স্মৃতির ছায়াপাত

শাহীন আখতার

\ ৮ \

 

পরিবারের সোনালি ইতিহাস

সেই সফরের কিছুই মনে নেই নীহার বানুর। এর কারণ হয়তো এটি সাবিনার গল্প। সাবিনা বলেও সে-কথা। কিন্তু নীহার বানু তা মানতে নারাজ। একই দিনে দু-দুটি বিষয় মন থেকে লোপাট হয়ে গেল! কবিতা মানুষ ভুলে যেতে পারে, তা বলে নিজের জীবনের ঘটনাও! এমন নয় যে, তিনি তখন কথায়-কথায় ঢাকা ছুটতেন। ওটা হয়তো ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ঢাকা সফর। তাছাড়া কালেভদ্রে যেতেন সায়মা খাতুনের সঙ্গে শ্বশুরকুলের কোনো আত্মীয়ের বাড়ি। একবার কেরায়া নায়ে করে তাঁরা যান দ্বীপের মত এক জলভাসা গাঁয়। বাড়িটাতে পোস্ট অফিস ছিল। আর ছিল বিস্তর নারকেল-সুপারি গাছ। পথে পড়েছিল বেহুলার লোহার বাসর, চান সওদাগরের জলমগ্ন মহাল। তখন অবশ্য নিয়মিত বাপের বাড়ি নাইয়র যেতেন নীহার বানু – বর্ষাকালে নৌকায় আর সুদিনকালে মোটা চাদরে ঘেরা রিকশায় চেপে।

আম-কাঁঠালের দিনে হাশমত বানুও বাপেরবাড়ি নাইয়র আসত। স্বামীর সঙ্গে মফস্বল শহরে থাকত হাশমত। স্বামী অফিসে চলে গেলে ওর আর কাজ কী। ছেলেকে দোলনায় দোলাতে-দোলাতে গ্রামোফোনে গান শোনো, বই পড়ো। শরৎচন্দ্র শেষ করে হাশমত তখন রবীন্দ্রনাথ পড়ছে। নীহার বানু তো গত ছ-মাস শরৎচন্দ্রের পথের দাবি নিয়েই পড়ে আছেন। স্বামীর দেওয়া উপহার। হাতে তুলে দেওয়ার সময় বলেছিলেন – বইটা পড়লে তাঁকে জানা হবে। বিশেষত কেন তিনি ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দেশান্তরি হলেন, আজাদ হিন্দে যোগ দিলেন, মিত্রবাহিনীর গু সাফ করলেন, জেল খাটলেন। নীহার বানু বইটা নিয়ে গর্বিত ছিলেন। লোকজনকে বলতে চাইতেন – তাঁর স্বামীকে নিয়ে লেখা শরৎচন্দ্রের বই! কিন্তু হাশমত বানু ছাড়া এর মর্ম কে বুঝবে! দিনেরবেলা হাড়ভাঙা খাটুনির পর বই হাতে রোজ বিছানায় যেতেন। এক পাতা পড়ার আগেই চোখের পাতা জুড়ে ঘুম।

সেবার হাশমত বানু পালকির পর্দা সরাতেই পথের দাবি হাতে সামনে দাঁড়ান নীহার বানু। বাস থেকে নেমে পাক্কা এক ঘণ্টা জানালাবিহীন পালকিতে। হাশমতের বাচ্চাটা গরমে ট্যাঁ-ট্যাঁ করছিল। পালকি থেকে নামার সময় বোনের হাতের বইয়ের দিকে একঝলক অবজ্ঞাভরে তাকায় হাশমত। তারপর বোরকা না খুলেই পুত্রকে বুকের দুধ দিতে ঘরের দরজায় মোড়া টেনে বসে যায়। বোনের এ-দেখনপনা শেলের মত বেঁধে নীহার বানুর বুকে। মাত্র এক বছর আগে-পরে শাদি হলেও বড় বোনের কোলজুড়ে পুত্রসন্তান। তাঁরও তো বিয়ে হয়েছে বছর গড়াল। বই পড়া, ছেলে বিয়োনো – সব কিছুতেই তিনি পিছিয়ে থাকবেন! খোদার এ কেমন বিচার! অবশ্য বিয়ের সময়ই মামা-খালারা বলাবলি করছিল – পাত্র যুদ্ধফ্রন্টে ছিল এত বছর। শরীরে গোপন রোগ-ব্যারাম থাকাটা আশ্চর্য নয়। তখন কে শোনে কার কথা। মেয়ে তো শাদির জন্য পাগল। হাজি চানেরও তর সইছিল না, আবিয়াতা কন্যার বয়স নিয়ে চারদিকে হাসাহাসি, কানাকানি, তাই অনুষ্ঠানাদির আগেই ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া বলে কলমা-কবুল পড়িয়ে ফেলেন।

স্বামীর গোপন ব্যাধির আতংকটা নীহার বানুর মনে ফের জাঁকিয়ে বসে, যখন তাঁর বড় ছেলে অসুস্থ হয়ে ইউনিভার্সিটির হোস্টেল থেকে বাড়ি চলে আসে। তখনো রোগ শনাক্ত হয়নি। খাওয়ায় অরুচি। রাতে ঘুষঘুষে জ্বর। সন্ধ্যায় ফের জ্বর আসতে দেখলে নীহার বানুর বুকটা কেঁপে উঠত – ছেলের শরীরে কি বাপের সেই গোপন-ব্যাধি! বাপ তো সুস্থদেহে দিব্যি চড়ে-ফিরে বেড়াচ্ছে। বিয়ের পর একবার সর্দিজ্বর ছাড়া আর কোনো বিমারিই হয়নি। মাস-দুই পর ছেলের রোগ শনাক্ত হল – বস্নাড ক্যান্সার। এ গোপন ব্যাধি নয়, নিদারুণ সরব। রোগী আর মাস-ছয় টেকে কিনা সন্দেহ। নীহার বানু যখন ঢাকায় বাসা ভাড়া করে ছেলের চিকিৎসা করাতে চলে যান, তখন সাবিনা নেহাতই শিশু। স্কুলের নিচের ক্লাসে পড়ে তখন। বছরখানেক আগে সায়মা খাতুন মারা গেছেন। তাদের দেখভাল করতে দূরসম্পর্কের যে মামি আসেন তখন, তিনি ছিলেন ভয়ানক কড়া ধাঁচের মানুষ। খুব খাটাতেন রোখসানাকে। ও ছাই ডলে মাছ কাটতে শেখে তখন, যা ভবিষ্যতে ওর কোনো কাজেই লাগেনি। অবশ্য হারিকেনের চিমনি মাজতে বসে ঘনঘন যে হাত কাটত, সে থেকেই রোখসানা নিজে-নিজে আঙুলে ব্যান্ডেজ বাঁধতে শেখে তখন। সাবিনার বেলায় সে-রকম লাভ-লোকসানের বালাই ছিল না। মহিলার ভয়ে ও আগেভাগে স্কুলে চলে যেত আর ছুটির পরও খেলাধুলার নাম করে অনেকক্ষণ থেকে যেত ওখানে। হাসপাতাল থেকে বড় ভাইয়ের চলে আসার দিনও সাবিনা বাড়ি ফেরে দেরি করে। ও ঘরে ঢোকার মুখে বই-খাতা হাতে দাঁড়িয়ে পড়ে – মোয়াজ্জেম হক উঠানের কোণের কামরাঙা গাছতলায় বেস্নড দিয়ে ছেলের মাথা মুড়িয়ে দিচ্ছেন। পুরনো খবরের কাগজে কুচকুচে কালো চুলের ওপর রক্তের ফোটার মত ছোট-ছোট লাল ফুল। কেমো থেরাপির জন্য এমনিতেই মাথার চুল ঝরে পড়ছিল বালিশে-খাবারে, অসহায়ভাবে তা চেয়ে-চেয়ে দেখার চেয়ে আগেভাগে তাই এ ব্যবস্থা। ফুলের ভারে নত কামরাঙা গাছটা স্কুলে পড়তেই লাগিয়েছিল বড়ভাই। বিল্ডিংয়ের ভিত গাড়ার সময় গাছটা কাটা পড়লে নীহার বানু খুব কেঁদেছিলেন। যে-মাটির ঘরটা সেদিন পড়ন্ত বেলায় বড়ভাইয়ের কেশহীন চাঁদিতে ছায়া দিয়েছিল, সেটিও সে-সময় ভেঙে ফেলা হয়।

মেজোভাই ফোনে সাবিনাকে বলেছিলেন, চেম্বারে রোগী দেখার ফাঁকে যখন জানালার পর্দা সরিয়ে তুষার পড়া দেখেন, বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। তখন কোন বাড়ির চেহারাটা ভেসে ওঠে তাঁর চোখের সামনে? সাবিনা প্রশ্নটা নোট বইয়ে টুকে রাখে। ব্যস্ত সার্জেন। তবু ফোন করে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। এবার বাবা-মায়ের বিপি, সুগার, কোলেস্টেরলের চার্ট আপডেট করে রেখেছে সাবিনা। এসব তথ্য সরবরাহের পর যখন জানতে চাইবেন – বাড়ির দেয়াল রং করাতে হবে কি না, দেশে এবার সময়মত ইলেকশন হবে তো, লোডশেডিংয়ের অবস্থা কেমন – তখনই ভাইজানকে প্রশ্নটা করতে হবে। নাকি আববাকে নিয়ে বই লেখা কতদূর – এ-প্রসঙ্গে আসবেন যখন, তখন?

 

কটা মাত্র সিঁড়ি, তা উতরাতেই সাবিনার পা ধরে আসে। নীহার বানু তখনো ডাইনিং টেবিলে হাত ভাঁজ করে বসে আছেন। গালে কান্নার দাগ। সাবিনা ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালায় না। মাথার কাছের জানালাটা খুলে দেয়। দশটাও বাজেনি, মনে হয় গহিন রাত। দূর থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসে, যা শুনলে এখনো ওর গা ছমছম করে। মনে পড়ে মেজোভাই টর্চ হাতে আম্মাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। সাবিনা স্বপ্নে-হাঁটা মানুষের মত ঘোরলাগা চোখে অন্ধকারে যায় তাঁর পেছন-পেছন হয়তো সবার অজান্তে। শোকের বাড়ি, তখন কে কার খোঁজ রাখে! মেজোভাই টর্চ জ্বালাতে কালো-কালো ছায়ার মত শিয়ালগুলো জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। বড় ছেলের ভাঙা কবরের পাশে খোলা চুলে বসে আছেন নীহার বানু। আরেকবার টর্চ টিপতে আলোটা তাঁর মুখের ওপর পড়ে সরাসরি। সঙ্গে-সঙ্গে চোখের খোদলে যেন দুটি জোনাক পোকা ধপ করে জ্বলে ওঠে। সাবিনার আর কিছু মনে নেই।

তার পরের কিছুদিন যমে-মানুষে টানাটানি। সাময়িকভাবে নীহার বানুর গোরস্তানে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সাবিনার অচেতন চেহারার দিকে শুষ্ক চোখে তাকিয়ে হয়তো ভাবতেন, মৃত সন্তানের চেয়ে জীবিত সন্তানের দাবিই বেশি, যা মা হয়ে অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়। হয়তো ভাবতেন না কিছুই। মেয়ের শিয়রে বসে তক্কে-তক্কে    থাকতেন। তারপর অমাবস্যার রাতগুলোতে তাঁকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখলে খাঁচাবন্দি সিংহের মত গর্জাতেন মোয়াজ্জেম হক। তখন কোনো এক বুঝদার তাঁকে উপদেশ দিয়েছিল – মাটির দেহ মাটিতে মিশে গেলে মা আপনিই সংসারে ফিরবেন। আরেকটা সেয়ান ছেলে আছে না ওঁর! কিন্তু নীহার বানু সংসারে ফিরলেও মেজোছেলের পাশেই ছায়ার মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতেন বড় ছেলেকে। যে ছায়া হয়েও মায়ের কাছে কায়ার ওপর জিতে থাকত।

‘দারিদ্র্য হচ্ছে কার্স, অভিশাপ, বুঝলেন আম্মা!’ মোয়াজ্জেম হকের দিকে ইঙ্গিত করে বলতেন মেজোভাই। আসল কথা – বাবা পাশ করা ডাক্তার হলে ছেলেকে ছেঁড়া শার্ট রিফু করে ক্লাসে যেতে হতো? মেডিকেলের পড়ার ভয়ানক খাটুনি। অথচ টিনের দুধ কেনারও পয়স নেই। ছেলের কথায় নীহার বানু খুব বিরক্ত হতেন। তাঁর তো মনে পড়ে না, এ-ছেলে পেটে থাকতে ডাক্তার হয়নি বলে স্বামীকে কখনো কটাক্ষ করেছেন বা টাকা-টাকা করে মাথা খারাপ করে দিয়েছেন! তখন বরং এক দুপুরবেলায় সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি সহপাঠী মেয়েদের সঙ্গে তালসারির নিচ দিয়ে আঁচল উড়িয়ে হাঁটছেন। দলবেঁধে যাচ্ছেন দূরের কোনো মেলা বা উৎসবে। রাস্তার ধারের ধানখেতে এঁকেবেঁকে বাতাস বইছে। শিরশিরে হাওয়া। না-শীত, না-গরম – খুব সুন্দর আর আরামদায়ক অনুভূতি। ততদিনে শ্বশুরবাড়ির ভাঙা বেড়া, খাটা পায়খানায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন নীহার বানু। জাগ দেয়ো পচা পাটের গন্ধটাও গর্ভবতী অবস্থায় জ্বালাতন করত না। তাই হয়তো ছেলেরও গন্ধবাতিক নেই। ও যে-ঘরে পড়াশোনা করে ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করেছে, এর অর্ধেকটা ছিল পাটের গুদাম। তখন থেকেই ডাক্তার হওয়ার পণ। পড়তোও রাত জেগে। যুদ্ধের দিন। পাকিস্তানি আর্মি বাড়িটা পুড়িয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত নীহার বানু ঘুম থেকে উঠে-উঠে ছেলেকে পাহারা দিতেন। বন্দুক হাতে অনেক কিশোর মুক্তিযুদ্ধ করছে, ও যদি বাপের মত যুদ্ধে চলে যায়, ডাক্তার হওয়ার মুখে ছাই পড়বে। এ-বাড়ির বাতাসটাই খারাপ – কাউকে বড় হতে দেয় না। পরে মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ছেলের ঘনঘন টাকা চাওয়া, নীহার বানুর মনে হল – বড় হতে চাওয়ারই বিড়ম্বরা। সবে যার শুরু।

বড় ছেলের অসুস্থতার বছরটায় মোয়াজ্জেম হকের ডিসপেনসারি প্রায় বন্ধই ছিল। জমানো টাকাকড়ি সব ছেলের চিকিৎসায় গেছে। শেষের দিকে ধানিজমিও বন্ধক দিতে হয়েছিল। ছেলে বাঁচেনি। জীবিত ছেলে জ্বালিয়ে মারছে টাকা-টাকা করে। ছেলের সামনেই হাতের চুড়ি খুলে দিলে ও রুমালে বেঁধে স্বর্ণকারের দোকানে বেচতে নিয়ে যায়। অলঙ্কারহীন হাতের দিকে তাকিয়ে নীহার বানু ভাবতেন, তাও সান্তবনা থাকত ছেলে যদি ডাক্তার হয়ে বিনা ‘ভিজিট’-এ দেশের গরিব রোগীদের চিকিৎসা করত, যেমনটি বই-পুস্তকে লেখা থাকে। বা সে যদি ক্যান্সার হাসপাতাল বানাতো, যে-রোগে তাঁর বড় ভাইকে অসময়ে চলে যেতে হয়েছে। সেরকম কোনো লক্ষণই তো নেই। তিনি মেজোছেলের দিকে তাকাতেন কাকের দৃষ্টিতে, যেন কোকিলের ডিমে তা দিয়ে এ-বাচ্চা ফুটিয়েছেন। বোকামি আর কাকে বলে!

সাবিনার মনে হয় – মেজোভাই যা হতে চেয়েছিলেন, তা-ই হয়েছেন। পেশাগত জীবনে সফলতা এসেছে, টাকা হয়েছে। আর অলক্ষে বেড়েছে বয়স। দাঁতের পাটি নড়বড়ে। টাকমাথা ঘিরে অক্সিডাইস করা রুপার ঝালরের মত কাঁচা-পাকা চুলের গোছা। এখন হয়তো মানুষের জীবনের কামিয়াবি কিসে – সেই তালাশে আছেন। তিনি ভাবতেই পারেন, পেশাগত যশ-খ্যাতি সুখ আনলেও একা সুখ ভোগে আনন্দ নেই, লোকে যেহেতু এর কদর করে না। গরিব দেশের মানুষ ভালবাসে প্রাপ্তিহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা। তাই হয়তো ব্যর্থ বাবার মাঝে খুঁজে ফিরছেন পরিবারের সোনালি ইতিহাস, যা লিপিবদ্ধ করবে ব্যর্থ বাবার এক ব্যর্থ কন্যা। [চলবে] r

শেয়ার করুন

Leave a Reply