢাকা শহরের জীবন ও সংস্কৃৃতির গভীর প্রচ্ছাপ লক্ষ করা যাবে। ঢাকা শহর নিয়ে তাঁর অবশ্য আলাদা একটি কাব্য রয়েছে (আমার শহর)। লক্ষ করার ব্যাপার যে, প্রধানত কবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গল্প-উপন্যাস বা, নাটক কাব্যাক্রান্ত নয়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় বা নূরলদীনের সারাজীবন প্রভৃতি অসাধারণ নাটক রচনার বেলায়ও তাঁকে আমরা সফলভাবে পেয়েছি।
উপন্যাসে তাঁর সমৃদ্ধি, বৈচিত্র্য, বৈভব ও মান উত্তীর্ণ পর্যায়ের। প্রকরণ, বিষয়বস্তুর বৈভব বাংলাদেশের আর্থ-সামজিক রূপান্তর নিয়ে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি তাঁকে নতুন ধারার উপন্যাস লিখতে সহায়তা করেছে। বাল্যস্মৃতি, উত্তরাধিকার, গ্রামীণ পারিবারিক চিত্র ও তৎকালীন সমাজ নিয়েও তাঁর অনেকগুলো উপন্যাস রয়েছে (অচেনা, অচিন্ত্য পূর্ণিমা, আনু বড় হয়, স্তব্ধতার অনুবাদ, মহাশূন্যে পরান মাস্টার)। এগুলোর কথা বাংলাদেশের অধিকাংশ পাঠক জানেন না। ব্যক্তিমানুষের টানাপড়েন, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, অভাব-দারিদ্র্য, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিনষ্ট সময় তাঁর উপন্যাসের মৌল বিষয় (এক যুবকের ছায়াপথ, টানটান, দূরত্ব, ত্রাহি, জেসমিন রোড, এক মুঠো জন্মভূমি, আলোর জন্য, শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ, ইহা মানুষ)। এর বাইরে নর-নারীর সম্পর্ক, প্রেম, রিরংসা, জৈবিক টানাপড়েন, শ্লীল-অশ্লীল জীবনবোধ তাঁর উপন্যাসকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তিনিই প্রথম সাহসের সঙ্গে বাংলাদেশে নর-নারীর জৈবিক সম্পর্ককে শিল্পের মর্যাদায় উত্তীর্ণ করেছেন।
কবি, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, ছড়াকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ইত্যাদি যে-কোনো মাধ্যমে তিনি গিয়েছেন, সফলতা পেয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ। তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় সত্য দুটো; এক. তিনি বাংলা গদ্য ও পদ্যকে যত বিচিত্রভাবে ব্যবহার করেছেন তা দুর্লভ। আমাদের ঈর্ষা হয় তাঁর বাক্যবিন্যাস-শব্দবোধ ও তার ব্যবহার দেখে। দুই. তিনি কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেননি। অনবরত নতুন পথ তৈরি করেছেন। প্রতিটি মাধ্যমে তাঁর লেখা মানে নতুন শৈলীতে নতুন বিষয়বস্তুর সন্ধান দেওয়া।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, প্রগতি, সামগ্রিক জীবনানুভূতি, সমাজ-সংলগ্ন জীবনাচরণ, মানবপ্রতীতি এবং অবিরাম পরিবর্তনীয় সমাজকাঠামোর তিনি অসাধারণ পর্যবেক্ষক এবং তার রূপায়ণ করেছেন নিজস্ব শব্দচয়নে। বাঙালির প্রতিটি শিল্প-চেতনায়, সংগ্রামে মিশে আছে তাঁর লেখা। সৈয়দ শামসুল হক গত ২৭ সেপ্টেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন; তাঁর বিচিত্র আর বিপুল সৃষ্টিযজ্ঞ রেখে গেছেন আমাদের কাছে। তাঁর মুক্ত ও স্বাধীন চেতনা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নজাত আকাক্সক্ষা মিশে আছে লেখায়। স্বাধীনতা- পরবর্তী বাংলাদেশ গঠনের দীপ্ত অঙ্গীকার ও পথনির্দেশনা পাওয়া যায় তাঁর রচনায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋব্ধ তাঁর সাহিত্য আমাদের সামনে চলার প্রেরণা দেবে সতত। সব্যসাচী এই লেখককে এ-জাতি মনে রাখবে তাঁর কবিতা, নাটক, কথাসাহিত্য এবং অন্যান্য রচনার মধ্য দিয়ে, যা তাদের বারবার প্রাণিত করে। 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার